যুদ্ধে কৃষ্ণের কাছে শিবকে পরাজিত দেখানো কেবল মায়ার ভ্রান্ত লীলামাত্র
ভূমিকা -
Narayanastra নামে একটি Facebook Page আছে, এদের উদ্দেশ্য হল ভগবান বিষ্ণুর শ্রেষ্ঠত্বের নামে পরমেশ্বর শিবকে অপমান করা। বৈষ্ণবেরা নিজেদের আরাধ্য বিষ্ণুর শ্রেষ্ঠত্বের অহংকার বজায় রাখবার জন্য পরমেশ্বর শিবকে ‘অক্ষম’ প্রমাণ করবার জন্য শাস্ত্রের মীমাংসা না জেনেই আক্ষরিক অর্থ কে সর্বোপরি বলে মেনে নেয়। এই বৈষ্ণবদের মধ্যে থাকা এক বিকৃত মস্তিস্কের ব্যক্তি Ashok Sarkar, যিনি জগতের মাতা পরমেশ্বরী পার্বতী দেবীকে নিজের প্রেমিকা বলে দাবী করেন, সেই নরকের কীট আমাদের পরমেশ্বর শিবকে নিকৃষ্ট প্রমাণ করতে উদ্দ্যত হয়েছে। দেখুন এই ভণ্ড বৈষ্ণবদের দাবিগুলির বাস্তবিকতা কতটা গ্রহণযোগ্য তা এবার আলোচনা করা হল।
____________________________________________________________________________________
🚫 ভণ্ড বৈষ্ণবের দাবী —
স্কন্দমহাপুরাণ/বিষ্ণুখন্ড/পুরুষোত্তমমাহাত্ম্য/দ্বাদশোঽধ্যায়/৪২-৭৯ নং শ্লোকে “শিবের অহংকার নাশ করেছে শ্রীকৃষ্ণ সুদর্শন চক্র দ্বারা”
📕গ্রন্থ সহায়তা👇 শ্রী নটবর চক্রবর্তী দ্বারা সম্পাদিত ও প্রকাশিত স্কন্দমহাপুরাণ।
বিঃদ্রঃ উপ্যাখ্যানটি শ্রীবৃন্দাবন দাস ঠাকুরও তার চৈতন্য ভাগবত এ সংক্ষিপ্তারে সংযোজন করেছিলেন।
🚫 ভণ্ড বৈষ্ণবের দাবী — ১
✅ শৈব পক্ষ থেকে বৈষ্ণবীয় ১ম দাবীর খণ্ডন —
🚫 ভণ্ড বৈষ্ণবের দাবী — ২
✅ শৈব পক্ষ থেকে বৈষ্ণবীয় ২য় দাবীর খণ্ডন —
🟣 পরমেশ্বর শিবের মহাপাশুপতাস্ত্র -র বর্ণনা - যা ত্রিভুবনে সর্বশ্রেষ্ঠ এবং অপ্রতিরোধ্য দিব্য অস্ত্র , যার দ্বারা ব্রহ্মা, বিষ্ণুও বধ হয়ে যাবেন -
শরশ্চ সূর্য্যসঙ্কাশঃ কালানলসমদ্যুতি ।
এতদস্ত্রং মহাঘোরং দিব্যং পাশুপতং মহৎ ॥ ২৫৭ ॥
অদ্বিতীয়মনির্দ্দেশ্যং সর্বভূতভয়াবহম্ ।
সস্ফুলিঙ্গং মহাকায়ং বিসৃজন্তমিবানলম্ ॥ ২৫৮ ॥
একপাদং মহাদংষ্ট্রং সহস্রশিরসোদরম্ ।
সহস্রভুজজিহ্বাক্ষমুদ্গিরন্তমিবানলম্ ॥ ২৫৯ ॥
ব্রাক্ষান্নারায়ণাচ্চৈন্দ্রাদাগ্নেয়াদপি বারুণাৎ ।
যদ্বিশিষ্টং মহাবাহো সর্ব্বশস্ত্রবিঘাতকম্ ॥ ২৬০ ॥
নির্দহেত চ যৎ কৃৎস্নং ত্রৈলোক্যং সচরাচরম্ ।
মহেশ্বরভুজোৎসৃষ্টং নিমিষার্দ্ধান্নসংশয়ঃ ॥২৬২ ॥
নাবধ্যৌ যস্য লোকেহস্মিন্ ব্রহ্মাবিষ্ণুসুরেষ্বপি ।....২৬৩ ॥ "
(মহাভারত/অনুশাসন পর্ব/১৩ নং অধ্যায়)
অর্থ — উপমন্যু বললেন, সূর্যের ন্যায় উজ্জ্বল ও প্রলয় কালাগ্নির ন্যায় ভয়ঙ্কর, অদ্বিতীয়, অনির্বচনীয় , অগ্নিস্ফূলিঙ্গ উদ্গিরণ কারী অস্ত্র পাশুপতাস্ত্র। তার এক পা, জিহ্বা, নয়ন, বিশাল দন্ত, সহস্রমস্তক, উদর ও সহস্রবাহু ছিল। ইহা ব্রহ্মা, বিষ্ণু, ইন্দ্র, অগ্নি, বরুণের অস্ত্রের থেকেও শ্রেষ্ঠ , যা দিয়ে মহাদেব ত্রিভুবনকেও দগ্ধ করতে সক্ষম।
এজগতে পাশুপতাস্ত্রের কাছে ব্রহ্মা, বিষ্ণু কেউই অবধ্য নয়।
অর্থাৎ বৈষ্ণব দের আরাধ্য বিষ্ণুরও ক্ষমতা নেই এই পাশুপতাস্ত্রের সামনে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর। বিষ্ণুর উপর এই মহাপাশুপতাস্ত্র প্রয়োগ করলে বিষ্ণুও বধ হয়ে যাবে ।
তাই বৈষ্ণব দের সাবধান হওয়া উচিত।
🚫 ভণ্ড বৈষ্ণবের দাবী — ৩
✅ শৈব পক্ষ থেকে বৈষ্ণবীয় ৩য় দাবীর খণ্ডন —
👉ত্রিদেব থাকে মহেশ্বরের অধীনে এবং মহেশ্বরেই লয় প্রাপ্ত হয়।
কোটিকোট্যযুতান্যত্র ব্রহ্মণ্ডানি মম প্রিয়ে।
জলবুদ্বুদবদ্দেবি সঞ্জাতানি তু লীলয়া।।৪৫
তত্রতত্র চতুর্ব্বক্ত্রা ব্রহ্মাণো হরয়ো ভবাঃ।
সৃষ্টাঃ প্রধানেন তদা লব্ধা শম্ভোন্তঃ সন্নিধিঃ।।৪৬
লয়ং চৈব তথান্যোন্যমাদ্যস্তং প্রকোরতি চ।
সর্গসংহার-সংস্থানাং কর্ত্তা দেবো মহেশ্বরঃ।।৪৭
সর্গে চ রজসো পৃক্তঃ সত্ত্বস্থঃ পরিপালনে।
প্রতিসর্গে তমোযুক্তোঃ সোহহং দেবি ত্রিধা স্থিতঃ।।৪৮
[স্কন্দপুরাণ- প্রভাসখন্ড- ক্ষেত্রমাহাত্ম্য- অধ্যায়- ১৯]
✅ অর্থ — পরমেশ্বর শিব বললেন, প্রিয়ে! আমার (সদাশিব দ্বারা) লীলাক্রমে প্রকৃতি হতে জলের বুদবুদ -এর আকারে কোটি কোটি অযুত অযুত ব্রহ্মাণ্ড জন্মেছে ; সেই সকল ব্রহ্মাণ্ডে চতুরানন ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও রুদ্র সৃষ্ট হইয়াছেন।
ইঁহারা পরস্পর আদ্যন্তক্রমে লয় প্রাপ্ত হইয়া শম্ভু সান্নিধ্য লাভ করেন।মহেশ্বরই সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়ের কর্তা।
হে দেবি! আমিই সেই মহেশ্বর আমি সৃষ্টি কাজে রজগুণযুক্ত, পালণ কার্য্যে সত্ত্বগুণযুক্ত ও সংহার কার্য্যে তমোগুণযুক্ত — এই ত্রিবিধ মূর্তি পরিগ্রহণ করিয়া বিরাজ করি।।
ত্রয়স্তে কারণাত্মানো জাতাঃ সাক্ষান্মহেশ্বরাৎ ।
চরাচরস্য বিশ্বস্য সর্গস্থিত্যন্তহেতবঃ ॥ ১৩
পরমৈশ্বর্যসংযুক্তাঃ পরমেশ্বরভাবিতাঃ ।
তচ্ছক্ত্যাধিষ্ঠিতা নিত্যং তৎকার্যকরণক্ষমাঃ ॥ ১৪
পিত্রা নিয়মিতাঃ পূর্বং ত্রয়োঽপি ত্রিষু কর্মসু ।
ব্রহ্মা সর্গে হরিস্ত্রাণে রুদ্রঃ সংহরণে তথা ॥ ১৫
তথাপ্যন্যোঽন্যমাৎসর্যাদন্যোঽন্যাতিশয়াশিনঃ ।
তপসা তোষয়িত্বা স্বং পিতরং পরমেশ্বরম্ ॥ ১৬
লব্ধ্বা সর্বাত্মনা তস্য প্রসাদাৎ পরমেষ্ঠিনঃ ।
ব্রহ্মনারায়ণৌ পূর্ব রুদ্রঃ কল্পান্তরেঽসৃজৎ ॥১৭
কল্পান্তরে পুনর্ব্রহ্মা রুদ্রবিষ্ণূ জগন্ময়ঃ ।
বিষ্ণুশ্চ ভগবান্ রুদ্রং ব্রহ্মাণমসৃজৎ পুনঃ ॥ ১৮
নারায়ণং পুনর্ব্রহ্মা ব্রহ্মাণং চ পুনর্ভবঃ ।
এবং কল্পেষু কল্পেষু ব্রহ্মবিষ্ণুমহেশ্বরাঃ ॥ ১৯
পরস্পরেণ জায়ন্তে পরস্পরহিতৈষিণঃ ।
তত্তৎ কল্পান্তবৃত্তান্তমধিকৃত্য মহর্ষিভিঃ ॥ ২০
প্রভাবঃ কথ্যতে তেষাং পরস্পরসমুদ্ভবাৎ ।..॥ ২১
[শিবমহাপুরাণ/বায়বীয় সংহিতা/পূর্বখণ্ড/১৩ অধ্যায়/১৩-২১ নং শ্লোক]
অর্থ — এই চরাচর জগতের সৃষ্টি, পালন ও সংহারের কারণাত্মারূপ ত্রিদেব (ব্রহ্মা, বিষ্ণু, রুদ্র) সাক্ষাৎ মহেশ্বর (সদাশিব) থেকে জন্মেছেন। এঁনাদের মধ্যে পরম ঐশ্বর্যযুক্ত, এঁরা পরমেশ্বর শিবের ভাবনায় ভাবিত এবং শিবের শক্তিতে অধিষ্ঠিত হয়ে সর্বদা তাঁর কার্য করতে সমর্থ ॥ ১৩-১৪ ॥
পিতা সদাশিবই পূর্বকালে এঁনাদের তিন জনকে তিনটি কর্মে নিযুক্ত করেছিলেন। ব্রহ্মাকে সৃষ্টিকার্যে, বিষ্ণুকে পালনকার্যে এবং রুদ্রকে সংহারকার্যে ॥ ১৫ ॥
কল্পান্তরে (ভিন্ন ভিন্ন কল্পে) তারা নিজের উৎপত্তিকর্তা পরমেশ্বর সদাশিবকে তপস্যা দ্বারা সন্তুষ্ট করে একজন অন্যজনের থেকে অধিক সামর্থ্য অর্জনের চেষ্টা করে থাকেন ॥ ১৬
সেই পরমেষ্ঠী শিবকে পূর্ণরূপে প্রসন্ন করে তার প্রসাদে পূর্বে কোনো কল্পে রুদ্রদেব ব্রহ্মা আর নারায়ণ কে উৎপন্ন করেছেন ॥ ১৭ ॥
আবার কোনো অন্য কল্পে জগন্ময় ব্রহ্মা রুদ্র আর বিষ্ণু কে উৎপন্ন করেছেন। পুনরায় কোনো অন্যকল্পে ভগবান বিষ্ণু রুদ্র তথা ব্রহ্মা কে উৎপন্ন করেছেন ॥ ১৮ ॥
পুনরায় অন্য কোনো কল্পে ব্রহ্মা নারায়ণ কে আর কোনো কল্পে রুদ্রদেব ব্রহ্মাকে উৎপন্ন করেছেন, এইভাবে প্রত্যেক কল্পে ব্রহ্মা-বিষ্ণু তথা মহেশ্বর পরস্পর হিত (উপকার) করবার ইচ্ছায় একজন অন্যের দ্বারা উৎপন্ন হতে থাকেন।মহর্ষিগণ সেই সেই গল্পের বৃত্তান্ত কে নিয়ে নিজেদের মধ্যে সেই সমুদ্ভবের দৃষ্টকোণের দ্বারা তাদের প্রভাবের বর্ণনা করে থাকেন ॥ ১৯-২১ ॥
🚫 ভণ্ড বৈষ্ণবের দাবী — ৪
✅ শৈব পক্ষ থেকে বৈষ্ণবীয় ৪র্থ দাবীর খণ্ডন —
চলুন দেখে নেওয়া যাক -
সর্বে রুদ্রং ভজন্ত্যেব রুদ্রঃ কঞ্চিদ্ভজেন্ন হি ।
স্বাত্মনা ভক্তবাৎসল্যাদ্ভজত্যেব কদাচন ॥ ১৫
[তথ্যসূত্র – শিবমহাপুরাণ/কোটিরুদ্রসংহিতা/অধ্যায় ৪২]
☘️অর্থ – সবাই ভগবান রুদ্র তথা পরমেশ্বর শিবের ভজনা করেন, কিন্তু পরমেশ্বর শিব কারোর ভজন করেন না, কখনো কখনো ভক্তবৎসলবশত তিনি নিজেই নিজের ভক্তের প্রশংসা রূপে ভজনা করে থাকেন ॥ ১৫
অতএব, পরমেশ্বর শিব বা কৈলাসপতি রুদ্রদেবও কখনোই বিষ্ণু ভক্ত নন, ভক্ত হবার লীলা করেন রুদ্রদেব। যে নির্দিষ্ট কল্পে ভগবান বিষ্ণুর থেকে ব্রহ্মা ও রুদ্রদেব উৎপন্ন হন, সেই কল্পে ভগবান বিষ্ণু ঈশ্বর হিসেবে ঘোষিত হবার কারণে ভগবান রুদ্র লোকাচারবশত ভক্তি সহকারে বিষ্ণুকে ঈশ্বর হিসেবে স্তব স্তুতি ও প্রণাম করে থাকেন।
এখানে সদাশিবের অবতার রুদ্রদেব লোকাচারবশত এই লীলা ঘটিয়ে থাকেন। সাক্ষাৎ সদাশিব বিষ্ণুর ভক্তি করেন না। অংশস্বরূপ রুদ্রকে দিয়ে কোনো একটি কল্পে বিষ্ণুর ভক্তি করাবার অভিনয় প্রকট করেন মাত্র। যা দেখে অজ্ঞানী জীব শিবকে বিষ্ণুর ভক্ত বলে ভেবে ভ্রমে পড়েন ।
আরও দেখুন,
♦️শিবমহাপুরাণের রুদ্র সংহিতার সতীখণ্ডের ২৫ অধ্যায়ে শিব কেন বিষ্ণু বা তার অবতারের কাছে পরাজিত হন বা তাদের স্তুতি করে তাদের শ্রেষ্ঠ বলে দাবী করে প্রণাম করেন ?
তার কারণ দেখুন —
[প্রসঙ্গ, মা সতীকে শ্রীরামচন্দ্র শিবের কৃপায় বিষ্ণুর অজেয় হবার শক্তি ও ঐশ্বর্য প্রাপ্তি বিষয়ে বিস্তারিত বলছেন]
অথো হরি সমাহূয় বৈকুণ্ঠাৎ প্রীতমানসঃ ।
তদ্ভক্ত্যা পূর্ণয়া দেবি মোদতি স্ম মহেশ্বরঃ ॥ ১০ ॥
সুমুহূর্তে মহাদেবস্তত্র সিংহাসনে বরে ।
উপবেশ্য হরিং প্রীত্যা ভূষয়ামাস সর্বশঃ ॥ ১১ ॥
আবদ্ধরম্যমুকুটং কৃতকৌতুকমঙ্গলম্ ।
অভ্যষিঞ্চন্মহেশস্তু স্বয়ং ব্রহ্মাণ্ডমণ্ডপে ॥ ১২ ॥
দত্তবান্নিখিলৈশ্বর্যং যন্নৈজং নান্যগামি যৎ ।
ততস্তুষ্টাব তং শম্ভুঃ স্বতন্ত্রো ভক্তবৎসলঃ ॥ ১৩ ॥
ব্রহ্মাণং লোককর্তারমবোচদ্বচনং ত্বিদম্ ।
ব্যাপয়ন্ স্বং বরাধীনং স্বতন্ত্রং ভক্তবৎসলঃ ॥ ১৪ ॥
মহেশ উবাচ —
অতঃ প্রভৃতি লোকেশ মন্নিদেশাদয়ং হরিঃ ।
মম বন্দ্যঃ স্বয়ং বিষ্ণুর্জাতঃ সর্বঃ শ্রুণোতি হি ॥ ১৫ ॥
সর্বৈর্দেবাদিভিস্তাত প্রণম ত্বমমুং হরিম্ ।
বর্ণযন্তু হরিং বেদা মমৈতে মামিবাজ্ঞয়া ॥ ১৬ ॥
শ্রীরাম উবাচ —
ইত্যুক্ত্বাথ স্বয়ং রুদ্রোঽনমদ্বৈ গরুড়ধ্বজম্।
বিষ্ণুভক্তিপ্রসন্নাত্মা বরদো ভক্তবৎসলঃ ॥ ১৭ ॥
ততো ব্রহ্মাদিভির্দেবৈঃ সর্বরূপসুরৈস্তথা ।
মুনিসিদ্ধাদিভিশ্চৈব বন্দিতোঽভূদ্ধরিস্তদা ॥ ১৮ ॥
ততো মহেশো হরয়েঽশংসদ্দবিষদাং পুরঃ ।
মহাবরান্ সুপ্রসন্নো দত্তবান্ ভক্তবৎসলঃ ॥ ১৯ ॥
✅ অর্থ — হে দেবী! ভগবান বিষ্ণুর পূর্ণ ভক্তিতে মহাদেব সদা-প্রসন্ন থাকতেন। তাই তিনি প্রীতিপূর্ণ হৃদয়ে শ্রীহরিকে বৈকুণ্ঠ থেকে আহ্বান করেন এবং শুভ মুহূর্তে শ্রীহরিকে ঐ শ্রেষ্ঠ সিংহাসনে বসিয়ে মহাদেব স্বয়ং প্রীতিপূর্বক তাঁকে সর্বপ্রকার অলংকারে বিভূষিত করেন। তাঁর মস্তকে মনোহর মুকুট পরানো হয় এবং তাঁর সঙ্গে মঙ্গল-কৌতুকও হয়। এই সব সাঙ্গ হলে মহেশ্বর স্বয়ং ব্রহ্মাণ্ডমণ্ডপে শ্রীহরির অভিষেক করেন এবং তাঁকে নিজের সমস্ত ঐশ্বর্য প্রদান করেন, যা অন্যের কাছে নেই।
তারপর ভক্তবৎসল শম্ভু শ্রীহরির স্তব করেন এবং নিজ পরাধীনতা (ভক্তের অধীনতা) ঘোষণা করে লোককর্তা ব্রহ্মাকে বলেন। ১০-১৪
মহেশ্বর বলেন- লোকেশ! আজ থেকে আমার নির্দেশানুসারে এই বিষ্ণু হরি স্বয়ং আমার বন্দনীয় হলেন। একথা সকলেই শুনুন। তাত! তুমি সমস্ত দেবতার সঙ্গে শ্রীহরিকে প্রণাম করো এবং আমার নির্দেশে বেদ আমার মতোই শ্রীহরির বর্ণনা করবে।
শ্রীরামচন্দ্র বলেন, হে দেবী সতী ! ভগবান বিষ্ণুর শিবভক্তি দেখে প্রসন্নচিত্তে বরদায়ক ভক্তবৎসল রুদ্রদেব উপরোক্ত কথা বলে নিজেই শ্রীগরুড়ধ্বজকে প্রণাম করলেন। তারপর ব্রহ্মাদি দেবগণ, মুনিগণ ও সিদ্ধাদিও শ্রীহরির বন্দনা করলেন। তখন ভক্তবৎসল মহেশ্বর অত্যন্ত প্রসন্ন হয়ে দেবতাদের সামনে শ্রীহরিকে অনেক বর দিলেন। ১৫-১৯
[লক্ষ্য করুন, শিবমহাপুরাণের রুদ্র সংহিতার সতীখণ্ডের ২৫ অধ্যায়ের ১৪,১৭-১৯ নং শ্লোকে দেখুন প্রভু রুদ্র নিজের ভক্ত বিষ্ণুর শিবভক্তির কারণে বিষ্ণুর কাছে নিজের পরাধীনতা স্বয়ং নিজেই স্বীকার করেছেন। তাই কোন কল্পে বিষ্ণুর অধীন বিষ্ণুকে ভক্তি করার মতো ঘটনাতে শিবের অক্ষমতা প্রমাণিত হয়না, বরং ঈশ্বরের মহানতা আর ভক্তের প্রতি প্রেমের উদারতা প্রমাণিত হয়।]
মহেশ উবাচ —
ত্বং কর্তা সর্বলোকানাং ভর্তা হর্তা মদাজ্ঞয়া ।
দাতা ধর্মার্থকামানাং শাস্তা দুর্ণয়কারিণাম্ ॥ ২০ ॥
জগদীশো জগৎপূজ্যো মহাবলপরাক্রমঃ ।
অজেয়স্ত্বং রণে ক্বাপি মমাপি হি ভবিষ্যসি ॥ ২১ ॥
শক্তিত্রয়ং গৃহাণ ত্বমিচ্ছাদি প্রাপিতং ময়া।
নানালীলাপ্রভাবত্বং স্বতন্ত্রত্বং ভবত্রয়ে ॥ ২২ ॥
ত্বৎ দ্বেষ্টারো হরে নূনং ময়া শাস্যাঃ প্রয়ত্নতঃ ।
ত্বদ্ভক্তানাং ময়া বিষ্ণো দেয়ং নির্বাণমুত্তমম্ ॥ ২৩ ॥
মায়াং চাপি গৃহাণেমাং দুঃপ্রণোদ্দাং সুরাদিভিঃ ।
যয়া সংমোহিতং বিশ্বমচিদ্রূপং ভবিষ্যতি ॥ ২৪ ॥
মম বাহুর্মদীয়স্ত্বং দক্ষিণোঽসৌ বিধির্হরে ।
অস্যাপি হি বিধেঃ পাতা জনিতাপি ভবিষ্যসি ॥ ২৫ ॥
হৃদয়ং মম যো রুদ্রঃ স এবাহং ন সংশয়ঃ ।
পূজ্যস্তব সদা সোঽপি ব্রহ্মাদীনামপি ধ্রুবম্ ॥ ২৬ ॥
অত্র স্থিত্বা জগৎ সর্বং পালয় ত্বং বিশেষতঃ ।
নানাবতারভেদৈশ্চ সদা নানোতিকর্তৃভিঃ ॥ ২৭ ॥
মম লোকে তবেদং বৈ স্থানং চ পরমর্দ্ধিমৎ ।
গোলোক ইতি বিখ্যাতং ভবিষ্যতি মহোজ্জ্বলম্ ॥ ২৮ ॥
ভবিষ্যন্তি হরে যে তেঽবতারা ভুবি রক্ষকাঃ ।
মদ্ভক্তাস্তান্ ধ্রুবং দ্রক্ষ্যে প্রীতানথ নিজাদ্ বরাৎ ॥ ২৯ ॥
✅অর্থ — মহেশ বললেন,
হরে! তুমি আমার আদেশে সম্পূর্ণ জগতের কর্তা, পালক এবং সংহারক হও। ধর্ম, অর্থ ও কামের দাতা এবং দুর্নীতি ও অন্যায়কারী দুষ্টদের দণ্ডদাতা হও; মহাবল-পরাক্রমসম্পন্ন, জগৎপূজ্য জগদীশ্বর হয়ে থাকো। সমরাঙ্গনে (রণক্ষেত্রে) তুমি কখনও পরাজিত হবে না, আমার কাছেও কখনও পরাজিত হবে না ॥ ২০-২১ ॥
তুমি আমার প্রদত্ত এই তিন প্রকার শক্তি গ্রহণ করো। এক, ইচ্ছা ইত্যাদির সিদ্ধি; দুই, নানারূপ লীলা প্রকট করার শক্তি এবং তিন, ত্রিলোকে নিত্য স্বতন্ত্রতা। হরে! যে তোমার দ্বেষকারী হবে, সে অবশ্যই আমার দ্বারা দণ্ডপ্রাপ্ত হবে। বিষ্ণো! আমি তোমার ভক্তদের উত্তম মোক্ষপ্রদান করব। তুমি এই মায়াও গ্রহণ করো, যা নিবারণ করা দেবতাদের পক্ষেও কঠিন হবে এবং যাতে মোহিত হলে এই পৃথিবী জড়রূপ হয়ে যায়। হরে! তুমি আমার বাম বাহু আর বিধাতা হলেন দক্ষিণ বাহু। তুমি এই বিধাতারও উৎপাদক এবং পালক হবে। আমার হৃদয়রূপ যে রুদ্র- সে-ই আমি-এতে কোনো সংশয় নেই। এই রুদ্র তোমার এবং ব্রহ্মাদি দেবতাগণেরও অবশ্যই পূজনীয়। তুমি এখানে থেকে বিশেষভাবে সম্পূর্ণ জগৎ পালন করো। নানাপ্রকার লীলাকারী বিভিন্ন অবতার দ্বারা সর্বদা সকলকে রক্ষা করতে থাকো। আমার চিন্ময় ধামে তোমার যে এই পরম বৈভবশালী এবং উজ্জ্বল স্থান, সেটি গোলোক নামে প্রসিদ্ধ হবে।
হরে! ভূতলে তোমার যেসকল অবতার হবেন, তাঁরা সকলের রক্ষক এবং আমার ভক্ত হবেন। আমি অবশ্যই তাদের দর্শন করবো। তারা আমার বরে সর্বদা প্রসন্ন থাকবেন।
বৈষ্ণবেরা শাস্ত্রের মীমাংসা না জেনে একটি কাহিনী পেলেই তাই নিয়ে হইচই শুরু করে, অথচ শিবের নিন্দা করতে গিয়ে নিজেদের অজ্ঞতা প্রমাণ করিয়ে দেয় সকলের কাছে। এইবার বৈষ্ণবের দেওয়া সিদ্ধান্তের সমূলে নাশ করবো।
🍁বিকৃত অল্পবুদ্ধিযুক্ত বৈষ্ণব প্রাণীর দাবীর খণ্ডন শৈব পক্ষ থেকে —
বৈষ্ণবদের এই পুরো দাবিটাই অর্ধসত্য। শ্রীকৃষ্ণ জয়ী হয়েছিল, এটি সত্য। কিন্তু তা মূলত পরমেশ্বর শিবের দেওয়া বরদানের ফলে হয়েছে।প্রভু শিবের পরাজয়ের ঘটনাটি ঘটেছে বলে বৈষ্ণবেরা দাবী করেছে তার পেছনে অন্য রহস্য লুকিয়ে আছে, সেই বিষয়ে আলোকপাত করা যাক।
শৈবাচার্য মহর্ষি সাবর্ণীকৃত পুরাণ শাস্ত্র মীমাংসাগ্রন্থ পৌরাণিক সংহিতায় বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে যে, বৈষ্ণবীয় ইত্যাদি বিভিন্ন পুরাণের মধ্যে কেন বিষ্ণুকে শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে -
[পৌরাণিক সংহিতা (শৈবোপআগম)/৪র্থ পটলঃ/৬-৭৪ নং শ্লোক]
পরমেশ্বর সদাশিব (বিষ্ণুকে) বললেন,
হে বিষ্ণু ! তুমি আমার প্রিয় ভক্ত, ভক্তের যশ বৃদ্ধি হলে আমার অত্যন্ত হয় প্রীতি হয়। তাই আমার ভক্তের যশ বৃদ্ধি জগতে বৃদ্ধির জন্য আমার লীলাবশত ধারণ করা রূপ গুণাত্মক সংহারক রুদ্রের মাধ্যমে কোনো কোনো নির্দিষ্ট কল্পে তোমার মাহাত্ম্য বৃদ্ধির জন্য তোমাকে শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করবো। সেই রুদ্র কৈলাস পর্বতে বসে তার প্রিয়া গৌরী সহ সকল দেবতা মুনি ঋষিকে বিষ্ণু মহিমা শ্রবণ করাবেন, এতে হে বৎস তোমাকে সকলেই ঈশ্বর বলে গণ্য করবে ॥ ৬-১০ ॥
আমার শিবলোক ঈশ্বর লোক নামে বিখ্যাত হওয়ায়, তোমার মতোই সকল শিবভক্তগণ আমার কৃপায় শিবলোকে অবস্থান করে ঈশ্বরপদ লাভ করে জগৎ সৃষ্টি স্থিতি পালন করতে সক্ষম হয়। কোনো কোনো নির্দিষ্ট কল্পে আমার ভক্তই ব্রহ্মা বিষ্ণু ইন্দ্রাদির পদে অবস্থান করে জগতে জগত শাসন করে চলেছেন অনন্ত কাল ধরে, আমার কৃপাবলে তুমিও কৈলাসবাসী রুদ্রকে পরাস্ত করতে সক্ষম হবে, কারণ তোমার মাহাত্ম্য বৃদ্ধি হবার জন্য এটি আবশ্যক ॥ ১১-১৪ ॥
সেই সেই নির্দিষ্ট কল্পের জন্য বিষ্ণুই সর্বশ্রেষ্ঠ ও ব্রহ্মা হর ইন্দ্রাদি দেবতাগণ তোমার থেকে উৎপন্ন হয়ে তোমার ভৃত্য হবে। প্রকৃত পক্ষে আমার (সদাশিবের) ভক্তই জগতের সর্বত্র স্থিত হয়ে শাসন করে, সেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করাই আমার উদ্দেশ্য ॥ ১৫-১৬ ॥
আবার তোমার মাহাত্ম্য বৃদ্ধিকারী পাদ্ম ইত্যাদি কল্পের কাহিনী সকল বৈষ্ণবীয় পুরাণে বর্ণিত হবে, সেই পুরাণে বিষ্ণু মাহাত্ম্য বর্ণিত হবে। ঐ নির্দিষ্ট কল্পে বিষ্ণুর অধীন হবে ব্রহ্মা, হর ও গৌরী সহ সকল দেবদেবী, ফলে বৈষ্ণবেরা ভ্রমিত হয়ে তোমাকেই একমাত্র শ্রেষ্ঠ ও শিব সহ অনান্য দেবদেবীদের তোমার অধীন বলে চিহ্নিত করবে। ফলে তারা কর্মের অধীন হয়ে সংসারের দুঃখ ভোগ করতে থাকবে ॥ ১৭-২০ ॥
বিষ্ণু বললেন, প্রভু ত্রিদেবজনক ! অম্বিকাপতি ! সদাশিব আপনাকে নমস্কার। আপনি তো সূর্যস্বরূপ, আর আমি কোথায় জোনাকির তুল্যও নই। তাহলে আপনি কেন আমার মতো তুচ্ছ পশুকে জগদীশ্বর বানাতে চাইছেন। আপনি পরমেশ্বর, আপনি পরমব্রহ্ম, আপনি পরমপুরুষোত্তম হয়েও নারায়ণস্বরূপ প্রকৃতিরূপ ধারণ করেন ॥ ২১-২৩ ॥
হে ত্র্যম্বক ! এতে অজ্ঞানী জীব আপনাকে জানতে সক্ষম হবে না, ফলে তারা আত্মজ্ঞানহীন হয়ে চিরকালই নরকে গিয়ে পড়বে। বেদের পরমতত্ত্ব একমাত্রই যে শিবতত্ত্ব, তা জানতে সক্ষম হবে না, এতে জগত মায়ায় মোহিত হয়ে বিষ্ণু আদি দেবতার শ্রেষ্ঠত্বের মোহে পড়ে নরকে গমন করবে, এমনকি আমি নিজেও অহংকারের বশীভূত হতে যেতে পারি। আমার এমন শ্রেষ্ঠত্বের দ্বারা কি লাভ হবে ? ॥ ২৪-২৬ ॥
আপনি প্রভু সর্বমঙ্গলকারী ! আপনার বচন নিঃসন্দেহে সত্য ! কারণ আপনি সনাতন ! আপনার বচন আগম নিগম ! পুরাণ ! আপনার বাণীই এই সমগ্র জগতের বিদ্যা বলে বিখ্যাত। কিন্তু হে প্রভু ! পুরাণ শাস্ত্রকে বেদের বিস্তারকারী ও মঙ্গলজনক ঘোষনা করেছে স্বয়ং বেদ। এখন যদি ঐ পুরাণ শাস্ত্রের মধ্যে বৈষ্ণবীয় পুরাণও গণ্য হয়, তবে আপনার বচন অনুসারে বৈষ্ণব পুরাণ দ্বারা সর্বদাই আমার ভক্তদের অধোগতির প্রাপ্তি হবে, এর ফলে আমার নিন্দা করবেন বিদ্বানেরা । আপনি আমাকে এই সংকট সমুদ্র থেকে উদ্ধার করুন, আমি আপনার চরণ দুটি আমার মস্তকে ধারণ করি ॥ ২৭-৩০ ॥
সদাশিব বললেন, হে বৎস ! তুমি অত্যন্ত প্রিয় কথা বলেছো, এই বিষয়ে একটি গূঢ় রহস্য বলছি, সাবধান হয়ে শোনো । এই জগত মায়া দ্বারা আমিই আমার মধ্যেই সৃজন করে আমিই ব্রহ্মা, বিষ্ণু, রুদ্র, অম্বিকা, দেবতা, মনুষ্যাদি সকল স্থাবর জঙ্গমাদি রূপে ভিন্ন ভিন্ন রূপে স্থিত হয়ে নিজের একরূপের সহিত অন্যরূপের সম্পর্ক মায়া দ্বারা প্রস্তুত করেছি ॥ ৩১-৩৩ ॥
মায়া দ্বারা ঐ জীব সকলকে তাদের দ্বারা শুভ অশুভ কর্ম করিয়ে তাদের কর্মফল ভোগের জন্য স্বর্গ নরকে পাঠিয়ে দিন, ভোগ শেষ হলে মর্তে পাঠিয়ে দিই। এই মায়া থেকে মুক্তি পাবার উপায় হল শিবজ্ঞান, শিবজ্ঞান লাভের জন্য শিবভক্তি একমাত্র উপায়, শিব ভক্তি শিব সম্পর্কিত কোনো কার্য করলে তবেই শিবভক্তি জন্মায় হৃদয়ে ॥ ৩৪-৩৬ ॥
কিন্তু যারা শিবকে জানতে সক্ষম নয়, শিবে আগ্রহী নয়, তাদের পূর্ণ মুক্তি লাভের জন্য বহু জন্ম ঘুরে ভ্রমিত হয়ে কোনো এক জন্মে শিবের প্রতি আকর্ষণ জন্মায়, অতঃপর মুক্তির পথে উপনীত হয়ে শিবে লীন হন ॥ ৩৭-৩৮ ॥
হে বিষ্ণু ! তোমার মহিমা প্রকাশে আমার ভক্তেরই মহিমা প্রকাশিত হবে, এতে আমারই আনন্দ লাভ হয়। আবার এর দ্বারা আমার থেকে জীবের দূরত্ব তৈরি হলে আত্মজ্ঞান হীন হয়ে মায়াবশত শিবনিন্দা করে বিষ্ণু শ্রেষ্ঠ ভেবে নরকে পতিত হবে, পুনরায় মর্ত্যে উপস্থিত হয়ে স্বর্গলাভ করবে, স্বর্গ ভোগের পর আবারো মর্ত্যে জন্ম নেবে। এভাবেই আত্মজ্ঞান হীন হয়ে বারংবার জন্ম-মৃত্যুর চক্রে আবদ্ধ হয়ে সৃষ্টিচক্রকে এগিয়ে নিয়ে যেতে থাকবে ॥৩৯-৪২ ॥
তাই আমার রুদ্র অবতার ঐ সকল কল্পে তোমার কৃপায় জীবিত থাকবার লোকাচার পালন করবে। জগতে তোমার মাহাত্ম্য বৃদ্ধি জন্য রুদ্রদেব তোমার কাছে পরাজিত হবেন। তা দেখে জ্ঞানহীনেরা আমাকে নিকৃষ্ট বলে ভাববে॥ ৪৩-৪৪ ॥
প্রত্যেক কলিযুগ উপস্থিত হলে বেদ বিরুদ্ধ কাল্পনিক মত দ্বারা বেদকে দূষণকারী বৈষ্ণব উৎপন্ন হবে, তারা শিবদ্বেষী হবেন, অসত্য মত উপস্থাপন করে বেদের বিপরীত মত প্রচার করবেন। কখনো কখনো বেদের নিন্দা করে নিজেদের স্বকল্পিত মতকে শ্রেষ্ঠ বলবে ॥ ৪৫-৪৬ ॥
বৈষ্ণবদের আধিক্যের ফলে সমাজে বৈষ্ণবদের মত একমাত্র ধর্ম বলে চিহ্নিত হবে, তারা ছলনার আশ্রয় নিয়ে সবরকমভাবে আমার নিন্দা করবে। আত্মজ্ঞানশূণ্য হয়ে অদ্বৈতজ্ঞানের বিরুদ্ধে দাস্যভাব প্রচার করবে, তারা অপকর্ম করবে, বৈড়ালব্রতী হবে, অগম্য গমন করবে। শৌর্য, বীর্যহীন হয়ে নপুংসক হয়ে ধূর্ততার আশ্রয় নিয়ে অধর্মকে ধর্ম বলে চিহ্নিত করবে, শৈবদের নিন্দা করে ভৈরব বীরভদ্র কালীর কাছে শাস্তি প্রাপ্ত হবেন। এভাবে বিশ্বের সর্বত্র ধর্মের রূপ পরিবর্তিত হয়ে অধর্ম হতে থাকবে। আর এই অধার্মিকদের কর্মফল ভোগের দ্বারাই বারংবার জন্ম-মৃত্যুর মাধ্যমে সৃষ্টি চক্র চলতে থাকবে ॥ ৪৭-৫২ ॥
পূর্বকালে একবার রুদ্র আমার কাছে বরদান চেয়ে বলেছিলেন, “হে প্রভো সদাশিব আমার এই রুদ্রের নাম, রূপ, অস্ত্র মহিমা যেন আপনার সমান হয়, আমার পূজার মাধ্যমেই যেন আপনার শিবপূজা সম্পন্ন হয়” তখন আমি তাকে ‘এবমস্তু (এমনই হবে)’ বলেছিলাম। তখন থেকেই রুদ্র আমার রূপে পূজিত হন, আমার শিবলীলাও রুদ্রের মাধ্যমে ঘটে থাকে, আবার ঐ রুদ্রদেবই প্রতি কল্পে আমার আদেশ মতোই কার্য করেন, তিনি সর্বদাই আমার ধ্যান করেন। কিন্তু অজ্ঞানতার কারণে পশুগণ এই বিষয়ে অজ্ঞাত হয়ে রুদ্র ও শিবের মধ্যে পরমার্থ ও ব্যবহারিক বিচার করতে অক্ষম হবে ॥ ৫৩-৫৮ ॥
তবে হে হরে ! এদের উদ্ধার করবে আমার জ্ঞানী ভক্তরাই করবে। আমার জ্ঞানী ভক্তগণ হলেন এক একজন সাক্ষাৎ রুদ্ররূপ। তাই আমার আত্মজ্ঞানী ভক্তদের জ্ঞানদৃষ্টি করে সম্মান প্রদর্শন হতে দেখলে আমি অত্যন্ত আনন্দিত হই। কারণ, শৈবদের জন্যই ধর্ম টিকে আছে, যতদিন জগতে আমার ভক্ত শৈব বর্তমান আছে, ততদিন ধর্ম টিকে থাকবে, বেদ টিকে থাকবে, আমার শিবধর্ম টিকে থাকবে, সনাতন শৈবধর্মই সর্বোত্তম, কারণ ইহাই অদ্বৈত জ্ঞানের মার্গ। অদ্বৈত জ্ঞান একমাত্র আমাকেই বোধ করায় ॥ ৫৯-৬৩ ॥
আবার এই কারণে ভবিষ্যতে আমার স্বরূপ তুমিই বিভিন্ন অবতার নিয়ে পৃথিবীতে আমার সনাতন শৈবধর্মকেই যুগে যুগে রক্ষা করবে। তোমার সহায়তার জন্য আমি আমার বিভূতিদের পাঠিয়ে তোমার কার্য সিদ্ধ করবো, প্রত্যেক অবতারে আমার ভজনা করে তুমি সেই শৈবধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করবে, যাতে সকলে জানতে পারে তাদের হৃদয়ে আমিই সমান ভাবে সদা বিরাজিত। আমি ভিন্ন কোথাও অন্য আর কিছু মাত্র নেই ॥ ৬৪-৬৭ ॥
কিন্তু এখন সকলে সহজেই আমাকে জেনে গেলে আমার এক থেকে দ্বিতীয় হবার ইচ্ছার মূল্য থাকবে না। সকলেই সহজেই মোক্ষলাভ করে নেবে। তাই এই কারণে, এখন তুমি জগতকে মায়ায় মোহিত করবার জন্য অবশ্যই নির্দিষ্ট কল্পে জগদীশ্বর হিসেবে পরিচিত হবে। হরে ! তাই আমার এই লীলায় কিছুমাত্র সংশয় নেই। সমগ্র জগতের সকলকিছু শিবময় জেনে তুমি নিশ্চিন্ত হও ॥ ৬৮-৭০ ॥
আমি বৈষ্ণবীয় পুরাণ এর মধ্যেও গুহ্যরূপে বিন্দু আকারে কিছু আমার শিবমাহাত্ম্য কে প্রকাশ করবো, ফলে পুরাণের মর্যাদা ও বেদের বাণীর মর্যাদা রক্ষা হবে। যারা প্রকৃত তত্ত্বজ্ঞ তারা বৈষ্ণবীয় পুরাণেও শিবতত্ত্বের উৎকৃষ্টতা অবগত হয়ে মোক্ষ লাভ করবেন। তুমি এবিষয়ে চিন্তিত হয়ো না ॥ ৭১-৭৪ ॥
💥আরেকটি প্রমাণ দেখুন,
🔖বিশ্লেষন -
রুদ্র আর সদাশিব বিষয়ে বৈষ্ণবেরা সর্বদাই অজ্ঞ, তাঁরা বৈষ্ণব পুরাণে বা বিষ্ণু মাহাত্ম্যে পরিপূর্ণ ইত্যাদি পুরাণের মধ্যে রুদ্র দ্বারা বিষ্ণুকে স্তুতি করতে দেখে ধারণা করে যে বিষ্ণু একমাত্র শ্রেষ্ঠ, বিষ্ণুর কাছে রুদ্র কে পরাজিত হতে দেখে মনে করে যে শিব পরাজিত হয়েছেন, এই কারণে বৈষ্ণবেরা আনন্দে দিশেহারা হয়ে ভাবতে থাকেন যে, বিষ্ণু সর্বশক্তিমান। অথচ, এমন ভাবনাকারী ব্যক্তি যে আসলেই মায়ায় আচ্ছন্ন, তা প্রমাণ করছে সকল পুরাণের মীমাংসা গ্রন্থ পৌরাণিক সংহিতা, যেখানে পুরাণের বিভিন্ন কাহিনির মীমাংসা রয়েছে, সাক্ষাৎ পরমেশ্বর শিবের আরাধনা করে সাবর্ণি মুনি এই মহান গ্রন্থ প্রকট করতে পেরেছিলেন। বিভিন্ন পুরাণে বিভিন্ন কাহিনী আছে, কিন্তু তার মধ্যে বিভ্রান্তি যাতে সৃষ্টি না হয় তার জন্য এটি সৃষ্টি হয়েছে, এটি শৈব আগম শাস্ত্র হওয়ায় এটি বেদ সম্মত বলেও জানতে হবে। কারণ, বেদের ১০৮ উপনিষদের মধ্যে অন্নপূর্ণা উপনিষদ শৈব আগম শাস্ত্র কে সকল শাস্ত্রের অন্তিম সিদ্ধান্ত প্রদাতা হিসেবে ঘোষণা করেছে, প্রমাণ দেখুন -
শিবঃ শৈবাগমস্থানাং কালঃ কালৈকবাদিনাম্ ।
যৎসর্বশাস্ত্রসিদ্ধান্তং যৎসর্বহৃদয়ানুগম্ ॥২১॥
[অথর্ববেদ/অন্নপূর্ণা উপনিষদ/অধ্যায়-৩/মন্ত্র-২১]
✅ অর্থ — পরমেশ্বর শিবের শৈব আগম হল সমস্ত শাস্ত্রের (যৎসর্বশাস্ত্রসিদ্ধান্তম্) চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত (উপসংহার) এবং এটি প্রতিটি যুগের প্রতিটি ব্যক্তির হৃদয়ের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ।
🔥ব্যাখ্যা — শৈব আগম সমস্ত শাস্ত্রের মধ্যে সর্বোত্তম, সাক্ষাৎ বেদশাস্ত্র একথা স্বীকার করেছে, সুতরাং যারা শৈব আগম অমান্য করে অর্থাৎ বেদশাস্ত্রের প্রমাণ দেখার পরেও শৈব আগম মানতে অস্বীকার করে তারা সনাতনী নয়।
তাই, আগম বচন যেহেতু বেদ সম্মত, পুরাণের মধ্যেও মীমাংসিত, তাই পরমেশ্বর শিবের ক্ষমতা অক্ষুন্ন বলেই প্রমাণিত হল। বেদ বচন দিয়ে এই খণ্ডন পর্বের ইতি টানবো।
🔷বেদ বলছে শিবের থেকে কেউ অধিক বলবান নেই -
অর্হন্ বিভৰ্ষি সায়কানি ধন্বার্হন্ নিষ্কং যজতং বিশ্বরূপম্ ।
অর্হন্নিদং দয়সে বিশ্বমভ্বং ন বা ওজীয়ো রুদ্র ত্বদস্তি ॥ ১০ ॥
[ঋগ্বেদ/শাকল শাখা/২য় মণ্ডল/৩৩ নং সূক্ত/১০নং মন্ত্র]
🔥 অর্থ – হে রুদ্রদেব ! আপনি বাণ ও ধনুক ধারণ করে থাকেন, হে পূজনীয় প্রভু ! আপনিই বহুরূপে একমাত্র বিশ্বরূপধারী।আপনিই সমস্ত বিশ্বভুবনের রক্ষাকর্তা, আপনার চেয়ে অধিক বলবান কেহই নেই ॥ ১০
বেদ বচন অনুযায়ী, পরমেশ্বর শিব বিষ্ণু সহ সকল দেবদেবীর থেকেও শক্তিমান বলে প্রমাণিত হয়েছে। তাই কিছু কাহিনীর ভিত্তিতে শিবকে বিষ্ণুর অধীন ভাবা - জ্ঞানের অপরিপক্কতা মাত্র।
বৈষ্ণবদের করা দাবী -
____________________________________________________________________________________
সিদ্ধান্ত
বৈষ্ণবদের শাস্ত্রজ্ঞানহীনতা সহ ভণ্ডামি খণ্ডিত হবার সাথে সাথে সমগ্র শাস্ত্র প্রমাণের দ্বারা শ্রী বিষ্ণু শিব কৃপায় জগতে পূজিত হন ও একমাত্র পরমেশ্বর প্রভু শিবই সর্বশক্তিমান বলে প্রমাণিত হল।
____________________________________________________________________________________
শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তে 🚩
হর হর মহাদেব 🚩
✍️ সত্য উন্মোচনে — শ্রী নন্দীনাথ শৈব আচার্য জী
©️ কপিরাইট ও প্রচারে — Shivalaya


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন