ঋগ্বেদীয় শিবসঙ্কল্প সূক্তকে বিষ্ণুর বলে আকাশকুসুম দাবী করা বৈষ্ণবদের অজ্ঞানতা ফাঁস



🔰 ভূমিকা - 

কিছু নব্য বৈষ্ণবের আগমন হয়েছে যারা নিজেদের রামানুজের অনুসারী দাবী করে, এদের উদ্দেশ্য হল ভগবান বিষ্ণুর শ্রেষ্ঠত্বের নামে পরমেশ্বর শিব ও শক্তিকে অপমান করা। বৈষ্ণবেরা নিজেদের আরাধ্য বিষ্ণুর শ্রেষ্ঠত্বের অহংকার বজায় রাখবার জন্য পরমেশ্বর শিবকে ‘অক্ষম’ প্রমাণ করবার জন্য শাস্ত্রের মীমাংসা না জেনেই আক্ষরিক অর্থ কে সর্বোপরি বলে মেনে নেয়। এই সকল বৈষ্ণবদের একটি ফেসবুক পেজ রয়েছে যার নাম “বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ”। এরা বেদের মধ্যে উল্লেখ থাকা পরমেশ্বর শিবের স্পষ্ট শব্দপ্রমাণ কে পর্যন্ত অপব্যাখ্যা করে নিজেদের দুর্বলতা ঢাকবার আপ্রাণ প্রয়াস করে । সেই নরকের কীটেরা আমাদের পরমেশ্বর শিবকে নিকৃষ্ট প্রমাণ করতে উদ্দ্যত হয়েছে, আর শিবের নামকে অপযুক্তি দিয়ে বিষ্ণু বলে দাবী করে অপপ্রচার করছে। দেখুন এই ভণ্ড বৈষ্ণবদের দাবিগুলির বাস্তবিকতা কতটা গ্রহণযোগ্য তা এবার আলোচনা করা হল।

____________________________________________________________________________________


 🔻 “বৈষ্ণব কতৃক শিবসঙ্কল্প সুক্ত নিয়ে বালখিল্য অপপ্রচার এর জবাব। পাণিনী অষ্টাধ্যায়ী, পূর্বমীমাংসা ও পঞ্চাবয়বী ন্যায় অনুসারে বৈষ্ণবদাবীর খণ্ডন”—


🚫 ভণ্ড বৈষ্ণবদের মূল দাবি, বৈষ্ণবরা বলে যে—

শিবসংকল্পসূক্তে ক্রম লেখা আছে- “ব্রহ্মা → হরি → শিব” কিন্তু, পাঠক্রমকে মান্য করা উচিত নয়। তাদের যুক্তি- অন্যান্য শ্রুতি যেমন নারায়ণ অনুবাক, শতপথ ব্রাহ্মণ, মহোপনিষদ ইত্যাদি নারায়ণকে সর্বোচ্চ বলেছে। তাই ক্রমিকভাবে শিবকে সর্বোচ্চ মানা ভুল, পাঠক্রমকে বাতিল করতে হবে এবং নারায়ণকে সর্বোচ্চ স্থাপন করতে হবে। “দূর্জনতোষ ন্যায়” অনুযায়ী যদিও বৈষ্ণবদের দাবী গ্রহণ করা হয়, তারপরেও তাদের এই দাবী অপ্রাসঙ্গিক।

শাস্ত্র বলে- “বাক্যনিয়মাৎ” [পূর্বমীমাংসা ১/২/৩২]।

“বাক্যনিয়মাৎ” অর্থাৎ বাক্যের নিজের গঠন, ক্রম ও সংযোগই অর্থ নির্ধারণ করে।

শিবসংকল্পসূক্ত এক বাক্য, এক ক্রম, এক যুক্তির কাঠামো। অর্থাৎ- ব্রহ্মা → হরি → শিব ক্রমটি কেবল সাজানো নয়, এটাই বাক্যের অর্থবাহী ধারা। তাই, পাঠক্রমকে বাতিল করা যাবে না, কারণ এটি বাক্য অনুযায়ী সঠিক অর্থ প্রকাশ করছে। একই প্রসঙ্গে মহর্ষি জৈমিনি বলছেন—

“অবিরুদ্ধম্‌ পরম্‌” [পূর্বমীমাংসা ১/২/৪৪] - যে ব্যাখ্যা গ্রহণ করা হচ্ছে, তা যদি বেদের স্পষ্ট পাঠ, বাক্যরীতি ও যুক্তির সঙ্গে বিরোধ না করে, তবে সেই ব্যাখ্যাই গ্রহণযোগ্য।

এখানে বাস্তব অবস্থা কী? শিবসংকল্পসূক্তে স্পষ্টভাবে পাঠ আছে- ব্রহ্মা < হরি < শিব।  এই তিনের ক্রম ও পৃথক উল্লেখ পাঠগতভাবে স্পষ্ট, শব্দগতভাবে স্বতন্ত্র কোনো দ্ব্যর্থতা নেই। এই পাঠকে যথার্থ অর্থে গ্রহণ করলে- কোনো বৈদিক বিধি নষ্ট হয় না। কোনো যুক্তিবিরোধ সৃষ্টি হয় না। কোনো কর্ম বা উপাসনাবিধি ভেঙে পড়ে না। তাই, এই পাঠের স্বাভাবিক অর্থ অবিরুদ্ধ।

বৈষ্ণব ব্যাখ্যার সমস্যা হলো, বৈষ্ণব পক্ষ বলছে—
“অন্যত্র নারায়ণকে সর্বোচ্চ বলা হয়েছে, তাই এখানে পাঠের ক্রম গ্রহণ করা যাবে না।”
কিন্তু, এটি শিবসংকল্পসূক্তের নিজস্ব বাক্যবিরোধ সৃষ্টি করছে। মন্ত্রের স্পষ্ট পাঠকে অগ্রাহ্য করছে। বাইরের শ্রুতির দোহাই দিয়ে ভিতরের অর্থ ভাঙছে। তাই বৈষ্ণবীয় এই ব্যাখ্যাই অবিরুদ্ধ নয়, বরং বিরুদ্ধ। অতএব ‘অবিরুদ্ধম্‌ পরম্‌’ সূত্রানুসারে শিবসংকল্পসূক্তের স্বাভাবিক অর্থই গ্রহণযোগ্য, বৈষ্ণব ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য নয়।

এবং শাস্ত্র আরও বলে- “শাস্ত্রদৃষ্টবিরোধাচ্চ” [পূর্বমীমাংসা ১/২/২]।।

এই সূত্র বলে যে- যেসব অংশ কর্ম নির্দেশ করে না বা যুক্তি/প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার সঙ্গে বিরোধী, সেগুলো অনিত্য বা অনর্থক।

শিবসংকল্পসূক্ত এমন কোনো বিরোধ সৃষ্টি করে না।
বরং এটি মনঃসংকল্প ও ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠত্বের বিষয়, যা সম্পূর্ণ যৌক্তিক। কেননা, শাস্ত্র নিজেই পরশিবের সর্বশ্রেষ্ঠতার সাক্ষ্য দেয়। তাই, শিবসংকল্পসূক্তকে বাতিল করার কোনো কারণ নেই।

🔹 “ক্রমকোপ ন্যায়” [পূর্বমীমাংসা ৫/৪/১] -ক্রমকোপ ন্যায় প্রযোজ্য হয় তখন, যখন- পাঠের ক্রম কেবল রীতিমতো সাজানো। ক্রমে অর্থবৈপরীত্য বা দ্বন্দ্ব, এবং বিকল্প ক্রম থাকতে পারে।

কিন্তু শিবসংকল্পসূক্তে- ক্রমটি তত্ত্বগত শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করে। কোনো দ্বন্দ্ব বা বিকল্প নেই। তাই ক্রমকোপ ন্যায় এখানে প্রযোজ্য নয়। পাঠক্রম বাতিল করা যাবে না।

এছাড়াও, এই সূত্রের প্রকৃত প্রয়োগক্ষেত্র হলো কর্মকাণ্ডীয় বিধিবাক্য, যেখানে একই কর্মের একাধিক অঙ্গের সম্পাদনক্রম নিয়ে সংশয় থাকে।

যেমন—
হোম আগে না পাক আগে?
আশ্বিন গ্রহ তৃতীয় না দশম?

এই ন্যায়ের উদ্দেশ্য হলো কার্যসম্পাদনের ক্রম নির্ধারণ, তত্ত্বগত শ্রেষ্ঠত্ব নয়। কিন্তু,  শিবসংকল্পসূক্ত কোনো বিধিবাক্য নয়, কোনো কর্মনির্দেশ নয়, কোনো প্রয়োজ্য ক্রিয়াক্রমও নয়। এটি একটি জ্ঞানমূলক, স্তোত্রাত্মক, তত্ত্বনির্ণায়ক সূক্ত।
অতএব, এখানে “ক্রমকোপ” ন্যায় প্রয়োগ করা অর্থ-  কর্মতত্ত্বের ন্যায়কে ব্রহ্মতত্ত্বে আরোপ করা, যা পূর্বমীমাংসার ভাষায় স্পষ্ট অধিকারভ্রংশ।

কিছু শ্রুতি যেমন নারায়ণ অনুবাক, শতপথ ব্রাহ্মণ ইত্যাদি নারায়ণকে সর্বোচ্চ বলে। কিন্তু, এগুলো স্বতন্ত্র প্রসঙ্গের, শিবসংকল্পসূক্তের সঙ্গে কোনো দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে না। শাস্ত্র বলে, যদি দুটি শাস্ত্রই নিজস্ব প্রেক্ষাপটে সঠিক, তবে একটির দ্বারা অন্যটি বাতিল তো করা যায় না। পক্ষান্তরে অন্যান্য শাস্ত্রের সাহায্যে বাক্যের তাৎপর্য নির্ধারণ করতে হয়। আর “নারায়ণসুক্ত” আদিতে পরমতত্ত্ব যে, পরশিব তা পূর্বে বহুবার শাস্ত্র সিদ্ধান্ত দ্বারা প্রমাণিত ও স্থাপিত করা হয়েছে। তাই, শিবসংকল্পসূক্তের ক্রম নারায়ণ-শ্রুতির কারণে বাতিল হবে না।

♦️ শ্রুতিতে নারায়ণ বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে, তা জানতে নিচের লিংকে ক্লিক করুন— 

১. https://issgt100.blogspot.com/2025/08/blog-post_16.html

২. https://www.facebook.com/share/p/17YXE4BEoV/

♦️ মহো উপনিষদ মীমাংসা—

১. https://issgt100.blogspot.com/2025/03/blog-post_16.html

২. https://issgt100.blogspot.com/2025/05/blog-post_24.html


শিবসংকল্পসূক্তের ক্রম বাস্তব ও অর্থবাহী। ক্রমকোপ ন্যায় বা অন্যান্য শ্রুতির কারণে এটি বাতিল করা যাবে না। শিবসংকল্পসূক্তের ক্রম শ্রেষ্ঠত্বের তাত্ত্বিক ধারাকে প্রকাশ করে।

সংক্ষেপে সহজ উদাহরণ দ্বারা বুঝুন—

ধরে নিন- একজন শিক্ষক লিখলেন—
“ছাত্র → সহকারী → প্রধান”।।

এটি শুধু সাজানোর জন্য নয়, এই ক্রমই কাজের এবং দায়িত্বের ক্রম নির্দেশ করছে। কেউ বলে- “না, প্রধান সর্বদা প্রথম হবে” এই যুক্তি তখন প্রযোজ্য নয়, কারণ প্রেক্ষাপট আলাদা। একইভাবে- ব্রহ্মা → হরি → শিব ক্রম শিবসংকল্পসূক্তের অর্থবাহী এবং শাস্ত্রসম্মত।

👉 এবার উক্ত মন্ত্রের ব্যাকরণগত ব্যাখ্যা দেখে নেওয়া যাক—

“পরাৎপরতরো ব্রহ্মা তৎপরাৎপরতো হরিঃ।
তৎপরাৎপরতো হ্যেষ তন্মে মনঃ শিবসংকল্পমস্ত” ॥

[ঋগবেদ আশ্বলায়ন শাখা/১০/১৭১/১৮ ও ঋগবেদ খিলানি /৪/১১ এবং শিবসংকল্প উপনিষদ]

👉 এখানে তিনটি তুলনাক্রমিক পদ সুস্পষ্ট—

“পরতরো ব্রহ্মা”।

“তৎপরাৎপরতো হরিঃ”।

“তৎপরাৎপরতো ঈশ (অধীশঃ/শিবঃ)”।

এখন দেখা যাক, এগুলি ব্যাকরণে কীভাবে বাধ্যতামূলক অর্থ বহন করছে।

👉 পাণিনী অষ্টাধ্যায়ী অনুযায়ী—

“দ্বিবচনবিভেজ্যোপপদে তরবীযসুনৌ”।।
[পাণিনী অষ্টাধ্যায়ী ৫/৩/৫৭]

সূত্রার্থ (ভাষ্যসমন্বিত) কাশিকা, সিদ্ধান্তকৌমুদী ও মহাভাষ্য অনুযায়ী—

দুটি পৃথক অর্থবস্তুর মধ্যে বিভজ্য উপপদ (যার থেকে তুলনা করা হচ্ছে) উপস্থিত থাকলে, অতিশয় (উৎকর্ষ/অধিকত্ব) বোঝাতে তর ও ইযসুন্‌ প্রত্যয় অনিবার্যভাবে ব্যবহৃত হয়।

এই কারণেই শিবসংকল্পসূক্তে ব্যবহৃত পরতর, তৎপরাত্ পরঃ ইত্যাদি শব্দসমূহকে “পাঠক্রমমাত্র” বলে উড়িয়ে দেওয়া ব্যাকরণগতভাবে অসম্ভব।

👉 কাশিকা স্পষ্ট বলছে— “অযমনযোরতিশয়েনাঢ্যঃ….আঢ্যতরঃ” -অর্থাৎ, দু’জন ধনীর মধ্যে একজন অপরজনের তুলনায় অধিক ধনী হলে আঢ্যতর হবেই।

গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত- এটি কোনো অলংকার বা প্রশংসা নয়, এটি তুলনাবদ্ধ বাস্তব উৎকর্ষ।

👉 শিবসংকল্পসূক্ত অনুযায়ী—

১ম পদ— “পরতরঃ ব্রহ্মা”৷ এখানে পরতর = পর + তর।

অর্থ— পূর্ববর্তী কোনো “পর” সত্তার তুলনায় ব্রহ্মা অধিকতর।
অতএব- ব্রহ্মা কারও তুলনায় পরতর। তিনি সর্বপ্রথম স্তর।

২য় পদ— “তৎপরাৎপরতো হরিঃ”।

“তৎপরাৎ” অর্থ- “সেই পরতর ব্রহ্মা থেকে”।

“পরো হরিঃ” অর্থ- “হরি সেই ব্রহ্মার তুলনায় অধিকতর পর”।

এখানে (৫/৩/৫৭) অনুযায়ী—

দুটি পৃথক সত্তা- ব্রহ্মা ও হরি।

বিভজ্য উপপদ- তৎপরাৎ।

অতিশয় বোঝাতে পর (তরার্থে ব্যবহৃত)।

ব্যাকরণগত বাধ্যতা হরি ব্রহ্মার তুলনায় শ্রেষ্ঠ। এটি অমান্য করার কোনো ব্যাকরণিক সুযোগ নেই।

৩য় পদ– “তৎপরাৎপরতো ঈশ (অধীশঃ/শিবঃ)”।

এখানে তৎপরাৎ আবার ব্যবহৃত। কিন্তু, এই “তৎ” এখন হরি। পরন্তঃ = পর + অন্ত (অতিশয়ান্ত)।

কাশিকা ও মহাভাষ্য অনুযায়ী- একই সূত্রে ধারাবাহিক অতিশয় সম্ভব, এবং তা তত্ত্বগত ক্রম তৈরি করে।
অতএব- শিব হরির তুলনায়ও অধিকতর শ্রেষ্ঠ।

👉 এই প্রসঙ্গে পাণিনী আরও বলেন—

“পঞ্চমী বিভক্তে”।।
[পাণিনী অষ্টাধ্যায়ী ২/৩/৪২]

সূত্রার্থ (ভাষ্যসমন্বিত) কাশিকা ও মহাভাষ্য উভয়েই বলেন—

যেখানে নির্ধারণমূলক তুলনা এবং যেখানে বিভাগ (ভেদ) নিত্য, সেখানে পঞ্চমী বিভক্তি অপরিহার্য।

উদাহরণ—

“মাথুরাঃ পাটলিপুত্রকেভ্যঃ আঢ্যতরাঃ”।।

পঞ্চমী বিভক্তি থাকলে তুলনা আবশ্যিক ও নির্দিষ্ট। শিবসংকল্পসূক্তে- “তৎপরাৎ” পঞ্চমী বিভক্তি, বারংবার ব্যবহৃত। মহাভাষ্যের সিদ্ধান্ত- যেখানে ভেদ নিত্য নয়, সেখানে পঞ্চমী হয় না।
অতএব- এখানে ভেদ নিত্য ও বাস্তব কল্পিত বা অলংকারিক নয়।

তাই এখানে, ব্রহ্মা ও হরি এক নয়। হরি ও শিব এক নয়। এবং এই ভেদ শ্রেষ্ঠত্বগত। এর অর্থ- ব্রহ্মা, হরি, শিব তিনজন একই সত্তার ভিন্ন নাম নয়। এদের মধ্যে ক্রমগত শ্রেষ্ঠত্ব আছে। এই ভেদ চিরন্তন (নিত্য), উপাধিনির্ভর নয়। যেহেতু শাস্ত্রে এখানে পঞ্চমী বিভক্তি ব্যবহার হয়েছে, তাই মহাভাষ্যের নিয়ম অনুযায়ী এই ভেদ কল্পিত হতে পারে না, এটি বাস্তব ও নিত্য। 
এই প্রসঙ্গে মহর্ষি জৈমিনি বলেন-

“গুণাদবিপ্রতিষেধঃ স্যাৎ” [পূর্বমীমাংসা ১/২/৪৭] - কোনো বাক্যের মুখ্য অর্থ গ্রহণ করলে যদি বাস্তব বিরোধ সৃষ্টি হয়, তখনই গৌণার্থ (রূপক/অলংকারিক অর্থ) গ্রহণ করা যাবে।

তাহলে, এখানে কি মুখ্য অর্থে বিরোধ হচ্ছে? শিবসংকল্পসূক্তের মূখ্য অর্থ নিলে- তিন তত্ত্বের পার্থক্য স্বীকার করা হয়। তাদের মধ্যে স্তর বা শ্রেষ্ঠত্বগত ভেদ বোঝানো হয়। এতে কোনো বেদবাক্য অসত্য হয়ে যাচ্ছে না। কোনো বিধি নষ্ট হচ্ছে না। কোনো অনিবার্য যুক্তিবিরোধ না। তাই, মুখ্য অর্থে কোনো বিরোধ নেই।

তাহলে প্রশ্ন করা যায় যে- তাহলে গৌণার্থ নেওয়ার অধিকার আছে কি? উত্তর হলো- নেই। কারণ- গৌণার্থ কেবল বাধ্য হলে নেওয়া হয়। এখানে কোনো বাধা নেই বরং গৌণার্থ নিলে পাঠ ও বাক্যরীতি ভেঙে যায়।  তাই, “গুণাদবিপ্রতিষেধঃ স্যাৎ” সূত্র অনুসারে- এখানে গৌণার্থ গ্রহণ নিষিদ্ধ, মুখ্য অর্থই চূড়ান্ত। সেই কারণেই ব্রহ্মা, হরি ও শিব এক নন এবং তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বগত ভেদ আছে।

👉 একই প্রসঙ্গে পাণিনী বলেন—

“হশি চ” (সন্ধি-প্রমাণ)।।
[পাণিনী অষ্টাধ্যায়ী ৬/১/১১৪]

এই সূত্র অনুযায়ী- হ-কার দ্বারা পরবর্তী শব্দ শুরু হলে
পূর্ববর্তী র-এর রু-আদেশ হয়।

কাশিকা উদাহরণ— পরতো অধীশঃ→ পরতোঽধীশঃ।।

এর তাৎপর্য- পরতো অধীশঃএকটি অখণ্ড বাক্য। এটি আলাদা দুইটি উক্তি নয়। তুলনাটি ধারাবাহিকভাবে যুক্ত
অতএব- এখানে “তালিকা” নয় বরং ক্রমবদ্ধ তুলনামূলক বাক্য।

👉 উপরের তিনটি সূত্র ও ভাষ্যের সমন্বিত প্রয়োগে সিদ্ধান্ত—

সূত্র (৫/৩/৫৭) দ্বারা প্রমাণিত- পরতর / পরঃ / পরন্তঃ অর্থ বাধ্যতামূলক অতিশয় তুলনা। সূত্র (২/৩/৪২) দ্বারা প্রমাণিত- তৎপরাৎ অর্থ নিত্য ভেদসহ তুলনা। সূত্র (৬/১/১১৪) দ্বারা প্রমাণিত যে, বাক্যটি অবিচ্ছিন্ন ও ক্রমান্বিত। পুরো মন্ত্রটি একটি অবিচ্ছিন্ন, যুক্তিসংগত ও ধারাবাহিক বাক্যরূপে গঠিত, যেখানে শব্দগুলোকে আলাদা করে ভেঙে অন্যরকম অর্থ করার কোনো সুযোগ নেই।

অতএব অষ্টাধ্যায়ী সিদ্ধান্ত হলো—

ব্রহ্মার চেয়ে হরি শ্রেষ্ঠ। হরির চেয়ে শিব শ্রেষ্ঠ। এটি পাঠক্রম নয়, ব্যাকরণবদ্ধ তত্ত্বক্রম। একে কোনো মীমাংসা-ন্যায় দিয়ে বাতিল করা অসম্ভব। এটি কোনো শৈব কল্পনা নয়- এটি পাণিনীয় ব্যাকরণ দ্বারা বাধ্যতামূলকভাবে নিষ্পন্ন সিদ্ধান্ত।



বৈষ্ণবদের এই অপ্রাসঙ্গিক দাবীর কোনো যৌক্তিকতা হয় না। কেননা, তাদের এই দাবী যদি মানা হয় তবে শ্রুতিতে পরমেশ্বর শিবের শ্রেষ্ঠতা নিয়ে যেসব বেদ বাক্য সব মিথ্যা হয়ে যাবে। 
তাই, বৈষ্ণবদের এই দাবী ছলনার প্রকাশ মাত্র।

✅ শ্রুতি কতৃক পরশিবের শ্রেষ্ঠত্ব, অদ্বিতীয়তা ও অতুলনীয়তা—

শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে বলা হয়েছে— 

“এক হি রুদ্র ন দ্বিতীয়ায় তস্থুর্য ইমাঁল্লোকানীশত ঈশানীভিঃ” [শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ/৩/২] -অর্থাৎ শিবই একমাত্র পরমেশ্বর দ্বিতীয় কেউই নেই। সেই একামত্র রুদ্রই নিজ ইচ্ছা শক্তি দ্বারা সমগ্র মহাবিশ্বের শাসন করেন। কারো সহায়তা ছাড়াই অনন্ত জগতের সৃষ্টি করেন, পালন করে ও অন্তে ধ্বংসও করেন। ব্রহ্মসূত্রের “জন্মাদ্যস্য যতঃ” (১/১/২) সূত্রের ব্রহ্মের সংজ্ঞা প্রতিপাদন করতে গিয়ে মহর্ষি বেদব্যাস এটাই বলেছেন যে- যিনি এই অখিল ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি, স্থিতি ও লয় করেন তিনিই একমাত্র পরমেশ্বর। সুতরাং, শ্রুতিও একই অর্থ প্রতিপাদন করেন শিবই একমাত্র পরমেশ্বর। এবং পরমেশর শিবকে নিয়ে শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ বলে- “নৈনমুর্দ্ধং ন তির্য্যঞ্চং ন মধ্যে পরিজগ্রভৎ। ন তস্য প্রতিমা অস্তি যস্য নাম মহদ্ যশঃ”।। (শ্বেতা ৪/১৯) অর্থাৎ- “সেই পরমেশ্বর শিবকে ঊর্ধ্বে, তির্যকে বা মধ্যেও কেউ ধারণ করতে পারে না। যাঁর নাম মহিমাময় ও যশস্বী সে পরমেশ্বর শিবের কোনো তুলনা নেই। সুতরাং, সাধারণ ভাবেই বলতে গেলে সেই পরমেশ্বর শিবই সর্বোচ্চ সত্ত্বা যার কোনো তুলনা নেই। তাই, শিবসংকল্প সূক্তে ব্রহ্মা, বিষ্ণু সকলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ হলো অতুলনীয় সেই অদ্বিতীয় পরমেশ্বর শিব। 

👉 এছাড়াও অন্যান্য শ্রুতি শাস্ত্রও একসাথে সাক্ষ্য দিয়ে বলে শিবই সকলের শ্রেষ্ঠ ও পরম ধ্যানের বিষয়—

যঃ শুক্র ইব সূর্যো হিরণ্যম্ ইব রোচতে। শ্রেষ্ঠো দেবানাং বসুঃ॥
[ঋগবেদ ১/৪৩/৫]

যিনি সূর্যের মতো দীপ্তিমান, স্বর্ণের মতো জ্যোতির্ময়, তিনিই দৈবতত্ত্বের মধ্যে শ্রেষ্ঠ এবং সকল ঐশ্বর্যের অধিপতি।।

শ্রেষ্ঠো জাতস্য রুদ্র শ্ৰিয়াসি ত্বস্তমস্তবসাং বজ্রবাহো।।
[ঋগবেদ ২/৩৩/৩]

হে বজ্রবাহু রুদ্র! তুমি সবার মধ্যে শ্রেষ্ঠ, তুমি তেজস্বীদের ও ঐশ্বর্যধারীর মধ্যেও সর্বোচ্চ।

ঈশানাদস্য ভুবনস্য ভূরে র্ন বা উ যোষদ্‌রুদ্রাদসুর্যম্॥
[ঋগবেদ ২/৩৩/৯]

রুদ্র এই সমগ্র ভুবনের অধীশ্বর, রুদ্র ব্যতীত আর কেউই এই বিশ্বকে শাসিত করতে সক্ষম নয়।

অর্হন্নিদং দয়সে বিশ্বমভ্বং না বা অজীয়ো রুদ্র ত্বদস্তি॥
[ঋগবেদ ২/৩৩/১০]

হে রুদ্র, আপনিই এই সমগ্র বিশ্বকে দয়া পূর্বক রক্ষা করেন, আপনার চেয়ে জ্যেষ্ঠ বা শ্রেষ্ঠ আর কেউই নেই।

তব শ্রিয়ে মরুতঃ মর্জয়ন্ত রুদ্র যৎ তে জনিম চারু চিত্রম্।
পদং যদ্ বিষ্ণোরুপমং নিধায়ি তেন পাশি গুহ্যং নাম গোনাম্॥
[ঋগবেদ ৫/৩/৩]

“হে রুদ্র! মরুৎগণ তোমার মহিমাময় দেহকে অলংকৃত করে। তোমার প্রকাশ আশ্চর্য ও মনোমুগ্ধকর। যে পরমপদ সর্বব্যাপী বিষ্ণুর সদৃশ, তা তোমার মধ্যে স্থাপন হয়েছে; এবং সেই পদতত্ত্ব দ্বারা তুমি বেদের গুপ্ত ও জ্ঞানরূপ সত্তাকে রক্ষা করো।”

ভুবনস্য পিতরং গীর্ভিরাভী রুদ্রং দিবা বর্ধয়া রুদ্রমক্তৌ।
বৃহন্তমৃষ্বমজরং সুষুম্নমৃধগ্ধুবেম কবিনেষিতাসঃ॥
[ঋগবেদ ৬/৪৯/১০]

“আমরা স্তোত্র ও মন্ত্রবচনের মাধ্যমে জগতের পিতারূপ পরম রুদ্রকে আহ্বান করি। আমরা দিনে ও রাতে তাঁকে স্তব করি ও মহিমা বৃদ্ধি করি। তিনি পরম মহৎ, শ্রেষ্ঠ, জরা-বিহীন এবং অনুগ্রাহক। আমরা সেই কল্যাণময় শিবের দিকে ধাবিত হই, যিনি মহাজ্ঞানী কবিরূপে আমাদের নেতৃত্ব দেন।”

নম ইদ্ উগ্রং নম আ বিবাসে নমো দাধার পৃথিবীম্‌ উত দ্যাম্।
নমো দেবেভ্যো নম ঈশ এষাং কৃতং চিদেনো নমসা বিবাসে॥
[ঋগ্বেদ সংহিতা ৬/৫১/৮]

“আমি সেই উগ্র রূপ মহাদেবকে নমস্কার করছি এবং আহ্বান জানাচ্ছি, যিনি এই পৃথিবী ও আকাশকে ধারণ করেন তাঁকে আমি প্রণাম জানাই। আমি সমস্ত দেবতাকেও প্রণাম করি, এবং তাঁদের যিনি ঈশ্বর, সেই রুদ্রকেও নমস্কার জানাই। আমাদের দ্বারা যেটুকু পাপ সম্পাদিত হয়েছে, হে শিব! নমস্কারের মাধ্যমে তুমি তা অপসারণ করো।”

শুণ্বন্তং পূষণং বয়ম্ ইর্যম্‌ অনষ্ট বেদসম্‌।
ঈশানং রায় ঈমহে॥
[ঋগ্বেদ সংহিতা ৬/৫৪/৮]

“আমরা সেই সর্বশ্রোতা, পোষণকারী ঈশান শিবকে আহ্বান করি, যিনি সর্বজ্ঞ, বিনাশশূন্য ও পথপ্রদর্শক,
এবং ধন, জ্ঞান ও অনুগ্রহের জন্য তাঁকেই প্রার্থনা করি।”

ত্রি সপ্তঃ সস্রা নদ্যো মহীরপো বনস্পতীন্‌ পর্বতা অগ্নিমূর্তয়ে।
কৃষানুমস্তৃন্তিষ্যং সধস্থং আ রুদ্রং রুদ্রেষু রুদ্রিয়ং হবামহে।।
[ঋগবেদ/১০/৬৪/৮]

এই মন্ত্রে ঋষি সকল প্রাকৃতিক শক্তি ও উপাদানকে, নদী, জল, বৃক্ষ, পর্বত, অগ্নিরূপে রুদ্রকে নিবেদন করছেন। এই রুদ্রই সর্বত্র অধিষ্ঠান করেন, যিনি দীপ্তিমান ও সর্বব্যাপী, তিনিই রুদ্রগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। তাঁকেই যজ্ঞে আহ্বান করা হচ্ছে।

“জগতাম্‌ পতয়ে নমো”।। [শুক্ল-যজুর্বেদ/ শতরুদ্রীয়/১৬/১৮]

“বিশ্বরুপেভ্যশ্চ বো নমঃ”।। [শুক্ল-যজুর্বেদ/ শতরুদ্রীয়/১৬/২৫]

“নমঃ শম্ভবায় চ ময়োভবায় চ। নমঃ শঙ্করায় চ ময়স্করায় চ। নমঃ শিবায় চ শিবতরায় চ।।” [শুক্ল-যজুর্বেদ/ শতরুদ্রীয়/১৬/৪১]

“এক এব রুদ্রো ন দ্বিতীয়ায় তস্থে”।। [কৃষ্ণ-যজুর্বেদ ১/৮/৬]

“ভবাশর্বো মন্বে বাং তস্য বিত্তং যয়োর্বামিদং প্রদিশি যদ বিরোচতে।
যাবস্যেশাথে দ্বিপদো যৌ চতুষ্পদস্তৌ নো মুঞ্চতমংহসঃ”॥১৷। [অথর্ব্ববেদ/৪র্থ কাণ্ড/৬ষ্ট অনুবাক/৩য় সুক্ত]

“যো অগ্নৌ রুদ্রো যো অন্বন্তর্য ওষধীবীরুধ আবিবেশ।
য ইমা বিশ্বা ভুবনানি চালূপে তস্মৈ রুদ্রায় নমো অস্ত্রগ্নয়ে” ॥ ১৷। [অথর্ব্ববেদ/৭ম কাণ্ড/৮ম অনুবাক/৬ষ্ট সুক্ত/১ নং মন্ত্র]

" পুরুষস্য বিদ্ম সহস্রাক্ষস্য মহাদেবস্য ধীমহি |
তন্নো রুদ্রঃ প্রচোদয়াৎ || "  [কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/ তৈত্তিরীয় আরণ্যক/ ১০ ম প্রপাঠক/ ১নং অনুবাক]

“পরমায় নমঃ”।। [কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/ তৈত্তিরীয় আরণ্যক/ ১০ ম প্রপাঠক- পরিশিষ্ট /১৬ নং অনুবাক]

"ঋতং সত্যং পরং ব্রহ্ম পুরুষং কৃষ্ণপিঙ্গলম্ । 
ঊর্ধ্বরেতং বিরুপাক্ষং বিশ্বরুপায় বৈ নমো নমঃ ॥ "
[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/ তৈত্তিরীয় আরণ্যক/ ১০ ম প্রপাঠক- পরিশিষ্ট /২৩ নং অনুবাক]

"সর্বো বৈ রুদ্রস্তস্মৈ রুদ্রায় নমো অস্তু । 
পুরুষো বৈ রুদ্রঃ সন্মহো নমো নমঃ । 
বিশ্বং ভূতং ভুবনং চিত্রং বহুধা জাতং জায়মানশ্চ যৎ । 
সর্বো হ্যেষ রুদ্রস্তস্মৈ রুদ্রায় নমো অস্তু ॥ "
[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/ তৈত্তিরীয় আরণ্যক/ ১০ ম প্রপাঠক- পরিশিষ্ট /২৪ নং অনুবাক]

ওঁ ঈশানঃ সর্ববিদ্যানাং ঈশ্বরঃ সর্বভূতানাং ব্রহ্মাধিপতির্ব্রহ্মণোধিপতির্ব্রহ্মা শিবো মে অস্তু সদাশিবোম্”।। [কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/ তৈত্তিরীয় আরণ্যক/ ১০ ম প্রপাঠক- পরিশিষ্ট /৪৭ নং অনুবাক]

"শান্তং শিবং অদ্বৈতং চতুর্থং মন্যন্তে  স আত্মা স বিজ্ঞেযঃ ॥ " ( মাণ্ডূক্য শ্রুতি/৭)

“ত্রিষু ধামসু যদ্ভোগ্যং ভোক্তা ভোগশ্চ যদ্ভবেৎ ।
তেভ্যো বিলক্ষণঃ সাক্ষী চিন্মাত্রোঽহং সদাশিবঃ” ॥১৮॥
[কৈবল্য উপনিষদ ১/১৮]

"যৎ পরং ব্রহ্ম স একঃ য একঃ স রুদ্রঃ যঃ রুদ্র যো রুদ্রঃ স ঈশানঃ যঃ ঈশানঃ স ভগবান্ মহেশ্বরঃ ॥ " (অথর্বশির উপনিষদ/৩ )

“প্রাণং মনসি সহকরণৈর্নাদান্তে পরমাত্মনি সংপ্রতিষ্ঠাপ্য ধ্যাযীতেশানং। ওঙ্কারো বেদ পর ঈশো বা শিব একো ধ্যেযঃ শিবংকরঃ ॥” [অথর্বশিখা উপনিষদ ৩]

“তুল্যাতুল্যবিহীনোহস্মি নিত্যঃ শুদ্ধঃ সদাশিবঃ। সর্বাসর্ববিহীনোহস্মি সাত্ত্বিকোহস্মি সদাস্ম্যহম্”।।
[মৈত্রেয়ী উপনিষদ ৩/৬]

"অদ্বৈতং নিষ্কলং নিষ্ক্রিয়ং শান্তং শিবং অক্ষরং অব্যযং হরি-হর-হিরণ্যগর্ভ স্রষ্টারং " [ভস্মজাবাল উপনিষদ /২/৭]

“যত্র ন সূর্যস্তপতি যত্র ন বায়ুবার্তি 
যত্র ন চন্দ্রমা ভাতি যত্র ন দূঃখানি প্রবেশ্যান্তি
সদানন্দং পরমানন্দং শান্তং শাশ্বতং সদাশিবং ব্রহ্মাদিবন্দিতং যোগীধ্যেয়ং পরমং পদং
যত্র গত্বা ন নিবর্তন্তে যোগীনস্তদেতদৃচাভ্যূক্তম্।
তদ্বিষ্ণু পরমং পদং সদা পশ্যন্তি সূরয় দিবীব চক্ষুরাততম”।। [বৃহজ্জাবাল উপনিষদ ৮ম ব্রাহ্মণ]

অবস্থাত্রিতযাতীতং তুরীযং ব্রহ্মসংজ্ঞিতম্ ।
ব্রহ্মবিষ্ণুদিভিঃ সেব্যং সর্বেষাং জনকং পরম্ ॥১৩॥
[পঞ্চব্রহ্ম উপনিষদ - ১৩]

অকর্তাহমভোক্তাহমবিকারোঽহমব্যযঃ।
শুদ্ধ বোধস্বরূপোঽহং কেবলোঽহং সদাশিবঃ।।
[অধ্যাত্ম উপনিষদ - ৫৯]

“ওঙ্কারং রথমারুহ্য বিষ্ণুং কৃত্বাথ সারথিম্।
ব্রহ্মলোকপদান্বেষী রুদ্রারাধনতত্পরঃ”।। 
[অমৃতনাদ উপনিষদ - ২]

ত্র‍্যম্বকং ত্রিগুণং স্থানং ত্রিধাতুং রূপবজ্জিতম্।
নিশ্চলং নির্বিকল্পং চ নিরাধারং নিরাশ্রয়ম্ ॥
উপাধিরহিতং স্থানং বাত্মনোহতীতগোচরম্।
স্বভাবভাবনাগ্রাহ্যং সঙ্ঘাতৈকপদোষ্মিতম্ ॥
[তেজবিন্দু উপনিষদ ৬/৭]

রেচকেন তু বিদ্যাত্মা ললাটস্থং ত্রিলোচনম্।
শুদ্ধস্ফটিকসঙ্কাশং নিষ্কলং পাপনাশনম্ ॥১১
[ধ্যানবিন্দু উপনিষদ/১/১১]

“আত্মসংজ্ঞঃ শিবঃ শুদ্ধ এক এবাদ্বযঃ সদা। 
ব্রহ্মরূপতযা ব্রহ্ম কেবলং প্রতিভাসতে”।।
[আত্ম উপনিষদ - ১]

শুদ্ধং শিবং শান্তং নির্গুণং ইত্যাদিবাচকং অনির্বাচং চৈতন্যং ব্রহ্মং...॥ " [শুক্ল যজুর্বেদীয় নিরালম্ব উপনিষদ/৩]

কবিং পুরাণং পুরুষোত্তমোত্তমং সর্বেশ্বরং সর্বদেবৈরুপাস্যম্।
অনাদি মধ্যান্তমনন্তমব্যযং শিবাচ্যুতাম্ভোরুহগর্ভভূধরম্।।১৭।।
স্বেনাবৃতং সর্বমিদং প্রপঞ্চং পঞ্চাত্মকং পঞ্চসু বর্তমানম্। 
পঞ্চীকৃতানন্তভবপ্রপঞ্চং পঞ্চীকৃতস্বাবযবৈরসংবৃতম্। 
পরাত্পরং যন্মহতো মহান্তং স্বরূপতেজোমযশাশ্বতং শিবম্।।১৮।। 
[নারদ পরিব্রাজক উপনিষদ /৯ম উপদেশ]

👉 উক্ত সকল শ্রুতি (বেদ–উপনিষদ) সর্বসম্মতভাবে পরমশিবকেই সর্বোচ্চ, অদ্বিতীয় ও অতুলনীয় পরম ব্রহ্ম বলে প্রতিষ্ঠা করে। শিব এক ও অদ্বিতীয় শিবের সমকক্ষ বা সমান কেউ নেই। শিবই পরম ব্রহ্ম যিনি সৃষ্টি–স্থিতি–লয় করেন। শ্রুতি এই কৃত্যগুলোর অধিকারী হিসেবে একমাত্র শিবকেই নির্দেশ করে। শিবের তুলনা নেই তিনি অতুলনীয়, কারো সঙ্গে তুলনাযোগ্য নন। ব্রহ্মা ও বিষ্ণু শিবেরই অধীন। শ্রুতি বলে, বিষ্ণু ও ব্রহ্মা শিবতত্ত্বের প্রকাশ বা তাঁর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ব্রহ্মা ও বিষ্ণু শিবের আরাধক/সেবক। বিষ্ণুর পরম পদও শিবেই প্রতিষ্ঠিত। শিব কারও অধীন নন শিব পরম স্বতন্ত্র। তাই, শিবসংকল্পসূক্তের ক্রম বাস্তব ও শ্রুতি সম্মত “ব্রহ্মা < হরি < শিব” এই শ্রেষ্ঠত্ব অলংকারিক নয়, বাস্তব ও তাত্ত্বিক।
অতএব, শিবই সেই পরমতত্ত্ব যিনি সকল দেবতার ঊর্ধ্বে, ব্রহ্মা ও বিষ্ণুরও অতীত, একমাত্র সর্বোচ্চ ও তুলনাহীন পরমসত্তা।

👉পঞ্চাবয়বী ন্যায় অনুযায়ী—

১. প্রতিজ্ঞা—  শিবই পরমেশ্বর, সর্বোচ্চ ও অদ্বিতীয় সত্তা; ব্রহ্মা ও বিষ্ণু তাঁর চেয়ে নূন্য।

২. হেতু— শিবের অদ্বিতীয়তা, সর্বব্যাপীতা ও সৃষ্টি-স্থিতি-লয়ের ক্ষমতা।

৩. দৃষ্টান্ত— শ্রুতিসমূহে বলা হয়েছে- “এক হি রুদ্র ন দ্বিতীয়ায় তস্থুর্য ইমাঁল্লোকানীশত ঈশানীভিঃ” (শ্বেতাশ্বতর ৩/২)  শিব একমাত্র পরমেশ্বর।

“নৈনমুর্দ্ধং ন তির্য্যঞ্চং ন মধ্যে পরিজগ্রভৎ। ন তস্য প্রতিমা অস্তি যস্য নাম মহদ্ যশঃ” (শ্বেতা ৪/১৯) শিবের তুলনা নেই।

ঋগ্বেদ ২/৩৩/৯–১০, ৫/৩/৩, ৬/৪৯/১০ ইত্যাদি শিবই সর্বশ্রেষ্ঠ ও সৃষ্টির আধার।

৪. উপনয়ন— যেহেতু শিব একমাত্র পরমেশ্বর এবং ব্রহ্মা ও বিষ্ণুরও অতীত, তাই শিবসংকল্পসূক্তে যে ক্রমে (ব্রহ্মা < হরি < শিব) দেখানো হয়েছে, তা শুধুমাত্র পাঠক্রম, শিবই বাস্তবে সর্বোচ্চ।
অতএব, শিব > হরি > ব্রহ্মা।

৫. নিগমন—  শিবই পরম ব্রহ্ম, সর্বোচ্চ ও তুলনাহীন সত্তা। ব্রহ্মা ও হরি তার চেয়ে নূন্য। 

🛑 অন্তিম প্রমাণ — 

অথর্ববেদের শরভ উপনিষদে ঋগ্বেদের আশ্বলায়ণ শাখার অন্তর্গত এই শিবসংকল্পসূক্তের উক্ত মন্ত্রের আরো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। দেখুন — 

পরাৎপরতরং ব্রহ্মা যৎপরাৎপরতো হরিঃ ।

পরাৎপরতরো হীশস্তস্মাত্তুল্যোঽধিকো ন হি ॥ ২৯ ॥

এক এব শিবো নিত্যস্ততোঽন্যৎসকলং মৃষা ।

তস্মাৎসর্বান্পরিত্যজ্য ধ্যেযান্বিষ্ণবাদিকান্সুরান্ ॥ ৩০ ॥

[অথর্ববেদ/শরভ উপনিষদ/২৯-৩০ নং শ্লোক]

অর্থ — যিনি পরাৎপর ব্রহ্মা, তার থেকেও অধিক পরাৎপর হলেন হরিঃ । কিন্তু হরির থেকেও অধিক যিনি পরাৎপর তিনিই হলেন ঈশ(সদাশিব), সেই প্রভু শিবের সমান তথা তার চেয়ে অধিক কেউ নেই(কারণ শিব‌ই সর্বোচ্চ সত্ত্বা পরমব্রহ্ম) ॥ ২৯ ॥

শিব‌ই একমাত্র নিত্য, অন্য সকল কিছুই মিথ্যা । এই কারণে বিষ্ণু আদি সকল দেবতাকে পরিত্যাগ করে শিবকেই ধ্যেয় বলে জানা উচিত ॥ ৩০ ॥


দেখুন ! ব্যাকরণ ও বেদ সম্পর্কে অনভিজ্ঞ অবোধ শিশু বৈষ্ণবলের পর্দা ফাঁস করে দিয়েছেন স্বয়ং বেদ নিজেই। তাই যেখানে বেদ নিজেই নিজের মন্ত্রের স্পষ্ট ব্যাখ্যা করে দিয়ে রেখেছে, সেখানে বেদমন্ত্রের অপব্যাখ্যা করবর জন্য বাইরে থেকে ভুলভাল দাবী করবার কোনো জায়গা ই থাকে না। 


✅ সিদ্ধান্ত—

১. শিব একমাত্র পরম ব্রহ্ম।

২. তাঁর কোনো সমকক্ষ নেই (অদ্বিতীয়)।

৩. তাঁর সঙ্গে তুলনা অসম্ভব (অতুলনীয়)।

৪. ব্রহ্মা ও বিষ্ণু শিবের অধীন বা শিবতত্ত্বের প্রকাশ।

৫. শিবসংকল্পসূক্তের “ব্রহ্মা < হরি < শিব” এই ক্রম সম্পূর্ণ শ্রুতি সম্মত।

শিবই একমাত্র পরমেশ্বর, ব্রহ্মা ও হরির চেয়ে শ্রেষ্ঠ। শিবসংকল্পসূক্তে শিবকেই পরমত্ব প্রদান করা হয়েছে, ক্রমকোপ বা পাঠক্রম দ্বারা তা হ্রাস পায় না। সুতরাং, বৈষ্ণবদের এই বালখিল্য দাবী সম্পূর্ণভাবে খণ্ডিত হলো।



🙏সর্বে হ্যেষ রুদ্রস্তস্মৈ রুদ্রায় নমো অস্তু🙏

নমঃ শিবায়ৈ 🙏
নমঃ শিবায় 🙏
শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তে ✊🚩

✍️অপপ্রচার দমনে— অন্তিক ভট্টাচার্য্য (শম্বরনাথ শৈব)।

🌻বিশেষ কৃতজ্ঞতা— আমার গুরু শ্রী নন্দীনাথ শৈবাচার্য জী ও আমার আদর্শ শ্রী রোহিত কুমার চৌধুরী শৈবজী।

কপিরাইট ও প্রচারে— Shivalaya (ISSGT)।

বি: দ্র:— লেখাটি কপি করলে সম্পূর্ণভাবে করবেন, কোনো রকম কাটছাট করা যাবে না।





শিবঃ ওঁ…….🙏

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ