শিবধর্ম ও শিবসেবা-ভক্তির মাধ্যমে প্রাণীদের মুক্তি
শিবমহাপুরাণ অনুসারে শিবের ধর্মকেই শিবধর্ম বলা হয় ।
পরমশৈবাচার্য মহর্ষি উপমন্যু তার যোগ্য শিষ্য পরমশৈব শ্রীকৃষ্ণজী মহারাজকে শিবজ্ঞান সম্পর্কে অবগত করানোর মুহূর্তে যা বলেছিলেন তা এখানে নিচে উল্লেখ করা হল।
মহর্ষি উপমন্যু শৈবশিরোমণি শ্রীকৃষ্ণজী মহারাজের উদ্দেশ্য বললেন,
হে শ্রীকৃষ্ণ হে পরমশিবভক্ত!
যিনি নিজ হৃদয়ে শক্তিসহ ভগবান শিবকে দর্শন করেন, তিনি সনাতন শান্তি প্রাপ্ত হন, অন্যেরা নয়, এই হল শ্রুতির বক্তব্য। শক্তিমানের শক্তি থেকে কখনও বিচ্ছেদ হয় না। সুতরাং শক্তি ও শক্তিমান উভয়ের তাদাত্ম্যের দ্বারা পরমানন্দ প্রাপ্তি হয়। মুক্তির প্রাপ্তিতে অবশ্যই জ্ঞান ও কর্মের কোনাে ক্ৰম আশা করা হয় না, শিব ও শক্তির যখন কৃপা হয়, তখন তার মুক্তি হস্তগত হয়। দেব-দানব-পশু-পক্ষী এবং কীট-পতঙ্গও তার কৃপায় মুক্ত হয়ে যায়। গর্ভস্থ শিশু , জন্মানাে বালক, শিশু, তরুণ, বৃদ্ধ, মুমূর্ষু, স্বর্গবাসী, নরকবাসী, পতিত, ধর্মাত্মা, পণ্ডিত অথবা মূর্খ, সাম্ব শিবের কৃপা হলে তখনই মুক্ত হয়ে যায়, এতে কোনাে সংশয় নেই। পরমেশ্বর শিব তার স্বাভাবিক করুণা দ্বারা ভক্তদের বিবিধ মল (পাপ) দূর করে, তাদের কৃপা করেন, তাতে সন্দেহ নেই । ভগবানের কৃপায় ভক্তি হয় । এবং ভক্তি দ্বারাই তার কৃপা হয়। অবস্থাভেদ চিন্তা করে বিদ্বান পুরুষ এবিষয়ে মােহিত হন না। কৃপাপ্রসাদপূর্বক যে ভক্তিলাভ হয় , তা ভােগ ও মােক্ষ — উভয়ই প্রাপ্তি করায় । মানুষ তা এক জন্মে প্রাপ্ত করতে পারে না। অনেক জন্ম ধরে শ্রোত-স্মার্ত কর্মের অনুষ্ঠান করে সিদ্ধিপ্রাপ্ত, অনাসক্ত, জ্ঞানসম্পন্ন পুরুষের ওপর মহেশ্বর প্রসন্ন হন এবং কৃপা করেন। দেবেশ্বর শিব প্রসন্ন হলে সেই পশুর (জীবের) মধ্যে বুদ্ধিসহ কিছু কিছু ভক্তির উদয় হয় । তখন সে অনুভব করতে থাকে যে, ভগবান শিব আমার প্রভু। তখন তপস্যাসহ সে নানাপ্রকার শৈবধর্ম পালনে সংলগ্ন হয় । সেই পরাভক্তির দ্বারা পরমেশ্বরের পরমপ্রসাদ উপলব্ধ হয় । প্রসাদের দ্বারা সম্পূর্ণ পাপ থেকে মুক্তি হয় এবং মুক্তি হলে পরমানন্দ প্রাপ্তি হয় , যে ব্যক্তির ভগবান শিবে সামান্য ভক্তিভাব থাকে , সে তিন জন্মের পর অবশ্যই মুক্ত হয়ে যায় । তাকে আর এই জগতে জঠর – যন্ত্রণা সহ্য করতে হয় না। অঙ্গসহ এবং অঙ্গরহিত যে সেবা , তাকে বলা হয় ভক্তি। তার তিনটি ভাগ থাকে মানসিক, বাচিক ও শারীরিক। শিবের রূপ ইত্যাদির যে চিন্তা তাকে বলা হয় মানসিক সেবা। জপ ইত্যাদি বাচিক সেবা এবং পূজাদি কর্ম শারীরিক সেবা। এই ত্রিবিধ সাধনা দ্বারা সম্পন্ন হওয়া যে সেবা , তাকে ‘ শিবধর্ম ’ বলে।
পরমাত্মা শিব পাঁচ প্রকার শিবধর্ম বলেছেন — তপ , কর্ম , জপ , ধ্যান ও জ্ঞান। লিঙ্গ পূজা ইত্যাদিকে কর্ম ’ বলা হয় । চান্দ্রায়ণাদি ব্রতের নাম ‘ তপ ’।
বাচিক , উপাংশু ও মানস — তিন প্রকারের যে শিব মন্ত্রের অভ্যাস (আবৃত্তি) , তাকে বলা হয় “ জপ ’।
শিবের চিন্তাকেই ‘ধ্যান’ বলা হয় এবং শিব – সম্পৰ্কীয় আগমে যে জ্ঞানের বর্ণনা থাকে , তাকেই এখানে ‘ জ্ঞান ’ শব্দ দ্বারা বলা হয়েছে।
পরমেশ্বর শিব শিবাকে যে জ্ঞানের উপদেশ দিয়েছেন , তাই হল শিবাগম(শিব + আগম)। শিবের আশ্রিত যে সকল ভক্ত আছেন তাদের প্রতি কৃপা করে কল্যাণের একমাত্র
সাধন এই জ্ঞানের উপদেশ দেওয়া হয়েছে । সুতরাং কল্যাণকামী বুদ্ধিমান পুরুষের পরম কারণ শিবে ভক্তি বৃদ্ধি করে বিষয়াসক্তি ত্যাগ করা উচিত।
[রেফারেন্স : শিবপুরাণ/বায়বীয়সংহিতা/উত্তরখন্ড/অধ্যায় ৭]
© KOUSHIK ROY. ALL RIGHTS RESERVED HTTPS://ISSGT100.BLOGSPOT.COM

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন