যোগ শব্দের ভুল অর্থ বানিয়ে শাস্ত্রের অপব্যাখ্যা করা বৈষ্ণবদের দাবীর খণ্ডন ও শিব পরমত্ত্ব প্রমাণ



⚠️যোগের ভুল অর্থ করে শাস্ত্রের ভুল বিশ্লেষণ করা রামানুজী বৈষ্ণবদের মিথ্যাচারের খণ্ডন মণ্ডণ ও শিবপরমত্ত্ব প্রমাণ —

মহাভারতের আশ্বমেধিক পর্ব্বে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছে “তৎকালে আমি যোগযুক্ত হয়ে জ্ঞান টা তোমাকে দিয়েছিলাম” অর্থাৎ সেইসময় যোগযুক্ত ছিলাম। অর্থাৎ পরব্রহ্মের সাথে সংযুক্ত থেকে ব্রহ্মপদে স্থিত হওয়া। 

কিন্তু বৈষ্ণবদের দাবী হলো শ্রীকৃষ্ণ যেহেতু নিজেই ব্রহ্ম তাহলে উনি কেনই বা যোগযুক্ত হবেন। এমনকি যোগের এমন অর্থ বের করেছে তা মূলত হাস্যকর। বৈষ্ণবদের অনুযায়ী যোগযুক্ত বলতে একগ্রতাযুক্ত বোঝাচ্ছে।

অর্থাৎ পুরো ব্যাপার টা এমন দাড়াচ্ছে যে, শ্রীকৃষ্ণ একাগ্রতাযুক্ত হয়ে পরব্রহ্মের বিষয়ে বলেছিলেন।

কিন্তু আসলেই শাস্ত্রের মূল অর্থ কি এটাই বোঝাচ্ছে?

বিষয়টা এমন হয়ে গেলো না যে— “পরং হি ব্রহ্ম কথিতং যোগযুক্তেন তন্ময়া” অর্থাৎ তৎকালে আমি একাগ্রতাযুক্ত হয়ে পরব্রহ্মের বিষয়ে বলেছিলেন!!

এবার যদি ভারতকৌমুদীর টীকা দেখি তাহলে— “যোগযুক্তেন ঐক্যাগ্রসমন্বিতেন” অর্থ করলে দাঁড়ায় যে— একাগ্রতার সহিত যোগযুক্ত থাকা। 

অর্থাৎ মূল সঠিক অর্থ হচ্ছে পরব্রহ্মের সাথে একাগ্রতার সহিত যোগযুক্ত থাকা। পরমাত্মার সাথে জীবাত্মার যে সংযোগ স্থাপন তাকেই যোগ বলা হচ্ছে। এবং যোগের মাধ্যমে ব্রহ্মপদে উন্নীত হয়ে, নিজেই ব্রহ্ম স্বরূপে(হিসেবে) স্থিত হওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে যে, দেহ কখনোই ব্রহ্ম বলে স্বীকৃত হয় না, আমি বলতে দেহের মধ্যে থাকা আত্মা কে ব্রহ্ম বলা হচ্ছে ।


👉এবার দেখে নেওয়া যাক শাস্ত্র যোগ নিয়ে কি বলছে—

যোহপান প্রাণয়োরৈক্যং স্বরজোরেতসোস্তথা।

সূর্য্যাচন্দ্রমসোর্যোগো জীবাত্মপরমাত্মনোঃ ॥৬৮

এবং তু দ্বন্দ্বজালস্য সংযোগো যোগ উচ্যতে।

অথ যোগশিখাং বক্ষ্যে সর্ব্বজ্ঞানেষু চোত্তমাম্ ॥৬৯

[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/যোগশিখা উপনিষদ/১ম অধ্যায়]

অনুবাদঃ— প্রাণ ও অপানের ঐক্য, নিজের রজঃ (গুদদেশস্থ রক্তবর্ণ শক্তি) ও রেতের (তালুস্থশুক্লবর্ণ শক্তির) মিলন, সূর্য্য (নাভিস্ত উগ্র তেজঃ) ও চন্দ্রের (তালুস্থ শীতল তেজের) সংযোগ, এবং জীবাত্মা ও পরমাত্মার মিলনরূপ দ্বন্দ্বসমূহের (দুই দুইটার) যে একত্রীকরণ, তাহাই যোগ বলিয়া কথিত (অর্থাৎ যাহাতে দ্বৈতভাব রহিত হয় (হঠ) এবং যাহা অদ্বৈতাবস্থা (রাজ), তাহাই যোগ।।৬৮-৬৯।।

টীকাকার বলছেনঃ— যোগঃ, জীবাত্মপরমাত্মনোঃ চ যোগঃ: এবং (এতদ্রূপং) তু দ্বন্দ্বজালস্য (দ্বয়োঃ দ্বয়োন্ট) সংযোগ মিলনং) যোগঃ উচ্যতে (যেন দ্বৈতাভাবঃ ভবতি, যা চ দ্বৈতাহীনাবস্থা স এব যোগঃ ইতি ভাবঃ)

যোগ অর্থ পরস্পর সংযোজন [নিঘন্টু/১/১/৩]

"যোগায় রথ্যাঃ অশ্বাঃ" রথের সহিত অশ্বের সংযোজন।

স্কন্দ স্বামী কতৃক টীকাঃ— "রথে যোগাত্মনঃ ইতি রথ্যাসঃ" অশ্বগণ নিজের সাথে রথ সংযোজন করেন বলেই রথ্য। "রথ্য" শব্দের অর্থ বাহক বা চালক, অর্থাৎ যিনি রথের অধিপতি [নিঘন্টু/১০/৩/৩]

যেমনটা শ্রুতিতে বলা আছে যে, রথকে শরীর ও রথের অধিপতিকে রথের স্বামী বলে জানবে। অর্থাৎ শরীর এবং জীবাত্মাকে বোঝানো হচ্ছে [কঠ উ:/১/৩/৩] 

অর্থাৎ পরিস্কার ভাবে বোঝা যাচ্ছে যে, পরস্পর বস্তুর সংযোজন কেই যোগ বলা হচ্ছে। যেমনটা শাস্ত্রে বলা আছে, জীবাত্মার সাথে পরমাত্মার সংযোজন কেই যোগ বলা হচ্ছে। অর্থাৎ ধ্যানের মাধ্যমে ঈশ্বরের সাথে যুক্ত হওয়া, জীবাত্মার সাথে পরমাত্মার একাত্মতা করিয়ে নিজেকেই ব্রহ্মস্বরূপে স্থিত করা

“যস্মিন্ কালে স্বমাত্মানং যোগী জানাতি কেবলম্।

তস্মাৎ কালাৎ সমারভ্য জীবন্মুক্তো ভবেদসৌ” ॥ ৪২

[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/বরাহ উপনিষদ- দ্বিতীয় অধ্যায়]

অর্থ — যোগী যৎকালে কেবল আত্মস্বরূপ অবগত হন, তৎকাল হইতে তিনি জীবন্মুক্ত বলিয়া কথিত হন।।৪২।। 

জীবন্মুক্ত অর্থাৎ শরীর থাকতেও মুক্ত, সাক্ষাৎ ব্রহ্ম অবস্থা (অহং ব্রহ্মাস্মী), (অয়মাত্মা ব্রহ্ম) (শিবোহম্‌) আর শ্রুতি ও ন্যায় শাস্ত্র মতে ইহা দৃষ্টান্তের লক্ষণ, আর দৃষ্টান্তের কোনো খণ্ডন হয় না।


বৈশেষিক দর্শনেও মহর্ষিকণাদ ও এক‌ই কথার সমর্থন করেছেন —

আত্মন্যাত্মমনসোঃ সংযোগবিশেষাদাত্মপ্রত্যক্ষম্ ॥ ১১

[বৈশেষিক দর্শন- ৯ম অধ্যায়- ২য় আহ্নিক- সূত্র নং- ১১]

অনুবাদ — আত্মা এবং মনের সংযোগবিশেষ (যে) আত্মস্থ হয় বলিয়া আত্ম-সাক্ষাৎকার (হইয়া থাকে)।।১১

ব্যাখ্যা — যে আত্মমনঃসংযোগ যোগ নামে অভিহিত, তাহাই আত্মা ও মনের সংযোগ- বিশেষ। সেই সংযোগ অর্থাৎ সেই যোগযুক্তমনঃসংযোগ সকল আত্মার এবং ঈশ্বরেরও থাকে, এইজন্য সকল আত্মা ও ঈশ্বরের সাক্ষাৎকার পাওয়া যায়।।১১।।


👉 যোগ কি তা নিয়ে মহাভারতে বলা আছে —

তৈশ্চাত্মা সততং জ্ঞেয় ইত্যেবমনুশুশ্রুম ।

ব্রতং হ্যহীনমনসো নান্যখেতি বিনিশ্চয়ঃ ॥ ১২ ॥

বিমুক্তঃ সর্ব্বসঙ্গেভ্যো লঘ্বহিরো জিতেন্দ্রিয়ঃ ।

পূর্ব্বরাত্রেহপররাত্রে ধারয়ীত মনোত্মনি ॥ ১৩ ॥

স্থিরীকৃত্যেন্দ্রিয়গ্রামং মনসা মিথিলেশ্বর ।

মনো বুদ্ধ্যা স্থিরং কৃত্বা পাষাণ ইব নিশ্চলঃ ॥ ১৪ ॥

স্থাণুবচ্চাপ্যকল্পঃ স্যাদ্গিরিবচ্চাপি নিশ্চলঃ ।

বুধা বিধিবিধানজ্ঞাস্তদা যুক্তং প্রচক্ষতে ॥ ১৫ ॥

[মহাভারত- শান্তিপর্ব- অধ্যায়- ২৯৮]

অর্থ — আমরা গুরুর নিকট এইরূপ শুনিয়াছি যে, মানুষ এইরূপ প্রাণায়াম করিয়া পরব্রহ্মকে জানিতে পারে এবং ধ্যানযুক্তচিত্ত যোগীর ইহাই ব্রত। এতদ্ভিন্ন অন্য প্রকার ব্রত নাই, ইহা বিশেষ নিশ্চয় ॥১২॥

যোগী সমস্ত সংসর্গ হইতে বিমুক্ত থাকিয়া, লঘুভোজী ও জিতেন্দ্রিয় হইয়া, রাত্রির প্রথম ভাগে বা শেষ ভাগে পরমাত্মাতে মন স্থাপন করিবেন।।১৩

মিথিলেশ্বর! মানুষ যখন মনদ্বারা অন্য ইন্দ্রিয়সমূহকে স্থির করিয়া বুদ্ধিদ্বারা আবার সেই মনকে অচল করিয়া, পাষাণের ন্যায় নিশ্চল, স্থাণুর তুল্য নিষ্পন্দ এবং পর্বতের ন্যায় অচল হয়; তখনই মুনিরা তাঁহাকে যোগযুক্ত বলেন।। ১৪-১৫৷।

👉অর্থাৎ স্পষ্ট ভাবে যোগ অর্থ বোঝায় যাচ্ছে যে, জীবাত্মার সাথে পরমাত্মা একত্রিত মিলন। ঈশ্বরের সাথে সংযুক্ত হওয়াকেই যোগ বলছে শ্রুতি শাস্ত্রে। পরমাত্মার সাথে একগ্রতার সাথে ধ্যানের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে ব্রহ্মপদে নিজেকে স্থিত করায় হলো যোগ। যেখানে সাধক নিজেই সাক্ষাৎ ব্রহ্মস্বরূপত্ত্বে উন্নিত হয়ে যান। যেমনটা শ্রীকৃষ্ণ পরমেশ্বর শিবের সাথে একাগ্রতার সহিত সংযুক্ত হয়ে নিজেই শিবস্বরূপে উন্নিত হয়ে গীতার জ্ঞান প্রদান করেছিলেন। 


👉যোগের নিয়মের ক্ষেত্রে কি বলা আছে তাও একবার দেখে নেব —

যদানুধ্যায়তে মন্ত্রং গাত্র কম্পোহথ জায়তে।

আসনং পদ্মকং বন্ধা যচ্চান্যদপি রোচতে ॥৭০

নাসাগ্রে দৃষ্টিমারোপ্য হস্তপাদৌ চ সংযতৌ।

মনঃ সর্বত্র সংগৃহ্য ওঁকারং তত্র চিন্তয়েৎ ॥৭১

[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/যোগশিখা উপনিষদ/১ম অধ্যায়]

অনুবাদঃ— যদি মন্ত্র অনুধ্যান (একাগ্রতার সহিত নিরন্তর চিন্তা) করা হয়, তবে গাত্র- কম্প জন্মে (অর্থাৎ গুরূপদিষ্ট কোন অক্ষর বা রূপ একাগ্রতার সহিত ধ্যান করিলে কুণ্ডলিনী জাগ্রত হইয়া বায়ু সঞ্চালন করে, তৎপর বায়ু দ্বারা শরীর কম্পিত হয়। ইহা যোগদীক্ষার চিহ্ন)। তৎসম ক্রমে পদ্মাসন অথবা অন্য যে কোন আসন রুচিকর হয়, তাহা রচনা করিয়া নাসাগ্রে। এখানে ভ্রুমধ্যে (শিবনেত্রে বা আবৃত চক্ষুতে) দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া হস্ত ও পদ সংযত করিয়া (বদ্ধপদ্মাসন প্রণালীতে, অথবা অন্যরূপে হস্ত পদ নিশ্চল করিয়া), সমস্ত স্থান হইতে মনকে প্রত্যাহৃত করতঃ তথায় (ভ্রুমধ্যে) ॐ-কারের চিন্তা করিবে।।৭০/৭১।।

টীকাকার বলছেনঃ— যদা (যদি) অনুধ্যায়তে (সাততোন একাগ্রতয়া চ মনসা এব চিন্তয়তি, ন তু ধচসা উচ্চৈনীচৈব।


👉বৈষ্ণবরা যে শাস্ত্রের ভুল ব্যাখ্যা করে বলছে শ্রীকৃষ্ণ একগ্রতার সহিত জ্ঞান দিয়েছিলো। কিন্তু শাস্ত্রের সঠিক অর্থ বের করে তো দেখা যাচ্ছে যে, সাধকের একগ্রতার সাথে পরমাত্মার ধ্যান করার কথায় দেখা যাচ্ছে। 

এবং ওঁকারের ধ্যান করার জন্যই শাস্ত্রে নির্দেশ দিচ্ছে। শ্রুতি শাস্ত্রে সাক্ষাৎ ওঁকার কাকে বলা হচ্ছে তাও স্পষ্ট করায় আছে —

প্রযতঃ প্রণবো নিত্যং পরমং পুরুষোত্তমম্ ।

ওঙ্কারং পরমাত্মনং তন্মে মনঃ শিবসংকল্পমস্ত” ॥ ২০ ॥

[ঋগ্বেদ সংহিতা/খিলানি/চতুর্থ অধ্যায়/১১ নং খিলা]

👉ব্যাস সংহিতার ১ম অধ্যায়ের ৪নং শ্লোক অনুসারে শ্রুতির বচনই সর্বোচ্চ। 

আর সাক্ষাৎ শ্রুতিই বলছে যে— পরমেশ্বর শিবই হলো সাক্ষাৎ ওঁকার। অর্থাৎ প্রত্যেক সাধকের কর্তব্য একাগ্রচিত্তে ওঁকাররূপী পরমেশ্বর শিবের ধ্যান করা। এবং শিব অবস্থাতে উন্নিত হওয়া, যা  “শিবোহম” “অহং ব্রহ্মাস্মী” “অয়মাত্মা ব্রহ্ম” স্থিতি। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে শিব মহাপুরাণের কৈলাস সংহিতার ১৭-১৯ অধ্যায় পড়ুন ।


👉যোগের অন্তিমে সাধক যখন পৌঁছে যায়, সেই সময় নিয়ে শ্রুতি শাস্ত্রে বলা হয়েছে —

কর্তব্যং নৈব তস্যাস্তি কৃতেনাসৌ ন লিপ্যতে।

জীবন্মুক্তঃ সদা স্বচ্ছঃ সর্বদোষবিবর্জিতঃ ॥৪৭

[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/যোগশিখা উপনিষদ/১ম অধ্যায়]

টীকাকার বলছেননঃ— তস্য (যোগিনং) কর্তৃব্যং ন এব (নিশ্চিতং) অস্তি। অসৌ (যোগী) কৃতেন কৰ্ম্মণা ন লিপ্যতে (সর্ব্বস্মিন্ ব্রহ্মস্বরূপদর্শনাৎ কৰ্ম্মণঃ ফলভাগ ন ভবেৎ যঃ সজীবন্মুক্তঃ (জীবন অপি মুক্তঃ; দেহে সতি ন সুখদুঃখৈঃ বিচাল্যতে তার্থঃ), সদা স্বচ্ছঃ নিৰ্ম্মলান্তঃকরণঃ), সর্ব্বদোষবিবর্জিতঃ (কামক্রোধাদিদোষরহিতঃ) চ ভধতি।

অনুবাদ — তাঁহার (যোগীর) কোন কর্ত্তব্য নাই (কারণ কর্ম্মের উদ্দেশ্য ব্রহ্মজ্ঞান তাঁহার লাভ হইয়াছে)। জীবন্মুক্ত, সর্ব্বদা নির্মূলান্তঃ- করণ এবং কামাদিসর্ব্বদোষরহিত যোগী কর্ম করিয়াও তাহার ফলে লিপ্ত হন না (কেননা তিনি সমস্তই ব্রহ্মরূপে দেখেন, এবং কোন উদেশ্য লইয়া কৰ্ম্ম করেন না, আর সুখদুঃখে বিচলিত হন না)।।৪৭।।

👉অর্থাৎ ব্রহ্মপদে স্থিত হওয়ার পর জীব সাক্ষাৎ শিব হয়ে যায়। জীবন থাকতেও নশ্বর শরীর থেকে মুক্ত থাকেন। তাই শ্রীকৃষ্ণকে জীবন্মুক্ত বলা হয়। কারণ তার আত্মাজ্ঞান ছিলো যে আত্মাটাই সাক্ষাৎ শিব। এবং যিনি শিবপদে উন্নিত হয়ে যান তার কোনো কর্তব্যের বেড়াজাল থাকে না। তিনিই নিজেই সাক্ষাৎ অকর্তা হয়ে যায়। যেমনটা ভগবদ গীতার ৪র্থ অধ্যায়ের ১৩ নং শ্লোকে বলা হচ্ছে যে, “গুণ এবং কর্ম অনুসারে ঈশ্বর চারবর্ণ সৃষ্টি করেছে কিন্তু, ঈশ্বর অকর্তা ও অব্যয়”। 

আত্মা যখন শরীর৷ ধারণ করার পর মন,বুদ্ধি, অহংকারের সাথে একত্রিত হয় তখন, আত্মা নিজের অস্তিত্ব ভুলে গিয়ে শরীরকেই আত্মার অস্তিত্ব ভাবতে থাকে এবং বিভিন্ন ভালো-মন্দ কাজের বেড়াজালে আটকে যায়। অর্থাৎ জীবাত্মা মায়া দ্বারা আবদ্ধ হয়ে সংসারের বন্ধনে আবদ্ধ হয়। কিন্তু যখন মায়া থেকে মুক্ত হয়ে যায় তখন জীব সাক্ষাৎ শিব হয়ে যায়। শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন যোগেশ্বর, তিনি সাক্ষাৎ শিবপদে উন্নিত হয়েই অর্জুনকে জ্ঞান দিয়েছিলেন, এবং শিবেরূপ প্রকট করেছিলেন। 


👉তন্ত্র শাস্ত্রেও একি কথার সমর্থন পাওয়া যায়—

পরমার্থং ন জানন্তি পশুপাশনিয়ন্ত্রিতাঃ ।। ৮৭ ।।

[কূলার্ণব তন্ত্র- ১ম উল্লাস]

অর্থ — পাশ-শৈব-শাক্ত শাস্ত্রে পশু শব্দ পারিভাষিক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। শৈবশাস্ত্র অনুসারে জীবন্মুক্তদের বাদ দিয়ে চেতনাবান্ আর সবাই পশু। ব্রহ্মা থেকে আরম্ভ করে তির্যগ পর্যন্ত সব জীবই পশু। উক্ত শাস্ত্রে বলা হয়েছে, পুরুষ পশু আর প্রকৃতি পাশ। পাশবদ্ধ পুরুষ পশু। পুরুষ আত্মা, প্রকৃতি মায়া। মায়াবৃত আত্মা পুরুষ বা পশু। সহজ করে বলা যায়, পাশবদ্ধ জীব পশু। পাশমুক্ত জীব শিব।

পাশবদ্ধঃ স্মৃতো জীবঃ পাশমুক্তঃ সদাশিবঃ(কুলার্ণবতন্ত্র ৯/৪২)।।

অর্থ — শাস্ত্র অনুসারে পশুভাবাপন্ন সাধক পশু। এই পশু পাশবদ্ধ জীব। এখানেও পাশবদ্ধ জীব পশু, পাশমুক্ত জীব সদাশিব।


👉শ্রুতিতেও একই কথার সমর্থন পাওয়া যায় —

এবং বদ্ধস্তথা জীবঃ কর্মনাশে সদাশিবঃ।

পাশবদ্ধস্তথা জীবঃ পাশমুক্তঃ সদাশিবঃ ॥৭॥

[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/স্কন্দ উপনিষদ/৭ নং মন্ত্র]

অর্থঃ— এই প্রকারে মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ থাকা (জীবাত্মা) জীব এবং সে (প্রারব্ধ) কর্ম (ফল) নষ্ট হলে সদাশিব হয়ে যায়। অথবা অন্য প্রকারে এটি এভাবে বলা যায় যে, পাশযুক্ত 'আত্মা'কে জীব বলা হয় এবং পাশমুক্ত ঐ জীবাত্মা সদাশিব হয়ে যায় ॥৭


👉জীব নিজেকে শিব অবস্থাতে উন্নিত করার একটা মাধ্যম হলো যোগ। একাগ্রচিত্তে ধ্যানের মাধ্যমে পরমাত্মার সাথে সংযুক্ত হয়ে নিজেকেই ব্রহ্মস্বরূপে স্থির করাটায় যোগের উদ্দেশ্য। আর যোগের যারা অভ্যাস করে তাদের বলা হয় যোগী। আর যে যোগী নিজেকে ব্রহ্মপদে স্থিত করেছেন তিনি হয়ে যায় জীবন্মুক্ত। অর্থাৎ জীবাত্মা নশ্বর শরীর থেকে মুক্ত হয়ে ব্রহ্মস্বরূপ হয়ে যান। 

এবং একই কথার সমর্থন মহাভারতেও রয়েছে —

রাগং মোহং তথা স্নেহং কামং ক্রোধঞ্চ কেবলম্।

যোগাচ্ছিত্ত্বা ততো দোষান্ পঞ্চৈতান্ প্রাপ্ত বন্তি তৎ ॥১১৷৷

যথৈবানিমিষাঃ স্থূলা জালং ছিত্ত্বা পুনর্জলম্।

প্রাপ্প বস্তি তথা যোগাস্তৎপদং বীতকল্মষাঃ ॥১২৷৷

[মহাভারত- শান্তিপর্ব- অধ্যায়- ২৯৩]

অর্থ — ভীষ্ম বলিলেন-'মানুষ যোগবলে প্রবল রাগ, মোহ, স্নেহ, কাম ও ক্রোধ এই পাঁচটা দোষ বিনষ্ট করিয়া সেই ব্রহ্মপদ লাভ করে ॥১১।।

বলবান্ মৎস্যগণ যেমন জাল ছেদন করিয়া পুনরায় জল প্রাপ্ত হয়, তেমন যোগীরা যোগের গুণে সমস্ত পাপ নষ্ট করিয়া, সেই ব্রহ্মপদ প্রাপ্ত হইয়া থাকেন ॥১২।।


👉পরবর্তী প্রমাণে আমরা যোগীর ব্রহ্ম অবস্থা সম্পর্কে শ্রুতিশাস্ত্রে কি বলা আছে তাই দেখে নেব —

নাসৌ মরণমাপ্নোতি পুনর্যোগবলেন তু।

হঠেন মৃত এবাসৌ মৃতস্য মরণং কুতঃ॥৪৫

[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/যোগশিখা উপনিষদ/১ম অধ্যায়]

টীকাকার বলছেনঃ— তু (কিন্তু) অসৌ (যোগী) পুনঃ (নিশ্চয়েন) যোগবলেন মরণং ন আপ্নোতি। [ মরণং বিশেষয়তি। যদি যা অন্য দেহনাশঃ স্যাৎ, তদা যথার্থতস্তু ন অন্য মরণং ভবেৎ, [যতঃ] অসৌ (যোগী) হঠেন (হঃ-বহির্মুখশ্বাসঃ, অপানঃ, পিঙ্গলা, পরমাত্মা; ঠঃ অন্তর্মুখশ্বাসঃ, প্রাণ; গুঁড়া, জীবাত্ম।: ইঠঃ প্রাণাপানয়োঃ সংযোগঃ- কেবলীকুম্ভকঃ- জীবাত্মপরমাত্মসংযোগঃ তেন) মৃতঃ এব (নিশ্চিতং) ভবতি (নিশ্বাস- প্রশ্বাসাভ্যামের জীবনং, তয়োঃ নিরোধে বাহ্যকৰ্ম্মনিবৃত্তিঃ; লা এব মরণাবস্থা ইত্যর্থঃ)। মৃত্য মরণং কুতঃ (কেন প্রকারেণ) ভবতি?

অনুবাদ — যোগবলে যোগী মরণপ্রাপ্ত হয় না। তাঁর দেহ থাকতেই তিনি হঠযোগ দ্বারা (প্রাণাপান বা জীবাত্মপরমাত্মসংযোগদ্বারা) মৃত হয়ে আছেন; (অর্থাৎ সাধারণ লোকের শ্বাসপ্রশ্বাসের অভাবই যেমন মৃত্যুর লক্ষণ, তাঁরও সেইরূপ হয়েছে। কেবলীকুম্ভকে যোগী সর্বদাই মৃতবৎ) সুতরাং, মৃতের আর মরণ কিরূপ ? (অর্থাৎ বাসনাক্ষয়ে যোগীর পূর্বেই মরণ হয়েছে, তাই দেহনাশ হলেও তাঁকে মৃত বলা যায় না) ॥ ৪৫ ॥


👉উল্লেখিত শ্রুতি প্রমাণের দ্বারা ভগবদ গীতাতে শ্রীকৃষ্ণ নিজেকে অমৃত স্বরূপ বলেছিলেন, তার কারণ জানা যায়। দেহ থাকতেও যিনি পরমাত্মা সাথে সংযুক্ত থাকে, তিনি জীবিত অবস্থায় দেহ থেকে মুক্ত হয়ে, “অহং ব্রহ্মাস্মী” পদে উন্নিত হন। তাকেই বলা হচ্ছে অমৃত স্বরূপ। অর্থাৎ ব্রহ্মের স্বরূপত্ত্বে স্থিত হয়ে যাওয়া। তাই তো সম্পূর্ণ গীতা জুড়ে শ্রীকৃষ্ণ নিজেকে একাধারে ব্রহ্ম বলে গেছেন। কারণ উনি জানেন ব্রহ্ম বলতে আত্মাকেই বোঝাচ্ছে। 


যথাকাশস্তথা দেহ আকাশাদপি নির্মূলঃ।

সূক্ষ্মাৎ সূক্ষ্মতরো দৃশ্যঃ স্থলাৎ স্থূলো জড়াজ্জড়ঃ ॥৪২

[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/যোগশিখা উপনিষদ/১ম অধ্যায়]

টীকাকার বলছেনঃ— যথা আকাশঃ নির্মূলঃ, তথা দেহঃ (যোগি- দেহঃ) নিম্মলঃ ভবতি। কিঞ্চ দেহঃ আকাশাৎ (নিৰ্ম্মলতম- পদার্থাৎ) অপি নিম্মলঃ। সূক্ষ্মাৎ স দেবঃ সূক্ষ্মতরঃ, দৃশ্যঃ, স্থলাৎ স্থলঃ, জড়াৎ জড়ঃ চ ভবতি।

অনুবাদঃ— আকাশ যেরূপ, যোগীদেহও সেইরূপ। এমন কি আকাশ হইতেও ইহা নির্মূল। ইহা সূক্ষ্ম হইতেও সূক্ষ্ম, দৃশ্য, স্থল হইতেও স্কুল এবং জড় হইতেও জড় (কেননা যোগী ইচ্ছামত সকল- প্রকার দেহই ধারণ করিতে পারেন; অবস্থাবিশেষে সে কখন সূক্ষ্ম, কখন স্কুল, কখন জড়, কখন অজড়, কখন দৃশ্য, কখন খা অদৃশ্য হইয়া থাকে।।৪২।।


👉এখানে একটি লক্ষণীয় বিষয় হলো, এখানে বলা হচ্ছে “আকাশ যেরূপ, যোগীদেহ ও সেইরূপ”,আর আকাশের রূপ বা আকার কেউ-ই পরিমাপ করতে সমর্থ নন কেননা আকাশ অনন্ত। তাই এর থেকে এটাই পরিস্কার হয় যে, যোগী সাক্ষাৎ আকাশ স্বরূপ হয়। অর্থাৎ অনন্ত স্বরূপে উন্নিত হয়। আর অনন্ত রূপ টা বিশ্বরূপকেই ইঙ্গিত করে তা আলাদা করে প্রমাণ করার দরকার নেই। তাই যিনি যোগের মাধ্যমে অনন্তরূপে অবস্থিত রয়েছেন, তারপক্ষে বিশ্বরূপ প্রকট করা বা ব্রহ্মের জ্ঞান দেওয়া কোনো বড় বিষয় নয়। কারণ এই অবস্থায় সবাই সাক্ষাৎ শিব হয়ে যায়। 

শ্রুতিতে বলা হয়েছে— “অস্য লোকস্য কা গতিরিতি? আকাশ ইতি হোবাচ; সর্বাণি হ বা ইমানি ভূতান্যাকাশাদেব সমুৎপদ্যন্তে, আকাশং প্রত্যস্তং যন্তি, আকাশো হোবৈভ্যো ভূতেভ্যো জ্যায়ান, আকাশঃ পরায়ণম্[ছাঃ উঃ/১/৯/১] আকাশ (পরমাত্মা) থেকেই সবকিছুর উৎপত্তি। আকাশ অর্থে ব্রহ্মকেই বোঝানো হয়েছে । তার একি সামঞ্জস্যতা ব্রহ্মসূত্রের "আকাশস্তল্লিঙ্গাৎ" [ব্রহ্মসূত্র/১/১/২৩] এর সাথে এক হয়। অর্থাৎ আকাশ (পরমাত্মা) থেকেই সবকিছুর উৎপত্তি। তাই যোগীর আকাশ সমান বলতে পরমাত্মা স্বরূপ বোঝানো হয়৷ যার ক্ষমতা অনন্ত।


👉যোগীদের নিয়ে মহাভারতে বলা আছে—

পরং হি তদ্ব্রহ্মময়ং মহাত্মন! ব্রহ্মাণমীশং বরদঞ্চ বিষ্ণুম্।

ভবঞ্চ ধৰ্ম্মঞ্চ ষড়াননঞ্চ যদ্ব্রহ্মপুত্রাংশ মহানুভাবান্ ॥৫৮॥

তমশ্চ কষ্টং সুমহদ্রজশ্চ সত্ত্বঞ্চ শুদ্ধং প্রকৃতিং পরাঞ্চ।

সিদ্ধিঞ্চ দেবীং বরুণস্য পত্নীং তেজশ্চ কৃৎস্নং সুমহচ্চ ধৈর্য্যম্ ॥৫৯৷৷

তারাধিপং খে বিমলং সতারং বিশ্বাংশ দেবানুরগাম্ পিতৃংশ্চ।

শৈলাংশ কৃৎস্নামুদধীংশ্চ ঘোরান্নদীশ্চ সর্বাঃ সবনান্ ঘনাংশ্চ ॥ ৬০ ॥

নাগান্নগান্ যক্ষগণান্ দিশশ্চ গন্ধর্ব্বসংঘান্ পুরুষান স্ত্রীয়শ্চ।

পরস্পরং প্রাপ্য মহান্ মহাত্মা বিশেত যোগী নচিরাদ্বিমুক্তঃ ॥৬১৷৷

[মহাভারত- শান্তিপর্ব- অধ্যায়- ২৯৩]

অর্থঃ— মহাত্মা রাজা! সেই পরব্রহ্ম, সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা, বরদাতা বিষ্ণু, ঈশ, ধর্ম, কার্তিকেয়, মহাপ্রভাবশালী ব্রহ্মার পুত্রগণ, কষ্টদায়ক তমোগুণ ও রজোগুণ, বিশুদ্ধ সত্ত্বগুণ, আদ্যাপ্রকৃতি, বরুণের পত্নী সিদ্ধিদেবী, সমস্ত তেজ, অতিবিশাল পৃথিবী, আকাশস্থিত নক্ষত্রগণসমন্বিত নিৰ্ম্মল চন্দ্র, সমস্ত দেবতা, সর্প, পিতৃলোক, সকল পর্বত, ভয়ঙ্কর সমুদ্র, সমস্ত নদী, জলযুক্ত মেঘ, নাগ, বৃক্ষ, যক্ষ, দিক, গন্ধর্ব এবং সাধারণ স্ত্রী ও পুরুষ-এই সকলকে পরস্পর প্রাপ্ত হইয়া, মহাত্মা মহাযোগী ইঁহাদের মধ্যে প্রবেশ করিতে পারেন এবং অচিরকাল মধ্যে নির্বাণমুক্তি লাভও করিতে সমর্থ হন ॥৫৮-৬১॥


👉তাহলে সকলে এবার বুঝেছেন যোগীর পক্ষে কি কি করা সম্ভব। অর্থাৎ ব্রহ্মাস্বরূপে অবস্থান করে সৃষ্টি করতে পারেন। বিষ্ণুস্বরূপে অবস্থান করে পালন করতে পারেন। রুদ্রস্বরূপে অবস্থান করে ধ্বংস করতে পারেন। যোগী যেখানে পরব্রহ্ম পদে স্থিত হচ্ছেন সেখানে বিশ্বরূপ প্রকট করা যোগীর জন্য সাধারণ ব্যাপার। 

কারণ যোগীর বিষয়ে এমনটাও মহাভারতে বলা আছে যে—

তদ্বজ্জাতবলো যোগী দীপ্ততেজা মহাবলঃ।

অন্তকাল ইবাদিত্যঃ কৃৎস্নং সংশোষয়েজ্জগৎ ॥২১৷৷

[মহাভারত- শান্তিপর্ব্ব- অধ্যায়- ২৯৩]

অর্থঃ— সেইরূপ যোগের প্রভাবে উৎপন্নশক্তি, উজ্জলতেজা ও মহাবল যোগী, প্রলয়কালে সূর্য্যের ন্যায় সমগ্র জগৎ শুষ্ক করিতে সমর্থ হন ॥২১॥

👉অর্থাৎ যোগীরা যোগের প্রভাবে সম্পূর্ণ জগৎকে ধ্বংস করতে সক্ষম। আর যার ধ্বংস করার সামর্থ্য রয়েছে, তার সৃষ্টি করারও সামর্থ্য রয়েছে। তাই কিছু শাস্ত্রতে দেখা যায় শ্রীকৃষ্ণকে সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের কর্তাও বলা হয়।


👉এবার দেখে নেব শ্রুতিতে যোগ নিয়ে কি বলছে—

কামক্রোধভয়ং চাপি মোহলোভমথো রজঃ।

জন্ম মৃত্যুশ্চ কার্পণ্যং শোকস্তন্দ্রা ক্ষুধা তৃষা ॥১০

তৃষ্ণা লজ্জা ভয়ং দুঃখং বিষাদো হর্ষ এব চ।

এভির্দোর্ষৈাবনিমুক্তঃ স জীবঃ শিবঃ উচ্যতে ॥১১

[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/যোগশিখা উপনিষদ/১ম অধ্যায়]

অনুবাদঃ— কাম, ক্রোধ, ভয়, মোহ, লোভ, রজঃ, জন্ম, মৃত্যু, দৈন্য, শোক, তন্দ্রা, ক্ষুধা, পিপাসা, স্পৃহা, লজ্জা, দুঃখ, বিষাদ ও আহলাদ এই সকল দোষ হইতে সম্পূর্ণ মুক্ত হইলেই সুখদুঃখান্বিত জীব তখন শান্ত শিব বলিয়া কথিত হয় ॥ ১০-১১ ॥


👉অর্থাৎ যোগ দ্বারা জীব যখন নিজেকে পাশ থেকে মুক্ত করে, তখন জীব সাক্ষাৎ শিব হয়ে যায়। এবং সবকিছুই তখন সেই যোগীর নিকটে শিবময় হয়। এর থেকেই ব্যাপার টা পরিস্কার হয় যে, শ্রীকৃষ্ণ সাক্ষাৎ পরমেশ্বর শিবের সাথে সংযুক্ত থেকে অর্জুনকে গীতার জ্ঞান দিয়েছিলো।


👉শুধু শ্রীকৃষ্ণের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য না, এটা সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। যেকেউ চাইলে যোগের মাধ্যমে ব্রহ্মপদে উন্নিত হতে পারবে। এবং সেও বিশ্বরূপ প্রকট হোক বা ব্রহ্মজ্ঞান প্রদান করা সেই সাধকের জন্য আহামরি কোনো বড় ব্যাপার নয়। 

কেননা শাস্ত্রে বলছে যে—

আত্মমনসোঃ সংযোগবিশেষাৎ সংস্কারাচ্চ স্মৃতিঃ ॥ ৬ ॥

[বৈশেষিক দর্শন- ৯ম অধ্যায়- ২য় আহ্নিক- সূত্র নং- ৬]

অনুবাদ — আত্মা এবং মনের সংযোগবিশেষ এবং সংস্কার হইতে স্মৃতি (উৎপন্ন হইয়া থাকে)।।

ব্যাখ্যাঃ— সংস্কার, উদ্বোধক-সমবধানকালীন আত্মমনঃসংযোগ বা উদ্বোধক ও আত্মমনঃসংযোগ যে সময়ে ঘটিবে তখন স্মৃতি বা স্মরণ হইবেই, অনুভব প্রমাত্মক হইলে, স্মৃতিও প্রমাত্মক হইবে, অনুভব লয়াত্মক হইলে স্মৃতিও ভ্রম হইবে।।৬।।

👉তাই আশ্বমেধিক পর্ব্বে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছিলেন, তৎকালে আমি যোগযুক্ত অবস্থায় পরব্রহ্ম জ্ঞান দিয়েছিলাম, যা এখন আমি পুনরায় দিতে সক্ষম নই। আত্মার সংযোগ যখন পরমাত্মার সাথে হবে তখন জীব ও শিবস্বরূপে উন্নিত হবে। এবং পরব্রহ্ম অর্থাৎ পরশিব জ্ঞানেও সিক্ত হবে। এবং সেই জ্ঞান টা অন্যদের প্রদান করতেও সমর্থ হবে।


👉এবার আসা যাক একাগ্রতা নিয়ে শাস্ত্র কি বলছে তা নিয়ে — 

নাবর্তন্তে পুনঃ পার্থ! মুক্তাঃ সংসারদোষতঃ। জন্মদোষপরিক্ষীণাঃ স্বভাবে পর্যবস্থিতাঃ ॥৩৷৷

তত্র ধ্যানেন সংশ্লিষ্টমেকাগ্রং ধারয়েন্মনঃ। পিণ্ডীকৃত্যেন্দ্রিয়গ্রামমাসীনঃ কাষ্ঠবন্ধু, নিঃ ॥৫॥

[মহাভারত--শান্তিপর্ব- অধ্যায়- ১৮৮]

অর্থঃ— যুধিষ্ঠির! তাঁহারা সংসারদোষ কামক্রোধাদি হইতে বিমুক্ত ও জন্মদোষশূন্য হইয়া পরমাত্মস্বরূপে যাইয়া অবস্থান করেন ; সুতরাং তাঁহারা আর সংসারে ফিরিয়া আসেন না ॥ ৩

অতএব মুক্তিকামী লোক, সেই বনমধ্যে ইন্দ্রিয়সমূহকে এক করিয়া মৌনী হইয়া, কাষ্ঠের ন্যায় উপবিষ্ট থাকিয়া ধ্যানযুক্ত মনকে একাগ্রভাবে ধারণ করিবেন ॥ ৫ ॥


মনসশ্চেন্দ্রিয়াণাঞ্চ কৃত্বৈকাগ্র্যং সমাহিতঃ।

পূর্বরাত্রাপরার্দ্ধে চ ধারয়েম্মন আত্মনি ॥১৩৷৷

একাগ্রং চিন্তয়েন্নিত্যং যোগান্নোদ্বেজয়েম্মনঃ ॥২৫৷৷

[মহাভারত- শান্তিপর্ব- অধ্যায়- ২৩৭]

অর্থঃ— যোগী মনোযোগী হইয়া রাত্রির প্রথমার্দ্ধ হইতে অপরাদ্ধ পর্যন্ত মন ও অন্যান্য ইন্দ্রিয়ের একাগ্রতা সম্পাদন করিয়া, মনকে পরব্রহ্মে স্থাপন করিবেন ॥১৩৷৷

যোগী ইন্দ্রিয়সমূহকে সংযত করিয়া হৃৎপদ্মে মন নিবেশ করিয়া একাগ্রভাবে সর্বদা পরব্রহ্মের ধ্যান করিবেন; কিন্তু কোন প্রকারেই যোগ হইতে মনকে বিচলিত করিবেন না ॥২৫॥


👉অর্থাৎ এর থেকে এটা পরিস্কার যে, একগ্রতা বলতে বোঝা যাচ্ছে যোগের সময় পরমাত্মার সাথে একাগ্রতার সহিত ধ্যানে যুক্ত থাকা। এর অর্থ এই নয় যে একাগ্রচিত্ত হয়ে জ্ঞান দিচ্ছিলো। শ্রীকৃষ্ণ যদি একাগ্রচিত্তে জ্ঞানই দিয়ে থাকে, তাহলে সেটা কোন আলাদা পরব্রহ্ম যার জ্ঞান অর্জুনকে দিচ্ছিলেন? কারণ বৈষ্ণবরাতো শ্রীকৃষ্ণকেই ব্রহ্ম বলেন! তাহলে শ্রীকৃষ্ণ যখন নিজেই ব্রহ্ম, তাহলে সে অন্য কোন ব্রহ্মের জ্ঞান প্রদান করছিলেন?

👉মূল বিষয়টাকে টীকারের ভুল ব্যাখ্যা করে সবাইকে এটাই দেখাচ্ছে যে একাগ্রচিত্তে জ্ঞান দিয়েছিলেন। যেখানে টীকার অর্থ করলে দেখা যাচ্ছে একাগ্রচিত্তে যোগযুক্ত অবস্থার কথা বোঝানো হচ্ছে। ব্যাপার টা এমন হয়ে গেলো না— আমি জিজ্ঞেস করলাম আজকে কি বার! সে উত্তরে বললো আজকে মাছ দিয়ে ভাত খেয়েছি। তাইতো বৈষ্ণবদের শাস্ত্রের অপব্যাখ্যাকারী বলি। মানুষের মধ্যে ভ্রান্তি ছড়ানোই এদের মূল উদ্দেশ্য।


👉যোগ সম্পর্কে শাস্ত্র আরও কি বলছে তা দেখে নেব—

ততো মনসি সংগৃহ্য পঞ্চবর্গং বিচক্ষণঃ।

সমাদধ্যান্মনো ভ্রান্তমিন্দ্রিয়ৈঃ সহ পঞ্চতিঃ ॥৮॥

বিসঞ্চাবি নিরালম্বং পঞ্চদ্বারং চলাচলম্।

পূর্বং ধ্যানপথে ধীবঃ সমাদধ্যান্মনোহন্তবা ॥৯

[মহাভারত--শান্তিপর্ব- অধ্যায়- ১৮৮]

অর্থঃ— তাহার পর বিচক্ষণ যোগী, পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়কে মনের ভিতরে প্রবেশ করাইয়া, সেই পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের সহিত ভ্রমণকারী মনকে, কোন ধ্যেয় বস্তুতে সমাহিত করেন ॥৮॥

মন নানাবিষয়ে বিচরণ করে, তাহার কোন আলম্বন স্থির থাকে না; পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয় মনের দ্বার হয় এবং মন অত্যন্ত চঞ্চল, এইরূপ মনকে প্রথমে হৃদয়মধ্যে কোন ধ্যেয় বস্তুতে যোগী সমাহিত করেন ॥৯।।

👉শুধু ইতিহাস শাস্ত্র মহাভারত নয় সমগ্র শাস্ত্রে এটাই বলা আছে কোনো এক ধ্যেয় বস্তুতে মনকে সমাহিত করতে। তাহলে এখন দেখার বিষয় সেই যোগীগণের ধ্যেয় বস্তু টা কি/কে!

সেই ধ্যেয় বস্তু নিয়ে শাস্ত্রে কি বলা আছে, তা শাস্ত্র থেকেই দেখে নেবো।


👉শ্রুতি শাস্ত্রে বলা হচ্ছে—

বিবিক্তদেশে চ সুখাসনস্থঃ শুচিঃ সমগ্ৰীবশিরঃ শরীরঃ ।

অন্ত্যাশ্রমস্থঃ সকলেন্দ্রিযাণি নিরুধ্য ভক্ত্যা স্বগুরুং প্রণম্য ॥ ৫ ॥

[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/কৈবল্য উপনিষদ/১ম খণ্ড/৫]

অর্থঃ– (একজন যোগীব্যক্তি) স্নান আদি দ্বারা নিজ শরীর শুদ্ধ করার পর একান্ত স্থানে সুখাসনে বসেন। এরপর গ্ৰীবা , মস্তক তথা শরীরকে এক সিধে(মেরুদন্ড সোজা) রেখে সমস্ত ইন্দ্রিয়কে নিরোধ করে ভক্তিপূর্বক নিজ গুরুকে প্রণাম করেন। তদনন্তর সন্ন্যাস আশ্রমে স্থিত (সেই)যোগীব্যক্তি নিজ হৃদয়-কমলে রজোগুণ রহিত , বিশুদ্ধ এবং দুঃখ বা শোকরহিত আত্মতত্ত্বের চিন্তন করেন  ॥ ৫ ॥


👉তাহলে সেই আত্মস্বরূপ ধ্যেয় বস্তুটা কে তা শ্রুতি শাস্ত্র থেকেই দেখে নেব—

হৃৎপুণ্ডরীকং বিরজং বিশুদ্ধং বিচিন্ত্য মধ্যে বিশদং বিশোকম্ ।

অচিন্ত্যমব্যক্তমনন্তরূপং শিবং প্রশান্তমমৃতং ব্রহ্মযোনিম্ ॥ ৬ ॥

[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/কৈবল্য উপনিষদ/১ম খণ্ড/৬]

অর্থঃ– এইভাবে নিজের হৃদয়ে বিরাজিত হ‌ওয়া বিশুদ্ধ , অচিন্ত্য , অব্যক্ত তথা অনন্তরূপে যুক্ত , শান্ত-চিত্ত , অমৃত , যিনি নিখিল ব্রহ্মান্ডের মূল কারণ সেই শিবের চিন্তা করেন ॥ ৬ ॥

👉অর্থাৎ সেই যোগী, এই জগৎ সংসারের যিনি মূল কারণ, সৎ-চিৎ-আনন্দ স্বরূপ, সর্বব্যাপী পরমেশ্বর শিবকেই নিজের হৃদয়ে ধ্যান করেন।

“সর্বত্রপূর্ণরূপোহস্মি সচ্চিদানন্দলক্ষণঃ”।

[সামবেদ/মৈত্রেয়ী উপনিষদ/৩য় অধ্যায়/১২]

আমি (সদাশিব) সর্বত্র পূর্ণরূপে বিরাজিত সচ্চিদানন্দলক্ষণযুক্ত।।১২

শিবই একমাত্র ধ্যেয় বাদ বাকী সবকিছুই মিথ্যা। তাই সবাইকে একমাত্র সেই শিবেরই শরণ নিতে বলেছে সাক্ষাৎ শ্রুতি শাস্ত্র—

এক এব শিবো নিত্যস্ততোহন্যৎসকলং মৃষা।

তস্মাৎসর্বানপরিত্যজ্য ধ্যেয়ন্বিষ্ণুবাদিকান্সুরান্।৩০

[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/শরভ উপনিষদ/৩০]

অর্থঃ— একমাত্র শিবই নিত্য, বাদবাকী সবকিছুই মিথ্যা। এজন্য বিষ্ণু আদি সকল দেবতাকে বাদ দিয়ে একমাত্র শিবকে ধ্যেয় বলে জানা উচিত।।৩০

👉এই একি কথা শ্রুতিতে বলেছেন শ্রীবিষ্ণুজীও—

শিবো গুরুঃ শিবো বেদঃ শিবো দেবঃ শিবঃ প্রভুঃ। শিবোহম্ম্যহং শিবঃ সর্বং শিবাদন্যত্র কিঞ্চন ॥৩২।।

[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/বরাহ উপনিষদ/তৃতীয় অধ্যায়/৩২ নং মন্ত্র]

অর্থঃ— শিব গুরু, শিব বেদ, শিব দেব, শিব প্রভু, আমি শিব, সমস্তই শিবস্বরূপ, শিব ব্যতীত কিছুই নাই।।৩২।।

বি:দ্র:— বিষ্ণু এখানে আমি শিব, বলতে নিজের আত্মস্বরূপ পরমাত্মা শিবেরই উল্লেখ করেছে। কেননা বিষ্ণুর শরীর মায়াময়। 

শিব এব সদা ধ্যেয়ঃ সর্বসংসারমোচকঃ।

তস্মৈ মহাগ্রাসায় মহেশ্বরায় নমঃ।।৩১

[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/শরভ উপনিষদ/৩১]

অর্থঃ— কেবলমাত্র প্রভু শিবেরই ধ্যান করা উচিত, যিনি সমস্ত বিশ্ব সংসারের মায়া বন্ধন মোচনকারী, সেই কালরূপ বিশ্বকে মহাগ্রাসরূপে গ্রহণকারী প্রভু মহেশ্বরকে নমস্কার করি।।৩১

ত্র্যম্বকং ত্রিগুণং স্থানং ত্রিধাতুং রূপবর্জ্জিতম্।

নিশ্চলং নির্বিকল্পং চ নিরাধারং নিরাশ্রয়ম্ ॥৬।।

[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/তেজবিন্দু উপনিষদ/৬]

অর্থঃ— সম্প্রতি সগুণ ব্রহ্ম প্রতিপাদন করিবার জন্য শিবও তাঁহার শক্তিরূপিণী প্রকৃতির বিষয় বলিতেছেন— সত্ত্ব, রজঃ এবং তমঃ এই ত্রিগুণাত্মিকা প্রকৃতি যাঁহার স্বরূপ, যিনি ত্রিলোকের কারণ ও আশ্রয়স্থান, শ্রুতি যাঁহাকে রূপহীন, স্থির, নিরাধার, নিরাশ্রয় এবং নির্বিকল্পরূপে নির্দেশ করেন; সেই ত্রিলোকপিতা ভগবান শিবের ধ্যান করিবে।।৬।।

👉লক্ষণীয় বিষয় দেখুন— সাধারণত বৈষ্ণবরা শিবকে তমগুণের বিগ্রহ বলেই সম্বোধন করে। কিন্তু তা মোটেই সঠিক নয়। ইহা বৈষ্ণবদের আরোপিত মিথ্যাচার ছাড়া কিছুই নয়৷ পরমেশ্বর শিবের পরমত্ব খণ্ডাতে, কৈলাস নিবাসী ত্রিদেব এর অন্তর্গত রুদ্রদেবের সাথে সদাশিবকে এক করে, বারংবার পরমেশ্বর শিবের পরমত্ব খণ্ডানোর চেষ্টা। কিন্তু কখনো করতে পারে না ওটা আলাদা ব্যাপার। কেননা শিব রুদ্ররূপে লীলা করছে, তাই শিবের উপর কোনো দোষ, কোনো কলঙ্ক আরোপিত হয় না। 

যাইহোক! এখানে বলা হচ্ছে দেখুন- এখানে বলছে তিনটি গুণকে ধারণ করেন যিনি। যে ত্রিগুণাত্মিকা প্রকৃতি স্বরূপ হয়ে জগতের কারণ হচ্ছেন এবং যিনি সম্পূর্ণ জগতের আশ্রয়স্থান। যিনি গুণ ধারণ করেও নির্গুণ, বেদ যাকে নিরাকার ব্রহ্ম বলেন সেই শিবের ধ্যান করার কথায় বলা হচ্ছে বেদের মধ্যে।

পরমেশ্বর শিব যখন নিরাকার, তখন তিনি জগৎ সৃষ্টির জন্যই সগুণ সাকার হচ্ছেন। এবং সাকার হওয়ার পরেই শিব গুণ দ্বারা নিজের আবৃত করছেন। কিন্তু পরমেশ্বর নির্গুণ। সত্ত্ব-রজ-তম এসব গুণ একেকটা ব্যবহারিক ভেদ মাত্র। 

ঠিক একই কথার সমর্থন শ্রুতি শাস্ত্র নিজেই দেয়—

তমাদিমধ্যান্তবিহীনমেকং বিভুং চিদানন্দমরূপমদ্ ভুতম্ ।

তথাদিউমাসহাযং পরমেশ্বরং প্রভুং ত্রিলোচনং নীলকণ্ঠং প্রশান্তম্ ।

ধ্যাত্বা মুনির্গচ্ছতি ভূতযোনিং সমস্তসাক্ষিং তমসঃ পরস্তাৎ ॥ ৭ ॥

[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/কৈবল্য উপনিষদ/১ম খণ্ড/৭]

অর্থঃ– যে প্রভু শিবের আদি , মধ্য এবং অন্ত নেই, যিনি অনুপম , বিভু(বিরাট) এবং চিদানন্দ স্বরূপ , অরূপ এবং অদ্ভুত , এভাবে সেই উমা(ব্রহ্মবিদ্যা) – এর সাথে পরমেশ্বরকে , সম্পূর্ণ চর-অচরের পালনকর্তাকে , শান্তস্বরূপ , ত্রিনেত্র স্বরূপ , নীলকণ্ঠকে যিনি সমস্ত ভূত সমূহ তথা প্রাণীদের মূল কারণ , সবকিছুর সাক্ষী এবং অবিদ্যা রহিত হিসেবে প্রকাশিত , এভাবে সেই প্রকাশপুঞ্জ পরমাত্মা শিবকে যোগীব্যক্তি ধ্যানের মাধ্যমে গ্ৰহণ করে তামসের ঊর্ধ্বে উঠে যান ।।৭॥

👉খুব বেশি ব্যাখ্যায় যাচ্ছি না, খুব সহজ ভাবেই বলি। যে শিবকে যোগীরা ধ্যানের মাধ্যমে জেনে গুণের ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন, সেই শিব কীভাবে তামসিক হয়? শিবই একমাত্র ধ্যেয় তাই যোগীরা একমাত্র শিবকেই চিন্তা করে থাকেন। তার পরবর্তী শ্রুতি প্রমাণে বলা হচ্ছে—

উপাধিরহিতং স্থানং বাত্মনোহতীতগোচরম্।

স্বভাবভাবনাগ্রাহ্যং সঙ্ঘাতৈকপদোঙ্খিতম্ ॥

[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/তেজবিন্দু উপনিষদ/৭]

অর্থঃ— যিনি অশরীরী অথচ সকল পদার্থের আশ্রয়, যিনি বাক্য ও মনের অগোচর, সমুদয় বস্তুর জ্ঞাতা, যাঁহাকে মিথ্যা, সংস্কাররহিত, স্বভাবসিদ্ধ বিশুদ্ধ ভাবনা দ্বারা জানা যায়, সেই বাক্যাতীত গুণাতীত শিবই একমাত্র ধ্যেয়।।৭।।

👉শ্রুতি শাস্ত্রের মান্যতা এটাই যে, যোগীগণের ধ্যেয় বস্তুটা হলো পরমেশ্বর শিব। যার ধ্যান করে যোগীরা পরমেশ্বর শিবের মার্গে গমন করেন এবং শিবত্ব প্রাপ্তি করেন। আমারদের ইতিহাস শাস্ত্র মহাভারতে বলা হয়েছে যে—

তস্থুষং পুরুষং নিত্যমভেদ্যমজরামরম্।

শাশ্বতঞ্চাব্যয়ঞ্চৈব ঈশানং ব্রহ্ম চাব্যয়ম্ ॥১৭৷৷

[মহাভারত- শান্তিপর্ব্ব- অধ্যায়- ৩০৬]

টীকাঃ— পুরুষং জীবম্‌, নিত্য- মভেদ্যম্, অজরামরম্, শাশ্বতং সনাতনম্‌, অব্যয়ং হ্রাসহীনম্, ঈশানং সর্ব্বনিয়ন্তৃ, অব্যয়ং বৃদ্ধিশূণ্যঞ্চ ব্রহ্ম ধ্যায়স্তি ॥১৭।।

অর্থঃ— জীবরূপে দেহস্থিত, সর্বদা অভেদ্য, অজয়, অমর, সনাতন, হ্রাসবৃদ্ধিশূক্ত ও জগতের নিয়ন্তা পরব্রহ্ম ঈশানকে যোগীরা ধ্যান করেন ॥ ১৩-১৭।।

👉এর থেকে তো বিষয় একদম পরিস্কার হয়ে গেলো যে, যোগীরা একমাত্র পরমেশ্বর শিবকেই ধ্যান করে থাকেন। কেননা জীবের দেহ হচ্ছে শিবের আলয় তার মধ্যে অবস্থান করা আত্মাই হচ্ছে শিব। শ্রুতিশাস্ত্রেও তাই বলা হয়েছে—

“দেহো দৈবালয় প্রোক্তঃ স জীবঃ কেবলঃ শিবঃ”।।১

[সামবেদ/মৈত্রেয় উপনিষদ/অধ্যায়/২/১]

অর্থঃ— শরীর হচ্ছে দেবালয় এবং উক্ত শরীরে যে জীবাত্মা আছেন তিনিই পরমেশ্বর শিব।।১।।

তাই তো যোগীরা নিজের আত্মস্বরূপ পরমেশ্বর শিবের ধ্যান করেন। নিজের আত্মস্বরূপ পরমেশ্বর শিবের সাথেই সংযুক্ত থাকেন। যোগীরা বাহ্যিক বিষয় বস্তুকে ত্যাগ করে কেবল শিবপদকেই জীবনের উদ্দেশ্য করে নেয়। তাই অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যোগীরা বাহ্যিক পূজা ততটা প্রাধান্য দেয় না, যতটা প্রাধান্য দেয় আন্তঃপূজাকে। অর্থাৎ যোগীরা মৃন্ময় প্রতিমা, প্রস্তর প্রতিমা ইত্যাদিতে পূজা করেনা বা করতে তেমন একটা দেখা যায়। কেননা তারা নিজের দেহেই অবস্থিত নিজের আত্মস্বরূপ পরমেশ্বর শিবেরই পূজা করেন এবং ধ্যান করেন। শ্রুতি শাস্ত্রও এই একি কথা বলে —

শিবমাত্মনি পশ্যন্তি প্রতিনাসু ন যোগিনঃ।

অজ্ঞানাং ভাবনার্থায় প্রতিমাঃ পরিকল্পিতাঃ।।৪৯

[সামবেদ/দর্শন উপনিষদ/৪র্থ খণ্ড/৪৯]

অর্থঃ— যোগীরা নিজের আত্মাতেই পরমেশ্বর শিবের দর্শন করেন, প্রস্তরখণ্ড কিংবা কাঠ দ্বারা নির্মিত প্রতিমাকে নয়। অজ্ঞানী মানুষেদের হৃদয়ে ভগবান শিবের প্রতি ভাবনা জাগ্রত করার জন্যই প্রতিমার কল্পনা করা হয়েছে।।৪৯


👉এখানে হয়তো বা অনেকের মনে হতে পারে যে, প্রতিমা পূজার বিপক্ষে বলা হয়েছে। আসলে বিষয় টা এমন নয়। যোগী আর সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা পার্থক্য থাকে। সাধারণ মানুষ ব্যবহারিক জীবন-যাপনের উপর বিশ্বাসী, তাদের আধ্যাত্মিক জ্ঞান নেই বললেই চলে। কারণ তারা বিকারগ্রস্ত, ইন্দ্রিয়ভোগী হয়। তারা জানেনা যে আত্মাই নিজের মূল অস্তিত্ব হয়। তাই তাদের পারমার্থিক জ্ঞান না থাকার কারণের পরমেশ্বর রূপ কল্পনা করে দেওয়া হয়েছে যাতে, অজ্ঞানী মানুষেরা সেই প্রতিমা পূজা করে, আধ্যাত্মিকতার ছোঁয়া পায়। কিন্তু যোগীদের ব্যাহ্যিক পূজা করতে হয় না। কেননা তারা নিজের আত্মস্বরূপ শিবতত্ত্বের জ্ঞান থাকে, তাই যোগীরা নিজের আত্মস্বরূপেরই পূজা করে, ধ্যান করে। কারণ শিবই যোগীগণের পূর্ণব্রহ্ম শিব -

শ্রীকৃষ্ণ বলছেন—

“আত্মা চ সর্বভূতানাং সাংখ্যে পুরুষ উচ্যসে।

ঋষভন্তং পবিত্রাণাং যোগিনাং নিষ্কলঃ শিবঃ”।।

[মহাভারত/অনুশাসনপর্ব/অধ্যায় ১৩/৩১৬]

অর্থঃ— আপনি সমস্ত প্রাণীর জীবাত্মা, সাংখ্যে পুরুষ বলিয়া উক্ত হইয়াছেন; পবিত্রগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ এবং যোগিগণের মধ্যে পূর্ণ শিব ॥৩১৬৷৷


এবং যোগীরা ধ্যানের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে পরমেশ্বর শিবের পথেই গমন করেন —

তথৈব বাগুরাং ছিত্ত্বা বলবন্তে যথা মৃগাঃ।

প্রাপ্নু যুর্বিলং মার্গং বিমুক্তাঃ- সর্ববন্ধনৈঃ ॥১৩৷৷

লোভজানি তথা রাজন! বন্ধনানি বলান্বিতাঃ।

ছিত্ত্বা যোগাঃ পরং মার্গং গচ্ছন্তি বিমলং শিবম্ ||১৪৷৷

[মহাভারত- শান্তিপর্ব- অধ্যায়-২৯৩]

টীকাঃ— বাগুরাং মৃগবন্ধনজালম্। বন্ধনানি পুত্রকলত্রাদিস্নেহপাশান। শিবং মঙ্গলময়ম্ ॥১৩-১৪৷।

অর্থঃ— রাজা! পশুগণ যেমন জাল ছেদন করিয়া সমস্ত বন্ধন মুক্ত হইয়া নির্মল পথ প্রাপ্ত হয়; তেমন যোগবলশালী যোগীরা লোভজাত সমস্ত স্নেহবন্ধন ছেদন করিয়া, নির্মল ও মঙ্গলময় শিবের পথে গমন করেন ॥১৩-১৪॥

👉এবার বৈষ্ণবরা এখানে যদি প্রশ্ন করেন, শিব বলতে তো মঙ্গলয় অর্থে বোঝানো হয়েছে, মোটেও সদাশিবের কথা বোঝানো হয়নি। তাহলে তাদের উদ্দেশ্যে এটাই বলতে চাই শিব অর্থে পরমেশ্বর শিবকেই বোঝানো হয়েছে। কেননা পরমেশ্বর শিবই তো মঙ্গলময় কেননা, পরমেশ্বর শিব সবার মঙ্গল করেন বলেই উনি মঙ্গলময়। আর সে কথা আমি বলছি না, শাস্ত্রই বলছে—

স মেধযতি যন্নিত্যং সর্বান্ বৈ সর্ব্বকৰ্ম্মভিঃ।

মনুষ্যান্ শিবমন্বিচ্ছংস্তম্মাদেষ শিবঃ স্মৃতঃ ॥১॥

[মহাভারত- অনুশাসনপর্ব্ব- অধ্যায়- ১৩৯]

অর্থঃ— যেহেতু মহাদেব মানুষের মঙ্গল কামনা করে সমস্ত কৰ্ম দ্বারা সর্বদা সকল মানুষকে পবিত্র করেন, সেই হেতু তিনি শিব নামে অভিহিত হন ॥৯॥

👉টীকাতেও বলা হয়েছে— শিবং মঙ্গলম্ ॥৯।।

অর্থাৎ পরমেশ্বর শিবই মঙ্গলময়। তাছাড়া সায়ণাচার্যও তার তৈত্তিরীয় আরণ্যক ভাষ্যে পরমেশ্বর শিবকে মঙ্গলময় বলে গেছেন, শিব সবার মঙ্গল বিধান করেন বিদায় শিবকে মঙ্গলময় বলা হয়। এবার দেখে নেওয়া তৈত্তিরীয় আরণ্যকে সায়ণাচার্য এর ভাষ্য—

কৃষ্ণ যজুর্বেদ এর তৈত্তিরীয় আরণ্যক এর সায়ণ ভাষ্য থেকে দেখানো হল - রুদ্রই সাক্ষাৎ মঙ্গলময় শিব। সাকারে তিনি কৈলাসবাসী।

(কৈলাস শব্দের উল্লেখ, অর্থাৎ গিরি বলতে সায়ণ আচার্য স্পষ্ট ভাবেই কৈলাস পর্বত কে বুঝিয়েছেন।)

👉একই কথার সমর্থন শ্রুতির মধ্যেই পাওয়া যায়, যেখানে বলা আছে—

সর্বত্রপূর্ণরূপোহস্মি সচ্চিদানন্দলক্ষণঃ ।

সর্বতীর্থস্বরূপোহস্মি পরমাত্মাস্ম্যহং শিবং ॥ ১২ ॥

[সামবেদ/মৈত্রেয় উপনিষদ/অধ্যায়/৩]

অর্থ — আমি সর্বত্র পূর্ণরূপে বিরাজিত সচ্চিদানন্দ লক্ষণযুক্ত। তীর্থের স্বরূপও আমি এবং আমি পরমাত্মা স্বরূপ কল্যাণকারী শিব ॥ ১২ ॥


♦️ সেই যোগীর ধ্যানের মাধ্যমে পরমেশ্বর শিবের তত্ত্বকে জানতে পারেন, তখন সে যোগী মুক্ত হয়ে শিবত্ব লাভ করেন। শ্রুতি শাস্ত্রের মধ্যেই বলা হয়েছে শিবতত্ত্বকে জানার পরেই জীবের মুক্তি হয় —

বিরক্তস্য তু সংসারাজ্ঞানং কৈবল্যসাধনম্ ।

তেন পাশাপহানিঃ স্যাজ্ঞাত্বা দেবং সদাশিবম্‌ ॥ ৪৭ ॥

[সামবেদ/দর্শন উপনিষদ/৬ষ্ঠ খণ্ড/৪৭]

অর্থঃ— এই প্রকারে যেসব মানুষের সংসার-সাগরের মায়া থেকে পৃথক হয়ে যায়, তাদের কৈবল্যমুক্তির সাধনভূত জ্ঞানের প্রাপ্তি হয়। সেই জ্ঞানের দ্বারা নিত্য পরমাত্মা সদাশিবের তত্ত্বজ্ঞান প্রাপ্ত হওয়ার পরে, সমস্ত প্রকার বন্ধন থেকেই জীব মুক্ত হয়ে যায় ॥ ৪৭ ॥


👉একই বাক্যের সমর্থনে শ্রীবিষ্ণুজী বলেছেন—

যস্মিন্ কালে স্বমাত্মানং যোগী জানাতি কেবলম্।

তস্মাৎ কালাৎ সমারভ্য জীবন্মুক্তো ভবেদসৌ" ॥৪২।।

[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/বরাহ উপনিষদ/দ্বিতীয় অধ্যায়]

অর্থ — যোগী যৎকালে কেবল আত্মস্বরূপ অবগত হন, তৎকাল হইতে তিনি জীবন্মুক্ত বলিয়া কথিত হন।।৪২।।


👉শ্রী বিষ্ণুও এক‌ই স্বীকারোক্তি দিচ্ছেন যে, যিনি নিজের আত্মস্বরূপ পরমেশ্বর শিবকে জানতে পারে, সে তৎকাল নিজের দেহ থেকে মুক্ত হয়ে যায়। অর্থাৎ দেহ থাকতেও উন্মুক্ত থাকে। কারণ সে ব্যক্তি নিজের আত্মস্বরূপ শিবতত্ত্বের জ্ঞান লাভ করে বিদায়, সাক্ষাৎ শিবত্ব প্রাপ্ত হয়। তাই তার আর নশ্বর শরীরের প্রয়োজন থাকে না। এবং সে শরীর থাকতেও অশরীরীই হয়। এবং নিজেকে ব্রহ্মপদে স্থিত করতে পারে। তখন সে যোগী সবকিছুর জ্ঞাতা হয়, সর্বব্যাপী হয়, সাক্ষাৎ শিবস্বরূপ হয়। তাই অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যেখানে আত্মজ্ঞানী যোগী নিজেকে ব্রহ্ম বলেন, জগতে সৃষ্টিকর্তা-স্থিতিকর্তা-লয়কর্তা বলেন। সেজন্যই তো গীতার মধ্যে শ্রীকৃষ্ণ নিজেকে ব্রহ্ম বলেছেন। অর্থাৎ উনার আত্মস্বরূপ পরমেশ্বর শিবকেই বলেছেন। কারণ শিবজ্ঞান প্রাপ্ত হলেই, জীব নিজেকে ব্রহ্মপদে স্থিত করতে পারে কেননা শিবই তো একমাত্র ব্রহ্ম। শ্রুতিতেই বলা আছে যে- “একমেবাদ্বিতীয়ম” ঈশ্বর এক এবং অদ্বিতীয়  [ছাঃ উঃ/৬/২/১], আর শ্রুতিশাস্ত্রেই পরমেশ্বর শিবকেই অদ্বিতীয় পরমেশ্বর বলা হয়েছে- “এক হি রুদ্র ন দ্বিতীয়ায় তস্থুর্য” রুদ্রই (পরশিব) অদ্বিতীয় ব্রহ্ম দ্বিতীয় কোনো সত্ত্বা নেই [শ্বেতাঃ উঃ/৩/২]।। তাই সকল যোগীগণ একমাত্র শিবকেই ধ্যেয় এবং পরম ধ্যানের বিষয় বলেই জানেন। এবং এও জানেন যে, শিবই একমাত্র সত্য, বাকী সবকিছু মিথ্যা।


👉দেখুন! যদি ব্রহ্ম বহু হতো তাহলে শাস্ত্রের কোনো মাহাত্ম্যই থাকতো না। কারণ সনাতন একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী। তবে হ্যাঁ ঈশ্বরের বহু রূপ রয়েছে এবং বিভিন্ন দেবদেবীর অনুসারীরা সেই দেব বা দেবীকেই সর্বোচ্চ সত্ত্বা মনে করেন। এটা ভক্তদের দৃষ্টিকোণ থেকে অযৌক্তিক কিছুই নয়। কারণ সব দেব দেবীরা এক শিবেরই প্রকাশিত বিভিন্ন স্বরূপ মাত্র। তাই যিনি নিজেকে শিব বলে জানতে পেরেছেন, তিনি সাক্ষাৎ শিবত্ব লাভ করেছেন “সচ্চিদানন্দরূপঃ শিবোঽহম শিবোঽহম”


👉আর যদি আপনারা এটা বলেন শিব একমাত্র ব্রহ্ম নয় তাহলে তো দেখা যাবে শ্রুতিই ওখানে খণ্ডিত হয়ে যাবে। আর আমার জানা মতে শ্রুতিকে তো খণ্ডন করা যায় না। কারণ ব্যাসদেব নিজের ব্যাস সংহিতাতে বলছেন “শ্রুতি এবং স্মৃতির বিরোধে শ্রুতির কথায় বলবান হয়[ব্যাস সংহিতা/১/৪]। তাহলে যদি শিবকে ব্রহ্ম মানা না হয় তাহলে তা সাক্ষাৎ শ্রুতি বিরুদ্ধ মত বলেই মান্যতা পাবে। 

আর যদি আসলেই ব্রহ্ম বহু হয়ে থাকে তাহকে শ্রুতি অনুযায়ী তো অনেক কিছুকেই ব্রহ্ম বলতেই হয়, যেমন—

"অন্নং ব্রহ্মেতি ব্যজানাৎ" অন্নই ব্রহ্ম।। ২

"প্রাণো ব্রহ্মেতি ব্যজানাৎ" প্রাণই ব্রহ্ম।।৩

"মনো ব্রহ্মেতি ব্যজানাৎ" মনই ব্রহ্ম।।৪

"বিজ্ঞানং ব্রহ্মেতি ব্যজানাৎ" বিজ্ঞানস্বরূপ চেতন জীবাত্মাই ব্রহ্ম।।৫

"আনন্দো ব্রহ্মেতি ব্যজানাৎ" আনন্দস্বরূপ পরমাত্মাই ব্রহ্ম।।৬

[তৈত্তিরীয় উপনিষদ/ভৃগুবল্লী/২-৬ নং অনুবাক]


👉তাহলে এবার যদি শ্রুতি অনুযায়ী চিন্তা করি তাহলে তো উপরোক্ত সবকিছুকেই ব্রহ্ম বলতে হয়।

তাহলে কি অন্নই একমাত্র ব্রহ্ম?

আর যদি অন্ন ব্রহ্ম না হয়! তাহলে কি প্রাণই ব্রহ্ম?

যদিও প্রাণও ব্রহ্ম না হয়! তাহলে মনই ব্রহ্ম হবে নিশ্চয়?

এবার যদি বলেন যে মন কীভাবে ব্রহ্ম হয়! তাহলে কি বিজ্ঞানস্বরূপ চেতনাই ব্রহ্ম? যদি চেতনাও ব্রহ্ম না হয়, তাহলে অবশ্যই আনন্দস্বরপ পরমাত্মাই ব্রহ্ম?

আসলে মূল ব্যাপার হলো একব্রহ্মই সবকিছুর মধ্যে অবস্থান করেন, এই কারণে সবকিছুকেই ব্রহ্মস্বরূপ বলা হয়, যেমনটা শ্রুতিতে বলা হয়েছে- “সর্ব্বং খল্বিদং ব্রহ্ম” সবকিছুই ব্রহ্ম [ছাঃ উঃ/৩/১৪/১]। অর্থাৎ এক ব্রহ্ম সবকিছুর মধ্যে আত্মস্বরূপে বিরাজমান থাকেন বিদায়, তার আত্মস্বরূপ ব্রহ্মকেই ব্রহ্ম বলা হয়। 

অন্ন জীবের মধ্যে উর্জা শক্তি প্রদান করেন বলেই অন্নকে ব্রহ্ম বলা হয়েছে। সমস্ত প্রাণী প্রাণ দ্বারাই জীবিত থাকে বলেই প্রাণকে ব্রহ্ম বলা হয়। মন দ্বারা উপলব্ধি ও মন থেকেই সকল প্রাণীর উৎপত্তি হয়, তাই মনকে ব্রহ্ম বলা হয়। সজীব চেতন প্রাণী থেকেই প্রাণীকুলের উৎপত্তি স্পষ্টরূপে প্রত্যক্ষ হয়। উৎপন্ন হয়ে এই বিজ্ঞানস্বরূপ জীবাত্মা জীবিত থাকে। তাই বিজ্ঞানস্বরূপ চেতনাকেই ব্রহ্ম বলা হয়। আর আনন্দস্বরূপ পরমাত্মাই অন্নময়াদি সকলের অন্তরাত্মা। এই কারণেই এইসবের মধ্যে ব্রহ্মবুদ্ধি হয় এবং ব্রহ্মের আংশিক লক্ষণ ও লক্ষিত হয়। কিন্তু প্রকৃত লক্ষণ আনন্দেই উপলব্ধ হয়। কারণ এই সমস্ত প্রাণী ঐ আনন্দস্বরূপ পরব্রহ্ম পরামাত্মা থেকেই সৃষ্টির প্রারম্ভে উৎপন্ন হয়। তাই আনন্দস্বরূপ পরমাত্মাই হলো একমাত্র ব্রহ্ম। আর শ্রুতিতেও একমাত্র ব্রহ্ম বলতে পরমেশ্বর শিবকেই বুঝিয়েছে। কারণ শিবই সত্য, বাদবাকী সকল কিছুই মিথ্যা।।


👉শ্রুতি শাস্ত্রে বলা হয়েছে—

য ইমং মঞ্চদং বেদ আত্মানং জীবমন্তিকাৎ।

ঈশানং ভূতভব্যস্য ন ততো বিজুগুপ্সতে। এতদ্বৈতৎ ॥৫৷৷

[কঠ উপনিষদ/২য় অধ্যায়/১ম বল্লী/৫]

অর্থঃ— যে ব্যক্তি কর্মফলভোক্তা জীবকে সমীপস্থ রূপে জানে, জানে যে ইহাই অতীত ও ভবিষ্যতের প্রভু ঈশান সেই জ্ঞানলাভের পর সে নিজকে গোপন করিতে ইচ্ছা করে না। ইহাই সেই ব্রহ্ম।।

👉এখানে প্রভু ঈশান কেবল অতীত ও ভবিষ্যতের প্রভু বলা হইয়াছে, কিন্তু উদ্দেশ্য এই যে তিনি ভূত ভবিষ্যৎ ও বর্তমান ত্রিকালের প্রভু। 

এবার যদি বৈষ্ণবগণ এই আপত্তি তুলেন যে, ঈশান পরমেশ্বরের বিশেষণ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ ঈশান বলতে ঈশ্বরকেই বোঝাচ্ছে, শিবকে নয়। 

[নিঘন্টু/৬/২০/১] অনুযায়ী ঈশান অর্থ ঈশ্বর বা পরমেশ্বকেই বোঝানো হয়েছে। আর শাস্ত্রে ঈশান যে সাক্ষাৎ শিব, তা স্পষ্ট ভাবেই উল্লেখ করায় আছে-

তৎ পরং ব্রহ্ম যৎ পরং ব্রহ্ম স একঃ যঃ একঃ স রুদ্রঃ যো রুদ্রঃ স ঈশানঃ যঃ ঈশানঃ স ভগবান মহেশ্বর।।৩

[অথর্ববেদ/অথর্বশির উপনিষদ/৩]

অর্থঃ— তিনি (শিব) পরব্রহ্ম, যিনি পরব্রহ্ম তিনি অদ্বিতীয়, যিনি অদ্বিতীয় তিনি রুদ্র, যিনি রুদ্র তিনি ঈশান, যিনি ঈশান তিনিই ভগবান মহেশ্বর।। ৩।।

“ঈশানস্য জগতঃ স্বদর্শমীশানমিন্দ্রতস্থুর্য ইতি তস্মাদুচ্যতে ঈশানঃ”।।

[অথর্ববেদ/অথর্ব্বশির উপনিষদ/৪]

অর্থঃ—স্থাবর জঙ্গমাত্মক জগতের অদ্বিতীয় অধীশ্বর রুদ্ররূপী ভগবান'ই সাক্ষাৎ ঈশান।।

ॐ ঈশানঃ সর্ববিদ্যানাং ঈশ্বরঃ সর্বভূতানাং ব্রহ্মাধিপতির্ব্রহ্মণোহধিপতির্ব্রহ্মা শিবো মে অস্তু সদাশিবোম্।।

[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/তৈত্তিরীয় আরন্যক/১০ম প্রপাঠক/২১ নং মন্ত্র]

অর্থঃ— পরম ঈশ্বর হল- ঈশান-শিব সর্বশক্তিমান, সবকিছুর মধ্যেই তিনি(শিব) আছেন, ঈশানই সকল বিদ্যা ও ভূতের অধীশ্বর। তিনি ব্রহ্মা, তিনি নারায়ণ সহ সকলের কর্তা, সেই ॐ-কার স্বরূপ পরমেশ্বর সদাশিব যেন সকলের প্রতি মঙ্গল করেন। 


👉শ্রুতিতে আরও বলা হয়েছে যে—

অঙ্গুষ্ঠমাত্রঃ পুরুষো মধ্য আত্মনি তিষ্ঠতি।

ঈশানো ভূতভব্যস্য ন ততো বিজুগুপ্সতে। এতদ্বৈতৎ ॥১২৷৷

[কঠ উপনিষদ/২য় অধ্যায়/১ম বল্লী/১২]

অর্থঃ— অঙ্গুষ্ঠপরিমাণ পুরুষ আত্মার মধ্যে অবস্থান করেন, ঈশান অতীত ও ভবিষ্যতের প্রভু। তাঁহাকে জানিবার পর আর গোপন করিতে ইচ্ছা করে না।।


👉যোগীরা যখন পরমেশ্বর ঈশান কে জেনে যায়, তখন আর নিজেকে গোপন করতে ইচ্ছা করে না। কেননা তখন যোগীরা সাক্ষাৎ শিবস্বরূপ হয়ে যায়। আমাদের ইতিহাস শাস্ত্র মহাভারতে বলা হয়েছে—

অয়ং স সত্যকামানাং সত্যলোকঃ পরং সতাম্।

অপবর্গশ্চ মুক্তানাং কৈবল্যং চাত্মবেদিনাম্ ॥৩৭৷৷

অয়ং ব্রহ্মাদিভিঃ সিদ্ধৈগুহায়াং গোপিতঃ প্রভুঃ।

দেবাসুরমনুষ্যাণাম প্রকাশো ভবেদিতি ॥৩৮৷

[মহাভারত/অনুশাসনপর্ব/অধ্যায় ১৫/৩৭/৩৮]

অর্থঃ— ইনি(পরমেশ্বর শিব) সত্যসঙ্কল্প পরমসাধুগণের সেই সত্যলোক, সারূপ্যমুক্তগণের সারূপ্যমোক্ষ এবং ব্রহ্মজ্ঞগণের নির্বাণমোক্ষ ॥৩৭৷৷

এই প্রভু, দেবগণ, অসুরগণ ও মনুষ্যগণের নিকটে প্রকাশিত না হন, এই জন্য, ব্রহ্মাদি সিদ্ধগণ ইহাকে হৃদয়কন্দরে গোপন করিয়া রাখিয়াছেন॥৩৮।।

👉অর্থাৎ শাস্ত্রই বলছে পরমেশ্বর শিবই হলো নির্বাণমোক্ষ প্রদান কারী। যোগীরা যেরূপ মোক্ষ প্রার্থনা করে পরমেশ্বর শিব তাদের সেরূপ মোক্ষই প্রদান করে। কারণ শিবই পরাৎপর ব্রহ্ম “পরমহস্মী পরাৎপর”  শিবই পরাৎপর ব্রহ্ম [সামবেদ/মৈত্রেয়ী উপনিষদ/অধ্যায় ৩/১০]। শ্রুতির সামঞ্জস্যতা সম্পূর্ণ রূপে ইতিহাস শাস্ত্রের সাথে এক হয়। তাছাড়া, ন্যায় শাস্ত্রে বলা হয়েছে হয়ে- “আত্মজন্মানঃ[যাস্ক নিরুক্ত/৭/১/৫/৯] এক আত্মা থেকেই সকল দেবতাদের জন্ম হয়। এখানে আত্মা বলতে পরমাত্মাকেই বুঝিয়েছে। যিনি জগতের সৃষ্টি-স্থিতি-লয়ের কারণ, তিনিই পরমেশ্বর। এবং তার সমর্থন পাওয়া যায় ব্রহ্মসূত্রেও যেখানে বলা হয়েছে- “জন্মাদ্যস্য যতঃ[ব্রহ্মসূত্র/১/১/২] যার থেকে সৃষ্টি, স্থিতি ও লয় হয় তিনিই ব্রহ্ম।

এখন শাস্ত্রে সেই ব্রহ্ম কে তা দেখার বিষয়। আর শাস্ত্রে বলা হয়েছে যে—

অঙ্গুষ্ঠমাত্রঃ পুরুষো জ্যোতিরিবধূমকঃ।

ঈশানো ভূতভব্যস্য স এবাদ্য স উ শ্বঃ। এতদ্বৈতৎ ॥১৩৷

[কঠ উপনিষদ/২য় অধ্যায়/১ম বল্লী/১৩]

অর্থঃ— অঙ্গুষ্ঠপরিমাণ পুরুষ, ধূমহীন জ্যোতির ন্যায়, অতীত ও ভবিষ্যতের প্রভু ঈশান, অদ্যও তিনি (আছেন) কল্যও তিনি (থাকিবেন)।।

👉অর্থাৎ ত্রিকালের যিনি ঈশ্বর তিনি ঈশান মহাদেব।

শ্রীকৃষ্ণ বলছে— 

ঈশানায় ভবঘ্নায় নমোহস্ত্বন্ধকঘাতিনে।

নমো বিশ্বায় মায়ায় চিন্ত্যাচিন্ত্যায় বৈ নমঃ”

[মহাভারত/অনুশাসনপর্ব/অধ্যায় ১৩/৩১৪]

অর্থঃ— আপনি ঈশান, ভক্তের সংসারনিবর্তক, অন্ধকাসুরহন্তা, বিশ্বরূপী, মায়াবী, চিন্তনীয় ও অচিন্তনীয়; আপনাকে নমস্কার ॥৩১৪।।

পরমেশ্বর শিবই ত্রিকালে বর্তমান থাকেন। শিবই একমাত্র নিত্য বাদবাকী সকল কিছুই মিথ্যা

“এক এব শিবো নিত্যস্ততোহন্যৎসকলং মৃষা” [কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/শরভ উপনিষদ/৩০]।


পরমেশ্বর শিব থেকেই থেকেই সৃষ্টি, স্থিতি ও লয় হয়। ইতিহাস শাস্ত্র মহাভারতে একি কথায় বলা আছে পরমেশ্বর শিব থেকেই সৃষ্টি, স্থিতি ও লয় হয়— 

অতঃ প্রবর্ততে সর্বমস্মিন্ সর্বং প্রতিষ্ঠিতম্।

অস্মিংশ্চ প্রলয়ং যাতি অয়মেকঃ সনাতনঃ ॥৩৬৷৷

[মহাভারত/অনুশাসনপর্ব/অধ্যায় ১৫/৩৬]

অর্থঃ— মহাদেব হইতেই সমস্ত উৎপন্ন হয়, ইহাতেই সমস্ত প্রতিষ্ঠিত আছে এবং এই মহাদেবেই সকল লয় প্রাপ্ত হইয়া থাকে। সুতরাং একমাত্র মহাদেবই সনাতন ॥৩৬৷৷


👉অর্থাৎ শাস্ত্র থেকেই প্রমাণ শিবই একমাত্র পরমেশ্বর যার থেকে সমস্ত কিছুর উৎপত্তি হয়, প্রতিষ্ঠিত হয় ও সংহার হয়। এবং একি প্রমাণ পাওয়া যায় শ্রুতিতেও—

যো দেবানাং প্রভবশ্চোদ্ভবশ্চ বিশ্বাধিপা রুদ্র মহর্ষিঃ।

হিরণ্যগর্ভং পশ্যত জায়মানং পূর্ব্বং স নো বুদ্ধ্যা শুভয়া সংযুনক্তু।।১২

[শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ/অধ্যায় ৪/১২]

অর্থ — যাহা হইতে সমস্ত দেবতার উৎপত্তি,যিনি ঐ সকল দেবতাতে যে সকল শক্তি আছে তাহার ও হেতু,যিনি সর্ব্বলোকপিতামহ ব্রহ্মার ও জনয়িতা, পরমেশ্বর সর্ব্বজ্ঞ রুদ্র, যিনি রুদ্র রুপে সংহার করেন,সেই পরমেশ্বর রুদ্র তাগাদিগকে শুভদ্বায়িনী বুদ্ধি প্রদান করুক।।১২


👉যদি শাস্ত্র থেকে প্রমাণ দেখানো শুরু করি তাহলে এই লেখাটা সম্পূর্ণ হতে হতে সারাজীবন তথা জনম জনম লেগে যাবে৷ কিন্তু, তবুও মহাদেবের মাহাত্ম্যের বর্ণনা শেষ হবে না। 

শাস্ত্রের মধ্যে স্পষ্ট বলায় আছে যিনি তিনটা কৃত্য (সৃষ্টি-স্থিতি-লয়) প্রতিপাদন করেন তিনিই পরমেশ্বর। আর মহাদেব হলো পঞ্চকৃত্যকারী(সৃষ্টি-স্থিতি-লয়-তিরোভাব-অনুগ্রহ), তাই সাধারণ যৌক্তিক ভাবে চিন্তা করলে শিবই যে পরমেশ্বর তা আপনা আপনিই প্রমাণিত হয়ে যায়।


👉এবার সম্পূর্ণ খণ্ডনের সিদ্ধান্তের দিকে আসা যাক—

১. যোগ অর্থ হলো- পরমাত্মার সাথে জীবাত্মার সংযোগ। 

২. একগ্রতা বলতে যোগের সময়, একাগ্রচিত্তে পরমেশ্বর শিবের সাথে যুক্ত থাকার কথায় বোঝায়। 

৩. মহাভারতে শ্রীকৃষ্ণের যোগযুক্ত অবস্থা বলতে, পরমেশ্বর শিবের সাথে একাগ্রচিত্তে সংযুক্ত থেকে শিবজ্ঞান দেওয়াকেই বুঝিয়েছে। 

৪. আর একজন যোগী চাইলেই সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয় করতেই পারে। কারণ তখন যোগী সাক্ষাৎ শিব অবস্থাতে অবস্থান করে। তাই সেই যোগীর অসাধ্য কিছুই হয় না। 

৫. সাক্ষাৎ শিব অবস্থাতে উন্নীত হওয়ার কারণেই শ্রীকৃষ্ণকে অনেক ক্ষেত্রে পরমেশ্বর বলা হয় এবং শ্রীকৃষ্ণ নিজেই বলেন, তিনিই ব্রহ্ম। কিন্তু মূলত ব্রহ্ম বলতে শ্রীকৃষ্ণ নিজের আত্মস্বরূপ পরমেশ্বর শিবকেই বোধিত করেন। কেননা শ্রীকৃষ্ণের প্রতি মানুষের অধিক আগ্রহ থাকার কারণই হলো মহাদেবের দেওয়া বরদান। পরমেশ্বর শিবের বরদানের কারণেই, শ্রীকৃষ্ণ যুদ্ধে অপরাজেয় এবং প্রিয় থেকে প্রিয়তর—

রুদ্রভক্ত্যা তু কৃষ্ণেন জগদ্ব্যাপ্তং মহাত্মনা।

তং প্রসাদ্য তদা দেবং বদর্য্যাং কিল ভারত! ॥১০॥

অর্থাৎ প্রিযতরত্বঞ্চ সর্ব্বলোকেষু বৈ তদা।

প্রাপ্তবানেব রাজেন্দ্র! সুবর্ণাক্ষান্মহেশ্বরাৎ ॥১১৷৷

[মহাভারত/অনুশাসনপর্ব/অধ্যায় ১৩/১০-১১]

অর্থঃ— ভরতনন্দন! মহাত্মা কৃষ্ণ তখন বদরিকাশ্রমে আপন ভক্তির গুণে সেই রুদ্রদেবকে প্রসন্ন করিয়া জগৎ ব্যাপ্ত করিতে পারিয়াছেন ॥১০।।

রাজশ্রেষ্ঠ! এই কৃষ্ণ অগ্নিনেত্র মহাদেবের অনুগ্রহে তদবধি সমগ্র জগতে অর্থ অপেক্ষাও প্রিয়তরত্ব প্রাপ্ত হইয়াছেন ॥১১।।


👉মহাদেবেরই বরদানের ফলস্বরূপ শ্রীকৃষ্ণ, মহাদেব থেকেও অধিক প্রিয়তর। কেননা মহাদেব ভক্তবৎসল, একভক্ত একবাটি দুধ খেতে চেয়েছিলো, মহাদেব তাকে সম্পূর্ণ ক্ষীর সমুদ্রই প্রদান করেন। তাই শ্রীকৃষ্ণকে সাধারণ মানুষেরা ব্রহ্ম বলে জানার কারণ, পরমেশ্বর শিবের শ্রীকৃষ্ণের প্রতি অনুগ্রহই। এর পরবর্তী শাস্ত্র প্রমাণ ও দেখে নেব—

ততোহথ ভগবানাহ প্রীতো মাং বৈ যুধিষ্ঠির।।

অর্থাৎ প্রিযতরঃ কৃষ্ণো মৎপ্রসাদাদ্ভবিষ্যসি ॥৩১

অপরাজিতশ্চ যুদ্ধেষু তেজশ্চৈবানলোপমম্।

এবং সহস্রশশ্চান্যান্মহাদেবো বরান্ দদৌ ॥৩২॥

[মহাভারত/অনুশাসনপর্ব/অধ্যায় ১৭/৩১/৩২]

অর্থঃ— ধৰ্ম্মরাজ! তাহার পর ভগবান্ মহাদেব সন্তুষ্ট হইয়া আমাকে বলিলেন-

'কৃষ্ণ! তুমি আমার অনুগ্রহে ধন অপেক্ষাও লোকের প্রিয়তর হইবে। ৩১।।

অগ্নির ন্যায় তোমার তেজ হইবে, সুতরাং তুমি যুদ্ধে কখনও পরাজিত হইবে না। মহাদেব এইরূপ অল্প সহস্র সহস্র বর আমাকে দিয়াছিলেন।।৩২।।


👉তাই পরিস্কার বোঝায় যাচ্ছে শ্রীকৃষ্ণ কেন এত প্রিয় সবার কাছে। শ্রীকৃষ্ণ নিজেই বলছে, আমি মহাদেব থেকে এই বরসমূহ লাভ করেছি। তাই শ্রীকৃষ্ণকে শাস্ত্রের মধ্যে ব্রহ্ম বলার কারণ সবার কাছে স্পষ্ট। একে তো শ্রীকৃষ্ণ শিবতত্ত্ব, দ্বিতীয়ত শ্রীকৃষ্ণ পরমেশ্বর শিবের বরদানে অনুগ্রহিত ছিলেন। তাই সবদিক থেকেই পরমেশ্বর শিবের পরমত্বের মাহাত্ম্যই উঠে আসে, যা আলাদা করে প্রমাণ করতেই হয় না।

তাছাড়া শ্রীকৃষ্ণ ছিলেন পরমশৈব, পরমশিবভক্ত। কেননা শাস্ত্রই তা বলে। শুধু শাস্ত্র কেন, শ্রীকৃষ্ণ নিজেই পরমেশ্বর শিব থেকেই এই বরদান চেয়ে নেন যে, পরমেশ্বর শিবের প্রতি অচল ভক্তি থাকুক —

ততঃ প্রণম্য শিরসা ইদং বচনমব্রুবম্।

যদি প্রীতো মহাদেবো ভক্ত্যা পরমযা প্রভুঃ ॥৩৫।।

নিত্যকালং তবেশান! ভক্তির্ভবতু মে স্থিরা।

এষমস্ত্বিতি ভগবাংস্তত্রোক্ত্বান্তরধীযত। ৩৬।।

[মহাভারত/অনুশাসনপর্ব/অধ্যায় ১৭/৩৫-৩৬]

অর্থঃ— তদনন্তর আমি মস্তকদ্বারা নমস্কার করিয়া এই কথা বলিয়াছিলাম যে, আমার পরম ভক্তির গুণে যদি প্রভু মহাদেব সন্তুষ্ট হইয়া থাকেন, তাহা হইলে হে ঈশান ! সর্বদাই যেন আপনার উপরে আমার অচলা ভক্তি থাকে। "এইরূপই হউক" এই কথা বলিয়া ভগবান্ মহাদেব সেই স্থানেই অন্তর্হিত হইলেন।।৩৫-৩৬।।

👉তাই শ্রীকৃষ্ণ যে অর্জুনকে বলেছিলেন তৎকালে আমি পরব্রহ্মের সাথে যোগ যুক্ত ছিলাম তাই এই জ্ঞান দিতে সক্ষম হয়েছি। তাহলে সবার কাছে দিনের আলোর মতোই পরিস্কার যে সেই পরমব্রহ্ম টা শিব ছাড়া আর কেউ-ই নয়।


৬. সকল শাস্ত্রের মধ্যে যা অত্যন্ত গোপনীয় জ্ঞান তা হলো শিবজ্ঞান। তাই গীতার মধ্যে যে জ্ঞানটা রয়েছে তা মূলত পরমেশ্বর শিবেরই। কারণ শাস্ত্রেই বলা আছে শ্রুতি-স্মৃতি, ব্যাকরণাদি অঙ্গশাস্ত্র, পুরাণ ও অধ্যাত্মশাস্ত্রের মধ্যে যিনি অতীব গুহ্যভাবে আছেন তিনিই হচ্ছেন সাক্ষাৎ মহাদেব। 

ব্যাস উবাচ—

বেদাঃ সাঙ্গোপনিষদঃ পুরাণাধ্যাত্মনিশ্চয়াঃ ।

যদত্র পরমং গুহ্যং স বৈ দেবো মহেশ্বরঃ ॥৮৯

[মহাভারত/দ্রোনপর্ব/অধ্যায় ১৭০/৮৯]

অর্থঃ— ব্যাসদেব বলিলেন! ব্যাকারণাদি অঙ্গশাস্ত্র ও উপনিষদের সহিত সমস্ত বেদ এবং পুরাণ ও অধ্যাত্মশাস্ত্র এই গুলির মধ্যে যাহা অত্যন্ত গোপনীয়, তাহাই মহেশ্বর মহাদেব ॥৮৯


👉তাছাড়াও পদ্মপুরাণের পাতাল খণ্ডের ১৭৫ নং অধ্যায়ে, শ্রীবিষ্ণুজী নিজেই বলেছেন যে, গীতা সাক্ষাৎ মহাদেবকেই বোধিত করে। আর গীতার স্বরূপটা শিবেরই স্বরূপ। তাই এক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, শ্রীকৃষ্ণ, অর্জুনকে যে জ্ঞানটা প্রদান করেছিলেন, তা শিবজ্ঞানই ছিলো। এবং পরমেশ্বর শিবের সাথেই একাগ্রভাবে সংযুক্ত থেকেই সেই জ্ঞান অর্জুনকে দিয়েছিলো।


👉এবং শ্রুতি অনুযায়ী সকল বিদ্যার অধিপতি সাক্ষাৎ শিবই —

ॐ ঈশানঃ সর্ববিদ্যানাং ঈশ্বরঃ সর্বভূতানাং।।

[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/তৈত্তিরীয় আরন্যক/১০ম প্রপাঠক/২১ নং মন্ত্র]

অর্থঃ— ঈশান মহাদেব সকল বিদ্যা ও ভূতের অধিপতি।

তাই এটা পরিস্কার হয় যে, গীতার মধ্যে যে বিদ্যা রয়েছে তা সাক্ষাৎ পরমেশ্বর শিবের প্রতিই সমর্পিত। শুধু গীতা কেন সমগ্র শাস্ত্রের বিদ্যা পরমেশ্বর শিবে প্রতিই সমর্পিত।


👉দেখুন একি কথার সামঞ্জস্যতা শ্রুতি শাস্ত্রের সাথেও এক হয়, যেখানে বলা হচ্ছে সকল বেদ অধ্যয়ন করলে যাকে জানা যায় তিনিই পরমেশ্বর শিব—

যোহসৌ সর্বেষু বেদেষু পঠতে হ্যজ ঈশ্বরঃ।

অকাযো নির্গুণোহধ্যাত্মা তন্মে মনঃ শিবসংকল্পমস্তু ॥ ২৩

[ঋগবেদ/ খিলানি/৪নং অধ্যায়/১১নং খিলা]

অর্থ – সমগ্র বেদ পাঠ করলে যাকে একমাত্র ঈশ্বর বলে জানা যায়, যিনি (পরমার্থে) একমাত্র নিরাকার নির্গুণ, সেই পরমেশ্বর শিবের প্রতি আমার মন সংকল্পিত হোক ॥২৩

👉তাই শাস্ত্রের অনর্থ করে, ভুলভাল কিছু প্রমাণ করতে যাবেন না। কারণ আপনার অর্থ করা ব্যাখ্যা যদি অন্যান্য শাস্ত্রের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না থাকে তাহলে তা কদাপি মান্যতা পাবেনা, যতই আপনি ব্যাকরণাদি দিক থেকে চেষ্টা করুন না কেন। প্রথমত বেদ বাক্যের কখনো খণ্ডন হয় না, ব্যাকরণাদি শাস্ত্র দ্বারা অর্থ বের করলেও অন্যান্য শাস্ত্রের সাথে পরস্পর মিল থাকতে হবে, নাহলে তা প্রক্ষিপ্ত হিসেবেই গণ্য করা হবে। তাছাড়া নীতি শাস্ত্রে বলা আছেই অহেতুক শাস্ত্রের ব্যাকরণগত অর্থ করে লোকের কাছে প্রসংশনীয় হওয়ার জন্য, নিজের মতবাদ প্রতিষ্ঠা করা যাবে না —

সমাসব্যূহহেত্বাদিকৃতেচ্ছার্থং বিহায় চ।

স্তুত্যর্থবাদান্‌ সন্ত্যজ্য সারং সংগৃহ্য যত্নতঃ।।৩৮

ধর্ম্মতত্ত্বং হি গহন মতঃ সৎসেবিতং নরঃ।

শ্রুতিস্মৃতিপুরাণানাং কর্ম্ম৷ কূর্য্যাৎ বিচক্ষণঃ।।৩৯

[শুক্রনীতি/৩য় অধ্যায়/৩৮-৩৯]

অর্থঃ— ধর্মতত্ত্ব নির্জন কানন স্বরূপ অতি দুরভিগম্য, অতএব বিচক্ষণ লোকেরা বেদ, স্মৃতি, পুরাণ ইত্যাদি শাস্ত্রের নানা প্রকার সমাসের দ্বারা ও নানা প্রকার কারণ ঘটিয়ে তার দ্বারা নিজের অভিমতসিদ্ধ অর্থ করা পরিত্যাগ করবে। এরূপ অর্থ ঘটালে লোকে প্রসংশা করবে সেই প্রশংশাবাদ ত্যাগ করবে এবং সৎলোকেরা যেরূপ আচরণ করে সেরূপ কার্য ই করবে।।৩৮/৩৯।।


👉তাই শ্রুতিই যখন সাক্ষ্য দিচ্ছে যোগের মূল অর্থ পরস্পর সাংযোজন, তাহলে সেটাকে ঘুরিয়ে অন্য দিকে নিয়ে গেলেও তা কখনোই মান্যতা পাবে না। তাছাড়াও শ্রুতির বচনই সর্বাধিক মান্যতা পাবে, কেননা শ্রুতি এবং স্মৃতির বিরোধে, শ্রুতিই বলবান হয়—

শ্রুতি স্মৃতি পুরাণানাং বিরোধো যত্র দৃশ্যতে ।

তত্র শ্রৌতং প্রমাণস্তু তয়োর্দ্বৈধে স্মৃতিব্বরা ॥


[ব্যাস সংহিতা/ অধ্যায় ১/৪]


অর্থঃ— যেখানে শ্রুতি, স্মৃতি ও পুরাণের বিরোধ দেখা যায়, সেখানে শ্রুতির কথনই বলবান এবং যেস্থলে স্মৃতি ও পুরাণের বিরোধ দেখা যায়, সেখানে স্মৃতির কথনই বলবান।



👉তাই এবার আর বৈষ্ণবদের মনগড়া মত চলবে না। কারণ বেদ যেহেতু অখণ্ডনীয়, তাই পুরাণ, ইতিহাস, দর্শন দ্বারা অহেতুক অসামঞ্জস্যপূর্ণ অর্থ করে বেদকে খণ্ডানোর চেষ্টা বিফলই হবে।

তাছাড়া বৈষ্ণবরা তো চিরকালই ভাঁড় ছিল, হাসির পাত্র ছিলো এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। বারংবার কিছু স্তুতি লিখে শৈবদের খণ্ডানোর যে চেষ্টা ওদের তা রীতিমতো প্রতিবারেই ব্যর্থ হয়। এবং নিজেদের হাসির পাত্র করে সবার সামনে। আসলে দোষ ওদের কি দেবো; ওদের পূর্বপুরুষ দক্ষেরও এক‌‌ই শিববিদ্বেষী রোগ হয়েছিলো, বীরভদ্রের হাতে মারা খাওয়ার পর পরমেশ্বর শিব যখন ছাগলের মুণ্ডি লাগিয়ে দিলো তখন দক্ষের বুদ্ধি সঠিক দিশাতে এসেছিলো। সেই যে পরমেশ্বর শিব দক্ষকে ছাগলের মুণ্ডি লাগিয়ে দিলো না, সে থেকেই বৈষ্ণবদের স্বভাবই পাঁঠা ছাগলের মতো হয়ে গেছে 🐐🐐। বলির আগে অনেক তিড়িংবিড়িং করে কিন্তু, শেষ গন্তব্য হয় হাড়িকাঠে গলা দেওয়া।

সমস্যা নেই আমরা শৈবরা, বকরামুণ্ডি বৈষ্ণবদের পাঁঠার জীবন থেকে মুক্তি দেবো, কারণ শৈবরা অনেক দয়ালু হয়। আমরা শৈবরা সবার প্রতি, সকল জীবের প্রতিই আদর এবং স্নেহ ভাবই রাখি, হোক না সে বৈষ্ণব পাঁঠা তাদের জন্য এক‌ই স্নেহ আমাদের মনে আছে, কারণ আমাদের হৃদয় বিশাল 😌


৭. যদি আমরা মেনেও নিই যে, শ্রীকৃষ্ণই পরমেশ্বর। গীতাতে যে জ্ঞান রয়েছে, তা শ্রীকৃষ্ণ নিজেই বলেছেন এবং অর্জুনকে শ্রীকৃষ্ণ নিজেই জ্ঞান প্রদান করেছিলেন। তাতেও পরমেশ্বর শিবের মাহাত্ম্যের বিন্দু পরিমাণও হানি হয় না এবং শিবের পরমত্বও খণ্ডিত হয় না। কেননা শ্রীকৃষ্ণ প্রথমত বিষ্ণুর অবতার। দ্বিতীয়ত বিষ্ণুরূপটা পরমেশ্বর শিবই ধারণ করেন। তৃতীয়ত যদিও শ্রীকৃষ্ণকে স্বতন্ত্র মেনেই নিই তাহলেও পরমেশ্বর শিবের পরমত্ব বিন্দু পরিমাণও হানি হয় না। কারণ শ্রুতি অনুযায়ী শ্রীকৃষ্ণের রূপটা পরমেশ্বর শিবই ধারণ করছে। তাছাড়াও শ্রীকৃষ্ণ হলো শিবতত্ত্ব। তাহলে শাস্ত্রের দিকে নজর দেওয়া যাক—

অপশ্যং ত্বাবরোহন্তং নীলগ্রীবং বিলোহিতম্।

উত ত্বা গোপা অদৃশন্নত ত্বোদহার্যঃ ॥ ১ 

উত ত্বা বিশ্বা ভূতানি তস্মৈ দৃষ্টায় তে নমঃ।

নমো অস্ত্র নীলশিখণ্ডায় সহস্রাক্ষায় বাজিনে ॥ ২

[অথর্ববেদ/নীলরুদ্র উপনিষদ/২য় খণ্ড]

অর্থ – হে রক্তবর্ণ (নেত্রযুক্ত) নীলকন্ঠ শিব! আমি ধরণীতে অবতরিত হতে থাকা আপনার স্বরূপ দর্শন করেছি, আপনার সেই স্বরূপ কে হয় গোপেরা দর্শন করেছে অথবা জল ভরতে থাকা গোপিনীরা দেখেছে অথবা বিশ্বের সমস্ত প্রাণী দেখেছে। আপনাকে দেখতে থাকা আপনার সেই শ্রীকৃষ্ণ স্বরূপ কে আমি নমস্কার করি।।

হে ময়ূরপুচ্ছমুকুটধারী ভগবন! আপনার প্রতি আমাদের নমস্কার। হে রুদ্রদেব! মহান শক্তিশালী ইন্দ্ররূপও আপনি স্বয়ং। আপনি আপনার প্রিয় ভক্তজনেদের সামনে অসংখ্য নেত্র দ্বারা যুক্ত হয়ে নিজের বিরাট রূপে প্রকট হয়ে থাকেন ॥ ১-২ ৷৷


স এস রুদ্রভক্তশ্চ কেশবো রুদ্রসম্ভবঃ।

সর্ব্বরুপং ভবং জ্ঞাতা লিঙ্গে যোহর্চ্চয়ত প্রভুম্।।৬২

[মহাভারত/দ্রোনপর্ব্ব/অধ্যায় ১৬৯/৬২]

অর্থ — যিনি জগদীশ্বর শিবকে সর্বভূতে ব্যাপ্ত জেনে তার লিঙ্গ স্বরূপে তার পুজা করতেন সেই নারায়ণ এই কৃষ্ণ,তিনি শিবাংশজাত ও শিবভক্ত।।৬২


👉এক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে, শ্রীকৃষ্ণ যদিও স্বতন্ত্র পরমেশ্বর হয়, তাহলেও পরমেশ্বর শিবের পরমত্ব খণ্ডন হয় না। যেহেতু শাস্ত্রে দেখা যাচ্ছে, শ্রীকৃষ্ণ সাক্ষাৎ শিবতত্ত্ব, তাই শ্রীকৃষ্ণকে পরমেশ্বর বললেও তা শিবকেই বোঝায়। কারণ শ্রুতিতে ঈশ্বরকে এক এবং অদ্বিতীয় বলা হয়েছে। তাই দু জন ব্রহ্ম হতেই পারে না। আর যদি তাই হয়, তাহলে শ্রুতি বাক্য মিথ্যা এবং প্রক্ষিপ্ত প্রমাণিত হয়। তাই সর্বশাস্ত্রের সিদ্ধান্তনুযায়ী এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায়- শ্রীকৃষ্ণ নিজের আত্মস্বরূপ পরমেশ্বর শিবকেই ব্রহ্ম বলেছেন। এবং পরমেশ্বর শিবের সাথেই একাগ্রভাবে সংযুক্ত থেকেই সেই জ্ঞান অর্জুনকে বলেছিলেন। 


✴️যোগ সম্পর্কে আরোপিত বৈষ্ণবগণের প্রথম দাবী শৈবপক্ষ দ্বারা সংক্ষিপ্ত আকারে খণ্ডানোর ১ম পর্ব শেষ হলো।।


———————————————————————

⚠️যোগ সম্পর্কে আরোপিত বৈষ্ণবগণের ২য় দাবী—


❎বৈষ্ণবদের দাবী— "জগদ্ব্যাপারবর্জং প্রকরণাদসন্নিহিতত্বাচ্চ" [ব্রহ্মসূত্র/৪/৪/১৭] জীবন্মুক্ত/মুক্ত পুরুষ, সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় করতে পারে না। জীবন্মুক্তরা ব্রহ্মজ্ঞান প্রাপ্ত হলেও, সাক্ষাৎ ব্রহ্মের কৃত্য করতে অসমর্থ। অর্থাৎ ব্রহ্ম এবং জীবের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে বিশিষ্টাদ্বৈত দর্শন অনুযায়ী।


✅অদ্বৈত শৈবসিদ্ধান্ত দ্বারা খণ্ডন— বৈষ্ণবদের এই দাবীটা কিছুটা সঠিক যে, ব্রহ্ম আর জীবের মধ্যে পার্থক্য আছে। "নেতরোহনুপপত্তে" [ব্রহ্মসূত্র/১/১/১৭] ও "ভেদবপদেশাচ্চ [ব্রহ্মসূত্র/১/১/১৮] অনুযায়ী এটা ঠিক যে, ব্রহ্মের আর জীবের মধ্যে কিঞ্চিত পার্থক্য আছে কিন্তু, সেই পার্থক্য একটা মায়ার আস্তরণের মাত্র।  অদ্বৈত শৈবদর্শন অনুযায়ী, এক শিবই নিজেকে মায়ার দ্বারা আবদ্ধ করে জীব হচ্ছে। তাই মায়াকে উত্তীর্ণ করতে পারলে শিব আর জীবের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না৷ পাশবদ্ধ হলে জীব, পাশমুক্ত হলে সদাশিব, যা [স্কন্দ উপনিষদ/৭ নং মন্ত্র] দ্বারা প্রমাণিত।

তাছাড়া পরমেশ্বর শিব ও মাতা দুর্গা সকলকে মায়া দ্বারা আবদ্ধ করে রাখে, যাতে কেউ পরমেশ্বর শিবকে জানতে না পারে। কারণ জীব যদি মায়ায় আবদ্ধ না হয়, তাহলে সকলেই মোক্ষ পেয়ে যাবে, সৃষ্টি আর নিজ গতিতে পরিচালিত হবে না। তাই পরমেশ্বর শিব ও মাতা দুর্গা নিজ মায়া দ্বারা সকল জীবকে আবদ্ধ করে রাখে, যার প্রমাণ [মহাভারত/শান্তিপর্ব/অধ্যায় ২৭৬/২৫][মহাভারত/অনুশাসনপর্ব/অধ্যায় ১৫/৫৬] অনুযায়ী সিদ্ধ হয়।


তাছাড়াও শ্রুতিতেও একি কথার সমর্থন পাওয়া যায়—

এষ সর্বেষু ভূতেষু গূঢ়াত্মা ন প্রকাশতে।

দৃশ্যতে দ্ব্যগ্রয়া বুদ্ধ্যা সূক্ষ্ময়া সূক্ষ্মদর্শিভিঃ ॥১২

[কঠ উপনিষদ/১ম অধ্যায়/৩য় বল্লী/১২]

অর্থঃ— ব্রহ্ম যদিও সকল প্রাণীর মধ্যে বিদ্যমান তথাপি তাঁহার স্বরূপ মায়া শক্তির দ্বারা আবৃত বলিয়া তিনি প্রকাশ পান না। যাঁহারা সূক্ষ্ম বস্তু দর্শন করিতে অভ্যস্ত তাঁহারা একাগ্র ও সূক্ষ্ম বুদ্ধির দ্বারা তাঁহাকে দর্শন করিতে পারেন।।


👉ব্রহ্মভাব প্রাপ্ত হলে কি যোগী সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয় করতে পারে নাকি পারে না, তার প্রমাণও শ্রুতি থেকেই দেখে নেব—

বিরাড রূপে মনো হঞ্জন্মহিমা-মবাপ্পয়াৎ।

চতুর্মুখে মনো যুঞ্জঞ্জগৎসৃষ্টিকরো ভবেৎ ॥

[যোগশিখা উপনিষদ/৫ম অধ্যায়/৫২]

টীকাঃ— বিরাড রূপে (জগদ্ব্যাপিসূক্ষ্মচৈতন্যে। মনঃ যুঞ্জন্ (সংযোগং কুর্ব্বন্) যোগী মহিমানম্ (ক্ষুদ্রত্বং তিতা বৃহত্তম্। আপুয়াৎ। চতুর্মুখে (ব্রহ্মণি) মনঃ যুঞ্জন্ যোগী জগৎসৃষ্টি- করঃ ভবেৎ।

অর্থঃ— বিরাট্‌রূপে মনোযোগ করিলে, বৃহৎ হইতে পারা যায়। ব্রহ্মায় মনোযোগ করিলে, জগৎসৃষ্টির সামর্থ্য জন্মে।


⬇️

ইন্দ্ররূপিণমাত্মানং ভাবয়ম্মর্ত্যভোগবান্।

বিষ্ণুরূপে মহাযোগী পালয়েদখিলং জগৎ ॥৫৩

[যোগশিখা উপনিষদ/৫ম অধ্যায়/৫৩]

টীকাঃ— আত্মানম্ (স্বম্) ইন্দ্ররূপিণং ভাবয়ন্ যোগী মর্ত্যভোগবান্ ভবেৎ (মর্ত্যলোকে সুখভোগাদিকং প্রাপ্লযাৎ ইত্যর্থঃ) মহাযোগী বিষ্ণুরূপে মনে। যুগ্মন্ অখিলং জগৎ পালয়েৎ।

অর্থঃ— নিজকে ইন্দ্ররূপ ভাবনা করিলে, মর্ত্যলোকে ভোগলাভ হয়। বিষ্ণুরূপে মনোযোগ করিলে, সমস্ত জগৎকে পালন করিবার শক্তি জন্মে।


⬇️

রুদ্ররূপে মহাযোগী সংহরত্যের তেজসা॥৫৪

[যোগশিখা উপনিষদ/৫ম অধ্যায়/৫৪]

টীকাঃ— মহাযোগী রুদ্ররূপে মনো যুঞ্জন্ তেজসা সংহরতি (সব্বং দগ্ধং সমর্থঃ ভবতি ইত্যর্থঃ)। 

অর্থঃ—যে মহাযোগী ব্যক্তি, রুদ্ররূপে মনঃসংযম করেন, তিনি তেজের দ্বারা সমস্ত সংহার করতে পারেন।।

[মহাভারত/অনুশাসনপর্ব/অধ্যায় ১৭/৬৩/৬৪] অনুযায়ী, যে ব্যক্তি পাপ বা পূণ্য কর্মে লিপ্ত হয়, সে আত্মজ্ঞানী হলে, শিব কৃপা করে তাকে ব্রহ্মত্ব, বিষ্ণুত্ব, ইন্দ্রত্ব কিংবা ত্রিভুবনের অধিপতিত্ত্ব দান করেন।


👉এমনকি শ্রীবিষ্ণুও এক‌ই কথায় বলছে যে, যোগী যোগের একটা পর্যায়ে পৌঁছালে সে সৃষ্টি-স্থিতি-লয় ইত্যাদি করতে পারে—

যত্র বায়ুঃ স্থিরঃ খে স্যাৎ সেয়ং প্রথমভূমিকা।

যত্রাত্মনা সৃষ্টিলয়ৌ জীবন্মুক্তিদশাগতঃ।

সহজঃ কুরুতে যোগং সেয়ং নিষ্পত্তিভূমিকা।।

[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/বরাহ উপনিষদ/অধ্যায় ৫/৭৫]

অর্থঃ— যোগী জীবন্মুক্তিদশা স্বভাবতঃ স্বয়ং যোগ অবলম্বন করত সৃষ্টি, স্থিতি ও লয় করিতে পারেন, তখন তাহার নাম নিপত্তি ভূমিকা।।

অর্থাৎ যোগী চাইলেই সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয় করতেই পারে।। 

পরম পবিত্র শিবমহাপুরাণেও একি কথায় পরমেশ্বর শিব, ব্রহ্মা এবং বিষ্ণুকে বলেছেন —

এতৎকালে তু যঃ কুর্যাৎ পূজাং মল্লিঙ্গবেরয়োঃ ।

কুর্যাৎ স জগতঃ কৃত্যং স্থিতিসর্গাদিকং পুমান্ ॥ ১১ ॥

[শিবমহাপুরাণ/বিদ্যেশ্বর সংহিতা/অধ্যায় ৯/১১]

অর্থঃ— এই সময় (শিবমহারাত্রিতে) যে পরমেশ্বর শিবের লিঙ্গস্বরূপ (নিষ্কল-অঙ্গ- আকৃতিরহিত নিরাকার ব্রহ্মের প্রতীক) এবং প্রতিকৃতি (সকল- সাকার স্বরূপের প্রতীক বিগ্রহ) এর পূজা করবে, সেই ব্যক্তি জগতের সৃষ্টি-স্থিতি-লয় ইত্যাদি কৃত্য করতে সক্ষম হবে।।১১।।


👉তাহলে দেখা যাচ্ছে যে— যোগী ব্যক্তি সাধনা দ্বারা সবই করতে পারেন। যোগীর জন্য সৃষ্টি থেকে লয় পর্যন্ত কার্য করা কোনো বিশেষ অসমর্থের না। 

⚠️তাহলে এবার এখানে সংশয় থেকে যাচ্ছে তাহলে, শাস্ত্র কি পরস্পর বিরোধী ?

কারণ ব্রহ্মসূত্রের সাথে শ্রুতির বিপরীর বক্তব্য দেখা যাচ্ছে, তাহলে মান্যতা কোনটা পাবে এমন একটা শংকা থেকেই যাচ্ছে !


✅শংকা নিবারণ— আসলে এখানে মীমাংসার একটা ব্যাপার আছে। ব্রহ্মসূত্রের "পুরুষার্থোহতঃ শব্দাদিতি বাদরায়ণঃ" [ব্রহ্মসূত্র/৩/৪/১] অনুযায়ী যিনি ব্রহ্মকে জানেন তিনি অমৃত স্বরূপ হন। অর্থাৎ সাক্ষাৎ ব্রহ্মস্বরূপ হন। আর যিনি ব্রহ্মস্বরূপে স্থিত হন, তার দ্বারা এমন কোনো কার্য নেই যা করা অসাধ্য হবে।

বৈষ্ণবগণ [ব্রহ্মসূত্র/৪/৪/১৭] নং প্রমাণ দেখিয়ে অর্ধসত্যই তুলে ধরেছে। এবং যোগীর মাহাত্ম্যকে ছোট করেছে। 

ব্রহ্মসূত্রের "প্রত্যক্ষোপদেশাদিতি চেন্নাধিকারিকমণ্ডলস্থোক্তেঃ" [ব্রহ্মসূত্র/৪/৪/১৮] ও "বিকারবর্ত্তিবচ তথা হি স্থিতিমাহ" [ব্রহ্মসূত্র/৪/৪/১৯] অনুযায়ী, যোগী নির্গুণ ব্রহ্মস্বরূপে স্থিত হন। কোনো বিকার থাকে না তার, মায়া থেকে মুক্ত হয়। অর্থাৎ যোগীর সে ক্ষমতা থাকে যে, যোগী চাইলেই জগৎ সৃষ্টি করতে পারবে, পালন করতে পারবে, ধ্বংস করতে পারবে। কিন্তু যোগী তা করে না, কেননা যোগী সকল বিকার ও মায়া থেকে মুক্ত হয়ে অমৃত স্বরূপ হয়েছে তাই যোগী তা করে না। কিন্তু তার অর্থ এমন নয় যে, যোগী করতে পারবে না। নির্গুণ ঈশ্বর জগৎ কে সৃষ্টি করার নিমিত্তেই সগুণ হয়ে গুণের আশ্রয় নেন। কিন্তু সকল মায়ার প্রভাব থেকে মুক্ত মূলত ঈশ্বর নির্গুণ। 


আরও সহজ ভাবে বলতে গেলে উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে —

আমার হাতে ধারালো অস্ত্র আছে, আমি চাইলেই কাউকে মারতে পারি কিন্তু, আমি তাকে মারবো না। এখানে না মারা, বা না করার যে ভাব, ওটিই মায়ার ঊর্ধ্বে। কেননা যোগী সংসারকে ত্যাগ করেই ব্রহ্মস্বরূপে নিজেকে স্থিত করেছেন, তাই তার পুনরায় এই জগৎ সংসার উৎপাদন করার কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই। 

আর যদি যোগীর সে ক্ষমতা নাই থাকতো তাহলে "তত্ত্বমসি" তুমিই ব্রহ্ম [ছাঃউঃ/৬/৮/৭], "সর্ব্বম খল্বিদং ব্রহ্ম" সবকিছুই ব্রহ্ম [ছাঃউঃ/৩/১৪/১], "ব্রহ্ম বেদ ব্রহ্মৈব ভবতি" যিনি ব্রহ্মকে জানেন, তিনি ব্রহ্ম স্বরূপ হন [মুণ্ডক উঃ/৩/২/৯], "স যো হ বৈ তৎপরমং ব্রহ্ম যো বেদ বৈ মুনিঃ .ব্রহ্মৈব ভবতি স্বস্থঃ সচ্চিদানন্দ মাতৃকঃ" যিনি ব্রহ্মকে জানেন তিনি সেই সৎ-চিৎ-আনন্দ স্বরূপ ব্রহ্মস্বরূপ প্রাপ্ত হন [রুদ্রহৃদয় উঃ/৫২], তাহলে এসব শ্রুতি বাক্য মিথ্যা প্রমাণিত হয়ে যেত। আর শ্রুতিকে বিশ্লেষণ করা যায়, খণ্ডন করা যায় না। 


তাছাড়া শাস্ত্রে জীব ও পরমাত্মার ভেদ বলতে কিছুও নেই —

"অবস্থিতেরিতি কাশকৃৎস্নঃ" [ব্রহ্মসূত্র/১/৪/২২]

[পদচ্ছেদঃ-অবস্থিতেঃ (ঐরূপে অবস্থান হেতু), ইতি (ইহা) কাশকৃৎস্নঃ (কাশকৃৎস্ন- নামক আচার্য্য) [ মনে করেন]।

[ সরলার্থঃ-"যঃ আত্মনি তিষ্ঠন আত্মনোহন্তরঃ” ইত্যাদিভ্যঃ পরমাত্মন এব জীবে অন্তরাত্মতয়া অবস্থিতেঃ হেতোঃ জীবাত্মশব্দস্থাপি পরমাত্মনি পর্যবসানাং জীবাভিধায়কশব্দেন পরমাত্মনোহভিধানম্, ইতি কাশকৃৎস্ন আচার্য্যো মন্যতে]

'যিনি আত্মাতে অবস্থান করেন' ইত্যাদি শ্রুতি হইতে জানা যায় যে, পরমাত্মাই অন্তর্যামি- রূপে জীবাত্মার মধ্যে অবস্থান করেন, এইরূপ অবস্থান করেন বলিয়াই জীববাচক শব্দে পরমাত্মার নির্দেশ করা হইয়াছে, ইহা কাশকৃৎস্ননামক আচার্য্যের মত।।১/৪/২২।।

👉তাই এক্ষেত্রে বলা যায় যে, ব্রহ্মই যেহেতু জীবাত্মা রূপে অবস্থান করছেন, তাই জীব ও ব্রহ্মের মধ্যে মাঝখানে একটা মায়ার আস্তরণ ছাড়া আর বিশেষ কোনো পার্থক্য নেই। কেননা ব্রহ্মই নিমিত্ত, ব্রহ্মই উপাদান।


👉তাই অদ্বৈত শৈব দর্শন অনুসারে ইহাই মান্য যে, যোগীর ইচ্ছা হলে সে সব করতে পারে, কিন্তু সে মায়ার ঊর্ধ্বে ও বিকার মুক্ত ভাবে অবস্থান করার কারণে যোগী তা করে না। তাই দেখতে গেলে এখানে যে একটা শাস্ত্রের পরস্পর বিরোধের একটা ভাব দেখা যাচ্ছিলো, তার সমাধান শাস্ত্র অনুসারেই হয়। তাই এ ক্ষেত্রে বৈষ্ণবগণেদের দ্বারা আরোপিত অর্ধসত্য বাক্য, অদ্বৈত শৈব দর্শন অনুসারে খণ্ডিত হয় এবং মীমাংসার দৃষ্টান্ত স্থাপন হয়৷।


👉 বকরামুণ্ডি বৈষ্ণবদের উদ্দেশ্যে ছোট্ট একটা বক্তব্য  —

নাপ্তোপদেশং সংবেত্তি বিদ্যামত্তঃ স্বহেতুভিঃ।

অনর্থ মপ্যভিপ্রেতং মন্যতে' পরমার্থবৎ' ॥ ৮৮ ॥

[শুক্রনীতি/অধ্যায় ৩]

অর্থ — বিদ্যাতে উন্মত্ত হইলে কেহ উপদেশ প্রদান করিলেও তাহা অগ্রাহ্য করে এবং নিজের অন্যায় মতকে পরমার্থের ন্যায় জ্ঞান করিয়া থাকে। ৮৮॥


👉সমাজে একটা প্রবাদ খুব বেশি প্রচলিত আছে, "অকাল পক্ক ফলে পচন শীঘ্র ধরে"। অর্থাৎ সময়ের আগে পেঁকে গেলে, সবার আগে নষ্টও হতে হয়। তাই অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্করী হতে যাবেন না। কারণ বাঘের উপরেও টাক থাকে। কারণ আপনারা যদি মনে করেন, আপনারা সর্বেসর্বা তাহলে এটা আপনাদের ভুল ধারণ ছাড়া কিছুই নয়। আপনারা বোকার স্বর্গে বসবাস করছেন। 

তাই কাউকে বিচার করতে গিয়ে এতটাই ঘাটাবেন না, যাতে নিজেদের অস্তিত্ব হারানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়।


🔥অদ্বৈত শৈবপক্ষ দ্বারা, বিশিষ্টাদ্বৈতবাদী রামানুজী সহ সকল বৈষ্ণবদের পক্ষ থেকে আরোপিত মিথ্যা দাবীর খণ্ডনের ১ম পর্ব সমাপ্ত হলো। ইহা সংক্ষিপ্ত আকারে ১ম পর্বের খণ্ডন ছিলো। যদি এর পরেও বৈষ্ণবগণ কতৃক, পরমেশ্বর শিবের বিরুদ্ধে অপপ্রচার দেখা যায়, তাহলে সেই খণ্ডনটা চূড়ান্ত পর্যায়ে হবে। 



 নমঃ শিবায় 🙏🚩

 সাম্বসদাশিবায় নমঃ 🚩🙏

ॐ দক্ষিণামূর্তয়ে নমঃ 🙏🚩

শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্ ✊🚩

ॐ নমঃ পার্বতীপতয়ে হর হর মহাদেব ✊🚩

✍️অপপ্রচার দমন ও লেখানীতেঃ— অন্তিক ভট্টাচার্য্য (শম্বরনাথ শৈব)

বিশেষ কৃতজ্ঞতা — আমার গুরু শ্রী নন্দীনাথ শৈবাচার্য জী ও শ্রী রোহিত কুমার চৌধুরী শৈবজীকে 🙏

কপিরাইট ও প্রচারে — SHIVALAYA 

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ