পুরুষসূক্ত পরমেশ্বর শিবের প্রতিই সমর্পিত
🚩 "শ্রুতি-কল্প-মীমাংসা ও ষড়প্রমাণের আলোকে পুরুষ সূক্তের দেবতা সহস্রশীর্ষ বেদ পুরুষ পরমেশ্বর রুদ্র। শতরুদ্রীয় হোম, অগ্নিচয়ন ও বিশ্বরূপের অখণ্ড বৈদিক বিশ্লেষণ"----
🔘 বৈদিক সাহিত্যের শিরোমণি হিসেবে পরিচিত 'পুরুষ সূক্ত' এক অতি পবিত্র এবং তাত্ত্বিক স্তোত্র। সাধারণত প্রচলিত বিশ্বাসে একে নির্দিষ্ট একটি রূপের সাথে সীমাবদ্ধ রাখা হলেও, বেদের সংহিতা, ব্রাহ্মণ এবং কল্পবেদাঙ্গের গভীর অনুশীলনে এক অনন্য সত্য উদ্ভাসিত হয়, তা হলো পুরুষ সূক্তের প্রকৃত দেবতা স্বয়ং পরমেশ্বর রুদ্র। এটি কেবল কোনো সাম্প্রদায়িক মতবাদ নয়, বরং অকাট্য শ্রুতি প্রমাণ এবং মীমাংসা শাস্ত্রের যুক্তিধারা দ্বারা সমর্থিত একটি শাশ্বত সিদ্ধান্ত।
যজ্ঞীয় কর্মকাণ্ডে পুরুষ সূক্তের প্রয়োগ বা বিনিয়োগ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অগ্নিচয়ন প্রক্রিয়ায় যখন শতরুদ্রীয় হোমের মাধ্যমে প্রদীপ্ত রুদ্রকে শান্ত করা হয়, তখন কল্পশাস্ত্রের বিধান অনুযায়ী 'পুরুষেণ নারায়ণেন' অর্থাৎ পুরুষ সূক্তের মাধ্যমেই সেই যজ্ঞপুরুষের উপস্থান করা হয়। শতপথ ব্রাহ্মণের অমোঘ বাণী 'স এষোঽত্র রুদ্রো দেবতা' অনুযায়ী যজ্ঞাগ্নিতে সংস্কৃত সেই পুরুষাকৃতি সত্তাই আসলে রুদ্র। জৈমিনি পূর্বমীমাংসার শ্রুতি, লিঙ্গ, বাক্য, প্রকরণ, স্থান ও সমাখ্যা এই ষড়প্রমাণের নিরিখে বিচার করলে দেখা যায় যে, পুরুষ সূক্তের প্রতিটি লক্ষণ, যথা সহস্রাক্ষত্ব বা বিশ্বব্যাপকতা, পরমেশ্বর শিবের বৈদিক স্বরূপের সাথেই হুবহু মিলে যায়।
বর্তমান প্রবন্ধে আমি “শম্বরনাথ শৈব” বৈদিক সংহিতা, আপস্তম্ভ শ্রৌতসূত্র এবং মীমাংসা ন্যায়ের আলোকে ধাপে ধাপে আলোচনা করব কীভাবে পুরুষ সূক্তের বর্ণিত 'পুরুষ' এবং বেদের 'রুদ্র' বা 'শিব' অভিন্ন। সৃষ্টির আদি যজ্ঞ থেকে শুরু করে বর্ণাশ্রমের উৎপত্তি এবং মহাজাগতিক চেতনার বিস্তার পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে পরমেশ্বর শিবের যে বিশ্বরূপ পুরুষ সূক্তে বর্ণিত হয়েছে, তার একটি বিজ্ঞানসম্মত ও শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা উপস্থাপন করাই এই আলোচনার মূল লক্ষ্য।
ॐ শ্রীমন্মহাগণাধিপতয়ে নমঃ 🙏
ॐ শ্রীগুরু দক্ষিণামূর্তয়ে নমঃ🙏
ॐ সাম্বসদাশিবায় নমঃ 🙏
শ্রী সদাশিব সমারম্ভ্যম্ শ্রীনন্দীকেশ্বর মধ্যমাম্।
অস্মাৎ আচার্য পর্যন্তম্ বন্দে গুরু পরম্পরাম্।। 🙏
🔘 প্রথমে দেখে নেওয়া যাক বেদ পুরুষ কে —
বৈদিক সাহিত্যে 'পুরুষ' শব্দটির গূঢ় অর্থ হলো সেই পরমাত্মা যিনি এই চরাচর বিশ্বে পরিব্যাপ্ত হয়ে আছেন। নিচে প্রদত্ত শ্রুতি প্রমাণসমূহ বিশ্লেষণ করলে এটি প্রমাণিত হয় যে, পুরুষ সূক্তে বর্ণিত সেই পরম পুরুষ মূলত পরমেশ্বর রুদ্র-শিবেরই বিশ্বরূপ।
"সহস্রশীর্ষা পুরুষঃ সহস্রাক্ষঃ সহস্রপাৎ ।
স ভূমিং বিশ্বতো বৃত্বা অত্যতিষ্ঠদ্ দশাঙ্গুলম্ ॥"
(কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ/৩ অধ্যায়/১৪ নং মন্ত্র, এবং পুরুষ সূক্ত)
এই মন্ত্রটি পুরুষ সূক্তের প্রথম মন্ত্র এবং শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে মহর্ষি শ্বেতাশ্বতর শৈবাচার্য দ্বারা এটি প্রয়োগ হয়েছে পরমেশ্বর রুদ্রের মাহাত্ম্য বর্ণনায়। এখানে পরম পুরুষ রুদ্রকে অগণিত মস্তক, চক্ষু ও চরণের আধার বলা হয়েছে। এই একই রূপের বর্ণনা আমরা নিম্নোক্ত শ্রুতিতেও পাই —
"পুরুষস্য বিদ্মহে সহস্রাক্ষস্য মহাদেবস্য ধীমহি ।
তন্নো রুদ্রঃ প্রচোদয়াৎ ॥"
(কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/তৈত্তিরীয় আরণ্যক/১০ম প্রপাঠক/৫ম অনুবাক)
এখানে স্পষ্টভাবে 'পুরুষ' শব্দের সমার্থক হিসেবে 'মহাদেব' ও 'রুদ্র' শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ, সেই সহস্রাক্ষ পুরুষ অন্য কেউ নন, তিনি স্বয়ং মহাদেব।
রুদ্রই হলো পুরুষ এবং সর্বব্যাপী পরমাত্মা —
সর্বে বৈ রুদ্রস্তস্মৈ রুদ্রায় নমো অস্তু ।
পুরুষো বৈ রুদ্রঃ সন্মহো নমো নমঃ ।
(কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/ তৈত্তিরীয় আরণ্যক/ পরিশিষ্ট ২৪ নং অনুবাক)
অর্থাৎ- শ্রুতি সরাসরি সিদ্ধান্ত প্রদান করছে যে- যা কিছু 'সর্ব' (সমগ্র জগত) তা-ই রুদ্র, এবং রুদ্রই হলেন সেই 'পুরুষ'। এখানে পুরুষ ও রুদ্রের মধ্যে কোনো ভেদ নেই।
"একো হি রুদ্র ন দ্বিতীয়ায় তস্থুর্য ॥"
(কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ ৩ অধ্যায়/২ নং মন্ত্র)
রুদ্রই অদ্বিতীয় পরমেশ্বর। তিনি যখন মায়ার অতীত পরম জ্যোতির্ময় পুরুষরূপে প্রতিভাত হন, তখন ঋষিরা তাঁকে এভাবে চিনেছিলেন —
বেদাহমেতং পুরুষং মহান্তমাদিত্যবর্ণং তমসঃ পরস্তাৎ ।
তস্য যোনিং পরিপশ্যন্তি ধীরাস্তম্মে মনঃ শিবসংকল্পমস্ত ॥
(ঋগ্বেদ/আশ্বলায়ণ শাখা/১০/১৭১/৯)
এখানে সেই 'মহান পুরুষ' বা মহান্তম পুরুষ রুদ্রকে আদিত্যবর্ণ অর্থাৎ স্বপ্রকাশিত বলা হয়েছে। ধীর ব্যক্তিগণ তাঁর উৎস জানেন এবং তাঁদের মন সেই শিবতত্ত্বের সংকল্পে লীন থাকে।
ওঙ্কার ও পুরুষোত্তম রূপে মহাদেবই বেদে উল্লেখযোগ্য —
প্রযতঃ প্রণবো নিত্যং পরমং পুরুষোত্তমম্ ।
ওঙ্কারং পরমাত্মনং তন্মে মনঃ শিবসংকল্পমস্ত ॥
(ঋগ্বেদ/আশ্বলায়ণ শাখা/১০/১৭১/২০)
যো বৈ বেদ মহাদেবং পরমং পুরুষোত্তমম্ ।
যঃ সর্বং যস্য চিৎসর্বং তন্মে মনঃ শিবসংকল্পমস্ত ॥
(ঋগ্বেদ/ আশ্বলায়ণ শাখা/ ১০/১৭১)
এই মন্ত্রগুলোতে মহাদেবকেই 'পরম পুরুষোত্তম' এবং 'পরমাত্মা' বলা হয়েছে। তিনি ওঙ্কার স্বরূপ এবং সমগ্র জগৎ যাঁর চিৎ-শক্তিতে প্রকাশিত। পুরুষ সূক্তের 'পুরুষ' যে পরমেশ্বর শিব, তা এখানে 'মহাদেব' ও 'পুরুষোত্তম' শব্দের অন্বয়ে সুপ্রতিষ্ঠিত।
শিবের সগুণ ও নির্গুণ স্বরূপের বর্ণনায় শ্রুতি বলে—
"পশুপাশবিমোচকং পুরুষং কৃষ্ণপিঙ্গলং ঊর্ধ্বরেতং বিরূপাক্ষং বিশ্বরূপং সহস্রাক্ষং সহস্রশীর্ষং সহস্রচরণং বিশ্বতোবাহুং বিশ্বাত্মানং একং অদ্বৈতং নিষ্কলং নিষ্ক্রিয়ং শান্তং শিবং অক্ষরং অব্যয়ং হরি-হর-হিরণ্যগর্ভস্রষ্টারং অপ্রমেয়ং অনাদ্যন্তং ... ।"
(অথর্ববেদ/ভস্মজাবাল উপনিষদ/ ২য় অধ্যায়)
এই বিশাল বর্ণনায় পপরমেশ্বর শিবকে একই সাথে 'পুরুষ' এবং 'বিশ্বরূপ' বলা হয়েছে। তিনিই হরি, হর এবং হিরণ্যগর্ভের স্রষ্টা। তিনি যেমন সহস্রশীর্ষ (সগুণ), তেমনি তিনি নিষ্কল ও শান্ত (নির্গুণ)। পুরুষ সূক্তের 'পুরুষ' যে সকল দেবতার পরম কারণ, তা এই শ্লোকটি দ্বারা প্রমাণিত হয়।
"বিশ্বতশ্চক্ষুরএত বিশ্বতোমুখো বিশ্বতোবাহুরুত বিশ্বতস্পাৎ ।" (কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ ৩/৩)
"সর্ব্বব্যাপী সর্ব্বভূতান্তরাত্মা ।
সাক্ষী চেতা কেবলো নির্গুণশ্চ ॥"
(কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ ৬/১১)
পুরুষ সূক্তে পুরুষকে বিশ্বব্যাপী বলা হয়েছে। শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ বলছে, সেই পরমেশ্বর শিবই সকল প্রাণীর অন্তরাত্মা এবং সাক্ষী স্বরূপ। তিনি যেমন সগুণ রূপে বিশ্বের কর্ম পরিচালনা করেন, তেমনি নির্গুণ রূপে তিনি কেবল চেতনাময়।
সুতরাং- উপরিউক্ত শ্লোকসমূহ বিচার করলে দেখা যায়, শ্রুতি শাস্ত্র যেখানেই 'পরম পুরুষ' বা 'সহস্রশীর্ষা পুরুষ'-এর কথা বলেছে, সেখানেই তার পরবর্তী বা পূর্ববর্তী পদে 'রুদ্র', 'মহাদেব' বা 'শিব' শব্দগুলো প্রযুক্ত হয়েছে। তৈত্তিরীয় আরণ্যক ও শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ পুরুষ সূক্তের মন্ত্রগুলো সরাসরি শিবের মহিমা কীর্তনে বিনিয়োগ করেছে। সুতরাং, অকাট্য শ্রুতি প্রমাণের ভিত্তিতে এটি প্রমাণিত যে, পুরুষ সূক্তের বর্ণিত 'পুরুষ' অন্য কেউ নন, তিনি স্বয়ং পরমেশ্বর শিব।
——————————————————————————————————————————————————————
🔘 অগ্নিচয়ন প্রক্রিয়াতে যখন শতরুদ্রীয় হোম হয়, তখন রুদ্রের উপস্থানের জন্য পুরুষ সুক্তের বিধান হয়। বেদের সংহিতা ভাগ, ব্রাহ্মণ ভাগ আদি সাধারণত কর্মকাণ্ড, যজ্ঞীয় রীতিনীতিকেই দর্শায়। আর, কীভাবে বেদ মন্ত্রের বিধান করতে হয়, সেই নিয়মকে বিস্তারিত ভাবে দর্শায় কল্পবেদাঙ্গ। অর্থাৎ- কল্পবেদাঙ্গকে বেদের কর্মকাণ্ডের ব্যাখ্যাকারী বলা যায়। শতপথ ব্রাহ্মণে বলা হয়েছে—
“অথাতঃ শতরুদ্রিয়ং জুহোতি । অত্রৈষ সর্বোহগ্নিঃ সংস্কৃতঃ স এষোহত্র রুদ্রো দেবতা তস্মিনদেবা এতদমৃতং রূপমুত্তমমদধুঃ”।। [শুক্ল-যজুর্বেদ/শতপথ ব্রাহ্মণ/৯/১/১/১]
অতঃপর 'শতরুদ্রিয়' হোম করেন (অর্থাৎ, যজ্ঞের নির্দিষ্ট ক্রমে শতরুদ্রীয় মন্ত্র পাঠ করে রুদ্রের উদ্দেশ্যে অগ্নিতে আহুতি প্রদান করা হয়)। এখানে অগ্নি সম্পূর্ণরূপে সংস্কৃত (প্রস্তুত)। এই অগ্নিই এখানে 'রুদ্র' দেবতা। তৈত্তিরীয় সংহিতাও একমত হয়ে বলছে —
“রুদ্রো বা এষ ষদগ্নিঃ স এতর্হি জাতো যর্হি সর্ব্বশ্চিতঃ” [কৃষ্ণ যজুর্বেদ/তৈত্তিরীয় সংহিতা/৫/৪/৩]
অর্থাৎ, এই যে অগ্নি চিত হয়েছেন, ইনিই রুদ্র। দেবতারা তাঁর মধ্যে এই উত্তম অমৃত রূপ স্থাপন করেছিলেন।
যাস্ক নিরুক্তে বলা হয়েছে- “অগ্নিরপি রুদ্র উচ্যতে” [যাস্ক নিরুক্ত/১০/৭/৭]
অর্থাৎ অগ্নি রুদ্র বলে কথিত হয়, বা অগ্নি ও রুদ্র একই।
আবার শুক্ল-যজুর্বেদের শতপথ ব্রাহ্মণে বলা হয়েছে-
“অগ্নিরিতি সোঽয়ং কুমারো রূপাণ্যনুপ্রাবিশন্ন” [শুক্ল-যজুর্বেদ/শতপথ ব্রাহ্মণ ৬/১/৩/১৯]
অর্থাৎ এই কুমার (অর্থাৎ রুদ্র)-ই অগ্নি নামে পরিচিত, তিনি বিভিন্ন রূপে প্রবেশ করেছেন (অর্থাৎ নানা শক্তি-রূপে সর্বত্র বিরাজমান হয়েছেন)।
অর্থাৎ অগ্নিই হলো সাক্ষাৎ রুদ্র তা সরাসরি শ্রুতির বিধান৷
আবার শ্রুতি নিজেই বলে -
“তস্মৈ রুদ্রায় নমো অস্ত্রগ্নয়ে”
[অথর্ববেদ/৭ম কাণ্ড/৮ম অনুবাক/৬ষ্ট সুক্ত/১ নং মন্ত্র]
অর্থাৎ সেই অগ্নিরূপ রুদ্রকে আমাদের নমস্কার।
সুতরাং, হোমে যে অগ্নি প্রস্তুত করা হয়, সেই অগ্নিই রুদ্র। এই অগ্নির মধ্যেই দেবতারা “অমৃতরূপ” (পরম, উত্তম, দেবতাত্মক রূপ) স্থাপন করেছেন। তৈত্তিরীয় সংহিতা অনুসারে, এই সদ্যজাত রুদ্রকে শান্ত করা আবশ্যক, কারণ-
“স যথা বৎসো জাতং স্তনং প্রেন্সত্যেবং বা এষ এতর্হি ভাগধেয়ং প্রেন্সতি” [কৃষ্ণ যজুর্বেদ/তৈত্তিরীয় সংহিতা ৫/৪/৩] নবজাতক বাছুর যেমন স্তন্য চায়, অগ্নিও তেমন আহুতি চায়।
শুক্ল-যজুর্বেদের শতপথ ব্রাহ্মণ/৯/১/১/৬ অনুযায়ী, প্রজাপতির ক্রোধ থেকে শতশীর্ষ রুদ্র প্রকট হয়েছিলো “শতশীর্ষা রুদ্রঃ সহস্রাক্ষঃ”।
আর আপস্তম্ভ শ্রৌতসূত্রের এই মন্ত্রে সেই রুদ্ররূপী অগ্নিকেই 'সহস্রশীর্ষ পুরুষ' হিসেবে চয়ন (স্থাপনা) করার কথা বলা হয়েছে। আবার, রুদ্রের সেই ভয়াবহ রূপকে যখন যজ্ঞবেদীতে সাজানো হয়, তখন তিনি 'পুরুষ' বা বিশ্বের পরম আধারে রূপান্তরিত হন। তাই শ্রৌতসূত্রে বলা হয়েছে- “সহস্রশীর্ষা পুরুষ ইত্যুপহিতাং পুরুষেণ নারায়াণেন যজমান উপতিষ্ঠতে” [আপস্তম্ব শ্রৌতসূত্র/১৬/২৮] (যজমান পুরুষ সূক্তের মাধ্যমে সেই সহস্রশীর্ষ পুরুষের উপাসনা করবেন)। অর্থাৎ- যজমান যখন অগ্নি চয়ন সম্পন্ন করেন, তখন তিনি 'সহস্রশীর্ষা পুরুষঃ' (পুরুষসূক্ত) পাঠ করে অগ্নির উপাসনা করেন। এখানে নারায়ণ ঋষি প্রোক্ত পুরুষসূক্তের মাধ্যমে বলা হয়েছে যে, এই অগ্নিই সেই পরম পুরুষ, যিনি সহস্র মস্তক ও সহস্র চক্ষুধারী এবং যিনি এই মহাবিশ্বকে পরিব্যপ্ত করে আছেন।
আপস্তম্ব শ্রৌতসূত্রে বলা হয়েছে- “মা ছন্দস্তৎপৃথিব্যগ্নিরদেবতা... গায়ত্রী ছন্দস্তদজা বৃহস্পতির্দেবতা... তেনর্ষিণা তেন ব্রহ্মণা তয়া দেবতয়াঙ্গিরস্বদ্ধ্রুবা সীদ।” [আপস্তম্ব শ্রৌতসূত্র/১৬/২৮] অর্থাৎ বিভিন্ন ছন্দের (মা, প্রমা, প্রতিমা, গায়ত্রী ইত্যাদি) কথা বলা হয়েছে, যা দিয়ে যজ্ঞের ইট বা ইষ্টক সাজানো হয়।
শতপথ ব্রাহ্মণের শেষ অংশে (শুক্ল-যজুর্বেদ/শতপথ ব্রাহ্মণ/৯/১/১/৪৩) বলা হয়েছে যে, শতরুদ্রীয় হোম কীভাবে ৩৬০ দিন বা সংবৎসরের সমান হয়। শ্রৌতসূত্রের এই বিধি অনুযায়ী কীভাবে বিভিন্ন ছন্দের ইট (ইষ্টক) দিয়ে সেই 'কাল-পুরুষ' বা 'সংবৎসর-অগ্নি'র শরীর তৈরি করা হয় তার ব্যাখ্যা করেছে। অর্থাৎ- রুদ্রের তেজকে বিভিন্ন ছন্দের মাধ্যমে শৃঙ্খলিত করা হচ্ছে।
তৈত্তিরীয় সংহিতাও এই শৃঙ্খলার ওপর জোর দিয়ে বলে— “তিস্র উত্তরা আহুতীর্জ্জহোতি ষট্ সং পদ্যন্তে ষদ্রা ঋতব ঋতুভিরেবৈনং শময়তি” [কৃষ্ণ যজুর্বেদ/তৈত্তিরীয় সংহিতা ৫/৪/৩] ছয়টি আহুতির মাধ্যমে ছয় ঋতু তথা কালের দ্বারা রুদ্রকে শান্ত করা হয়। গায়ত্রী, ত্রিষ্টুপ ও জগতী ছন্দের ইষ্টক স্থাপনের মাধ্যমে রুদ্রের সেই অনিয়ন্ত্রিত শক্তিকে একটি সুসংগত 'ব্রহ্ম' বা শৃঙ্খলায় আনা হয়। এতে রুদ্র আর হিংসা করেন না, বরং তিনি যজমানের পরম মিত্র হয়ে ওঠেন।
আপস্তম্ব শ্রৌতসূত্রে বলা হয়েছে — “পুরস্তাৎপ্রতীচীং পুরুষাকৃতিং চিনোতি” [আপস্তম্ব শ্রৌতসূত্র/১৬/২৮] পূর্ব থেকে পশ্চিমে পুরুষাকৃতিতে অগ্নি চয়ন করবেন। এই পুরুষাকৃতি অগ্নি যে সর্বব্যাপী, তা তৈত্তিরীয় সংহিতার এই মন্ত্রে স্পষ্ট — “কস্যাং বাহহ বিশি রুদ্রঃ কস্যাং বেত্যনুপরিক্রামমেব হোতব্যমপরিবর্গমেবৈনং শময়তি” [কৃষ্ণ যজুর্বেদ/তৈত্তিরীয় সংহিতা/৫/৪/৩] রুদ্র কোন দিকে আছেন তা নির্দিষ্ট নয়, তাই চারদিকে ঘুরে আহুতি দিয়ে তাঁকে সর্বত্র শান্ত করতে হয়। শুক্ল-যজুর্বেদের শতপথ ব্রাহ্মণে 'শতশীর্ষ রুদ্রের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তাঁর একটি নির্দিষ্ট আকার প্রয়োজন। শ্রৌতসূত্রে সেই আকারটিই হলো পুরুষাকৃতি বেদী। এই বেদীর শির (মাথা), পক্ষ (ডানা) ও পুচ্ছ (লেজ) থাকে।
শুক্ল-যজুর্বেদের শতপথ ব্রাহ্মণের/৯/১/১/৪৪ মন্ত্রে পক্ষ ও পুচ্ছের উল্লেখ পাওয়া যায়- “শিরস্তৎপক্ষপুচ্ছান্যথ” যা এই পুরুষাকৃতি বেদীরই ইঙ্গিত দেয়। তৈত্তিরীয় সংহিতায় এই তিন স্তরের লোকাত্মক পুরুষকে প্রকাশ করা হয়েছে — “ত্রেধাবিভক্তং জুহোতি ত্রয় ইমে লোকা ইমানেব লোকান্ সমাবদ্বীর্য্যান্ করোতি” [কৃষ্ণ যজুর্বেদ/তৈত্তিরীয় সংহিতা/৫/৪/৩] তিন ভাগে আহুতি দিয়ে তিন লোকব্যাপী পুরুষের বীর্য সমান করা হয়।
আপস্তম্ব শ্রৌতসূত্রে বলা হয়েছে — “অপস্যা উপদধাতি” [আপস্তম্ব শ্রৌতসূত্র ১৬/২৮] (জলের ইষ্টক স্থাপন) এবং বিভিন্ন দিকের কথা আছে। শুক্ল-যজুর্বেদের শতপথ ব্রাহ্মণের/৯/১/১/৩৪, ৩৫, ৩৬ নং অংশে রুদ্রের তিন লোকের কথা বলা হয়েছে (আকাশ, অন্তরীক্ষ, পৃথিবী)। শ্রৌতসূত্রে সেই তিন লোক ও চার দিককে ইষ্টক বা ইটের মাধ্যমে সাজানো হচ্ছে। রুদ্র অত্যন্ত উত্তপ্ত ও প্রদীপ্ত {“দীপ্যমানোঽতিষ্ঠৎ” (শুক্ল-যজুর্বেদ/শতপথ ব্রাহ্মণ ৯/১/১/১-২)}, তাই তাঁকে শান্ত করতে এই 'আপস্যা' বা জলীয় তত্ত্বের আহুতি ও ইষ্টক প্রয়োজন হয়। কৃষ্ণ-যজুর্বেদের তৈত্তিরীয় সংহিতা অনুযায়ী রুদ্রকে স্বস্থানে শান্ত করতে হয়— “উদঙ তিষ্ঠন্ জুহোত্যেষা বৈ রুদ্রস্য দিক্ স্বায়ামেব দিশি রুদ্রং নিরবদয়তে” [কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/তৈত্তিরীয় সংহিতা/৫/৪/৩] এই থেকে বিষয়টি পরিস্কার যে- রুদ্র এবং যজ্ঞপুরুষ অভিন্ন। রুদ্র যখন তাঁর সংহারী রূপে থাকেন, তখন আমরা শতরুদ্রীয় দ্বারা তাঁকে শান্ত করি। আর যখন তিনি যজ্ঞবেদীতে পুরুষাকৃতিতে শান্ত হয়ে বসেন, তখন আমরা পুরুষসূক্ত দ্বারা রুদ্রের মহিমা কীর্তন করি। সুতরাং, উক্ত শ্রুতি বচন এবং কল্পশাস্ত্রের বিধান দ্বারা বোঝা যায় - পুরুষসুক্ত সাক্ষাৎ রুদ্রের প্রতিই বিনিয়োগ হয়। তাই, পুরুষ সুক্তের দেবতা যে প্রভু রুদ্রই তা সাক্ষাৎ শ্রুতি প্রমাণ দ্বারা স্থাপিত।
এবার জৈমিনি পূর্বমীমাংসা ৩য় অধ্যায়ের ৩য় পাদ ১৪ নং সূত্র অনুযায়ী-শ্রুতি-লিঙ্গ-বাক্য-প্রকরণ-স্থান-সমাখ্যা এইগুলিই অর্থনির্ণয়ের প্রধান উপায়। এবার এখানে বিষয় হলো- পুরুষসুক্তের দেবতা নির্ণয়। তবে, দেখে নেওয়া যাক পূর্বমীমাংসা অনুযায়ী পুরুষ সুক্তের দেবতা কে—
◾১. শ্রুতি প্রমাণ — প্রথমত শ্রুতি প্রমাণ অনুযায়ী, পুরুষসুক্ত যদি সাক্ষাৎ রুদ্রের প্রতি বিনিয়োগ হয় (অর্থবাদ ব্যতীত) তবে, শ্রুতি প্রমাণ অনুযায়ী পুরুষ সুক্তের দেবতা রুদ্রই নির্ধারিত হবে। কারণ, শ্রুতি প্রমাণই সবচেয়ে প্রবল এবং সাক্ষাৎ বিনিয়োগ করে। শ্রুতি বলে- “শতরুদ্রীয়ং জুহোতি” [শুক্ল যজুর্বেদ/শতপথ ব্রাহ্মণ ৯/১/১/১] অর্থাৎ- এরপর দেবতারা শতরুদ্রীয় হোম করেন। আর শতরুদ্রীয় হোমে রুদ্রের উপস্থানে পুরুষ সূক্তের বিধান হয়। অগ্নিচয়ন যজ্ঞে শতরুদ্রীয় হোমে প্রদীপ্ত রুদ্রকে উপাসনা করার জন্য তৃতীয় বিভক্তির মাধ্যমে পুরুষসূক্তের (নারায়ণ ঋষি প্রোক্ত) বিধান দেওয়া হয়।
আপস্তম্ভ শ্রৌতসূত্র/১৬/২৮ বলা হয়েছে— “পুরুষেণ নারায়ণেন যজমানঃ উপতিষ্ঠতে”। এখানে ‘পুরুষেণ’ ও ‘নারায়ণেন’ পদ দুটিতে পাণিনীয় সূত্র “কর্তৃকরণয়োস্তৃতীয়া” [পাণিনী অষ্টাধ্যায়ী/২/৩/১৮] অনুসারে করণ কারকে তৃতীয়া বিভক্তি হয়েছে।
কাশিকা ভাষ্যমতে- “করণে দাত্রেণ লুনাতি” (যেমন দা-এর দ্বারা কাটা হয়), এখানেও তেমনি পুরুষসূক্তের দ্বারা (করণ) রুদ্রের উপাসনা করা হয়। অর্থাৎ- যজমান পুরুষসূক্তের মাধ্যমে (তৃতীয়া বিভক্তি) স্বয়ং রুদ্রেরই উপস্থান বা উপাসনা করেন এটা সাক্ষাৎ শ্রুতি দ্বারা বিনিয়োগ হয়। সুতরাং- পুরুষসুক্তের দেবতা রুদ্রই এটা সাক্ষাৎ শ্রুতির বিধান যা অখণ্ডনীয়। যদি প্রশ্ন হয় কেন তৃতীয়া বিভক্তি দ্বারা প্রয়োগ হবে? তার জন্য পাণিনী বলেন- “সাধকতমং করণম্” (পাণিনী অষ্টাধ্যায়ী/১/৪/৪২) হলো সেই আধার বা সংজ্ঞা সূত্র, যার ওপর ভিত্তি করেই “কর্তৃকরণয়োস্তৃতীয়া” (পাণিনী অষ্টাধ্যায়ী/২/৩/১৮) সূত্রটি কাজ করে।
কাশিকা ভাষ্যে বলা হয়েছে— “ক্রিয়াসিদ্ধৌ যৎ প্রকৃষ্টোপকারকং... তৎ করণসংজ্ঞং ভবতি” (ক্রিয়া সম্পাদনের জন্য যা সবচেয়ে বেশি সাহায্যকারী, তার নামই ‘করণ’)।
যজ্ঞে যজমানের প্রধান লক্ষ্য হলো - প্রদীপ্ত রুদ্রকে উপস্থান বা উপাসনা করা। এই উপাসনা ক্রিয়াটি সফল করার জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম বা ‘প্রকৃষ্টোপকারক’ হলো পুরুষসূক্ত। যেহেতু পুরুষসূক্ত এখানে উপাসনা সিদ্ধির শ্রেষ্ঠ উপায় (সাধকতম), তাই পাণিনী অষ্টাধ্যায়ী/১/৪/৪২ সূত্র অনুযায়ী এর ‘করণ’ সংজ্ঞা হয় এবং পাণিনী অষ্টাধ্যায়ী/২/৩/১৮ সূত্র অনুযায়ী এতে ‘পুরুষেণ’ (তৃতীয়া বিভক্তি) যুক্ত হয়। তবে প্রশ্ন ওঠে রুদ্রই কেন লক্ষ্য ? ব্যাকরণে ‘করণ’ বা মাধ্যম সব সময় একটি নির্দিষ্ট ‘সাধ্য’ বা লক্ষ্যের অভিমুখী থাকে। উদাহরণ- যেমন ‘দা’ (দাত্রেণ) দিয়ে ‘ঘাস’ কাটা হয়। এখানে দা হলো মাধ্যম, আর ঘাস হলো লক্ষ্য। এখানে ‘পুরুষসূক্ত’ হলো মাধ্যম (করণ), আর ‘রুদ্র’ হলেন লক্ষ্য। শতরুদ্রীয় হোমের প্রেক্ষাপটে (প্রকরণ) রুদ্রই একমাত্র উপাস্য হিসেবে উপস্থিত। সুতরাং, পুরুষসূক্ত রূপ সাধকতম করণের দ্বারা রুদ্রেরই উপাসনা সিদ্ধ হচ্ছে।
আবার শ্রুতিই সাক্ষাৎ বলে- শতপথ ব্রাহ্মণে বারবার রুদ্রকে 'অগ্নি' এবং অগ্নিকে 'সর্ব' বলা হয়েছে। আবার পুরুষ সূক্তে পুরুষকে 'সর্ব' (পুরুষ এবেদং সর্বং) বলা হয়েছে।
শুক্ল যজুর্বেদ/শতপথ ব্রাহ্মণ/৯/১/১/১- “স এষোহত্র রুদ্রো দেবতা” এই অগ্নিই এখানে রুদ্র দেবতা। বেদে সরাসরি বলা হয়েছে- "রুদ্রায় নমো অস্ত্রগ্নয়ে"।
এবং নিরুক্তেও “অগ্নিরপি রুদ্র উচ্যতে” বলে- রুদ্রই যে অগ্নি তা সংজ্ঞায়িত করেছে।
যেহেতু রুদ্রই অগ্নি এবং সেই অগ্নিকেই পুরুষাকৃতিতে চয়ন করে পুরুষ সূক্ত পাঠ করা হচ্ছে, তাই শ্রুতিগতভাবে এই পুরুষই সাক্ষাৎ রুদ্র।
এই শ্রুতিগত বিনিয়োগকে আরও সুসংহত করতে মীমাংসা দর্শনের প্রসিদ্ধ 'ছাগপশুন্যায়' উল্লেখযোগ্য- “অগ্নিষোমীয়ং পশুমালভেত” [তৈত্তিরীয় সংহিতা/৬/১/১/৬] “পশুচোদনায়াম্ অনিয়মঃ অবিশেষাৎ” [মীমাংসা ৬/৮/৩০]— অগ্নিষোমীয় যজ্ঞে পশুবলি দেওয়া উচিত, এই নির্দেশক (বিধি) বাক্যে ‘'পশু’ এমন একটি সাধারণ পদ হওয়ায়, তা চার পায়ে চলা কোনো পশু বলি দেওয়ার কথা বলে, কোনো নির্দিষ্ট পশুর কথা বলে না। এই কারণে, সেই অগ্নিষোমীয় যজ্ঞে বলি দেওয়ার জন্য ঠিক কি পশু, সে বিষয়ে সন্দেহ হয়। কিন্তু, “ছাগস্য হবিশো বপায়া মেদসঃ” [তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ৩/৬/৮/১]— অর্থাৎ ছাগলের চর্বি দিয়ে হোম করতে হবে, এই অর্থবোধক বিনিয়োগ মন্ত্র থেকে এবং এই মন্ত্রে ‘ছাগ’ নামক বিশেষ পদ থাকার কারণে, সাধারণ ‘পশু’ শব্দের অর্থ ‘ছাগ’ নির্ধারিত হয়। এইভাবে, সাধারণ 'পশু’ শব্দের ‘ছাগ’ অর্থ না করলে, ‘'অগ্নিষোমীয়’’ এই বিধিবাক্য ও ‘ছাগস্য হবিশঃ’ এই বিনিয়োগ বাক্যের মধ্যে একতা থাকবে না। তাই সাধারণ ‘পশু’ শব্দের ‘ছাগ’ এই বিশেষ অর্থ গ্রহণ করা উচিত। এই উদ্দেশ্য সিদ্ধ করার জন্য পূর্বমীমাংসার “ছাগো বা মন্ত্র বর্ণাত্” [মীমাংসা ৬/৮/৩১]— এই সূত্র প্রবৃত্ত হয়। একেই ছাগপশুন্যায় বলা হয়। তাই এই ন্যায় দ্বারা সিদ্ধ হয়, ভিন্ন ভিন্ন মন্ত্রে যেসব বিশেষ পদ এসেছে, সেগুলির উপর ভাবনা করে, সাধারণ পদগুলোর অর্থ নির্ধারণ করা উচিত।
শতপথ ব্রাহ্মণের বিধি— “অথাত শতরুদ্রীয়ং জুহোতি” (৯/১/১/১)। এখানে যজ্ঞের মূল দেবতা হিসেবে রুদ্র প্রতিষ্ঠিত। এই হোমে যখন উপস্থানের কথা আসে, তখন একটি প্রশ্ন জাগে কোন মন্ত্র বা উপাচারের দ্বারা এই উপস্থান সিদ্ধ হবে? এটি একটি সাধারণ আকাঙ্ক্ষা।
এই আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে আসে কল্পশাস্ত্র বা শ্রৌতসূত্রের বিনিয়োগ বাক্য— “পুরুষেণ নারায়ণেন যজমানঃ উপতিষ্ঠতে” (আপস্তম্ভ শ্রৌতসূত্র/১৬/২৮)। এখানে 'পুরুষ' (পুরুষসূক্ত) একটি বিশেষ পদ হিসেবে উপস্থিত।
যেমন ‘পশু’ বলতে যেকোনো পশু হতে পারত, কিন্তু ‘ছাগ’ পদের উপস্থিতিতে তা ছাগলেই নির্দিষ্ট হয়েছে, ঠিক তেমনি শতরুদ্রীয় হোমে (রুদ্রের যজ্ঞে) যখন নির্দিষ্টভাবে ‘পুরুষসূক্ত’ পাঠের বিধান দেওয়া হয়েছে, তখন ছাগপশুন্যায় অনুযায়ী সেই সূক্তের বিষয়বস্তু বা ‘পুরুষ’ শব্দটির অর্থ রুদ্রেই পর্যবসিত হয়। কারণ, রুদ্রের যজ্ঞে অন্য কোনো বিজাতীয় দেবতার সূক্ত পাঠ করলে বিধি ও বিনিয়োগের মধ্যে একতা থাকবে না।
সুতরাং- "অথাত শতরুদ্রীয়ং জুহোতি" এই বিধি বাক্য ও "পুরুষেণ নারায়ণেন যজমানঃ উপতিষ্ঠতে" এই বিনিয়োগ বাক্যের দ্বারা সিদ্ধ হয় যে- পুরুষ সুক্ত দ্বারাই রুদ্রের উপস্থান হয়। তাই পুরুষ সুক্তও রুদ্রের প্রতিই একান্ত বিনিয়োগ সিদ্ধ হয়। যেহেতু- অগ্নিচয়ণ প্রক্রিয়াতে যখন শতরুদ্রীয় হোম হয় তখন রুদ্রের উপস্থানে পুরুষ সুক্তের বিধান হয়। এবং উক্ত ছাগপশুন্যায় দ্বারাও ইহা সমর্থিত। সুতরাং- পুরুষ সুক্তের দেবতা কেবল রুদ্রই এটাই মেনে নেওয়া ন্যায় সঙ্গত।
◾২. লিঙ্গ প্রমাণ — পুরুষ সূক্তের প্রথম মন্ত্রে বলা হয়েছে- "সহস্রশীর্ষা পুরুষঃ সহস্রাক্ষঃ সহস্রপাৎ" (সহস্র মস্তক, সহস্র চক্ষু ও সহস্র পাদ বিশিষ্ট পুরুষ)। শতপথ ব্রাহ্মণ/৯/১/১/৬)-এ রুদ্রের বর্ণনায় ঠিক একই লিঙ্গ বা লক্ষণ ব্যবহার করা হয়েছে- "স এষ শতশীর্ষা রুদ্রঃ সমভবৎসহস্রাক্ষঃ" (তিনি সেই শতশীর্ষ ও সহস্রাক্ষ রুদ্র রূপে আবির্ভূত হলেন)।
এছাড়াও- “বিরূপাক্ষং বিশ্বরূপং সহস্রাক্ষং সহস্রশীর্ষং সহস্রচরণং” [অথর্ববেদ/ভস্মজাবাল উপনিষদ ২/৩] এবং- "পুরুষস্য বিদ্ম সহস্রাক্ষস্য মহাদেবস্য ধীমহি। তন্নো রুদ্রঃ প্রচোদয়াৎ।" [কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/তৈত্তিরীয় আরণ্যক/১০/১] যেহেতু রুদ্র এবং পুরুষ সূক্তের পুরুষের বর্ণনা বা 'লিঙ্গ' হুবহু এক, তাই মীমাংসা মতে লিঙ্গ প্রমাণে এই পুরুষই রুদ্র। এবং বিশ্বব্যাপিতা, সর্বলোকস্থিতি, কালাত্মকতা, তেজোময়তা সবই রুদ্রের বৈদিক বৈশিষ্ট্য তাই, লিঙ্গ প্রমাণ অনুযায়ী পুরুষই সাক্ষাৎ রুদ্র।
◾৩. বাক্য প্রমাণ — বাক্য প্রমাণ হলো পদের পারস্পরিক অন্বয়। আপস্তম্ব শ্রৌতসূত্র/১৬/২৮ — স্পষ্ট বাক্য প্রদান করছে- "সহস্রশীর্ষা পুরুষ ইত্যুপহিতাং পুরুষেণ নারায়ণেন যজমান উপতিষ্ঠতে"। এখানে 'উপহিতাং' (স্থাপিত অগ্নিরূপ রুদ্রকে) এবং 'পুরুষেণ' (পুরুষ সূক্তের দ্বারা) পদ দুটির অন্বয় ঘটছে। অর্থাৎ- যে রুদ্রকে স্থাপন করা হলো, তাঁকেই পুরুষ সূক্তের দ্বারা উপাসনা করা হচ্ছে। উপাসনার বিষয় হলো অগ্নি এবং অগ্নিই হলো সাক্ষাৎ রুদ্র তাই, বাক্য প্রমাণ অনুযায়ী- পুরুষসূক্তের বিষয়বস্তু হলো রুদ্রই।
◾৪. প্রকরণ প্রমাণ — শুক্ল যজুর্বেদ/শতপথ ব্রাহ্মণ/৯/১/১/১ - স্পষ্টভাবে বলছে "স এষোহত্র রুদ্রো দেবতা" (এই যে অগ্নি সংস্কৃত হলেন, ইনিই রুদ্র দেবতা)। এই একই প্রকরণে বা যজ্ঞের ধারাবাহিকতায় যখন আপস্তম্ব শ্রৌতসূত্র অনুযায়ী 'পুরুষ সূক্ত' পাঠ করা হয়, তখন প্রকরণগতভাবে সেই 'পুরুষ' রুদ্র ছাড়া আর কেউ হতে পারেন না। কারণ, সমগ্র যজ্ঞটি রুদ্রকে শান্ত ও প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। এবং এছাড়াও, কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/ শ্বেতাশ্বতর উপনিষদের ৩য় অধ্যায়ের ২য় নং শ্রুতি অনুযায়ী- “এক হি রুদ্র ন দ্বিতীয়ায় তস্থুর্য” বাক্য দ্বারা রুদ্রই একমাত্র অদ্বিতীয় পরমেশ্বর প্রতিপাদিত হয়। এবং ৬ নং শ্রুতি সেই পরমেশ্বর রুদ্রই “গিরিনিবাসী”, “ গিরিত্র” আদি চিহ্ন দ্বারা সংজ্ঞায়িত করা হয় । যা শাস্ত্রগতভাবে কৈলাসনিবাসী (বিশ্বময় অবস্থা) রুদ্রের সাথেই অভিন্ন। সেই রুদ্রকেই পরম ব্রহ্ম, সর্বব্যাপক, সর্বশ্রেষ্ঠ, মহৎ, জ্যোতির্ময়, অদ্বিতীয়, সর্বাত্মা, অন্তরাত্মা, পুরুষ, শিব, ঈশান, ভগবান রূপে ধারাবাহিকভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। পরমেশ্বর রুদ্রের এমন বর্ণনা করে, পরবর্তী ১৪ নং শ্রুতি বাক্যে বলা হয়েছে— “সহস্রশীর্ষা পুরুষঃ সহস্রাক্ষঃ সহস্রপাৎ। স ভূমিং বিশ্বতো বৃত্বাঽত্যতিষ্ঠদ্দশাঙ্গুলম্॥” অর্থাৎ - পুরুষের সহস্র মস্তক, সহস্র চক্ষু, সহস্র চরণ।তিনি সমগ্র পৃথিবীকে পরিব্যাপ্ত করে তারও ঊর্ধ্বে দশ আঙুল পরিমাণ অতীত হয়ে অবস্থান করেন। এবং কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/শ্বেতাশ্বতর উপনিষদের ৪র্থ অধ্যায়ের ১০ নং শ্রুতিতে - “মায়িনন্তু মহেশ্বরম্”, ১৮ নং শ্রুতিতে “শিব এব কেবলঃ” ইত্যাদি বলে “সেই রুদ্রই মায়ার অধীশ্বর এবং যখন কিছুই ছিলোনা কেবল শিবই ছিলেন” এমন অর্থ প্রতিপাদন করেন। উক্ত, ব্যাখ্যা থেকে বিষয়টি পরিস্কার হয় যে - “সহস্রশীর্ষ পুরুষঃ” এই বাক্যের পূর্বে রুদ্রের বাক্য এবং পরেও রুদ্রের বাক্য উপস্থিত থাকাতে এবং ব্রহ্মত্বের অসাধারণ গুণে গুণান্বিত করে রুদ্রকেই বর্ণনা করেছে (বিশ্বাতীত ও বিশ্বময় অবস্থা), যার কারণে- উক্ত “সহস্রশীর্ষ পুরুষঃ” এই বাক্যও পূর্বমীমংসার প্রকরণ নিয়ম অনুযায়ী রুদ্রের প্রতিই ব্যাখ্যিত হবে৷ প্রকরণ প্রমাণ অনুযায়ী নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় যে- পুরুষসূক্তের দেবতা সাক্ষাৎ রুদ্রই।
◾৫. স্থান প্রমাণ — স্থান' হলো পাঠের ক্রম বা অবস্থান। যজ্ঞে একটি কর্মের পর অন্যটি করা হলে তাদের মধ্যে সম্বন্ধ স্থাপিত হয়। আর অগ্নিচয়ন যজ্ঞে শতরুদ্রীয় হোমের (রুদ্র উপাসনা) ঠিক পরেই বা সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই 'পুরুষাকৃতি' অগ্নিতে পুরুষ সূক্ত পাঠের বিধান দেওয়া হয়েছে। শতরুদ্রিয়ের মাধ্যমে রুদ্রকে শান্ত করে তাঁকে যে স্থানে বসানো হয়, সেখানেই পুরুষ সূক্তের পুরুষকে আবাহন করা হয়। এই স্থানিক নৈকট্য প্রমাণ করে যে রুদ্র ও পুরুষ অভিন্ন, এবং “ঋতং সত্যং পরং ব্রহ্ম পুরুষং কৃষ্ণপিঙ্গলম্” [কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/তৈত্তিরীয় আরণ্যক ১০/১২], [মহানারায়ণ উপনিষদ/২৩], [ভস্মজাবাল উপনিষদ/২/৩], “পুরুষ বৈ রুদ্রঃ সন্মহো নমো নমঃ” [কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/তৈত্তিরীয় আরণ্যক/১০/২৪] ইত্যাদি শ্রুতি বাক্যও রুদ্রই পুরুষ বলে সংজ্ঞায়িত করে। মন্ত্র যেখানে প্রয়োগ হয়, দেবতা সেই অনুযায়ী নির্ণীত হয়। তাই, শ্রৌতযজ্ঞীয় প্রয়োগস্থান, অগ্নিচয়ন বেদী, পুরুষাকৃতি বেদী, রুদ্রাত্মক অগ্নিবেদী ইত্যাদি স্থান প্রমাণ দ্বারা পুরুষ ও রুদ্রের অভিন্নতা হওয়ার কারণে, রুদ্রই সাক্ষাৎ পুরুষ সুক্তের দেবতা নির্ণীত হয় ৷
◾৬. সমাখ্যা প্রমাণ — রুদ্রকে বেদে 'মহাদেব' বা 'ঈশ্বর' ইত্যাদি বলা হয়। পুরুষ সূক্তে পুরুষকেও বলা হয়েছে- "উতামৃতত্বস্যেশানো" (যিনি অমৃতত্বের ঈশান বা স্বামী)। 'ঈশান' শব্দটি রুদ্রের একটি বিখ্যাত নাম বা সমাখ্যা। এই নামের মিল প্রমাণ করে যে পুরুষ সূক্তের দেবতা রুদ্রই। এছাড়াও- যজ্ঞবেদীতে স্থাপিত সত্তাকে শাস্ত্রে যজ্ঞপুরুষ, কালপুরুষ, বিশ্বপুরুষ, পুরুষ ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হয়েছে। একইভাবে রুদ্রকেও শাস্ত্রে পুরুষ, বিশ্বপুরুষ, কাল, মহাকাল, যজ্ঞপুরুষ ইত্যাদি সমাখ্যায় অভিহিত করা হয়েছে। এই নামগত ঐক্য দ্বারা তত্ত্বগত ঐক্য সিদ্ধ হয়। তাই, পুরুষসূক্তে উক্ত “পুরুষ” কোনো পৃথক দেবতা নয়, বরং যজ্ঞপুরুষরূপী রুদ্রই। সমাখ্যা প্রমাণ অনুযায়ী যজ্ঞপুরুষের সঙ্গে রুদ্রের অভেদ প্রতিষ্ঠিত। সুতরাং, পুরুষসূক্তে উক্ত পুরুষ রুদ্রই।
এছাড়াও বেশ কিছু ন্যায় দ্বারাও প্রতিষ্ঠিত হয় যে, পুরুষসুক্তের দেবতা সাক্ষাৎ পরমেশ্বর রুদ্রই। তবে, দেখে নেওয়া যাক এই প্রসঙ্গে ন্যায় কি বলে —
শাস্ত্রীয় অর্থনির্ণয়ের ক্ষেত্রে জৈমিনীয় মীমাংসা সূত্রের প্রাবল্য অনস্বীকার্য। পুরুষসূক্তের দেবতা নির্ণয়ে যখন আমরা শ্রুতি ও লিঙ্গাদি প্রমাণের বিচার করি, তখন প্রথমেই 'স্থূলারুন্ধতী ন্যায়' আমাদের পথপ্রদর্শক হয়। পরমাত্মা অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সাধারণ বুদ্ধির অগোচর। তাই শ্রুতি প্রথমে 'সহস্রশীর্ষা', 'সহস্রাক্ষ' বা 'সহস্রপাৎ' এরকম স্থূল শারীরিক লক্ষণের (লিঙ্গ) বর্ণনা দেয়। যেমন আকাশে সূক্ষ্ম অরুন্ধতী নক্ষত্র দেখানোর জন্য প্রথমে স্থূল সপ্তর্ষিমণ্ডল দেখানো হয়, ঠিক তেমনি এই মহাজাগতিক রূপের বর্ণনার মাধ্যমে মূলত সেই সর্বব্যাপী রুদ্রতত্ত্বকেই নির্দেশ করা হয়েছে, যা কৃষ্ণ-যজুর্বেদের শ্বেতাশ্বতর উপনিষদোক্ত শ্রুতি ও কৃষ্ণ-যজুর্বেদের শতপথ ব্রাহ্মণে স্পষ্টভাবে রুদ্রের বিশেষণ হিসেবে বর্ণিত।
যজ্ঞীয় বিনিয়োগের দিকে তাকালে আমরা 'দণ্ডাপুপিকা ন্যায়'-এর অকাট্য প্রয়োগ দেখতে পাই। আপস্তম্ব শ্রৌতসূত্র অনুযায়ী, অগ্নিচয়ন যজ্ঞে শতরুদ্রীয় হোমের সময় ‘পুরুষেণ নারায়ণেন’ অর্থাৎ পুরুষসূক্তের দ্বারা রুদ্রের উপস্থান বা উপাসনা করা হয়। এখানে যজ্ঞের মূল লক্ষ্য বা 'সাধ্য' হলেন প্রদীপ্ত রুদ্র। দণ্ডাপুপিকা ন্যায় বলে- যদি কোনো দণ্ডের সাথে পিঠা (আপূপ) যুক্ত থাকে এবং কেউ দণ্ডটি টেনে নেয়, তবে পিঠাটি আলাদা করে নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না, তা দণ্ডের সাথেই চলে আসে। একইভাবে, যখন রুদ্রের আরাধনায় পুরুষসূক্তকে 'করণ' বা মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা হয়, তখন সেই সূক্তের দেবতা হিসেবে 'পুরুষ' নামক সত্তাটি অনিবার্যভাবেই রুদ্রের সাথে একাত্ম হয়ে যায়। প্রধান দেবতা রুদ্র হলে, সেই সূত্রে পঠিত সূক্তের দেবতাও রুদ্রই এটি দণ্ডাপুপিকান্যায় দ্বারা সিদ্ধ হয়ে যায়।
এরপর প্রকরণ ও সমাখ্যা প্রমাণের বিচারে 'দেহলীদীপ ন্যায়' অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। পুরুষসূক্তে পুরুষকে 'ঈশান' (উতামৃতত্বস্যেশানো) বলা হয়েছে। 'ঈশান' শব্দটি রুদ্রের একটি শাস্ত্রীয় সমাখ্যা বা প্রসিদ্ধ নাম। যেমন গৃহের প্রবেশদ্বারে (দেহলীতে) রাখা একটি প্রদীপ ঘরের ভেতর ও বাইরে উভয় দিকই আলোকিত করে, তেমনি এই 'ঈশান' বা 'রুদ্র' শব্দটিও একদিকে যজ্ঞাগ্নিকে এবং অন্যদিকে পুরুষসূক্তের পরম পুরুষকে সমানভাবে আলোকিত করে প্রমাণ করে যে, উভয়ই অভিন্ন। শ্রুতিতে রুদ্রকে 'সর্ব' এবং পুরুষকে 'সর্ব' বলাও এই একই তত্ত্বের পরিচায়ক।
পরিশেষে, সমগ্র যুক্তিশৃঙ্খলার সমাপ্তি ঘটে 'ঘট্টকুটীপ্রভাত ন্যায়'-এর মাধ্যমে। কেউ যদি ভিন্ন কোনো দেবতার প্রাধান্য স্থাপনের জন্য নানাবিধ গৌণ অর্থ বা কল্পনা আশ্রয় করেন, তবুও শ্রুতির অকাট্য বিনিয়োগ, লিঙ্গসাম্য এবং শ্বেতাশ্বতর উপনিষদের প্রকরণগত প্রমাণের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত রুদ্রতত্ত্বেই ফিরে আসতে হয়। যেমন কোনো পথচারী শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার জন্য সারারাত অন্য পথে ঘুরেও ভোরে সেই শুল্ক-আদায় কেন্দ্রের (ঘট্টকুটী) সামনেই এসে উপস্থিত হয়, ঠিক তেমনি পুরুষসূক্তের প্রকৃত অর্থ বিচার করলে সকল পথ ঘুরে রুদ্রেই পর্যবসিত হতে হয়।
অতএব, মীমাংসা শাস্ত্রের ষড়প্রমাণ এবং দণ্ডাপুপিকা, দেহলীদীপ আদি ন্যায়সমূহ বিচার করলে এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত হয় যে, পুরুষসূক্তের বর্ণিত ‘পুরুষ’ অন্য কেউ নন, বরং তিনি স্বয়ং পরমেশ্বর রুদ্র।
——————————————————————————————————————————————————————
🔘 পুরুষ' শব্দটির আক্ষরিক অর্থ হলো 'মানুষ' বা 'নর'। এটি কেবল মানবজাতির সাধারণ নাম নয়, বরং এটি বিশ্বের পুরুষত্ব এবং মূলনীতিকেও অন্তর্ভুক্ত করে। বৈদিক শাস্ত্রসমূহ মনোযোগ দিয়ে অধ্যয়ন করলে দেখা যায় যে, কেবল পরমেশ্বর শিবই হলেন 'পুরুষ', আর বাকি সমস্ত প্রকৃতি বা সৃষ্টি হলো নারী (শক্তি)। 'পুরুষ' শব্দটির বিশ্লেষণ- “পুরি শেতি ইতি পুরুষঃ” - যে পুরে (নগররূপী শরীরে, জগতে) অবস্থান করেন, তিনিই পুরুষ।
বা- পাণিনীয় উণাদিপাঠের "পুরঃ কুষণ্" (উণাদি ৪/৭৪) সূত্রানুসারে, অগ্রগমন বা দেহরূপ পুরীতে শয়নকারী অর্থে 'পুর' ধাতু থেকে 'কুষণ্' প্রত্যয়যোগে 'পুরুষ' পদটি নিষ্পন্ন হয়। বৈদিক ছান্দস প্রয়োগে "অন্যেষামপি দৃশ্যতে" (অষ্টাধ্যায়ী ৬/৩/১৩৭) সূত্রানুসারে দীর্ঘত্ব প্রাপ্ত হয়ে এটি অনেক ক্ষেত্রে 'পূরুষ' রূপে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ- যিনি জগতের আদি কারণ এবং যিনি দেহ-পুরীতে অধিষ্ঠিত পরমাত্মা, তিনিই পুরুষ- “স বা অয়ং পুরুষঃ সর্বাসু পূর্ষূ পুরিশয়ো নৈনেন কিঞ্চনানাবৃতং নৈনেন কিঞ্চনাসংবৃতম্” [বৃহদারণ্যক উপনিষদ/ ২/৫/১৮]
অতএব, “পুরুষ” মানে এমন এক সর্বাত্মা যিনি সমগ্র জগতে ব্যাপ্ত। এই অর্থ কেবলমাত্র পরমেশ্বর শিব-কেই প্রতিপাদিত কারণ তাঁকে শ্রুতি বারবার “সর্বব্যাপী”, “সর্বজ্ঞ”, “সর্বরূপী” বলে উল্লেখ করেছে। পুরুষ সূক্ত প্রথম ঋগ্বেদের শাকল শাখায়/১০/৯০ আবির্ভূত হয়। নারায়ণ মহর্ষি হলেন এই স্তোত্রের 'মন্ত্রদ্রষ্টা' (ঋষি)। এই নারায়ণ মহর্ষিই পরবর্তীতে দ্বাপর যুগে দেবকীপুত্র শ্রীকৃষ্ণ হিসেবে অবতার গ্রহণ করেন। তাঁর প্রতিরূপ নর মহর্ষি 'অর্জুন' হিসেবে জন্মগ্রহণ করেন। পরমেশ্বর শিবের কৃপায় নারায়ণ মহর্ষি পুরুষের দিব্য দর্শন লাভ করেছিলেন। তিনিই ছিলেন প্রথম মানব ঋষি যিনি মহাজাগতিক একত্ব এবং সমস্ত প্রাণীর মধ্যে আত্মায় একত্ব উপলব্ধি করেছিলেন। এই অদ্বৈত জ্ঞান নারায়ণ ঋষিকে পরমেশ্বর শিবের সাথে বিলীন করে দিয়েছিল। যারা পুরুষকে জানেন, তারা সত্যই পুরুষের মতো সমস্ত প্রাণীর আত্মাস্বরূপ হয়ে ওঠেন।
---- শুক্ল যজুর্বেদের শতপথ ব্রাহ্মণ বর্ণনা করে যে কীভাবে নারায়ণ ঋষি পুরুষের সাথে একাত্ম হয়েছিলেন—
"পুরূষো হ নারায়ণোঽকাময়ত অতিতিষ্ঠেয়ং সর্বাণি ভূতান্যহমেবেদং সর্বং স্যামিতি..." (শুক্ল যজুর্বেদ/শতপথ ব্রাহ্মণ/১৩/৬/১/১)
অর্থ— "পুরুষ নারায়ণ কামনা করেছিলেন, 'আমি যেন সমস্ত প্রাণীকে অতিক্রম করতে পারি! আমি একাই যেন এখানে (এই মহাবিশ্বে) সবকিছু হতে পারি!' তিনি এই 'পাঁচ দিনের' যজ্ঞ অনুষ্ঠান, পুরুষমেধ দর্শন করলেন এবং তা গ্রহণ করে যজ্ঞ সম্পাদন করলেন, এবং এর মাধ্যমে যজ্ঞ সম্পন্ন করে তিনি সমস্ত প্রাণীকে অতিক্রম করলেন এবং এখানে সবকিছুতে পরিণত হলেন। এবং সত্যই, যে ব্যক্তি এটি জেনে পুরুষমেধ যজ্ঞ করেন, অথবা যিনি কেবল এটি জানেন, তিনি সমস্ত প্রাণীকে অতিক্রম করেন এবং এখানে সবকিছুতে পরিণত হন।"
---- মহাভারতের অনুশাসন পর্বে ভীষ্ম পিতামহ যুধিষ্ঠিরকে বলেন —
রুদ্রভক্ত্যা তু কৃষ্ণেন জগদ্ব্যাপ্তং মহাত্মনা ।
তং প্রসাদ্য তদা দেবং বদর্য্যাং কিল ভারত ! ॥ ১০ ॥
অর্থাৎ প্রিযতরত্বঞ্চ সর্বলোকেষু বৈ তদা ।
প্রাপ্তবানেব রাজেন্দ্র ! সুবর্ণাক্ষান্মহেশ্বরাৎ ॥ ১১ ॥
[হরিদাস সিদ্ধান্ত বাগীশের অনুবাদিত ‘মহাভারত/অনুশাসনপর্ব/অধ্যায় ১৩/১০-১১নং শ্লোক’]
অর্থ : মহাত্মা কৃষ্ণ পরমেশ্বর রুদ্রের প্রতি ভক্তির কারণে সমগ্র মহাবিশ্বে ব্যাপ্ত হয়ে আছেন। হে ভারত, বদ্রিকাশ্রমে পরমেশ্বর শিবকে তাঁর তপস্যার মাধ্যমে প্রসন্ন করে তিনি সমস্ত জগতের কাছে প্রিয় হওয়ার অবস্থা এবং সমস্ত জ্ঞান লাভ করেছেন।
মহাভারতে পরমেশ্বর শিব স্বয়ং বলেছেন -
সত্যশৌচার্জব ত্যাগৈস্তপসা নিয়মেন চ ।
ক্ষান্ত্যা ভক্ত্যা চ ধৃত্যা চ বুদ্ধ্যা চ বচসা তথা ॥
যথাবদহমারাদ্ধঃ কৃষ্ণেনাক্লিষ্টকর্মণা ।
তস্মাদিষ্টতমঃ কৃষ্ণাদ্ অন্যো মম ন বিদ্যতে ॥
(মহাভারত ১০/৭/৬০-৬১)
অর্থ : "সত্য, শৌচ, সরলতা, ত্যাগ, তপস্যা, নিয়ম, ক্ষমা, ভক্তি, ধৈর্য, বুদ্ধি এবং বাক্যের দ্বারা শ্রীকৃষ্ণ আমাকে যথাযথভাবে আরাধনা করেছেন। তাই কৃষ্ণের চেয়ে প্রিয় আমার আর কেউ নেই।"
👉 এবার ধাপে ধাপে প্রত্যেকটা পুরুষসুক্ত মন্ত্রের ব্যাখ্যা করা যাক—
——————————————————————————————————————————————————————
🔘 পুরুষ সূক্ত ১—
সহস্রশীর্ষা পুরুষঃ সহস্রাক্ষঃ সহস্রপাৎ ।
স ভূমিং বিশ্বতো বৃত্বাত্যতিষ্ঠদ্ দশাঙ্গুলম্ ॥
সহস্র - হাজার হাজার (অগণিত অর্থে)। শীর্ষা - মস্তকবিশিষ্ট। পুরুষঃ - সেই মহান পুরুষ। সহস্র - হাজার হাজার। অক্ষ - চক্ষুবিশিষ্ট তিনি। সহস্রপাৎ - এবং সহস্র চরণবিশিষ্ট। স - তিনি। বৃত্বা - আবৃত করে/প্রকাশিত হয়ে। ভূমিং - বিশ্বকে। অত্যতিষ্ঠৎ - তিনি ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন। দশাঙ্গুলম্ - দশ আঙুলের পরিমাপের অতীত (অনন্ত)।
অর্থ— পুরুষের সহস্র মস্তক, সহস্র চক্ষু এবং সহস্র চরণ। তিনি বিশ্বকে সর্বত্র পরিবেষ্টন করে দশ অঙ্গুলি পরিমিত স্থান অতিক্রম করে অবস্থান করছেন।
👉 ব্যাখ্যা— বেদপুরুষ শিবকে 'সহস্র' মস্তক, 'সহস্র' চক্ষু ইত্যাদি সম্পন্ন বলা হয়েছে। এখানে সহস্র মানে কেবল ১০০০ নয়। সহস্র মানে প্রায় অনন্ত, কিন্তু প্রযুক্তিগতভাবে আমরা 'অনন্ত' শব্দটি ব্যবহার করতে পারি না কারণ সৃষ্টির প্রাণীর সংখ্যা অসীম নয়। একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা অবশ্যই আছে। কিন্তু মানুষের ভাষা সেই সংখ্যাটি প্রকাশ করতেও যথেষ্ট নয়। কোনো এক 'রহস্যময়' কারণে, ঋষিরা 'শত' এবং 'সহস্র' শব্দগুলো কেবল সংখ্যার জন্যই নয়, বরং 'অগণিত' বোঝাতেও ব্যবহার করেছেন। শাস্ত্র বলে যে ঈশ্বরের অগণিত নাম আছে এবং সব নামই তাঁর নাম। তবুও আমরা ঈশ্বরকে উপাসনা করার সময় 'অষ্টোত্তর শতনাম' বা 'সহস্রনাম' ব্যবহার করি। 'শত' এবং 'সহস্র' শব্দগুলো একে ১০০ বা ১০০০-এ সীমাবদ্ধ করার জন্য নয়, বরং 'পূর্ণতা' বা সমগ্রতা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
এই মন্ত্রটি সমস্ত জীবের একত্ব ব্যাখ্যা করে। যদিও বাহ্যিক জগৎ অনেক জীবসত্তা নিয়ে গঠিত বলে মনে হয়, কিন্তু সমস্ত সত্তার অন্তর্নিহিত মূলনীতি (অর্থাৎ পরমেশ্বর রুদ্র) কেবল একজনই। সমস্ত জীবে আত্মা বা পুরুষ এক। সমস্ত জীবের সকল হাত, সকল পা, সকল মাথা হলো সেই এক পুরুষেরই হাত/পা/মাথা।
“যদেজতি পততি যচ্চ তিষ্ঠতি প্রাণদপ্রাণন্নমিষচ্চ যদ্ভুবৎ। তদ্ দাধার পৃথিবীং বিশ্বরূপং তৎ সংভূয় ভবত্যেকমেব” ।।
(অথর্ববেদ ১০/৮/১১)
অথর্ববেদের স্কম্ভ সূক্ত বলে- "যা গতিশীল, যা উড়ন্ত, বা যা স্থির, যা শ্বাস নেয় বা শ্বাস নেয় না, যা চোখ বন্ধ করে, সেই বিশ্বরূপ সত্তা পৃথিবীকে ধারণ করে আছে এবং তা মূলত এক।"
যজুর্বেদের তৈত্তিরীয় আরণ্যক (১০/২৪/১) স্পষ্টভাবে বলে- পরমেশ্বর রুদ্রই হলেন 'বেদ পুরুষ' (পুরষো বৈ রুদ্রঃ)। ঋগ্বেদের কৌষীতকী ব্রাহ্মণ (৬/১/১৩) পরমেশ্বর রুদ্রকে "সহস্রাক্ষ সহস্রপাৎ" বলে অভিহিত করেছে। এবং কৃষ্ণ-যজুর্বেদ মৈত্রায়ণী সংহিতা সংহিতাতেও পরমেশ্বর শিবকে সহস্রাক্ষ পুরুষই বলেছে- “মহাদেবং সহস্রাক্ষং শিবমাবাহয়াম্যহম্” (মৈত্রায়ণী সংহিতা /২য় কাণ্ড/ ৯ম প্রপাঠক)।।
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদেও একই কথা নিশ্চিত করা হয়েছে-
“বিশ্বতশ্চক্ষুরুত বিশ্বতোমুখো বিশ্বতোবাহুরুত বিশ্বতস্পাৎ। সং বাহুভ্যাং ধমতি সম্পতত্রৈর্দ্যাবাভূমী জনয়ন্ দেব একঃ” ॥
(শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ ৩/৩)
"তাঁর (শিবের) চক্ষু সর্বত্র, তাঁর মুখ সর্বত্র, তাঁর বাহু সর্বত্র, সর্বত্র তাঁর চরণ। তিনি (শিবই) সেই এক দেব (দেব একঃ) যিনি স্বর্গ ও মর্ত্য সৃষ্টি করে তাদের অদ্বৈত প্রকাশক হিসেবে বিদ্যমান।"
এবং শ্রুতিতে আরও বলা হয়েছে—
“নমো অস্তু নীলগ্রীবায় সহস্রাক্ষায় মীঢুষে” ॥ অর্থাৎ- নীলকণ্ঠ, সহস্র চক্ষুবিশিষ্ট এবং ফলদাতা সেই রুদ্রকে নমস্কার।। “অবতন্ব ধনুস্তব সহস্রাক্ষ শতেষুধে” ॥ অর্থাৎ- হে সহস্র চক্ষুবিশিষ্ট এবং শত তূণীরধারী, আপনি আপনার ধনুর জ্যা শিথিল করুন।। [যজুর্বেদ/তৈত্তিরীয় সংহিতা/৪র্থ খণ্ড/৫ম প্রপাঠক/১ম অনুবাক]
“নমঃ সহস্রাক্ষায় চ শতধন্বনে চ” - নমস্কার সেই সহস্র চক্ষুবিশিষ্টকে, এবং নমস্কার সেই শত ধনুর অধিকারীকে। [যজুর্বেদ/ তৈত্তিরীয় সংহিতা/৪র্থ খণ্ড/৫ম প্রপাঠক/ ৫ম অনুবাক]
সুতরাং- এর থেকে বোঝা যায় সেই সহস্রশীর্ষা পুরুষ পরমেশ্বর শিবই।
——————————————————————————————————————————————————————
🔘 পুরুষসুক্ত ২—
পুরুষ এবেদং সর্বং যদ্ ভূতং যচ্চ ভব্যম্ ।
উতামৃতত্বস্যেশানো যদন্নেনাতিরোহতি ॥
পুরুষ - পুরুষ। এব - ই / একমাত্র। ইদং সর্বং - এই যা কিছু আছে। যদ্ ভূতং - যা অতীতে ছিল। যচ্চ ভব্যম্ - এবং যা ভবিষ্যতে হবে। উত - অধিকন্তু। অমৃতত্বস্য - অমরত্বেরও। ঈশান - তিনি একমাত্র প্রভু (ঈশ্বর)। যদ্ - যা কিছু। অন্নেন - অন্নের দ্বারা। অতিরোহতি - নিজেকে প্রকাশ করে (বৃদ্ধি পায়), তাও সেই পুরুষই।
অর্থ— যা কিছু অতীতে ছিল এবং যা কিছু ভবিষ্যতে হবে এই সমস্তই পুরুষ। তিনি অমরত্বের অধিপতি এবং যেহেতু তিনি অন্নের দ্বারা পরিপুষ্ট জগতের উর্ধ্বে অবস্থান করেন (অথবা অন্নের মাধ্যমে যা বৃদ্ধি পায় তারও প্রভু)।
👉 ব্যাখ্যা— পরমেশ্বর রুদ্রই সমগ্র সৃষ্টি। কালচক্রে যা আছে, যা ছিল এবং যা হবে, সবই রুদ্রই। তবে তাঁর কি মৃত্যুর মতো কোনো শেষ আছে? না। তিনি নিজেই অমরত্বের অধিপতি, সেই শাশ্বত সত্তার (অমৃত) প্রভু যার বিনাশ নেই।
যজুর্বেদের তৈত্তিরীয় আরণ্যক (১০/২৪/১) বলে- "সর্বে বৈ রুদ্রস্তস্মৈ রুদ্রায় নমো অস্তু" অর্থাৎ- এই সব কিছু সত্যই রুদ্র। সেই রুদ্রকে আমরা প্রণাম করি। ঐ একই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- "বিশ্বং ভূতং ভুবনং চিত্ৰং বহুধা জাতং জায়মানং জায়ত সর্বেহ্যেষ রুদ্রস্তস্মৈ রুদ্রায় নমো অস্তুু" অর্থাৎ- সমগ্র মহাবিশ্ব, সৃষ্ট সকল জীব এবং অতীতে ও বর্তমানে এই জগতের রূপে যা কিছু বিচিত্রভাবে ও প্রচুর পরিমাণে সৃষ্টি হয়েছে, তার সবই এই রুদ্র। সেই রুদ্রকে জানাই নমস্কার।
আমরা জানি যে রুদ্রকে 'ঈশান' (প্রভু) বলা হয়। পরমেশ্বর রুদ্র সকল জীবের অধিপতি। তিনি সমগ্র সৃষ্টির একমাত্র ঈশ্বর। ঋগ্বেদ (২/৩৩/৯) স্পষ্টভাবে রুদ্রকে “ঈশানাদস্য ভুবনস্য” (অর্থাৎ- এই ভুবনের ঈশ্বর) হিসেবে বর্ণিত করেছে। ঋগ্বেদ (৬/৪৯/১০) বলে যে রুদ্র হলেন “ভুবনস্য পিতরং” অর্থাৎ- সমগ্র মহাবিশ্বের পিতা। যজুর্বেদের শ্রী রুদ্রম (৪/৫/২) বলে- "জগতাম পতয়ে নমো" অর্থাৎ- সমগ্র জগতের প্রতিপালক বা প্রভু রুদ্রকে নমস্কার। তৈত্তিরীয় আরণ্যক (১০/৪৭) আরও বলে- “ঈশানঃ সর্ববিদ্যানামীশ্বরঃ সর্বভূতানাং… "যিনি সকল বিদ্যার শাসক (ঈশান), সকল সৃষ্ট জীবের নিয়ন্ত্রক (ঈশ্বর), বেদের রক্ষক এবং হিরণ্যগর্ভের একমাত্র অধিপতি, সেই পরমাত্মা সদাশিব আমার প্রতি প্রসন্ন হোন। তিনিই সদাশিব এবং প্রণব (ওঁ) দ্বারা নির্দেশিত।"
তদুপরি, শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ স্পষ্টভাবে রুদ্রকে 'পুরুষ' হিসেবে বর্ণনা করে এবং তাঁর ঈশ্বরত্ব সম্পর্কে বলে-
“একো হি রুদ্ৰো ন দ্বিতীয়ায় তস্থুর্য ইমাংল্লোকান্ ঈশত ঈশনীভিঃ। প্রত্যঙ্ জনাংস্তিষ্ঠতি সঞ্চুকোচান্তকালে সংসৃজ্য বিশ্বা ভুবনানি গোপাঃ” ॥ অর্থাৎ- "রুদ্র এক এবং অদ্বিতীয় পরমেশ্বর, যিনি তাঁর শক্তিসমূহ (ঈশানী) দ্বারা এই সমস্ত লোক শাসন করেন।" (শ্বেতা ৩/২)
“মহান্ প্রভুর্বৈ পুরুষঃ সত্ত্বস্যৈষ প্রবর্তকঃ। সুনির্মলামিমাং প্রাপ্তিমীশানো জ্যোতিরব্যয়ঃ”॥ অর্থাৎ- "জ্যোতির্ময় ও অব্যয় ঈশানকে লাভ করলে পরম শান্তি পাওয়া যায়।" (শ্বেতা ৩/১২)
“সর্বস্য প্রভুমীশানং সর্বস্য শরণং সুহৃৎ” ॥ "তিনিই সর্বপ্রভু ঈশান এবং সকলের মহৎ আশ্রয়।" (শ্বেতা ৩/১৭)
“তমীশানং বরদং দেবমীড্যং নিচায্যেমাং শান্তিমত্যন্তমেতি” ।। অর্থাৎ- "সেই ঈশান বরদাতা ও স্তুতিযোগ্য দেব।" (শ্বেতা ৪/১১)
“তং ঈশ্বরাণাং পরং মহেশ্বরং”।। অর্থাৎ- "শিব ঈশ্বরদেরও পরম মহেশ্বর।" (শ্বেতা ৬/৭)
“স তন্মযো হ্যমৃত ঈশসংস্থো জ্ঞঃ সর্বগো ভুবনস্যাস্য গোপ্তা। য ঈশেঽস্য জগতো নিত্যমেব নান্যো হেতুর্বিদ্যত ঈশনায” ।। অর্থাৎ- "যিনি চিরকাল এই জগতের অধিপতি, তাঁর শাসন করার জন্য অন্য কোনো কারণের (কর্তার) প্রয়োজন নেই।" (শ্বেতা ৬/১৭)
রুদ্র অমরত্বেরও অধিপতি। এই কারণেই বৈদিক ঋষিরা পরমেশ্বর রুদ্রের কাছে প্রার্থনা করেছেন যেন তিনি অমরত্বকে আটকে না রাখেন এবং যন্ত্রণাহীনভাবে তাদের বন্ধন থেকে মুক্তি দেন। এই মন্ত্রটি 'মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র' হিসেবে উল্লেখিত- “ত্র্যম্বকং যজামহে সুগন্ধিং পুষ্টিবর্ধনম্... (ঋগ্বেদ ৭/৫৯/১২) অর্থাৎ- "আমরা সুগন্ধি ও পুষ্টিদানকারী ত্রিনয়নধারী শিবের উপাসনা করি। বৃন্ত থেকে শসা যেভাবে সহজেই বিচ্ছিন্ন হয়, তেমনি তিনি যেন আমাদের মৃত্যুপাশ থেকে মুক্ত করেন, কিন্তু অমরত্ব থেকে যেন বিচ্যুত না করেন।"
সৃষ্টি নিজের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে। বৃদ্ধির জন্য অন্নের (খাদ্যের) প্রয়োজন। অন্ন কী? অন্ন হলো অন্য কোনো জীবন। জীবনই জীবনের খাদ্য, সেটি উদ্ভিদ হোক বা প্রাণী। এই কারণেই আমরা বলি জগৎ অন্নের ওপর বাড়ে, জগৎ অন্নময় (অন্নময়ং জগৎ)। যা কিছু সৃষ্টির গভীরে লুকায়িত এবং যা কিছু প্রকাশিত হয়ে নিজেকে অন্যের খাদ্য হিসেবে উপস্থাপন করে, তার সবই সেই পুরুষ। তিনি অন্নরূপে সৃষ্টিকে ধারণ করেন।
পরমেশ্বর রুদ্রই অন্ন। তিনি নিজেই অন্ন গ্রহণ করেন। তিনি অন্নের অধিপতি। অর্থাৎ, ঈশ্বর রূপে তিনি অন্নদাতা, জীব রূপে তিনি অন্নভোক্তা, এবং প্রকৃতি রূপে তিনি নিজেই অন্ন। রুদ্র এই ত্রয়ী সত্তা। যারা মায়ার বশীভূত তারা কেবল বহুত্ব দেখে, কিন্তু তত্ত্বজ্ঞানীর কাছে এই সৃষ্টির সবকিছুই রুদ্র। যজুর্বেদের শ্রী রুদ্রম (৪/৫/২) রুদ্রকে অন্নের অধিপতি “অন্নানাং পতয়ে নমো” বলে সম্বোধন করেছে।
পরমেশ্বর রুদ্র নিজেই অন্ন গ্রহণ করেন এবং নিজেকে বিস্তার করেন। এ সম্পর্কে শতপথ ব্রাহ্মণ (৯/১/১/৬) বলে- "সহস্র মস্তক, চক্ষু ও তূণীরধারী এই রুদ্র ধনুকে বাণ যোজনা করে দাঁড়িয়ে অন্ন দাবি করছিলেন। দেবতারা তাঁকে দেখে ভীত হলেন। তাঁরা প্রজাপতিকে বললেন: 'আমরা এই সত্তাকে নিয়ে ভীত, পাছে তিনি আমাদের ধ্বংস করেন।' প্রজাপতি তাঁদের বললেন- 'তাঁর জন্য অন্ন সংগ্রহ করো এবং তা দিয়ে তাঁকে শান্ত করো।' তাঁরা তাঁর জন্য 'শতরুদ্রীয়' অন্ন সংগ্রহ করলেন।"
পরবর্তীতে প্রজাপতিসহ সকল দেবতারা 'শতরুদ্রীয়' স্তোত্র পাঠ করে রুদ্রকে শান্ত করেন। শতরুদ্রীয় স্তোত্রটি শুরু হয় এভাবে- "নমস্তে রুদ্র মন্যব..." (হে রুদ্র, আপনার ক্রোধকে নমস্কার...)।
——————————————————————————————————————————————————————
🔘 পুরুষসুক্ত ৩—
এতাবানাস্য মহিমাতো জ্যায়াংশ্চ পুরুষঃ ।
পাদোঽস্যবিশ্বা ভূতানি ত্রিপাদস্যামৃতং দিবি ॥
এতাবান্ — এই যে দৃশ্যমান জগত। অস্য — তাঁর (সেই পুরুষের)। মহিমা — মহিমা বা বিভূতি। অতঃ — এবং এর থেকে। পুরুষঃ চ — সেই পুরুষ। জ্যায়ান্ — আরও মহান বা শ্রেষ্ঠ। বিশ্বা ভূতানি — এই জগতের সমস্ত সৃষ্ট জীব ও বস্তু। পাদঃ — মাত্র এক চতুর্থাংশ (এক অংশ)। অস্য — তাঁর। ত্রিপাদ — বাকি তিন অংশ। দিবি — দ্যুলোকে বা স্বপ্রকাশিত পরম পদে। অমৃতম্ — যেখানে তারা শাশ্বত বা অমর।
অর্থ— এই দৃশ্যমান জগতের যা কিছু মহিমা দেখছ, তা সেই পুরুষেরই বিভূতি, কিন্তু সেই পুরুষ এই সমস্ত কিছু অপেক্ষা আরও মহান। এই জগতের সমস্ত প্রাণী ও সৃষ্টি তাঁর মাত্র এক অংশ, তাঁর বাকি তিন অংশ দিব্যধামে অমৃত বা শাশ্বত রূপে বিদ্যমান।
👉 ব্যাখ্যা— এই মন্ত্র দ্বারা জানা যায় যে, আমরা যা কিছু ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করি বা দেখি, তা পরমাত্মার এক অতি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। ঋগ্বেদে (১০/৯০/৩) এখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে- ব্রহ্মাণ্ডের বিশালতা তাঁর মহিমার একটি সামান্য প্রকাশ। পরমেশ্বর শিব বা সেই পরম পুরুষ কেবল এই বিশ্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নন, তিনি এই বিশ্বের অতীত বা বিশ্বোত্তর। উপনিষদ অনুসারে, এই সৃষ্টি হলো তাঁর 'অপরা' শক্তি বা প্রকাশ। কিন্তু তাঁর প্রকৃত স্বরূপ 'ত্রিপাদ' যা অমৃত এবং তা আমাদের এই মর্ত্য জগতের জন্ম-মৃত্যুর ঊর্ধ্বে। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় (১০/৪২) ঈশ্বর যেমন বলেছেন— "বিষ্টভ্যাহমিদং কৃৎস্নমেকাংশেন স্থিতো জগৎ" (আমি আমার এক অংশের দ্বারা এই সমগ্র জগতকে ধারণ করে আছি), এই মন্ত্রটির ভাবার্থও ঠিক তাই। অর্থাৎ, সমগ্র বিশ্ব রুদ্রেরই একটি প্রকাশিত রূপ “জগতাম্ পতয়ে নমো” (যজুর্বেদ ১৬/১৮) “যো বৈ রুদ্রঃ স ভগবান্যচ্চ বিশ্বং তস্মৈ বৈ নমোনমঃ” (অথর্বশির ২/২৫), কিন্তু রুদ্র নিজে বিশ্বের সীমানায় আবদ্ধ নন, তাই বেদ পরমেশ্বর রুদ্রকে “ঊর্ধ্বায় নমো”, পরমায় নমো” (তৈত্তিরীয় আরণ্যক ১০/১৬) বলেই স্তুতি করে।
——————————————————————————————————————————————————————
🔘 পুরুষসুক্ত ৪—
ত্রিপাদূর্ধ্ব উদৈৎ পুরুষঃ পাদোঽস্যেহাভবৎ পুনঃ ।
ততো বিষ্বঙ্ ব্যক্রামৎ সাশনানশনে অভি ॥
ত্রিপাদ - তিন অংশ। পুরুষঃ - পুরুষের। উদৈৎ - উর্ধ্বে উঠে গেছেন / ঊর্ধ্বে বিদ্যমান। উর্ধ্ব - সমস্ত সৃষ্টির উপরে। পাদঃ - মাত্র এক চতুর্থাংশ (এক অংশ)। অস্য - তাঁর। ইহ - এখানে (এই জগতে)। অভবৎ - প্রকাশিত বা ব্যক্ত হয়েছে। পুনঃ - বারবার। তত - সেই অংশ থেকে। সাশন - অনাশন - যারা খাদ্য গ্রহণ করে (সচেতন জীব) এবং যারা করে না (অচেতন বস্তু)। বিষ্বঙ্ - এই দৃশ্যমান জগতের সর্বত্র। অভিব্যক্রামৎ- বিস্তৃত বা নির্গত হয়েছে।
অর্থ— সেই পুরুষের তিন অংশ উর্ধ্বে (অব্যক্ত অবস্থায়) বিদ্যমান, তাঁর মাত্র এক অংশ এই জগতে বারবার প্রকাশিত হয়। সেই এক অংশ থেকেই জড় ও চেতন অর্থাৎ যা আহার করে এবং যা আহার করে না এই সমস্ত বিশ্ব চরাচর ব্যাপ্ত হয়ে প্রকাশিত হয়েছে।
👉 ব্যাখ্যা— পরমেশ্বর রুদ্রই বেদের 'ব্রহ্ম'। 'ব্রহ্ম' শব্দটির উৎপত্তি 'বৃহৎ' শব্দ থেকে, যার অর্থ বিশাল বা মহৎ। এ প্রসঙ্গে যজুর্বেদের শ্রী রুদ্রম (৪/৫/৫) বলে- "নমো বৃহতে চ" (সেই ভগবান রুদ্রকে নমস্কার যিনি 'বৃহৎ' অর্থাৎ ব্রহ্ম)। যজুর্বেদ (৫/৫/৯) আরও বলে- "অগ্নিতে যে রুদ্র, জলে যে রুদ্র, ওষধি বা উদ্ভিদে যে রুদ্র, যে রুদ্র সমস্ত প্রাণীর অন্তরে প্রবেশ করে আছেন সেই রুদ্রকে জানাই প্রণাম।"
অথর্ববেদের স্কম্ভ সূক্ত (যা শিবের অগ্নি লিঙ্গ রূপ বর্ণনা করে) বলে- "যেখানে স্কম্ভ (স্তম্ভ বা লিঙ্গ) আদি জগতকে আকার ও রূপ দিয়ে সৃষ্টি করেছিলেন, সেখানে তাঁরা স্কম্ভের সেই একটি অংশকেই আদি জগৎ হিসেবে চিনেছিলেন।" (অথর্ববেদ ১০/৭/২৬)
"সেই দেবতারা সত্যই মহান, যারা অস্তিত্বহীনতা (অব্যক্ত) থেকে জীবনে আবির্ভূত হয়েছেন। অধিকন্তু, ঋষিরা বলেন যে স্কম্ভের (লিঙ্গ) সেই এক অংশই হলো অব্যক্ত সত্তা।" (অথর্ববেদ ১০/৭/২৫)
"অতীতের কতটা গভীরে স্কম্ভ প্রবেশ করেছেন? তাঁর কতটা অংশ ভবিষ্যৎ পর্যন্ত পৌঁছেছে? সেই এক অংশ যা তিনি সহস্র স্থানে স্থাপন করেছেন, তার কতটা গভীরে স্কম্ভ প্রবেশ করেছিলেন?" (অথর্ববেদ ১০/৭/৯)
স্কম্ভ সূক্তের উপরের এই মন্ত্রগুলো থেকে এটি স্পষ্ট যে, পরমেশ্বর শিবের কেবল একটি অংশই এই সৃষ্টি এবং এর জীবসমূহ হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। যজুর্বেদের শ্রী রুদ্রম রুদ্রের সেই বিশ্বরূপকে নমস্কার জানিয়ে বলে- "বিশ্বরূপেভ্যশ্চ বো নমো" সেই ভগবান রুদ্রকে নমস্কার যিনি বিশ্বরূপ ধারণ করেন। (যজুর্বেদ ৪/৫/৪)। ঋগ্বেদ (২/৩৩/১০) সাথেও রুদ্রের “বিশ্বরূপম্” সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। সুতরাং, এটি পরিষ্কার যে সমগ্র বিশ্বই পরমেশ্বর রুদ্রের প্রকাশিত রূপ।
——————————————————————————————————————————————————————
🔘 পুরুষ সুক্ত ৫—
তস্মাদ্ বিরাড়জায়ত বিরাজো অধি পুরুষঃ ।
স জাতোঅত্যরিচ্যত পশ্চাদ্ ভূমিমথো পুরঃ ॥
তস্মাদ্ - সেই (আদি) পুরুষ থেকে। বিরাট - উজ্জ্বল বিশ্ব বা ব্রহ্মাণ্ড। অজায়ত - জন্ম নিল বা উৎপন্ন হলো। বিরাজো অধি - সেই বিরাটের আধারে। পুরুষঃ - (জীবাত্মারূপী) পুরুষ উৎপন্ন হলেন। স - তিনি। জাতঃ - জন্মগ্রহণ করে। অত্যরিচ্যত - অত্যন্ত বৃদ্ধি পেলেন বা পরিব্যাপ্ত হলেন। পশ্চাদ্ - সম্মুখে (বা পশ্চিম দিকে)। ভূমি - পৃথিবীর। অথো - এবং তারপর। পুরঃ - পশ্চাতে (বা পূর্ব দিকে)।
অর্থ— সেই আদি পুরুষ থেকে 'বিরাট' (ব্রহ্মাণ্ড) উৎপন্ন হলো। সেই বিরাটের আধারে পুনরায় পুরুষের (জীব রূপের) জন্ম হলো। তিনি জন্মগ্রহণ করেই পৃথিবীর সম্মুখে, পশ্চাতে এবং সর্বদিকে পরিব্যাপ্ত হলেন (অর্থাৎ তিনি বহু রূপে বিস্তৃত হলেন)।
👉 ব্যাখ্যা— এই শ্লোকটি বলছে যে পুরুষ থেকে 'বিরাট' জন্ম নিয়েছে। বিরাট হলো এই উজ্জ্বল জগত। উপনিষদ একেই 'হিরণ্যগর্ভ' বলে। বেদ একে 'প্রজাপতি' নামে অভিহিত করে। এই প্রজাপতিই সৃষ্টির জন্য দায়ী। তিনিই প্রথম জাত সত্তা। প্রজাপতি থেকে পুরুষ স্বয়ং (জীবরূপে) জন্ম গ্রহণ করলেন। জন্মের সাথে সাথেই তিনি পৃথিবীর সমস্ত দিকে ছড়িয়ে পড়লেন অর্থাৎ, তিনি বহুধা বিভক্ত হলেন এবং নতুন নতুন প্রজাতির বিবর্তন ঘটল।
অব্যক্ত পুরুষ ———> হিরণ্যগর্ভ (দৃশ্যমান বিশ্ব) ———> পুরুষ (সমস্ত জীব ও প্রাণী)।
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ বলে- “যো দেবানাং প্রভবশ্চোদ্ভবশ্চ বিশ্বাধিপো রুদ্রো মহর্ষিঃ। হিরণ্যগর্ভং জনয়ামাস পূর্বং স নো বুদ্ধ্যা শুভয়া সংযুনক্তু” ॥ "তিনি, সর্বজ্ঞ রুদ্র, যিনি দেবতাদের স্রষ্টা এবং তাদের ক্ষমতার দাতা, যিনি মহাবিশ্বের আধার, যিনি সৃষ্টির শুরুতে হিরণ্যগর্ভকে জন্ম দিয়েছিলেন, তিনি আমাদের নির্মল বুদ্ধি প্রদান করুন।।" (শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ ৩/৪)
“ততঃ পরং ব্রহ্ম পরং বৃহন্তং যথানিকায়ং সর্বভূতেষু গূঢ়ম্। বিশ্বস্যৈকং পরিবেষ্টিতারম্ ঈশং তং জ্ঞাত্বাঽমৃতা ভবন্তি" ।। অর্থাৎ- পরমেশ্বর রুদ্র বিরাট অপেক্ষা উচ্চতর এবং হিরণ্যগর্ভের অতীত। তিনি বিশাল এবং সমস্ত প্রাণীর দেহে প্রচ্ছন্ন আছেন। কেবল তাঁকে জানার মাধ্যমেই যিনি এককভাবে বিশ্ব চরাচর ব্যাপ্ত করে আছেন, মানুষ অমরত্ব লাভ করে।" (শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ ৩/৭)
"মানুষ হিরণ্যগর্ভকে পরম এবং অনির্বচনীয় বলে জানে, সৃষ্টির আদিতে, এই বিশ্বের মধ্যস্থলে, স্কম্ভ (স্তম্ভ/লিঙ্গ) সেই হিরণ্যগর্ভকে নিষিক্ত করেছিলেন (অর্থাৎ জন্ম দিয়েছিলেন)।" (অথর্ববেদ ১০/৭/২৮)
হিরণ্যগর্ভকে জন্ম দেওয়ার পর, অজন্মা রুদ্র হিরণ্যগর্ভের মাধ্যমেই নিজেকে প্রকাশ করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে রুদ্র অজন্মা; তিনি প্রজাপতির মাধ্যমেই আবির্ভূত হন। এই প্রসঙ্গে অথর্ববেদ বলে-
“প্রজাপতিশ্চরতি গর্ভে অন্তরদৃশ্যমানো বহুধা বি জায়তে। অর্ধেন বিশ্বং ভুবনং জজান যদস্যার্ধং কতমঃ স কেতুঃ” ।। (অথর্ববেদ ১০/৮/১৩)
"প্রজাপতি গর্ভের অভ্যন্তরে বিচরণ করেন, তিনি অদৃশ্য হয়েও বহু রূপে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তাঁর অর্ধাংশ দিয়ে সমস্ত সৃষ্টিকে জন্ম দিয়েছেন। তাঁর বাকি অর্ধাংশকে চেনার চিহ্ন বা সংকেত কী?"
”একচক্রং বর্তত একনেমি সহস্রাক্ষরং প্র পুরো নি পশ্চা। অর্ধেন বিশ্বং ভুবনং জজান যদস্যার্ধং ক্ব তদ্ বভূব” ।। (অথর্ববেদ ১০/৮/৭)
"ঊর্ধ্বে, পূর্বে এবং পশ্চিমে নিম্নভাগে অগণিত উপাদানে গঠিত সেই একচক্র ও একনেমি বিশিষ্ট রথচক্রটি ঘূর্ণায়মান। তাঁর অর্ধাংশ দিয়ে তিনি এই সমস্ত সৃষ্টিকে জন্ম দিয়েছেন, তাঁর বাকি অর্ধাংশ কোথায় অলক্ষ্যে রয়ে গেল?"
“উতৈষাং পিতোত বা পুত্র এষামুতৈষাং জ্যেষ্ঠ উত বা কনিষ্ঠঃ। একো হ দেবো মনসি প্রবিষ্টঃ প্রথমো জাতঃ স উ গর্ভে অন্তঃ” ।। (অথর্ববেদ ১০/৮/২৮)
"তিনিই এদের পিতা অথবা পুত্র, তিনিই এদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ অথবা কনিষ্ঠ। সেই এক অদ্বিতীয় দেব মনের অভ্যন্তরে প্রবিষ্ট হয়ে আছেন, তিনিই প্রথম জাত, আবার তিনিই গর্ভের অভ্যন্তরে (ভ্রূণরূপে) বিদ্যমান।"
ত্বং স্ত্রী ত্বং পুমানসি ত্বং কুমার উত বা কুমারী। ত্বং জীর্ণো দণ্ডেন বঞ্চসি ত্বং জাতো ভবসি বিশ্বতোমুখঃ।। (শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ ৪/৩ ও অথর্ববেদ ১০/৮/২৭)
"তুমিই নারী, তুমিই পুরুষ, তুমিই কুমার এবং তুমিই কুমারী। তুমিই বৃদ্ধরূপে দণ্ড হাতে টলমল করে চলো, তুমিই জন্মগ্রহণ করে বিশ্বতোমুখ (সর্বব্যাপী) রূপ ধারণ করো।"
একই বিষয় অথর্ববেদে পরমেশ্বর শিবের সন্ন্যাসী রূপ (ব্রাত্য) বর্ণনা করার সময় উল্লেখ করা হয়েছে-
”ব্রাত্য আসীদীয়মান এব স প্রজাপতিং সম্ ঐরয়ৎ।। স প্রজাপতিঃ সুবর্ণম্ আত্মন্নপশ্যৎ তৎ প্রাজনয়ৎ।। তদ্ একম্ অভবৎ তল্ ললামম্ অভবৎ তন্ মহদ্ অভবৎ তজ্ জ্যেষ্ঠম্ অভবৎ তদ্ ব্রহ্ম অভবৎ তৎ তপো 'ভবৎ তৎ সত্যম্ অভবৎ তেন প্রাজায়ত” ।। (অথর্ববেদ ১৫/১/১-৩)
"সেখানে ব্রাত্য (পরমেশ্বর শিবের তপস্বী রূপ) ছিলেন। তিনিই প্রজাপতিকে কর্মে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। প্রজাপতি নিজের মধ্যে হিরণ্য (সুবর্ণ) দর্শন করলেন এবং তাকে জন্ম দিলেন। তা অদ্বিতীয় হলো, তা বিশিষ্ট হলো, তা মহান হলো, তা জ্যেষ্ঠ হলো, তা ব্রহ্ম হলো, তা তপ হলো, তা সত্য হলো এবং তার মাধ্যমেই তিনি (ব্রাত্য) জন্মগ্রহণ করলেন।"
“সো 'বর্ধত স মহান্ অভবৎ স মহাদেবো 'ভবৎ।। স দেবানাম্ ঈশাং পর্যৈৎ স ঈশানো 'ভবৎ।। স একব্রাত্যো 'ভবৎ স ধনুর আদত্ত তদ্ এবেন্দ্রধনুঃ।। নীলম্ অস্যোদরং লোহিতং পৃষ্ঠম্।। নীলেনৈবাপ্রিয়ং ভ্রাতৃব্যং প্রোর্ণোতি লোহিতেনে দ্বিষন্তং বিধ্যতীতি ব্রহ্মবাদিনো বদন্তি” ।। (অথর্ববেদ ১৫/১/৪-৮)
"তিনি বর্ধিত হলেন, তিনি মহান হলেন, তিনি মহাদেব হলেন। তিনি দেবগণের আধিপত্য লাভ করলেন, তিনি ঈশান হলেন। তিনি একব্রাত্য হলেন। তিনি একটি ধনু ধারণ করলেন, যা ইন্দ্রধনু। তাঁর উদর নীল এবং পৃষ্ঠদেশ লোহিত (নীললোহিত)। নীল বর্ণ দিয়ে তিনি অপ্রিয় শত্রুকে আবৃত করেন এবং লোহিত বর্ণ দিয়ে বিদ্বেষী ব্যক্তিকে বিদ্ধ করেন, ব্রহ্মবাদীরা এমনটাই বলেন।"
অতএব, অথর্ববেদ এটি পরিষ্কার করে দেয় যে, প্রজাপতির আবির্ভাবের আগেও রুদ্র বিদ্যমান ছিলেন এবং রুদ্রই প্রজাপতিকে সৃষ্টি করেছিলেন ও তাঁকে কর্মে প্রবৃত্তি দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে, তিনি নিজেই প্রজাপতির মাধ্যমে নিজেকে প্রকট করেন এবং সমস্ত জীব ও দেবতার অন্তর্যামী হিসেবে সব দিকে পরিব্যাপ্ত হন।
——————————————————————————————————————————————————————
🔘 পুরুষসুক্ত ৬—
যৎ পুরুষেণ হবিষা দেবা যজ্ঞমতন্বত ।
বসন্তোঅস্যাসীদাজ্যং গ্রীষ্ম ইধ্মঃ শরদ্ ধবিঃ ॥
যৎ - যখন। যজ্ঞম্ - যজ্ঞ। দেবাঃ - দেবতারা। অতন্বত - সম্পাদন করেছিলেন। পুরুষেণ - পুরুষকে দিয়েই। হবিষা - হব্য বা উৎসর্গ হিসেবে। বসন্তঃ - বসন্ত ঋতু। অস্য - সেই যজ্ঞের। আসীৎ - হয়েছিল। আজ্যম্ - ঘি (ঘৃত)। গ্রীষ্মঃ - গ্রীষ্ম ঋতু হয়েছিল তার। ইধ্মঃ - ইন্ধন বা সমিধ (কাঠ)। শরদ্ - শরৎ ঋতু হয়েছিল তার। হবিঃ - প্রধান আহুতি বা বলি।
অর্থ— দেবতারা যখন পুরুষকে হব্য বা উৎসর্গ হিসেবে গ্রহণ করে (সৃষ্টিরূপ) যজ্ঞ সম্পাদন করেছিলেন, তখন বসন্ত ঋতু হয়েছিল সেই যজ্ঞের ঘি, গ্রীষ্ম হয়েছিল ইন্ধন বা কাঠ এবং শরৎ হয়েছিল প্রধান আহুতি।
👉 ব্যাখ্যা— এই শ্লোকটি দেখে অনেকে বিস্মিত হতে পারেন। মনে নানা সন্দেহ জাগতে পারে, এই দেবতারা কারা? তাঁরা কোথা থেকে এলেন? পুরুষের সাথে দেবতাদের সম্পর্ক কী? এই ঋতুগুলোই বা কী? সৃষ্টির আগেই বা ঘি, কাঠ ইত্যাদি কীভাবে এল? প্রথম যে বিষয়টি আমি বলতে চাই তা হলো- পুরুষ সূক্ত নিঃসন্দেহে একটি সৃষ্টিতত্ত্বের স্তোত্র। কিন্তু, এখানকার 'সৃষ্টি' আকাশ, বাতাস, আগুন, জল বা মাটির মতো জড় প্রকৃতির (প্রকৃতি) উপাদান সম্পর্কে নয়। পুরুষ সূক্তের সৃষ্টিতত্ত্ব মূলত 'জীবসত্তা' বা প্রাণ নিয়ে। এর অর্থ হলো- এই স্তোত্রে সৃষ্টির 'পুরুষ' দিকটি (চেতনা) উল্লেখ করা হয়েছে, 'প্রকৃতি' দিকটি নয়। দেবতারা (প্রাকৃতিক শক্তি) প্রকৃতির অংশ, কিন্তু তাঁরা তখনই সক্রিয় হন যখন পুরুষ (শিব/আত্মা) তাঁদের চালিত করেন। যখন পুরুষ প্রকৃতির সাথে যুক্ত হন, তখনই দেবতারা তাঁদের নিজ নিজ কাজ সম্পন্ন করেন। তার আগে পর্যন্ত দেবতারা প্রাণহীন সত্তার মতো।
উদাহরণস্বরূপ- প্রকৃতিতে আগুন থাকতে পারে, কিন্তু কোনো অনুভবকারী (পুরুষ) ছাড়া 'উষ্ণতা' বলে কি কিছু থাকতে পারে? আমরা কীভাবে বলব যে আগুন গরম না ঠান্ডা? সত্য বলতে, আগুন নিজে গরমও নয়, ঠান্ডাও নয়। কেবল পুরুষ (শিব/আত্মা) আছেন বলেই আমরা আগুনের মধ্যে 'উষ্ণতা' বৈশিষ্ট্যটি শনাক্ত করতে পারি। কিন্তু, পুরুষ নিজে এই অভিজ্ঞতার দ্বারা প্রভাবিত হন না। পুরুষের প্রতিবিম্বিত চেতনা, যা মনকে পরিচালনা করে, সেই হলো প্রকৃত অনুভবকারী। শুদ্ধ সত্তা (পুরুষ) সবসময় নির্লিপ্ত এবং কলঙ্কমুক্ত।
দেবতারা হলেন পুরুষের (আত্মার) শরীর। চোখ, কান, মন এবং অন্যান্য ইন্দ্রিয় হলো দেবতা। একইভাবে পৃথিবী, জল, আগুন এবং অন্যান্য উপাদানও দেবতা। তাঁরা কার্য করেন কারণ তাঁরা পুরুষের দ্বারা চালিত হন।
অথর্ববেদ (১০/৭/১৩) বলে- “যস্য ত্রয়স্ত্রিংশদ্ দেবা অঙ্গে সর্বে সমাহিতাঃ। স্কম্ভং তং ব্রূহি কতমঃ স্বিদ্ এব সঃ”।। "আমাকে বলো, সেই স্কম্ভ কে, যাঁর দেহের অঙ্গে তেত্রিশ জন দেবতা সমাহিত আছেন?" শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ (৪/১২) বলে- “যো দেবানাং প্রভবশ্চোদ্ভবশ্চ বিশ্বাধিপো রুদ্রো মহর্ষিঃ। হিরণ্যগর্ভং পশ্যত জাযমানং
স নো বুদ্ধ্যা শুভযা সংযুনক্তু” ।। "তিনিই দেবতাদের স্রষ্টা এবং ক্ষমতার দাতা, মহাবিশ্বের আধার, সর্বজ্ঞ রুদ্র, যিনি শুরুতে হিরণ্যগর্ভকে জন্ম দিয়েছিলেন।"
এখন, দেবতারা সৃষ্টি যজ্ঞে পুরুষকেই হব্য হিসেবে ব্যবহার করলেন। তাঁরা 'পুরুষ'কে অন্য কারোর কাছে নয়, বরং 'পুরুষ'র কাছেই হব্য হিসেবে উৎসর্গ করলেন। অর্থাৎ, ইন্দ্রিয়গুলো (দেবতা) কেবল পুরুষের কারণেই কাজ করে না, বরং সেই কাজগুলো কেবল পুরুষের দ্বারাই অনুভূত হয়। সুতরাং পুরুষ কেবল কাজের প্রেরণাই দেন না, কাজের ফল আস্বাদনের প্রেরণাও দেন। যজুর্বেদের শ্রী রুদ্রম বলে-"দেবানা হৃদয়েভ্যো নমঃ" অর্থাৎ- সেই রুদ্রকে নমস্কার যিনি সকল প্রাণীর হৃদয়ে স্পন্দিত হন।
শতপথ ব্রাহ্মণ (৯/১/১/৬) বলে- "প্রজাপতি যখন দুর্বল হয়ে পড়লেন, দেবতারা তাঁকে ছেড়ে চলে গেলেন। কেবল এক দেবতা, 'মন্যু' (ক্রোধ/তেজ), তাঁকে ছেড়ে যাননি বরং তাঁর অভ্যন্তরেই ছিলেন। প্রজাপতি রোদন করলেন। তাঁর চোখ থেকে যে অশ্রু পড়ল তা মন্যুর ওপর গিয়ে পড়ল। তিনি শত মস্তক, শত চক্ষু ও শত তূণীরধারী রুদ্র হলেন। তারপর তাঁর শরীর থেকে অগণিত হাজার হাজার অশ্রুবিন্দু যা ঝরল, তা এই বিশ্বে প্রবেশ করল। যেহেতু তাঁরা রোদনের ফলে উৎপন্ন হয়েছিলেন, তাই তাঁদের 'রুদ্র' বলা হয়।" এই রুদ্র যখন খাদ্য দাবি করে দেবতাদের ভীত করলেন, তখন প্রজাপতির নির্দেশে দেবতারা 'শতরুদ্রীয়' নামক অন্ন সংগ্রহ করে তাঁকে শান্ত করলেন। শতরুদ্রীয় শুরু হয়েছে এই বলে- "নমস্তে রুদ্র মন্যব..." (হে রুদ্র, আপনার ক্রোধকে নমস্কার)।
ঘি এবং কাঠ এখানে প্রতীকী। ঋতুগুলোকে সৃষ্টি যজ্ঞের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে বসন্ত বা শরতের মতো ঋতুগুলোকে 'শৃঙ্খলার' বা 'কালের' (সময়) সুশৃঙ্খল প্রবাহ হিসেবে বুঝতে হবে। অর্থাৎ, জীবজগৎ রাতারাতি সৃষ্টি হয়নি। সেখানে একটি সুশৃঙ্খল নিয়ম ছিল। প্রজাতির বিবর্তন ঘটেছে। বসন্তে যেমন গাছপালা সবুজে ভরে ওঠে, আবার শরতে পাতা ঝরে শুকনো হয়ে যায়, তেমনি সৃষ্টিতেও অনেক নতুন প্রজাতির উদ্ভব হয় এবং অনেক পুরনো প্রজাতি বিলুপ্ত হয়। কিন্তু ঋতু পরিবর্তনের মতো এই বিবর্তনের মধ্যেও একটি নিখুঁত শৃঙ্খলা বা অর্ডার রয়েছে। পুরুষের উপস্থিতির কারণেই প্রকৃতিতে এই শৃঙ্খলা বজায় থাকে। সৃষ্টি বা বিবর্তন কোনো বিশৃঙ্খল বা আকস্মিক ঘটনা নয়।
——————————————————————————————————————————————————————
🔘 পুরুষসুক্ত ৭—
তং যজ্ঞং বহির্ষি প্রৌক্ষণ্ পুরুষং জাতমগ্রতঃ ।
তেন দেবা অযজন্ত সাধ্যা ঋষয়শ্চ যে ॥
তং - সেই। পুরুষং - পুরুষকে। যজ্ঞং - যজ্ঞের (পশু হিসেবে)। জাতম্ - যিনি আবির্ভূত বা উৎপন্ন হয়েছিলেন। অগ্রতঃ - সৃষ্টির আদিতে। সাধ্যা - সাধ্য নামক দেবগণ (সিদ্ধগণ)। প্রৌক্ষণ্ - পবিত্র জলের দ্বারা প্রোক্ষণ বা অভিষেক করেছিলেন। বহির্ষি - কুশশয্যা বা যজ্ঞের ঘাসের উপর। তেন - তাঁর (সেই পুরুষের) দ্বারা। দেবা ঋষয়শ্চ - দেবতারা এবং ঋষিগণ। যে - যাঁরা ছিলেন। অযজন্ত - যজ্ঞ সম্পাদন করেছিলেন।
অর্থ— সৃষ্টির আদিতে জাত সেই পুরুষকে (যজ্ঞের উৎসর্গ হিসেবে) তাঁরা যজ্ঞতৃণের (কুশ) উপর পবিত্র জলের দ্বারা সিক্ত করলেন। সেই পুরুষের মাধ্যমে দেবতারা, সাধ্যগণ এবং ঋষিগণ যজ্ঞ সম্পাদন করেছিলেন।
👉 ব্যাখ্যা— এখানে পুরুষকে স্বয়ং যজ্ঞের পশুরূপে (বলির পশু) উৎসর্গ করা হয়েছে। যজ্ঞের নিয়ম অনুযায়ী, এই পশুকে পবিত্র জলের দ্বারা যজ্ঞের কুশশয্যার ওপর অভিষেক করে পবিত্র করতে হয়। 'বহির্ষি' শব্দটি এই ঘাস বা তৃণশয্যাকে নির্দেশ করে। শতপথ ব্রাহ্মণের বিধান অনুযায়ী, এখানে 'ঋষি' বলতে 'প্রাণ' বা জীবনীশক্তিকে বোঝানো হয়েছে।
"সৃষ্টির আদিতে এই ঋষিগণই ছিলেন 'অসৎ' বা অব্যক্ত। তাঁরা বলেন, এই ঋষিগণ কারা? প্রাণসমূহ-ই আসলে সেই ঋষি।" (শতপথ ব্রাহ্মণ ৬/১/১/১)
'সাধ্য'গণও এক প্রকারের দেবতা, তবে তাঁরা তাঁদের কর্ম ও ত্যাগের মাধ্যমে এই দেবত্ব বা উচ্চপদ অর্জন করেছেন। তাঁদের 'যজ্ঞীয় দেবতা' বলা যেতে পারে।
——————————————————————————————————————————————————————
🔘 পুরুষসুক্ত ৮—
তস্মাদ্ যজ্ঞাৎ সর্বহুতঃ সম্ভৃতং পৃষদাজ্যম্ ।
পশূংস্তাংশ্চক্রে বায়ব্যানারণ্যান্ গ্রাম্যাশ্চ যে ॥
তস্মাৎ - সেই। যজ্ঞাৎ - যজ্ঞ থেকে। সর্বহুতঃ - 'সর্বহুত' নামক (যেখানে সবকিছু উৎসর্গ করা হয়েছে)। সম্ভৃতং - সংগৃহীত বা উৎপন্ন হয়েছিল। পৃষদাজ্যম্ - দধি মিশ্রিত ঘৃত (পৃষদাজ্য)। তা থেকে। চক্রে - সৃষ্টি করা হলো। পশূন্ - পশুদের। বায়ব্যান্ - বায়ুজীবী বা আকাশচারী (পাখি ইত্যাদি)। আরণ্যান্ - বন্য পশুদের। গ্রাম্যাশ্চ - এবং গ্রাম্য বা গৃহপালিত পশুদের।
অর্থ— সেই সর্বহুত নামক মহাযজ্ঞ থেকে দধি মিশ্রিত ঘৃত (পৃষদাজ্য) উৎপন্ন হলো। তিনি (সেই পুরুষ) আকাশচারী প্রাণী এবং আরণ্য ও গ্রাম্য উভয় প্রকার পশুদের সৃষ্টি করলেন।
👉 ব্যাখ্যা— দেবতাদের দ্বারা সম্পাদিত সেই যজ্ঞের ফলে এখন বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভব ঘটছে। শুরুতে কেবল এককোষী জীব ছিল। দেবতাদের এই যজ্ঞই বৈচিত্র্যের বিস্তার ঘটাহ। শীঘ্রই নতুন নতুন প্রজাতির অস্তিত্ব তৈরি হলো। এভাবে পাখি, পশু, মানুষ কিংবা বন্যপ্রাণী সবকিছুর সৃষ্টিই দেবতাদের করা সেই ত্যাগের ফল। দেবতাদের সংখ্যা ৩৩ জন- ৮ বসু, ১১ রুদ্র, ১২ আদিত্য, ইন্দ্র এবং প্রজাপতি, তাঁরাই সৃষ্টির জন্য দায়ী। আর পুরুষ হলেন প্রেরণা দাতা এবং দেবতা সহ সকল প্রাণীর অন্তর্যামী।
এখানে 'পৃষদাজ্য' বা চর্বিযুক্ত ঘৃত বলতে সেই সমস্ত জৈব-রাসায়নিক উপাদানকে বুঝতে হবে যা যজ্ঞের ফলে উৎপন্ন হয়। এই উপাদানগুলোই (যা যজ্ঞের ফল) বিভিন্ন প্রজাতির উৎপত্তির কারণ। কিন্তু এই উপাদানগুলো (প্রকৃতি), যা দেহ গঠন এবং গুণ নির্ধারণের জন্য দায়ী, সেগুলো অন্তর্যামী পুরুষকে স্পর্শ করতে পারে না, কারণ তিনি নির্গুণ। পরমেশ্বর রুদ্রই সেই পুরুষ, যিনি জীবনের সকল রূপের অন্তর্যামী। তিনি দেবতাদেরও অন্তর্যামী। অগ্নি, জল, আকাশ সবকিছুই কেবল পরমেশ্বর রুদ্র দ্বারা পরিব্যাপ্ত।
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ (২/১৬) বলে- “এষো হ দেবঃ প্রদিশোঽনু সর্বাঃ পূর্বো হ জাতঃ স উ গর্ভে অন্তঃ। স এব জাতঃ স জনিষ্যমাণঃ প্রত্যঙ্ জনাস্তিষ্ঠতি সর্বতোমুখঃ”।। "সেই পরমেশ্বরই সমস্ত দিক পরিব্যাপ্ত করে আছেন, তিনিই প্রথম প্রকাশিত হয়েছিলেন এবং তিনিই বিশ্বের গর্ভে অবস্থান করেন। তিনিই বর্তমানে শিশু রূপে জন্মান এবং ভবিষ্যতে তিনিই জন্মাবেন, তিনি সর্বতোমুখ হয়ে সকল মানুষের অন্তরে অবস্থান করছেন।"
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ (৩/১১) বলে- “সর্বাননশিরোগ্রীবঃ সর্বভূতগুহাশয়ঃ। সর্বব্যাপী স ভগবাংস্তস্মাৎ সর্বগতঃ শিবঃ” ।। "সকল মুখই তাঁর মুখ, সকল মস্তকই তাঁর মস্তক, সকল গ্রীবাই তাঁর গ্রীবা। তিনি সকল প্রাণীর হৃদয়ে (গুহায়) বাস করেন। তিনি সর্বব্যাপী ভগবান, তাই তিনি সর্বগত শিব।"
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ (২/১৭) বলে- “যো দেবো অগ্নৌ যোঽপ্সু যো বিশ্বং ভুবনমাবিবেশ। য ওষধীষু যো বনস্পতিষু তস্মৈ দেবায নমো নমঃ”।। "সেই স্বয়ংপ্রকাশিত ঈশ্বর (শিব), যিনি অগ্নিতে আছেন, যিনি জলে আছেন, যিনি সমগ্র বিশ্বে প্রবেশ করেছেন, যিনি ওষধি এবং বনস্পতিতে (গাছপালায়) আছেন সেই ঈশ্বরকে জানাই বারবার নমস্কার।" আবার একই- সমর্থন অথর্ববেদেও বিদ্যমান- ‘যো অগ্নৌ রুদ্রো যো অন্বন্তর্য ওষধীবীরুধ আবিবেশ। য ইমা বিশ্বা ভুবনানি চালূপে তস্মৈ রুদ্রায় নমো অস্ত্রগ্নয়ে” ॥ [অথর্ব্ববেদ/৭ম কাণ্ড/৮ম অনুবাক/৬ষ্ট সুক্ত/১ নং মন্ত্র]
——————————————————————————————————————————————————————
🔘 পুরুষসুক্ত ৯—
তস্মাদ্ যজ্ঞাৎ সর্বহুত ঋচঃ সামানি জজ্ঞিরে ।
ছন্দাংসি জজ্ঞিরে তস্মাদ্ যজুস্তস্মাদজায়ত ॥
তস্মাদ্ যজ্ঞাৎ সর্বহুত - সেই 'সর্বহুত' যজ্ঞ থেকে। ঋচঃ - ঋগ্বেদের মন্ত্রসমূহ এবং।সামানি - সামবেদের মন্ত্রসমূহ। জজ্ঞিরে - উৎপন্ন হয়েছিল। তস্মাদ্ - তা থেকে। ছন্দাংসি - ছন্দসমূহও। জজ্ঞিরে - আবির্ভূত হয়েছিল। তস্মাদ্ - তা থেকে। যজুঃ - যজুর্বেদের মন্ত্রসমূহ। অজায়ত - জন্ম নিয়েছিল।
অর্থ— সেই সর্বহুত মহাযজ্ঞ থেকে ঋগ্বেদ ও সামবেদের মন্ত্রসমূহ উৎপন্ন হয়েছিল, তা থেকে গায়ত্রীর মতো ছন্দসমূহ এবং যজুর্বেদ জন্ম লাভ করেছিল।
👉 ব্যাখ্যা— সায়নাচার্য 'সর্বহুত' শব্দের এই ব্যুৎপত্তি দিয়েছেন- "সর্বাত্মক পুরুষো যস্মিন যজ্ঞে হুয়তে সো অয়ম সর্বহুতঃ" অর্থাৎ- যে যজ্ঞে সকলের অন্তরাত্মা পুরুষকে হব্য হিসেবে উৎসর্গ করা হয়, সেই যজ্ঞই হলো 'সর্বহুত'। বেদসমূহের মধ্যে ঋগ্বেদ মূলত স্তোত্র পাঠের সাথে সম্পর্কিত, যেখানে অগ্নি, ইন্দ্র, আদিত্য এবং মরুদ্গণের মতো প্রাকৃতিক শক্তি ও দেবতাদের প্রশংসা করা হয়। সামবেদের গানগুলো হলো সুর বা সংগীতের ভিত্তি। যজুর্বেদ হলো অধ্বর্যু পুরোহিতদের বেদ, যা যজ্ঞের পদ্ধতি এবং সূত্রসমূহ নিয়ে গঠিত। এগুলোর সাথে সাথেই আবির্ভূত হয় 'ছন্দ', যা স্তোত্র পাঠের মাত্রা বা তাল নির্ধারণ করে।
অথর্ববেদের 'কাল সূক্তে', যা পরমেশ্বর শিবের মহাকাল রূপের প্রতি একটি স্তোত্র, সেখানে বলা হয়েছে- “কালো হ ভূতং ভব্যং চ পুত্রো অজনয়ৎ পুরা। কালাদৃচঃ সমভবন্ যজুঃ কালাদজায়ত”।। "কাল থেকেই যা অতীত এবং যা ভবিষ্যৎ, সবই উৎপন্ন হয়েছে। কাল থেকেই ঋকসমূহের উৎপত্তি এবং কাল থেকেই যজুর্বেদের জন্ম।" (অথর্ববেদ ১৯/৫৪/৩) পরমেশ্বর শিবই শ্রুতি শাস্ত্রে কাল বলেই বর্ণিত- “যো বৈ রুদ্রঃ স ভগবান্যশ্চ কালস্তস্মৈ বৈ নমোনমঃ” (অথর্বশির উপনিষদ ২/২০) “ওঁ বামদেবায় নমো জ্যেষ্ঠায় নমঃ শ্রেষ্ঠায় নমো রুদ্রায় নমঃ কালায় নমঃ কলবিকরনায় নমো বলবিকরনায় নমো বলায় নমো বলপ্রমথনায় নমঃ সর্বভূতদমনায় নমো মনোন্মায় নমঃ” (তৈত্তিরীয় আরণ্যক ১০/৪৩)
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ (৪/৯) বলে- “ছন্দাংসি যজ্ঞাঃ ক্রতবো ব্রতানি ভূতং ভব্যং যচ্চ বেদা বদন্তি। অস্মান্ মাযী সৃজতে বিশ্বমেতত্তস্মিংশ্চান্যো মাযযা সন্নিরুদ্ধঃ”।। "পবিত্র মন্ত্রসমূহ, যজ্ঞ, ক্রতু (সংকল্পিত কর্ম), ব্রত, অতীত, ভবিষ্যৎ এবং বেদ যা কিছু উল্লেখ করে, সবই সেই অবিনাশী ব্রহ্ম থেকে উৎপন্ন হয়েছে। ব্রহ্ম তাঁর মায়ার শক্তির মাধ্যমে এই মহাবিশ্ব প্রক্ষেপ করেন। পুনরায়, সেই মহাবিশ্বে ব্রহ্ম মায়ার প্রভাবে জীবরূপে আবদ্ধ হন।"
——————————————————————————————————————————————————————
🔘 পুরুষসুক্ত ১০—
তস্মাদাশ্বা অজায়ন্ত যে কে চোভয়াদাঃ ।
গাবো হ জজ্ঞিরে তস্মাৎ তস্মাজ্জাতা অজাবয়ঃ ॥
তস্মাদ্ - সেই (পুরুষ) থেকে। অজায়ন্ত - জন্ম নিয়েছিল। অশ্বা - অশ্ব বা ঘোড়াসমূহ, এবং সেই সকল প্রাণী যাদের। একে চ - কেবল একটি (নিচের পাটিতে) এবং। উভয়াদাঃ - উভয় পাটিতে দাঁত আছে। গাবঃ - গাভীসমূহ। জজ্ঞিরে - উৎপন্ন হয়েছিল। তস্মাৎ - তা থেকে। তস্মাৎ - তা থেকে। জাতা - জন্মেছিল। অজা - ছাগল এবং। অবয়ঃ - মেষ বা ভেড়া।
অর্থ— তা থেকে অশ্বসমূহ এবং উভয় পাটিতে দাঁতবিশিষ্ট সকল পশু উৎপন্ন হলো। তা থেকে গাভীসমূহ এবং ছাগল ও মেষসমূহ উৎপন্ন হলো।
👉 ব্যাখ্যা— এখানে উল্লিখিত প্রাণীগুলো কোনো এক নিগূঢ় বা আধ্যাত্মিক অর্থ বহন করে। উদাহরণস্বরূপ, অশ্ব (ঘোড়া) হলো 'ইন্দ্রিয়'-এর প্রতীক। বেদের এই রহস্যময়তা ভেদ করা অত্যন্ত কঠিন। তবুও, আমরা যদি সাধারণ অর্থেও এর মর্মার্থ বুঝি, তবে তা 'বেদ পুরুষ রুদ্র'-এর মহিমা বুঝতে আমাদের সাহায্য করে। এখানে উল্লিখিত প্রাণীগুলো সভ্যতার শুরু থেকে ১৯শ শতাব্দীর শিল্প বিপ্লবের পূর্ব পর্যন্ত মানবজীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তারা সভ্যতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। ব্রাহ্মণরা 'গাভী'-র প্রতি বেশি অনুরক্ত কারণ প্রতিদিনের নির্ধারিত আচার-অনুষ্ঠান এবং যজ্ঞ-যাগের জন্য 'পঞ্চগব্য' অত্যন্ত প্রয়োজন। এই কারণেই ব্রাহ্মণদের গাভী দান (গো-দান) করার প্রথা রয়েছে, এটি আসলে ব্রাহ্মণদের সম্পদের মতো। এই গাভীগুলো মূলত পুরুষ রুদ্র থেকেই উৎপন্ন। পরব্রহ্ম রুদ্র গাভীদেরও অন্তর্যামী। যজুর্বেদের শ্রী রুদ্রমে যেমন বলা হয়েছে- "যে ভূতানাম্ অধিপতয়ো" (যজুর্বেদ ৪/৫/১১) অর্থাৎ- সত্যই পরমেশ্বর রুদ্র সকল প্রাণীর অধিপতি।
একইভাবে, অশ্ব (ঘোড়া) ক্ষত্রিয়দের সাথে সম্পর্কিত। এটি তাদের সম্পদ। শান্তি রক্ষা, যুদ্ধ এবং প্রজাপালনের মতো নির্ধারিত দায়িত্ব পালনের জন্য তাদের ঘোড়ার প্রয়োজন হয়। এই অশ্বসমূহ পরমেশ্বর রুদ্র থেকেই আগত। একইভাবে, বৈশ্য এবং শূদ্ররা ব্যবসা-বাণিজ্য ও জীবিকার জন্য ছাগল ও মেষের ওপর বেশি নির্ভর করে। যদিও তারা বলদ, গাভী বা ঘোড়ার মতো অন্যান্য প্রাণীও ব্যবহার করে, তবে তারা মালিকের চেয়ে রক্ষকের ভূমিকা বেশি পালন করে।
সুতরাং, পরমেশ্বর শিবই সকল প্রাণীর অধিপতি। তাঁকে বলা হয় 'পশুপতি'। বেদ বলে সকল পশু (যা বন্ধনে আবদ্ধ) একমাত্র রুদ্রেরই অধীন।
যজুর্বেদ (৩/১/৪) বলে- "পশুপতি কোন পশুদের শাসন করেন? তিনি চতুষ্পদ এবং দ্বিপদ উভয়কেই শাসন করেন।" সুতরাং মানুষ এবং প্রাণী উভয়ই একমাত্র পরমেশ্বর পশুপতি শিব দ্বারা শাসিত। প্রতিটি জীবই এখানে 'পশু' (বদ্ধ জীব) এবং তাদের প্রভু হলেন পশুপতি শিব।
——————————————————————————————————————————————————————
🔘 পুরুষসুক্ত ১১—
যৎ পুরুষং ব্যদধুঃ কতিধা ব্যকল্পয়ন ।
মুখং কিমস্য কৌ বাহূ কা উরূ পাদা উচ্যেতে ॥
যৎ - যখন। পুরুষং - পুরুষকে। ব্যদধুঃ - বিভক্ত করা হলো। কতিধা - কত প্রকারে বা কত রূপে। ব্যকল্পয়ন - তাঁকে কল্পনা করা হয়েছিল বা রূপ দেওয়া হয়েছিল? কিম্ - কী। আসীত - হয়েছিল। অস্য মুখং - তাঁর মুখ? কৌ - কী কী (হয়েছিল)। উচ্যেতে - বলা হয়। অস্য বাহূ - তাঁর বাহুদ্বয়কে? অস্য উরূ - তাঁর উরুদ্বয়। অস্য পাদৌ - তাঁর চরণদ্বয়। কা উচ্যেতে - কী নামে অভিহিত করা হয়?
অর্থ— যখন দেবতারা পুরুষকে বিভক্ত করেছিলেন, তখন তাঁকে কত রূপে কল্পনা করেছিলেন? তাঁর মুখ কী ছিল? তাঁর বাহুদ্বয় কী হয়েছিল? তাঁর উরু ও চরণদ্বয়কেই বা কী বলা হয়?
👉 ব্যাখ্যা— এখানে পুরুষকে বিভিন্ন অংশে বিভক্ত করা হয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে দেবতারা কোনো ছুরি দিয়ে পুরুষকে টুকরো টুকরো করেছেন! এটি কেবল একটি গুহ্য বা আধ্যাত্মিক অভিব্যক্তি। আমরা সবাই জানি যে বেদ পুরুষ পরমেশ্বর শিব স্থান-কাল দ্বারা সীমাবদ্ধ নন। তাহলে তাঁকে কীভাবে বিভক্ত করা সম্ভব? উপনিষদ স্পষ্টভাবে বলেছে ভগবান শিব হলেন 'অখণ্ড', অর্থাৎ যাঁর কোনো অংশ নেই। সুতরাং, এখানে 'বিভাজন' শব্দটিকে রূপক হিসেবে বুঝতে হবে। এই ধরণের রূপকগুলো ধ্যানের জন্য ব্যবহৃত হয়। উপনিষদ আমাদের অনেক উপমা ও রূপকের মাধ্যমে ধ্যানের পদ্ধতি শেখায় যাতে মানুষ 'অচিন্ত্য পরমেশ্বর শিবকে' কল্পনা করতে পারে। এটি উপাসনায় সহায়তা করে। অবশেষে, ব্রহ্মজ্ঞান লাভের পর মানুষ 'শিবোহম' (আমিই শিব) অবস্থায় অধিষ্ঠিত হয়। সত্যই, তাঁরা তখন ব্রহ্মস্বরূপ।
ছান্দোগ্য উপনিষদে 'বৈশ্বানর'-কে এক বিঘৎ পরিমাণ বলা হয়েছে। অনন্ত ব্রহ্ম কীভাবে এক বিঘৎ পরিমাপে সীমাবদ্ধ হতে পারেন? ব্রহ্মসূত্র (১/২/৩০) এটি পরিষ্কার করে বলে যে, সমগ্র সৃষ্টিই পরমেশ্বরের প্রকাশ। সুতরাং, 'স্থান' দ্বারা সীমাবদ্ধ এই বর্ণনাগুলো কেবল ধ্যান বা উপাসনার উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে। কঠ উপনিষদে পুরুষকে "বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ পরিমাণ" (অঙ্গুষ্ঠমাত্রেন পুরুষঃ) বলা হয়েছে। ব্রহ্মসূত্রে ঋষি বাদরি বলেন যে, বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ পরিমাণ বলতে একটি মানসিক প্রতিচ্ছবিকে বোঝানো হয়েছে, প্রকৃত আকারকে নয়। হৃদয়ে অবস্থিত মনের মাধ্যমে পুরুষকে স্মরণ বা ধ্যান করা হয়। হৃদয়ের আকার যেহেতু এক বিঘৎ পরিমাণ এবং সাধক যখন হৃদপদ্মে ব্রহ্মের ধ্যান করেন, তখন তিনি অনিচ্ছাকৃতভাবেই তাঁকে ওই আকারের সাথে যুক্ত করেন। এই মানসিক অনুষঙ্গ বা 'অনুস্মৃতি'-র কারণেই ব্রহ্মকে 'প্রদেশমাত্র' বা এক বিঘৎ পরিমাপের বলা হয়।
একইভাবে জাবাল উপনিষদে পরমেশ্বরকে মস্তক ও চিবুকের মধ্যবর্তী স্থানে অনুভব করার কথা বলা হয়েছে। এটি বলে যে তাঁকে 'অবিমুক্ত' (পূর্ণ মুক্তি) হিসেবে 'বরণা' (পাপ নিবারক) এবং 'নাসী' (পাপ বিনাশক)-র মাঝে উপলব্ধি করতে হবে। জাবাল উপনিষদ বলে, "ভ্রু ও নাসিকার মিলনস্থলই হলো স্বর্গীয় জগত (মস্তকের উপরিভাগ) এবং মর্ত্য জগতের (চিবুক) মিলনস্থল।"
ছান্দোগ্য উপনিষদ বলে- "এই ব্রহ্ম চতুষ্পদ (চার পা বিশিষ্ট) বাকেন্দ্রিয় একটি পা, মুখ্য প্রাণ একটি পা, চক্ষু একটি পা এবং কর্ণ একটি পা।" (ছান্দোগ্য ৩/১৮/১-২)। ছান্দোগ্য উপনিষদে (৫/১/৮) 'বৈশ্বানর বিদ্যা' বা ভগবানের বিশ্বরূপ নিয়ে ধ্যানের বর্ণনা আছে। সেখানে ধ্যানকারীকে ভাবতে বলা হয়েছে যে তাঁর মস্তক হলো আকাশ, চক্ষু হলো সূর্য ইত্যাদি। শতপথ ব্রাহ্মণ (১০/৬/৩/২) বলে- "সেই আত্মার ধ্যান করো যা মনঃস্বরূপ, যার শরীর প্রাণ এবং যার রূপ হলো আলোক।" বৃহদারণ্যক উপনিষদ (৫/১০/৬) বলে- "সেই জ্যোতির্ময় মনঃস্বরূপ পুরুষ হৃদয়ের অভ্যন্তরে অবস্থান করেন, যিনি একটি চাল বা যবের দানার মতো ক্ষুদ্র। তিনি সকলের শাসক, সকলের প্রভু, যা কিছু বিদ্যমান তিনি সেই সবকিছুর ওপর শাসন করেন।"
ব্রহ্মের আকার সম্পর্কে "ব্রহ্ম চতুষ্পদ" বা "এর ষোলটি কলা আছে" ইত্যাদি বক্তব্যগুলো কেবল উপাসনার খাতিরে বলা হয়েছে। কারণ অনন্ত, সূক্ষ্ম এবং সর্বব্যাপী ব্রহ্মকে বোঝা অত্যন্ত কঠিন। অল্পবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষের উপাসনার সুবিধার জন্যই ব্রহ্মের প্রতি চারটি পা ইত্যাদি বৈশিষ্ট্য আরোপ করা হয়েছে।
——————————————————————————————————————————————————————
🔘 পুরুষসুক্ত ১২—
ব্রাহ্মণোঽস্য মুখমাসীদ্ বাহূ রাজন্যঃ কৃতঃ ।
ঊরূতদস্য যদ্ বৈশ্যঃ পদ্ভ্যাং শূদ্রোহজায়ত ॥
অস্য - তাঁর (সেই পুরুষের)। মুখম্ - মুখ। আসীদ্ - হয়েছিল। ব্রাহ্মণঃ - ব্রাহ্মণ। বাহূ - বাহুদ্বয়। কৃতঃ - তৈরি হয়েছিল বা হয়েছিল। রাজন্যঃ - রাজন্য বা ক্ষত্রিয়। যদ্ - যা ছিল। অস্য ঊরূ - তাঁর উরুদ্বয়। তদ্ - তা থেকে হয়েছিল। বৈশ্যঃ - বৈশ্য বা বণিকগণ। পদ্ভ্যাং - এবং চরণদ্বয় থেকে। শূদ্রঃ - শূদ্র বা সেবকগণ। অজায়ত - জন্ম নিয়েছিলেন।
অর্থ— ব্রাহ্মণ তাঁর মুখস্বরূপ ছিলেন, তাঁর বাহুদ্বয় থেকে ক্ষত্রিয়গণ নির্মিত হয়েছিলেন। তাঁর উরুদ্বয় বৈশ্যে পরিণত হয়েছিল এবং তাঁর চরণদ্বয় থেকে শূদ্রগণ জন্মগ্রহণ করেছিলেন।
👉 ব্যাখ্যা— পুরুষ সূক্তের এই মন্ত্রটি সম্ভবত সবচেয়ে বিতর্কিত। অনেকে এটি ব্যাখ্যা করতে ভয় পান। কিছু অপরিপক্ক মস্তিষ্ক একে পরবর্তীকালের প্রক্ষিপ্ত অংশ বলে এড়িয়ে যেতে চান। কিন্তু, শ্রুতিতে কোনো প্রক্ষিপ্ত অংশ থাকতে পারে না। তাছাড়া, কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত প্রাপ্ত বেদের সমস্ত শাখা ও সংস্করণে এই মন্ত্রটি পাওয়া যায়। তাই একে প্রক্ষিপ্ত বলা মোটেও উচিত নয়। অদীক্ষিত বা অ-তিহ্যবাহী শিক্ষার্থীরা তাদের বুদ্ধি অনুযায়ী যা খুশি ভাবতে পারেন, কিন্তু ঐতিহ্যবাহী এবং দীক্ষিত শিক্ষার্থীদের এমন কথা বলা উচিত নয় যা 'শ্রুতি'-র মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে।
মুখ হলো বাকশক্তির আধার। ব্রাহ্মণ হলেন তিনি যিনি সমাজকল্যাণে বেদ পাঠ এবং যজ্ঞ-যাগ পরিচালনা করেন। একজন ব্রাহ্মণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ছাড়াও তাঁর ব্রাহ্মণ্য দায়িত্ব পালন করতে পারেন, কিন্তু মুখ বা বাকশক্তি ছাড়া তা অসম্ভব। বাকশক্তি ছাড়া তিনি 'হোতা' বা 'সামগান' গায়ক হতে পারেন না। তাই ব্রাহ্মণগণ রূপকভাবে বেদপুরুষ রুদ্রের মুখ থেকে উৎপন্ন হয়েছেন বলা হয়।
ক্ষত্রিয়রা হলেন শাসক। তাঁদের প্রাথমিক দায়িত্ব হলো বহিরাগত শত্রু থেকে প্রজাদের রক্ষা করা। এটি করার জন্য ক্ষত্রিয়কে শারীরিকভাবে সামর্থ্যবান হতে হয়। তাঁদের 'বাহুবল' থাকা আবশ্যক। বাহু ছাড়া তিনি ক্ষত্রিয় ধর্ম পালন করতে পারেন না। তাই ক্ষত্রিয়গণ রূপকভাবে বেদপুরুষ রুদ্রের বাহু থেকে জন্মেছেন বলা হয়।
বেদপুরুষ রুদ্র সম্পর্কে অথর্ববেদ (১৫/১/১-৮) বলে-
“ব্রাত্য আসীদীয়মান এব স প্রজাপতিং সম্ ঐরয়ৎ।।
স প্রজাপতিঃ সুবর্ণম্ আত্মন্নপশ্যৎ তৎ প্রাজনয়ৎ।।
তদ্ একম্ অভবৎ তল্ ললামম্ অভবৎ তন্ মহদ্ অভবৎ তজ্ জ্যেষ্ঠম্ অভবৎ তদ্ ব্রহ্ম অভবৎ তৎ তপো 'ভবৎ তৎ সত্যম্ অভবৎ তেন প্রাজায়ত।।
সো 'বর্ধত স মহান্ অভবৎ স মহাদেবো 'ভবৎ।।
স দেবানাম্ ঈশাং পর্যৈৎ স ঈশানো 'ভবৎ।।
স একব্রাত্যো 'ভবৎ স ধনুর আদত্ত তদ্ এবেন্দ্রধনুঃ।।
নীলম্ অস্যোদরং লোহিতং পৃষ্ঠম্।।
নীলেনৈবাপ্রিয়ং ভ্রাতৃব্যং প্রোর্ণোতি লোহিতেনে দ্বিষন্তং বিধ্যতীতি ব্রহ্মবাদিনো বদন্তি”।।
"এক বিচরণকারী ব্রাত্য (সন্ন্যাসী রূপী শিব) ছিলেন। তিনি প্রজাপতিকে কর্মে উদ্বুদ্ধ করলেন। প্রজাপতি নিজের মধ্যে হিরণ্য (স্বর্ণ) প্রত্যক্ষ করলেন এবং তা উৎপন্ন করলেন। তা অনন্য, বিশিষ্ট, মহান, শ্রেষ্ঠ, ভক্তি (ব্রহ্ম), পবিত্র তেজ (তপ) এবং সত্য হলো, তার মাধ্যমেই তিনি (রুদ্র) প্রকাশিত হলেন। তিনি বৃদ্ধি পেলেন, মহাদেব হলেন, দেবতাদের ঈশ্বর (ঈশান) হলেন। তিনি ধনু ধারণ করলেন। তাঁর উদর নীল এবং পৃষ্ঠ লোহিত। ব্রহ্মবাদীরা বলেন, নীল বর্ণ দিয়ে তিনি শত্রুকে আবৃত করেন এবং লোহিত বর্ণ দিয়ে বিদ্বেষীকে বিদ্ধ করেন।"
এই স্তোত্রটি আরও বলে- "সোঽরজ্যত ততো রাজন্যোঽজায়ত" (অথর্ববেদ ১৫/৮/১) অর্থাৎ- “একব্রাত্য যখন রাগের (তেজের) দ্বারা আবিষ্ট হলেন, তখন তাঁর থেকে রাজন্য বা ক্ষত্রিয়ের উৎপত্তি হলো।” আরও বলা হয়েছে- "অতো বৈ ব্রহ্ম চ ক্ষত্রং চোদতিষ্ঠতাম্..." (অথর্ববেদ ১৫/১০/৩) অর্থাৎ- “তাঁর (একব্রাত্য) থেকেই পুরোহিততন্ত্র (ব্রাহ্মণ) এবং রাজতন্ত্র (ক্ষত্রিয়) উত্থিত হয়েছে।” সুতরাং- অথর্ববেদ স্পষ্টভাবে বলে যে চতুর্বর্ণের উৎপত্তি বেদপুরুষ মহাদেব থেকেই।
বৈশ্যরা হলেন ব্যবসায়ী। বেদ তাঁদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো ধর্মীয় আচার নির্ধারণ করেনি। তাঁদের দায়িত্ব হলো ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দের সাহায্য করা। তাঁরা বাণিজ্যে লিপ্ত হবেন এবং রাজ্যের সমৃদ্ধির জন্য কঠোর পরিশ্রম করবেন। তাঁরা অর্থনীতির স্তম্ভস্বরূপ। বৈশ্যরা প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ এবং রাজাকে কর প্রদানের মাধ্যমে সহায়তা করলেই কেবল ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়রা তাঁদের দায়িত্ব পালন করতে পারেন। যেহেতু তাঁরা স্তম্ভের মতো ভিত্তি প্রদান করেন, তাই রূপকভাবে তাঁদের পুরুষের উরু থেকে জাত বলা হয়েছে।
শূদ্ররা হলেন তাঁরা যারা তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করেন। তাঁরা বিভিন্ন সেবাধর্মী কাজে লিপ্ত থাকেন। অর্থনীতিতে তাঁদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের দায়িত্ব হলো অন্য বর্ণগুলোকে নিজ নিজ ধর্ম পালনে সহায়তা করা। শূদ্রদের ছাড়া অন্য বর্ণগুলোর অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। যেহেতু শূদ্ররা তৃণমূল পর্যায়ে অবস্থান করেন এবং সমাজের ভিত্তিস্বরূপ, তাই তাঁদের পুরুষের চরণ থেকে জাত বলা হয়েছে। পা ছাড়া বাকি শরীর অচল হয়ে পড়ে। এটি কোনো উঁচু-নিচু ভেদাভেদ নয়, বরং একটি সুশৃঙ্খল শ্রেণিবিন্যাস। শূদ্ররা বেদপুরুষের চরণ থেকে জন্মেছেন বলার মধ্যে কোনো অপমান নিহিত নেই।
——————————————————————————————————————————————————————
🔘 পুরুষসুক্ত ১৩—
চন্দ্রমা মনসো জাতশ্চক্ষোঃ সূর্যো অজায়ত ।
মুখাদিন্দ্রশ্চাগ্নিশ্চ প্রাণাদ্ বায়ুরজায়ত ॥
মনসঃ - তাঁর (সেই পুরুষের) মন থেকে। চন্দ্রমা - চন্দ্র। জাতঃ - জন্মগ্রহণ করেছিল। চক্ষোঃ - চক্ষু থেকে। সূর্যঃ - সূর্য। অজায়ত - জন্ম নিয়েছিল। মুখাদ্ - মুখ থেকে। ইন্দ্রশ্চ - ইন্দ্র এবং। অগ্নিশ্চ - অগ্নি এবং। প্রাণাদ্ - তাঁর প্রাণবায়ু বা শ্বাস থেকে। বায়ু - বায়ু। অজায়ত - উৎপন্ন হয়েছিল।
অর্থ— তাঁর মন থেকে চন্দ্র উৎপন্ন হলেন, চক্ষু থেকে সূর্য জন্ম নিলেন। তাঁর মুখ থেকে ইন্দ্র ও অগ্নি এবং প্রাণ থেকে বায়ু উৎপন্ন হলেন।
👉 ব্যাখ্যা— এখানে বলা হয়েছে যে, সমস্ত দেবতা বেদপুরুষ রুদ্র থেকে সৃষ্টি হয়েছেন। তিনিই সকল দেবতার উৎস। একই সাথে তিনি নিজে দেবতাদের রূপে প্রকাশিত হন। এ প্রসঙ্গে অথর্ববেদ বলে-
“তস্য ব্রাত্যস্য।। যদস্য দক্ষিণম্ অক্ষ্যসৌ স আদিত্যো যদস্য সব্যম্ অক্ষ্যসৌ স চন্দ্রমাহ্।। যো 'স্য দক্ষিণঃ কর্ণো 'য়ং সো অগ্নির যো 'স্য সব্যঃ কর্ণো 'য়ং স পবমানঃ।। অহোরাত্রে নাসিকে দিতিশ্চাদীতিশ্চ শীর্ষকপালে সংবৎসরঃ শিরঃ”।।
"সেই ব্রাত্য (ভগবান শিবের সন্ন্যাসী রূপ)-র ডান চোখ হলো সূর্য এবং বাম চোখ হলো চন্দ্র। তাঁর ডান কান হলো অগ্নি এবং বাম কান হলো পবমান (বায়ু)। দিন ও রাত তাঁর নাসিকা। দিতি ও অদিতি হলেন তাঁর মস্তক ও খুলি।" (অথর্ববেদ ১৫/১৮/১-৪)
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ (৪/২) বলে- "সেই পরমাত্মাই অগ্নি, তিনিই আদিত্য (সূর্য); তিনিই বায়ু, তিনিই চন্দ্র। সেই আত্মাই জ্যোতির্ময় নক্ষত্রপুঞ্জ, তিনিই হিরণ্যগর্ভ, তিনিই জল এবং তিনিই বিরাট।"
শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ (৩/৪) আরও বলে- "তিনি, সর্বজ্ঞ রুদ্র, যিনি দেবতাদের স্রষ্টা এবং তাঁদের ক্ষমতার দাতা, মহাবিশ্বের আধার, যিনি সৃষ্টির শুরুতে হিরণ্যগর্ভকে জন্ম দিয়েছিলেন, তিনি আমাদের নির্মল বুদ্ধি প্রদান করুন!"
——————————————————————————————————————————————————————
🔘 পুরুষসুক্ত ১৪—
নাভ্যা আসীদন্তরিক্ষং শীর্ষ্ণো দ্যৌঃ সমবর্তত ।
পদ্ভ্যাং ভূমির্দিশঃ শ্রোত্রাৎ তথা লোকানকল্পয়ন ॥
নাভ্যা - তাঁর নাভি থেকে। আসীদ্ - আবির্ভূত হয়েছিল। অন্তরিক্ষং - অন্তরীক্ষ বা মহাশূন্য। শীর্ষণো - তাঁর মস্তক থেকে। দ্যৌঃ - দ্যুলোক বা আকাশ। সমবর্তত - সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পদ্ভ্যাং - তাঁর চরণদ্বয় থেকে। ভূমিঃ - পৃথিবী। শ্রোত্রাৎ - তাঁর কর্ণসমূহ থেকে। দিশঃ - দিকসমূহ। তথা - এভাবেই তাঁরা (দেবতারা)। অকল্পয়ন - কেবল সংকল্প বা মানস চিন্তার দ্বারা সৃষ্টি করলেন। লোকান্ - ভুবনসমূহ বা জগতসমূহ।
অর্থ— তাঁর নাভি থেকে অন্তরীক্ষ (মহাশূন্য) আবির্ভূত হলো, মস্তক থেকে আকাশ সুপ্রতিষ্ঠিত হলো, চরণদ্বয় থেকে পৃথিবী এবং কর্ণ থেকে দিকসমূহ উৎপন্ন হলো। এভাবেই কেবল সংকল্পের মাধ্যমে জগতসমূহ সৃষ্টি করা হয়েছিল।
👉 ব্যাখ্যা— এখানে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে যে, কেবল জীবন্ত প্রাণীরাই নয়, বরং আকাশ, পৃথিবী, দিক এবং বিভিন্ন ভুবনের মতো সমগ্র জড় সৃষ্টিও ভগবান শিবের ইচ্ছামাত্র প্রকাশিত হয়েছে। দ্বৈতবাদী দর্শনগুলোর বিশ্বাসের বিপরীতে, এই জড় জগতও বেদপুরুষ রুদ্র থেকেই আবির্ভূত। ঋগ্বেদ বলছে যে-
“ভুবনস্য পিতরং গীর্ভিরাভী রুদ্রং দিবা বর্ধয়া রুদ্রমক্তৌ। বৃহন্তমৃষ্বমজরং সুষুম্নমৃধগ্ধুবেম
কবিনেষিতাসঃ”॥
পরমেশ্বর রুদ্রই সকল জগতের পিতা, "দিবসে রুদ্র, নিশীথে রুদ্র, আমাদের এই সকল স্তোত্রগানের দ্বারা আমরা বিশ্বপিতা রুদ্রকে সম্মান জানাই। সেই মহান, উচ্চতর, আনন্দময় ও জরাহীন সত্তাকে আমরা বিশেষভাবে আহ্বান করি।" (ঋগ্বেদ ৬/৪৯/১০)
পরমেশ্বর রুদ্র কেবল জগতের পিতাই নন, ঋগ্বেদ বলে তিনি এর শাসকও বটে- “স্থিরেভিরঙ্গৈঃ পুরুরূপ উগ্রো বভ্রুঃ শুক্রৈভিঃ পিপিশে হিরণ্যৈঃ। ঈশানাদস্য ভুবনস্য ভূরে র্ন বা উ যোষদ্রুদ্রাদসুর্যম্”॥
"সুদৃঢ় অঙ্গবিশিষ্ট, বহুরূপী, শক্তিশালী ও পিঙ্গলবর্ণ রুদ্র নিজেকে উজ্জ্বল সুবর্ণ অলঙ্কারে ভূষিত করেন। এই ভুবনের অধীশ্বর (ঈশানাদস্য ভুবনস্য) সেই শক্তিশালী রুদ্র থেকে তাঁর ঈশ্বরত্ব বা শক্তি কখনোই বিচ্যুত হয় না।" (ঋগ্বেদ ২/৩৩/৯)
যজুর্বেদের শ্রী রুদ্রম ভগবান রুদ্রকে 'জগৎপতি' বলে অভিহিত করেছে- "জগতাম্ পতয়ে নমো" (সমগ্র সৃষ্টির অধিপতি আপনাকে নমস্কার)। (যজুর্বেদ ৪/৫/২)। একইভাবে বলা হয়েছে যে পরমেশ্বর রুদ্রই সকল দিকের অধিপতি এবং তিনি বিশ্বরূপ– "দিশাং চ পতয়ে নমো" সকল দিকের অধিপতি রুদ্রকে নমস্কার (যজুর্বেদ ৪/৫/২)। "বিশ্বরূপেভ্যশ্চ বো নমো" সেই ভগবান রুদ্রকে নমস্কার যিনি বিশ্বরূপ ধারণ করেন (যজুর্বেদ ৪/৫/৪)।
অথর্ববেদ (৯/২/২৭) বলে– “ভবো দিবো ভব ঈশে পৃথিব্যা ভব আ পপ্র উর্বন্তরিক্ষম্। তস্যৈ নমো যতমস্যাম্ দিশীতঃ”।। অর্থাৎ- "ভব (শিব) আকাশ শাসন করেন, ভব পৃথিবী শাসন করেন, ভব এই বিশাল বায়ুমণ্ডলকে পরিপূর্ণ করেছেন। যে কোনো দিকে তিনি বিদ্যমান থাকুন না কেন, তাঁকে নমস্কার!"
উপরের শ্লোকগুলো থেকে এটি স্পষ্ট যে- পরমেশ্বর শিবই সমস্ত জগত, দিক, আকাশ এবং পৃথিবীর জন্মদাতা। তিনি কেবল এদের পিতাই নন, বরং একমাত্র শাসক। তিনি নিজেই পঞ্চভূত বা মৌল উপাদান রূপে প্রকাশিত হন এবং তিনিই সেই উপাদানসমূহের অন্তরে অবস্থান করেন।
——————————————————————————————————————————————————————
🔘 পুরুষসুক্ত ১৫—
সপ্তাস্যাসন পরিধয়স্ত্রিঃ সপ্ত সমিধঃ কৃতাঃ ।
দেবা যদ্ যজ্ঞং তন্বানা অবধ্নন্ পুরুষং পশুম্ ॥
অস্য — এই যজ্ঞের জন্য। সপ্ত — সাতটি ছিল। পরিধয়ঃ — বেষ্টনী কাষ্ঠ বা বেড়া। ত্রিঃসপ্ত — তিন-সাত, অর্থাৎ একুশটি। সমিধঃ — সমিৎ-কাষ্ঠ বা যজ্ঞীয় ইন্ধন। কৃতাঃ — প্রস্তুত করা হয়েছিল। যদ্ যজ্ঞং — যে যজ্ঞের জন্য। দেবা — দেবতারা যজ্ঞ সম্পাদনকারী হিসেবে। তন্বানা — যজ্ঞ বিস্তারকালে।
অবধ্নন্ — বন্ধন করেছিলেন। পুরুষং — পুরুষকে। পশুম্ — যজ্ঞের পশুরূপে।
অর্থ— "তাঁর (এই যজ্ঞের) সাতটি বেষ্টনী কাষ্ঠ ছিল, একুশটি ইন্ধন স্তর প্রস্তুত করা হয়েছিল, যখন দেবতারা যজ্ঞ উৎসর্গকালে পুরুষকে বলির পশুরূপে বন্ধন করেছিলেন।"
👉 ব্যাখ্যা— সায়ণাচার্য বলেন- "ঐষ্টিকস্যাবাহবনীয়স্য ত্রয়ঃ পরিধয়ঃ উত্তরবেদিকাস্ত্রয়ঃ আদিত্যশ্চ সপ্তমঃ পরিধি প্রতিনিধি রূপঃ" অর্থাৎ- উত্তরবেদী অংশে তিনটি বেষ্টনী, আবাহনীয় অংশে তিনটি এবং আদিত্য (সূর্য) হলেন সপ্তম আবরণ বা বেষ্টনী। সুতরাং, জড় সৃষ্টির একটি কাঠামো রয়েছে। সেই কাঠামোটি কী? এখানে বলা হয়েছে "সপ্তাস্যাসন পরিধয়ঃ" অর্থাৎ সাতটি ছিল বেষ্টনী। সেগুলি কী কী? নিচে সেই সাতটি বিষয়ের তালিকা দেওয়া হলো যা সৃষ্টির কাঠামো হিসেবে কাজ করে-
১) আকাশ (মহাশূন্য)
২) বায়ু (বাতাস)
৩) অগ্নি (আগুন)
৪) আপঃ (জল)
৫) পৃথিবী (মাটি)
৬) সূর্য (যা বুদ্ধিকে নির্দেশ করে)।
৭) চন্দ্র (যা মানস বা মনকে নির্দেশ করে)।
বেদ পুরুষ রুদ্র সৃষ্টির এই সাতটি বেষ্টনীর অন্তর্যামী। তিনি নিজেই 'আত্মা' হিসেবে কার্য করেন এবং জীব হিসেবে এই সপ্তবিধ কাঠামোর মধ্যে প্রবেশ করেন। বৈদিক শাস্ত্র একে পরমেশ্বর শিবের 'অষ্টমূর্তি' রূপ হিসেবে ব্যাখ্যা করে। উপরে উল্লিখিত সাতটি হলো- পরমেশ্বর শিবের সাতটি রূপ। 'আত্মা' এবং উপরে উল্লিখিত সাতটি রূপকে একত্রে 'অষ্টমূর্তি' বলা হয়। ভব, সর্ব, উগ্র, ভীম, রুদ্র, পশুপতি, মহাদেব এই সাতটি নাম উপরের সপ্তবিধ কাঠামোর সাথে যুক্ত। অষ্টমটি হলো ঈশান। তাঁকে ঈশান বলা হয় কারণ তিনি জীবদেহের অন্তর্যামী। ঈশান হলেন সকল জীবের অন্তরাত্মা। পরমেশ্বর রুদ্রের কারণে অগ্নি এমন রূপ প্রাপ্ত হয়েছেন-
“তমব্রবীদ্রুদ্রোঽসীতি । তদ্যদস্য তন্নামাকরোদগ্নিস্তদ্রূপমভবদগ্নিব রুদ্রো যদারোদিত্তস্মাদ্রুদ্রঃ” (শতপথ ব্রাহ্মণ ৬/১/৩/১০)
'তুমি হলে রুদ্র।' এবং যেহেতু তিনি তাঁকে এই নাম দিয়েছিলেন, অগ্নি সেই রূপ (বা সেই আকার) ধারণ করেছিলেন, কারণ রুদ্রই হলেন অগ্নি।
পরমেশ্বর রুদ্রের কারণে জলরাশি এমন রূপ প্রাপ্ত হয়েছে- “তমব্রবীৎসর্বোঽসীতি । তদ্যদস্য তন্নামাকরোদাপস্তদ্রূপমভবন্নাপো বৈ সর্বোহদ্ভ্যো হীদিং সর্বং জায়তে” (শতপথ ব্রাহ্মণ ৬/১/৩/১১)
"তুমি হলে সর্ব।" এবং যেহেতু তিনি তাঁকে এই নাম দিয়েছিলেন, জলরাশি সেইরূপ হয়েছিল, কারণ সর্বই হলো জল, যেহেতু জল থেকেই এখানে সবকিছু (সর্ব) উৎপন্ন হয়।
পরমেশ্বর রুদ্রের কারণে বায়ু এমন রূপ প্রাপ্ত হয়েছে-” স বৈ ত্বমিত্যব্রবীত পশুপতিরেবেতি যৎ পশুপতির্বায়ুস্তেন” (কৌষীতকী ব্রাহ্মণ ৬/২/২৫)
প্রজাপতি বললেন, 'তুমি হলে পশুপতি' কারণ পশুপতিই হলেন বায়ু।
গাছপালা এবং বৃক্ষরাজিও পরমেশ্বর রুদ্র- “স বৈ ত্বমিত্যব্রবীত উগ্র এব দেব ইতি যদ উগ্রো দেব ওষধয়ো বনস্পতয়স্তেন” (কৌষীতকী ব্রাহ্মণ ৬/২/৩৭)
প্রজাপতি উত্তর দিলেন, 'তুমি হলে উগ্রদেব (ভীষণ দেবতা)' কারণ উগ্রদেবই হলেন গাছপালা ও বনস্পতি।
পরমেশ্বর শিব নিজেই আদিত্য (সূর্য) রূপে প্রকাশিত হন- “স বৈ ত্বমিত্যব্রবীত মহান এব দেব ইতি যন মহান দেব আদিত্যস্তেন” (কৌষীতকী ব্রাহ্মণ ৬/৩/৬)
অর্থাৎ, প্রজাপতি বললেন, 'তুমি হলে মহাদেব (মহান দেবতা)' কারণ মহাদেবই হলেন আদিত্য (সূর্য)।
পরমেশ্বর শিব নিজেই প্রজাপতি এবং চন্দ্রমা (চাঁদ)- “তন্নামাকরোচ্চন্দ্রমাস তদ্রূপমভবৎ প্রজাপতির বৈ চন্দ্রমা প্রজাপতির বৈ মহাদেবঃ” (শতপথ ব্রাহ্মণ ৬/১/৩/১৬) অর্থাৎ, "তিনি তাঁকে বললেন, 'তুমি হলে মহাদেব।' এবং সেই কারণে চন্দ্র সেইরূপ হয়েছিলেন, কারণ চন্দ্রই হলেন প্রজাপতি, আর প্রজাপতিই হলেন মহাদেব।"
পরমেশ্বর রুদ্র নিজেই ইন্দ্র- “স বৈ ত্বমিত্যব্রবীত অশনির এবেতি যদ অশনির ইন্দ্রস্তেন” (কৌষীতকী ব্রাহ্মণ ৬/৩/৪১) অর্থাৎ, প্রজাপতি রুদ্রকে বললেন 'তুমি হলে অশনি' কারণ অশনিই হলেন ইন্দ্র।
পরমেশ্বর রুদ্র হলেন সর্বদেব স্বরূপ- সকল দেবতাই কেবল পরমেশ্বর শিবের বিভিন্ন রূপ ও শক্তি। সকল দেবতার সমষ্টিই পরমেশ্বর রুদ্রের দেহ গঠন করে। এ সম্পর্কে শতপথ ব্রাহ্মণ (৯/১/১/১) বলে- “অথাতঃ শতরুদ্রিয়ং জুহোতি । অত্রৈষ সর্বোহগ্নিঃ সংস্কৃতঃ স এষোহত্র রুদ্রো দেবতা তস্মিনদেবা এতদমৃতং রূপমুত্তমমদধুঃ স এষোহত্র দীপ্যমানোহতিষ্ঠদন্নমিচ্ছমানস্তস্মাদ্দেবা অবিভয়ুর্যদ্বৈ নোহয়ং ন হিংস্যাদিতি।।” অর্থাৎ- “এখন 'শতরুদ্রীয়' মন্ত্রে আহুতি প্রদান করো। এখানে এই বিশ্বজনীন অগ্নি প্রস্তুত করা হয়েছে, এবং এখানে এই রুদ্রই হলেন দেবতা। তাঁর মধ্যে দেবতারা এই অতি উৎকৃষ্ট অমর রূপ স্থাপন করেছিলেন। এখানে তিনি প্রজ্বলিত হয়ে অন্ন কামনায় উত্থিত হলেন। দেবতারা তাঁকে দেখে ভীত হলেন, পাছে (তাঁরা ভাবলেন) 'তিনি আমাদের ধ্বংস না করে ফেলেন'।"
যজুর্বেদের শ্রী রুদ্রম বলে যে পরমেশ্বর রুদ্র হলেন সকল দেবতার জ্যোতির্ময় হৃদয়- “দেবানা হৃদয়েভ্যো নমঃ” (যজুর্বেদ ৪/৫/৯) অর্থাৎ, সেই রুদ্রকে প্রণাম যিনি দেবতাদের জ্যোতির্ময় হৃদয়।
”যো রুদ্রো অগ্নৌ যো অপ্সু য ওষধীষু
যো রুদ্রো বিশ্ব ভুবনাবিবেশ তস্মৈ রুদ্রায় নমো অস্তু”।। (যজুর্বেদ ৫/৫/৯)
অর্থ- যে রুদ্র অগ্নিতে, যে রুদ্র জলে, যে রুদ্র ওষধিতে (উদ্ভিদ), যে রুদ্র সমস্ত ভুবনে বা বিশ্বে প্রবেশ করেছেন, সেই রুদ্রকে জানাই নমস্কার।
এখন আমরা বুঝতে পারি যে সৃষ্টির একটি কাঠামো রয়েছে। তাহলে এই সপ্তবিধ কাঠামোর মধ্যে কী অর্পণ করা হবে? সূক্তটি বলছে একুশটি (ত্রিসপ্ত) হলো 'সমিধঃ' অর্থাৎ যজ্ঞীয় ইন্ধন যা এই সপ্তবিধ কাঠামোতে অর্পণ করা হয়। সেই একুশটি উপাদান কী কী?
সেই একুশটি হলো-
"পঞ্চ তন্মাত্র" — বা পাঁচটি বিষয় (বর্ণ, শব্দ, গন্ধ, রস, স্পর্শ)।
"পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিয়" — বা পাঁচটি বোধেন্দ্রিয় (চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা এবং ত্বক)।
"পঞ্চ কর্মেন্দ্রিয়" — বা পাঁচটি কর্মের অঙ্গ (হাত, পা, বাকযন্ত্র, জননেন্দ্রিয় এবং পায়ু)।
"পঞ্চ মহাভূত" — বা পাঁচটি মহান উপাদান (ক্ষিতি/মাটি, অপ/জল, তেজ/অগ্নি, মরুৎ/বায়ু এবং ব্যোম/আকাশ)।
"অন্তঃকরণ" — যা হলো 'মন-বুদ্ধি-অহংকার'।
সুতরাং, ৫+৫+৫+৫+১ = ২১। পঞ্চমহাভূত এখানে কাঠামো এবং উপকরণ, উভয় হিসেবেই কাজ করে।
——————————————————————————————————————————————————————
🔘 পুরুষসুক্ত ১৬—
যজ্ঞেন যজ্ঞমযজন্ত দেবাস্তানি ধর্মাণি প্রথমান্যাসন্ ।
তে হ নাকং মহিমানঃ সচন্ত যত্র পূর্বে সাধ্যাঃ সন্তি দেবাঃ ॥
যজ্ঞেন - যজ্ঞের দ্বারা (অর্থাৎ উৎসর্গীকৃত পুরুষ-পশুর দ্বারা)। দেবাঃ - দেবতারা। অযজন্ত - যজ্ঞ করেছিলেন। যজ্ঞম্ - যজ্ঞের প্রতি (অর্থাৎ যজ্ঞপুরুষ বা শিবের প্রতি)। তানি - সেই। ধর্মাণি - ধর্ম বা বিধানসমূহ। আসন - হয়েছিল। প্রথমানি - প্রথম বা আদি। তে মহিমানঃ - সেই মহিমান্বিতগণ (সাধক বা দেবতারা)। সচন্ত - লাভ করেন বা প্রাপ্ত হন। নাকম্ - স্বর্গ বা আনন্দধাম। যত্র - যেখানে। পূর্বে - পুরাকালের। সাধ্যাঃ - সাধ্য নামক দেবগণ (সিদ্ধগণ)। দেবাঃ - দেবতারা। সন্তি - বাস করেন।
অর্থ — দেবতারা যজ্ঞের (পশু-পুরুষের) মাধ্যমে যজ্ঞেরই (যজ্ঞপুরুষের) আরাধনা করেছিলেন, এই আচারগুলোই ছিল সৃষ্টির আদি ধর্ম বা বিধান। সেই মহিমান্বিত সত্তাগণ স্বর্গধাম প্রাপ্ত হন, যেখানে পুরাকালের সাধ্যগণ এবং দেবতারা বাস করেন।
👉 ব্যাখ্যা — এই মন্ত্রটি পুরুষ সূক্তের উপসংহার। এখানে যজ্ঞের এক চমৎকার রহস্য উন্মোচিত হয়েছে- দেবতারা যজ্ঞের মাধ্যমে যজ্ঞেরই উপাসনা করছেন। এর গভীর অর্থ হলো, পরমাত্মা নিজেই নিজেকে নিজের মধ্যে আহুতি দিচ্ছেন। সৃষ্টিপ্রক্রিয়া আসলে ঈশ্বরের একটি আত্মউৎসর্গ। এই আদি যজ্ঞ থেকেই মহাবিশ্বের নিয়ম বা 'ধর্ম' প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এখানে 'নাক' শব্দটির দ্বারা কেবল সাধারণ স্বর্গ নয়, বরং সেই পরম পদকে বোঝানো হয়েছে যা দুঃখরহিত। যারা এই সৃষ্টিতত্ত্বের রহস্য জানেন এবং সেই পরম পুরুষ রুদ্রের উপাসনা করেন, তাঁরাও সেই উচ্চতর চেতনা বা ধাম প্রাপ্ত হন যেখানে সিদ্ধগণ অবস্থান করছেন।
তৈত্তিরীয় আরণ্যক অনুসারে, এই পুরুষই হলেন পরমেশ্বর রুদ্র। তিনি কেবল স্রষ্টাই নন, তিনি নিজেই যজ্ঞের উপকরণ এবং লক্ষ্য। এই অদ্বৈত সত্যটি অনুধাবন করাই হলো সমস্ত ধর্মের সারকথা।
——————————————————————————————————————————————————————
পরিশেষে বলা যায়- পুরুষ সূক্ত কেবল একটি স্তোত্র নয়, বরং এটি সৃষ্টির সেই আদি ও শাশ্বত সত্যের আখ্যান, যেখানে পরমাত্মা নিজেই নিজেকে বিশ্বরূপে উৎসর্গ করেছেন। শ্রুতি (শতপথ ব্রাহ্মণ, তৈত্তিরীয় আরণ্যক), কল্প (আপস্তম্ব শ্রৌতসূত্র) এবং পূর্বমীমাংসার কঠোর যুক্তিধারা বিশ্লেষণ করলে এই সত্য দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, পুরুষ সূক্তের বর্ণিত সেই 'সহস্রশীর্ষ পুরুষ' অন্য কেউ নন, বরং তিনি স্বয়ং পরমেশ্বর রুদ্র।
যজ্ঞের যূপকাষ্ঠে যখন রুদ্রকে পশুরূপে কল্পনা করা হয়, তখন তিনি কেবল সংহারকর্তা নন, বরং তিনি জগতের আধার ও পালক 'যজ্ঞপুরুষ'। জৈমিনি প্রোক্ত ষড়প্রমাণ এবং দণ্ডাপুপিকা-দেহলীদীপের মতো ন্যায়সমূহ আমাদের নিশ্চিত করে যে, শতরুদ্রীয় হোমে প্রযুক্ত পুরুষ সূক্তটি সাক্ষাৎ রুদ্রেরই মহিমা কীর্তন করে। তিনি যেমন বিশ্বের অন্তরাত্মা হয়ে সবকিছুর মধ্যে প্রবেশ করে আছেন (বিশ্বময়), তেমনি তিনি মহাবিশ্বের সীমানা অতিক্রম করে দশ অঙ্গুলি ঊর্ধ্বে অনন্তরূপেও বিদ্যমান (বিশ্বোত্তর)।
নারায়ণ ঋষির এই দিব্য দর্শন আমাদের শেখায় যে, চরাচর এই মহাবিশ্বে যা কিছু দৃশ্যমান চন্দ্র, সূর্য, অগ্নি, বায়ু কিংবা বিভিন্ন বর্ণের মানুষ ও প্রাণী সবই সেই এক পরম পুরুষ রুদ্রেরই বিভিন্ন অঙ্গ। সুতরাং, পুরুষ সূক্তের প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করা মানেই হলো সেই অদ্বৈত রুদ্রতত্ত্বকে জানা, যা আমাদের সংকীর্ণ ভেদাভেদ ভুলে 'শিবময়' বিশ্বদর্শনের প্রেরণা দেয়।
--- আমি “শম্বরনাথ শৈব” যজ্ঞপুরুষ রূপী সেই পরমেশ্বর রুদ্রের চরণে অনন্ত কোটি প্রণতি জানিয়ে এই শাস্ত্রীয় আলোচনা পূর্ণ করলাম।
———সর্বে হ্যেষ রুদ্রস্তস্মৈ রুদ্রায় নমো অস্তু———
নমঃ শিবায় 🙏
নমঃ শিবায়ৈ🙏
শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্ 🚩
ॐ নমঃ পার্বতীপতয়ে হর হর মহাদেব 🚩
✍️ লেখনীতে — অন্তিক ভট্টাচার্য্য (শম্বরনাথ শৈব)।
🌻 বিশেষ কৃতজ্ঞতা — আমার গুরু শ্রী নন্দীনাথ শৈবাচার্য ও আমার আদর্শ শ্রী রোহিত কুমার চৌধুরী শৈবজী।
📣 কপিরাইট ও প্রচারে— Shivalaya


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন