স্কন্দমহাপুরাণের কাশীখণ্ডে কি মাংস আহারের নিন্দা করা হয়েছে ? মীমাংসা ও ন্যায় শাস্ত্রের মাধ্যমে বিশ্লেষণ।
❌ পূর্বপক্ষের দাবি —
স্কন্দ মহাপুরাণের কাশীখণ্ডে মহর্ষি অগস্ত্যের আশ্রমে অহিংসার মহিমা ও মাংসভক্ষণ নিন্দা।
ক্ব মাংসং ক্ব শিবে ভক্তিঃ ক্ব মদ্যং ক্ব শিবার্চনম্।
মদ্যমাংসরতানাঞ্চ দূরে তিষ্ঠতি শঙ্করঃ॥
বিনা শিবপ্রসাদং হি ভ্রান্তিঃ কাপি ন নশ্যতী।
অতএব ভ্রমন্ত্যেতে ভ্রমরাঃ শিববর্জিতাঃ॥
[স্কন্দপুরাণ/কাশীখণ্ড/তৃতীয় অধ্যায়/শ্লোক-৬০-৬১]
অর্থঃ — কোথায় মাংসাহার আর কোথায় শিবভক্তি! কোথায় মদ্যপান আর কোথায় শিবের আরাধনা! মদ্য এবং মাংসে আসক্ত ব্যক্তিদের থেকে ভগবান শঙ্কর (শিব) সর্বদা দূরে অবস্থান করেন। শিবের কৃপা ছাড়া মানুষের মনের কোনো বিভ্রান্তি বা মায়া দূর হয় না। শিবের কৃপাবঞ্চিত হয়েই এই বিভ্রান্ত আত্মারা ভ্রমরের মতো সংসারচক্রে ঘুরে বেড়ায়।
এবং আরও বলা হয়েছে —
মাংসভোজন ও মদ্যপান উভয়ই গুরুতর পাপ এবং ইহলোক ও পরলোকে দুঃখের কারণ। নিজের ভোগের জন্য অন্য প্রাণীর প্রাণ হরণ করে মাংস ভক্ষণকারী কঠোর নরকযন্ত্রণা ভোগ করে এবং পরবর্তীতে কর্মফল অনুযায়ী নিজেও ভোগান্তির শিকার হয়। এমনকি প্রাণসংকটেও মাংস ভক্ষণকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। একইভাবে, মদ্যপানে আসক্ত ব্যক্তিও দীর্ঘকাল নরকে যন্ত্রণা ভোগ করে এবং পরবর্তী জন্মে অধঃপতিত যোনি লাভ করে।
✅ পরম অদ্বৈত মহাপাশুপত শৈবপক্ষ দ্বারা [সিদ্ধান্তপক্ষ] খণ্ডন —
প্রথম বিষয় হলো- পূর্বপক্ষের একটি বড় বিভ্রান্তি হলো- তিনি মনে করেন শাস্ত্রে বুঝি 'নিরামিষ আহারই' সর্বোপরি একমাত্র শুদ্ধ ও চিত্তের জন্য উত্তম আহার এবং মাংস আহার মানেই অশাস্ত্রীয়। অথচ সমগ্র শাস্ত্রে কোথাও আহারকে কেবল একরৈখিক 'আমিষ ও নিরামিষ' এই দুই ভাগে ভাগ করে সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি, বরং শাস্ত্রের মূল বিচার হলো 'ভক্ষ্য' (যা ভক্ষণযোগ্য) এবং 'অভক্ষ্য' (যা ভক্ষণ অযোগ্য)। এই ভক্ষ্য-অভক্ষ্যের বিধান স্বয়ং শাস্ত্রই নির্দিষ্ট করে দিয়েছে।
শাস্ত্রীয় বিধিতে নির্দিষ্ট কিছু পশুপক্ষী ও মৎস্যকে স্পষ্টভাবেই 'ভক্ষ্য' বলে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। যেমন-
মনু সংহিতার ৫ অধ্যায়ে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে —
ভক্ষ্য বস্তুর মধ্যে, প্রথমে প্রাণীর মধ্যে হলো- ছাগ, মেষ, মৃগ, বরাহ আদি আদি।
পঞ্চনখ বিশিষ্ট প্রাণীর মধ্যে - গোধা, শশক, কূর্ম, গণ্ডার, সজারু, পূতিখষ, এগুলো ভক্ষণ যোগ্য৷
পক্ষীর মধ্যে- তিতির, বন্য মোরগ, বন্য কপোত (পায়রা) ও ঘুঘু (যা নির্দিষ্ট যজ্ঞীয় বিধিতে গ্রাহ্য)। এছাড়া চাতক, বটেরা এবং মূলত যারা মাংসাশী বা নোংরা খেকো নয়, এমন তৃণভোজী বা শস্যভোজী পাখি (যেমন বুনো হাঁস বা সারসের কিছু প্রজাতি) ভক্ষ্য। এমনকি প্রাচীন কল্প ও গৃহ্যসূত্রের নির্দিষ্ট নিয়ম অনুসারে ক্ষেত্রবিশেষে ময়ূরের মাংসের বিধানও ছিল।
মৎসের মধ্যে- সাপের ন্যায় দেখতে। নরম বুকবিশিষ্ট বা জলচর হিংস্র প্রাণী, যেমন - কুমির, হাঙর বা মকর।৷ কাঁচা মাংস খেয়ে বেঁচে থাকে এমন জলজ জীব, যেমন- শুশুক (শিমুমার) ইত্যাদি। অদ্ভুত বা বিকৃত আকৃতির যেকোনো মাছ ভক্ষণ নিষিদ্ধ। এসব ধরণের ছাড়া অন্যান্য মাছ ভক্ষণ যোগ্য যেমন - রুই, কাতল ইত্যাদি ইত্যাদি।
আবার - একইভাবে অভক্ষ্য বস্তুরও উল্লেখ শাস্ত্রে রয়েছে৷ উপরোক্ত যেসব বিষয়ের নাম উল্লেখ হয়েছে, সেসব ভক্ষণ করা যায় এতে কোনো দোষ বর্তায় না৷ কারণ, শাস্ত্র নিজেই এই বিধান করে দিয়েছেন৷
বিপরীতপক্ষে, নিরামিষ হলেই যে তা পরম পবিত্র বা গ্রহণীয় তাও নয়। নিরামিষের মধ্যেও বহু বস্তুকে শাস্ত্র 'অভক্ষ্য' বা বর্জনীয় বলেছে। যেমন- পলাণ্ডু (পেঁয়াজ), লশুন (রসুন), গঞ্জন (গাজর), শালগম, ছত্রাক (ব্যাঙের ছাতা) এবং বৃক্ষনির্যাস (গাছের আঠা)। গৃহস্থ ও সাধকদের চিত্তশুদ্ধির জন্য এই সমস্ত নিরামিষ পরিহার করার কড়া নির্দেশ রয়েছে।
এছাড়াও - শাস্ত্রে আরো দেখা যায় - নিরামিষ হোক বা আমিষ যদি তা বাসি হয়ে যায় (শাস্ত্রীয় পরিভাষায় যাকে 'পর্যুষিত অন্ন' বা বাসি খাবার বলে, যা অভক্ষ্য), তবে তা অভক্ষ্য। তাহলে - কেউ যদি দুপুরে নিরামিষ রান্না করে রাতে তা গ্রহণ করে তবে সেটাও অভক্ষ্য বলেই গণ্য হবে। সেক্ষেত্রে, নিরামিষের আর সাত্ত্বিকতা থাকছে না। পক্ষান্তরে- মাংস সদ্য রান্না করে খেলে সেটাই সাত্ত্বিক আহার হিসেবেই গণ্য হবে। পূর্বপক্ষের এই দাবি যে 'নিরামিষ মাত্রই পরম শুদ্ধ' তাহা ব্যভিচার দোষে দুষ্ট।
অতএব দেখা যাচ্ছে, আমিষের মধ্যেও যেমন ভক্ষ্য ও অভক্ষ্যের সূক্ষ্ম বিভাজন রয়েছে, তেমনি নিরামিষের মধ্যেও ভক্ষ্য ও অভক্ষ্য বিদ্যমান। সুতরাং, নিরামিষ আহার গ্রহণ করলেই কেউ স্বয়ংক্রিয়ভাবে শাস্ত্র মেনে চলছেন তা নয়, সেখানেও বহু বাদ-বিচার ও বাধানিষেধ রয়েছে।
যখন শাস্ত্র নিজেই অতি সূক্ষ্মভাবে কোন মাংসটি ভক্ষ্য আর কোন নিরামিষটি অভক্ষ্য তার তালিকা তৈরি করে দিচ্ছে, তখন শাস্ত্রের সেই ভক্ষ্য মাংসের বিধানকে অস্বীকার করে কেবল নিরামিষকেই একমাত্র সিদ্ধান্ত দাবি করা চরম বিভ্রান্তি। শাস্ত্রের একদিকের শ্রেণীবিন্যাসকে মান্য করা আর অন্যদিকের শ্রেণীবিন্যাসকে অস্বীকার করা স্পষ্টতই “অর্ধজড়তীয়তা” দোষে দুষ্ট।
পূর্বপক্ষের শাস্ত্র নিয়ে চর্চা থাকলেও, শাস্ত্র প্রসঙ্গের কোন বাক্যের কি অর্থ হয়, কীভাবে প্রয়োগ হয় তার হয়তো ধারণা নেই। কোনটা “স্তুতিবাদ” কোনটা “নিন্দার্থবাদ” ন্যায় শাস্ত্রের জ্ঞান থাকলে সেটাও বুঝতে পারতেন। পক্ষান্তরে - পূর্বপক্ষ, কেবল “অভিধাবৃত্তি” গ্রহণ পূর্বক নিজের স্বতন্ত্র সিদ্ধান্ত দিয়ে দিয়েছেন এবং সেটাকেই সর্বোপরি মেনেছেন। কিন্তু, পূর্বপক্ষের সেই সিদ্ধান্ত “অর্ধজড়তীয়তা” দোষে দুষ্ট৷
পূর্বপক্ষ বলেছেন - স্কন্দপুরাণের উক্ত প্রসঙ্গে মাংস ভক্ষণের নিন্দা করা হয়েছে, তাই মাংসকে ত্যাগ করা উচিত এটাই শাস্ত্রের সিদ্ধান্ত। কিন্তু, এখানেই পূর্বপক্ষ শাস্ত্রের কেবল একপাক্ষিক অর্থই গ্রহণ করছেন। তিনি এখনো “নিন্দা” এবং “নিষেধের” তত্ত্বগত অর্থও জানেন না।
স্কন্দপুরাণের উক্ত প্রসঙ্গে বলা হয়েছে — “অহিংসার মহিমা” এবং “মাংস ভক্ষণের নিন্দা”৷ অর্থাৎ মাংস ভক্ষণের নিন্দার মাধ্যমে অহিংসা বা মোক্ষের মাহাত্ম্যকে তুলে ধরা বা প্রসংশা করা। পূর্বপক্ষ যদি মীমাংসাদর্শন কিছুটা অধ্যয়ন করতেন তবে “মাংস ভক্ষণের নিন্দাকে” শাস্ত্রের সিদ্ধান্ত বলে সর্বোপরি মান্য করতেন না। তাহলে এখানে প্রশ্ন আসে - মাংস ভক্ষণের নিন্দা কেন করা হলো ? তবে এর উত্তর জানার জন্য মীমাংসা দেখে নেওয়া যাক —
পূর্বপক্ষ ভাবছেন পুরাণে মাংসের নিন্দা করা হয়েছে অর্থেই মাংস আহার সর্বাবস্থায় পাপ বা নিষিদ্ধ। কিন্তু মীমাংসা শাস্ত্রের দুই পরম আচার্য এই ভ্রম দূর করেছেন। “ন হি নিন্দা ন্যায়” অনুযায়ী —
(মীমাংসা-সূত্র ২/৪/২০) এর “শবর ভাষ্যে” বলা হয়েছে–
”ন হি নিন্দা নিন্দয়িতুং প্রযুক্তে। কিং তর্হি? নিন্দিতাদিতরত প্রশংসিতুম্”।।
অর্থ- নিন্দা কেবল নিন্দা করার জন্য ব্যবহার করা হয় না। তবে কেন করা হয় ? যা নিন্দিত হচ্ছে, তা থেকে ভিন্ন অন্য কিছুকে প্রশংসা করার জন্য।
কুমারিল ভট্টের তন্ত্র-বার্তিকে বলা হয়েছে —
“ন হি নিন্দা নিন্দ্যং নিন্দিতুং প্রবর্ততেঽপি তু বিধেয়ং স্তোতুম্ ॥”
অর্থাৎ — নিন্দা নিন্দনীয় বিষয়কে নিন্দা করার উদ্দেশ্যে প্রবৃত্ত হয় না, বরং যা বিধেয় (অর্থাৎ যে কাজটি করার বিধান দেওয়া হচ্ছে), তার প্রশংসা করার জন্য এটি ব্যবহৃত হয়।
স্কন্দপুরাণের কাশীখণ্ডের উক্ত শ্লোকগুলির মূল উদ্দেশ্য মাংসকে পরম পাপ সিদ্ধান্ত দেওয়া নয়, বরং সেখানে 'বিধেয়' হলো 'উচ্চতর শিবভক্তি ও মোক্ষ মার্গ' এবং “অহিংসার” মহিমাকে প্রসংশিত করা। সেই মোক্ষ মার্গ বা নিবৃত্তি মার্গের মহিমা ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রশংসা করার জন্যই এখানে মাংসাহারের নিন্দা করা হয়েছে। এটি শাস্ত্রের এক প্রকার আলংকারিক ভাষা, যাকে মীমাংসায় ‘নিন্দার্থবাদ’ বলে। এর দ্বারা সাধারণ গৃহস্থের জন্য বেদে ও ধর্মসূত্রে দেওয়া মাংসাহারের বিধি মিথ্যা বা অপ্রমাণ হয়ে যায় না। উক্ত প্রসঙ্গেই বলা হয়েছে —
“মদ্যমাংসরতানাঞ্চ দূরে তিষ্ঠতি শঙ্করঃ”॥
"মদ্য-মাংস-রতানাম্" । 'রত' শব্দের অর্থ হল — যাঁরা অত্যন্ত আসক্ত, কামুক, মদ্যপ এবং লোলুপ। শাস্ত্রের নিয়ম হল - জীবনধারণের জন্য বা শাস্ত্রীয় বিধিতে যজ্ঞাবশিষ্ট মাংস গ্রহণ করা আর কাম ও মোহের বশবর্তী হয়ে ২৪ ঘণ্টা মদ্য-মাংসে 'রত' (আসক্ত) থাকা এক বিষয় নয়, দুটি ভিন্ন ভিন্ন বিষয়। শ্লোকটি আসক্তির নিন্দা করেছে, বিধি অনুযায়ী পরিমিত আহারের নিন্দা করেনি।
যেমন - কোনো বৈষ্ণব পুরাণে দেখা যায়, পরমেশ্বর শিব স্বয়ং ভগবান বিষ্ণুকে পরম সত্ত্বা বলে স্তুতি করছেন এবং নিজেকে তাঁর দাস বা ভক্ত হিসেবে ঘোষণা করছেন।
এখন, আমরা যদি এই শাস্ত্রবাক্যের কেবল 'শক্যার্থ' (আক্ষরিক অর্থ) গ্রহণ করি, তবে অর্থ দাঁড়াবে যে- শিব কেবলই একজন সাধারণ দেবতা এবং তাঁর নিজস্ব 'পরমত্ব' বা ঈশ্বরত্ব খণ্ডিত হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু শাস্ত্রবিচারের পরিভাষায় এখানে শিবের পরমত্ব খণ্ডিত হয় না। এখানে মূল উদ্দেশ্য শিবকে ছোট করা নয়, বরং পরমেশ্বর শিব নিজের মুখে বিষ্ণুর স্তুতি করে মূলত বিষ্ণুভক্তির মহিমা (বিধেয়) প্রচার করছেন। একেই শাস্ত্রে 'স্তুত্যর্থবাদ' বলা হয়।
ঠিক একইভাবে, কাশীখণ্ডে যখন মোক্ষ ও শিবভক্তির মহিমা প্রচারের উদ্দেশ্যে মাংসাহারের তীব্র নিন্দা করা হয়, তখন তারও 'শক্যার্থ' বা আক্ষরিক অর্থ নিয়ে মাংসাহারকে পরম পাপ বলা ভুল। সেখানে শিবভক্তিরূপ 'বিধেয়'-এর মহিমা কীর্তন করার জন্যই মাংসের নিন্দা করা হয়েছে, যাকে শবরস্বামী ও কুমারিল ভট্ট 'নিন্দার্থবাদ' বলেছেন। সুতরাং, এই নিন্দা প্রশংসারই একটি আলংকারিক পিঠ মাত্র, কোনো সার্বিক নিষেধ বা পরম সিদ্ধান্ত নয়।"
কিন্তু, পূর্বপক্ষ উক্ত প্রকরণের আক্ষরিক অর্থ গ্রহণ করেই সিদ্ধান্ত দিতে চেয়েছেন যে, এখানে মাংস ভক্ষণের নিষেধ করা হচ্ছে। পূর্বপক্ষ এখনো “নিন্দার” মূল অর্থটি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে।
পূর্বপক্ষের মতানুযায়ী, যদি স্কন্দপুরাণে মাংস আহার নিষেধ হয়, তবে, একই স্কন্দপুরাণের সংহিতা ভাগ [সূত সংহিতা/যজ্ঞবৈভবখণ্ড/পূর্বভাগ/৪৫ অধ্যায়/৪১, ৪৮-৫১ নং শ্লোক] -এ শাস্ত্রবিহিত মাংস ভক্ষণের বিধিও রয়েছে। তাহলে, পুরাণে কি “বিরোধাভাস” হচ্ছে না ? কারণ - পুরাণই বলছে মাংস গ্রহণ করা যাবে না, পক্ষান্তরে পুরাণই বলছে - মাংস গ্রহণ করা যায়। তবে সেক্ষেত্রে আপাত দৃষ্টিতে “বিরোধাভাস” এর উদয় হয়। তবে সেক্ষেত্রে মীমাংসা কি হতে পারে, সেই সিদ্ধান্তই বিশ্লেষণ করা যাক। পূর্বমীমাংসায় বলা হয়েছে —
"শিষ্ট্বা তু প্রতিষেধঃ স্যাৎ" [পূর্বমীমাংসা ১০/৮/৪-৬]
অর্থ : কিন্তু (একটি বিধান বা বিধি) পূর্বে শিষ্ট (উপদিষ্ট বা বিহিত) হওয়ার পর যদি তার নিষেধ আসে, তবে তাকে প্রতিষেধ বা বর্জন হিসেবে গ্রহণ করতে হবে (যা বিকল্পের জন্ম দেয়)।
যেমন - "উদিতে জুহোতি" (ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ৫/৫/৫) এবং "অনুদিতে জুহোতি"।।
অর্থ - "সূর্য উদিত হলে হোম (যজ্ঞ) করবে" / "সূর্য উদিত না হলে (উদয়ের পূর্বে) হোম করবে।"
"অতিরাত্রে ষোড়শিনং গৃহ্ণাতি" ও "নাতিরাত্রে ষোড়শিনং গৃহ্ণাতি"।। (তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ২/২/২/৩ ও ১২)
অর্থ - "অতিরাত্র যজ্ঞে ষোড়শী পাত্র গ্রহণ করবে" / "অতিরাত্র যজ্ঞে ষোড়শী পাত্র গ্রহণ করবে না।"
এই ধরনের ক্ষেত্রে 'তুল্যবলবিরোধ'-এর (সমান শক্তিশালী দুটি বাক্যের পারস্পরিক বিরোধের) কারণে 'বিকল্প' নির্ধারিত বা সিদ্ধ হয়। অর্থাৎ, মীমাংসা শাস্ত্র অনুসারে যেহেতু দুটি বাক্যই শ্রুতি বা বেদের বাণী, তাই কেউ চাইলে সূর্যোদয়ের পরেও হোম করতে পারেন, আগেও করতে পারেন, কিংবা যজ্ঞে ষোড়শী পাত্র নিতেও পারেন, নাও নিতে পারেন। দুটিই সমানভাবে সত্য।
মাংসের ক্ষেত্রেও ঠিক এই "তুল্যবলবিরোধ" স্পষ্ট। যেমন - স্কন্দপুরাণে বলা হচ্ছে মাংস ভক্ষণ করা অনুচিত। আবার - আপস্তম্ব ধর্মসূত্রে বলছে - “তথা রসানামমাংসমাধুলবণানীতি পরিহাপ্য”।। [কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/আপস্তম্ব ধর্মসূত্র/১/১৭/১৫], অর্থাৎ - ভক্ষণের জন্য বাজার থেকে মাংস কেনা যায়। তাহলে - দেখা যাচ্ছে এখানেও একটা “বিরোধাভাস” এর উৎপত্তি হচ্ছে। কারণ - মাংস ভক্ষণ ও মাংস বর্জন দুই বিধানই শাস্ত্রে বর্ণিত আছে। এখন - শাস্ত্র যেহেতু পরস্পর বিরোধ হতে পারেনা সেক্ষেত্রে তার সমন্বয় করতে হবে৷ তাহলে - এর সমন্বয় কোন প্রকারে হবে ? সেক্ষেত্রে মনুর বচন অনুযায়ী - “আচারশ্চৈব সাধূনামাত্মনস্তুষ্টিরেব চ” ।। (মনু সংহিতা/২/৬)
উক্ত শ্লোকের ভাষ্যে মেধাতিথি বলেছেন — আত্মতুষ্টিশ্চ বৈকল্পিকপদার্থবিষয়ধর্ম্মে প্রমাণম্। তদাহ গর্গব্যাসঃ- বৈকল্পিকে আত্মতুষ্টিঃ প্রমাণম্।।
“আত্মসন্তুষ্টিও ধর্মের প্রমাণমূলক বিষয়। গর্গব্যাসও বলেছেন ‘আত্মসন্তুষ্টিই বৈধ (প্রমাণ)।” অর্থাৎ- ধর্মের প্রতিষ্ঠা ও প্রমাণের জন্য শুধুই বেদ বা আচারের নির্দেশই নয়, নিজের অন্তর্গত তৃপ্তি বা আত্মসন্তুষ্টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যেহেতু শাস্ত্রে মাংস আহার এবং মাংস বর্জন দুটিরই তুল্যবল বিধান ও বিকল্প রয়েছে, তাই এখানে কোন ব্যক্তি নিরামিষ খাবে আর কে আমিষ খাবে, তা সম্পূর্ণভাবে সেই ব্যক্তির 'আত্মতুষ্টি' বা রুচির ওপর নির্ভরশীল এবং শাস্ত্রীয়ভাবেই তা অনুমোদিত।
সুতরাং, এখানে আমি নিজের ইচ্ছেমতো কথা বলছি না। শাস্ত্রের দেওয়া বিকল্পের জায়গায় নিজের আত্মতুষ্টি বা রুচিকে প্রাধান্য দেওয়াটাই যে পরম শাস্ত্রীয় নিয়ম তা মনুস্মৃতি, মেধাতিথি ভাষ্য এবং ব্যাসদেবের বচন দ্বারাই প্রমাণিত। অতএব, কেবল নিরামিষ আহারকেই একমাত্র সিদ্ধান্ত বলে চাপিয়ে দেওয়াটা শাস্ত্রের একপাক্ষিক সিদ্ধান্ত মাত্র। কারো যদি মাংস ভক্ষণ করতে ইচ্ছে না হয় তবে- সে নিরামিষ গ্রহণ করবে। আর যে মাংস ভক্ষণে অভ্যস্ত সে তাই ভক্ষণ করবে। আমাদের বলা এই মীমাংসাতে তো আর শাস্ত্রের বিরোধ হচ্ছে না৷ তাই বলে এরূপ সিদ্ধান্ত দেওয়া যাবেনা যে- একমাত্র নিরামিষই সাত্ত্বিক আহার, মাংস আদি আহার বর্জনীয়। যদি এরূপ সিদ্ধান্ত দেওয়া হয় তবে- বহু প্রামাণ্য শাস্ত্রবাক্যের উপর “বিরোধদোষ” আরোপিত হবে৷
পূর্বপক্ষ জীবনধারণের জন্য মাংস গ্রহণকে যে ‘পাপ’ বা ‘হিংসা’ বলে লৌকিক ভাবাবেগ তৈরি করতে চাইছেন, তা বৈদিক সৃষ্টিতত্ত্বের নিয়মেরই বিরোধী। পরম প্রমাণ শ্রুতি এবং স্মৃতি উভয় স্থানেই এই সৃষ্টিকে ‘অন্ন এবং অন্নাদের’ (খাদ্য ও খাদক) একটি চক্র হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। স্বয়ং তৈত্তিরীয় উপনিষদে সৃষ্টির এই নিয়ম বলা হয়েছে —
"অহমন্নমন্নমদাদন্তমদ্মি"।।
অর্থাৎ- আমিই অন্ন, এবং অন্নভক্ষণকারীকে আমিই ভক্ষণ করি। সমস্ত সৃষ্টিই একে অপরের খাদ্য।
আরো দেখুন, ‘সর্বমস্যান্নং ভবতি’ সবই অন্ন — বলছে বৃহদারণ্যক উপনিষদ/২/২/৪।
শ্রুতির এই ধারণাকেই আরও স্পষ্ট করে মনুসংহিতার পঞ্চম অধ্যায়ের ৩০ নম্বর শ্লোকে মহর্ষি মনু সিদ্ধান্ত দিয়েছেন —
“নাত্তাদোষোঽস্ত্যত্তা হি প্রাণিনোঽহন্যহন্যপি।
ধাত্রৈব সৃষ্টা হি প্রাণিনো ভোক্তারশ্চৈব ভক্ষকাঃ ॥”
[মনুস্মৃতি/৫ অধ্যায়/৩০ নং শ্লোক]
অর্থ — প্রতিদিন ভক্ষ্য প্রাণীদের ভক্ষণ করলেও ভক্ষণকারীর কোনো দোষ বা পাপ হয় না। কারণ, বিধাতা নিজেই কিছু প্রাণীকে ভক্ষ্য এবং কিছু প্রাণীকে ভক্ষক হিসেবে সৃষ্টি করেছেন।
সুতরাং, শাস্ত্র যেখানে বিধাতার সৃষ্টিপ্রক্রিয়া এবং প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মকে স্বীকৃতি দিয়ে ভক্ষ্য প্রাণীর মাংস গ্রহণকে ‘নিষ্পাপ’ বলে সিদ্ধান্ত দিচ্ছে, সেখানে পূর্বপক্ষ লৌকিক আবেগের বশবর্তী হয়ে একে সর্বাবস্থায় ‘পাপ’ বলে মূলত মনুস্মৃতি এবং উপনিষদের এই সিদ্ধান্তকেই অস্বীকার করছেন।
অতএব, পূর্বপক্ষের উত্থাপিত পুরাণের শ্লোকটি নিবৃত্তি মার্গী ও মোক্ষকামীদের জন্য সত্য, কৃষ্ণ-যজুর্বেদের আপস্তম্ব ধর্মসূত্রের — বাজার থেকে ক্রয় করে (কিনে) এনে মাংস খাওয়ার বিধি বা মনুস্মৃতির বিধানটি প্রবৃত্তি মার্গীদের জন্য সমান সত্য। শাস্ত্রের একটি অংশকে (নিষেধ) গ্রহণ করে অন্য অংশকে (বিধি) হঠতা/জেদ বশত অমান্য বলে উড়িয়ে দেওয়াটাই হল - অর্ধজড়তীয়তা দোষ।
এছাড়াও শিবমহাপুরাণের বায়বীয় সংহিতার পূর্বখণ্ডের ১ম অধ্যায়ের ২৫-২৭ অধ্যায় অনুসারে বেদ-বেদাঙ্গও পরমেশ্বর শিবের বচন। শুধুমাত্র পুরাণের বচনের সামান্য অংশ দেখিয়ে তার দ্বারা অনান্য সকল শিববানীরূপ শাস্ত্রের বচনকে অস্বীকার করাও অজ্ঞতামাত্র। আর যদি এটাও ছেড়ে দিই, তবুও ব্যাস সংহিতা/১/৪ - অনুসারে উক্ত বিষয়ে বেদের বচনের কাছে পুরাণ বচন দুর্বল।
অতএব, “কেবল নিরামিষই একমাত্র শাস্ত্রীয় সিদ্ধান্ত এবং মাংসাহার সর্বাবস্থায় পাপ” পূর্বপক্ষের এই দাবি শবরস্বামী, কুমারিল ভট্ট, মেধাতিথি এবং মহর্ষি জৈমিনির ব্যাখ্যার আলোকেই সম্পূর্ণ খণ্ডিত, অশাস্ত্রীয় ও অযৌক্তিক।
🙏সর্বে হ্যেষ রুদ্রস্তস্মৈ রুদ্রায় নমো অস্তু🙏
শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্ ✊🚩
✍️ অপপ্রচার দমনে — অন্তিক ভট্টাচার্য্য (শম্বরনাথ শৈব)।
🌻 বিশেষ কৃতজ্ঞতা — আমার গুরু শ্রী নন্দীনাথ শৈবাচার্য জী ও আমার আদর্শ শ্রী রোহিত কুমার চৌধুরী শৈবজী।
📣 ©️ কপিরাইট ও প্রচারে : Shivalaya 🔥
শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্ 🚩
ॐ নমঃ পার্বতীপতয়ে হর হর মহাদেব 🚩
পরমেশ্বর শিবের ও সনাতন শৈবধর্মের বিষয়ে এমন গুহ্য সত্য রহস্য ও সত্য উন্মোচনমূলক লেখা আরো পেতে অবশ্যই আমাদের Shivalaya ফেসবুক পেজ Follow করে Favourite করে রাখুন। এই তথ্য দ্বারা যদি আপনার জ্ঞান বৃদ্ধি হয়ে থাকে তবে অবশ্যই এই লেখাটি শেয়ার করুন, যাতে সত্য প্রকাশ্যে আসে।
#হিন্দুধর্ম #সনাতনধর্ম #শিবালয় #Shivalaya #sanatandharma #খাদ্যাভ্যাস #শৈবধর্ম #আমিষ #নিরামিষ #মাংসাহার #কাশীখণ্ড #মনুস্মৃতি #ব্যাসস্মৃতি #স্কন্দমহাপুরাণ #শুক্ল-যজুর্বেদ #উদ্ভিদ #আপস্তম্বধর্মসূত্র #ন্যায়শাস্ত্র #মীমাংসাশাস্ত্র
[এই পোস্টটি শুধুমাত্র শিক্ষামূলক ও জনসচেতনতার উদ্দেশ্যে প্রকাশিত।এখানে ব্যবহৃত চিত্রটি কেবল বিষয়টি সহজে উপস্থাপনের জন্য Ai-সহায়তায় নির্মিত একটি প্রতীকী চিত্র, এই ছবিটির মধ্যে কিছু লেখা আলাদা ভাবে লেখা হয়েছে। সকল শাস্ত্রীয় উদ্ধৃতি ও তথ্য যথাসম্ভব মূল গ্রন্থ অনুসারে ছবি উপস্থাপিত হয়েছে।]

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন