শরভ উপনিষদ

॥ শিবঃ ॐ ॥

 ॥ শরভোপনিষৎ ॥

অনুবাদক - শ্রী নন্দীনাথ শৈব আচার্য 

(বাংলাতে এই সর্ব প্রথম শ্রুতিশাস্ত্রের অন্তর্গত মহাশাস্ত্র পরমপবিত্র শরভ উপনিষদ অনুবাদ করে প্রকাশ করা হল ISSGT (International Shiva Shakti Gyan Tirtha) -এর পক্ষ থেকে। অনুবাদ করেছেন শ্রীকৌশিক রায় শৈবজী


অথ  হৈনং পৈপ্পলাদো ব্রহ্মাণমুবাচ ভো ভগবান ব্রহ্মাবিষ্ণুরুদ্রানাং মধ্যে কো বা অধিকতরো ধ্যেয়ঃ স্যাত্তত্ত্বমেব নো ব্রূহীতি । তস্মৈ স হোবাচ পিতামহশ্চ হে পৈপ্পলাদ শৃণু বাক্যমেতত্ । বহূনি পুণ্যানি কৃতানি যেন তেনৈব লভ্যঃ পরমেশ্বরোঽসৌ । যস্যাঙ্গজোঽহং হরিরিন্দ্রমুখ্যা মোহান্ন জানন্তি সুরেন্দ্রমুখ্যাঃ ॥ ১ ॥ 

সরলার্থ – একবার প্রজাপতি ব্রহ্মা কে ঋষি পৈপ্পলাদ জিজ্ঞাসা করেন, হে ভগবন! কৃপা করে এটি বলুন, ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং রুদ্র (শিব) - এনাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ধ্যেয় (পূজ্য) কে ?
প্রজাপতি ব্রহ্মা বললেন, পৈপ্পলাদ!  আমি যা বলছি তা গভীর মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করো। সেই পরমেশ্বর কে বহু পুণ্যের দ্বারাই প্রাপ্ত করা যেতে পারে, যে প্রভুর অঙ্গের থেকে আমি(ব্রহ্মা) প্রকট হয়েছি, সেই পরমেশ্বরকে মোহবশত মুখ্য দেবতা বিষ্ণু,
 ইন্দ্র এবং সুরেন্দ্রও জানতে সক্ষম নন।


প্রভুং বরেণ্যং পিতরং মহেশং

যো ব্রহ্মাণং বিদধাতি তস্মৈ ।

বেদাংশ্চ সর্বান্প্রহিণোতি চাগ্র্যং

তং বৈ প্রভুং পিতরং দেবতানাম্ ॥ ২ ॥

সরলার্থ – সেই প্রভুই সর্বপ্রথম প্রজাপতি ব্রহ্মা কে ধারণ করেন, সেই প্রভুই বরণের যোগ্য, তিনিই প্রভু, তিনিই পিতা মহেশ্বর,
তিনিই শ্রেষ্ঠ। এবং তিনিই বেদের প্রথম প্রেরক পরমেশ্বর, তিনিই সবার প্রভু এবং সমস্ত দেবতাগণেরও পিতা ॥ ২ ॥


 মমাপি বিষ্ণোর্জনকং দেবমীড্যং

যোঽন্তকালে সিযলোকান্সংজহার

স একঃ শ্রেষ্ঠশ্চ সর্বশাস্তা স এব বরিষ্ঠশ্চ ॥ ৩ ॥

সরলার্থ – সেই প্রভু (শিব) আমার (ব্রহ্মা) এবং বিষ্ণুদেবেরও পিতা, উনিই অন্তিম সময়ে (মহাপ্রলয়) সম্পূর্ণ বিশ্বের বিনাশ করেন,সেই দেব কে নমস্কার করি, তিনি একাই নিয়ামক, তিনি শ্রেষ্ঠ এবং বরিষ্ঠ (সর্বাগ্রে বরনীয়) ॥ ৩ ॥


যো ঘোরং বেষমাস্থায শরভাখ্যং মহেশ্বরঃ ।
নৃসিংহং লোকহন্তারং সংজঘান মহাবলঃ ॥ ৪ ॥

সরলার্থ – সেই মহাবলবান মহেশ্বর শরভের রূপ ধারণ করে নৃসিংহের প্রাণ হনন করেন ॥ ৪ ॥


হরিং হরন্তং পাদাভ্যামনুযান্তি সুরেশ্বরাঃ ।
মাবধীঃ পুরুষং বিষ্ণুং বিক্রমস্ব মহানসি ॥ ৫ ॥

সরলার্থ – সর্বেশ্বর ভগবান রুদ্র যখন শ্রী বিষ্ণুর পা এর অংশ ধরে হরণ করলেন, সেই সময় সমস্ত দেবতাগণ পরমেশ্বর শিবের কাছে প্রার্থনা করে বললেন, হে পুরুষোত্তম প্রভু !! আপনি বিষ্ণুর উপর দয়া করুন, ওনাকে বধ করবেন না, আপনার জয় হোক ॥ ৫ ॥


কৃপয়া ভগবান্বিষ্ণুং বিদদার নখৈঃ খরৈঃ ।

চর্মাম্বরো মহাবীরো বীরভদ্রো বভূব হ ॥ ৬ ॥

সরলার্থ – তখন [বীরভদ্র] নিজের তেজোময় নখের দ্বারা নৃসিংহরূপী বিষ্ণুদেবকে ভগবান রুদ্র বিদীর্ণ করে দিলেন, তখন সেই নৃসিংহের চর্ম ধারণকারী সেই মহাবীর রুদ্র বীরভদ্র নামে বিখ্যাত হলেন ॥ ৬ ॥


স একো রুদ্রো ধ্যেযঃ সর্বেষাং  সর্বসিদ্ধযে ।
যো ব্রহ্মণঃ পঞ্চবক্রহন্তা তস্মৈ রুদ্রায নমো অস্তু ॥ ৭ ॥

সরলার্থ – এই প্রকার একমাত্র পরমেশ্বর রুদ্রই সমস্তপ্রকার সিদ্ধিপ্রদানকারী এবং সবার কাছে ধ্যেয় পূজ্য আরাধ্য।

যিনি ব্রহ্মার পঞ্চমতম মাথা কে সমাপ্ত করেছেন, সেই পরমেশ্বর রুদ্র ভগবান কে নমস্কার ॥ ৭ ॥


যো বিস্ফুলিঙ্গেন ললাটজেন সর্বং জগদ্ভস্মসাত্সংকরোতি ।
পুনশ্চ সৃষ্ট্ বা পুনরপ্যরক্ষদেবং স্বতন্ত্রং প্রকটীকরোতি ।
তস্মৈ রুদ্রায় নমো অস্তু ॥ ৮ ॥

সরলার্থ – যিনি নিজ ললাটের অগ্নি দ্বারা সম্পূর্ণ সংসার কে জ্বালিয়ে দেন এবং পুনরায় সৃষ্টি করে সেটিকে রক্ষাও করে থাকেন, সেই পরমেশ্বর ভগবান রুদ্র কে নমস্কার করি ॥ ৮ ॥


যো বামপাদেন জঘান কালং ঘোরং পপেঽথো হলাহলং দহন্তম্ ।
তস্মৈ রুদ্রায নমো অস্তু ॥ ৯ ॥

সরলার্থ – যিনি নিজ বাম পা দ্বারা কাল কে বধ করে দিয়েছেন তথা জলন্ত বিষ পান করেছেন, সেই পরমেশ্বর রুদ্র কে আমি নমস্কার করি ॥ ৯ ॥


যো বামপাদার্চিতবিষ্ণুনেত্রস্তস্মৈ দদৌ চক্রমতীব হৃষ্টঃ ।

তস্মৈ রুদ্রায নমো অস্তু ॥ ১০ ॥

সরলার্থ – যে প্রভুর বাম পাদপদ্মে বিষ্ণু নিজ নেত্র (চক্ষু) সমর্পিত করে দিয়েছেন, তার ফলস্বরূপ যে প্রভু প্রসন্ন হয়ে বিষ্ণুকে চক্র (সুদর্শন) প্রদান করেছিলেন।

সেই পরমেশ্বর ভগবান রুদ্র কে আমি নমস্কার করি ॥ ১০ ॥


যো দক্ষযজ্ঞে সুরসঙ্ঘান্বিজিত্য বিষ্ণুং ববন্ধোরগপাশেন বীরঃ ।

তস্মৈ রুদ্রায নমো অস্তু ॥ ১১ ॥

সরলার্থ – যে বীরভদ্র সমস্ত দেবতাদের কে পরাজিত করেছেন এবং বিষ্ণুকেও নাগপাশ দ্বারা বেঁধে দিয়েছেন। সেই পরমেশ্বর ভগবান রুদ্র কে আমি নমস্কার করি ॥ ১১ ॥


যো লীলযৈব ত্রিপুরং দদাহ বিষ্ণুং কবিং সোমসূর্যাগ্নিনেত্রঃ ।
সর্ব দেবাঃ পশুতামবাপুঃ স্বয়ং তস্মাৎ পশুপতির্বভূব ।
তস্মৈ রুদ্রায নমো অস্তু ॥ ১২ ॥

সরলার্থ – যে প্রভু কৌতুকমাত্রই ত্রিপুরকে দহন করেছেন, যার ত্রিনেত্র সূর্য, চন্দ্র ও অগ্নিস্বরূপ, বিষ্ণু তথা সমস্ত দেবতা যার

সমক্ষে পশুস্বরূপ হয়ে গেছেন অর্থাৎ যার অধীন হয়ে গেছেন, ফলে যিনি পশুপতি উপাধি দ্বারা ভূষিত হন,

সেই পরমেশ্বর ভগবান রুদ্র কে আমি নমস্কার করি ॥ ১২ ॥


যো মৎস্যকূর্মাদিবরাহসিংহান্বিষ্ণুং ক্রমন্তং বামনমাদিবিষ্ণুম্ ।

বিবিক্লবং পীড্যমানং সুরেশং ভস্মীচকার মন্মথং যমং চ ।

তস্মৈ রুদ্রায নমো অস্তু ॥ ১৩ ॥

সরলার্থ – যিনি সুরগণের দেবতা ইন্দ্র সহ বিষ্ণুর মৎস্য, কূর্ম, বরাহ, নৃসিংহ, বামন সহ সমস্ত অবতারের প্রবর্তক এবং তাদের পীড়াদান করেছেন, যিনি যম ও কামদেবকে ভস্ম করেছেন অর্থাৎ তেজোবিহীন করেছেন,

সেই পরমেশ্বর ভগবান রুদ্রকে নমস্কার করি ॥ ১৩ ॥


এবম্ প্রকারেণ বহুধা প্রতুষ্ট্বা ক্ষমাপযামাসুর্নীলকণ্ঠং মহেশ্বরম্ ।

তাপত্রয়সমুদ্ভূতজন্মমৃত্যুজরাদিভিঃ ।

নাবিধানি দুঃখানি জহার পরমেশ্বরঃ ॥ ১৪ ॥


সরলার্থ – এই রকমভাবে দেবতাগণেরা অনেক প্রকার প্রার্থনা করে নীলকণ্ঠ মহেশ্বরের কাছে ক্ষমা চাইতে লাগলেন তখন সেই পরমেশ্বর শিব তিনপ্রকারের তাপ এবং জন্ম,মৃত্যু,জরা আদি অনেক প্রকার দুঃখদায়ক পীড়া নাশ করলেন ॥ ১৪ ॥


এবং মন্ত্রৈঃ প্রার্থ্যমান আত্মা বৈ সর্বদেহিনাম ।
শঙ্করো ভগবানাদ্যো ররক্ষ সকলাঃ প্রজাঃ ॥ ১৫ ॥


সরলার্থ – এইভাবে দেবতাগণকৃত অনেক প্রকার স্তুতি শ্রবণ করে পরমেশ্বর ভগবান শঙ্কর প্রসন্ন হলেন তথা প্রজাগণকে রক্ষা

করলেন ॥ ১৫ ॥


ভক্ত্যানম্রতনোর্বিষ্ণোঃ প্রসাদমকরোদ্বিভুঃ ।
যতো বাচো নিবর্তন্তে অপ্রাণ্য মনসা সহ ।
আনন্দং ব্রহ্মণো বিদ্বান্ন বিভেতি কদাচনেতি ॥ ১৭ ॥


সরলার্থ – সেই পরমেশ্বর মহেশ্বর শ্রীবিষ্ণুর ভক্তিযুক্ত নমস্কারের প্রতি প্রসন্ন হলেন। যে স্থান হতে (যে শিবের অনুভূতি তে) মনের সাথে বাক্য‌ও তাকে না পেয়ে ফিরে আসে, সেই আনন্দ স্বরূপ ব্রহ্মের(শিবের) বোধ(উপলব্ধ জ্ঞান) কারী বিদ্বান ব্যক্তি কখনো ভয়গ্রস্ত হন না ॥ ১৭ ॥


‌অণোরণীযান্মহতো মহীযানাত্মাস্যজন্তোর্নিহিতো গুহাযাম্ ।

তমক্রতুং পশ্যতি বীতশোকো ধাতুঃপ্রসাদান্মহিমানমীশম্ ॥ ১৮ ॥


সরলার্থ – পরমাত্ম-চেতনা(শিব) এই জীবের হৃদয়রূপী গুহা র মধ্যে অনুর থেকেও অতিসূক্ষ্ম এবং মহানের থেকে‌ও অতি মহানরূপে বিরাজমান । শুধুমাত্র শোকরহিত নিষ্কাম কর্মে রত থাকা কোনো বিমল সাধকই পরমাত্মার অনুকম্পা দ্বারাই সেই পরমাত্মা শিবের দর্শন পেয়ে থাকেন ॥ ১৮ ॥


বসিষ্টবৈযাসকিবামদেববিরিঞ্চিমুখ্যৈর্হৃদি ভাব্যমানঃ ।

সনৎসুজাতাদিসনাতনাদ্যৈরীড্যো মহেশো ভগবানাদিদেবঃ ॥ ১৯ ॥


সরলার্থ – বসিষ্ট, বামদেব, বিরিঞ্চি(ব্রহ্মা) এবং শুকদেবের ন্যায় ঋষি নিরন্তরভাবে যে প্রভুর ধ্যানে মগ্ন থাকেন এবং সনৎসুজাত

আদি, সনাতন আদি ঋষি যে প্রভুর স্তুতি করে থাকেন, সেই ভগবান মহেশ্বর হলেন দেবতাদের‌ও পূর্ববর্তী আদিদেব(পরমেশ্বর) ॥ ১৯


সত্যো নিত্যঃ সর্বসাক্ষী মহেশো নিত্যানন্দো নির্বিকল্পো নিরাখ্যঃ ।
অচিন্ত্যশক্তির্ভগবান্গিরীশঃ স্বাবিদ্যযা কল্পিতমানভূমিঃ ॥ ২০ ॥


সরলার্থ – সেই পর্বতবাসী ভগবান গিরীশ শিবের বিদ্যা(শক্তি) সম্পর্কে কেউ জানতে সক্ষম নন। সেই প্রভু শিব নিত্য, সত্য, সবার মধ্যে সাক্ষী হিসেবে নিরন্তর আনন্দরূপ, নির্বিকল্পরূপে অবস্থিত। যা বাক্যের অগোচর, সেই প্রভুর প্রকৃত অবস্থান আদি সম্পর্কে আমরা নিজেদের অবিদ্যার কারণে শুধুমাত্র কল্পনার উপর নির্ভর করি(অর্থাৎ সেই প্রভুকে যথার্থরূপে জানি না) ॥ ২০ ॥


অতিমোহকরী মায়া মম বিষ্ণোশ্চ সুব্রত ।
তস্য পাদাম্বুজধ্যানাদ্ দুস্তরা সুতরা ভবেৎ ॥ ২১


সরলার্থ – তার(শিবের) মায়া আমাকে (ব্রহ্মা)এবং স্বয়ং শ্রীবিষ্ণুকেও অতি দৃঢ়ভাবে মোহিত করে থাকে। মায়া থেকে মুক্ত হওয়া অতি দুষ্কর, কিন্তু তার(শিব) চরণের কমলের ধ্যান করলে সেই মায়া থেকে সহজেই মুক্ত হওয়া সম্ভবপর হয় ॥২১


অতিমোহকরী মায়া মম বিষ্ণোশ্চ সুব্রত ।

তস্য পাদাম্বুজধ্যানাদ্ দুস্তরা সুতরা ভবেৎ ॥ ২২ ॥ 


সরলার্থ – (শিবের আদেশে) সম্পূর্ণ বিশ্বসৃষ্টির প্রকটকারী হলেন শ্রীবিষ্ণুই। নিজের অংশস্বরূপ জীবের সাথে, আমার‌ই(ব্রহ্মার) অংশস্বরূপ থেকে সমুদ্ভূত হয়ে সম্পূর্ণ জগতকে পালন করে থাকেন ॥২২


বিনাশং কালতো যাতি ততোঽন্যৎসকলং মৃষা ।
ॐ তস্মৈ মহাগ্রাসায মহাদেবায শূলিনে ।
মহেশ্বরায় মৃডায তস্মৈ রুদ্রায নমো অস্তু ॥ ২৩ ॥


সরলার্থ – কালের ক্রমানুসারে সমস্ত কিছু বিনষ্ট হয়ে যায়, এই কারণে এই সমস্ত বিশ্বসৃষ্টি মিথ্যা। ওই সমস্ত কিছুকে মহাগ্রাসরূপে পরিনত করে থাকেন যিনি, সেই শূলধারী মহাদেব কে এবং কৃপাবর্ষনকারী মহেশ্বর রুদ্রকে নমস্কার করি ॥ ২৩


একো বিষ্ণুর্মহদ্ভূতং পৃথগ্ভূতাযনেকশঃ ।

ত্রীংল্লোকান্ব্যাপ্য ভূতাত্মা ভুঙ্ ক্তে বিশ্বভুগব্যযঃ ॥ ২৪


সরলার্থ – (শিবের ইচ্ছায়) একমাত্র ভগবান বিষ্ণু এই সমস্ত প্রকার সৃষ্টির মধ্যে সবথেকে পৃথক, মহান এবং অদ্ভুত। যদিও তিনি সর্বভূত তথা প্রাণীদের দের মধ্যে সব রকম ভোগকে উপভোগ করেন তবুও অব্যয় হন ॥২৪


চতুর্ভিশ্চ চতুর্ভিশ্চ দ্বাভ্যাং পঞ্চমিরেব চ ।

হূযতে চ পুনর্দ্বাভ্যাং স মে বিষ্ণুঃ প্রসীদতু ॥ ২৫ ॥


সরলার্থ – যে ভগবান বিষ্ণুর উদ্দেশ্যে চার-চার, দুই এবং পাঁচ তথা পুনরায় দুই আহুতি সমর্পিত করা হয়, সেই শ্রীবিষ্ণু আমার (ব্রহ্মার) উপর প্রসন্ন হোন ॥২৫


ব্রহ্মার্পণং ব্রহ্ম হবির্ব্রহ্মাগ্নৌ ব্রহ্মণা হুতম্ ।

ব্রহ্মৈব তেন গন্তব্যং ব্রহ্মকর্মসমাধিনা ॥ ২৬ ॥


সরলার্থ – ব্রহ্মের উদ্দেশ্যে অর্পণ করা হবি স্বয়ং ব্রহ্ম, হবিকে সেই ব্রহ্মরূপ কর্তা দ্বারা ব্রহ্মরূপ অগ্নিতে হবন করা হয়ে থাকে, এই আহুতি দেওয়াও হল ব্রহ্ম। এই কারণে সমাধিস্থ যোগীর কাছে প্রাপ্ত করার যোগ্য একমাত্র ব্রহ্ম‌ই(শিব‌ই) থাকে ॥২৬


শরা জীবাস্তদঙ্গেষু ভাতি নিত্যং হরিঃ স্বযম্ ।

ব্রহ্মৈব শরভঃ সাক্ষান্মোক্ষদোঽৎ‌যং মহামুনে ॥ ২৭ ॥


সরলার্থ – স্বয়ং ভগবান শ্রীহরি যার সঙ্গে নিয়মিত প্রকাশমান হন সেই জীব হলো ‘শর’। এই কারণে মোক্ষদাতা ব্রহ্ম‌ই ‘শরভ’ (পরমেশ্বর শিবের স্বরূপ হলেন ভগবান শরভ) ॥২৭


মায়াবশাদেব দেবা মোহিতা মমতাদিভিঃ ।

তস্য মাহাত্ম্যলেশাংশং বক্তুং কেনাপ্য শক্যতে ॥ ২৮ ॥ 


সরলার্থ – দেবতাগণ‌ও যার মায়া আদি দ্বারা বিমোহিত হয়ে থাকেন, সেই প্রভুর মহিমার বিষয়ে কিছুমাত্র বলতে কোন ব্যক্তি সমর্থ হতে পারেন ? ॥ ২৮ ॥


পরাৎপরতরং ব্রহ্মা যৎপরাৎপরতো হরিঃ । পরাৎপরতরো হীশস্তস্মাত্তুল্যোঽধিকো ন হি ॥ ২৯ ॥


সরলার্থ – যিনি পরাৎপর ব্রহ্মা, তার থেকেও অধিক পরাৎপর হলেন হরিঃ । কিন্তু হরির থেকেও অধিক যিনি পরাৎপর তিনিই হলেন ঈশ(সদাশিব), সেই প্রভু শিবের সমান তথা তার চেয়ে অধিক কেউ নেই(কারণ শিব‌ই সর্বোচ্চ সত্ত্বা পরমব্রহ্ম) ॥ ২৯ ॥


এক এব শিবো নিত্যস্ততোঽন্যৎসকলং মৃষা ।

তস্মাৎসর্বান্পরিত্যজ্য ধ্যেযান্বিষ্ণবাদিকান্সুরান্ ॥ ৩০ ॥


সরলার্থ – শিব‌ই একমাত্র নিত্য, অন্য সকল কিছুই মিথ্যা । এই কারণে বিষ্ণু আদি সকল দেবতাকে পরিত্যাগ করে শিবকেই ধ্যেয় বলে জানা উচিত ॥ ৩০ ॥


শিব এব সদা ধ্যেযঃ সর্বসংসারমোচকঃ ।

তস্মৈ মহাগ্রাসায মহেশ্বরায নমঃ ॥ ৩১ ॥


সরলার্থ – কেবলমাত্র প্রভু শিবের‌ই ধ্যান করা উচিত, যিনি সমস্ত বিশ্ব সংসারের মায়া বন্ধন মোচনকারী, সেই কালরূপ বিশ্বকে মহাগ্রাসরূপে গ্রহণকারী প্রভু মহেশ্বর কে নমস্কার করি ॥ ৩১ ॥


পৈপ্পলাদং মহাশাস্ত্রং ন দেযং যস্য কস্যচিত্ ।

নাস্তিকায কৃতঘ্নায দুর্বৃত্তায দুরাত্মনে ॥ ৩২ ॥

দাম্ভিকায় নৃশংসায শঠযানৃতভাষিণে ।

সুব্রতায সুভক্তায সুবৃত্তায সুশীলিনে ॥ ৩৩ ॥

গুরুভক্তায দান্তায শান্তায ঋজুচেতসে ।

শিবভক্তায দাতব্যং ব্রহ্মকর্মোক্তধীমতে ॥ ৩৪ ॥

স্বভক্তাযৈব দাতব্যমকৃতঘ্নায সুব্রতম্ ।

ন দাতব্যং সদা গোপ্যং যত্নেনৈব দ্বিজোত্তম ॥ ৩৫ ॥


সরলার্থ – পৈপ্পলাদ ঋষি দ্বারা প্রাপ্ত হওয়া এই মহাশাস্ত্র শরভ উপনিষদ সবাইকে দেওয়া উচিত নয়। কৃতঘ্ন, নাস্তিক, দুষ্ট বৃত্তি যুক্ত, দুরাত্মা, দাম্ভিক, মিথ্যাবাদী, শঠ এবং নৃশংস ব্যক্তিকে এই উপনিষদ শাস্ত্র কখনোই দেওয়া উচিত নয়। যিনি প্রকৃত ভক্ত, যার বুদ্ধি শুদ্ধ, সুশীল, গুরুভক্ত, পবিত্র সংকল্পধারণকারী, সংযত জীবনযাপন করেন, ধর্ম বুদ্ধি, শিব ভক্ত এবং ব্রহ্ম কর্ম তে মন রাখেন তথা নিজের প্রতিও ভক্তি রাখেন, যিনি কৃতঘ্ন নন, এমন বৈশিষ্ট্য ধারী সাধক ব্যক্তিকেই এই শাস্ত্রের উপদেশ করা উচিত। যদি এমন বৈশিষ্ট্য ধারী ব্যক্তি না পাওয়া যায় তবে হে দ্বিজোত্তম ! এই পৈপ্পলাদ ঋষিকৃত শাস্ত্রকে রক্ষা করবে, কাউকে দেবে না ॥৩২-৩৫


এতৎপৈপ্পলাদং মহাশাস্ত্রং যোঽধীতে শ্রাবযেদ্দ্বিজঃ স জন্মমরণেভ্যো মুক্তো ভবতি । যো জানীতে সোঽমৃতত্বং চ গচ্ছতি । গর্ভবাসাদ্বিমুক্তো ভবতি । সুরাপানাৎপূতো ভবতি । স্বর্ণস্তেযাৎপূতো ভবতি । ব্রহ্মহত্যাৎপূতো ভবতি । গুরুতল্পগমনাৎপূতো ভবতি । স সর্বান্বেদানধীতো ভবতি । স সর্বান্দেবান্ধ্যাতো ভবতি । স সমস্তমহাপাতকো পপাতকাৎপূতো ভবতি । তস্মাদবিমুক্তমাশ্রিতো ভবতি । স সততং শিবপ্রিযো ভবতি । স শিবসাযুজ্যমেতি । ন স পুনরাবর্ততে ন স পুনরাবর্ততে । ব্রহ্মৈব ভবতি । ইত্যাহ ভগবান্ব্রহ্মেত্যুপনিষৎ ॥ ৩৬ ॥


সরলার্থ – এই পৈপ্পলাদকৃত মহাশাস্ত্র শরভ উপনিষদ যে ব্যক্তি স্বয়ং অধ্যয়ন করেন এবং দ্বিজ ব্যক্তিকে শ্রবণ করান, সেই ব্যক্তি জন্ম-মরণরূপী বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে যান । এই শাস্ত্রকে যিনি জানেন তিনি অমৃততত্ত্ব কে প্রাপ্ত করে গর্ভবাস থেকে মুক্ত হন । ইহা পাঠ করলে সেই ব্যক্তি স্বর্ণ চুরির পাপ, সুরাপান, ব্রহ্মহত্যা এবং গুরুপত্নীগমন এর মতো মহাপাতক থেকে মুক্ত হয়ে সমস্ত বেদশাস্ত্র পাঠের ফল লাভ করতে পারেন। সমস্ত মহাপাতক এবং উপপাতক থেকে মুক্তি পেয়ে নির্মল হয়ে যান তথা শিবের আশ্রিত হয়ে যান এবং স্বয়ং শিবের সতত প্রিয় হয়ে যান। শিব সাযুজ্য প্রাপ্ত করতন । তার আর কখনো পুনর্জন্ম হয় না । তিনি ব্রহ্মরূপ হয়ে যান। এইভাবে প্রজাপতি ব্রহ্মা দ্বারা এই শরভ উপনিষদ উপদেশ করা হয়েছে ॥ ৩৬ ॥ (ইতি শরভ উপনিষদ)


লেখনীতে – শ্রীনন্দীনাথ শৈব জী


©️ Copyright এবং প্রচারে – International Shiva Shakti Gyan Tirtha


© Koushik Roy. All Rights Reserved https://issgt100.blogspot.com





মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ