হনুমান — শিবের বিভূতি নাকি স্বয়ং শিব ?



 হনুমান  শিবের বিভূতি নাকি স্বয়ং শিব ? 

_________________________________________________

🔰 ভূমিকা — 

মহাবলী হনুমানজীকে নিয়ে সনাতন সমাজে বহু মত, বহু বিশ্বাস এবং বহু প্রচলিত ধারণা রয়েছে। কেউ তাঁকে ভগবান শিবের স্বয়ং অবতার বলেন, আবার কেউ তাঁকে রুদ্রের অংশস্বরূপ বিভূতি বা শিবপুত্র বলে বর্ণনা করেন। একইভাবে ভগবান শিবের মোহিনী দর্শন ও হনুমানজীর আবির্ভাব সম্পর্কেও বিভিন্ন ব্যাখ্যা প্রচলিত রয়েছে, যার ফলে অনেক ভক্তের মনেই নানা প্রশ্ন ও সংশয় জন্ম নেয়।

এই আলোচনায় কোনো সম্প্রদায়গত মতকে প্রতিষ্ঠা করার পরিবর্তে, বিভিন্ন পুরাণে বর্ণিত শাস্ত্রীয় প্রমাণগুলিকে একত্রে উপস্থাপন করা হয়েছে। বিশেষভাবে শিবমহাপুরাণ, স্কন্দ মহাপুরাণ, ব্রহ্মাণ্ড মহাপুরাণ এবং বাল্মীকি রামায়ণ-এর প্রাসঙ্গিক শ্লোক ও তাদের অর্থের আলোকে বিষয়গুলি বিচার করা হয়েছে।

এখানে আমরা পর্যায়ক্রমে দেখব — শিবমহাপুরাণে হনুমানজীর আবির্ভাব কীভাবে বর্ণিত হয়েছে, ভগবান শিবের মোহিনী-লীলা সম্পর্কে অন্যান্য পুরাণ কী ব্যাখ্যা দিয়েছে, হনুমানজী শিবের অংশস্বরূপ নাকি স্বয়ং শিব — এই প্রশ্নে বিভিন্ন শাস্ত্র কী সাক্ষ্য প্রদান করেছে, নন্দীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক প্রসঙ্গে পুরাণ শাস্ত্র কী বলে, শ্রীরামের অবতারে তাঁকে কেন সহায়ক রূপে আবির্ভূত হতে হয়েছিল, এবং পরবর্তীকালে হনুমন্তেশ্বর মহাদেব প্রতিষ্ঠার কাহিনির মাধ্যমে তাঁর জীবনলীলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় কীভাবে প্রকাশিত হয়েছে।

আসুন, ব্যক্তিগত মত বা প্রচলিত ধারণার পরিবর্তে সনাতন ধর্মের শাস্ত্রের সাক্ষ্য ও প্রমাণের আলোকে এই বিষয়গুলির বিচার করি।

_________________________________________________

♦️ শিব মহাপুরাণে হনুমান রুদ্রের তেজ থেকে প্রকট হয়েছেন —


একস্মিন্সময়ে শম্ভুরদ্ভুতোতিকরঃ প্রভুঃ ।
দদর্শ মোহিনীরূপং বিষ্ণোঃ স হি বসদ্‌গুণঃ ॥ ৩॥

চক্রে স্বং ক্ষুভিতং শম্ভুঃ কামবাণহতো যথা ।
স্বং বীর্য্যপ্পাতয়ামাস রামকার্য‌ার্থ‌মীশ্বরঃ ॥ ৪ ॥

তদ্বীর্য্য স্থাপয়ামাসুঃ পত্রে সপ্তর্ষয়শ্চ তে ।
প্রেরিতা মনসা তেন রামকার্য‌ার্থ‌মাদরাৎ ॥ ৫ ॥

তৈর্গোতমসুতায়াং তদ্বীর্য্য শম্ভোর্মহর্ষিভিঃ।
কর্ণদ্বারা তথাঞ্জন্যাং রামকার্য‌ার্থ‌মাহিতম্ ॥ ৬ ॥

ততচ সময়ে তস্মাদ্ধনুমানিতি নামভাক্ ।
শম্ভুর্জজ্ঞে কপিতনুর্মহাবলপরাক্রমঃ ॥ ৭॥

[শিবমহাপুরাণ/শতরুদ্র সংহিতা/অধ্যায় ২০]

✅ অর্থ : এক সময় অত্যন্ত আশ্চর্য লীলা সম্পাদনকারী এবং সর্বগুণসম্পন্ন ভগবান শিব, বিষ্ণুর মোহিনী রূপ দর্শন করেছিলেন ॥ ৩ ॥

সেই মোহিনী রূপ দেখামাত্র, যেন কামদেবের বাণে বিদ্ধ হয়ে, শম্ভু নিজের মনকে বিচলিত করলেন এবং সেই ঈশ্বর রুদ্র শ্রীরামের কার্যের জন্য নিজের [ঘর্ম] তেজের প্রকাশ করে দিলেন ॥ ৪ ॥

শিবের মনের প্রেরণায় অনুপ্রাণিত হয়ে সপ্তর্ষিগণ তাঁর সেই [রুদ্রের দেহের ঘর্মময়] তেজকে শ্রী রামের কার্যের জন্য শ্রদ্ধার সঙ্গে একটি পত্রের উপর স্থাপন করলেন ॥ ৫ ॥

এরপর সেই মহর্ষিগণ শম্ভুর সেই তেজকে শ্রী রামের কার্যের জন্য গৌতমের কন্যা অঞ্জনীর কানে মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করলেন ॥ ৬ ॥

সময় উপস্থিত হলে সেই শম্ভু-তেজ মহান বল ও পরাক্রমসম্পন্ন, বানর-শরীরধারী হয়ে হনুমান নামে প্রকাশিত হলেন ॥ ৭ ॥


♦️ বিশ্লেষণ : শিবমহাপুরাণ অনুযায়ী, হনুমানজীর জন্ম ভগবান শিবের অংশ থেকে হয়েছে।

কিন্তু আপনার মনে এই প্রশ্ন জেগে ওঠা স্বাভাবিক যে,

পরমেশ্বর শিব, যিনি আদিযোগী এবং মায়ার অতীত, তিনি কীভাবে মোহিনীর রূপ দেখে মোহিত হলেন ?

এই প্রশ্নের উত্তর আমরা স্কন্দমহাপুরাণ ও ব্রহ্মাণ্ড মহাপুরাণে আছে, যার ব্যাখ্যা পরবর্তী অংশে উপস্থাপন করা হয়েছে।

_________________________________________________

🔶 স্কন্দমহাপুরাণ-এ বলা হয়েছে —

পুনঃ কদাচিচ্ছ্রীকান্তো ন্যগ্রোধবন ঈশ্বরম্ ॥ ২৫

আরাধ্যাস্মাদ্ বরং বদ্রে প্রসন্নাৎ পার্বতীপতেঃ ।

ত্বয়া রন্তুমপেক্ষেশাধুনা ভূত্বা রমণ্যহম্ ॥ ২৬

দেয়ো বরো মমাধীশ প্রসন্নো যদি শঙ্কর ।

দত্বৈবমীশ্বরস্তস্মৈ বরমন্তর্ধিমায়যৌ ॥ ২৭

ততস্তু কারণে দেবমমৃতং ক্ষীরসাগরাৎ ।

গৃহীতমসুরৈর্ বিষ্ণুর্ মোহিন্যাকারমাস্থিতঃ ॥ ২৮

তেনাসুরান্ মোহয়িত্বা পায়য়িত্বামৃতং সুরান্ ।

ঊর্ধ্বরেতসমীশানমপি মোহমুপানযৎ ॥ ২৯

রমমাণো মহেশেন মোহিন্যাকারমস্থিতঃ ।

লেভে চ পুত্রং শাস্তারং কামারাতেরপীশ্বরাৎ ॥ ৩০

[স্কন্দ মহাপুরাণ/শঙ্কর সংহিতা/শিব রহস্য খণ্ড/উপদেশ কাণ্ড/অধ্যায় ৬৬]

✅ অর্থ — একসময় ন্যগ্রোধ অরণ্যে শ্রীকান্ত ভগবান বিষ্ণু - পরম ঈশ্বর শিবের উপাসনা করলেন এবং শিব সন্তুষ্ট হলে পার্বতীপতির কাছে একটি বর প্রার্থনা করলেন। শ্রীবিষ্ণু প্রার্থনা করে বললেন —

“হে প্রভু ! যদি আপনি সন্তুষ্ট হন, তবে আমায় এই বর দিন — আমি আপনার সঙ্গে মিলন-রস ভাব অনুভব করবার জন্য এক অতুল সুন্দরী নারীর রূপ ধারণ করতে চাই।”

ভগবান শংকর সেই বর প্রদান করলেন এবং তারপর অন্তর্ধান করলেন ॥ ২৫–২৭ 

পরবর্তীতে দেব-দানবরা যখন অমৃত লাভের জন্য ক্ষীরসাগর সমুদ্র মন্থন করল, তখন অমৃত দানবরা ছিনিয়ে নিল। তাদের প্রতারণা করার জন্য ভগবান বিষ্ণু মোহিনী রূপ ধারণ করলেন। সেই মায়ার মোহে পড়ে দানবরা প্রতারিত হল এবং দেবতারা অমৃত পান করতে সক্ষম হল।

এমনকি রুদ্র — যিনি সাধারণত জাগতিক কামনা-বাসনার অতীত — তিনিও মোহিনীর এই রূপে মুহূর্তের জন্য নিজের দেওয়া বরদানের কারণেই মোহিত হলেন। বিষ্ণুর নারী অবতাররূপী মোহনীর সঙ্গে মিলন-আনন্দে নিমগ্ন হয়ে রুদ্র এক পুত্রের জন্ম দিলেন।

এইভাবে জন্মলেন শাস্তা (লোকমতে নাম - আয়াপ্পা) — কামদেবের শত্রু রুদ্রের পুত্র, যিনি মোহিনী রূপী বিষ্ণুর দৈব সংযোগে আবির্ভূত ॥ ২৮–৩০ 


🔍 বিশ্লেষণ : 

স্কন্দ মহাপুরাণ অনুযায়ী, ভগবান বিষ্ণু ভগবান রুদ্রের আরাধনা করে তাঁর নিকট এই বরদান প্রার্থনা করেন যে, তিনি যেন এক অত্যন্ত সুন্দর নারীর রূপ ধারণ করতে পারেন। ভগবান রুদ্র তাঁর ভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে এই বরদান প্রদান করেন।

পরবর্তীতে, যখন সমুদ্র মন্থনের সময় অসুররা অমৃতের কলশ নিয়ে দেবতাদের সঙ্গে প্রতারণা করে পালিয়ে যায়, তখন ভগবান বিষ্ণু সেই মোহিনী রূপ ধারণ করেন, যা তিনি রুদ্রের কাছ থেকে পেয়েছিলেন। এই মোহিনী রূপের মাধ্যমে তিনি অসুরদের মোহিত করে অমৃত পুনরুদ্ধার করেন এবং দেবতাদের পান করান।


🔶 ব্রহ্মাণ্ড মহাপুরাণে বলা হয়েছে 

এতস্মিন্নন্তরে বিষ্ণুঃ সর্বলোকৈকরক্ষকঃ।

সম্যগারাধয়ামাস ললিতাং স্বৈক্যরূপিণীম্ ॥ ৪ ॥

ভগবানপি যোগীন্দ্রঃ সমারাধ্য মহেশ্বরীম্।

তদেকধ্যানযোগেন তদ্রূপঃ সমজায়ত ॥ ৭ ॥

সর্বসম্মোহিনী সা তু সাক্ষাচ্ছৃঙ্গারনায়িকা।

সর্বশৃঙ্গারবেষাঢ্যা সর্বাভরণভূষিতা ॥ ৮ ॥

সুরাণামসুরাণাং চ নিবার্য রণমুল্বণম্।

মন্দস্মিতেন দৈত্যান্ মোহয়ন্তী জগাদ হ ॥ ৯॥

[ব্রহ্মাণ্ড পুরাণ/উত্তরপাদ (৪)/ [ললিতোপাখ্যান] অধ্যায় ১০/৪,৭-৮ নং শ্লোক]

✅ অর্থ : এই সময়ে, সমগ্র লোকের একমাত্র রক্ষক ভগবান বিষ্ণু নিজের স্বরূপের সঙ্গে একাত্ম ললিতা দেবীকে আরাধনা করে সন্তুষ্ট করলেন ॥ ৪ ॥

যোগীদের মধ্যে নেতারূপ ভগবান বিষ্ণু মহেশ্বরীকে সন্তুষ্ট করলেন। কেবল তাঁর (ললিতার) ধ্যান করেই তিনি তাঁর মতোই ললিতারূপী সুন্দর রূপ ধারণ করলেন ॥ ৭ ॥

[ঐ মোহিনীরূপ ধারণ করে] তিনি সকলকে মোহিত ও মন্ত্রমুগ্ধ করে দিতেন, তিনি প্রেমভাবের যেন স্বয়ং নায়িকা ছিলেন। তিনি আকর্ষণীয় বস্ত্র পরিধান করেছিলেন এবং সকল অলংকারে সুশোভিতা ছিলেন ॥ ৮ ॥

যুদ্ধক্ষেত্রে যুদ্ধরত দেবতা ও দানবদের সরিয়ে (আলাদা করে) মহাদেবী মৃদু হাস্যে দানবদের মোহিত করলেন [ও তাদের উদ্দেশ্যে বললেন] — ॥ ৯ ॥


🔍 বিশ্লেষণ : ব্রহ্মাণ্ড পুরাণে একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপিত হয়েছে। এর মতে, ভগবান বিষ্ণু মাতা ললিতা ত্রিপুরসুন্দরীর ধ্যান করে তাঁর কাছ থেকে মোহিনী রূপ লাভ করেন, যা স্বয়ং মাতারই সৌন্দর্যময় রূপ। তাই যখন ভগবান রুদ্রদেব মোহিনী রূপ দেখে মোহিত হয়েছিলেন, তখন তিনি প্রকৃতপক্ষে নিজেরই পত্নীর দিব্যরূপ দর্শন করছিলেন, বিষ্ণুকে দেখে নয়।

_________________________________________________

এখন আমরা এই বিষয়টি বিবেচনা করবো যে, 

🔥 মহাবলী হনুমান জী ভগবান রুদ্রের অংশস্বরূপ বিভূতি পুত্র, না কি তিনি স্বয়ং শিবই ?

✅ উত্তর দেখুন — 

সর্বথা সুখিনং চক্রে সরামং লক্ষ্মণং হি সঃ।

সর্বসৈন্যং ররক্ষাসৌ মহাদেবাত্মজঃ প্রভুঃ ॥ ৩২

[শিবমহাপুরাণ শতরুদ্র সংহিতা অধ্যায় ২০/৩২ নং শ্লোক]

✅ অর্থ : এইভাবে মহাদেবের পুত্র, সেই প্রভু হনুমানজী লক্ষ্মণসহ শ্রীরামকে সর্বপ্রকারে সুখী করেছিলেন এবং সমগ্র সেনাবাহিনীর রক্ষা করেছিলেন ॥ ৩২ 


🔍বিশ্লেষণ - শ্লোকে মহাদেবাত্মজ উল্লেখ হয়েছে। 

মহাদেবাত্মজ শব্দটি দুটি অংশে গঠিত —

মহাদেব = ভগবান শিব।

আত্মজ = আত্ম থেকে জন্মগ্রহণকারী, পুত্র, সন্তান।


আত্মজ শব্দের ব্যুৎপত্তি:

আত্মনঃ = নিজের/আত্মার।

জ = জন্মগ্রহণকারী (√জন্ ধাতু থেকে)।

 এখানে আত্মজ শব্দের প্রাথমিক ও সর্বাধিক প্রচলিত অর্থ "পুত্র"। তবে পুরাণে অনেক সময় আত্মজ শব্দটি অংশ থেকে উৎপন্ন, শক্তিজাত, বা তেজোজাত অর্থেও ব্যবহৃত হয়। তাই যদি কোনো গ্রন্থে হনুমানজীকে শিবের তেজ বা অংশ থেকে আবির্ভূত বলা হয়ে থাকে, তাহলে "মহাদেবাত্মজ" শব্দটি সেই প্রসঙ্গেও ব্যবহৃত হতে পারে। কিন্তু অভিধানগত অর্থ হলো— মহাদেবের পুত্র। তাই হনুমান হলেন মহাদেবাত্মজ, অর্থাৎ শিবের পুত্র। হনুমান কখনোই সাক্ষাৎ শিব নন।


✳️ আরো দেখুন 👇


দগ্ধ্বা লঙ্কাং বঞ্চয়িত্বা বিভীষণগৃহং ততঃ।

অপতদ্বারিধৌ বীরস্ততঃ স কপিকুঞ্জরঃ ॥ ২৫॥

স্বপুচ্ছং তত্র নির্বাপ্য প্রাপ তস্য পরং তটম্।

অখিন্নঃ স যযৌ রামসন্নিধিং গিরিশাংশজঃ ॥ ২৬॥

[শিবমহাপুরাণ/শতরুদ্র সংহিতা/অধ্যায় ২০/২৫-২৬ নং শ্লোক]

✅ অর্থ : এরপর সেই কপিশ্রেষ্ঠ বীর হনুমান কেবল বিভীষণের গৃহটি বাদ দিয়ে সমগ্র লঙ্কাকে দগ্ধ করে সমুদ্রে ঝাঁপ দিলেন ॥ ২৫ 

সেখানে নিজের লেজের আগুন নেভিয়ে, ভগবান গিরিশ-রুদ্রের অংশ থেকে উৎপন্ন তিনি সমুদ্রের অপর তীরে এসে আনন্দিত হয়ে শ্রীরামের নিকটে গেলেন ॥ ২৬ 


🔍 বিশ্লেষণ - শ্লোকে গিরিশাংশজ উল্লেখ হয়েছে।  গিরিশাংশজ এর পদচ্ছেদ ও অর্থ :

গিরিশ = গিরির (পর্বতের) ঈশ্বর, অর্থাৎ ভগবান শিব। 

অংশ = অংশ, অংশবিশেষ।

জ = জন্মগ্রহণকারী, উৎপন্ন।

এখানে "গিরিশাংশজঃ" শব্দটি ব্যাকরণগতভাবে "শিবের অংশ থেকে জন্মগ্রহণকারী" অর্থই প্রকাশ করে; "স্বয়ং গিরিশ (শিব)" অর্থ প্রকাশ করে না। যদি শাস্ত্রকারের উদ্দেশ্য হনুমানই স্বয়ং শিব—এ কথা বলা হতো, তবে সাধারণত "গিরিশঃ", "শিবঃ", "মহেশ্বরঃ", "রুদ্রঃ" ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করা হতো, "গিরিশাংশজঃ" নয়।

অতএব,

গিরিশাংশজঃ = গিরিশ (শিব)-এর অংশ থেকে জন্মগ্রহণকারী, শিবের অংশসম্ভূত, শিবাংশজাত। তাই হনুমান হলেন গিরিশাংশজঃ, অর্থাৎ শিবের পুত্র। হনুমান কখনোই সাক্ষাৎ শিব নন।

“শিব মহাপুরাণ-এ হনুমানজীকে শিব-পুত্র এবং ভগবান রুদ্রের অংশ বলে মানা হয়েছে। 

_________________________________________________

📜 হনুমান চালিসা-তেও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে —

‘শঙ্কর সুবন কেশরী নন্দন’ — যার অর্থ, হনুমানজী ভগবান শঙ্করের অংশস্বরূপ বিভূতি মাত্র।

কিন্তু আজকাল কিছু কট্টর বৈষ্ণব ব্যক্তি প্রভু শিবকে রামের চরণসেবক হিসেবে প্রচার করবার জন্য  ‘শঙ্কর সুবন’-এর পরিবর্তে ‘শঙ্কর স্বয়ং’ বলছেন, যা সম্পূর্ণ অসত্য।

♦️ বিভূতি দের দিয়ে কার্য‌ করিয়ে দেন রুদ্রদেব, স্বয়ং নিজে কখনোই কারোর সেবা করেন না। প্রমাণ দেখুন 👇 

ব্রহ্মা বিষ্ণুশ্চ রুদ্রস্য স্বাসাধারণরূপতঃ ।

স্ববিভূত্যাত্মনা চাপি  কুর্বাতে এব সেবনম্ ॥ ৫৫

রুদ্রঃ স্বেনৈব রূপেণ বিষ্ণোশ্চ ব্রহ্মণস্তথা ।

সেবনং নৈব কুরুতে বিভূতের্বা দ্বয়োরপি ॥ ৫৬

কেবলং কৃপয়া রুদ্রো লোকানাং হিতকাম্যয়া ।

স্ববিভূত্যাত্মনা বিষ্ণোর্ব্রহ্মণশ্চাপরস্য চ ॥ ৫৭

করোতি সেবাং হে বিপ্রাঃ কদাচিৎসত্যমীরিতম্ ।

ন তথা ব্রহ্মণা বিষ্ণুর্ণ ব্রহ্মা ন পুরন্দরঃ ॥ ৫৮

[স্কন্দমহাপুরাণ/সূতসংহিতা/যজ্ঞবৈভবখণ্ড/উত্তরার্দ্ধ/ (সূতগীতা) অধ্যায় ২]

✅ অর্থ — ব্রহ্মা তথা বিষ্ণু নিজের রূপ তথা অবতার নিয়ে সেই অবতার আদি বিভূতিরূপ ধরেও সর্বদা ভগবান রুদ্রের ভজনা করেন। রুদ্র কোনোভাবেও‌ এদের সেবা করেন না ।

কখনো কখনো শুধুমাত্র কৃপাবশত মানুষ কে হিত শেখাবার জন্য ব্রহ্মাদি কে পূজ্য বলেন বা নিজের অবতারাদি বিভূতিরূপ দ্বারা বিষ্ণু, ব্রহ্মাদির সেবা করে দেন মাত্র । 

কিন্তু বিষ্ণু-ব্রহ্মা কৃপাবশত শিবের পূজা করে দেন এমনটা নয় ॥ ৫৫-৫৮


সুতরাং, পরমেশ্বর শিব যে রামের ধ্যান করেন না তা প্রমাণিত হয়ে গেল । বরং জগতবাসী কে সাধন মার্গের দিকে আগ্রহ করবার জন্য ভগবান রুদ্রদেব ধ্যান করবার লোকাচার(অভিনয় কার্য‌) পালন করেন মাত্র।

পুরাণগুলিতে কোথাও হনুমানজীকে স্বয়ং শিব বলা হয়নি ; বরং তাঁকে রুদ্রের অংশস্বরূপ মাত্র বলা হয়েছে। তাই ‘শঙ্কর স্বয়ং’ বলা শুধু শাস্ত্রবিরুদ্ধ নয়, বরং সত্য থেকে সকলকে বিভ্রান্ত করাও বটে।

সঠিক শব্দ ‘শঙ্কর সুবন’-ই, যা শাস্ত্রীয় প্রমাণের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। এই সমস্ত প্রমাণ থেকে প্রতীয়মান হয় যে হনুমানজী ভগবান রুদ্রের অংশস্বরূপ, স্বয়ং শিব নন।

_________________________________________________

🔶 মহাবলী হনুমান প্রকৃতপক্ষে নন্দীর অবতার, এই নন্দী হলেন একাদশ রুদ্র গণের মধ্যে একজন। স্কন্দমহাপুরাণ থেকে প্রমাণ দেখুন — 


এবং সম্ভাষ্য ভগবান্ বিষ্ণুঃ পরমমঙ্গলঃ ॥

বালী চেন্দ্রাংশসম্ভূতঃ সুগ্রীবোংশুমতঃ সুতঃ ॥ ৯৮ ॥

তথা ব্রহ্মাংশসম্ভূতো জাম্ববান্নৃক্ষকুঞ্জরঃ ।

শিলাদতনয়ো নন্দী শিবস্যানুচরঃ প্রিয়ঃ ॥ ৯৯ ॥

যো বৈ চৈকাদশো রুদ্রো হনূমান স মহাকপিঃ ।

অবতীর্ণঃ সহয়ার্থং বিষ্ণোরমিততেজসঃ ॥ ১০০ 

[স্কন্দমহাপুরাণ/মাহেশ্বরখণ্ড/কেদারখণ্ড/অধ্যায় ৮]

✅ অর্থ : বালি ইন্দ্রতত্ত্ব থেকে অবতীর্ণ হয়েছিলেন এবং সুগ্রীব সূর্যপুত্ররূপে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। জাম্ববান, যিনি ব্রহ্মাংশ, তিনি বানররূপে অবতীর্ণ হয়ে সুগ্রীবের মন্ত্রী হয়ে ওঠেন।

যিনি শিবের অনুচর এবং একাদশ রুদ্রের মধ্যে অন্যতম, সেই শিলাদ নন্দন নন্দী অমিততেজা বিষ্ণুর সাহায্য করবার জন্য মহাকপি হনুমান রূপে অবতীর্ণ হলেন ॥ ৯৮-১০০ 

_________________________________________________

✳️ এছাড়াও বাল্মিকী রামায়ণে উল্লেখ করে বলা হয়েছে যখন মহাবলী মহাবীর হনুমান জী লঙ্কায় উপস্থিত হন তখন রাবণ আশঙ্কা করে ভাবছিলেন যে, এই বানর স্বয়ং নন্দী কি না,  দেখুন 👇 

শঙ্কাহতাত্মা দধ্যৌ স কপীন্দ্রং তেজসা বৃতম্ ।

কিমেষ ভগবান নন্দী ভবেৎ সাক্ষাদিহাগতঃ ॥ ২

যেন শপ্তোঽস্মি কৈলাসে ময়া প্রহসিতে পুরা ।..॥ ৩

[বাল্মীকি রামায়ণ/সুন্দরকাণ্ড/৫০ সর্গ/২-৩ শ্লোক]

✅ অর্থ : আশঙ্কায় পরিপূর্ণ হয়ে রাবণ সেই তেজস্বী কপিবর হনুমানের বিষয়ে ভাবতে ভাবতে বিচার করতে লাগলে, রাবণ ভাবলেন ‘ এই বানরের রূপ ধরে কি সাক্ষাৎ ভগবান নন্দী উপস্থিত হয়েছেন নাকি ?!! যে নন্দীকে পূর্বকালে কৈলাস পর্বতে আমি উপহাস করে অপমানিত করবার কারণে নন্দী আমাকে অভিশাপ দিয়েছিলেন, সেই নন্দী এখন এই লঙ্কা তে উপস্থিত হয়েছেন নাকি ?

_________________________________________________

“স্কন্দ মহাপুরাণ-এ স্পষ্ট উল্লেখিত হয়েছে যে, ভগবান শিবের পরম সেবক নন্দী মহারাজ-ই হনুমান রূপে অবতার গ্রহণ করেছিলেন। এর প্রমাণ আমরা বাল্মিকী রামায়ণ-এও পাই। যখন হনুমানজীকে লঙ্কায় রাবণের মহলে বন্দী করে উপস্থিত করা হয়েছিল, তখন রাবণের মনে এই ধারণা জন্মায় যে, এ সেই নন্দীই, যিনি একসময় তাকে অভিশাপ দিয়েছিলেন।”

আসলে, রাবণ পূর্বে নন্দীকে অপমান করেছিলেন এবং তাঁকে ‘বানর’ বলে উপহাস করেছিলেন। তখন নন্দী রাবণকে অভিশাপ দেন যে, তার বিনাশের কারণ এক বানরই হবে। যখন রাবণ হনুমানকে দেখলেন, তখন তার সেই অভিশাপের কথা মনে পড়ে গেল এবং তার মনে হলো যে নন্দী-ই বানররূপে তার সামনে উপস্থিত হয়েছেন।

এখন যদি কেউ বলে যে এই প্রমাণ ভুল, তবে তার বক্তব্য যুক্তিযুক্ত নয়। যখন স্কন্দ মহাপুরাণ-এর মতো মহাপুরাণে এটির উল্লেখ পাওয়া যায় এবং রামায়ণ-এও এর প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে, তখন এটিকে ভুল বলা যায় না।


এখন আমরা জানি যে নন্দী হোন বা স্বয়ং ভগবান রুদ্রই নিজের অংশস্বরূপ বিভূতি থেকে শ্রীরামের সহায়তার জন্য অবতার গ্রহণ করেছিলেন। 

কিন্তু প্রশ্ন ওঠে — এটি কেন প্রয়োজনীয় ছিল ? এই রহস্যটি  জেনে নিন ।

_________________________________________________

♦️ শিবমহাপুরাণে পরমেশ্বর শিব নিজেই বিষ্ণুকে অবতার গ্রহণ করে পৃথিবী কে অধর্ম মুক্ত করতে আদেশ দিয়েছিলেন। পরমেশ্বর সদাশিব আরো বলেছিলেন যে, যখন যখন বিষ্ণু দুঃসাধ্য কর্ম করতে অসমর্থ হবেন তখন তখন মহাদেব বিভূতি রূপকে প্রকট করে তার দ্বারা বিষ্ণুকে সহায়তা করবেন, দেখুন —

সহায়ং তে করিষ্যামি সর্বকার্যে চ দুঃসহে ।

তব শত্রূন্ হনিষ্যামি দুঃসাধ্যান্যরমোৎকটান্ ॥ ৩ ॥

বিবিধানবতারাংশ গৃহীত্বা কীর্তিমুত্তমাম্ ।

বিস্তারয় হরে লোকে তারণায় পরো ভব ॥ ৪ ॥

গুণরূপো হাহে রুদ্রো হানেন বপুষা সদা ।

কার্য করিষ্যে লোকানাং তবাশক্যং ন সংশয়ঃ ॥ ৫ ॥

[শিবমহাপুরাণ/রুদ্র সংহিতা/অধ্যায় ১০/৩-৫ নং শ্লোক]

✅ অর্থ : পরমেশ্বর সদাশিব বললেন, আমি সকল দুঃসাধ্য কর্মে তোমাকে (বিষ্ণুকে) সহায়তা করবো। তোমার জয় করা অসম্ভব ও অত্যন্ত প্রখর শত্রুদের আমি বিনাশ করবো, হে হরে। তুমি বিভিন্ন রকমের অবতার ধারণ করে জগতে তোমার উৎকৃষ্ট কীর্তির বিস্তার করো এবং সংসারে জীবদের উদ্ধারের জন্য সদা সচেষ্ট থাকো ॥ ৩-৪ 

আমি গুণরূপী রুদ্রদেব (কৈলাসপতি হর) হয়ে অবতার  ধারণ করে, নিশ্চয়ই সেই গুণাত্মক দেহ (রুদ্রের রুদ্রগণ) দ্বারা সেই সকল কর্ম সম্পাদন করবো, যে কর্ম তুমি করতে অসমর্থ হবে — এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই ॥ ৫ 


❇️ ব্যাখ্যা : শিব মহাপুরাণের বর্ণনা অনুযায়ী, পরমেশ্বর সদাশিব স্বয়ং ভগবান বিষ্ণুকে বরদান দিয়েছিলেন যে, তিনি বহু অবতার গ্রহণ করে সৃষ্টিতে ধর্ম প্রতিষ্ঠা করবেন এবং জগতের পালন করবেন। শিব এ কথাও প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, তিনি এই সকল কাজে বিষ্ণুকে সহায়তা করবেন এবং তাঁর শত্রুদের সংহার করবেন।

এই কারণেই, যখন ভগবান বিষ্ণু শ্রী রামের রূপে অবতার গ্রহণ করেন, তখন ভগবান সদাশিবও তাঁর কৈলাসপতি গুনাত্মক রুদ্রদেবের অংশ থেকে প্রকট হওয়া বিভূতিরূপ নন্দী তথা নন্দীর অংশস্বরূপ থেকে হনুমান রূপে অবতার নিয়ে রামচন্দ্র কে সহায়তা করেন। যেহেতু নন্দী রুদ্রেরই রুদ্রাবতার, আর রুদ্রতেজও রুদ্রস্বরূপ। তাই রুদ্রের তেজ নন্দীর অভিশাপ কে সত্য করতে নন্দীর অবতাররূপে আত্মপ্রকাশ করেছে, তাই হনুমান জী নন্দীর অবতার, সাক্ষাৎ শিব নয়। কারণ, পরমেশ্বর শিব হলেন গুণাতীত (গুণ - মায়া, মায়ার প্রভাব থেকে মুক্ত)। তিনি মায়ায় মোহিত হন না, কারণ যিনি সর্ব‌োচ্চ পরমসত্বা, তিনি কখনোই মায়ায় প্রভাবিত নন। তাই পরমেশ্বর সদাশিব বিষ্ণুকে বরদান দেওয়ার সময় স্পষ্ট করে বলেছিলেন যে, সদাশিব বিষ্ণুর সহায়তা করবেন গুনাত্মক রুদ্ররূপে। গুনাত্মক -এর অর্থ হল মায়ায় যিনি প্রভাবিত হতে পারেন, অর্থাৎ সদাশিব যেহেতু গুনাতীত, তাই সেই রূপে তিনি কোনো মায়ায় প্রভাবিত হবেন না, কিন্তু বিষ্ণুর সহায়তার জন্য সদাশিব গুনাত্মক রুদ্ররূপকে প্রকপ্ত করে, সেই রুদ্রের মাধ্যমে বিষ্ণুর সহায়তা করেছেন, আর রুদ্রদেব মায়ায় আবদ্ধ হয়েছেন নিজেরই বরদান রক্ষার্থথে।এতে শিব যে মায়ার প্রভাব থেকে মুক্ত, মায়াতীত সেটিও প্রমাণিত হল। আবার প্রয়োজনে শিব রুদ্রের অবতার রূপে জগতের কল্যাণার্থে‌ মায়ায় প্রভাবিত হয়েছেন সেটিও প্রমাণিত হল। এর দ্বারা পরমেশ্বর শিবের ক্ষমতার উপর কোন প্রশ্নই থাকে না, শিব - একদৃষ্টির বিচারে মায়ায় প্রবেশ করে মায়ায় প্রভাবিত হন লীলাবশত, আবার অন্যদৃষ্টির বিচারে দেখা যায় যে তিনি মায়ায় প্রবেশ করেও মায়া থেকে মুক্ত। এক কথায় সাক্ষাৎ সদাশিব স্বরূপে তিনি মায়ামুক্ত, আর রুদ্ররূপে লোকাচারবশত মায়ায় প্রভাবিত। এই কারণেই শিব অন্তহীন, তার কাছে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। তাই শিব নিষ্কলঙ্ক পরমব্রহ্ম।


এখন আসুন, আমরা পরবর্তী অংশে দেখি — মহাবীর হনুমান কীভাবে নিজের পাপ থেকে মুক্তি লাভ করেছিলেন এবং ‘হনুমন্তেশ্বর মহাদেব’-এর প্রতিষ্ঠা কীভাবে হয়েছিল।

_________________________________________________

🕉️ মহাবীর হনুমান দ্বারা পূজিত ‘হনুমন্তেশ্বর মহাদেব’-এর প্রতিষ্ঠা — 

[তথ্যসূত্র : স্কন্দ মহাপুরাণ/অবন্ত্য খণ্ড/রেবাখণ্ড/অধ্যায় ৮৪]

শ্রী মার্কণ্ডেয় বললেন,

এই প্রসঙ্গে তিনি একটি প্রাচীন কাহিনির উল্লেখ করেন। কৈলাস পর্বতে পরমেশ্বর শিব এই কাহিনী সনৎকুমারকে শুনিয়েছিলেন, সেই সনৎকুমার এই বিষয়ে ভক্তিভরে তাঁকে (মহাদেবকে) জিজ্ঞাসা করেছিলেন।

তখন ঈশ্বর (শিব) বললেন — হে স্কন্দ ! পূর্বকালে ত্রেতাযুগে রাম রাবণকে বধ করেছিলেন। সেই সময় চৌদ্দ কোটি ব্রহ্মরাক্ষস নিহত হয়েছিল। হে পুত্র ! যখন দেবতাদের রক্ষার জন্য তাদের বধ করা হয়, তখন তিন লোকেই মহা আনন্দ ও উল্লাস ছড়িয়ে পড়ে।

সীতাকে উদ্ধার করবার পর রাম প্রধান বানরদের সঙ্গে অযোধ্যায় ফিরে আসেন। লক্ষ্মণের বড় ভাই ভরত এক মহোৎসবের আয়োজন করেন এবং রাজ্য রামের হাতে অর্পণ করেন। এরপর রাম সেই রাজ্যে শাসন করতে শুরু করেন, যেখানে সকল শত্রুর বিনাশ ঘটেছিল। হনুমান তাঁর কর্ম সম্পন্ন করে কৈলাসে চলে যান। দ্বাররক্ষক নন্দী, যদিও তিনি রুদ্রের অংশ ছিলেন, তবুও সেই পাপসমূহ বিনাশকারী রুদ্রের দর্শনের জন্য তাঁকে প্রবেশ করতে দিলেন না। তখন হনুমান নন্দীকে জিজ্ঞাসা করলেন — 

“আমি কী পাপ করেছি ? কেন আমি অম্বিকা সহ রুদ্রের পবিত্র দিব্য শরীরের দর্শনলাভ করতে পারছি না ?”

নন্দী বললেন — হে বানরদের নেতা! তুমি দেবতাদের জন্য এই অবতার গ্রহণ করেছো। তবুও যে পাপ সংঘটিত হয়েছে, তার নাশ কেবল তার ফল ভোগের দ্বারাই হয়।

হনুমান বললেন —

হে নন্দী ! আমি যখন দেবতাদের কাজ করছিলাম, তখন কি আমি কোনো পাপ করেছি ? ব্রাহ্মণদের যজ্ঞকে অপবিত্রকারী দুষ্ট রাক্ষসদেরই তো বধ করা হয়েছে।

তাদের এই কথোপকথন শুনতে ইচ্ছুক হয়ে পরমেশ্বর শিব অন্য দ্বার থেকে উঁকি দিয়ে সেই ভয়ঙ্কর শক্তিশালী বানরকে দেখলেন, যিনি আসলে তাঁরই এক অংশস্বরূপমাত্র। পরে তিনি বানররাজকে নিজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন।


ঈশ্বর (শিব) বললেন — 

হে বানর ! গঙ্গা, গয়া, রেবা, যমুনা ও সরস্বতী— এই সমস্ত নদীই সমস্ত পাপ বিনাশকারী। তুমি এই নদীগুলিতে পবিত্র স্নান করো। নর্মদার দক্ষিণ তীরে সোমনাথের নিকটে এক অত্যন্ত পবিত্র তীর্থ আছে। হে বানর ! সেখানে যাও। আমার আদেশে সেখানে স্নান করলে তোমার মহাপাপ নাশ হবে।

এরপর হনুমান জী লাফিয়ে উঠে উচ্চস্বরে গর্জন করতে করতে রেবা (নর্মদা)-র দক্ষিণ তীরে পৌঁছালেন। সেখানে তিনি কঠোর তপস্যা করলেন। ঈশ্বরের কৃপায় অল্প সময়ের মধ্যেই রাক্ষস বধজনিত পাপ তপস্যার মাধ্যমে বিনষ্ট হয়ে গেল।

এরপর পরমেশ্বর শিব দেবতাদের সঙ্গে সেই তীর্থে এসে হনুমানকে আলিঙ্গন করলেন এবং তাঁকে বরদান দিয়ে বললেন — “এখন থেকে নিঃসন্দেহে এই তীর্থ তোমারই হবে।” সেই থেকেই এর নাম হয় ‘কপিতীর্থ’ এবং শিব স্বয়ং সেখানে ‘হনুমন্তেশ্বর’ নামে অবস্থান করছেন। তিনি সকল প্রকার হত্যাজনিত পাপ নাশ করেন।

_________________________________________________

📕 হনুমন্তেশ্বর শিবলিঙ্গের মাহাত্ম্য বিষয়ে মহাদেব বলেছে —  

শ্রীমহাদেব উবাচ।
একোনাশীতিকং বিদ্ধি হনুমৎকেশ্বরং প্রিয়ে ।
যন্য দর্শনমাত্রেণ সমীহিতফলং লভেৎ ॥ ১ 
প্রাপ্তরাজ্যস্য রামস্য রাক্ষসানাং বধে কৃতে ।
আগতা মুনয়ো দেবি রাঘবং প্রতি-নন্দিতুম্ ॥ ২ 
রামেণ পূজিতাঃ সর্বে হ্যগস্তিপ্রমুখা দ্বিজাঃ । 
প্রহৃষ্টমনসো বিপ্রা রামং বচনমব্রুবন ॥ ৩
দিষ্ট্যা তু নিহতো রাম রাবণঃ পুত্রপৌত্রবান্ ।
দিষ্ট্যা বিজয়িনং ত্বাদ্য পশ্যামঃ সহ ভার্য্যয়া ॥ ৪  
হনূমতা চ সহিতং বানরেণ মহাত্মনা ।
দিষ্ট্যা পবনপুত্রেণ রাক্ষসান্তকরেণ চ ॥ ৫
চিরং জীবতু দীর্ঘায়ুর্বানরো হনুমান্ সদা । 
অঞ্জনীগর্ভসম্ভূতো রুদ্রাংশো হি ধরাতলে ॥ ৬  
আখণ্ডলোঽগ্নির্ভগবান্ যমো বৈ নির্ঋতিস্তথা । 
বরুণঃ পবনশ্চৈব ধনাধ্যক্ষস্তথা শিবঃ ।
ব্রহ্মণা সহিতাশ্চৈব দিকপালাঃ পান্তু সর্বদা ॥ ৭ 
শ্রুত্বা তেষাং তু বচনং মুনীনাং ভাবিতাত্মনাম্ । 
বিস্ময়ং পরমং গত্বা রামঃ প্রাঞ্জালরব্রবীৎ ॥ ৮
কিমর্থং লক্ষ্মণং ত্যক্ত্বা বানরোঽয়ং প্রশংসিতঃ । 
কীদৃশঃ কিষ্প্রভাবো বা কিংবীর্য্যঃ কিংপরাক্রমঃ ॥ ৯ ॥

[স্কন্দ মহাপুরাণ/অবন্ত্য খণ্ড(২)/ অধ্যায় ৭৯/২-৯ নং শ্লোক]

✅ অর্থ : মহাদেব বললেন, 

হে আমার প্রিয়তম ! জেনে রাখো, হনুমৎকেশ্বর লিঙ্গ উনসত্তরতম দেবতা। এর দর্শনমাত্রেই মনোবাসনা পূর্ণ হয়।

হে দেবী, যখন রাক্ষসদের বধ সম্পন্ন হলো এবং রাম রাজ্য লাভ করলেন, তখন ঋষিগণ রাঘবকে অভিনন্দন জানাতে সেখানে উপস্থিত হলেন। সেই সকল ব্রাহ্মণ, যাদের মধ্যে অগস্ত্য মুনি প্রধান ছিলেন, তারা রামের দ্বারা পূজিত ছিলেন। আনন্দচিত্তে মুনিগণ রামকে এই কথা বললেন —

“হে রাম ! সৌভাগ্যবশত রাবণ তার পুত্র-পৌত্রসহ নিহত হয়েছে। এর আগে আমরা আপনাকে আপনার পত্নীসহ বিজয়ী অবস্থায় প্রত্যাবর্তন করতে দেখলাম। আপনার সঙ্গে ছিলেন মহাত্মা বানরগণ, রাক্ষসদের বিনাশকারী পবনপুত্র হনুমানও। বানর হনুমান দীর্ঘজীবী হোন। তিনি পৃথিবীতে রুদ্রের অংশস্বরূপে অবস্থিত। তিনি অঞ্জনার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেছেন। ব্রহ্মাসহ সকল দিকপাল — ইন্দ্র, অগ্নি, ভগবান যম, নিঋতি, বরুণ, পবন, কুবের এবং শিব — তাঁকে সর্বদা রক্ষা করুন।”

_________________________________________________

🔥 সিদ্ধান্ত : 

স্কন্দ মহাপুরাণ-এ স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে হনুমান কীভাবে নিজের পাপ থেকে মুক্তি লাভ করেছিলেন এবং ‘হনুমন্তেশ্বর মহাদেব’-এর প্রতিষ্ঠা কীভাবে হয়েছিল। এই কাহিনি শুধু হনুমানজীর ভক্তি ও অনুতাপকে প্রকাশ করে না, বরং এটিও প্রমাণ করে যে তিনি ভগবান শিবের অংশমাত্র, স্বয়ং শিব নন।

এতক্ষণে আপনারা নিশ্চয়ই ভালোভাবে বুঝে গিয়েছেন যে হনুমান শিবের অংশরূপ, সাক্ষাৎ পরমেশ্বর শিব নন এবং এই সত্য বিষয়টি সনাতনধর্মের পুরাণশাস্ত্র ও বাল্মিকী রামায়ণ দ্বারা প্রমাণিত।

_________________________________________________

🚩 তথ্য সংগ্রহ ও লেখনীতে : শ্রীগুরু নন্দীনাথ শৈব আচার্য পরমাধিকারী 🚩 

©️ কপিরাইট ও প্রচারে : Shivalaya 🔥 

নন্দী অবতার মহাবলী হনুমানের জয় 

পরমশৈব ভগবান মর্যা‌দা পুরুষোত্তম শ্রীরামচন্দ্রের জয়    

শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্ 🚩 

ॐ নমঃ পার্বতীপতয়ে হর হর মহাদেব 🚩 


#হনুমান #নন্দী #সনাতনধর্ম #শৈবধর্ম #মহাদেব #শিব #সত্য‌উন্মোচন #রুদ্রাবতার #একাদশরুদ্র

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ