ব্যাকরণের অপপ্রয়োগ করে — মাতা পার্বতীকে বিষ্ণুর পত্নী দাবী করা ছাগমুখ বৈষ্ণবের দাবীর খণ্ডন

 

🔰 ভূমিকা — 

“অশোক সরকার” নামে একজন কু লাঙ্গার, বে জ ন্মা, শিববিরোধী, শিবের অপপ্রচারকারী মধ্ব মতের অনুসারী, বারংবার পরমেশ্বর শিবের পরমত্ব খণ্ডিত করতে না পেরে শাস্ত্রের অপপ্রয়োগের দ্বারা বারংবার পরমেশ্বর শিবের অপপ্রচার চালায়। এই বেজ ন্মা কু লাঙ্গার অশোক জানেনা যে- শৈবরা ছাড় দেয় কিন্তু, ছেড়ে দেয় না।
 কমেন্টে আমার সাথে তর্কে না পেরে- মাতা পার্বতীকে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করে বলে অশোক বেজ ন্মা নাকি মাতা পার্বতীকে নিজের বউ বানাবে। অবশ্য এর জন্য ঐ অশোক বেজ ন্মার নরকেও জায়গা হবে না। এখন আবার শাস্ত্রের অপপ্রচার করে মাতা পার্বতীকে- বিষ্ণুর পত্নী বানাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। Ai ব্যবহার করে অশ্লীল ছবি তৈরী করে মাতা পার্বতীকে ভগবান বিষ্ণুর কোলে বসিয়ে দিচ্ছে। এমনকি মাতা পার্বতী শ্রী বিষ্ণুকে চুম্বন করছে এমন ধরণের অশ্লীল অমানবিক সনাতনধর্মের বিরোধী কর্ম করে চলেছে এই ম্লেচ্ছ অশোক। মুসলিমরা এমন করলে হিন্দু সনাতনীরা বিরোধ করে, কিন্তু যখন সনাতন ধর্মের মধ্যেই এইরকম ইসলামিক পদ্ধতিতে দেবদেবীর অশ্লীল ছবি তৈরী করে বৈষ্ণব সম্প্রদায় আর তার সমর্থন করে অনান্য বৈষ্ণবেরা। তখন এর বিরোধিতা কেউ করে না। কারণ সনাচনী সমাজটা আজ শুধু বৈষ্ণব কেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে, ফলে বৈষ্ণবদের সনাতনবিরোধী কর্মকাণ্ড গুলো দেখেও না দেখার ভান করা হচ্ছে।
এদিকে এই কু লাঙ্গার অশোক সরকার বাংলাদেশের মাটিতে বসে নকল আইডি খুলে বিপ্লব রায়, নকুল বর্মণ ইত্যাদি নামের আরো কয়েক বৈষ্ণবদের সাথে যুক্ত হয়ে এই বে জন্মাগিরি করে বেড়াচ্ছে। 

আসলেই একটা প্রবাদবাক্য আছে- “বিনাশ কালে বিপরীত বুদ্ধি”। এই অশোক বেজ ন্মারও একই অবস্থা হয়েছে। শীঘ্রই এর বিনাশ হবে।

________________________________________________

🚫 এই বেজ ন্মা অশোকের ব্যাকরণের দোহাই দিয়ে করা  অপপ্রচার দেখে নেওয়া যাক —


❌ বৈষ্ণব অশোকের বক্তব্য ও দাবী — 

বিষ্ণু সহস্রনামে “উমাপতিঃ” ও “স্ত্রীগৌরী” নাম আছে।
“স্ত্রীগৌরী” একটি পুরুষবাচক বহুব্রীহি নাম।
এর ব্যুৎপত্তি—
গৌরী স্ত্রী যস্য সঃ = স্ত্রীগৌরী। অর্থাৎ “গৌরী যার স্ত্রী”।
যদিও পাণিনি ১.২.৪৮ অনুসারে হ্রস্ব হওয়া উচিত ছিল,
কিন্তু যেহেতু শব্দটি পৃষোদরাদি (৬.৩.১০৯), তাই এটি নিপাতনে সিদ্ধ, আর্ষপ্রয়োগ। যেহেতু শিব নিজেই সহস্রনামে এই নাম উচ্চারণ করেছেন।
অতএব শিব স্বয়ং গৌরীকে বিষ্ণুর স্ত্রী বলেছেন।


✅ শৈবপক্ষ দ্বারা খণ্ডন—

এই দাবির মূল দোষ খণ্ডনের আগে পরিষ্কার করে বলা দরকার যে- এই দাবিতে তিনটি মৌলিক দোষ আছে।

❌ ১ম দোষ—  ব্যাকরণ দিয়ে ঐতিহাসিক/পৌরাণিক সম্পর্ক প্রমাণ করা অনর্থক। পাণিনীয় ব্যাকরণ- শব্দের রূপ নির্ধারণ করে, শব্দের লিঙ্গ নির্ধারণ করে, কিন্তু দেবদেবীর বিবাহ, পত্নীত্ব বা ইতিবৃত্ত নির্ধারণ করে না। এটি “category mistake” অর্থাৎ, যখন কোনো বস্তু, ধারণা বা বিষয়কে এমন এক শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত করে বলা হয়, যেখানে সেটি আদৌ পড়ে না। অর্থাৎ, ভিন্ন প্রকৃতির জিনিসের ওপর ভুল শ্রেণীর গুণ বা ধর্ম আরোপ করা।

❌ ২য় দোষ— বহুব্রীহির অর্থকে বাস্তব-বৈবাহিক অর্থ ধরে নিয়ে অনর্থ করেছে।  বহুব্রীহি সমাসের সংজ্ঞা হলো- “অর্থটি সমাসবদ্ধ পদের বাইরে অবস্থান করে”। অর্থাৎ- “স্ত্রীগৌরী” শুধু বলে- “কোনো পুরুষ যার স্ত্রী ‘গৌরী’ কিন্তু এটি বলে না কোন গৌরী, কোন পুরুষ, পৌরাণিকভাবে সত্য না উপচার।

❌ ৩য় দোষ— পৃষোদরাদি সূত্রকে অর্থ-নির্ধারক বানানো সবচেয়ে বড় ভুল এখানে। ৬/৩/১০৯ পৃষোদরাদি সূত্র শব্দের রূপগত ব্যতিক্রম রক্ষা করে, অর্থ বা তত্ত্ব নির্ধারণ করে না। নিপাতনে সিদ্ধ অর্থ- “এই রূপটি বৈধ” এই না যে “এই অর্থটাই ঐতিহাসিক সত্য”।

👉উক্ত সূত্রে মহর্ষি পাণিনী বলেন—

“পৃষোদরাদীনি যথোপদিষ্টম্‌”
[পাণিনী অষ্টাধ্যায়ী ৬/৩/১০৯]

কাশিকা ভাষ্য—
“যেষু লোপাগমবর্ণবিকারাঃ শাস্ত্রেণ ন নিহিতাঃ দৃশ্যন্তে চ, তানি যথোপদিষ্টানি সাধূনি ভবন্তি”।

অর্থ— “যেসব ক্ষেত্রে শাস্ত্র দ্বারা লোপ, আগম বা বর্ণবিকার নির্দিষ্টভাবে বিধান করা হয়নি, অথচ সেগুলি প্রচলিত রূপে দেখা যায়, সেগুলি শাস্ত্রে যেভাবে উপদেশ দেওয়া হয়েছে, সেই রূপেই শুদ্ধ বলে গণ্য হয়”।

অর্থাৎ- শাস্ত্রনির্দিষ্ট পরিবর্তন না থাকলে, শব্দকে যেমন শাস্ত্রে দেওয়া হয়েছে ঠিক তেমনভাবেই শুদ্ধ ধরা হয়।

এখানে একটিও এমন কথা নেই যে তার দ্বারা দেবীর পরিচয় বদলানো যাবে, পত্নীত্ব স্থির হবে বা পুরাণবিরোধী অর্থ গ্রহণযোগ্য করা যাবে।

অতএব, ৬/৩/১০৯ দিয়ে “গৌরী অর্থ বিষ্ণুপত্নী” প্রমাণ করা সূত্রের সম্পূর্ণ অপব্যবহার।

এছাড়াও- ১/২/৪৮ সূত্রের নিজস্ব সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কাশিকা ভাষ্যেই স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—

“ইযসো বহুব্রীহেঃ প্রতিষেধো বক্তব্যঃ”

অর্থাৎ, বহুব্রীহি সমাসে এই সূত্রের প্রতিষেধ রয়েছে। ফলে, বহুব্রীহি দেখলেই ১.২.৪৮ যান্ত্রিকভাবে প্রয়োগ করতে হবে এমন সিদ্ধান্ত কাশিকাসিদ্ধ নয়। এতেই প্রমাণিত হয় যে, ‘স্ত্রীগৌরী’ যদি বহুব্রীহি হয় বলেই তার উপর এই সূত্র অবশ্যম্ভাবী এই ধারণা ভুল।

👉 জৈমিনি পূর্বমীমাংসা অনুযায়ী— যদি কোনো বাক্য বা শব্দ যদি কেবল গুণ, প্রসংশা আদি প্রকাশ করে তবে তাকে অর্থবাদ বলা হয়৷ বিষ্ণুসহস্রনামে “স্ত্রীগৌরী” কোনো কর্মবিধান নয়, এটি কোনো “বিবাহ কর” বা “গৌরীকে পত্নী হিসেবে গ্রহণ কর” এমন নির্দেশ নয়, এখানে গৌরী কেবল উপমা অর্থে প্রয়োগ হয়েছে। অর্থাৎ কান্তি বোঝানোর অর্থে ব্যবহৃত। সুতরাং- এটি নিঃসন্দেহে অর্থবাদ।

তবে, অর্থবাদ থেকে কি “পত্নী” সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা যায়? না। এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সূত্র বলে — 

“গুণাদবিপ্রতিষেধঃ স্যাৎ”
[পূর্বমীমাংসা ১/২/৪৭]

যদি কোনো অর্থবাদ বাক্যকে আক্ষরিক অর্থে নিলে শাস্ত্রবিরোধ সৃষ্টি হয়, তবে গৌণার্থে (রূপক অর্থে) গ্রহণ করতে হবে।

“স্ত্রীগৌরী” আক্ষরিক অর্থে নিলে - গৌরী অর্থ বিষ্ণুর পত্নী। কিন্তু এটি- শ্রুতি-বিরোধী, স্মৃতি-বিরোধী, পুরাণ-বিরোধী, আগম-বিরোধী কারণ সর্বত্র- গৌরী = উমা = পার্বতী = শিবপত্নী। শব্দ অভিধান অনুযায়ী- “উমা কাত্যায়নী গৌরী কালী হৈমবতীশ্বরা। শিবা ভবানী রুদ্রাণী সর্বাণী সর্বমঙ্গলা॥” [অমরকোষ/স্বর্গবর্গ/২৮]- এই অর্থই প্রতিপাদন করে যে- গৌরীই হলো দেবী পার্বতী যিনি শিবের পত্নী, বিষ্ণুর নয়। তাই মীমাংসা অনুসারে বাধ্যতামূলকভাবে গৌণার্থ গ্রহণ করতে হবে, পত্নীত্ব নয়। আর ঠিক এখানেই ন্যায় শাস্ত্র বলে– 

“ধর্ম্মবিকল্প-নির্দ্দেশেহর্থ-সদ্ভাব-প্রতিষেধ উপচারচ্ছলম্”
[ন্যায়দর্শন ১/২/৫৫]

অর্থাৎ, যখন শব্দটি গৌণ বা লাক্ষণিক অর্থে ব্যবহৃত, তখন মুখ্যার্থ অবলম্বন করে দোষ দেখানোই উপচার ছল।

বিষ্ণু সহস্রনামে অধিকাংশ নামই হলো- গুণবাচক, লাক্ষণিক, ঐশ্বর্য বা শক্তির প্রকাশ অর্থে ব্যবহৃত। “স্ত্রীগৌরী” এখানে ঐশ্বর্যশক্তিসহ ঈশ্বর, শুদ্ধ শক্তিযুক্ত ঈশ্বর এই লাক্ষণিক অর্থে গ্রহণযোগ্য। কিন্তু, বৈষ্ণবরা মুখ্য দাম্পত্য অর্থ জোর করে আরোপ করছে লাক্ষণিক অর্থ অস্বীকার করছে। সুতরাং এটি স্পষ্ট উপচার-ছল। সুতরাং- বৈষ্ণবদের দাবী সম্পূর্ণ ছলনায় দুষ্ট। তাই বৈষ্ণবীয় দাবী অগ্রহণযোগ্য।

👉পূর্বমীমাংসা আরও বলে—

“বিরোধে ত্বনপেক্ষং স্যাদ্ অসতি হ্যনুমানম্”
[পূর্বমীমাংসা ১/৩/৩/]

যদি স্মৃতি ও শ্রুতির মধ্যে বিরোধ হয়, তবে স্মৃতি বাতিল। বৈষ্ণব দাবি মূলত স্মৃতি-নির্ভর ব্যাখ্যা কিন্তু, শ্রুতি ও বহুসংখ্যক স্মৃতি বলে গৌরী রুদ্রপত্নী। “অম্বিকাপতয়ে উমাপতয়ে” [তৈত্তিরীয় আরণ্যক ১০ম প্রপাঠক] ও এই একই অর্থ প্রদিপাদন করে যে- শিবই পার্বতীর স্বামী। তাই বৈষ্ণব ব্যাখ্যা অগ্রহণযোগ্য।

👉 এছাড়াও- নাম দ্বারা সম্পর্ক স্থাপন হয় না মীমাংসা বলে—

“আখ্যা হি দেশসংযোগাত্”
[পূর্বমীমাংসা ১/৩/১৯]

নাম নির্ধারিত হয় প্রসঙ্গ ও প্রয়োগের দ্বারা। বিষ্ণুসহস্রনামে নামগুলো হলো- গুণবাচক, স্তোত্রমূলক, প্রশংসামূলক। এখানে সামাজিক বা বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করা অযৌক্তিক। শিবও ভক্তবৎসলতা পূর্বক বিষ্ণুর স্তুতি ও প্রসংশা করেন। শিবমহাপুরাণে বলা হয়েছে- “স্বাত্মনা ভক্তবাৎসল্যাদ্ভজত্যেব কদাচন “॥ [শিবমহাপুরাণ/কোটিরুদ্রসংহিতা/৪২/১৫]- পরমেশ্বর শিব কখনো কখনো ভক্তবৎসলবশত তিনি নিজেই নিজের ভক্তের প্রশংসা রূপে ভজনা করে থাকেন। তাই, এখানেও বৈষ্ণব দাবী গ্রহণযোগ্য নয়।

👉পূর্বমীমাংসায় জৈমিনী আরও বলেন—

“শাস্ত্রাস্থা বা তন্নিমিত্তত্বাত্”
[পূর্বমীমাংসা ১/৩/৯]

শাস্ত্রসমর্থিত ব্যাখ্যাই অধিক প্রামাণ্য। আর সকল শাস্ত্র- শ্রুতি, স্মৃতি, পুরাণ, আগম, ইতিহাস সব জায়গায় সমর্থিত যে- শিবই পার্বতীপতি। তাই সেটিই প্রামাণ্য। তাই বৈষ্ণবদের এই ছলনাময় ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য নয়।

👉 তবে প্রশ্ন উঠতে পারে যে- তবে বিষ্ণুকে “স্ত্রীগৌরী” বলা হলো কেনো? এমন সন্দেহের উত্তরে মহর্ষি জৈমিনি বলেন— 

“যস্মিন্ গুণোপদেশঃ প্রধানতঃ অভিসম্বন্ধঃ”
[পূর্বমীমাংসা ১/৪/৩]

যেখানে গুণের উল্লেখ থাকে, সেখানে সেই গুণ প্রধান বিষয়ের স্তুতির জন্য, আলাদা কোনো নতুন তত্ত্ব বা সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার জন্য নয়। যেমন মহাভারতে বলা হয়েছে—

“সিংহং কেশরিণং ক্রুদ্ধমতিক্রম্যাভিনৰ্দ্দসে।
শৃগাল ইব মূঢ়ত্বং নৃসিংহং কর্ণ! পাণ্ডবম্" ॥৪৮৷৷
[মহাভারত/কর্ণপর্ব/অধ্যায় ৩১/৪৮]

“হে কর্ণ! ক্রুদ্ধ কেশরী সিংহকে অতিক্রম করে যেমন এক শৃগাল মূঢ়তার পরিচয় দেয়, তেমনি নৃসিংহ পাণ্ডব অর্জুনকে অবজ্ঞা করে (অতিক্রম করতে উদ্যত হয়ে) তুমিও মূঢ়তা প্রদর্শন করছ।”

এখানে লক্ষ্য করুন- অর্জুনকে ‘নৃসিংহ’ বলা হয়েছে। কিন্তু, এর দ্বারা কি কেউ সত্যিই বলবে যে অর্জুনই শাস্ত্রে বর্ণিত বিষ্ণুর অবতার নৃসিংহ? অবশ্যই না। এখানে “নৃসিংহ” শব্দটি অর্জুনের বীরত্ব, পরাক্রম ও অদম্য শক্তির গুণ বোঝাতে ব্যবহৃত অর্থাৎ- মানব হয়েও সিংহের মতো অপ্রতিরোধ্য। কিন্তু, কেউ যদি আপত্তি তুলে বলে- “শব্দপ্রমাণ আছে, তাই অর্জুনই নৃসিংহ অবতার” তাহলে, সেটি হবে শব্দের ভুল প্রয়োগ ও মীমাংসা-বিরোধী সিদ্ধান্ত। একই ভাবে- এখানে “স্ত্রীগৌরী” শব্দে “গৌরী” শব্দটি গুণ হিসেবে গৃহীত হয়েছে (যেমন- কান্তি, শুদ্ধশক্তি, সৌন্দর্য অর্থে), তাই সেটি বিষ্ণুর গুণস্তুতি, গৌরীর সঙ্গে বিষ্ণুর বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য নয়।

এ কারণেই জৈমিনি সতর্ক করেন—

“মিথঃ চ অনর্থসম্বন্ধঃ”
[পূর্বমীমাংসা ১/৪/১৫]

অপ্রাসঙ্গিক ক্ষেত্রে সম্পর্ক কল্পনা করা অনর্থক।

যেমন- উপমাকে আক্ষরিক সত্তা বানানো, গুণবাচক শব্দকে ব্যক্তি বা দাম্পত্য সম্পর্ক হিসেবে ধরা এসবই শাস্ত্রার্থে গুরুতর ভুল। তাই- “স্ত্রীগৌরী” শব্দটি গুণবাচক রূপক মাত্র। এটি বিষ্ণুর ঐশ্বর্য ও শক্তির প্রশংসা জন্য ব্যবহৃত, পার্বতীর সঙ্গে কোনো আক্ষরিক দাম্পত্য প্রমাণের জন্য নয়।

👉 আমরাও যদি বৈষ্ণবদের ন্যায় অপযুক্তি করতে চাই, তবে- যাস্ক নিরুক্ত- ৩/৪/১২ অনুযায়ী ‘স্ত্রী’ এর অর্থ হয় কন্যা। তবে আমরাও এই যুক্তিতে বলতে পারি এখানে গৌরী অর্থ- কান্তিময়ী। অর্থাৎ, কান্তিময়ী কন্যার পিতা হলেন বিষ্ণু এমন অর্থ বৈষ্ণবদের মেনে নিতে হবে।

আবার একই ভাবে- উক্ত পদ্মপুরাণে উত্তরখণ্ডের বিষ্ণুসহস্রনামের ১২১ নং শ্লোকে বলা হয়েছে- “পরঃ শিবঃ পরো ধ্যেয়ঃ পরং জ্ঞানং পরা গতিঃ” অর্থাৎ- বিষ্ণুর বাহ্যিক রূপকে পরমার্থিক অদ্বিতীয় পরশিব বলেই স্তুতি করেছেন রুদ্রদেব। এবং সেই পরশিবই হলো- পরমধ্যেয়, পরমজ্ঞান, পরমগতি, পরমার্থ, পরম শ্রেয়, পরমানন্দ স্বরূপ যা পরমব্রহ্মের লক্ষণ। তাহলে বৈষ্ণবীয় যুক্তি যদি মেনে নেওয়া হয় তবে, এই দাবীও মেনে নিতে হবে যে- বিষ্ণু সহস্রনামে মূলত পরশিবকেই স্তুতি করা হয়েছে। আর যেহেতু শিবেরই অর্ধাঙ্গিনী গৌরী তাই সেই বিষ্ণু স্বরূপ শিবকেই স্ত্রীগৌরি বলেই স্তুতি করা হয়েছে৷ বৈষ্ণবদের দাবী যদি মান্য হয় তবে আমাদের এই দাবীও মানতে হবে বৈষ্ণবদের।

👉 সহস্রনামের মধ্যে- “শিব” নাম বিষ্ণুর আছে, “নারায়ণ” নাম শিবের আছে। “ঈশ্বর” বহু দেবতার নাম। যদি বৈষ্ণব যুক্তি মানি, তবে- বিষ্ণু শিব হবেন, শিব বিষ্ণু হবেন, সকল দেবীর সকল দেবতার সাথে বিবাহ প্রমাণিত হবে। অর্থাৎ এটি একটি অতিপ্রসঙ্গদোষ। যেমন, বামন পুরাণে পরমেশ্বর শিবকে স্তুতি করে বলা হয়েছে- “শিখণ্ডী পুণ্ডরীকাক্ষঃ পুণ্ডরীকবনালয়ঃ” [বামন পুরাণ/৪৭/১৪০] অর্থাৎ- শিবই ‘পুণ্ডরীকাক্ষ’। তাহলে এক্ষেত্রে আমরা বলতেই পারি যে- বিষ্ণুসহস্রনামে বিষ্ণুটা সাক্ষাৎ শিবই এবং সেই বিষ্ণু রূপধারী শিবের স্ত্রীই হলো গৌরী। কেননা, স্তুতিতে শিবকে পুণ্ডরীকাক্ষ বলে সম্বোধন করা হয়েছে৷ তাই এক্ষেত্রে বিষ্ণুসহস্রনাম মূলত পরমেশ্বর শিবের উদ্দেশ্যেই সমর্পিত এমনটা মেনে নিতে হবে বৈষ্ণবদের৷ 

👉 আবার একই ভাবে, বেশ কিছু পুরাণাদি শাস্ত্রে- ব্রহ্মাকেও সর্বাত্মক বলা হয়েছে। তবে কি আমাদের মেনে নিতে হবে যে ব্রহ্মাই সর্বশ্রেষ্ঠ ও পরমব্রহ্ম? একই ভাবে শাস্ত্রে, সূর্য, ইন্দ্র আদি দেবতাদেরও ব্রহ্মস্বরূপ চিন্তন করে স্তুতি করা হয়েছে। তাহলে এখানেও কি কেবল স্তুতিতে ইন্দ্রাদি দেবতাদের ব্রহ্মস্বরূপ বলেছে বলেই কি সবাইকে স্বতন্ত্র ব্রহ্ম মেনে নিতে হবে? এক তত্ত্বের উপর আরেক শ্রেষ্ঠ তত্ত্বের শ্রেষ্ঠত্ব যদি জোড়পূর্বক চাপানো হয় তবে ব্রহ্মের উপর তো ‘অনাবস্তাদোষ’ আরোপিত হবে। কেননা, ব্রহ্ম এক ও অদ্বিতীয় তার ঊর্ধ্বে আর কোনো শ্রেষ্ঠ তত্ত্ব থাকতেই পারে না। আর সেই এক ও অদ্বিতীয় ব্রহ্মই হলো পরমেশ্বর শিব যা- “এক হি রুদ্র ন দ্বিতীয়ায় তস্থুর্য” [শ্বেতাশ্বতর ৩/২] আদি শ্রুতি বাক্য দ্বারা প্রমাণিত। 

👉 আবার একই সহস্রনামে- “উমাপতি” উমার স্বামী। যদি নাম দিয়ে আক্ষরিক বৈবাহিক অর্থই ধরতে হয়, তবে- উমাপতি অর্থ শিব, স্ত্রীগৌরী অর্থ বিষ্ণু, তাহলে সহস্রনাম নিজেই আত্মবিরোধী হয়ে যায়। কিন্তু, বাস্তবে উভয়ই গুণবাচক ও উপচারমূলক নাম, আক্ষরিক বৈবাহিক অবস্থা নয়।

শাস্ত্র বলে- গৌরী অর্থ শিবপত্নী (বেদ, সমস্ত পুরাণ, ইতিহাস, আগম, ইতিবৃত্ত)। লক্ষ্মী অর্থ বিষ্ণুপত্নী। একটিও শাস্ত্র নেই যেখানে গৌরীকে আক্ষরিক অর্থে বিষ্ণুর পত্নী বলা হয়েছে।

“স্ত্রীগৌরী” একটি বৈধ নিপাতনে সিদ্ধ নাম কিন্তু এটি ব্যাকরণগত বৈধতা, তত্ত্বগত প্রমাণ নয়। এটি দিয়ে গৌরীকে বিষ্ণুর পত্নী প্রমাণ করা যায় না। বৈষ্ণব দাবী হল ব্যাকরণ ও শাস্ত্র উভয়ের অপব্যবহারের ফল। ব্যাকরণ দিয়ে গৌরীর স্বামী বদলানো এটি শাস্ত্রার্থ নয়, শাস্ত্রবিকৃতি মাত্র।

👉 ন্যায় দর্শন অনুযায়ী— 

‘প্রতিজ্ঞাহেতূদাহরণোপনয়নিগমনান্ অবয়বাঃ’। [ন্যায়সূত্র-১/১/৩২]

অর্থাৎ-প্রতিজ্ঞা, হেতু, উদাহরণ, উপনয় ও নিগমন- এই পঞ্চবাক্য অবয়ব।

◾প্রতিজ্ঞা— বৈষ্ণবদের এই দাবি- “বিষ্ণু সহস্রনামের ‘স্ত্রীগৌরী’ নাম দ্বারা গৌরী (পার্বতী) বিষ্ণুর পত্নী প্রমাণিত” এটি শাস্ত্রসম্মত নয় এবং ছলনাময়, তাই অগ্রহণযোগ্য।

◾হেতু— কারণ- পাণিনীয় ব্যাকরণ শব্দের রূপগত বৈধতা নির্ধারণ করে, দেবদেবীর বৈবাহিক বা পৌরাণিক সম্পর্ক নির্ধারণ করে না (category mistake)। বহুব্রীহি সমাস কেবল গুণবাচক পরিচয় দেয়, বাস্তব দাম্পত্য প্রতিষ্ঠা করে না। পৃষোদরাদীনি যথোপদিষ্টম্ (৬/৩/১০৯) সূত্র রূপ রক্ষা করে, অর্থ বা তত্ত্ব নির্ধারণ করে না। “স্ত্রীগৌরী” আক্ষরিকভাবে নিলে তা শ্রুতি, স্মৃতি, পুরাণ, আগম, শব্দঅভিধান সর্বত্র প্রতিষ্ঠিত “গৌরী = উমা = পার্বতী = শিবপত্নী” এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে বিরোধী। বিরোধ ঘটলে মীমাংসা অনুসারে গৌণার্থ গ্রহণ আবশ্যক, মুখ্যার্থ নয়।
গৌণার্থ থাকা সত্ত্বেও মুখ্য দাম্পত্য অর্থ আরোপ করা
ন্যায়সূত্র ১/২/৫৫ অনুসারে উপচারছল।

◾উদাহরণ— যেমন- পুরাণে সূর্যকে “পরব্রহ্মস্বরূপ” বলা হয়েছে, কিন্তু তাতে “সূর্য” অদ্বিতীয় ব্রহ্ম হয়ে যান না। সহস্রনামে বিষ্ণুর “শিব” নাম আছে, তাতে বিষ্ণু শিবের ঐতিহাসিক পরিচয় হয়ে যায় না। ইন্দ্র, ব্রহ্মাকেও ব্রহ্মরূপে স্তুতি করা হয়েছে, তাতে তারা প্রত্যেকে স্বতন্ত্র পরব্রহ্ম হয়ে যান না।
অতএব, স্তোত্রমূলক নাম দ্বারা ঐতিহাসিক বা বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপিত হয় না।

◾উপনয়— “স্ত্রীগৌরী” নামটি গুণবাচক, উপচারমূলক, অর্থবাদধর্মী। এটিকে আক্ষরিক দাম্পত্য অর্থে গ্রহণ করলে- শাস্ত্রবিরোধ, আত্মবিরোধ (উমাপতি বনাম স্ত্রীগৌরী), অতিপ্রসঙ্গদোষ, ন্যায়সূত্রে বর্ণিত বাক্-ছল, সামান্য-ছল ও উপচার-ছল সবই উপস্থিত হয়। তাই, বৈষ্ণবদের প্রয়োগ ন্যায়সম্মত নয়।

◾নিগমন—  সুতরাং সিদ্ধান্ত এই যে- “স্ত্রীগৌরী” একটি নিপাতনে সিদ্ধ, গুণবাচক ও লাক্ষণিক নাম মাত্র, এটি দ্বারা গৌরী (পার্বতী)-কে বিষ্ণুর পত্নী প্রমাণ করা যায় না। এইরূপ প্রমাণ প্রচেষ্টা ব্যাকরণ ও শাস্ত্র উভয়ের অপব্যবহার এবং ন্যায়শাস্ত্রোক্ত ছলনায় দুষ্ট তাই, সম্পূর্ণরূপে অগ্রহণযোগ্য।”

👉বৈষ্ণবদের আরেকটি হাস্যকর দাবী হলো- ব্যাসায় বিষ্ণুরূপায় ব্যাসরূপায় বিষ্ণবে” অর্থাৎ- কৃষ্ণদ্বৈপায়ন জী সাক্ষাৎ বিষ্ণু স্বরূপ। অন্যদিকে বৈষ্ণবদের‌ই শাস্ত্র বলে- 

“বেদব্যাসেন মুনিনা আরাধ্য পরমেশ্বরম্‌।
সর্বজ্ঞত্বং ব্রহ্মজ্ঞানং প্রাপ্তং দেবপ্রসাদতঃ”।।
[গীতাপ্রেস প্রকাশিত/বামনপুরাণ/ অধ্যায় ৪৬/৩৮নং শ্লোক]

অর্থাৎ- মহর্ষি বেদব্যাস পরমেশ্বর মহাদেবের আরাধনা করে সর্বজ্ঞত্ব ও ব্রহ্মজ্ঞত্ব লাভ করে।

তাই বৈষ্ণবরা যদি বেদব্যাসকে বিষ্ণুস্বরূপ প্রমাণ করতে চায়, তবে বৈষ্ণবদের বলে রাখি সেই বেদব্যাস কৃষ্ণদ্বৈপায়ন পরমেশ্বর শিবের আরাধনা করেই পরমজ্ঞান লাভ করেছেন। সেক্ষেত্রে, বেদব্যাস স্বরূপী বিষ্ণু যে পরমেশ্বর শিবের একান্ত ভক্ত তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণিত হয়ে যায়৷

👉 আবার বিষ্ণু স্বরূপের প্রকাশ যে পরমেশ্বর শিবের মাধ্যমেই হয় তা নিম্ন শ্রুতি প্রমাণ দ্বারা সিদ্ধ হয়ে যায়-

“যো বৈ রুদ্রঃ স ভগবান্‌ যশ্চ বিষ্ণুঃ তস্মৈ বৈ নমো নমঃ” ।। 
[অথর্ব্বশির উপনিষদ/২/১]

এই বাক্যের শাস্ত্রীয় অর্থ দাঁড়ায়—

“যে পরমেশ্বর রুদ্র, যিনি বিষ্ণু-স্বরূপে প্রকাশিত, সেই পরমেশ্বর রুদ্রকেই আমি পুনঃপুনঃ নমস্কার করি।”

👉 “যো বৈ রুদ্রঃ’’  অর্থ- পরম সত্তা হিসেবে রুদ্রের প্রতিষ্ঠা। বাক্যে প্রথমে এসেছে - “যো বৈ রুদ্রঃ” এখানে “যো” সম্পর্কসূচক সর্বনাম এবং “রুদ্রঃ” তারই বিশেষ্যরূপ।

পাণিনির গুরুত্বপূর্ণ সূত্র—

“তৎপুরুষঃ সমানাধিকরণঃ কর্মধারয়ঃ” (পাণিনী ১/২/৪২)

কাশিকা ভাষ্যের ব্যাখ্যায় “সমানাবিধেয়ৌ পদৌ” অর্থাৎ- দুটি পদ একই সত্তাকে নির্দেশ করলে তাদের সমানাধিকরণ বলা হয়।

এই মন্ত্রে “যো” এবং “রুদ্রঃ” দুটিই এক এবং একই সত্তাকে প্রকাশ করছে। ফলে মন্ত্র প্রথমেই বলছে- “যিনি,  তিনি রুদ্র।” এবং “রুদ্রই পরমেশ্বর।

👉 এরপর আছে- “স ভগবান”। এখানে “স” (সে/তিনি) পূর্বোক্ত “যো রুদ্রঃ”-এর প্রতিই ফিরে যায়। এটিও সামানাধিকরণ কারণ “স” এবং “রুদ্রঃ” একই সত্তাকে নির্দেশ করছে।

অতএব অর্থ দাঁড়ায়- “যিনি রুদ্র, তিনিই ভগবান।” এখানে রুদ্রকে পরমেশ্বরত্ব প্রতিপাদন পাণিনীয়ভাবে স্বীকৃত হয়ে যায়।

👉 তৃতীয় অংশ “যশ্চ বিষ্ণুঃ”। এখানে “যঃ” আবার সেই একই সম্পর্কসূচক সর্বনাম, অর্থাৎ পূর্বোক্ত সত্তা রুদ্রকেই নির্দেশ করছে। এখানে পুণরায় প্রযোজ্য— “সমানাধিকরণঃ (১/২/৪২)”। “রুদ্রঃ” ও “বিষ্ণুঃ” উভয়েরই বিভক্তি ও কারক একই (প্রথমা), এবং উভয়ই একই ব্যক্তিকে নির্দেশ করছে। ফলে শাস্ত্রীয়ভাবে অর্থ হয়—

“রুদ্রই বিষ্ণু-স্বরূপে প্রকাশিত।”

এখানে বিষ্ণু কোনো স্বতন্ত্র সত্তা নয়, তিনি রুদ্রের এক প্রকাশ, এক রূপ, এক নাম। এটি ব্যাকরণিকভাবে এতই সুস্পষ্ট যে কোনো তর্কের অবকাশ নেই। যা দুটি পদ সমানাধিকরণে ব্যবহৃত হয়, তারা একই সত্তা।

তিনটি সমানাধিকরণ-পদ যুক্ত হলে চূড়ান্ত ব্যাকরণগত অর্থ—

(যো রুদ্রঃ) যিনি রুদ্র। (স ভগবান) তিনিই ভগবান রুদ্র। (যশ্চ বিষ্ণুঃ) এবং তিনিই বিষ্ণু-রূপে প্রকাশিত।

অতএব সমগ্র অন্বয়—

“যিনি রুদ্র, তিনিই ভগবান, এবং তিনিই বিষ্ণু স্বরূপে প্রকাশিত।”

ব্যাকরণগতভাবে দেখা যায়, subject (কর্তৃ) একমাত্র রুদ্র। সব বিশেষণ, প্রতিশব্দ, সম্পর্কবাচক পদ রুদ্রের উপর গিয়ে পতিত হচ্ছে।

👉 এর পরের বাক্য- “তস্মৈ বৈ” রুদ্ররূপী সেই পরমেশ্বরকেই প্রণাম। এখানে দত্তি একবচন। তস্মৈ = “যাঁকে (আগে বর্ণনা করা হয়েছে) সেই এক পরমসত্তাকে।”

পাণিনীয় অন্বয়-নীতিতে সম্পর্কসূচক সর্বনাম সর্বদা নিকটতম পূর্বোক্ত সত্তা-এর মুখাপেক্ষী হয় এবং যেহেতু পূর্বোক্ত সত্তা রুদ্রই “তাঁকেই” অর্থাৎ সেই রুদ্রকেই প্রণাম।

👉 শেষ পদদ্বয়- “নমো নমঃ” - “সেই পরমেশ্বর রুদ্রকেই আমি পুনঃপুনঃ নমস্কার করি।”

পাণিনীয় ব্যাকরণের প্রত্যক্ষ প্রয়োগে মন্ত্রের অন্বয় দাঁড়ায়—

“যে পরমেশ্বর রুদ্র, যিনি বিষ্ণু-স্বরূপে প্রকাশিত, সেই পরমেশ্বর রুদ্রকেই আমি পুনঃ পুনঃ নমস্কার করি।”

সূত্র- ১/২/৪২ (সামানাধিকরণ) তিনবার প্রয়োগে প্রতিষ্ঠিত হয়—

রুদ্র = ভগবান = বিষ্ণু = একই পরম সত্ত্বা শিব।

বাক্যের বিষয় রুদ্র, তিনি অপরিবর্তিত। “বিষ্ণু” একটি রূপ, পাণিনীয়ভাবে রুদ্রের বিশেষণ। প্রণাম (নমো নমঃ) রুদ্রকেই উদ্দেশ্য করে।

সুতরাং, ব্যাকরণিকভাবে এই মন্ত্রের অর্থ স্পষ্ট- রুদ্রই পরমেশ্বর, বিষ্ণুরূপেও তিনিই, এবং সেই রুদ্র-পরমেশ্বরকেই প্রণাম জানানো হচ্ছে।

👉 এছাড়াও বেদ বাক্যকে আমরা তখনই অপ্রমাণ বা অর্থবাদ বলে মেনে নিতে পারি যখন, সেই বেদ বাক্য অন্য শাস্ত্রের সাথে সামঞ্জস্যতা রাখবে না। কিন্তু, যখন অন্যান্য শাস্ত্রও একই বিষয়ে সমর্থন করে এবং শব্দপ্রমাণ উপস্থাপন করে তখন বেদ বাক্য খাঁটি প্রমাণ হিসেবেই গণ্য হবে। যেমন শতরুদ্রিয় সূক্ত শ্রুতি বলছে—

“নমঃ গিরিশয়ায় চ শিপিবিষ্টায় চ” [শুক্ল-যজুর্বেদ/১৬/২৯]

--গিরিতে নিবাসকারী রুদ্রকে নমস্কার, বিষ্ণুস্বরূপ ধারণকারী রুদ্রকে নমস্কার। এবং উক্ত মন্ত্রের ভাষ্যে আচার্যগণও বলছেন— 

--“শিপিবিষ্টায় বিষ্ণুরূপায় ‘বিষ্ণুঃ শিপিবিষ্টঃ’ ইতি শ্রুতেঃ” ।। (মহীধর ভাষ্য)

--”বিষ্ণুমূর্তিধারী শিপিবিষ্টঃ” ।। (সায়ণভাষ্য/তৈত্তিরীয় সংহিতা ৪/৫/৫)

উক্ত ভাষ্য থেকেও একই সমর্থন পাওয়া যায় যে- পরমেশ্বর শিবই বিষ্ণুস্বরূপ ধারণকারী। এবং আচার্যের বচনও যদি বেদের পরিপন্থী হয় তবে তা বেদের ন্যায় প্রামাণ্য। পূর্বমীমাংসা বলে—

“তুল্যম্‌ চ সাম্প্রদায়িকম্‌” [পূর্বমীমাংসা ১/২/৮]

--“যেমন বিধিবাক্য ও অর্থবাদবাক্যের মধ্যে পারস্পরিক সংযোগের দ্বারা অর্থবাদ প্রামাণ্যতা লাভ করে, তেমনি আচার্যপরম্পরায় গৃহীত ও প্রমাণিত যেসব ব্যাখ্যা বা প্রথা আছে, সেগুলিও তদ্রূপ সমানভাবে প্রামাণ্য বলে স্বীকৃত।” -যেহেতু আচার্যদের ভাষ্যও বেদের বিরোধী নয় তাই আচার্যদের উক্ত ভাষ্যও বেদের ন্যায় প্রমাণ। এই প্রসঙ্গে পূর্বমীমাংসা বলছে—

“অবিরুদ্ধম্‌ পরম্‌” [পূর্বমীমাংসা ১/২/৪৪]

--যে ব্যাখ্যা বা অনুমান (পরম্) গ্রহণ করা হচ্ছে, তা যদি বেদের বিধান বা যুক্তির সঙ্গে বিরোধ না করে, তবে সেই ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য।

একই প্রসঙ্গে পুর্বমীমাংসা বলে— 

“শাস্ত্রদৃষ্টবিরোধাচ্চ"  [পূর্বমীমাংসা ১/২/২]

--বেদের যেসব অংশ ‘কর্ম নির্দেশ’ দেয় না এবং যেগুলো প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা বা যুক্তির সঙ্গে বিরোধ করে, সেগুলোর স্থায়ী মূল্য নেই, সেই জন্যই তারা অনিত্য বা অনর্থক বলে গণ্য হয়।

কিন্তু, এক্ষেত্রে অন্যান্য শ্রুতি ও আচার্যগণের ভাষ্য একই প্রমাণ দেয় যে- শিবই বিষ্ণুস্বরূপ ধারণ করেন। তাই এক্ষেত্রে- উক্ত মন্ত্র শ্রুতি, ব্যাকরণ, মীমাংসা ও আচার্যদের ভাষ্যের বিরোধ না হওয়ার জন্য “শিবই বিষ্ণু স্বরূপে প্রকাশিত হন” এমন মেনে নেওয়ায় ন্যায় সঙ্গত। তাই পূর্বমীমাংসা অনুযায়ী— 

"বাক্যনিয়মাৎ" [পূর্বমীমাংসা ১/২/৩২] — অর্থাৎ বাক্যের নিয়ম থেকে অর্থ নির্ধারিত হয়। তাহলে পূর্বমীমাংসা অনুযায়ী উক্ত মন্ত্রের অর্থ হবে— 

“যো বৈ রুদ্রঃ স ভগবান্‌ যশ্চ বিষ্ণুঃ তস্মৈ বৈ নমো নমঃ”।।
 
--(যো বৈ রুদ্রঃ স ভগবান্‌) যে পরমেশ্বর রুদ্র (যশ্চ বিষ্ণুঃ) বিষ্ণুস্বরূপে প্রকাশিত (তস্মৈ বৈ নমো নমঃ) সেই পরমেশ্বর রুদ্রকে পুনঃ পুনঃ নমস্কার।।


👉বৈষ্ণবদের এমন বালখিল্য হাস্যকর দাবীর উপর বেশ কিছু প্রশ্ন উঠে আসে—

‘স্ত্রীগৌরী’ শব্দটি কি ব্যাকরণগতভাবে স্বাভাবিক গঠন? যদি “গৌরী স্ত্রী যস্য সঃ” অর্থে বহুব্রীহি সমাস গৃহীত হয়, তবে পাণিনীয় নিয়ম অনুযায়ী- ‘গৌরী’ একটি ঈকারান্ত স্ত্রীলিঙ্গ শব্দ, এটি এখানে উপসর্জন। সুতরাং “গোস্ত্রিয়োরুপসর্জনস্য” (১/২/৪৮) সূত্র অনুযায়ী ঈ-কার হ্রস্ব হওয়া বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ, শুদ্ধ রূপ হওয়ার কথা স্ত্রীগৌরি, স্ত্রীগৌরী নয়। যদি পাণিনির নিয়মেই চলতে হয়, তবে সহস্রনামে দীর্ঘ ঈ-কারযুক্ত ‘স্ত্রীগৌরী’ কেন ব্যবহৃত হলো?

তাহলে কি পাণিনীয় নিয়ম এখানে কার্যকর নয়? 
যদি বলা হয়- এই শব্দটি পাণিনীয় সাধারণ নিয়ম মানে না, তবে অনিবার্যভাবে স্বীকার করতে হয় যে এটি নিপাতনে সিদ্ধ / পৃষোদরাদি শ্রেণিভুক্ত। পাণিনির স্পষ্ট সূত্র আছে- “পৃষোদরাদীনি যথোপদিষ্টম্” (৬/৩/১০৯) অর্থাৎ, ঋষি-প্রযুক্ত কিছু শব্দ ব্যাকরণের সাধারণ নিয়মের বাইরে অবস্থান করে এবং সেগুলোকে যেমন আছে তেমনই গ্রহণ করতে হয়। যদি ‘স্ত্রীগৌরী’ পৃষোদরাদি হয়, তবে সেখানে কৃত্রিমভাবে সমাস বিচ্ছেদ করে “গৌরী অর্থ পত্নী” অর্থ চাপিয়ে দেওয়ার অধিকার কোথা থেকে এলো?

বহুব্রীহি অর্থই কি ‘পত্নী’? বহুব্রীহি সমাসে কেবল সম্পর্ক বোঝায়, পত্নীত্ব নয়। উদাহরণ- পীতাম্বরঃ অর্থ- যাঁর পীতাম্বর আছে। চক্রপাণিঃ অর্থ- যাঁর চক্র হাতে। নীলকণ্ঠঃ অর্থ- যাঁর কণ্ঠ নীল। কিন্তু, “যাঁর গৌরী আছে” গৌরী স্ত্রী এই সিদ্ধান্ত কোথা থেকে এল? গৌরী শব্দটি কি কেবলমাত্র “স্ত্রী/পত্নী” অর্থেই ব্যবহৃত হয়? না কি এটি- দীপ্তি, শুভ্রতা, কল্যাণশক্তি, শ্রী-তত্ত্ব এই অর্থগুলিতেও বহুল ব্যবহৃত?

সহস্রনামের প্রসঙ্গে ‘গৌরী’ কি দেবী পার্বতী হতেই হবে? বিষ্ণু সহস্রনাম একটি নামবাচক স্তোত্র, যেখানে বহু শব্দ- গুণবাচক, তত্ত্ববাচক, শক্তিবাচক, উপাসনামূলক। যেমন- শ্রীপতি, বিশ্বধূরন্ধর, শিশু, ব্রহ্মা, যোগিনীগ্রস্থ, রুদ্রচণ্ডী, মেষরূপশঙ্করবাহন, মহাশিব, বামাচার,  ঐরাবত, উচ্চৈঃশ্রবা আদি আদি। এখানে ‘গৌরী’ শব্দকে কেন হঠাৎ ব্যক্তিবিশেষ (পার্বতী) হিসেবে ধরতে হবে? যদি ‘গৌরী’ অর্থই পার্বতী হয়, তবে ‘শ্রী’, ‘লক্ষ্মী’, ‘মহামায়া’ এই শব্দগুলিও কি সর্বত্র ব্যক্তি-দেবী হিসেবেই নিতে হবে?

শাস্ত্রবিরোধী পরিণতি কি বৈষ্ণবরা স্বীকার করবেন? যদি সত্যিই গৌরী অর্থ পার্বতী আর স্ত্রীগৌরী অর্থ বিষ্ণুর পত্নী হয়, তাহলে- অনিবার্যভাবে দাঁড়ায় পার্বতী শিবের পত্নী নন পুরাণ, উপনিষদ, আগম, মহাভারত সব ভ্রান্ত শিব-পার্বতী বিবাহ মিথ্যা। একটি দুর্বল ব্যাকরণগত কৌশল রক্ষা করতে গিয়ে কি সম্পূর্ণ শৈব-শাক্ত শাস্ত্রপরম্পরাকে অস্বীকার করা যুক্তিসঙ্গত ?

‘স্ত্রীগৌরী’ শব্দের উপর ভিত্তি করে গৌরীকে বিষ্ণুর পত্নী প্রমাণের চেষ্টা ব্যাকরণগতভাবে অসঙ্গত। পাণিনীয় সূত্রের নির্বাচনী ব্যবহার, পৃষোদরাদি নীতির লঙ্ঘন এবং সর্বোপরি শাস্ত্রসমষ্টির বিরুদ্ধে এটি শাস্ত্রার্থ নয়, বরং পূর্বনির্ধারিত ছলনাময় মতকে ব্যাকরণ দিয়ে জোর করে প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টা। বৈষ্ণবদের মাথায় রাখা উচিত যে- ব্যাকরণ শাস্ত্রের দাস, শাস্ত্র ব্যাকরণের নয়।
__________________________________________________

এবার “উমাপতি” শব্দে মহাভারতে শিবকেই বোঝানো হয়, তার প্রমাণ দেখুন। 

[প্রসঙ্গ : শ্রীকৃষ্ণ পুত্রলাভের আশায় শিব আরাধনা করে তপস্যা করেন, তখন মহাদেব তার পত্নী উমার সহিত সেখানে আবির্ভূত হয়ে শ্রীকৃষ্ণ কে বরদান করেন। শিব চরণে শ্রীকৃষ্ণ  নিজের মাথা নিচু করে স্পর্শ করে দণ্ডবৎ প্রণাম করেন। তখন উমাদেবীকে মা বলে সম্বোধন করেন, উমাদেবী শ্রীকৃষ্ণ কে বরদান দেন। এই বর্ণনা তিনি নিজে উপমন্যু শৈবাচার্য কে বলছিলেন]

🔶 শ্রীকৃষ্ণের তপস্যা পূর্ণ হতেই উমা সহ শিব আবির্ভূত হবাৎ বিষয়ে শ্রীকৃষ্ণ যা দেখেছিলেন তা বর্ণনা করছেন‌—

তত্র স্থিতশ্চ ভগবান্ দেব্যা সং মহাদ্যুতিঃ।
তপসা তেজসা কান্ত্যা দীপ্তয়া সহ ভার্য্যয়া ॥ ৩৮১ ॥
ররাজ ভগবাংস্তত্র দেব্যা সহ মহেশ্বরঃ।
সোমেন সহিতঃ সূর্য্যো যথা মেঘস্থিতস্তথা ॥ ৩৮২ ॥

[বিশ্ববাণী প্রকাশনীর ‘মহাভারত/অনুশাসন পর্ব/১৩ অধ্যায়]

অর্থ‌ — তপস্যা, তেজ ও কান্তিদ্বারা উজ্জ্বলা ভার্য্যা পার্বতীর সহিত মহাতেজা ভগবান্ মহাদেব সেই তেজঃপুঞ্জের মধ্যে অবস্থান করছিলেন ॥ ৩৮১ ॥

চন্দ্রের সহিত সন্ধ্যারাগরঞ্জিত, মেঘের উপরে স্থিত সূর্য্যের মতো পার্বতীর সহিত ভগবান মহেশ্বর সেই তেজঃপুঞ্জ মধ্যে শোভা পাচ্ছিলেন ॥ ৩৮২ ॥



🔶 শ্রীকৃষ্ণ শিবচরণে ও তার পত্নী উমাকে মা সম্বোধন করে তাঁর চরণেও নিজের মস্তক স্পর্শ করে প্রণাম  করেছেন, দেখুন 👇 

কৃষ্ণ উবাচ।

মৃদ্ধা নিপত্য প্রণতস্তেজঃ সন্নিচয়ে ততঃ।

পরমং হর্ষমাগত্য ভগবন্তমথাক্রবম্ ॥১॥

ধর্ম্মে দৃঢ়ত্বং যুধি শত্রুঘাতং যশস্তথা গ্র্যং পরমং বলঞ্চ।

যোগপ্রিযত্বং তব সন্নিকর্ষং বৃণে সুতানাঞ্চ শতং শতানি ॥২॥

এবমত্ত্বিতি তদ্বাক্যং ময়োক্তঃ প্রাহ শঙ্করঃ।

ততো মাং জগতো মাতা ধারিণী সর্বপাবনী ॥ ৩ ॥

উবাচ উমা প্রণিহিতা সর্ব্বাণী তপসাং নিধিঃ।

দত্তো ভগবতা পুত্রঃ শাম্বো নাম তবানঘ! ॥ ৪ ॥ 

মত্তোহপ্যষ্টে। বরানিষ্টান গৃহাণ ত্বং দদামি তে।

প্রণম্য শিরসা সা চ ময়োক্তা পাণ্ডুনন্দন! ॥ ৫ ॥

[বিশ্ববাণী প্রকাশনীর ‘মহাভারত/অনুশাসন পর্ব/১৪ অধ্যায়]

অর্থ — কৃষ্ণ বললেন, ‘তারপর আমি (কৃষ্ণ) অত্যন্ত আনন্দলাভ করে (পরমেশ্বর শিবের সামনে) ভূমিতে পতিত হয়ে নিজের মস্তক দ্বারা শিবের শ্রীচরণ স্পর্শ করে দণ্ডবৎ প্রণাম করলাম এবং তেজোরাশির মধ্যে অবস্থিত ভগবান্ মহাদেবকে বললাম, ॥ ১ ॥

(শ্রীকৃষ্ণ বললেন) ধর্ম অনুষ্ঠানে দৃঢ়তা, যুদ্ধে শত্রুসংহাব, উত্তম যশ, উৎকৃষ্ট বল, যোগ অনুষ্ঠানে প্রীতি, আপনার (শিবের) সান্নিধ্য এবং দশসহস্র পুত্র আমি বরণ করি' ॥ ২ ॥

আমি এই কথা বলবার পর, ভগবান মহাদেব বললেন-'তাই হবে'। তার পর জগন্মাতা, জগদ্ধাত্রী, সর্ব্বপাবনী, তপস্যার নিধি ও মহাদেবের পত্নী উমাদেবী আমার মঙ্গল করবার জন্য প্রশিহিত হয়ে আমাকে বললেন, নিষ্পাপ কৃষ্ণ! ভগবান্ মহাদেব 'শাম্ব' নামে একটা পুত্র তোমাকে দান করলেন ॥ ৩-৪ ॥

আমার কাছ থেকেও অভীষ্ট আটটি বর গ্রহণ করো, আমিও সেগুলি তোমাকে দান করছি।' হে পাণ্ডুনন্দন ! তখন আমি আমার মস্তক দ্বারা উমাদেবীর চরণ স্পর্শ করে তাঁকেও প্রণাম করে বললাম,॥ ৫ ॥

__________________________________________________



রুদ্র হৃদয় উপনিষদে রুদ্র শব্দে শিব‌ই বোঝানো হয়েছে, কারণ ঐ রুদ্র যখন ব্রহ্মার রূপধারণ করেন, উমা তখন সরস্বতীর রূপ ধারণ করেন। এইভাবে রুদ্র যখন বিষ্ণুর রূপধারণ করেন, উমা তখন লক্ষ্মীর রূপ ধারণ করেন। তাই এখানে স্পষ্টত বিষ্ণু কখনোই উক্ত রুদ্র শব্দের বাচিত সত্ত্বা নন, উমার স্বামীও রুদ্র ছাড়া অন্য কেউ নন। কারণ এখানে, শিব রূপধারণ করে ব্রহ্মা হচ্ছেন, বিষ্ণু হচ্ছেন। এখানে বিষ্ণু ব্রহ্মা হচ্ছেন না, শিব হচ্ছেন না। তাই রুদ্র হৃদয় উপনিষদের মন্ত্রে শিব‌ই উমার স্বামী।  প্রমাণ দেখুন 👇 

রুদ্রো নর উমা নারী তস্মৈ তস্মৈ নমো নমঃ ॥ ১৭ ॥

রুদ্রো ব্রহ্মা উমা বাণী তস্মৈ তস্মৈ নমো নমঃ ।

রুদ্রো বিষ্ণুরুমা লক্ষ্মীস্তস্মৈ তস্মৈ নমো নমঃ ॥ ১৮ 

রুদ্রঃ সূর্য উমা ছায়া তস্মৈ তস্মৈ নমো নমঃ ।

রুদ্রঃ সোম উমা তারা তস্মৈ তস্মৈ নমো নমঃ ॥ ১৯ 

রুদ্রো দিবা উমা রাত্রিস্তস্মৈ তস্মৈ নমো নমঃ ।

রুদ্রো যজ্ঞ উমা বেদিস্তস্মৈ তস্মৈ নমো নমঃ ॥ ২০ 

রুদ্রো বহ্নিরুমা স্বাহা তস্মৈ তস্মৈ নমো নমঃ ।

রুদ্রো বেদ উমা শাস্ত্রং তস্মৈ তস্মৈ নমো নমঃ ॥ ২১ 

রুদ্রো বৃক্ষ উমা বল্লী তস্মৈ তস্মৈ নমো নমঃ ।

রুদ্রো গন্ধ উমা পুষ্পং তস্মৈ তস্মৈ নমো নমঃ ॥ ২২ 

রুদ্রোঽর্থ অক্ষরঃ সোমা তস্মৈ তস্মৈ নমো নমঃ ।

রুদ্রো লিঙ্গং উমা পীঠং তস্মৈ তস্মৈ নমো নমঃ ॥ ২৩ 

সর্বদেবাত্মকং রুদ্রং নমস্কুর্য়াৎ পৃথক্ পৃথক্ ।

এভির্মংত্রপদৈরেব নমস্যামীশাপার্বতীম্ ॥ ২৪ 

যত্র যত্র ভবেৎসার্ধমিমং মন্ত্রমুদীরয়েৎ ।

ব্রহ্মহা জলমধ্যে তু সর্বপাপৌঃ প্রমুচ্যতে ॥ ২৫ 


অর্থ —  নর (পুরুষ) রূপে যে রুদ্র রয়েছেন ও নারী রূপে যে উমা রয়েছেন, সেই সেই রূপে পরমেশ্বর শিব ও পার্বতীকে নমস্কার করি ॥ ১৭

ব্রহ্মা রূপে যে রুদ্র রয়েছেন ও বাণী(সরস্বতী) রূপে যে উমা রয়েছেন, সেই সেই রূপে পরমেশ্বর শিব ও পার্বতীকে নমস্কার করি ।

বিষ্ণু রূপে যে রুদ্র রয়েছেন ও লক্ষ্মী রূপে যে উমা রয়েছেন, সেই সেই রূপে পরমেশ্বর শিব ও পার্বতীকে নমস্কার করি ॥ ১৮

সূর্য রূপে যে রুদ্র রয়েছেন ও ছায়া রূপে যে উমা রয়েছেন, সেই সেই রূপে পরমেশ্বর শিব ও পার্বতীকে নমস্কার করি ।

সোম(চন্দ্র) রূপে যে রুদ্র রয়েছেন ও তারা রূপে যে উমা রয়েছেন, সেই সেই রূপে পরমেশ্বর শিব ও পার্বতীকে নমস্কার করি ॥ ১৯

দিন রূপে যে রুদ্র রয়েছেন ও রাত্রি রূপে যে উমা রয়েছেন, সেই সেই রূপে পরমেশ্বর শিব ও পার্বতীকে নমস্কার করি ।

যজ্ঞ রূপে যে রুদ্র রয়েছেন ও বেদি রূপে যে উমা রয়েছেন, সেই সেই রূপে পরমেশ্বর শিব ও পার্বতীকে নমস্কার করি ॥ ২০

বহ্নি(অগ্নি) রূপে যে রুদ্র রয়েছেন ও স্বাহা রূপে যে উমা রয়েছেন, সেই সেই রূপে পরমেশ্বর শিব ও পার্বতীকে নমস্কার করি ।

বেদ রূপে যে রুদ্র রয়েছেন ও শাস্ত্র রূপে যে উমা রয়েছেন, সেই সেই রূপে পরমেশ্বর শিব ও পার্বতীকে নমস্কার করি ॥ ২১

বৃক্ষ রূপে যে রুদ্র রয়েছেন ও বল্লী(লতা) রূপে যে উমা রয়েছেন, সেই সেই রূপে পরমেশ্বর শিব ও পার্বতীকে নমস্কার করি ।

গন্ধ রূপে যে রুদ্র রয়েছেন ও পুষ্প রূপে যে উমা রয়েছেন, সেই সেই রূপে পরমেশ্বর শিব ও পার্বতীকে নমস্কার করি ॥ ২২

অর্থ রূপে যে রুদ্র রয়েছেন ও অক্ষর রূপে যে উমা রয়েছেন, সেই সেই রূপে পরমেশ্বর শিব ও পার্বতীকে নমস্কার করি ।

লিঙ্গ রূপে যে রুদ্র রয়েছেন ও পীঠ রূপে যে উমা রয়েছেন, সেই সেই রূপে পরমেশ্বর শিব ও পার্বতীকে নমস্কার করি ॥ ২৩

এই প্রকারে সমস্ত দেবতাদের রূপে অদ্বিতীয় পরমেশ্বর রুদ্র-শিবকেই পৃথক পৃথক ভাবে প্রণাম করে থাকি । এই মন্ত্রসমূহের দ্বারা আমিও ঈশ(শিব)-পার্বতীকে নমস্কার করি ॥ ২৪

মনুষ্যদের উচিত তারা যেখানে যেখানে যাক সেখানে সেখানে এই অর্ধনারীশ্বরের মন্ত্র যেন জপ করতে থাকে । ব্রহ্মহত্যাকারী ব্যক্তিও যদি জলে প্রবেশ করে সেখানে দাঁড়িয়ে এই মন্ত্র জপ করে তবে সে সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হয়ে যায় ॥ ২৫

(শ্রুতির এই বাক্য‌ই শিবমহাপুরাণ/বায়বীয় সংহিতা/উত্তর খণ্ড/অধ্যায় ৪ -তে উপস্থিত)


শ্রুতিবাক্য সর্বোপরি মান্য, তাই যেহেতু শ্রুতিতে রুদ্রের একটি নাম বিষ্ণু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই এই সিদ্ধান্ত ই সর্বোচ্চ, শ্রুতি বচন পুরাণ বা ইতিহাসের বচন দ্বারা খণ্ডিত করা অসম্ভব। 


শাস্ত্র প্রমাণ, কাহিনীর শব্দপ্রমাণ, ব্যাকরণ গত প্রমাণ ও ন্যায় শাস্ত্রের ন্যায় বিচারে উমাপতি যে শিব‌ই, তা প্রমাণিত।

কিন্তু এবার ✋ থামুন, আর ভাবুন, আজকে যদি এটাও প্রমাণ করতে হয় যে উমাপতি বলতে শিবকেই বোঝানো হয়, আর যদি কেউ পরমত্ব প্রমাণের লড়াইয়ে দার্শনিক ব্যাখ্যা ছেড়ে না কোনো দেবদেবীর দাম্পত্য সম্পর্ককে বদলে দিতে চায় তাহলে সেটি আর পরমত্বের বিচারের লড়াই থাকে না, তখন সেটি কুরুচিপূর্ণ নীচ মানসিকতার সর্বোচ্চ নিকৃষ্টতম মনোভাবের পরিচয়। 

লক্ষ্মীপতি বলতে যে শ্রী বিষ্ণু, তা আমরা শৈবরা স্বীকার করি তথা সর্বজন বিদিত। এটি প্রমাণের জন্য আলাদা যুক্তির প্রয়োজন নেই। কিন্তু শিব পরমত্ব প্রমাণের জন্য যদি কেউ লক্ষ্মীর দাম্পত্য স্বামী বলতে সাক্ষাৎ শিব‌ইকে ইঙ্গিত করেন তবে তা স্বয়ং ধর্ম বিরুদ্ধ বচন হয়ে যায়। 

 শাস্ত্রের প্রমাণ অনুযায়ী, প্রভু শিব বিষ্ণুরূপে লীলা করেন, আর দেবী অম্বিকাও লক্ষ্মীদেবীরূপে লীলা করেন। কিন্তু তা বলে সরাসরি প্রভু শিবকে লক্ষ্মীর দাম্পত্য স্বামী বলা কখনোই যুক্তিসম্মত নয়। ধর্মে পরিভাষা বদলে দেওয়াতে কখনোই ধর্মলাভ হয় না। তাই পরমত্ব প্রমাণের ভিত্তি হল দর্শন, কিন্তু সেই লড়াই যখন ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে তখন তা আর ধর্মীয় সুস্থ আলোচনা থাকে না। তখন তা হয়ে ওঠে পৈশাচিকতা, যা এই কু লাঙ্গার অশোক স রকারের মস্তিষ্কে  বিদ্যমান।


আমরা বিষ্ণুপরমত্বের খণ্ডন করে শিবপরমত্বকে প্রকৃত সত্য প্রমাণ করবার জন্য শাস্ত্রপ্রমাণ দ্বারা দার্শনিক আলোচনা করতে পারি, কিন্তু কেউ যদি দার্শনিক আলোচনায় অক্ষম হয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণ করে, তবে সে আর ধার্মিক থাকেন না, একজন সাধারণ মানুষ হবার‌ও যোগ্যতা তিনি হারিয়ে ফেলেন, পণ্ডিত হ‌ওয়া তো অনেক দূরের কথা। 

__________________________________________________



অতএব, বৈষ্ণবীয় আরো একটি শিববিরোধী অপপ্রচার খণ্ডিত হলো।


  ———সর্বে হ্যেষ রুদ্রস্তস্মৈ রুদ্রায় নমো অস্তু———

নমঃ শিবায় 🙏
নমঃ শিবায়ৈ 🙏
শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তে ✊🚩

✍️অপপ্রচার দমনে— অন্তিক ভট্টাচার্য্য (শম্বরনাথ শৈব)।

🌻কৃতজ্ঞতা— আমার গুরু শ্রী নন্দীনাথ শৈবাচার্য ও আমার আদর্শ রোহিত কুমার চৌধুরী শৈবজী। 

কপিরাইট ও প্রচারে— Shivalaya (ISSGT)।

বি: দ্র:— লেখাটি অনুকরণ করলে সম্পূর্ণ করবেন কোনো কাটাছেঁড়া করা যাবেনা।

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ