বেদ অনুসারে — ব্রহ্ম কে ? (বৈশিষ্ট্য ও লক্ষণের ভিত্তিতে)




ভূমিকা ঃ
বর্তমানে সনাতন ধর্মের যে বেহাল অবস্থা হয়েছে, সেখানে ব্রহ্ম কে ? এটি নির্ণয় করতে হচ্ছে । এতটাই নির্বোধ হয়েছে আজকের সমাজ যে তারা ব্রহ্মের বৈশিষ্ট্য কি কি হয় তা পর্যন্ত আন্দাজ করতে অক্ষম হয়ে গেছে। কিন্তু আমরা শৈব রা এই অজ্ঞানতার অন্ধকার থেকে সমাজ কে মুক্ত করবার জন্য এই বিষয়ে আলোকপাত করবো ।  


  ব্রহ্ম কে ?



উত্তর ঃ

এই নিয়ে মুণ্ডক শ্রুতিতে বর্ণিত ব্রহ্মের অবস্থার সম্পর্কে ক্ষুদ্র বিশ্লেষণ —

যত্তদদ্রেশ্যমগ্রাহ্যমগোত্রমবর্ণমচক্ষুঃশ্রোত্রং তদপাণিপাদম্।
নিত্যং বিভুং সর্বগতং সুসূক্ষ্মং তদব্যয়ং যদ্ভূতযোনিং পরিপশ্যন্তি ধীরাঃ। ৬ ।।

[অথর্ববেদ/মুণ্ডক উপনিষদ/১/১/৬]
অর্থ— পরব্রহ্ম পরমেশ্বর জ্ঞানেন্দ্রিয় দ্বারা অধিগম্য হন না, এমন কি কর্মেন্দ্রিয় দ্বারাও অগম্য। এই ব্রহ্ম গোত্রাদি উপাধিশূন্য তথা ব্রাহ্মণাদি বর্ণগত ভেদ তথা পীতাদি বর্ণ এবং আকৃতি শূন্য। ওই ব্রহ্ম নেত্র, কর্ণাদি জ্ঞানেন্দ্রিয় তথা হস্ত পদাদি কর্মেন্দ্রিয়শূন্য। ওই ব্রহ্ম অত্যন্ত সূক্ষ্ম, ব্যাপক, অন্তরাত্মারূপে সর্বত্র প্রসারিত এবং সর্বতোভাবে অবিনাশী অর্থাৎ নিত্য। জ্ঞানীজন সমস্ত প্রাণীর ওই কারণকে সর্বত্র পরিপূর্ণরূপে অনুভব করেন।।৬।।

এখানে ব্রহ্মের সম্পর্কে শ্রুতিতে যা বলা হয়েছে তা কিছুটা এমন— ব্রহ্ম জ্ঞান ও কর্মেন্দ্রিয় দ্বারা অগম্য। ব্রহ্ম নিরাকার, জাত, গোত্র, বর্ণ রহিত। ব্রহ্ম চক্ষু, কর্ণ, হস্ত, পদ রহিত। যিনি, সর্বব্যাপী, সুক্ষ্ম, ক্ষয়বৃদ্ধি রহিত। অবিনাশী সর্বদা নিত্য, স্থাবরজঙ্গমাদি সকল বস্তুতে আত্মরূপে বিরাজমান। যিনি সর্বকারণের কারণ সেই ব্রহ্মকে, জ্ঞানী ব্যক্তিগণ সর্বত্র অনুভব করেন।
উক্ত ব্রহ্মের অবস্থার উপর, শাস্ত্রের ভিত্তিতে কিছু সামান্যতম বিশ্লেষণ —
—————————————————————
—————————————————————
১. ব্রহ্ম  জ্ঞান ও কর্মেন্দ্রিয় দ্বারা অগম্য

👉এই প্রসঙ্গে শ্রুতিতে বলা আছে —
নান্তঃপ্রজ্ঞং ন বহিপ্রজ্ঞং নোভয়তঃপ্রজ্ঞং ন প্রজ্ঞানঘনং ন প্রজ্ঞং নাপ্রজ্ঞম্। অদৃষ্টমব্যবহার্যমগ্রাহ্যমলক্ষণমচিন্ত্যমব্যপদেশ্যমেকাত্মপ্রত্যয়সারং প্রপঞ্চোপশমং শান্তং শিবমদ্বৈতং চতুর্থং মন্যন্তে স আত্মা স বিজ্ঞেয়ঃ।। ৭ ।।
[অথর্ববেদ/মাণ্ডূক্য উপনিষদ/৭]
অর্থ — যিনি না জ্ঞানস্বরূপ, না জ্ঞেয় আর না অজ্ঞেয়; যিনি অদৃষ্ট, তাঁকে না ব্যবহারে আনা যায়, না তিনি গ্রহণীয়, না চিন্তনীয়, না কথনীয় আর না আছে তাঁর কোনো লক্ষণ, তাঁর মধ্যে সমস্ত প্রপঞ্চের অভাব। পরমেশ্বর শিবই শান্ত (স্থির) অদ্বৈত পরমসত্ত্বা, চতুর্থ অবস্থা বা তুরীয়াবস্থা, ব্রহ্মজ্ঞানীরা শিবকেই পরমাত্মা ও জ্ঞেয় বলে জানেন ।
—————————————————————
—————————————————————
২. ব্রহ্ম  নিরাকার, জাত, গোত্র, বর্ণ রহিত

👉এই প্রসঙ্গে ঋগবেদ বলছে —
অকায়ো নির্গুণোহধ্যাত্মা তন্মে মনঃ শিবসংকল্পমস্তু ॥ ১১
[ঋগবেদ/আশ্বলায়ণশাখা/১০/১৭১/১১ এবং ঋগবেদ/খিলভাগ/৪/১১]
অর্থ — যার কোনো কায়া নেই অর্থাৎ শরীরহীন নিরাকার, যিনি নির্গুণ অর্থাৎ যিনি গুণাতীত, সেই পরমেশ্বর শিবের প্রতি মন সঙ্কল্পিত হোক। 

অর্থাৎ, এর থেকেই পরিস্কার যে পরমেশ্বর শিব যিনি নিরাকারে অকায়ো (পাঞ্চভৌতিক দেহহীন)  ব্রহ্ম। যিনি সকল গুণের অতীত । আর যিনি নিরাকার গুণাতীত, তিনি সকল জাত, গোত্র, বর্ণেরও অতীত ।
—————————————————————
—————————————————————
৩. ব্রহ্ম  জাগতিক চক্ষু, কর্ণ, হস্ত, পদ রহিত

👉এ প্রসঙ্গে শ্রুতি কি বলছে তা দেখে নেব —

ব্রহ্মবিদাপ্নোতি পরম্ । ব্রহ্মা শিবো মে অস্তু সদাশিবোম্ ॥ ১২

অচক্ষুর্বিশ্বতশ্চক্ষুরকর্ণো বিশ্বতঃ কর্ণোপাদো 

বিশ্বতঃপাদোপাণির্বিশ্বতঃ পাণিরাহমশিরা বিশ্বতঃ

শিরা বিদ্যামন্ত্রৈকসংশ্রয়ো বিদ্যারূপো 

বিদ্যাময়ো বিশ্বেশ্বরোহমজরোহম্ ॥ ১৩

[অথর্ববেদ/ভস্মজাবাল উপনিষদ/২ অধ্যায়/১২-১৩ নং মন্ত্র]

অর্থ — (পমেশ্বর শিব বলছেন) যিনি ব্রহ্মকে (নিজের আত্মা কে পরমাত্মা শিব বলে) জানতে পারেন তিনি পরম অবস্থায় উপনীত হয়ে পরমব্রহ্ম শিব কে লাভ করেন। (তিনি প্রার্থনা করে বলেন)  সকলের স্রষ্টা সেই ব্রহ্মারূপী সাক্ষাৎ ॐ-কার সদাশিব আমাদের কল্যাণ বিধান করুন ॥ ১২ 
 আমার (শিবের) পাঞ্চভৌতিক চোখ নয়, তবু আমার সব দিকেই চক্ষু (অর্থাৎ সব কিছু দেখি)। আমার পাঞ্চভৌতিক কান নেই, তবুও আমি বিশ্বের সর্বত্র সবকিছু শ্রবণ করি। আমার পাঞ্চভৌতিক চরণ নেই — তবু আমি সর্বত্র গমন করি। আমার পাঞ্চভৌতিক হাত নেই, তবু আমি সর্বত্র স্পর্শ করি। আমার পাঞ্চভৌতিক মস্তক নেই , তবুও সর্বত্র আমার মস্তক উপস্থিত। আমি সেই সত্ত্বা , যিনি বিদ্যা ও মন্ত্রের একমাত্র আশ্রয়। আমি নিজেই বিদ্যারূপ, বিদ্যাময় । আমি বিশ্বেশ্বর (বিশ্বের একমাত্র অধীশ্বর)। আমি অজর (যার কোনো বার্ধক্য নেই) ॥ ১৩ 


👉অর্থাৎ পরমেশ্বর শিব সকল দিকেই বর্তমান আছেন। তাই শ্রুতিতে বলা হচ্ছে —

সর্ব্বতঃ পাণিপাদং তৎ সর্বতোহক্ষিশিরোমুখম্।
সর্ব্বতঃ শ্রুতিম শ্লোকে সর্বমাবৃত্য তিষ্ঠতি। ১৬।
সর্ব্বেন্দ্রিয়গুণাভাসং সর্ব্বেন্দ্রিয়বিবর্জিতম্।
সর্বস্য প্রভু
মীশানং সর্বস্থ্য শরণং সুহৃৎ ॥ ১৭ ॥

[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ/৩ অধ্যায়/১৬-১৭ নং মন্ত্র]
অর্থ — পরমেশ্বর ঈশান শিবের সর্বত্র পাণিপাদ, সর্বত্র চক্ষুঃ শির ও মুখ, সর্বত্র শ্রবণ, এবং তিনি সংসারে সকলকেই ব্যাপিয়া অবস্থিতি করিতেছেন ॥ ১৬
পরমেশ্বর ঈশান-শিবের শরীর অপ্রাকৃত, অতএব উহার প্রত্যেক অবয়বে সকল ইন্দ্রিয়ের ধর্মই প্রকাশ পেয়ে থাকে। তাঁর প্রাকৃত কোন ইন্দ্রিয়ই নাই। তিনি সকলের প্রভু ও নিয়ন্তা; তিনি সকলের সুহৃৎ ও আশ্রয় ॥ ১৭
—————————————————————
—————————————————————
৪. ব্রহ্ম  সর্বব্যাপী, সুক্ষ্ম, ক্ষয়বৃদ্ধি রহিত

👉সর্বব্যাপী বলতে শ্রুতিতে কাকে বোঝানো হয়েছে তা দেখে নেবো —
"সর্বব্যাপী স ভগবান্ তস্মাৎ সর্বগতঃ শিবঃ"
[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ/৩ অধ্যায়/১১ নং মন্ত্র]
অর্থ — সাক্ষাৎ পরমেশ্বর শিবই সর্বব্যাপী।

এ প্রসঙ্গে ঋগবেদে বলা আছে—
সর্বস্থিতং সর্বগতং সর্বপব্যাপ্তং তন্মে মনঃ শিবসঙ্কল্প মস্তু।।২২।।
[ঋগ্বেদ/আশ্বলায়ণশাখা/১০/১৭১/২২ এবং ঋগ্বেদ খিলভাগ/৪/২২]
অর্থ — সর্বত্রবিরাজমান, সর্বজ্ঞাতা সর্বজ্ঞ, সর্বব্যাপী সেই পরমেশ্বর শিবের প্রতি মন সংকল্পিত হোক।।২২।।

👉শ্রুতি অনুযায়ী সুক্ষ্ম কে তা দেখে নেবো —
সূক্ষাতিসূক্ষ্মং কলিলস্য মধ্যে বিশ্বস্য স্রষ্টারমনেকরূপম্।
বিশ্বস্যৈকং পরিবেষ্টিতারং জ্ঞাতা শিবং শান্তিমত্যন্তমেতি।।

[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ/৪/১৪]
অর্থ — সূক্ষাতিসূক্ষ, মায়াগহনের মধ্যে অবস্থিত, বিশ্বের স্রষ্টা (শিব), অনেকরূপ, বিশ্বের এক পরিবেষ্টিতা, পরমেশ্বর শিবকে জানিয়া নিত্য শান্তি লাভ করেন ।
অর্থাৎ যিনি সুক্ষ্ম থেকে সুক্ষ্ম তিনিই পরমেশ্বর শিব।

এই প্রসঙ্গে ঋগবেদ কি বলছে তাও দেখে নেবো—
সূক্ষ্মাসূক্ষ্মতরং জ্ঞানসং তন্মে মনঃ শিবসংকল্পমস্ত।।১৪।
[ঋগবেদ/আশ্বলায়ণশাখা/১০/১৭১/১৪ এবং ঋগবেদ/খিলভাগ/৪/১১]
অর্থ — জ্ঞানের ক্ষেত্রে যিনি সুক্ষ্ম থেকে সুক্ষ্মতম, সেই পরমেশ্বর শিবের প্রতি মন সঙ্কল্পিত হোক।।

👉পরমেশ্বর শিব অক্ষর অব্যয় অর্থাৎ যার কোনো ক্ষয় নেই যিনি সর্বদা বিদ্যমান তাই শ্রুতিতে বলা হয়েছে- “শান্তং শিবম্‌ অক্ষর অব্যয়ম্‌
[অথর্ববেদ/ভস্মজাবাল উপনিষদ/২/৩] 
অর্থ —  পরমেশ্বর শিবই শান্ত সদা বিদ্যমান, যার ক্ষয় নেই, যিনি অক্ষর শাশ্বত ব্রহ্ম।। 
—————————————————————
—————————————————————
৫. ব্রহ্ম  সর্বদা নিত্য ও অবিনাশী।

👉শ্রুতিতে সর্বদা নিত্য বলতে বলেছে—
ঋতং সত্যম্ পরব্রহ্ম পুরুষং কৃষ্ণপিঙ্গলম্।
ঊর্ধ্বরেতং বিরূপাক্ষং বিশ্বরূপায় বৈ নমো নমঃ 
॥ 
[তথ্যসূত্র - কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/তৈত্তিরীয় আরণ্যক/১০/১২ এবং কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/মহানারায়ণ উপনিষদ/২৩]
অর্থ — যিনি বাণীর অবিষয়, মনের দ্বারা অগম্য যিনি নিত্য শাশ্বত, সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যাপক থেকে ব্যাপক, যিনি নিজেই প্রপঞ্চ রূপে পরিণত হয়, সর্বোৎকৃষ্ট পুরুষ যিনি সকল প্রাণীর হৃদয়ে বাস করেন, যিনি ডানপাশে কৃষ্ণবর্ণ ও বামপাশে পিঙ্গলবর্ণ দ্বারা যুক্ত অর্ধনারীশ্বর উমা-মাহেশ্বরাত্মক বিগ্রহ। যিনি অগ্নিলিঙ্গের ন্যায় দ্যুলোক পর্যন্ত দেদীপ্যমান, যার ত্রিনেত্র সূর্য, সোম ও অগ্নি স্বরূপ সেই জগৎস্বরূপ পরব্রহ্ম বিরূপাক্ষ শিবের নিমিত্তে নমস্কার করি।।

এই প্রসঙ্গে ঋগ্বেদে বলা আছে—
প্রযতঃ প্রণবো নিত্যং পরমং পুরুষোত্তমম্ ।
ওঙ্কারং পরমাত্মনং তন্মে মনঃ শিবসংকল্পমস্ত 
॥  ২০ 
[ঋগবেদ/আশ্বলায়ণশাখা/১০/১৭১/১৪ এবং ঋগবেদ/খিলভাগ/৪/১১]
অর্থ — যিনি সর্বদা নিত্য, যিনি প্রণব ওঁকার, পরম পুরুষ, পরমাত্মা সেই পরমেশ্বর শিবের প্রতি মন সঙ্কল্পিত হোক।। 

এবং শ্রুতিতে আরও বলা আছে—
এক এব শিবঃ নিত্যস্ততোহন্যৎসকলং মৃষা ॥ 
[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/শরভ উপনিষদ/৩০ নং মন্ত্র]
অর্থ — একমাত্র শিবই নিত্য, বাদবাকী সকল কিছুই মিথ্যা ॥ 

শ্রুতিতে আরও বলা আছে— 
অহমেবাস্মি সিদ্ধোহস্মি শুদ্ধোহস্মি পরমোহস্ম্যহম্।
অহমস্মি সদাসোহস্মি নিত্যোহস্মি বিমলোহ স্ম্যহম্ ॥ 
[সামবেদ/মৈত্রেয়ী উপনিষদ/৩/২]
র্থ — পরমেশ্বর শিব বলছেন —আমিই সিদ্ধ, আমিই শুদ্ধ তথা পরম তত্ত্ব আমিই। আমি সর্বদা বিদ্যমান থাকি, আমি নিত্য এবং মলরহিতও আমিই।
—————————————————————
—————————————————————
৬. ব্রহ্ম  স্থাবরজঙ্গমাদি সকল বস্তুতে আত্মরূপে বিরাজমান


👉শ্রুতি অনুসারে কে ইনি—
ঈশানস্য জগতঃ স্বদর্শমীশানমিন্দ্রতস্থুর্য ইতি তস্মাদুচ্যতে ঈশানঃ।
[অথর্ববেদ/অথর্বশির উপনিষদ- ৪]
অর্থ — স্থাবর জঙ্গমাত্মক জগতের অদ্বিতীয় অধীশ্বর রুদ্ররূপী ভগবান'ই সাক্ষাৎ ঈশান।।

এ নিয়ে শ্রুতিতে আরও বলা আছে —
একো হি রুদ্রো ন দ্বিতীয়ায় তস্থুর্য ইমাল্লোকানীশত ঈশনীভিঃ ।
প্রত্যঙ জনাংস্তিষ্ঠতি সঞ্চুকোপান্তকালে সংসৃজ্য বিশ্বা ভুবনানি গোপাঃ 
॥ 
[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ/৩/২]
অর্থ — পরমেশ্বর মহারুদ্রই অদ্বিতীয় পরমেশ্বর দ্বিতীয় কোনো সত্ত্বা নেই। এক অদ্বিতীয় পরমেশ্বরই নিজশক্তি সকল দ্বারা এই বিশ্বসংসারকে নিয়মিত করিতেছেন। অতএব ব্রহ্মজ্ঞ সকল তাঁহার দ্বিতীয় স্বীকার করেন না (অর্থাৎ দ্বিতীয় কোনো সত্ত্বা নেই, শিবই অদ্বিতীয় পরমেশ্বর)। তিনি সর্বজনের অন্তরে অবস্থান করিতেছেন। তিনি সমুদয় ভুবন সৃষ্টি করিয়া উহাদিগকে পালন করিতেছেন এবং অন্তকালে রুদ্রমূর্তিতে উহাদের সংহারকার্য্য সাধন করিতেছেন ।

উক্ত শ্রুতি বাক্যের সমর্থনে অথর্বশির শ্রুতিতে বলেছে যে—
একো রুদ্রো ন দ্বিতীয়ায় তস্মৈ য ইমাল্লোকানীশত ঈশানীভিঃ 
[অথর্ববেদ/অথর্ব্বশির উপনিষদ- ৫]
অর্থ — সেই এক রুদ্রদেব ঈশানীশক্তিদ্বারা এই অনন্তভুবনের সর্ব্বকর্তৃত্ব করিতেছেন। তিনি অদ্বিতীয় কাহারও সাহায্যের অপেক্ষা করেন না। রুদ্রদেবই এই অনন্ত ব্রহ্মাণ্ডের একমাত্র অধীশ্বর, তিনি ভিন্ন জগৎকর্তা আর কেহ নাই।।

এ প্রসঙ্গে ঋগবেদে বলা হয়েছে—
ঈশানাদস্য ভুবনস্য ভুরে র্ন বা উ যোষদ্রুদ্রাদসূর্যম্ ॥ ৯
[ঋগবেদ সংহিতা/শাকল শাখা/২য় মণ্ডল/৩৩ সূক্ত/৯ নং মন্ত্র]
অর্থ — পরমেশ্বর ঈশান রুদ্র সমস্ত ভুবনের অধিপতি এবং ভর্তা; তাঁর বল পৃথকৃত হয় না ॥ ৯

এই প্রসঙ্গে অথর্ববেদে বলা আছে —
যো অগ্নৌ রুদ্রো যো অন্বন্তর্য ওষধীবীরুধ আবিবেশ।
য ইমা বিশ্বা ভুবনানি চালূপে তস্মৈ রুদ্রায় নমো অস্ত্রগ্নয়ে ॥ ১ 

[অথর্ববেদ/৭ম কাণ্ড/৮ম অনুবাক/৬ষ্ট সুক্ত/১ নং মন্ত্র]
অর্থ — পরমেশ্বর রুদ্রদেব যজ্ঞার্হরূপে অগ্নিতে, বরুণরূপে জলে এবং সোমরূপে লতাসমূহে প্রবিষ্ট, তিনি এই নামরূপাত্মন পরিদৃশ্যমান সকল ভুবন ও ভূতসমূহকে সৃষ্টি করতে সমর্থ। সেই সর্বজগৎস্রষ্টা, সর্বজগতে অনুপ্রবিষ্ট রুদ্রাত্মক অগ্নিকে নমস্কার ॥ ১॥

অর্থাৎ পরমেশ্বর শিবই সবকিছুর মধ্যে আত্মরূপে অবস্থান করেন।
—————————————————————
—————————————————————
৭. ব্রহ্ম  সর্বকারণের কারণ, ব্রহ্মই সবকিছু।

👉সর্বকারণের কারণ বলতে শ্রুতি কাকে প্রতিপাদিত করে তা দেখে নেবো —
উমার্ধদেহং বরদং সর্বকারণ কারণম্
[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/যোগতত্ত্ব উপনিষদ/১০১]
অর্থ — যিনি পরাম্বিকা উমাকে নিজের অর্ধদেহে ( বামভাগে ) ধারণ করেছেন , সেই বরদাতা পরমেশ্বর সদাশিবই অখিল চরাচরের সমস্ত কারণের একমাত্র কারণ।
এই নিয়ে তৈত্তিরীয় শ্রুতিতে বলা আছে যে- 
সর্বে বৈ রুদ্রঃ” [কৃষ্ণ-যজুর্বেদতৈত্তিরীয় আরণ্যক/১০/২৪/১] 
অর্থ — এক অদ্বিতীয় পরমেশ্বর শিবই সবকিছুর কারণ, শিবই সবকিছু।।
—————————————————————
—————————————————————
৮. জ্ঞানীরা সর্বদা সেই ব্রহ্মকেই অনুভব করেন।

👉জ্ঞানী ব্যক্তিরা কাকে অনুভব করেন তা শ্রুতি থেকেই দেখে নেব—
ধ্যাত্বা মুনির্গচ্ছতি ভূতযোনিং সমস্তসাক্ষিং তমসঃ পরস্তাৎ ॥ ৭ ॥
[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/কৈবল্য উপনিষদ/১/৭]
অর্থ — সেই প্রকাশপুঞ্জ পরমাত্মা শিবকে যোগীব্যক্তি ধ্যানের মাধ্যমে গ্ৰহণ করেন ॥ ৭


এ প্রসঙ্গে শ্রুতিতে আরও কি বলা আছে তাও দেখে নেবো—
তম্‌ ঈশানং বরদং দেবমীড্যং নিচায্যেমাং শান্তিমত্যন্তমেতি।।
[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ/৪/১১]
অর্থ — অখিল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের একমাত্র নিয়ন্তা পরমেশ্বর ঈশান শিবকে সাক্ষাৎকার করে নিত্য শান্তি লাভ হয়। নিত্য শান্তি অর্থাৎ, সৎ-চিৎ-আনন্দ স্বরূপ অবস্থায় উন্নীত হয়।

উক্ত শ্রুতিতে আরও বলা আছে—
বিশ্বস্যৈকং পরিবেষ্টিতারং জ্ঞাতা শিবং শান্তিমত্যন্তমেতি।।
[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ/৪/১৪]
অর্থ — বিশ্বের স্রষ্টা, অনেকরূপ, বিশ্বের একমাত্র পরিবেষ্টিতা, পরমেশ্বর শিবকে জানিয়া নিত্য শান্তি লাভ করেন ।

এই প্রসঙ্গে শিবসূত্রে বলা আছে—
শুদ্ধতত্ত্বানুসন্ধানাদ্বা অপশুসশক্তিঃ
[শিবসূত্র/১ম উন্মেষ/শাম্ভবোপায়/১৬ নং সূত্র]
অর্থ — এই প্রকারে প্রপঞ্চে শুদ্ধ তত্ত্বের, অর্থাৎ শিবাত্মক ভাবনা করার ফলে বন্ধনাত্মক পশুশক্তি নষ্ট হয়ে যায়, তথা যোগী সদাশিবের সমান জগৎপতি স্বরূপ হয়ে যায়।।

জ্ঞানীরা পরমেশ্বর শিবকে চিন্তন করেই জগৎ থেকে মুক্ত হয়ে সদাশিব অবস্থাতে উন্নীত হয়। সদাশিব অবস্থা অর্থাৎ সৎ-চিৎ-আনন্দ স্বরূপ পরমানন্দ অবস্থা।
অর্থাৎ জ্ঞানীরা যাকে অনুভব করেন তিনিই পরমেশ্বর শিব।। 
—————————————————————
—————————————————————


👉উপরোক্ত মুণ্ডক শ্রুতিতে যেখানে বলা হয়েছে—

 ব্রহ্ম জ্ঞান ও কর্মেন্দ্রিয় দ্বারা অগম্য। ব্রহ্ম নিরাকার, জাত, গোত্র, বর্ণ রহিত। ব্রহ্ম চক্ষু, কর্ণ, হস্ত, পদ রহিত। যিনি, সর্বব্যাপী, সুক্ষ্ম, ক্ষয়বৃদ্ধি রহিত। অবিনাশী সর্বদা নিত্য, স্থাবরজঙ্গমাদি সকল বস্তুতে আত্মরূপে বিরাজমান। যিনি সর্বকারণের কারণ সেই ব্রহ্মকে, জ্ঞানী ব্যক্তিগণ সর্বত্র অনুভব করেন। এই ব্রহ্মই হলো সাক্ষাৎ পরমেশ্বর শিব।।

👉সর্বশেষে একটি প্রমাণ দিয়ে বলছি —

আত্মসংজ্ঞঃ শিবঃ শুদ্ধ এক এবাদ্বযঃ সদা।
ব্রহ্মরূপতযা ব্রহ্ম কেবলং প্রতিভাসতে।। ১।।

[অথর্ববেদ/আত্মা উপনিষদ/১ নং মন্ত্র]
অর্থ — নিজের আত্ম সংজ্ঞা আত্মা হল স্বয়ং শিবই , যিনি শুদ্ধ , সদা এক ও অদ্বিতীয় । যিনি সদা নিজেই ব্রহ্মস্বরূপ ও ব্রহ্ম হিসেবেই সর্বত্র প্রতিভাসিত হন বা প্রকট বা বিরাজিত হন ।
——————————————————————————————————————————


 সিদ্ধান্ত


 শিব আদি তত্ত্ব, শিবই ব্রহ্ম, শিব অখণ্ড, অভেদ্য, অচ্ছেদ্য, যা কিছু দেখা যায় সব শিব কিন্তু শিব নিরাকার, তিন গুণকে উৎপন্ন করে লীলা করেন কিন্তু, শিব নির্গুণ, শিবই জীবরূপে মায়াতে আবদ্ধ হয়ে সুখ-দূঃখ ভোগ করেন কিন্তু, শিব সেই মায়ারও অতীত। জীবরূপের কালের অধীন হন শিব কিন্তু, শিবই কালাতীত, শিবের মধ্যেই ত্রিকাল প্রবাহমান। শিবই তুরীয় অবস্থা আবার সেই তুরীয় অবস্থার ঊর্ধ্বে শিব তুরীয়াতীত। শিব শান্ত, স্থির আবার শিব শান্ত্যাতীত। শিবই পরমজ্যোতি, শিবই শাশ্বত সনাতন। শিবই সর্বব্যাপী, শিবই সর্বত্র বিরাজমান। শিবই সত্য, শিবই নিত্য যিনি সেই সত্য স্বরূপ, পরমানন্দস্বরূপ শিবকে উপলব্ধি করেন, শিবকে অনুভব করেন, তিনিই সাক্ষাৎ শিবত্ব লাভ করেন। পরমাত্মা শিব, যিনি পরমেশ্বর এবং স্বতন্ত্র দেহে সর্বজনীন রূপে আত্মপ্রকাশ করেন, তিনি প্রতিটি সীমিত পৃথক দেহে বা বিভিন্ন রূপে চিৎ রূপে অবস্থান করেন। আকারের সীমাবদ্ধতার কারণে, পরমাত্মা শিব, জীবাত্মার রূপ ধারণ করে এবং দুঃখ, সুখ এবং যন্ত্রণা ভোগ করে। অর্থাৎ, বেদ (শ্রুতি) অনুসারে যেহেতু ব্রহ্মের সকল বৈশিষ্ট্য ও লক্ষণগুলি একমাত্র প্রভু শিবের বৈশিষ্ট্য ও লক্ষণের সাথে মিলে গিয়েছে তাই বেদ অনুসারে শিবই একমাত্র ব্রহ্ম বলে জানা গেল, ইহাই সত্য, ইহাই সত্য আর একমাত্র ইহাই পরমসত্য ।

ॐ নমঃ শিবায় 🙏
সাম্বসদাশিবায় নমঃ 🙏
শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তে ✊🚩
হর হর মহাদেব 🚩

✍️লেখনীতেঃ— অন্তিক ভট্টাচার্য্য (শম্বরনাথ শৈব)

কপিরাইট ও প্রচারেঃ— আন্তর্জাতিক শিবশক্তি জ্ঞান তীর্থ (International Shiva Shakti Gyan Tirtha)

বিঃ দ্রঃ— লেখাটি কপি করলে সম্পূর্ণভাবে করবেন, কোনো রকম কাটছাট করা যাবে না।


শিবঃ .....

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ