মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গারূপে মা পার্বতী

 


বর্তমানে বহু মানুষের কাছে একটি ভ্রান্ত ধারণা শাস্ত্রের রূপ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছে প্রায়।

 আদিশক্তি দেবী দূর্গা ও দেবী পার্বতী এক নয়, এমন গুজব রটানো হচ্ছে বেশ কিছুকাল ধরে,অবশ্য এটি কলিযুগের একটি প্রভাব।যার ফলে মা শক্তির মধ্যেই ভাগাভাগি করে চলেছে জ্ঞানপাপীরা। আজ সেই ভ্রান্ত ধারণাকে ভাঙ্গতে আমরা স্কন্দমহাপুরাণের অন্তর্গত মাহেশ্বর খন্ডের অরুণাচলমাহাত্ম্যম পর্বের দশম ও একাদশ অধ্যায়ের দেবী বিষয়ক কথন তুলে ধরছি।


  একদা একসময় দেবী পার্বতী জগতের কল্যাণ সাধনের জন্য শিবঅনুগ্রহে অরুণাচলেশ্বরের নিকটবর্তী ঋষি গৌতমের আশ্রমে তপস্যারত ছিলেন। মহিষাসুরের অত্যাচারে দেবগণ সেই আশ্রমে উপস্থিত হয়ে দেবী পার্বতীর সম্মুখে আকুল ভাবে প্রার্থনা করে বললেন, 

হে দেবী জগন্মাতা! আমাদের অভয়প্রদান করুন।মহাবলশালী মহিষাসুর আমাদের অপ্সরা, গজ, লক্ষ লক্ষ অশ্ব,মেষ,মহিষ অপহরন করেছেন, সিদ্ধসাধুগনকে গৃহকর্ম করার আদেশ দিয়েছেন, জগতের সমস্ত রত্ন হরন করেছেন, আমরা তার ভয়ে তার আজ্ঞা পালন, সেবা ও পুজো করতে বাধ্য হয়েছি।সে সমুদ্রকেও আহত ও পর্বতকে আঘাত দ্বারা চূর্ণ করে চলেছেন। তার দুর্দমনীয় বল এতই ভীষণ যা আমাদের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব হচ্ছে না। আপনি তো পরাশক্তি এবং প্রভু পরমেশ্বর শিবের স্ত্রী।আমরা জানি না প্রভু শিবের লীলাখেলা। হে জগন্মাতা! আমরা আপনার দ্বারা সর্বদা প্রতিপালিত হই। হে মা পরমেশ্বরী! আমাদের রক্ষা করুন।তখন দেবী পার্বতী প্রসন্ন হয়ে অভয় দিয়ে বললেন, আমি তপস্যা দ্বারা শরনাগতের ত্রাণ করবো। উচিত সময়ে তোমাদের শত্রু বিনাশ প্রাপ্ত হবে। হে দেবতাগণ! নিরপরাধ শত্রু কে হনন করা উচিত নয় বলে আমি মনে করি। কোনো এক উপায় বের করে আমি এই অসুর বিনাশ করবো।


অতপরঃ দেবতাগণ দেবীর অভয়বানী শ্রবন করে জগদম্বা গিরিকন্যা পার্বতীদেবীকে প্রণাম করে নির্ভয়ে আনন্দচিত্তে বিদায় নিলেন।


দেবগন বিদায় নিলে কমললোচনা দেবী পার্বতী কান্তিমতী মোহিনীশক্তির রূপ ধারন করলেন এবং শ্রেষ্ঠ বটুক চতুষ্টয় প্রতিষ্ঠিত করে তাদের বললেন, এখানে যে ব্যক্তি অরুণাচলেশ্বর শিব লিঙ্গের দর্শনের জন্য আসবেন সেই ক্লান্ত ক্ষুধার্ত তৃষ্ণার্ত অতিথি কে কখনো ত্যাগ করবে না।

যখন দেবী কৈলাস থেকে এই স্থানে আগমন করেছিলেন তখন তার সাথে দুন্দুভি, সত্যবতী, অনবমী ও সুন্দরী নামক মাতৃচতুষ্টয় দেবীর সেবার জন্য পরিচারিকা হিসেবে এসেছিলেন।


তখন আশ্রমে আর কোনো ভয় রইল না, আনন্দে ভরে উঠল চারিদিক। সাধুগণ এই স্থান কে শিবলোক বলে আহ্লাদিত হতে লাগলেন। দেবী গৌরী প্রাণপ্রিয় স্বামী শিব কে তপস্যা দ্বারা তৃপ্তির অন্তহীন সীমায় ডুবে রইলেন।

 এদিকে মহিষাসুর মৃগয়ারত হয়ে সেই আশ্রমের আশেপাশেই বিচরন করতে ছিলেন। মহিষাসুর তার সৈন্যসহিত বহু হরিন শিকার করছিলেন। তার কয়েকটি সৈন্যের দ্বারা তাড়িত হওয়া কিছু হরিন সেই আশ্রমে প্রবেশ করলো যেখানে দেবী তপস্যারত ছিলেন। সৈন্যরা সেই আশ্রমে প্রবেশ করতে গেলে দেবীর বটুকগন অসুরসৈন্যদের বাধা দিয়ে সতর্কবার্তা দিলেন।বটুকগন বললেন, এখানে স্বয়ং দেবী গৌরী তপস্যারত। তাই এখানে আপনাদের প্রবেশের অনুমতি নেই, এই স্থান শরনাগতদের রক্ষক।

 তখন দানবগন সেখানে তাহাই হউক বলে আড়ালে গিয়ে মায়া দ্বারা পক্ষীরূপ ধারন করে আশ্রমে প্রবেশ করে দেবীর রূপ দর্শনের বাসনায় বৃক্ষের ডালে বসে তপস্যারত দেবী গৌরীর দিব্যরূপ লাবন্য দর্শন করে বিস্মৃত হয়ে উড়ে গিয়ে মহিষাসুরের কাছে সেই সমস্ত বর্ননা নিবেদন করল। 

 সেসব শুনে মহিষাসুরের মনে ভয়ংকর লালসা জেগে উঠলো । সে বৃদ্ধরূপ ধারন করে সেই পবিত্র আশ্রমে উপস্থিত হল।দেবীর পরিচারিকাদের বৃদ্ধরূপধারী মহিষাসুর জিজ্ঞাসা করলেন যে, এই দেবী কেন তপস্যা করছে ?

তখন পরিচারিকাগণ বললেন, ইনি এনার স্বামীর প্রসাদ লাভের জন্য তপ করছেন। কিন্তু এনার স্বামী কিছুতেই প্রসন্ন হচ্ছেন না এবং এই জগতের যেন কল্যাণ হয় সেই নিমিত্তে প্রভু পরমেশ্বরের আরাধনা করছেন দেবী। তখন সেই কথা শুনে মহিষাসুর হাসতে হাসতে বললেন,এই সামান্য তপফলের আশায় তপস্যা করছো বালিকা ? 

এখন আমার ঐশ্বর্য সম্পর্কে শোনো। আমি হলাম ত্রিলোকের অধীশ্বর, সমস্ত বীর আমাকে ভয় করে, আমি ওরকম সামান্য তপ ফল দিতে সমর্থ আছি।আমি কামরূপী ও সর্বভোগপ্রদায়ক অতএব, আমাকে পতিরূপে ভজনা করো।


 এরকম কটুবচন শুনে দেবী গৌরী পরমেশ্বর প্রভু শিবকে স্মরন করে চক্ষু উন্মীলিত করে মৌনভাব ত্যাগ করলেন এবং সহাস্যে বললেন, আমি মহাবলবান মহাদেবের ভার্যা হব, তাই আমি কঠোর তপ করছি তুমি যদি তার মতোই বলবান হও তবে আমাকে তোমার বল প্রদর্শন করো। তা নাহলে,বৃথা সময় অপচয় করে স্ত্রীলোকের মতো স্বভাব প্রকাশ কোরো না।

এ কথা শোনা মাত্রই মহিষাসুর ক্রোধবশে নিনাদ করে উঠল এবং ভাবলো এই নারী আসলে কে ? 


অতঃপর দেবীকে হরন করার উদ্দেশ্যে অগ্রসর হলে দেবী পার্বতী জ্বলন আকৃতি দুরাসদ উগ্রমূর্তি দূর্গারূপ ধারন করিলেন।৫৯

মেরুপর্বতের মতো মহিষাসুর দীপ্তিমতী মহামায়া কে সম্মুখে দর্শন করলেন। ৬০

[জিঘৃক্ষন্তং সমায়ান্তং বীক্ষ্য তং মহিষাসুরম্।

অভূদ্দুরাসদা দুর্গা কন্যা সা জ্বলনাকৃতিঃ॥৫৯|১০

মহামায়াং সমালোক্য জ্বলন্তীং পুরতঃ স্থিতাম্।

স্বয়ং স মহিষাকারো ববৃধে মেরুসন্নিভঃ॥৬০|১০]

মহিষাসুর মহাদেবী পার্বতীর উগ্র দুর্গারূপ দর্শন করে ভীত হয়ে পলায়ন করলেন। তখন দেবী সেই দুর্মতি কে যুদ্ধ পুনরাগমন করানোর জন্য উপায় খুঁজে সুরগুরু নামক মুনিকে মহিষাসুরের কাছে পাঠালেন মায়ার বশে আনার জন্য। তখন সেই মুনি মহিষাসুরের কাছে গিয়ে বললেন,হে দুষ্ট ! এই পবিত্র অরুণাচলেশ্বর স্থানে কোনো সাধুগণের উপর অত্যাচার করিস না। এখানে তোর প্রভুত্ব খাটবে না। এখানে শিবভক্তদের সর্বদা কল্যাণ হয়। তোর যদি ক্ষমতা থাকে তবে এসো দেবীর সাথে লড়ে দেখা, তিনি তোর সমস্ত সৈন্যসহ তোকেও গ্রাস করবেন। এই শুনে মহিষাসুরের ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে মুনিকে ভক্ষন করতে যাবে এমন সময় মুনি মায়াবলে অন্তর্হিত হল।ক্রোধে উত্তেজিত মহিষাসুরের আদেশে তার সমস্ত ভয়ংকর সৈন্যগন যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে অরুনাচলভূমি কে ঘিরে ধরলো।

এই দেখে দেবী গৌরী বিকট বিকট গনদেবতা সৃষ্টি করলেন।তারা একে অপরকে বলতে লাগল, আমি এই সমস্ত অসুরদের গ্রাস করবো,এই স্বল্প অসুরে আমার খিদে মিটবে না ইত্যাদি ইত্যাদি। এবার দেবীর যোগিনীগন শঙ্খধ্বনী দিলেন।

মহাযুদ্ধ আরম্ভ হল। 

দেবীর বেতালগনের সাথে বিভৎস যুদ্ধ করতে লাগল কিছু অসুরেরা। এদিকে দেবীর তেজ হতে আবির্ভূত ডাকিনী, যোগিনী, পিশাচ, প্রেত ও রাক্ষসেরা অসুরদের মেরে মেরে আনন্দে নৃত্য করতে করতে তাদের রক্ত মাংস খেতে লাগলো।

মহিষাসুর দেবী গৌরীর সৃষ্ট বলশালিনী চামুণ্ডার আনন্দে রক্ত মাংস খাওয়ার দৃশ্য দেখা মাত্রই বিরাট জিহ্বা লেহন করতে লাগল ও খুরের আঘাতের শব্দে দিগন্ত প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠল। দেবীর অমরগনকে মোহিত করে ফেললো এবং দেবীর সমস্ত অস্ত্র কে শীর্ণ করলো। দুষ্ট মহিষাসুরের মৃত্যুর বিলম্ব হতে দেখে দেবী গৌরী এই অসুরের মৃত্যুকামনায় স্বামীর চরন স্মরণ করলেন।

দেবি কে সরাসরি আক্রমন করে বসলেন মহিষাসুর।কিন্তু এবার দেবী তার অস্ত্র প্রতিহত করে মহিষাসুরের দেহ ক্ষতবিক্ষত করে দিলেন।তাতে বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে সে রণক্ষেত্র থেকে অন্তর্ধান হয়ে শ্বেতনখ যুক্ত বিরাট সিংহের ছদ্মবেশে পুনঃরায় ফিরলে দেবীর বাহন কেশরী নামক সিংহরাজ তাকে চপেটাঘাত করতে করতে ধরাশায়ী করে বক্ষ চিরে দিল। মহিষাসুর সাথে সাথে বাঘের রূপ ধারন করলে দেবী ত্রিপুরবিনাশী পরমেশ্বর শিবের মতো চন্দ্রকান্তি ভল্লাস্ত্র দ্বারা নিহত করলে পুনরায় মহিষাসুর একটি করিরূপ


ধারন করলেন, যা দেবীর বাহন সিংহরাজের দ্বারা নিহত হলে এবার মহিষাসুর নিজ বিকট রূপে দেবী গৌরীর সাথে যুদ্ধ করতে গেলে দেবী মস্তক ছিন্ন করে ফেললেন। নিজ আসুরিক মায়ার দ্বারা পুনর্বার মহিষাসুর মহিষের রূপ ধারন করে যুদ্ধ করতে লাগলেন।

এদিকে দেবতাগন অধৈর্য হয়ে ঋষি গৌতমকে পাঠালেন। গৌতম দেবী গৌরী কে বললেন - হে দেবি সমস্ত জগতের ওজঃ শক্তি,জ্ঞান শক্তি,বলশক্তি ও প্রাণশক্তি তোমাতে অবস্থিত। হে পরমেশ্বরী দেবী, এই অসুর নিজমায়ার দ্বারা আপনাকে ভ্রমিত করার চেষ্টা করছে। আপনি নিজ শক্তিকে স্তম্ভন করে গুনত্রয়রূপধারিনী হয়ে আপনার শক্তিশালী ত্রিশূল দ্বারা ধ্বংস করুন এই অসুরকে।


অতঃপর দেবী ভগবতী গৌরী মহিষাসুরকে আক্রমন করে ভূতলে পতিত করেন। দেবীর হাতের মহাশক্তিশালী দিব্য ত্রিশূল জ্বলে ওঠে......✨


ভগবতী দুর্গারূপী গৌরী সেই ত্রিশূল দ্বারা আঘাত করে মহাবলশালী দুষ্ট মহিষাসুরের বক্ষ এফোড় ওফোড় করে ফেললেন।

মহিষাসুর ওঠার চেষ্টা করলেন কিন্তু অসমর্থ হলেন। দেবী গৌরী নিজ পদ দ্বারা ভূতলে চেপে ধরে মহিষাসুর কে ভূমি থেকে উঠে আসার সুযোগ দিলেন না।মহিষাসুরের বক্ষ হতে রক্তধারা বেরোতে লাগলো এবং দেবী গৌরী সাথে সাথে খড়্গ দ্বারা তার মস্তক ছিন্ন করলেন। 

সিদ্ধগন,ইন্দ্র ও অনান্য দেবতাগন স্তব ও পুষ্পবৃষ্টি সহ দেবী ভগবতী দুর্গার প্রশংসা করলেন। ইন্দ্র বললেন, জগতের বীজরূপী জগন্মাতা কে প্রণাম করি।হে অম্বিকা, আপনিই ভক্ত দের ভক্তি, শক্তি,দান্তি,কলা এবং ক্ষমা। আপনি একমাত্র বিশ্বরূপা,তাই আপনি নামভেদে বিভিন্ন হিসেবে দৃষ্ট হন। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে আপনি এক পরমেশ্বরী জগদম্বা। অতএব, আপনার সমস্ত তেজ স্বরূপের যেন পূজা হয় । ভবিষ্যতেও যেন আমাদের সঙ্কটকালে আপনি আমাদের পুনঃ পুনঃ রক্ষা করেন এই প্রার্থনা করছি হে জগৎজননী। আপনি এই দুষ্ট মহিষাসুর কে বধ করার জন্য যে উগ্ররূপ ধারন করেছেন সেই দুর্গা রূপে যেন সর্বদা দেবমন্দিরে আপনার আরাধনা করে দেব - মানবগণ।আপনার এই রূপ ধ্যানকারীর কোনরূপ যেন শত্রুভয় না থাকে এবং সর্বদা বিজয় লাভ হয়।

মর্যাদাহীন দুর্বল ব্যক্তিও আপনার পাদপদ্মসেবা করলে কীর্তিশালী ও ত্রিলোকপতি হয়। এই মহিষাসুর আপনার পদ দ্বারা লাঞ্ছিত হয়ে মৃত্যু বরন করেছে তাই আপনার পূজার সময় যেন এই অসুরকেও সামনে রেখে আপনার এই দুর্গারূপের পূজা করা হয়।

দেবী পার্বতী দেবতাগন ও দেবরাজ ইন্দ্রের প্রার্থনায় অতি প্রসন্ন হয়ে "তথাস্তু" বললেন। দেবতাগন আন্দের সাথে পরমেশ্বরী দেবী গৌরীর আশীর্বাদ গ্রহন করে স্বর্গে ফিরে গেলেন।


[মনে রাখবেন, এই এক‌ই ঘটনা বিভিন্ন কল্পে বিভিন্ন রূপে ঘটিত হয়ে থাকে কিন্তু মূল কাহিনী অবিকৃত থাকে]


✍️লেখনীতে : শ্রীনন্দীনাথ শৈবজী

🚩কপিরাইট ও প্রচারে - International Shiva Shakti Gyan Tirtha - ISSGT 


[বিঃদ্রঃ - আমাদের লেখাগুলি শেয়ার করুন এবং লেখাগুলি কপি করতে পারবেন কিন্তু সেক্ষেত্রে কোনোরকম ভাবেই লেখাটিকে এডিট করা যাবেনা বা কোনো স্থানের লেখাকে মুছতে পারবেননা। আপনি Same to Same কপি করে পেস্ট করে পোষ্ট করবেন]


 

মন্তব্যসমূহ

  1. ওঁ সর্বমঙ্গলমঙ্গল্যে শিবে সর্বাথসাধিকে | শরণ্যে ত্র্যম্বকে গৌরি নারায়ণি নমোস্তু তে ||

    উত্তরমুছুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ