সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র, বিদ্যুৎ যাকে আলোকিত করতে পারে না সেই ব্রহ্ম কে ও তার ধাম কোনটি ?
😍 সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্র, বিদ্যুৎ যাকে আলোকিত করতে পারে না সেই ব্রহ্ম কে ও তার ধাম কোনটি ?
__________________________________________
🔰 ভূমিকা — বেদের ১০৮ উপনিষদ ভাগের মধ্যে বহুল প্রচলিত নয়টি উপনিষদের মধ্যে কঠ উপনিষদ ও মুণ্ডক উপনিষদে বর্ণিত একটি বিশেষ প্রসঙ্গের মন্ত্রকে বর্তমান কালের বিভিন্ন সম্প্রদায় তাদের নিজেদের ইচ্ছামতো আরাধ্য দেবীকে সেই মন্ত্রের অর্থের প্রতিপাদ্য বিষয় বলে ব্যাখ্যা বা ভাষ্য রচনা করেছেন। যেমন — বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের বৈষ্ণবেরা উক্ত মন্ত্র বিশেষকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন যে, এই মন্ত্রটি ভগবান শ্রীহরি বিষ্ণু/শ্রীকৃষ্ণকে ও তার বৈকুণ্ঠলোক বা গোলককে বুঝিয়েছে। আবার আদি শঙ্করাচার্যের কেবলাদ্বৈতবাদী তথাকথিত স্মার্তগণের দাবী হল - উক্ত মন্ত্রে “নিরাকার ব্রহ্মকে” বুঝিয়েছে। এক্ষেত্রে যদি শৈবগণ দাবী করেন যে ঐ নিরাকার পরমব্রহ্মটিই শিব এবং উক্ত মন্ত্রের যে ব্রহ্মলোক রয়েছে তা শিবলোক। এই সিদ্ধান্তে আপত্তি জানিয়ে আদি শঙ্করবাদী স্মার্তগণ বলেন আদিশঙ্করাচার্য তার ভাষ্যে ব্রহ্মলোককে নিরাকার ব্রহ্ম অবস্থা বুঝিয়েছেন, কোনো নির্দিষ্ট দেবদেবীকে বা তাঁর নিবাসস্থলের নির্দিষ্ট লোক কে বোঝাননি।
সুতরাং এখানেই শৈবদের সাথে আদিশঙ্করাচার্যের মতের বিরোধ হয়েছে।
আবার আর্যসমাজীরাও এক্ষেত্রে কট্টর নিরাকারবাদী হবার কারণে আদিশঙ্করাচার্যের মতবাদের মতোই ভাষ্য সিদ্ধান্ত রচনা করেছেন।
এবার দেখা যাক নিরপেক্ষ ভাবে বিচার করলে কোন পক্ষের দাবী সত্য ও অখণ্ডিত বলে প্রমাণিত হয়।
______________________________________________
সর্বপ্রথম বেদের যে শ্রুতিমন্ত্রে এই অস্পষ্ট প্রসঙ্গ উল্লেখিত হয়েছে তা দেখা যাক,
______________________________________________
🚩 আলোচ্য বেদমন্ত্র 🚩
♦️ কঠ উপনিষদের ২য় অধ্যায়ের ২য় বল্লীর ১৫ নং মন্ত্রে বলা হয়েছে —
ন তত্র সূর্যো ভাতি ন চন্দ্রতারকং নেমা বিদ্যুতো ভাস্তি কুতোহয়মগ্নিঃ। তমেব ভান্তমনুভাতি সর্বং তস্য ভাসা সর্বমিদং বিভাতি ॥”
[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/কঠ উপনিষদ/২য় অধ্যায়/২য় বল্লী/১৫ নং মন্ত্র]
✅ অনুবাদ : সেখানে তার কাছে সূর্য দীপ্তি প্রদান করেন না, চন্দ্র, তারা, এমনকি বিদ্যুৎও নন। তাই, অগ্নি কিভাবে দীপ্তি দিতে পারে ? তার জ্যোতির দ্বারাই সবকিছু জ্যোতির্ময় হয়ে আছে, তাঁরই প্রকাশিত আলোক দ্বারাই সবকিছু আলোকিত ।
♦️ মুণ্ডক উপনিষদেও এই একই শ্রুতি মন্ত্রতেও এই কথা বলা হয়েছে —
ন তত্র সূর্যো ভাতি ন চন্দ্রতারকং
নেমা বিদ্যুতো ভান্তি কুতোহয়মগ্নিঃ।
তমেব ভান্তমনুভাতি সর্বং তস্য ভাসা সর্বমিদং বিভাতি ॥
[মুণ্ডক উপনিষদ/২ মুণ্ডক/২য় অধ্যায়/১০ নং মন্ত্র]
✅ অনুবাদ : সেখানে সূর্য চন্দ্র বা তারা কিরণ দেয় না এবং এই বিদ্যুৎও নয় তবে এই অগ্নি কীভাবে জ্বলবে ? সেই পরমাত্মা প্রকাশিত বলেই জগত প্রকাশিত হয় এবং তাঁর জ্যোতিতেই এই সমস্ত কিছু জ্যোতিষ্মান।
— দেখুন এখানে এমন একজন পরমাত্মা পরমব্রহ্ম ও তার নিত্যধাম বা লোকের কথা বলা বলা হয়েছে যা নির্দিষ্ট ভাবে কোনো দেবদেবীকে বা তার লোককে ইঙ্গিত করছে না। এর ফলে আদি শঙ্করাচার্যও এটিকে সকল দেবদেবীর থেকে পৃথক রেখেই নিরপেক্ষ হিসেবে দেখিয়েছেন তার উপনিষদ ভাষ্যে।
কিন্তু বৈষ্ণবদের পরম্পরাগত তথাকথিত আচার্যগণ এই মন্ত্রের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে উক্ত নিত্যধামকে বিষ্ণুর বৈকুণ্ঠ বা কৃষ্ণের গোলক হিসেবে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।
অনান্য দেব-দেবীর ভক্তেরা নিজের নিজের পছন্দের দরুন এই মন্ত্রের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নিজেদের ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।
এখন প্রশ্ন হল, সবাই যদি নিজের সিদ্ধান্তকে সত্য ও অন্যের দেওয়া ব্যাখ্যার সিদ্ধান্তকে অসত্য বলে দাবী করেন, তাহলে প্রকৃত সত্য কোনটি ?
চলুন মন্ত্রটির প্রকৃত ব্যাখ্যা বেদ-পুরাণের ভিত্তিতেই জেনে নেওয়া যাক।
______________________________________________
______________________________________________
🕉️🌷 শ্রীগুরু নন্দীনাথ শৈব আচার্য কৃত ব্যাখ্যা —
উক্ত বেদ মন্ত্রে বলা হয়েছে, সূর্য চন্দ্র তারা বিদ্যুৎ তথা অনান্য কেউই সেই পরমাত্মা পরমব্রহ্মকে বা তার নিত্যধামকে আলোকিত করতে সক্ষম নন, বরং তার শক্তিতেই সকলে দীপ্তি দিতে সক্ষম, এটি সত্য।
কিন্তু কঠ ও মুণ্ডক উপনিষদের মধ্যে ঐ বেদমন্ত্রে নির্দিষ্ট ভাবে পরমব্রহ্ম হিসেবে কোনো দেবদেবীর নাম উল্লেখ না করা হলেও বেদের অন্যত্র ঐ একই মন্ত্র উল্লেখ হয়েছে, কিন্তু সেখানে সরাসরি প্রভু শিবের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
আলোচ্য মন্ত্রের পরমব্রহ্ম টি যে শুধুমাত্র সাক্ষাৎ মহাদেবই, তা বেদেই স্পষ্ট করে বলা হয়েছে। তাতে তিনি নিরাকার হোন বা সাকার ; উভয় অবস্থা সাক্ষাৎ শিব স্বয়ং নিজেই, অন্য আর কেউ নয়।
☘️ চলুন দেখে নেওয়া যাক আলোচ্য মন্ত্রের সম্পূর্ণ রূপটি বেদের উপনিষদ ভাগ থেকে —
🔸 মুক্তিকা উপনিষদের শ্রুতিবচন অনুযায়ী অথর্ববেদ শাখার অন্তর্গত হল ভস্মজাবাল উপনিষদ, এই উপনিষদে বলা হয়েছে —
নৈব ভাবয়ন্তি তল্লিঙ্গং ভানুশ্চন্দ্রোঽগ্নির্বায়ুঃ।
স্বপ্রকাশং বিশ্বেশ্বরাভিধং পাতালমধিতিষ্ঠতি ।
তদেবাহম্ ॥ ১৯
[অথর্ববেদ/ভস্ম জাবাল উপনিষদ/২য় অধ্যায়/১৯ নং শ্রুতি]
✅ অনুবাদ : পরমেশ্বর শিব বললেন, সূর্য, চন্দ্র, অগ্নি ও বায়ু — কেউই সেই লিঙ্গকে অনুধাবন করতে পারে না (প্রকাশ দিতে সক্ষম নয়) । সেই লিঙ্গ নিজেই স্বপ্রকাশ (নিজে থেকেই জ্যোতিসম্পন্ন - জ্যোতির্ময়) ও 'বিশ্বেশ্বর' নামে পরিচিত যা পাতালেও অধিষ্ঠিত রয়েছে। সেই জ্যোতির্লিঙ্গের দেবতা আমিই (শিবই) ॥ ১৯ ॥
🔍 বিশ্লেষণ :
দেখুন ! ভস্মজাবাল উপনিষদের অথর্ববেদীয় শ্রুতিমন্ত্রেই স্পষ্ট ভাবে প্রমাণিত হয় যে, বিশ্বেশ্বর লিঙ্গ অর্থাৎ কাশী তে অবস্থিত শিবলিঙ্গ পাতাল সহ সমস্ত কিছু জুড়েই অবস্থিত এবং এই কারণেই এই বিশ্বেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গের স্থান হল মোক্ষপুরী। যা একমাত্র সাধকেরা সাধনার দ্বারা সেই দিব্য চেতনা লাভ করে তবেই জড় জগতের জাগতিক দৃষ্টিকোণের উর্ধ্বে উঠে সেই পরমধামকে দর্শন করতে পারবে। শাস্ত্রমতে শিবলোক সমস্ত লোকের উপরে স্থিত, সেই শিবলোকে যখন কোন সাধক পৌঁছে যায়, তখন আর এই জড় জগতে ফিরতে হয় না তাকে, সে জন-মৃত্যু চক্র থেকে চিরকালের জন্য মুক্ত হয়ে যায়। যেহেতু এই লোক সমস্ত লোকের ঊর্ধ্বে, তাই এখানে সূর্য চন্দ্র অগ্নি বিদ্যুৎ কেউই তাদের ক্ষমতা প্রদর্শন করতে পারেনা, এই লোকে পরমেশ্বর শিবের প্রভাবেই সমস্ত কিছু আলোকিত। এমনকি সূর্য চন্দ্র তথা সমস্ত কিছুই তার শক্তিতেই বলীয়ান।
ত্রিদেবের উৎপত্তিকর্তা পরমেশ্বর সদাশিবের এই শিবলোকই হল আলোচ্য মন্ত্রের উক্ত পরমব্রহ্ম। যা আদি শঙ্করাচার্য নিজের ভাষ্যে এড়িয়ে গিয়েছেন, আর বৈষ্ণব আচার্যগণ শিবের স্থানে বিষ্ণুকে জোরপূর্বক বসিয়ে নব্য সিদ্ধান্ত তৈরী করেছেন। আদিশঙ্করাচার্য সহ বৈষ্ণব আচার্য তথা সকল অশৈব আচার্যদের মতবাদ গ্রহণ করলে অনান্য বেদমন্ত্রের সাথেই বিরোধ হয়। আর যে ব্যাখ্যা সিদ্ধান্ত বেদের অনান্য মন্ত্রের সহিত সাংঘর্ষিক, তা কখনোই নিরপেক্ষ ও বেদসম্মত সিদ্ধান্ত বলে গ্রহণযোগ্য নয়।
এই বিষয়ে বেদেই প্রমাণ দেখুন 👇
পরমেশ্বর শিবের মহিম গায়ন করতে করতে রুদ্রহৃদয় উপনিষদ ‘আলোচ্য মন্ত্র’কে সেই এক দেবতা বলে মহাদেবকে উল্লেখ করেছে।
♦️ রুদ্রহৃদয় উপনিষদের ৪০ নং মন্ত্রে বলা হয়েছে —
ন তত্র চন্দ্রার্কবপুঃ প্রকাশতে ন বান্তি বাতাঃ সকলা দেবতাশ্চ ।
স এষ দেবঃ কৃতভাবভূতঃ স্বয়ং বিশুদ্ধো বিরজঃ প্রকাশতে ॥
[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/রুদ্রহৃদয় উপনিষদ/৪০ নং মন্ত্র]
✅ অনুবাদ : পরমাত্মার যে নিত্যধামে সূর্য তথা চন্দ্র প্রকাশ দিতে সক্ষম নয়, যেখানে বায়ুদেব প্রবাহিত হয় না, যেখানে অন্য দেবতারাও পৌঁছাতে পারেন না, সেই নিত্যধামের পরমাত্মা শিব সাধক ব্যক্তির দ্বারা চিন্তন করবার মাধ্যমে শুদ্ধ এবং নির্গুন স্বরূপে প্রকাশিত হন ।
______________________________________________
এবার বেদের অন্য আরেকটি শ্রুতি মন্ত্রে দেখুন শৈবপক্ষের সিদ্ধান্ত ও ব্যাখ্যা সম্পূর্ণভাবে বেদসম্মত 👇
♦️ অথর্ববেদের নৃসিংহ পূর্বতাপনী উপনিষদের পঞ্চমোপনিষদের ২০ নং মন্ত্রে বলা হয়েছে —
তদ্বা এতৎপরমং ধাম মন্ত্ররাজাধ্যাপকস্য
যত্র ন সূর্যস্তপতি যত্র ন বায়ুর্বাতি যত্র
ন চন্দ্রমা ভাতি যত্র ন নক্ষত্রাণি ভান্তি
যত্র নাগ্নির্দহতি যত্র ন মৃত্যুঃ প্রবিশতি
যত্র ন দুঃখং সদানন্দং পরমানন্দং
শান্তং শাশ্বতং সদাশিবং ব্রহ্মাদিবন্দিতং
যোগিধ্যেয়ং পরমং পদং যত্র গত্বা ন নিবর্তন্তে যোগিনঃ ॥
[অথর্ববেদ/নৃসিংহ পূর্বতাপনী উপনিষদ/পঞ্চমোপনিষদ/২০ নং মন্ত্র]
✅ অনুবাদ : এই মন্ত্ররাজ জপ করে জপকারী ব্যক্তি সেই পরমধাম প্রাপ্ত করেন, যেখানে বায়ু গমন করে না, যেখানে সূর্য তাপ দেয় না, যেখানে চন্দ্রের প্রকাশ নেই, সেখানে নক্ষত্র চমকায় না, যেই স্থানে অগ্নি প্রজ্জ্বলিত হয় না তথা যেখানে মৃত্যুর প্রবেশ নেই, যে স্থান সর্বদা দুঃখরহিত, যেখানে সর্বদাই আনন্দ বিরাজ করে, যা পরমানন্দদায়ক স্থান, শান্ত, শাশ্বত, যেখানে স্বয়ং প্রভু সদাশিব বিরাজমান, সেই প্রভু শিবই ব্রহ্মা সহ সকল দেবতাদের দ্বারা বন্দনীয় হন, তিনি যোগীব্যক্তিদের একমাত্র পরম লক্ষ্যবস্তু, যা পরমপদ নামে বিখ্যাত, যেখানে সাধকেরা পৌঁছে গেলে সংসার থেকে মুক্ত হয়ে যায়, আর কখনো সংসারে ফিরতে হয় না।
🔍🔸 লক্ষ্য করুন, সূর্য চন্দ্র নক্ষত্র অগ্নি যেখানে নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শন করতে পারে না, সেই স্থানে অবস্থিত পরমেশ্বর সদাশিব বন্দিত হন - ব্রহ্মা সহ অন্যান্য দেবতাদের দ্বারা , সেই স্থানকেই পরমপদ বলা হয়েছে । সেই পদকেই যোগীদের একমাত্র পরম লক্ষ্যবস্তু বলা হয়েছে। সেই পদে স্থিত হলে সংসার থেকে মুক্ত হয়ে যায় সাধক, একথাই বলা হয়েছে।
🛑 আবার, দেখুন এই ব্যাখ্যাকে পুরাণেও স্পষ্ট করে প্রামাণিক ঘোষণা করেছে।
♦️ স্কন্দ মহাপুরাণের সূত সংহিতার যজ্ঞবৈভবখণ্ড/উপরিভাগ/(ব্রহ্মগীতা) ৭ অধ্যায়/ ৪৫-৪৭ শ্লোকে বলা হয়েছে —
ন তত্র সূর্যশ্চন্দ্রশ্চ তারকা বিদ্যুতোঽনলঃ ।
বিভান্তি শঙ্করে সাক্ষাৎ স্বয়ংভানে চিদাত্মকে ॥ ৪৫
তমেব সকলং ভান্তমনুভাতি স্বভাবতঃ ।
তস্য ভাসা সর্বমিদং বিভাতি তত এব হি ॥ ৪৬
ন তত্র চন্দ্রার্কবপুঃ প্রকাশতে ন
বান্তি বাতাঃ সকলাশ্চ দেবতাঃ ।
স এষ দেবঃ কৃতভূতভাবনঃ
স্বয়ং বিশুদ্ধো বিরজঃ প্রকাশতে ॥ ৪৭
[স্কন্দ মহাপুরাণ/সূত সংহিতা/যজ্ঞবৈভবখণ্ড/উপরিভাগ/(ব্রহ্মগীতা) ৭ অধ্যায়/৪৫-৪৭ শ্লোক]
✅ অনুবাদ : সেই শঙ্কর (সদাশিব) কে সূর্য, চন্দ্র, তারা, বজ্র-বিদ্যুৎ, অগ্নি আদি কেউই প্রকাশ দিতে সক্ষম নন, সেই পরমেশ্বর শম্ভু তো স্বয়ং চিদাত্মক জ্ঞানস্বরূপ। তিনি স্বভাবতঃ ভাসিত হন বলেই তার উপর সকল কিছু ভাসিত হচ্ছে। শিবের প্রকাশের কারণেই এই সব কিছু ভাসিত হচ্ছে । এই কারণে তাকে বিষয় করে চন্দ্র তথা সূর্যের বিম্ব প্রকাশ করতে পারে না । বায়ুও তার কাছে প্রবাহিত হতে সক্ষম নন, সমস্ত দেবতা পরম শিব কে বিষয় (প্রভাবিত) করতে সক্ষম নয়। সব প্রাণীগণের কল্যাণকারী সেই মহাদেব নিজের শুদ্ধ নির্মল স্বভাব দ্বারা ভাসিত হন ।
🔍 বিশ্লেষণ : কঠ উপনিষদ ও মুণ্ডক উপনিষদে বর্ণিত যে স্থান ও ব্রহ্মের কথা বলা হয়েছে সেটি নিশ্চিত ভাবে একমাত্র পরমেশ্বর শিবকেই বোঝানো হয়েছে, তা
ভস্ম জাবাল উপনিষদ, রুদ্রহৃদয় উপনিষদ, নৃসিংহপূর্বতাপনী উপনিষদের মন্ত্রই স্পষ্ট ভাবে প্রমাণ করেছে। তারই সাথে পুরাণ শাস্ত্রের বচনও একই সিদ্ধান্ত দিয়েছে। এই মন্ত্রের সাথে অনান্য শাস্ত্রের বচনের মিল পাওয়া গিয়েছে ।
______________________________________________
এবার পুরাণ অনুসারে সমস্ত লোকের ঊর্ধ্বে কোন লোক রয়েছে সেটি আরো স্পষ্ট ভাবে দেখা যাক।
দেখুন —
॥ সনৎকুমার উবাচ ॥
বিধিলোকাত্পরো লোকো বৈকুণ্ঠ ইতি বিশ্রুতঃ ।
বিরাজতে মহাদীপ্ত্যা যত্র বিষ্ণুঃ প্রতিষ্ঠিতঃ ॥ ৩৪
তস্যোপরিষ্টাত্কৌমারো লোকো হি পরমাদ্ভুতঃ ।
সেনানীঃ শম্ভুতনয়ো রাজতে য়ত্র সুপ্রভঃ ॥ ৩৫
ততঃ পরমুমালোকো মহাদিব্যো বিরাজতে ।
যত্র শক্তির্বিভাত্যেকা ত্রিদেবজননী শিবা ॥ ৩৬
পরাত্পরা হি প্রকৃতী রজঃসত্ত্বতমোময়ী ।
নির্গুণা চ স্বয়ং দেবী নির্বিকারা শিবাত্মিকা ॥ ৩৭
তস্যোপরিষ্টাদ্বিঞ্জেয়ঃ শিবলোকঃ সনাতনঃ ।
অবিনাশী মহাদ্বিব্যো মহাশোভান্বিতঃ সদা ॥ ৩৮
বিরাজতে পরম ব্রহ্ম যত্র শম্ভুর্মহেশ্বরঃ ।
ত্রিদেবজনকঃ স্বামী সর্বেষাং ত্রিগুণাৎপরঃ।।৩৯
তত ঊর্ধ্বং ন লোকাশ্চ গোলোকস্তৎ সমীপতঃ ।
গোমাতরঃ সুশীলাখ্যাস্তত্র সন্তি শিবপ্রিয়াঃ ॥ ৪০
তত্পালঃ কৃষ্ণনামা হি রাজতে শঙ্কর আজ্ঞয়া।
প্রতিষ্ঠিতঃ শিবেনৈব শক্ত্যা স্বচ্ছন্দচারিণা ॥ ৪১
শিবলোকোহদ্ভুতো ব্যাস নিরাধারো মনোহরঃ ।
তথানির্বচনীয়শ্চ নানাবস্তুবিরাজিতঃ ॥ ৪২
শিবস্তু তদধিষ্ঠাতা সর্বদেবশিরোমণিঃ ।
বিষ্ণুব্রহ্মহরৈঃ সেব্যঃ পরমাত্মা নিরঞ্জনঃ ॥ ৪৩
[তথ্যসূত্র : শিবমহাপুরাণ/উমাসংহিতা/অধ্যায় ১৯ ]
✅ অর্থ — ব্রহ্মলোকের ওপর দীপ্তমান শ্রেষ্ঠ বৈকুন্ঠলোক অবস্থিত এবং সেখানে বিষ্ণু নিবাস করে ॥ ৩৪
তার ওপর অত্যন্ত অদ্ভুত কৌমারলোক অবস্থিত, যেখানে মহাতেজস্বী শম্ভুপুত্র কার্তিকেয় নিবাস করেন ॥ ৩৫
তার ওপর পরম দিব্য উমালোক অবস্থিত, যেখানে ত্রিদেবের জননী একমাত্র মহাশক্তি শিবা বিরাজ করেন ॥ ৩৬
সেই দেবী (শিবা/দুর্গা/মহাপার্বতী) স্বয়ং পরাৎপরা প্রকৃতি, সত্ত্ব, রজ, তমোময়ী, শিবাত্মিকা নির্গুণা-নির্বিকার ॥ ৩৭
তারও ওপরে সনাতন, অবিনাশী, পরম দিব্য তথা সর্বদা মহান ও শোভাযুক্ত শিবলোকের অবস্থান বলে জানবে ॥ ৩৮
যেখানে ত্রিদেব উৎপন্নকারী, সবার স্বামী ও ত্রিগুনাতীত পরমব্রহ্ম সদাশিব নিবাস করেন ॥ ৩৯
তার ওপর আর কোনো লোক নেই। তার সমীপে নিচের দিকে গোলোক অবস্থিত যেখানে সুশীলা নামক শিবের প্রিয় গোমাতাগণ নিবাস করেন ॥ ৪০
সেই গাভিদের পালন করার জন্য(রক্ষাকর্তা হিসেবে) শ্রীকৃষ্ণ শিব আজ্ঞায় সেখানে নিবাস করেন। পরম স্বতন্ত্র শিবই কৃষ্ণ কে নিজ শক্তি দ্বারা সেখানে অধিষ্ঠিত করেছেন ॥ ৪১
হে ব্যাস ! সেই শিবলোক অদ্ভুত, নিরাধার, মনোহর, অনির্বচনীয় ও অনেক বস্তু দ্বারা সুশোভিত ॥ ৪২
সব দেবতাদের শ্রেষ্ঠ, ব্রহ্মা-বিষ্ণু-হর দ্বারা সেবিত, পরমাত্মা ও নির্বিকার শিব সেই লোকে অবস্থান করেন ॥ ৪৩
পুরাণের বছর দ্বারা প্রমাণিত হলো যে শিবলোক অনান্য সমস্ত লোকের ঊর্ধ্বে অবস্থিত, এই শিবলোকের ঊর্ধ্বে আর অন্য কোনো লোক নেই সেটিও প্রমাণিত।
______________________________________________
☀️ পর্যবেক্ষণের ফলাফল :
উক্ত কঠ উপনিষদ ও মুণ্ডক উপনিষদের আলোচ্য বৈদিক মন্ত্রে যে একমাত্র উমাপতি পরমেশ্বর শিবের মাহাত্ম্যই রয়েছে, তা বেদ স্বীকার করেছে এবং পুরাণও শাস্ত্র স্বীকার করে নিয়েছে। উপরোক্ত পুরাণ শাস্ত্রের শ্লোকের উপর বেদের অর্থাৎ শ্রুতিশাস্ত্রের সমর্থন পাওয়া গিয়েছে । তাই এই শ্লোকগুলি যে চিরাচরিত সত্য তা দিনের আলোর ন্যায় পরিষ্কার।
কেননা ব্যাস সংহিতায় বলা হয়েছে,
মহর্ষি ব্যাসদেব তার ব্যাস সংহিতা ১.৪ তে বলেছেন —
শ্রুতি স্মৃতি পুরাণানাং বিরোধো যত্র দৃশ্যতে ।
তত্র শ্রৌতং প্রমাণস্তু তয়োর্দ্বৈধে স্মৃতিব্বরা ॥ ৪
(তথ্যসূত্র - ব্যাস সংহিতা/১ম অধ্যায়/৪ নং শ্লোক)
✅ অর্থ : যেখানে শ্রুতি, স্মৃতি ও পুরাণের বিরোধ দেখা যায়, সেখানে শ্রুতির কথনই বলবান এবং যেস্থলে স্মৃতি ও পুরাণের বিরোধ দেখা যায়, সেখানে স্মৃতির কথনই বলবান।
সুতরাং, দেখা যাচ্ছে যে, বেদের সহিত পুরাণ শাস্ত্রের বাক্যের উপর সমর্থন রয়েছে। তাই এই শ্লোকগুলির অর্থ নিঃসন্দেহে গ্রহণযোগ্য।
তাই পুরাণের এই বেদসম্মত প্রামাণিক নির্দেশ বাক্য কে অশ্রদ্ধা করে অমান্য করে বেদের নামে বেদমন্ত্রের উপর মনগড়া কাল্পনিক ব্যাখ্যা করলে তার মতো অধার্মিককে দেখে বেদও ভয় পান,
🛑 মহাভারত থেকে প্রমাণ দেখুন 👇
ইতিহাসপুরাণাভ্যাং বেদং সমুপবৃংহয়েৎ।
বিভেত্যল্পশ্রুতাদ্বেদো মাময়ং প্রহরিষ্যতি ॥২২৯
[তথ্যসূত্র : মহাভারত/আদিপর্ব/অধ্যায় ১/২২৯ নং শ্লোক]
✅ অর্থ — ইতিহাস ও পুরাণশাস্ত্র দ্বারা বেদকে বর্ধিতপূর্বক ব্যাখ্যা করবে; নইলে 'এ আমাকে প্রহার করবে' এটি ভেবে বেদ অজ্ঞ লোক হতে ভয় পেয়ে থাকেন ॥২২৯
🔸 ব্যাখ্যা - ইতিহাস ও পুরাণশাস্ত্র পাঠ করলে তা থেকে বিভিন্ন পুরাতন কাহিনী জানা যাবে, যেমন - প্রাচীন ঋষি-মুনি সহ বিভিন্ন মহাপুরুষদের জীবন যাপন, তাদের বেদ পাঠের মাধ্যম, বেদবাণীর সঠিক প্রয়োগ, দেবতা তথা পরমেশ্বরের বিভিন্ন লীলা ও রীতিনীতি সম্পর্কে অবগত হওয়া যায়। এই পুরাণ সম্পর্কে অবগত না হয়ে যে ব্যক্তি বেদ পাঠ করে, সে বেদবাণীর ভুল অর্থ বের করে, ভুল ব্যাখ্যা বের করে প্রচার করে এবং সেই নিজস্ব ধারণায় পুষ্ট ভ্রমটিকেই সত্য বলে ভাবে। ফলে বেদ বানীর অর্থ বিকৃত হয়ে সমাজে ঐ বিকৃত অর্থ ছড়িয়ে সাধারণ মানুষকেও ভুল পথে পরিচালিত করে, ধর্মের প্রকৃত অর্থ প্রচারের স্থানে ত্রুটিপূর্ণ অর্থ প্রচার হলে, এতে ধর্মের অবনতি হয়। তাই উপমা হিসেবে বলা হয়েছে যে এধরণের ব্যক্তিদের কে বেদ ভয় করেন। কারণ, বেদের বাণী বিকৃত করার অর্থ এতে বেদের উপর আঘাত করা বোঝানো হয়েছে।
তাই যারা উক্ত বৈদিক মন্ত্রের অর্থ কে বেদ ও পুরাণশাস্ত্রের প্রাচীন বৃত্তান্ত অনুসারে ব্যাখ্যা না করে নিজেদের মনের মতো করে ব্যাখ্যা করে চলেছে সেইসব অধার্মিক বৈষ্ণব, স্মার্ত আদি শঙ্করাচার্য্যবাদী, নিরাকারবাদী আর্যসমাজীদের স্বয়ং বেদই সহ্য করতে পারেন না।
♦️ বেদকে সর্বদা পুরাণ শাস্ত্র অনুযায়ী ব্যাখ্যা করা উচিত, গৌতমধর্ম সূত্র বলছে —
তস্য চ ব্যবহারো বেদোধর্মশাস্ত্রাণ্যঙ্গান্যুপবেদাঃ পুরাণম।
[তথ্যসূত্র : গৌতম ধর্মসূত্র (বেদাঙ্গশাস্ত্র)/১১/১৯]
✅ অর্থ — বেদ, ধর্মশাস্ত্র (স্মৃতি), অঙ্গ (কল্প বেদাঙ্গ) ও পুরাণশাস্ত্রের ভিত্তিতে ন্যায়বিচার হওয়া উচিত।
তাই যে ব্যক্তি শাস্ত্রের দেওয়া বিধানকে শ্রদ্ধাসহিত মান্য না করে নিজের ইচ্ছামত শাস্ত্রের বিধানের সাথে অপব্যবহার করে তাদের মতো অপব্যাখ্যাকারীদের উদ্দেশ্যে
শ্রীমদ্ ভগবদ্গীতা বলছে —
যঃ শাস্ত্রবিধিমুৎসৃজ্য বর্ততে কামকারতঃ।
ন স সিদ্ধিমবাপ্নোতি ন সুখং ন পরাং গতিম্ ॥ ২৩
[তথ্যসূত্র – ভগবদ্ গীতা/অধ্যায় ১৬/২৩ নং শ্লোক]
✅ অর্থ — যে ব্যক্তি শাস্ত্রের দেওয়া আদেশ মান্য না করে নিজের যা ইচ্ছা তাই করে, সেই ব্যক্তি না কোনো সুখ পান আর না তার পরমগতি (মুক্তিলাভ) হয় ॥ ২৩
______________________________________________
🔥 সিদ্ধান্ত :
আর্যসমাজীদের ভাষ্য, বৈষ্ণবদের ভাষ্য, আদিশঙ্করাচার্যের ভাষ্য তথা অশৈবদের তথাকথিত ভাষ্য অনুযায়ী, যেহেতু উক্ত ব্রহ্ম একমাত্র শিব নন, সুতরাং তাদের উক্ত ভাষ্য সিদ্ধান্ত বেদবিরুদ্ধ বলে প্রমাণিত হওয়ায় তা অগ্রহণযোগ্য।
একমাত্র বেদসম্মত শৈব ব্যাখ্যা ও সিদ্ধান্ত সর্বজন মান্য, এই সিদ্ধান্ত ই একমাত্র সমগ্র সনাতন ধর্মের সর্বোপরি সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত।
☘️ এবার আলোচ্য বেদমন্ত্রের সঠিক অর্থ হল দেওয়া হল —
♦️ কঠ উপনিষদের ২য় অধ্যায়ের ২য় বল্লীর ১৫ নং মন্ত্রে বলা হয়েছে —
ন তত্র সূর্যো ভাতি ন চন্দ্রতারকং নেমা বিদ্যুতো ভাস্তি কুতোহয়মগ্নিঃ। তমেব ভান্তমনুভাতি সর্বং তস্য ভাসা সর্বমিদং বিভাতি ॥”
[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/কঠ উপনিষদ/২য় অধ্যায়/২য় বল্লী/১৫ নং মন্ত্র]
✅ অনুবাদ : সেখানে শিবের কাছে শিবলোকে সূর্য দীপ্তি প্রদান করেন না, চন্দ্র, তারা, এমনকি বিদ্যুৎও নন। তাই, অগ্নি কিভাবে দীপ্তি দিতে পারে ? শিবের জ্যোতির দ্বারাই সবকিছু জ্যোতির্ময় হয়ে আছে, তাঁরই প্রকাশিত আলোক দ্বারাই সবকিছু আলোকিত ।
♦️ মুণ্ডক উপনিষদেও এই একই শ্রুতি মন্ত্রতেও এই কথা বলা হয়েছে —
ন তত্র সূর্যো ভাতি ন চন্দ্রতারকং
নেমা বিদ্যুতো ভান্তি কুতোহয়মগ্নিঃ।
তমেব ভান্তমনুভাতি সর্বং তস্য ভাসা সর্বমিদং বিভাতি ॥
[মুণ্ডক উপনিষদ/২ মুণ্ডক/২য় অধ্যায়/১০ নং মন্ত্র]
✅ অনুবাদ : সেখানে শিবের কাছে শিবলোকে সূর্য চন্দ্র বা তারা কিরণ দেয় না এবং এই বিদ্যুৎও নয় তবে এই অগ্নি কীভাবে জ্বলবে ? সেই পরমাত্মা শিব প্রকাশিত বলেই জগত প্রকাশিত হয় এবং তাঁর জ্যোতিতেই এই সমস্ত কিছু জ্যোতিষ্মান।
______________________________________________
শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্ 🚩
ॐ নমঃ পার্বতীপতয়ে হর হর মহাদেব 🚩
✒️ সত্য উন্মোচনে : শৈব প্রতিষ্ঠান শিবালয় প্রতিষ্ঠাতা শিবদ্বারাধীশাধ্যক্ষ আচার্যপরমাধিকারী শ্রীগুরু নন্দীনাথ শৈব আচার্যদেব জী
© কপিরাইট ও প্রচারে : Shivalaya
#শৈবধর্ম #হিন্দুধর্ম #Shivalaya #সনাতনধর্ম #শিবালয় #হরহরমহাদেব #শিব #নন্দীনাথশৈব #শ্রীনন্দীনাথশৈবাচার্য #NandiNathShaiva #শৈবভাষ্য #বেদেরনিরপেক্ষভাষ্য #উপনিষদ #পরমেশ্বরশিব #বেদ

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন