শ্রীসুন্দর কৃত শ্রী নটরাজ স্তোত্র

 


🔰 ভূমিকা ঃ 

             শ্রীসুন্দর নটরাজের পুণ্ডরীকপু্রে গিয়ে পরমেশ্বর শিবের স্তুতি করেছিলেন, সেটির সমগ্র প্রসঙ্গ শ্লোক সহ স্তোত্র টি এখানে তুলে ধরা হল। স্কন্দোপপুরাণের ৯ নং অধ্যায়ের ৯২-১২৭ অধ্যায়ে এই সমগ্র বর্ণনা রয়েছে।

_________________________________________________


🔷 প্রসঙ্গ : 

 বামনেশ্বরের পূজা করে শ্রীসুন্দর পুণ্ডরীকপুর (চিদম্বর নটরাজ শিবের মন্দির স্থানে) গিয়ে পৌঁছলেন। ইন্দ্রের অমরাবতীর মতোই ঐ শিবক্ষেত্রের দিব্য শোভা ছিল। সেখানে ছিল রূপোর সিঁড়ি ও নীলমণির বারান্দা। বৃহৎ ও মনোরম অট্টালিকাগুলি শোভা পাচ্ছিল। বীণা, বাঁশি, মৃদঙ্গ প্রভৃতির কোমল ও সুমধুর ধ্বনি সর্বত্র ধ্বনিত হত। অপ্সরাদের ন্যায় সুন্দরী নারীরা যেন সেই পুরীকে আলোকিত করতো। মঙ্গলসূচক ও সুগন্ধি-পুষ্পে ভরা এবং ফলযুক্ত বৃক্ষলতায় স্থানটি সবুজে সুশোভিত ছিল; আর পদ্ম, কলহার, কুমুদ, উৎপল প্রভৃতি ফুলে শোভিত পুকুরগুলি নগরটির রূপকে দর্শনযোগ্য করে তুলেছিল। সেখানে সর্বত্রই মিষ্টি জলের প্রাচুর্য ছিল। রথ, হাতি, ঘোড়া ও পদাতিকদের ভীড় সর্বদাই লেগে থাকতো। শৈবদীক্ষার বিধিতে পারদর্শী সহস্র সহস্র বিদ্বানের সমৃদ্ধ গৃহ সেখানে ছিল। বেদ, শাস্ত্র, পুরাণ ও আগমজ্ঞ মহাত্মাগণ সেই স্থানের শোভা বৃদ্ধি করতেন। শ্রৌত, পণ্ডিত ও নিজ নিজ কর্তব্যে নিয়োজিত ব্রাহ্মণদেরও সেখানে বিপুল সংখ্যা ছিল। বৈদিক যজ্ঞের ধোঁয়ার সুগন্ধ ও বেদের ধ্বনি সেই শিবপুরীকে পরিব্যাপ্ত করে রাখত। সকল বর্ণ ও আশ্রমের সজ্জন ব্যক্তিরা সেখানে বসবাস করতেন। এইরূপ চিদম্বরপুরে পৌঁছে সুন্দর-এর মন পরিতৃপ্ত হল ॥৯১–১০২॥

অন্যান্য ব্রাহ্মণদের সঙ্গে তিনিও শিবালয়ে প্রবেশের পূর্বে শিবগঙ্গা তীর্থে স্নান করল এবং ভস্ম ধারণ করে মন্দিরে গেলেন। ভগবানের দর্শন করে তিনি তাঁকে সূক্তিমালা নিবেদন করলেন। তারপর ভক্তিভরে প্রণাম করে তিনি সভামণ্ডপে পৌঁছলেন। সেখানে তিনি ভক্তদের মধ্যে প্রসিদ্ধ ব্যাঘ্রপাদ, পতঞ্জলি, পরশুরাম, ব্রহ্মা, নারায়ণ, নারদ, তুম্বরু, ইন্দ্র প্রভৃতি এবং হিমালয় প্রভৃতিকে দেখল। পুরীর রক্ষাকারী বিষ্ণু ও ব্রহ্মাকে এবং দ্বারে অবস্থানকারী গণেশকে প্রণাম করে, স্কন্দকে (কার্তিকেয় কে) স্মরণ করে, নন্দী প্রভৃতির কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে সে সভায় প্রবেশ করল। সেখানে পঞ্চাক্ষরাত্মক সিংহাসনের উপর পার্বতীসহ সভাপতি মহাদেব বিরাজমান ছিলেন। তাঁদের চারদিকে মায়ার সূক্ষ্ম পর্দা পরিবেষ্টিত ছিল। তাঁদের বন্দনা করে শতরুদ্রীয় মন্ত্র দ্বারা তিনি নমস্কার জানালেন। এরপর সুন্দর স্তুতি আরম্ভ করলেন ॥১০৩–১১১॥

__________________________________________________

[শ্রীসুন্দর কৃত নটরাজ স্তুতি]


সতে নমশ্চিদে নমঃ সদামুদাত্মনে নমঃ

সতশ্চ সাক্ষিণে নমঃ সভাধিপায় তে নমঃ।

অরূপিণে চ রূপিণে নিরূপণাধিকায়তে

কপালিনেঽকপালিনে কপর্দিনে নমো নমঃ ॥ ১১২


নমো হরায় জাহ্নবীধরায় চন্দ্রমৌলয়ে

ত্রয়ীময়ায় শম্ভবে ত্রিলোচনায় তে নমঃ ।

করালকালকূটনীলকণ্ঠনালকান্তয়ে

কপালমালিনে নমঃ করীন্দ্রচর্মধারিণে ॥ ১১৩


নমঃ শিবায় শম্ভবে নমস্ত্রিশূলধারিণে

নমোঽজগর্বহারিণে মহোক্ষকেতবে নমঃ।

দিগম্বরায় তে নমশ্চিদম্বরায় তে নমঃ

স্বয়ম্ভুভে সদা নমশ্চিদম্বরায় তে নমঃ ॥ ১১৪


নমঃ সুবর্ণসংসদে নমঃ সভেশ্বরায় তে

নমোঽস্তু ভূতসংসদে নমো গণাধিপায় তে।

নমো গিরীন্দ্রজাপতে নমো হিরণ্যবাহবে

নমোঽস্তু চেতসস্পতয়ে নমো নমঃ শিবায় তে ॥ ১১৫


পুণ্ডরীকস্রজং নৌমি পুণ্ডরীকাসনার্চিতম্।

পুণ্ডরীকাজিনধরং পুণ্ডরীকপুরেশ্বরম্ ॥১১৬

মহাদেবমহানৃত্তমহাড়ম্বরসাক্ষিণীম্।

মহাদেবতনূং বামাং শিবকামামহং ভজে ॥ ১১৭

পুণ্ডরীকগজারাধ্যং পুণ্ডরীকমুনিস্তুতম্।

পুণ্ডরীকপুরীনাথং পুরারিং প্রণমাম্যহম্ ॥ ১১৮


✅ অর্থ — 

হে সৎ–স্বরূপ, চিৎ–স্বরূপ এবং নিত্য আনন্দরূপ পরমেশ্বর! আপনাকে প্রণাম। যা কিছু বিদ্যমান আছে, তার সকলের সাক্ষীস্বরূপ যিনি সভাপতি — আপনাকে নমস্কার। আপনি কোনো নির্দিষ্ট রূপে সীমাবদ্ধ নন, তবু সমস্ত রূপ ধারণ করেন। যেভাবেই আপনাকে নিরূপণ করা হোক না কেন, আপনি তার অতীতেই (সেই সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বেই) অবস্থান করেন। কপালধারী, দুঃখীদের পালনকর্তা, জটাধারী আপনাকে প্রণাম করি ॥ ১১২ ॥

গঙ্গাধর, চন্দ্রমৌলি হরকে প্রণাম করি।  বেদ দ্বারা যিনি জ্ঞেয়, সেই ত্রিলোচন শম্ভুকে নমস্কার। ভয়ঙ্কর কালকূট বিষের বর্ণে নীলবর্ণরূপে যার কণ্ঠ শোভায়মান, কপালমালা (মুণ্ডমালা) ধারণকারী এবং গজচর্মপরিধানকারী সেই আপনাকে প্রণাম করি ॥ ১১৩ ॥

কল্যাণরূপ, কল্যাণকারী, ত্রিশূলধারী — আপনার চরণে আমি ও আমার সর্বস্ব অর্পণ করলাম। ব্রহ্মার অহংকার নাশকারী বৃষভধ্বজকে প্রণাম। নিজে নিরাবরণ হয়েও বিশেষ জ্ঞানের আবরণে আচ্ছন্ন বলে যাকে প্রতীয়মান হয়, সেই স্বয়ম্ভু চিদম্বরকে সর্বদা প্রণাম ॥ ১১৪ ॥

স্বর্ণময় সংসদে (সভায়) বিরাজমান সভাপতি, গণরাজ — যাঁর সভায় ভূতগণও স্থান পায় — সেই আপনাকে নমস্কার। হৈমবতীর পতি, হিরণ্যবাহু — আপনাকে প্রণাম করি। আমার চিত্তের অধিপতি শিবের চরণে আমি সমর্পিত ॥ ১১৫ ॥

কমলপুষ্পের মালা পরিধানকারী আপনাকে আমি প্রণাম করি। কমলাসনে বসে থাকা ব্রহ্মাও আপনার কেবল একজন পূজক মাত্র। পুণ্ডরীকপুরের অধিপতি, আপনি ব্যাঘ্রচর্মপরিধানকারী আপনাকে প্রণাম করি ॥ ১১৬ ॥

(শিবের সাথে স্থিত) মহাদেবের মহানৃত্যের মহান অভিনয়ের আড়ম্বরের সাক্ষী, মহাদেবের শরীরের বামদিকের অর্ধাংশরূপে অবস্থানকারী, সৌন্দর্যময়ী শ্রী শিবকামেশ্বরী (শিবের পত্নী পার্বতী দেবী মাতা) কে আমি ভজন করি ॥ ১১৭ ॥

ব্যাঘ্র ও গজের আরাধ্য, পুণ্ডরীক মুনির দ্বারা স্তুত হ‌ওয়া, পুণ্ডরীকপুরীর স্বামী পুরারি শিবকে আমি প্রণাম করি ॥ ১১৮ ॥

[স্তুতি সমাপ্ত]

________________________________________________

এরপর মহর্ষি অগস্ত্য শৈবাচার্য বললেন, এইভাবে স্তোত্র গান দ্বারা নিজের জন্ম যখন শ্রীসুন্দর সফল করছিলেন, তখন সেখানে আকাশবাণী হল ‘সুন্দর স্তুতি গায়নকারী হে সুন্দর ! স্তোত্রে আমি সন্তুষ্ট হয়েছি’। এখন তুই শীঘ্রই শ্রীপুরে উপস্থিত হয়ে সেখানে প্রতিদিন আমার স্তুতি কর ॥ ১১৯-১২০ ॥


আকাশবাণীর পর সুন্দররের উপর সোনার মতো স্বর্ণবৃষ্টি হলো ; এতে মানুষের কথা কী বলা যাবে — দেবতারাও বিস্ময়ে মুগ্ধ হয়ে পড়লেন। সেখানে বসবাসকারী লোকেরা শ্রীসুন্দরকে ‘স্বয়ং হর (শিব)’ মনে করে প্রণাম করতে লাগল। ॥ ১২১ – ১২২ ॥


তবুও অচিন্ত্য-সামর্থ্যের অধিকারী মহাদেবের সংকল্পের মাহাত্ম্য যিনি উপলব্ধি করেছিলেন, সেই সুন্দররের মধ্যে অহংকাররূপ অন্ধকার প্রবেশ করতে পারল না। বরং— ‘আমার মতো একজনের উপর এত অনুগ্রহ কীভাবে হতে পারলো ?’— এই চিন্তা করে তিনি আরও অধিক ভক্তিভাবে বিভোর হয়ে উঠলেন। ॥ ১২৩ – ১২৪ ॥

শিবের আজ্ঞা পালনকারী শ্রীসুন্দর সেখানে অবস্থানকারী দেবী-দেবতা ও মুনিদের থেকে অনুমতি নিয়ে রওনা হলেন।..॥ ১২৭

_________________________________________________


✍️ তথ্য সংগ্রহকারী ও অনুবাদ : আচার্যপরমাধিকারী শ্রী নন্দীনাথ শৈব আচার্য গুরুদেব জী 

© কপিরাইট ও প্রচারে : Shivalaya


শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্ 🚩 

ॐ নমঃ পার্বতীপতয়ে হর হর মহাদেব 🚩 



মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ