অর্জুনের শিব আরাধনা ও কিরাত রূপী শিবের লীলা (মহাভারত বর্ণিত কাহিনী অনুসারে)

 


॥ ॐ নমঃ শিবায় ॥


ভূমিকা — 

পরমেশ্বর শিবের উপাসনা বা তপস্যা করে বিশ্ব সংসারের সকল বড় বড় মহাপুরুষ নিজের উন্নতি ও সফলতা প্রাপ্ত করেছেন। শিব মহিমার বর্ণনা করা কারোর পক্ষেই সম্ভব নয়। তবুও আমাদের সকলের মধ্যে ভক্তি বৃদ্ধি করবার জন্য শাস্ত্রে বর্ণিত হয়েছে শিব মাহাত্ম্যের কাহিনী। তাই শাস্ত্রের বচনকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তুলে ধরে প্রভু শিবের ভক্ত ও তাদের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে আপামর জগৎবাসীর কাছে তুলে ধরবার জন্য আমি শ্রী নন্দীনাথ শৈব এই প্রবন্ধটি সমর্পণ করেছি। 

এই প্রবন্ধের মূল আলোচ্য বিষয় হলো — অর্জুনের দ্বারা পরমেশ্বর শিবের তপস্যা করা এবং কিরাতরূপ ধারণ করে প্রভু শিবির দ্বারা অর্জুনের সামর্থ্য ও ধৈর্য্যের পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়ে। 

বিশ্বসংসারে বহু শিবভক্ত শৈবদের মধ্যে পঞ্চপান্ডবের একজন অর্জুন হলেন একজন অন্যতম ক্ষত্রিয়শ্রেষ্ঠ শৈব।

মহাভারতের বনপর্বের অন্তর্গত কৈরাত উপপর্বে এই কাহিনী যেভাবে বর্ণিত হয়েছে, প্রতিটি শ্লোক অনুসারে অনুবাদ দেওয়া হল। যাতে সম্পূর্ণ বিষয়টি প্রভু শিবের প্রত্যেক ভক্ত হৃদয়াঙ্গম করতে সক্ষম হন।

এখানে উপস্থাপিত অধ্যায়ের সংখ্যা বিভিন্ন প্রকাশনীর প্রকাশিত মহাভারতের সাথে ভিন্ন পাঠান্তর দেখা যেতে পারে। কিন্তু এই অর্জুন-কিরাত বিষয়ক ঘটনাটি মহাভারতের বনপর্বের উক্ত কৈরাত উপপর্বের মধ্যেই উপলব্ধ আছে বলে জানতে হবে। 

এখানে হরিদাস সিদ্ধান্ত বাগীশ মহাশয়ের বাংলা ভাষায়  অনুবাদিত ‘বিশ্ববাণী প্রকাশনী’ দ্বারা প্রকাশিত মহাভারত গ্রন্থ থেকে অধ্যায় সংখ্যাটি নির্দিষ্ট করা হয়েছে, ফলে এর উপর ভিত্তি করে - এখানে এই কাহিনীর আরম্ভ বনপর্বের ৩৪ অধ্যায় বলে গণ্য করা হল। 

গোরক্ষপুর গীতাপ্রেস প্রকাশনী দ্বারা প্রকাশিত মহাভারতের বনপর্বে এই কাহিনিটি বনপর্বের ৩৮ তম অধ্যায় থেকে ৪১ অধ্যায়ের ৫ নং শ্লোক পর্যন্ত বর্ণিত হয়েছে। অধ্যায়ের সংখ্যা বিষয়টি ভিন্ন হলেও শ্লোক ও মূল আলোচ্য বিষয়ে কোনো পার্থক্য নেই।

পরমেশ্বর শিবের নাম নিয়ে এবার কিরাত অবতার বিষয়ে


____________________________________________________________________________________


অর্জুনের শিব আরাধনা ও কিরাত রূপী শিবের লীলা (মহাভারত বর্ণিত কাহিনী অনুসারে)


♦️[মহাভারত/বনপর্ব/৩৪ অধ্যায়/১০-৩৫ নং শ্লোক]♦️


 হে নিষ্পাপ রাজা! দেবদেব শঙ্করের সহিত অর্জুনের একেবারে গাত্র-সংস্পর্শরূপ সম্মেলনই ঘটেছিল ; তা শ্রবণ করুন ॥ ১০ ॥

রাজা ! অমিতপরাক্রম, মহাবল, মহাবাহু এবং সমস্ত জগতের মধ্যে প্রধান মহারথ ইন্দ্রনন্দন সেই কৌরব অর্জুন যুধিষ্ঠিরের আদেশে দেবরাজ ইন্দ্রের এবং দেবদেব মহাদেবের দর্শন লাভ করবার জন্য, অলৌকিক গাণ্ডীবধনু ও স্বর্ণ-মুষ্টিযুক্ত তরবারি ধারণ করে, স্থিরচিত্ত হয়ে, কার্যসিদ্ধি উদ্দেশে হিমালয়ের শৃঙ্গ লক্ষ্য করে উত্তরদিকে গমন করলেন ॥ ১১- ১৩ ॥

তিনি তপস্যার জন্য কৃতনিশ্চয় ও অত্যন্ত ত্বরান্বিত হয়ে একাকীই কণ্টকা-কীর্ণ ভয়ঙ্কর বনের ভিতরে গিয়ে উপস্থিত হলেন। সেই বনটি নানা রকমের পুষ্পে ও ফলে পরিপূর্ণ এবং বহুবিধ পশুসমূহে ব্যাপ্ত ছিল, আর তার ভিতরে নানাপ্রকার পক্ষী এবং সিদ্ধগণ ও চারণগণ বিচরণ করতো ॥১৪-১৫ ॥

তার পর অর্জুন সেই মনুষ্যবিহীন বনে প্রবেশ করলে, আকাশে শঙ্খ-ধ্বনি ও পটহধ্বনি হতে থাকলো ॥ ১৬ ॥

আর, ভূতলে বিশাল পুষ্পবৃষ্টি পতিত হইল এবং বিস্তৃত মেঘসকল সমস্ত দিক আবৃত করলো ॥ ১৭ ॥

তখন অর্জন হিমালয়ের সন্নিহিত দুর্গম বনসকল অতিক্রম করে, তার উপরে থেকে শোভা পেতে লাগলেন ॥ ১৮ ॥

তিনি সেখানে দেখলেন-নানাবিধ বৃক্ষ আছে, তাতে বহুতর ফুল ফুটে রয়েছে এবং নানাপ্রকার পক্ষী মনোহর রব করে বেড়াইতেছে; আর, অনেক নদী প্রবাহিত হচ্ছে, সেগুলির আবর্ত (ঘোলা) সকল বিশাল এবং জল বৈদুর্য্যমণির ন্যায় নির্মূল ; তাহার নিকট হংস, কারণ্ডব, সারস, কোকিল, কোঁচবক ও ময়ূরগণ রব করছে এবং তার তীরে মনোহর বন রয়েছে। অতিরথ অর্জন সেই স্থানে নদীগুলির পবিত্র ও নির্মল জল দেখে আনন্দিত হলেন ॥ ১৯-২১ ॥

অত্যন্ত তেজস্বী ও দৃঢ়চেতা অর্জুন তখন সেই মনোহর বনের মধ্যে থেকে দারুণ তপস্যায় প্রবৃত্ত হলেন ; তিনি কুশময় কৌপীন পরিধান করে দণ্ড ও মৃগচৰ্ম ধারণপূর্বক প্রথমে ভূতলপতিত শুষ্কপত্র মাত্র ভোজন করতেন ॥ ২২-২৩ ॥

পরে, তিন তিন দিনের পর এক একটি ফল ভক্ষণ করে একমাস অতিক্রম করলেন; তার পর আবার ছয় ছয় দিনের পর এক একটা ফল ভোজন করে দ্বিতীয়মাস অতিবাহিত করলেন ॥ ২৪ ॥

তৃতীয় মাসে পনেরো পনেরো দিনের পর এক একটা ফল ভোজন করলেন; তাহার পর চতুর্থমাস উপস্থিত হলে, তখন ভরতশ্রেষ্ঠ মহাবাহু অর্জুন কেবল বায়ু ভক্ষণ করে, নিরবলম্বনে থেকে, চরণের অঙ্গুষ্ঠের অগ্রভাগ দ্বারা ভূতলে দাঁড়াইয়া ঊর্দ্ধবাহু হয়ে তপস্যা করতে লাগলেন ॥ ২৫-২৬ ॥

সর্বদা স্নান করায় অমিততেজা ও মহাত্মা অর্জুনের জটাসমূহের মধ্যে বেশ কিছুগুলি বিদ্যুতের ন্যায় পিঙ্গলবর্ণ হয়ে গেল এবং কতকগুলি মেঘের ন্যায় কৃষ্ণবর্ণই থাকলো ॥ ২৭ ॥

তারপর, মহর্ষিরা সকলে অর্জুনকে ভয়ঙ্কর তপস্যায় প্রবৃত্ত বলে জানাবার জন্য মহাদেবের নিকট গমন করলেন ॥ ২৮ ॥

এবং তাঁরা মহাদেবকে নমস্কার করে তাঁর নিকট অর্জনের সেই তপস্যার বিষয় বলতে লাগলেন, 'মহাতেজা অর্জুন হিমালয়ের উপরে অবস্থান করছেন ॥ ২৯ ॥

দেবদেব ! অর্জুন আপন তেজে সমস্ত দিক্ যেন ধূম্রবর্ণ করে দুষ্কর ভয়ঙ্কর তপস্যায় প্রবৃত্ত হয়েছেন ; আমরা সকলে তাঁর উদ্দেশ্য বুঝতে পারছি না ॥ ৩০ ॥

কিন্তু উনি আমাদের সকলকেই সন্তপ্ত করছেন ; অতএব আপনি তাকে সম্যক্ রূপে বারণ করুন'। নির্মলচিত্ত ঋষিগণের সেই কথা শুনে ভূতপতি উমাপতি মহাদেব এই কথা বললেন-'ঋষিগণ ! তোমরা অর্জুনের প্রতি কোনো আশঙ্কা কোরো না ॥ ৩১-৩২ ॥

তোমরা আনন্দিত হয়ে নিরুদ্বেগে যথাস্থানে সত্বর গমন করো ; আমি তার মনের উদ্দেশ্য জানি ॥ ৩৩ ॥

তার স্বর্গের প্রতি কোনো ইচ্ছা নাই, সম্পদ বা আয়ুরও কোনো কামনা নেই। কিন্তু তার যা অভীষ্ট, সেই সমস্ত এখন‌ই আমি সম্পাদন করবো ॥ ৩৪ ॥

বৈশম্পায়ন বললেন- সত্যবাদী ঋষিরা মহাদেবের সেই কথা শুনে আনন্দিত চিত্তে পুনরায় আপন আপন আশ্রমে চলে গেলেন ॥ ৩৫ ॥


____________________________________________________________________________________

♦️[মহাভারত/বনপর্ব/৩৫ অধ্যায়/১-১১২ নং শ্লোক]♦️

বৈশম্পায়ন বললেন-সেই মহাত্মা তপস্বীরা সকলেই চলে যাওয়ার পর, সর্বপাপনাশক ও মনোহরমূর্তি ভগবান্ মহাদেব স্বর্ণবৃক্ষের ন্যায় উজ্জ্বল ব্যাধের বেশ ধারণ করে, শরীর দ্বারা অন্য এক সুমেরু পর্বতের ন্যায় শোভা পেতে থেকে, সুন্দর পিনাকনামক ধনু ও সর্পতুল্য বাণ নিয়ে, মূর্তিমান্ অগ্নির মতো মহাবেগে নিজের গৃহ থেতে নির্গত হলেন ; তখন সমান নিয়ম ও সমানবেশ-ধারিণী উমাদেবী, অন্যান্য বহুতর স্ত্রী এবং নানা রকমের বেশধারী ও হৃষ্টচিত্ত ভূতগণ মহাদেবের অনুগমন করতে লাগলেন। ভরতনন্দন রাজা। তখন সেই স্থানটি অত্যন্ত শোভা পেতে লাগলেন ॥ ১-৫ ॥

এবং সেই সময়ে সেই সমস্ত বনটিই ক্ষণকালের মধ্যে নিঃশব্দ হয়ে গেল এবং নির্ঝরের শব্দ ও পাখির রব বিরত হল ॥ ৬ ॥

মহাদেব তখন অনায়াসে কার্য্যকারী অর্জুনের কাছে গিয়ে ‘মূক’ - নামক অদ্ভূতাকৃতি একটি দানবকে দেখতে পেলেন ॥৭ ॥

এদিকে অর্জুনও সেই মুকদানবের জিঘাংসার বিষয়ই যেন মনে মনে আলোচনা করছিলেন ; তখন সেই অতি দুষ্টাত্মা মূকদানব শূকরের রূপ ধারণ করে অর্জুনকে বধ করবার জন্য আসতে লাগলেন। তখন অর্জুন গাণ্ডীবধনু ও সর্পতুল্য বাণ নিয়ে, সেই শ্রেষ্ঠ ধনুতে গুণারোপণ করে এবং জ্যাশব্দে সমস্ত দিক্ শব্দে মুখরিত করে মুক্ত দানবকে বলিলেন ॥ ৮-৯ ॥

'আমি এখানে আগন্তুক এবং আমার কোন অপরাধ নেই ; তথাপি তুই যখন আমাকে বধ করবার ইচ্ছা করেছিস, তখন আমিই তোকে আগে যমের আলয়ে পাঠাবো ॥ ১০ ॥

এই কথা বলে দৃঢ়ধন্বা অর্জুন প্রহার করতে প্রবৃত্ত হলেন ; এই দেখে কিরাতররূপী মহাদেব এই বলে তাঁকে বারণ করলেন যে, ‘এই নীলমেঘতুল্য শূকরটিকে আমিই আগে বধ করবার ইচ্ছা করেছি।’ কিন্তু অর্জুন তাঁর সেই বাক্য অগ্রাহ্য করে প্রহার করেই ফেললেন ॥ ১১- ১২ ॥

মহাতেজা কিরাতও সেই একমাত্র লক্ষ্য মূকদানবের প্রতি এক‌ই সময়ে এক‌ই সাথে বজ্রের তুল্য বেগবান্ এবং অগ্নিশিখার ন্যায় উজ্জ্বল একটা বাণ নিক্ষেপ করলেন ॥ ১৩ ॥

তখন কিরাতের ও অর্জুনের নিক্ষিপ্ত সেই বাণ দুটি গিয়ে, পর্বতের মতো দৃঢ় ও বিস্তৃত সেই মূকদানবের শরীরে একসময়েই পতিত হয়ে বিধে গেল ॥ ১৪ ॥

তখন বৈদ্যুতিক শব্দের মতো এবং পর্বতের উপরে বজ্রপাতের শব্দের ন্যায়, দানবদেহে সেই বাণ দুটি পতন হবার শব্দ হলো ॥ ১৫ ॥ 

তখন সেই দানব সর্পতুল্য উজ্জলমুখ বহুতর বাণ দ্বারা আবার বিদ্ধ হয়ে রাক্ষসের ন্যায় অতিভীষণ আকৃতি ধারণ করে মরে গেল ॥ ১৬ ॥

তারপর, শত্রুহন্তা অর্জুন দেখলেন স্বর্ণকান্তি, ব্যাধরূপ বেশধারী এবং স্ত্রীসমূহ সমন্বিত সেই পুরুষকে ॥ ১৭ ॥

তখন অর্জুন আনন্দিত হয়ে হাসতে হাসতেই যেন সেই পুরুষটিকে বললেন, ‘কে তুমি নির্জন বনে স্ত্রীবেষ্টিত হয়ে বিচরণ করছো ? ॥ ১৮ ॥

হে স্বর্ণকান্তি পুরুষ ! এই ভয়ঙ্কর বনে তোমার কি ভয় হচ্ছে না ? কি জন্য‌ই বা তুমি আমার শূকরটাকে বিদ্ধ করলে ? ॥ ১৯ ॥

রাক্ষসের মতো বিকটাকার এই দানব এখানে যখন উপস্থিত হয়েছিল, আমিই সবার আগে তাকে দেখতে পেয়েছি। সুতরাং ইচ্ছা করেই হোক বা আমাকে পরিভূত করবার উদ্দেশেই হোক, তুমি তাকে বিদ্ধ করে আমার হাত হতে জীবিত অবস্থায় মুক্তিলাভ করতে পারবে না ॥ ২০ ॥

কারণ, তুমি আজ আমার বিষয়ে যে ব্যবহার করেছো, এটি মৃগয়ার নিয়ম নয়। অতএব পার্বত্য ! আমি তোমাকে প্রাণচ্যুত করবো ॥ ২১ ॥

অর্জুনকে এই ভাবে বলতে শুনে ব্যাধ হাসতে হাসতেই যেন কোমল বাক্যে অর্জুনকে বললো ॥ ২২ ॥

‘বীর ! তুমি বনের মধ্যে আমার থেকে কোন ভয় কোরো না। আমরা এই বনেই বাস করি বলে এই স্থান সর্বদাই আমাদের পরিচিত ॥ ২৩ ॥

কিন্তু তপোধন ! তুমি কি কারণে এই বনে হুঙ্কর বাস করবার ইচ্ছা করেছো ? তবে আমরা বহু সংখ্যক জন্তুতে পরিপূর্ণ এই বনেই বাস করে থাকি ॥ ২৪ ॥

কিন্তু তুমি অস্থির তুল্য তেজস্বী, সুকুমারদেহ এবং সুখভোগে অভ্যন্ত। সুতরাং তুমি একাকী কি করে এই শূণ্যবনে বিচরণ করবে ?’ ॥ ২৫ ॥

অর্জুন বললেন,‘গাণ্ডীব ধনু এবং অগ্নিতুল্য নারাচ (বাণবিশেষ) সকল আশ্রয় করে আমি দ্বিতীয় অগ্নির (কার্তিকেয়র) মতো এই মহাবনে বাস করবো ॥ ২৬ ॥

এই দারুণ রাক্ষস আমাকে বধ করবার জন্য বরাহরূপ ধারণ করে এখানে উপস্থিত হয়েছিল ; তাই আমি তাকে বধ করেছি’ ॥ ২৭ ॥

ব্যাধ বললেন, ‘আমিই আগে তাকে ধনুক দ্বারা ক্ষিপ্ত বাণ দ্বারা তাড়ন করেছি এবং বধ‌ও করেছি, যমালয়েও পাঠিয়েছি‌ ॥ ২৮ ॥

এই বরাহটা প্রথমে আমারই লক্ষ্য হয়েছিল ; সুতরাং আমারই হয়েছিল এবং আমার প্রহারেই এটি প্রাণচ্যুত হয়েছে ॥ ২৯ ॥

তুমি আপন বলে দর্পিত কি না ; তাই অন্যের নিকট নিজের দোষ বলতে পারছ না, তুমি গর্বিত হয়েছ। সুতরাং মূর্খ ! তুমি জীবিত অবস্থায় আমার কাছ থেকে মুক্ত হতে পারবে না ॥ ৩০ ॥

তুমি স্থির হও ; আমি বজ্রতুল্য বাণ নিক্ষেপ করবো ; তুমি তোমার পরমশক্তি সহকারে আমার সহিত মিলিত হও এবং তুমিও বাণক্ষেপ করো’ ॥ ৩১ ॥

তখন অর্জুন সেই ব্যাধের সেই বাক্য শুনে ক্রোধ প্রকাশ করলেন এবং বাণ দ্বারা তাহাকে তাড়ন করলেন ॥ ৩২ ॥

তারপর, ব্যাধ হৃষ্টচিত্তে সেই বাণ সকল গ্রহণ করলেন এবং বার বার ‘স্থির হও’ এই কথা বললো, আর ‘মূর্খ ! মূর্খ !’ বলে সম্বোধন করলেন ॥ ৩৩ ॥

এবং ‘এই সকল মর্মভেদী নারাচবাণ নিক্ষেপ করো’ এই কথাটিও বললেন। তখন অর্জুন তৎক্ষণাৎ যেন বাণের বর্ষণ করতে লাগলেন ॥ ৩৪ ॥

তৎপরে তাঁহারা দুই জনেই ক্রুদ্ধ হইয়া, পরাক্রম বশত শোভা পেতে থেকে, সর্পতুল্য বাণদ্বারা বার বার পরস্পর প্রহার করতে লাগলেন ॥ ৩৫ ॥

তৎপরে-অর্জুন ব্যাধের উপরে বাণবৃষ্টি করতে লাগলেন ; ব্যাধরূপী মহাদেবও তাহা প্রসন্নচিত্তে নিজের অঙ্গে ধারণ করতে থাকলেন ॥ ৩৬ ॥

ব্যাধরূপী মহাদেব কিছুকাল সেই বাণবৃষ্টি ধারণ করে অক্ষত শরীরেই পর্বতের মতো অচল র‌ইলেন ॥ ৩৭ ॥

অর্জুন নিজের বাণবর্ষণ ব্যর্থ হয়েছে দেখে অত্যন্ত বিস্ময়াপন্ন হলেন এবং 'সাধু সাধু' এই কথা বললেন ॥ ৩৮ ॥

(আর, মনে মনে ভাবলেন) ‘হিমালয়বাসী এই কোমলাঙ্গ ব্যাধ অবিহ্বল থেকে গাণ্ডীব দ্বারা নিক্ষিপ্ত নারাচগুলি গ্রহণ করছে; কি আশ্চর্য্য ॥ ৩৯ ॥

এ ব্যক্তি কে ? ইনি কি সাক্ষাৎ মহাদেব ? না কি কোনো যক্ষ?

না দেবতা ? না অসুর ? কারণ, হিমালয়ে দেবতাপ্রভৃতির সমাগম হয়ে থাকে ॥ ৪০ ॥

আমার নিক্ষিপ্ত বাণসমূহের বেগ, মহাদেব ছাড়া অন্য আর কেউই সহ্য করতে সমর্থ হবেন না ॥ ৪১ ॥

এই ব্যক্তি যদি মহাদেব ছাড়া অন‌্য কোনো দেবতা বা যক্ষ হন, তবে আমি তাকে তীক্ষ্ণ বাণ দ্বারা যমালয়ে পাঠিয়ে দেবো’ ॥ ৪২ ॥

তখন, সূর্য্য যেমন কিরণ নিক্ষেপ করেন, সেই ভাবে হৃষ্টচিত্ত অর্জুন শত শত মর্মভেদী নারাচ কিরাতের উপরে নিক্ষেপ করলেন ॥ ৪৩ ॥

তখন পৰ্বত যেমন শিলাবৃষ্টি ধারণ করে নেয়, সেই ভাবে জগৎসৃষ্টিকর্তা কিরাতরূপী ভগবান্ শূলপাণি মহাদেব প্রসন্নচিত্তে সেই নারাচ (বাণের) বৃষ্টি ধারণ করলেন ॥ ৪৪ ॥

তারপর, অর্জুন ক্ষণকালমধ্যেই বাণশূন্য হয়ে পড়লেন এবং বাণগুলি ক্ষয় পেয়েছে দেখে অত্যন্ত ভীত হলেন ॥ ৪৫ ॥

তখন অর্জুন ভগবান্ অগ্নিদেবকে স্মরণ করলেন, যিনি পূর্বে খাণ্ডব বন দাহের সময়ে তাঁকে দুইটি অক্ষয় তৃণ দিয়েছিলেন ॥ ৪৬ ॥

(সেই সময়ে অর্জুন মনে মনে ভাবতে লাগলেন) ‘এখন আমি ধনুক দ্বারা কি নিক্ষেপ করবো ; যেহেতু আমার সমস্ত বাণ‌ই নিঃশেষ হয়েছে। এই পুরুষটিও অনির্বচনীয়ই বটে ; কেননা সে আমার সমস্ত বাণগুলিই গ্রাস করেছে ॥ ৪৭‌ ॥

(সে যাই হোক) শূলের অগ্রভাগ দ্বারা যেমন হাতিকে বধ করে, তেমন ধনুকের অগ্রদ্বারা একে বধ করে যমালয়ে পাঠাবো’ ॥ ৪৮ ॥

এটি ভেবে মহাতেজা অর্জুন ধনুর অগ্রে গুণ সংযোগ করে, তার দ্বারা ধরে বজ্রতুল্য মুষ্টিদ্বারা প্রহার করলেন ॥ ৪৯ ॥

এরপরে, শত্রুহস্তা অর্জুন ধনুকের অগ্রদ্বারাই যুদ্ধ করতে প্রবৃত্ত হলেন ; তখন সেই ব্যাধ অর্জুনের সেই অলৌকিক ধনুও ধরে ফেললেন ॥ ৫০ ॥

এবং ধরে নিয়েই তা গ্রাস করে ফেললেন। তখন অর্জুন তরবারি ধারণ করলেন এবং যুদ্ধ শেষ করবার ইচ্ছায় ব্যাধের প্রতি সবেগে ধাবিত হলেন ॥ ৫১ ॥

এবং পর্বত‌ও ছেদন করতে সমর্থ, এইরকম সেই তীক্ষ্ণধার তরবারি কে বিক্রমের সহিত সম্পূর্ণ বাহুবল প্রয়োগ করে ব্যাধের মস্তকে নিক্ষেপ করলেন ॥ ৫২ ॥

তখন সেই উৎকৃষ্ট তরবারি টি ব্যাধের মস্তকে পড়েই লাফিয়ে উঠলো। তারপর অর্জুন বৃক্ষ ও শিলা-পাথর ছুড়ে যেন তা বর্ষণ করবার মাধ্যমে যুদ্ধ করতে লাগলেন ॥ ৫৩ ॥

তখন বিশালমূর্ত্তি কিরাতরূপী ভগবান্ মহাদেব সেই সকল বৃক্ষ এবং শিলাও গ্রাস করতে লাগলেন। তারপর মহাবল অর্জুন মুখে ধূম উদগার করতে থেকে বজ্রতুল্য মুষ্টিদ্বারা দুর্ধর্ষ ব্যাধকে প্রহার করলেন ॥ ৫৪ -৫৫ ॥

তখন ব্যাধরূপী মহাদেবও বজ্রতুল্য অতিদারুণ মুষ্টিদ্বারা অর্জুনকে পীড়ন করতে লাগলেন ॥ ৫৬ ॥

সেই সময়ে যুধ্যমান অর্জুনের ও ব্যাধের মুষ্টিপ্রহার হতে থাকায় ভয়ঙ্কর 'চটচটা' শব্দ হতে লাগলো ॥ ৫৭ ॥

বৃত্রাসুর ও ইন্দ্রের মতো ব্যাধ ও অর্জুনের সেই লোমহর্ষণ বাহুযুদ্ধ পূর্ণ একমুহূর্তকাল হয়ে গেল ॥ ৫৮ ॥

তারপর বলবান্ অর্জন বক্ষদ্বারা ব্যাধকে আঘাত করলেন ; ব্যাধও বলপূর্বক স্পন্দিতদেহ অর্জুনকে প্রহার করলেন ॥ ৫৯ ॥

তাঁদের বাহু নিষ্পেষণে এবং বক্ষের সংঘর্ষে অঙ্গে যেন ধূমশালী কাঠের থেকে উৎপন্ন হ‌ওয়া অগ্নি উৎপন্ন হইল ॥ ৬০ ॥

তারপর ব্যাধরূপী মহাদেব নিজের অঙ্গ দ্বারা অর্জনকে নিপীড়িত করে, তাঁর চেতনা লোপ করতে করতে, ক্রোধ দেখিয়ে অধিক মাত্রাযুক্ত তেজে আক্রমণ করলেন ॥ ৬১ ॥

ভরতনন্দন ! তারপরে অর্জুন মহাদেবের অঙ্গে আবদ্ধ হয়ে গিয়ে, অত্যন্ত পীড়িত শরীর একেবারে যেন সঙ্কুচিত হয়ে পড়লেন ॥ ৬২ ॥

মহাদেবের অঙ্গদ্বারা দৃঢ় আবদ্ধ হওয়ায় অর্জুনের শ্বাসরোধ হয়ে গেল ; তিনি নিষ্পন্দ হয়ে মাটিতে পতিত হলেন এবং তাঁর প্রাণ যেন প্রায় বের হয়ে গেল (এমন অবস্থা হয়েছিল অর্জুনের) ॥ ৬৩ ॥

তিনি কিছু মুহূর্তকাল সেই ভাবে থেকে, আবার চেতনা লাভ করেই, অত্যন্ত দুঃখিত হয়ে, রক্তাক্ত দেহে উঠলেন ॥ ৬৪ ॥

এবং অর্জুন তৎক্ষণাৎ পিনাকধনুক ধারণকারী শরণাগতরক্ষক ভগবান মহাদেবের শরণাপন্ন হয়ে, স্থণ্ডিলের উপরে শিবের মৃন্ময় (মাটির) প্রতিমা বানিয়ে মালা দ্বারা শিব প্রতিমার (শিবলিঙ্গের) পূজা করলেন ‌॥ ৬৫ ॥

তখন পাণ্ডবশ্রেষ্ঠ অর্জুন (ব্যাধের দিকে তাকিয়ে দেখতেই) সেই মালাটিই ব্যাধের মস্তকে অবস্থিত দেখলেন ; এই দেখার সাথে সাথেই তিনি প্রকৃত বিষয় বুঝে আনন্দে আত্মহারা হলেন ॥ ৬৬ ॥

এবং কিরাতরূপী মহাদেবের চরণযুগলে পতিত হলেন। তখন মহাদেব সন্তুষ্ট হয়ে, অর্জুনকে বিস্ময়াপন্ন ও তপস্যায় ক্ষীণ (শুকনো প্রায়) হয়ে যাওয়া অঙ্গ দেখে, মেঘগম্ভীর বাক্যে তাঁকে বললেন ॥ ৬৭ ॥

মহাদেব বললেন, ‘অর্জুন ! অর্জুন !আমি তোমার এই অতুলনীয় বীরত্বে ও ধৈর্য্যগুণে সন্তুষ্ট হয়েছি ; তোমার তুল্য ক্ষত্রিয় সহজে হয় না ॥ ৬৮ ॥

হে নিষ্পাপ মহাবাহু ভরতশ্রেষ্ঠ ! আজ আমার ও তোমার উৎসাহ ও বল সমান সমান যেন দেখলাম। সুতরাং আমি তোমার উপরে সন্তুষ্ট হয়েছি ; তুমি আমার স্বরূপ দর্শন করো ॥ ৬৯ ॥

বিশালনয়ন ! তুমি পূর্বজন্মে ঋষি ছিলে, সুতরাং তোমাকে আমি দিব্য চক্ষু দিচ্ছি ; আর তুমি যুদ্ধে সমস্ত শত্রুকে এবং সমস্ত দেবতাকেও জয় করতে পারবে ॥ ৭০ ॥

আমার যে অস্ত্র অন্য কেউই নিবারণ করতে পারেনি, আমি প্রীতিবশত সেই অস্ত্র তোমাকে দান করবো ; তুমি অচিরকালমধ্যেই আমার সেই অস্ত্র ধারণ করতে পারবে ॥৭১ ॥

বৈশম্পায়ন বললেন, তারপর, অর্জুন সেই স্থানে দেবী পার্বতীর সহিত অত্যন্ত তেজস্বী, গিরিশ ও শূলপাণি মহাদেবকে দর্শন করলেন ॥ ৭২ ॥

তখন শত্রুনগরবিজয়ী অর্জুন ! জানুযুগল দ্বারা মাটিতে স্পর্শ করে এবং মস্তক দ্বারা প্রণাম করে, স্তব দ্বারা মহাদেবকে প্রসন্ন করতে লাগলেন ॥ ৭৩ ॥

অর্জুন বললেন, ‘আপনি কপর্দ্দি, সমস্ত ভূতের অধীশ্বর, তৃতীয় নয়ন দ্বারা কামদেবকে নিপাত করেছেন, দেবতারও দেবতা মহাদেব ! নীলগ্রীব জটাধারী ॥ ৭৪ ॥

দেব ! আমি জানি যে, আপনি ব্রহ্মাদি সৃষ্টিকর্তাদের মধ্যে প্রধান, ত্র্যম্বক, বিভু, দেবগণেরও গতি এবং এই সমগ্র জগৎ  আপনারই উৎপাদিত ॥ ৭৫ ॥

আপনি-দেব, দানব ও মনুষ্যসমন্বিত ত্রিভুবনেরই সকলের পক্ষেই অজেয়, আপনি শিব‌ই বিষ্ণুরূপধারী, বিষ্ণু শিবের রূপ এবং আপনি দক্ষযজ্ঞবিনাশকারী বীরভদ্র ; সুতরাং আপনাকে নমস্কার করি ॥ ৭৬ ॥

আপনি ললাটনেত্র, জগতের সংহারক ও উৎপাদক শর্ব, শূলপাণি, পিনাক নামক ধনুর্দ্ধারী, সূর্য্যস্বরূপ, মঙ্গলকারক এবং বিধাতা। অতএব, আপনাকে নমস্কার করি ॥ ৭৭ ॥

হে ভগবন্ ! আপনি সর্ব ভূতপদার্থের মহেশ্বর। আপনি- প্রমথগণের অধিপতি গণেশ স্বরূপ ধারণ করে বিরাজ করেন, জগতের মঙ্গল-কারক, সৃষ্টিকর্তাদেরও সৃষ্টিকর্তা ॥ ৭৮ ॥

 প্রকৃতি-পুরুষেরও অতীত, সর্ব্বোৎকৃষ্ট এবং পরমসূক্ষ্ম তুরীয় ব্রহ্ম শিবস্বরূপ; আমি আপনাকে প্রসন্ন করছি। ভগবন্ ! শঙ্কর ! আমি যে অপরাধ করেছি, তা আপনি ক্ষমা করুন ॥ ৭৯ ॥

দেবশ ! আমি আপনারই সাক্ষাৎকারের আকাঙ্ক্ষী হয়ে, তপস্বীদের উত্তম আশ্রয় এবং আপনার প্রীতিকর এই মহা পর্বতে এসেছি ॥ ৮০ ॥

ভগবন্ ! আপনি সমগ্র জগতের নমস্কৃত ; সুতরাং, আমি আপনাকে প্রসন্ন করছি। মহাদেব ! গুরুতর সাহস করায় আমার এটি যেন অপরাধ বলে গণ্য না করেন ॥ ৮১ ॥

হে মহাদেব ! অত্যন্ত দুঃসাহস বশত আমি যে আপনার সাথে যুদ্ধ করেছি, এতে আমার অপরাধ নেই। এইসব আমার অজান্তেই ঘটে গিয়েছে। হে শঙ্কর ! আমি এখন আপনার শরণাপন্ন । আপনি আমার এই ধৃষ্টতাকে ক্ষমা করুন ॥ ৮২ ॥

বৈশম্পায়ন বললেন, হে জনমেজয় ! তখন মহা তেজস্বী ভগবান বৃষভধ্বজ শিব অর্জুনের সুন্দর হাত ধরে বললেন, ‘আমি তোমার অপরাধ প্রথম থেকেই ক্ষমা করে দিয়েছি’ ॥ ৮৩ ॥

এই বলে ভগবান হর সেই অর্জুনের দুই হাত ধরে টেনে নিজের হৃদয় লাগালেন আর প্রসন্ন চিত্তে সেই বৃষের চিহ্ন অঙ্কিত ধ্বজ ধারনকারী বৃষভধ্বজ পুনরায় কুন্তীপুত্র পার্থ কে সান্ত্বনা দিয়ে পুনরায় বললেন, ॥ ৮৪ ॥

মহাদেব বললেন, অর্জুন ! তুমি পূর্বজন্মে যে দেহ ধারণ করেছিলে তা নর নামক ঋষি বলে সুপ্রসিদ্ধ ছিল। নারায়ণ নামক ঋষি তোমার সখা ছিল। সেই সময়ে তুমি বদরিক আশ্রমে অনেক সহস্র বর্ষ পর্যন্ত উগ্র তপস্যা করেছিলে ॥ ৮৫

তোমার মধ্যে অথবা পুরুষোত্তম বিষ্ণুর মধ্যে উৎকৃষ্ট তেজ বিদ্যমান । তোমরা দুইজন পুরুষ অগ্রণী  নিজেদের তেজের দ্বারা সম্পূর্ণ জগতকে ধারণ করে আছো ॥ ৮৬

হে প্রভাবসম্পন্ন অর্জুন ! ইন্দ্রের রাজ্যাভিষেকের সময়ে তুমি এবং কৃষ্ণ মেঘের ন্যায় গম্ভীরধ্বনিযুক্ত বিশাল একটি ধনুক ধারণ করে দানবগণকে নিবারণ করেছিলে ॥ ৮৭ ॥

পুরুষশ্রেষ্ঠ অর্জুন ! এই সেই গাণ্ডীব ধনু ; এটি তোমারই হাতের‌ই যোগ্য । আমি মায়া করে যে ধনুকটি গ্রাস করেছিলাম মাত্র ॥ ৮৮ ॥

আর, এই সেই অক্ষয় তূণ দুটী পুনরায় তোমারই হোক; এটিও তোমারই যোগ্য এবং তোমার শরীর‌ও ব্যথা শূন্য হবে ॥ ৮৯ ॥

পুরুষশ্রেষ্ঠ অর্জুন ! তুমি যথার্থই পরাক্রমশালী ; সুতরাং তোমার উপরে আমি সন্তুষ্ট হয়েছি। অতএব তুমি আমার কাছ থেকে অভীষ্টবর গ্রহণ করো ॥ ৯০‌ ॥

হে সম্মানকারী অরিন্দম ! মর্ত্যলোকে তোমার তুল্য কোনো পুরুষ নেই এবং স্বর্গেও তোমার চেয়েও প্রধান ক্ষাত্রশক্তিশালী লোক নেই’ ॥ ৯১ ॥

অর্জুন বললেন, ‘প্রভু বৃষধ্বজ ! আপনি প্রীতিবশত যদি আমাকে অভীষ্ট বর দান করেন, তবে আমি সেই ভয়ঙ্কর দিব্য পাশুপত অস্ত্র নিতে ইচ্ছা করি ॥ ৯২ ॥

যে অস্ত্রের নাম ‘ব্রহ্মশির’, যা কেবলমাত্র আপনারই আছে, যার পরাক্রম ভয়ঙ্কর এবং যা দারুণ প্রলয়কাল উপস্থিত হলে সমগ্র জগৎটাকেই সংহার করে থাকে ॥ ৯৩ ॥

মহাদেব ! ভীষ্ম, দ্রোণ, কৃপ ও কর্ণের সহিত আমার মহাযুদ্ধ হবে ; সেই যুদ্ধে যাতে আমি আপনার অনুগ্রহে তাঁদের জয় করতে পারি ॥ ৯৪ ॥

যে অস্ত্রদ্বারা আমি যুদ্ধে দানব, রাক্ষস, ভূত, পিশাচ, গন্ধর্ব্ব ও নাগদিগকে দগ্ধ করতে সমর্থ হবো ॥ ৯৫ ॥

যে অস্ত্র অভিমন্ত্রিত করলে, সেখান থেকে সহস্র সহস্র, শূল, ভয়ঙ্কর গদা এবং সর্পাকৃতি বাণ সকল আবির্ভূত হয়ে থাকে ॥ ৯৬ ॥

এবং যে অস্ত্র দ্বারা আমি-ভীষ্ম, দ্রোণ, কূপ ও সর্ব্বদা কটুভাষী কর্ণের সহিত যুদ্ধ করতে পারবো ॥ ৯৭ ॥

ভগবন্ কামনাশক ! ইহাই আমার প্রথম কামনা যে, যাতে আমি আপনার অনুগ্রহে শত্রুসংহারে সমর্থ হই'॥ ৯৮ ॥

মহাদেব বললেন, ‘প্রভাবশালী পাণ্ডব। আমার প্রিয় পাশুপত অস্ত্র আমি তোমাকে দান করব। কেন না, তুমি তাহা ধারণ, প্রয়োগ ও উপসংহার করতে সমর্থ ॥ ৯৯ ॥

ইন্দ্র, যম, কুবের, বরুণ, কিংবা বায়ুও এ অস্ত্র জানেন না। সুতরাং মানুষেরা জানবে কি করে ? ॥ ১০০ ॥

অর্জুন ! তুমি সহসা কোন লোকের উপরে এ অস্ত্র নিক্ষেপ কোরো না। কারণ, দূর্বলের উপরে নিক্ষেপ করলে, এ অস্ত্র জগৎটাকেই দগ্ধ করবে ॥ ১০১ ॥

স্থাবর-জঙ্গমাত্মক ত্রিভুবনের মধ্যে কোন প্রাণীই এই অস্ত্রের অবধ্য নাই। বিশেষত এই অস্ত্র-মন, নয়ন, বাক্য ও ধমুদ্বারা নিক্ষেপ করা যায়’ ॥ ১০২ ॥

বৈশম্পায়ন বললেন, সেই কথা শুনে অর্জুন পবিত্র ও একাগ্রচিত্ত হয়ে সত্বর মহাদেবের কাছে গিয়ে বললেন, ‘শিক্ষা দিন’ ॥ ১০৩ ॥

তার পর, মহাদেব মন্ত্র, সঙ্কেত ও উপসংহারের সহিত মূর্তিমান যমের মতো যেন সেই পাশুপত অস্ত্র অর্জুনকে শিক্ষা দিলেন ॥ ১০৪ ॥

তখন সেই পাশুপত অস্ত্র শিবের যেমন অনুগত ছিল, অর্জুনেরও তেমনই অনুগত হল; অর্জুনও সন্তুষ্ট হইয়া তাহাকে গ্রহণ করলেন ॥ ১০৫ ॥

তারপর পর্বত, বন, বৃক্ষ, সমুদ্র, বনসন্নিহিত স্থান, গ্রাম, নগর ও খনির সহিত সমগ্র পৃথিবী কাঁপতে লাগল ॥ ১০৬ ॥

আর, সেই সময়ে সহস্র সহস্র শঙ্খ, দুন্দুভি ও ভেরীর শব্দ এবং বিশাল নির্ঘাতের শব্দ হইল ॥ ১০৭ ॥

তদনন্তর সেই ভয়ঙ্কর পাশুপত অস্ত্র মূর্তিধারণপূর্বক অমিততেজা অর্জুনের পাশে থেকে অত্যন্ত জ্বলতে লাগল ; তাহা দেবগণ ও দানবগণ দর্শন করলেন ॥ ১০৮ ॥

তারপর, মহাদেব অমিততেজা অর্জুনের অঙ্গ স্পর্শ করলে, অর্জুনের শরীরে পূর্বে যুদ্ধ করে যে কিছু ক্ষত বা বেদনা হয়েছিল, সে সমস্তই তিরোহিত হল ॥ ১০৯ ॥

তৎপরে মহাদেব অনুমতি করলেন যে,‘অর্জুন ! তুমি স্বর্গে গমন করো’।

তখন অর্জুন মস্তকদ্বারা মহাদেবকে প্রণাম করে কৃতাঞ্জলি হয়ে তাঁর দিকে চেয়ে র‌ইলেন ॥ ১১০ ॥

তদনন্তর দেবতাদের অধীশ্বর, চিরস্বাধীন, মহাতেজা, কৈলাসবাসী, উমাপতি ও জগতের মঙ্গলকারী মহাদেব দৈত্য ও পিশাচগণের দমনকারী বিশাল সেই গাণ্ডীব ধনুক অর্জুনের হস্তে প্রত্যর্পণ করলেন ॥ ১১১ ॥

তারপর, যে হিমালয়ের উন্নতাবনত স্থান, সমতল ভূমি ও গুহা সকল শুভ্রবর্ণ এবং যে হিমালয় পক্ষিগণ ও মহর্ষিগণের আশ্রয়, সেই মঙ্গলময় হিমালয় পরিত্যাগ করে তখনই মহাদেব পার্বতীর সহিত আকাশে চলে গেলেন; আর অর্জুন সেই দিকে চেয়ে রইলেন ॥ ১১২ ॥

____________________________________________________________________________________

♦️[মহাভারত/বনপর্ব/৩৬ অধ্যায়/১-৫ নং শ্লোক]♦️

বৈশম্পায়ন বললেন, সমস্ত লোক দেখতে থাকে, সেই অবস্থাতেই যেমন অস্ত চলে যেতে থাকা সূর্য তাদের দৃষ্টির অগোচর হয়ে পড়েন ; সেইরূপ অর্জুন দেখছিলেন, সেই অবস্থাতেই মহাদেব তাঁর দৃষ্টির অগোচর হয়ে পড়লেন ॥ ১ ॥


হে ভরতনন্দন ! তারপর, 'আমি মহাদেবকে প্রত্যক্ষ দেখতে পেয়েছি' এটি ভেবে বিপক্ষবীরহন্তা অর্জুন অত্যন্ত বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়লেন ॥ ২ ॥

(আর ভাবলেন) ‘আমি ধন্য হয়ে গেছি এবং অনুগৃহীত হয়েছি। যে হেতু, ত্রিলোচন, পিনাকধারী ও বরদাতা মূর্তিমান্ মহাদেবকে আমি দেখতে পেয়েছি এবং নিজ হাতের দ্বারা স্পর্শ করতে পেরেছি ॥ ৩ ॥

আর, আপনাকে অত্যন্ত কৃতার্থ বলে মনে করছি, যুদ্ধে সকল শত্রুকেই জয় করবার সম্ভাবনা রয়েছে বলে অনুমান করতে পারছি এবং সমস্ত প্রয়োজনই সিদ্ধ হয়েছে বলে ধারণা করতে পারছি ॥ ৪ ॥

এইভাবেই অমিততেজা অর্জুন চিন্তা করছিলেন ।..॥ ৫॥


॥ মহাভারত বর্ণিত অর্জুনের শিবারাধনা ও পরমে শিবের কিরাত অবতারের লীলা বর্ণনা সম্পূর্ণ হল ॥

____________________________________________________________________________________

🟢 পুনঃকথন : হরিদাস সিদ্ধান্ত বাগীশ মহাশয়ের অনুবাদিত  মহাভারতের বনপর্বের ১৪০ তম অধ্যায়ে অর্জুন পুনরায় এই বিষয়ে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা করেছিলেন যুধিষ্ঠিরের কাছে । 

____________________________________________________________________________________


[বিশেষ দ্রষ্টব্য : এই ঘটনাটি মহাভারত ছাড়াও শিবমহাপুরাণের শতরুদ্রিয় সংহিতার ৩৭ অধ্যায় থেকে ৪১ নং অধ্যায় পর্যন্ত আরো বিস্তারিত ভাবে বর্ণিত হয়েছে। এ বিষয়ে অন্যত্র আলোচনা করা হবে।]


শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তে 🚩 

হর হর মহাদেব 🚩 


✍️ লেখনীতে — শ্রী নন্দীনাথ শৈব আচার্য জী 

©️ কপিরাইট ও প্রচারে — International Shiva Shakti Gyan Tirtha - ISSGT


মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ