'একং সদ্বিপ্রা বহুধা' মন্ত্রের ঐ ব্রহ্ম স্বয়ং একমাত্র পরমেশ্বর শিব




'একং সদ্বিপ্রা বহুধা' মন্ত্রের ঐ ব্রহ্ম স্বয়ং একমাত্র পরমেশ্বর শিব 
__________________________________________________

🚩 ​"ঋগ্বেদের “একং সদ্বিপ্রা বহুধা” ও রুদ্রের অদ্বৈতবাদ, পাণিনীয় ব্যাকরণ ও মীমাংসা ন্যায়ের নিরিখে- ​নিরপেক্ষবাদ বনাম বৈদিক সত্য 'একং সদ্বিপ্রা বহুধা' মন্ত্রের প্রকৃত তাৎপর্য" —


নিরপেক্ষবাদীরা ঋগবেদে উল্লেখিত “একং সদ্বিপ্রা বহুধা” এই বাক্যের তাৎপর্য কিছুটা এভাবে বের করে - সেই এক ব্রহ্মকেই ঋষিগণ বিভিন্ন নামে বলে থাকেন। তাই - শিব, বিষ্ণু, ইন্দ্র আদি সকল সত্ত্বাই সেই এক ব্রহ্ম সত্ত্বারই বিভিন্ন রূপ বটে। কিন্তু, এই অর্থ সমন্বয়কারীদের মধ্যে সঠিক হলেও অন্যান্য শাস্ত্র ও প্রকরণ বিচারে ইহা অর্ধসত্য অর্থ মাত্র। কেননা- অন্যান্য শাস্ত্র ও প্রকরণে সেই এক ও অদ্বিতীয় সত্ত্বা হিসেবেই পরমেশ্বর শিবকেই সংজ্ঞায়িত করেছে। তাই, কেবল নির্গুণ, নিরাকার, নির্বিকার সেই ব্রহ্মকেই বহু নামে ডাকেন এই অর্থ পূর্ণ সত্য নয়৷

নিরপেক্ষবাদীদের মতানুযায়ী সকলই ব্রহ্ম হয়ে যান তবে - ন্যায় অনুযায়ী সেই ব্রহ্মতত্ত্বে “অনাবস্থাদোষ” আরোপিত হয়। কেননা - শাস্ত্রের সিদ্ধান্ত হলো - “একমেবাদ্বিতীয়ম” ব্রহ্ম এক ও অদ্বিতীয়। সেই এক ও অদ্বিতীয় ব্রহ্ম কেবল বহু স্বরূপে প্রকাশিত হতে পারেন। কিন্তু, বহু স্বরূপই ব্রহ্মশব্দ বাচ্য হতে পারেন না, এতে দোষ আরোপিত হয়।

যদি - বিষয়টি দ্ব্যর্থবোধক হয় তবে পূর্বমীমাংসার "তদর্থশাস্ত্রাৎ" (১/২/৩১) উক্ত নিয়ম অনুযায়ী অন্যান্য শাস্ত্র প্রকরণ নির্ণয় করেই মূল অর্থ নির্ধারণ করতে হয়। এখন, নিরপেক্ষবাদীদের মতানুসারে- এক ও অদ্বিতীয় ব্রহ্ম বিষ্ণু ও শিব দুই সত্ত্বাকেই বোঝায়, অর্থাৎ - বিষয়টি এখানে দ্ব্যর্থক। তাই, অন্যান্য শাস্ত্র প্রকরণ ও ন্যায় অনুযায়ীই উক্ত দ্ব্যর্থকতার সমাধান হওয়া উচিত। তাহলে অন্যান্য শাস্ত্র ও প্রকরণ বিচার করে উক্ত শ্রুতি বাক্যের সঠিক তাৎপর্য বিশ্লেষণ করা যাক —

ঋগবেদের উক্ত ঋচাটি হলো —

একং সদ্বিপ্রা বহুধা বদন্ত্যগ্নিং যমং মাতরিশ্বানমাহুঃ ॥
[ঋগবেদ সংহিতা/শাকলশাখা/১ম মণ্ডল/১৬৪ সূক্ত/৪৬ মন্ত্র]

অন্বয় — বিপ্রাঃ (ঋষিগণ)। একং সদ্‌ (এক পরম তত্ত্ব পরমশিব -কে)। বহুধা বদন্তি (বিভিন্ন নামে অভিহিত করেন)। অগ্নিম্, যমম্, মাতরিশ্বানম্ আহুঃ (তাঁকেই অগ্নি, যম, মাতরিশ্বা ইত্যাদি বলেন)।

অর্থ — ঋষিগণ সেই এক সত্তা পরমশিবকেই বিভিন্নভাবে বর্ণনা করেন, তাঁকেই কেউ অগ্নি, কেউ যম, আবার কেউ মাতরিশ্বা বলে থাকেন।

এবার অন্যান্য শাস্ত্র প্রকরণ ও ব্যাকরণ দ্বারা বিশ্লেষণ করা যাক — 

পাণিনীয় ব্যাকরণের “নামন্ত্রিতে সমানাধিকরণে সামান্যবচনম্(৮/১/৭৩) সূত্রের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে 'এক ও অদ্বিতীয় ব্রহ্ম যে আসলে রুদ্রই'।

​পাণিনীয় ব্যাকরণ অনুসারে- যখন দুটি পদ একই বিভক্তিযুক্ত হয় এবং তারা একই বস্তু বা সত্তাকে নির্দেশ করে, তখন তাদের মধ্যে সমানাধিকরণ সম্বন্ধ ঘটে। ​শ্রুতি বাক্য - "একমেবাদ্বিতীয়ম্" (ছান্দোগ্য) এবং "এক হি রুদ্র ন দ্বিতীয়ায় তস্থুঃ" (শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ)।

​এখানে 'এক' এবং 'অদ্বিতীয়' পদ দুটি পরম সত্তার বিশেষণ। আবার শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে এই 'এক' পদটি সরাসরি 'রুদ্র' পদের সাথে সমানাধিকরণ হিসেবে প্রযুক্ত হয়েছে।
ব্যাকরণগতভাবে, যদি 'A (ব্রহ্ম) = এক' হয় এবং 'B (রুদ্র) = এক' হয়, এবং উভয় ক্ষেত্রেই 'এক' পদটি অদ্বিতীয়ত্বের বাচক হয়, তবে A = B বা ব্রহ্ম ও রুদ্র অভিন্ন।

​পাণিনীয় সূত্র (৮/১/৭২) অনুসারে, সাধারণত পরপর দুটি সম্বোধন পদ থাকলে প্রথমটিকে 'অবিদ্যমান' বা উহ্য ধরা হয়। কিন্তু, উল্লিখিত সূত্রটি (৮/১/৭৩) তার ব্যতিক্রম। এটি বলে- যদি পদ দুটি সমানাধিকরণ হয় এবং পরবর্তী পদটি সামান্যবচন (বিশেষ্য বা মূল সত্তা) হয়, তবে পূর্বপদটি 'বিদ্যমান' বলেই গণ্য হবে।

​যখন আমরা বলি "এক হি রুদ্র", তখন 'এক' (অদ্বিতীয় ব্রহ্ম) এবং 'রুদ্র' এই দুটি পদের মধ্যে কোনোটিই ব্যাকরণগতভাবে উহ্য বা গৌণ নয়। পাণিনীয় ভাষ্যের "অগ্নে গৃহপতে" উদাহরণের মতো এখানেও 'এক' এবং 'রুদ্র' অবিচ্ছেদ্য। অর্থাৎ, ব্রহ্মের যে 'অদ্বিতীয়ত্ব', তা রুদ্রের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গভাবে বিদ্যমান। রুদ্রকে বাদ দিয়ে সেই অদ্বিতীয়ত্বের কোনো স্বতন্ত্র অস্তিত্ব ব্যাকরণ সমর্থন করে না।

​সূত্রটিতে 'সামান্যবচন' শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাশিকা ভাষ্য অনুযায়ী- এটি পর্যায়বাচক শব্দের ক্ষেত্রে খাটে না। ​যদি রুদ্র কেবল ব্রহ্মের একটি 'নাম' বা 'পর্যায়' হতো, তবে সূত্রটি এখানে লাগত না। ​কিন্তু রুদ্র এখানে 'সামান্যবচন', অর্থাৎ তিনি এমন এক সত্তা যিনি সমস্ত বিশ্বের আধার।

ব্রহ্মের 'অদ্বিতীয়ত্ব' কোনো বিমূর্ত ধারণা নয়, সেই অদ্বিতীয়ত্বের মূর্ত ও সামান্য রূপই হলো রুদ্র। তাই "এক হি রুদ্র" বাক্যে 'এক' পদটি রুদ্রের গুণ নয়, বরং রুদ্রই সেই 'এক' পদের মূল অর্থ বা বাচ্য।

একইভাবে “একং সদ্বিপ্রা বহুধা” ঋগ্বেদের এই 'এক সৎ' বা পরম সত্য মূলত রুদ্রই। কারণ, কৃষ্ণ-যজুর্বেদের শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ/৩ অধ্যায়/২ মন্ত্র - স্পষ্ট ভাবে বলছে — 
একো হি রুদ্রো ন দ্বিতীয়ায় তস্থূঃ”। অর্থাৎ, অদ্বিতীয়ত্বের যে গুণ বা লক্ষণ ব্রহ্মের, তা ব্যাকরণগত ও শ্রুতিগতভাবে রুদ্রেই পর্যবসিত।

রুদ্রকে বাদ দিয়ে সেই অদ্বিতীয়ত্বের কোনো স্বতন্ত্র অস্তিত্ব ব্যাকরণ সমর্থন করে না। এই সত্য ঋগ্বেদের অন্যত্রেও প্রতিধ্বনিত হয়েছে, যেখানে বহুর আড়ালে সেই 'এক'-এর অনুপ্রবেশকে স্বীকার করা হয়েছে-

​“এক এবাগ্নির্বহুধা সমিদ্ধ একঃ সূর্যো বিশ্বমনু প্রভূতঃ।
একৈবোষাঃ সর্বমিদং বি ভাত্যকং বা ইদং বি বভুব সর্বম্‌।।
[ঋগবেদ সংহিতা/শাকলশাখা/৮/৫৮/২]

​একই অগ্নি বহু রূপে জ্বলে ওঠে, একই সূর্য সমস্ত জগতকে আলোকিত করে, একই ঊষা সমস্ত কিছু উজ্জ্বল করে তোলে। এই এক সত্তাই সমস্ত রূপে বিরাজমান হয়েছেন।

​আচার্য সায়ণ এই মন্ত্রের ভাষ্যে স্পষ্ট করেছেন যে - যেমন অগ্নি বা সূর্যের মতো দেবতারা একক হয়েও বহু রূপে প্রকাশিত হতে পারেন, তেমনি পরম ব্রহ্মও এক হয়েও অনেক হন- [“তস্মাদেকং বৈ একমেবাদ্বিতীয়ং ব্রহ্ম ইদমান্ব্রহ্মস্তম্বপর্যন্তং জগৎ বি বভূব বিশেষেণাভবদিতি যুক্তমিতি শেষঃ। যদগ্ন্যাদয়ো দেবা অপ্যেকাকিনঃ সন্তোঽনেকভবনসমর্থাস্তদা পরং ব্রহ্ম একং সদনেকং ভবেদিতি কিমু বক্তব্যমিত্যভিপ্রায়ঃ”]। 
সায়ণাচার্য এখানে তৈত্তিরীয় উপনিষদ উদ্ধৃত করে বলেছেন - “তৎসৃষ্ট্বা তদেবানুপ্রাবিশৎ(তৈত্তিরীয় উপনিষদ/২/৬) সেই এক পরমাত্মা সৃষ্টি করে নিজেই তাতে অনুপ্রবেশ করেছেন।

​এখন, পূর্বোক্ত ‘ছাগপশুন্যায়’ এবং ‘তদর্থশাস্ত্রাৎ’ নীতি অনুযায়ী, এই মন্ত্রে বর্ণিত ‘এক’ পরম ব্রহ্ম আসলে কে? যখন শ্রুতি নিজেই রুদ্রকে অদ্বিতীয় বলে নির্দিষ্ট করে দেয়, তখন এই মন্ত্রের ‘এক’ সত্তা রুদ্র ছাড়া আর কেউ হতে পারেন না। অর্থাৎ রুদ্রই সেই ব্রহ্ম, যিনি অগ্নি-সূর্য-বিষ্ণু-ইন্দ্র রূপে ‘অনুপ্রবেশ’ করেছেন।

দণ্ডাপুপিকান্যায়” অনুযায়ী - যদি 'এক' এবং 'অদ্বিতীয়' পদের দ্বারা ব্রহ্মের সর্বব্যাপিত্ব প্রমাণিত হয়, এবং ব্যাকরণগত সামানাধিকরণ্য দ্বারা সেই 'এক' পদের আধার হিসেবে 'রুদ্র' সুপ্রতিষ্ঠিত হন, তবে জগতের অন্য সমস্ত তত্ত্ব (যেমন সৃষ্টি, স্থিতি, লয়) যে রুদ্রেরই বিভিন্ন প্রকাশ, তা লাঠির সাথে পিঠা খাওয়ার মতো স্বতঃসিদ্ধ হয়ে যায়।
​পাণিনীয় ভাষ্য অনুযায়ী, 'রুদ্র' এবং 'অদ্বিতীয় ব্রহ্ম' এই দুই পদের মধ্যে আধার-আধীয় বা বিশেষণ-বিশেষ্য ভাব নেই, বরং তারা অখণ্ড একার্থতা প্রকাশ করে। অর্থাৎ-

১. ব্রহ্ম অদ্বিতীয়, কারণ তিনি রুদ্র।
২. রুদ্র অদ্বিতীয়, কারণ তিনিই একমাত্র ব্রহ্ম।

​এই কারণেই শিব বা রুদ্র-উপাসনা কেবল একটি সম্প্রদায়গত ধারা নয়, বরং এটি শ্রুতি ও ব্যাকরণের নিরিখে জগতের মূল ও অনাদি ধারা।

এই ব্যাখ্যার পরেও নিরপেক্ষাদীরা শ্বেতাশ্বতরে বর্ণিত রুদ্র শব্দকে নিরাকার ব্রহ্ম বলেই আপত্তি তুলবে। কিন্তু, এক্ষেত্রে উক্ত অধ্যায়ের প্রকরণ অনুযায়ী রুদ্র শব্দটির সাথে গিরিত্র, গিরিশন্ত পদ দ্বারা বোঝা যায়- সেই নিরাকার, নির্গুণ, নির্বিকার পরশিব ব্রহ্মই সগুণ অবস্থায় গিরিত্র, গিরিনিবাসী রুদ্রই। শ্বেতাশ্বতর শ্রুতি ৩য় অধ্যায় অনুযায়ী - “একো হি রুদ্রো ন দ্বিতীয়ায় তস্থুর্য” বাক্য দ্বারা রুদ্রই একমাত্র অদ্বিতীয় পরমেশ্বর প্রতিপাদিত হয়। এবং সেই পরমেশ্বর রুদ্রই “গিরিনিবাসী”, “গিরিত্র” আদি চিহ্ন দ্বারা সংজ্ঞায়িত করা হয়। যা শাস্ত্রগতভাবে কৈলাসনিবাসী (বিশ্বময় অবস্থা) রুদ্রের সাথেই অভিন্ন। সেই রুদ্রকেই পরম ব্রহ্ম, সর্বব্যাপক, সর্বশ্রেষ্ঠ, মহৎ, জ্যোতির্ময়, অদ্বিতীয়, সর্বাত্মা, অন্তরাত্মা, পুরুষ, শিব, ঈশান, ভগবান রূপে ধারাবাহিকভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। 

ঘৃতকাঠিন্য ন্যায়” অনুযায়ী - তরল ঘৃত যেমন ঘনীভূত হয়ে আকার ধারণ করে,, তেমনই- নিরাকার, নির্বিকার, নির্গুণ পরশিব ব্রহ্ম কৈলাসনিবাসী, ত্রিনেত্রধারী রুদ্র স্বরূপেই প্রকাশিত হয়। শতরুদ্রীয় প্রকরণেও উব্বট, মহীধর ও সায়ণাচার্য ও গিরি, গিরিত্র, গিরিশন্ত পদ দ্বারা কৈলাস’ই বুঝিয়েছে। আচার্য মহীধর “গিরিশন্ত” শব্দের ভাষ্যে বলেছেন- “শকন্ধ্যাদিত্বাৎ পররূপম্‌[পাণিনী ৬/১/৯৪] অর্থাৎ- গিরিশন্ত শব্দটি একটি সম্বোধনবাচক বহুব্রীহি সমাস যা, বিশেষ কোনো ঈশ্বরতুল্য রূপেই বোঝানো হয়। সুতরাং- সেই “একমেবাদ্বিতীয়ম”, “এক হি রুদ্র”, “একং সদ্বিপ্রা বহুধা” ইত্যাদি শ্রুতি বাক্যে যে সেই অদ্বিতীয় রুদ্রকেই প্রতিপাদিত করেছে তা সম্পূর্ণ শাস্ত্র সম্মত।

উক্ত বিষয়টি “ছাগপশুন্যায়” দ্বারাও সিদ্ধ হয়— “একং সদ্বিপ্রা বহুধা বদন্তি" (ঋগ্বেদ) বা "একমেবাদ্বিতীয়ম্" (ছান্দোগ্য উপনিষদ)। এখানে 'এক' বা 'সত্' একটি সাধারণ বিশেষ্য, যা যে কোনো পরম সত্তাকে বোঝাতে পারে। কিন্তু, "এক হি রুদ্র ন দ্বিতীয়ায় তস্থুঃ" (তৈত্তিরীয় সংহিতা/১/৮/৬/ শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ/৩/২) অনুযায়ী- এখানে 'এক' সত্তাটিকে স্পষ্টভাবে 'রুদ্র' নামে অভিহিত করা হয়েছে। “ছাগপশুন্যায় অনুযায়ী”- যেহেতু 'রুদ্র' একটি বিশেষ সংজ্ঞা এবং শ্রুতিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে "রুদ্রই এক, দ্বিতীয় কেউ নেই", তাই অন্যান্য সাধারণ বাক্যে যেখানে 'এক' বা 'অদ্বৈত' সত্তার কথা বলা হয়েছে, তার অর্থ রুদ্রেই পর্যবসিত হবে।

​নীলকন্ঠ শিবাচার্য এবং অদ্বৈত বেদান্তী পণ্ডিত অপ্পয়দীক্ষিতের মতো মহাচার্যগণ এই যুক্তিকে আরও দৃঢ় করতে নিম্নলিখিত শ্রুতিবাক্যগুলো উপস্থাপন করেন- এখানে দেবতারা জিজ্ঞাসা করেছিলেন, "কে আপনি?" পরমেশ্বর রুদ্র উত্তর দিয়েছিলেন- "অহমেকঃ আসং প্রথমম্‌..." [অথর্ববেদ/শির উপনিষদ/১] আমিই এক এবং আদিতে ছিলাম। এটি 'একমেবাদ্বিতীয়ম্' বাক্যের প্রত্যক্ষ বিশেষীকরণ।

​আবার, কৃষ্ণ-যজুর্বেদের শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ/অধ্যায়/১৮ নং মন্ত্র — "যদাঽতমস্তন্ন দিবা ন রাত্রির্ন সন্নচাসৎ শিব এব কেবলঃ" - অর্থাৎ, আদি সৃষ্টির পূর্বে যখন অজ্ঞানরূপ অন্ধকারের লেশমাত্রও ছিলনা, তখন দিন ছিল না, রাত্রি ছিল না ; সৎ ছিল, অসৎও ছিল না, তখন কেবলমাত্র অদ্বিতীয় পরমেশ্বর শিবই ছিলেন। এখানে 'সৎ' ও 'অসৎ'-এর অতীত সত্তা হিসেবে শিবকে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। ​যদি আমরা 'এক' বলতে সাধারণ ঈশ্বর বুঝি, তবে "রুদ্রো ন দ্বিতীয়ায় তস্থুঃ" এই মন্ত্রের বিশেষত্ব নিরর্থক হয়ে পড়ে। ​কিন্তু যদি 'এক' বলতে 'রুদ্র' বুঝি, তবে ঋগ্বেদের সেই "একং সৎ" মন্ত্রটির একটি সুনির্দিষ্ট এবং শাস্ত্রসম্মত লক্ষ্য স্থির হয়।

ছাগপশুন্যায় অনুসারে -

১. সাধারণ পদ- একম্, সত্, ব্রহ্ম।
২. বিশেষ পদ- রুদ্র, শিব, ঈশান।

​যেহেতু শ্রুতি "একই রুদ্র, দ্বিতীয় কেউ নেই" (ন দ্বিতীয়ায় তস্থুঃ) বলে একটি কঠোর সীমারেখা টেনে দিয়েছে, তাই বেদের সমস্ত 'এক' বা 'অদ্বৈত' বোধক বাক্য এই বিশেষ রুদ্রতত্ত্বেই পর্যবসিত হয়। বৈদিক বিচারে সাধারণ ধর্মী (ব্রহ্ম) এবং বিশেষ ধর্মী (রুদ্র) অভিন্ন, যেখানে বিশেষ পদটিই সাধারণ পদের পরিচয় নিশ্চিত করে।

♦️ বশিষ্ট ধর্মসূত্রে বলা হয়েছে —

ইতিহাসপুরাণাভ্যাং বেদং সমুপবৃহয়েৎ”।
[বশিষ্ঠ ধর্মসূত্র/সপ্তবিংশতি অধ্যায়/ষষ্ঠ সূত্র]

অর্থ — ইতিহাস ও পুরাণ দ্বারা বেদকে বর্ণনা করা উচিত।

এখন রুদ্রের সাপেক্ষে এই ঋকের উপবৃংহণ আলোচনা করা যাক। 

♦️ এই প্রসঙ্গে কূর্ম মহাপুরাণ বলছে —

এনমেকে বদন্ত্যগ্নিং নারায়ণপথাপরে ।
ইন্দ্রমেকে পরে প্রাণং ব্রহ্মানমপরে জগুঃ ॥
ব্রহ্মবিষ্ণুগ্নিবরুণাঃ সর্ব্বে দেবান্তথর্যয়ঃ ।
একস্যেবাথ রুদ্রস্য ভেদান্তে পরিকীর্ত্তিতাঃ ॥
যং যং ভেদং সমাশ্রিত্য যজন্তি পরমেশ্বরম্ ।
তত্ত্বদ্রুপং সমাস্থায় প্রদদাতি ফলং শিবঃ ॥

[কূর্মপুরাণ/উপরিভাগ/৪৪ অধ্যায়/৩৬-৩৮ নং শ্লোক]

✅ অর্থ : কেহ কেহ অগ্নিকে পরমাত্মা বলিয়া থাকেন,কেহ নারায়ণকে,কেহ ইন্দ্রকে,কেহ প্রাণকে,কেহ বা ব্রহ্মাকে পরমাত্মা বলিয়া থাকেন। কিন্তু, ব্রহ্মা,বিষ্ণু, অগ্নি,বরুণ প্রভৃতি সর্ব্বদেবতা এবং সমস্ত ঋষিগণ এক রুদ্রেরই ভেদমাত্র বলিয়া পরিকীর্ত্তিত। সাধক যে যে ভেদ আশ্রয় করিয়া পরমেশ্বরের পূজা করেন, পরমেশ্বর রুদ্র সেই রূপ আশ্রয় করিয়া ফল প্রদান করিয়া থাকেন।।

♦️ শিবরহস্য মহৈতিহাস শাস্ত্র বলছে —

এষ ব্রহ্মষ বিষ্ণুশ্চ এষ দেবো বিরাজতে ।
এষ ভূতপতির দেব এষ সেতুবিধানঃ ॥২৯॥
একমেব মহাদেবমিন্দ্রমিত্রাদিভিঃ সুরৈঃ ।
নামরূপগুণৈশ্চৈব মায়য়া মন্যতে জনঃ ॥৩০॥

[শিবরহস্য ইতিহাস/১ম অংশ/৩য় অধ্যায়]

​✅ অর্থ : মহাদেবই একমাত্র সত্তা যিনি ব্রহ্মা, বিষ্ণু, ইন্দ্র, মিত্র এবং অন্যান্য নামে পরিচিত। মানুষ মায়ার বশবর্তী হয়ে তাঁকে বিভিন্ন নাম, রূপ ও গুণের মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন মনে করে।

♦️ ব্রহ্ম মহাপুরাণ হয়েছে —

এক এবাদ্বয়ঃ শম্ভুরিন্দ্রমিত্রাগ্নিনামভিঃ।
বদন্তি বহুধা বিপ্রা ভ্রান্তোপকৃতিহেতবে ॥২৭॥
​[ব্রহ্ম মহাপুরাণ/ ১৫৮তম অধ্যায়]

✅ অর্থ : অদ্বয় এক শম্ভুই ইন্দ্র, মিত্র ও অগ্নি নামে পরিচিত। বিভ্রান্তদের (অজ্ঞদের) উপকারের নিমিত্তে বিপ্রগণ (বিদ্বানগণ) তাঁকে বহু প্রকারে বর্ণনা করেন।

♦️ একই প্রসঙ্গে মহাভারতে বলা আছে —


ব্রহ্মাবিষ্ণুসুরেন্দ্রানাং রুদ্রাদিত্যাশ্বিনামপি ।
বিশ্বেষামপি দেবানাং বপুর্ধারয়তে ভবঃ ॥ ১৩৯ ॥
নরাণাং দেবনারীণাং তথা প্রেতপিশাচয়োঃ ।
কিরাতশবরাবাঞ্চ জলজানামনেকশঃ” ॥ ১৪০ ॥

[মহাভারত/অনুশাসনপর্ব/অধ্যায় ১৩]

✅ অর্থ : ভব (পরমেশ্বর শিব) ব্রহ্মা, বিষ্ণু, সুররাজ ইন্দ্র, রুদ্রগণ, আদিত্যগণ ও অশ্বিনীকুমারদ্বয়সহ বিশ্বের সমস্ত দেবতার শরীর (রূপ) ধারণ করেন ॥ ১৩৯ ॥
​তিনিই মানুষের রূপ, দেবনারীদের রূপ, এমনকি প্রেত ও পিশাচদের রূপও ধারণ করেন। এছাড়া তিনি কিরাত (ব্যাধ), শবর এবং জলে উৎপন্ন নানা প্রকার জলজ প্রাণীর রূপও বহুবার ধারণ করেন ॥ ১৪০ ॥

​অর্থাৎ নাম এবং রূপ যা-ই হোক না কেন, তার আধার বা শরীর ধারণকারী হলেন একমাত্র পরমেশ্বর শিব।

​উপরিউক্ত শ্লোকগুলো ছাড়াও আশ্বলায়ন গৃহ্যসূত্রের সূত্র — “সর্বাণি হ বা অস্য নামধেয়ানি [৪/৯/২৭] জগতের সমস্ত নামই রুদ্রের নাম। এমনকি তৈত্তিরীয় সংহিতা ৪/৫/৯- “দেবানা হৃদয়েভ্যঃ” উল্লেখ করে যে রুদ্রই সমস্ত দেবগণের অন্তর্যামী। সুতরাং, এখানে রুদ্রই হলেন সেই 'একং সৎ' (এক পরম সত্য) যাকে ঋষিরা বিভিন্ন নামে ডাকেন।

এটি স্বীকৃত হয় যে "সমস্ত নামই রুদ্রের" (আশ্বলায়ন গৃহ্যসূত্র/৪/৯/২৭), তবে এই বড় সত্যটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ক্ষুদ্রতর নামগুলো (অগ্নি, ইন্দ্র ইত্যাদি) যে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই রুদ্রের অন্তর্ভুক্ত হবে, তা দণ্ডাপুপিকা ন্যায়ে স্বতঃসিদ্ধ। অর্থাৎ, মহত্তর সত্য (রুদ্রের সর্বনামাত্মকতা) প্রমাণিত হলে ক্ষুদ্রতর সত্যগুলো (অগ্নি আদির নামান্তর) আলাদা করে প্রমাণের প্রয়োজন পড়ে না।
"একং সদ্বিপ্রা বহুধা বদন্তি" এই মন্ত্রে 'একং' হলো সেই অদ্বিতীয় পরমেশ্বর রুদ্র, আর 'অগ্নি', 'যম' প্রভৃতি নামগুলো তাঁরই বিভিন্ন বিভূতি বা শক্তির পরিচায়ক। যেহেতু তিনি সর্বব্যাপী (বৈশ্বানর রূপে বা অগ্নিরূপে), তাই সমস্ত বৈদিক ও জাগতিক শব্দ প্রকৃতপক্ষে তাঁরই মহিমা কীর্তন করে। কল্পবেদাঙ্গ অনুযায়ী শ্রুতির ব্যাখ্যা একদম শাস্ত্রসম্মত।

অর্থাৎ এক ও অদ্বিতীয় পরমেশ্বর রুদ্রই বিভিন্ন স্বরূপে প্রকাশিত হন। কৈবল্য শ্রুতির এই বাক্যও একই অর্থ প্রতিপাদন করে —

স ব্রহ্মা স শিবঃ সেন্দ্রঃ সোঽক্ষরঃ পরমঃ স্বরাট্ ।
স এব বিষ্ণুঃ স প্রাণঃ স কালোঽগ্নিঃ স চন্দ্রমাঃ ॥ ৮ ॥
[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/কৈবল্য উপনিষদ/৮ নং মন্ত্র]

অর্থ — তিনিই (পরমেশ্বর শিব)  ব্রহ্মা, তিনিই শিব, তিনিই ইন্দ্র, তিনি অবিনশ্বর, পরম, স্বয়ংপ্রভ ও সর্বাধিপতি। তিনিই বিষ্ণু, তিনিই প্রাণ, তিনিই কাল, তিনিই অগ্নি এবং তিনিই চন্দ্র।

আবার একই সমর্থন রয়েছে তৈত্তিরীয় আরণ্যকে —

স ব্রহ্ম স শিবঃ স হরিঃ স ইন্দ্রঃ সোঽক্ষরঃ পরমঃ স্বরাট্  ॥ ৫ ॥ " 
(কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/তৈত্তিরীয় আরণ্যক/ ১০ম প্রপাঠক/নারায়ণ সূক্ত)  

অর্থাৎ এক ও অদ্বিতীয় পরমেশ্বর রুদ্র, যিনি ব্রহ্মা, বিষ্ণু, রুদ্র, ইন্দ্র, অগ্নি, চন্দ্র প্রভৃতি সকল দেবরূপে প্রকাশিত।

এছাড়াও - (শতপথ ব্রাহ্মণ ৬/১/৩/১০-১৯), (কৌষীতকি ব্রাহ্মণ ৬/১-৯ সম্পূর্ণ) (অথর্ববেদ/শির উপনিষদ ২/১-৩৩), (কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/রুদ্রহৃদয় উপনিষদ) অনুযায়ী - পরমেশ্বর শিবই যে সকল দেবতার রূপের ধারক তা প্রমাণিত হয়ে যায়।

অর্থাৎ, দেবতাগণ পৃথক সত্তা নন, এরা সকলেই ঐ এক সর্বব্যাপী ব্রহ্ম রুদ্রেরই নানা শক্তির প্রকাশ।একো অহং বহু স্যাম্‌”, “সর্ব্বম্‌ খল্বিদং ব্রহ্ম”, “সর্বে বৈ রুদ্রঃ” ইত্যাদি শ্রুতিবাক্যও এই অর্থ প্রতিপাদন করে যে- এক ও অদ্বিতীয় পরমেশ্বর রুদ্রই বহু হন। এবং ব্রহ্মজ্ঞ ঋষিগণ সেই এক পরম সত্ত্বা রুদ্রকেই বহু নামে ডেকে থাকেন।

এবার - পূর্ব মীমাংসা ৩/৩/১৪ - শ্রুতি, লিঙ্গ, বাক্য, প্রকরণ, স্থান ও সমীক্ষা অনুযায়ী উক্ত বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যাক —

​১. শ্রুতি প্রমাণ — ​মীমাংসা অনুসারে 'শ্রুতি' হলো সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ।

তৈত্তিরীয় সংহিতা (১/৮/৬)

"প্রতিপুরুষমেককপালার্নির্ব্বপত্যেকমতিরিক্তং যাবন্তো গৃহ্যাঃ স্তন্তেভ্যঃ কমকরং পশূনাং শর্মাসি শৰ্ম্ম যজমানস্য শৰ্ম্ম যে যচ্ছৈক এব রুদ্রো ন দ্বিতীয়ায় তস্থে আখুস্তে রুদ্র পশুস্তং জুষস্ব” ।। এখানে ত্র্যম্বক হোমের জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক পুরডাশ নির্বাপণ বা প্রস্তুত করার প্রত্যক্ষ বিধান দেওয়া হয়েছে। যদিও বাক্যের শেষাংশে স্তুতিমূলক কিছু বর্ণনা রয়েছে, তবে মূল উদ্দেশ্য একটি যজ্ঞীয় কর্ম সম্পাদন করা হওয়ায় এটি বিধিরূপেই গণ্য।


কৃষ্ণ-যজুর্বেদের ​শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ - "একো হি রুদ্রো ন দ্বিতীয়ায় তস্থুঃ"।
সামবেদের ​ছান্দোগ্য উপনিষদের - "একমেবাদ্বিতীয়ম্"।


এখানে 'এক' এবং 'অদ্বিতীয়' শব্দের সরাসরি প্রয়োগ কোনো মধ্যস্থতা ছাড়াই পরম সত্তাকে নির্দেশ করছে। নিরপেক্ষবাদীরা যখন 'এক' পদটিকে একটি গুণবাচক বিমূর্ত ধারণা বলেন, তখন ছাগপশুন্যায় দ্বারা সেই সাধারণ শ্রুতিকে 'রুদ্র' নামক বিশেষ শ্রুতির মাধ্যমে সংকুচিত করা হয়। শ্রুতি প্রমাণ অনুযায়ী, রুদ্রের অদ্বিতীয়ত্ব স্বতঃসিদ্ধ।

​২. লিঙ্গ প্রমাণ — ​'লিঙ্গ' হলো শব্দের অন্তর্নিহিত শক্তি বা চিহ্ন। এখানে "গিরিত্র", "গিরিশন্ত", এবং "ত্রিনেত্র" পদের উল্লেখ হয়েছে। শ্বেতাশ্বতরের ৩য় অধ্যায়ে যখন 'রুদ্র' শব্দের সাথে এই বিশেষ চিহ্নগুলো (লিঙ্গ) যুক্ত হয়, তখন তা কেবল নিরাকার ব্রহ্মকে বোঝায় না, বরং সগুণ-নির্গুণ অভেদ পরমেশ্বর শিবকেই চিহ্নিত করে। "ঘৃতকাঠিন্য ন্যায়" এখানে লিঙ্গ প্রমাণের কাজ করছে অর্থাৎ ঘনীভূত ঘৃতের চিহ্ন দেখেই যেমন তার মূল উপাদান বোঝা যায়, এই চিহ্নগুলো দেখেই 'একম্ সত্'-এর পরিচয় রুদ্র হিসেবে নিশ্চিত হয়।

​৩. বাক্য প্রমাণ — ​বাক্য হলো পদের পারস্পরিক অন্বয়। পাণিনীয় সূত্র ৮/১/৭৩ এবং সামানাধিকরণ্য হয়েছে। "একং সদ্বিপ্রা বহুধা বদন্তি" এবং "এক হি রুদ্র" এই দুই বাক্যের মধ্যে 'এক' এবং 'রুদ্র' পদের যে ব্যাকরণগত সম্পর্ক, তার দ্বারা প্রমাণ হয় যে- রুদ্র কোনো খণ্ডিত রূপ নন। পাণিনীয় সামানাধিকরণ্য অনুযায়ী- বাক্যের অন্তর্গত 'এক' পদের আধার হলেন 'রুদ্র'। এটি নিরপেক্ষবাদীদের "অনাবস্থাদোষ" থেকে মুক্ত করে, কারণ এখানে রুদ্রই অদ্বিতীয় ব্রহ্ম, এখানে কোনো ভেদাভেদ নেই।

​৪. প্রকরণ প্রমাণ — ​'প্রকরণ' হলো বিষয়ের ধারাবাহিকতা বা প্রসঙ্গ। শ্বেতাশ্বতর উপনিষদের ৩য় ও ৪র্থ অধ্যায়ের প্রকরণ অনুযায়ী-  যেখানে সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের কথা বলা হচ্ছে এবং সমাপ্তিতে বলা হচ্ছে "শিব এব কেবলঃ" (কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ/৪/১৮), সেখানে পুরো প্রকরণটি শিবতত্ত্বকেই 'অদ্বিতীয়' হিসেবে প্রতিষ্ঠা করছে। নিরপেক্ষবাদীরা প্রকরণ বিচ্ছিন্ন করে কেবল একটি বাক্য (একং সত্) গ্রহণ করেন, কিন্তু মীমাংসা মতে সমগ্র প্রকরণ বিচার করলে অদ্বিতীয় সত্তা হিসেবে রুদ্রই প্রতিপাদিত হন।

​৫. স্থান প্রমাণ — ​'স্থান' বা 'ক্রম' হলো পাঠের অবস্থান। শতরুদ্রীয় এবং তৈত্তিরীয় আরণ্যক (নারায়ণ সূক্ত)-এর ক্রম উল্লেখ্য। কৈবল্য উপনিষদ বা তৈত্তিরীয় আরণ্যকের ক্রমে বলা হয়েছে- "স ব্রহ্মা স শিবঃ স হরিঃ", তখন 'শিব' পদের অবস্থান অন্যান্য দেবগণের উর্ধ্বে বা মূল সত্তা হিসেবে প্রদর্শিত হয়। দণ্ডাপুপিকা ন্যায় অনুযায়ী, মূল সত্তার স্থানে রুদ্রের উপস্থিতিই প্রমাণ করে যে অন্য সব নাম রুদ্রের ক্রমিক প্রকাশ।

​৬. সমাখ্যা প্রমাণ — আশ্বলায়ন গৃহ্যসূত্রের "সর্বাণি হ বা অস্য নামধেয়ানি" এবং অমরকোষের সংজ্ঞা উল্লেখ্য। 'বিপ্র' শব্দের সমাখ্যা হলো "দেবতাতত্ত্ববিদ"। যারা বেদ বহির্ভূত দেবতার উপাসনা করে, সমাখ্যা অনুযায়ী তারা 'বিপ্র' নয়। আবার রুদ্র শব্দের সমাখ্যা হলো "যিনি দুঃখ বিনাশ করেন" বা "যিনি ব্রহ্মবিদ্যা দান করেন"। এই বৈদিক সমাখ্যা বা পরিচিতিই প্রমাণ করে যে- ঋগ্বেদের সেই 'একম্ সত্' প্রকৃতপক্ষে রুদ্রই।

​পূর্বমীমাংসা ৩/৩/১৪ অনুযায়ী, শ্রুতি লিঙ্গ বা বাক্যের চেয়ে শক্তিশালী। যেহেতু তৈত্তিরীয় সংহিতায় সরাসরি শ্রুতি রয়েছে যে- "রুদ্রই এক, দ্বিতীয় কেউ নেই", তাই এই শ্রুতি প্রমাণ নিরপেক্ষবাদীদের 'লিঙ্গ' বা 'বাক্য' ভিত্তিক সাধারণ কল্পনাকে নস্যাৎ করে দেয়।

​উক্ত বিশ্লেষণ দ্বারা প্রমাণ হয় যে —

১. ব্রহ্মের অদ্বিতীয়ত্ব কোনো শূন্যতা নয়, তা রুদ্রের পূর্ণতা।

২. নিরপেক্ষবাদীদের ব্যাখ্যা একটি "অর্ধসত্য", কারণ তারা কেবল সাধারণ শ্রুতিকে গ্রহণ করে, বিশেষ শ্রুতিকে (রুদ্র) ত্যাগ করে।

৩. পাণিনীয় ব্যাকরণ এবং মীমাংসা ন্যায়ের নিরিখে পরমেশ্বর শিবই সেই অদ্বিতীয় পরমাত্মা, যিনি সমস্ত বৈদিক নাম ও রূপের মূল উৎস।

🔷 ন্যায় দর্শন অনুযায়ী —

লৌকিকপরীক্ষকাণাৎ যস্মিন্নর্থে বুদ্ধি সাম্যং স দৃষ্টান্তঃ ৷৷ ২৫ ৷৷
[ন্যায়/১/১/২৫]

অনুবাদ — লৌকিকদিগের এবং পরীক্ষকদিগের যে পদার্থে বৃদ্ধির সাম্য (অবিরোধ) হয়, তাহা দৃষ্টান্ত।

​বেদের প্রধান ভাষ্যকারগণ, যথা- সায়ণাচার্য, মহীধর এবং উবট, তাঁদের ভাষ্যে স্পষ্টভাবে রুদ্রের সর্বেশ্বরত্ব এবং সাকার-নিরাকার উভয় স্বরূপের স্বীকৃতি দিয়েছেন। ​তাঁরা ‘রুদ্র’ পদকে একদিকে যেমন ‘অগ্ন্যাদি’ সর্বাত্মক নিরাকার শক্তিরূপে ব্যাখ্যা করেছেন, তেমনি শতরুদ্রীয় আদি প্রকরণে রুদ্রকে ‘গিরিশন্ত’ বা ‘কৈলাসনিবাসী’ সাকার রূপেও স্বীকার করেছেন।
​সুতরাং, পরীক্ষক বা শাস্ত্রজ্ঞদের নিকট রুদ্রের এই উভয়মুখী সত্তা সম্পূর্ণ অবিরোধ। যা ন্যায় মতে দৃষ্টান্তের লক্ষণ আর দৃষ্টান্তের কোনো খণ্ডন হয় না।

সুতরাং - 

১. প্রতিজ্ঞা: — অদ্বিতীয় ব্রহ্ম মূলত পরমেশ্বর রুদ্রই।

২. ​হেতু: — যেহেতু শ্রুতি ও পাণিনীয় ব্যাকরণ তাঁকে ‘সামান্যবচন’ এবং ‘অদ্বিতীয়’ বলে নির্দেশ করেছে।

​৩. দৃষ্টান্ত: — যেমন লৌকিক ও পরীক্ষক উভয়ের সম্মতিতে রুদ্রের সাকার-নিরাকার অভেদ সত্যটি স্বীকৃত (ন্যায় ১/১/২৫)

৪. ​উপনয়: — ঋগ্বেদের ‘একং সত্’ মন্ত্রেও সেই একই অবিরোধ রুদ্রতত্ত্ব প্রযুক্ত হয়েছে।

৫. ​নিগমন: — অতএব, রুদ্রই সেই অদ্বিতীয় সত্য যাকে বিপ্রগণ বহু নামে অভিহিত করেন।

​ঋগ্বেদের “একং সদ্বিপ্রা বহুধা বদন্তি” এই মন্ত্রের প্রকৃত তাৎপর্য কেবল একটি বিমূর্ত নিরপেক্ষবাদ নয়, বরং এটি পরমেশ্বর রুদ্রের সর্বাত্মক ও অদ্বিতীয় সত্তারই সপ্রমাণ ঘোষণা। বৈদিক ও ব্যাকরণিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এটি সুষ্পষ্ট যে- নিরপেক্ষবাদীদের সমন্বয়ী ব্যাখ্যা আদতে একটি ‘অর্ধসত্য’। কারণ, সাধারণ ‘এক ব্রহ্ম’ পদের লক্ষ্য যে বিশেষ ‘রুদ্র’ সত্তা, তা শ্রুতি নিজেই নির্ধারণ করে দিয়েছে।

ছাগপশুন্যায়” এবং ‘তদর্থশাস্ত্রাৎ’ নিয়মানুযায়ী, সাধারণ পদের অর্থ সর্বদা বিশেষ পদের অনুগামী হয়। যখন শ্রুতি স্বয়ং বলছে- “একো হি রুদ্রো ন দ্বিতীয়ায় তস্থুঃ”, তখন জগতের সমস্ত ‘এক’ ও ‘অদ্বিতীয়’ পদের পরমার্থিক পর্যবসান রুদ্রতত্ত্বেই সম্পন্ন হয়। “দণ্ডাপুপিকা ন্যায়” অনুযায়ী- মূল সত্তা হিসেবে রুদ্রের অদ্বিতীয়ত্ব প্রমাণিত হলে, অন্যান্য নাম ও রূপের তদাশ্রিত হওয়া স্বতঃসিদ্ধ হয়ে যায়।

​পাণিনীয় ব্যাকরণের সামানাধিকরণ্য এবং “নামন্ত্রিতে সমানাধিকরণে সামান্যবচনম্” সূত্রের আলোকে রুদ্র ও অদ্বিতীয় ব্রহ্মের অভিন্নতা প্রতিষ্ঠিত। রুদ্র এখানে কেবল ব্রহ্মের কোনো একটি গুণবাচক ‘নাম’ নন, বরং তিনি সেই পরম তত্ত্ব ‘সামান্যবচন’ বা মূল আধার। শ্বেতাশ্বতর ও তৈত্তিরীয় সংহিতার প্রকরণ বিচার করলে দেখা যায়, নিরাকার পরশিবব্রহ্ম ও সগুণ রুদ্রের মধ্যে কোনো ভেদ নেই, যেমনটি ‘ঘৃতকাঠিন্য ন্যায়’ দ্বারা প্রমাণিত।

​বশিষ্ঠ ধর্মসূত্রের নীতি অনুযায়ী ইতিহাস ও পুরাণের মাধ্যমে বেদের অর্থ বিস্তার করলে (উপবৃংহণ) দেখা যায়- কূর্মপুরাণ, শিবরহস্য, মহাভারত এবং ব্রহ্মপুরাণ একই সমর্থনে স্বীকার করেছে যে- অগ্নি, বিষ্ণু বা ইন্দ্রের উপাসনা প্রকৃতপক্ষে সেই এক অদ্বিতীয় রুদ্রেরই উপাসনা। আশ্বলায়ন গৃহ্যসূত্রের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জগতের সমস্ত নামই রুদ্রের নাম, কারণ তিনি সর্বব্যাপী।

​পরিশেষে বলা যায়- পরমেশ্বর রুদ্রই সেই অনাদি ও অদ্বিতীয় সত্তা, যিনি স্বীয় মায়ার দ্বারা বহু রূপে প্রতীয়মান হন। রুদ্র কেবল প্রলয়কর্তা নন, বরং তিনি সেই এক ও অদ্বিতীয় পরমেশ্বর, যিনি সত্ ও অসত্ এর অতীত এবং অন্ধকার প্রলয়কালেও একমাত্র অবশিষ্ট থাকেন (শিব এব কেবলঃ)। সুতরাং, ঋগ্বেদের ‘একং সৎ’ হলো সেই পরমেশ্বর রুদ্রই। তাঁর উপাসনাই সনাতন ধর্মের মূল ও অনাদি ধারা, যা শ্রুতি, লিঙ্গ, বাক্য, প্রকরণ, স্থান ও সমাখ্যা এই ছয়টি প্রমাণের দ্বারাই সুপ্রতিষ্ঠিত।


🙏সর্বে হ্যেষ রুদ্রস্তস্মৈ রুদ্রায় নমো অস্তু🙏

নমঃ শিবায়ৈ 🙏
নমঃ শিবায় 🙏
শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্‌ ✊
ॐ নমঃ পার্বতীপতয়ে হর হর মহাদেব 🚩

✍️ অপপ্রচার দমনে— অন্তিক ভট্টাচার্য্য (শম্বরনাথ শৈব)।

🌻 বিশেষ কৃতজ্ঞতা— আমার গুরু শ্রী নন্দীনাথ শৈবাচার্য জী ও আমার আদর্শ শ্রী রোহিত কুমার চৌধুরী শৈবজী।

📣 কপিরাইট ও প্রচারে— Shivalaya।


মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ