শিব ও বিষ্ণু কি এক? কোন পর্যায়ে এক ও কোন পর্যায়ে ভিন্ন তা নিয়ে কিঞ্চিত আলোচনা—

 🔻 শিব ও বিষ্ণু কি এক ? কোন পর্যায়ে এক ও কোন পর্যায়ে ভিন্ন তা নিয়ে কিঞ্চিত আলোচনা—


👉 নমস্কার, নমঃ শিবায় সকলকে 🙏

বর্তমানে বেশ কিছু খিচুড়ীবাদী মানসিকতা সম্পন্ন, ব্যক্তিরা শিব ও বিষ্ণুকে এক দেখাতে গিয়ে স্কন্দ উপনিষদের একটি শ্লোককে উদ্ধৃত করে এটাই প্রমাণ করে যে- শিব ও বিষ্ণু এক তারা আলাদা নয়৷ যারা শিব ও বিষ্ণুর মধ্যে ভেদ করে তারা নরকগামী হয়। তাই এদের মধ্যে ভেদ করা উচিত নয়। আর যেহেতু বেদের বাক্য সর্বোচ্চ সত্য তাই বেদবাক্য মানতেই হবে।

হ্যাঁ আমরাও বলি শিব ও বিষ্ণু একই সত্ত্বা, এদের মধ্যে কিঞ্চিত মাত্রেও ভেদ নেই। তবে নিত্য সত্য ও অনিত্য সত্য ভেদে কখন তারা এক ও কখন আলাদা সেটাও বিচার করা উচিত। তত্ত্বগত ভাবে শিব ও বিষ্ণু একই সত্ত্বা ঠিক তবে, ব্যবহারিক জগতে শিব ও বিষ্ণুর আপাত ভেদ আছে। আজ সেই বিষয় নিয়েই কিঞ্চিত পরিমান আলোচনা করবো কোথায় শিব ও বিষ্ণু এক ও কোথায় আলাদা। চলুন তবে শুরু করা যাক —

“ॐ শ্রীসদাশিব সমারাম্ভ্যম্‌ শ্রীনন্দীকেশ্বর মধ্যমাম্‌।
অস্মাৎ আচার্য পর্যন্তম্‌ বন্দে গুরু পরম্পরাম্‌” ।।

ওঁ শ্রীমন্মহাগণাধিপতয়ে নমঃ 🙏
ওঁ শ্রীগুরু দক্ষিণামূর্তয়ে নমঃ🙏
ওঁ সাম্বসদাশিবায় নমঃ 🙏

👉প্রথমে দেখে নেওয়া যাক উক্ত স্কন্দ উপনিষদের বচন—

শিবায় বিষ্ণুরূপায় শিবরূপায় বিষ্ণবে।
শিবশ্চ হৃদয়ং বিষ্ণু বিষ্ণুশ্চ হৃদয়ং শিব।।
যথা শিবময়ো বিষ্ণুরেবং বিষ্ণুময়োঃ শিবঃ।
যথান্তরং ন পশ্যামি তথা মে স্বস্তিরায়ুষী।।
[স্কন্দ উপনিষদ /৮-৯]

অর্থ— বিষ্ণুরূপে শিব এবং শিবরূপে বিষ্ণু,
শিবই বিষ্ণুর হৃদয়, আর বিষ্ণুই শিবের হৃদয়।
যেমন শিব সর্বাংশে বিষ্ণুময়, তেমনি বিষ্ণুও সর্বাংশে শিবময়। আমি এই দুয়ের মধ্যে কোনও ভেদ দেখি না
এই জ্ঞানে আমার মঙ্গল ও দীর্ঘায়ু হোক।।

👉 উক্ত মন্ত্র অনুযায়ী শিব ও বিষ্ণু একই সত্ত্বা এমনটাই বলছে বেদ। হ্যাঁ এটা চিরন্তন সত্য যে শিবই বিষ্ণুরূপে ভাসিত হয় তাই বিষ্ণুকেও শিবরূপেই ভাবনা করা হয়। তাই বিষ্ণুই শিবেরই প্রকাশিত স্বরূপ হওয়ার কারণে শিব ও বিষ্ণু একই, কোনো ভেদ নেই। 

তবে এখানে একটা প্রশ্ন উঠে আসে- যদি শিব ও বিষ্ণু আলাদা সত্ত্বা না হয় এক সত্ত্বাই হয়, তবে ও এক ও অদ্বিতীয় সত্ত্বাটি কে ? কারণ বিষ্ণুও আলাদা পরমেশ্বর নন এবং শিবও নন। তাহলে তারা এক হলে ছান্দোগ্য উপনিষদ অনুযায়ী- “একমেবাদ্বিতীয়ম্‌” [ছান্দোগ্য ৬/২/১] ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়। সেই অদ্বিতীয় পরমেশ্বরটা কে? 
সেই এক ও অদ্বিতীয় পরমেশ্বর কে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা হবে তবে ?

শিব ও বিষ্ণু আলাদা নন মানলাম তবে- “একোহি রুদ্র ন দ্বিতীয়ায় তস্থুর্য” [কৃষ্ণ যজুর্বেদ/শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ/৩ অধ্যায়/২নং মন্ত্র] একমাত্র শিবই পরমেশ্বর দ্বিতীয় কোনো সত্ত্বা নেই।
 তাহলে শিব ও বিষ্ণু এক হলে এই এক ও অদ্বিতীয় রুদ্রটাও বা কে? 
আবার এই রুদ্রকে নিয়ে শ্বেতাশ্বতর উপনিষদের ৩ অধ্যায়ের পরের মন্ত্রে বলা হয়েছে —
 
যা তে রুদ্র শিবা তনুরঘোরাহপাপকাশিনী।
তয়া নস্তন্বা শান্তময়া গিরিশন্তাভি চাকশীহি ৷৷৫৷৷
যামিষু গিরিশন্ত হস্তে বিভ্যস্তবে।
শিবাং গিরিত্র তাং কুরু হিংসীঃ পুরুষ জগৎ৷৷৬৷৷

[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ/৩ অধ্যায়/৫-৬ নং মন্ত্র]

অর্থ— হে রুদ্র! তোমার যে ‘শিব’ (কল্যাণময়) তনু বা শান্ত শরীর আছে যা ঘোর (ভয়ঙ্কর) নয়, যা সকল পাপ ও অশুভতাকে দূর করে, সেই শান্তময় দেহ বা স্বরূপ দ্বারা, হে গিরিশ (পর্বতে অবস্থানকারী), তুমি আমাদের প্রতি প্রকাশিত হও ।।৫।।
হে গিরিশন্ত (পর্বতের অধিবাসী রুদ্র)! তোমার হাতে যে ভয়ংকর অস্ত্র (ধনু-বাণ) ধারণ করেছ, সেটিকে কল্যাণকর করো। হে গিরিত্র (পর্বতের অধিপতি), তুমি যেন মানুষ বা জগতের কোনো প্রাণীকে আঘাত না করো ।।৬।।

অর্থাৎ “একোহি রুদ্র ন দ্বিতীয়ায় তস্থুর্য” অর্থে যে- এক ও অদ্বিতীয় পরমেশ্বরের উল্লেখ করলো সেই পরমেশ্বরের স্বরূপ নিয়ে ও প্রার্থনা জানিয়ে বলা হচ্ছে- হে পরমেশ্বর রুদ্র তুমি গিরিতে অবস্থান করো। স্পষ্ট শব্দপ্রমাণ রয়েছে গিরিশন্ত/গিরিশ। আর গিরি যে শিবই অবস্থান করেন তা সবারই জানা। বেদই বলছে —

“কৈলাসশিখরভাসা হিমবদ্‌গিরিসংস্থিতা।
নীলকণ্ঠং ত্রিনেত্রং চ তন্মে মনঃ শিব সঙ্কল্প মস্তু”।।
[ঋগবেদ/আশ্বলায়ণ শাখা/১০/১৭১]

তাহলে খিচুড়িবাদীদের প্রতি প্রশ্ন যে- শিব ও বিষ্ণু একই হলে- সেই কৈলাসে থাকা নীলকন্ঠ ত্রিনেত্রধারী এক ও অদ্বিতীয় পরমেশ্বর টা কে? কারণ সনাতন ধর্ম একেশ্বরবাদী যা ছান্দোগ্য উপনিষদেরই বক্তব্য। আপনাদের মতানুযায়ী শিব ও আলাদা পরমেশ্বর নন আবার বিষ্ণুও আলাদা পরমেশ্বর নন তবে, “এক হি রুদ্র ন দ্বিতীয়ায় তস্থুর্য” এই শ্রুতি বাক্যে বলা এক ও অদ্বিতীয় পরমেশ্বর টা কে। কে এই কৈলাসনিবাসী সত্ত্বা??? যার স্বরূপ উল্লেখ করেছে নীলকন্ঠ ত্রিনেত্রধারী!!!!

আপনাদের মতানুসারে ঈশ্বরে কোনো ভেদ নেই। হ্যাঁ একদম ঠিক ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয় তাই ঈশ্বরে কোনো ভেদ নেই। তবে এখানেও একটা প্রশ্ন থেকে যায়- ঈশ্বর কি তবে বহু হয় ? অর্থাৎ বিষ্ণু একটা আলাদা পরমেশ্বর শিবও একটা আলাদা পরমেশ্বর, এমনও কি হয় ??? যদি এমন হয় তবে “একমেবাদ্বিতীয়ম” ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয় পরমেশ্বর। এই শ্রুতি বাক্যের কি বিরোধ হয় না ??

আবার আপনাদের মান্যতা অনুযায়ী যদি শিব ও বিষ্ণুতে কোনো ভেদ নেই তবে, বেদ কেন বলছে বিষ্ণুর চেয়ে শিব শ্রেষ্ঠ?? বেদের বচন দেখুন তবে—

পরাৎপরতরো ব্রহ্মা তৎপরাৎপরতো হরিঃ ।
তৎপরাৎপরতো হ্যেষ তন্মে মনঃ শিবসংকল্পমস্ত ॥
[ঋগবেদ/আশ্বলায়ণ শাখা/১০ মণ্ডল/১৭১ সূক্ত]

অর্থ— যিনি ব্রহ্মার চেয়েও শ্রেষ্ঠ, হরির চেয়েও শ্রেষ্ঠ,
যিনি সর্বোচ্চ “পরমাত্মা” রূপে সকলকে ধারণ করেন,
আমার মন সেই সর্বোচ্চ, অদ্বিতীয় পরমেশ্বর শিব এর প্রতি সঙ্কল্পিত হোক।

তাহলে বেদ অনুযায়ী শিব ও বিষ্ণু অভেদ হলে, আবার বেদই কেন বলছে বিষ্ণুর চেয়ে শিবই শ্রেষ্ঠ ?? তাহলে বেদ কি পরস্পর বিরোধী ? এক্ষেত্রে কি তবে শিব ও বিষ্ণুর ভেদ হচ্ছে না? তাহলে এর মীমাংসা কি??

চলুন তবে বেদের পরস্পর বিরোধী বক্তব্যের আভাস হ‌ওয়া বিষয়টিকে মীমাংসা করা যাক। 

আসলেই এই শংকা সমাধান স্কন্দ উপনিষদের উক্ত শ্লোকেই দেওয়া আছে। কিন্তু, শ্লোকের তত্ত্বগত অর্থ কেউই বুঝতে পারেনি বলেই কেবল বিষ্ণু ও শিব এক এক বলেই লাফিয়ে যাচ্ছিলেন ও আমাদের ভেদাভেদকারী বলে চিহ্নিত করে দিচ্ছিলেন বারংবার।

দেখুন বেদ নিজেই বলছে শিব বিষ্ণুর চেয়ে শ্রেষ্ঠ সেটা আমরা প্রচার করলেই ভেদাভেদকারী এটা কোনো যুক্তি হতেই পারে না। 

কেননা বেদ স্বয়ম্‌ একথা বলছে, আমরা নিজেরা কেউই এমন বানিয়ে বলছি না। ন্যূনতম জ্ঞান থাকলে বুঝতে পারতেন বেদ কেন এমন কথা বলছে। 
আপনারা সেটা নিয়েই ভাবেন না তাই আপনারা বেদের তত্ত্বগত অর্থ জানতেই পারেন না।

যেমন- “কোনো অন্ধ যদি বৃক্ষকে না দেখে তবে সেটা বৃক্ষের দোষ নয়”। তেমনি, কেউ যদি বেদের অর্থের সঠিক তাৎপর্য না বোঝে তবে সেটা তাদের অজ্ঞানতার ফল বেদ মন্ত্রের ত্রুটি নয়।

যাইহোক মূল বিষয়ে আসা যাক। উক্ত স্কন্দ উপনিষদের শ্লোকের শেষে বলা আছে যে—

“যথান্তরং ন পশ্যামি তথা মে স্বস্তিরায়ুষী”।।

অন্বয়— (যথা) যেমন / যেভাবে। (অন্তরম্‌) পার্থক্য, ভেদ। (ন পশ্যামি) আমি দেখি না। (তথা) সেইরূপ / সেভাবে। (মে) আমার। (স্বস্তিঃ) মঙ্গল / কল্যাণ। (আয়ুষী) আয়ু, জীবন।

অর্থ— “যেমন আমি শিব ও বিষ্ণুর মধ্যে কোনও ভেদ দেখি না, তেমনি (এই অভেদ জ্ঞানের ফলে) আমার জীবনে মঙ্গল ও দীর্ঘায়ু হোক।”

এই শ্লোকে—
“যথা শিবময়ো বিষ্ণুরেবং বিষ্ণুময়োঃ শিবঃ।
যথান্তরং ন পশ্যামি তথা মে স্বস্তিরায়ুষী॥”

এর মাধ্যমে একজন যোগী বা ব্রহ্মজ্ঞ গভীর অদ্বৈত উপলব্ধি প্রকাশ করছেন।

যোগী অনুভব করছেন যে, শিব ও বিষ্ণু আলাদা কোনো সত্তা নন। দুজনই এক পরম তত্ত্ব, যিনি পরশিব ব্রহ্মনামা একমাত্র সত্যস্বরূপ চৈতন্য। একজনের মধ্যে অন্যজন সম্পূর্ণরূপে বিরাজমান- “শিবশ্চ হৃদয়ং বিষ্ণু, বিষ্ণুশ্চ হৃদয়ং শিবঃ।” অর্থাৎ, শিবই বিষ্ণুর অন্তঃস্থিত আত্মা, বিষ্ণুই শিবের অন্তঃস্থিত আত্মা। এখানে দ্বৈত ভেদ লুপ্ত হয়ে যায়। অর্থাৎ এক পরমাত্মা শিবই, বিষ্ণু ও শিবের (রুদ্রের) অন্তরে রয়েছেন। আর যোগী পরমঅদ্বৈত ভাবে অবস্থান করার জন্য সেই অন্তরে অবস্থান করা পরশিবব্রহ্মেরই অভেদ অবস্থার উপলব্ধি করছে। এখানে বাহ্য রূপ শিবের দর্শনও করছেন না এবং বিষ্ণুর দর্শনও করছেন না।

“যথান্তরং ন পশ্যামি” যোগী বলেন, আমি তাদের মধ্যে কোনো অন্তর দেখি না। এই ‘অদ্বৈত দর্শন’ই যোগের পরম লক্ষ্য, যেখানে ভেদ-বুদ্ধি নাশ হয়ে একত্ব বোধের উদয় ঘটে। শিব-বিষ্ণু, রূপ-অরূপ, সগুণ-নির্গুণ সবই একই পরশিব পরমসত্তার প্রকাশ বলে তিনি অনুভব করেন।

“তথা মে স্বস্তিরায়ুষী” এই অভেদ জ্ঞান, এই ঐক্যবোধই প্রকৃত স্বস্তি বা শান্তি। যিনি সর্বত্র একই ব্রহ্মকে দেখেন, তাঁর মধ্যে আর কোনো সংঘাত, দ্বন্দ্ব বা মায়া-জনিত অস্থিরতা থাকে না। এই জ্ঞানেই দীর্ঘায়ু, প্রশান্তি, ও মুক্তির অভিজ্ঞতা নিহিত থাকে।

এই শ্লোকে যোগী অবস্থান করছেন, পরম সমাধি বা ব্রহ্মসম্বিতের স্তরে, যেখানে তাঁর চেতনায় শুধু একমাত্র “অহং ব্রহ্মাস্মি”, “শিবোঽহম” জ্ঞানই অবশিষ্ট। সেই অবস্থায় শিব (সংহারকর্তা রুদ্র), বিষ্ণু, প্রাণী, জগৎ সব একই পরমচৈতন্যরূপে প্রকাশিত। এই পরম অবস্থাকেই শিব অবস্থা বলা হয় বেদে (শ্রুতিতে) — 
“শান্তম্‌ শিবম্‌ অদ্বৈতম্‌ চতুর্থম্‌ মন্বন্তে স আত্মা স বিজ্ঞেয়ঃ” [মাণ্ডুক্য উপনিষদ/৭]।

এই মন্ত্রে যোগী উপলব্ধি করছেন যে- “শিব ও বিষ্ণু ভিন্ন দেবতা নন, উভয়ে একই সর্বব্যাপী চৈতন্য পরশিব ব্রহ্মেরই প্রকাশ। আমি সেই একত্বকে প্রত্যক্ষ করেছি। এই অদ্বৈত জ্ঞানেই আমার শান্তি, মঙ্গল ও অমৃতত্ব নিহিত।”

অর্থাৎ স্কন্দ উপনিষদে একজন যোগীর পরম অবস্থাকেই তুলে ধরা হয়েছে। তাই স্কন্দ উপনিষদের প্রথমেই বলা হয়েছে যে- পাশবদ্ধ হলেই জীব, পাশ মুক্ত হলেই সদাশিব। আর এক সদাশিবই ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও রুদ্র স্বরূপে নিজেকে প্রকাশিত করেন। স্কন্দ উপনিষদের উক্ত শ্লোকের সমর্থন পাওয়া যায় কুণ্ডিকা উপনিষদেও। যেখানে যোগী পরম অবস্থায় উন্নীত হয়ে নিজেকে শিব ও বিষ্ণু বলেই জেনে যান—

নারায়ণোঽহং নরকান্তকোঽহং পুরান্তকোঽহং পুরুষোঽহমীশঃ ।
অখণ্ডবোধোঽহমশেষসাক্ষী নিরীশ্বরোঽহং নিরহং চ নির্মমঃ ॥ ১৭
[কুণ্ডিকা উপনিষদ/১৭]

অর্থ — আমিই নারায়ণ, আমিই নরকান্তক (যিনি নরকারসুরকে বধ করেছেন), আমিই পুরান্তক (ত্রিপুরান্তক) শিব, আমিই পুরুষ তথা ঈশ্বর। আমিই অখণ্ড বোধ স্বরূপ, সমস্ত প্রাণীদের সাক্ষী, আমিই ঈশ্বররহিত (যার উপর আর অন্য কোনো নিয়ন্ত্রক নেই), অহংকার রহিত তথা মমতারহিতও আমিই ।।

এখানে শিব বলতে পরমেশ্বর শিব নন বরং ত্রিদেবের অন্তর্গত কালাগ্নি রুদ্রদেব। আর রুদ্র ও বিষ্ণু যে অভেদ তা সদাশিব নিজেই বলেছেন —

রুদ্রধ্যেয়ো ভবাংশ্চৈব ভবধ্যেয়ো হরস্তথা।
যুভয়োরন্তরং নৈব তব রুদ্রস্য কিঞ্চন॥ ৬॥
বস্তুতশ্চাপি চৈকত্বং বরতোঽপি তথৈব চ।
লীলয়াপি মহাবিষ্ণো সত্যং সত্যং ন সংস্কয়ঃ॥ ৭॥

[শিবমহাপুরাণ/সৃষ্টিখণ্ড/অধ্যায় ১০/৬/৭/]

বিষ্ণু রুদ্রের আরাধ্য হবে আর রুদ্র বিষ্ণুর আরাধ্য হবে। বিষ্ণু আর রুদ্রের মধ্যে কোনো ভেদ নেই।।
হে মহাবিষ্ণো! লীলাতে ভেদ হলেও বস্তুত, বিষ্ণু ও রুদ্র একই তত্ত্ব। এটা সত্য, সত্য, এতে কোনো সংশয় নেই।।

ঠিক একই কথায় বলা হয়েছে স্কন্দ উপনিষদের এই শ্লোকেও যে শিব ও বিষ্ণু একই তাদের মধ্যে কোনো ভেদ নেই। আর সেই অভেদ অবস্থায় পৌঁছে যোগীও সেই উপলব্ধি করেছেন যা উপনিষদে বর্ণিত হয়েছে।

👉 এখন যদি কেউ বলে যে- স্কন্দ উপনিষদের শ্লোকে শিব শব্দটি এসেছে, অর্থাৎ এখানে রুদ্রের কথা বলা হয়নি বরং সদাশিবেরই উল্লেখ হয়েছে। তবে তাদের বলে দিতে চাই যে- বেদের মধ্যে একই শব্দ অনেক অর্থে ব্যবহৃত হয়। একটা শব্দের যে শুধু মাত্র একটিই অর্থ থাকে এমন কিন্তু নয়। স্থান, কাল, পাত্র ভেদে একটি শব্দেরই অনেক অর্থ হয়। যা প্রসঙ্গ, প্রাসঙ্গিক লক্ষণ, শাস্ত্রের সহায়তা ও বাক্য দ্বারা নির্ধারণ করতে হয়। তাই শিব বলতেই যে এখানে সদাশিবই হবে এমন কোনো কথা নেই। কেননা শ্রুতিই বলছে —

স ব্রহ্মা স শিবঃ সেন্দ্রঃ সোঽক্ষরঃ পরমঃ স্বরাট্ ।
স এব বিষ্ণুঃ স প্রাণঃ স কালোঽগ্নিঃ স চন্দ্রমাঃ ॥ ৮ ॥
[কৈবল্য উপনিষদ ৮]

অন্বয়— সঃ ব্রহ্মা, সঃ শিবঃ, সঃ ইন্দ্রঃ, সঃ অক্ষরঃ, পরমঃ স্বরাট্‌। সঃ এব বিষ্ণুঃ, সঃ প্রাণঃ, সঃ কালঃ, অগ্নিঃ, সঃ চন্দ্রমাঃ।

অর্থ— তিনিই (পরমেশ্বর শিব‌ই)  ব্রহ্মা, তিনিই শিব (সংহারকর্তা রুদ্র), তিনিই ইন্দ্র, তিনি অবিনশ্বর, পরম, স্বয়ংপ্রভ ও সর্বাধিপতি। তিনিই বিষ্ণু, তিনিই প্রাণ, তিনিই কাল, তিনিই অগ্নি এবং তিনিই চন্দ্র।

আবার একই সমর্থন রয়েছে তৈত্তিরীয় আরণ্যকে—

স ব্রহ্ম স শিবঃ স হরিঃ স ইন্দ্রঃ সোঽক্ষরঃ পরমঃ স্বরাট্ || ৫ || " 
(তৈত্তিরীয় আরণ্যক/ ১০ম প্রপাঠক/ নারায়ণ সূক্ত)  

অর্থাৎ এক ও অদ্বিতীয় পরমেশ্বর শিব, যিনি ব্রহ্মা, বিষ্ণু, রুদ্র, ইন্দ্র, অগ্নি, চন্দ্র প্রভৃতি সকল দেবরূপে প্রকাশিত।  অর্থাৎ, দেবতাগণ পৃথক সত্তা নন, এরা সকলেই ঐ এক সর্বব্যাপী ব্রহ্ম শিবেরই নানা শক্তির প্রকাশ। “একো অহং বহু স্যাম্‌”, “সর্ব্বম্‌ খল্বিদং ব্রহ্ম”, “সর্বে বৈ রুদ্রঃ” ইত্যাদি শ্রুতিবাক্যও এই অর্থ প্রতিপাদন করে যে- এক ও অদ্বিতীয় পরমেশ্বর শিবই বহু হন।

উক্ত শ্রুতিতে স্পষ্ট শব্দপ্রমাণ আছে যেখানে শিব অর্থে রুদ্রদেবকেই বোঝানো হয়েছে। কারণ শিবই পরমেশ্বর রুদ্রদেব শিবেরই লীলামূর্তি যার মাধ্যমে পরশিব সকল জাগতিক কার্য সম্পাদন করেন।

👉এবার আসা যাক কোন পর্যায়ে সদাশিব ব্রহ্ম ও বিষ্ণু এক ও কোন পর্যায়ে আলাদা —

ব্রহ্ম সম্পর্কে শ্রুতিতে বলা আছে যে— “ন তস্য প্রতিমা অস্তি” [শুক্ল-যজুর্বেদ ৩২/৩] অর্থাৎ - ব্রহ্মের কোনো তুলনা নেই। তাই এক্ষেত্রে ব্যবহারিক স্বরূপের সাথে ব্রহ্মকে এক বলা যায় না। কেননা ব্যবহারিক ভাবে শিব ও বিষ্ণু আলাদা। তাই এক্ষেত্রে বিষ্ণুকে শিবের সমান বলা যাবে না, কেননা ব্রহ্মের কোনো তুলনা হয় না। আর একমাত্র ব্রহ্ম যে শিবই সেটা - “এক হি রুদ্র ন দ্বিতীয়ায় তস্থুর্য” উক্ত শ্রুতি বাক্য দ্বারাই প্রমাণিত।

অতি সংক্ষেপে শিব ও বিষ্ণুর ঐক্য ও ভেদ দুই পর্যায়ে—

১. তত্ত্বগত বা পরমার্থিক পর্যায়—

এই স্তরে শিব ও বিষ্ণু অভিন্ন। উভয়ই এক চিদ্ব্যাপক, নিরাকার, নিত্য, অদ্বৈত পরব্রহ্ম। স্কন্দ, কৈবল্য, নারায়ণসূক্ত প্রভৃতি শ্রুতিতে বলা —

“স ব্রহ্মা স শিবঃ স ইন্দ্রঃ স এব বিষ্ণুঃ।”

অর্থাৎ, সকল দেবরূপই এক সদাশিব-চৈতন্যের প্রকাশ।
এই স্তরে কোনো ভেদ নেই “যথান্তরং ন পশ্যামি।”

২. ব্যবহারিক বা কার্যলীলামূলক পর্যায় —

এখানে রূপ ও কর্মভেদে পার্থক্য দেখা দেয় —

ব্রহ্মা সৃষ্টি করেন, বিষ্ণু পালন করেন, রুদ্র/শিব সংহার করেন। এটি পরমেশ্বর শিবেরই শক্তিত্রয় বা লীলাভেদ।

যেমন এক সূর্য আলো, তাপ ও রশ্মি রূপে প্রকাশিত,
তেমনি এক সদাশিব ব্রহ্ম সৃষ্টিতে-ব্রহ্মা, পালনে-বিষ্ণু, সংহারে-রুদ্ররূপে লীলা করেন। এই স্তরে ভেদ আপাত, তত্ত্বত অভেদ।

👉 পরমার্থতত্ত্বে শিব ও বিষ্ণু অভিন্ন। উভয়ই সেই এক অদ্বিতীয় পরমচৈতন্য, নিত্য, সর্বব্যাপক, পরশিব ব্রহ্মের প্রকাশমাত্র। তবে এই অভেদ তত্ত্বের প্রকাশ ব্যবহারত স্তরে (ব্যবহারিক বা লীলামূলক পর্যায়ে) রূপ, কর্ম ও নামভেদে প্রতীয়মান হয়।

শিবই লীলানিমিত্তে নানা রূপ ধারণ করেন। সৃষ্টির জন্য ব্রহ্মারূপে, পালনার্থে বিষ্ণুরূপে, সংহারার্থে রুদ্ররূপে।
অতএব স্কন্দ উপনিষদের “শিবায় বিষ্ণুরূপায় শিবরূপায় বিষ্ণবে” উক্তিটি এই লীলাভেদের ঐক্য নির্দেশ করে। দুজনই এক পরশিবেরই দ্বিধা-প্রকাশ একই চৈতন্য, দুই লীলা।

কিন্তু এদের মূলে অবস্থিত যিনি সেই সদাশিব তত্ত্ব তিনি নিত্য, অজ, অমৃত ও পরম। শিবতত্ত্ব থেকে যেসব কার্যরূপ বা অবতাররূপ প্রকাশিত হয় (যেমন বিষ্ণু বা রুদ্র), তারা অনিত্য, কারণ জগত-লীলা সম্পূর্ণ হলে তারা পুনরায় পরশিবেই লীন হন।

অতএব, যিনি নিত্য ও অপরিণাম, সেই পরশিব ব্রহ্ম-ই একমাত্র সত্যস্বরূপ, আর যিনি পালনাদি লীলার জন্য প্রকাশিত, সেই বিষ্ণু তত্ত্ব অনিত্য, কার্যরূপ। এই কারণেই নিত্য পরশিব ব্রহ্মের সঙ্গে অনিত্য লীলামূর্তি বিষ্ণুকে ব্যবহারিক অর্থে অভিন্ন বলা যায় না।

👉 স্কন্দ উপনিষদে যেমন বলা হয়েছে—

“শিবায় বিষ্ণুরূপায় শিবরূপায় বিষ্ণবে… যথান্তরং ন পশ্যামি।”

অর্থাৎ, যোগী বা ব্রহ্মজ্ঞ উপলব্ধি করছেন- শিব ও বিষ্ণু আলাদা নয়, দুজনই এক পরশিবেরই প্রকাশিত লীলা। তত্ত্বগত অভেদে, দুজনের অন্তরে কোনো ভেদ নেই।

তবে ব্যবহারিক স্তরে রূপ, নাম ও কর্মের ভেদ প্রতীয়মান। শিবের লীলায়—

ব্রহ্মা সৃষ্টি করেন, বিষ্ণু পালন করেন, রুদ্র/শিব সংহার করেন। এই ব্যবহারিক ভেদই দর্শনীয়, কিন্তু মূলত্ম এক।

এখানেই অমৃতবিন্দু উপনিষদের মন্ত্র সমর্থন যোগায়—

“এক এব হি ভূতাত্মা ভূতে ভূতে ব্যবস্থিতঃ।
একধা বহুধা চৈব দৃশ্যতে জলচন্দ্রবত।”
[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/অমৃতবিন্দু উপনিষদ/১২]

অর্থাৎ, এক অখণ্ড আত্মা সর্বভূতে বিরাজ করে। যেমন চন্দ্রের প্রতিফলন বহু জলাশয়ে দেখা যায়, কিন্তু চন্দ্র একটাই, তেমনি এক পরমেশ্বর শিব বহুরূপে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, রুদ্র দর্শিত হলেও মূল এক পরশিব।

পরমার্থে- শিব–বিষ্ণু অভিন্ন, এক নিত্য সত্য।

ব্যবহারিক/লীলা স্তরে- রূপ, কর্ম, নামের ভেদ প্রতীয়মান।

অন্তিমে- সমস্ত অনিত্য প্রকাশ বিষ্ণু, রুদ্র পরশিবেই লীন হয়।

যোগীর উপলব্ধি- যিনি সবকে এক চৈতন্যে দেখেন, তিনি তাত্ত্বিক শান্তি ও স্বস্তি লাভ করেন।

পরমার্থে শিব–বিষ্ণু এক, ব্যবহারে তাঁদের রূপ, কর্ম, নামের ভেদ শিবেরই লীলা। কিন্তু নিত্য সত্য একমাত্র পরশিব, সকল লীলা ও সকল নাম অবশেষে সেই শিবেতেই বিলীন। তাই শৈবরা একমাত্র শিবকেই পরমেশ্বর বলেন। বাদবাকী বিষ্ণু আদি সব দেবতায় শিবেরই প্রকাশিত অনিত্য সত্ত্বা মাত্র। 

এতক্ষণ পর্যন্ত স্কন্দ উপনিষদ শিব-বিষ্ণু অভেদ ঘোষণা করল, শ্বেতাশ্বতর বলল অদ্বিতীয় সেই এক রুদ্র, কিন্তু এখন প্রশ্ন আসে- 

সে রুদ্র কি শুধু শিব? নাকি সেই রুদ্রের মধ্যেই শিব-বিষ্ণু উভয় তত্ত্ব নিহিত?

ঠিক এখানেই নারদ পরিব্রাজক উপনিষদ এক অমূল্য সিদ্ধান্ত দেয়—

কবিং পুরাণং পুরুষোত্তমোত্তমং সর্বেশ্বরং সর্বদেবৈরুপাস্যম্।
অনাদি মধ্যান্তমনন্তমব্যযং শিবাচ্যুতাম্ভোরুহগর্ভভূধরম্।।১৭।।
স্বেনাবৃতং সর্বমিদং প্রপঞ্চং পঞ্চাত্মকং পঞ্চসু বর্তমানম্। 
পঞ্চীকৃতানন্তভবপ্রপঞ্চং পঞ্চীকৃতস্বাবযবৈরসংবৃতম্। 
পরাত্পরং যন্মহতো মহান্তং স্বরূপতেজোমযশাশ্বতং শিবম্।।১৮।।

[নারদ পরিব্রাজক উপনিষদ /৯ম উপদেশ]

যিনি কবি (সর্বজ্ঞ), পুরাণ (চিরন্তন), পুরুষোত্তমদেরও উত্তম, সর্বেশ্বর, এবং সমস্ত দেবতার দ্বারা পূজনীয় যিনি অনাদি, মধ্যবিহীন, অন্তহীন, অনন্ত ও অব্যয়, যিনি শিব ও অচ্যুত (বিষ্ণু)-র অম্বুজ হৃদয়ের গর্ভে ধারক সেই পরম মহেশ্বর। এই সমগ্র জগৎ, যা তাঁর দ্বারাই আচ্ছাদিত, যা পঞ্চভূত-সত্তাময় এবং পঞ্চতত্ত্বের মধ্যে অবস্থান করছে এই অসীম বহু-বৈচিত্র্যময় সৃষ্টি, যা পঞ্চীকৃত (পাঁচ উপাদান সংযুক্ত), এবং তাঁরই পঞ্চীকৃত দেহ-অঙ্গের দ্বারা পরিবেষ্টিত। যিনি পরেরও পর, মহানদেরও মহত্তম, যাঁর স্বরূপ চিরন্তন, তেজোময়, এবং যিনি চিরশুদ্ধ শিব সেই পরম তত্ত্ব।

বিষ্ণু শিবের থেকে পৃথক নয়, বরং বিষ্ণু শিবতত্ত্বের প্রকাশ। শিবই মূল-অদ্বিতীয় সত্তা, যাঁর মধ্যে উভয়েই অভেদভাবে অবস্থিত। এটাই স্কন্দ উপনিষদের- “যথান্তরং ন পশ্যামি” যোগীর অদ্বৈত উপলব্ধির সারতত্ত্ব।

সুতরাং, যারা শ্লোকের সঠিক অর্থ বিচার না করেই কেবলই সব এক এক বলেই লাফাচ্ছে তাদের জেনে রাখা উচিত কেন শিব ও বিষ্ণু এক ও কেন আলাদা।

বি: দ্র:— এমন বিচার বিশ্লেষণ করে উক্ত শংকার মীমাংসা করার পরেও যে আমাদের ভেদাভেদকারী বলবেন, তার অবশ্যই জ্ঞানের ন্যূনতা আছে। সেও অন্ধের ন্যায় বৃক্ষকে না দেখে, বৃক্ষের দোষ দেন।


🙏সর্বে হ্যেষ রুদ্রস্তস্মৈ রুদ্রায় নমো অস্তু”🙏


নমঃ শিবায় 🙏
নমঃ শিবায়ৈ🙏
শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তে ✊🚩

✍️লেখনীতে— অন্তিক ভট্টাচার্য্য (শম্বরনাথ শৈব)

🌻বিশেষ কৃতজ্ঞতা— আমার গুরু শ্রী নন্দীনাথ শৈবাচার্য ও আমার আদর্শ শ্রী রোহিত কুমার চৌধুরী শৈবজী।

কপিরাইট ও প্রচারে— আন্তর্জাতিক শিবশক্তি জ্ঞান তীর্থ (International Shiva Shakti Gyan Tirtha)

বিঃ দ্রঃ — লেখাটি অনুকরণ করলে সম্পূর্ণ করবেন, কোনো রকম কাটছাট গ্রহণযোগ্য নয়।





শিবঃ ওঁ……..🙏


মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ