ভাগবতপুরাণ অনুসারে শিব হলেন পরমেশ্বর ভগবান পরমব্রহ্ম

 


যারা এই সমগ্র আলোচনাটি পড়তে আগ্রহী, তাদের কাছে আমাদের নিবেদন থাকলো যে, আপনার ধৈর্য্য সহকারে সম্পূর্ণ লেখাটি পড়বেন।

কারণ এই লেখাটি সুদীর্ঘ, এখানে প্রত্যেকটি বিষয়কে ধরে ধরে আলোচনা করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত পড়বেন তবেই সম্পূর্ণ লেখাটির তাৎপর্য বুঝতে সক্ষম হবেন।


বর্তমানে শৈবদের কথা তথা সনাতনীদের কাছে ভাগবতপুরাণকে হাতিয়ার করে বহু বৈষ্ণবগণ প্রচার করে বেড়াচ্ছেন যে শিব হল শ্মশানবাসী তমোগুণী, তার চালচুলো নেই, সে ভিক্ষারী, সে কামুক, তার পুরুষাঙ্গ লিঙ্গকে শৈবগণের পূজা করে তাই তারাও অসভ্য, শিবকে তমোগুণ থেকে জন্ম দেন বিষ্ণু/কৃষ্ণ। শিব শুধুমাত্র একটা তমোগুণী দেবতামাত্র, তিনি পরমেশ্বর নন, তিনি ভগবান নন, তিনি শ্রীকৃষ্ণের অধীনে থাকেন। একমাত্র শ্রীকৃষ্ণই বিশ্বরূপ দেখিয়েছেন তাই তিনিই ভগবান। শিবপুরাণ তামসিক, তাই শিবপুরাণের কথা অমান্য। একমাত্র ভাগবতপুরাণ ই পরমসাত্ত্বিক পুরাণ তাই ভাগবতপুরাণ ই মান্য।

    - এগুলি হল বর্তমান বৈষ্ণবদের ছড়িয়ে বেড়ানো তাদের কিছু দাবী। চলুন পাঠকবৃন্দগণ আজ তাদের সেই শিবনিন্দার জবাব হিসেবে ভাগবত পুরাণ কি বলছে সেটা দেখে নিই।

(উক্ত ঘটনাটি ভাগবতপুরাণের ৮নং স্কন্ধের ৭নং অধ্যায়ের অন্তর্গত, যেখানে সমুদ্রমন্থন চলাকালীন সময়ে কালকূট বিষ নির্গত হয়ে জগতকে বিনাশের দিকে নিয়ে যেতে শুরু করে তখন সবার প্রার্থনা তে পরমেশ্বর মহাদেব আবির্ভূত হন এবং জগতকে সেই ভয়ঙ্কর বিষ থেকে মুক্ত করেন, ঠিক সেই সময় প্রজাপতিগণ পরমেশ্বর শিবের স্তুতি করে পরম সত্যতা উন্মোচন করে দেন। যা এতদিন গুপ্ত ছিল সমগ্র সনাতন সমাজের কাছে। সেই ঘটনা উল্লেখ করে শিবনিন্দার জবাব এখানে দেয়া হল প্রত্যেক শ্লোকের অনুবাদের সাথে তার ব্যাখ্যা এবং তার সিদ্ধান্ত তুলে ধরা হল।)


লেখনীতে - শ্রী নন্দীনাথ শৈবাচার্য জী 

তথ্য সংগ্রহের জন্য ধন্যবাদ - শ্রীসৌভিক দাস শৈবজী 

(কপিরাইট এবং শিবমাহাত্ম্য প্রচারে - #ISSGT)

INTERNATIONAL SHIVA SHAKTI GYAN TIRTHA


👇

প্রজাপতয় উচুঃ 


⚫দেবদেব মহাদেব ভূতাত্মন্ ভূতভাবন ।

ত্রাহি নঃ শরণাপন্নাংস্ত্রৈলােক্যদহনাদ্ বিষাৎ ॥ ২১


✅বাংলা অর্থ👉প্রজাপতিগণ এইভাবে মহাদেবের স্তুতি করলেন — 

হে দেবতাদের আরাধ্য মহাদেব ! আপনি সমস্ত প্রাণীর আত্মা ও জীবনদাতা, আমরা আপনার শরণাগত । ত্রিলােক ভস্মকারী এই ভয়ংকর তীব্র বিষ থেকে আপনি আমাদের রক্ষা করুন ॥ ২১ ॥

(🔴ব্যাখ্যা - এখানে পরমেশ্বর শিবকে সমস্ত প্রাণীর আত্মা বলে স্বীকার করেছেন স্বয়ং ভাগবতপুরাণ।তিনিই জীবনদাতা প্রভু, বিপদে একমাত্র পরমেশ্বর শিবই সহায় তাই সবাই পরমেশ্বরের শরণাপন্ন হন)


⚫ত্বমেকঃ সর্বজগত ঈশ্বরাে বন্ধমােক্ষয়োঃ । 

তং ত্বামৰ্চন্তি কুশলাঃ প্রপান্নার্তিহরং গুরুম্ ॥ ২২ ॥


✅বাংলা অর্থ👉আপনি সমস্ত জগতের বন্ধন ও মোচনের হেতু (প্রভু), সেইজন্য বিচারশীল ব্যক্তিরা আপনাকে আরাধনা করে থাকেন। কারণ, আপনি শরণাগতের ক্লেশহারী ও জগদ্ গুরু ॥ ২২ ॥

(🔴ব্যাখ্যা - এখানে পরমেশ্বর শিবকে বন্ধনের কারণও বলা হয়েছে এবং সেই বন্ধনমোচনকারী মোক্ষদাতাও বলা হয়েছে, পরমেশ্বরের এই ক্ষমতা আছে তাই তিনি উভয়ই করতে সক্ষম। যারা প্রকৃত বিচার করতে সক্ষম তারা একমাত্র পরমেশ্বরের এই বিষয়ে বুঝতে সক্ষম, সেই কারণেই শিবের আরাধনা বিচারশীল ব্যক্তিরা করেন।সেই প্রভু শিবের কাছে যে কোনো প্রার্থনাকারীর দুঃখ মোচন করেন এবং তিনি জগতের একমাত্র গুরুও বটে।)


⚫গুণময্যা স্বশক্ত্যাস্য সর্গস্থিত্যপ্যয়াম্বিভাে ।

ধৎসে যদা স্বদৃগ্ ভূমন্ ব্রহ্মবিষ্ণুশিবাভিধাম্ ॥ ২৩


✅বাংলা অর্থ👉 হে প্রভু ! আপনার নিজ গুণময়ী শক্তি দ্বারা এই জগতের সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় করার জন্যে অনন্ত, সর্বদা একরস থাকা সত্ত্বেও আপনি ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব নাম ধারণ করেন ॥ ২৩ ॥

(🔴ব্যাখ্যা - এখানে বলা হয়েছে যে, পরমেশ্বর সদাশিব তার গুণময়ী শক্তি দ্বারা অর্থাৎ আদিশক্তির দ্বারা সৃষ্টি করারণ জন্য ব্রহ্মা রূপ, স্থিতি করার জন্য বিষ্ণুরূপ এবং প্রলয়ের জন্য শিব(রুদ্র) রূপ ধারণ করেন। প্রকৃত পক্ষে শিবই একরস তিনিই অনন্ত। অর্থাৎ শিব ও শক্তির মিলনে শিবই তিনটি গুণের দ্বারা ত্রিদেব কে উৎপন্ন করেন। এই ত্রিদেব সেই পরমেশ্বর শিবেরই রূপ। শুধুমাত্র কার্যের জন্য ভিন্ন গুণ দ্বারা বিভক্ত হয়েছেন মাত্র।)


⚫ত্বং ব্রহ্ম পরমং গুহ্যং সদসদ্ভাবভাবনঃ । নানাশক্তিভিরাভাতস্ত্বমাত্মা জগদীশ্বরঃ ॥ ২৪


✅বাংলা অর্থ👉আপনি স্বপ্রকাশ, এর কারণ হল আপনি পরম গুহ্য ব্ৰহ্মতত্ব । উৎকৃষ্ট - নিকৃষ্ট দেবতা, মানুষ, পশুপক্ষী যত প্রাণী রয়েছে সকলেই আপনি জীবনদাতা । কারণ আপনি সকলের আত্মা । আপনিই জগদীশ্বর । নানা শক্তি দ্বারা আপনিই জগৎরূপে প্রতীয়মান হন ॥ ২৪ ॥

(🔴ব্যাখ্যা - উপরোক্ত শ্লোকে বলা হয়েছে যে, পরমেশ্বর শিব স্বয়ং প্রকাশিত হন, অন্য কারোর থেকে তিনি জন্ম নেননি, কারণ শিব স্বয়ং পরম গুহ্য ব্রহ্ম, যেহেতু ব্রহ্মের জন্ম নেই তাই সেই ব্রহ্ম শিবেরও কোনো জন্ম নেই, তিনি নিজেই প্রকাশিত হন নিজের ইচ্ছায়, শুভদেবতা এবং অপদেবতা, সৎ মানুষ অসৎ মানুষ অথবা পশু পাখি সহ যত প্রাণী আছে তাদের সকলের জীবনদাতা হলেন পরমেশ্বর শিব।তিনিই সকলের আত্মা এবং তিনি জগদীশ্বর, বিভিন্ন শক্তি দ্বারা শিবই জগৎরূপে প্রতীয়মান হন, বেদেও বলা হয়েছে ব্রহ্ম সর্বত্র আছেন।এখানেও বলা হয়েছে শিব সর্বত্র আছে, অর্থাৎ শিবই পরমেশ্বর ব্রহ্ম এবিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।এটি বৈষ্ণবদের সাত্ত্বিক শ্রেষ্ঠ ভাগবতপুরাণ স্বয়ং বলছেন)


⚫ত্বং শব্দযােনির্জগদাদিরাত্মা প্রাণেন্দ্রিয়দ্রব্যগুণস্বভাবঃ । 

কালঃ ক্রতুঃ সত্যমৃতং চ ধর্ম -

স্তয্যক্ষরং যৎ ত্রিবৃদামনন্তি ॥ ২৫


✅বাংলা অর্থ👉 আপনি বেদের কারণ, সমস্ত বেদ আপনার থেকে উদ্ভূত । আপনার জ্ঞান স্বতঃসিদ্ধ, আপনিই জগতের আদি কারণ মহত্তত্ত্ব এবং তামস, রাজস ও সাত্ত্বিক এই তিন অহংকার। আপনি প্রাণ, ইন্দ্রিয় ও পঞ্চমহাভূত এবং শব্দাদি বিষয়ের ভিন্ন ভিন্ন স্বভাব ও তাদের মূল কারণ । আপনি প্রাণীদের বৃদ্ধি করেন আবার কালরূপে নাশও করেন । আপনি কল্যাণকারী যজ্ঞ ও সত্য এবং মধুর বাক্য । ধর্মও আপনারই স্বরূপ । আপনি অউম এই তিন অক্ষর যুক্ত প্রণব ( ॐ-কার ) অথবা ত্রিগুণাত্মিক প্রকৃতি আপনার আশ্রিত - বেদজ্ঞগণ এই কথা বলেন ॥ ২৫ ॥

( 🔴ব্যাখ্যা - উপরোক্ত শ্লোকে পরমেশ্বর শিব থেকেই বেদ উদ্ভূত তথা বেদের কারণ বলে স্বয়ং ভাগবত পুরাণ স্বীকার করছেন, শিবজ্ঞান সমস্ত শাস্ত্রে, শাস্ত্রজ্ঞ ব্যক্তি এবং সমস্ত যোগী মুনিঋষিগণের কাছে স্বয়ং প্রকাশিত, এ বিষয়ে তাদের বোঝানোর প্রয়োজন নেই।শিব হলেন জগতের আদি কারণ, তিনি শুধু তমো গুণী নন বরং তম সহ বাকি সত্ত্ব ও রজঃগুনেরও মূল কারণ।কারণ, শিবের শুধুমাত্র রুদ্র স্বরূপ হল তমঃগুণসম্পন্ন, অনান্য শিবস্বরূপ তমোগুণ বিশিষ্ট নয়। শিবই প্রাণ ও অনান্য তত্ত্বের মূল কারণ।শিবই প্রানীদের বিনাশ করেন আবার বৃদ্ধিও ঘটান।শিব হলেন কল্যানরূপী সত্যের রূপ, যজ্ঞের রূপ, শিব হল মধুর বাক্য এমনকি ধর্মও শিবরূপ।

ॐ কার স্বয়ং শিব, শিবই স্বয়ং ॐ কার। অর্থাৎ ॐ ও পরমেশ্বর শিব এক ও অভিন্ন। ত্রিগুনাত্মক প্রকৃতিও শিবের ইচ্ছার অধীন একথা বেদজ্ঞ ব্যক্তিগণই জানেন কারণ বেদে মহেশ্বর শিবকেই মায়াধীশ বলেছেন।প্রকৃতি অর্থাৎ শক্তি সর্বদা শিবের অধীন।)


⚫অগ্নির্মুখং তেঽখিলদেবতাত্মা 

ক্ষিতিং বিদুর্লোকভবাঙ্ ঘ্রিপঙ্কজম্ । 

কালং গতিং তেঽখিলদেবতাত্মনো 

দিশশ্চ কর্ণৌ রসনং জলেশম্ ॥২৬


✅বাংলা অর্থ👉 সর্বদেবস্বরূপ অগ্নি আপনার মুখ । ত্রিলােকের অভ্যুদয়কারিন্ হে শংকর ! এই পৃথিবী আপনার চরণ কমল । আপনি অখিলেশ্বর ! এই কাল আপনার গতি, দিক সকল আপনার কর্ণ এবং বরুণ আপনার রসনা ॥ ২৬ ॥

(🔴ব্যাখ্যা - উপরের ভাগবতপুরাণোক্ত শ্লোক পরমেশ্বর শিবের উদ্দেশ্য বলছেন যে, শিব সর্বদেতার স্বরূপ এবং জ্ঞানরূপী অগ্নি হল পরমেশ্বর শিবের শ্রীমুখ। অর্থাৎ অগ্নি যেমন পবিত্র তেমনি পরমেশ্বর শিব পরমপবিত্র জ্ঞানস্বরূপ। ত্রিলোকের পতি হলে পরমেশ্বর শঙ্কর। পৃথিবীকে পরমেশ্বর শিবের শ্রীচরণ হিসেবে কল্পনা করে বন্দনা করা হয়েছে এখানে। অখিল ঈশ্বর শিবের গতি হল কাল অর্থাৎ সময়রূপ, জগতের সমস্ত দিক পরমেশ্বরের কর্ণ অর্থাৎ কান রয়েছে বলে মহিমা গায়ন করা হয়েছে। বরুন দেব হল শিবের জিহ্বা স্বরূপ।)


⚫নাভির্নভস্তে শ্বসনং নভস্বান্ 

সূর্যশ্চ চক্ষূংষি জলং স্ম রেতঃ ।

পরাবরাত্মাশ্রয়ণং তবাত্মা

সােমাে মনাে দ্যৌৰ্ভগবঞ্ছিরন্তে ॥ ২৭


✅বাংলা অর্থ👉হে প্রভু ! আকাশ আপনার নাভি, সমীরণ আপনার নিশ্বাস, সূর্য আপনার চক্ষু ও জল আপনার বীর্য । উৎকৃষ্ট ও নিকৃষ্ট সকল জীবের যে আশ্রয়, তা আপনার অহংকার । চন্দ্র আপনার মন এবং স্বর্ণ আপনার মন্ত্রক ॥ ২৭ ॥

(🔴ব্যাখ্যা - এই শ্লোকে প্রভু শিবের স্তুতি করতে গিয়ে বলা হয়েছে যে আকাশ হল শিবের নাভীস্বরূপ, বায়ু হল পরমেশ্বর শিবের কল্যাণ কারী নিশ্বাস, সূর্য হল পরমেশ্বরের চক্ষুস্বরূপ এবং জল হল পরমেশ্বরের জীবনদায়ী শক্তিস্বরূপ। মূল্যবান ও নিকৃষ্ট যে কোনো জীবের আশ্রয় একমাত্র শিব, এই অহংস্বরূপ পরমেশ্বর একমাত্র শিব।শিবের মন চন্দ্রের মতো শীতলতার আবেশপূর্ণ। স্বর্ণ যেমন মহামূল্যবান রত্ন সেই স্বরূপ হল পরমেশ্বরের এ ভুবন মহল)


⚫কুক্ষিঃ সমুদ্রা গিরয়ােঽস্থিসঙ্ঘা

রােমাণি সর্বৌষধিবীরুধস্তে । 

ছন্দাংসি সাক্ষাৎ তব সপ্ত ধাতব- 

স্ত্ৰয়ীময়াত্মন্ হৃদয়ং সর্বধর্মঃ ॥ ২৮


✅বাংলা অর্থ👉হে বেদস্বরূপ ভগবান ! সমুদ্র আপনার কুক্ষি, পর্বত আপনার অস্থি, সর্বপ্রকার ওষধি ও তৃণ আপনার রােমরাজি, গায়ত্রী প্রভৃতি সাত ছন্দ আপনার সাত ধাতু ও ধর্ম আপনার হৃদয় ॥ ২৮ ॥

(🔴ব্যাখ্যা - এই শ্লোকে পরমেশ্বর শিবকে বেদের স্বরূপ ভগবান বলা হয়েছে। সমুদ্রের গভীরতাকে কল্পনা করে তাকে শিবের গর্ভ,পর্বতের মতো কঠিন বস্তুকে পরমেশ্বরের অস্থি অর্থাৎ তার দেহের হাড়, সমস্ত ঔষধ ত তৃণজাতীয় উদ্ভীদকে শিবের দেহের রোম, মন্ত্র উচ্চারণ করতে ব্যবহৃত গায়ত্রী সহ অনান্য ছন্দগুলিকে শিবের সাত ধাতু ও ধর্ম বলে স্তুতি করা হয়েছে। কারণ জগত শিবময়। একথা শ্রুতিশাস্ত্রও স্বীকার করেছেন এবং ভাগবতপুরাণের মতামতও একই।)


⚫মুখাগ্নি পঞ্চোপনিষদস্তবেশ 

যৈস্ত্রিংশদষ্টোত্তরমন্ত্রবর্গঃ ।

যৎ তছিবাখ্যং পরমার্থতত্ত্বং 

দেব স্বয়ংজ্যোতিরবস্থিতিস্তে ॥ ২৯


✅বাংলা অর্থ👉হে প্রভু ! তৎপুরুষ, অঘাের, সদ্যোজাত, বামদেব এবং ঈশান — এই পঞ্চোপনিষদ্ (পাঁচ মন্ত্র) আপনার পাঁচটি মুখ । এইসব মন্ত্রের পদচ্ছেদ থেকে আটত্রিশ কলাত্মক মন্ত্র উৎপন্ন হয়েছে । আপনি যখন সমস্ত প্রপঞ্চ থেকে স্বতন্ত্র হয়ে স্বরূপে স্থিত হন তখন সেই স্থিতির নাম হল ‘ শিব '। বাস্তবে এটিই হল স্বপ্ৰকাশ পরমার্থতত্ত্ব ॥ ২৯ ॥ 

(🔴ব্যাখ্যা - এই শ্লোকে বলা হয়েছে, শিবের পাঁচটি শ্রীমুখ রয়েছে যা হতে পাঁচমন্ত্র অর্থাৎ পঞ্চাক্ষর মহামন্ত্র ॐ নমঃ শিবায় প্রকটিত হয়েছে। এই মন্ত্রের পদচ্ছেদ থেকেই ৩৮রকম কলাত্মক মন্ত্র উৎপন্ন হয়ে জগতে প্রকাশিত হয়েছে। ভাগবতপুরাণ এখানে একটি মহান সত্য কথা স্বীকার করেছেন যে যখন পরমেশ্বর মহাদেব এই প্রপঞ্চ অর্থাৎ মায়া থেকে স্বতন্ত্র(পৃথক ভাবে স্বাধীনভাব) হয়ে নিজ মূল স্বরূপে স্থিত হন অর্থাৎ জগতের সমস্ত কার্য মহাদেবে বিলিন হয় তখন একমাত্র মহাদেবই স্বাধীন ভাবে স্থিত হন। সেই স্থিতি রূপের নাম শিব। ভাগবতপুরাণ স্বয়ং নিজে সত্যতার সাথে স্বীকার করে নিয়েছেন যে, বাস্তবে মহাদেবের এই স্বপ্রকাশ শিব স্থিতির অবস্থাই পরমার্থ তত্ত্ব। বেদশাস্ত্রে বলা হয়েছে পরমার্থে একমাত্র ব্রহ্ম ই স্বাধীন ভাবে একাকি থাকেন, ব্রহ্ম ভিন্ন দ্বিতীয় আর কেউ থাকেননা, 

বেদের অন্তর্গত শ্বেতাশ্বতর উপনিষদেও বলা হয়েছে -

      "একো হি রুদ্র ন দ্বিতীয়ায় তস্থূ "

 অর্থাৎ একমাত্র রুদ্র অর্থাৎ পরমেশ্বর শিবই ব্রহ্ম তিনিই আছেন তিনিই পরমার্থতত্ত্ব হিসেবে তিনি স্থিত থাকে দ্বিতীয় আর কেউ থাকেন না। ভাগবতপুরাণও এটাই নির্দেশেই স্বীকার করলেন যে শিবই একমাত্র পরমার্থতত্ত্ব তিনিই স্বাধীন,শিব কারো অধীন নন, তিনি কারোর নির্দেশেও কিছু করেন না, তিনি স্বতন্ত্র অর্থাৎ নিজ ইচ্ছায় সব কিছু করেন।)


⚫ছায়া ত্বধর্মোৰ্মিযু যৈবিসর্গো 

নেত্ৰত্রয়ং সত্ত্বরজস্তমাংসি । 

সাংখ্যাত্মনঃ শাস্ত্ৰকৃতস্তবেক্ষা 

ছন্দোময়াে দেব ঋষিঃ পুরাণঃ ॥ ৩০


✅বাংলা অর্থ👉অধর্মের যেসব তরঙ্গ অর্থাৎ লােভ দম্ভ ইত্যাদিতে আপনার ছায়া বর্তমান এবং এর ফলেই বিবিধ প্রকারের সৃষ্টি উৎপন্ন হয় । সেই সৃষ্টির মূল সত্ত্ব, রজঃ ও তমােগুণ আপনার ত্রিনেত্র । হে প্রভু ! গায়ত্রী ইত্যাদি ছন্দোময় বেদ আপনার দৃষ্টি, কারণ আপনি শাস্ত্রকর্তা এবং সাংখ্য - জ্ঞানস্বরূপ ॥ ৩০ ॥

(🔴ব্যাখ্যা - পরমেশ্বর মঙ্গল ও অমঙ্গল উভয়ের কারণ। তাই ধর্ম ও অধর্ম দুটোই তার হতেই উদ্ভূত।

তিনি যেমন ধর্মকে প্রকাশ করেন তেমন ভাবে অধর্ম প্রকাশ করে তিনি ধর্মের মাহাত্ম্য কে ফুটিয়ে তোলেন। তিনি লীলাধারী তাই তার ইচ্ছা সম্পর্কে জানতে পারা সম্ভব নয়। তাই তিনি তার মায়া স্বরূপ ছায়া দ্বারা লোভ অহংকার দম্ভ প্রভৃতি অবিদ্যা তরঙ্গকেও তৈরি করেন ফলে জগতের বৃদ্ধি পায়, সৃষ্টিরচক্র চলতে থাকে। সেই সৃষ্টি উপোরোক্ত তিনটি গুণের দ্বারা হয়,যা পরমেশ্বর শিবের ত্রিনেত্রের স্বরূপ।

পরমেশ্বর শিবের দৃষ্টি কে মঙ্গলময় গায়ত্রী সহ ছন্দোময় বেদ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ শাস্ত্রের কর্তাও পরমেশ্বর মহাদেব স্বয়ং। তিনিই সাংখ্য শাস্ত্র ও জ্ঞানস্বরূপ।)


⚫ ন তে গিরিত্রাখিললােকপাল- বিরিঞ্চবৈকুণ্ঠসুরেন্দ্রগমাম্ । 

জ্যোতি পরং যত্র রজস্তমশ্চ 

সত্ত্বং ন যদ্ ব্রহ্ম নিরস্তভেদম্ ॥ ৩১


✅বাংলা অর্থ👉 হে ভগবান ! আপনার জ্যোতির্ময় স্বরূপ হল পরম ব্রহ্ম । সেখানে সত্ত্ব, রজঃ বা তমােগুণ নেই এবং কোনো প্রকারের ভেদ - বিভেদও নেই । আপনার সেই স্বরূপকে লােকপালগণ এমন কী ব্রহ্মা, বিষ্ণু, ইন্দ্র পর্যন্ত কেউই জানতে পারেন না ॥ ৩১ ॥

(🔴ব্যাখ্যা - উপোরোক্ত শ্লোকে পরমেশ্বর শিবকে ভগবান বলেও বারংবার উল্লেখ করা হয়েছে, এছাড়া এখানে একটি মহামূল্যবান কথা বলা হয়েছে। পরমেশ্বর শিবের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে যে শিবের জোতির্ময় স্বরূপ হল পরম ব্রহ্ম। জ্যোতির্ময় স্বরূপ বলতে নির্গুণ ব্রহ্ম শিবলিঙ্গের কথা এখানে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে। ভাগবতপুরাণ বলছে যে এই জ্যোতির্ময় স্বরূপে শিবের সেই ত্রিগুনাত্মক গুণ অর্থাৎ সেই সত্ত্ব, রজঃ বা তমােগুণ এখানে নেই।কারণ, জ্যোতির্ময় শিবলিঙ্গে সেই গুণ বিলীন হয়ে গিয়েছে এবং নির্গুণ স্বরূপ পরম ব্রহ্ম শিব যেহেতু ত্রিগুণাতীত তাই তিনি নির্গুণ জ্যোতিস্বরূপ শিবলিঙ্গরূপী। তাই এখানে শিব কোনো গুণে গুণান্বিত নন বরং তিনি এর ঊর্ধ্বে তিনি নির্গুণ পরমেশ্বর।

তাছাড়া এই জ্যোতির্ময় শিবলিঙ্গে কোনো ভেদাভেদ নেই বলা হয়েছে কারণ এই শিবলিঙ্গ সমস্ত দেবদেবী তথা সমগ্রজগত লয় হয়ে যায় অর্থাৎ সবকিছুই শিবে লীন হয়ে এক ও অভিন্ন পরব্রহ্ম নির্গুণ শিবে পরিনত হয়ে যায় তাই এই পরমার্থ অবস্থাতে অন্য কোনো কিছুর সাথে ভেদ থাকে না শিবলিঙ্গের। এই শিবলিঙ্গ নির্গুণ জ্যোতির্ময় স্বরূপকে কেউ সম্পূর্ণ রূপে জানতে সক্ষম নয়। এমনকি ব্রহ্মা ও বিষ্ণুও জানতে সক্ষম নয়। ইন্দ্র সহ কোনো দেবতাও জানতে সক্ষম নন। কারণ পরম ব্রহ্ম শিব সমস্ত কিছুর অগোচর প্রভু।)


⚫কামাধ্বরত্রিপুরকালগরাদ্যনেক-

ভূতদ্রুহঃ ক্ষপয়তঃ স্তুতয়ে ন তৎ তে ।

যস্ত্বন্তকাল ইদমাত্মকৃতং স্বনেত্র-

বহ্নিস্ফুলিঙ্গশিখয়া ভসিতং ন বেদ ॥ ৩২


✅বাংলা অর্থ👉 আপনি কন্দর্প, দক্ষযজ্ঞ, ত্রিপুরাসুর , কালকূট বিষ ( যা আপনি এখন পান করবেন ) এবং অনেক ভূতদ্রোহীদের বিনষ্ট করেছেন । কিন্তু এই সব কর্ম আপনার নিকট প্রশংসার্হ নয়, কারণ প্রলয় কালে আপনারই রচিত এই বিশ্ব আপনারই নেত্রাগ্নির স্ফুলিঙ্গে জ্বলে ভস্ম হয় কিন্তু আপনি এমন ধ্যানে মগ্ন থাকেন যে যেন কিছুই জানেন না ॥ ৩২ ॥

(🔴ব্যাখ্যা - পরমেশ্বর শিব কন্দর্প সহ দক্ষযজ্ঞ ও ত্রিপুরাসুরের বিনাশ করেছিলেন, তিনি কালকূট বিষকে বিনষ্ট করেছিলেন যা তিনি ওই মুহূর্তে পানও করবেন। তিনি বহু অধর্মীদের বিনাশ করেছেন। এই সমস্ত লীলা প্রশংসারো ঊর্ধ্বে। কেননা এ বিশ্ব স্বয়ং শিবের রচিত আর এই বিশ্ব শিবেরই নেত্র (চক্ষু) থেকৈ নির্গত অগ্নির দ্বারা জ্বলে পুড়ে ভস্ম হয়ে শিবে বিলীন হয়। কিন্তু এত কিছু ঘটে যাওয়ার পরেও প্রভু শিব এমন ভাবেই শান্ত থেকে নিজ অন্তরধ্যান অর্থাৎ নির্গুণ স্বরূপে স্থিত থাকেন যেন কিছু ঘটেইনি, সবই যেন স্বপ্নের মতো কাল্পনিক ছিল, যেন প্রভু শিব কিছুই জানেন না এমন এক অবস্থায় তিনি স্থিত হন। এই স্থিত পরমার্থিক অবস্থাকেই নির্গুণ অবস্থা বলা হয়)


⚫যে ত্বাত্মরামগুরুভির্হৃদি চিন্তিতাঙ্ ঘ্রি-

দ্বন্দ্বং চরন্তমুময়া তপসাভিতপ্তম্ ।

কত্থন্ত উগ্ৰপরুষং নিরতং শ্মশানে

তে নৃনমূতিমবিদংস্তব হাতলজ্জাঃ ॥৩৩


✅বাংলা অর্থ👉জীবন্মুক্ত ও আত্মারাম পুরুষেরা তাদের হৃদয়ে আপনার চরণযুগল ধ্যান করেন এবং আপনি নিজেও সর্বদা জ্ঞান ও তপস্যায় নিমগ্ন থাকেন । আপনি উমার সঙ্গে বিচরণ করেন দেখে যে সকল নির্লজ্জ ব্যক্তি আপনাকে উমার প্রতি আসক্ত ( কামুক ) কিংবা আপনি শ্মশানে বাস করেন বলে আপনাকে হিংস্র ও ক্রুর মনে করে — তারা মূর্খ, আপনার লীলার রহস্য কিছুমাত্র উপলব্ধি করতে পারে না ॥ ৩৩ ॥

(🔴ব্যাখ্যা - জীবন থেকে যারা উন্মুক্ত হয়েছেন সেই যোগীগণকে জীবন্মুক্ত বলা হয়। যারা নিজ আত্মাতে শিব দর্শন করেছেন যাকে শাস্ত্র আত্মদর্শন বলে উল্লেখ করেছেন। এই আত্মদর্শন কারী দের আত্মারাম পুরুষ বলা হয়। এই যোগী পুরুষেরা তাদের হৃদয়ে পরমেশ্বর প্রভু শিবের শ্রীচরণদুটি ধ্যান করেন। পরমেশ্বর শিব জগৎকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য নিজেই নিজের পরমজ্ঞানস্বরূপ অবস্থাতে নিমগ্ন থাকেন যা সাধারন ধ্যান বলে গণ্য হয় জীবের কাছে।

ভাগবতপুরাণ এখানে একটি বিরাট বড় বিষয়ের সমাধান করে সত্য উন্মোচন করে বলেছেন যে, যেসমস্ত ব্যক্তিগণ পরমেশ্বর শিবকে কামুক প্রকৃতির বলে ভেবে শিবনিন্দা করে, যে সমস্ত ব্যক্তি পরমেশ্বর শিবকে দেবী পার্বতীর প্রতি আসক্ত বলে ভাবে, যেসমস্ত ব্যক্তি পরমেশ্বর শিবকে শুধুমাত্র শ্মশানে বাসকারী ভিক্ষুক অভদ্র অসভ্য ভেবে শিবনিন্দায় মগ্ন হয় সেই সমস্ত অজ্ঞ ব্যক্তি মহামূর্খ বলেই নির্দেশ করেছে স্বয়ং ভাগবতপুরাণ। কারণ তারা মায়ায় আচ্ছন্ন তাই সেইসব শিবনিন্দাকারী মূর্খগণেরা পরমেশ্বর শিবের লীলা বুঝতে অক্ষম।তারা পরমেশ্বরের মায়ায় মোহিত বলেই শিবের মহিমা জানতে পারেনা।)


⚫তৎ তস্য তে সদসতোঃ পরতঃ পরস্য

নাঞ্জঃ স্বরূপগমনে প্রভবন্তি ভূম্নঃ । 

ব্রহ্মাদয়ঃ কিমুত সংস্তবনে বয়ং তু

তৎ সর্গসর্গবিষয়া অপি শক্তিমাত্রম্ ৷৷ ৩৪


✅বাংলা অর্থ👉যে মায়া জগতের কার্য কারণের অতীত, আপনি সেই মায়ার অতীত । সেইজন্য ব্রহ্মা প্রভৃতি দেবতাগণও আপনার স্বরূপ জানতে সমর্থ হন না, অতএব স্তুতি কী করে করবেন ? অতএব সৃষ্ট জীবগণের মধ্যে অর্বাচীন আমরা কী করে আপনার স্তুতি করব । তথাপি আমাদের ক্ষমতা অনুযায়ী সামান্য স্তুতি করলাম ॥ ৩৪ ॥

(🔴ব্যাখ্যা - এখানে ভাগবতপুরাণ উল্লেখ করেছেন যে , পরমেশ্বর শিব মায়ার অতীত। অর্থাৎ পরমেশ্বর শিব মায়াধীশ। যা শ্রুতিশাস্ত্রেও বর্ণিত আছে।

এই কারনেই প্রজাপতি ব্রহ্মা তথা অনান্য দেবতাগণেরাও পরমেশ্বর শিবের প্রকৃত মহিমা স্বরূপকে জানতে অসমর্থ। যেহেতু তারা অসমর্থ তাই তারা সম্পূর্ণভাবে পরমেশ্বর শিবের স্তুতি করতেও সমর্থ নন। তাই স্তুতিকারীগণেরা বলছেন যে পরমেশ্বরের স্তুতি ব্রহ্মা সহ দেবতাগণেরাও করতে সমর্থ নন সেখানে আমরা তুচ্ছ জীবগণেরা কিভাবে পরমেশ্বর শিবের স্তুতি করতে সমর্থ হতে পারি?

তাই স্তুতিকারীগণ তাদের ক্ষমতা অনুযায়ী স্তুতি করেছেন পরমেশ্বর শিবের।)


⚫এতৎ পরং প্রপশ্যামাে ন পরং তে মহেশ্বর ।

মৃড়নায় হি লােকস্য ব্যক্তিস্তেঽব্যক্তকর্মণঃ ॥ ৩৫


✅বাংলা অর্থ👉আমরা আপনার এই লীলাবিহারী রূপ দর্শন করলাম, কিন্তু আপনার পরম স্বরূপ সম্বন্ধে আমরা অজ্ঞ । হে মহেশ্বর ! যদিও আপনার লীলা অব্যক্ত তথাপি সংসারের জীবের মঙ্গলের জন্যই আপনি এইরূপে ব্যক্ত হয়েছেন, এতে কোনাে সন্দেহ নেই ॥ ৩৫ ॥

(🔴ব্যাখ্যা - উপরোক্ত শ্লোকে স্তুতিকারীগণ বলছেন যে, তারা পরমেশ্বর শিবের লীলাবিহারী রূপ দর্শন করেছেন কিন্তু তারা পরমেশ্বর শিবের পরম স্বরূপ অর্থাৎ বিরাট অনন্ত জগৎরূপী সেই চরম অবস্থায় অবস্থানকারী শিবস্বরূপের সম্পর্কে জানেননা তাই তারা নিজেদের সেই বিষয়ে অজ্ঞ বলে চিহ্নিত করেছেন।

তারা আরো বলেছেন যে, পরম ব্রহ্ম মহেশ্বর প্রকৃত পক্ষে অব্যক্ত এবং তার লীলাও অব্যক্ত অর্থাৎ যার সম্পর্কে ব্যক্ত করা সম্ভব নয়, যিনি মন বুদ্ধি বাক্যের অগোচর। তবুও তিনি সংসারের জীবেদের মঙ্গলের কথা ভেবেই ত্রিগুনাত্মক রুদ্র মহেশ্বর রূপে আবির্ভূত হন। যা অজ্ঞ জীবেরা বুঝতে সক্ষম নয়। পরমেশ্বর শিবের এই লীলাতে কোনো সন্দেহ নেই।ইহাই পরম সত্য।)


   ----উপরের আলোচনা দ্বারা ভাগবতপুরাণ থেকে সিদ্ধ হল - 

১| প্রভু শিব সর্বোচ্চ পরম ব্রহ্ম পরমেশ্বর ভগবান।তাই তার সম্পর্কে সম্পূর্ণ জানা সম্ভব নয় এবং বলাও অসম্ভব।

২| পরমেশ্বর শিব স্বাধীন, তিনি কোনো ব্যক্তির আজ্ঞাবহ দাস নন।

৩| পরমেশ্বর শিবই ব্রহ্মা বিষ্ণুর রূপ ধারণ করেন, তিনি তমোগুণী নন। বরং কার্যের জন্য গুণধারণ করেন মাত্র, তিনি গুণের অতীত।

৪|জোতির্ময় শিবলিঙ্গ হল সর্বোচ্চ সত্ত্বা, যার সম্পর্কে কেউ জানতে সক্ষম নন।

৫| সমগ্র জগত শিবময়, সমস্তদিকে শিবেরই অঙ্গ সমূহ রয়েছে, তাই তিনি বিশ্বরূপ।

৬|জগতসহ সমস্ত প্রানীর অন্তরের আত্মা হলেন শিব, তিনিই নিজের ইচ্ছেতে জগত সৃষ্টি করেন আবার ধ্বংসও করেন নিজের ইচ্ছায়, মহাদেব কারোর ইচ্ছার অধীন নন। যা করেন নিজের ইচ্ছাতেই করেন।তিনিই পরমাত্মা।

৭|ভাগবতপুরাণে সর্বোচ্চ সত্ত্বা শিবকেই বলা হয়েছে অতএব শিবপুরাণেও যেহেতু এই একই কথা বলা হয়েছে তাই শিবপুরাণ অমান্য করলে তা ভাগবতপুরাণের বাক্যকেই অমান্য করা হয়েছে বলে গণ্য হবে।

৮|পরমেশ্বর শিব কামুক নন, তিনি শ্মশানবাসীও নন, বরং তিনি নিজ লীলার প্রদর্শন করেন মাত্র, যার লীলার মাহাত্ম্য মায়াচ্ছন্ন পাষণ্ডীগণের বুঝতে না পেরে শিবনিন্দা করতে থাকেন।


৯| পরমেশ্বর শিব বেদকে প্রকট করেন, তিনিই বেদের কারণ, পরমেশ্বর শিবই ব্রহ্ম, সেই কারণেই বেদ কে ব্রহ্মজ্ঞান বলে মান্য করা হয়।কিন্তু বহু মায়াচ্ছন্ন ব্যক্তি এই পরম সত্য জানতে অক্ষম কারণ তারা মায়ার শিকার। পরমেশ্বর মায়া দ্বারা জগৎ সৃষ্টি করেন, তাই ধর্মের সাথে অধর্মকেও প্রকট করেন পরমেশ্বর। কিন্তু তিনি নিজে কখনোই এই মায়ার অধীন নন। বরং মায়া পরমেশ্বর শিবের অধীন। এই অধর্মের কবলে পড়েই মায়াচ্ছন্ন ব্যক্তিগণ শিবনিন্দা করে বেড়ান।


১০| পরমেশ্বর মহাদেবই সর্বোচ্চ সত্ত্বা তাই তাকে শিব  বলে সম্মোধন করাই যুক্তিযুক্তি। তাই সমস্ত শাস্ত্রে পরমেশ্বর শিবকে অতি গুহ্যভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু এই সত্যতা খুবই কম ব্যক্তি উপলব্ধি করতে পারে, যারা এই পরমসত্য উপলব্ধি করতে সক্ষম হন তাদেরকেই বিচারশীল বিচক্ষন মহাপুরুষ বলে চিহ্নিত করেছে শাস্ত্র।


🔥আশা করি এই পরম সত্যের জ্ঞান পাওয়ার পর বৈষ্ণবগণ নিজেদের এত পরমপ্রিয়  সাত্ত্বিক ভাগবতপুরাণের বচন কে অমান্য করবে না। 


ॐ সাম্বশিবায় নমঃ ॥


মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ