সরস্বতী কি শুধুই নদী নাকি নারীরূপী দেবী ? জানুন বেদের উত্তর ।
🔥 সরস্বতী কি শুধুই নদী নাকি নারীরূপী দেবী ? জানুন বেদের উত্তর ।
🔰 ভূমিকা —
বৈদিক যুগে সরস্বতীকে প্রধানত একটি মহিমান্বিত নদী হিসেবে পূজিত ও বন্দিত করা হতো—এ কথা সর্বজনস্বীকৃত। তবে পরবর্তীকালে একটি প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা গড়ে উঠেছে, যেখানে ভৌত নদী ও আধ্যাত্মিক দেবী সরস্বতীর মধ্যে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা আছে বলে মনে করা হয়। কেউ কেউ দাবি করেন যে সরস্বতী কেবলমাত্র একটি ভৌগোলিক সত্তা, এবং বিদ্যা, কলা ও বাক্শক্তির অধিষ্ঠাত্রী দেবীর সঙ্গে তাঁর কোনো অন্তর্নিহিত সম্পর্ক নেই। বর্তমানে নাস্তিক বা আর্যসমাজ তথা অসনাতনি দের দ্বারা এই দাবীগুলি সমাজে ছড়িয়ে পড়ছে।
আজকের এই লেখার উদ্দেশ্য হলো - নাস্তিক বা আর্যসমাজ তথা অসনাতনিদের উক্ত দাবিগুলিকে সুসংগঠিতভাবে খণ্ডন করা। শাস্ত্রগ্রন্থসমূহ পর্যালোচনা করে আমি দেখাবো যে, সরস্বতী নদী ও দেবী সরস্বতী কোনো পৃথক বা পরস্পরবিরোধী সত্তা নন ; বরং তাঁরা একই দিব্য তত্ত্বের দুইটি গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ প্রকাশমাত্র।
এটি একটি প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সত্য যে, বৈদিক যুগে সরস্বতী এক মহাশক্তিশালী, চিরপ্রবাহী নদী হিসেবে পূজিত ও সম্মানিত ছিলেন। কিন্তু সরস্বতীকে কেবলমাত্র একটি ভৌগোলিক সত্তা বলে গণ্য করা এবং বিদ্যার অধিষ্ঠাত্রী দেবী (বিদ্যাধিষ্ঠাত্রী) ও বাক্শক্তির অধিষ্ঠাত্রী দেবী (বাগাধিষ্ঠাত্রী) হিসেবে তাঁর ভূমিকা অস্বীকার করা নিঃসন্দেহে গভীর অজ্ঞতারই প্রকাশ।
তাহলে,
🕉️ সরস্বতীকে ব্যক্তিবিশেষ দেবী হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রমাণ কী ?
☘️ চলুন আপনাকে দেখিয়ে দিই সেই অকাট্য বেদমন্ত্রে উপলব্ধ শ্রুতিপ্রমাণ।
♦️ ঋগ্বেদের শাকল শাখার ১.৩.১০, ১.৩.১১ ও ১.৩.১২ — এই সরস্বতী মন্ত্র সূক্তসমূহে, যা সরস্বতীর উদ্দেশ্যে নিবেদিত, সেখানে প্রথম মন্ত্রটি অন্বারম্ভণীয়েষ্টি (প্রারম্ভিক যজ্ঞ)-তে সরস্বতীর জন্য পুরোনুবাক্যা (আহ্বানসূচক মন্ত্র) হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
এই বিধানটি দর্শপূর্ণমাসাবারপ্স্যমাণঃ অংশে নির্দিষ্ট করা হয়েছে, যেখানে সূত্রে বলা হয়েছে —
“পাবকা নঃ সরস্বতী পাবীরবী কন্যা চিত্রায়ুঃ”
[আশ্বলায়ন শ্রৌতসূত্র/২/৮]
অর্থাৎ, যজ্ঞীয় বিধানে সরস্বতীকে আহ্বান করার জন্য নির্দিষ্ট মন্ত্র ও আচার নির্ধারিত হয়েছে, যা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে সরস্বতী কেবল একটি ভৌগোলিক নদী নন, বরং যজ্ঞে আহ্বেয় এক দেবীসত্তা হিসেবে স্বীকৃত।
🔸 ঋগ্বেদ/শাকল শাখা/১.৩.১০ —
পাবকা নঃ সরস্বতী বাজেভির্বাজিনীবতী ।
যজ্ঞং বষ্টু ধিয়াবসুঃ ॥ ১০
(ঋগ্বেদ সংহিতা/শাকল শাখা/১ম মণ্ডল/৩য় সূক্ত/১০ নং মন্ত্র)
✅ অর্থ — পবিত্রকারিণী সরস্বতী আমাদের পবিত্র করুন। তিনি অন্নদাত্রী, বল ও সমৃদ্ধিতে পরিপূর্ণা; যিনি যজ্ঞকে ধন ও প্রজ্ঞার দ্বারা অলংকৃত করেন। আমাদের নিবেদিত হব্য দ্বারা আকৃষ্ট হয়ে তিনি যেন এই যজ্ঞে উপস্থিত হন।
🔸 ঋগ্বেদ/শাকল শাখা/১.৩.১১ —
চোদয়িত্রী সূনৃতানাং চেতন্তী সুমতীনাং ।
যজ্ঞং দধে সরস্বতী ॥ ১১
(ঋগ্বেদ সংহিতা/শাকল শাখা/১ম মণ্ডল/৩য় সূক্ত/১১ নং মন্ত্র)
✅ অর্থ — সরস্বতী সত্যপ্রিয়দের প্রেরণাদাত্রী, সু-মনা ও সৎবুদ্ধিসম্পন্নদের চেতনা জাগ্রতকারিণী। তিনি আমাদের যজ্ঞকে ধারণ করেছেন এবং গ্রহণ করেছেন।
🔸 ঋগ্বেদ/শাকল শাখা/১.৩.১২ —
মহো অর্ণঃ সরস্বতী প্রচেতয়তি কেতুনা ।
ধিয়ো বিশ্বা বিরাজতি ॥ ১২
(ঋগ্বেদ সংহিতা/শাকল শাখা/১ম মণ্ডল/৩য় সূক্ত/১১ নং মন্ত্র)
✅ অর্থ — সরস্বতী তাঁর ঐশ্বর্য ও শক্তির দ্বারা এক মহান প্রবাহমান সত্তা (মহান নদীরূপে) নিজেকে প্রকাশ করেন, এবং একই সঙ্গে স্বরূপে অবস্থান করে সকল বুদ্ধি ও চেতনাকে দীপ্ত ও আলোকিত করেন।
উপরোক্ত মন্ত্র দুটির ব্যাখ্যায় সায়ণাচার্য চূড়ান্তভাবে বলেছেন যে, সরস্বতী দ্বিরূপে (দুইরূপে) বিদ্যমান — একদিকে তিনি বিগ্রহবৎ দেবতা অর্থাৎ ব্যক্তিস্বরূপ দেবী, এবং অন্যদিকে তিনি নদীরূপা।
পূর্ববর্তী শাকলশাখার দুটি ঋক্ মন্ত্রে (১.৩.১০-১১) -এ যেখানে তাঁর দেবীরূপের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, সেখানে এই তৃতীয় ঋক্টিতে (১.৩.১২) তাঁকে প্রবাহমান নদীরূপে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই রূপে সরস্বতী তাঁর নিজস্ব লক্ষণ বা কার্যকারণ দ্বারা (কেতুনা) — অর্থাৎ তাঁর প্রবাহ বা গতির মাধ্যমে — মহান জলরাশি বা বিপুল জলসমষ্টিকে (মহো অর্ণঃ) প্রত্যক্ষযোগ্য করেন, প্রকাশিত করেন বা অনুভবযোগ্য করে তোলেন (প্রচেতয়তি)।
__________________________________________________
🔶 মহর্ষি যাস্ক এই দ্বিরূপতাকেই নিশ্চিত করে দিয়েছেন ‘নিরুক্ত’তে।
তিনি বলেন —
তত্র সরস্বতীত্যেতস্য নদীবৎ দেবতাবচ্চ নিগমা ভবন্তি
(নিরুক্ত/২/২৩)
অর্থাৎ— সরস্বতী নামে এমন নিগম (বেদমন্ত্র) বিদ্যমান আছে যেখানে তাঁকে একদিকে নদীরূপে এবং অন্যদিকে দেবীরূপে অভিহিত করা হয়েছে।
🔸 নিরুক্ত গ্রন্থে সরস্বতীর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলা হয়েছে —
“মহদর্ণঃ সরস্বতী প্রচেতয়তি প্রজ্ঞাপয়তি কেতুনা কর্মণা প্রজ্ঞয়া বেমানি চ সর্বাণি প্রজ্ঞানান্যভিবিরাজতি।”
এর অর্থ — সরস্বতী তাঁর ক্রিয়া, প্রজ্ঞা ও জ্ঞানরূপ লক্ষণের দ্বারা মহৎ জলরাশি বা মহাসমুদ্রকে প্রত্যক্ষ ও বোধগম্য করে তোলেন; এবং তিনি সকল প্রকার জ্ঞান ও উপলব্ধির উপর দীপ্তিমান হয়ে বিরাজ করেন।
✨ অর্থগত তাৎপর্য —
এখানেও স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে সরস্বতী কেবল একটি ভৌত নদী নন, আবার কেবল বিমূর্ত দেবীতত্ত্বও নন—বরং নদীরূপ ও দেবীরূপ, এই দুই রূপেই তিনি একই দিব্য সত্তার প্রকাশ।
__________________________________________________
🔶 ঋগ্বেদে মহর্ষি ভরদ্বাজপ্রণীত সরস্বতীর উদ্দেশ্যে নিবেদিত একটি সূক্ত বিদ্যমান।
(তথ্যসূত্র : ঋগ্বেদ সংহিতা/শাকল শাখা/৬ষ্ঠ মণ্ডল/৬১ সূক্ত/১-১৪ নং মন্ত্র)
এই সরস্বতী সূক্তটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল — এতে সরস্বতীকে দুই ভিন্ন রূপে স্তব করা হয়েছে: প্রথমে তাঁকে ব্যক্তিস্বরূপ দেবী হিসেবে, এবং পরবর্তীতে নদীরূপে বর্ণনা করা হয়েছে। ঋগ্বিধান, বিভিন্ন শ্রৌতসূত্র এবং নিরুক্ত প্রভৃতি প্রাচীন প্রামাণ্য গ্রন্থসমূহ এই দ্বিরূপ স্বভাবকেই স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা ও সমর্থন করে।
🔸 শৌনক ঋষি তাঁর ঋগ্বিধান গ্রন্থে বলেন—
“ইয়মিত্যেতদাদ্যং তু সূক্তং সারস্বতং জপেৎ ।
দ্বিজঃ প্রাতঃ শুচির্ভূত্বা বাগ্মী ভবতি বুদ্ধিমান্ ॥”
(ঋগ্বিধান ২.২৯৫)
অর্থাৎ— এই সূক্তের প্রথম ঋক্টি (“ইয়ম্” দিয়ে শুরু) সরস্বতী-সূক্তরূপে প্রতিদিন প্রাতে শুদ্ধচিত্তে যে দ্বিজ ব্যক্তি জপ করেন, তিনি বাক্পটু (বাগ্মী) ও বুদ্ধিমান হয়ে ওঠেন।
✨ তাৎপর্য —
শৌনক ঋষির এই বক্তব্য স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে সরস্বতী এখানে কেবল নদীরূপে নয়, বরং বাক্শক্তি ও বুদ্ধির অধিষ্ঠাত্রী দেবী হিসেবেই উপাস্য—যার উপাসনা মানুষের বাগ্মিতা ও প্রজ্ঞা বৃদ্ধি করে।
__________________________________________________
🔸 এই সরস্বতী সূক্তের প্রথম মন্ত্রে (ঋগ্বেদ/শাকল শাখা/৬/৬১/১) সরস্বতীকে একজন দেবীরূপা ঐশ্বরিক সত্তা হিসেবে সম্বোধন করা হয়েছে, যিনি পুত্র, ঐশ্বর্য ও যজ্ঞীয় সাফল্য প্রদান করেন —
ইয়মদদাদ্রভসমৃণচ্যুতং দিবোদাসং বধ্র্যুশ্বায় দাশুষে ।
যা শশ্বন্তমাচখাদাবসং পণিং তা তে দাত্রাণি তবিষা সরস্বতি ॥ ১ ॥
(তথ্যসূত্র : ঋগ্বেদ সংহিতা/শাকল শাখা/৬ষ্ঠ মণ্ডল/৬১ সূক্ত/১ নং মন্ত্র)
✅ অর্থ — হে সরস্বতী, আপনি দানশীল যজমানকে অবিচল শক্তিসম্পন্ন দিবোদাসকে প্রদান করেছিলেন ; আপনি চিরস্থায়ী দাতা, যিনি দস্যু ও শত্রুদের ধ্বংস করেছেন। আপনার ঐশ্বর্য ও শক্তির দ্বারা প্রদত্ত এই দানসমূহই আপনার মহিমার প্রকাশ।
🔸 দ্বিতীয় মন্ত্র থেকে শুরু করে এই সূক্তে সরস্বতীকে নদীরূপে স্তব করা হয়েছে — এক বিশাল, প্রবল ও বিস্তৃত নদী হিসেবে, যিনি পর্বত ভেদ করে প্রবাহিত হন এবং ভূমিকে পুষ্ট করেন —
ইয়ং শুষ্মেভিবির্সখা ইবারুজৎ সানু গিরীণাং তবিষেভিরূমির্ভিঃ ।
পারাবতঘ্নীমবসে সুবৃক্তিভিঃ সরস্বতীমা বিবাসেম ধীতিভিঃ ॥ ২ ॥
(ঋগ্বেদ সংহিতা/শাকল শাখা/৬ষ্ঠ মণ্ডল/৬১ সূক্ত/২য় নং মন্ত্র)
✅ অর্থ — এই সরস্বতী তাঁর প্রবল শক্তিতে পর্বতসমূহের শিখর বিদীর্ণ করে অগ্রসর হন; তাঁর তেজস্বী তরঙ্গমালায় তিনি শত্রুনাশিনী। আমরা উত্তম স্তোত্র ও ধ্যানের মাধ্যমে এই সরস্বতী নদীকেই আশ্রয় করি।
🔳 সায়ণাচার্যের ব্যাখ্যা (২য় মন্ত্রে) —
সায়ণাচার্য এই দ্বিরূপ স্বভাব স্পষ্ট করে বলেন —
“ সরস্বতী দেবতারূপেণ নদীরূপেণ চ বর্ততে। দেবতারূপা স্তুতা। অধুনানয়া নদীরূপাং সরস্বতী স্তৌতি। ”
অর্থ : সরস্বতী দেবীরূপে এবং নদীরূপে — উভয়ভাবেই বিদ্যমান। পূর্বে দেবীরূপে তাঁর স্তব করা হয়েছে, আর এখন এই মন্ত্রে নদীরূপা সরস্বতীরই স্তব করা হচ্ছে।
__________________________________________________
💠 এখানে কেউ কেউ আপত্তি তুলতে পারেন যে উপরোক্ত আলোচনায় সরস্বতীকে স্পষ্টভাবে বাক্শক্তির অধিষ্ঠাত্রী (বাগধিষ্ঠাত্রী) এবং বিদ্যা-বুদ্ধির অধিষ্ঠাত্রী (বিদ্যাধিষ্ঠাত্রী) হিসেবে চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়নি।
কিন্তু ঋগ্বেদের শাকল শাখার ২য় মণ্ডলের ৩য় সূক্তের ৮ম মন্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ দেবীত্রয় — সরস্বতী, ইলা ও ভারতী — কে যজ্ঞবেদীতে অধিষ্ঠিত হওয়ার জন্য আহ্বান করা হয়েছে। মন্ত্রটি হল —
সরস্বতী সাধয়ন্তী ধিয়ং ন ইলা দেবী ভারতী বিশ্বতূর্তিঃ ।
তিস্রো দেবীঃ স্বধয়া বহির্রেদমচ্ছিদ্রং পান্তু শরণং নিষদ্য ॥ ৮ ॥
(ঋগ্বেদ সংহিতা/শাকল শাখা/২য় মণ্ডল/৩য় সূক্ত/৮ম মন্ত্র)
অর্থ : সরস্বতী, যিনি আমাদের বুদ্ধিকে সিদ্ধ ও পরিপূর্ণ করেন ; দিব্যা ইলা ; এবং সর্বত্র বিস্তৃত মহিমাময়ী ভারতী —এই তিন দেবী স্বধাশক্তির সঙ্গে আমাদের গৃহে (যজ্ঞস্থলে) আগমন করে আমাদের কল্যাণার্থে নিবেদিত এই নিষ্কলুষ যজ্ঞকে রক্ষা করুন এবং এটিকে আমাদের আশ্রয়রূপে স্থাপন করুন।
__________________________________________________
🔶 সায়ণাচার্য তাঁর প্রামাণিক ভাষ্যে এই দেবীসমূহের কার্যগত তত্ত্ব স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, সরস্বতীই হলেন সেই প্রধান শক্তি, যিনি আমাদের অন্তর্লীন প্রার্থনা, বুদ্ধি অথবা যজ্ঞকর্মকে — অর্থাৎ, আমাদের ধী (धियं), বুদ্ধি বা যাগ — সাধন ও সমাপ্ত করেন (সাধয়ন্তী, নিবর্তয়ন্তী)।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে, সায়ণাচার্য ব্যাখ্যা করেন যে “বিশ্বতূর্তিঃ” (Viśvatūrtih) উপাধিটি আসলে বাক্ (বাণী/বাক্শক্তি)-এর গুণবাচক বিশেষণ। এই বাক্শক্তি হলো সর্ববিষয়গত (সর্ববিষয়গতা)—অর্থাৎ জ্ঞান ও অস্তিত্বের সকল সম্ভাব্য বিষয়ের মধ্যেই ব্যাপ্ত ও পরিব্যাপ্ত।
🔹 এই অভিন্নতা আরও সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ-এ, যেখানে আহুতি প্রদানের যজ্ঞীয় বিধানে দেবীকে সরাসরি বাক্শক্তির সঙ্গে একাত্ম করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে —
অস্যা এবৈর্ন প্রতিষ্ঠায়োদ্যচ্ছতে ।
সরস্বত্যৈ স্বাহা
সরস্বত্যৈ বৃহত্যৈ স্বাহা
সরস্বত্যৈ পাবকায়ৈ স্বাহা হত্যাহ ।
বাগ্বৈ সরস্বতী ।
(তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ/কাণ্ড ৩/প্রপাঠক ৮)
অর্থাৎ — এই আহুতিগুলির দ্বারাই (যজ্ঞ) প্রতিষ্ঠিত হয়। ‘সরস্বতীর উদ্দেশ্যে স্বাহা’, ‘বৃহতী সরস্বতীর উদ্দেশ্যে স্বাহা’, ‘পাবকা সরস্বতীর উদ্দেশ্যে স্বাহা’ — এইভাবে বলা হয়। সরস্বতীই বাক্।
ব্রাহ্মণগ্রন্থটি এখানে দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করছে—
“বাগ্ বৈ সরস্বতী”—অর্থাৎ সরস্বতীই বাক্শক্তি।
__________________________________________________
🔶 শতপথ ব্রাহ্মণ (কাণ্ব শাখা ৩.২.১০.৩) -এ বলা হয়েছে —
“অনূকমেবাস্য সামিধেন্যস্তস্মাত্তা ব্রূয়াৎ সন্তন্বন্নিবমেঽনুব্রূহীতি সন্ততমিব হীদমনূকং মনশ্চ হৈবাস্য বাক্চাঘারৌ সরস্বাশ্চ সরস্বতী চ স বিদ্যান্মনশ্চৈব মে বাক্চাঘারৌ সরস্বাশ্চ সরস্বতী চেতি ॥ ৩ ॥”
এর অর্থ — এই মন্ত্রটি সামিধেনী (যজ্ঞকাষ্ঠ) হাতে নিয়ে ধারাবাহিকভাবে পাঠ করা উচিত। এজন্য বলা হয়— “আমার পরে নিরবচ্ছিন্নভাবে পাঠ করো”, কারণ এই পাঠের উদ্দেশ্য হলো অবিচ্ছিন্নতা রক্ষা করা। যেভাবে যজ্ঞে আহুতি নিরবচ্ছিন্নভাবে অর্পিত হয়, তেমনি এখানে মন ও বাক্ উভয়ই যজ্ঞকর্মে নিয়োজিত থাকে। এখানে মনই আহুতি এবং বাক্ও আহুতি। এই আহুতির অধিষ্ঠাত্রী দেবতা হলেন সরস্বান ও সরস্বতী। তাই যজমানের এই জ্ঞান থাকা উচিত — “আমার আহুতিসমূহ আসলে মন ও বাক্, এবং এদের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা সরস্বান ও সরস্বতী।”
🔶 শতপথ ব্রাহ্মণ (৪.৬.৩.৩, মধ্য্যন্দিন শাখা) এ বলা হয়েছে —
“অথাত স্তোমায়নস্যৈব ।
আগ্নেয়মগ্নিষ্টোম আলভেত…
বাগ্বৈ সরস্বতী যোষা বৈ বাগ্যোষা রাত্রিস্তদ্যথাযথং যজ্ঞক্রতূন্ ব্যাবর্তয়ত্যেতানি…”
এই অংশটি মূলত স্তোমায়ন (যজ্ঞসংক্রান্ত স্তব বা সূক্ত পাঠ) অনুযায়ী পশু আহুতির সঠিক প্রক্রিয়ার নির্দেশ দেয়। এভাবে যজ্ঞে পশু আহরণ করা হয় :
অগ্নিস্টোম (Agnistoma) যজ্ঞে প্রথমে আঘাতের (বলির) জন্য পশু নির্বাচিত ও অগ্নির উদ্দেশ্যে ধরা হয়। কারণ, এই যজ্ঞ মূলত অগ্নিদেবতাকে নিবেদিত।
ধাপে ধাপে দ্বিতীয় ও তৃতীয় পশু আহরিত হয় অন্যান্য দেবতা ও উদ্দেশ্যের জন্য।
চতুর্থ পশু আহৃত হয় সরস্বতী-র উদ্দেশ্যে, এখানে বিশেষভাবে বলা হয়েছে—“বাগ্বৈ সরস্বতী” (Vāgvai Sarasvatī)। অর্থাৎ, সরস্বতীকে বাক্শক্তির দেবী হিসেবে আয়োজনের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
পাঠক বা যজমানকে নির্দেশ দেওয়া হয় যে তিনি যেন নির্দিষ্টভাবে এই যজ্ঞকর্ম অনুসরণ করেন, এবং যে কোন রাত্রি বা ক্রম অনুযায়ী এটি সম্পন্ন হয়।
🔶 একটি ষোড়শী (Śodashi) যজ্ঞে, তৃতীয় পশু ইন্দ্র দেবতার উদ্দেশ্যে নিবেদিত হয়, কারণ ষোড়শী সরাসরি ইন্দ্রকে নির্দেশ করে।
একটি অতিরাত্র (Atirātra) যজ্ঞে, চতুর্থ পশু সরস্বতীর উদ্দেশ্যে পূজাত হয়। এখানে সরস্বতীকে বাক্ (Vāk/Speech) হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। যেহেতু বাক্ নারীরূপ (feminine), তাই তাকে রাত্রি (Rātri/Night) — যেটিও নারীরূপ — এর সঙ্গে যুগলভাবে অবস্থান করানো হয়। এটি যজ্ঞের প্রতীকী ও আধ্যাত্মিক ভেদকে প্রকাশ করে।
এই তিনটি পশু আহুতির প্রক্রিয়া (তৃতীয় পশু ষোড়শী, চতুর্থ পশু অতিরাত্র, অন্যান্য ক্রম) যাজকের কাছে স্বাধীনতা দেয় — তিনি নিজের পছন্দমতো এগুলি সম্পন্ন করতে পারেন, কিন্তু যজ্ঞের নিয়মিত ক্রম ও শৃঙ্খলা মেনে।
__________________________________________________
🔶 ঋগ্বেদের শাকল শাখার ৯ম মণ্ডলের ৬৭ সূক্তের ৩২ নং মন্ত্র টি বৈদিক অধ্যয়নের পবিত্র তাৎপর্য এবং যজ্ঞে সরস্বতীর ভূমিকাকে বিশেষভাবে উল্লেখ করে —
“ পাবমানীর্যো অধ্যেত্যৃষিভিঃ সম্ভৃতং রসম্ ।
তস্মৈ সরস্বতী দূহে ক্ষীরং সর্পির্মধূদকম্ ॥ ৩২ ”
✅ অর্থ — যিনি ঋষিদিগের রসময়ী রচনা, পবমান সোম বিষয়ক এ সমস্ত শ্লোক অধ্যয়ন করেন, তাঁকে সরস্বতী ঘৃত দুগ্ধ ও সুমধুর জল প্রদান করেন ।
সায়ণাচার্যের ব্যাখ্যা অনুযায়ী:
ব্রাহ্মণ যিনি এই পব্যমাণ সূক্তগুলি অধ্যয়ন করেন, তিনি বেদের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ও প্রজ্ঞা লাভ করেন।
এখানে সরস্বতীকে উল্লেখ করা হয়েছে, যিনি পবিত্র অধ্যয়ন ও যজ্ঞকর্মে অন্বেষককে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা প্রদানকারী দেবী।
🔹 যে ভক্ত এই পদ্ধতিতে উৎসর্গভঙ্গিমায় নিয়োজিত, তাঁর জন্য সরস্বতী, বাক্-দেবী (Vāg-devatā)—যিনি সর্বত্র প্রবাহমান — নিজেই যজ্ঞীয় পদার্থ: দুধ (क्षीर), ঘি (सर्पि), মধু (मधु, মদ্যজাত) এবং সোমা-জল আকারে প্রবাহিত করেন।
এটি বোঝায় যে, সরস্বতী তাঁর উপস্থিতি ও কার্যকারিতার মাধ্যমে যাজক বা শিক্ষার্থীকে যজ্ঞনিষ্ঠ ও বৈদিক জ্ঞানপ্রবণ করে তোলেন।
সমহিতাগুলিতে তিনি ধী (বুদ্ধি) রক্ষাকারিণী,
ব্রাহ্মণগ্রন্থে তিনি বাক্ (Vāk) হিসেবে স্বতন্ত্র।
এগুলি একত্রিতভাবে সরস্বতীর জ্ঞান ও ভাষা বিষয়ক সার্বভৌমত্বের প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
তিনি সেই দিব্য শক্তি, যিনি নিশ্চিত করেন যে যজ্ঞ অচ্ছিদ্র (Acchidram, নিখুঁত) থাকে।
তার মাধ্যমে মানব চিন্তাশক্তি এবং মহাজাগতিক নিয়মের মধ্যে সেতুবন্ধন ঘটে, এবং বুদ্ধি, বাক্ ও যজ্ঞকর্মের মধ্যে সমন্বয় সৃষ্টি হয়।
__________________________________________________
♦️ মহাভারতেও বলা হয়েছে সরস্বতী নদী দেবীরূপী বিগ্রহধারী। বিশ্ববাণী প্রকাশনীর প্রকাশিত -
মহাভারতের শল্য পর্বের ৪৭ অধ্যায়ে বলা হয়েছে - সরস্বতী নদীতে নেমে দধীচ মহর্ষি সন্ধ্যা ইত্যাদি পূজার ক্রিয়াকর্ম করছিলেন, তার কাজে বিঘ্ন ঘটানোর জন্য ইন্দ্র স্বর্গের অপ্সরাদের পাঠিয়ে দেন। তাদের রূপের কারণে দধীচ মহর্ষির বীর্য নদীতে পতিত হলে দেবী সরস্বতী তার মহাশক্তিশালী রেত কে নষ্ট না হতে দিয়ে দিব্যভাবে নিজের গর্ভে রক্ষা করে ধারণ করেন, তার ফলে দেবীর কৃপায় সেখান থেকে সারস্বত মুনির জন্ম হয়।
অর্থাৎ এখানেও সরস্বতী শুধুমাত্র নদীমাত্র নয়, বরং তার ব্যক্তিবিশেষ দেবীরূপও শাস্ত্রসম্মত ও মান্য।
__________________________________________________
♦️ ঋগ্বেদের শাকল শাখার ২য় মণ্ডলের ৪১ সূক্তের ১৬ তম মন্ত্রে সরস্বতীকে তিন রূপে স্তব করা হয়েছে —
“অম্বিতমে নদীতমে দেবিতমে সরস্বতী”
অর্থাৎ —
অম্বিতমে: সর্বশ্রেষ্ঠ মাতৃস্বরূপ দেবী পার্বতী হিসেবে,
নদীতমে: সকল নদীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ হিসেবে,
দেবীতমে: সমস্ত দেবীর মধ্যে অন্যতম দেবী।
🔶 এরপর সরস্বতীর পরিচয় আরও ব্যাখ্যা করা হয়েছে ঋগ্বেদের শাকল শাখার ৬ষ্ঠ মণ্ডলের ৪৯ সূক্তের ৭ম মন্ত্রে —
“পাবীরবী কন্যা চিত্রায়ুঃ সরস্বতী বীরপত্নী ধিয় ধাৎ ।”
সায়ণাচার্যের ব্যাখ্যা অনুযায়ী,
এখানে “বীরপত্নী (virapatni)” পদটি সরস্বতীর নায়ক বা বীরের সহধর্মিণী হিসেবে পরিচয় নির্দেশ করে। এই নায়ক প্রজাপতি বা ব্রহ্মা, অর্থাৎ সরস্বতী প্রজাপতি বা ব্রহ্মার পত্নী/সহধর্মিণী হিসেবে চিহ্নিত।
✨ সারাংশ ও তাৎপর্য
এখানে সরস্বতীকে কেবল নদী বা দেবী নয়, বরং:
সর্বশ্রেষ্ঠ মাতৃসত্তা পার্বতী,
সর্ববৃহৎ নদী,
সর্বোচ্চ দেবী,
বীরের সহধর্মিণী (প্রজাপতি/ব্রহ্মা-এর পত্নী)—এই সব রূপে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
🔸 এখানে দেবী সরস্বতীকে পার্বতীদেবীর থেকে প্রকটিত হওয়া একটি রূপবিশেষ হিসেবে এবং ব্রহ্মার পত্নী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এবিষয়ে বেদের উপনিষদ ভাগ থেকে সরাসরি আরো একটি শব্দপ্রমাণ দেখুন —
রুদ্রো ব্রহ্মা উমা বাণী তস্মৈ তস্মৈ নমো নমঃ ।
রুদ্রো বিষ্ণুরুমা লক্ষ্মীস্তস্মৈ তস্মৈ নমো নমঃ ॥ ১৮ ॥
[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/রুদ্রহৃদয় উপনিষদ/১৮ নং মন্ত্র]
✅ অর্থ — ব্রহ্মা রূপে যে রুদ্র (শিব) রয়েছেন ও বাণী (সরস্বতী) রূপে যে উমা (অম্বিকা পার্বতী) রয়েছেন, সেই সেই রূপে পরমেশ্বর শিব ও পার্বতীকে নমস্কার করি ।
বিষ্ণু রূপে যে রুদ্র রয়েছেন ও লক্ষ্মী রূপে যে উমা রয়েছেন, সেই সেই রূপে পরমেশ্বর শিব ও পার্বতীকে নমস্কার করি ॥ ১৮
এটি আবার প্রমাণ করে যে বৈদিক পরম্পরায় সরস্বতী একাধিক আধ্যাত্মিক, প্রাকৃতিক ও দেবীসত্তার সমন্বয় রূপে সর্বত্র প্রসিদ্ধ।
__________________________________________________
সিদ্ধান্ত
বেদ বচন অনুসারে, সরস্বতী হলে ব্যক্তিবিশেষ দেবীরূপধারী দেবী, তারই আরেকটিরূপ হল নদী, তিনি শুধুমাত্র নদী নন। তিনি ব্রহ্মার পত্নী, তিনি জগন্মাতা শিবপত্নী উমার একটি বিশেষ লীলারূপ।
__________________________________________________
জয় মা সরস্বতী
জয় মা পার্বতী
জয় পরমেশ্বর দক্ষিণামূর্তি শিবের
শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্ 🚩
ॐ নমঃ পার্বতীপতয়ে হর হর মহাদেব 🚩
✍️ তথ্য সংগ্রহে ও লেখনীতে — শ্রী নন্দীনাথ শৈব আচার্য গুরুদেব জী
কপিরাইট ও প্রচারে — Shivalaya
#বেদ #সনাতনধর্ম #সনাতন #হিন্দুমন্দির #সরস্বতী #অম্বিকা #পার্বতী #সরস্বতীপূজা #সরস্বতীসূক্ত #ঋগ্বেদ #দেবীসরস্বতী #সরস্বতীদেবী #দক্ষিণামূর্তি

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন