কিত্তুর রাণী চেন্নাম্মা — শৈব বীরঙ্গনা নারী, যিনি প্রথমবার ব্রিটিশদের পরাজিত করেছিলেন

 


🔰 ভূমিকা —

 সনাতন শৈবধর্মের শিবভক্ত শৈবগণ চিরকাল শাস্ত্রে চরম পারদর্শী ছিলেন, সমগ্র বিশ্বে সকল সিদ্ধযোগীদের ৯৫ শতাংশের অধিক হল শৈবরাই। কিন্তু ধর্মের এই শাস্ত্র ও আধ্যাত্মিক জগতে অবাধ বিচরণকারী শৈবরা যুদ্ধেও মহাসাহসী চরম ক্ষমতা সম্পন্ন শৌর্যবীর্যবান ছিলেন, কিন্তু তার মধ্যে একজন শৈবনারীর নাম ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে প্রথমবার সশস্ত্র যুদ্ধ করে বিজয়  মুকুটলাভ করবার জন্য স্বর্ণাক্ষরে লিখিত হয়েছে। যা বর্তমানের সনাতনীরা জানতে সক্ষম হয়নি।

একজন ভস্ম-ত্রিপুণ্ড্রধারী শৈবনারীর মধ্যে কোন উচ্চতর সাহস থাকলে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ করা যায়, তা পাঠকবৃন্দ নিশ্চয়ই ধারণা করতে পারছেন। এমনকি তিনি ব্রিটিশদের পরাজিত‌ও করেছিলেন। 

বর্তমানে শৈবদের বিষয়ে সাধারণ সনাতনী ব্যক্তিদের কোনো ধারণাই নেই, কলির ছলনায় পরমেশ্বর শিবের পরমেশ্বরত্ব নিয়েই উঠে গিয়েছে প্রশ্ন, সেখানে মানুষেরা শৈব নারীদের আর কিভাবে চিনবেন ?

এখনকার বেশির ভাগ সনাতনী নারীরা কুসঙ্গে পড়ে স্বধর্মের রীতিনীতি ত্যাগ করাকে আধুনিকতা ভাবে। আর যারা নিজেদের ধার্মিক বলে মনে করে তাদের মধ্যে বেশিরভাগ নারী গোপী রাধিকা ইত্যাদি সেজে ফটো তুলে রিলস শর্ট ভিডিও করে নিজেদের সৌন্দর্য দেখানোকেই ধর্মকর্ম বলে ভাবছে। এসবের মাঝে প্রকৃত ধর্মীয় অনুশাসন লুপ্ত হয়ে গেছে, সাজগোজ করে আকর্ষণ করাই এখনকারের মানুষের ধর্মীয় আচার বলে স্বীকৃত হচ্ছে। ধর্মের প্রকৃত জ্ঞানের বিষয়ে অবগত না হ‌ওয়ার কারণে আকর্ষণ করবার মাধ্যমে ব্যভিচার কে প্রেম না দিয়ে কামলীলা প্রচার করাই এখন ধর্মের রূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর এসব নিয়ে অসনাতনী আর্যসমাজী, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানেরা হাসাহাসি করে। কিন্তু এসব সাজগোজ করে এসব লোকদেখানো কৃত্রিম ভান করা কর্ম কখনোই ধর্মের প্রকৃত রূপ নয়। ধর্ম সর্বদাই শালীনতা, ব্রহ্মচর্য, শৌর্য, শুচিতা, রিপুকে বশে রাখবার কথা বলে। কিন্তু আজকালকার সনাতনীরা ঐ কৃত্রিমতাকেই ধর্ম বলে প্রচার করছে, আর এর কারণে শৈবনারীদের বীরত্ব সাহসিকতার বিষয়ে মানুষ অজ্ঞ রয়ে গিয়েছে।

কিন্তু সত্য কখনো চাপা থাকে না, একদিন ঠিকই বের হয়ে আসে। আর তাই আজ এটি বাংলার সনাতনীদের জানাবার জন্য প্রকাশ করছি।

__________________________________________________

🛡️ Kittur Rani Chennamma — একজন বীরঙ্গনা শৈব মহারাণীর শৌর্য ও জীবনবৃত্তান্ত

Kittur Rani Chennamma দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটকের কিত্তুর রাজ্যের এক সাহসী রানি ও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধের প্রথম নারী নেতৃত্বকারী হিসেবে ইতিহাসে স্মরণীয়। 


🗓️  জন্ম ও শৈশব —

  • জন্ম: ২৩ অক্টোবর ১৭৭৮

  • স্থান: কাঘাটি (Kagati) গ্রাম, বর্তমান বেলগাও (Belagavi) জেলা, কর্নাটক। 

  • ছোট থেকেই তিনি তীরন্দাজি, ঘোড়া চালনা ও তরোয়াল চালনে দক্ষ ছিলেন — চরিত্রে সাহসী ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রূপ গড়ে উঠেছিল। 

  • বীর শৈবপরম্পরায় দীক্ষিত ছিলেন, পরমেশ্বর শিবের পরমভক্ত ছিলেন। গলায় ইষ্টলিঙ্গ ধারণ করতেন


🌹  বিবাহ ও পরিবার —

  • ১৫ বছর বয়সে তিনি রাজা মল্লসরজার (Mallasarja Desai) সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, যিনি কিত্তুর রাজ্যের শাসক ছিলেন। 

  • তাদের একমাত্র পুত্র ছিলেন, কিন্তু ১৮২৪ সালে সেই পুত্র মারা গেলে রাজ্য উত্তরাধিকার সমস্যা সামনে আসে।


⚔️ ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ — কিত্তুর বিক্ষোভ (১৮২৪)

📜 Doctrine of Lapse (উত্তরাধিকার নীতি)

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি দাবি করেছিল, যদি কোনো রাজা স্বজন সন্তান না রেখে মারা যায়, তাহলে রাজ্য তারা নিজেদের শাসনে নিতে পারবে।
চেন্নাম্মা তাঁর দত্তক পুত্র শিবালিঙ্গাপ্পা (Shivalingappa)-কে স্বীকৃতি দেওয়ার চেষ্টা করলেও কোম্পানি তা মানতে অস্বীকার করে — এ থেকেই সংঘাত শুরু হয়।


🛡️  কিত্তুর যুদ্ধ — প্রথম লড়াই

  • অক্টোবর ১৮২৪-এ ব্রিটিশরা কিত্তুর দুর্গ আক্রমণ করলে রানি চেন্নাম্মা ও তাঁর সৈন্যরা প্রতিরোধ করেন এবং ব্রিটিশ অফিসার থ্যাকারকে নিহত করেন এই লড়াইয়ে।
    এই বিজয় ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ হিসেবে  ইতিহাসে বিবেচিত হয়। 


🏰 দ্বিতীয় আক্রমণ ও পরিণতি —

  • ব্রিটিশরা শক্তিশালী বাহিনী নিয়ে ফিরে আসে এবং দ্বিতীয়বার কিত্তুর দুর্গ দখল করে।

  • মহারানি চেন্নাম্মা ও তাঁর পরিবারকে বাইলহঙাল (Bailhongal) কারাগারে আটক করা হয়।

  • তিনি ২১ ফেব্রুয়ারি ১৮২৯ সালে কারাগারেই মৃত্যু বরণ করেন। 


🔥 ঐতিহাসিক ও সামাজিক গুরুত্ব —

  • চেন্নাম্মা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ১৮৫৭ সালের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধের বহু আগেই যুদ্ধ করেছিলেন, তাই তিনি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অন্যতম প্রারম্ভিক নায়ক 

  • তিনি কেবল বীর রানি নন — নারীর নেতৃত্ব, আত্মসম্মান ও স্বাধীনতার জন্য সংগ্রামের প্রতীক।

  • কর্নাটকে আজো Kittur Utsava নামে তিনদিন ব্যাপী উৎসব তার স্মরণে পালিত হয়।


🏛️ স্মৃতি ও সম্মান —

  • ২০০৭ সালে ভারতের সংসদ ভবনের সামনে তাঁর এক ভাস্কর্য স্থাপিত হয় — এটি সাহসী রানি হিসেবে ভারতের প্রতি সম্মান। 

  • নারীর অধিকার ও নেতৃত্বের প্রতীকেরূপে আজও বহু উদ্যোগ তাঁর ঘটনা স্মরণ করে।

__________________________________________________

☝️ স্মরণীয় বিষয় 

Kittur Rani Chennamma ছিলেন:
✔️ কিত্তুর রাজ্যরানি ও পরমশৈব ।
✔️ ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ এর নেতা ।
✔️ নারীর ক্ষমতায়ন ও প্রতিরোধের গুরুত্বের প্রতীক ।
✔️ ১৮২৯ সালে কারাগারের ভিতর মৃত্যুবরণ করেন ।
✔️ স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে অম্লান স্মৃতি রেখে গেছেন।

__________________________________________________

🙏 শ্রদ্ধা সহকারে বলতে হয় —

একদিকে সাধনায় চরম সিদ্ধিলাভকারী মাতা অক্কা মহাদেবী যদি শৈবদের জন্য আদর্শ সাধিকা হন, তবে ব্রিটিশ সরকারের বুকে পা তুলে দেশের জন্য যুদ্ধ করে বিজয় মুকুটলাভ ছিনিয়ে নেওয়া কিত্তুর রাণী চেন্নাম্মা হলেন শৈবদের জন্য পরমাদর্শ বীরাঙ্গনা মহারাণী ।

শৈব পুরুষ দের মধ্যে যেমন মহারাজ বিক্রমাদিত্য, ভোজরাজ, মহারাণাপ্রতাপ, শশাঙ্ক, ছত্রপতি শিবাজী ছিলেন। তেমন‌ই শৈবনারীদের মধ্যে কিত্তুর মহারাণী চেন্নাম্মা পরম আদর্শ, শৈবনারীপুরুষ সকলের জন্য।

শৈবদের দ্বারাই সর্বদা ধর্ম প্রচার প্রসার হয়ে এসেছে যুগে যুগে। আবার, শৈবদের দ্বারাই চিরকাল রক্ষা হয়ে এসেছে সমাজ, দেশ, বিশ্ব।

__________________________________________________

✍️ তথ্য সংগ্রহে ও লেখনীতে — শ্রীগুরু নন্দীনাথ শৈবাচার্য জী 

কপিরাইট ও প্রচারে : 


শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্ 🚩 

ॐ নমঃ পার্বতীপতয়ে হর হর মহাদেব 🚩 

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ