নবদূর্গা – ব্রহ্মচারিণী (২)

  

ব্রহ্মচারিণী


চৈত্র/আশ্বিনের নবরাত্রি নামক শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে মাতা পার্বতীর এই ব্রহ্মচারিণী রূপের পূজা হয় ।


সদাশিবপত্নী মাতা শিবা তার প্রত্যক্ষরূপে লীলামূর্তি ধারণ করেন যা পার্বতী নামে জগতবিখ্যাত।

এই পার্বতী মাতার বিভিন্ন লীলাস্বরূপই নবদুর্গা নামে পরিচিত। মাতা পার্বতীর নবদুর্গাস্বরূপের মধ্যে দ্বিতীয়তম লীলামূর্তি হল – ব্রহ্মচারিণী


পার্বতী মাতা সখীদ্বয় জয়া বিজয়ার সাথে প্রতিদিন ধ্যানস্থে থাকা শিবের পূজা করতে যেতেন। এমতাবস্থায় দেবতাদের পরামর্শে কামদেব একদিন তার কামবান প্রভু শিবের হৃদয় লক্ষ্য করে নিক্ষেপ করলেন। কিন্তু আশানুরূপ ফল তো হল‌ই না বরং কামবান‌সহ কামদেব ভস্মীভূত হয়ে গেলেন। পরমেশ্বর সহসা সেখান থেকে অদৃশ্য হলেন, এই সমস্ত দেখে মাতা পার্বতী অত্যন্ত দুঃখিত হয়ে শিববিরহে পাগলীনি প্রায় হয়ে গেলেন, তার কোনো কিছুই ভালো লাগে না, তিনি সারাদিন শোকে আকুল হয়ে শিব শিব নাম ধরে ডাকতে লাগলেন। তিনি পিতৃগৃহে থাকলেও তার মন ভগবান শঙ্করের কাছেই থাকতো। কখনো কখনো বিরহের বেদনায় শিবা মূর্ছিত হয়ে যেতেন। পিতা হিমালয়, মাতা মেনকা ও ভ্রাতা মৈনাক সহ অন্য ভ্রাতাগণেরা বহুভাবে শান্তনা দিতে লাগলেন কিন্তু শিবার বিরহ যেন কোনোভাবেই প্রশমিত হল না।

এদিকে ইন্দ্রের পরামর্শে দেবর্ষি নারদ হিমালয় ভবনে এলেন।

 পরাশক্তি মাতা শিবা যখন দেবর্ষি নারদ দ্বারা প্রভু শিবের প্রসন্নতার উপায় জেনে নিলেন এবং মহামন্ত্র নমঃ শিবায় এর উপদেশ পেলেন। তখন তিনি পিতা মাতার কাছে অনুমতি চাইলেন, পিতা হিমালয় সম্মতি দিলেও, মাতা মেনকা স্নেহবশত নানাভাবে বোঝালেন, মেনকা তপস্যা করতে বারন করার জন্য বলেছিলেন উ , মা যার অর্থ বাইরে যেও না, সেই থেকে শিবার নাম হল উমা । এটি শুনে পার্বতী মাতা দুঃখ প্রকাশ করেছেন জেনে মেনকা অনুমতি প্রদান করলেন। তখন শিবা নিজের সমস্ত রাজকীয় বস্ত্র, অলংকার তথা রাজভবন ত্যাগ করলেন।


 মাতা পার্বতী কটি প্রদেশে সুন্দর মেখলা বেঁধে বল্কল ধারণ করলেন। অলংকার পরিত্যাগ করে মৃগচর্মে সুশোভিতা হলেন। তারপর তিনি তপস্যার জন্য গঙ্গাবতরণ (গঙ্গোত্রী) তীর্থের দিকে যাত্রা করলেন।


 যেখানে ধ্যানকালে ভগবান শঙ্কর কামদেবকে দগ্ধ করেছিলেন, হিমালয়ের সেই শিখর গঙ্গাবতরণ নামে প্রসিদ্ধ। সেই পরম উত্তম শৃঙ্গীতীর্থে পার্বতীদেবী ব্রহ্মচর্যপালনপূর্বক তপস্যা করতে শুরু করলন। গৌরী তপস্যা করায় তার নাম হল ‘গৌরীশিখর’। শিবা তাঁর তপস্যার দৃষ্টিতে সেই স্থানে বহু সুন্দর ও পবিত্র বৃক্ষ রোপণ করেন, যা ফল প্রদানকারী ছিল। পার্বতী প্রথমে ভূমি শুদ্ধ করে সেখানে এক বেদী নির্মাণ করেন। পরে এমন তপস্যা আরম্ভ করেন, যা মুনিদের পক্ষেও দুষ্কর ছিল। তিনি মনসহ সমস্ত ইন্দ্রিয় বশে করে ঐ বেদীর ওপর উচ্চকোটির তপস্যায় রত হন। গ্রীষ্মকালে নিজের চারদিকে দিনরাত আগুন জ্বালিয়ে, তার মধ্যে বসে নিরন্তর পঞ্চাক্ষর-মন্ত্র জপ করতেন। বর্ষার সময় বেদীর সুস্থির আসনে বসে বা কোনো পাথরের চাঁইয়ে আসন করে নিরন্তর বৃষ্টিধারায় ভিজতে থাকতেন। শীতকালে নিরাহারে থেকে ভগবান শংকরের ভজনে তৎপর হয়ে সর্বদা শীতল জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতেন এবং সারারাত বরফের ওপর বসে থাকতেন। এইভাবে তপস্যা করতে করতে পঞ্চাক্ষর মন্ত্রের জপে সংলগ্ন হয়ে শিবা সমস্ত মনোবাঞ্ছিত ফলের দাতা শিবের ধ্যানে মগ্ন থাকতেন। প্রতিদিন অবকাশ মতো তিনি সখীদের সঙ্গে তার প্রোথিত বৃক্ষসমূহকে প্রসন্নতাসহ জল সেচন করতেন এবং সেখানে আগত অতিথিদের আদর আপ্যায়নও করতেন।

 শুদ্ধ চিত্তসম্পন্ন পার্বতী প্রচণ্ড ঝড়, ঠাণ্ডা, নানাপ্রকার বর্ষা এবং দুঃসহ গরমও সহ্য করতেন। তাঁর ওপর নানাপ্রকার দুঃখ-কষ্ট আসে কিন্তু তিনি তা অগ্রাহ্য করতেন না। তিনি কেবল শিবে মন নিবিষ্ট করে সেখানেই স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে বা বসে থাকতেন। তার প্রথম বছর ফলাহার করে অতিবাহিত হয়, দ্বিতীয় বছর শুধু পাতা চিবিয়ে কাটান। এইভাবে তপস্যা করতে করতে দেবী পার্বতী অসংখ্য বর্ষ অতিক্রম করেন। তারপর হিমালয়ের কন্যা পাতা খাওয়াও ছেড়ে সর্বদা নিরাহারে থাকতে লাগলেন। তাতেও তপশ্চর্যার প্রতি তাঁর অনুরাগ বৃদ্ধি পেতেই থাকল। হিমাচলপুত্রী আদ্যা শিবা আহারের জন্য পর্ণও ত্যাগ করলেন। তাই দেবতারা তাঁর নাম রাখলেন ‘অপর্ণা’। তারপর পার্বতী ভগবান শিবকে স্মরণ করে এক পায়ে দাঁড়িয়ে পঞ্চাক্ষর-মন্ত্র জপ করে অত্যন্ত ভীষণ তপস্যা করতে লাগলেন। তাঁর অঙ্গ চীর ও বল্কলে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। মস্তকে জটা ধারণ করে থাকতেন তিনি। এইভাবে তিনি মুনিদের তপস্যাকেও জয় করে নিলেন, এই ভাবে তিন হাজার বছর কেটে গেল। তার তপস্যার প্রভাবে ওই স্থানে বিচরণকারী পশুপাখিগনেরা‌ও বিরোধশূণ্য হয়ে গিয়েছিল, পার্বতী মাতার তপস্যার ফলে ঐ স্থান কৈলাস সমতুল্য হয়ে উঠেছিল । অবশেষে প্রভু শিব বিভিন্ন পরীক্ষা দ্বারা মাতা পার্বতীকে নিরীক্ষণ করে অবশেষে মাতার মনোবাঞ্ছিত ফল প্রদান করেছিলেন। এই মহাতপস্বীনি স্বরূপী ব্রহ্মচর্যপালনকারীণী মাতা পার্বতীকে ব্রহ্মচারিণী বলা হয় ।


🌷দেবী ব্রহ্মচারিণীর দুটি হস্তের মধ্যে একটি হস্তে অক্ষমালা (জপমালা), অন্য হস্তে কমণ্ডলু। তার ভৈরব হল চন্দ্রমৌলীশ্বর।


কাশীর (বারাণসী) দুর্গাঘাটের সন্নিকটে দেবী ব্রহ্মচারিণীর মন্দির আছে। মন্দিরটি ছোটো পরিসরে। দেবীবিগ্রহটি উচ্চতাও বেশি বড় নয়। পূর্ব দিকে মুখ রয়েছে এই দেবীবিগ্রহের, মুখে সোনার মুখোশ লাগানো থাকে। আশ্বিনের শারদীয়া ও চৈত্রের বাসন্তীপূজার নবরাত্রির সময়ের অন্তর্গত ২য়তম দিনে এই মন্দিরেতে প্রচুর ভক্ত আগমন ঘটে থাকে ।


🔴ব্রহ্মচারিণী ধ্যান –

বন্দে বাঞ্ছিতলাভায় চন্দ্রার্ধকৃতশেখরাম্ ।

জপমালাকমণ্ডলুধরাং ব্রহ্মচারিণীং শুভাম্ ।

গৌরবর্ণাং স্বাধিষ্ঠানস্থিতাং দ্বিতীয়দুর্গাং ত্রিনেত্রাম্।

ধবলবর্ণাং ব্রহ্মরূপাং পুষ্পালঙ্কারভূষিতাম্ ।

পদ্মবদনাং পল্লবাধরাং কান্তঙ্কপোলাং পীনপয়োধরাম্।

কমনীয়াং লাবণ্যাং স্মেরমুখীং নিম্ননাভিং নিতম্বনীম্ ॥


🔴ব্রহ্মচারিণী স্তোত্র –

তপশ্চারিণী ত্বং হি তাপত্রয়নিবারিণী ।

ব্রহ্মরূপধরাং ব্রহ্মচারিণীং প্রণমাম্যহম্ ॥

নবচক্রভেদিনী ত্বং হি নব ঐশ্বর্যপ্রদায়িনী ।

ধনদাং সুখদাং ব্রহ্মচারিণীং প্রণমাম্যহম্ ॥

শঙ্করপ্রিয়া ত্বং হি ভুক্তি-মুক্তিদায়িনী ।

শান্তিদাং মানদাং ব্রহ্মচারিণীং প্রণমাম্যহম্ ।।


🔴ব্রহ্মচারিণী কবচ –

ত্রিপুরা মে হৃদয়ং পাতু ললাটং পাতু শঙ্করভামিনী

অর্পণা সদা পাতু নেত্রৌ অধরৌ চ কপোলৌ ॥

পঞ্চদশী কণ্ঠং পাতু মধ্যদেশং পাতু মাহেশ্বরী

ষোডশী সদা পাতু নভো গৃহো চ পাদয়ো ।

অঙ্গপ্রত্যঙ্গং সততং পাতু ব্রহ্মচারিণী ॥


মাতা পার্বতী ব্রহ্মচারিণীরূপে আমাদের প্রত্যেক ভক্তশৈবদের অটুট ব্রহ্মচর্য্যক্ষমতা প্রদান করুন, আমরা যেন অটুট চর্যার দ্বারা আমাদের শিবসাধনাকে সফল করতে পারি এবং মাতা পার্বতীর চরণের যেন চিরকাল স্থায়ী হতে পারি ।


দধানা করপদ্মাভ্যামক্ষমালাকমণ্ডলূ ।

দেবী প্রসীদতু ময়ি ব্রহ্মচারিণ্যনুত্তমা ॥


ব্রহ্মবিদ্যা তুমি উমা, শিবচিন্তাকারিণী তুমি শিবা ,

শিব শিব নাম জপিতে পারি আমি যেন রাত্র দিবা ।

(শ্রীনন্দীনাথশৈবকৃতপ্রার্থনা)

ॐ নমঃ শিবায়ৈ ॥

ॐ নমঃ শিবায় ॥


✍️লেখনীতে – শ্রীনন্দীনাথ শৈবজী

©️ Copyright এবং প্রচারে – International Shiva Shakti Gyan Tirtha

© Koushik Roy. All Rights Reserved https://issgt100.blogspot.com


মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ