‘রুদ্র’ শব্দের অর্থ বিকৃতকারী দয়ানন্দ সরস্বতী সহ আর্যসমাজকে চরম খণ্ডন দেওয়া হল শৈবপক্ষ থেকে
ভূমিকা —
আর্যসমাজের প্রতিষ্ঠাতা দয়ানন্দ সরস্বতী শুক্ল যজুর্বেদের ১৬ অধ্যায়ে থাকা রুদ্র সূক্তের রুদ্রকে ঈশ্বরত্ব থেকে সরিয়ে কখনো বিদ্যুৎ, কখনো অগ্নি, কখনো সাধারণ মনুষ্য/রাজা/সেনাপতি বলে বেদমন্ত্রের অর্থের অনর্থ করেছে। যাতে দয়ানন্দ সরস্বতী বেদ থেকে ঈশ্বরের সাকার হবার প্রমাণগুলিকে মুছে ফেলতে পারে, সেই উদ্দেশ্যে দয়ানন্দ সরস্বতী এই অনর্থ ঘটিয়েছেন, আর বর্তমান কালে আর্য সমাজীরা দয়ানন্দ সরস্বতীর এই পাপকর্মকে গর্বের করে সমাজে ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে। বাংলাদেশ অগ্নিবীর নামক আর্য সমাজের প্রতিষ্ঠান ম্লেচ্ছ যবনদের প্রেরণায় বাংলাদেশে প্রতিমা পূজার বিরুদ্ধে সকল রকম অপপ্রচার করে চলেছে, যেহেতু বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দু সনাতনীরা ধর্ম সম্পর্কে সচেতন নয়, সহজ সরল প্রকৃতির, তাই ম্লেচ্ছ যবনদের সহায়তায় আর্য সমাজীদের এই নব্য প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ অগ্নিবীর নেমেছে সংখ্যালঘু দেবদেবীর প্রতিমাপূজক হিন্দুদের মধ্যে বেদের দোহাই দিয়ে ছলনা করে প্রতিমাপূজা থেকে বিমুখ করে দেবার জন্য। বাংলাদেশ অগ্নিবীর নামক আর্যসমাজীদের এই প্রতিষ্ঠান তাদের back to the vedas ব্লগে নিজেদের মতো করে রুদ্র শব্দের অর্থের আরো অনর্থ ঘটিয়েছে। চলুন তাদের দাবী ও শৈবপক্ষ থেকে তার খণ্ডন দেখে নেওয়া যাক।
❌ বাংলাদেশ অগ্নিবীর নামক আর্যসমাজের দাবী —
নিরুক্ত আদি বৈদিক গ্রন্থে রূদ্র শব্দের অর্থ' বিদ্যুৎ' তথা 'বজ্রপাত' করা হয়েছে।
রুদ্রো রৌতীতি সতো রোরুয়মাণো দ্রবতীতি বা রোদয়তেবা। যদরুদত্ তদ্রুদ্রস্য রুদ্রত্বমিতি কাঠকম্। যদরোদীত্তদ্রুদ্রস্য রুদ্রত্বমিতি হারিদ্রবিকম্। (নিরু০ ১০/৬)
বৃহদ্দেবতায় উক্ত বিদ্যুৎ শব্দের অর্থ রুদ্র করা হয়েছে।
অরোদীদন্তরিক্ষে যদ্বিদ্যুদ্ বৃষ্টিং দদতৃণাম্। চতুর্ভিঋষিভিস্তেন রুদ্র ইত্যাভিসংস্তুতঃ। (২/৩৫)।
অর্থাৎ : যে কারণে অন্তরিক্ষে এই বজ্রদেব ক্রন্দিত হয়েথাকেন এবং মনুষ্যের হিতার্থে বৃষ্টি বর্ষণ প্রদান করে থাকেন তাই তাকে (পরমেশ্বরকে) রুদ্র বলা হয়ে থাকে। যাস্কাচার্য একে তিন ধাতু দ্বারা সিদ্ধ করেন। (রৌতি= রু শব্দে) শব্দার্থে, " রু" ধাতু থেকে" রু" এবং দু = গতৌ গত্যর্থক" দ্রু", এই দুই ধাতু দ্বারা রুদ্র সিদ্ধ হয়। রুদ্র ধাতু থেকেও রুদ্র সিদ্ধ হয়ে থাকে। এবিষয়ে ব্যকরণের মত উল্লেখ্য।
যজুর্বেদীয় শতপথ ব্রাহ্মণে রুদ্র সম্পর্কে মনোহর তথা রুচিকর আখ্যান দ্বারা বর্ণনা করা হয়েছে। যথা -
অভুদ্বা ইয়ং প্রতিষ্ঠেতি। তদ্ ভূমিরভবত্তামপ্রথয়যত্। সা চ পতিঃ সংবৎসরাযাদীক্ষন্ত ভূতানাং পৃথিব্যভবত্ তস্যামস্যাং প্রতিষ্ঠায়াং ভূতানি চ ভূতানাং পতিগৃহপতিরাসীত। উষাঃ পত্নী। তদ্যানি তানি ভুতানি ঋতবস্তে। অথ যঃ স ভুতানাং পতিঃ সংবৎসরঃ সোথে যা ভূতানি ঋতবস্তে সোষাঃ পত্নী ঔষসী সা তানীমানি ভূতানি চ ভূতানাং চ পতিঃ সংবৎসর উষসি রেতোৎসিঞ্চন্তস কুমারোজায়ত। সোৎ রোদীত্ || (শতপথ ব্রাহ্মণ/৬/১/৩/৭-৮)।
অর্থাৎ : এখানে আগ্নেয় শক্তির ব্যাপকতা দর্শানো হয়েছে। এটিতে সন্দেহ নেই যে, সৃষ্টিতত্ত্ববিদ বিজ্ঞানী তারা নিমিত্তকারণ ঈশ্বরকে ছেড়ে সৃষ্টিজগতের মূখ্য কারণ ভৌতিক সূর্যকে মনে করেন। ক্রমশঃ সেই সূর্যাগ্নি থেকে এক পার্থিব গোলক বাহির হয়ে কয়েক লক্ষ বছর পর অনন্ত অসংখ্য প্রাণীর সৃষ্টি তথা বাসের যোগ্য হয়। তাতে পর্বত, সমুদ্র, বনস্পতি, ঔষধি, পর্জন্য, বিবিধ পশু, পক্ষী, মনুষ্যাদি উৎপন্ন হয়। এই পৃথিবী থেকে বহুত দূর সূর্য স্থাপিত হয়। সেখান থেকে সে উষ্ণতা বিতরণ করতে থাকে। নিজ নিজ ক্ষমতা অনুসারে সৃষ্টির প্রত্যেক পদার্থ উষ্ণতা গ্রহণ করতে থাকে। সেই থেকে এক কুমার উৎপন্ন হয়। সে কাঁদতে থাকে।
তং প্রজাপতিরব্রবীত। কুমার! কিং রোদিষি। সোৎব্রবীত। নাম মে ধেহীতি ॥ ৯ ॥
তমব্রবীদ রুদ্রোৎসি ইতি। তদ্যদস্য তত্রাম অকরোদ্ অগ্নিস্তদ্রুপমভবত্।
অগ্নির্বে রুদ্রো যদরোদীত্। তস্মাদ রুদ্রঃ। সোৎব্ৰবীত্। জ্যাযান্বা অতোৎস্মি।
ধেহ্যেব মে নামেতি ॥ ১০ ॥
তমব্রবীত্। সর্বোৎসীতি। যদ্যদস্য তত্রামাকরোত্। আপস্তদ্রুপমভবত্রাপো বৈ সর্বঃ।
অদ্ভযো হীদ সর্ব জায়তে। সোৎব্রবীত। জ্যাযান্বা অতোৎস্মি। ধেহ্যেব মে নামেতি ॥ ১১ ॥
অর্থাৎ : প্রজাপতি বলেন হে কুমার! তুমি কেন কাঁদছ ? সে বলল আমার একটি নাম দিন। আমার একটি নামে রাখেন ॥ ৯ ॥
প্রজাপতি বলেন- তুমার নাম " রুদ্র "। তার এই রুদ্র নাম শুদ্ধ "অগ্নি" বাচক হয়। অগ্নিই রুদ্র হয়। যার জন্য সে কাঁদতে থাকে অতঃ সেই রুদ্র বলতে থাকেন। তৎপশ্চাৎ প্রজাপতি দ্বারা সেই কুমার বলতে লাগে নিশ্চয় আমি এতে' জ্যায়ান' অধিক হই, আমাকে অন্য অন্য একটি নামও দেন ॥ ১০ ॥
প্রজাপতি বলেন - তুমি সর্ব। তার এই সর্ব নাম জলে ব্যপকতা এবং জল দায়িত্ব সূচক, কারণ জল থেকেই সব জীব উৎপন্ন হয়। পুনঃ সেই কুমার বলে আমি এর থেকেও' জ্যায়ান' - অধিক হই, আমার আরো অন্য কোন নাম দেন।
উক্ত শতপথের আখ্যান থেকেও প্রমাণ হয় রুদ্রের অর্থগত নাম অগ্নি।
বাংলাদেশ অগ্নিবীর
ও৩ম্ কৃণ্বন্তো বিশ্বমার্যম
✅ শৈবপক্ষ দ্বারা চরম খণ্ডন —
আর্যসমাজীদের দাবী অনুযায়ী - বেদের সকল স্থানে রুদ্র শব্দের অর্থ হলো- বিদ্যুৎ বা বজ্রপাত। যার জন্য তারা যাস্ক নিরুক্তের একটা প্রমাণ উদ্ধৃত করেছে। নিরুক্তে যখন রুদ্র শব্দের অর্থে বিদ্যুৎ বলা হয়েছে তাহলে তা অবশ্যই সঠিক বলা হয়েছে এবং তার কোনো খণ্ডনও হবে না।
কিন্তু, এখানে কিছু প্রশ্ন থেকে যায়।
যেমন- যদি নিরুক্ত অনুযায়ী বেদের সকল স্থানে রুদ্র বলতে কেবল বিদ্যুৎ বা বজ্রপাত বোঝানো হয় তবে-
“একো হি রুদ্র ন দ্বিতীয়ায় তস্থুর্য” (শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ/৩/২) ও (তৈত্তিরীয় সংহিতা ১/৮/৬) -
“বিশ্বধিপো রুদ্রঃ মহর্ষিঃ” (শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ ৪/১২) ও (তৈত্তিরীয় আরণ্যক ১০ম প্রপাঠক) -
“পুরুষস্য বিদ্ম সহস্রাক্ষস্য মহাদেবস্য ধীমহি। তন্নো রুদ্রঃ প্রচোদয়াৎ” (তৈত্তিরীয় আরণ্যক /১০/১) -
“তৎপুরুষায় বিদ্মহে মহাদেবায় ধীমহি তন্নো রুদ্রঃ প্রচোদয়াৎ” (তৈত্তিরীয় আরণ্যক /১০/৪৭) - “সর্বে বৈ রুদ্রস্তস্মৈ রুদ্রায় নমো অস্তু। পুরুষো বৈ রুদ্রঃ সন্মহো নমো নমঃ” - “সর্বে হ্যেষ রুদ্রস্তস্মৈ রুদ্রায় নমো অস্তু” (তৈত্তিরীয় আরণ্যক ১০/২৪) অনুযায়ী এখানে “রুদ্র” শব্দ দ্বারা কি এবং কাকে বোঝানো হয়েছে ?
এছাড়াও, বেদের চারটি ভাগ অর্থাৎ- সংহিতা, আরণ্যক, ব্রাহ্মণ ও উপনিষদে যেখানে যেখানে “রুদ্র” শব্দ রয়েছে সেখানেও কি রুদ্র শব্দের অর্থে কেবল “বিদ্যুৎ বা বজ্রপাত” হবে ? আর্যসমাজের নিকট এই প্রশ্ন রয়ে গেলো।
আমাদের শৈবদের উক্ত সকল স্থানে রুদ্র শব্দে পরমেশ্বর শিবকেই বোঝানো হয়েছে, কোনো বিদ্যুৎ বা বজ্রপাতকে নয়।
কেননা- এমন আর্যসমাজীদের বানানো এমন অর্থ কখনো প্রাসঙ্গিক নয় যেখানে বলা হয়- “একো হি রুদ্র ন দ্বিতীয়ায় তস্থুর্য” অর্থাৎ- একমাত্র বিদ্যুৎ’ই পরমেশ্বর দ্বিতীয় কোনো সত্ত্বা নেই। যদি নিরুক্ত ও আর্যসমাজীদের দাবী অনুযায়ী রুদ্র অর্থ বিদ্যুৎ হয় তবে উক্ত শ্লোকের অর্থ কতটা যৌক্তিক তার উপর প্রশ্ন থেকেই যায়। কেননা- শুধুমাত্র বিদ্যুৎ কীভাবে পরমেশ্বর হয় ? বিদ্যুৎ কীভাবে সর্বজ্ঞ হয় ? বিদ্যুৎ কীভাবে সবকিছুর কারণ হয় ? বিদ্যুৎকে কীভাবে পুরুষ শব্দে সংজ্ঞায়িত করা হয়? যদি রুদ্র শব্দের অর্থ বিদ্যুৎ হয় তবে এসব অসঙ্গতির সঠিক উত্তর কি হবে সেটা আর্যসমাজীদের ভাবনার বিষয়।
👉এবার দৃষ্টিপাত করা যাক আর্যসমাজীদের দাবীতে থাকা অসঙ্গতি নির্ণয়ের বিষয়ে —
আর্যসমাজীরা দাবী তো করেছে যে, নিরুক্ত অনুযায়ী রুদ্র শব্দের অর্থ বিদ্যুৎ বা বজ্রপাত। হ্যা, নিরুক্ত ভুল নয়। কিন্তু, বেদে তো সকল স্থানে তো রুদ্র শব্দের অর্থ বিদ্যুৎ মানলে তো বেদের অর্থের সর্বনাশ হবে। তাহলে এই অসঙ্গতিপূর্ণ দাবীর মীমাংসা কি ? সেটি আর্যসমাজীরা সমাধান করতে সমর্থ নয়।
আর্যসমাজীরা নিরুক্তের কেবল সেই অংশটুকুকে তুলে দেখিয়ে প্রচার করেছে যেখানে- আর্যরা নিজেদের মতবাদকে সঠিক হিসেবে জনগণকে দেখাতে পারবে। নিরুক্তের অবশিষ্ট অংশটুকু আর্যসমাজ তুলে ধরেনি ইচ্ছে করে। বা তুলে ধরলেও তার উপযুক্ত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে দেখায়নি। এই কারণে, আর্যসমাজের উপর “অর্ধজড়ীয়তার” দোষ আরোপিত হয়। কারণ, একটা সম্পূর্ণ বিষয়ের একটি ভাগকে স্বীকার করে, অথচ অন্য ভাগকে অস্বীকার করার মতো কর্ম - অর্ধজড়ীয়তাই বটে।
সুতরাং, বলা যায় আর্যসমাজের ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ ছলনাময়। কেননা ন্যায় শাস্ত্র বলছে—
‘‘বচনবিঘাতোহর্থাবকল্পোপপত্ত্যা ছলং।’’
[ন্যায়সূত্র ১/২/৫১]
অর্থ — যখন কোনো বচনের প্রকৃত অর্থকে বিকৃত করে অন্য অর্থ কল্পনা করে নিজের দাবিকে জোরালো করা হয়, তখন সেটাকে বলা হয় “ছল”।
ছল ৩ প্রকার — বাক্ছল, সামান্যছল ও উপাচার ছল।
‘‘অবিশেষাহিতেহর্থে বক্তুরভিপ্রায়াৎ অর্থান্তরকল্পনা বাক্চ্ছলম্’’ [ন্যায়সূত্র-১/২/৫৩]
অর্থ — বক্তা যেভাবে অর্থ বোঝাতে চায়, তার পরিবর্তে একই শব্দের অন্য অর্থ কল্পনা করে বিকৃত করা।
উদাহরণ —
কেউ বললেন — “গঙ্গায় স্নান করো।”
আসল উদ্দেশ্য নদী ‘গঙ্গায়’।
কিন্তু প্রতিপক্ষ বলল— “গঙ্গা তো এক নারীও বটে (শব্দের আরেক অর্থ)। তাহলে কি সেই নারীর মধ্যে স্নান করতে হবে ?” এটা হলো বাক্-ছল অর্থান্তর কল্পনা।
বেদে ‘রুদ্র’ শব্দ বিভিন্ন অর্থে (দেবতা, ঈশ্বর, চিকিৎসক, সকল জীবের রক্ষক ইত্যাদি) ব্যবহৃত।
কিন্তু বক্তার (বেদের) অভিপ্রায় হচ্ছে “ঈশ্বরতত্ত্বের এক দিক” বোঝানো। আর্যসমাজ এই অভিপ্রায়কে বাদ দিয়ে অন্য অর্থ (বিদ্যুৎ) কল্পনা করেছে, এটি অর্থান্তরকল্পনা, যা সূত্র অনুযায়ী বাক্-ছল।
যেমন- “রুদ্রং দ্রষ্টুমিচ্ছামি” অর্থ “আমি ঈশ্বর রুদ্রকে দর্শন করতে চাই”
আর্যসমাজ যদি বলে “আমি বজ্রপাত দেখতে চাই”, তবে এটি বক্তার অভিপ্রায়বিরুদ্ধ অর্থান্তর, অর্থাৎ বাক্-ছল।
‘‘সম্ভবতোহর্থস্য অতিসামান্যযোগাৎ অসম্ভূতার্থকল্পনা সামান্যচ্ছলম্’’। [ন্যায়সূত্র-১/২/৫৪]
অর্থ — যখন বক্তা কোনো পদার্থ বোঝাতে একটা বিশেষ ধর্ম (লক্ষণ) উল্লেখ করেন, আর প্রতিপক্ষ সেই ধর্মটা ধরে এমন কিছুর সঙ্গে মিলিয়ে দেয়, যেখানে সেটি অসম্ভব।
উদাহরণ—
বক্তা বললেন — “অগ্নি উষ্ণ।”
প্রতিপক্ষ বলল— “রাগও তো উষ্ণ হয়, তাহলে কি রাগও অগ্নি?”
এখানে “উষ্ণতা” নামক ধর্মটা অনেক জিনিসে আছে। অগ্নি বোঝাতে উষ্ণতা বলা হয়েছিল, কিন্তু প্রতিপক্ষ তা ধরে অন্যত্র টেনে নিয়েছে। এটাই হলো সামান্য-ছল।
“রুদ্র” শব্দের এক অর্থ “যিনি ক্রন্দন করান” বজ্রপাতের সময় আকাশ গর্জে, সেটাকে তারা “ক্রন্দন” ভেবে রুদ্রের পরিচয় দিতে চায়। কিন্তু “ক্রন্দন” ধর্ম কেবল বজ্রপাতেই নেই, মানুষ, পশু, বায়ুপ্রভৃতি বহু স্থানে আছে। এই সাধারণ ধর্মের (ক্রন্দন বা গর্জন) অতি-প্রসারণ করে “রুদ্র = বজ্রপাত” বলা হয়েছে।
তাই এটি অতিসামান্যযোগে অসম্ভূতার্থকল্পনা অর্থাৎ সামান্য-ছল।
আর্যসমাজ মূলত রুদ্র শব্দের ভুল ও ছলনাময় ব্যাখ্যা করেছে। মহর্ষি যাস্ক রুদ্র শব্দের বিভিন্ন অর্থ ও ব্যুৎপত্তির নিয়ম বলেছেন। কিন্তু, আর্যসমাজ রুদ্র শব্দের অনেকার্থ বাদ দিয়ে কেবল মাত্র বিদ্যুৎ ও বজ্রপাত শব্দকেই উপস্থাপন করেছেন। যেটা এক প্রকারের সত্যকে লুকোনো। কারণ, রুদ্র শব্দে পরমেশ্বর, দেবতা, পরমবৈদ্য, রক্ষণশীল দেবতাও বোঝায়। কিন্তু, আর্যসমাজীরা সেই সব অর্থকে বাদ দিয়ে ছলনাময় পূর্বক একটি অর্থ দ্বারা রুদ্র শব্দের বিদ্যুৎ অর্থ প্রতিপাদিত করেছে। তাহলে এবার দেখে নেবো যাস্ক নিরুক্তে রুদ্র শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ।
আর্যসমাজ কতৃক ছলনাময় অনর্থের উন্মোচন দেখুন,
আর্যসমাজ কতৃক বৃহদ্দেবতায় রুদ্র শব্দের ব্যুৎপত্তি অর্থে যে অর্থ করেছে তা হলো —
“অরোদীদন্তরিক্ষে যদ্বিদ্যুদ্ বৃষ্টিং দদতৃণাম্। চতুর্ভিঋষিভিস্তেন রুদ্র ইত্যাভিসংস্তুতঃ”। (২/৩৫)।
অর্থাৎ : যে কারণে অন্তরিক্ষে এই বজ্রদেব ক্রন্দিত হয়েথাকেন এবং মনুষ্যের হিতার্থে বৃষ্টি বর্ষণ প্রদান করে থাকেন তাই তাকে (পরমেশ্বরকে) রুদ্র বলা হয়ে থাকে।
[আর্যসমাজ কতৃক অনুবাদ]
👉 এবার উক্ত রুদ্র শব্দের নিরুক্তির সঠিক অনুবাদ দেখে নেওয়া যাক —
অরোদীদন্তরিক্ষে যদ্বিদ্যুদ্ বৃষ্টিং দদতৃণাম্ ।
চতুর্ভিঋষিভিস্তেন রুদ্র ইত্যাভিসংস্তুতঃ।।
অন্বয় — যৎ (যিনি) অন্তরিক্ষে (আকাশে) অরোদীত্ (রোদেননি / কাঁদেননি), যঃ (যিনি) বিদ্যুদ্-বৃষ্টিং (বিদ্যুৎসহ বৃষ্টি) তৃণানাম্ (তৃণজাতির, অর্থাৎ উদ্ভিদের জন্য) অদদাত্ (বর্ষণ করেছিলেন), তেন (সেই তাঁকেই) চতুর্ভিঃ ঋষিভিঃ (চারজন ঋষি দ্বারা) রুদ্র ইতি ( ‘রুদ্র’ এই নামে ) আভিসংস্তুতঃ (স্তুত করা হয়েছে)।।
অর্থ — “যিনি আকাশে রোদেননি (অর্থাৎ, যিনি সর্বদা শান্ত, দুঃখমুক্ত ও করুণাময়), যিনি বিদ্যুৎসহ বৃষ্টি বর্ষণ করেছিলেন তৃণাদি উদ্ভিদের জন্য সেই তিনি চারজন ঋষির দ্বারা ‘রুদ্র’ নামে স্তুত হয়েছেন।”
সুতরাং, উক্ত নিরুক্তির ভাবার্থ— যিনি দুঃখহীন, শান্ত ও করুণারূপে আকাশ থেকে জীবপালনকারিণী বৃষ্টি বর্ষণ করেন, তাঁকেই ঋষিগণ “রুদ্র” নামে স্তুতি করেছেন।।
❌ আর্যসমাজের অনুবাদের অসঙ্গতিগুলো হলো —
১. “অরোদীত্” শব্দের ভুল অর্থ- মূল অর্থ “রোদেননি” (দুঃখহীন), কিন্তু ধূর্ত আর্যসমাজীরা অর্থ করেছে “ক্রন্দিত হন” যা একেবারে বিপরীত অর্থ লিখেছে।
২. “তৃণানাম্” শব্দের বিকৃতি- মূল অর্থ “তৃণ বা উদ্ভিদের জন্য”, কিন্তু তারা বলেছে কেবল “মনুষ্যের হিতার্থে” যা কল্পিত সংযোজন।
৩. “চতুর্ভিঋষিভিঃ” অংশ উপেক্ষা- চার ঋষি কর্তৃক স্তুতির কথা বাদ দিয়েছে আর্যসমাজ।
৪. মন্ত্রের ভাববিরোধ- মন্ত্রে রুদ্র করুণাময় ও শান্ত, আর তারা দেখিয়েছে “ক্রন্দনকারী বজ্রদেব” সম্পূর্ণ বিপরীত ভাব।
আর্যসমাজের অনুবাদ ব্যাকরণবিরুদ্ধ, অর্থবিকৃত ও বেদের মূল ভাবের পরিপন্থী।
◾তাহলে সকলে ভাবুন- এই অনার্যসমাজীরা কত বড় ধূর্ত হলে মন্ত্রের অর্থ পালটে দিতে পারে। কিন্তু, দুঃখের বিষয় আজকাল সনাতনীরা সেই অনার্যসমাজকেই অনুসরণ করে, যারা কিনা বেদের নামে কেবল অপপ্রচার করে।
👉 “রুদ্র” শব্দের ব্যুৎপত্তি ও যাস্কাচার্যের বিশ্লেষণ—
যাস্কাচার্য “নিরুক্ত” (১০।৫–৮) এ “রুদ্র” শব্দের নানা ব্যুৎপত্তি-সম্ভাবনা ব্যাখ্যা করেছেন। মূলত তিনি “রু” এবং “রুদ্” ধাতু (রোদন বা শব্দার্থক) থেকে ‘রুদ্র’ শব্দের বিভিন্ন অর্থিক প্রক্ষেপ নির্ণয় করেছেন। নিম্নে ক্রমানুসারে সেগুলির বিশ্লেষণ—
“রুদ্রো রৌতীতি সতঃ, রোরূয়মাণো দ্রবতীতি বা রোদয়তো, 'যদরুদত্ত-দ্রুদ্রস্য রুদ্রত্বম্' ইতি কাঠকম্, 'যদরোদীত্তদ্রুদ্রস্য রুদ্রত্বম্' ইতি হারিদ্রবিকম্” ।।৮।।
[যাস্ক নিরুক্ত ১০/৫/৮]
'রুদ্র' শব্দের ব্যুৎপত্তি প্রদর্শন করিতেছেন- (১) রুদ্রঃ রৌতি ইতি সতঃ ('রুদ্র' শব্দ শব্দার্থক 'রু' ধাতু হইতে নিষ্পন্ন কর্তৃবাচ্যে রুদ্র শব্দ করেন);
(২) রোরায়মাণঃ প্রবতি ইতি বা (অথবা, শব্দার্থক 'রু' ধাতু এবং গত্যর্থক 'ড্র' ধাতুর যোগে 'রুদ্র' শব্দের নিষ্পত্তি -মেঘোদরস্থ রুদ্র অত্যধিক শব্দ করিতে করিতে চলিয়া থাকেন);
(৩) রোদয়তেবা (অথবা, অন্তর্গত নিজর্থ 'রুদ' ধাতু হইতে 'রুদ্র' শব্দ নিষ্পন্ন রুদ্র শত্রুগণকে রোদন করান অর্থাৎ দুঃখসন্তপ্ত করেন);
(৪) [রোদিতি ইতি] (অথবা, 'রুদ' ধাতু হইতে 'রুদ্র' শব্দের নিষ্পত্তি- রুদ্র রোদন করেন); শেষোক্ত নির্বচনের সমর্থনে বেদবাক্য উদ্ধৃত করিতেছেন-
(১) 'যৎ অরুদৎ তৎ রুদ্রস্য রুদ্রত্বম্' ইতি কাঠকম্ (যেহেতু রোদন করিয়াছিলেন তাহাতেই রুদ্রের রুদ্রত্ব-ইহা কঠশাখার প্রবচন)
(২) 'যৎ অরোদীৎ তৎ রুদ্রস্য রুদ্রত্বম্' ইতি হারিদ্রবিকম্ (যেহেতু রোদন করিয়াছিলেন, তাহাতেই রুদ্রের রুদ্রত্ব ইহা মৈত্রায়ণীয় হারিদ্রব শাখার প্রবচন) রুদ্র পিতা প্রজাপতিকে বাণের দ্বারা বিদীর্ণ করিয়াছিলেন, তাঁহার দুর্নিবার শোক উপস্থিত হইয়াছিল এবং তিনি ক্রন্দন করিয়াছিলেন। রুদ্র মরুদণের পিতা (ঋ ২।৩৩।১; ঋ ১।৩৯।৪ দ্রষ্টব্য)। "তিনি অতি উগ্রস্বভাব এবং দুর্দ্ধর্য-দেবতা-তাঁহার নামগ্রহণও বিপজ্জনক; যে মন্ত্রে তাঁহার নাম আছে সেখানে 'রুদ্র' না বলিয়া 'রুদ্রিয়' বলাই ভাল" (ঐত, ব্রা, ৩।১০।৩)। 'রুদ্' ধাতু আবার 'রু' ধাতুরই সমানার্থক; ইহার অন্য এক অর্থ শব্দ করা বা গর্জন করা (to roar), কাজেই রুদ্রকে মরুদ্দুণের অর্থাৎ ঝড়ের পিতা এবং শব্দায়মান-দেবতা বলা যাইতে পারে; মনে হয় তিনি মেঘোদরবর্তী বিদ্যুৎ সহচারী মাধ্যমিক-দেবতা। শুক্ল-যজুর্ব্বেদে দেখিতে পাই (১৬/৬৪-৬৬) রুদ্রগণ তিন স্থানেরই দেবতা; দ্যুলোকে তাঁহাদের আয়ুধ বৃষ্টি, অন্তরিক্ষলোকে রাত এবং পৃথিবীলোকে অন্ন-অতিবৃষ্টি অনাবৃষ্টির দ্বারা এবং কুরাতের দ্বারা অন্ন বিনাশ করিয়া, কদরের দ্বারা রোগ উৎপাদন করিয়া তাঁহারা প্রাণিবর্গের হিংসা সাধন করেন। রুদ্রই কিন্তু আবার ভিষকশ্রেষ্ঠ নানাবিধ ঔষধ প্রয়োগে রোগপ্রতীকারকর্তা (ঋ ২।৩৩) সপ্তম পরিচ্ছেদের প্রথম সন্দর্ভ দ্রষ্টব্য।
📒 ব্যাখ্যা— যাস্কাচার্য নিরুক্তে (১০/৫–৮) বলেছেন —
“রুদ্রো রৌতীতি সতঃ, রোরূয়মাণো দ্রবতীতি বা রোদয়তেবা।”
এখানে তিনটি ধাতু ব্যবহার করা হয়েছে- “রু”, “দ্রু”, ও “রুদ্”।
এই তিনটি থেকেই রুদ্র শব্দের অর্থ দাঁড়ায় —
যিনি গর্জন করেন, যিনি চলমান শক্তি, যিনি কাঁদান বা দুঃখ দেন (সংহারী)।
অর্থাৎ- রুদ্র শব্দের ব্যুৎপত্তি দেবতার গুণ ও কর্ম থেকে, বিদ্যুতের পদার্থবাচক গুণ থেকে নয়।
যাস্কাচার্য কোথাও বলেননি “রুদ্র” অর্থ কেবল “বিদ্যুৎ”। বরং তিনি বলেছেন, রুদ্র “রুদতি, রুদায়তি” অর্থাৎ চেতনা সম্পন্ন কর্তা, বস্তু নয়।
বিদ্যুৎ একটি জড় পদার্থ, কিন্তু নিরুক্তের রুদ্র জীবন্ত কর্তা দেবতা।
সুতরাং “রুদ্র = বিদ্যুৎ” বলা ধর্মগ্রন্থবিরুদ্ধ ও যুক্তিবিরুদ্ধ।
“রুদ্রঃ রৌতি ইতি সতঃ” - “রু” ধাতু থেকে (রৌতি = শব্দ করা, গর্জন করা)।
অর্থাৎ, রুদ্র সেই যিনি গর্জন করেন আকাশে মেঘের মতো গর্জনকারী দেবতা।
“রোরূয়মাণো দ্রবতীতি বা” - “রু” (শব্দ করা) ও “দ্রু” (গমন করা) এই দুই ধাতুর যোগে ‘রুদ্র’।
অর্থ — যিনি শব্দ করতে করতে চলেন, অর্থাৎ গর্জন করতে করতে আকাশে বিচরণ করেন (মেঘে বজ্রধ্বনির ইঙ্গিত)।
“রোদয়তেবা” - “রুদ্” ধাতু থেকে “রুদতি” অর্থ - কাঁদানো বা দুঃখ দেওয়া।
অর্থ — রুদ্র সেই যিনি অন্যকে রোদন করান, দুঃখ দেন, ভীত করেন (সংহারী শক্তির ইঙ্গিত)।
“রোদিতি ইতি” - রুদ্র নিজেই রোদন করেছেন “যদ্ অরুদৎ তদ্ রুদ্রস্য রুদ্রত্বম্” (কাঠক শাখা)।
অর্থাৎ, তিনি নিজে রোদন করেছিলেন, সেই কারণে তাঁর নাম “রুদ্র” হয়েছে।
“যদ্ অরোদীৎ তদ্ রুদ্রস্য রুদ্রত্বম্” (মৈত্রায়ণীয় হারিদ্রব শাখা)
অর্থাৎ- রুদ্র নিজেই রোদন করেছিলেন।
এই রোদন প্রজাপতির বাণ বিদারণের পর তাঁর অন্তঃশোক থেকে উৎপন্ন।
এখানে রুদ্র চেতন, অনুভবশীল, ক্রন্দনকারী, কিন্তু বিদ্যুৎ নির্জীব ও অনুভূতিহীন।
সুতরাং “রুদ্র অর্থ কেবল বিদ্যুৎ” বললে এই মন্ত্র অর্থহীন হয়ে যায়।
👉 বেদে রুদ্র হলো বিদ্যুৎ বা মেঘের নিয়ন্ত্রক —
যজুর্বেদ (১৬।৬৪–৬৬) বলে —
রুদ্রগণ আকাশ, পৃথিবী ও দ্যুলোকের দেবতা;
তাঁদের আয়ুধ বৃষ্টি, রাত, ও অনাবৃষ্টি।
অর্থাৎ রুদ্র কেবল বজ্রপাত বা বৃষ্টি নন, বরং সেগুলোর নিয়ন্ত্রক দেবতা।
যেমন “ইন্দ্র বজ্র ধারণ করেন, কিন্তু তিনি বজ্র নন।”
তেমনি “রুদ্র বিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টির প্রভু, কিন্তু কেবল বিদ্যুৎ নন।”
👉 তাই বেদ পরমেশ্বর রুদ্রকে মেঘ ও বিদ্যুৎ স্বরূপ বলে স্তুতি করেছেন। এই প্রসঙ্গে বেদ বলছে—
“নমো মেঘ্যায় চ বিদ্যুতায় চ নমো বর্ষায় চাবর্ষায় চ”।।
[শুক্ল-যজুর্বেদ ১৬/৩৮]
উক্ত মন্ত্রের ভাষ্যে উব্বট-মহীধর বলেছেন —
উব্বট ভাষ্য — নমো মেঘ্যায় চ বিদ্যুত্যায় চ। নিগদব্যাখ্যানম্। নমো বর্ষায় চাবর্ষায় চ। বর্ষে ভবঃ বর্ষ্যে। অবর্ষে ভবঃ অবর্ষ্যঃ।।
মহীধর ভাষ্য— মেঘে ভবো মেঘ্যে তস্মৈ। বিদ্যুতি ভবো বিদ্যুত্যঃ তস্মৈ। বর্ষে বৃষ্ট্যাং ভবো বর্ষে তস্মৈ। অবর্ষে বৃষ্টিপ্রতিবন্ধে ভবোঽবর্ষ্যঃ তস্মৈ।।
ভাষ্যার্থ— “নমো মেঘ্যায় চ বিদ্যুত্যায় চ” —
যিনি মেঘরূপে প্রকাশিত, তাঁকেও প্রণাম, যিনি বিদ্যুৎ বা বজ্ররূপে প্রকাশিত, তাঁকেও প্রণাম। যিনি মেঘে অবস্থান করেন, তিনিই মেঘ্য দেবতা, যিনি বিদ্যুতে অবস্থান করেন, তিনিই বিদ্যুত্য দেবতা।
“নমো বর্ষায় চ অবর্ষায় চ”—
যিনি বৃষ্টি বা বর্ষণের রূপে প্রকাশিত, তাঁকেও প্রণাম,
যিনি বৃষ্টির অভাব বা খরার রূপে প্রকাশিত, তাঁকেও প্রণাম। যিনি বৃষ্টিতে বর্তমান, তিনি বর্ষ্য, যিনি বৃষ্টি-প্রতিবন্ধে বা খরায় বর্তমান, তিনি অবর্ষ্য।
অর্থাৎ- যিনি মেঘ, বিদ্যুৎ, বৃষ্টি ও খরার রূপে বিরাজমান। প্রকৃতির প্রত্যেক অবস্থায় যিনি নিজ শক্তি প্রকাশ করেন, সেই সর্বব্যাপী পরমেশ্বর রুদ্রকে প্রণাম।
👉 আবার যাস্ক নিরুক্তে রুদ্র শব্দে গর্জনকারী/শব্দকারীও বলেছেন। এই প্রসঙ্গে বেদ কি বলে সেটাও দেখে নেবো —
“নমঃ শ্রবায় চ প্রতিশ্রবায় চ”।।
[শুক্ল-যজুর্বেদ ১৬/৩৪]
এই মন্ত্রের ব্যাখ্যায় উব্বট-মহীধর বলেছেন —
উব্বট ভাষ্য— নমঃ শ্রবায় চ প্রতিশ্রবায় চ শ্রবঃ শব্দঃ প্রতিশ্রবঃ প্রতিশব্দঃ।
মহীধর ভাষ্য— শ্রুয়ত ইতি শ্রবঃ শব্দস্তদ্রুপায় নমঃ। প্রতিশ্রবঃ প্রতিশব্দস্তদ্রুপায় নমঃ।
উব্বট ভাষ্য অনুযায়ী— ‘শ্রবঃ’ শব্দের অর্থ “শব্দ”, আর ‘প্রতিশ্রবঃ’ অর্থ “প্রতিশব্দ” অর্থাৎ প্রতিধ্বনি।
মহীধর ভাষ্য অনুযায়ী— ‘শ্রবঃ’ অর্থাৎ “যা শ্রুত হয়”, অর্থাৎ শব্দ, সেই রূপের প্রতি প্রণাম। ‘প্রতিশ্রবঃ’ মানে “যা প্রত্যুত্তরে শ্রুত হয়”, অর্থাৎ প্রতিশব্দ বা প্রতিধ্বনি, সেই রূপের প্রতিও প্রণাম।
ভাবার্থ— “আমি শব্দরূপ রুদ্রকে এবং তাঁর প্রতিধ্বনি-রূপ প্রকাশক শক্তিকেও প্রণাম জানাই।” অর্থাৎ, মূল শব্দ ও তার প্রতিশব্দ উভয়ই রুদ্রশক্তির প্রকাশ।
আচার্য সায়ণেরও একই মান্যতা—
“শ্রুয়ত ইতি শ্রবঃ শব্দঃ। প্রতিশ্রবঃ প্রতিধ্বনিঃ।।
[তৈত্তিরীয় সংহিতা/সায়ণভাষ্য/৪/৫/৬]
আবার রুদ্র যেহেতু মহাশব্দকারী তাই শ্রুতি বলছে—
“নম উচ্চৈর্ঘোষায় আক্রন্দয়তে”
[শুক্ল-যজুর্বেদ/ শতরুদ্রীয়/ ১৬/১৯]
উব্বট ভাষ্য— নম উচ্চৈর্ঘোষায় মহাশব্দায়। আক্রন্দয়তে আক্রন্দঃ প্রসিদ্ধঃ।।
মহীধর ভাষ্য— উচ্চৈর্ঘোষো ধ্বনির্যস্য স উচ্চৈর্ঘোষঃ। আক্রন্দয়তি রোদয়তীত্যাক্রন্দযন্ যুদ্ধে মহাশব্দায় ত্রিপুরোদকায় নমঃ।।
অর্থাৎ- যিনি যুদ্ধক্ষেত্রে মহাশব্দকারী ও আক্রন্দনকারী, এবং ত্রিপুরসহ সমস্ত শত্রুকে ধ্বংস করেন, সেই মহাশব্দকারী রুদ্রকে নমস্কার।।
তৈত্তিরীয় সংহিতার ভাষ্যেও আচার্য সায়ণ একই ভাষ্য করেছেন—
“যুদ্ধকাল উচ্ছ্রিতো ঘোষো ধ্বনির্যস্যাসাবুশ্চৈর্ঘোষস্তস্মৈ। আক্রন্দযন্বৈরিণাং রোদয়িতা তস্মৈ রুদ্রায় নমো অস্তু”।।
[তৈত্তিরীয় সংহিতা/ সায়ণভাষ্য/৪/৫/২]
👉 আবার যাস্ক নিরুক্তে রুদ্র শব্দের অর্থে সংহারকারীও বলা হয়েছে। তবে এই প্রসঙ্গে বেদ কি বলছে তা দেখে নেওয়া যাক—
“নমোঽগ্রেবধায় চ দূরেবধায় চ নমো হন্ত্রে চ হনীয়সে চ”।।
[শুক্ল-যজুর্বেদ ১৬/৪০]
মন্ত্রের ভাষ্যে মহীধর বলেছেন— “অনে পুরো বর্তমানো হন্তীলমেবচঃ তস্যৈ। দূরে বর্তমানো হন্তীতি দূরেবধঃ তস্মৈ। হন্তীতি হন্তা তস্মৈ। লোকে ইয়ো হন্তি তদ্রূপেণ রুত্র এভ হন্তীত্যর্থঃ। অতিশয়ে হন্তা হনীয়ান তস্মৈ। ‘তুরিষ্ঠেমেয়ঃছু’ (পা০ ৬।৫।১৫৪) ইতি তৃচো লোপঃ।
প্রলয়ে সর্বহন্তেত্যর্থঃ।”
অর্থ — তিনি (রুদ্র) কখনো সামনে থেকে শত্রুদের সংহার করেন, আবার কখনো দূর থেকে হত্যা করেন তাই তিনি ‘ইনি’ ও ‘দূরেবধ’। ‘হন্তা’ অর্থে যিনি হত্যা করেন, তিনিই এখানে উদ্দেশ্য। এই জগতে যে সংহার ঘটে, তা আসলে রুদ্রের রূপেই সংঘটিত হয় এইটাই অর্থ। আর যখন তিনি অতিশয়ভাবে সংহার করেন, তখন তিনি হন ‘হনীয়স্’। পাণিনির "তুরিষ্ঠেমেয়ঃছু" সূত্র অনুযায়ী ‘তৃচ্’ প্রত্যয়ের লোপ হয়েছে। এইভাবে বোঝানো হয়েছে, প্রলয়ের সময় রুদ্রই সর্বসংহারকারী।
আচার্য সায়ণও বলেছেন —
“সংহারকালেঽতিশয়েন চ সর্বেষাং হন্তা হনীয়ান্”।।
[তৈত্তিরীয় সংহিতা/সায়ণভাষ্য/৪/৫/৮]
সুতরাং- মহর্ষি যাস্ক রুদ্র শব্দের ব্যুৎপত্তিতে যে অর্থ নিরূপণ করে গেছেন তা একদম শ্রুতিসম্মত।
ঋগবেদ ১/১১৪ অনুযায়ী—
মা নঃ মহান্তমুত্ মা নঃ অর্বকং মা ন উক্ষন্তম্ উত্ মান্ উক্ষিতম্ ।
মা নঃ বধীঃ পিতরং মোত মাতরং মা নঃ প্রিয়াস্ তন্বো রুদ্র রীরিষঃ ॥৭
অর্থ — হে রুদ্র! তুমি যেন আমাদের মধ্যে কোনও বড়ো, শিশু, গর্ভবতী, সদ্যোজাত, পিতা-মাতা কিংবা প্রিয় কারোরই অনিষ্ট না করো।
মা নস্তোকে তনয়ে মা ন আয়ৌ মা নো গোষু মা নো অশ্বেষু রীরিষঃ ।
বীরান্ মা নো রুদ্র ভামিতো বধীর্ হবিশ্মন্তঃ সদমিত্ ত্বা হৱামহে ॥৮।।
অর্থ — হে রুদ্র! তুমি যেন আমাদের সন্তান, আয়ু, গাভী, অশ্ব, বীর সন্তানদের কোনও অনিষ্ট না করো। আমরা সদা হব্য প্রদানকারী হয়ে তোমাকে আহ্বান করি।
ঋগবেদ ২/৩৩/৪—
মা ত্বা রুদ্র চুক্রুধামা নমোভি র্মা দুষ্টুতি বৃষভ মা সহূতি ।
উন্নো বীরাঁ অর্পয় ভেষজেবি র্ভিষক্তমং ত্বা ভিষজাং শৃণোমি ॥
অর্থ — হে রুদ্র! তুমি আমাদের ওপর রুষ্ট হয়ো না। তুমি ভীষণ অথচ কল্যাণকর। তুমি আমাদের বীর সন্তানদের সুরক্ষা দাও তোমার ওষুধসম বাণীর মাধ্যমে। আমি শুনেছি, তুমি চিকিৎসকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ চিকিৎসক।
এই মন্ত্রগুলো থেকে স্পষ্ট —
রুদ্র কেবল “বিদ্যুৎ” বা “বজ্রপাত” নন, তিনি হলেন জীবন্ত, চেতনতাপূর্ণ, সর্বশক্তিমান দেবতা, যিনি সংহার, রক্ষা ও চিকিৎসা এই তিন কর্মেই এক।
অর্থাৎ, বেদের রুদ্রই পরমেশ্বর শিব, যিনি- সংহার করেন কিন্তু কল্যাণের জন্যই করেন।
👉 আবার একই ব্যুৎপত্তিকে সমর্থন করে বেদের ভাষ্যকার উব্বট-মহীধর রুদ্র শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ নিরূপণ করেছে উনাদের ভাষ্যে। যজুর্বেদের ১৬ তম অধ্যায়ের ১ নং মন্ত্রের ভাষ্যে রুদ্র শব্দের অর্থে উব্বট-মহীধর বলেছেন —
“হে রুদ্র, রুত্ দুঃখং দ্রাবযতি রুদ্রঃ । যদ্বা “রু গতৌ? যে গত্যর্থাস্তে জ্ঞানার্থাঃ। রবণং রুত্ জ্ঞানং রাতি দদাতি রুদ্রঃ জ্ঞানম্ ভাবে ক্বিপ্ তুগাগমঃ । রুত্ জ্ঞানপ্রদ্ঃ । যদ্বা পাপিনো নরান্ দুঃখভোগেন রোদযতি রুদ্রঃ”।।
অর্থ — “রুত্” অর্থ দুঃখ; “দ্রাবযতি” অর্থাৎ গলিয়ে দেয়, নাশ করে। সুতরাং ‘রুত্ দ্রাবযতি ইতি রুদ্রঃ’ যিনি দুঃখ দূর করেন, তিনি রুদ্র।
অন্য ব্যাখ্যায় —
‘রু’ ধাতু গমনার্থক, আর যেসব গমনধাতু থাকে, সেগুলি জ্ঞানার্থকও হয়।
অতএব, ‘রু’ অর্থ জানা বা জ্ঞানদান করা; ‘রত্’ অর্থ দেওয়া তাই “রুত্ জ্ঞানং রাতি দদাতি রুদ্রঃ” যিনি জ্ঞান প্রদান করেন, তিনি রুদ্র।
এখানে “জ্ঞানম্ ভাবে ক্বিপ্ তুগাগমঃ” অর্থাৎ “রুত্” ধাতুর ভাবার্থে ক্বিপ্ প্রত্যয় ও তুগ্ আগম যুক্ত হয়ে ‘রুদ্র’ শব্দ গঠিত হয়েছে, যার অর্থ ‘রুত্ জ্ঞানপ্রদঃ’, অর্থাৎ জ্ঞানদাতা।
আরও এক ব্যাখ্যা —
“যদ্বা পাপিনো নরান্ দুঃখভোগেন রোদয়তি রুদ্রঃ” যিনি পাপীদের তাদের পাপফলভোগ দ্বারা কাঁদান বা শোকভোগ করান, তিনিও রুদ্র নামে পরিচিত।
রুদ্র শব্দের তিনটি প্রধান অর্থ এখানে দেওয়া হয়েছে —
যিনি দুঃখ নাশ করেন, যিনি জ্ঞান প্রদান করেন, যিনি পাপীদের দুঃখভোগের মাধ্যমে শোধন করেন।
অতএব রুদ্র তিনি একাধারে দুঃখনাশক, জ্ঞানদাতা ও পাপবিনাশক পরমেশ্বর।
আচার্য সায়ণও একই ভাবে রুদ্র শব্দের অর্থ গ্রহণ করেছেন —
“রুদ্রোদনহেতুর্দূঃখং তদ্দ্রাবয়তি বিনাশয়তীতি রুদ্রঃ”।।
[তৈত্তিরীয় সংহিতা/সায়ণ ভাষ্য/৪/৫/৮]
👉 যাস্কাচার্যের এই ব্যুৎপত্তিগুলো থেকে বোঝা যায় যে —
“রুদ্র” শব্দের অর্থ কেবল “বিদ্যুৎ” নয়। বরং এটি পরম শক্তিমান তত্ত্বের/দেবতার নাম যিনি গর্জন করেন, চলনশীল, ভীতিদায়ক, আবার করুণাশীল ও চিকিৎসকও। উক্ত সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা থেকেই বোঝা যায় যাস্ক নিরুক্তে কেন পরমেশ্বর রুদ্রকে রোদন করান, গর্জনকারী, দূঃখ দূরকারী অর্থে সংজ্ঞায়িত করেছে।
সুতরাং, আর্যসমাজ যেভাবে বলে “রুদ্র অর্থে কেবল বিদ্যুৎ”, তা এই নিরুক্তের সব অর্থের অতি সীমিত ও আংশিক অর্থগ্রহণ মাত্র।
👉 পাণিনী অষ্টাধ্যায়ী অনুযায়ীও রুদ্র শব্দের ব্যুৎপত্তিতে একই অর্থই মানা হয়েছে, একটু অন্য ভাবে।
“নতরপদে অনুদাত্তাদারপৃথিবীরুদ্রপুষমন্থিষু”(পাণিনী অষ্টাধ্যায়ী ৬/২/১৪২) - এই সূত্রের ভাষ্যে ভাষ্যকাররা রুদ্র শব্দের অর্থ করেছেন এই রকম —
S.C VASU — सोमारुद्रौ, Rudra is formed by 'rak' affix (Unadi II.२२.), and has acute on the final…
কাশিকা ভাষ্য—
রুদ্র — “সোমা॒রু॒দ্রৌ” (মৈ০স০ ২।১।৫ অনুযায়ী)। “রোদের্ নিলুক্” (ঊণাদিসূত্র ২।২২) ইতি রুদ্রশব্দঃ রক্-প্রত্যয়ান্তঃ অন্তোদাত্তঃ।
ন্যাস ভাষ্য–
রোদের্ নিলুক্ চ ইতি। “রুদির্ অশ্রু-বিমোচনে” (ধাতুপাঠ ১০৬৭) ইত্যস্মাৎ ন্যন্তাত্ “স্ফায়িতঞ্চি” (দ।উ।৮।৩১) ইত্যাদি সূত্রদ্রগিত্যনুবর্তমানে “রোদের্ নিলুক্ চ” (দ।উ।৮।৩৯) ইতি রক্, তেন রুদ্রঃ অন্তোদাত্তঃ।
সিদ্ধান্তকৌমুদী ভাষ্য —
সোমারুদ্রৌ। রোদের্ নিলুক্ চ ইতি রগন্তো রুদ্রশব্দঃ।
ব্যুৎপত্তি অনুযায়ী - ‘রুদির্ (অশ্রুবিমোচনে)’ ধাতু + ‘রক্’ প্রত্যয় = “রুদ্র” (যিনি দুঃখ নাশ করেন বা কাঁদান)।
ব্যবহার অনুযায়ী - বৈদিক মন্ত্রে “সোমা-রুদ্রৌ” ইত্যাদি অর্থাৎ - নির্দিষ্ট এক দেবতা রুদ্র, যিনি পরমেশ্বরের সংহার বা চিকিৎসারূপ।
পাণিনির সূত্রে উল্লেখ - “পৃথিবী”, “রুদ্র”, “পূষা”, “মন্থি” এরা সকলেই দেবনাম, এজন্যই তাদের উদাত্ত-অনুদাত্ত নির্দিষ্ট করা হয়েছে।
অতএব, পাণিনির ৬।২।১৪২ সূত্রে “রুদ্র” শব্দটি কোনো সাধারণ শব্দ নয়, বরং বৈদিক দেবতা রুদ্রের নামরূপেও (proper noun) ব্যবহৃত। ব্যাকরণে এর ধাতু-উৎপত্তি দেখানো হলেও, প্রয়োগে এটি পরমেশ্বর রুদ্রের নির্দেশক দেবনাম।
অর্থাৎ- স্থান, কাল, পাত্র ভেদে বুঝতে হবে কখন কোন অর্থে রুদ্র শব্দটা ব্যবহৃত হয়েছে। যেমনটা- আর্যসমাজের দাবী অনুযায়ী যদি রুদ্র শব্দের অর্থে কেবল “বিদ্যুৎ” মানা হয় তবে- “একো হি রুদ্র ন দ্বিতীয়ায় তস্থুর্য” ইত্যাদি বেদ বাক্যের বিরোধীতা হয়। তাই শব্দের অর্থ নির্ধারণ করতে হয় প্রেক্ষাপট ও প্রসঙ্গ যাচাই করে।
মহর্ষি যাস্কও রুদ্র শব্দ নিয়ে দ্ব্যর্থবোধক একটি দাবী তুলে ধরেছেন নিরুক্তে। চলুন তবে দেখে নেওয়া যাক নিরুক্তে মহর্ষি যাস্ক কি বলছেন —.
“একো এব রুদ্র অবস্তে ন দ্বিতীয়ঃ” (যাস্ক নিরুক্ত ১/৩/৪/৯)- অর্থাৎ একমাত্র রুদ্রই আছেন দ্বিতীয় কেউই নেই।
পক্ষান্তরে মহর্ষি যাস্ক বলছেন — “অসংখ্যাতা সহস্রাণি যে রুদ্রা অধি ভূম্যাম্” - অর্থাৎ অসংখ্য সহস্র সহস্র রুদ্র ভূমিতে অবস্থিত আছেন।
উক্ত স্থানে মহর্ষি যাস্ক অসঙ্গতি দেখিয়ে বলছেন - যদি একমাত্র রুদ্রই আছেন দ্বিতীয় কেউই নেই, তবে- অসংখ্য সহস্র রুদ্র ভূমিতে আছেন এর দ্বারা কি মন্ত্র পরস্পর বিরোধ হচ্ছে না? উক্ত মন্ত্রের এমন দ্ব্যর্থকতা মীমাংসা করতে পূর্বমীমাংসায় বলা হয়েছে—
অর্থবিপ্রতিষেধাৎ” [পূর্বমীমাংসা/১/২/৩৬]
যেখানে বলা হয়েছে, যদি একটিই শব্দ দুই বিপরীত অর্থ বোঝায়, তখন প্রসঙ্গ ও প্রাসঙ্গিক লক্ষণ দেখে অর্থ স্থির করতে হবে।
তাহলে এখানে “রুদ্র” ও “রুদ্রা” দুই শব্দের প্রাসঙ্গিক লক্ষণ দ্বারা বিচার করতে হবে রুদ্র শব্দ কোন স্থানে কীভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। তাহলে মীমাংসার গঠন হবে এমন —
“এক এব রুদ্র অবস্থে ন দ্বিতীয়” উক্ত তৈত্তিরীয় সংহিতার মন্ত্রে রুদ্র এখানে একমাত্র পরমেশ্বর বলেই গণ্য হবে। কেননা এখানে রুদ্র এক ও অদ্বিতীয় পরমেশ্বর অর্থে ব্যবহৃত। আবার- যাস্ক নিরুক্ত- ১/৩/৬/২ অনুযায়ী- “অবসায় পদ্বতে রুদ্র মৃলেতি…..তস্মাদবগৃহ্নস্তি” (ঋগবেদ ১০/১৬৯/১) অর্থাৎ- এখানে রুদ্র শব্দের অর্থ পরমেশ্বর যেখানে, প্রার্থনা করা হচ্ছে যে- চরণ বিশিষ্ট গাভীগণন যেন সুখে থাকে। আর প্রার্থনা পরমেশ্বরের উদ্দেশ্যেই করা হয়।
ছান্দোগ্য শ্রুতি অনুসারেও- “একোমেবাদ্বিতীয়ম্” ঈশ্বর এক এবং অদ্বিতীয়। সুতরাং, ঈশ্বর যেহেতু বহু হতেই পারে না তাই- নিরুক্তে “একমাত্র রুদ্র” বলতে সেই এক ও অদ্বিতীয় পরমেশ্বর শিবই এটাই মেনে নেওয়া শাস্ত্র সম্মত।
আবার- “অসংখ্যাতা সহস্রাণি যে রুদ্রা অধি ভূম্যাম্” - এখানে রুদ্রকে একমাত্র পরমেশ্বর বলা হয়নি, বরং মন্ত্রের বিপরীতে অসঙ্গতি দেখানো হয়েছে যে, অনেক রুদ্র আছেন।
এক্ষেত্রে মীমাংসা অনুযায়ী-
“রুদ্র” ও “রুদ্রা” দুই শব্দের পার্থক্য বুঝতে হবে। কেননা- “রুদ্র” কেবল একটি মাত্র সত্ত্বাকে ইঙ্গিত করছে কিন্তু অন্যদিকে, “রুদ্রা” শব্দ দ্বারা অনেক সত্ত্বা ইঙ্গিত করছে। নিরুক্তের উক্ত স্থানে- “রুদ্রা” বলতে একাদশরুদ্র, শতরুদ্র, কোটিরুদ্র অর্থে বোঝানো হয়েছে। নিরুক্তেও অনেক স্থানে মহর্ষি যাস্ক “রুদ্রা” শব্দ দ্বারা একাদশ রুদ্রকেই বুঝিয়েছেন যারা বিশ্বকে ব্যাপ্ত অবস্থান করেন৷ আবার পুরাণ-ইতিহাস আদি শাস্ত্রেও রুদ্রের অসংখ্য ভেদের কথা আমরা জানতে পারি।
“শতরুদ্রীয়তে”- এক পরমেশ্বর রুদ্রকেই শতরূপে বন্দনা করা হয়েছে। তাই এক্ষেত্রে বলা যায়, এক ও অদ্বিতীয় পরমেশ্বর রুদ্রই সমগ্র জগৎ ব্যাপ্ত করে অবস্থান করেন। “বিশ্বরূপ" = সমস্ত সত্তায় যিনি ব্যক্ত “নমো বিশ্বরূপেভ্যশ্চ বো নমঃ”[শুক্ল-যজুর্বেদ/১৬/২৫]- “বিভর্ষি সায়কানি ধন্বা অর্হন্ নিষ্কং যজতং বিশ্বরূপম্" [ঋগবেদ/২/৩৩/১০]- "বিশ্বরূপায় বৈ নমো নমঃ" [কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/তৈত্তিরীয় আরণ্যক/১০/১২], অনুযায়ী- বিশ্বের সকল রূপই যেহেতু পরমেশ্বর রুদ্রের সেক্ষেত্রে - এক ও অদ্বিতীয় রুদ্রই অসংখ্য সহস্র সহস্র রূপে ভূমিতে বিরাজমান আছেন, এমন মেনে নেওয়ায় শাস্ত্র সম্মত।
একই ভাবে মহর্ষি যাস্ক রুদ্র শব্দের অর্থে অগ্নিও নিরূপণ করেছে —
“অগ্নিরপি রুদ্র উচ্যতে” (যাস্ক নিরুক্ত ১০/৭/৭)
অর্থাৎ- অগ্নিও রুদ্র বলে কথিত হয়।
উক্ত অর্থ অনুযায়ী- একটু আশ্চর্য হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছুই নয়। কেননা সবার মনে প্রশ্ন জাগ্রত হতেই পারে যে- রুদ্র শব্দ যদি একমাত্র পরমেশ্বর অর্থে ব্যবহৃত হয় তবে, অগ্নি কীভাবে রুদ্র শব্দ দ্বারা সংজ্ঞায়িত হবে? সুতরাং এখানে বিষয় দ্ব্যর্থক হয়ে দাঁড়ায় কেননা- রুদ্র অর্থ পরমেশ্বর আবার অগ্নিও, তবে সঠিক কোনটা? তাই এমন দ্ব্যর্থকতা দূর করতে মীমাংসা অনুযায়ী প্রাসঙ্গিক লক্ষণ যাচাই করেই অর্থ নিরূপণ করা উচিত। এক্ষেত্রে মীমাংসা হবে —
যো অগ্নৌ রুদ্রো যো অন্বন্তর্য ওষধীবীরুধ আবিবেশ।
য ইমা বিশ্বা ভুবনানি চালূপে তস্মৈ রুদ্রায় নমো অস্ত্রগ্নয়ে ॥ ১৷।
[অথর্ব্ববেদ/৭ম কাণ্ড/৮ম অনুবাক/৬ষ্ট সুক্ত/১ নং মন্ত্র]
অন্বয়– যঃ রুদ্রঃ (যে রুদ্র) অগ্নৌ (অগ্নিতে) [অস্তি],
যঃ চ (এবং যে) অন্তর্ ঔষধী-বীরুধঃ (ঔষধি ও বৃক্ষবৃন্দের মধ্যে অবস্থিত), যঃ ইমাঃ বিশ্বাঃ ভূবনান্য্ চালূপে (যিনি এই সমস্ত জগৎ পরিব্যাপ্ত করেছেন), তস্মৈ অগ্নয়ে রুদ্রায় নমঃ অস্তু (সেই অগ্নিরূপ রুদ্রকে নমস্কার হোক)।
অর্থ — “যিনি অগ্নির মধ্যে রুদ্ররূপে বিরাজমান, যিনি ঔষধি ও বৃক্ষলতায় অন্তর্নিহিত আছেন, যিনি এই সমস্ত ভুবনকে পরিব্যাপ্ত করে আছেন, সেই অগ্নিরূপ রুদ্রকে আমাদের নমস্কার।”
এখানে ‘অগ্নি’ রুদ্রেরই এক শক্তিরূপ প্রকাশ। রুদ্রের তেজোশক্তি, জীবনদানশক্তি অগ্নিরূপে প্রকাশিত। তাই অগ্নিকে “রুদ্র” বলা হয়েছে তাদাত্ম্যবাচকভাবে, অর্থাৎ “রুদ্ররূপ অগ্নি” বা “অগ্নিরূপ রুদ্র”।
“অগ্নিরপি রুদ্র উচ্যতে” অর্থ- “অগ্নিও রুদ্রের এক রূপ”,
না যে “অগ্নি নামক স্বতন্ত্র দেবতা রুদ্র থেকে পৃথক।”
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ ৩/২ অনুযায়ী- “একো হি রুদ্র ন দ্বিতীয়ায় তস্থুর্য” - একমাত্র রুদ্রই আছেন, দ্বিতীয় কেউ নেই।
অতএব, সেই এক রুদ্রই নানা শক্তিরূপে অগ্নি, বায়ু, সূর্য, জল ইত্যাদি রূপে প্রকাশমান।
“সর্বে বৈ রুদ্রঃ” (তৈত্তিরীয় আরণ্যক ১০/২৪) এই শ্রুতি বাক্যও একই অর্থ প্রতিপাদন করে।
“অগ্নিও রুদ্র বলা হয়” এতে কোনো আশ্চর্যের কিছু নেই, কারণ— রুদ্রই সর্বব্যাপী পরমেশ্বর, তিনি অগ্নিরূপে তেজস্বী শক্তিরূপে প্রকাশিত, তাই বেদে অগ্নি রুদ্রের অংশরূপ, নামরূপ বা তাদাত্ম্যরূপে বর্ণিত।
অতএব, অগ্নি, উদ্ভিদ ও সমগ্র বিশ্বে যিনি অন্তর্নিহিত ও সর্বব্যাপী, তাঁকেই “অগ্নিরূপ রুদ্র” বলা হয়েছে, এবং তাঁকেই নমস্কার জানানো হয়েছে।
👉 এই সম্বন্ধীয় আরও একটি শ্রুতি প্রমাণ ও বিশ্লেষণ দেখে নেওয়া যাক—
ত্বমগ্নে রুদ্রো অসুরো মহো দিবস্তং শর্দ্ধো মারুতম্ পৃক্ষ ঈশিষে। ত্বং বাতৈররূণৈর্যাসি শঙ্গয়স্তম্ পূষা বিধতঃ পানি নু ত্মনা। আ বো রাজানমধ্বরস্য রুদ্রং হোতাং সত্যযজম্ রোদস্যোঃ।।
[তৈত্তিরীয় সংহিতা ১/৩/১৪]
অন্বয়— হে অগ্নে! ত্বম্ রুদ্রঃ, ত্বম্ অসুরঃ, ত্বম্ মহঃ দিবঃ, ত্বম্ মারুতং শর্দঃ পৃক্ষঃ ঈশিষে। ত্বম্ আরূণৈঃ বাতৈঃ শঙ্গয়ঃ (শত্রূন্) যাসি। ত্বম্ পূষা বিধতঃ পাণিনু ত্মনা (সহ) নু। আঃ (বয়ম্) রাজানম্ অধ্বরস্য রুদ্রং, সত্যযজম্ হোতারম্, রোদস্যোঃ (অভি) হোতুম্ আহ্বয়ামঃ॥
অর্থ — হে অগ্নি! তুমি রুদ্র, তুমি অসুর (প্রাণশক্তিধারী), তুমি স্বর্গের মহান জ্যোতি, তুমি মারুৎগণের শক্তিবলসম্পন্ন নেতা, তুমি লালবর্ণ বায়ুর মতো দ্রুতগামী, শত্রুদের ধ্বংস কর, তুমি বিধাতার (সৃষ্টিকর্তার) সঙ্গে পূষণের মতোই সমস্ত কর্ম সম্পাদন কর। হে রুদ্রস্বরূপ অগ্নি! আমরা তোমাকেই যজ্ঞের রাজা, সত্যযাজক, দুই পৃথিবীর (দ্যুলোক ও ভূমি) হোতা রূপে আহ্বান করি।
এই মন্ত্রে অগ্নিকে “রুদ্র” বলে সম্বোধন করেছেন—
“ত্বমগ্নে রুদ্রঃ” তুমি অগ্নি, তুমি রুদ্রই।
এর দ্বারা বোঝানো হচ্ছে, অগ্নি ও রুদ্র ভিন্ন সত্তা নন, বরং একই সর্বব্যাপী পরমেশ্বর শিবের ভিন্ন ভিন্ন কার্যরূপ বা শক্তিরূপ। যজ্ঞে যিনি হোতা (অগ্নিরূপে গ্রহণকারী), সেই রুদ্রই প্রাণশক্তি ও তেজরূপে সর্বত্র কার্যরত।
অর্থাৎ এক ও অদ্বিতীয় পরমেশ্বর রুদ্রই বিভিন্ন স্বরূপে প্রকাশিত হন, যার মধ্যে একটা প্রকাশিত স্বরূপ হলো অগ্নি। কৈবল্য শ্রুতির এই বাক্যও একই অর্থ প্রতিপাদন করে —
স ব্রহ্মা স শিবঃ সেন্দ্রঃ সোঽক্ষরঃ পরমঃ স্বরাট্ ।
স এব বিষ্ণুঃ স প্রাণঃ স কালোঽগ্নিঃ স চন্দ্রমাঃ ॥ ৮ ॥
[কৈবল্য উপনিষদ/৮ নং মন্ত্র]
অন্বয়— সঃ ব্রহ্মা, সঃ শিবঃ, সঃ ইন্দ্রঃ, সঃ অক্ষরঃ, পরমঃ স্বরাট্। সঃ এব বিষ্ণুঃ, সঃ প্রাণঃ, সঃ কালঃ, অগ্নিঃ, সঃ চন্দ্রমাঃ।
অর্থ — তিনিই (পরমেশ্বর শিব) ব্রহ্মা, তিনিই শিব, তিনিই ইন্দ্র, তিনি অবিনশ্বর, পরম, স্বয়ংপ্রভ ও সর্বাধিপতি। তিনিই বিষ্ণু, তিনিই প্রাণ, তিনিই কাল, তিনিই অগ্নি এবং তিনিই চন্দ্র।
আবার একই সমর্থন রয়েছে তৈত্তিরীয় আরণ্যকে —
স ব্রহ্ম স শিবঃ স হরিঃ স ইন্দ্রঃ সোঽক্ষরঃ পরমঃ স্বরাট্ ॥ ৫ ॥
(তৈত্তিরীয় আরণ্যক/ ১০ম প্রপাঠক/ নারায়ণ সূক্ত)
অর্থাৎ এক ও অদ্বিতীয় পরমেশ্বর রুদ্র, যিনি ব্রহ্মা, বিষ্ণু, রুদ্র, ইন্দ্র, অগ্নি, চন্দ্র প্রভৃতি সকল দেবরূপে প্রকাশিত।
অর্থাৎ, দেবতাগণ পৃথক সত্তা নন, এরা সকলেই ঐ এক সর্বব্যাপী ব্রহ্ম রুদ্রেরই নানা শক্তির প্রকাশ। “একো অহং বহু স্যাম্”, “সর্ব্বম্ খল্বিদং ব্রহ্ম”, “সর্বে বৈ রুদ্রঃ” - ইত্যাদি শ্রুতিবাক্যও এই অর্থ প্রতিপাদন করে যে- এক ও অদ্বিতীয় পরমেশ্বর রুদ্রই বহু হন।
👉 একই ভাবে শতপথ ব্রাহ্মণেও রুদ্রকে অগ্নিতত্ত্ব বলেই জানা যায়। যেখানে রুদ্রের অষ্টমূর্তির উল্লেখ রয়েছে। রুদ্রের সেই অষ্টমূর্তির একমূর্তিই হলো অগ্নিতত্ত্ব স্বরূপ —
অগ্নিরিতি সোঽয়ং কুমারো রূপাণ্যনুপ্রাবিশন্ন। ব অগ্নিম্ কুমারমিভ পশ্যন্তি, এতান্যেবাস্য রূপাণি পশ্যন্তি। এতানি হি রূপাণ্যনুপ্রাবিশৎ।
[শতপথ ব্রাহ্মণ ৬/১/৩/১৯]
অন্বয়— সঃ অয়ং কুমারঃ “অগ্নিঃ” ইতি (ইতি-শব্দবাচ্যঃ)। সঃ রূপাণি অনুপ্রাবিশৎ। ততঃ বঃ (জনাঃ) অগ্নিম্ কুমারম্ ইব পশ্যন্তি। এতানি এব আস্য রূপাণি পশ্যন্তি। এতানি হি রূপাণি অনুপ্রাবিশৎ।
অর্থ— এই কুমার (অর্থাৎ রুদ্র)-ই অগ্নি নামে পরিচিত, তিনি বিভিন্ন রূপে প্রবেশ করেছেন (অর্থাৎ নানা শক্তি-রূপে সর্বত্র বিরাজমান হয়েছেন)। তাই মানুষ তাঁকেই অগ্নিরূপে, কুমারের মতো দেখতে পায়, তারা আসলে তাঁরই ঐ রূপসমূহ দেখতে পায়, কারণ তিনিই তো ঐ রূপগুলির মধ্যে প্রবেশ করেছিলেন।
উক্ত শতপথ ব্রাহ্মণের আলোচ্য অংশের সায়ণভাষ্যও দেখে নেওয়া যাক—
যদ্বেদাষ্টাবঅগ্নিরূপাণি অষ্টাক্ষরা গায়ত্রী, তস্মাৎ “গায়ত্রোঽগ্নির্” ইতি। সোঽয়ং কুমারো রূপাণ্য্ অনুপ্রাবিশৎ। ন বা অগ্নিং কুমারমিব পশ্যন্তি, এতান্যবাস্য রূপাণি পশ্যন্তি। এতানি হি রূপাণ্য্ অনুপ্রাবিশৎ।
ভাষ্যার্থ— যেহেতু অগ্নির আটটি রূপ আছে, এবং গায়ত্রী ছন্দও আট অক্ষরবিশিষ্ট, এই কারণেই বলা হয় “গায়ত্রীই অগ্নি”। এই কুমার (রুদ্র) সেই সকল রূপের মধ্যে প্রবেশ করেছিলেন। মানুষেরা অগ্নিকে যেন কুমারের মতো দেখতে পায়, আসলে তারা ঐ রূপগুলিকেই দেখে, কারণ তিনিই (রুদ্র) সেই রূপগুলির মধ্যে প্রবিষ্ট হয়েছিলেন।
অর্থাৎ- অগ্নি ও কুমার (রুদ্র) ভিন্ন নন, উভয়ই একই সর্বব্যাপী দেবতাতত্ত্বের প্রকাশ। “রূপাণ্যনুপ্রাবিশৎ” অর্থ- তিনি নিজেকে নানা রূপে প্রকাশ করেছেন, যার ফলে ভক্তরা কখনও তাঁকে অগ্নি, কখনও কুমার (রুদ্র) রূপে উপলব্ধি করেন।
অতএব, এই অংশে “অগ্নিরপি রুদ্র উচ্যতে” (নিরুক্ত ১০/৭/৭)-এর তত্ত্বই প্রতিপাদিত হয়েছে, রুদ্রতত্ত্বই অগ্নিতত্ত্বে প্রবিষ্ট, রূপবৈচিত্র্য সত্ত্বেও মূল সত্তা এক ও অভিন্ন।
সুতরাং —আর্যসমাজ যে ব্যাখ্যা করেছে যে- রুদ্রের অর্থগত নাম অগ্নি, অর্থাৎ রুদ্র নামটা অগ্নির বিশেষণ মাত্র এই দাবীটা সম্পূর্ণ ভুল ও মনগড়া।
শতপথ ব্রাহ্মণের ৬/১/৩/ অংশের আলোচ্য বিষয় হলো রুদ্রের অষ্টমূর্তি। যেখানে রুদ্রের আটটা স্বরূপ জগতের আটটা তত্ত্বে বিরাজিত। কিন্তু, অনার্যসমাজের দাবী সম্পূর্ণ ভিন্ন ও শাস্ত্র বিরোধী। কেননা, আর্যরা বলছে শতপথ ব্রাহ্মণের উক্ত স্থানে অগ্নির ব্যাপকতা সম্পর্কে বলা হয়েছে কিন্তু, শাস্ত্র অধ্যয়ন ও যুক্তি সম্মত ভাবে যাচাই করলে জানা যায় শতপথ ব্রাহ্মণের উক্ত অংশে যে ঘটনাটার উল্লেখ আছে তা মূলত পরমেশ্বর শিবেরই একটা লীলা প্রকাশ মাত্র।
মহর্ষি বেদব্যাস বলেছেন— “ইতিহাসপুরাণাভ্যাং বেদং সমুপবৃংহয়েৎ” [মহাভারত/আদিপর্ব/১/২২৯]- অর্থাৎ, বেদকে পুরাণ ইতিহাস দ্বারা বর্ণনা করতে হবে।
মীমাংসার স্মৃতিধিকারণেও কুমারিল ভট্টপাধ্যায় ইতিকথা ও পুরাণকে বেদার্থ বোঝার প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
পুরাণে পরমেশ্বর শিবের অষ্টমূর্তি বিশদে ব্যাখ্যা আছে। যেখানে - পরমেশ্বর শিব ব্রহ্মাকে দেওয়া বরদান ফলিত করার জন্য নীললোহিত রুদ্র স্বরূপে ব্রহ্মার ক্রোধ থেকে, ব্রহ্মার পুত্র স্বরূপে নিজেকে প্রকাশিত করেন। এবং নীললোহিত রুদ্র কুমার স্বরূপে ব্রহ্মার সম্মুখে রোদন করতে থাকেন। এবং এই রোদনের জন্য ব্রহ্মা নীললোহিত শিবকে রুদ্র নাম দেন এবং সাথে আরও সাতটি নাম দেন। এই নীললোহিত শিবের এই আট নামই অষ্টমূর্তি হিসেবে শাস্ত্রে উল্লেখিত হয়। এই অষ্টমূর্তি জগতের আট তত্ত্ব স্বরূপে প্রকাশিত হন। এই প্রসঙ্গে পুরাণে বিশদে বলা থাকলেও অতি সংক্ষিপ্ত ভাবে দুটি প্রমাণ দেখে নেবো —
ততোঽভিসৃষ্টাস্তনব এষাং নাম্নাং স্বয়ম্ভুবা।
সূর্য্যো মহী জলং বহ্নির্ব্বায়ুরাকাশমেব চ।।
দীক্ষিত ব্রাহ্মণশ্চন্দ্র ইত্যেতে ব্রহ্মধাতবঃ।
তেষু পূজ্যতে বন্দ্যঃ স্যাদ্রুদ্রাস্তান্ন হিনস্তি বৈ।।
[ব্রহ্মাণ্ডপুরাণ /প্রক্রিয়াপাদ/ ২৮/১৮-১৯]
এরপর স্বয়ম্ভূ রুদ্র তাঁরই নামরূপে নিম্নলিখিত তত্ত্বরূপ সৃষ্টি করলেন সূর্য, পৃথিবী, জল, অগ্নি, বায়ু ও আকাশ এবং দীক্ষিত ব্রাহ্মণ ও চন্দ্র এই আটটি ব্রহ্মধাতু (ব্রহ্মতত্ত্বের আধার)।
এইসব ব্রহ্মধাতুর মধ্যেই রুদ্র পূজিত ও বন্দিত হন,
অতএব, যে ব্যক্তি তাদের সম্মান করে, রুদ্র তাঁকে কখনো বিনাশ করেন না।
এই প্রসঙ্গে কূর্ম্মমহাপুরাণে রয়েছে —
ভবঃ সর্ব্বন্তথেশানঃ পশূনাং পতিরেব চ।
ভীমশ্চোগ্রো মহাদেবস্তানি নামানি সপ্ত বৈ।
সূর্য্যো জলং মহী বহ্নির্বাযুরাকাশমেব চ।
দীক্ষিতো ব্রাহ্মণশ্চন্দ্র ইত্যেতা অষ্টমূর্ত্তয়ঃ।।২৬।।
স্থানেন্বেতেষু যে রুদ্রান্ ধ্যায়ন্তি প্রণমস্তি চ।''
তেষামষ্টতনুদেবো দদাতি পরমং পদম্ ॥২৭।।
[কূর্ম্মমহাপুরাণ / পূর্বভাগ / অধ্যায় ১০/ শ্লোক নং ১৮-২৭]
ব্রহ্মা তখন রুদ্রকে সাতটি অন্যান্য নাম দেন।
ভব, সর্ব, ঈশান, পশুপতি, ভীম, উগ্র, মহাদেব।
এবং রুদ্রের অষ্টমূর্তি (সূর্য, জল, ভূমি, অগ্নি, বায়ু, আকাশ, ব্রাহ্মণ, চন্দ্র) নির্দিষ্ট করেন।
যে ব্যক্তি এই রুদ্রের অষ্টমূর্তি-রূপে ধ্যান করে, রুদ্র তাকে ‘পরমং পদম্’, অর্থাৎ চূড়ান্ত মোক্ষ প্রদান করেন।
অর্থাৎ - রুদ্র সর্বব্যাপী ব্রহ্মতত্ত্ব, যিনি সূর্য, ভূমি, জল, অগ্নি, বায়ু, আকাশ, চন্দ্র ও দীক্ষিত ব্রাহ্মণ, এই সমস্ত মহাত্মতত্ত্বের মধ্যেই প্রকাশিত।
অতএব, এই বিশ্বতত্ত্বগুলির প্রতি শ্রদ্ধা বা পূজা করাই প্রকৃতপক্ষে রুদ্রের পূজা। এবং যে এমন করে, সে রুদ্রের অনুগ্রহ থেকে কখনো বঞ্চিত হয় না। একই বক্তব্য শিবমহাপুরাণ, লিঙ্গমহাপুরাণ আদি শাস্ত্রেও বিশদে বর্ণিত আছে। আবার শিবের এই অষ্টমূর্তির উল্লেখ পাওয়া যায় কল্প বেদাঙ্গেও —
“হরায় মৃডায় শর্বায় শিবায় ভবায় মহাদেবোগ্রায় ভীমায় পশুপতয়ে রুদ্রায় শঙ্করায়েশানায় স্বাহেতি” ।।১৭।।
[আশ্বলায়ণ গৃহ্যসূত্র /৪/৯/১৭]
একই সমর্থন পারস্কর গৃহ্যসূত্রেও —
“রূদ্রায় স্বাহা, শর্বায় স্বাহা, পশুপতয়ে স্বাহা, উগ্রায় স্বাহা, ভীমায় স্বাহা, ভবায় স্বাহা, মহাদেবায় স্বাহা, ঈশানায় স্বাহা” ।।
[পারস্কর গৃহ্যসূত্র /৩/৮/৬]
উক্ত কল্প বেদাঙ্গের আলোচ্য অংশে পরমেশ্বর শিবের উদ্দেশ্যে শূলগব যজ্ঞে আহুতি চলাকালীন, শিবের অষ্টমূর্তির উদ্দেশ্যে আহুতি দেওয়ার উল্লেখ করেছে মহর্ষিগণ। আবার শুক্ল-যজুর্বেদ এর শতরুদ্রীয়তেও পরমেশ্বর শিবকে অষ্টমূর্তির উল্লেখিত নামে স্তুতি করতে দেখা যায়—
“নমো ভবায় চ রুদ্রায় চ। নমঃ শর্বায় চ পশুপতয়ে চ”।।২৮।।
“নমঃ উগ্রায় চ ভীমায় চ” ।।৪০।।
“তাসামীশানো ভগবঃ পরাচীনা মুখা কৃধি” ।।৫৩।।
[শুক্ল-যজুর্বেদ/ শতরুদ্রীয় নামক ১৬ অধ্যায়/২৮, ৪০, ৫৩ নং মন্ত্র]
অনেকটা একই ভাবে পরমেশ্বর শিবের অষ্টমূর্তির উল্লেখিত নামে অর্থবেদেও পরমেশ্বর শিবের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করা হয়েছে —
তস্মৈ প্রাচ্যা দিশো আন্তর্দেশাদ্ ভবমিষ্বাসমনুষ্ঠাতারমকুর্বন্ ॥ ১
ভব এনমিষ্বাসঃ প্রাচ্যা দিশো আন্তর্দেশাদনুষ্ঠাতানু তিষ্ঠতি।
নৈনং শর্বো ন ভবো নেশানঃ ॥ ২
তস্মৈ দক্ষিণায়া দিশো আন্তর্দেশাচ্ছর্বমিষ্বাসমনুষ্ঠাতারমকুর্বন্ ॥ ৪
শর্ব এনমিষ্বাসো দক্ষিণায়া দিশো আন্তর্দেশাদনুষ্ঠাতানু তিষ্ঠতি ।
নৈনং শর্বো ন ভবো নেশানঃ ।
নাস্য পশূন্ ন সমানান্ হিনস্তি য এবং বেদ ॥ ৫
তস্মৈ প্রতীচ্যা দিশো আন্তর্দেশাৎ পশুপতিমিষ্বাসমনুষ্ঠাতারমকুর্বন্ ॥ ৬
তস্মৈ উদীচ্যা দিশো আন্তর্দেশাদুগ্রং দেবমিষ্বাসমনুষ্ঠাতারমকুর্বন্ ॥ ৮
উগ্র এনং দেব ইষ্বাস উদীচ্যা দিশো আন্তর্দেশাদনুষ্ঠাতানু তিষ্ঠতি ।
নৈনং শর্বো ন ভবো নেশানঃ। নাস্য পশূন্ ন সমানান্ হিনস্তি য এবং বেদ ॥ ৯
তস্মৈ ধ্রুবায়া দিশো আন্তর্দেশাদ্ রুদ্রমিষ্বাসমনুষ্ঠাতারমকুর্বন্ ॥ ১০
তস্মা ঊর্ধ্বায়া দিশো আন্তর্দেশান্মহাদেবমিষ্বাসমনুষ্ঠাতারমকুর্বন্ ॥ ১২
মহাদেব এনমিষ্বাস ঊর্ধ্বায়া দিশো আন্তর্দেশাদনুষ্ঠাতানু তিষ্ঠতি।
নৈনং শর্বো ন ভবো নেশানঃ। নাস্য পশূন্ ন সমানান্ হিনস্তি য এবং বেদ ॥ ১৩
তস্মৈ সর্বেভ্যো আন্তর্দেশেভ্যো ঈশানমিষ্বাসমনুষ্ঠাতারমকুর্বন্ ॥ ১৪
ঈশান এনমিষ্বাসঃ সর্বেভ্যো আন্তর্দেশেভ্যো নুষ্ঠাতানু তিষ্ঠতি।
নৈনং শর্বো ন ভবো নেশানঃ ॥ ১৫
[অথর্ববেদ/১৫/৫/১-১৫]
উক্ত অথর্ববেদের স্তুতিতে পরমেশ্বর শিবকে সকল দিক থেকে রক্ষা করার জন্য প্রার্থনা জানানো হয়েছে যেখানে শিবের- ভব, শর্ব, পশুপতি, উগ্র, রুদ্র, মহাদেব, ঈশান উক্ত নাম উচ্চারণ পূর্বক প্রার্থনা জানানো হয়েছে। উক্ত এইসব নাম গুলো শতপথ ব্রাহ্মণে উল্লেখিত শিবের অষ্টমূর্তিরই নাম।
সুতরাং- উক্ত বিশ্লেষণ থেকে বিষয়টা দিনের আলোর ন্যায় পরিষ্কার হয় যে- শতপথ ব্রাহ্মণে অগ্নির ব্যাপকতা নয় বরং পরমেশ্বর শিবের অষ্টমূর্তিরই বর্ণনা করা হয়েছে। এবং রুদ্র কদাপি অগ্নির বিশেষণ নয় বরং রুদ্রই অগ্নি তত্ত্ব স্বরূপে নিজেকে প্রকাশিত করেন।
জৈমিনি পূর্বমীমাংসা বলছে —
“তদর্থশাস্ত্রাৎ” [পূর্বমীমাংসা৷ ১/২/৩১]
অর্থাৎ- যদি কোনো শব্দ বা বাক্য মন্ত্রে অস্পষ্ট হয়, তবে তার অর্থ নির্ধারিত হয় অন্য কোন শাস্ত্র বা প্রসঙ্গের সাহায্যে।
অতএব, মীমাংসা এবং অন্যান্য শাস্ত্র সমর্থন ও শব্দপ্রমাণ অনুযায়ী শতপথ ব্রাহ্মণে “রুদ্র” নাম টা পরমেশ্বর শিবেরই প্রমাণিত হয়। এবং এটাই মেনে নেওয়ায় ন্যায় সঙ্গত।
বিষয়গুলো কত সহজেই ব্যাখ্যা করা যায়। কিন্তু, আর্যসমাজ এই ব্যাখ্যা করতে অসমর্থ। কেননা- ওদের এই জ্ঞান নেই যে তারা তত্ত্বগত ব্যাখ্যা করবে। কারণ যদি এই জ্ঞান থাকতো তবে রুদ্র শব্দের অর্থ কেবল- “বিদ্যুৎ বা বজ্রপাত” বলতো না, তাও আবার নিরুক্তের ভুল বিশ্লেষণ দ্বারা। অনার্যসমাজ এখানেই কুপকাত হয় কেননা, রুদ্র শব্দের যদি সঠিক অর্থ সবার সামনে তুলে ধরে তবে - অনার্যসমাজের তথাকথিত “ত্রৈতবাদ” খণ্ডিত হয়ে যাবে। এবং অনার্যসমাজের সকল ব্যাখ্যায় যে, ভুল, অসত্য ও মনগড়া সেটা প্রমাণিত হয়ে যাবে ও এই তথাকথিত বেদবাদীদের আসল চেহারা উন্মোচিত হয়ে যাবে। সেই ভয়েই দয়াভণ্ডের চ্যালারা বেদের অর্থের সঠিক ব্যাখ্যা কখনোই করে না। তাই তো সর্বদা নিজেদের পিঠ বাঁচাতে অর্থের অনর্থ করে মিথ্যাচার করতে থাকে।
বেদের মধ্যে “রুদ্র” নাম অনেকার্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। অনেক স্থানে রুদ্র নাম দ্বারা পরমেশ্বর শিবকে বোঝায়, কোথাও সদাশিবকে, কোথাও ত্রিদেবের অন্তর্গত কালাগ্নি রুদ্রকে, কোথাও একাদশ রুদ্রকে, কোথাও শতরুদ্রকে ও কোথাও কোটিরুদ্রকেও বোঝানো হয়। যিনি প্রকৃত জ্ঞানী তিনি প্রসঙ্গ ও প্রাসঙ্গিক লক্ষণ দ্বারা যুক্তির মাধ্যমে বুঝে নিতে পারবেন বেদে রুদ্র শব্দ কোথায় কি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আর যারা কেবল বেদের নামে ভাওতাবাজি করে তারা কদাপি বুঝতেও পারবেনা রুদ্র শব্দ দ্বারা কি বোঝানো হচ্ছে। সেই তথাকথিত বেদবাদী অনার্যসমাজীরা এটাও জানে না জগতের সকল নাম এক ও অদ্বিতীয় পরমেশ্বর রুদ্রেরই। আশ্বলায়ন গৃহ্যসূত্র (৪/৯/২৭) বলছে— "সর্বাণি হ বা অস্য নামধেয়ানি" অর্থাৎ- জগতের সকল নামই রুদ্রের। কেননা, রুদ্রই একমাত্র সর্বব্যাপী পরমেশ্বর। তাই, অনার্যরা যদি এই দাবী করে যে- রুদ্র নামটি অগ্নির বিশেষণ মাত্র তবে তারা মনগড়া ও ভুল ব্যাখ্যা করছে।
এই এক ও অদ্বিতীয় পরমেশ্বর শিবই নিষ্কল, নিষ্ক্রিয়, নির্গুণ ব্রহ্ম। আবার সাকারে নীলকন্ঠ ত্রিনেত্রধারী কৈলাসনিবাসী রুদ্র/সদাশিব।
👉 আসলে আর্যসমাজীদের শাস্ত্রের অনর্থ করার মূল কারণ হলো এদের তথাকথিত গুরু দয়ানন্দ সরস্বতী কতৃক প্রচারিত “ত্রৈতবাদ”। আর্যসাজীদের মান্যতা অনুসারে পরমেশ্বর সাকার হতেই পারেন না। পরমেশ্বর কেবল নিরাকার আর বেদ নাকি পরমেশ্বরকে কেবল নিরাকার বলেই ব্যক্ত করেন। এমনটাই আর্যসমাজের মান্যতা।
তাই আর্যসমাজের মান্যতা ও প্রতিষ্ঠা যাতে অস্তিত্বহীন হয়ে না যায় সেজন্যই নিজেদের পিঠ বাঁচাতে বেদকে ঢাল বানিয়ে যা নয় তা অর্থ করে প্রচার করতে থাকে। যদি অর্থের অনর্থ না করে তাহলে জনগণ জেনে যাবে যে- দয়ানন্দ একজন ভণ্ড ছিলো এবং বেদের নামে কেবল ভণ্ডামি করেই বেরিয়েছিলো। এবং তার অনুসারীরাও একেকটা মহাভণ্ড। তাই অনার্যদের এতো কাঠখড় পোড়ানো। এখানেও একই যুক্তি খাটিয়েছে এই অনার্যসমাজ। নিরুক্তের ভুল ব্যাখ্যা, বেদের ভুল বিশ্লেষণ দ্বারা প্রমাণ করতে মরিয়া যে- এখানে রুদ্র কেবল অগ্নি, বজ্র, বিদ্যুৎ আদির বিশেষণ মাত্র। পরমেশ্বর বা সাকার দেবতা নন৷ চলুন তবে এই মহাভণ্ডদের ভণ্ডামির মুখোশ উন্মোচন করা যাক।
👉প্রথমে নিরাকার সাকার নিয়ে অতি সামান্য কিছু তথ্য দেখা যাক—
অপি বোভয়বিধাঃ স্যুঃ"
[যাস্ক নিরুক্ত/৭/২/৩/৭]
অর্থ — দেবতারা মনুষ্যকার এবং মনুষ্যাকার নয় দুই হতে পারে।
👉ব্রহ্মের অবস্থা সম্পর্কে শ্রুতিতে বলা হয়েছে—
“দ্বে বাব ব্রহ্মণো রূপে মূর্ত্তঞ্চৈবামূর্ত্তঞ্চ”
[বৃহদারণ্যক উপনিষদ/২/৩/১]
অর্থ — ব্রহ্মের দুটি রূপ একটি নিরাকার অপরটি সাকার।।
👉এবং শ্রুতিতে আরও বলা হয়েছে যে—
“তদনুপ্রবিশ্য সচ্চ ত্যচ্চাভবৎ”
[তৈত্তিরীয় উপনিষদ/২/৬]
অর্থাৎ — ব্রহ্ম সংসারে অনুপ্রবেশ করিয়া সৎ অর্থাৎ মূর্ত এবং ত্যৎ অর্থাৎ অমূর্ত উভয়ই হলেন।
অর্থাৎ এর থেকে জানা যাচ্ছে ব্রহ্ম সাকার ও নিরাকার দুই অবস্থাতেই বিদ্যমান আছেন।
👉 এই প্রসঙ্গে ঋগবেদ বলছে —
“অকাযো নির্গুণোহধ্যাত্মা তন্মে মনঃ শিবসংকল্পমস্ত ||”
[ঋগবেদ/আশ্বলায়ন শাখা/১০/১৭১]
অর্থাৎ শিবই অকায়ো ব্রহ্ম যিনি সকল গুণের ঊর্ধ্বে। অকায়ো অর্থাৎ যার কোনো কায়া নেই মানে নিরাকার প্রত্যাগাত্মা। এবং আবার শিবই যে সাকার তার প্রমাণও ঋগবেদ নিজেই দেই—
কৈলাসশিখরাভাসা হিমবদগিরিসংস্থিতা |
নীলকণ্ঠং ত্রিনেত্রং চ তন্মে মনঃ শিবসংকল্পমস্ত ||
[ঋগবেদ/আশ্বলায়ন শাখা/১০/১৭১]
অর্থ — যিনি হিমগিরি কৈলাস শিখরে বাস করেন, যিনি (সাকারে) নীলকন্ঠ, যিনি ত্রিনেত্র সেই শিবের প্রতি মন সঙ্কল্পিত হউক।
এর উপর আচার্য সায়ণের ভাষ্যও পাওয়া যায় যেখানে তিনি শিবকে কৈলাস নিবাসী নীলকণ্ঠ ত্রিনেত্রধারী রুদ্র বলেই স্বীকার করে গেছেন। অর্থাৎ শিব নিরাকার হলেও তিনি সাকার স্বরূপেও বিদ্যমান। তাই কেবল একচেটিয়া ভাবে নিরাকার সত্ত্বাকে মেনে সাকার সত্ত্বাকে অবমাননা করা নিতান্তই মূর্খামি ও অশাস্ত্রীয়।
👉বেদ শাস্ত্র অনন্ত জ্ঞানের ভাণ্ডার। বেদ এতটাই অনন্ত যে, যে কেউই অনায়াসেই বলতে পারেনা সে বেদের মধ্যে অবস্থিত প্রত্যেকটি শব্দের গূঢ় অর্থ জানে। বেদ হলো অনন্ত, আর অনন্তকে জানা যায় না কেবল নিজের বিশুদ্ধ বুদ্ধিমত্তা, উপলব্ধি ও সঠিক যুক্তি দ্বারা কিঞ্চিত পরিমাণ বর্ণনা মাত্র করা যায়। সেই বর্ণনার মধ্যেও অনার্যরা ভুল ব্যাখ্যা করে থাকে তাও ইচ্ছাকৃত ভাবে। পরমেশ্বর কি সাকার নাকি নিরাকার তা নিয়ে বেদ স্বয়ম্ কি বলছে তা দেখে নিই —
যা তে রুদ্র শিবা তনুরঘোরাহপাপকাশিনী।
তয়া নস্তন্বা শান্তময়া গিরিসন্তাভি চাকশীহি৷৷২৷৷
যামিষু গিরিশন্ত হস্তে বিভ্যস্তবে।
শিবাং গিরিত্র তাং কুরু হিংসীঃ পুরুষ জগৎ৷৷৩৷৷
শিবেন বচসাত্বা গিরি শাচ্ছাবদামসি।
যথা নঃ সর্ব মিজ্জগদ যক্ষ্মং সুমনা অসত্৷৷৪৷৷
[শুক্ল-যজুর্বেদ/ (শতরুদ্রীয় সূক্ত) অধ্যায় ১৬]
অর্থ — হে রুদ্র! তোমার যে ‘শিব’ (কল্যাণময়) তনু বা শান্ত স্বরূপ আছে যা ঘোর (ভয়ঙ্কর) নয়, যা সকল পাপ ও অশুভতাকে দূর করে, সেই শান্তময় দেহ বা স্বরূপ দ্বারা, হে গিরিশ (পর্বতে অবস্থানকারী), তুমি আমাদের প্রতি প্রকাশিত হও ।।২।।
হে গিরিশন্ত (পর্বতের অধিবাসী রুদ্র)! তোমার হাতে যে ভয়ংকর অস্ত্র (ধনু-বাণ) ধারণ করেছ, সেটিকে কল্যাণকর করো। হে গিরিত্র (পর্বতের অধিপতি), তুমি যেন মানুষ বা জগতের কোনো প্রাণীকে আঘাত না করো ।।৩।।
হে গিরিশ(পর্বতের অধিবাসী শিব)! তোমার সঙ্গে আমরা শুভবাক্যে, শিববচনে কথা বলি যেন আমাদের সমগ্র জগত রোগ ও দুঃখমুক্ত হয়ে সুমনস্ক (শুভমনা) হয় ।।৪।।
উক্ত সকল মন্ত্র দ্বারা তো প্রমাণ হয়ে যায় যে- পরমেশ্বর নিরাকার হলেও জগতের পরিচালনার জন্য সাকার স্বরূপে প্রকাশিত হন। যে সাকার স্বরূপকে উদ্দেশ্য করে ভক্তগণ বন্দনা করছেন৷ উপরোক্ত মন্ত্রের মধ্যে অবস্থিত- “তনূ”, “ গিরি/গিরিশ/গিরিত্র”, “ইষু” ইত্যাদি শব্দের দ্বারা প্রমাণিত হয় যে ঈশ্বরের দিব্য ও লীলাময় শরীর অবশ্যই আছে। কেননা, মন্ত্রের প্রসঙ্গ অনুযায়ী- “তনূ” শব্দের অর্থ শরীর এবং উব্বট-মহীধর, সায়ণ আদি আচার্যরাও একই মান্যতা ও সমর্থন করে নিজেদের ভাষ্য করেছেন। তাই উক্ত মন্ত্রে ব্রহ্মকে নিরাকার বলা যাবেই না। কেননা, ব্রহ্ম কেবল নিরাকার হলে “তনূ” শব্দের অন্য কি অর্থ হবে মন্ত্রের প্রসঙ্গ অনুযায়ী এমন সংশয় থেকে যায়।
আরও বলা আছে যিনি গিরিতে অবস্থান করে বা যিনি পর্বতের অধিপতি। সাধারণত ব্রহ্ম সর্বব্যাপী হলেও তিনি নির্দিষ্ট ভাবে পর্বতে কীভাবে অবস্থান করবেন শরীর ছাড়া বা কীভাবে নিরাকার ব্রহ্মকে পর্বতের অধিপতি বলে সম্বোধন করা যাবে, যেখানে ব্রহ্মকে শ্রুতি নামহীন, কল্পনা করা যায় না, ভাবনা করা যায় না, এমন বলে সেখানে নিরাকার, নির্গুণ ব্রহ্ম কীভাবে বিশেষণ দ্বারা বর্ণনা যোগ্য এমন প্রশ্ন থেকেই যায়। সুতরাং, এখানেও প্রমাণিত হয়ে যায় ব্রহ্ম নিজ ইচ্ছায় দিব্য ও লীলাময় শরীর ধারণ করেন।
এবং উক্ত মন্ত্রে আরও বলা আছে যে- “যামিষু গিরিশন্ত হস্তে বিভ্যস্তবে” অর্থাৎ- গিরির অধিপতি রুদ্র হাতে বাণ ধারণ করে আছেন৷ “ইষু” শব্দের অর্থ “বাণ”। তাহলে ব্রহ্ম যদি কেবল নিরাকার, নির্গুণ হয়ে থাকেন তবে, মন্ত্রের প্রসঙ্গ অনুযায়ী নিরাকার ব্রহ্ম হাতে বাণ ধারণ করে আছেন কীভাবে? এমন প্রশ্ন থেকে যায়।
অতএব, এখানেও প্রমাণিত হয় ব্রহ্ম শরীর ধারণপূর্বক সাকার হন৷
উপরোক্ত মন্ত্রগুলোর থেকে জানা যায়া ব্রহ্ম নিজ ইচ্ছায়, অপ্রাকৃত, দিব্য ও লীলাময় শরীর ধারণ করেন৷ কিন্তু, আর্যসমাজ যদি এমনটা স্বীকার করে নেয় তবে এদের মিথ্যাচারের পর্দা ফাঁস হয়ে যাবে।
তাই দয়ানন্দ সরস্বতী এই মন্ত্র গুলোর মধ্যে অবস্থিত শব্দের অর্থ পরিবর্তন করে মনগড়া অনুবাদ প্রচার করে সবার সামনে উপস্থাপন করে যে, এখানে তো সাকার রুদ্রের কথা বলা হচ্ছে না, এখানে তো বলা হচ্ছে একজন যোদ্ধার কথা, রাজার কথা, সেনাপতির কথা।
আরও মজার বিষয় হলো- মন্ত্রে তনূ শব্দের অর্থ শরীর হলেও আর্যসমাজীদের গুরু দয়ানন্দ সরস্বতীর মান্যতা ও ব্যাখ্যা অনুযায়ী তনূ শব্দের অর্থ হলো নীতি বা সত্য উপদেশ। গিরি শব্দের অর্থ করেছে মেঘ। এবং “ইষু” শব্দের অর্থ বাণ স্বীকার করেও অনুবাদ করার সময় যুদ্ধবিদ্যা বলে চালিয়ে অদ্ভুত অর্থ লিখে বলেন, “ঈশ্বর সাকার নয় এ কেবল প্রাকৃতিক শক্তির কাব্যিক বর্ণনা।”
যদিও আগে আমি পূর্বোক্ত একটি প্রবন্ধে আর্যসমাজ নামক অনার্যদের খণ্ডনে প্রমাণ করেছি যে- শতরুদ্রীয়তে রুদ্রের সাকার স্বরূপের বন্দনা করা হয়েছে এবং নিরাকার, নির্গুণ পরশিব নিজ ইচ্ছায় শরীর ধারণ করেন। তথাপি এই প্রবন্ধে পূনরায় প্রমাণ করবো যে অনার্যদের দাবী মনগড়া ও ভুল।
👉 প্রথমে দেখে নেবো ভাষ্যকাররা উক্ত মন্ত্রের তনূ, গিরি/গিরিশ/গিরিত্র, ইষু শব্দের অর্থে কি ভাষ্য করেছেন—
👉 ১. “তনূ” শব্দের অর্থে আচার্যদের ভাষ্য হলো—
◾উব্বট— যা তে তব হে রুদ্র, শিবা শান্তা তনূঃ শরীরম্।।
◾মহীধর — হে রুদ্র, যা তে তবেদৃশী তনূঃ শরীরে হে গিরিশন্ত, তয়া তন্বা নোঽস্মানভিচাকশীহি অভিপশ্য।
চাকশীতিঃ পশ্যতিকর্মা (নি. ৩।১১।৮)। কীদৃশী তনূঃ? শিবা শান্তা মঙ্গলরূপা।।
◾সায়ণ (তৈত্তি০ স০ ৪/৫/১) — হে রুদ্র তে তব য়া তনূঃ শিবাঽস্মাস্বনুগ্রহকারিণ্যত এবাঘোরা হিংসিকা ন ভবতি।।
উক্ত আচার্যগণের ভাষ্য অনুযায়ী তনূ শব্দের অর্থে “মঙ্গলময় শরীর” অর্থ গ্রহণ করেছেন। মঙ্গলময় বলার কারণ হলো- পরশিব ব্রহ্মের শরীর নিজ ইচ্ছায় প্রকাশিত, সকল প্রকারের দিব্যতায় পরিপূর্ণ ও অপ্রাকৃত। যে শরীরের দর্শন মাত্রেই জীব নীরোগ তথা জীবের সকল দূঃখ দূর হয়। তাই রুদ্রের এই শরীর হলো মঙ্গলময়।
এবার দেখে নেবো তনূ শব্দের অর্থে শাস্ত্র কি বলছে —
“তনূত্যজেব তস্করা বনগূ রশনাভির্দশভিরভ্যধীতাম্।।”
(নিরুক্ত ৩।১৪।১)
‘তনূ’ শব্দটি এখানে “শরীর” (দেহ) অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। এটি পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় “তনূত্যজ” শব্দের ব্যুৎপত্তিগত বিশ্লেষণ থেকে।
ব্যুৎপত্তিগত বিশ্লেষণ —
তনূ= শরীর, দেহ, কায়।
ত্যজ্ = ত্যাগ করা, পরিত্যাগ করা।
তনূত্যজ = “যে নিজের শরীর ত্যাগে প্রস্তুত”, অর্থাৎ মৃত্যুভয়হীন সাহসী ব্যক্তি।
এই শব্দটিকে যাস্ক তাঁর নিরুক্ত-এ ব্যাখ্যা করেছেন এইভাবে —
“তনূত্যক্তঃ তনূত্যজঃ” (নিরুক্ত/৩/১৪/২)
“তনূত্যজ” শব্দের অর্থ হলো শরীর ত্যাগকারী।
সুতরাং, এখানে “তনূ” অর্থ কী?
“তনূ” = শরীর এই অর্থই নিঃসন্দেহে প্রতিপাদিত হয়েছে।
এবং এটি যাস্কের নিজ ভাষ্য থেকেই স্পষ্টভাবে প্রমাণিত—
“তনূত্যজ” মানে— যে দেহ ত্যাগ করে বা দেহত্যাগে প্রস্তুত।
“তনূত্যক্তা” মানে— যে দেহ ছেড়ে দিয়েছে।
“তনূ” মানে নীতি, উপদেশ বা সত্যোপদেশ এই ধরনের কোনো অর্থ নিরুক্তে একবারও দেওয়া হয়নি।
এটি অনার্য ব্যাখ্যাকারদের মনগড়া এবং ভাষ্যবিরুদ্ধ ব্যাখ্যা।
নিরুক্ত ৩।১৪।১-২ অনুযায়ী “তনূ” শব্দের অর্থ হলো “শরীর”।
আর “তনূত্যজ” মানে “যে দেহ ত্যাগে প্রস্তুত”, অর্থাৎ সাহসী ও মৃত্যুভয়হীন ব্যক্তি।
সুতরাং, যারা বলেন “তনূ” মানে নীতি বা সত্যোপদেশ,
তারা ব্যাকরণ, নিরুক্ত ও প্রাচীন ভাষ্যসমূহের সম্পূর্ণ পরিপন্থী ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন, যা অযুক্তিক ও গ্রন্থবিরোধী।
আরও দেখে নেওয়া যাক—
"স ন স্তিপা উত ভবা তনূপাঃ"
(ঋগ্বেদ ১০।৬৯।৪)
যাস্ক এই মন্ত্রকে ভাষ্য করে বলেন —
স্তিপা = কূপ, যেমন কূপ বা জলের আধার।
তনূপা = যে তনূ (শরীর) রক্ষা করে, শরীররক্ষাকারী।
অর্থাৎ, “যেমন কূপ জল দিয়ে প্রাণীদের রক্ষা করে, হে অগ্নি, তুমিও আমাদের তনূ, অর্থাৎ দেহ রক্ষা করো।”
বিশ্লেষণ—
তনু-পা = "তনু" + "পা"।
তনু = দেহ, শরীর।
পা = রক্ষা করা (√পা ধাতু, পালন, রক্ষা)।
তনূপা = শরীর রক্ষা করো, দেহের রক্ষাকর্তা।
“তনূ” শব্দের অর্থ এখানে একদম স্পষ্টভাবে “শরীর”।
যেহেতু প্রার্থনা করা হয়েছে “তুমি আমাদের তনুপা হও” অর্থাৎ “তুমি আমাদের শরীর রক্ষা করো”, তাই “তনূ” মানে নীতি, উপদেশ, বা জ্ঞান নয়, বরং জড় শরীর বা কায়।
তনূ প্রসঙ্গে যাস্ক নিরুক্তের আরও বলা আছে —
“তনূশুভ্রং” [ঋগবেদ/৫/৩৪/৩]
অর্থাৎ, শরীরশোভাকারী। [যাস্কনিরুক্ত/৬/১৯/১] অনুযায়ী, তনূঃ অর্থে শরীরই বলেছে।
“তনূশুভ্রং - তনূশোভয়িতারং” [যাস্কনিরুক্ত/৬/১৯/৬]
যার অর্থ হয়- শরীরের শোভা সম্পাদন করা ইত্যাদি। অর্থাৎ, এখানেও তনূঃ অর্থে শরীরই নির্দেশ করেছে।
তাই "তনুঃ = নীতি" বলা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও ভাষ্যবিরুদ্ধ।
তনূ” শব্দের অর্থ শরীর উণাদিসূত্র অনুসারে—
উণাদিসূত্র (১।৮০) —
"কৃষিচমিতনিধনিসর্জিখর্জিভ্য ঊঃ স্ত্রিয়াম্"
এই সূত্র অনুযায়ী —
“তন্” (তনু ধাতু, অর্থাৎ বিস্তার করা) এই ধাতুর সঙ্গে
“ঊঃ” প্রত্যয় যোগে। স্ত্রীলিঙ্গ প্রাতিপদিক হয় তনূঃ।
স্বা০ দ০ বৃ০—
“তনোতি কার্যাণি যয়া [সা] তনূঃ”
(অর্থাৎ, যে দ্বারা কাজ সম্পাদিত হয় সে হলো ‘তনূ’, অর্থাৎ শরীর)
তন্ + ঊঃ— তনূ (স্ত্রীলিঙ্গ)
অর্থ— শরীর (যা দ্বারা কাজ হয়)
অতএব, “তনূ” মানে নীতি, সত্যোপদেশ, ইত্যাদি নয়, বরং উণাদিসূত্র অনুসারে নির্দিষ্টভাবে “শরীর” এটাই শুদ্ধ ব্যাকরণতত্ত্ব।
উণাদিসূত্র আরও বলছে —
উণাদিসূত্র (১।৭) —
“ভৃমৃষীদ্ধৃচরিত্সরিত্নিধনিমিমস্জিভ্য ঊঃ”
(ভৃ, মৃ, শী, ধৃ, চর্, ত্সর্, তন্, ধন্, মি, মস্জ্ এই ধাতুগুলির থেকে ‘উ’ প্রত্যয় হয়)
তনুঃ —
"তন্যন্তে কর্মাণ্যনেন ইতি তনুঃ"
(অর্থাৎ, যার দ্বারা কর্মসমূহ বিস্তৃত হয়, তাকে বলে ‘তনুঃ’)
অর্থ— শরীর (দেহ)।
বিকল্প অর্থ— স্বল্প, কোমল, ত্বক (কিন্তু মূল অর্থ শরীর)।
ধাতু + প্রত্যয় রূপ—
ধাতু— তন্ (বিস্তার করা)।
প্রত্যয়— উঃ।
গঠন— তন্ + উঃ = তনুঃ।
স্ত্রীলিঙ্গ, প্রাতিপদিক।
অর্থ— যা দ্বারা কার্য (কাজ) সম্পন্ন হয় = শরীর।
“তনুঃ” শব্দটি উণাদিসূত্র ১।৭ অনুসারে তন্ ধাতু থেকে উঃ প্রত্যয়ে গঠিত এবং এর অর্থ শরীর, বা কর্মবাহক দেহ।
অতএব, ‘তনূ’ মানে নীতি বা উপদেশ ইত্যাদি বলাটা উণাদিসূত্র ও ভাষ্যবিরোধী। যথার্থ ব্যুৎপত্তি অনুযায়ী এটি শরীর অর্থেই প্রমাণিত।
👉 ২. গিরি/গিরিশ/গিরিত্র শব্দের অর্থে আচার্যদের ভাষ্য নিম্নরূপ—
◾উব্বট— গিরিশন্ত গিরৌ পর্বতে কৈলাসাখ্যে অবস্থিতঃ শং সুখং তনোতীতি গিরিশন্তঃ। যদ্বা গিরি বাচ্যবস্থিতঃ সুখং তনোতীতি। যদ্বা গিরৌ মেঘেঽবস্থিতো বৃষ্টিদ্বারেণ সুখং তনোতীতি। তস্য সম্বোধনং হে গিরিশন্ত।।২।।
শিবাং গিরিত্র গিরৌ কৈলাসে অবস্থিতঃ, ত্রায়তে ভক্তানীতি গিরিত্রঃ, তস্য সম্ভোধনং ‘হে গিরিত্র’।।৩।।
গিরিশ গিরৌ পর্বতে কৈলাসাখ্যে শেতে ইতি গিরিশঃ তস্য সংবোধনম্ হে গিরিশ।।৪।।
◾মহীধর— গিরৌ কৈলাসে স্থিতঃ শং সুখং প্রাণিনাং তনোতি বিস্তারয়তীতি গিরিশন্তঃ। গিরি বাচি স্থিতঃ শং তনোতীতি বা, গিরৌ মেঘে স্থিতো দৃৃষ্টিদ্বারেণ শং তনোতীতি বা, গিরৌ শেতে গিরিশঃ। গিরিশশ্চাসাবন্তশ্চ গিরিশন্তঃ সৎসংবুদ্ধিঃ। শকন্ধ্বাদিত্বাৎপররূপম্ (পা. ৬।১।৯৪)। শান্তময়া সুখতময়া।।২।।
গিরিত্র গিরৌ কৈলাসে স্থিতো ভুতানি ত্রায়তে ইতি গিরিত্রঃ।।৩।।
গিরৌ কৈলাসে শেতে গিরিশঃ হে গিরিশ।।৪।।
◾সায়ণ (তৈত্তিরীয় সংহিতা/৪/৫/১) —
গিরৌ কৈলাসে স্থিত্বা নিত্যং প্রাণিভ্যো যঃ শং সুখং তনোতি স গিরিশংস্তস্য সম্বোধন হে গিরিশন্ত।।২।।
কৈলাসাখ্যাং গিরিং ত্রায়তে পালয়তীতি গিরিত্রসস্তৎসম্বোধনম্ হে গিরিত্র।।৩।।
গিরৌ কৈলাসে শেতে তিষ্টতীতি গিরিশঃ।।৪।।
গিরিশ, গিরিশন্ত ও গিরিত্র” এই তিন নামেই রুদ্রকে কৈলাসবাসী, কল্যাণদানকারী, বৃষ্টিরূপে জীবনদায়ক, এবং ভক্তদের রক্ষাকারী মহাদেব হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তিন ভাষ্যকারই গিরি শব্দের অর্থে কৈলাস অর্থ করে গেছেন। সুতরাং, এখানেই প্রমাণিত হয় উক্ত মন্ত্রে কৈলাস নিবাসী ত্রিনেত্রধারী নীলকন্ঠ শিবেরই বর্ণনা করা হয়েছে। রুদ্র শব্দের অর্থ ব্যাখ্যা করার সময় পূর্বেই রুদ্রকে কেন মেঘ শব্দে সংজ্ঞায়িত করেছে তার উপযুক্ত বিশ্লেষণ করেছি। সুতরাং, এখানে পুনরায় তার দরকার নেই।
শাস্ত্রীয় ব্যাকরণ থেকেও এটি স্পষ্ট —
“শকন্ধ্বাদিত্বাৎপররূপম্ (পাণিনি ৬/১/৯৪)” সূত্রানুসারে, ‘গিরিশন্ত’ শব্দটি একটি সম্বোধনবাচক বহুব্রীহি সমাস যা বিশেষ কোনো ঈশ্বরতুল্য রূপেই বোঝানো হয়।
সুতরাং, গিরিশন্ত মানে “ঈশ্বর শিব” ছাড়া অন্য কিছু গ্রহণ করা ভাষ্য ও ব্যাকরণ উভয়ের বিরোধিতা।
ঋগবেদের এই বচনও৷ এর সমর্থন করে যে- গিরিতে অর্থাৎ কৈলাসে পরশিব ব্রহ্মই সাকার দেহ ধারণ করে অবস্থান করেন—
“কৈলাসশিখরাভাসা হিমবদিগিরিসংস্থিতা ।
নীলকণ্ঠং ত্রিনেত্রং চ তন্মে মনঃ শিবসংকল্পমস্ত” ॥
[ঋগবেদ/ আশ্বলায়ণ শাখা/১০/১৭১]
উক্ত শ্রুতি প্রমাণ দ্বারা সিদ্ধ হয়ে যায় যে- গিরি অর্থ কৈলাসই বটে যেখানে পরমেশ্বর শিব ত্রিনেত্রধারী নীলকন্ঠ স্বরূপে বিরাজিত।
পাণিনী অষ্টাধ্যায়ী এর কিছু সূত্রের ভাষ্যে ভাষ্যকাররা গিরি ও পর্বত শব্দকে পাহাড় বাচক করেছেন। পাণিনী সূত্র- “আয়ুধজীবিভ্যশ্ছ” (৪/৩/৯১) - এই সূত্রে কাশিকা ভাষ্যে বলেছেন— “অন্ধকবর্তীয়াঃ, রোহিতগিরীয়াঃ” অর্থাৎ- অন্ধকবর্ত বা রোহিতগিরি নামক পাহাড় থেকে উৎপত্তি বা সম্পর্ক নির্দেশ করে। এখানে “গিরি” বা “পর্বত” শব্দটি সরাসরি পাহাড় বা পর্বতাঞ্চল অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। -“সংজ্ঞায়াং গিরিনিকায়োঃ” (পা০ ৬/২/৯২) এই সূত্রেও কাশিকা আদি ভাষ্যকাররা গিরি বলতে স্পষ্ট ভাবে পাহাড়/পর্বত বলেছেন। যদিও এই সূত্র গুলো উক্ত মন্ত্রের জন্য প্রাসঙ্গিক নয় কিন্তু, উক্ত সূত্র ও ভাষ্য দ্বারা এটা প্রমাণ হয় গিরি ও পর্বত অর্থ পাহাড়।
👉 ৩. ইষু শব্দের অর্থে আচার্যরা বলেছেন—
◾উব্বট— যামিষুম্। যাম্ ইষুং কান্ডং।।৩।।
◾মহীধর— উতো অপিচ তে তবেষবে বাণায় নমঃ।।১।।
হে গিরিশন্ত! স্বং যাং ইষু বাণং হস্তে বিবর্ষি ধারয়সি।কিং কর্তুম্? অস্তবে ‘অসু ক্ষেপণে’ তুমর্থে তব্যপ্রত্যয়ঃ। অসিতুং শত্রূন্ ক্ষেপ্তুমিত্যর্থঃ।।৩।।
◾সায়ণ (তৈত্তি০ স০ ৪/৫/১)— উতাপি চ তে তবেষবে নমঃ। ত্বদীয়ায় বাণায় নমোঽস্তু।।১।।
হে গিরিশন্ত যামিষুং বাণমস্তবে বৈরিষু প্রক্ষেপ্তুং হস্তে বিভর্ষি।।৪।।
ইষু” শব্দটি রুদ্রের হাতে ধারণকৃত ঐশ্বরিক বাণ, যা দ্বারা তিনি অসুর ও দুষ্কৃতদের বিনাশ করেন এবং জগৎকে রক্ষা করেন।
“ইষু” = বাণ / অস্ত্র / রুদ্রের বিনাশকারী শক্তি,
যা তাঁর করুণারূপেও প্রকাশিত অধর্মবিনাশী ও ধর্মরক্ষাকারী। মন্ত্রের ও ভাষ্যে যিনি বাণ ধারণ করে আছেন তাকে স্পষ্ট ভাবে “হে গিরিশ” বলে সম্বোধন করা হচ্ছে। আর গিরিশ বলতে কৈলাসনিবাসী রুদ্রই। সুতরাং এখানে বিষয় পরিষ্কার যে রুদ্র সাকারও বটে।
এবার দেখে নেওয়া যাক ইষু অর্থে শাস্ত্র কি বলে—
নিরুক্তের প্রথম উদ্ধৃতি—
ধনুর্ধন্বতের্গতিকর্ম্মণঃ, বধকর্ম্মণো বা, ধন্বন্ত্যস্মাদিষবঃ।।
(নিরুক্ত ৯।১৬।৬)
👉 ব্যাখ্যা—
নিরুক্তকার যাস্ক এই শ্লোকে "ধনুস্" বা "ধনু" শব্দের অর্থ ও উৎস ব্যাখ্যা করছেন দুটি ভিন্ন দিক থেকে।
১. প্রথমত, “ধনুঃ ধন্বতেঃ গতিকৰ্ম্মণঃ” ধনু মানে গতি ঘটায় এমন বস্তু।
"ধনু" শব্দটি এসেছে "ধন্ব" ধাতু থেকে, যার একটি অর্থ হলো চলা বা গমন করা। এই দিক দিয়ে, ধনু এমন বস্তু যা থেকে বাণ ছোঁড়া হয়। বাণ ধনু থেকে গমন করে, তাই ধনু হলো গতি ঘটানোর উপকরণ।। (উণাদি ২৭৪ দ্রষ্টব্য)।।
২. দ্বিতীয়ত “বধকৰ্ম্মণো বা” ধনু মানে বধ করে এমন অস্ত্র।
আবার, "ধন্ব" ধাতুর আরেকটি অর্থ হলো হত্যা বা সংহার করা। সেই দিক দিয়ে, ধনু এমন বস্তু যা শত্রু নিধন বা সংহার সাধন করে। ধনু অস্ত্র হিসেবেই ব্যবহৃত হয় বাণ চালানোর জন্য।
👉ধনু শব্দের মূলে আছে দুইটি সম্ভাবনা।
(১) বাণকে চালনা করার জন্য গতি প্রদান করে।
(২) সেই বাণের মাধ্যমে বধ সাধন করে।
অর্থাৎ, ধনু কোনো জ্ঞানের প্রতীক নয়, এটি একটি বাস্তব অস্ত্র বাণ চালনার যন্ত্র।
অর্থাৎ এখানে স্পষ্ট হয়ে গেলো যে ইষু অর্থ বাণ। কারণ ধনুকের সাথে সম্পর্কযুক্ত থাকার কারণে এবং যা দ্বারা বধ করা হয় এমন অর্থ বোঝানোর জনক্স ইষু অর্থ বাণ এই অর্থ সরাসরি স্পষ্ট হয়ে যায়।
নিরুক্তের দ্বিতীয় উদ্ধৃতি—
ইষুরীষতের্গতিকর্ম্মণো বধকর্ম্মণো বা।
(নিরুক্ত ৯।১৮।৬)
👉 ব্যাখ্যা—
এই শ্লোকে যাস্কাচার্য "ইষু" শব্দের উৎস ব্যাখ্যা করছেন, যেটি মূলত "বাণ" বা "অস্ত্র" বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
১. প্রথমত, “ইয়ুঃ ঈষতেঃ গতিকৰ্ম্মণঃ” ইষু অর্থ গতি সম্পন্ন বস্তু।
ইষু শব্দ এসেছে "ঈষ্" ধাতু থেকে, যার অর্থ ছোড়া বা চালনা করা। এই দিক দিয়ে, ইষু সেই বস্তু যা গতি লাভ করে বা চালিত হয় (যেমন: ধনু থেকে ছোঁড়া বাণ)।
২. দ্বিতীয়ত, “বধকৰ্ম্মণঃ বা” ইষু অর্থ প্রাণ সংহার করে এমন অস্ত্র।
"ঈষ্" ধাতুর আরেকটি অর্থ হত্যা বা প্রহার করা। এই দিক দিয়ে, ইষু এমন বস্তু যা প্রাণ হরণ করে, অর্থাৎ প্রাণনাশক অস্ত্র।। (উণাদি ১৩ সূত্র দ্রষ্টব্য)।।
ইষু একটি অস্ত্র, যা ধনু থেকে ছোঁড়া হয় এবং বধ করে। আর ধনু নিশ্চিত ভাবেই বাণই ছোঁড়া হয়। একে কোনো জ্ঞান বা নীতিবচনের প্রতীক হিসাবে দেখানো ভিত্তিহীন।
নিরুক্তের তৃতীয় উদ্ধৃতি—
বুন্দ ইষুর্ভবতি ।
(নিরুক্ত ৬।৩২।১৩)
👉 ব্যাখ্যা—
এখানে যাস্কাচার্য বলেন, “বুন্দ” শব্দের অর্থ হলো- ইষু, অর্থাৎ বাণ বা তীর।
“বুন্দ” শব্দটি এই শ্লোকের মাধ্যমে “ইষু” বা অস্ত্রের প্রতিশব্দ হিসাবে প্রতিপন্ন। এটি বোঝায় যে “ইষু” শব্দ কেবল গতি বা আঘাতকারী অস্ত্রকেই বোঝায় অন্য কিছু নয়।
“ধনু” ও “ইষু” উভয় শব্দই অস্ত্রবাচক।
তাদের মূল ধাতুগত অর্থ গতি ও সংহার।
নিরুক্তে কোথাও “ইষু” বা “ধনু” শব্দকে জ্ঞান, নীতি, শিক্ষা বা উপদেশের প্রতীক বলা হয়নি।
অতএব, “ইষু = শিক্ষা বা নীতিবোধ” এই দাবি নিরুক্তের প্রমাণে সম্পূর্ণ অসঙ্গত ও ভিত্তিহীন।
উপরিউক্ত বিশ্লেষণ থেকে প্রমাণিত হয় যে পরশিব ব্রহ্ম শ্রুতিতে নিরাকার, নির্গুণ হলেও জগতের নিমিত্তে সাকার স্বরূপে বিররাজিত বা প্রকাশিত হন। তাই পরশিব ব্রহ্মকে কেবল নিরাকার দাবী করাটা একপাক্ষিক সিদ্ধান্ত মাত্র।
মন্ত্র/শ্লোকের অর্থ নির্ধারণ করতে হয় সম্পূর্ণ প্রসঙ্গ ও বাক্য দ্বারা। কেবল শব্দ দ্বারা মন্ত্র/শ্লোকের অর্থ নির্ধারণ করা যায় না। যদি কেউ কেবল শব্দের দ্বারা অর্থ নির্ধারণ করে এটা বলে যে- সম্পূর্ণ মন্ত্র/শ্লোকে অন্য অর্থ বিরাজমান সেক্ষেত্রে সেটা হবে একচেটিয়া দৃষ্টিকোণ। তাই সম্পূর্ণ প্রসঙ্গ ও বাক্য দ্বারাই মন্ত্র/শ্লোকের অর্থ নির্ধারণ করাই ন্যায় সঙ্গত। এই প্রসঙ্গে জৈমিনি পূর্বমীমাংসা বলছে—
“বাক্য নিয়মাৎ”
[পূর্বমীমাংসা ১/২/৩২]
অর্থ— বাক্যের নিয়ম থেকে (অর্থ নির্ধারিত হয়)।’
যখন একক শব্দগুলির অর্থ একাধিকভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়, তখন তাদের মধ্যে কোন অর্থটি গ্রহণযোগ্য হবে তা পুরো বাক্যের প্রয়োগ (context) বা বাক্যের অভিপ্রায় (tātparya) দেখে নির্ধারণ করতে হয়।
অর্থাৎ, শব্দ নয়, বাক্যই চূড়ান্ত অর্থনির্ধারক।
এটাই বাক্যনিয়ম।
👉 যেমন, যজুর্বেদ ১৬/২ —
“যা তে রুদ্র শিবা তনুরঘোরাহপাপকাশিনী।
তয়া নস্তন্বা শান্তময়া গিরিসন্তাভি চাকশীহি ৷৷ ২ ৷৷”
এখানে “রুদ্র” শব্দটি একবচন, সম্বোধন-রূপে ব্যবহৃত—
এক ব্যক্তিসত্তা উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করা হচ্ছে। তনু অর্থাৎ “শরীর” বা “রূপ”, “শান্তময়া তনু”,“তোমার শান্তময় শরীরে আমায় দর্শন দাও।”
এটি নীতি বা মেঘ হতে পারে না। নীতি বা মেঘের “তনু” নেই, “চাক্ষুহি” (আমাকে দর্শন দাও) বলা যায় না।
তাহলে বাক্যের প্রয়োগ অনুযায়ী (বাক্য নিয়মাৎ) “রুদ্র”কে সত্তাবিশিষ্ট দেবতা হিসেবেই নিতে হবে।
👉 যজুর্বেদ ১৬/৩ —
যামিষু গিরিশন্ত হস্তে বিভ্যস্তবে।
শিবাং গিরিত্র তাং কুরু হিংসীঃ পুরুষ জগৎ ৷৷ ৩
এখানে “তোমার হাতে ধরা অস্ত্র” (যামিষু, বিভ্যস্তবে, হস্তে) বলা হয়েছে। নীতি বা মেঘের তো হাত নেই, অস্ত্রও নেই। তাহলে রুদ্র সাকার ঈশ্বর ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে না। বাক্যের প্রয়োগই (বাক্যনিয়ম) এই অর্থ নির্ধারণ করছে।
👉 যজুর্বেদ ১৬/৪ —
শিবেন বচসাত্বা গিরি শাচ্ছাবদামসি।
যথা নঃ সর্ব মিজ্জগদ যক্ষ্মং সুমনা অসত্ ৷৷ ৪ ৷৷
এখানে স্পষ্টভাবে রুদ্রের উদ্দেশ্যে বলা হচ্ছে —
“হে গিরিশ, আমরা তোমার সঙ্গে শান্ত, মঙ্গলময় বাক্যে কথা বলি, যেন সমস্ত জগত সুস্থ থাকে।”
“বচসা কথা বলা”, “সুমনা অসৎ” এ সবই ব্যক্তির প্রতি প্রার্থনা। কোনো বিমূর্ত নীতি বা মেঘের সঙ্গে কেউ কথা বলে না। তাহলে বাক্যের প্রকৃত তাৎপর্য- একজন সজ্ঞান, সাকার, করুণাময় ঈশ্বর রুদ্রের প্রার্থনা।
👉 সূত্রপ্রয়োগ —
১. শব্দ “রুদ্র”-এর বহু অর্থ হতে পারে- “রাজা”, “বায়ু”, “বজ্র”, “দেবতা”।
২. কিন্তু এখানে পুরো বাক্যগুলির প্রয়োগ দেখে দেখা যায়- রুদ্রের “তনু” আছে, “হস্তে অস্ত্র” আছে, “বচসা কথা বলা” হচ্ছে, “কৃপা চাওয়া” হচ্ছে, “গিরিশ” বলে সম্বোধন করা হচ্ছে।
৩. এইসব প্রয়োগ শরীরধারী চৈতন দেবতার সঙ্গেই মানানসই।
৪. তাই বাক্য নিয়মাৎ, অর্থাৎ বাক্যের নিয়ম অনুযায়ী,
“রুদ্র” শব্দের অর্থ হবে- ঈশ্বররূপ সাকার রুদ্র।
👉 বাক্যনিয়ম দ্বারা শব্দার্থ নির্ধারণ করলে দেখা যায়,
আর্যসমাজের ব্যাখ্যা বাক্যতাৎপর্যের বিরোধী। কারণ তাদের অর্থ করলে বাক্যগুলির অর্থ হাস্যকর বা অসঙ্গত হয়ে যায়।
যেমন— “মেঘের হাতে অস্ত্র আছে, সে যেন মানুষকে আঘাত না করে” এভাবে অনুবাদ করা বাক্যসংগত নয়।
তাই মীমাংসা যুক্তি বলে—
"শাস্ত্রদৃষ্টবিরোধাচ্চ"(পূর্বমীমাংসা ১/২/২)
অর্থ— শাস্ত্রের (অন্য অংশের) ও প্রত্যক্ষদৃষ্ট (অভিজ্ঞতালব্ধ) সত্যের বিরোধ হওয়ার কারণে (অর্থটি গ্রহণযোগ্য নয়)।
অর্থাৎ — যদি কোনো ব্যাখ্যা বা শব্দার্থ এমনভাবে করা হয় যাতে তা (১) অন্য শাস্ত্রবাক্যের, কিংবা (২) প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধ বাস্তবতার বিরোধী হয়, তাহলে সে ব্যাখ্যা অবৈধ বলে গণ্য হবে। এটি মীমাংসার একটি মৌলিক অর্থনির্ধারণ নিয়ম।
👉 বর্তমান প্রেক্ষাপটে যজুর্বেদ ১৬.২–৪ ইত্যাদি রুদ্রস্তোত্রের প্রসঙ্গে আর্যসমাজীয় ব্যাখ্যা—
তাদের মতে —
“রুদ্র” = রাজা / বজ্রপাত / মেঘ।
“তনু” = নীতি বা সত্যপোদেশ।
“গিরি” = মেঘ বা উচ্চ স্থান।
অর্থাৎ, তাঁরা মনে করেন এখানে কোনো সাকার দেবতা বা ঈশ্বর বোঝানো হয়নি।
👉 এখন দেখা যাক সূত্রানুসারে এর অসঙ্গতি —
(১) শাস্ত্রদৃষ্টবিরোধ—
বেদের অন্য অংশগুলিতে “রুদ্র” সম্বন্ধে বলা হয়েছে—
“নমোহস্তু নীলগ্রীবায় সহস্রাক্ষায় মীঢুষে”- “নমো হিরণ্যবাহবে সেনান্যে” - “নমো বিরূপেভ্যো বিশ্বরূপেভ্যশ্চ বো নমঃ” - “নমো নীলগ্রীবায় চ শিতিকণ্ঠায় চ” - “কপর্দিনে চ ব্যুপ্তকেশায় চ” - “পরমে বৃক্ষ আয়ুধাং নিধায় কৃত্তিং বসান আ চর পিনাকং বিভ্রদা গদি”।। (যজুর্বেদ/ শতরুদ্রীয়/ অধ্যায় ১৬)।
“ত্র্যম্বকং যজামহে” (যজুবেদ ৩/৬০)।
“এতত্তে রুদ্রাবসং তেন পরো মুজতোঽতীতি।
অবততধন্বা পিনাকাবসঃ কৃত্তিবাসা” (যজুবেদ ৩/৬১)।
“ঋতং সত্যং পরং ব্রহ্ম পুরুষং কৃষ্ণপিঙ্গলম্।
ঊর্ধ্বরেতং বিরূপাক্ষং বিশ্বরূপায় বৈ নমো নমঃ” (তৈত্তিরীয় আরণ্যক/ ১০ প্রপাঠক)।
“ওঁ নমো হিরণ্যবাহবে হিরণ্যরূপায় হিরণ্যপতয়ে অম্বিকাপতপয়ে উমাপতয়ে পশুপতয়ে নমো নমঃ” (তৈত্তিরীয় আরণ্যক /১০ প্রপাঠক)
“ইমা রুদ্রায় তবসে কপর্দিনে ক্ষয়দ্বীরায় প্র ভরামহে মতীঃ” (ঋগবেদ ১/১১৪/১)।
“দিভো বরাহম্ অরুষং কপর্দিনং ত্বেষং রূপং নমসা নি হ্বয়ামহে” (ঋগবেদ ১/১১৪/৫)।
“স্থিরেভিরঙ্গৈঃ পুরুরূপ উগ্রো বভ্রুঃ শুক্রৈভিঃ পিপিশে হিরণ্যৈঃ” (ঋগবেদ ২/৩৩/৯)।
কৈলাসশিখরে রম্যে শংকরস্য শুভে গৃহে ।
দেবতাস্তত্র মোদন্তি তন্মে মনঃ শিবসংকল্পমস্ত ॥
কৈলাসশিখরাভাসা হিমবদিগিরিসংস্থিতা ।
নীলকণ্ঠং ত্রিনেত্রং চ তন্মে মনঃ শিবসংকল্পমস্ত ॥
(ঋগবেদ/ আশ্বলায়ণ শাখা ১০/১৭১)
এখানে রুদ্রকে স্পষ্টভাবে দেবতা, ঈশ্বর, মহাদেব হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে তাঁর রূপ, হস্তে অস্ত্র, গুণাবলী, কৃপা, এমনকি ভক্তির যোগ্যতা উল্লেখ রয়েছে।
এখন যদি কেউ “রুদ্র” মানে “মেঘ” বলে,
তাহলে তা ঐ সমস্ত বেদবাক্যের সরাসরি বিরোধী (শাস্ত্রদৃষ্টবিরোধ) হয়ে যায়।
অতএব মীমাংসা সূত্র বলে —
“শাস্ত্রদৃষ্টবিরোধাচ্চ”
অর্থাৎ- যে অর্থ শাস্ত্রের অন্য বাক্যের বিরোধ করে, তা গ্রহণযোগ্য নয়।
(২) দৃষ্টবিরোধ—
“প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা” (দৃষ্ট) অনুযায়ীও “মেঘ”, “নীতি” বা “বজ্র”-এর কোনো হস্ত, তনু, চক্ষু, শান্তময় রূপ, বচন, বা কৃপা প্রদানের ক্ষমতা নেই।
কিন্তু বেদীয় মন্ত্রে বলা হচ্ছে—
“তয়া নস্তন্বা শান্তময়া গিরিশন্তাভি চাকশীহি”
“শান্তময় শরীরে তুমি আমাদের দর্শন দাও।”
এটি সচেতন দেবতা ছাড়া অন্য কারও ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তাই আর্যসমাজের “মেঘ”-অর্থ প্রত্যক্ষ বাস্তবতারও বিরোধী (দৃষ্টবিরোধ)।
👉 সূত্র প্রয়োগ অনুযায়ী এখানে দুটি স্পষ্ট বিরোধ আছে —
শাস্ত্রদৃষ্টবিরোধ — শতরুদ্রীয় ও অন্যান্য বেদীয় মন্ত্রে রুদ্রকে ঈশ্বররূপে বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু “মেঘ, বিদ্যুৎ, বজ্রপাত”- অর্থ করা শাস্ত্রবিরোধী।
দৃষ্টবিরোধ — প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় মেঘ, বিদ্যুৎ, বজ্রপাত বা নীতি-রূপ বস্তুর শরীর, অস্ত্র, দৃষ্টি, বাক নেই তাই “মেঘ, বিদ্যুৎ, বজ্রপাত”-অর্থ বাস্তববিরোধী।
অতএব “শাস্ত্রদৃষ্টবিরোধাচ্চ” সূত্রানুসারে এই অর্থ অগ্রাহ্য।
মীমাংসা সিদ্ধান্ত অনুযায়ী—
কোনো শব্দের অর্থ নির্বাচনের সময় যদি সেই অর্থ অন্য বেদবাক্যের অর্থ, বা প্রত্যক্ষ সত্যের বিরোধী হয়, তবে তা পরিত্যাজ্য।
তাই “রুদ্র” শব্দকে কেবল “বিদ্যুৎ”, “বজ্রপাত”, “নীতি” বা “মেঘ” বলা মীমাংসাসিদ্ধ নয়।
একমাত্র “সচেতন দেবতা রুদ্র”-ই বাক্যতাৎপর্য অনুযায়ী সঙ্গত, শাস্ত্রসম্মত ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
👉 শাস্ত্রদৃষ্টবিরোধাচ্চ” সূত্রটি আর্যসমাজীয় ব্যাখ্যাকে অগ্রাহ্য করে, এবং “বাক্যনিয়মাৎ” সূত্র তার পরিবর্তে রুদ্রের সাকার দেবত্ব স্থির করে।
এই দুই সূত্র একত্রে প্রয়োগ করলে মীমাংসাসিদ্ধ যুক্তিতে প্রমাণিত হয় যে— যজুর্বেদের শতরুদ্রীয় অধ্যায়ে “রুদ্র” কোনো বিমূর্ত নীতি, বিদ্যুৎ, বজ্রপাত বা মেঘ নয়, বরং চৈতন, সাকার, পরমেশ্বর শিব।
👉পঞ্চাবয়বী ন্যায় অনুযায়ী—
◾প্রতিজ্ঞা— রুদ্র সাকার ঈশ্বর।
অর্থাৎ- “বেদের ‘রুদ্র’ শব্দে যিনি উক্ত, তিনি সাকার (রূপযুক্ত) চৈতন দেবতাও বটে।”
◾হেতু— যেহেতু তিনি তনু, হস্ত, বচন, দৃষ্টি, কৃপা প্রভৃতি সচেতন ক্রিয়ার অধিকারী। যজুর্বেদ ১৬.২–৪ ইত্যাদিতে বলা হয়েছে—
“যা তে রুদ্র শিবা তনুঃ”— তাঁর “তনু” (রূপ/শরীর) আছে।
“যামিষুং গিরিশন্ত হস্তে বিভ্যস্তব”— তাঁর “হস্তে অস্ত্র” আছে।
“শিবেন বচসা ত্বা বদামসি”— তাঁর সঙ্গে “বচনে কথা বলা” হচ্ছে।
“অভি চাকশীহি”— “আমাদের দর্শন দাও” তিনি “দৃষ্টি” সম্পন্ন।
এইসব ক্রিয়াগুলো চৈতন সত্তা ও শরীরধারী রূপ ছাড়া সম্ভব নয়।
◾উদাহরণ— যেমন মানুষ, দেবতা, বা কোনো সাকার চৈতন ব্যক্তি যাঁর দেহ ও ইন্দ্রিয় থাকে তিনিই এই ধরনের কর্ম করতে পারেন। অচেতন, নিরাকার পদার্থ (নীতি, বজ্রপাত, বিদ্যুৎ, মেঘ ইত্যাদি) কখনোই “দর্শন দেওয়া”, “বচনে উত্তর দেওয়া”, “অস্ত্র ধারণ করা” ইত্যাদি করতে পারে না।
◾উপনয়ন— তদ্রূপ রুদ্রও এইসব সচেতন ক্রিয়ার অধিকারী বলে বেদে বর্ণিত। সুতরাং তিনি কেবল নিরাকার পদার্থ বা নীতি নন, বরং সজ্ঞান, রূপযুক্ত চৈতন সত্তা অর্থাৎ সাকার ঈশ্বরও বটে।
◾নিগমন— অতএব, রুদ্র সাকার ঈশ্বরও বটে।
👉উপরোক্ত সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ থেকে এটা প্রমাণিত হয় - পরশিব ব্রহ্ম কেবল নিরাকার নয় বরং সাকারও বটে। এবং রুদ্র শব্দের অর্থ কেবল- ব্রজপাত, বিদ্যুৎও নয় রুদ্র সাক্ষাৎ পরমেশ্বর। উপরোক্ত আলোচনা, ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ, আচার্যের ভাষ্য, ন্যায় ও শ্রুতি প্রমাণ অনুযায়ী এটা নিশ্চিত যে রুদ্র নিরাকার নির্গুণ ব্রহ্ম হওয়ার সত্ত্বেও সাকার স্বরূপেও প্রকাশিত হন। তাই, সকল শাস্ত্র প্রমাণ ও আচার্যদের মান্যতা একই সিদ্ধান্তকে মেনে চলে, আর ন্যায় অনুযায়ী এই সিদ্ধান্তকে দৃষ্টান্তের লক্ষণ বলা হয়। আর দৃষ্টান্তের কোনো খণ্ডন হয় না।
লৌকিকপরীক্ষকাণাৎ যস্মিন্নর্থে বুদ্ধি সাম্যং স দৃষ্টান্তঃ ৷৷ ২৫ ৷৷
[ন্যায়/১/১/২৫]
অনুবাদ — লৌকিকদিগের এবং পরীক্ষকদিগের যে পদার্থে বৃদ্ধির সাম্য (অবিরোধ) হয়, তাহা দৃষ্টান্ত।
“রুদ্র” পদ শ্রুতি-সমর্থিত, পণ্ডিতসম্মত (সায়ণ, মহীধর, উবট), এবং লোকবোধ বিরোধী নয়। এদের সকলেই স্বীকার করেছেন যে পরমেশ্বর রুদ্র নিরাকার সত্তা হলেও তাঁর ইচ্ছায় সাকার প্রকাশ ঘটে।
উভয় ক্ষেত্রেই লৌকিক যুক্তি দ্বারা, এবং পরীক্ষক (শাস্ত্রাচার্য) দ্বারা রুদ্রের নিরাকার-সাকার উভয় স্বরূপের ধারণা অবিরোধরূপে স্বীকৃত।
অতএব, এই ধারণাই দৃষ্টান্তের লক্ষণরূপে সিদ্ধ।
অর্থাৎ এখানে দৃষ্টান্তের উপর পক্ষ ও প্রতিপক্ষ উভয়েরই বুদ্ধি বিরোধহীনভাবে স্থিত। কারণ ‘দৃষ্টান্ত’ স্থাপিত হয়েছে এমন এক ক্ষেত্রে যেখানে বেদ, ভাষ্য, নিঘন্টু ও দর্শনসিদ্ধ সামঞ্জস্যপূর্ণ দৃষ্টপদ তাই, দৃষ্টান্তের কোনো খণ্ডন হয় না।
রুদ্র নিরাকার ব্রহ্ম হয়েও সাকার প্রকাশিত হন এই সিদ্ধান্তে কোনো লৌকিক বা শাস্ত্রদৃষ্ট বিরোধ নেই।
অতএব, ন্যায়সূত্র ১।১।২৫ অনুসারে এটি দৃষ্টান্তলক্ষণযুক্ত সিদ্ধান্ত, অর্থাৎ অখণ্ডনীয় সত্য।
সুতরাং— আর্যসমাজের যে দাবী ছিলো বেদে “রুদ্র” শব্দের অর্থ কেবল বিদ্যুৎ বা বজ্রপাত এবং রুদ্র সাকার ঈশ্বর নন সেই দাবী উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা খণ্ডিত হলো এবং এই অনার্যরা যে বেদের ভুল ব্যাখ্যাকারী ও অপপ্রচারকারী তা প্রমাণিত হলো। শৈবপক্ষ দ্বারা পরমেশ্বর শিবের সাকারত্বের বিষয়টি প্রমাণিত ও অখণ্ডিত রইল।
🙏সর্বে হ্যেষ রুদ্রস্তস্মৈ রুদ্রায় নমো অস্তু🙏
নমঃ শিবায়ৈ 🙏
নমঃ শিবায় 🙏
শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তে ✊🚩
হর হর মহাদেব 🚩
✍️অপপ্রচার দমনে— অন্তিক ভট্টাচার্য্য (শম্বরনাথ শৈব)।
🌻বিশেষ কৃতজ্ঞতা— আমার গুরু শ্রী নন্দীনাথ শৈবাচার্য জী ও আমার আদর্শ শ্রী রোহিত কুমার চৌধুরী শৈবজী।
কপিরাইট ও প্রচারে— আন্তর্জাতিক শিব শক্তি জ্ঞান তীর্থ (ISSGT)।
বি: দ্র:— লেখাটি কপি করলে সম্পূর্ণভাবে করবেন, কোনো রকম কাটছাট করা যাবে না।
শিবঃ ॐ…….🙏


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন