গোমাতা দের উৎপত্তির, পূজনীয় হবার ও নন্দী-বৃষভের শিববাহন হবার প্রকৃত কারণ কি ? জেনে নিন



শ্রীগোমাত্রৈ নমঃ ॥

শ্রীবৃষভায় নন্দীকেশ্বরায় শিববাহনায় নমঃ ॥

নমঃ শিবায়ৈ চ নমঃ শিবায় ॥


সনাতন ধর্মে “গো" মাতা একটি খুব‌ই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

প্রত্যেক সনাতনী গো জাতিকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করে থাকে, গো অর্থাৎ সাধারণ ভাষায় যাকে ‘গরু’ বলা হয়, সেই গরু জাতিকে আমরা সনাতনীরা প্রাচীন কাল থেকেই অত্যন্ত সমাদর করে আসছি, কিন্তু বর্তমানে আমাদের সনাতনী সমাজের বিরাট অংশের সনাতনীরাই “গোমাতা” -র বিষয়ে অনভিজ্ঞ রয়েছেন। তারা গোমাতাদের এই পূজনীয় হবার প্রকৃত কারণ কি ?  তা জানে না।

গোমাতার উৎপত্তি কোন উদ্দেশ্যে হয়েছে ? গোমাতার উৎপত্তি কোথা থেকে হল ? গোমাতার উৎপত্তি কিভাবে হয়েছিল ? — এবিষয়ে তারা কিছুমাত্র ধারণা রাখে না।

 ফলে এই অজ্ঞানতার সুযোগ নিয়েই মুসলিমরা , খ্রিষ্টানরা, বৌদ্ধ তথা নাস্তিকরা তথা বিভিন্ন চার্বাক সদৃশ ব্যক্তিরা আমাদের সনাতন ধর্মকে মজার পাত্র বানিয়ে ঠাট্টা তামাশা করবার জন্য বিভিন্ন রকমের প্রশ্ন করে সনাতনীদের বিভ্রান্ত করতে থাকে, সেক্ষেত্রে সেইসব শাস্ত্র জ্ঞানহীন সনাতনীরা তখন সমুচিত জবাব দিয়ে তাদের মুখ বন্ধ করাতে সক্ষম হয় না।


তাই আমি শ্রী নন্দীনাথ শৈব, গোমাতা দের উৎপত্তির বিষয়ক সমগ্র প্রকৃত শাস্ত্রিয় তথ্য প্রমাণসহ উপস্থাপনের মাধ্যমে সকল বিভ্রান্তি দূর করে সনাতন ধর্মের সম্মান রক্ষার্থে প্রবৃত্ত হলাম ।

সম্পূর্ণ আলোচনাটি প্রশ্ন-উত্তর পর্বের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে ।

জনতা প্রশ্ন করছেন, উত্তর দিচ্ছেন শ্রী নন্দীনাথ শৈব আচার্য জী।

________________________________________________


(প্রশ্নকারী)

১. গরু দের সনাতনে ধর্মে এত পবিত্র ও পূজা কেন করা হয় ?


উত্তরদাতা- শ্রী নন্দীনাথ শৈবাচার্য জীর উত্তর

 দেখুন, গোমাতা তথা গোজাতির আশ্রয় দাতা হলেন স্বয়ং পরমেশ্বর সদাশিব, তার অত্যন্ত প্রিয় এনারা। পরমেশ্বর শিব এই দিব্য গোমাতাদের মধ্যে থেকে গোরাজপুরুষ বৃষভ কে নিজের বাহন হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন, এমনকি সনাতন ধর্মের ধ্বজেও সেই বৃষভনন্দীর চিহ্ন স্থাপন করেছেন পরমেশ্বর শিব । এই কারণেই পরমেশ্বর শিবের অত্যন্ত প্রিয় এই গোগণ ।

এবিষয়ে শাস্ত্র প্রমাণ সহ দেখুন 👇 

মহাভারতে পরমেশ্বর শিব বলছেন,

মহেশ্বর উবাচ ।

নিরুদ্বিগ্নস্তু যো দদ্যান্মাসমেকং গবাহ্নিকম্ ৷

একভক্তং তথাশ্নীয়াচ্ শ্রূয়তাং তস্য যৎ ফলম্ ॥৩

ইমা গাবো মহাভাগাঃ পবিত্রং পরমং স্মৃতাঃ ।

ত্রীলোকান্ ধারয়ন্তি স্ম সদেবাসুরমানুষান্ ॥৪

তাসু চৈব মহাপুণ্যং শুশ্রূষা চ মহাফলম্ ৷

অহন্যহনি ধৰ্মেণ যুজ্যতে বৈ গবাহ্নিকঃ ॥৫

ময়াহ্যেতে হ্যনুজ্ঞাতাঃ পূর্বমাসন্ কৃতে যুগে । 

ততোঽহমনুনীতো বৈ ব্রহ্মণা পদ্মযোনিনা ॥৬

তস্মাদ্ ব্রজস্থানগতস্তিষ্ঠত্যুপরি মে বৃষঃ ।

রমেঽহং সহ গোভিশ্চ তস্মাৎ পূজ্যাঃ সদৈব তাঃ । 

মহাপ্রভাবা বরদা বরান্ দদ্যুরুপাসিতাঃ ॥৭

তা গাবোঽস্যানুমন্যন্তে সৰ্ব্বকৰ্ম্মসু যৎ ফলম্ ।

তস্য তত্ৰ চতুৰ্ভাগো যো দদাতি গবাহ্নিকম্ ॥৮

[তথ্যসূত্র — হরিদাস সিদ্ধান্ত বাগীশ অনুবাদিত বিশ্ববাণী প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত ‘মহাভারত/অনুশাসন পর্ব/১১১ অধ্যায় এবং মহাভারত/অনুশাসন পর্ব/১৩৩ অধ্যায়/৩-৯ শ্লোক]

✅ অর্থ — মহাদেব বললেন,

যে মানুষ উদ্বেগরহিত হয়ে প্রসন্নচিত্তে একমাস পর্যন্ত প্রত্যহ কোন গরুকে ঘাস ও জল প্রভৃতি দান করে এবং প্রতিদিন একবারমাত্র ভোজন করে থাকে, তার যে ফল হয়, তা শ্রবণ করুন ॥ ৩

 এই গো সকল মহাভাগ্যবতী ও পরম পবিত্র বস্তু বলে জানবে, এনারাই দেবগণ, অসুরগণ ও মনুষ্যগণের সহিত ত্রিভুবন ধারণ করছেন ॥ ৪

সেই গোগণের সেবা করা মহাপুণ্যজনক এবং বহু মহাফল প্রাপ্ত হয়ে যায় , সুতরাং প্রত্যহ গোসেবাকারী মানুষ বিশেষ ধৰ্ম প্রাপ্ত করে থাকেন ॥ ৫

আমি শিব ই পূর্বে সত্যযুগে আমার কাছে থাকা এই গো সকলের উদ্দেশ্যে ধর্মের অনুষ্ঠান করবার জন্য সকলকে আজ্ঞা দিয়েছিলাম ; তার পর এখন আবার পদ্মযোনি ব্রহ্মা সেই গোপন ধর্ম বলবার জন্য অনুনয় করেছেন বলেই সেই ধৰ্ম এখন পুনরায় বললাম ॥ ৬

সেই জন্যই ব্রজস্থানে (গোলোকে) স্থিত গোগণেদের মধ্যে থাকা আমার বাহন বৃষভ(নন্দী) আমার রথের উপরে থাকা আমার ধ্বজের মধ্যে চিহ্ন হিসেবে স্থিত থাকে এবং আমি(শিব) গোগণের সহিত স্থিত থেকে আনন্দ অনুভব করি । এই কারণে, মহাপ্রভাবশালিনী ও বরদায়িনী গোসকল সর্বদাই পূজনীয় এবং তাদের পূজা করলে তারা বরদান করেন ॥ ৭

সেই গোগণ গোসেবকের সমস্ত কৰ্ম্মে যে ফল দান করবার অনুমতি করেন ; যে লোক গবাহ্নিক অর্থাৎ এক মাস পর্যন্ত প্রত্যহ গোগণকে ঘাস-জল আদি দান করেন, তার সেই চিরগোসেবকের ফলের চারভাগের এক ভাগ ফল লাভ হয় ॥ ৮


♦️ বিশ্লেষণ — মহাভারত থেকে পরিষ্কার ভাবে আমরা জানতে পারছি যে, পরমেশ্বর শিবের প্রিয় হল গোমাতাগণ। তাই গোজাতির মধ্যে পুরুষ অর্থাৎ বৃষভ নন্দীকে বাহন বানিয়েছেন পরমেশ্বর শিব স্বয়ং । এমনকি সনাতন ধর্মের ধ্বজে বৃষভ-নন্দী মহারাজকে স্থান দিয়েছেন স্বয়ং পরমেশ্বর শিব । এই ধ্বজ যা বৃষভধ্বজ নামে বিখ্যাত, সেই ধ্বজ পরমেশ্বর শিবের রথের উপরে স্থিত হয়ে উড়তে থাকে ।


________________________________________________


(প্রশ্নকারী)

২. গোমাতা রা কোন লোকে থাকেন ?


উত্তরদাতা -

শ্রী নন্দীনাথ শৈবাচার্য জীর উত্তর —

এ বিষয়ে সনাতন ধর্মের পরমপবিত্র শাস্ত্রে পরিষ্কার ভাবে উত্তর দেওয়া‌ হয়েছে । দেখুন 👇 

♦️ স্কন্দ মহাপুরাণের কাশিখণ্ডে বলা হয়েছে 👇

ব্রহ্মোবাচঃ ।

মম লোকাৎ পরো লোকো বৈকুণ্ঠ ইতি গীয়তে। 

তম্বোপরিষ্টাৎ কৌমার উমালোকন্ততঃ পরম্ ॥ ৯১ 

শিবলোকন্তদুপরি গোলোকস্তৎসমীপতঃ। 

গোমাতরঃ সুশীলাঢ্যাস্তত্র সন্তি শিবপ্রিয়াঃ ॥ ৯২

(তথ্যসূত্র — স্কন্দমহাপুরাণ/কাশিখণ্ড/ অধ্যায় ৩/শ্লোক ৯১-৯২)

✅ অর্থ— আমার(অর্থাৎ ব্রহ্মার) লোকের উপরে বৈকুণ্ঠ লোক, ইহা কথিত হয়েছে।কৌমার(কার্তিকেয়্ -র) লোক তার উর্দ্ধে, উমা(দেবী)লোক কৌমার লোকের চেয়েও উপরে। তার উপরে শিবলোক স্থিত; গোলোক শিবলোকের সমীপবর্ত্তী, সেখানে পরমেশ্বর শিবের অত্যন্ত প্রিয় সুশীলা নামক বহু গো-মাতাগণ অবস্থান করে থাকেন ॥৯১-৯২


এবার ‘গোলোক’ বিষয়ে আরো বিস্তারিত তথ্য

শিবমহাপুরাণ থেকে দেখুন 👇 


শ্রীবিষ্ণুরুবাচ ।

সর্বোপরি চ যস্যাস্তি শিবলোকঃ পরাৎপরঃ ।

যত্র সংরাজতে শম্ভুঃ পরব্রহ্ম পরেশ্বরঃ ॥ ৪৭

প্রকৃতেঃ পুরুষস্যাপি যোঽধিষ্ঠাতা ত্রিশক্তিধৃক্ ।

নির্গুণঃ সগুণঃ সোঽপি পরংজ্যোতিঃ স্বরূপবান ॥ ৪৮

যস্যাঙ্গজাস্তু বৈ ব্রহ্মংস্ত্রয়ঃ সৃষ্ট্যাদিকারকাঃ ।

সত্ত্বাদিগুণসম্পন্না বিষ্ণুব্রহ্মহরাভিধাঃ ॥ ৪৯ 

স এব পরমাত্মা হি বিহরত্য উময়া সহ ।

যত্র মায়াবিনির্মুক্তো নিত্যানিত্যপ্রকল্পকঃ ॥ ৫০

তৎসমীপে চ গোলোকে গোশালা শঙ্করস্য বৈ ।

তস্যেচ্ছয়া চ মদ্রূপঃ কৃষ্ণো বসতি তত্র হ ॥ ৫১

তদ্ গবাং রক্ষণার্থায় তেনাজ্ঞপ্তঃ সদা সুখী ।

তৎসংপ্রাপ্তসুখঃ সোঽপি সংক্রীড়তি বিহারবিৎ ॥ ৫২

[তথ্যসূত্র — শ্রীশিবমহাপুরাণ/রুদ্রসংহিতা/(৫ম) যুদ্ধখণ্ড/২৯ অধ্যায়/৪৭-৫২ শ্লোক]

✅ অর্থ — যার পরাৎপর শিবলোক সমস্ত লোকের উপর স্থিত, যেখানে পরমব্রহ্ম পরমেশ্বর সদাশিব স্বয়ং বিরাজমান আছেন, সেই প্রভু তিন শক্তিকে ধারণকারী যে প্রকৃতি এবং পুরুষ রয়েছে তার‌ও অধিষ্ঠাতা, যিনি নির্গুণ, সগুণ তথা পরমজ্যোতিস্বরূপ, হে ব্রহ্মণ ! সৃষ্টি আদি কৃত্যকারী তথা সত্ত্ব আদি গুণে যুক্ত বিষ্ণু ব্রহ্মা এবং হর নামক তিন দেবতা যার অঙ্গ থেকে উৎপন্ন হয়েছে, মায়ার প্রভাব থেকে সর্বদা মুক্ত এবং নিত্য-অনিত্যের ব্যবস্থাপক সেই পরমাত্মা ই তোমার সাথে বিহার করে থাকেন। তার কাছেই গোলক স্থিত আর সেখানে পরমেশ্বর শিবের গোশালা রয়েছে। তারই ইচ্ছাতে সেখানে আমার অর্থাৎ বিষ্ণুর স্বরূপে স্থিত শ্রীকৃষ্ণ নিবাস করেন ॥ ৪৭-৫১

পরমেশ্বর শিব নিজের সেই গো জাতিকে রক্ষার জন্য সেই শ্রীকৃষ্ণকে নিযুক্ত করেছিলেন । সেই শ্রীকৃষ্ণ গোগণেদের রক্ষার দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে সেখানে বিহার করতে করতে ক্রীড়া করেন ॥ ৫২


সুতরাং, উপরোক্ত প্রমাণের দ্বারা আপনারা জানতে পারলেন যে, পরমেশ্বর শিবের আদেশে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গোমাতাদের দেখাশোনার দায়িত্ব পালনের জন্য যে লোকে অবস্থান করবার সুযোগ লাভ করেছিলেন তা ‘গোলোক’ নামে পরিচিত। সেই গোলোকে গোমাতারা থাকেন। এই গোলোক হল শিবলোকের গোশালা অর্থাৎ যারা সাধারণ মানুষ গোয়ালঘর বলে থাকেন। এটি শিবলোকের কাছেই অবস্থিত। যে শিবলোকে স্বয়ং পরমেশ্বর সদাশিব অবস্থান করছেন ।

________________________________________________


(প্রশ্নকারী)

৩. গো গণেদের উৎপন্ন করবার মূল উদ্দেশ্য কি ছিল ?


উত্তরদাতা -

শ্রী নন্দীনাথ শৈবাচার্য জীর উত্তর —

[মূখ্য কারণ]

পরমেশ্বর শিবের আরাধনার উদ্দেশ্যেই মূলত এই গোমাতাদের উৎপন্ন করা হয়েছিল । দেখুন 👇 

শিবস্নানাগ্নিকার্যার্থাং উৎপন্নাং কপিলাং যতঃ ॥৫১

(তথ্যসূত্র — শিবধর্মপুরাণ/৮ম অধ্যায়/৫১ নং শ্লোক)

✅ অর্থ — পরমেশ্বর শিবকে দুধ দিয়ে স্নান করাবার জন্য এবং হোমযজ্ঞে তথা গোময় দ্বারা ঘুঁটে উৎপন্ন করে তা অগ্নিসংযোগে দগ্ধ করে তার ভস্ম দ্বারা শিবকে ভস্মস্নান তথা ত্রিপুণ্ড্র তিলক ধারণের জন্য কপিলা আদি গোমাতাদের উৎপত্তি হয়েছে ॥ ৫১

অর্থাৎ, পরমেশ্বর শিবের পূজার্চনায় শিবলিঙ্গ বা শিব প্রতিমা বিগ্রহ দুধ দ্বারা স্নান করাবার জন্য ও হোমযজ্ঞে হবি হিসেবে গোমাতার দুধ হতে উৎপন্ন ঘিয়ের জন্য তথা সেই হোমযজ্ঞের থেকে উৎপন্ন ভস্ম প্রাপ্ত করবার জন্যই গো মাতাদের উৎপন্ন করা হয়েছে। 


[গৌণ কারণ]

এছাড়াও, মহাভারতে আরো বলা হয়েছে,

যজ্ঞাঙ্গং কথিতা গাবো যজ্ঞ এব চ বাসব ! ।

এতাভিশ্চ বিনা যজ্ঞো ন বৰ্ত্তেত কথঞ্চন ॥ ১৭

ধারয়ন্তি প্রজাশ্চৈব পয়সা হবিষা তথা ।

এতাসাং তনয়াশ্চাপি কৃষিযোগমুপাসতে ॥১৮

জনয়ন্তি চ ধান্যানি বীজানি বিবিধানি চ ।

ততো যজ্ঞাঃ প্রবর্ত্তন্তে হব্যং কব্যঞ্চ সৰ্বশঃ ॥ ১৯

[তথ্যসূত্র : মহাভারত/অনুশাসন পর্ব/৭২ অধ্যায়]

অর্থ — এই গোগণকেই যজ্ঞাঙ্গ ও যজ্ঞ বলে কথিত। কারণ, গোগণ ব্যতীত কোনো ভাবেই যজ্ঞ হতে পারে না ॥১৭

গোগণ দুগ্ধ ও ঘৃত দ্বারা মনুষ্যগণকে পোষণ করে এবং এদের সন্তান বৃষ(ষাড়)গণ কৃষিকাৰ্য্য সম্পাদন করে থাকে ॥১৮

ইহারা ধান্য ও নানাবিধ বীজ উৎপাদন করে, এর থেকেই যজ্ঞ, হব্য ও কব্য প্রভৃতি সমস্ত প্রয়োজনীয় উপকরণ লাভ হয়, যার দ্বারা যজ্ঞ সম্পন্ন হয় ॥১৯


মহাভারত অনুযায়ী গোমাতাদের প্রতি সনাতনীদের হৃদয়ে এতটা শ্রদ্ধার কারণ হল, আমাদের উপাসনার যজ্ঞের  ক্ষেত্রে দুধ ও ঘি প্রয়োজন। যা গোমাতার কাছ থেকেই আমরা প্রাপ্ত করে থাকি, তাছাড়া এই গোজাতির বৃষগণ কৃষিকার্যে হাল টেনে মনুষ্যদের খাদ্য উৎপাদনে সহায়তা করে, দেবতার হবি(হোমযজ্ঞের ঘৃত) ও মনুষ্যদের চাহিদা পূরণের কারণেই শাস্ত্রে বলা হয়েছে যে গোমাতারা দেবতা ও জীবেদের ধারণ করে থাকেন। এই পরিপোষন করবার কারণেই ‘মাতা’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে শাস্ত্রে ।

________________________________________________


(প্রশ্নকারী)

৪. গরু বা বৃষের দেহের প্রধান স্থান মস্তকের মধ্যে কে থাকেন শ্রীহরি নাকি শিব ?


উত্তরদাতা -

শ্রী নন্দীনাথ শৈবাচার্য জীর উত্তর —

এ বিষয়ে সনাতন ধর্মের শাস্ত্র বলছে যে, 

শৃঙ্গমূলে গবাং নিত্যং ব্রহ্মাবিষ্ণুঃ স্বয়ং স্থিতৌ ॥৭৩

শিরোমধ্যে মহাদেবঃ সর্বদেবপতিঃ স্থিতঃ ।..॥৭৪

ললাটে পার্বতীদেবী নাসাগ্রে চৈব ষণ্মুখঃ ।..॥৭৫

(তথ্যসূত্র — শিবধর্মপুরাণ/৮ম অধ্যায়/৭৩-৭৫)

✅ অর্থ — গো-এর দুই শিং -এর মূলে ব্রহ্মা ও বিষ্ণু স্থিত ॥৭৩

গো-এর মস্তকের মধ্যে প্রধান অংশে সর্বদেবপতি পরমেশ্বর মহাদেব স্থিত ॥৭৪

গো-এর ললাটে পরমেশ্বরী মাতা পার্বতী দেবী ও নাসারন্ধ্রে কার্তিকেয়্ স্থিত আছেন ॥ ৭৫


সুতরাং, শাস্ত্র অনুযায়ী পরমেশ্বর শিব‌ই গোজাতির মস্তকের মধ্যে প্রধান স্থানে অবস্থান করেন। কারণ তিনি পরমব্রহ্ম, তিনিই সনাতন ধর্মের সকল কিছুর মধ্যে মূল। গো -এর শিং দুটিতে শ্রীহরি ও ব্রহ্মা জী  অবস্থান করেন । আর মাতা পার্বতী গো এর ললাটে স্থিত থাকেন । 


________________________________________________


(প্রশ্নকারী)

৫. গোজাতির উৎপত্তি কার থেকে হল এবং কিভাবে হয়েছিল ? কিভাবে বৃষভ মহাদেবের বাহন হয়েছিলেন ?  


উত্তরদাতা -

শ্রী নন্দীনাথ শৈবাচার্য জীর উত্তর —

এ বিষয়ে সনাতন ধর্মের শাস্ত্র ‘মহাভারত’ -এর অনুশাসন পর্ব বলছে যে, 


ইতীদং মনসা গত্বা প্রজাসর্গাথর্মাত্মনঃ ।

প্রজাপতিস্তু ভগবানমৃতং প্ৰাপিবত্তদা ॥ ১৬

স গতস্তস্য তৃপ্তিং তু গন্ধং সুরভিমুদ্‌গিরন্ । 

দদর্শোদ্‌গারসংবৃত্তাং সুরভিং মুখজাং সুতাম্ ॥ ১৭ 

সাহসৃজৎ সৌরভেয়ীস্ত সুরভির্লোকমাতৃকাঃ ।

সুবর্ণবর্ণাঃ কপিলাঃ প্ৰজানাং বৃত্তিধেনবঃ ॥ ১৮ 

তাসামমৃতবর্ণানাং ক্ষরন্তীনাং সমন্ততঃ।

বভূবামৃতজঃ ফেনঃ স্রবন্তীনামিবোৰ্মিজঃ ॥ ১৯

স বৎসমুখবিভ্ৰষ্টো ভবস্য ভুবি তিষ্ঠতঃ ।

শিরস্যবাপতৎ ক্রুদ্ধঃ স তদৈক্ষত চ প্ৰভুঃ ॥ ২০

ললাটপ্রভবেণাক্ষ্ণা রোহিণীং প্রদহন্নিব ।

তত্তেজস্তু ততো রৌদ্রং কপিলাস্তা বিশাংপতে ! ॥ ২১ 

নানাবর্ণত্বমনয়ম্মেঘানিব দিবাকরঃ।

যাস্ত তস্মাদপক্রম্য সোমমেবাভিসংশ্রিতাঃ ॥২২

যথোৎপন্নাঃ স্ববর্ণস্থাস্তা নীতাশ্চান্যবর্ণতাম্।

অথ ক্রুদ্ধং মহাদেবং প্রজাপতিরভাষত ॥ ২৩

অমৃতেনাবসিক্তস্ত্বং নোচ্ছিষ্টং বিদ্যতে গবাম্ ।

যথা হ্যমৃতমাদায় সোমো বিস্যন্দতে পুনঃ ॥ ২৪

তথা ক্ষীরং ক্ষরন্ত্যেতা রোহিণ্যোঽমৃতসম্ভবম্ ।

ন দুষ্যত্যনিলো নাগ্নির্ন সুবৰ্ণং ন চোদধিঃ ॥ ২৫

নামৃতেনামৃতং পীতং বৎসপীতা ন বৎসলা ।

ইমান্ লোকান্ ভরিষ্যন্তি হবিষা প্রস্রবেণ চ ॥ ২৬

আসামৈশ্বর্য্যমিচ্ছন্তি সৰ্ব্বেঽমৃতময়ং শুভম্ ।

বৃষভঞ্চ দদৌ তস্মৈ সহ গোভিঃ প্রজাপতিঃ।

প্রসাদয়ামাস মনস্তেন রুদ্রস্য ভারত ! ॥ ২৭

প্রীতশ্চাপি মহাদেবশ্চকার বৃষভং তদা ৷

ধ্বজঞ্চ বাহনঞ্চৈব তস্মাৎ স বৃষভধ্বজঃ ॥ ২৮

ততো দেবৈর্ম হাদেবস্তদা পশুপতিঃ কৃতঃ।

ঈশ্বরঃ স গবাং মধ্যে বৃষভাঙ্কঃ প্রকীৰ্ত্তিতঃ ॥ ২৯ 

এবমব্যগ্রবর্ণানাং কপিলানাং মহৌজসাম্ ।

প্রদানে প্রথমঃ কল্পঃ সৰ্বাসামেব কীৰ্ত্তিতঃ ॥ ৩০

লোকজ্যেষ্ঠা লোকবৃত্তিপ্রবৃত্তা

রুদ্রোপেতাঃ সোমবিষ্যন্দভূতাঃ ।

সৌম্যাঃ পুণ্যাঃ কামদাঃ প্রাণদাশ্চ

গা বৈ দত্ত্বা সর্বকামপ্ৰদঃ স্যাৎ ॥৩১

ইদং গবাং প্রভববিধানমুত্তমং পঠন্ 

সদা শুচিরপি মঙ্গলপ্রিয়ঃ ।

বিমুচ্যতে কলিকলুষেণ মানবঃ শ্রিয়ং

সুতান্ ধনপশুমাপ্নুয়াৎ সদা ॥ ৩২

(তথ্যসূত্র : মহাভারত/অনুশাসন পর্ব/৬২ অধ্যায়)

✅ অর্থ —

ভগবান প্রজাপতি ব্রহ্মা প্রজা সৃষ্টির জন্য মনে মনে এই ভাবনা করে অমৃত পান করলেন ॥ ১৬

তিনি অমৃত পানে তৃপ্তিলাভ করলেন, তাহার সুমিষ্ট গন্ধ উদ্‌গার করত: সেই অমৃত থেকে উদ্‌গারজাত মুখ থেকে উৎপন্না কন্যা সুরভিকে দেখতে পেলেন ॥১৭

সেই সুরভি লোকের মাতৃস্বরূপা, স্বর্ণবর্ণা ও জীবিকানির্ব্বাহিণী সৌরভেয়ী- নামে কপিলা ধেনুগণকে সৃষ্টি করলেন ॥১৮

নদীর তরঙ্গজাত ফেনের ন্যায়, অমৃতবর্ণা দুগ্ধনিঃসারিণী সেই ধেনুগণের দুগ্ধজাত ফেন, সকল দিকে উৎপন্ন হল ॥১৯॥

সেই দুগ্ধ-ফেন বৎসের মুখ হইতে বিচ্যুত হয়ে ভূতলে স্থিত মহাদেবের মস্তকে নিপতিত হল তখন প্রভাবশালী মহাদেব ক্রুদ্ধ হয়ে ললাট-নয়নদ্বারা দগ্ধ করবার জন্য‌ই যেন সেই ধেনুকে দর্শন করলেন ।

হে নরনাথ! সূর্য্য যেমন মেঘের দ্বারা মেঘেই নানা বর্ণ প্রকাশিত করেন; তেমন মহাদেবের ললাট-নয়নজাত সেই ভীষণ তেজ সেই পিঙ্গলবর্ণা ধেনুদেরকে নানা বর্ণ করে দিয়েছিল। আর যে সকল ধেনু সেই তেজ হইতে নির্গত হইয়া চন্দ্ৰকেই আশ্রয় করলো, তারা যেমন উৎপন্ন হয়েছিল, তেমনই নিজের নিজের বর্ণবিশিষ্ট থেকেঐ তেজের সংস্রবে অন্যান্য বর্ণ প্রাপ্ত হল। 

তখন প্রজাপতি ব্রহ্মা বিনীত ভাবে ক্রুদ্ধরত রুদ্র-মহাদেবকে বললেন – ॥ ২০–২৩

হে দেবদেব! আপনি ফেন রূপ অমৃতদ্বারা অভিষিক্ত হয়েছেন । কিন্তু গোমুখ হতে বিচ্যুত ঐ দুগ্ধ-ফেনা উচ্ছিষ্ট নয়। চন্দ্র যেমন অমৃত গ্রহণ করে আবার তা প্রকাশ মাধ্যমে নিঃসারণ করেন, তেমন‌ই এই গোসকল অমৃতজাত দুগ্ধক্ষরণ করেন ; সুতরাং বৎসমুখ - নিসৃতঃ দুগ্ধ-ফেনখ বায়ু, অগ্নি, স্বর্ণ ও সমুদ্র(জল) দ্বারা স্পর্শ হলেও দূষিত হয় না ॥ ২৪–২৫

অমৃতপায়ী দেবগণ পান করলেও অমৃত কখনোই দূষিত হয় না এবং বৎসলা ধেনু বৎস দ্বারা পান করলেও উচ্ছিষ্ট হয় না । এই ধেনু ঘৃত ও দুগ্ধদ্বারা মনুষ্যগণকে ভরণ করবে ॥ ২৬

ভরতনন্দন! এই জন্যই সমস্ত মানুষ এই ধেনুগণের দুগ্ধরূপ সুখসম্পদ ইচ্ছা করে ৷ তাহার পর প্রজাপতি সকল গোগণের সাথে একটি পরমপবিত্র বৃষ‌ মহাদেবকে দান করলেন এবং তার দ্বারা তিনি পরমেশ্বর মহাদেবের মনকেও প্রসন্ন করতে সক্ষম হলেন ॥ ২৭

তখন মহাদেবও সন্তুষ্ট হয়ে সেই বৃষটিকে নিজের ধ্বজ ও বাহন বানিয়ে নিলেন ; এর কারণে তাকে ‘বৃষধ্বজ' বলা হয় ॥ ২৮

তার পর দেবতারা তখন মহাদেবকে পশুপতি বলে জেনে মাধ্য করতে লাগলেন। সেই জন্যই সকল দেবগণের মধ্যে একমাত্র পরমব্রহ্ম মহাদেব‌ই পশুগণের অধীশ্বর ও বৃষভাঙ্ক বলিয়া কথিত হয়ে থাকেন ॥ ২৯

এইরূপে সমস্ত ধেনুর মধ্যেই অমিশ্রবর্ণা ও তেজস্বিনী কপিলা ধেনুর দান প্রথম কল্প কথিত হয়ে থাকে ॥ ৩০

লোকজ্যেষ্ঠা, লোকের বৃত্তিসম্পাদনে প্রবৃত্তা, মহাদেবের কাছে আশ্রিতা, চন্দ্র হইতে নির্গত অমৃতপ্রাপ্তা, সৌম্যমূৰ্ত্তি, পবিত্রা, কামদায়িনী ও প্রাণদায়িকা ধেনু কে দান করে মানুষ গ্রহীতার সমস্ত অভীষ্টদাতাই হয় ॥ ৩১

মানুষ পবিত্র ও মঙ্গলার্থী হয়ে এই উত্তম গোসৃষ্টির উপাখ্যান সর্ব্বদা পাঠ করে কলির পাপ হতে মুক্ত হয় এবং সর্ব্বদা কান্তি, পুত্র, ধন ও পশু লাভ করে ॥ ৩২


________________________________________________


(প্রশ্নকারী)

৬. কি করে গোগণেরা গোলোক প্রাপ্ত করেছিলেন ?

উত্তরদাতা -

শ্রী নন্দীনাথ শৈবাচার্য জীর উত্তর —

এ বিষয়ে সনাতন ধর্মের শাস্ত্র ‘মহাভারত’ -এর অনুশাসন পর্ব বলছে 👇

দেবতার্থেঽমৃতার্থে চ যজ্ঞার্থে চৈব ভারত ! ।

সুরভির্নাম বিখ্যাতা রোহিণী কামরূপিণী ॥ ৬

সঙ্কল্প্য মনসা পূর্বং রোহিণী হ্যমৃতাত্মনা ৷

ঘোরং তপঃ সমাস্থায় নির্মিতা বিশ্বকৰ্মণা ॥ ৭

পুরুষং চাসৃজদ্ ভূয়স্তেজসা তপসা চ হ ৷

দেদীপ্যমানং বপুষা সমিদ্ধমিব পাবকম্ ॥ ৮ সোঽপশ্যদিষ্টরূপাং তাং সুরভিং রোহিণীং তদা ৷

দৃষ্ট্বৈব চাতিবিমনাঃ সোহভবৎ কামমোহিতঃ ॥ ৯

তং কামার্ত্তমথো জ্ঞাত্বা স্বয়ম্ভূর্লোকভাবনঃ ।

মাৰ্ত্তো ভব তথা চৈষ ভগবানভ্যভাষত ॥ ১০

ততঃ স ভগবাংস্তত্ৰ মাৰ্ত্তাণ্ড ইতি বিশ্রুতঃ।

চকার নাম তং দৃষ্ট্বা তস্যাৰ্ত্তীভাবমুত্তমম্ ॥১১ 

সোঽদদাদ্ ভগবাংস্তস্মৈ মাৰ্ত্তাণ্ডায় মহাত্মনে ।

সুরূপাং সুরভিং কন্যাং তপস্তেজময়ী শুভাম্ ॥ ১২

যথা ময়ৈষ চোদ্‌ভূতস্ত্বং চৈবৈষা চ রোহিণী।

মৈথুনং গতবন্তৌ চ তথা চোৎপৎস্যতি প্ৰজা ॥ ১৩

প্রজা ভবিষ্যতে পুণ্যা পবিত্রং পরমঞ্চ বাম্ ।

ন চাপ্যগম্যাগমনাদ্দোষং প্রাপ্প্যসি কর্হিচিৎ ॥ ১৪

ত্বৎপ্রজাসম্ভবং ক্ষীরং ভবিষ্যতি পরং হবিঃ ।

যজ্ঞেষু চাজ্যভাগানাং ত্বৎ প্ৰজামূলজো বিধিঃ ॥ ১৫

প্রজাশুশ্রূষবশ্চৈব যে ভবিষ্যন্তি রোহিণি ! ।

তব তেনৈব পুণ্যেন গোলোকং যান্তু মানবাঃ ॥ ১৬

তত এতেন পুণ্যেন প্রজান্তব তু রোহিণি ! ।

ঊর্দ্ধং মমাপি লোকস্য বৎস্যন্তে নিরুপদ্রবাঃ ॥ ১৯

[তথ্যসূত্র : মহাভারত/অনুশাসন পর্ব/৬৭ অধ্যায়]

✅ অর্থ — দেবগণের নিমিত্ত, অমৃতের জন্য এবং যজ্ঞ সম্পাদনার্থ রক্ত- বর্ণা ও কামরূপিণী সুরভি নামে বিখ্যাত একটি ধেনু ছিল ॥ ৬

পূর্বকালে জগতের সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা ভয়ঙ্কর তপস্যা করিয়া মনে মনে কল্পনা করে অমৃতদ্বারা রক্তবর্ণা সেই সুরভিকে সৃষ্টি করে ছিলেন ॥ ৭

তিনি পুনরায় তেজ ও তপস্যার প্রভাবে প্রজ্বলিত অগ্নির ন্যায় দেহের তেজে দেদীপ্যমান একটি পুরুষ বৃষও আবার সৃষ্টি করেছিলেন সুরভীর জন্য ॥ ৮

তখন সেই পুরুষ আশানুরূপ সৌন্দর্য্যশালিনী রক্তবর্ণা সেই সুরভিকে দর্শন করল, তাকে দেখে সেই পুরুষ বৃষ কামে মোহিত হয়ে অত্যন্ত বিহ্বল হয়ে পড়ল ॥ ৯

এরপর জগতের সৃষ্টিকর্তা ভগবান্ ব্রহ্মা সেই পুরুষকে কামার্ত্ত বলে জেনে তাকে বললেন—‘তুমি কামাৰ্ত হয়ো না’ ॥ ১০

ব্রহ্মা ওইভাবে বলবার কারণে তখন সেই কামার্ত পুরুষ অর্থাৎ বৃষ ‘মার্তাণ্ড’ এই নামে প্রসিদ্ধ হল এবং ব্রহ্মাও তার গুরুতর কামার্ত ভাব দেখে তার ‘মাৰ্ত্তাণ্ড’- এই নামই অনুমোদন করলেন ॥ ১১

তখন ভগবান্ ব্রহ্মা সেই মহাত্মা মার্তাণ্ডের হাতে সুরূপা, শুভলক্ষণা ও তপস্তেজময়ী কন্যা সুরভিকে দান করলেন ও বললেন ॥ ১২ 

‘এই তুমি বৃষ এবং এই রক্তবর্ণা সুরভি আমার থেকে উৎপন্ন হয়ে যেহেতু মিথুন ভাব প্রাপ্ত হয়েছো, তার কারণে তোমাদের সন্তান উৎপন্ন হবে ॥ ১৩

‘তোমাদের পরম পবিত্র ও পুণ্যজনক' সন্তান উৎপন্ন হবে, কিন্তু অগম্যা গমন বলে এখন তোমার দোষ‌ও হবে না ॥ ১৪

তোমার সন্তান হতে উৎপন্ন উত্তম দুগ্ধ (থেকে উৎপন্ন ঘৃত) হবি হিসেবে ব্যবহৃত হবে এবং যজ্ঞে আজ্য ভাগের যা কিছু বিধান আছে, তা তোমাদের সন্তানদের মাধ্যমেই সম্ভবপর হবে ॥ ১৫

রোহিণি ! যারা লোকের শুশ্রূষাকারী হবে, সেই ব্যক্তিগণ তোমারই সেই পুণ্যের বলে গোলোক প্রাপ্ত হবে ॥ ১৬

রোহিণি ! তাহার পর তোমার সন্তানেরা এই পুণ্যের ফলেই আমার লোকেরও অর্থাৎ ব্রহ্মলোকেরও উপরে নিরুপদ্রবে বাস করবে ॥১৯


________________________________________________


(প্রশ্নকারী)

৭. সুরভীর থেকে কোন কোন সন্তান উৎপন্ন হল এবং কি করে পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ল ? 

উত্তরদাতা -

শ্রী নন্দীনাথ শৈবাচার্য জীর উত্তর —

উত্তর রয়েছে সনাতন ধর্মের শাস্ত্র ‘মহাভারত’ -এর অনুশাসন পর্বে, দেখুন 👇

তপ্তা তপো ঘোরতপাঃ সুরভির্দীপ্ততেজসঃ।

সুষাবৈকাদশ সুতান্ রুদ্রা যে চ্ছন্দসি স্ততাঃ ॥ ৪

অজৈকপাদহির্ব্র ধ্ন্যস্ত্র্যম্বকশ্চ মহাযশাঃ ।

বৃষাকপিশ্চ শম্ভুশ্চ কপালী রৈবতস্তথা ॥ ৫

হরশ্চ বহুরূপশ্চ উগ্র উগ্রোঽথ বীৰ্য্যবান্ ।

তস্য চৈবাত্মজঃ শ্ৰীমান্ বিশ্বরূপো মহাযশাঃ ॥ ৬ 

একাদশৈতে কথিতা রুদ্রাস্তে নাম নামতঃ।

মহাত্মানো মহাযোগাস্তেজযুক্তা মহাবলাঃ ॥ ৭

এতে বরিষ্ঠজন্মানো দেবানাং ব্রহ্মবাদিনাম্ ।

বিপ্রাণাং প্রকৃতির্লোকে এত এব হি বিশ্ৰুতাঃ ॥ ৮

এত একাদশ প্রোক্তা রুদ্রাস্ত্রিভুবনেশ্বরাঃ।

শতং ত্বেতৎ সমাখ্যাতং শতরুদ্রং মহাত্মনাম্ ॥ ৯

সুষুবে প্রথমাং কন্যাং সুরভিঃ পৃথিবীং তদা । 

বিশ্বকামদুঘা ধেনুর্যা ধারয়তি দেহিনঃ ॥ ১০

সুতং গোব্রাহ্মণং রাজন্ ! একমিত্যভিধীয়তে । 

গোব্রাহ্মণস্য জননী সুরভিঃ পরিকীর্ত্যতে ॥ ১১

সৃষ্ট্বা তু প্রথমং রুদ্রান্ বরদান রুদ্রসম্ভবান্ ।

পশ্চাৎ প্রভুং গ্রহপতিং সুষুবে লোকসম্মতম্ ॥ ১২ 

সোমরাজানমমৃতং যজ্ঞসর্বস্বমুত্তমম্ ।

ওষধীনাং রসানাঞ্চ দেবানাং জীবিতস্য চ ॥ ১৩

ততঃ শ্রিয়ঞ্চ মেধাঞ্চ কীর্তিং দেবীং সরস্বতীম্ ।

চতস্ৰঃ সুষুবে কন্যা যোগেষু নিয়তাঃ স্থিতাঃ ॥ ১৪

এতাঃ সৃষ্ট্বা প্রজা এষা সুরভিঃ কামরূপিণী ।

সুষুবে পরমং ভূয়ো দিব্যা গোমাতরঃ শুভাঃ ॥ ১৫

পুণ্যাং মায়াং মধুশ্চ্যোতাং শিবাং শীঘ্রাং সরিদ্বরাম । 

হিরণ্যবর্ণাং সুভগাং গব্যাং পৃশ্নীং কুথাবতীম্‌ ॥ ১৬ 

অঙ্গাবতীং ঘৃতবতীং দধিক্ষীরপয়োবতীম্ ।

অমোঘাং সুরসাং সত্যাং রেবতীং মারুতীং রসাম্ ॥ ১৭

অজাঞ্চ সিকতাঞ্চৈব শুদ্ধধূমামধারিণীম্ ।

জীবাং প্রাণবর্তীং ধন্যাং শুদ্ধাং ধেং ধনবিহাম্ ॥ ১৮ 

ইন্দ্ৰাম্বৃদ্ধিঞ্চ শান্তিঞ্চ শান্তপাপাং সরিরাম্ । 

চত্বারিংশতিমেকাঞ্চ ধন্যাস্তা দিবি পূজিতাঃ ॥ ১৯ 

ভূয়ো জজ্ঞে সুরভ্যাশ্চ শ্ৰীমাংশ্চন্দ্রাংশুসপ্রভঃ ।

বৃষো দক্ষ ইতি খ্যাতঃ কণ্ঠে মণিতলপ্ৰভঃ ॥২০ 

স্রগ্বীককুদ্মান্ দ্যুতিমান্ মৃণালসদৃশপ্রভঃ ।

সুরভ্যনুমতে দত্তো ধ্বজো মাহেশ্বরস্তু সঃ ॥ ২১

সুরভ্যঃ কামরূপিণ্যো গাবঃ পুণ্যার্থমুৎকটাঃ ।

আদিত্যেভ্যো বসুভ্যশ্চ বিশ্বেভ্যশ্চ দদৌ বরান্ ॥ ২২

সুরভিস্তু তপস্তপ্ত্বা সুষুবে গাস্ততঃ পুনঃ ।

যা দত্তা লোকপালানামিন্দ্রাদীনাং যুধিষ্ঠির ! ॥ ২৩

সুষ্টুতাং কপিলাঞ্চৈব রোহিণীঞ্চ যশস্বিনীম্ । 

সৰ্বকামদুঘাঞ্চৈব মরুতাং কামরূপিণীম্‌ ॥ ২৪

গাবো মৃষ্টদুঘা হ্যেতাস্তাশ্চতস্রোঽত্র সংস্তুতাঃ ।

যাসাং ভূত্বা পুরা বৎসাঃ পিবন্ত্যমৃতমুত্তমম্ ॥ ২৫

সুষ্টুতাং দেবরাজায় বাসবায় মহাত্মনে ! ৷

কপিলাং ধর্মরাজায় বরুণায় চ রোহিণীম্‌ ॥২৬৷৷

সর্বকামদুঘাং ধেনুং রাজ্ঞে বৈশ্রবণায় চ ।

ইত্যেতা লোকমহিতা বিশ্রুতাঃ সুরভেঃ প্রজাঃ ॥ ২৭

এতাসাং প্রজয়া পূর্ণা পৃথিবী মুনিপুঙ্গব ! ।

গোভ্যঃ প্রভবতে সৰ্ব্বং যৎ কিঞ্চিদিহ শোভনম্ ॥২৮

[তথ্যসূত্র : মহাভারত/অনুশাসন পর্ব/৬৮ অধ্যায়]

✅ অর্থ — ঘোরতপা সুরভি তপস্যা করে উজ্জ্বলতেজসম্পন্ন একাদশ পুত্র প্রথমে প্রসব করেন, যাঁহারা বেদে একাদশ রুদ্র বলে উল্লেখ করা হয়েছে ॥ ৪

অজৈকপাৎ, অহিব্রধ্ন, মহাযশা ত্র্যম্বক, বৃষাকপি, শম্ভু, কপালী, রৈবত, হর, বহুরূপ উগ্র, বীর্য্যবান্ উগ্র এবং সেই বৃষের পুত্র মহাযশা শ্রীমান্ বিশ্বরূপ ॥ ৫-৬

মহাত্মা, মহাযোগী, তেজস্বী ও মহাবল এই এগার জনকে নামানুসারে সেই একাদশ রুদ্র বলা হয়ে থাকে ॥ ৭

এই একাদশ রুদ্র দেবগণের মধ্যে জ্যেষ্ঠ এবং এই বিখ্যাত একাদশ রুদ্রই জগতে বেদবাদী ব্রাহ্মণগণের জন্য মূল ॥ ৮

এই একাদশ রুদ্রকেই ত্রিভুবনের অধীশ্বর বলা হয়েছে এবং মহাত্মা রুদ্রদের এক শতকেই বেদের শতরুদ্রের নামে নামাঙ্কিত হয়েছে ॥ ৯

 এই সময়ে সুরভি সেই পৃথিবীকে প্রথমা গো কন্যারূপে প্রসব করেন, সকলের অভীষ্টপূরণকারিণী ধেনুরূপা যেই পৃথিবী প্রাণিগণকে ধারণ করছেন ॥ ১০

রাজা ! গো ও ব্রাহ্মণরূপ দুই পুত্রকে একই বলা হয় এবং এক সুরভিই সেই গো ও ব্রাহ্মণের জননী বলে কথিত হন ॥ ১১

সুরভি প্রথমে বরদাতা ও বৃষসঞ্জাত একাদশ রুদ্রকে সৃষ্টি করে পরে প্রভাবশালী সূৰ্য্য, ওষধী ও রসের অধিপতি জগৎপ্রিয় চন্দ্র, দেবগণের জীবন- রক্ষক অমৃত রূপী দুগ্ধ এবং যজ্ঞের সর্ব্বস্ব উত্তম হবি (ঘৃত) সৃষ্টি করেছিলেন ॥১২-১৩

তার পর জগতের নানাকার্য্যের উপায়রূপে নিরূপিত শ্রী, মেধা, কীৰ্ত্তি ও সরস্বতীদেবীরূপ (গুণস্বরূপ) চারটি গো কন্যাকে সুরভি প্রসব করেন ॥ ১৪

এই কামরূপিণী সুরভি, এই সন্তানগণকে সৃষ্টি করে পুনরায় মঙ্গলময়ী দিব্য গোমাতৃগণকে প্রসব করেছিলেন ॥ ১৫

পুণ্যা, মায়া, মধুশ্চ্যোতা, শিবা, নদীশ্রেষ্ঠা, শীঘ্রা, স্বর্ণবর্ণা ও মনোহরা গব্যা, পৃশ্নী, কুথাবতী, অঙ্গাবতী, ঘৃতবর্তী, দধিমতী, ক্ষীরবতী, জলবতী, অমোঘা, সুরসা, সত্যা, রেবতী, মারুতী, রসা, অজা, সিকতা, শুদ্ধধূমা, অধারিণী, জীবা, প্রাণবতী, ধন্যা, শুদ্ধা, ধেনু, ধনাবহা, ইন্দ্রা, ঋাদ্ধ, শান্তি ও নদীশ্রেষ্ঠা শান্তপাপা এবং আরও ৪১ সংখ্যার মতো নদীসমূহ সুরভিই সৃষ্টি করেছিলেন, সেই ধন্য নদী সকল স্বর্গে পূজিত হয়ে থাকে ॥ ১৬-১৯

শ্রীমান্, চন্দ্রকিরণের ন্যায় শুভ্রবর্ণ এবং চন্দ্রকান্তমণির ন্যায় উজ্জ্বল কণ্ঠদেশযুক্ত একটি বৃষ পুনরায় সুরভি হতে উৎপন্ন হইয়াছিল , সেই বৃষটি ‘দক্ষ’ নামে বিখ্যাত হয়েছিল ॥ ২০

মাল্যভূষিত, ঘাড়ের উপরে উচ্চ মাংসগুপ্তযুক্ত, কান্তিসমন্বিত ও মৃণালের ন্যায় শুভ্রবর্ণ সেই বৃষটিকে প্রজাপতি ব্রহ্মা সুরভির অনুমতি নিয়ে পরমেশ্বর মহাদেবের বাহন ও ধ্বজরূপে দান করেছিলেন ॥ ২১

কামরূপিণী ও বিশালাঙ্গী সুরভিতনয়া গো সকল পুণোর জন্যই উৎপন্ন হয়েছিল । ব্ৰহ্মা আদিত্যগণ, বসুগণ ও বিশ্বেদেবগণকে বররূপে সেই সকল গো দান করে ছিলেন ॥২২

যুধিষ্ঠির! তাহার পর আবার সুরভি তপস্যা করিয়া বহুতর গো প্রসব করেন, ব্রহ্মা ইন্দ্রাদি লোকপালগণকে যে সকল গো দান করেছিলেন ॥ ২৩

সুষ্ঠুতা, কপিলা, যশস্বিনী রোহিণী এবং কামরূপিণী সৰ্ব্বকামদুহা—এই চারটি গোকন্যাকে দেবগণের নিমিত্ত সুরভি পুনরায় প্রসব করেছিলেন ॥ ২৪

এই চারটি গো বিশেষ শুদ্ধি উৎপাদন করতো এবং তারা তৎকালে সকলেরই প্রশংসার পাত্রী ছিল, সেই পূর্বকালে যাদের বৎসগণ জন্ম নিয়ে উত্তম অমৃত (অমৃত তুল্য দুগ্ধ) পান করতো ॥ ২৫

ব্রহ্মা মহাত্মা দেবরাজ ইন্দ্রকে সুষ্ঠুতা, ধর্মরাজকে কপিলা, বরুণকে রোহিণী এবং রাজা কুবেরকে সর্বকামদুঘা ধেনু দান করেছিলেন। সুরভিতনয়া জগৎপূজিতা এই চারটি ধেনু বিখ্যাত ॥ ২৬-২৭

মুনিশ্রেষ্ঠ যুধিষ্ঠির! এই চারটি ধেনুর সন্তানে পৃথিবী পরিপূর্ণ হয়েছে । এই জগতে যা কিছু শোভন কাৰ্য্য আছে, তা গো হতেই উৎপন্ন হয় ॥ ২৮

________________________________________________


(প্রশ্নকারী)

৮. শাস্ত্র কি গরুর মাংস খাওয়ার অনুমতি দেয় ? 

উত্তরদাতা -

শ্রী নন্দীনাথ শৈবাচার্য জীর উত্তর —

উত্তর রয়েছে সনাতন ধর্মের শাস্ত্র ‘মহাভারত’ -এর অনুশাসন পর্বে, দেখুন 👇

ন চাসাং মাংসমশ্নীয়াদ্ গবাং .. ॥ ১৭

[তথ্যসূত্র : মহাভারত/অনুশাসন পর্ব/৬৩ অধ্যায়]

✅ অর্থ — গোমাংস (অর্থাৎ গরুর মাংস) কখনোই ভক্ষণ করবে না ॥ ১৭


স্মৃতি শাস্ত্র থেকে, দেখুন 👇 

গোমাংস মানুষঞ্চৈব শুনোহস্তাৎ সমাহিতম্ ।

অভক্ষ্যমেতৎ সর্বন্তু ভুক্ত্বা চান্দ্রায়ণং চরেৎ ॥ ১৯৫

[তথ্যসূত্র - সংবর্ত সংহিতা/১৯৫ নং শ্লোক]

✅ অর্থ — (অজ্ঞাত হয়ে) গোমাংস, মনুষ্যের মাংস, এবং কুকুরের হস্ত হতে আহৃত যে দ্রব্য, এ সকল অভক্ষণীয়, এগুলি ভক্ষণ করলে চান্দ্রায়ণ ব্রত দ্বারা প্রায়শ্চিত্ত করবে ॥ ১৯৫


ধেন্বনডুহৌ চ ॥ ৩০

[তথ্যসূত্র - গৌতম সংহিতা/অধ্যায় ১৭/৩০ শ্লোক]

✅ অর্থ — গরু, অনডুহ (ষাঁড়) এ সকলের মাংস ভক্ষণ করবে না ॥ ৩০


লশুনপলাণ্ডুগৃঞ্জনৈতদ্গন্ধিবিড়্ বরাহ গ্রাম্যকুক্কুটবানরগোমাংসভক্ষণে চ ॥
সর্বেষ্বেতেষু দ্বিজানাং প্রায়শ্চিত্তান্তে ভূয়ঃ সংস্কারং কুর্যাৎ ॥

[তথ্যসূত্র — বিষ্ণু সংহিতা/অধ্যায় ৫১/৩-৪ শ্লোক]
✅ অর্থ — সকল দ্বিজগণ শুনুন ! লশুন, পলাণ্ডু, গৃঞ্জন, এতদগন্ধি (অর্থাৎ লশুনাদি গন্ধযুক্তদ্রব্য) বিড়বরাহ, গ্রাম্য-কুক্কট, বানর এবং গো মাংস ভোজনেও  প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে ॥ ৩-৪


অমেধ্যরেতো গোমাংসং চাণ্ডালন্নমথাপি বা ।

যদি ভুক্তং তু বিপ্রেণ কৃচ্ছ্রং চান্দ্রায়ণং চরেৎ ॥ ১

[তথ্যসূত্র — পরাশর সংহিতা/অধ্যায় ১১/১ শ্লোক]

✅ অর্থ — হে বিপ্র গণ শুনুন ! যদি কেউ অপবিত্র রেতঃ, গোমাংস বা চন্ডালের অন্ন গ্রহণ করেন, তাহলে কৃচ্ছ চান্দ্রায়ণ ব্রত আচরণ করে প্রায়শ্চিত্ত করবে ॥ ১


গো নর অশ্বখরোষ্ট্রাণাংছত্রকং গ্রামকুক্কুটম্ ॥ ১৫

মাংসং জগ্ধ্বা কুঞ্জরস্য তপ্তকৃচ্ছ্রেণ শুধ্যতি ।..॥ ১৬

[তথ্যসূত্র — অগ্নি পুরাণ/অধ্যায় ১৬৮/১৫-১৬ শ্লোক]

✅ অর্থ — গো, নর, অশ্ব, উষ্ট্র, গ্রাম্য কুক্কট ও হস্তী ইহাদের মাংসাদি ভক্ষণ করলে, তপ্ত কৃচ্ছের অনুষ্ঠান দ্বারা শুদ্ধিলাভ হয়ে থাকে ॥ ১৫-১৬


ভুঞ্জানো মানবং মাংসং গোমাংসং জ্ঞানতঃ শিবে ! ।

উপোষ্য পক্ষং শুদ্ধঃস্যাৎ প্রায়াশ্চিত্তমিদং স্মৃতম্ ॥ ১২৫

[তথ্যসূত্র — মহানির্বাণ তন্ত্র/১১তম উল্লাস/১২৫ শ্লোক]

✅ অর্থ — হে শিবে! যদি কোন ব্যক্তি জ্ঞানপূর্ব্বক মনুষ্যমাংস ও (অজ্ঞানপূর্বক) গোমাংস ভক্ষণ করে, তা হলে একপক্ষ উপবাস করে সে ব্যক্তি শুদ্ধ হবে,—এই তার প্রায়শ্চিত্তের এক উপায় ॥ ১২৫


চান্দ্রায়ণং পরাকং বা গাং হত্বা তু প্রমাদতঃ ।

মতিপূর্ববধে চাস্যাঃ প্রায়শ্চিত্তং ন বিদ্যতে ॥৬২

[তথ্যসূত্র : কূর্মপুরাণ/উপরিভাগঃ/অধ্যায় ৩২]

✅ অর্থ — অজ্ঞানবশত (না জেনে) গরু হত্যা করলে চান্দ্রায়ণ বা পরাক ব্রত করে প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে।

কিন্তু জ্ঞানপূর্বক(জেনে বুঝে ইচ্ছা করে) গরু হত্যা 

করলে সেই পাপের থেকে ক্ষমা পাবার মতো 

প্রায়শ্চিত্তের কোনো উপায়‌ নেই ॥ ৬২


♦️ অন্তিম প্রমাণ সর্বশাস্ত্রের সিদ্ধান্ত স্বরূপ সাক্ষাৎ মহাশ্রুতিশৈব আগম’ শাস্ত্র থেকে দেখুন 👇 

কৃতঘ্নো ব্রহ্মহা গোঘ্নো দৃষ্ট্বা ধ্বজ নিবেশনম ॥ ৯৫

প্রাপ্নোতি পাপনির্মোক্ষং মখকর্তুঃ কুলদ্বয়ম ।..॥ ৯৬

[তথ্যসূত্র — (মহাশ্রুতি)উত্তর কামিকাগম/ষষ্ঠ পটল/৯৫-৯৬ নং মহামন্ত্র]

✅ অর্থ — যে অকৃতজ্ঞ, ব্রাহ্মণহত্যাকারী এবং গোহত্যাকারী, তারা যখন যজ্ঞের স্থানে গ্রথিত থাকা বৃষভধ্বজ(বৃষভপতাকা) দর্শন করে বা সেই যজ্ঞস্থলে উপস্থিত হয়ে সম্মিলিত হয়, তখন তারা পাপমুক্ত হয় এবং যজ্ঞকর্তার দুই কুলেরও পাপ মোচন হয় ॥ ৯৫-৯৬


ব্যাখ্যা : এই মহামন্ত্রে ধর্মীয় ও সামাজিক বিধানের বিষয়ে এখানে বলা হচ্ছে, যথাসময়ে বৃষ্টি হলে শস্য ভালো হয়, ধার্মিক রাজা বিজয়ী হন এবং সমাজে শান্তি ও সমৃদ্ধি বজায় থাকে। সেইসঙ্গে, যজ্ঞের মহিমা বর্ণনা করা হয়েছে যেখানে যজ্ঞের ধ্বজা বা পতাকা বৃষভধ্বজ দর্শনের মাধ্যমে গুরুতর পাপ (যেমন ব্রাহ্মণহত্যা, গোহত্যা) করা ব্যক্তিও পাপমুক্ত হতে পারে। যজ্ঞের প্রভাবে যজ্ঞকর্তার দুই কুলেরও পাপ থেকে মুক্তি ঘটে।

________________________________________________


(প্রশ্নকারী)

৮. শিবের বাহন বৃষভ-নন্দীকে সাক্ষাৎ ধর্ম বলেন কেন ? 

উত্তরদাতা -

শ্রী নন্দীনাথ শৈবাচার্য জীর উত্তর —

উত্তর রয়েছে সনাতন ধর্মের শাস্ত্র ‘শিবমহাপুরাণ’ -এর বিদ্যেশ্বর সংহিতার ১৭ তম অধ্যায়ের ৮৫ থেকে ৮৭ নং শ্লোকে, দেখুন 👇

 তদূধর্বং “বৃষভো ধর্মো” ব্রহ্মচর্যস্বরূপধৃক্।

সত্যাদিধর্মযুক্তস্ত শিবলোকাগ্ৰর্তঃ স্থিতঃ ।।৮৫

ক্ষমাশৃঙ্গঃ শমশ্রোত্রো বেদধ্বনি বিভূষিতঃ।

আস্তিক্যচক্ষুর্নিশ্বাস গুরুবুদ্ধিমনা বৃষঃ।।৮৬

তং ক্রিয়া বৃষভং ধর্মং কালাতীতোহ ধিতিষ্ঠতি।।৮৭

(তথ্যসূত্র:-শিব মহাপুরাণ/ বিদ্যেশ্বর সংহিতা/অধ্যায় নং ১৭)


✅ অর্থ —

     ঊর্ধ্বে “বৃষভ নন্দীরূপী যে ধর্ম” রয়েছে, তা ব্রহ্মচর্য (অর্থাৎ দশ লক্ষণযুক্ত) এর মূর্ত প্রতীক। তার চার পদ (অর্থাৎ চার পা) হল সত্য অর্থাৎ জ্ঞান, ক্রিয়া, চর্যা ও যোগ। এই ধর্ম বৃষভ সাক্ষাৎ শিবলোকের দ্বারে অবস্থিত। তার শিং হলো- ক্ষমা, কান হলো-শম, তার গলার ঘন্টা হলো-বেদধ্বনি, চক্ষু দুটি আস্তিকতা, তার শ্রেষ্ঠ বুদ্ধি ও মন হলো-বিশ্বাস। এই ক্রিয়া ইত্যাদি ধর্মরূপী বৃষভ নন্দী, তিনি কারণের আদিতে অবস্থিত বলে অবগত হওয়া উচিত। এই ধর্মবৃষভ নন্দীর উপর কালের অতীত সেই পরমেশ্বর শিব আরোহন করে অধিষ্ঠিত আছেন।

আরো দেখুন 👇 

ধর্মরূপবৃষো ॥

 (তথ্যসূত্র - শ্রীস্কন্দমহাপুরাণ/ সূতসংহিতা/ মুক্তিখণ্ড/ চতুর্থ অধ্যায় /শ্লোক ৪২)

✅ অর্থ — সনাতন ধর্মের সাক্ষাৎ রূপ হলেন বৃষভ অর্থাৎ শিববাহন নন্দী মহারাজ।


শাস্ত্র প্রমাণ সহ প্রমাণিত হলো নন্দী মহারাজ হলেন সাক্ষাৎ সনাতন ধর্ম সেই ধর্মের উপর পরমেশ্বর শিব আরোহন করেন (চড়ে বসেন), পরমেশ্বর শিব সনাতন ধর্মের প্রকাশ করেছেন। তাই সনাতন ধর্মকে শিবধর্ম বা শৈবধর্ম বলা হয়।

মনুসংহিতায় উল্লেখিত ধর্মের ১০টি লক্ষণ সম্পূর্ণ ভাবে নন্দী মহারাজের মধ্যে সাঙ্কেতিক আকারে অবস্থিত। তাই শিববাহন বৃষভ নন্দী মহারাজ হলেন — সাক্ষাৎ সনাতন ধর্ম। 


🔥 সিদ্ধান্ত —

(১) পরমেশ্বর শিবের কাছেই আশ্রিত গোমাতা ও তার সন্তানেরা,

(২) গোমাতারা পরমেশ্বর শিবের আরাধনার বিভিন্ন উপাচারের জোগান দেবার জন্য‌ই উৎপন্ন হয়েছেন, এছাড়াও দেবতাদের উদ্দেশ্যে হবি হিসেবে ঘৃতের অভাব পূরণ হয়ে যায় ,

(৩)  পরমেশ্বর সদাশিবের আদেশে গোলোকে গোমাতাদের দেখাশোনা করবার দায়িত্ব পালন করেন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ,

(৪) সনাতন ধর্মের ধ্বজাতে স্বয়ং শিববাহন বৃষভ নন্দী থাকেন,

(৫) গোহত্যা বা গরুর মাংস ভক্ষণ সনাতন ধর্মে নিষিদ্ধ , একথা স্বয়ং মহাশ্রুতি শৈব আগম শাস্ত্র নির্দেশ করেছে।


সুতরাং, সনাতন ধর্মে গোমাতার সম্মান ও শ্রদ্ধা সম্পূর্ণটাই পরমেশ্বর শিবের সহিত অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। যারা পরমেশ্বর শিবের নিন্দা করে গোমাতাদের প্রতি ভক্তি বা শ্রদ্ধা দেখায় তারা হল ছদ্মবেশী বকধার্মিক। পরমেশ্বর শিবের সাথের সনাতন ধর্মের সমস্ত রকম মান্যতা যুক্ত রয়েছে। তাই গোমাতা দের যারা শ্রদ্ধা করেন তাদের উচিত গোমাতাদের আশ্রয়দাতা পরমেশ্বর শিবের ভজনা করা। 

এবিষয়ে যারা সঠিক সঠিক প্রচার করেন, তারাই প্রকৃত ধার্মিক, যারা এই বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে প্রচার করে তারা ছলনাকারী। সুতরাং সত্য প্রচার করুন, সত্য মেনে চলুন, সত্য ই পরম ধর্ম, আর ধর্ম‌ই সনাতন ।

🔶 বেদ শাস্ত্রে গোমাংস ভক্ষণ আছে কি না সে বিষয়ে যাবতীয় সংশয় নিরসন করা হবে আগামীতে, অপেক্ষা করুন। 

শ্রীবৃষভবাহন নন্দী মহারাজের জয়

শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্ 🚩 

ॐ নমঃ পার্বতীপতয়ে হর হর মহাদেব 🚩 

✍️ লেখনীতে — শ্রী নন্দীনাথ শৈব আচার্য জী 

কপিরাইট ও প্রচারে — SHIVALAYA 

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ