“ ঈশ্বর সাকার রূপ ধারণ করলে দোষযুক্ত হন ” — বলে দাবী করা আর্যসমাজীদের হাস্যকর দাবীর খণ্ডন শৈবপক্ষ থেকে
♦️ ঈশ্বর সাকার হলে কি দোষযুক্ত হয় ?
🔰 ভূমিকা —
“আর্যসমাজ কতৃক ঈশ্বরের সাকারত্বে দোষ হয়” — এই দাবী শৈবপরম্পরার পক্ষ থেকে করা হল - খণ্ডন ও আপত্তি নিরসন (১ম পর্ব) —
“ॐ শ্রীসদাশিব সমারাম্ভ্যম্ শ্রীনন্দীকেশ্বর মধ্যমাম্।
অস্মাৎ আচার্য পর্যন্তম্ বন্দে গুরু পরম্পরাম্” ॥
ॐ শ্রীমন্মহাগণাধিপতয়ে নমঃ 🙏
ॐ শ্রীগুরু দক্ষিণামূর্তয়ে নমঃ🙏
ॐ সাম্বসদাশিবায় নমঃ 🙏
দয়ানন্দ সরস্বতীর প্রতিষ্ঠিত আর্যসমাজকে ‘অনার্য’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে সমগ্র প্রবন্ধে। এবার কোনো রকম অন্য প্রসঙ্গে কথা না বলে শৈবপক্ষ থেকে যুক্তিসম্মতভাবে সরাসরি অনার্যদের দোষ/আপত্তির খণ্ডন করা যাক। —
————————————————————————————————————————————————
❌অনার্যদের দাবী —
"ঈশ্বর কে যদি সাকার স্বীকার করা হয় তাহলে দোষ কি?
দেখো কমল দোষ একটা নহে বহু। ভেবে দেখো ঈশ্বরের লক্ষন.. তিনি সচ্চিদানন্দ। সচ্চিদানন্দ শব্দটিতে তিনটি পদ আছে। সৎ চিৎ আনন্দ। সৎ অর্থাৎ ভূত ভবিষ্যত এবং বর্তমান।
তিনকাল ই যে একরস হয়ে বিদ্যমান থাকে। আর এক কথায় বলা যায় যে যাতে কেন প্রকার পরিবর্তন হওয়া সম্ভব নহে তাকে সৎ বলে।যে জ্ঞান যুক্ত সে চিৎ আর ত্রিকালে যাতে দুঃখের অভাব হয় সে আনন্দঈশ্বর এ কারনেই সচ্চিদানন্দ। যেহেতু ঈশ্বরের কখনো পরিবর্তন হয় না তার জ্ঞান ও কখনো বিনষ্ট হয় না তাতে কোনো দুখঃ ও ব্যাপ্ত হয় না। জগতে যত রকমের সাকার পদার্থ আছে সবগুলোকে পরিবর্তন হতে দেখা যায় তাই তারা সৎ নহে। চিৎ কেবল নিরাকার আত্মা এবং পরমাত্মা উভয়কে পাওয়া যায়। কোনো প্রকার সাকার দেহদারী দুঃখের হাত হতে রক্ষা পেতে পারে না। ত্রিকালে তাতে আনন্দও থাকতে পারে না।
✅ শৈবপক্ষ দ্বারা খণ্ডন—
আর্যসমাজ এখানে পরিবর্তনশীল সব সাকার পদার্থকে “অসৎ” বলে বাতিল করছে, যা বেদান্তসম্মত নয়।
শাস্ত্রে বলা হয়— সাকার জগৎ মিথ্যা নয়, বরং অনিত্য।
অনিত্য অর্থ অসৎ নয়।
অতএব “যা পরিবর্তনশীল তাই সৎ নয়” এটি অতিরঞ্জিত সিদ্ধান্ত।
আর্যরা বলেন- “চিৎ কেবল নিরাকার আত্মা ও পরমাত্মাতেই পাওয়া যায়”।
এখানেই বড় দার্শনিক সমস্যা হয়। কেননা এখানে উপনিষদের বিরোধ হয়। উপনিষদ বলে— “স ইক্ষত” তিনি দেখলেন “তৎ সৃষ্টিত্বা তদেবানুপ্রাবিশৎ”[তৈত্তিরীয় উপনিষদ ২/৬]"। অর্থাৎ চৈতন্য সৃষ্টির ভিতরেও অনুপ্রবিষ্ট।
চৈতন্য রূপনিরপেক্ষ, রূপবিরোধী নয়। সাকার নিরাকার ভেদ উপাধিগত, চৈতন্যগত নয়। যদি চৈতন্য কেবল নিরাকারেই সম্ভব হয়, তবে- ঈশ্বরের সগুণ রূপ (রুদ্র, নারায়ণ, ঈশ, স্থাবরজঙ্গমাত্মক জগৎ) সবই অস্বীকার করতে হয়। যা সরাসরি বেদ-পুরাণবিরোধী
অনার্যরা বলেন- “কোনো সাকার দেহধারী দুঃখের হাত হতে রক্ষা পেতে পারে না”।।
আপত্তি শাস্ত্রসম্মত নয়, কারণ— দুঃখ শরীরজনিত নয়, অবিদ্যাজনিত। শ্রুতি বলে- “অবিদ্যায়ামন্তরে বর্তমানাঃ স্বয়ং ধীরাঃ পণ্ডিতং মন্যমানাঃ। জঙ্ঘন্যমানাঃ পরিযন্তি মূঢ়া অন্ধেনৈব নীয়মানা যথান্ধাঃ”।। (মুণ্ডক ১/২/৮) - “অবিদ্যার মধ্যেই অবস্থান করে তারা নিজেদের ধীর, পণ্ডিত বলে মনে করে। অথচ প্রকৃতপক্ষে তারা বিভ্রান্ত ও মূঢ় হয়ে ঘুরে বেড়ায়। যেমন- অন্ধের দ্বারা পরিচালিত অন্ধেরা পথভ্রষ্ট হয়ে ঘোরে।” একই সমর্থন রয়েছে- (কঠ উপনিষদ ১/২/৫) যেখানে অবিদ্যার কারণেই জন্ম-মৃত্যু ও দূঃখের উপস্থিতি। উক্ত কথনকে আরও স্পষ্ট করে স্মৃতি শাস্ত্র বলে– “অজ্ঞানেবাবৃতং জ্ঞানং তেন মুহ্যন্তি জন্তবঃ”।। (গীতা ৫/১৫) -অবিদ্যার আবরণে জ্ঞান ঢাকা পড়ে, এজন্যই জীব মোহগ্রস্ত হয়। এছাড়াও (ছান্দোগ্য ৭/২৬/২) অনুযায়ী- নারদের জিজ্ঞাসার উত্তরে সনৎকুমার বলেন- “আত্মদ্রষ্টা পুরুষ মৃত্যু দেখে না, রোগ দেখে না, দূঃখ দেখে না”। অর্থাৎ- এখানে বিষয়টি পরিষ্কার যিনি জ্ঞানী তিনি শরীরধারী হলেও দূঃখের দ্বারা প্রভাবিত হন না। যদি দূঃখের কারণ শরীর হতো তবে- এই ছান্দোগ্য শ্রুতি বাক্য মিথ্যা হয়ে যেতো। যদি দুঃখের কারণ শরীরই হতো, তবে জীবন্মুক্তেরও দুঃখ ভোগ হওয়া বাধ্যতামূলক হতো। ঈশ্বর সাকার হলেও তিনি উপাধিনিরপেক্ষ। শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ (৩/১৯) অনুযায়ী (তিনি অঙ্গহীন হয়েও ক্রিয়াশীল)।
অতএব, সাকারতা অর্থ দুঃখভোগিতা নয়।
আর্যদের বক্তব্য অনুযায়ী- “ত্রিকালে যেখানে দুঃখের অভাব, সেটাই আনন্দ”।
এটি নেতিবাচক সংজ্ঞা, কিন্তু উপনিষদে আনন্দ হলো— "আনন্দো ব্রহ্মেতি ব্যজানাৎ" আনন্দস্বরূপ পরমাত্মাই ব্রহ্ম (তৈত্তি /২/৬) স্বরূপগত পূর্ণতা, কেবল দুঃখের অভাব নয়। ব্রহ্মানন্দ অর্থ স্বপ্রকাশ পরিপূর্ণ চৈতন্য। অনার্যদের সংজ্ঞা এখানে অত্যন্ত সংকীর্ণ।
মূল সমস্যা আর্যসমাজের নেগেটিভ থিওলজি। আর্যসমাজের এই বক্তব্যে একটি মৌলিক প্রবণতা আছে। যা যা সীমাবদ্ধ সব বাতিল। ফলে ঈশ্বর হয়ে ওঠেন- নিরাকার, নিষ্ক্রিয়, কেবল দার্শনিক ধারণা। এটি বেদীয় ঈশ্বরতত্ত্বের পূর্ণ রূপ নয়। উপনিষদ, স্মৃতি, পুরাণ, আগম সব মিলিয়ে যে ঈশ্বরতত্ত্ব পাওয়া যায়, তার সাথে বিপরীত।
এখানে কিছু প্রশ্ন উঠে আসে—
দুঃখ কি আসলেই পদার্থ বা রূপের কারণে উৎপন্ন, নাকি অবিদ্যার কারণে?
আনন্দ কি কেবল দুঃখের অভাব, নাকি শাস্ত্রের মত চৈতন্যের স্বপ্রকাশ পূর্ণতা?
অনার্যরা কেন নেতিবাচক সংজ্ঞার উপর ভিত্তি করে সৃষ্টিশীল জগৎ ও ঈশ্বরের বৈচিত্র্য অস্বীকার করছেন?
————————————————————————————————————————————————
❌প্রথম দোষঃ— শীত গ্রীষ্ম ক্ষুদা তৃষ্ণা ভয় রোগ শোক বৃদ্ধাত্ত মৃত্যু প্রভৃতি সাকার দেহধারী কে গ্রাস করে দুঃখ দেয়। ঈশ্বর সর্বদা এই সমস্ত হতে পৃথক। অতএব ঈশ্বর সাকার স্বীকার করলে দোষ তাকে স্পর্শ করবে। সে অবস্থায় ঈশ্বর সচ্চিদানন্দ এবং নির্বিকার হতে পারে না। কেননা, প্রত্যেক সাকার পদার্থে জন্ম বৃদ্ধি ক্ষয় জরা মৃত্যু প্রভৃতি বিকার দোষ থাকে।
✅শৈবপক্ষ দ্বারা খণ্ডন—
বিকার দোষ দ্বারা ঈশ্বরকে সংজ্ঞায়িত করা যাবে না। কেননা, ঈশ্বর সদা নির্বিকার স্বরূপ। ব্রহ্ম নিজ ইচ্ছায় শরীর ধারণ। যেটি অপ্রাকৃত, সকল দিব্যতায় পরিপূর্ণ।
অনার্যদের দাবী অনুযায়ী- “সাকার অর্থ দুঃখভোগী” এই অনুমানটি অপ্রমাণিত সাধারণীকরণ। শাস্ত্র কখনো বলেনি যে, কোনো সাকার সত্তাই অবশ্যম্ভাবীভাবে দুঃখভোগী হবে। বরং শাস্ত্র বলে- দুঃখের কারণ অবিদ্যা ও কর্মবন্ধন, দেহমাত্র নয়। গীতা ৫.১৪—
“ন কর্তৃত্বং ন কর্মাণি লোকস্য সৃজতি প্রভুঃ।
ন কর্মফলসংযোগং স্বভাবস্তু প্রবর্ততে” ॥
অতএব দেহ থাকা অর্থই দুঃখভোগী হওয়া নয়।
উপাধি, উপাধিমান ভেদ না মানার দোষ। এই আপত্তিতে সবচেয়ে বড় দার্শনিক ভুল হলো- উপাধি (দেহ) আর উপাধিমান (ঈশ্বর) অভেদ করে ফেলা। শাস্ত্রে স্পষ্ট- দুঃখ হলো উপাধির ধর্ম। ঈশ্বর উপাধির অধিষ্ঠাতা, ভোক্তা নন। শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ বলে— “একো দেবঃ সর্বভূতেষু গূঢ়ঃ সর্বব্যাপী সর্বভূতান্তরাত্মা” (শ্বেতা/৬/১১) তিনি দেহে অধিষ্ঠিত হলেও দেহধর্ম দ্বারা স্পর্শিত নন।
অনার্যদের দাবী হলো- “প্রত্যেক সাকার পদার্থে জন্ম, বৃদ্ধি, ক্ষয় ইত্যাদি দোষ থাকে”।
এটি আবারও লোকানুভব নির্ভর ভুল সিদ্ধান্ত। গীতা ৪.৬—
“অজোঽপি সন্নব্যয়াত্মা ভূতানামীশ্বরোঽপি সন্
প্রকৃতিং স্বামধিষ্ঠায় সম্ভবাম্যাত্মমায়য়া”।।
অর্থাৎ- ঈশ্বরের জন্ম-মৃত্যু নেই। ঈশ্বর নিজ প্রকৃতিতে আশ্রয় করে, নিজ মায়াবলে নিজেকেই সৃষ্টি করেন। অর্থাৎ- ঈশ্বর অজ হয়েও অবতরণ হন, কিন্তু ঈশ্বর সর্বদা বিকারহীন।
অনার্যরা ধরে নিচ্ছেন- সাকার মানেই পাঁচভৌতিক জড় দেহ। কিন্তু শাস্ত্রে ঈশ্বরের দেহ হলো- চৈতন্যময়, সত্ত্ববিশুদ্ধ, মায়িক, কর্মজ নয়। “স্থিরেভিরঙ্গৈঃ পুরুরূপ উগ্রঃ” [ঋগবেদ/২/৩৩/৯] -বহু রূপ ধারণকারী উগ্র পরমেশ্বর, কিন্তু তবু স্থির, বিকারহীন।।
অনার্যদের মতে- নির্বিকার অর্থই কোনো রূপই থাকতে পারে না। কিন্তু, নির্বিকার অর্থ- স্বরূপগত পরিবর্তনহীনতা, রূপগত প্রকাশ নিষিদ্ধ নয়।
অনার্যদের এই দোষ মানা হয় তবে- রুদ্র, বিষ্ণু, ঈশ্বর সব বেদীয় দেবতা ও সম্পূর্ণ চরাচরাত্মক জগৎ অস্তিত্বহীন। অবতারতত্ত্ব মিথ্যা। উপনিষদীয় “স ঈক্ষত” অর্থহীন। যা গ্রহণযোগ্য নয়।
এই দোষ যৌক্তিক নয়, কারণ— সাকারত্বকে দুঃখের কারণ ধরা ভুল। উপাধি-উপাধিমান ভেদ অস্বীকার করা হয়েছে। ঈশ্বরীয় দেহকে কর্মজ দেহের সঙ্গে এক করে ফেলা হয়েছে। নির্বিকারত্ব ভুলভাবে বোঝানো হয়েছে।
সুতরাং- ঈশ্বর সচ্চিদানন্দ ও নির্বিকার হয়েও সাকার হতে পারেন, কারণ তাঁর সাকারত্ব মায়িক ঈশ্বরীয়, কর্মজ নয়। কেননা ঈশ্বর অকর্তা- “তস্য কর্তারমপি মাং বিদ্ধ্যকর্তারমব্যয়ম্” (গীতা ৪/১৩)।।
প্রশ্ন—
সব সাকার পদার্থ কি অবশ্যই দুঃখভোগী? যদি না, তবে অনার্যরা কেন এমন সাধারণীকরণ করছেন?
ঈশ্বরের মায়িক, চৈতন্যময় দেহকে কেন মানুষের জড় দেহের সাথে তুলনা করা হচ্ছে?
নির্বিকারত্ব কি সত্যিই রূপবিরোধী, নাকি শুধুই স্বরূপগত বিকারহীনতা?
দুঃখের উৎপত্তি কি প্রকৃতপক্ষে উপাধি বা দেহ থেকে, নাকি অবিদ্যা ও কর্মফল থেকে?
শাস্ত্র অনুযায়ী, ঈশ্বর সচ্চিদানন্দ অবস্থায় সাকার হবার পরেও দুঃখগ্রস্ত হন কি?
————————————————————————————————————————————————
❌দ্বিতিয় দোষঃ— ঈশ্বরকে সাকার স্বীকার করলে তিনি সর্বব্যাপী হতে পারবেন না কেননা, প্রত্যেক সাকার পদার্থ একদেশী অর্থাৎ একস্থানে স্থিতীশীল।
✅শৈবপক্ষ দ্বারা খণ্ডন—
শাস্ত্র কখনো বলেনি সাকার মানেই অবশ্যম্ভাবীভাবে দেশ-সীমাবদ্ধ। বরং এই নিয়মটি প্রযোজ্য- কর্মজ ভৌতিক সাকার বস্তুতে। ঈশ্বরীয়, মায়িক, চিন্ময় সাকারত্বে নয়। শ্রুতি অনুযায়ী— “পুরুষং এবেদং সর্বং যদ্ভূতং যচ্চ ভব্যম্” (শ্বেতা ৩/১৫ ও ঋগবেদ ১০/৯০/২) এখানে সর্বব্যাপিতা রূপনিরপেক্ষ, রূপবিরোধী নয়।
অনার্যরা এই আপত্তি ধরে নিচ্ছে ঈশ্বরের রূপ দেহের মতো উপাধি। কিন্তু শাস্ত্র মতে ঈশ্বরের রূপ উপাধি দ্বারা আবদ্ধ নয়। বরং উপাধি ঈশ্বরের দ্বারা অধিষ্ঠিত। শ্রুতি বলে- “ সর্বব্যাপী সর্বভূতান্তরাত্মা” (শ্বেতা ৬/১১) তিনি সর্বব্যাপী হয়েও অন্তর্যামী।
অন্তর্যামিত্ব অর্থই দেশসীমাবদ্ধতা নয়। ব্রহ্ম সর্বব্যাপী হয়েও বিভিন্ন স্বরূপে প্রকাশিত। যেমন—
আকাশ সর্বব্যাপী। তবুও ঘটাকাশ, মহাকাশ বলে প্রকাশিত। ঘটাকাশ একদেশে প্রকাশিত হলেও
আকাশত্ব সর্বত্র বর্তমান।
সূর্য এক স্থানে প্রকাশিত। তবুও তার প্রকাশ সর্বত্র। একই ভাবে ব্রহ্মও সর্বব্যাপী।
এছাড়াও অনার্যদের এই আপত্তি শাস্ত্র সরাসরি খণ্ডন করেছে—
আপাণিপাদো জবনো গ্রহীতা পশ্যত্যচক্ষুঃ স শৃণোত্যকর্ণঃ।
স বেতি বেদ্যং ন চ তস্যাস্তি বেতা তমাহুরগ্র্যং পুরুষং মহান্তম্॥
[শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ ৩/ ১৯]
তিনি সেই পুরুষ, যিনি হাত-পা বিহীন হয়েও প্রবল বেগে গমনকারী। চক্ষুহীন হয়েও তিনি দেখেন এবং কর্ণহীন হয়েও সবকিছু শোনেন। তিনি জ্ঞেয় সমস্ত বিষয়কে জানেন। তাঁকে জানবার মতো আর কেউ নেই, জ্ঞানীরা তাঁকেই মহান, শ্রেষ্ঠ প্রভৃতি নামে অভিহিত করেন।
অর্থাৎ ব্রহ্ম অঙ্গহীন হয়েও ক্রিয়াশীল। এখানেই বোঝা যায়, রূপ ও ব্যাপ্তি পরস্পরবিরোধী নয়।
অনার্য কতৃক অবতারতত্ত্ব এই দোষকে সম্পূর্ণ ভেঙে দেয়। যদি এই দোষ মানা হয় “ঈশ্বর অবতার নিতে পারবেন না” তবে উপনিষদ ও গীতার অবতারবাণী মিথ্যা হবে। গীতা ৪/৬ অনুযায়ী- “প্রকৃতিং স্বামধিষ্ঠায় সম্ভবাম্যাত্মমায়য়া” অর্থাৎ- ঈশ্বর নিজেই মায়াবলে নিজেকে সৃষ্টি করেন। তাহলে বিষয়টি স্পষ্ট যে- অবতরণ অর্থ সর্বব্যাপিতা নষ্ট নয় বরং ইচ্ছাকৃত প্রকাশ।
অনার্যরা বলছে- সর্বব্যাপী মানে “একই সময়ে সর্বত্র দেহগত উপস্থিতি”। শাস্ত্রে সর্বব্যাপী অর্থ- সত্তা ও চৈতন্য দ্বারা সর্বত্র অধিষ্ঠান। সর্বব্যাপিতা দেশগত নয়, সত্ত্বাগত। এছাড়াও যদি ব্রহ্ম শব্দের ব্যুৎপত্তি করা হয় তবে- “বৃহত্বাদ্ বৃহণত্বাচ্চ" এই ব্যূৎপত্তির অনুসারে ব্রহ্ম ব্যাপক থেকে ব্যাপক হয়ে নিজে নিজে প্রপঞ্চের রূপে বদলে যায়। শ্রুতিও বলে—
“বিশ্বং ভূতং ভুবনং চিত্রং বহুধা জাতং জায়মানশ্চ যৎ।
সর্বে হ্যেষ রুদ্রস্তস্মৈ রুদ্রায় নমো অস্তু।। "
(কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/ তৈত্তিরীয় আরণ্যক/ ১০ ম প্রপাঠক- পরিশিষ্ট /২৪ নং অনুবাক)
সেই সর্বাত্মক রুদ্রকে নমস্কার জানাই, যার থেকে জড় জগৎ, ভূত, চেতন, অচেতন, ভুবন , প্রাণী সকলই জাত হয়েছে। সমগ্র বিশ্ব প্রপঞ্চ সেই এক রুদ্র স্বরূপই বটে। সেইরূপ সর্বাত্মক রুদ্রকে নমস্কার জানাই।
তাই অনার্যদের এই “দ্বিতীয় দোষ” যুক্তিগতভাবে যৌক্তিক নয়, কারণ— সাকারত্বকে একদেশীতার সঙ্গে সমার্থক করা হয়েছে। কর্মজ দেহ ও ঈশ্বরীয় রূপের ভেদকে অস্বীকার করেছে। সর্বব্যাপিতার শাস্ত্রীয় সংজ্ঞা ভুলভাবে উপস্থাপন করেছে। উপনিষদ, গীতা আদি সব কিছুর বিরোধ সৃষ্টি হয়।
অতএব- ঈশ্বর সর্বব্যাপী হয়েও সাকার হতে পারেন, কারণ তাঁর সাকারত্ব দেশ-সীমাবদ্ধ নয়, আর তাঁর সর্বব্যাপিতা রূপবিরোধী নয়।
প্রশ্ন—
কি সব সাকার পদার্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থান-সীমাবদ্ধ হবে?
সর্বব্যাপীতার অর্থ কি দৈহিক উপস্থিতি, নাকি চৈতন্য ও সত্তার সর্বত্র অধিষ্ঠান?
ঈশ্বরের মায়াজগৎ বা সগুণ প্রকাশ কি তাঁর সর্বব্যাপীতাকে কমিয়ে দেয়?
কেন কর্মজ জড় দেহ ও ঈশ্বরীয় সাকারতা সমান ধরে নেওয়া হচ্ছে?
শাস্ত্র অনুযায়ী, সর্বব্যাপী সাকার ঈশ্বরের ধারণা কি বাস্তব এবং যুক্তিসঙ্গত?
————————————————————————————————————————————————
❌তৃতীয়দোষঃ— ঈশ্বর অনাদি ও অনন্ত হতে পারবেন না কেননা প্রত্যেক সাকার বা অবয়বী দেহধারী উৎপন্ন হয়ে থাকে যে বস্তুর আরম্ভ আছে সে সাদি। এ অবস্থায় অনাদিতত্বব গুনের অভাব হবে। ঈশ্বর অনাদি হতে পারেবেন না। অনন্ত হতেও পারেবেন না। যাহার উৎপত্তি আছে তাহার বিনাশ ও আছে। যে নদীর একপাড় থাকে তার অন্য পাড় ও থাকবে।
✅শৈবপক্ষ দ্বারা খণ্ডন—
অনার্যদের আপত্তি অনুযায়ী- “সাকার অর্থ উৎপন্ন”। কিন্তু, এটাই এই আপত্তির মূল দোষ। কেননা শাস্ত্রে কোথাও বলা হয়নি সব সাকার সত্তাই উৎপন্ন হবে। এই নিয়মটি প্রযোজ্য কেবল কর্মজ, উপাদাননির্ভর ভৌতিক দেহে, ঈশ্বরীয় সাকারত্বে নয়। গীতা ৪/৬ অনুযায়ী- অজ (অজাত) হয়েও সম্ভব। এখানে “সম্ভব” অর্থ প্রকাশ, উৎপত্তি নয়।
অতএব, সাকার প্রকাশ অর্থ সর্বক্ষেত্রে উৎপত্তি নয়।
উৎপত্তি (জনন) ও প্রকাশ (আবির্ভাব) গুলিয়ে ফেলেছে অনার্যরা। অনার্যরা ধরে নিচ্ছে- রূপ গ্রহণ অর্থ নতুন করে জন্ম নেওয়া। কিন্তু, পরিষ্কার ভেদ আছে- জনন অর্থ পূর্বে না থাকা সত্তার উৎপত্তি। আবির্ভাব অর্থ নিত্য সত্তার প্রকাশ। ঈশ্বরের ক্ষেত্রে- কোনো নতুন সত্তা সৃষ্টি হয় না। কেবল অব্যক্ত থেকে ব্যক্ত প্রকাশ। এ কারণে অনাদিত্ব নষ্ট হয় না।
অনার্যরা বলছেন অবয়বী মানেই নশ্বর, এই আপত্তি সর্বজনীন নয়। অনার্যদের আপত্তি- প্রত্যেক অবয়বী বস্তুর বিনাশ আছে। কিন্তু, এটি আবারও ভৌতিক জগতের নিয়মকে সর্বত্র আরোপ করা। কেননা—
ভৌতিক অবয়বের বিনাশ হয়। মায়িক/চিন্ময় অবয়বের বিনাশ হয় না। উপনিষদ বলে— “ন তস্য কার্যং করণং চ বিদ্যতে” (শ্বেতা ৬/৮) ব্রহ্ম কর্মজ দেহের মতো নন।
এছাড়াও অনার্য কতৃক “নদীর দুই পাড়” দৃষ্টান্তটি অপ্রযোজ্য। “যার এক পাড় আছে তার অন্য পাড়ও থাকবে”। এটি সীমাবদ্ধ ভৌতিক বস্তুর দৃষ্টান্ত, ঈশ্বরতত্ত্বের জন্য প্রযোজ্য নয়। কেননা ঈশ্বর- দেশ, কাল, পরিমিত নন। অনন্তত্ব গণনাগত নয়, স্বরূপগত। শ্রুতি অনুযায়ী- “অনন্তশ্চাত্মা” (শ্বেতা/১/৯) আত্মা অনন্ত। “সত্যং জ্ঞানম্ অনন্তং ব্রহ্ম” (তৈত্তি/২/১/১)।
অনার্যদের মতে অনন্ত অর্থ “একদিকে সীমা নেই”। অনার্যদের এই অর্থ এক ভাবে ঠিক হলেও একমাত্র অর্থ নয়। শাস্ত্রে অনন্ত অর্থ- পরিমেয় নয়, সীমাবদ্ধ নয়। ব্রহ্মের শুরু নেই, শেষ নেই, তবু ব্রহ্ম সৃষ্টি নিমিত্তে আকৃতিযুক্ত।
অতএব আকৃতি অর্থ এই নয় যে- আদি বা অন্ত।
অনার্যদের এই দোষ মানলে গুরুতর শাস্ত্রবিরোধিতা হয়। এই আপত্তি গ্রহণ করলে—
অবতারতত্ত্ব মিথ্যা হয়, শ্রুতিতে- “অজায়মানো বহুধা বিজায়তে” (যজুর্বেদ ৩১/১৯) বাক্যটি অসংগত হয়, রুদ্র, বিষ্ণু, ঈশ্বর সব সাকার বেদীয় দেবতা এবং চরাচরাত্মক জগৎ অস্তিত্বহীন হয়। যা কোনো বেদান্ত ও পরম্পরাতে মানে না। তাই অনার্যদের এই “তৃতীয় দোষ” যৌক্তিক নয়, কারণ—
সাকারত্ব ও উৎপত্তিকে এক করে ধরা হয়েছে। প্রকাশ ও জন্মের ভেদ মানা হয়নি। ভৌতিক ন্যায়কে ঈশ্বরতত্ত্বে জোর করে বসানো হয়েছে। অনন্তত্বের শাস্ত্রীয় অর্থ ভুল বোঝা হয়েছে।
সুতরাং- ঈশ্বর অনাদি ও অনন্ত হয়েও সাকার হতে পারেন, কারণ তাঁর সাকারত্ব উৎপন্ন নয়, বরং নিত্য সত্তার স্বেচ্ছাপ্রকাশ।
প্রশ্ন—
সব সাকার পদার্থ কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে উৎপন্ন হবে?
রূপ গ্রহণ কি অর্থাৎ নতুন জন্ম? প্রকাশ ও উৎপত্তি কি সমান?
ভৌতিক বস্তু এবং ঈশ্বরের সাকারত্বের নিয়ম কি একইভাবে প্রযোজ্য?
অনাদি ও অনন্তত্ব কি প্রকাশিত রূপের জন্যও হারায়?
শাস্ত্রে অনন্তত্বের অর্থ কি সীমাহীনতা বা জন্মহীনতা?
————————————————————————————————————————————————
❌চতুর্থ দোষঃ— ঈশ্বরে সর্বজ্ঞত্ব গুনের অভাব হবে। কেননা ঈশ্বর যদি সর্বজ্ঞ স্বীকার করা যায় তাজলে ঈশ্বর সাকার হওয়া এক দেশে অবস্থিতির কারনে সর্বত্র তারপক্ষো বিদ্যমান থাকা সম্ভব নহে। যদি ঈশ্বর সর্বত্র না থাকে তাহলে তার ভিতর সকল স্থানের জ্ঞান থাকাও সম্ভব না তার জ্ঞান এক স্থানের হবে। ঈশ্বর যে দেশে বা স্থানে থাকবেন তার জ্ঞান সেই স্থানের জ্ঞানই হবে। পরিণাম- ঈশ্বর অন্তর্যামী হতে পারবেন না। কেননা তিনি প্রত্যেকের মনের কথা জানতে পারবেন না।
✅শৈবপক্ষ দ্বারা খণ্ডন—
অনার্যদের আপত্তি- “জ্ঞান সর্বত্র হতে হলে দেহ সর্বত্র থাকতে হবে”। এই অনুমানটিই মূল ভুল। কেননা শাস্ত্রে কোথাও বলা হয়নি যে- জ্ঞান তখনই সর্বব্যাপী হবে যখন দেহও সর্বত্র থাকবে। কারণ- জ্ঞান দেহজাত নয়, চৈতন্যজাত। উপনিষদ অনুযায়ী— “য সর্বজ্ঞঃ সর্ববিদ্” (মুণ্ডক ১/১/৯) এখানে সর্বজ্ঞত্ব স্বরূপগত, অবস্থাগত নয়। এছাড়াও পরশিব ব্রহ্ম- “বিশ্বাধিপো রুদ্র মহর্ষিঃ” (শ্বেতা ৩/৪) অর্থাৎ- পরশিব ব্রহ্ম বিশ্বাতীত হয়েও সর্বজ্ঞ। অর্থাৎ পরশিব ব্রহ্ম - বিশ্বময় ও বিশ্বাতীত দুইভাবেই সর্বজ্ঞ লক্ষণযুক্ত।
অনার্যরা জ্ঞান ও অবস্থান গুলিয়ে ফেলার দোষ করছে। অনার্যরা ধরে নিচ্ছে- জ্ঞান অর্থ ইন্দ্রিয়গত প্রত্যক্ষ। কিন্তু, পরশিব ব্রহ্মের জ্ঞান ইন্দ্রিয়নির্ভর নয়, দেশ, কাল নিরপেক্ষ স্বপ্রকাশ।
মানুষ জানতে পারে- চোখে দেখে, কানে শুনে, অধ্যয়ন করে। কিন্তু, পরশিব ব্রহ্ম জানেন, নিজ সত্ত্বা দ্বারা। পরশিব ব্রহ্মের লক্ষণই হলো সর্বজ্ঞ।
অতএব “এক স্থানে থাকলে এক স্থানের জ্ঞান” এই ন্যায় পরশিব ব্রহ্মের ক্ষেত্রে অপ্রযোজ্য।
এছাড়াও শাস্ত্রীয় অন্তর্যামিত্ব সরাসরি অনার্যদের এই আপত্তি খণ্ডন করে। বৃহদারণ্যক উপনিষদ ৩/৭ (অন্তর্যামী ব্রাহ্মণ) পরশিব ব্রহ্ম- অন্তরে থাকেন, তবুও ইন্দ্রিয় দ্বারা অজ্ঞেয়, তবুও সর্বজ্ঞ। অন্তর্যামিত্ব অর্থই- দেশগত উপস্থিতি নয়, চৈতন্যগত অধিষ্ঠান।
অনার্যদের মতে- সর্বজ্ঞ অর্থ সর্বত্র প্রত্যক্ষভাবে জানা। কিন্তু, শাস্ত্রে সর্বজ্ঞত্ব অর্থ- কারণ হিসেবে সবকিছুর জ্ঞান থাকা। গীতা ৭/২৬- “বেদাহং সমতীতানি বর্তমানানি চার্জুন” -ঈশ্বর যা হয়েছে, যা হচ্ছে ও যাকিছু হবে সবই জানেন। এই জ্ঞান সর্বত্র বসে থাকার ফল নয়। সর্বত্রের কারণ হওয়ার ফল।
অনার্যদের “এক দেশে থাকলে এক স্থানের জ্ঞান” এই আপত্তি সহজেই খণ্ডিত হয়। দৃষ্টান্ত—
একজন গণিতজ্ঞ এক জায়গায় বসেই অসংখ্য স্থানের পরিমাপ গণনা করতে পারে।
সূর্য এক স্থানে থেকেও পৃথিবীর সর্বত্র আলো দেয়।
যদি সীমাবদ্ধ জীবের ক্ষেত্রেও এই আপত্তি খাটে না, তবে ঈশ্বরের ক্ষেত্রে তো আরও কম।
অনার্যদের ধারণা- অন্তর্যামী অর্থ প্রত্যেকের মনের ভেতরে বসে থাকা। কিন্তু, শাস্ত্রে অন্তর্যামী অর্থ- চৈতন্য হিসেবে প্রত্যেক মনের অধিষ্ঠাতা -
“একো দেবঃ সর্বভূতেষু গূঢ়ঃ সর্বব্যাপী সর্বভূতান্তরাত্মা। কর্মাধ্যক্ষঃ সর্বভূতাদিবাসঃ সাক্ষী চেতা কেবল নির্গুণশ্চ”।। (শ্বেতা/৬/১১)
অর্থাৎ- পরশিব ব্রহ্ম সকল জীবের ভিতরে ও বাইরে যিনি এক ও অভিন্ন সত্তা হিসেবে বিরাজমান, যিনি সকল কর্মের নিত্য সাক্ষী ও নিয়ন্তা, অথচ নিজে গুণ, কর্ম ও পরিবর্তনের ঊর্ধ্বে। পরশিব ব্রহ্ম বাহ্য কোনো পৃথক সত্তা নন, তিনি সকল জীবের অন্তরে বিরাজমান একক, চেতন, নির্গুণ, সর্বব্যাপী পরম সত্য যাঁকে জেনে দ্বৈতবোধ লুপ্ত হয়।
মন পরিবর্তনশীল, ঈশ্বর অপরিবর্তনীয়।
অতএব জানাটা প্রতিবিম্বের মাধ্যমে, অবস্থানের মাধ্যমে নয়।
অনার্যদের এই দোষ মানলে শাস্ত্রবিরোধিতা অনিবার্য। কেননা- উপনিষদের “সর্বজ্ঞ সর্ববিদ্” মিথ্যা হবে। বৃহদারণ্যক (৩/৭) অন্তর্যামী ব্রাহ্মণ অস্বীকার করতে হবে। ঈশ্বরীয় প্রজ্ঞাকে মানবীয় প্রত্যক্ষের স্তরে নামিয়ে আনতে হবে। যা শাস্ত্রসম্মত নয়। তাই এই “চতুর্থ দোষ” যৌক্তিক নয়, কারণ— জ্ঞানকে দেহগত অবস্থানের সঙ্গে সমার্থক করা হয়েছে। ঈশ্বরীয় জ্ঞানকে ইন্দ্রিয়নির্ভর ধরে নেওয়া হয়েছে। অন্তর্যামিত্বের শাস্ত্রীয় অর্থ ভুল বোঝা হয়েছে। সর্বজ্ঞত্বের কারণগত স্বরূপ অস্বীকার করা হয়েছে।
সুতরাং- পরশিব ব্রহ্ম সাকার হয়েও সর্বজ্ঞ ও অন্তর্যামী হতে পারেন, কারণ তাঁর জ্ঞান দেশ, কাল, নিরপেক্ষ আর অন্তর্যামিত্ব অবস্থানগত নয় অধিষ্ঠানগত।
প্রশ্ন—
সর্বজ্ঞ হওয়ার জন্য পদার্থগত অবস্থান প্রয়োজন?
অন্তর্যামী কি কেবল স্থানগত উপস্থিতি বোঝায়?
জ্ঞান কি শুধুমাত্র ইন্দ্রিয় বা প্রত্যক্ষতার মাধ্যমে সম্ভব?
স্থানগত সীমাবদ্ধ উদাহরণ (মানব, সূর্য, গণিতজ্ঞ) ঈশ্বরের জন্য প্রযোজ্য কি?
সর্বজ্ঞতা ও চৈতন্যজাত জ্ঞানকে অবস্থানগতভাবে ব্যাখ্যা করা শাস্ত্রসম্মত কি?
————————————————————————————————————————————————
❌পঞ্চম দোষঃ— ঈশ্বরে নিত্যত্ব গুনের অভাব হবে। ঈশ্বর অনিত্য হয়ে যাবেন। সেই নাত্য, যার অস্তিত্ব থাকবে, অথচ তার কোনো কারণ থাকবে না। সে কোনও পদার্থের সংযোগ দ্বারাও উৎপন্ন হবে না। কেননা, যে সাকার সে বস্তু তত্ত্বের মিশ্রনযোগে উৎপন্ন হয়ে থাকে।
✅শৈবপক্ষ দ্বারা খণ্ডন—
“সাকার মানেই কারণসাপেক্ষ উৎপন্ন” এটাই এই দোষের ভুল। অনার্য কতৃক এই আপত্তি সত্য কেবল- ভৌতিক, কর্মজ ও উপাদাননির্ভর সাকার বস্তুর ক্ষেত্রে। কিন্তু, ঈশ্বরীয় সাকারত্ব এই শ্রেণীর নয়। “গীতা ৪/৬” অনুযায়ী- ঈশ্বর অজ, অব্যয় তবুও সাকার প্রকাশ সম্ভব। এখানে “সম্ভব” অর্থ উৎপত্তি নয়, স্বেচ্ছাপ্রকাশ। অর্থাৎ পরশিব ব্রহ্ম নির্গুণ, নিরাকার, অকর্তা হয়েও নিজ ইচ্ছায় সাকার হন।
“নিত্য” শব্দের ভুল সংজ্ঞা দ্বারা অনার্যরা ধরে নিচ্ছেন- নিত্য অর্থ “কোনো রূপই গ্রহণ করতে পারবে না”। কিন্তু, শাস্ত্রে নিত্য অর্থ- স্বরূপগত অস্তিত্ব চিরস্থায়ী, রূপগত প্রকাশে কোনো বাধা নেই। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়—
সূর্য নিত্য কিন্তু, প্রতিদিন উদয়–অস্ত যায় (প্রকাশ/অপ্রকাশ)। সূর্যত্ব নষ্ট হয় না, তেমনি ঈশ্বরত্বও নষ্ট হয় না।
অনার্যরা কারণসাপেক্ষতা ও আশ্রয় দুটিকে গুলিয়ে ফেলেছেন। অনার্যদের আপত্তি- “যার কোনো কারণ নেই, সে সাকার হতে পারে না”। কিন্তু, কারণসাপেক্ষ উৎপত্তি অর্থ পূর্বে না থাকা সত্তার জন্ম। আশ্রয় বা শক্তি অর্থ নিত্য সত্তার প্রকাশ। ঈশ্বরের রূপ কোনো বহিরাগত কারণের ফল নয় বরং তাঁর নিজ শক্তি (মায়া/শক্তি) দ্বারা প্রকাশ। শ্রুতি বলে- “পরাস্য শক্তির্বিবিধৈব শ্রুয়তে” (শ্বেতা ৬/৮) তাই, শক্তি থাকাই নিত্যত্বের বিরোধ নয়।
অনার্যদের “সাকার বস্তু তত্ত্বের মিশ্রণে উৎপন্ন” এই আপত্তি সর্বজনীন নয়। কেননা এই আপত্তি- সাংখ্য বা ভৌতিক বস্তুতত্ত্বে প্রযোজ্য, ঈশ্বরতত্ত্বে নয়। উপনিষদ বলে— “ন তস্য কার্যং করণং চ বিদ্যতে” (শ্বেতা ৬/৮)।
অতএব ঈশ্বরের সাকারত্ব- কর্মজ নয়, তত্ত্বসংযোগজ নয়, উৎপন্নও নয়।
অনার্যদের এই দোষ মানলে শাস্ত্রীয় বিপর্যয় অনিবার্য। এই আপত্তি গ্রহণ করলে- উপনিষদের নিত্য ঈশ্বরবাক্য অস্বীকার হয়, গীতার অবতারতত্ত্ব মিথ্যা হয়, ঈশ্বরের প্রপঞ্চ স্বরূপে বদলে যাওয়াও মিথ্যা হয়। যা কোনো প্রামাণিক শাস্ত্র মানে না। তাই এই “পঞ্চম দোষ” যৌক্তিক নয়, কারণ— সাকারত্বকে উৎপত্তির সঙ্গে এক করে দেখা হয়েছে। নিত্যত্বের শাস্ত্রীয় অর্থ ভুল বোঝা হয়েছে। কর্মজ সাকারত্ব ও ঈশ্বরীয় সাকারত্বের ভেদ মানা হয়নি। কারণ ও শক্তির ভেদ উপেক্ষিত করা হয়েছে।
সুতরাং- ঈশ্বর নিত্য হয়েও সাকার হতে পারেন, কারণ তাঁর সাকারত্ব উৎপন্ন নয়, বরং নিত্য সত্ত্বার স্বশক্তিপ্রকাশ।
প্রশ্ন—
নিত্যত্ব কি শুধুমাত্র রূপগত অপরিবর্তনীয়তা বোঝায়, নাকি স্বরূপগত চিরস্থায়ী অস্তিত্ব?
সাকার প্রকাশ কি নিত্যত্বকে নষ্ট করে?
উৎপত্তি বনাম প্রকাশ ঈশ্বরের ক্ষেত্রে কি সব সাকার প্রকাশ উৎপত্তি?
ঈশ্বরের সাকার রূপও ভৌতিক বস্তু বা উপাদানের সংযোগের দ্বারা সীমাবদ্ধ?
ভৌতিক কর্মজ বস্তু নিয়ম ঈশ্বরীয় সাকারত্বের জন্য প্রযোজ্য?
————————————————————————————————————————————————
❌ষষ্ঠদোষঃ— পরমাত্মা সর্বাধার গুনরহিত হবেন। তিনি সর্বাধার না হয়ে অপরাধার হয়ে যাবেন। পরমাত্মা সর্বাধার কেন জানো? কেননা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তারই আশ্রয় থেকে গতিশীল; বিশ্বব্রহ্মাণ্ড কে তিনি ধারন করে আছেন। যদি পরমাত্মাকে সাকার স্বীকার করা হয় তানি কারও আশ্রয়ে থাকবেন। একারনেই তো মত মতান্তর বাদীর দলেরা ঈশ্বরকে সাকার মনে করে, তার আশ্রয়স্থল তৈরী করে রেখেছে। কেহ সপ্তলোক, কেহ চতুর্থলোক কেহ ক্ষীরসাগর কেহ গোলক কেহ আবার বৈকুণ্ঠধাম স্থীর করে রেখেছে। যদি পরমেশ্বর নিজেই অপরের আশ্রয়ে থাকে তাহলে বলতো জগৎ কার আশ্রয়ে থাকবে? জগৎ তো নিরাশ্রয় হয়ে যাবে।
ঈশ্বরকে সাকার ধরলে এমনি বহিতত দোষ ঈশ্বরকে যুক্ত করে।
✅শৈবপক্ষ দ্বারা খণ্ডন—
“সাকার মানেই আশ্রিত” এই অনুমানটাই মূল দোষ। শাস্ত্রে কোথাও বলা হয়নি- যে সাকার, সে অবশ্যই অপরের আশ্রয়ে থাকবে। এটি সত্য কেবল ভৌতিক দেহধারী জীবের ক্ষেত্রে, ঈশ্বরের ক্ষেত্রে নয়। শ্রুতি বলে— “যস্মাত্ পরং নাপরং অস্তি কিঞ্চিত্
যস্মান্নাণীয়ো ন জ্যায়োঽস্তি কশ্চিত্” (শ্বেতা ৩/৯)- যার ঊর্ধ্বে কিছু নেই, তিনি কিসের আশ্রয়ে থাকবেন?
অনার্যরা “অবস্থান” ও “আশ্রয়” এই দুইটি গুলিয়ে ফেলেছে। অনার্যরা ধরে নিচ্ছে অবস্থান অর্থ আশ্রিত হওয়া। কিন্তু- আশ্রয় অর্থ যার উপর নির্ভর করে অন্য কিছু থাকে। অবস্থান অর্থ প্রকাশ বা অধিষ্ঠান। ঈশ্বরের সাকারত্ব অর্থ- তিনি কোথাও নির্ভর করে আছেন এটা নয় বরং তিনি সর্বত্র অধিষ্ঠান করে আছেন। বৃহদারণ্যক উপনিষদ ৩/৮/৯- “এতস্য বা অক্ষরস্য প্রশাসনে গার্গি সূর্যাচন্দ্রমসৌ বিধৃতৌ তিষ্ঠতঃ” - সূর্য, চন্দ্র তাঁর শাসনে স্থিত, তিনি তাঁদের আশ্রয়ে নন।
অনার্যরা বলছে লোক-লোকান্তর মানলে ঈশ্বর আশ্রিত হয়ে যান। কিন্তু, শাস্ত্রে লোকের কথা বলা হয় ব্যবহারিক স্তরে উপাসনা ও ধ্যানের সুবিধার্থে। লোক ঈশ্বরকে ধারণ করে না, ঈশ্বরই লোককে ধারণ করেন। ঈশ্বর আধাররূপে সর্বত্র অধিষ্ঠান করেন, আধেয়রূপে নয়, বরং স্বেচ্ছাপ্রকাশরূপে।
অনার্যদের ধারণা সর্বাধার অর্থ “শারীরিকভাবে সবকিছু বহন করা”। কিন্তু, সর্বাধার অর্থ- সত্তা, নিয়ন্ত্রণ ও কারণ হিসেবে ধারণ করা। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়—
আকাশ পাত্রকে ধারণ করে কিন্তু, আকাশ নিজে কোনো পাত্রে নির্ভর করে না।
ঈশ্বর “লোকস্থিত” বললেও তিনি লোকাশ্রিত নন। শাস্ত্র বলে- ঈশ্বর বৈকুণ্ঠে, কৈলাসে, ইত্যাদি অবস্থান করেন। এর অর্থ- ঈশ্বর সেখানে সীমাবদ্ধ এটা নয় বরং তিনি সেখানে বিশেষভাবে প্রকাশিত। যেমন— আগুন লোহার মধ্যে প্রকাশিত হলেও আগুন লোহার আশ্রয়ে নয়। গীতা (৯/ ৪–৫)- “ময়া ততমিদং সর্বং জগতব্যক্তমূর্তিনা। মৎস্থানি সর্বভূতানি ন চাহং তেষ্ববস্থিতঃ”।। সমস্তকিছু ঈশ্বরের মধ্য কিন্তু, তিনি কোনো কিছুর মধ্যে আবদ্ধ নন। এটাই এই দোষের সরাসরি খণ্ডন।
অনার্যদের শংকা “জগৎ নিরাশ্রয় হয়ে যাবে” এই ভয় অর্থহীন। এই ভয় আসে কারণ, আশ্রয়কে কেবল স্থানগত বলে ধরা হয়েছে। কিন্তু, শাস্ত্রে জগৎ ঈশ্বরের সত্তায় স্থিত, ঈশ্বরের শক্তিতে পরিচালিত।
অতএব ঈশ্বর সাকার হলেও জগৎ তাঁর আশ্রয়েই থাকে কোনো নিরাশ্রয়তা আসে না।
অনার্য কতৃক উত্থাপিতএই দোষ মানলে গুরুতর শাস্ত্রবিরোধিতা হয়। এই আপত্তি মানলে উপনিষদের “সর্বাধার ব্রহ্ম” অস্বীকার করা হয়। গীতার ৯ম অধ্যায় অসংগত। পরশিব ব্রহ্মের জগৎ স্বরূপে প্রকাশিত হওয়া মিথ্যা হয়ে যাবে। যা কোনো প্রামাণিক দর্শন মানে না। তাই এই “ষষ্ঠ দোষ” যৌক্তিক নয়, কারণ- সাকারত্বকে আশ্রিতত্বের সঙ্গে এক করে দেখা হয়েছে। অবস্থান ও আশ্রয়ের শাস্ত্রীয় ভেদ মানা হয়নি। সর্বাধারত্বের অর্থ ভৌতিকভাবে বোঝা হয়েছে। উপনিষদ, গীতা সরাসরি অনার্যদের এই আপত্তি খণ্ডন করে।
সুতরাং- পরমাত্মা সাকার হয়েও সর্বাধার হতে পারেন,
কারণ তিনি আশ্রিত নন তিনি আশ্রয়েরও আশ্রয়। ঈশ্বর লোকস্থিত হতে পারেন, কিন্তু লোকাশ্রিত নন।
প্রশ্ন—
শাস্ত্রে সাকারত্বের সঙ্গে আশ্রিতত্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্ত?
অবস্থান অর্থই কি আশ্রয়?
সর্বাধারত্ব কি শারীরিক বহনের সমার্থক?
লোক-লোকান্তর অর্থ কি ঈশ্বর অন্যের আশ্রয়ে থাকা?
ঈশ্বরের প্রকাশ অর্থই কি তিনি কারও আশ্রয়ে থাকবেন?
————————————————————————————————————————————————
❌অনার্যদের দাবী—
বাস্প এবং অগ্নি এরা একক পদার্থ নয়। এরা অসংখ্য পরমানুর সৃস্টি। জলের অসংখ্য ক্ষুদ্র পরমানু বাষ্পের আকার ধারণ করে সেই পরমানুর সমষ্টিই আবার স্কুল হয়ে মেঘরুপে আত্ম প্রকাশ করে তখন তাকে আমরা জল বা বরফ বলি। বাষ্প যদি একটি পরমানু বা একক রস হতো তাহলে সে কোনো কালে স্কুল হতে পারত না। অগ্নীর পরমানু সমন্ধে ঐ একই কথা। অগ্নির পরমানু অসংখ্য হওয়ায় পরষ্পর সংযোগস্থান রুপে প্রচন্ড অগ্নির আকার ধারন করে। অগ্নি সর্বব্যাপক ও নিরাকার একথা বলা ভুল। অগ্নি" পৃথিবী এবং জল অপেক্ষা সুক্ষ্ম তাই তাকে পৃথিবীতে বা জলের ব্যাপক স্বঅকার করা যেতে পারে কিন্তু আকাশ ও বায়ুতে স্বীকার করা যায় না। তবে হ্যা আকাশ ও বায়ু দুটোই অগ্নিতে ব্যাপক। কেননা এ দুটো অগ্নি অপেক্ষা সুক্ষ্ম। সুক্ষ্ম পদার্থই স্কুল পদার্থে ব্যাপক হয়ে থাকে। যে সব পদার্থে অগ্নি ব্যাপক রুপে আছে সেই পদার্থে সমুহ সাকার বা রূপ যুক্ত। জগতে যাহা রুপবান দৃস্ট হয় সে সমস্ত অগ্নির ব্যাপকতার কারনে কেননা রুপ অগ্নির একটি গুন। অতএব ভৌতিক পদার্থের সমস্টি সুক্ষ্ম অপেক্ষা স্কুল এবং সে সুক্ষ্ম অপেক্ষা এজন্য স্কুল যেহেতু সে বহু পরমানুর সমস্টি দ্বারা গঠিত। পরমাত্মা সর্বব্যাপক এক এবং একর সংযুক্ত অতএব তিনি সাকার হতে পারেন না। প্রশ্ন রইল যে ঈশ্বর সবসময় অবতার গ্রহন করে থাকেন। ধারনা করা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নামা। উপরে উঠা বা নামার ব্যাবহার একদেশিতার লক্ষণ অর্থাৎ উঠানামা ক্রিয়া এক স্থানে অবস্থান কারী বস্তুর পক্ষে সম্ভব। যে সর্বব্যাপক তার পক্ষে অসম্ভব। যে সর্বব্যাপক তার পক্ষে আসা যাওয়া উঠানামা করা সম্ভব হতে পারে না। যিনি সবস্থানে থাকেন তিনি কোথায় আসবেন বা কোথাই বা যাবেন।
✅শৈবপক্ষ দ্বারা খণ্ডন—
অনার্যরা ভৌতিক পদার্থের গঠনকে ঈশ্বরের সাথে সমান মেনে নিয়েছে। বাষ্প, জল, অগ্নি সব ভৌতিক পদার্থ। এগুলো পরমাণুসমষ্টি, উৎপন্ন হয়, নশ্বর, স্থান নির্ধারিত। ঈশ্বরের সাকারত্ব ভৌতিক নয়। শাস্ত্রে স্পষ্ট বলা আছে ঈশ্বর সাকার হলেও উৎপন্ন বা পরমাণুযুক্ত নয়, বরং নিত্য এবং স্বশক্তিশালী। (গীতা ৪/৬) এই অর্থ প্রতিপাদন করেন যে- অজ (অজাত), অব্যয় হলেও প্রকাশ বা অবতার সম্ভব।
অনার্যরা ধরে নিচ্ছে “সাকার মানে একদেশী, সীমানাবদ্ধ”। কিন্তু, একদেশী অর্থ স্থানিকভাবে সীমাবদ্ধ। সাকার অর্থ রূপ ধারণ করা, নিজ ইচ্ছায় প্রকাশিত হওয়া। ঈশ্বরের সাকারত্ব অর্থ রূপ গ্রহণ / প্রকাশিত হওয়া, স্থানিক সীমাবদ্ধতা নয়।
অনার্যরা বলছেন যিনি সর্বব্যাপক, তিনি কোথায় আসবেন বা যাবেন? কিন্তু, শাস্ত্রে সর্বব্যাপকত্ব অর্থ সর্বত্র অধিষ্ঠান, অবস্থান বা স্থান নয়।
উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়- সূর্য, বাতাস সর্বত্র আলো বা তাপ ছড়ায়, কিন্তু কোনো “স্থানিক আসা-যাওয়া” নয়।
(গীতা ৯/৪–৫) ঈশ্বর সর্বত্র, কিন্তু স্থানগতভাবে আবদ্ধ নয়। অবতারও এক ধরনের প্রকাশ, স্থানগত “সীমানা” না, লীলার মাধ্যমে প্রকাশিত হওয়া।
অনার্যরা বলছে অবতার অর্থ “এক স্থান থেকে অন্য স্থানে আসা বা যাওয়া”। কিন্তু, শাস্ত্রে স্পষ্ট অবতার কর্মজ নয়, লীলাজ কার্য, যার উদ্দেশ্য ধর্ম সংস্থা, দুষ্টের নাশ। এটি স্বরূপগত বা কার্যগত প্রকাশ, স্থানগত সীমাবদ্ধতা নয়।
অনার্যদের এই আপত্তি যৌক্তিক নয় কারণ- ভৌতিক পদার্থের গঠন ও বৈশিষ্ট্যকে ঈশ্বরের উপর চাপানো হয়েছে। সাকারত্ব অর্থ স্থানিক সীমাবদ্ধতা এই ভুল সিদ্ধান্তকে মান্য করা। সর্বব্যাপকত্বকে একদেশীতার সঙ্গে মিশিয়ে ধরা। অবতারকে স্থানগত আসা-যাওয়া বলে ভুল ব্যাখ্যা করা। শাস্ত্র সরাসরি বলে স্বরূপে সীমাবদ্ধ না হলেও সর্বত্র প্রকাশ সম্ভব।
সুতরাং- ঈশ্বর সাকার ও সর্বব্যাপক হতে পারেন।
অবতার অর্থ লীলাজ প্রকাশ, স্থানিক সীমাবদ্ধ নয়।
ভৌতিক পদার্থের নিয়ম ঈশ্বরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
প্রশ্ন—
শাস্ত্রে ঈশ্বরের সাকারত্ব অর্থ ভৌতিক পদার্থের মতো উৎপন্ন বা পরমাণুযুক্ত?
শাস্ত্রে সাকারত্বের অর্থ স্থানিক সীমাবদ্ধতা?
সর্বব্যাপকত্ব অর্থ কি স্থানিক অবস্থান বা আসা-যাওয়া?
অবতার অর্থ কি শারীরিক স্থানান্তর বা সীমানাবদ্ধ কার্য?
সর্বব্যাপকত্বের সাথে স্থানিক সীমানা যুক্ত করা যৌক্তিক কি?
————————————————————————————————————————————————
❌অনার্যদের দাবী—
ঈশ্বরের অবতার কখনও হয়নি, কখনও হবেও না। সময় সময় যে সব মহাপুরুষ(?) জন্ম নিয়েছিলেন, যারা দুষ্টের দমন করেছিলেন অথবা জনসাধারণকে সঠিক পথ দেখিয়েছিলেন, জনসাধারণ তাঁদের নানাপ্রকার উপাধি দিয়েছে। সেই মহানদের নাম কেউ নবী' রেখেছে-কেউ তাকেঈশ্বরের পুত্র বলেছে। কেউ তাঁকে ঈশ্বরের অবতার বলে স্বীকার করেছে। | কেউ তাকে ঈশ্বরে বলেছে। মনে রাখতে হবে, তাঁরা কিন্তু সকলেই মানুষ ছিলেন। একটু বিচার বিবেচনা করেই দ্যাখো। যিনি অশরীরী হয়ে শরীর-ধারী প্রাণীকুলকে সৃষ্টি করতেপারেন, সেই ঈর্থর কি অশরীরী হয়ে শরীর ধারী প্রাণীদের সংহার করতে পারেন না? জগতে আজও অসংখ্য প্রাণী জন্ম নিচ্ছে, এবং মরছোঈর কি শরীর ধারণ করে তাদের সৃষ্টি ও সংহার করছেন? সামান্য মাত্র ভূকম্পনে প্রাণীকে মরতে দেখেছ। এক ঘূর্ণি ঝড়ের | আঘাতে কত নগর বিধ্বস্ত হয়ে যায়, গে মহামারীতে, কলেরায়, শত শতমানুষ মরে যায়, আর সামান্য মাত্র একজন তুচ্ছ প্রাণীকে মারার জন্য কিনা ঈশ্বরকে অবতার হতে হবে? তার সামনে রাবণ, কংস তো কোন ছার! যে ঈশ্বর নীরবে সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয় করতে সক্ষম, তাকে শরীর ধারণ করে অথাৎ অবতার হয়ে দুষ্টকে সংহার করতে হয়েছিল, একথা বলা হাস্যকর এবং ঘোরতর অপমানকর নয় কি? "যখন যখন ধর্মে শনি উপস্থিত হয় তখন তখন ঈর্থর অবতার হন" একথা বলাও ভ্রান্তি উৎপাদক নয় কি? এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে, যারা অবতারবাদে বিশ্বাসী তারা প্রায় এই কথাটিকে বারংবার বলে থাকে। কিন্তু তাদের সিদ্ধান্ত অনুসারেই টেকে না। দ্যাখো! যারা যারা ঈশ্বরের অবতার বিবাস করে থাকে, তারা মুখ্যরূপে দশ অবতার এবং চার যুগ স্বীকার করে। সত্যযুগ, ত্রেতা যুগ, দ্বাপর যুগ আর কলিযুগ। কেমন? সত্যযুগে' ধর্মের চার চরণ, ত্রেতা যুগে ধর্মের তিন চরণ আর অধর্মের এক চরণ স্বীকৃত দ্বাপর যুগে' ধর্মের দুই চরণ এবং অধর্মের দুই চরণ। অর্থাৎ অর্ধেক পুণ্য আর অর্ধেক পাপ। কলিযুগে' ধর্মের এক চরণ আর অধর্মের তিন চরণ। এবার একটু অবতার (মে বিবেচনা করা যাক। লোকে জানে, সত্যযুগে চার অবতার, ত্রেতা যুগে তিন, দ্বাপরে দুই আর কলিযুগে এক অবতার। এখন, বিচার্য বিষয় এই, যদি সত্যযুগে ধর্মের চার চরণ ছিল, অধর্ম মোটেই ছিল না সে যুগে চার অবতারের প্রয়োজন কীসের?
ত্রেতা যুগের যখন ধর্মের তিন চরণ মেনে নেওয়া হলো এ অবস্থায় তিনটি মাত্র অবতার হলো কেন? দ্বাপর যুগে যখন অর্ধেক পাপ আর অর্ধেক পুণ্য, | সে অবস্থায় অবতার দু'জন কেন রয়ে গেল? আর কলিযুগে যখন ধর্মের একটি চরণ রয়ে গেল, আর অধর্মের রয়ে গেল তিন চরণ, সে অবস্থায় একজন অবতার কেন? আর তাও আবার কলিযুগের শেষে নাকি আবির্ভাব ঘটবে, এখনও ঘটেনি, তা কেন? হওয়া উচিত ছিল, অধর্মের বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে অবতারেরও বৃদ্ধি। তা না হয়ে যাই অধর্মের বৃদ্ধি হতে লাগল ততই অবতারের সংখ্যা হ্রাস পেতে লাগল। এবার বলতো, ধর্মের হানি হওয়ার সঙ্গে অবতারদের সম্বন্ধ কোথায় রইল?
✅শৈবপক্ষ দ্বারা খণ্ডন—
অনার্যরা বলছে অবতার প্রয়োজন মানুষের সমস্যার সমাধানে। কিন্তু, শাস্ত্রে স্পষ্ট অবতার মানবজীবনকে সীমাবদ্ধভাবে নয়, বরং ধর্ম, ব্রহ্মাণ্ড ও সমগ্র সত্তার স্বার্থে। ভগবদ্গীতা ৪/৭–৮—
“যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত,
অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্”।।
অর্থাৎ—ঈশ্বর শুধু মানবজাতির জন্য নয়, ধর্ম ও সত্তার ভারসাম্য রক্ষার জন্য অবতার হন।
অনার্যরা ধরে নিচ্ছে ধর্ম হ্রাসের সঙ্গে অবতারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। শাস্ত্রে অবতার সংখ্যা নির্দিষ্ট নয়, যে কালে প্রয়োজন হয় সে কালে প্রকাশিত হয়। “অবতার” অর্থ সাধারণ মানদণ্ড, কিন্তু শাস্ত্র উল্লেখ করে, যখন প্রয়োজন হয় তখনই অবতার। তাই যুগ ও অবতারের সংখ্যা সমানুপাতিক হওয়া শাস্ত্রগত বাধ্যবাধকতা নয়।
অনার্যরা যুগভিত্তিক সংখ্যা দিয়ে সমালোচনা করছেন।
কিন্তু, শাস্ত্র মতে প্রতিটি অবতার স্বতন্ত্র উদ্দেশ্য ও সময়ে প্রকাশিত হয়। প্রতিটি অবতার সেটি যুগের প্রয়োজন ও মহৎ লক্ষ্য অনুযায়ী, সংখ্যার মধ্যে গাণিতিক সমতা বাধ্যতামূলক নয়।
অনার্যরা ধরে নিচ্ছে অবতার অর্থ ঈশ্বরের অশরীরী ক্ষমতা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে শরীরধারী হয়ে আসা। শাস্ত্রে বলা হয়েছে- অবতার অর্থ লীলা বা স্বেচ্ছাপ্রকাশ, নিতান্তই কর্মজ নয়, শরীরধারণও তাঁর নিত্যত্বকে ক্ষয় করতে পারে না। (গীতা ৪/৬–৮)- “অজোঽপি সন্নব্যয়াত্মা… সম্ভবাম্যাত্মায়য়া….ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে”। অর্থাৎ- অবতার নির্দিষ্ট সময়ে ও উদ্দেশ্যে প্রকাশিত, কিন্তু তিনি জন্মগ্রহণ বা ক্ষয়ী হন না।
অনার্যদের যুক্তি হলো- কলি যুগে ধর্ম এক চরণ, অধর্ম তিন অবতার সংখ্যা এক হওয়া উচিত নয়। শাস্ত্রমতে অবতার সংখ্যা অধর্মের মাত্রা নয়, বরং ধর্মের রক্ষার প্রয়োজন অনুযায়ী। ছোট ধর্মের জন্যও এক অবতার যথেষ্ট, বড় বিপদের জন্যও এক অবতার। এই বিচার গণিত নয়, লক্ষ্য ও প্রয়োজনভিত্তিক।
অনার্যদের এই আপত্তিও যৌক্তিক নয় কারণ- অবতারকে শুধুই মানুষের সমস্যা সমাধানের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। যুগভিত্তিক সংখ্যা ও ধর্মের অনুপাতকে বাধ্যবাধকতা মনে করা হয়েছে। শরীরধারণ ও জন্মগ্রহণকে উৎপন্ন হওয়ার সমান ধরা হয়েছে। অবতার অর্থ লীলাজ প্রকাশ, সৃষ্টিকর্তার নিত্যত্ব অক্ষুণ্ণ থাকে।
সুতরাং- ঈশ্বরের অবতার সত্য, কিন্তু এটি লীলাজ প্রকাশ, কর্মজ নয়, সংখ্যা বা যুগের অনুপাত অনুযায়ী সীমাবদ্ধ নয়। অবতার ধর্ম প্রতিষ্ঠা, অধর্ম দমন, জনসাধারণকে সঠিক পথ দেখানোর জন্য প্রকাশিত হন, কিন্তু ঈশ্বরের নিত্যত্ব ও সর্বব্যাপকত্ব ক্ষুণ্ণ হয় না।
প্রশ্ন—
শাস্ত্রে অবতার শুধুমাত্র মানবজাতির জন্য সীমাবদ্ধ?
শাস্ত্রে যুগভিত্তিক সংখ্যা ও ধর্মের অনুপাত অনুযায়ী অবতার সংখ্যা বাধ্যতামূলক?
শাস্ত্রে কি অবতার অর্থই ঈশ্বরের নিত্যত্ব ক্ষয়?
অনার্যরা লীলাজ প্রকাশ এবং শারীরিক জন্মকে একই অর্থে নিয়েছেন কীভাবে?
শাস্ত্রে কি বলা হয়েছে অবতার কেবল মানুষকে রক্ষা করতে আসে, পুরো ব্রহ্মাণ্ড বা সত্তার ভারসাম্য রক্ষার জন্য নয়?
————————————————————————————————————————————————
❌অনার্যদের দাবী—
প্রথমতঃ-কেউ আঙুলের উপর পাহাড় তুলেছিল একথা ভুল। | যদি দুর্জনতোষ ন্যায়ানুসারে একথা স্বীকার করে নেওয়া যায়, তবু এ দ্বারা। ঈশ্বর অথবা ঈশ্বরের অবতারের কোনও মহিমা প্রকাশ পায় না। তুমি হয়ত বলবে কেন? কেন, তাই বলছি শোনো। যে ঈশ্বর সূর্য প্রভৃতি গ্রহ উপগ্রহ সমূহকে আপন শত্তি (তে ধারণ করে আছেন, তাঁর পথে গোবর্ধন প্রভৃতি পর্বত এক সরষে পরিমাণও নয়। যে ধরার উপর তোমরা বাস করছ, আমরা বাস করছি, সেই ধরার বুকে এক আধটা নয়, ছোটবড় পাহাড়পর্বত আছে, সেই ধরাকে ধারণ করে আছেন ঈশ্বর, সে কথা মনে করলে, বেচারা গোবর্ধন পর্বত নগণ্য নয় কি? যদি ঈশ্বর বা কোনও ঈশ্বরের অবতার, গোবর্ধন পর্বত আঙুলে তুলে ধরে, সে এমন কোন্ বাহাদুরীর কথা হলো? যদি কোনও এম, এ, অধ্যয়নরত বিদ্যার্থী, দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণীর কোনও প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিয়ে দেয়, তাহলে সে এমন কোন্ লক্ষভেদ করল? হ্যা, দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র হয়ে যদি কেউ এম, এ, প্রাপত্রের উত্তর দেয় বাস্তবিকপথে সেই প্রশংসনীয়। ঠিক তেমনি, মানুষ হয়ে যদি কেউ | আঙুলে পর্বত তুলে ধরে তাহলে বলা যায়-হ্যা, এক অদ্ভুত কাজ করেছে বটে। কেননা, মানুষের পথে আঙুলে পর্বত তুলে ধরা কল্পনাতীত। আর যদি সে কাজ কোনও ঈশ্বরের অবতার করে থাকে, তাতে বিস্ময়ের কী থাকতে পারে বলো। শুধু তাই নয় এতে তার কোনও মহিমাও প্রকাশ পায় না।
✅শৈবপক্ষ দ্বারা খণ্ডন—
কারণ ছাড়া কোনো কার্য হয় না। তেমনি শ্রীকৃষ্ণের আঙ্গুলের উপর পাহাড় তুলে নেওয়াটা একটা বিশেষ কারণের জন্য ঘটিত হয়েছে। আর যেহেতু কৃষ্ণ ঈশ্বরের অবতার তাই- শ্রীকৃষ্ণের জন্য আঙ্গুলে পাহাড় তুলে নেওয়াটা কোনো বিশাল মহিমাকে প্রকাশ না করলেও সাধারণ জীবের জন্য তা অসাধারণ ঘটনা৷ তাই সাধারণের জন্য এটাকে ঈশ্বরীয় মহিমা প্রকাশ বললেও ক্ষতি হয় না৷ অর্থাৎ, ঈশ্বরের শক্তির সীমা-প্রদর্শন নয়, বরং তাঁর স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি ও লীলার প্রকাশ। গোবর্ধনধারণ কোনো বাহাদুরি প্রদর্শন নয়, বরং বৃন্দাবনবাসীদের রক্ষা ও ইন্দ্রগর্ব দমন এই নির্দিষ্ট ধর্মীয় উদ্দেশ্যেই সংঘটিত। অনার্যদের মূল ভ্রান্তি হলো- তারা ঈশ্বরকে কেবল একমাত্র “নিরাকার, বিশ্বাতীত” অবস্থায় সীমাবদ্ধ করে দেখে। অথচ শাস্ত্র বলে, ব্রহ্ম একাধারে বিশ্বাতীত এবং বিশ্বময়। শ্রুতি বলে—
“তদেবেজতি তন্নৈজতি তদ্দূরে তদ্বন্তিকে।
তদন্তরস্য সর্বস্য তদু সর্বস্যাস্য বাহ্যতঃ”॥
(ঈশোপনিষদ ৫)
অর্থাৎ- তিনি চলেনও, চলেন না-ও, তিনি দূরেও, নিকটেও, তিনি সবকিছুর ভিতরে আবার সবকিছুর বাইরেও।
অনার্যরা এখনো এটাই জানে না যে- ব্রহ্ম বিশ্বাতীত ও বিশ্বময় দুই ভাবেই আছেন। ব্রহ্ম যখন নিরাকার, নিষ্কল, নির্বিকার, পরমানন্দ স্বরূপ তখন ব্রহ্ম বিশ্বাতীত। আর যখন ব্রহ্ম সেই বৃহৎ থেকেও বৃহৎ হয়ে অবিকৃত থেকেও উপাধিভেদে প্রকাশিত হন” অর্থাৎ- নির্দিষ্টি একটা স্বরূপে প্রকাশিত হন তখন ব্রহ্ম বিশ্বময়। বিশ্বময় অবস্থায় ব্রহ্ম অধর্মের নাশ ও ধর্মের প্রতিষ্ঠার জন্য অবতারিত হন। তার মধ্যে শ্রীকৃষ্ণ অন্যতম। তিনি অভিনয় মাত্র বহু লীলা ঘটিয়েছেন। তেমনই, স্থান, কাল, পাত্র ভেদে সেই সময়ে শ্রীকৃষ্ণ বৃন্দাবনবাসীদের রক্ষার নিমিত্তে গোবর্ধন পর্বত নিজ আঙ্গুলে তুলে ধরেছেন। এখানে যা কিছুই হয়েছে সব ঈশ্বরের বিশ্বময় অবস্থায় লীলা মাত্র। কিন্তু, মূলত ঈশ্বর বিশ্বাতীত। এই অবতার কোনো বিকার নয়, কোনো বাধ্যতাও নয় এটি ঈশ্বরের স্বাভাবিক লীলা। শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ বলে—
ন তস্য কার্যং করণং চ বিদ্যতে
ন তৎসমশ্চাভ্যধিকশ্চ দৃশ্যতে।
পরাস্য শক্তির্বিবিধৈব শ্রূয়তে
স্বাভাবিকী জ্ঞানবলক্রিয়া চ”॥
(শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ ৬/৮)
অতএব ঈশ্বরের অবতার গ্রহণ কোনো দুর্বলতা নয়, বরং তাঁর স্বাধীন স্বাতন্ত্র্যশক্তির প্রকাশ।
এক ঈশ্বরই জগৎ রূপে ভাসিত হচ্ছে, আবার সেই এক ও অদ্বিতীয় ঈশ্বরই সেই জগতে নাট্য করছেন। জগৎ স্বরূপে যিনি আছেন তিনিও ব্রহ্ম আর গোবর্ধন পর্বত যিনি আঙ্গুলে তুলে ধরেছেন তিনিও এক ঈশ্বরের প্রকাশ তবে এখানে অসঙ্গতি কিসের??
একই অদ্বিতীয় ব্রহ্ম জগৎরূপে ভাসিত হচ্ছেন, আবার সেই জগতের মধ্যেই ক্রীড়ারত। এই তত্ত্বকে উপনিষদ অত্যন্ত সুন্দর উপমায় প্রকাশ করেছে—
যথোর্ণনাভিঃ সৃজতে গৃহ্ণতে চ
যথা পৃথিব্যামোষধয়ঃ সম্ভবন্তি।
যথা সতঃ পুরুষাৎ কেশলোমানি
তথাক্ষরাত্সম্ভবতীহ বিশ্বম্॥
(মুণ্ডক উপনিষদ ১/১/৭)
মাকড়সা যেমন- নিজেই জালের বিস্তার করে, সেই জালেই ক্রীড়া করে এবং অন্তিমে সেই জালকেই গিলে নেই। সেই ভাবেই এক ও অদ্বিতীয় পরমেশ্বর নিজেই মহাবিশ্বের সৃজন করেন, পালন করেন ও অন্তিমে সেই জগৎকে নিজের মধ্যেই সমাহিত করে নেন। অর্থাৎ যিনি জগতের সৃজন করছে তিনিও এক ও অদ্বিতীয় ঈশ্বর এবং যিনি বিভিন্ন ক্রীড়া করছে তিনিও সেই ঈশ্বর।
অতএব, যিনি জগৎরূপে বিরাজমান, তিনিও ব্রহ্ম। যিনি গোবর্ধন পর্বত আঙুলে তুলে ধরেছেন, তিনিও সেই একই ব্রহ্মের প্রকাশ। এখানে দ্বৈততা বা অসঙ্গতির প্রশ্নই ওঠে না। অনার্যদের আপত্তি তাই শাস্ত্রবিরোধী, দর্শনগতভাবে অসম্পূর্ণ এবং ঈশ্বরতত্ত্বের একদেশী বোঝাপড়ার ফল।
প্রশ্ন—
শাস্ত্রে ঈশ্বরের কর্ম বা লীলার মহিমা শুধুমাত্র “অদ্ভুত” বা মানুষের চোখে বিশাল কার্য দ্বারা মাপা হয়?
ঈশ্বরের স্বেচ্ছামূলক কার্য বা লীলা কি মানুষের অনুমান ছাড়া মহিমাহীন?
আঙ্গুলে পর্বত তোলা কর্মজ বাহাদুরি, নাকি ধর্ম ও জনসাধারণের রক্ষার জন্য বিশেষ কারণ?
শাস্ত্রে ঈশ্বরের কার্য ভৌতিক বা মানবীয় সীমার মধ্যে মাপা হয়?
আঙ্গুলে পর্বত তোলা ভৌতিক দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করা যায়?
ঈশ্বরের লীলা কি মানবসীমার তুলনায় বোঝানো সম্ভব বা প্রয়োজনীয়?
শাস্ত্রে অনুযায়ী ঈশ্বর কি একই সঙ্গে জগৎরূপে বিরাজমান এবং নির্দিষ্ট ক্রীড়ার মধ্যেও প্রকাশিত হতে পারেনা?
আঙ্গুলে পর্বত তোলা ঘটনার মাধ্যমে বিশ্বময় ও বিশ্বাতীত ঈশ্বরের দুই অবস্থার মধ্যে দ্বৈততা তৈরি হয়?
সাধারণ মানুষের দৃষ্টিকোণ লীলার প্রকৃত মহিমা নির্ধারণ করতে যথেষ্ট?
শাস্ত্রে কি বলা হয়েছে এক ঈশ্বর একাধিক অবস্থায় একসঙ্গে থাকতে পারে না?
প্শাস্ত্রে বিশ্বময় অবস্থার মধ্যেও নির্দিষ্ট লীলার প্রকাশ সম্ভব নয় কি?
————————————————————————————————————————————————
❌অনার্যদের দাবী—
ঈশ্বরে যদি অবতাররূপে আসেন তাহলে তার মধ্যে সর্বশক্তিমানত্ব গুণ থাকবে না। এই অবস্থায় তাঁকে শক্তিহীন হতে হবে। যদি বলো কেমন করে হবে? তো শোনো। যে ঈশ্বর শরীর ধারণ করার পূর্বে হস্তপদাদি অবয়ব | রহিত হয়ে বিজগৎ রচনা করেছিলেন এখন তাঁকে হস্তপদাদি অবয়বের সাহায্যে কাজ করতে হবে। পূর্বে তিনি চ (রহিত হয়েও দেখতেন, এবার তাঁকে চোখ দিয়ে দেখতে হবে। পূর্বে কর্ণ রহিত হয়ে শুনতেন, এবার কান | দিয়ে শুনতে হবে। বলার উদ্দেশ্য এই যে, অবতার হয়ে আসবার আগে তাঁকে অবয়ব রহিত হয়ে কাজ করতে হতো, এবার শরীরের অধীনে থেকে, তাঁকে কাজ করতে হবে। ঈশ্বরকে যদি অপরের ভরসায় কাজ করতে হয়,। তাহলে তিনি সর্বশক্তিমান হবেন কেমন করে? অল্পজ্ঞ জীব যেমন শরীরের | ভরসায় কাজ করে, তেমনি ঈশ্বরেকেও শরীরের ভরসায় কাজ করতে হবে। তাহলে তুমিই বল, জীব আর ঈধরে পার্থক্য কী রইল? মানুষকে যেমন শীত, গ্রীষ্ম, ক্ষুধা, তৃষ্ণা ব্যাকুল করে তোলে, মানুষের যেমন রাগ-দ্বেষ, জ্বর-জ্বালা হয়, তেমনি শরীরধারী ঈর্থরেরও হবে। তাছাড়া সবচেয়ে বড় দোষ ঈরে আরোপিত হবে-ঈশ্বর অবতার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাকে পরাধীন হতে হবে, - তিনি স্বাধীন থাকতে পারবেন না। কখনও তাঁর খাওয়ার প্রয়োজন বা কখনও জলের, কখনও বা বস্ত্রাদির আবার কখনও নিবাস স্থানের অর্থাৎ মাথা গোঁজার মত ঠাঁইও প্রয়োজন হবে। যিনি জগতের যাবতীয় কর্ম আপন শক্তি বলে করেন, তাঁকে শরীরের সাহায্যে করতে হবে। এ অবস্থায় তাঁকে সর্বশক্তিমান কোন্ বিচারে বলবো বল? যদি কোনও ব্যক্তি অন্যকে আপন দৃষ্টি শক্তির প্রভাবে আকৃষ্ট করে জ্ঞানহারা করতে সক্ষম হয়, আর এক ব্যক্তি কাহাকেও ঔষধ প্রয়োগে জ্ঞানহারা করে। বলতো, এ দুজনের মধ্যে কোন জন অধিক শক্তিশালী। এস্থলে সেই শক্তিশালী ব্যক্তি, যেজন দৃষ্টিশত্তি (বলে | অন্যকে ওয়ানহারা করতে স(ম। যদি বলো কেন? কারণ এই যে, সে অপরকে সংজ্ঞাহীন করতে ঔষধের সাহায্য নেয়নি। এবার তুমি বেশ ভাল করে বুঝেছ যে, ঈশ্বর সেই অবস্থায় সর্বশক্তিমান হতে পারবেন, যখন তিনি অবতার গ্রহণ করবেন না। তুমি যে মনে করেছ সর্বশক্তিমান সম্ভব-অসম্ভব সব কিছুই করতে পারে, এ মনে করা মস্ত বড় ভুল | ছাড়া আর কিছুই না। যার মধ্যে সর্বপ্রকার শক্তি আছে তিনি সর্বশক্তিমান, এই হলো সর্বশক্তিমানের বাস্তবিক অর্থ। যিনি সর্বশক্তিমান হবেন তিনি। জগতের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পদার্থকে অপরের সাহায্য ব্যতীত যেমন যুক্ত করতে পারবেন, তেমনি তাদের বিযুক্তও করতেপারবেন। তিনি সমস্ত জীবকে তাদের কর্মানুয়াযী ফল দিতে এবং সৃষ্টি, স্থিতিও প্রলয় করতে পারবেন। তাৎপর্য এই যে, ঈশ্বর তাঁর নিজের কর্ম সম্পাদনে অপর কোনও কিছুর সাহায্য গ্রহণ করবেন না। এই হল ঈশ্বরের সর্বশক্তিমত্ত্বা। সর্বশক্তিমানের অর্থ এ নয় যে, তিনি অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারবেন।
✅শৈবপক্ষ দ্বারা খণ্ডন—
অনার্যরা বলছে- ঈশ্বরের দেহ অর্থ জীবের দেহ। আর এটাই অনার্যদের সবচেয়ে বড় ভুল ধারণা। কেননা শাস্ত্র স্পষ্ট করে বলে —
“অবজানন্তি মাং মূঢ়া মানুষীং তনুমাশ্রিতম্।
পরং ভাবমজানন্তো মম ভূতমহেশ্বরম্”॥
(গীতা ৯/১১)
অর্থাৎ— মূঢ়েরা আমাকে মানবদেহধারী দেখে তুচ্ছ মনে করে, আমার পরম স্বরূপ জানে না। এখানে পরিষ্কার যে, অবতারদেহ বাহ্যত মানবসদৃশ, কিন্তু তত্ত্বতঃ জীবদেহ নয়।
শাস্ত্রে অবতারদেহ বলা হয়- অপ্রাকৃত, চিন্ময়, মায়াধীন নয়, মায়াধারী। এই প্রসঙ্গে শ্রুতি বলে—
“মায়াং তু প্রকৃতিং বিদ্যান্মায়িনং তু মহেশ্বরম্”।।
(শ্বেতাশ্বতর ৪/১০)
মায়া প্রকৃতি, আর মায়ার অধীশ্বর মহেশ্বর।
অতএব, ঈশ্বরের দেহ মায়ার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়, বরং মায়াকে নিয়ন্ত্রণ করে।
অনার্যরা বলছে- আগে ঈশ্বর চক্ষু ছাড়া দেখতেন, এখন চোখ দিয়ে দেখতে হবে। কিন্তু, এটি মানবীয় অভিজ্ঞতা ঈশ্বরের উপর চাপানো হয়েছে। শাস্ত্র বলে—
“আপাণিপাদো জবনো গ্রহীতা
পশ্যত্যচক্ষুঃ স শৃণোত্যকর্ণঃ”।।
(শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ ৩/১৯)
অর্থাৎ—ঈশ্বর হাত-পা ছাড়াই গ্রহণ করেন, চোখ ছাড়াই দেখেন, কান ছাড়াই শোনেন। অবতার অবস্থায়ও এই ক্ষমতা নষ্ট হয় না, বরং লীলা হিসাবে সীমাবদ্ধ মনে হয়। এটি শক্তিহীনতা নয়, বরং স্বেচ্ছায় সংযম।
অনার্যদের ভুল যুক্তি হলো- শরীর ব্যবহার অর্থ শক্তির অভাব। কিন্তু, শাস্ত্রীয় অর্থে শরীর ব্যবহার অর্থ স্বাতন্ত্র্যশক্তির প্রকাশ। (গীতা ৪/৬)—
“অজোঽপি সন্নব্যয়াত্মা … সম্ভবাম্যাত্মমায়য়া”।।
অর্থাৎ— অজ, অব্যয় হয়েও আমি আত্মমায়ায় প্রকাশিত হই। এটি পরাধীনতা নয়, বরং ঈশ্বরের পূর্ণ স্বাধীনতা।
“জীব আর ঈশ্বরের পার্থক্য কী রইল?” অনার্যদের এই আপত্তির খণ্ডনে আমি বলি—
জীবের দেহ কর্মজ, ক্ষুদা-তৃষ্ণা বাধ্যতামূলক, জ্ঞান সীমিত, শক্তি সীমাবদ্ধ, জীবের পরাধীনতা রয়েছে। কিন্তু, পক্ষান্তরে ঈশ্বরের দেহ অপ্রাকৃত ইচ্ছাকৃত ও চিন্ময়। ঈশ্বরের দেহে ক্ষুদা-তৃষ্ণা নেই, যা করেন সব লীলা মাত্র। ঈশ্বর হলো সর্বজ্ঞ, অসীম শক্তিমান, পরমস্বতন্ত্র। তাই বাহ্য সাদৃশ্য মানেই তাত্ত্বিক সমতা নয়।
অনার্যদের “ঔষধ বনাম দৃষ্টিশক্তি” উদাহরণটা ভ্রান্ত উপমা মাত্র। কেননা এই উপমার সমস্যা হলো- এখানে দুটি সীমাবদ্ধ জীবের শক্তি তুলনা করা হয়েছে। ঈশ্বরের ক্ষেত্রে প্রশ্নই ওঠে না “সাহায্য নেওয়া”। কারণ— ঈশ্বরের শরীর, ইন্দ্রিয়, শক্তি সবই তাঁরই শক্তির প্রকাশ।
তাই এখানে “অপরের সাহায্য” কথাটাই ভুল। এছাড়াও শ্রুতি বলে— দ্বিতীয়াদ্বৈ ভয়ং ভবতি” তিনি অদ্বিতীয়, তার প্রতিদ্বন্দ্বী দ্বিতীয় কেউ-ই নাই [বৃহদারণ্যক উপনিষদ/১/৪]৷ শ্বেতাশ্বতর উপনিষদেও এটাই বলা আছে অদ্বিতীয় পরশিবই একমাত্র ব্রহ্ম এবং উনি কারো সাহায্যের অপেক্ষা রাখেন না, পরশিব নিজ শক্তির দ্বারা এই মহাবিশ্বকে নিয়মিত করেন। পরশিব পরম স্বতন্ত্র “একো হি রুদ্র ন দ্বিতীয়ায় তস্থুর্য ইমাঁল্লোকানীশত ঈশানীভিঃ” [শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ/৩/২]। তাই পরশিব ব্রহ্ম সাকার হয়েও সর্বদা পরিপূর্ণ ও আনন্দের আস্বাদনকারী।।
অনার্যরা এক জায়গায় ঠিক বলেছেন “সর্বশক্তিমান মানে অসম্ভবকে সম্ভব করা নয়”। হ্যাঁ, ঠিক কিন্তু তারা ভুল করছেন এখানে তারা ভাবছে অবতার অর্থই শক্তি কমে যাওয়া। কিন্তু, শাস্ত্র বলে- সর্বশক্তিমান অর্থ নিজের শক্তি দ্বারা সব করা, প্রয়োজনে না করাও করতে পারা। যেমন শ্রুতি বলে- “সঃ অকাময়ত বহু স্যাং প্রজায়েয়” [তৈত্তিরীয় উপনিষদ ২/৬] ‘তিনি ইচ্ছা করলেন আমি বহু হই, সৃষ্টি হই, এরূপ বহু হওয়ার সংকল্প,- “নামরূপে ব্যাকরবাণি” [বৃহদারণ্যক ১/৪/৭] ‘আমি নাম-রূপ দুইকে ব্যাকরণ করব,- “তন্নামরূপাভ্যামেব ব্যাকৃয়ত” [বৃহদারণ্যক ১/৪/৭)] ‘তিনি নাম ও রূপের দ্বারা নিজেকে প্রকাশ করলেন,। তাই, অবতার গ্রহণ করা বা না করা দুটোই ঈশ্বরের শক্তির প্রকাশ। কেননা পরশিব ব্রহ্ম সংকল্প মাত্রই বহু হন।
তাই অনার্যদের দাবী অযৌক্তিক, কারণ- তারা অবতারদেহকে জীবদেহ মনে করেছে। স্বেচ্ছা-সংযমকে শক্তিহীনতা ভেবে নিয়েছে। মায়াধীনতা ও মায়াধারীত্ব গুলিয়ে ফেলেছে। মানবীয় সীমা ঈশ্বরের উপর চাপিয়ে দিয়েছে।
সুতরাং- ঈশ্বর অবতার গ্রহণ করলেও তাঁর সর্বজ্ঞতা, সর্বশক্তিমত্তা, স্বাতন্ত্র্য একটিও লুপ্ত হয় না। অবতার হলো শক্তির ক্ষয় নয়, বরং স্বাধীন লীলার সর্বোচ্চ প্রকাশ। অবতার গ্রহণ ঈশ্বরের সর্বশক্তিমত্তার অভাব নয়, বরং তাঁর স্বাতন্ত্র্যশক্তির পরাকাষ্ঠা।
প্রশ্ন—
অবতারদেহ কি জীবদেহের সীমাবদ্ধতা ধারণ করে?
শরীরধারণ অর্থ কি শক্তিহীনতা বা পরাধীনতা?
ঈশ্বর কি কখনো অপরের সাহায্য ছাড়া কাজ করতে অক্ষম?
লীলার স্বেচ্ছামূলক সংযম কি শক্তিহীনতার সমতুল্য?
ঈশ্বরের সর্বশক্তিমত্তা কি শরীরধারণে ক্ষুণ্ণ হয়?
জীবের সীমাবদ্ধ শক্তি ও অভিজ্ঞতা কি ঈশ্বরের উপর প্রয়োগযোগ্য?
অবতার গ্রহণে কি ঈশ্বরের স্বাধীনতা বা স্বাতন্ত্র্য কমে যায়?
————————————————————————————————————————————————
❌অনার্যদের দাবী—
অসম্ভবকে সম্ভব না করা, নিয়মকে অনিয়মের মধ্যে না আনতে পারাই তো ঈশ্বরের ঈশ্বরত্ব। যদি তুমি বল যে, ঈশ্বর অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারেন, তাহলে আমি তোমায় প্রশ্ন করি, আচ্ছা বলতো-"ঈশ্বর কি নিজে নিজেকে মেরে ফেলতে পারেন, না পারেন না?"
✅শৈবপক্ষ দ্বারা খণ্ডন—
প্রথমত এসব হলো হাস্যকর আপত্তি। কেননা জগতের জন্য সম্ভব-অসম্ভব, নিয়ম-অনিয়ম সবই ঈশ্বরের দ্বারা স্থাপিত। ব্রহ্ম সংকল্প মাত্রই সব করতে পারেন। তাই ঈশ্বর যদি অসম্ভবকে সম্ভব করেন তাতে ঈশ্বরত্বের বিন্দুমাত্রও হানি হয় না। কেননা ঈশ্বরের একটি লক্ষণ হলো- সর্বকতৃত্বতা। অর্থাৎ- ঈশ্বর তাঁর নিজস্ব স্বরূপের বিরোধী নয় এমন সব কিছু করতে পারেন। তার জন্য ঈশ্বরের কোনো বাধাবাধ্যকতা নেই। কেননা, জগৎটাও ঈশ্বরের, নিয়মটাও ঈশ্বরের, তাহলে ঈশ্বর যদি অসম্ভবকে সম্ভব করেন তাতে ক্ষতি কি? ঈশ্বর তো পরমস্বতন্ত্র।
কিন্ত, ঈশ্বর অসম্ভব কে সম্ভব করেন না কারণ- যা ঈশ্বর কতৃক জগতের নিয়মের বিপরীতে যায় সেই অসম্ভবকে ঈশ্বর সম্ভব করেন না৷ এখানেই ঈশ্বরের ঈশ্বরত্ব যে ঈশ্বর নিয়মের অধীশ্বর হয়েও স্বেচ্ছায় নিয়মানুগ আচরণ করে জগৎকে শিক্ষা প্রদান করেন৷ যাতে জগৎ বাসীও নিয়ম পালন করেন৷
এছাড়াও শ্রুতি বলছে- “অমৃতস্যং পরং সেতুং” (শ্বেতা ৬/১৯) অর্থাৎ- ব্রহ্ম অমৃতের পরম সেতু। তাই ঈশ্বর নিজেকে ব্যক্ত স্বরূপকে অব্যক্ত স্বরূপে লীন করে দেন। তার অর্থ এই নয় যে- ঈশ্বর নিজেই নিজেকে মেরে ফেলছেন৷ গীতাতে বলা হচ্ছে–
“ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিৎ নায়ং ভূত্বা ভবিতা বা ন ভূয়ঃ। অজো নিত্যঃ শ্বাশ্বতোঽয়ং পুরাণো ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে”।। (গীতা ২/২০)
“এই আত্মা কখনো জন্মায় না, কখনো মরে না, একবার অস্তিত্ব লাভ করে আবার ভবিষ্যতে অস্তিত্বশীল হবে এমনও নয়। তিনি অজ, নিত্য, চিরন্তন ও পুরাতন, শরীর বিনষ্ট হলেও তিনি বিনষ্ট হন না।”
যিনি “মরেন না” তাঁকে “নিজেকে মারা” প্রশ্ন করাই অর্থহীন। এটা ঠিক যেমন প্রশ্ন করা “আগুন কি নিজেকে ঠাণ্ডা করে ফেলতে পারে?” এখানে আগুনের স্বরূপ নষ্ট করলেই সে আগুন থাকে না।
ঈশ্বর প্রকৃতির নিয়মের অধীশ্বর কিন্তু, যুক্তির বিরোধী নন। “ঈশ্বর কি নিজেকে মেরে ফেলতে পারেন?” এটা শাস্ত্রসম্মত প্রশ্ন নয়। “অসম্ভবকে সম্ভব না করাই ঈশ্বরত্ব” আংশিক সত্য, কিন্তু ভুল ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে। সঠিক কথা হলো- ঈশ্বর সব কার্য করতে পারেন যা স্বরূপবিরোধী নয়।
প্রশ্ন—
শাস্ত্রে বলা হয়েছে কি ঈশ্বরের সীমা হল “অসম্ভব” বা “স্বরূপবিরোধী কার্য”?
ঈশ্বরের ক্ষমতা কি শুধুমাত্র জ্ঞানসম্মত ও নিয়মমাফিক কার্যেই সীমাবদ্ধ?
আত্মার স্বরূপধর্মকে বিপরীত করার চেষ্টা কি শাস্ত্রসম্মত বা যৌক্তিক?
শাস্ত্রে দেখানো হয়েছে ঈশ্বর নিয়মের মধ্যে সীমাবদ্ধ, নাকি তিনি নিয়ম নির্ধারণকারী?
অসম্ভবকে সম্ভব করা অর্থই কি শাস্ত্রের প্রেক্ষিতে ঈশ্বরত্বের হানি?
————————————————————————————————————————————————
❌অনার্যদের দাবী—
ঈশ্বর নিজের মতো অন্য ঈশ্বর সৃষ্টি করতে। পারেন না, কোনও মতেই পারবেন না। তুমি বলবে কেন পারবেন না। আচ্ছা, তা বলছি শোনো-মনে করো, পূর্বের ঈশ্বর পুরাতন, তিনি আর একজন নূতন ঈশ্বরকে সৃষ্টি করলেন তাহলে এদের একজন হলেন পুরাতন, আর একজন হলেন নূতন। কেন? যে ঈশ্বরে প্রথমে ছিলেন তিনি অনাদি, আর দ্বিতীয় নূতন যে স্তরটি হলেন তিনি সাদি অর্থাৎ তাঁর আদি আছে। এক কথায় বলা যায় যে, একজনকে কেউ সৃষ্টি করেনি, আর অপরজনকে সৃষ্টি। করা হয়েছে। একজনের বয়সের সঙ্গে সম্বন্ধে নেই, আর অপর জনের বয়স আজ হতে শুরু হল। কেননা, শেষোত্ত (টি সৃষ্ট। ঈর্থর যিনি অনাদি, এঁদের উভয়ের মধ্যে তিনি ব্যাপক, আর যে ঈরটি সৃষ্টি তিনি ব্যাপ্য। কেননা, | এঁদের উভয়ে ব্যাপক হতে পারেন না। যদি বলো অর্ধেক অর্ধেক ব্যাপক থাকবেন, তাহলে দুই ঈশ্বর সর্বব্যাপক হওয়া সম্ভব হবে না। অতএব সর্বশক্তিমান শব্দের অর্থ এ নয় যে, ঈশ্বর সব কিছু করতে সক্ষম। ঈশ্বর তাই করতে সক্ষম, যা ঈশ্বরের করা উচিত।
✅শৈবপক্ষ দ্বারা খণ্ডন—
অনার্যরা বলেন— “পুরাতন ঈশ্বর অনাদি, নূতন ঈশ্বর আদি। তাই দুইজন সর্বব্যাপক হতে পারে না।” এই যুক্তি সিদ্ধান্তের ভুলে ভরা। কারণ- শাস্ত্রে ঈশ্বরকে অদ্বিতীয় এবং সর্বব্যাপক বলা হয়েছে। অদ্বিতীয় অর্থ একজন ঈশ্বরের মধ্যে সমস্ত শক্তি, জ্ঞান, ব্যাপকতা একসাথে বিদ্যমান। এখানে “পুরাতন” ও “নূতন” ঈশ্বরের ধারণা মানবসৃষ্ট সময়গত ধারা থেকে উদ্ভূত, শাস্ত্রভিত্তিক নয়। ঈশ্বর কেবল অব্যক্ত স্বরূপ থেকে ব্যক্ত স্বরূপে প্রকাশিত হন। তাই ঈশ্বরের ক্ষেত্রে পুরাতন-নূতন বলতে কিছুই হয় না। কেননা, নিত্য সত্ত্বায় স্বেচ্ছায় প্রকাশিত হন। যেমন শ্রুতি বলে- “তৎ সৃষ্টিত্বা তদেবানুপ্রবিশৎ” [তৈত্তিরীয় উপনিষদ ২/৬]- ঈশ্বর নিজেই সৃষ্টি করে নিজেই স্বেচ্ছায় সৃষ্টিতে প্রবেশ করেন। ঈশ্বরের জন্য কালের সীমা বা বয়সের বিষয় প্রযোজ্য নয়। শ্রুতিমতে— “একো দেবঃ সর্বভূতেষু গূঢ়ঃ সর্বব্যাপী সর্বভূতান্তরাত্মা”। (শ্বেতা/৬/১১)- অর্থাৎ এক ঈশ্বর সমস্ত প্রাণীদের মধ্যে অবস্থান করেন (অদ্বিতীয়, সর্বব্যাপক)।
অতএব, “নূতন” বা “পুরাতন” ঈশ্বরের ধারণা শাস্ত্রসম্মত নয়।
অনার্যরা বলে- “সর্বশক্তিমান মানে সব করতে সক্ষম নয়”। শাস্ত্রে সর্বশক্তিমানের অর্থ হলো ঈশ্বর যা তাঁর স্বরূপবিরোধী নয়, তা করতে পারেন। এটি সীমাহীন কিন্তু স্বরূপনিষ্ঠ ক্ষমতা। অর্থাৎ- ঈশ্বর অনন্ত শক্তির অধিকারী হয়েও স্বরূপ বিরুদ্ধ কিছুই করেন না। যে কেউ শাস্ত্রীয় যুক্তি না বুঝে “সর্বশক্তিমান অর্থ সব কিছু করার সামর্থ্য” ধরে নিলে ভুল হয়। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়-
ঈশ্বরকে অন্য ঈশ্বর সৃষ্টি করতে বলা হচ্ছে, এটি নিজস্ব অদ্বিতীয় স্বরূপের বিরোধী, কারণ ঈশ্বরের শক্তি এক।
স্বরূপবিরোধী কার্য সম্ভব নয়, তাই “নতুন ঈশ্বর সৃষ্টি” অসম্ভব, কিন্তু এতে ঈশ্বরের শক্তি বা সর্বশক্তিমানের ক্ষতি হয় না।
দ্বিতীয় ঈশ্বর সৃষ্টি করা শাস্ত্রসম্মত নয়, কারণ ঈশ্বর অদ্বিতীয়। “পুরাতন” বা “নূতন” ঈশ্বরের ধারণা মানুষের কল্পনা, শাস্ত্রের নয়। সর্বশক্তিমান অর্থ স্বরূপবিরোধী না এমন সব কিছু করতে সক্ষম। তাই, অনার্যদের যুক্তি শাস্ত্রীয়ভাবে ভ্রান্ত এবং যৌক্তিক নয়। অদ্বিতীয় ঈশ্বর কখনো অন্য ঈশ্বরের সৃষ্টিকর্তা হতে পারেন না, কারণ এতে অদ্বিতীয়তা লঙ্ঘিত হবে।
প্রশ্ন —
শাস্ত্রে ঈশ্বরকে কি কালের মধ্যে আবদ্ধ বলা হয়েছে, নাকি তিনি অনাদি ও অনন্ত?
নিত্য, অজ, চিরন্তন ঈশ্বরকে কি সময়ের আবদ্ধতার সঙ্গে তুলনা করা যৌক্তিক?
সর্বশক্তিমানের সীমা শাস্ত্রগতভাবে সবকিছু করা, নাকি স্বরূপবিরোধী কার্য এড়িয়ে যাওয়া?
শাস্ত্রে কি এক ঈশ্বরকে দুই বা একাধিক ঈশ্বরের সৃষ্টিকর্তা হিসেবে দেখানো হয়েছে?
————————————————————————————————————————————————
❌অনার্যদের দাবী—
প্রথমতঃ ঈশ্বরের যখন অবতার হয়ই না, সে অবস্থায় তাঁর অবতার স্বীকার করা মানে, সত্যকে গলা টিপে মেরে ফেলা। এটা একটা মস্ত ক্ষতি নয় কি?
✅শৈবপক্ষ দ্বারা খণ্ডন—
অনার্যরা বলেন “ঈশ্বর অবতার নন, তাঁকে অবতার স্বীকার করলে সত্যকে হত্যা হয়।” এটি তথ্যগত ভুল। শাস্ত্রে স্পষ্টভাবে বলা আছে ঈশ্বর অদ্বিতীয় এবং বিশ্বময়। ঈশ্বর যখন অবতার গ্রহণ করেন, তখন তিনি নিজস্ব স্বরূপ নষ্ট করেন না। অবতার হল ঈশ্বরের বিশ্বময় প্রকাশ, যা মানুষের উপলব্ধি ও ধর্ম-রক্ষার জন্য। শাস্ত্র বলে— “সমং সর্বেষু ভূতেষু তিষ্ঠন্তং পরমেশ্বরম্” (গীতা ১৩/২৮) -অর্থাৎ, যে সমস্ত জগতের মধ্যে নিহিত, তিনিই পরমেশ্বর। এখানে “নিহিত” বলতে বোঝায় অবতারসহ সমস্ত রূপে উপস্থিতি।
অতএব, অবতার স্বীকার করা সত্যকে হত্যা নয়, বরং ঈশ্বরের মহিমা ও লীলা উপলব্ধি করা।
সত্য অর্থ ঈশ্বরের স্থির, অনাদি, অনন্ত প্রকৃতি। অবতার অর্থ সেই সত্যের প্রকাশিত রূপ, যা ধারা, স্থান ও কাল অনুসারে দেখা যায়। যেমন— শ্রীকৃষ্ণের গোবর্ধন পর্বত উঁচু করা, বৃন্দাবন লীলা সবই বিশ্বময় রূপে প্রকাশিত লীলা। ঈশ্বর সত্য স্বরূপে থাকেন এবং বিশ্বময় রূপে প্রকাশিত হন।
অতএব, অবতার স্বীকার করা সত্যকে অস্বীকার করা নয়, বরং বিশ্বময় সত্যকে উপলব্ধ করা।
সুতরাং- অবতার স্বীকার করা সত্যকে হত্যা করে না। অবতার হল ঈশ্বরের অদ্বিতীয় মহিমার প্রকাশ, যা মানুষ ও জগতের উপকারের জন্য। অনার্যদের যুক্তি ভুল ভিত্তি ও কল্পনার উপর দাঁড়িয়ে আছে।
প্রশ্ন—
“সত্য” বলতে অনার্যরা কি ঈশ্বরের নিত্য-অপরিবর্তনীয় স্বরূপ বোঝাচ্ছেন, নাকি কেবল তাঁর নিরাকার অবস্থাকেই সত্য ধরে নিচ্ছেন?
যদি ঈশ্বরের নিরাকার স্বরূপই একমাত্র সত্য হয়, তাহলে শাস্ত্রে ঈশ্বরের বিশ্বময় উপস্থিতি কেন বলা হয়েছে?
যদি ঈশ্বরের অবতার হওয়াই “সত্য হত্যা” হয়, তবে গীতা, উপনিষদ ও পুরাণে অবতার-বর্ণনা কি সবই মিথ্যা?
শাস্ত্রকে অস্বীকার করেই কি “সত্য” সংরক্ষণ করা সম্ভব?
শাস্ত্রবাক্যকে মিথ্যা প্রমাণ না করে অবতার অস্বীকার করার অধিকার অনার্যরা কোথা থেকে পেলেন?
ঈশ্বর যদি কেবল বিশ্বাতীত হন, তবে “সর্বভূতান্তরাত্মা” (সব কিছুর অন্তরে অবস্থানকারী) শ্রুতি-বাক্যের অর্থ কী?
ঈশ্বর যদি জগতের অন্তরে ও বাইরে একসাথে অবস্থান করতে পারেন, তবে বিশেষ রূপে প্রকাশিত হওয়াকে কেন অসম্ভব ধরা হবে?
অবতার গ্রহণ কি ঈশ্বরের স্বরূপের পরিবর্তন, না কেবল প্রকাশের ভেদ?
যদি ঈশ্বরের স্বরূপ অপরিবর্তনীয় হয়, তবে প্রকাশভেদে তাঁর সত্যত্ব কীভাবে নষ্ট হয়?
সূর্য যেমন এক হয়েও জলপাত্রভেদে বিভিন্ন প্রতিবিম্ব সৃষ্টি করে তাতে কি সূর্যের সত্য নষ্ট হয়?
যদি ঈশ্বর সর্বশক্তিমান হন, তবে তিনি নিজেকে প্রকাশ করতে অক্ষম এমন ধারণা কি ঈশ্বরত্বের অবমাননা নয়?
ঈশ্বর নিজের ইচ্ছায় প্রকাশিত হলে তা কি তাঁর দুর্বলতা, নাকি স্বাধীনতার চূড়ান্ত প্রকাশ?
অধর্ম বৃদ্ধির সময়ে ঈশ্বর যদি মানুষের কাছে বোধগম্য রূপে ধর্মরক্ষা করেন, তবে সেটিকে “সত্য হত্যা” বলা কি নৈতিকভাবে যুক্তিযুক্ত?
মানুষের কল্যাণার্থে ঈশ্বরের কৃপামূলক প্রকাশকে অস্বীকার করা কি সত্যের প্রতি আনুগত্য, না অহংকার?
————————————————————————————————————————————————
❌অনার্যদের দাবী—
দ্বিতীয়তঃ-সমস্ত জগতের যিনি উন্নতি কর্তা সেই ঈধরের অবনতি ঘটবে। কেন জানো? কেননা, তিনি নারায়ণ হতে নর হয়ে যাবেন। নর থেকে নারায়ণ হওয়া উন্নতির লক্ষণ বলা যেতে পারে, কিন্তু নারায়ণ থেকে নর হওয়া একেবারে নীচে নেমে যাওয়া। কোনও ভিখারী যদি রাজা হয়ে যায়, বাস্তবিক পথে তার উন্নতি হয়েছে জানতে হবে। কিন্তু রাজা যদি ভিখারী হয়, তাকে উন্নতির চিহ্ন কে বলবে? যদি কেহ একথা স্বীকার করে তাকে পাগল ছাড়া কী বলা হবে।
✅শৈবপক্ষ দ্বারা খণ্ডন—
অনার্যরা বলে- “নারায়ণ থেকে নর হওয়া মানে ঈশ্বরের অবনতি।” এটি ভুল যুক্তি, কারণ শাস্ত্র অনুযায়ী ঈশ্বরের অদ্বিতীয়তা ও সর্বব্যাপকত্ব অক্ষুণ্ণ থাকে। ঈশ্বর অবতার গ্রহণ করলে তিনি “শরীরধারী” হন, কিন্তু নিজস্ব স্বরূপ নষ্ট করেন না। শাস্ত্র বলে-
“যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত। অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানম সৃজাম্যহম্।” (গীতা ৪/৭)
অর্থাৎ—যখনই ধর্মের অবনতি হয়, ঈশ্বর নিজেকে প্রকাশিত করেন (অবতার)। এখানে ঈশ্বরের অবতার অবনতি নয়, বরং ধর্মের রক্ষার জন্য প্রকাশিত।
মানুষ বা রাজা-ভিখারী উদাহরণ এখানে প্রযোজ্য নয়।
ঈশ্বরের অবতার মানব বা পদার্থের মতো পরিমাণ/সীমার অধীনে নয়। তিনি সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ, সর্বব্যাপক, তাই অবতার গ্রহণ করলেও “উন্নতি বা অবনতি” কোনো প্রয়োগযোগ্য ধারণা নয়। শাস্ত্রে যেমন বলা হয়েছে—
“একো দেবঃ সর্বভূতেষু গূঢ়ঃ সর্বব্যাপী সর্বভূতান্তরাত্মা”। (শ্বেতা/৬/১১)- অর্থাৎ, এক ঈশ্বর সমস্ত জগতের আধার। অবতার হল সেই আধারের বিশ্বময় প্রকাশ, যা সত্যকে কম বা বেশি করে না।
“নারায়ণ থেকে নর হওয়া” যদি মেনেও নিই তাতে বিশেষ ক্ষতি কিছুই নেই। কেননা, শ্রুতি বলে- “নমো বিরূপেভ্যো বিশ্বরূপেভ্যশ্চ বো নমঃ” (যজুর্বেদ ১৬/২৫) বিশ্বের সকল স্বরূপধারী যিনি, তিনি যদি নারায়ণ থেকে নর হন তবে এতে শাস্ত্রের বিরোধ কোথায় হয় এমন প্রশ্ন থেকেই যায়। তাই ঈশ্বরের অবতার স্বরূপ নষ্ট করে না, বরং ধর্ম রক্ষা ও জগতের কল্যাণে প্রকাশিত হয়। অনার্যদের যুক্তি ভুল ধারা ও মানবসৃষ্ট উদাহরণে নির্ভরশীল, যৌক্তিক নয়।
প্রশ্ন—
“নর” শব্দটিকে অনার্যরা কি জীবত্ব, অজ্ঞতা ও সীমাবদ্ধতার সমার্থক ধরে নিচ্ছেন?
শাস্ত্রে যেখানে ঈশ্বরকে “বিশ্বরূপ, বহুরূপ” বলা হয়েছে, সেখানে মানব-রূপ গ্রহণকে কেন স্বরূপহানি ধরা হবে?
ঈশ্বর অবতার নিলে কি তাঁর নারায়ণত্ব নষ্ট হয়ে যায়, নাকি কেবল মানবসদৃশ রূপে প্রকাশ ঘটে?
যদি স্বরূপ অপরিবর্তনীয় হয়, তবে বাহ্য রূপভেদে “উন্নতি-অবনতি” কথাটি কেমন করে প্রযোজ্য হয়?
রাজা ও ভিখারী উভয়েই কি পরাধীন, সীমাবদ্ধ ও কর্মজ সত্তা নয়?
সীমাবদ্ধ জীবের সামাজিক মর্যাদা দিয়ে কি সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ ঈশ্বরের অবস্থান বিচার করা যুক্তিসঙ্গত?
যিনি পূর্ণ, নিত্য ও পরিপূর্ণ, তাঁর ক্ষেত্রে “উন্নতি” বা “অবনতি” এই ধারণা আদৌ খাটে কি?
উন্নতি-অবনতি তো অপূর্ণ সত্তার বৈশিষ্ট্য। ঈশ্বর কি কখনো অপূর্ণ ছিলেন?
অবতার অবস্থায় ঈশ্বর কি জীবের মতো অজ্ঞ, শক্তিহীন বা কর্মাধীন হয়ে যান?
যদি না যান, তবে “নর হওয়া অর্থ অবনতি” এই সমীকরণটি এল কোথা থেকে?
গীতায় “সম্ভবাম্য আত্মমায়য়া” বলা হলে, সেটি কি অবনতি বোঝায়, না ঈশ্বরের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি?
“নমো বিরূপেভ্যো বিশ্বরূপেভ্যঃ” শ্রুতি মানলে, ঈশ্বরের মানব-রূপ গ্রহণে আপত্তি থাকে কোথায়?
যদি ঈশ্বর মানুষের কল্যাণ ও ধর্মরক্ষার জন্য মানবসম্বন্ধযুক্ত হন, তবে সেটিকে “অবনতি” বলা কি নৈতিকভাবে সঠিক?
ঈশ্বরের করুণাময় নিকটতা কি তাঁর মর্যাদা হ্রাস করে, না মহিমা বৃদ্ধি করে?
————————————————————————————————————————————————
❌অনার্যদের দাবী—
তৃতীয়তঃ-বিড়াল তপস্বীর দল নিজেদেকে ঈশ্বরের অবতার বলা আরম্ভ করবে, আর সকল স্ত্রী পুরুষদেরকে জালে জড়িয়ে তাদের ধর্ম নষ্ট করবে। তাদের চেলা বানিয়ে তাদের কাছ থেকে ধন নিয়ে মজা উড়াবে। ভারতবর্ষে এমন বহু বিড়ালতপস্বীর উদাহরণ রয়েছে, যারা নিজেদেরকে ঈশ্বরের অবতার বলে ঘোষণা করে, নর-নারীর মধ্যে ঈশ্বরের ভাবনাকে মনের সাথে নষ্ট করেছে।
✅শৈবপক্ষ দ্বারা খণ্ডন—
অনার্যরা বলে- “বিড়াল তপস্বীর দল নিজেকে ঈশ্বরের অবতার বলে ঘোষণা করে এবং মানুষের ধর্ম নষ্ট করে।” এটি মানুষের ভুল আচরণকে ঈশ্বরের অবতার গ্রহণের সাথে যুক্ত করার চেষ্টা, যা যুক্তি অনুযায়ী বৈধ নয়। ঈশ্বরের অবতার গ্রহণ শাস্ত্রসম্মত এবং ধর্ম রক্ষার্থে হয়। কিছু লোক যদি নিজেদেরকে অবতার দাবি করে বা জঘন্য কাজ করে, সেটি ঈশ্বরের প্রকৃত অবতারকে প্রভাবিত করে না।
ভণ্ড গুরু থাকলেই কি বশিষ্ঠ, ব্যাস, উপমন্যু প্রভৃতি ঋষিদের ত্যাগ ও সাধনা অস্বীকার্য?
যেমন- অনার্যদের গুরু দয়ানন্দ বেদের নামে কেবল অপপ্রচার করেই গেছে। বেদের ভুল অর্থ করা, মূর্তি পূজোর বিরোধ করা, নিয়োগের বিধান দেওয়া, বেদ-স্মৃতি আদি কিছু শাস্ত্রকে ছাড়া অন্যান্য শাস্ত্রকে অমান্য করা। অন্যান্য পরম্পরাকে ভুল প্রমাণিত করা। ওঁ এর নতুন স্বরূপ ও৩ম্ তৈরী করা। অবতার অস্বীকার করা, অলৌকিকতা অস্বীকার করা। দেব-দেবীর স্বরূপকে অস্বীকার করা আরও অনেক। যদি বিড়ল তপস্বীর প্রসঙ্গ আসে তাহলে প্রথমেই দয়ানন্দের নাম থাকবে। কেননা দয়ানন্দও ধর্ম ও বেদকে ঢাল করে কেবল মিথ্যা অপপ্রচার করেছে নিজের স্বার্থ চরিচার্থ করার জন্য।
শাস্ত্রে বলা আছে- ঈশ্বর অবতার হন ধর্মের রক্ষার্থে, মানুষের বিভ্রান্তি বা দুষ্টতার কারণে নয়। যারা নিজেদের অবতার দাবি করে বা অনৈতিক কাজ করে, তারা মানবিক বিভ্রান্তি বা কপটতা করছে।
নকল মুদ্রা প্রচলিত আছে বলে কি আসল মুদ্রার অস্তিত্ব অস্বীকার করা যায়?
এক ঈশ্বরই সমস্ত জগতে নিহিত। প্রকৃত অবতার ঈশ্বরের মহিমা ও সত্যের প্রকাশ, মানবিক ভুল ও কপটতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। তাই, মানুষের ভুল আচরণকে ঈশ্বরের অবতার গ্রহণের সঙ্গে যুক্ত করা অযৌক্তিক। শাস্ত্র অনুযায়ী অবতার হল ধর্ম রক্ষা ও কল্যাণের জন্য। অনার্যদের দাবী মানবিক কপটতা ও বিভ্রান্তির উপর ভিত্তি করে, যা শাস্ত্রসম্মত যুক্তি নয়।
প্রশ্ন—
কিছু লোক যদি নিজেকে মিথ্যাভাবে “অবতার” বলে দাবি করে, তাহলে কি তাতে অবতার-তত্ত্ব নিজেই মিথ্যা হয়ে যায়?
মানুষের লোভ, প্রতারণা ও কপট আচরণের দায় কি ঈশ্বরের উপর চাপানো যুক্তিসঙ্গত?
যদি কেউ বেদের নাম করে অধর্ম প্রচার করে, তবে কি বেদই মিথ্যা হয়ে যায়?
কোথাও কি শাস্ত্রে বলা আছে যে যে কেউ নিজেকে অবতার ঘোষণা করলেই সে অবতার হয়ে যায়?
প্রকৃত অবতারের লক্ষণ (শাস্ত্রসমর্থন, ধর্মস্থাপনা, অহংকারশূন্যতা) না মিললে, তাকে অবতার বলা হয় কোন যুক্তিতে?
সমাজে যদি ভণ্ড ডাক্তার থাকে, তাহলে কি প্রকৃত চিকিৎসাবিদ্যার অস্তিত্ব অস্বীকার করা যায়?
যদি “বিড়াল তপস্বী” যুক্তিতে অবতার অস্বীকার করা হয়, তবে একই যুক্তিতে—
ভণ্ড বৈদিক ব্যাখ্যাকারী থাকায় কি বেদ অস্বীকার করতে হবে?
ভণ্ড সংস্কারক থাকায় কি সংস্কার অস্বীকার করতে হবে?
বাস্তবে তো দেখা যায় অবতার অস্বীকারকারী সমাজেও ভণ্ড, প্রতারক ও ধর্মব্যবসায়ী সমানভাবে বিদ্যমান।
যদি অবতার তত্ত্ব মুছে ফেলা হয়, তাহলে ভণ্ড গুরু, ভণ্ড সাধু, ভণ্ড ধর্মব্যবসায়ীরা কি আপনা-আপনি বিলুপ্ত হয়ে যাবে?
মানুষের ধর্মনাশ কি অবতার বিশ্বাসের কারণে, না অবিবেক, লোভ ও অশিক্ষার কারণে?
যদি অবতার বিশ্বাসই ধর্মনাশের কারণ হতো, তবে রাম, কৃষ্ণপ্রভৃতির প্রভাবে ধর্ম কীভাবে টিকে রইল?
শাস্ত্র যে অবতারকে ধর্মরক্ষক, অহিংস, করুণাময় ও অহংকারশূন্য বলে বর্ণনা করে, সেই আদর্শের সঙ্গে ভণ্ড তপস্বীর চরিত্রের মিল কোথায়?
শাস্ত্রীয় তত্ত্বকে বাদ দিয়ে সমাজগত বিকৃতি দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া কি বৌদ্ধিক সততা?
————————————————————————————————————————————————
❌ অনার্যদের দাবী—
চতুর্থতঃ-ঈশ্বরের অবতার মেনে নিলে মানুষ অপরের অত্যাচার সহ্য করা আরম্ভ করবে। যখন দুষ্ট এবং পাপী অত্যাচার করে, মা বোনদের মান-সম্মান নষ্ট করে সম্পত্তি লুঠতে থাকে, ঘর বাড়ীতে আগুন লাগিয়ে দেয়, তখন অবতারবাদীর দল হাতের উপর হাত দিয়ে নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে থাকে তারা অন্যায় ও অত্যাচারের প্রতিকার করতে অগ্রসর হয় না। তারা মনে মনে ভাবে অন্যায় ও অধর্মকে বাধা দেওয়া তাদের ক্ষমতার বাইবে। ভগবান অবতার হয়ে আসলেই দুষ্টের দমন হবে, তবেই ধর্মের স্থাপন হতে পারবে। এইভাবে পৃথিবীর ভার হাল্কা হবে। প্রকৃত পথে এ এক মহান ভীরুতা। এই ভীরুতা এসেছে ঈশ্বরের অবতার স্বীকার করার মধ্য দিয়ে। দ্যাখো, যে সমস্ত জাতি ঈম্বরের অবতার হওয়া স্বীকার করে না, সেই সমস্ত জাতি আপন শত্রুদের বিরুদ্ধে মুখোমুখি হয়ে তাদের শক্ত হাতে প্রতিরোধ করে। যারা অবতার বিশ্বাসী নয়, তারা কোনও দিনও স্বীকার করে না যে, অন্যায়কারী এবং অত্যাচারীদের মারধর করার জন্য অবতার কোমর বেঁধে উঠে পড়ে লাগবে। তারা কোনও দিনও ভাবতে পারে না যে, অন্যায়ী এবং অত্যাচারীদের বিনাশ করার জন্য ঈশ্বর অবতার হবেন। তারা মনে করে ঈশ্বর যেমন
অত্যাচারীদের হাত, পা প্রভৃতি দিয়েছেন, তেমনি আমাদেরও দিয়েছেন। এই কারণেই সেই সমস্ত জাতি
শত্রর সঙ্গে মুখোমুখি হয়ে শত্ত (হাতে প্রতিকার করার জন্য সামনা সামনি দাঁড়ায়। তাঁরা নিজের কর্মকে ঈরের
ভরসায় ছেড়ে দেয় না। শোনো কমল! আমি তোমায় সত্য করে বলছি, এই অবতারের সিদ্ধান্তই আর্য জাতিকে বহুভাবে পতিত এবং পদদলিত করেছে। এই অবতারবাদই আত্মবিশ্বসী আর্যজাতির অন্তর হতে আত্মবিশ্বাসকে (Self Confidence) নির্বাসন দিয়েছে।
✅শৈবপক্ষ দ্বারা খণ্ডন—
অনার্যরা বলছে- ঈশ্বরের অবতার বিশ্বাস করলে মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করতে অক্ষম হয়। এটি অমূলক সাধারণীকরণ। মানুষের কর্মকাণ্ডকে ঈশ্বরের অবতার গ্রহণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা যৌক্তিক নয়।
ঈশ্বর অবতার হলে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা ও কর্মক্ষমতা কমে যায় না। মানুষ এখনও নিজের ধর্ম ও নৈতিক দায়িত্ব পালন করতে পারে। ঈশ্বর অবতার হন ধর্ম রক্ষার জন্য, মানুষের কার্যক্ষমতা বা আত্মবিশ্বাস কমানোর জন্য নয়। এখানে স্পষ্ট যে অবতার মানুষের সহায়ক, তাদের ক্ষমতা বা আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে না।
ঈশ্বর সমস্ত জগতে নিহিত। অবতার হল সেই বিশ্বময় প্রকাশ, যা মানুষের জন্য পথ প্রদর্শক।
ইতিহাসে দেখা যায়, অবতার বিশ্বাস মানুষকে দায়িত্বশীল ও নৈতিক কাজের দিকে অনুপ্রাণিত করেছে। অনার্যরা যে “অবতার বিশ্বাসীরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে না” বলেছে, তা মানব আচরণের বাস্তব সত্যের বিপরীত। অবতারধর্মী মানুষও নিজের কর্ম ও প্রতিরোধের দায়িত্ব পালন করে। “বীর ছত্রপতি শিবাজী ও বীর ছত্রপতি সাম্ভাজী মহারাজ” তার জীবন্ত প্রমাণ। যারা ঈশ্বরের সাকার স্বরূপকে অন্তরে ধারণ করেও অন্যায়ের প্রতিরোধ করেছেন। তাই, ঈশ্বরের অবতার মানুষকে স্বাভাবিক দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত করে না।
তাই, অনার্যদের যুক্তি ভ্রান্ত, মানুষের আচরণকে ঈশ্বরের কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা বৃথা চেষ্টা। শাস্ত্রে বলা আছে অবতার হলো ধর্ম রক্ষার জন্য, তাতে মানুষের স্বাধীনতা ও আত্মবিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত হয় না। বাস্তব ও ইতিহাস প্রমাণ করে, অবতারধর্মী মানুষও নিজের দায়িত্ব পালনে সক্রিয়।
সুতরাং- অনার্যদের এই দাবী যৌক্তিক নয়, এটি মানবিক কপটতা ও ভুল বোঝাবুঝির উপর ভিত্তি করে উপস্থাপন করেছে।
প্রশ্ন—
অবতার স্বীকার করলেই যদি মানুষ নিষ্ক্রিয় ও ভীরু হয়, তবে মহাভারতের অর্জুন, রামায়ণের রাম, নৃসিংহভক্ত প্রহ্লাদ, শিবভক্ত বিভিন্ন রাজারা বা ইতিহাসের শিবাজী-সাম্ভাজীর মতো ব্যক্তিরা কীভাবে সক্রিয় প্রতিরোধকারী হলেন?
তাঁরা তো সকলেই ঈশ্বরের অবতার বা সাকার ঈশ্বরবিশ্বাসী ছিলেন।
কোন শাস্ত্রে বলা হয়েছে যে ‘অবতার বিশ্বাস করলে মানুষ কর্মত্যাগী হবে’?
নাকি এটি কেবল অনার্যদের মনগড়া সামাজিক অনুমান?
যদি অবতার বিশ্বাস মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে নিরুৎসাহিত করে, তবে গীতা কেন বলে—
“তস্মাদ্যুধ্যস্ব ভারত” (গীতা ২/১৮) যেখানে স্বয়ং অবতার কৃষ্ণ যুদ্ধের নির্দেশ দিচ্ছেন?
অবতার বিশ্বাসী যদি মনে করে “ভগবান এসে সব করবেন”, তবে কৃষ্ণ কেন কুরুক্ষেত্রে নিজে অস্ত্র না তুলে অর্জুনকে অস্ত্র ধরতে বাধ্য করলেন?
এখানে কি অবতার মানুষের দায়িত্ব কেড়ে নিচ্ছেন, না দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন?
যে জাতিগুলি অবতার মানে না বলেই নাকি সাহসী, ইতিহাসে তারা কি কখনও নিষ্ঠুরতা, উপনিবেশবাদ, গণহত্যা, দাসত্ব আর যুদ্ধের জন্য দায়ী হয়নি?
নৈতিকতা কি কেবল অবতার অস্বীকার করলেই জন্মায়?
অন্যায় প্রতিরোধ না করার কারণ কি ধর্মতত্ত্ব, না সামাজিক-রাজনৈতিক অবক্ষয়?
একটি ধর্মীয় তত্ত্বকে সমস্ত জাতিগত দুর্বলতার কারণ বানানো কি যুক্তিসঙ্গত?
যদি ঈশ্বর মানুষের হাতে-পা দিয়েছেন বলেই মানুষ লড়বে, তবে ঈশ্বর নৈতিক বোধ, ধর্মবুদ্ধি ও আদর্শ কেন দেন?
অবতার কি সেই আদর্শেরই জীবন্ত প্রকাশ নয়?
অবতারবাদ যদি আত্মবিশ্বাস ধ্বংস করে, তবে কেন অবতারদের জীবনেই সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ, বীরত্ব ও দৃঢ়তা দেখা যায়?
শ্রীরাম, শ্রীকৃষ্ণ, নৃসিংহ, এঁরা কি ভীরুতার প্রতীক?
অবতার বিশ্বাস আর অলস ভাগ্যবাদ এক জিনিস, এই সমীকরণটি অনার্যরা কোন যুক্তিতে দাঁড় করালেন?
দুটিকে গুলিয়ে ফেলা কি যুক্তির বিভ্রান্তি (category mistake) নয়?
যদি অবতারবাদ মানুষকে নিষ্ক্রিয় করেই, তবে শাস্ত্রে ‘পুরুষার্থ’, ‘কর্তব্য’, ‘ধর্মযুদ্ধ’, ‘ব্রত’, ‘তপস্যা’ এই সকল সক্রিয় কর্মমূলক ধারণা কেন এত গুরুত্ব পায়?
————————————————————————————————————————————————
অনার্য কতৃক ঈশ্বর সাকার হওয়া নিয়ে যেসব দোষ উত্থাপিত করেছেন, শৈবপক্ষ দ্বারা উক্ত সকল দোষের খণ্ডন ও ১ম পর্ব সমাপ্ত হলো। পূনরায় ঈশ্বরের সাকারত্বের দোষ নিবারণ নিয়ে বেদান্ত সূত্র উত্তরমীমাংসা অনুযায়ী খুব শীঘ্রই ২য় পর্ব আনা হবে।
🙏সর্বে হ্যেষ রুদ্রস্তস্মৈ রুদ্রায় নমো অস্তু🙏
নমঃ শিবায়ৈ 🙏
নমঃ শিবায় 🙏
শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্✊🚩
ॐ নমঃ পার্বতীপতয়ে হর হর মহাদেব 🚩
✍️অপপ্রচার দমনে— অন্তিক ভট্টাচার্য্য (শম্বরনাথ শৈব)।
🌻বিশেষ কৃতজ্ঞতা— আমার গুরু শ্রী নন্দীনাথ শৈবাচার্য জী ও আমার আদর্শ শ্রী রোহিত কুমার চৌধুরী শৈবজী।
কপিরাইট ও প্রচারে— Shivalaya
বি: দ্র:— লেখাটি কপি করলে সম্পূর্ণভাবে করবেন, কোনো রকম কাটছাট করা যাবে না।


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন