আর্যসমাজের নিরাকারবাদী যুক্তির অসারতা ও শৈবপক্ষের অকাট্য খণ্ডন।

 🚩 ​"আর্যসমাজের নিরাকারবাদী যুক্তির অসারতা ও শৈবপক্ষের অকাট্য খণ্ডন। পাণিনীয় ব্যাকরণ, যজ্ঞতত্ত্ব এবং বিবিধ ন্যায়ের আলোকে সাকার মূর্তিপূজার আধ্যাত্মিক ও বৈজ্ঞানিক অনিবার্যতা।"


✅ নিরাকার ঈশ্বরের উপাসনা কিভাবে সম্ভব ❓

প্রশ্ন— দাদা ! বলো, ঈশ্বর যদি নিরাকার হন, তাঁকে মনে করব কেমন করে ?

আর্যসমাজের উত্তর — আচ্ছা, শোনো । ‘মনে করা’—তাই না? মনে রেখো, ‘মনে করা’ দুই প্রকারের ।

◼️ প্রথমতঃ—জগতের প্রাণী ও জগতের পদার্থকে মনে করা।
◼️দ্বিতীয়তঃ- সর্বব্যাপক, সর্বনিয়ন্তা, ইন্দ্রিয়াতীত পরম প্রভু পরমাত্মাকে মনে করা।

জগতের সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত বস্তু সমূহকে মনে করা যায়, তাদের দর্শন করে, অথবা তাদের বিয়োগ হলে । যথা—এক বন্ধুকে আমি কলকাতায় দেখলাম, তার সঙ্গে পরিচয় হলো । ছ'বছর পর আবার আমি তাকে বোম্বাই নগরে দেখলাম । এবার আমার মনে হলো একে তো আমি কলকাতায় দেখেছিলাম । এবার শোনো বিয়োগ হলে কেমন করে মনে করা যায় — যেমন নাকি, – আমার এক বন্ধু, তার সঙ্গে আমার গভীর ভালোবাসা । একদিন সে বেড়াতে চলে গেল । এবার তার কথা বার বার মনে হতে লাগল না জানি এখন সে কোথায় আছে । যত সময় আমরা পরস্পরকে দর্শন করি, তত সময় মনে করার কোনো প্রশ্নই আসে না ।

 কেননা, যে বস্তু চোখের সামনে আছে, তার সম্বন্ধে মনে করা আবার কি? যখন পরস্পর বিযুক্ত হলাম, তখন তার কথা মনে জাগল এ হলো জাগতিক বস্তু সমূহকে মনে করা । ঈশ্বরকে মনে করা এ হতে সম্পূর্ণ পৃথক্ ব্যাপার । ঈশ্বরকে মনে করা বা ঈশ্বরের ধ্যান করা, মানে — মনকে নির্বিষয় করা । ‘মনে করা’ অর্থাৎ মন এবং ইন্দ্রিয় সমূহে ছড়ানো আত্মিক শক্তিকে আত্মায় একত্র করা । যত সময় মন এবং ইন্দ্রিয় সমূহ জাগতিক বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকবে, তত সময় আত্মা ঈশ্বরের ধ্যান বা ঈশ্বরকে মনে করতে পারবে না । ঈশ্বরের ধ্যান করার জন্যে মন এবং ইন্দ্রিয় সমূহকে নিরন্তর অভ্যাস দ্বারা বিষয়ের প্রতি ধাবিত হতে না দেওয়া অত্যন্ত আবশ্যক।

মনে রাখতে হবে যে, যোগের অষ্ট অঙ্গের মধ্যে ধ্যান হলো সপ্তম অঙ্গ । যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা এই ছয়টি অঙ্গের পরিপালন করা সর্বপ্রথম আবশ্যক, তারপর সাধক ধ্যানের অধিকারী হয়। নিয়মানুসারে যোগের ছয়টি অঙ্গের পরিপালন বা অনুশীলন হওয়ার পর ধ্যান স্বাভাবিক ভাবেই হতে থাকে । যখন যোগের ছয় অঙ্গের পর ধ্যানের স্থান, সে অবস্থায় মূর্তির দ্বারা আরম্ভেই কেমন করে ধ্যান হবে?


✅ শৈবপক্ষ দ্বারা খণ্ডন — 

​আর্যসমাজ বলছে মনকে ‘নির্বিষয়’ করতে। কিন্তু মনস্তত্ত্ব অনুযায়ী, মন কখনোই শূন্যে ভাসতে পারে না। মনের ধর্মই হলো কোনো না কোনো ‘বিষয়’ বা ‘আলম্বন’কে গ্রহণ করা। নিরাকার পরমাত্মা যদি মন ও বাণীর অগোচর হন, তবে সেই ‘অগোচর’ সত্তাকে মন দিয়ে ভাবা অসম্ভব। কারণ, মন কেবল সসীম ও সাকার বস্তুকেই ধারণ করতে পারে। আর্যসমাজ যে ‘ওঁ’ বা শব্দব্রহ্মের উপাসনা করে, সেটিও একটি ‘নামাত্মক’ সাকার রূপ। যদি শব্দ একটি মাধ্যম হতে পারে, তবে রূপ কেন নয় ? দুটিই তো ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য।

​আর্যসমাজ মনে করে অষ্টাঙ্গ যোগের প্রথম ধাপ থেকেই নিরাকার ধ্যান সম্ভব। কিন্তু বৈদিক ও পৌরাণিক পরম্পরা ‘অধিকারি-ভেদ’ স্বীকার করে।
​গীতায় (১২/৫) স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে - “অব্যক্তা হি গতির্দুঃখং দেহবদ্ভিরবাপ্যতে’’ অর্থাৎ- দেহধারী মানুষের পক্ষে নিরাকার উপাসনা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। এছাড়াও- উপনিষদ যখন ‘ওঁ’ কারকে ধ্যানের মাধ্যম বলে, তখন সে একটি ‘প্রতীক’ বা ‘প্রতিমা’ তৈরি করে দেয়। 
কঠোপনিষদ (১/২/১৭) বলছে — “এতদালম্বনং শ্রেষ্ঠমেতদালম্বনং পরম্”। অর্থাৎ, এই আলম্বন বা অবলম্বন শ্রেষ্ঠ। যদি অবলম্বন ছাড়াই সব সম্ভব হতো, তবে উপনিষদ এই প্রতীকের প্রয়োজনীয়তা দেখাত না।

​আর্যসমাজ মূর্তিকে ‘জড়’ বলে প্রত্যাখ্যান করে, কিন্তু তারা ‘বেদ’ নামক গ্রন্থ বা ‘শব্দ’কে পরম পবিত্র মনে করে। শব্দও তো আকাশ গুণের কার্য এবং জড় প্রকৃতির অংশ। যদি জড় শব্দের মাধ্যমে চৈতন্যে পৌঁছানো যায়, তবে জড় মূর্তির মাধ্যমে কেন নয়? রূপ, রস, গন্ধ, স্পর্শ এবং শব্দ এই পাঁচটিই পঞ্চভূতের গুণ। আর্যসমাজ কেবল ‘শব্দ’কে গ্রহণ করে বাকিগুলোকে বর্জন করার মাধ্যমে একটি যৌক্তিক একদেশদর্শিতা প্রদর্শন করে।

​আর্যসমাজের উত্তরে ঈশ্বরকে কেবল ‘সর্বনিয়ন্তা’ ও ‘ইন্দ্রিয়াতীত’ এক সত্তা হিসেবে দেখানো হয়েছে, যা অনেকটা যান্ত্রিক বিষয়ের মতো। মানুষের হৃদয়ে যে ভক্তি ও প্রীতি রয়েছে, তার প্রকাশের জন্য একটি রূপ বা আধার প্রয়োজন। মা যেমন সন্তানকে ভালোবাসলে তাকে জড়িয়ে ধরেন (যা সাকার কর্ম), ঈশ্বরকেও মানুষ ভালোবাসলে তাকে একটি হৃদয়ানুগ রূপে দেখতে চায়। নিরাকার ভাবটি অত্যন্ত শুষ্ক এবং সাধারণ মানুষের জন্য তা আধ্যাত্মিক তৃপ্তি দিতে ব্যর্থ।

​আর্যসমাজ মূর্তিকে ‘ঈশ্বর’ মনে করে ভুল করে। সনাতন ধর্মের মূল যুক্তি হলো আমরা মূর্তিকে পূজা করি না, বরং মূর্তিতে থাকা ঈশ্বরকে পূজা করি। যেমন- অগ্নিকাষ্ঠের সর্বত্র আগুন থাকলেও তা ব্যবহারের জন্য যেমন মন্থন করে এক জায়গায় প্রকাশ করতে হয়, তেমনি ঈশ্বর সর্বব্যাপী হলেও উপাসনার সুবিধার্থে মূর্তিতে তাঁকে ‘আবাহন’ করা হয়। এটি কোনো ভুল নয়, বরং সর্বব্যাপী সত্তাকে হৃদয়ে ঘনীভূত করার একটি আধ্যাত্মিক বিজ্ঞান।

আর্যসমাজের উত্তরটি কেবল উচ্চস্তরের যোগীদের জন্য প্রযোজ্য হতে পারে, কিন্তু সাধারণ সাধকের জন্য তা অপূর্ণ। যিনি নিরাকার, তিনিই সাকার হওয়ার ক্ষমতা রাখেন এই পূর্ণতাকে আর্যসমাজ অস্বীকার করে। মূর্তিপূজা বা প্রতীক উপাসনা কোনো প্রাথমিক ভুল নয়, বরং এটি ব্রহ্মের সর্বব্যাপী সত্তাকে স্পর্শ করার জন্য একটি সোপান বা পবিত্র মাধ্যম।

‘স্থুলারুন্ধতী ন্যায়’ অনুযায়ী - যেমন ছোট তারাটি দেখানোর জন্য আগে পাশের বড় তারাটি দেখানো হয়, তেমনি নিরাকারকে বোঝার জন্য সাকারের আশ্রয় নেওয়াটা শাস্ত্রসম্মত এবং বিজ্ঞানসম্মত।
——————————————————————————————————————————————————————

প্রশ্ন —  দাদা ! মন যে বড় চঞ্চল, — ছট্‌ফটে । নিরাকারে সে কেমন করে যুক্ত হবে বুঝতে পারছি না? মনকে অভীষ্ট স্থানে যুক্ত করতে হলে সাকার পদার্থের সাহায্য ছাড়া কেমন করে তা সম্ভব হবে? মন নিবিষ্ট করার জন্য সাকার পদার্থ একান্ত আবশ্যক । সাকার পদার্থ ছাড়া মনে স্থিরতা আসতেই পারে না ।

আর্যসমাজের উত্তর —  স্নেহের ভাইটি ! তুমি বড় সরল । আরে মন যে নিরাকারেই স্থির হয় একথা জানোনা? সাকারে যে স্থির হতেই পারবে না । কেননা, সাকার পদার্থ যে, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ বিষয় যুক্ত তাই মন ঐ সব বিষয়ে আবদ্ধ হয়ে নিজের মধ্যে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে । যদি সাকার পদার্থে মন স্থির হতো, তাহলে জগৎটাই তো আকার যুক্ত, অর্থাৎ সাকার । যেহেতু জগৎটা সাকার, অতএব সকলের মন জগতে স্থির হয়ে যাওয়া উচিত। কিন্তু তা তো হয় না । জাগতিক বস্তুতে যতই মন প্রবেশ করেছে, ততই তার মনে চঞ্চলতা অধিকতর হচ্ছে । যদি আরও একটু গভীরভাবে বিচার করো তাহলে বুঝতে পারবে যে, মন কখনও স্থির হয় না, মন স্থির হওয়া মানেই মরণ । মন অথবা হৃদয়ের গতি রুদ্ধ হওয়াই মরণ । মন কোথাও স্থির হচ্ছে না — মানে, মানুষ মরে নাই । বাস্তবিক পক্ষে মনের বাহ্য বৃত্তি সমূহের অন্তর্মুখী হওয়াকেই মানসিক স্থিরতা বলে । মানুষ যত সময় বেঁচে থাকবে তত সময় তার মন গতিশীল থাকবে ।


✅ শৈবপক্ষ দ্বারা খণ্ডন— 

​আর্যসমাজ বলছে, মন সাকার বস্তুর রূপ-রস-গন্ধে চঞ্চল হয়, তাই নিরাকারে সে স্থির হয়। মন নিজে একটি সূক্ষ্ম বস্তু হলেও সে সবসময় কোনো না কোনো বিষয় অবলম্বন করে চলে। নিরাকার কোনো বিষয় নয়, বরং বিষয়ের অভাব। মন যদি কোনো আলম্বন না পায়, তবে সে স্থির হওয়ার বদলে আরও বেশি ইতস্তত বিক্ষিপ্ত হয়। যেমন- একটি লতা যেমন কোনো গাছ বা খুঁটি ছাড়া ওপরে উঠতে পারে না, মনও তেমনি কোনো রূপ বা প্রতীক ছাড়া উর্ধ্বমুখী হতে পারে না।

​তারা বলছে, জগৎ সাকার বলে সবার মন জগতে স্থির হওয়া উচিত ছিল। এটি একটি অত্যন্ত দুর্বল যুক্তি। জগতের বস্তুসমূহ চঞ্চল এবং পরিবর্তনশীল, তাই সেখানে মন স্থির হয় না। কিন্তু ঈশ্বরীয় সাকার রূপ বা 'বিগ্রহ' কোনো সাধারণ জাগতিক বস্তু নয়। সেটি হলো পরমাত্মার একটি ঘনীভূত আধ্যাত্মিক প্রতীক। সূর্য সর্বত্র থাকলেও তার তাপ দিয়ে কাগজ পোড়ানো যায় না, কিন্তু আতশ কাঁচের মাধ্যমে সেই সূর্যরশ্মিকে একবিন্দুতে আনলে তবেই কাগজ পোড়ে। ঠিক তেমনি, ঈশ্বর সর্বত্র নিরাকারভাবে থাকলেও মূর্তিতে বা প্রতীকে তাঁকে একাগ্র করলে তবেই মনের বিক্ষেপ দূর হয়।

​আর্যসমাজ দাবি করছে, মন স্থির হওয়া মানেই 'মরণ'। এটি যোগশাস্ত্রের মূল সংজ্ঞার সম্পূর্ণ বিরোধী। মহর্ষি পতঞ্জলি যোগের সংজ্ঞা দিয়েছেন — "যোগশ্চিত্তবৃত্তি নিরোধঃ" (যোগদর্শন ১/২) অর্থাৎ- চিত্তের বৃত্তিসমূহকে নিরোধ বা স্থির করাই যোগ। আর্যসমাজ এখানে 'জৈবিক গতি' এবং 'মানসিক একাগ্রতা'-কে এক করে ফেলেছে। মন স্থির হওয়া মানে মরণ নয়, বরং মন যখন বাহ্যিক বিষয় থেকে সরে এসে এক জায়গায় নিবদ্ধ হয়, তাকেই বলে সমাধি। সমাধিস্থ যোগী মৃত নন, বরং তিনি পরম সত্যে জীবিত।

​তারা বলছে, মনের বৃত্তির অন্তর্মুখী হওয়াকেই স্থিরতা বলে। এই অন্তর্মুখী হওয়ার জন্যই সাকারের প্রয়োজন। সাধারণ মানুষের মন সরাসরি শূন্যে অন্তর্মুখী হতে পারে না। তাকে প্রথমে একটি পবিত্র ও দিব্য রূপের (যেমন ইষ্টদেবতা বা ওঁকার প্রতীক) ওপর একাগ্র করতে হয়। সেই সাকার রূপের ধ্যান করতে করতেই মন সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর হয় এবং একসময় সেই রূপও ত্যাগ করে নিরাকারে বিলীন হয়। অর্থাৎ, সাকার হলো লক্ষ্যে পৌঁছানোর মাধ্যম, বাধা নয়।

​আর্যসমাজ এখানে মনস্তত্ত্বের ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছে। তারা রূপ-রস-গন্ধকে কেবল কামনার বস্তু হিসেবে দেখছে, কিন্তু এগুলো যে ভক্তির মাধ্যম হতে পারে তা অস্বীকার করছে। যদি রূপ-রস-গন্ধ মনকে চঞ্চল করে, তবে আর্যসমাজে যে হবনের সুগন্ধ বা মন্ত্রের শব্দ ব্যবহার করা হয়, তাতেও তো মন চঞ্চল হওয়ার কথা! যদি যজ্ঞের ধোঁয়া ও মন্ত্রের ধ্বনি (যা সাকার ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য) মনকে শান্ত করতে পারে, তবে একটি পবিত্র বিগ্রহ বা চিত্র কেন পারবে না ?

​সাকার পদার্থ মনকে চঞ্চল করে না, বরং অশুদ্ধ ও কামনাময় সাকার বস্তু মনকে চঞ্চল করে। পক্ষান্তরে, শুদ্ধ ও দিব্য সাকার রূপ চঞ্চল মনকে একটি কেন্দ্রে ধরে রাখতে সাহায্য করে।

“শাখাচন্দ্র ন্যায়” অনুযায়ী - দ্বিতীয়ার চাঁদ অত্যন্ত সূক্ষ্ম হয়, যা আকাশের বিশালতায় খুঁজে পাওয়া কঠিন। তখন একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি অন্যকে চাঁদটি দেখানোর জন্য বলেন, “ঐ যে দেখছ গাছের ডালটি (শাখা), ঠিক ওর মাথার ওপরেই চাঁদ আছে।”

​এখানে গাছের ডালটি কিন্তু চাঁদ নয়, এবং চাঁদ গাছের ডালের ওপর বসেও নেই। কিন্তু ডালটি একটি ‘সীমানা’ বা ‘আধার’ হিসেবে কাজ করে, যা আমাদের দৃষ্টিকে একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে স্থির হতে সাহায্য করে। যখনই দৃষ্টি সেই ডালের ডগায় স্থির হয়, তখনই তার ঠিক পেছনে থাকা সূক্ষ্ম চাঁদটি মানুষের চোখে ধরা পড়ে।
আর্যসমাজ যখন বলে যে সাকার বস্তু মনকে কেবল চঞ্চল করে, তখন তারা এই ‘শাখা’ বা আধারটির গুরুত্ব অস্বীকার করে। নিরাকার পরমাত্মা আকাশের সেই সূক্ষ্ম চাঁদের মতো, যা সাধারণ ও চঞ্চল মনের পক্ষে ধরা অসম্ভব। সাকার মূর্তি বা প্রতীক হলো সেই ‘গাছের ডাল’। এটি ঈশ্বর নয়, কিন্তু এটি আমাদের মনকে একটি নির্দিষ্ট ‘রূপ’ বা ‘বিন্দুতে’ স্থির করতে সাহায্য করে।
মন যখন সেই পবিত্র সাকার রূপে একাগ্র হয়, তখন সেই একাগ্রতার মাধ্যমেই সে ধীরে ধীরে সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর হয়ে নিরাকার পরম সত্যের নাগাল পায়।
​তাই মূর্তিপূজা বা সাকার উপাসনা কোনো ভ্রান্তি নয়, বরং এটি নিরাকারকে খুঁজে পাওয়ার এক অনিবার্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি। শাখা না থাকলে যেমন চঞ্চল দৃষ্টি আকাশে চাঁদকে খুঁজে পায় না, তেমনি সাকার আলম্বন না থাকলে চঞ্চল মন নিরাকার ব্রহ্মে লীন হতে পারে না।
——————————————————————————————————————————

প্রশ্ন —  তাহলে, তুমি বলতে চাও যে, যারা মূর্তিপূজা দ্বারা ঈশ্বরের ধ্যান করে তারা সব ভুল করে । 

আমার বিবেচনায় মূর্তি দ্বারা মনের চাঞ্চল্য দূর হতে পারে । এই জন্যই তো মানুষ শ্রীরাম, কৃষ্ণ, দুর্গা, কালী প্রভৃতি দেব দেবীর মূর্তি পূজা করে থাকে।

আর্যসমাজের উত্তর —  মূর্তি পূজা দ্বারা ঈশ্বরের ধ্যান কোনো কালেও হতে পারে না । আমি প্রথমেই বলেছি যে, ধ্যান মানে মনকে বিষয় শূন্য করা অর্থাৎ মনের ঝুলিতে কোনো জিনিষটি থাকবে না, মনের ঝুলিটিকে একেবারে খালি করে রাখতে হবে ।

একটু ভেবেই দ্যাখো, মূর্তিতে কী আছে? মূর্তিতে পঞ্চ বিষয় বিদ্যমান । মোটামুটিভাবে বিচার করলে দেখবে মূর্তিতে‘রূপ’ আছেই । ফল, সন্দেশ, দুধ, জল যা সমর্পণ করা হয় তাতে ‘রস’ আছে । মূর্তি পূজায় যে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়া হয় সেই ফুলে ‘গন্ধ’ আছে । পূজার সময়, কাঁসর, শঙ্খ, ঘন্টা বাজান হয় তাতে ‘শব্দ’ আছে । বিষয় রূপ মূর্তিটাই পঞ্চতত্ত্বের দ্বারা নির্মিত সেই পঞ্চতত্ত্ব নির্মিত মূর্তিতে রূপ, রস, গন্ধ, শব্দ ও স্পর্শ আছে । এই অবস্থায় মনের চঞ্চলতা মূর্তির দ্বারা কেমন করে দূরে হতে পারে ?
যদি মূর্তি দ্বারা মনের চাঞ্চল্য দূর হতো তাহলে মূর্তিপূজক, শ্রীকৃষ্ণকে যে ভগবান বলে থাকে সেই সাক্ষাৎ শ্রীকৃষ্ণ কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধক্ষেত্রে ধনুর্ধর অর্জুনের সামনে কেনো, অতি নিকটে থেকেও, তার মনের চঞ্চলতা দূর হয় নি কেনো? তার মনে চঞ্চলতা যেমন তেমনই ছিল, আদৌ দূর হয়নি । অর্জুনের মনের চঞ্চলতা দূর হলে কি শ্রীকৃষ্ণকে সে প্রশ্ন করত ?

চঞ্চলং হি মনঃ কৃষ্ণ প্রমাথি বলবদ্দৃঢ়ম্।
তস্যাহং নিগ্রহং মন্যে বায়োরিব সুদুষ্করম্।। 
[ভগবদ্‌গীতা/৬ অধ্যায়/৩৪ নং শ্লোক]
অর্থ : হে কৃষ্ণ মন যে বড়ই চঞ্চল, বড় শক্তিধর, হঠকারী, একে স্ববশে আনা, বায়ুকে গাঁঠরী বাঁধার মত দুষ্কর, বড়ই কঠিন ।

একথা শুনে শ্রীকৃষ্ণ উত্তরে বলেছিলেন —
অসংশয়ং মহাবাহো মনো দুর্নিগ্রহং চলম্।
অভ্যাসেন তু কৌন্তেয় বৈরাগ্যেণ চ গৃহ্যতে।।
[ভগবদ্‌গীতা/৬ অধ্যায়/৩৫ নং শ্লোক]
অর্থ : হে অর্জুন । মন যে বড় চঞ্চল এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই, মনকে নিগ্রহ করা দুষ্কর তা আমি জানি, কিন্তু মনে রেখো, এই প্রবল ও দুর্নিগ্রহ চঞ্চল মনকে অভ্যাস এবং বৈরাগ্যের দ্বারা বশে আনা যায় — অর্থাৎ বশে আনা অসম্ভব নয় ।

বাস্তব শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনের সামনে মূর্তিমান থেকেও অর্জুনের মন স্থির হলো না, সে সময় তো তাঁকে দিনরাত সে প্রত্যক্ষ করছিল কিন্তু মানুষ আজ তার জড়মূর্তি সামনে রেখে চঞ্চল মনকে স্থির করার দুঃসাহস দেখায় । এতে কি কখনও মন স্থির হতে পারে ?


✅ শৈবপক্ষ দ্বারা খণ্ডন — 

​আর্যসমাজ বলছে মূর্তিতে রূপ-রস-গন্ধ আছে, তাই মন চঞ্চল হবে। শাস্ত্র অনুযায়ী বিষয়ের চঞ্চলতা নির্ভর করে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। সাধারণ জগতের রূপ-রস-গন্ধ মানুষকে কামনার দিকে টানে, তাই তা চঞ্চলতা সৃষ্টি করে। কিন্তু মূর্তির রূপ-রস-গন্ধ হলো ‘পবিত্র’। প্রসাদী ফুল বা মূর্তির রূপ মনকে জগৎ থেকে সরিয়ে ঈশ্বরে নিবদ্ধ করে। এটি ‘বিক্ষেপ’ নয়, বরং ‘একাগ্রতা’। মনকে ‘খালি’ করার আগে তাকে একটি ভালো বিষয়ে ‘পূর্ণ’ করতে হয়। নোংরা জল সরাতে গেলে যেমন পরিষ্কার জল দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হয়, তেমনি জাগতিক চিন্তা সরাতে গেলে মূর্তিরূপী পবিত্র চিন্তা দিয়ে মনকে পূর্ণ করতে হয়।

​আর্যসমাজ দাবি করছে যে শ্রীকৃষ্ণ সামনে থাকা সত্ত্বেও অর্জুনের মন চঞ্চল ছিল, তাই মূর্তিতে কাজ হবে না। এটি একটি ভয়াবহ অপযুক্তি। অর্জুনের মন চঞ্চল ছিল কারণ তিনি শ্রীকৃষ্ণকে তখন ‘পরমেশ্বর’ হিসেবে নয়, বরং ‘বন্ধু’ বা ‘সারথি’ হিসেবে দেখছিলেন। যখন শ্রীকৃষ্ণ তাঁর ‘বিশ্বরূপ’ (যা সাকার কিন্তু অলৌকিক) প্রদর্শন করলেন, তখনই অর্জুনের সব মোহ ও চঞ্চলতা দূর হলো। ​শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন অভ্যাস ও বৈরাগ্যের কথা। এই ‘অভ্যাস’-এর প্রথম ধাপই হলো কোনো একটি রূপে বা প্রতীকে মনকে বারবার ফিরিয়ে আনা। আর্যসমাজ যে নিরাকার ধ্যানের কথা বলছে, তা উচ্চস্তরের যোগীদের জন্য। সাধারণ মানুষের জন্য সাকার আলম্বন ছাড়া ‘অভ্যাস’ করা অসম্ভব।

​আর্যসমাজ বলছে মনের ঝুলি খালি করতে হবে। মন কখনোই শূন্য থাকতে পারে না। যদি আপনি জোর করে মন থেকে রূপ-রস-গন্ধ সরিয়ে দেন, তবে মন শূন্যতায় না গিয়ে বরং পুরনো জাগতিক স্মৃতিতে ফিরে যাবে। যোগশাস্ত্রে মনের একাগ্রতার জন্য ‘ত্রাটক’ বা কোনো প্রতীকে স্থির দৃষ্টি রাখার বিধান আছে। মূর্তিপূজা হলো সেই মনস্তাত্ত্বিক বিজ্ঞানেরই একটি প্রয়োগ। রূপের মাধ্যমেই অরূপকে ধরা সম্ভব।

​তারা বলছে জড় মূর্তি মনকে স্থির করতে পারে না। যদি জড় মূর্তি মনকে স্থির করতে না পারে, তবে জড় ‘বেদ গ্রন্থ’ বা জড় ‘অগ্নি’ (হবন) কী করে মনকে পবিত্র করে? আর্যসমাজে যজ্ঞের সময় অগ্নির শিখার দিকে তাকিয়ে মন্ত্র পাঠ করা হয়। সেই অগ্নিশিখাও তো পঞ্চভূতের অন্তর্গত ‘তেজ’ এবং তাতেও ‘রূপ’ ও ‘স্পর্শ’ আছে। যদি অগ্নিশিখাকে কেন্দ্র করে মন একাগ্র হতে পারে, তবে শ্রীকৃষ্ণের পবিত্র মূর্তিকে কেন্দ্র করে কেন হবে না? এটি তাদের স্পষ্ট স্ববিরোধিতা।

 “পঙ্ক-প্রক্ষালন ন্যায়” অনুযায়ী- পায়ে কাদা লাগলে যেমন সেই কাদা পরিষ্কার করার জন্য জলের প্রয়োজন হয় (যদিও জলও একটি জড় পদার্থ), তেমনি মনের জাগতিক রূপ-রস-গন্ধের ‘কাদা’ পরিষ্কার করার জন্য মূর্তিরূপী ‘পবিত্র রূপ-রস-গন্ধের’ প্রয়োজন হয়।

​আর্যসমাজ বলছে সরাসরি কাদা না মেখেই পরিষ্কার থাকতে। কিন্তু সংসার-পথে চলতে গেলে যে কাদা মনে লাগে, তা দূর করতে সাকার উপাসনা বা মূর্তিপূজা হলো সেই বিশুদ্ধ জল, যা মনকে ধুয়ে নিরাকার ব্রহ্মের ধ্যানের যোগ্য করে তোলে। অর্জুন শ্রীকৃষ্ণের সাকার উপদেশের মাধ্যমেই স্থিরতা পেয়েছিলেন, যা প্রমাণ করে যে সাকার আশ্রয়ই নিরাকার উপলব্ধির প্রধান পথ। এই বিষয়টা “কূপখননকারী ন্যায়” দ্বারাও সিদ্ধ হয়।

​“কূপখননকারী ন্যায়” অনুযায়ী- যখন কেউ পানীয় জলের জন্য কুয়ো খনন করে, তখন তাকে প্রচুর পরিমাণে কাদা ও মাটি নিয়ে নাড়াচাড়া করতে হয়। খননকারীর শরীর ও হাত-পা সেই কাদায় মাখামাখি হয়ে যায়। এখন কেউ যদি বাইরে থেকে এসে তাকে বলে- "ছিঃ! তুমি তো নোংরা কাদা মাখছ, এভাবে কি পরিষ্কার জল পাওয়া যায়?" তবে তা হবে মূর্খতা। কারণ, সেই কাদা খুঁড়ে খুঁড়ে নিচে নামলে তবেই একসময় স্বচ্ছ ও শীতল জলের ধারা বেরিয়ে আসে। আর সেই জলেই খননকারী তার শরীরের সমস্ত কাদা ধুয়ে পরিষ্কার হয়ে যান।

আর্যসমাজ বলছে মূর্তিপূজা বা সাকার উপাসনা হলো রূপ-রস-গন্ধের 'কাদা' বা জড় বস্তু, তাই এতে মন চঞ্চল হয়। কিন্তু, নিরাকার ব্রহ্ম বা পরমাত্মা হলেন সেই ভূগর্ভস্থ ‘স্বচ্ছ জল’। তাঁকে পেতে হলে সাকার উপাসনারূপী ‘কাদা-মাটি’ (মূর্তি, পুষ্প, চন্দন, ধূপ) খুঁড়তেই হবে। অর্থাৎ, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সাকার বিষয়কে অবলম্বন করেই গভীর ধ্যানে প্রবেশ করতে হয়।

অর্জুন যখন শ্রীকৃষ্ণের সাকার রূপ ও উপদেশের কাদা-মাটি (যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি ও রূপ) নিয়ে দ্বন্দ্বে ছিলেন, তখনই তিনি কৃষ্ণ-রূপী কূপ খনন করে শেষ পর্যন্ত সেই পরম শান্তির জল বা জ্ঞান লাভ করেছিলেন। যে সাকার রূপকে আর্যসমাজ ‘জড়’ বা ‘বিষয়’ বলে অবজ্ঞা করছে, সেই রূপের সাধনা শেষ পর্যন্ত সাধককে এমন এক স্তরে নিয়ে যায় যেখানে সব কাদা (জাগতিক আসক্তি) ধুয়ে যায় এবং কেবল নিরাকার চৈতন্যের নির্মল ধারা অবশিষ্ট থাকে।

আর্যসমাজ চাচ্ছে কাদা না খুঁড়েই জল পেতে, যা অসম্ভব। সাকার উপাসনা হলো সেই পবিত্র কাদা যা খুঁড়তে খুঁড়তে মানুষ একসময় নিরাকারের মহাসমুদ্রে পৌঁছায়। তাই কূপ খনন না করে যেমন তৃষ্ণা মেটে না, তেমনি সাকার আলম্বন বা মূর্তিরূপী প্রতীককে আশ্রয় না করে সাধারণ মানুষের পক্ষে নিরাকার ব্রহ্মের অতল গভীরে পৌঁছানো অসম্ভব।
——————————————————————————————————————————————————————

প্রশ্ন —  তাহলে মূর্তিপূজা করাই উচিত নয় বুঝি?
বিমলঃ হ্যাঁ, মূর্তি পূজা করতে হবে বৈকি তবে, সে মূর্তির পূজা কেমন জানো? জড় মূর্তির পূজা জড়ের মতো, আর চেতন মূর্তির পূজা চেতনের মত কর উচিত ।

প্রশ্ন —  জড়মূর্তির পূজা জড়ের মতো, আর চেতন মূর্তির পূজা চেতনের মতো করা উচিত, এ কথার রহস্য বুঝলাম না। একটু পরিষ্কার করে বললে বুঝতে পারি ।

আর্যসমাজের উত্তর —  ‘পূজা’ শব্দের ধাতুগত এবং ব্যবহারিক প্রভৃতি কয়েক প্রকারের অর্থ হয় । ‘পূজা’ অর্থাৎ আদর, যত্ন করা, যাকে সংস্কৃতে — সৎকার বলা হয়। কোনো বস্তুর যথাযথ ব্যবহার, কোনো বস্তুর যথাযথভাবে রক্ষা, কাহাকেও যথাযথ দান দেওয়াকেও পূজা বলে । এবার একটু বিচার-বিবেচনা করে জড়মূর্তি পূজার অর্থ চিন্তা কর । জড়মূর্তি পূজা মানে, সেই জড়মূর্তিকে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে রাখা । মূর্তিটিকে এমন স্থানে স্থাপন করবে, যেথায় সেই মূর্তিটির কোন প্রকার ক্ষতি না হয় অর্থাৎ যেন ভেঙে না যায়, ময়লা না হয়, তার ঔজ্জ্বল্য নষ্ট না হয়, অবহেলিত হয়ে না থাকে এখানে মূর্তি পূজা অর্থাৎ জড়মূর্তির যথাযথ উপযোগ, উচিত রক্ষণাবেণ। পূজা মানে এ নয় যে, প্রত্যেক বস্তুর সামনে ঢিপ্‌-টিপ্ করে মাথা ঠুকে তাতে ফুল বেলপাতা, তুলসীপাতা, ফল-মিষ্টি-নৈবদ্য অর্পণ করা । যেমন নাকি, একজন আর একজনকে বলল—আরে ভাই ! এই সাধুজীর ‘পেট পূজা’ করিয়ে দাও । এর মানে কী? না, সাধুকে খাইয়ে দাও । ওর মানে এ নয় যে, সাধুর পেটের উপর এক গুচ্ছ বেলপাতা, ফুল-ফুল, মিষ্টি রেখে তাকে প্রণাম কর । 

ঠিক এমনি — একজন আর একজনকে বলল — এই যে গুণ্ডাকে দেখছ, কেবল বাজে বকেই যাচ্ছে, যা তা বলছে, পিঠ পুজো করে দাও, তবে এ শান্ত হবে — নইলে হবে না । এর মানে — এর পিঠে আচ্ছা করে কয়েক ডাণ্ডা কষে দাও । পিঠ পূজার অর্থ এ হবেনা যে, কিছু বেলপাতা, ফুল, ফল পিঠের ওপর রেখে প্রণাম কর । দেখলে একস্থানে পূজার অর্থ হল খাওয়ান, আর একস্থানে অর্থ হল মার দেওয়া । ঠিক্ এমনি জড়মূর্তি পূজার অর্থ — মূর্তিকে যথাস্থানে সুরক্ষিত রাখা, যেন তার চাক্‌চিক্য নষ্ট না হয় — ময়লা না হয় । জড়মূর্তির ওপর ফুল-ফল অর্পণ, এবং তার সামনে মাথা ঠুকে প্রণাম করার অর্থ মূর্তি পূজা নয় কেননা, মূর্তিতে সে যোগ্যতা নেই যে, সে তোমার ভক্তি শ্রদ্ধা, অনুভব করবে এবং সে ফল-ফুল-মন্ডামিঠাই খাবে ।

যত সজীব বা চেতন মূর্তি এ জগতে আছে — যথা মাতা, পিতা, গুরু, অতিথি, সন্ন্যাসী, উপদেশক তথা অন্যপ্রাণী, এরা সবাই ফল-ফুল-মন্ডা-মিঠাই পেয়ে লাভবান হয় । ফল-ফুল, মন্ডা, মিঠাই প্রভৃতি দ্বারা বিবিধ প্রকারে তাদের পূজা করা উচিত । এখানে ‘পূজা’ অর্থ আদর যত্ন করা -সংস্কৃতে যাকে সৎকার বলে । এর নাম সজীব মূর্তি পূজা ।


✅ শৈবপক্ষ দ্বারা খণ্ডন — 

​আর্যসমাজ 'পূজা' শব্দটিকে কেবল 'সৎকার' বা 'যত্ন করা' অর্থে সীমাবদ্ধ করেছে। কিন্তু আধ্যাত্মিক পরিভাষায় পূজার অর্থ হলো 'উপাসনা' অর্থাৎ পরমাত্মার নিকটবর্তী হওয়া। পাণিনীয় ধাতুপাঠ ১০.০১৪৪ অনুযায়ী- পূজ্‌ ধাতু থেকে পূজা শব্দটি নিষ্পন্ন হয়েছে “পূজ্‌ পূজায়াম্‌” যার অর্থ হলো- পূজা করা, অর্চনা করা ও সম্মান করা। এছাড়া পাণিনী নিজেই পূজা অর্থে বলেছেন— 

​পাণিনীয় সূত্রে 'পূজা' অর্থটি কেবল সাধারণ 'সৎকার' বা 'ব্যবহার' হলে তার জন্য আলাদা নিয়মের প্রয়োজন হতো না। কিন্তু পাণিনি-  'নাঞ্চেঃ পূজায়াম্' (৬/৪/৩০) সূত্রে দেখিয়েছেন-

​সাধারণ ব্যবহার- কূয়ো থেকে জল তোলা (উদক্ত), এখানে 'ন' লোপ পায়।

​পূজা অর্থ- গুরুর সম্মান (অঞ্চিত), এখানে 'ন' লোপ পায় না।

​যদি পূজা মানে কেবল 'যথাযথ ব্যবহার' হতো, তবে জল তোলার মতো সাধারণ কাজেও পাণিনি 'পূজা'র নিয়ম খাটাতেন। এই রূপভেদই প্রমাণ করে যে 'পূজা' একটি বিশেষ উচ্চতর মানসিক ভাব, কেবল লৌকিক সৎকার নয়।

​'পূজায়াং নানন্তরম্' (৮/১/৩৭) এবং 'পূজনাৎ পূজিতমনুদাত্তং...' (৮/১/৬৭) সূত্রগুলোতে পূজা বা প্রশংসা অর্থে পদের স্বর পরিবর্তনের বিশেষ বিধান দেওয়া হয়েছে।
সাধারণ 'সদব্যবহার' বা 'রক্ষণাবেক্ষণ' বোঝাতে বেদে বা ব্যাকরণে পদের স্বর এভাবে পরিবর্তিত হয় না। পূজা যে একটি 'বিশিষ্ট মর্যাদা', তা এই স্বর-বিজ্ঞান দ্বারা প্রমাণিত।

​'সুঃ পূজায়াম্' (১/৪/৯৪) সূত্রে বলা হয়েছে- যখন 'সু' শব্দ দ্বারা পূজা (অতিশয় প্রশংসা) বোঝায়, তখন তার বিশেষ সংজ্ঞা হয় এবং সন্ধিতে 'স' স্থানে 'ষ' হয় না (যেমন- সুসিক্ত)।

আর্যসমাজের দাবী অনুযায়ী পূজা মানে কেবল 'ভালো ব্যবহার' হয়, তবে পাণিনি কেন 'প্রশংসা' এবং 'সাধারণ ক্রিয়া'র মধ্যে এত সূক্ষ্ম পার্থক্য তৈরি করলেন? স্পষ্টতই, পূজা একটি অভ্যন্তরীণ শ্রদ্ধা বা ভক্তির বহিঃপ্রকাশ।

​'ক্তেন চ পূজায়াম্' (২/২/১২) সূত্রে বলা হয়েছে, পূজা অর্থে 'ক্ত' প্রত্যয়ান্ত পদের সাথে ষষ্ঠী সমাস হয় না (যেমন- রাজ্ঞাং পূজিতঃ)।

​আর্যসমাজ যে 'দান' বা 'রক্ষণাবেক্ষণকে' পূজা বলছে, সেই অর্থে সমাস হওয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু পাণিনি 'পূজা'র গুরুত্ব ও গাম্ভীর্য বজায় রাখার জন্য পদের বিভক্তি লোপ করে সমাস করতে নিষেধ করেছেন।

আর্যসমাজ 'দান' করাকে পূজা বলে। কিন্তু ব্যাকরণ ও শাস্ত্র মতে, দান হলো কাউকে কিছু 'দিয়ে দেওয়া', আর পূজা হলো পূজ্য সত্তার সামনে নিজেকে নিবেদন করা। সব দানই পূজা নয়, কিন্তু শ্রদ্ধাহীন কোনো কাজই ব্যাকরণ মতে 'পূজা'র মর্যাদা পায় না। আর্যসমাজ পূজাকে কেবল 'শরীরের কাজ' বা 'বস্তুর ব্যবহার' হিসেবে দেখে। কিন্তু মহর্ষি পাণিনি তাঁর ব্যাকরণে প্রমাণ করে গেছেন যে, পূজা হলো 'হৃদয়ের শ্রদ্ধা'। পাণিনীয় ব্যাকরণ অনুসারে, শ্রদ্ধা বা ভক্তি ছাড়া কোনো যান্ত্রিক কাজকে 'পূজা' বলা ভাষাতাত্ত্বিকভাবে ভুল।

আমরা যখন মূর্তির সামনে ফুল দিই বা মাথা নত করি, তখন আমরা পাথরকে সম্মান করি না, বরং সেই পাথরের আধারে যে সর্বব্যাপী চৈতন্য বিরাজমান, তাঁকে স্মরণ করি। আর্যসমাজ 'পেট পূজা' বা 'পিঠ পূজা'র মতো লৌকিক উপহাসের উদাহরণ দিয়ে ঈশ্বরীয় উপাসনাকে তুলনা করে অত্যন্ত নিম্নমানের যুক্তি প্রদর্শন করেছে।

​তারা বলছে, মূর্তির কোনো যোগ্যতা নেই আমাদের ভক্তি অনুভব করার। ঈশ্বর কি কেবল চেতন প্রাণীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ? তিনি যদি 'সর্বব্যাপী' হন, তবে মূর্তিরূপ জড়ের মধ্যেও তিনি বিদ্যমান। ভক্ত যখন মূর্তিকে নিবেদন করে, তখন সর্বান্তর্যামী ঈশ্বর ভক্তের সেই 'ভাব' গ্রহণ করেন। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় ভগবান বলেছেন— "পত্রং পুষ্পং ফলং তোয়ং যো মে ভক্ত্যা প্রযচ্ছতি" (৯/২৬)। এখানে ভগবান মূর্তির কথা বলেননি, বলেছেন 'ভক্তি'র কথা। জড় মূর্তিতে নিবেদন করা মানে জড়কে খাওয়ানো নয়, বরং জড়ের মাধ্যমে অরূপকে অর্পণ করা।

​আর্যসমাজ বলছে চেতন মূর্তির (পিতা-মাতা-গুরু) সেবা করাই প্রকৃত পূজা। এটি একটি বড় সামাজিক সত্য হতে পারে, কিন্তু এটি আধ্যাত্মিক উপাসনার বিকল্প নয়। পিতা-মাতার সেবা হলো 'কর্তব্য', আর ঈশ্বরের আরাধনা হলো 'ভক্তি'। আর্যসমাজ যদি কেবল চেতন বস্তুর উপযোগিতাকেই পূজা মনে করে, তবে তারা 'বেদ' গ্রন্থকে কেন সম্মান করে? বেদ তো জড় কাগজ ও কালিতে তৈরি। তবে কি বেদের পূজা মানে কেবল তাকে ঝেড়েমুছে পরিষ্কার করে আলমারিতে তুলে রাখা? তারা যদি বেদের মন্ত্রে দিব্যশক্তি অনুভব করতে পারে, তবে ভক্ত কেন মূর্তিতে দিব্যশক্তি অনুভব করতে পারবে না?
“দণ্ডাপূপিকা ন্যায়” অনুযায়ী- যদি একটি লাঠির গায়ে কিছু পিঠে বেঁধে রাখা হয় এবং কোনোভাবে হাঁতি সেই শক্ত লাঠিটিকেই খেয়ে ফেলে, তবে এটা নিশ্চিত যে নরম পিঠেগুলো সে আগেই খেয়ে ফেলেছে। যদি পরমেশ্বর এতই শক্তিশালী ও দয়াময় হন যে তিনি আমাদের হৃদয়ের অব্যক্ত কথা (যা নিরাকার) বুঝতে পারেন, তবে তিনি আমাদের নিবেদিত ফুল বা ভক্তি (যা সাকার) বুঝতে পারবেন না কেন?

আর্যসমাজ যে 'চেতন পূজা'র কথা বলছে, তা লৌকিক জগতের শিষ্টাচার মাত্র। কিন্তু আধ্যাত্মিক জগতে সাকার মূর্তিকে অবলম্বন করে যে উপাসনা, তা জড়ের পূজা নয়, তা হলো জড়ের মাধ্যমে জগতপতির আরাধনা। যেমন চিঠির কাগজে টান দিলে লেখকের গায়ে লাগে না, কিন্তু সেই কাগজ ছিঁড়লে লেখকের মনে আঘাত লাগে, তেমনি মূর্তিতে ফুল দিলে তা ঈশ্বরের চরণে পৌঁছায় ভক্তের হৃদয়ের মাধ্যমে। ​তাই আর্যসমাজের এই 'সজ্জীব ও নির্জীব' বিভাজনটি কেবল বাহ্যিক, যা উপাসনার মূল তত্ত্বকে স্পর্শ করতে পারে না।
——————————————————————————————————————————————————————

প্রশ্ন —  ঈশ্বর যদি সর্বত্র বিদ্যমান থাকেন, তিনি মূর্তিতেই বা থাকবেন না কেনো? যদি মূর্তিতে ঈশ্বর থাকেন, তাহলে মূর্তি পূজা করায় দোষ কোথায়? যারা মূর্তি পূজা করে তারা মাটি বা পাথরের পূজা করে না, ব্যাপক পরমাত্মারই পূজা করে ।

আর্যসমাজের উত্তর —  একথা সত্য যে, ঈশ্বর সর্বত্র বিদ্যমান বলে, তিনি মূর্তিতেও ব্যাপক । কিন্তু তিনি সর্বত্র আছেন বলে সব স্থানে সর্ববস্তুতে তাঁর পূজা হয়, এর মূলে কোনো যুক্তি নেই! দ্যাখো, পূজা যে করে সে ‘জীবাত্মা’ পূজার উদ্দেশ্য কী? জীবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার মিলন । কেমন? মিলন—কখন হয় —যখন উভয়ে উপস্থিতি থাকে । মূর্তিতে ঈশ্বর আছেন সত্য, কিন্তু সেখানে ‘জীবাত্মা’ নেই। এ অবস্থায় জীবাত্মা ও পরমাত্মার মিলন হবে কেমন করে । হ্যাঁ, প্রত্যেক মানুষের মধ্যে জীবাত্মা এবং পরমাত্মা উভয়েই বর্তমান, তাই সেখানেই উভয়ের মিলন সম্ভব । অতএব যে মানুষটি ঈশ্বরের সঙ্গে মিলিত হতে চায়, তাকে আপন হৃদয়েই মন এবং ইন্দ্রিয়কে স্ব-অধীন করে ঈশ্বরের পূজা করা কর্তব্য ।

দেখো ! ঈশ্বর সর্বত্র, এ কথা জেনেও কি সব জল পানের যোগ্য ? সিংহ এবং সাপ উভয়েই পরমাত্মায় ব্যাপক, এ অবস্থায় আমি জিজ্ঞাসা করি, সিংহ ও সাপের কাছে যাওয়া কি উচিত? অতএব, পরমাত্মা মূর্তিতেও ব্যাপক আছেন সুতরাং মূর্তির পূজা করা উচিত, একথা বলার মত অজ্ঞানতা ও মূর্খতা আর কী হতে পারে? পরমাত্মা মিছরীর টুকরোতেও আছেন, বিষেও আছেন, তাই বলে কী বিষ খাওয়া উচিত? কদাপি নয় সেই জিনিষই খাওয়া উচিত যা খাওয়ার যোগ্য । মূর্তি পূজক মনে করবে যে, সে মূর্তিতে ব্যাপক পরমাত্মার পূজা করছে, কিন্তু বাস্তবিক পক্ষে মূর্তির দ্বারা ব্যাপক ঈশ্বরের পূজা হয় না । হয়ত তুমি বলবে, কেনো হবেনা? কেনো হবে না, তাই বলছি । যে সমস্ত বস্তু মূর্তির ওপর দেওয়া হয় যথা— বেলপাতা, ফুল, চাল, কলা, গামছা, কাপড় ইত্যাদি, তাতেও তো পরমাত্মা ব্যাপক আছেন । যথা—আকাশ ঘটেও ব্যাপক এবং ইটেও ব্যাপক এই অবস্থায় যদি কোনো ব্যক্তি ঘটে আকাশ ব্যাপক এই মনে করে ইটটা তুলে ঘটাকাশে ছুঁড়ে মারে, তাহলে সে ভুল করবে । কেননা, আকাশ ব্যাপক হওয়ায় আকাশের গায়ে ইঁট লাগতে পারে না, ইঁট তুলে যদি ঘটে আঘাত করা যায় তাহলে ঘট ভেঙে যাবে, কিন্তু আকাশ ভাঙবে না । কেননা আকাশ যে, সে ইটেও ব্যাপক ঠিক তেমনি, যে কোনো ব্যক্তি যদি সে পত্র-পুষ্প, ফল-জল, মিষ্টি আদি মূর্তির সামনে বা মূর্তির উপর, অর্পণ করে তা মূর্তিতেই অর্পিত হয়, ঈশ্বরে নয় । কেননা, ঈশ্বর যে ঐ সব পদার্থেও ব্যাপক।


✅ শৈবপক্ষ দ্বারা খণ্ডন —  

​আর্যসমাজ বলছে মূর্তিতে ঈশ্বর থাকলেও সেখানে জীবাত্মা নেই, তাই মিলন সম্ভব নয়। আসলে এটি একটি হাস্যকর যুক্তি। জীবাত্মা কি কেবল শরীরের ভেতরেই সীমাবদ্ধ? যদি জীবাত্মা শরীরের বাইরে না থাকত, তবে আমরা বাইরের জগতকে দেখতাম বা জানতাম কী করে? উপাসনার সময় সাধক যখন মূর্তির সামনে বসেন, তখন তাঁর চেতনা (জীবাত্মা) মূর্তিতে পরিব্যাপ্ত পরমাত্মার সঙ্গে যুক্ত হয়। মিলন শরীরের ভেতরে হতে হবে এমন কোনো ভৌগোলিক শর্ত শাস্ত্রে নেই। মন যেখানে একাগ্র হয়, সেখানেই মিলন ঘটে।

​তারা বলছে বিষে ঈশ্বর থাকলেও বিষ খাওয়া উচিত নয়, তাই মূর্তিতে ঈশ্বর থাকলেও পূজা করা উচিত নয়।
এখানে আর্যসমাজ 'ব্যবহারিক জগত' এবং 'পারমার্থিক সাধনা'-কে এক করে ফেলেছে। বিষ খাওয়া শরীরের জন্য ক্ষতিকর (ব্যবহারিক), কিন্তু মূর্তিপূজা মনের জন্য কল্যাণকর (পারমার্থিক)। সাপের কাছে যাওয়া ভয়ের কারণ কারণ সাপ কামড়াতে পারে, কিন্তু মূর্তিতে ফুল দিলে কি মূর্তি কামড়াতে আসে? মূর্তিপূজা কোনো প্রাণঘাতী বিষয় নয়, বরং এটি মনের একাগ্রতা বাড়ানোর একটি পবিত্র প্রক্রিয়া। তারা 'ক্ষতিকর বস্তু'র সঙ্গে 'পবিত্র প্রতীক'-এর তুলনা করে অত্যন্ত নিম্নমানের যুক্তি দিয়েছে।

​তারা বলছে ইঁট ছুঁড়লে আকাশে লাগে না, ঘটে লাগে। তেমনি ফুল দিলে মূর্তিতে লাগে, ঈশ্বরে নয়। এই যুক্তিটিই তাদের মূর্তিপূজার প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ করে দেয় ! আকাশ নিরাকার বলে তাকে ইঁট দিয়ে ছোঁয়া যায় না, কিন্তু ঘটকে ছোঁয়া যায়। ঠিক তেমনি, ঈশ্বর নিরাকার ও ব্যাপক বলে সরাসরি তাঁকে ফুল দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু মূর্তিতে ফুল দিলে সেই অর্পণটি একটি 'মাধ্যম' হিসেবে কাজ করে। আমরা যখন চিঠির খামে ঠিকানা লিখি, সেই কালি খামের ওপর লাগে, প্রাপকের গায়ে নয়। কিন্তু সেই ঠিকানার মাধ্যমেই চিঠিটি প্রাপকের কাছে পৌঁছায়। মূর্তিপূজাও তেমন মূর্তি হলো সেই 'খাম', আর ভক্তি হলো 'চিঠি'।

​আর্যসমাজ বলছে ঈশ্বর সর্বত্র থাকলে সব জায়গায় পূজা হয় না কেন ? আগুন সব কাঠের মধ্যেই সুপ্তভাবে থাকে, কিন্তু রান্নার জন্য কাষ্ঠ-মন্থন করে আগুনকে এক জায়গায় জ্বালতে হয়। ঠিক তেমনি, ঈশ্বর সর্বত্র থাকলেও তাঁর বিশেষ মহিমা বা সান্নিধ্য অনুভব করার জন্য একটি পবিত্র কেন্দ্র বা 'বিন্দু' (মূর্তি) প্রয়োজন। সূর্যরশ্মি সর্বত্র থাকলেও যেমন আতশ কাঁচ ছাড়া আগুন জ্বলে না, তেমনি ঈশ্বরের ব্যাপকতা সর্বত্র থাকলেও ভক্তি ও প্রতীকের আরাধনা ছাড়া হৃদয়ে ঈশ্বরীয় প্রেম জাগ্রত হয় না।

​“সূচী-কটাহ ন্যায়” অনুযায়ী - যদি কোনো কামারকে একটি সূঁচ এবং একটি বড় কড়াই (কটাহ) তৈরি করতে দেওয়া হয়, তবে সে আগে সহজ ও ছোট কাজটি (সূঁচ) শেষ করে, তারপর বড় ও কঠিন কাজটি (কড়াই) হাতে নেয়। নিরাকার ব্রহ্মের অনন্ত ব্যাপকতা অনুভব করা হলো সেই ‘বিশাল কড়াই’ তৈরির মতো কঠিন কাজ। আর একটি নির্দিষ্ট মূর্তিতে ঈশ্বরকে অনুভব করার চেষ্টা করা হলো ‘সূঁচ’ তৈরির মতো সহজ কাজ।
সাধারণ মানুষের পক্ষে এক লাফে অসীম আকাশে মনকে ব্যাপ্ত করা অসম্ভব। তাই ছোট একটি মূর্তিকে কেন্দ্র করে ভক্তি শুরু করলে মন ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়। যে মূর্তির মধ্যে ঈশ্বরকে দেখতে শেখে, সেই সাধকই একদিন আকাশ, মাটি, বিষ, সাপ অর্থাৎ সর্বত্র ঈশ্বরকে দেখার সামর্থ্য লাভ করে। ​আর্যসমাজ চায় শুরুতেই বড় কাজ করতে, যা সাধারণ মানুষের জন্য অসম্ভব। মূর্তিপূজা হলো সেই ‘সহজ শুরু’, যা শেষ পর্যন্ত সর্বত্র ব্রহ্মদর্শনের দিকে নিয়ে যায়।

——————————————————————————————————————————————————————

প্রশ্ন —  মূর্তির উপর বা সামনে ফল, ফুল প্রভৃতি না হয় অর্পণ নাই বা করলাম, কিন্তু সেই মূর্তিকে শ্রদ্ধা সহকারে দর্শন করলে ব্যাপক পরমাত্মা এবং তাঁর মহিমার জ্ঞান অবশ্যই হবে।

আর্যসমাজের উত্তর —  এও উল্টো কথা বলছো । একটু ভেবে দ্যাখো, দর্শনে ব্যাপক পরমাত্মার এবং তাঁর মহিমার জ্ঞান কেমন করে হবে? শোনো। তিলে, তেল ব্যাপক আছে, — কেমন? কিন্তু, যে তিলকে দেখে, সে দেখে তিলকে, তিলে তেল দেখে কী? সে তো তিলই দেখবে, তাই তো? সে যতই শ্রদ্ধা এবং মনযোগ সহকারে তিলকে দর্শন করুক না কেনো, সে তিলই দেখবে, তিলে তেল দেখতে পারবে না । তেল দেখবে কখন, যখন সেই তিলকে ঘানিতে ফেলে পেষণ করা হবে,— তখন । এইভাবে মূর্তিতে ঈশ্বর ব্যাপক আছেন, সত্য, কিন্তু দর্শক সেই মূতিকে দর্শন করে মাত্র ঈশ্বরকে সে দর্শন করে না । ঈশ্বর দর্শন তখনই সম্ভব, যখন দর্শক জড়মূর্তির সঙ্গে সম্বন্ধ বিচ্ছেদ করে আত্মায় সেই ব্যাপক পরমাত্মার সন্ধান করবে । বাকী রইল ঈশ্বরের মহিমা জ্ঞান । সেও তো মানুষের গড়া মূর্তিতে ঈশ্বরের মহিমা দর্শন? তাই বা কেমন করে হবে? মানুষের গড়া মূর্তিতে শিল্পীর মহিমাই প্রকাশ পায় । মূর্তি-দর্শক বলবে — “বাঃ, বলাই পাল কী ঠাকুরই না গড়েছে, যেন কথা কইছে, কী অপূর্ব শিল্পনৈপুণ্য।” এ কার মহিমা? এ সেই মূর্তি রচয়িতার মহিমা, ঈশ্বরের নয় । হ্যাঁ, পরমাত্মা যা নিমার্ণ করেছেন তাতে পরমাত্মার মহিমা দর্শন করতে পারবে, দেখতেও পাবে। তুমি পরমাত্মার মহানতা দর্শন করতে চাও তো বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের রচনা বিচার বিবেচনা করে সন্ধান কর, দেখবে ঈশ্বরের রচিত ক্ষুদ্রাপেক্ষা ক্ষুদ্রতম বস্তুতে কী অপূর্ব সৃষ্টি কৌশল ! মানুষের তৈরী জড় মূর্তিতে পরমাত্মার মহিমার কোন চিহ্নটা রয়েছে যে, তুমি তা দেখতে পাবে ?


✅ শৈবপক্ষ দ্বারা খণ্ডন —  

​আর্যসমাজ বলছে তিল দেখলে তেল দেখা যায় না, তিল পিষলে তবেই তেল বেরোয়। ঠিক একইভাবে, মূর্তিকে কেবল ‘পাথর’ হিসেবে দেখলে ঈশ্বর দেখা যায় না। কিন্তু ভক্তিরূপ ‘ঘানিতে’ যখন মনকে পেষণ করা হয়, তখন সেই মূর্তিরূপ আধারেই পরমাত্মার অনুভব ঘনীভূত হয়। মূর্তি এখানে সেই তিলের মতো আধার, যা সাধককে মনে করিয়ে দেয় যে এর ভেতরেই ‘তৈল’ বা পরমাত্মা আছেন। যদি তিলই না থাকে, তবে তেল বের করার জন্য ঘানিতে কী দেবেন? নিরাকারবাদীরা শূন্য ঘানি ঘুরিয়ে তেল পেতে চান, যা অসম্ভব। সাকার উপাসনা হলো সেই মাধ্যম যার সাহায্যে আধ্যাত্মিক মন্থন শুরু হয়।

​তারা বলছে মূর্তিতে কেবল ভাস্করের নিপুণতা দেখা যায়, ঈশ্বরের নয়। এটি একটি অত্যন্ত সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। একজন দেশপ্রেমিক যখন তার জাতীয় পতাকার সামনে দাঁড়ান, তিনি কি দর্জির সেলাইয়ের প্রশংসা করেন? নাকি পতাকার মধ্য দিয়ে দেশের সার্বভৌমত্বের মহিমা দর্শন করেন? ঠিক তেমনি, ভক্ত যখন মূর্তিকে দেখেন, তিনি শিল্পীর কাজকে গৌণ করে তার মধ্য দিয়ে ঈশ্বরের দিব্য গুণাবলি (যেমন- শ্রীকৃষ্ণের করুণা বা শিবের বৈরাগ্য) চিন্তা করেন। মূর্তি এখানে 'অনুঘটক' হিসেবে কাজ করে, যা মনকে শিল্পীর হাত থেকে সরিয়ে জগদীশ্বরের চরণে নিয়ে যায়।

​আর্যসমাজ বলছে প্রাকৃতিক বস্তুতেই কেবল ঈশ্বরের মহিমা আছে। ঈশ্বর যদি সর্বব্যাপী হন, তবে মানুষের বুদ্ধি এবং শিল্পনৈপুণ্য কি ঈশ্বরের বাইরের কিছু? মানুষের হাত দিয়ে যে সুন্দর মূর্তি তৈরি হয়, সেই সৃজনী শক্তিও তো ঈশ্বরেরই দান। যদি একটি তুচ্ছ পোকার গঠন দেখে ঈশ্বরের প্রশংসা করা যায়, তবে মানুষের তৈরি একটি পবিত্র বিগ্রহ, যা লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয়ে ভক্তি জাগায়, তা দেখে ঈশ্বরের মহিমা স্মরণে বাধা কোথায়? প্রকৃতপক্ষে, আর্যসমাজ এখানে ঈশ্বরকে প্রকৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলছে, কিন্তু শিল্প ও হৃদয়ের ভক্তির মধ্যে তাঁকে দেখতে অস্বীকার করছে।

​দর্শনের কাজ হলো মনের মধ্যে ‘সংস্কার’ জাগিয়ে তোলা। ​আমরা যখন মৃত প্রিয়জনের ছবি দেখি, তখন আমরা কাগজের প্রশংসা করি না, বরং সেই ছবির মাধ্যমে ব্যক্তির স্মৃতিতে মগ্ন হই। মূর্তিও তেমনই একটি ‘দিব্য চিত্র’ বা ‘বিগ্রহ’, যা দর্শন মাত্রই অসীম পরমাত্মার গুণাবলি মনে করিয়ে দেয়। নিরাকার পরমাত্মাকে মনে করার জন্য মনকে কোনো না কোনো সাকার সংকেত (যেমন- ওঁকার ধ্বনি বা মূর্তি) গ্রহণ করতেই হয়।

যখন কোনো শিশুকে প্রথম লিখতে শেখানো হয়, তখন তাকে সরাসরি সূক্ষ্ম অক্ষর লিখতে দেওয়া হয় না। তাকে প্রথমে স্লেটে বড় বড় এবং স্থূল অক্ষরে (স্থূলাক্ষর) হাত ঘোরাতে হয়। সেই বড় অক্ষরে হাত ঘোরাতে ঘোরাতে যখন তার আঙুল অভ্যস্ত হয়, তখনই সে ভবিষ্যতে অতি সূক্ষ্ম এবং সুন্দর হস্তাক্ষর লিখতে সক্ষম হয়।
​নিরাকার ব্রহ্মের মহিমা দর্শন হলো সেই ‘সূক্ষ্ম অক্ষর’।
​আর সাকার মূর্তির মহিমা দর্শন হলো সেই ‘স্থূল অক্ষর’। ​আর্যসমাজ চায় শিশুটি বড় অক্ষরে হাত না ঘুরিয়েই সরাসরি সূক্ষ্ম হস্তাক্ষর লিখুক, যা প্রাকৃতিক নিয়মের বিরোধী।
মূর্তিতে ঈশ্বরের মহিমা দর্শন করা কোনো ভুল নয়, বরং এটি মনের একটি প্রাথমিক মহড়া। মূর্তিরূপ স্থূল আধারে ঈশ্বরের মহিমা দেখতে দেখতেই একদিন সাধকের দৃষ্টি এতই সূক্ষ্ম হয় যে, সে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতি ধূলিকণায় এবং নিজের আত্মার ভেতরে সেই নিরাকার পরমাত্মার মহিমা প্রত্যক্ষ করতে পারে। তাই মূর্তি শিল্পীর মহিমা নয়, বরং ঈশ্বরের মহিমা অনুভবের প্রথম পাঠশালা।

——————————————————————————————————————————————————————

প্রশ্ন —  দাদা ! ফল সদাসর্বদা ভাবনাময়ই হয়ে থাকে । মূর্তিকে ঈশ্বর না মেনেও আমরা তাতে ঈশ্বরের ভাবনা আরোপ করে ফল লাভ করতে পারি। দ্বিতীয় কথা, যদি কোনো লোক এক লাফে খুব উঁচুতে উঠতে না পারে, তার জন্য মই বা সিড়ি প্রয়োজন। আমি মূর্তি পূজাকে ঈশ্বর প্রাপ্তির প্রথম সিঁড়ি বলেই মনে করি । অতএব যদি কোন লোক ভগবানের কল্পিত মূর্তি তৈরী করে, তাতে ঈশ্বরের ভাবনা আরোপ করে পূজা করে, আমি তাতে কোনো দোষ দেখি না ।

আর্যসমাজের উত্তর —  তোমার মনে রাখা উচিত যে, ভাবনা কোনো পদার্থের বাস্তবিকর্তাকে অর্থাৎ সত্যকে পরিবর্তন করতে পারে না। কোনো মানুষ যদি অজ্ঞানতা বশতঃ চুনের জলে দুধের ভাবনা আরোপ করে তাকে মন্থন করে, তা বলে তুমি কি বলতে পারো, তা থেকে সে মাখন পাবে? জলে অগ্নির ভাবনা করে শীতার্ত ব্যক্তি কি শীত দূর করতে পারবে? পাথরে রুটির ভাবনা করে কি মানুষ তার ক্ষুধা নিবৃত্তি করতে পারবে? ভাবনা বা মনে করলেই যদি প্রত্যেক জিনিষ পাওয়া যেতো, তাহলে জগতে কেহই দুঃখী ও নির্ধন থাকত না । আর কাহাকেও কোনো বস্তুলাভ করার জন্য হাড়ভাঙা পরিশ্রমও করতে হতে না । সেই ভাবনাই বাস্তবিক ভাবনা, যার আধার সত্য, নইলে সে অভাবনা । কোনো মানুষ যদি জোলাপের গুলিকে হজমীর গুলি মনে করে তা খায়, তার কি পেট খারাপ হবে না? তাই বলছিলাম — কোনো বস্তুতে ভাবনা আরোপ করে সেই বস্তু লাভ করার আশা নিরেট বোকামী ।
দ্যাখো, সোমনাথের মন্দিরের মূর্তিতে পূজারীদের জড় ভাবনা ছিল না, সোমনাথ যে সাক্ষাৎ মহাদেব । যখন মহমুদ গজনবী সোমনাথ মন্দিরের উপর আত্রমণ চালাল, তখন পাণ্ডা এবং পূজারীর দল নিশ্চিন্ত মনে, নিশ্চেষ্ট হয়ে বসেছিল । তারা বলতে লাগল—সকলে মিলে সোমনাথের জপ কর, তিনি নিজেই ম্লেচ্ছকুল নাশ করবেন, আমাদের লড়াই করার কোনো প্রয়োজনই নেই। এই ভাবনা এবং বিশ্বাসের পরিণাম কী হয়েছিল? ইতিহাস পাঠকদের জিজ্ঞাসা করো। তারা বলবে এর পরিণাম কী হয়েছিলো । এর পরিণামের কথা সকলে ভাল করে জানে ।

শুধু সোমনাথই বা কেনো ? এই ভাবনার বশবর্তী হয়ে সহস্র মন্দির ও মূর্তি গুঁড়ো হয়ে গিয়েছিল । লুণ্ঠনকারীদল কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি লুটে নিয়ে বিদেশে চলে গেল এ সব দেখে শুনেও মূর্তি পূজকদের অন্ধ বিশ্বাস ঘুচলো না । কী আশ্চর্যের কথা ! নির্জীব — অচেতন জড় মূর্তি, যে কিছুই করতে পারে না, মানুষ কিনা সেই জড় মূর্তিতে সৃজন ক্ষমতার ভাবনা আরোপ করল ! কী ভয়াবহ অন্ধবিশ্বাস ? আর যারা চেতন, যারা সব কিছু করতে সক্ষম তাদের উপর কিনা, না করতে পারার ভাবনা আরোপ করল! আমাদের দেশের এবং জাতির অধঃপতনের মূল কারণই এই । এবার তুমি নিশ্চয়ই বুঝেছ অজ্ঞানতাপূর্ণ ভাবনা আরোপ কত ভয়াবহ ও দুঃখ-জনক হতে পারে ।

তুমি যে বলছো মূর্তি পূজা ঈশ্বর প্রাপ্তির প্রথম সোপান বা সিঁড়ি - এ একেবারে ডাহা মিথ্যা। হ্যাঁ, চেতন মূর্তির পূজা ঈশ্বর প্রাপ্তির প্রথম সোপান কিছু অংশে স্বীকার করা যেতে পারে । কিন্তু জড় মূর্তির পূজা তো কোনো মতেই স্বীকার করা যেতে পারে না । জড় মূর্তি পূজাকে হিমালয় পাহাড়ের ওপর আরোহণ করার প্রথম সোপান যদিও মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু যে মূর্তি জ্ঞানশূন্য, তাকে ঈশ্বর প্রাপ্তির প্রথম সোপান কেমন করে মেনে নেওয়া যেতে পারে?

যদি কেহ ইংরেজী ভাষায় কথা বলা শিক্ষা করতে চায়, তাহলে তার ইংরাজী ভাষা শিক্ষার প্রথম সোপান হবে, এ, বি, সি, ডি প্রভৃতি বর্ণ । যদি কেহ সংস্কৃত বা হিন্দী ভাষায় কথা বলা শিক্ষা করতে চায়, তাহলে তাকে সংস্কৃত বা হিন্দি শিক্ষার প্রথম সোপান শিক্ষা করতে হবে অ, আ, ই, ঈ প্রভৃতি বর্ণমালা । কিন্তু যদি কেহ এ, বী, সী, ডী প্রভৃতি বর্ণকে সংস্কৃত শিক্ষার প্রথম সোপান মনে করে এ, বী, সী, ডী পড়তে আরম্ভ করে তা হলে কি সে সংস্কৃত শিক্ষা করতে পারবে? যার সিঁড়ি যা, তা দিয়েই কৃতকার্যতা লাভ করা যেতে পারে । ঈশ্বর প্রাপ্তির সিঁড়ি বা সোপান হলো চেতন প্রাণীর নিষ্কাম সেবা, সৎসঙ্গ, যম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম, প্রত্যাহার, ধারণা, ধ্যান ও সমাধি । এইসব সিঁড়ির উপর নিরন্তর আরোহণ অর্থাৎ এদের বিধিপূর্বক অনুষ্ঠান দ্বারাই ঈশ্বর প্রাপ্তি হতে পারে । তুমি যে প্রশ্ন করলে— ঈশ্বরের কাল্পনিক মূর্তি নির্মাণ করে পূজা করার দোষ কোথায়? দোষ একটা নয়–বহু ।


✅ শৈবপক্ষের খণ্ডন— 

​আর্যসমাজ বলছে চুনের জলে দুধের ভাবনা করলে মাখন পাওয়া যায় না। মূর্তিপূজা কোনো রাসায়নিক প্রক্রিয়া নয় যে পাথর থেকে মাখন বের করতে হবে। এটি একটি মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়া। উপাসনার লক্ষ্য হলো চিত্তশুদ্ধি। চুনকে দুধ ভাবলে শরীর পুষ্টি পায় না ঠিকই, কিন্তু একটি পবিত্র প্রতীককে (মূর্তি) ঈশ্বর ভাবলে মনে ভক্তি, শান্তি এবং পবিত্রতা সঞ্চারিত হয়। এখানে 'ফল' মানে মাখন বা রুটি নয়, বরং 'ফল' হলো মানসিক স্থিরতা ও ঈশ্বরীয় প্রেম। আর্যসমাজ এখানে স্থূল বস্তুগত লাভ আর সূক্ষ্ম আধ্যাত্মিক উন্নতির পার্থক্য বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে।

​তারা সোমনাথ মন্দিরের লুণ্ঠনকে মূর্তিপূজার ব্যর্থতা হিসেবে দেখিয়েছে। এটি একটি অত্যন্ত দুর্বল ও কুতার্কিক যুক্তি।

​প্রথমত, কোনো মন্দিরে আক্রমণ হওয়া মানে সেই ধর্মের আদর্শ ভুল, এমনটা ভাবা অযৌক্তিক। ​আর্যসমাজ সোমনাথ মন্দিরের ধ্বংসকে মূর্তিপূজার ব্যর্থতা হিসেবে দেখিয়েছে। আর্যসমাজ প্রতিদিন যজ্ঞ বা হবন করে। এখন প্রশ্ন হলো- যদি কোনো পাপিষ্ঠ বা ম্লেচ্ছ এসে যজ্ঞকুণ্ডে জল ঢেলে দেয় বা যজ্ঞের আগুন নিভিয়ে দেয়, তবে কি প্রমাণ হয় যে ‘অগ্নি’ শক্তিহীন? বা ‘বেদমন্ত্র’ মিথ্যা? কদাপি নয়। প্রাচীনকালে রাক্ষসরা ঋষিদের যজ্ঞ নষ্ট করত, তাই বলে কি যজ্ঞের আধ্যাত্মিক মহিমা কমে গিয়েছিল? যজ্ঞ পণ্ড হওয়া মানে যজ্ঞের বিধাতার বা রক্ষকের বাহ্যিক হার, যজ্ঞের অন্তর্নিহিত শক্তির হার নয়। ঠিক তেমনি, সোমনাথ মন্দির লুণ্ঠিত হওয়া মানে হিন্দুদের সামরিক হার, মূর্তিরূপী পরমাত্মার আধ্যাত্মিক পরাজয় নয়।

যজ্ঞের ফল (যেমন- বৃষ্টি হওয়া বা চিত্তশুদ্ধি) নির্ভর করে শ্রদ্ধার ওপর। যদি কেউ যজ্ঞের ফল না পায়, আর্যসমাজ বলবে- “আপনার শ্রদ্ধায় খামতি ছিল বা বিধিতে ভুল ছিল।” তারা কিন্তু কখনোই বলবে না যে যজ্ঞ জিনিসটাই ভুল। তাহলে সোমনাথের ক্ষেত্রে তারা কেন বলছে যে মূর্তিপূজা ভুল? সেখানেও তো একই যুক্তি খাটে, রক্ষণাবেক্ষণ বা সামরিক বিধিতে ভুল ছিল, কিন্তু উপাসনার আদর্শে কোনো ভুল ছিল না।

যজ্ঞের কাঠ বা ঘৃত (ঘি) হলো জড় পদার্থ। কিন্তু মন্ত্রের দ্বারা তাতে দেবতা আবাহন করা হয়। আর্যসমাজ যদি বিশ্বাস করে যে জড় কাঠে অগ্নি প্রজ্বলন করে তাতে ঘি দিলে তা ঈশ্বরে পৌঁছায়, তবে তারা কেন বিশ্বাস করতে পারছে না যে জড় মূর্তিতে ফুল দিলে তা ঈশ্বরে পৌঁছাবে? যজ্ঞকুণ্ডে জল ঢাললে যেমন আগুন নিভে যায়, মূর্তিকে হাতুড়ি দিয়ে মারলে তেমন তা ভেঙে যায়। কারণ দুটিই জড় আধারে অবস্থিত। কিন্তু আগুন নিভে গেলেও যেমন 'অগ্নি-তত্ত্ব' মরে না, মূর্তি ভেঙে গেলেও তেমন 'ঈশ্বর-তত্ত্ব' ধ্বংস হয় না।

​“রজ্জু-সর্প ন্যায়” অনুযায়ী - অন্ধকারে একটি দড়িকে দেখে কেউ সাপ মনে করে ভয় পেল। যখন আলো আনা হলো, তখন দেখা গেল ওটা সাপ নয়, দড়ি। এখানে সাপটি মিথ্যা ছিল, কিন্তু দড়িটি সত্য। গজনীর মতো লুণ্ঠনকারীরা মূর্তিকে কেবল ‘সোনা-দানার আধার’ বা ‘জড় পাথর’ (সাপের মতো ভ্রম) হিসেবে দেখেছিল। কিন্তু ভক্তরা মূর্তিকে দেখেছিলেন ‘পরমেশ্বরের বিগ্রহ’ (সত্য রজ্জু) হিসেবে। ​লুণ্ঠনকারী তার লুণ্ঠনের ফল পেয়েছে (ধনসম্পদ), কারণ তার লক্ষ্য ছিল জড়। ​ভক্ত তার ভক্তির ফল পেয়েছেন (শান্তি ও মুক্তি), কারণ তার লক্ষ্য ছিল চৈতন্য।
যজ্ঞের আগুন নেভানো যায়, কিন্তু যজ্ঞের মহিমা নয়। মন্দির ভাঙা যায়, কিন্তু উপাসনার আদর্শ নয়। আর্যসমাজ বাহ্যিক লুণ্ঠনকে আদর্শের পরাজয় বলে যে দাবি করছে, তা যজ্ঞের তত্ত্বের মতোই একটি ভ্রান্ত ধারণা।

​দ্বিতীয়ত, সোমনাথের পতন মূর্তিপূজার জন্য হয়নি, হয়েছিল তৎকালীন হিন্দুদের সামরিক ও রাজনৈতিক অদূরদর্শিতার জন্য। বীরত্বের অভাবকে ধর্মের ওপর চাপিয়ে দেওয়া এক ধরনের পলায়নীবৃত্তি।

​তৃতীয়ত, গজনী মূর্তিকে ধ্বংস করতে পেরেছে কারণ মূর্তিটি ছিল জড় পাথর, কিন্তু সে কি ভক্তের হৃদয়ে থাকা সোমনাথকে ধ্বংস করতে পেরেছে? আজ গজনী নেই, কিন্তু সোমনাথ মন্দির সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে। এটিই হলো ভাবনার শক্তি।

​তারা বলছে ইংরেজি বর্ণমালা দিয়ে সংস্কৃত শেখা যায় না, তেমনি মূর্তি দিয়ে ঈশ্বর পাওয়া যায় না। এই তুলনাটিই ভুল। মূর্তিপূজা কোনো 'ভিন্ন ভাষা' নয়। বরং এটি হলো 'ব্রেইল পদ্ধতি'র মতো। একজন অন্ধ মানুষ যেমন আঙুল দিয়ে স্পর্শ করে (সাকার) অক্ষর জ্ঞান লাভ করে এবং পরে সেই জ্ঞানের মাধ্যমে গভীর দর্শন (নিরাকার) বোঝে, মূর্তিপূজাও তেমনি। প্রতীক বা আলম্বন ছাড়া কোনো শিক্ষাই শুরু হতে পারে না। এমনকি আর্যসমাজ যে 'ওঁ' কার বা গায়ত্রী মন্ত্র জপ করে, সেগুলিও তো শব্দের আধার বা প্রতীক। শব্দ কি ঈশ্বর? না। কিন্তু শব্দের দ্বারা যেমন ঈশ্বরকে পাওয়া যায়, রূপের দ্বারাও তেমন পাওয়া যায়।

​তারা বলছে মানুষের সেবা করাই সিঁড়ি। জনসেবা বা সমাজসেবা অবশ্যই মহৎ কাজ, কিন্তু সেটি 'কর্মযোগ'। আর মূর্তিপূজা হলো 'ভক্তিযোগ'। মানুষের সেবা করলে মানুষের উপকার হয়, কিন্তু নিজের চঞ্চল মনকে বশ করতে হলে একটি দিব্য রূপের ধ্যান প্রয়োজন। মা-বাবার সেবা করলে কি সমাধি লাভ হয়? সমাধি লাভের জন্য মনকে অন্তর্মুখী করতে হয়, আর সেই অন্তর্মুখিতার জন্য একটি দিব্য সাকার অবলম্বন (যেমন- বিগ্রহ) সবচেয়ে সহজ মাধ্যম।

যেমন- একটি লোহার বল বা পিণ্ড (লৌহপিণ্ড) স্বভাবত কালো ও ঠান্ডা (জড়)। কিন্তু সেই লোহাকে যখন দীর্ঘক্ষণ আগুনের মধ্যে রাখা হয়, তখন লোহাটি আগুনের মতো লাল বর্ণ ধারণ করে এবং আগুনের মতোই দহন ক্ষমতা পায়। তখন লোহা ও আগুনের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না।
​লোহা হলো জড় মূর্তি, আর আগুন হলো সর্বব্যাপী পরমাত্মা। ​ভক্ত যখন তীব্র ভক্তি ও একাগ্রতার সঙ্গে সেই মূর্তিতে ঈশ্বরীয় ভাবনা আরোপ করে, তখন সেই জড় মূর্তি আর জড় থাকে না, তা ভক্তের জন্য 'চৈতন্যময়' হয়ে ওঠে। ​আর্যসমাজ কেবল লোহার কালো পিণ্ডটিকে দেখছে, কিন্তু আগুনের তাপে তার লাল হয়ে ওঠা বা চৈতন্যময় হওয়াকে অস্বীকার করছে।

​ভাবনা কোনো বস্তুর ভৌত গুণ পাল্টায় না সত্য, কিন্তু তা উপলব্ধি পাল্টে দেয়। সোমনাথের মূর্তি গজনবীর কাছে পাথর ছিল, কিন্তু ভক্তের কাছে তা ছিল বিশ্বের নাথ। সেই ভাবনার সিঁড়ি দিয়েই কোটি কোটি মানুষ শান্তিলাভ করেছে। সুতরাং মূর্তিপূজা অজ্ঞানতা নয়, বরং এটি হলো জড়ের মাধ্যমে অজড় বা পরম চৈতন্যে পৌঁছানোর এক দিব্য রসায়ন।
——————————————————————————————————————————————————————

◼️ প্রথম দোষ - নকল বস্তুতে আসল বস্তুর গুণ আছে মনে করে মানুষ নিজে নিজেকে প্রতারণা করবে । পশু, পাখী, পোকামাকড়ও ভালভাবে জানে যে, কোনো মেকীবস্তু আসল হয়ে কাজে লাগবে না। বিড়ালের সামনে মাটি বা রবারের ইঁদুর রেখে দিয়ে দেখো, সে কখনও তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে ধরতে যাবে না । মৌমাছির সামনে কাগজের ফুল রেখে দিয়ে দেখো, সে ভুলেও আসল ফুল মনে করে তাতে মধু খাওয়ার জন্য বসবে না। এইভাবে অন্য প্রাণীরাও মেকি বস্তুর সঙ্গে প্রেম করে না, করবে না। কিন্তু মানুষ, যে প্রাণী জগতের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হওয়ার দাবীদার তারাই মেকি বস্তুর কাছ থেকে যথেষ্ট ফল পাবার আশা করে এবং তাতে আসক্ত হয় । হায়! এর চেয়ে আশ্চর্য আর কী হতে পারে?


✅ শৈবপক্ষ দ্বারা খণ্ডন —  

​আর্যসমাজ বিড়াল ও মৌমাছির উদাহরণ দিয়েছে। বিড়ালের ইঁদুর ধরা বা মৌমাছির ফুলে বসা হলো তাদের ক্ষুধা নিবৃত্তির জৈবিক প্রয়োজন। মানুষ মূর্তিপূজা করে পেট ভরানোর জন্য নয়, বরং মনকে একাগ্র করার জন্য। বিড়াল রবারের ইঁদুর ধরে না কারণ তাতে মাংস নেই, কিন্তু মানুষ মূর্তির সামনে বসে কারণ তাতে ‘শান্তি’ ও ‘ভক্তি’ আছে। আধ্যাত্মিকতা কোনো শারীরিক ভোগ নয় যে তাকে মেকি বা আসল দিয়ে বিচার করতে হবে। এটি একটি অভ্যন্তরীণ অনুভব।

​পশু-পাখিরা ‘প্রতীক’ বোঝে না, কিন্তু মানুষ চতুর বুদ্ধিমান বলেই প্রতীক বুঝতে পারে। এটিই মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব। একটি ছোট কাগজের টুকরো (কারেন্সি নোট) কি আসল সোনা বা রূপো? না। কিন্তু সেই কাগজের ওপর যখন রাষ্ট্রের সিলমোহর থাকে, তখন তা হাজার টাকার মূল্য পায়। পশুরা সেই নোটকে কাগজ মনে করে চিবিয়ে ফেলে দেবে, কিন্তু বুদ্ধিমান মানুষ তার মূল্য জানে। ​মূর্তিও তেমন এটি কেবল পাথর নয়, এটি ঈশ্বরের ‘সীলমোহর’ যুক্ত একটি প্রতীক। পশুরা প্রতীক বোঝে না বলেই তারা মূর্তিপূজা করে না, আর মানুষ প্রতীক বুঝতে পারে বলেই সে মূর্তির মাধ্যমে অসীমকে হৃদয়ে ধরে।

​আমরা যখন আমাদের মৃত পিতা বা মাতার ছবি দেখি, তখন আমরা কি তাকে ‘মেকি মানুষ’ মনে করি? বিড়াল তার মায়ের ছবি দেখে আবেগাপ্লুত হবে না, কিন্তু একজন মানুষ হবে। ছবির মাধ্যমে আমরা সেই আসল মানুষটির স্মৃতি ও গুণাবলীকে মনে করি। মূর্তিও পরমাত্মার একটি ‘স্মারক’। আর্যসমাজ যদি ছবি বা মূর্তিকে মেকি বলে বর্জন করতে বলে, তবে তাদের যুক্তি অনুযায়ী জাতীয় পতাকাকে সম্মান করা বা মৃত প্রিয়জনের ছবি রাখাও ‘নিজেকে প্রতারণা করা’। কিন্তু বাস্তব হলো- প্রতীক আমাদের চেতনার সঙ্গে যুক্ত থাকে।

​আর্যসমাজ যজ্ঞের আগুনকে পরম পবিত্র মনে করে। এখন যদি তাদের যুক্তি ধার করি- ​আগুন তো লোহা গলাতে বা রান্না করতে লাগে। কিন্তু যজ্ঞের আগুনে ঘি ঢেলে মানুষ যে পুণ্য বা স্বর্গ কামনা করে, তা কি কোনো পশু করবে? একটি বানরের সামনে যজ্ঞ করলে সে তাকে সাধারণ আগুনই মনে করবে। ​তাহলে আর্যসমাজের যুক্তি অনুযায়ী পশুরা যা বোঝে না তা করাই যদি বোকামি হয়, তবে যজ্ঞ করাও কি বোকামি নয়? আসলে, মানুষের শ্রেষ্ঠত্বই হলো সে জড়ের আড়ালে থাকা সত্যকে উপলব্ধি করতে পারে, যা পশুরা পারে না।

যেমম- একজন মানুষ একটি জানালার ফাঁক দিয়ে মণির উজ্জ্বল আলো দেখে মনে করল সেখানে মণি আছে, আসলে সেখানে একটি প্রদীপ জ্বলছিল। আরেকজন মানুষও সেই আলো দেখে মণি মনে করে দৌড়ে গেল। প্রথমজন মণি পেল না কারণ সে কেবল আলো দেখেছিল, কিন্তু দ্বিতীয়জন সেই আলোর উৎস খুঁজতে খুঁজতে ভেতরে গিয়ে আসল মণিটি পেয়ে গেল।
​আলো হলো মূর্তি বা সাকার প্রতীক, আর মণি হলো
নিরাকার ব্রহ্ম। ​আর্যসমাজ বলছে আলোটা তো মণি নয়, তাই আলোর পেছনে যাওয়া প্রতারণা। কিন্তু ভক্ত জানে, এই আলোর রেখা ধরেই (মূর্তির ভক্তি) মণির কাছে (ঈশ্বর) পৌঁছানো সম্ভব।

মৌমাছি বা বিড়াল কেবল বর্তমানের ‘বস্তু’ বোঝে, কিন্তু মানুষ ‘লক্ষ্য’ বোঝে। মূর্তিপূজা মেকি বস্তুর সঙ্গে প্রেম নয়, বরং মেকি বস্তুরূপী মাধ্যমের সাহায্যে আসল সত্যকে খোঁজা। পশুরা যা পারে না, মানুষ তা পারে বলেই সে শ্রেষ্ঠ। আর্যসমাজ এখানে মানুষকে পশুর স্তরে নামিয়ে এনে বিচার করছে, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।

——————————————————————————————————————————————————————

◼️ দ্বিতীয় দোষ — ঈশ্বরের কাল্পনিক মূর্তি পূজক ঈশ্বরকে নিজের মতই ভাবে । নিজের প্রয়োজনীয় বস্তুর মতো তারও প্রয়োজন আছে মনে করে। যথাঃ—মানুষ যেমন নিজের জন্য ভোজনের প্রয়োজন অনুভব করে, ঠিক্ তেমনি সেও ঈশ্বরের ভোজনের প্রয়োজন আছে মনে করে থালায় নৈবেদ্য ও ভোগ সাজিয়ে দেয় । যেমন সে নিজে কাপড় পরে। তেমনি সে কল্পিত ঈশ্বরের মূর্তিকেও কাপড় পরায়, সে যেমন নিজে স্নান করে, তেমনি সেই কল্পিত ঈশ্বরের মূর্তিকে জল দিয়ে স্নান করায় । সে যেমন নিজে ঘুমায় এবং জাগে, তেমনি সে তার কল্পিত ঈশ্বরের মূর্তিকেও ঘুম পাড়ায় এবং জাগায় । সে যেমন নিজে অলংকার ধারণ করে, তেমনি সে কল্পিত ঈশ্বরের মূর্তিকেও অলংকার ধারণ করায় । মানুষ যখন ঈশ্বরেও নিজের মতো অভাব ও প্রয়োজন অনুভব করে, সেই অবস্থায় অভাবগ্রস্ত ঈশ্বরের কাছে কোনো কল্যাণের আশা করা যেতে পারে কিনা সে বিচার তুমিই কর । যে ঈশ্বর নিজেই অভাবগ্রস্ত সে অন্যের অভাব মোচন করবে কেমন করে? তুমিই বলো— একজন অন্ধ অপর অন্ধকে পথ দেখাবে কেমন করে? অন্ধ কি অপর অন্ধকে পথ দেখাতে পারে?


✅ শৈবপক্ষ দ্বারা খণ্ডন — 

​আর্যসমাজ বলছে ঈশ্বরকে খাওয়ানো বা স্নান করানো মানে তাঁকে অভাবগ্রস্ত ভাবা। একজন মা যখন তার ছোট সন্তানকে পুতুল নিয়ে খেলতে দেখেন এবং দেখেন যে সন্তানটি তার পুতুলকে খাওয়াচ্ছে বা ঘুম পাড়াচ্ছে, মা কি তখন হাসাহাসি করেন যে পুতুলটি অভাবগ্রস্ত? না। তিনি দেখেন সন্তানের মমতা ও বিকাশের প্রক্রিয়া।
​ভক্ত জানে যে ঈশ্বর নিরাকার এবং তাঁর ক্ষুধা নেই। কিন্তু ভক্তের নিজের তো হৃদয় আছে! সেই হৃদয়ের ভালোবাসা প্রকাশের জন্য একটি মাধ্যমের প্রয়োজন। আমরা যখন প্রিয়জনকে উপহার দিই, তার মানে এই নয় যে সে অভাবগ্রস্ত, বরং উপহারটি আমাদের ভালোবাসার প্রতীক। মূর্তিতে ভোগ নিবেদন করা ঈশ্বরকে পুষ্ট করা নয়, বরং ভক্তের নিজের অহংকার ও সম্পদকে ঈশ্বরের চরণে সমর্পণ করার একটি অভ্যাস।

​তারা বলছে অভাবগ্রস্ত ঈশ্বর অন্যকে পথ দেখাবে না। মূর্তিপূজক মূর্তিকে 'অভাবগ্রস্ত মানুষ' মনে করে না, বরং মূর্তিকে 'ঈশ্বরের জানালা' মনে করে। জানালার কাঁচ যেমন আলো দেয় না (আলো দেয় সূর্য), কিন্তু জানালার মাধ্যমেই আলো ঘরে আসে, তেমনি মূর্তি নিজে অভাব মোচন করে না, কিন্তু মূর্তির মাধ্যমে একাগ্র হওয়া মন সেই পরমাত্মার শক্তি লাভ করে যা অভাব মোচন করে। আর্যসমাজ এখানে 'মাধ্যম' এবং 'মূল'-কে গুলিয়ে ফেলেছে।

​আর্যসমাজ যজ্ঞে ঘি, কাঠ এবং সামগ্রী অর্পণ করে।
​যুক্তি: যদি মূর্তিকে কাপড় পরানো বা ভোগ দেওয়া 'অভাবগ্রস্ততা' হয়, তবে যজ্ঞের আগুনে ঘি ঢালা কী? ঈশ্বর কি ক্ষুধার্ত যে তাঁকে ঘি পুড়িয়ে খাওয়াতে হবে? আগুন কি ঈশ্বরের মুখ যে সেখানে খাবার দিতে হবে?
​আর্যসমাজ বলবে- যজ্ঞ একটি পবিত্র বিধি। তাহলে মূর্তিপূজাও একটি পবিত্র বিধি। যজ্ঞে যেমন অগ্নির মাধ্যমে ত্যাগ স্বীকার করা হয়, মূর্তিপূজায় তেমন রূপের মাধ্যমে ত্যাগের ও ভক্তির অভ্যাস করা হয়। যদি যজ্ঞ ঈশ্বরকে 'অভাবগ্রস্ত' না করে, তবে মূর্তিপূজাও করে না।

​শাস্ত্রে ঈশ্বরকে পাওয়ার বিভিন্ন ভাব আছে। কেউ তাঁকে 'প্রভু' ভাবে (দাস্য), কেউ 'সন্তান' ভাবে (বাৎসল্য)।
​খণ্ডন: যে ভক্ত ঈশ্বরকে সন্তান স্নেহে স্নান করায় বা ঘুম পাড়ায়, সে আসলে নিজের ভেতরের করুণা ও প্রেমকে জাগিয়ে তুলছে। এটি মনকে কোমল করার একটি সাধনা। আর্যসমাজের শুষ্ক যুক্তিবাদ মানুষের হৃদয়ের এই কোমল আবেগকে 'অন্ধত্ব' বলে উপহাস করছে, যা আধ্যাত্মিকতার মূল সুর অর্থাৎ প্রীতি বা প্রেম-এর বিরোধী।

একজন মানুষ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মাথায় তিলক পরলে আয়নায় থাকা প্রতিবিম্বের মাথাতেও তিলক দেখা যায়। আবার নিজের মুখ পরিষ্কার করলে প্রতিবিম্বের মুখও পরিষ্কার দেখায়। এখানে আয়নার প্রতিবিম্বটি নিজে কোনো কাজ করছে না, কিন্তু আয়নায় যা করা হচ্ছে তা আসলে নিজেরই সংস্কার।

​মূর্তি হলো সেই আয়না, আর ভক্তের মন হলো সেই মানুষটি। ​ভক্ত যখন মূর্তিকে স্নান করায়, অলংকার পরায় বা ভোগ দেয়, তখন আসলে সে তার নিজের অন্তঃকরণকেই ঈশ্বরীয় রঙে রাঙিয়ে তোলে। ​ঈশ্বর অভাবগ্রস্ত নন, কিন্তু ভক্তের মন কলুষিত। মূর্তিরূপ আয়নায় ঈশ্বরকে সুন্দর সাজে সাজাতে সাজাতে ভক্তের নিজের মনও সুন্দর ও পবিত্র হয়ে ওঠে।

আর্যসমাজ মনে করে পূজা মানে পাথরকে সেবা করা, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে পূজা মানে মূর্তিরূপ আধারে নিজের আত্মাকেই ঈশ্বরের কাছে সাজিয়ে ধরা। অন্ধ এখানে মূর্তি নয়, বরং আর্যসমাজের সেই যুক্তি যা ভক্তির এই সূক্ষ্ম বিজ্ঞান বুঝতে পারছে না।

——————————————————————————————————————————————————————

◼️ তৃতীয় দোষ — ঈশ্বর এক, আর তাঁর মূর্তি অনেক । কেননা, যতগুলি সম্প্রদায় তারা তাদের আপন আপন বিশ্বাস মতে ততগুলি মূর্তি গড়ে থাকে। পরিণাম পরস্পর রাগ-দ্বেষ, ঝগড়া-বিবাদ থেকেই যায়। ঝগড়া-বিবাদ জাতীয় সংগঠনের পক্ষে মহান ক্ষতিকর এরূপ আরও অনেক দোষ দেখান যেতে পারে।


✅ শৈবপক্ষ দ্বারা খণ্ডন —  

​আর্যসমাজের দাবি হলো ঈশ্বর এক হলে মূর্তি অনেক কেন ? এর উত্তর হলো— তত্ত্ব এক, কিন্তু রুচি ভিন্ন।
​যেমন একই জল ভিন্ন ভিন্ন পাত্রে রাখলে পাত্রের আকার ধারণ করে, তেমনি একই পরমাত্মা সাধকের ভক্তি ও রুচি অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন রূপে প্রকাশিত হন।
​শ্রুতিতে বলা হয়েছে "একং সদ্বিপ্রা বহুধা বদন্তি" (ঋগবেদ ১/১৬৪/৪৬) সত্য এক, ঋষিরা তাকে বহু নামে ডাকেন। বহু মূর্তির অর্থ বহু ঈশ্বর নয়, বরং এক ঈশ্বরেরই বহু গুণ বা শক্তির প্রকাশ।

​দাবি করা হয়েছে যে ভিন্ন মূর্তির কারণে ঝগড়া-বিবাদ হয়। কিন্তু বিচার করলে দেখা যায়- ​বিবাদের কারণ মূর্তি নয়, বরং মানুষের সংকীর্ণ মানসিকতা। যারা প্রকৃত জ্ঞানী, তারা জানেন যে শিব, বিষ্ণু বা শক্তি আসলে একই চেতনার ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ। ​ইতিহাস সাক্ষী দেয় যে, নিরাকারবাদীদের মধ্যেও মতাদর্শগত কারণে যুদ্ধ হয়েছে। সুতরাং ঝগড়া বা বিবাদের জন্য মূর্তিকে দায়ী করা অযৌক্তিক, এটি সম্পূর্ণভাবে মানুষের ব্যক্তিগত অহংকার ও অজ্ঞতার ফল।

​আর্যসমাজের মতে মূর্তিভেদ জাতীয় ঐক্যের ক্ষতি করে। কিন্তু বাস্তবে- ​ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে ভিন্ন ভিন্ন বিগ্রহ (যেমন- দক্ষিণে বালাজী, পূর্বে জগন্নাথ, উত্তরে বিশ্বনাথ) থাকলেও এই মূর্তিকে কেন্দ্র করেই হাজার বছর ধরে দেশের মানুষ এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাতায়াত করেছে। এই 'তীর্থ সংস্কৃতি' বরং ভারতকে ভৌগোলিক ও মানসিকভাবে ঐক্যবদ্ধ রেখেছে। ​মূর্তিগুলো আসলে জাতীয় ঐতিহ্যের ধারক। এগুলো মানুষকে একটি সাধারণ সাংস্কৃতিক মূলে আবদ্ধ করে, যা জাতীয় সংগঠনের জন্য ক্ষতিকর নয় বরং সহায়ক।

সূর্য এক, কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন জলাধারে তার প্রতিবিম্ব ভিন্ন দেখায়। জলাধারগুলো (বিভিন্ন সম্প্রদায়) আলাদা হতে পারে, কিন্তু তাদের মধ্যে প্রতিফলিত আলোকশিখা (ঈশ্বর) এক ও অভিন্ন। এই সত্যটি অনুধাবন করলে আর কোনো বিদ্বেষ থাকে না।

মূর্তিপূজা কেবল পুতুল পূজা নয়, এটি সসীম মানবের অসীমকে ছোঁয়ার একটি মাধ্যম। আর্যসমাজ মূর্তিপূজাকে দোষারোপ করলেও, এটি সাধারণ মানুষের আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য একটি সহজ ও মনোবৈজ্ঞানিক পথ। বিবাদ মেটানোর সমাধান মূর্তি ভাঙা নয়, বরং সকল দেবতার প্রণাম সেই এক ঈশ্বরের কাছেই পৌঁছায় এই উদার চেতনার বিস্তার ঘটানো।

 “ঘট্টকুটীপ্রভাত ন্যায়” অনুযায়ী - শুল্ক এড়ানোর জন্য সারারাত অন্য পথে হেঁটেও ভোরে যেমন সেই শুল্কশালা বা চুঙ্গিঘরের (ঘট্টকুটি) সামনেই এসে পড়তে হয়, তেমনি আকার বা প্রতীককে অস্বীকার করার চেষ্টা করেও উপাসনার প্রয়োজনে মানুষের মন সেই প্রতীকেই ফিরে আসে। নিরাকারবাদী হোক বা সাকারবাদী ধ্যান বা আরাধনা করতে গেলে মনের সামনে ঈশ্বরের কোনো না কোনো গুণ, নাম বা ভাবনার আশ্রয় নিতেই হয়। নাম (শব্দ) নিজেও তো এক প্রকার সূক্ষ্ম রূপ বা প্রতীক। অর্থাৎ, মূর্তিকে পরিহার করার চেষ্টা করলেও মানুষের মন কোনো না কোনো 'আকার' বা 'প্রতিমায়' এসেই উপস্থিত হয়। বিবাদ এড়ানোর জন্য মূর্তিকে অস্বীকার করা নয়, বরং সকল রূপের মধ্যে সেই এক অখণ্ড সত্তাকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিই হলো প্রকৃত সমাধান।
——————————————————————————————————————————————————————

প্রশ্ন —  তোমার বলার উদ্দেশ্য - মূর্তি তৈরী করাও উচিত নয় আর মূর্তির পূজা করাও উচিত নয় । আমার মনে হয়, অবশ্য আমি যতদূর বুঝি— শান্ত-রাগ-রাগিণীময় গীত মহাপুরুষদের চিত্র এবং মূর্তি দর্শনে মনে শান্তি আসে আর ভক্তের চিত্তে তার বেশ ভাল প্রভাবও পড়ে।

আর্যসমাজের উত্তর—  আমার বলার উদ্দেশ্য মোটেই এ নয় যে, কারো মূর্তি গড়বে না, কারো ফটো বা ছবি তৈরী করবে না। আমি চিরদিনই বলে আসছি—মূর্তি গড়া প্রয়োজন । বিশ্বের মহাপুরুষদের মূর্তি অথবা চিত্র তৈরী করলে তাঁদের স্মৃতি রক্ষা করা হয় কিন্তু এর মানে এই নয় যে, চেতন মানুষের মতো তাদের পূজাও করা উচিত । অথবা তাঁদের সকলকে পরমাত্মা বা পরমাত্মার প্রতিনিধি বোধে তাঁদের কাছে ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষলাভের আশায় প্রার্থনা করা উচিত । প্রাণহীন বস্তু চিরদিনই প্রাণহীন তার মধ্যে জীবিত মানুষের বা সর্বব্যাপক ঈশ্বরের স্থলাভিষিক্ত হয়ে কর্ম করার যোগ্যতা কোথায়? যে পিতা জীবিত অবস্থায় সন্তানকে স্নেহ করতে সক্ষম, মৃত্যুর পর সে কি সন্তানকে স্নেহ করতে পারে? যে শরীরে পিতা আপন সন্তানকে কোলে বসিয়ে খাইয়েছে, সেই প্রাণহীন শরীর কি সন্তানের কোনো কাজে লাগে? পিতার সেই প্রাণহীন শরীরে এবং পাথরের বা মাটির তৈরী মূর্তিতে পার্থক্য কোথায়? হ্যাঁ, সামান্য তফাৎ অবশ্যই আছে বলা যেতে পারে । পাথর বা ধাতু নির্মিত মূর্তি পচে গলে যায় না, আর প্রাণহীন শরীর পচে-গলে যায় - তাছাড়া উভয়ের একই অবস্থা । জড় দেবতার পূজার অর্থ হলো তাদের যথাযোগ্য ব্যবহার করা। যদি যথাযথভাবে তাদের ব্যবহার না করা হয়, তাহলে সেই বস্তু সমূহই মানুষের পক্ষে ক্ষতিকর হতে বাধ্য । যদি বলো সে কেমন করে হয়? তো শোনো ।

একজন গঙ্গার বড় ভক্ত। সে রাতদিন তার পূজায় রত থাকে । গঙ্গায় ফুল, নৈবেদ্য অর্পণ করে, গঙ্গা লহরী স্তোত্র পাঠ করে । কিন্তু সে সাঁতার কাটা জানে না । একদিন সে গঙ্গায় নেমে পূজা করছে এমন সময় হঠাৎ সে গঙ্গার গভীর জলে তলিয়ে গেল, — গঙ্গার ভক্ত ডুবে গেল । এতদিন সে গঙ্গার কতো পূজো করেছে–আরাধনা করেছে, আর কিনা সেই গঙ্গা, তার ভক্তকে একেবারে পেটে পুরে নিল ! কই, সে যার এত স্তোত্র পাঠ করত, পুজো পাঠ করত, গঙ্গা তাকে ছাড়ল না তো? এখানে ছাড়াছাড়ি নেই সে তার যত শ্রদ্ধা-ভক্ত দিয়েই পূজা করুক না কেনো? ফুল, বেলপাতা আর যত ইচ্ছা ঘটি বা কলসী-কলসী দুধ ঢালুক না কেনো, সে যত বড় ভক্তই হোক না কেনো, সাঁতার না জানার জন্য তাকে গঙ্গার পেটে যেতেই হবে ।

আর একজন গঙ্গাকে “গঙ্গা মা” মনে না করে নদী মনে করত । সে বোধ হয় কাউকে হত্যা করেছিল । তাই তার হাত পা ছিলো রক্তে রক্তাক্ত । ধরা পড়ার ভয়ে সে সাকার গঙ্গা নদীতে দিল ঝাঁপ । সে সাঁতার জানত, আরকী ভয় ? গঙ্গার বুক চিরে সাঁতার কেটে সে পার হয়ে গেল । একজন ‘গঙ্গা মায়ের’ পুজো করে ডুবে মরল, আর একজন গঙ্গাকে জড় জেনে তার যথার্থ ব্যবহার করে রক্ষা পেল এমনটা হলো কেনো জানো ? একজন জলের যথাযথ ব্যবহার করা জানতো, তাই সে সাঁতার কেটে পার হয়ে গেল, আর একজন জলের যথাযথ ব্যবহার জানত না, তাই গঙ্গার পূজা করেও সে ডুবে গেল । একজন বেঁচে গেল, আর একজন মরে গেল।

একদল গঙ্গা পূজক আছে তারা মনে করে শুধু গঙ্গা স্নান করলেই মুক্তি হবে । তারা প্রতি বৎসর লক্ষ লক্ষ, কোটি কোটি টাকা রেল কোম্পানীকে দিয়ে থাকে। তারা টাকা দেয়, টাকা দিয়ে গাড়ীতে ধাক্কা খায়, তারপর হয়রানি, তারা মনে করে গঙ্গায় স্নান করলে — প্রণাম করলে, ফল-মূল গঙ্গায় দিলে গঙ্গার পূজা হবে । আর একদল আছে যারা গঙ্গা হতে খাল কেটে লক্ষ লক্ষ বিঘে জমিতে জল দিয়ে জমিকে উর্বরা করাকে গঙ্গাপূজা মনে করে । তারা গঙ্গার প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করছে, চাকী চালাচ্ছে । তারা কোনোও দিন পুণ্যের আশায় গঙ্গায় স্নান করে না। কিন্তু তারা গঙ্গাকে পাইপের মধ্যে দিয়ে নিজের ঘরে এনেছে, আর নানা প্রকারে তার দ্বারা লাভবান হচ্ছে । এইভাবে তারা জড় পদার্থের যথাযথ ব্যবহার দ্বারা জড়ের পূজা করে চলছে এইভাবে প্রত্যেক জড় পদার্থের বিষয়ে উদাহরণ উপস্থিত করা যেতে পারে ।

শেষে রইল, মূর্তি বা ছবি বা ফটো দেখে প্রভাব সৃষ্টির কথা । এ বিষয়ে একটু বিচার বিবেচনা করে দেখো–একটু ভাবো । মনে রাখবে মূর্তি দেখলেই চিত্তে ভাল মন্দের প্রভাব পড়ে না, কিন্তু যে প্রভাবটা পড়ে সেটা আন্তরিক সংস্কারের কারণেই পড়ে থাকে । উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে । একজন হিন্দু সে শ্রীরাম বা কৃষ্ণের মূর্তি দর্শন করল, সেই মূর্তির সামনে মাথা নত করে প্রণাম করল জানো, সে মূর্তির সামনে মাথা নত করল কেনো? সে শ্রীরাম ও কৃষ্ণের ইতিহাস জানত। তার অন্তরে তাঁদের সম্বন্ধে সংস্কার ছিল যে, শ্রীরাম ও কৃষ্ণ ঈশ্বরের অবতার ছিলেন, তাঁরা রাবণ ও কংসকে সংহার করেছিলেন সে পুস্তক পাঠ করেই হোক বা অন্যের কাছে শুনেই হোক, তার মনের মধ্যে এইরূপ সংস্কার জমা হয়েছিল । তাই সে তাঁদের মূর্তি দেখে প্রভাবিত হয়েছে ।

আর যদি সেই হিন্দুর সামনে কোনো জাপানী দেবতা ‘কন্‌ফিউশিয়াস’ এর মূর্তি রেখে দেওয়া হয় তাহলে কি সেই মূর্তি দেখে তার মনে প্রভাব সৃষ্টি হবে? জাপানী দেবতাকে দেখে তার মনে শ্রদ্ধা জন্মাবে না কেননা, ‘কন্‌ফিউশিয়াস’ সম্বন্ধে তার কিছুই জানা নেই । যে ব্যক্তিটির অন্তরে‘কন্‌ফিউশিয়াস’ সম্বন্ধে কোনো সংস্কারই নেই, সেই মূর্তি দেখে তার মাথা নত হয় না।
একজন অহিন্দু সে হিন্দুর কোনো দেব-দেবীর মূর্তিকে দেখে শ্রদ্ধায় মাথা নত করে না। এর কারণ — সেই অহিন্দুদের মনে হিন্দুদের দেব-দেবী সম্বন্ধে কোনো সংস্কার নেই । একজন মুসলমানের কাছে এক দুর্বল তথা কুরূপ মুসলমানের ছবি ভাল, কিন্তু কোনো হিন্দুর দেব দেবীর ছবি তার কাছে ভাল নয়, কেননা, তাদের সম্বন্ধে তার মনে একটুও শ্রদ্ধা নেই । হিন্দু দেব-দেবীদের চিত্র মুসলমানদের কেনো ভাল লাগে না? তার কারণ তারা যে মুমিন বা তারা যে ইসলামের একজন সহায়ক এই সংস্কার তাদের মনে দৃঢ় হয়ে আছে। এবার তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছ যে, মনে যা কিছু প্রভাব পড়ে সে তাদের আপন আপন সংস্কারের জন্য পড়ে, মূর্তি দেখে প্রভাব পড়ে না । যদি মূর্তি দেখে প্রভাব পড়ত, তাহলে প্রত্যেক মানুষের মনে মূর্তির দর্শন মাত্রই তাদের মনে প্রভাব পড়ত এবং তাদের মনে শান্তি আসত, কিন্তু তা হয় না ।


✅ শৈবপক্ষ দ্বারা খণ্ডন —  

​আর্যসমাজ বলছে গঙ্গার উপযোগিতা বা সাঁতার জানাই আসল 'পূজা'। কিন্তু এখানে একটি মৌলিক ভুল আছে, প্রয়োজন এবং প্রেম (ভক্তি) এক নয়। খাল কেটে জল আনা বা বিদ্যুৎ তৈরি করা হলো গঙ্গার ভৌতিক ব্যবহার (Physical use)। এটি বিজ্ঞানের বিষয়। একজন তৃষ্ণার্ত মানুষ জল পান করে তৃষ্ণা মেটায় সেটি তার শারীরিক প্রয়োজন। কিন্তু সেই জলের উৎসের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হলো আধ্যাত্মিকতা।

যে ভক্ত সাঁতার না জেনে ডুবে মরেছে, তার মৃত্যু হয়েছে প্রাকৃতিক নিয়মে (Physics)। গঙ্গা তাকে মারেনি, তার নিজের অসতর্কতা তাকে ডুবিয়েছে। কিন্তু তার 'ভক্তি' ছিল তার মানসিক স্তরে। আর্যসমাজের যুক্তি অনুযায়ী, মা অসুস্থ হলে সন্তান যদি তার সেবা করে কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞান না জানার কারণে মা মারা যান, তবে কি সন্তানের সেই সেবাকে অর্থহীন বা ভুল বলা হবে ? জড়ের শক্তির অপব্যবহার করলে বিপদ হবে, এটা তো ধ্রুব সত্য, কিন্তু তার মানে এই নয় যে সেই জড়ের অন্তরালে থাকা দৈবশক্তিকে প্রণাম করা যাবে না।

​আর্যসমাজ মৃত বাবার শরীরের সাথে মূর্তির তুলনা করেছে। এটি একটি দুর্বল যুক্তি। আমরা মৃতদেহকে দাহ করি কারণ সেটি ত্যাজ্য। কিন্তু মূর্তি কোনো 'মৃত বস্তু' নয়, সেটি একটি 'মাধ্যম'। যেমন একটি কাগজের টুকরো (টাকা) নিজে কোনো সম্পদ নয়, কিন্তু সরকারের সিল থাকায় তা মূল্যবান। তেমনি মূর্তিতে যখন ভক্ত ঈশ্বরের গুণ আরোপ করে, তখন সেটি আর সাধারণ পাথর থাকে না, তা 'অধিষ্ঠান' হয়ে ওঠে।

আর্যসমাজ নিজেই বলেছে মহাপুরুষদের ছবি রাখা ভালো স্মৃতি রক্ষার জন্য। এখন প্রশ্ন হলো, কেউ যদি তার মৃত পিতার ছবির সামনে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানায়, আর কেউ যদি সেই ছবিতে জুতো মারে, দুটোই কি সমান ? ছবি তো জড়। কিন্তু ছবির সাথে যে 'ভাব' যুক্ত, তাকে আঘাত করা মানে পিতাকেই আঘাত করা। মূর্তিপূজাও ঠিক তাই।

​আর্যসমাজ বলছে, মূর্তির নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নেই, যা আছে তা মানুষের সংস্কার। অর্থাৎ আগে থেকে জানলে তবেই ভক্তি আসবে। এখন, কোনো সুন্দর বাগান বা হিমালয়ের দৃশ্য দেখলে কি কেবল সংস্কারের কারণে ভালো লাগে? না, সেই দৃশ্যের একটি নিজস্ব নান্দনিক প্রভাব আছে। একইভাবে, সুনিপুণভাবে নির্মিত একটি শান্ত সমাহিত শিব মূর্তি বা তেজস্বী কালী মূর্তি একজন অজানা মানুষের মনেও বিস্ময় বা প্রশান্তি জাগাতে পারে।
একজন নিরক্ষর মানুষ যার কোনো 'পুস্তকীয় সংস্কার' নেই, সেও যখন একটি দিব্য মূর্তির সামনে দাঁড়ায়, তার মনে এক প্রকার সমর্পণ ভাব আসে। সংস্কার কেবল পথ দেখায়, কিন্তু মূর্তিরূপী মাধ্যমটি সেই ভাবকে ঘনীভূত করতে সাহায্য করে। যেমন লেন্স ছাড়া সূর্যের আলো কাগজ পোড়াতে পারে না, তেমনি প্রতিমা ছাড়া সাধারণ মানুষের নিরাকার চিন্তা বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়।

আর্যসমাজ মূর্তিকে 'জড়' বলে সরিয়ে দিতে চায়, কিন্তু মহাপুরুষদের 'স্মৃতি রক্ষার' জন্য আবার সেই মূর্তিরই আশ্রয় নিতে চায়। ​তারা বলছে - "মূর্তি গড়ো কিন্তু পূজা করো না।" পূজার অর্থ কী? পূজা শব্দের অর্থ হলো সম্মান প্রদর্শন। যদি মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে আপনি মহাপুরুষের গুণগান করেন, তবে সেটাও এক প্রকার মানস-পূজা। আপনি যে পথেই পালানোর চেষ্টা করুন না কেন (মূর্তিবিরোধিতা), শেষ পর্যন্ত সেই স্মারক বা মূর্তিরূপী 'ঘট্টকুটী' বা শুল্কশালাতেই আপনাকে ফিরতে হচ্ছে।

​আর্যসমাজের যুক্তি অনুযায়ী, গঙ্গার ওপর বাঁধ দিয়ে বিদ্যুৎ তৈরি করা যদি 'আসল পূজা' হয়, তবে ধর্ম আর ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না। ধর্ম মানুষের অস্তিত্বের তৃষ্ণা মেটায়, আর বিজ্ঞান মেটায় বস্তুগত তৃষ্ণা। গঙ্গাকে মা বলে ডাকা হলো হৃদয়ের প্রসারতা, আর তাকে পাইপে ভরা হলো মস্তিষ্কের চাতুর্য। দুটোই দরকার, কিন্তু একটির জন্য অন্যটিকে অস্বীকার করা মূর্খতা।

মূর্তিপূজক গঙ্গায় ডুবে মরলে সেটা তার কারিগরি শিক্ষার অভাব, ভক্তির অপরাধ নয়। আবার চোর গঙ্গা পার হয়ে গেলে সেটা তার সাঁতারের দক্ষতা, তার পাপের মুক্তি নয়। আর্যসমাজ এখানে ভৌতিক নিয়ম এবং আধ্যাত্মিক অনুভূতিকে গুলিয়ে ফেলেছে। মূর্তিপূজা জড়ের উপাসনা নয়, জড়ের মাধ্যমে অরূপের আরাধনা। উপমা হিসেবে বলি, এখন মূর্তিপূজারীরা দয়ানন্দ সরস্বতীর মূর্তিতে পদাঘাত করলেই আর্যসমাজীরা মূর্তিপূজার কতটা বিরোধী তা ধরা পড়ে যাবে।

——————————————————————————————————————————————————————

প্রশ্ন —  স্কুলে মানচিত্র দেখান হয় । ছোট্ট মানচিত্র দেখে যদি বিশাল পৃথিবীর জ্ঞান হতে পাবে, ছোট্ট ছবি বা মূর্তি দেখলে বিশাল ঈশ্বরের বা ব্রহ্মের জ্ঞান লাভ হবে না কেনো ?

আর্যসমাজের উত্তর —  স্নেহের ভাইটি, শোনো । মানচিত্র সাকার জগতেরই হয়ে থাকে। সেই মানচিত্র দ্বারা নদী, হ্রদ, পাহাড়-পর্বত, নগর, রাজপথ, রেল, বন, উপবন প্রভৃতির জ্ঞান করান যেতে পারে । কিন্তু যে ঈশ্বর সর্বব্যাপক এবং নিরাকার, তার মানচিত্র বা ছবি কী করে সম্ভব হবে ? সম্ভব হয় না, তা দিয়ে ঈশ্বরের জ্ঞানও হয় না ।


✅ শৈবপক্ষের খণ্ডন — 

​আর্যসমাজ বলছে মানচিত্র কেবল সাকার বস্তুর হয়। কিন্তু তলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, মানচিত্র নিজেও তো সেই আসল পাহাড় বা নদী নয়। এটি একটি 'প্রতীক'।
​মানচিত্রে একটি ছোট বিন্দু দিয়ে একটি বিশাল শহরকে বোঝানো হয়। বিন্দুটি কি শহর ? না। কিন্তু সেই বিন্দুর সাহায্যে আমরা শহরের অবস্থান ও অস্তিত্ব অনুভব করি। একইভাবে, সসীম মূর্তির মাধ্যমে অসীম ঈশ্বরের বিরাটত্ব ও অস্তিত্ব অনুভব করা হয়। নিরাকারকে বোঝার জন্য সাকার অবলম্বনের প্রয়োজন হয় এটি মানুষের মস্তিষ্কের সীমাবদ্ধতা, ঈশ্বরের নয়।

​আর্যসমাজের দাবি হলো নিরাকারের ছবি সম্ভব নয়। কিন্তু উপনিষদ ও দর্শনে 'প্রতীক উপাসনা' স্বীকৃত। বায়ু নিরাকার, কিন্তু বায়ুর গতি বোঝাতে আমরা ছবিতে বক্ররেখা ব্যবহার করি। বিদ্যুৎ নিরাকার, কিন্তু তার সংকেত হিসেবে আমরা একটি বিশেষ চিহ্ন ব্যবহার করি। যদি নিরাকার বিদ্যুৎ বা বায়ুর প্রতীকী চিত্র হতে পারে, তবে সর্বব্যাপী ঈশ্বরের গুণাবলী (যেমন - পালনকর্তা হিসেবে বিষ্ণু বা সংহারকর্তা হিসেবে রুদ্রদেব) বোঝাতে কেন মূর্তিরূপী 'মানচিত্র' ব্যবহার করা যাবে না ?

​আর্যসমাজ বলছে মানচিত্র দিয়ে জ্ঞান হয়, কিন্তু মূর্তি দিয়ে হয় না। মানচিত্র দেখে কি কেউ হিমালয়ের ঠান্ডা অনুভব করতে পারে? বা গঙ্গার জলের শীতলতা পায় ? না। মানচিত্র কেবল নির্দেশক । ঠিক তেমনি, মূর্তিও ঈশ্বর নয়, বরং ঈশ্বরের দিকে যাওয়ার একটি মানচিত্র বা দিশারি। মানচিত্র যেমন পথ দেখায়, মূর্তিও তেমনি সাধকের মনকে নিরাকার ব্রহ্মের দিকে ধাবিত করার প্রাথমিক পথ নির্দেশ করে।

​আর্যসমাজ 'ওঁ' ধ্বনিকে ঈশ্বরের নাম হিসেবে স্বীকার করে। 'ওঁ' শব্দটি এটি একটি শব্দ বা বর্ণ (সাকার প্রতীক)। যদি কান দিয়ে শোনা 'শব্দ-প্রতীক'  দিয়ে নিরাকারকে বোঝা সম্ভব হয়, তবে চোখ দিয়ে দেখা 'রূপ-প্রতীক'  দিয়ে কেন সম্ভব হবে না? শব্দ ও রূপ উভয়ই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য মাধ্যম। একটিকে গ্রহণ করে অন্যটিকে 'অসম্ভব' বলা স্ববিরোধিতা এবং অর্ধজড়তীয়তা দোষে পুষ্ট।
'ঘট্টকুটীপ্রভাত ন্যায়' দ্বারা আর্যসমাজের দাবী খণ্ডিত হয়। আর্যসমাজ ঈশ্বরকে বোঝাতে গিয়ে 'দয়ালু', 'ন্যায়কারী', 'সর্বশক্তিমান' এই শব্দগুলো ব্যবহার করে। এই শব্দগুলোও তো মানুষের অভিজ্ঞতার জগত থেকে নেওয়া একেকটি মানসিক ছবি বা মানচিত্র। নিরাকারকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তারা যখনই কোনো গুণের কথা বলে, তখনই তারা অলক্ষ্যে একটি 'মানসিক মূর্তি' তৈরি করে ফেলে। ​অর্থাৎ, মূর্তিকে পরিহার করতে গিয়েও তারা গুণেরূপী মানচিত্রের সেই শুল্কশালাতেই (ঘট্টকুটি) বারবার ফিরে আসছে।

​মানচিত্র যেমন ভূগোল শেখার শুরু, শেষ নয়, মূর্তিপূজাও তেমনি আধ্যাত্মিকতার প্রাথমিক সোপান। মানচিত্র ছাড়া যেমন বিশাল পৃথিবীর সঠিক ধারণা পাওয়া কঠিন, তেমনি সাধারণ মানুষের পক্ষে কোনো অবলম্বন বা 'রূপক মানচিত্র' (মূর্তি) ছাড়া অতিন্দ্রিয় ব্রহ্মতত্ত্ব হৃদয়াঙ্গম করা প্রায় অসম্ভব। আর্যসমাজ এখানে মাধ্যম এবং লক্ষ্যকে গুলিয়ে ফেলেছে।

——————————————————————————————————————————————————————

প্রশ্ন —  অক্ষর এবং শব্দ নিরাকার, কিন্তু দ্যাখো তারও মূর্তি আছে । সেই নিরাকার শব্দের অক্ষর তৈরী করে ছেলেদের বোধ করান হয় । যদি অক্ষর এবং শব্দের আকার সৃষ্টি না হত, তাহলে ছেলেরা কেমন করে বিদ্যালাভ করতে পারত ? তেমনি ঈশ্বর সম্বন্ধে বলা চলে কিনা ?

আর্যসমাজের উত্তর —  দেখো, অক্ষর এবং শব্দ চোখ দিয়ে দেখা যায় না, যায় কী? কিন্তু কান দিয়ে শোনা যায় । বোধ করার জন্য যা কানের বিষয়, মানুষ তাকে চোখের বিষয় করে ফেলেছে । আর যা কোনো ইন্দ্রিয়ের নয়, অর্থাৎ যে ইন্দ্রিয়াতীত তার বোধ করানোর জন্য কোন ইন্দ্রিয়ের বিষয় করা যাবে বল ? যে ইন্দ্রিয় গ্রাহ্য নয়, তাকে কেবল অনুভব দ্বারাই জানা যেতে পারে । আর এ আবশ্যক নয় যে, নিরাকার অক্ষরের এবং শব্দের কল্পিত চিহ্ন গড়লে তবেই বিদ্যা হবে, নইলে হবে না? যদি এমনটি হতো, তাহলে অন্ধ-বিদ্বান ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া যেত না । কেননা, অন্ধ তো জীবনেও অ, আ, ই, ঈ এদের রূপ দেখেনি । তারা, এ, বি, সি, ডি ও চোখে দেখেনি, চোখ নেই তো দেখবে কেমন করে ? কিন্তু তুমি দেখেছো, অন্ধব্যক্তিও এম. এ./বি.এ. পাশ করেছ, শাস্ত্রী হয়েছে । তারা ইংরাজী, বাংলা, সংস্কৃত ভাষা শিখেছে । দ্বিতীয়তঃ লিখিত এবং কল্পিত চিহ্নকে বলা হয়‘বর্ণ’ । যা মুখে উচ্চারিত হয় তাকে বলা হয়‘অক্ষর’ । অক্ষর নিরাকার, অক্ষরের কোনো রূপ নেই। যা লেখা যায় তাকে বর্ণ বলে। সেই বর্ণের আকার আছে,—বর্ণ সাকার ।


✅ শৈবপক্ষ দ্বারা খণ্ডন —  

​আর্যসমাজ বলেছে অন্ধরা অক্ষর না দেখেও বিদ্বান হয়। কিন্তু তারা একটি বড় সত্য এড়িয়ে গেছে। অন্ধ ব্যক্তি চোখে না দেখলেও 'ব্রেইল' (Braille) পদ্ধতির মাধ্যমে আঙুল দিয়ে ছুঁয়ে অক্ষরের স্পর্শযোগ্য সাকার রূপ অনুভব করে। অর্থাৎ, নিরাকার শব্দকে বোঝার জন্য তাকে কোনো না কোনো সাকার মাধ্যমের (স্পর্শ বা শব্দ) ওপর নির্ভর করতেই হয়।
যেমন অন্ধের জন্য 'স্পর্শ' একটি মাধ্যম, চক্ষুষ্মানের জন্য 'দর্শন' (মূর্তি বা বর্ণ) একটি মাধ্যম। মাধ্যম ছাড়া নিরাকার তত্ত্ব সসীম মানুষের মস্তিষ্কে প্রবেশ করে না।

​আর্যসমাজ 'বর্ণ'কে সাকার এবং 'অক্ষর'কে নিরাকার বলে আলাদা করতে চাইছে। কিন্তু ব্যাকরণ শাস্ত্র ও দর্শনের দৃষ্টিতে- বর্ণ এবং অক্ষর আসলে একই তত্ত্বের দুটি প্রকাশ। সাকার 'বর্ণ' ছাড়া নিরাকার 'অক্ষর' বা 'শব্দার্থ'হৃদয়াঙ্গম করা অসম্ভব। যদি নিরাকার শব্দকে বোঝাতে সাকার 'বর্ণ' (লিখন) এবং 'ধ্বনি' (উচ্চারণ) দোষের না হয়, তবে নিরাকার ঈশ্বরকে বোঝাতে সাকার 'মূর্তি' দোষের হবে কেন ? দুটিই তো মানুষকে অরূপের দিকে নিয়ে যাওয়ার 'সংকেত'।

পাণিনী অষ্টাধ্যায়ী অনুযায়ী —

"তস্মিন্নিতি নির্দিষ্টে পূর্বস্য" (১/১/৬৬)

অর্থাৎ, সপ্তমীর নির্দেশ থাকলে কার্যটি ঠিক তার 'পূর্ববর্ণের' ওপর হবে।

​উদাহরণ (ইকো যণচি)- দধি + উদকম্ = দধ্যুদকম্। এখানে 'ই' কারের পর 'উ' কার থাকায় সন্ধি হয়েছে। পাণিনি এখানে 'ই' (ইক্) এবং 'উ' (অচ্)-এর মতো সংকেত বা প্রতীকের ওপর ভিত্তি করে একটি অদৃশ্য নিয়মকে (যণ্ সন্ধি) মূর্ত করেছেন।
আর্যসমাজ বলছে নিরাকারকে বুঝতে সাকার প্রতীকের প্রয়োজন নেই। কিন্তু কাশিকা ভাষ্য দেখাচ্ছে যে- ব্যাকরণের মতো একটি বিমূর্ত নিয়মকেও বুঝতে গেলে 'ই', 'উ', 'দধি', 'উদকম্' এই সাকার ও নির্দিষ্ট (নির্দিষ্টগ্রহণমানন্তর্যার্থম্‌) বর্ণের আশ্রয় নিতেই হয়। যদি বর্ণাত্মক প্রতীকের নির্দিষ্টতা ছাড়া ব্যাকরণ বোধগম্য না হয়, তবে বিগ্রহাত্মক প্রতীক ছাড়া ব্রহ্মতত্ত্ব সাধারণের বোধগম্য হবে কীভাবে?
​আর্যসমাজ বলছে ঈশ্বর ইন্দ্রিয়াতীত, তাই তাকে কোনো ইন্দ্রিয়ের বিষয় করা যাবে না। যদি ইন্দ্রিয়াতীতকে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য না করা যায়, তবে আর্যসমাজ 'ওঁ' ধ্বনি উচ্চারণ করে কেন? শব্দ তো কানের বিষয় (ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য)। তারা কেন ঈশ্বরকে 'দয়ালু' বা 'ন্যায়কারী' বলে ? এই গুণগুলো তো মানুষের মনের বিষয়। মানুষের মন সসীম। অসীম ও ইন্দ্রিয়াতীত ঈশ্বরকে সরাসরি অনুভব করার ক্ষমতা সাধারণ মানুষের নেই। তাই কৃপা করে ঈশ্বর নিজেকে সাকার রূপে বা প্রতীকে আবদ্ধ করেন যাতে ভক্ত তাকে ধরতে পারে। একেই শাস্ত্রে 'অরূপরূপিণী' বা 'সগুণ ব্রহ্ম' বলা হয়েছে।

'ঘট্টকুটীপ্রভাত ন্যায়' অনুযায়ী- ​এখানে আর্যসমাজের অবস্থান আবার সেই একই বৃত্তে এসে থমকে যাচ্ছে। ​তারা বলছে 'বর্ণ' (সাকার) দিয়ে 'অক্ষর' (নিরাকার) শেখানো যায়, এতে কোনো দোষ নেই। কিন্তু 'মূর্তি' (সাকার) দিয়ে 'ঈশ্বর' (নিরাকার) চেনা যাবে না !
​এটি একটি দ্বিচারিতা {আর্যসমাজ সাকার প্রতীককে (বর্ণ/শব্দ) ব্যবহার করে নিরাকার জ্ঞান অর্জন করছে, আবার সেই সাকার প্রতীকের উপযোগিতাকেই মূর্তির ক্ষেত্রে অস্বীকার করছে। অর্থাৎ, তাদের যুক্তিটি একটি বৃত্তে ঘুরছে- "প্রতীক দরকার জ্ঞান লাভের জন্য, কিন্তু প্রতীকের (মূর্তি) প্রয়োজন নেই ঈশ্বর লাভের জন্য।" অথচ ঈশ্বর লাভও তো একপ্রকার পরম জ্ঞান (ব্রহ্মজ্ঞান)। এই দ্বিমুখী অবস্থানই চক্রাশ্রয় দোষের নামান্তর}। যদি বর্ণমালার 'অ' চিহ্নটি নিরাকার অ-কারকে বোঝাতে সক্ষম হয়, তবে ত্রিশূলধারী শিবের 'মূর্তি' কেন পরমাত্মার আনন্দ বা সংহার শক্তিকে বোঝাতে সক্ষম হবে না ? তারা সাকার মাধ্যমকে (বর্ণ/শব্দ) স্বীকার করেও মূর্তিকে অস্বীকার করছে, অর্থাৎ শুল্ক ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করেও দিনশেষে সেই সাকার মাধ্যমের চৌকাঠেই (ঘট্টকুটি) এসে দাঁড়িয়েছে।
​আর্যসমাজ বলছে কল্পিত চিহ্ন ছাড়াও বিদ্যা হয়। কিন্তু বাস্তব হলো, প্রতীক বা চিহ্ন মানুষের মনোযোগকে 'একাগ্র' করে। ঈশ্বর নিরাকার ও সর্বব্যাপী হলেও, তাকে একটি মূর্তিতে সীমাবদ্ধ করে পূজা করলে সাধকের বিক্ষিপ্ত মন স্থির হয়। যেমন সূর্যের আলো সর্বত্র থাকলেও আতস কাঁচ ছাড়া তা আগুন জ্বালাতে পারে না, তেমনি সর্বব্যাপী ঈশ্বরকে অনুভব করতে মূর্তিরূপী 'লেন্স' বা 'আতস কাঁচ' অত্যন্ত কার্যকর।
আর্যসমাজ 'অন্ধ' ব্যক্তির উদাহরণ দিয়ে যা বোঝাতে চেয়েছে তা আসলে মূর্তিপূজারই পক্ষ নেয়। কারণ অন্ধও প্রতীকের (ব্রেইল/শব্দ) সাহায্য ছাড়া শিখতে পারে না। ঠিক তেমনি, আধ্যাত্মিক জগতের 'অন্ধ' বা সাধারণ মানুষ মূর্তিরূপী প্রতীকের সাহায্য ছাড়া নিরাকার ব্রহ্মের জ্ঞান লাভে সমর্থ হয় না।
——————————————————————————————————————————

প্রশ্ন —  আচ্ছা, যদি তাই হয়, সময় তো নিরাকার কেমন ? কিন্তু সময়েরও মূর্তি সাকার ঘড়ি রূপে তৈরী হয়েছে । আর আমরা নিরাকার সময়কে ঘড়ির মধ্যে সাকার রূপে দেখছি ।

আর্যসমাজের উত্তর —  ঘড়ি সময়ের মূর্তি নয় । ঘড়ি সূর্যের মূর্তি । সূর্যকে দেখে যেমন সময়ের জ্ঞান হয়, তেমনি ঘড়ি দেখে সময়ের জ্ঞান হয় । ঘড়ির যাবতীয় ক্রম সূর্যের উপর নির্ভর করে ।


✅ শৈবপক্ষ দ্বারা খণ্ডন — 

​আর্যসমাজ বলছেন, ঘড়ি সময়ের মূর্তি নয়, সূর্যের মূর্তি। কিন্তু প্রশ্ন হলো - ঘড়ি বা সূর্য ছাড়া কি সাধারণ মানুষ সময়ের সূক্ষ্ম বিভাগ (সেকেন্ড, মিনিট) অনুভব করতে পারে ? উত্তর হলো - সূর্য বা ঘড়ি হলো সময়ের 'ব্যঞ্জক' (Indicator)। নিরাকার সময়কে মাপার জন্য যেমন সাকার সূর্যের গতি বা ঘড়ির কাঁটা অপরিহার্য, তেমনি নিরাকার পরমাত্মার অনন্ত গুণাবলীকে মনের আয়ত্তে আনতে সাকার মূর্তিও অপরিহার্য। সূর্যকে যদি সময়ের 'প্রতীক' হিসেবে মেনে নেওয়া হয়, তবে মূর্তিকে ঈশ্বরের 'প্রতীক' হিসেবে অস্বীকার করা অর্ধজড়তীয়তা দোষ বা স্ববিরোধিতা।

——————————————————————————————————————————————————————

প্রশ্ন — নিরাকার ধ্যান যদি করতেই হয় তা করব কেমন করে ? যদি চোখের সামনে কোনো মূর্তি থাকে তবেই তো তার ধ্যান সম্ভব হয় । নিরাকারের ধ্যান করতে চোখ বন্ধ করলাম, আর কোনো কিছুই দেখতে পেলাম না - এ অবস্থায় মন বসবে কেমন কেরে?

আর্যসমাজের উত্তর —  শোনো, জগৎ দুই প্রকারের, আধ্যাত্মিক আর ভৌতিক। আধ্যাত্মিক জগৎ — অর্থাৎ আত্মা সম্বন্ধীয় বা আত্মা সম্পৰ্কীয় জগৎ। ভৌতিক জগৎ অর্থাৎ — পৃথিবী, জল, অগ্নি, বায়ু এবং আকাশ এই পঞ্চভূত সম্বন্ধীয় বা পঞ্চভূত সম্পৰ্কীয় জগৎ । মনে রাখতে হবে পরমাত্মা সম্পর্কীয় চিন্তন আধ্যাত্মিক জগতের সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত । যখন তুমি ধ্যান করতে বসেছ, তখন তোমার মাথার মধ্যে মূর্তির আকৃতি ঘুরে ফিরে বেড়াচ্ছে । এ অবস্থায়, আধাত্মিক অর্থাৎ পরমাত্মা সম্পর্কীয় চিন্তন হলো কী করে ? সে চিন্তন তো ভৌতিক অর্থাৎ পঞ্চভূত সম্পর্কীয় চিন্তন । কেননা, মূর্তি পঞ্চভূতের দ্বারা নির্মিত। আধ্যাত্মিক জ্ঞানলাভ তখনই সম্ভব যখন জগতের সমস্ত মূর্তিমান বস্তুর ভাবনা-চিন্তা ত্যাগ করে আত্মাতেই পরমাত্মার ব্যাপকতার অনুভব করতে পারবে । পরমাত্মায় এবং আত্মায় দেশকালের দূরত্ব বা ব্যবধান নেই আছে কেবল জ্ঞানের ব্যবধান । অজ্ঞানতার আবরণ দূর হলেই পরমাত্মার অনুভূতি হতে থাকবে।

বাকী রইল মন বসার কথা । মনকে বসালে সে বসে, না বসালে সে কেমন করে বসবে ? জগতে অভ্যাসের দ্বারাই সমস্ত কর্ম সিদ্ধ হয়। এমন অনেক মেয়ে মানুষ আছে, যারা মাথায় পর পর দুটো তিনটে কলস রেখে কোমরে ছেলে নিয়ে, পরস্পর গল্পগুজব করতে করতে উঁচু-নীচু পথের উপর দিয়ে চলে, সাধ্য কী যে মাথার কলসী থেকে এক ফোঁটা জল মাটিতে পড়ে ! পথে ঘাটে যারা বাঁশবাজীর খেলা দেখায়, তারা মাথার উপর পর-পর কয়েকটা কলস, আর দুই কাঁধে দু-দুটো ছেলে নিয়ে লম্বা বাঁশের উপর সর-সর করে উঠে যায় । সার্কাসে মেয়েরা তারের উপর সাইকেল চালায় এসব তো অভ্যাসের পরিণাম ।

রোগা-পটকা মানুষ ভোর চারটের সময় উঠে শীতের দিনে গঙ্গা বা যমুনায় স্নান করতে চলেছে, আর ঠিক সেই সময় মোটা মোটা, তাগড়া-তাগড়া মানুষ লেপের ভিতর থেকে মুখ বার করতে ভয় পায় কেনো? যারা ভোরে স্নান করার অভ্যাস করেছে, তাদের পক্ষে শীত-গ্রীষ্ম সবই সমান । এইভাবে যে ঈশ্বরের চিন্তন করার অভ্যাস করেছে, সে যম, নিয়ম সাধনা দ্বারা ঘন্টার পর ঘন্টা নদী, পাহাড়ে একান্ত স্থানে বসে বসে চিন্তন করতে সক্ষম। আর যারা সমাধিস্থ হয় তারা একই আসনে কয়েকদিন ধরে ধ্যান করতেই থাকে । তারা কি কোনো মূর্তির ধ্যান করে বলতে পারো ? একটুখানি গভীরভাবে চিন্তা করলে বুঝবে মূর্তিতে তো মনই বসে না কেননা, মন কখনও নাকের চিন্তন করবে, কখনও বা হাত পায়ের । মূর্তির সারা অঙ্গে মন ঘুরে বেড়াবে যখন মনের সামনে কোনো মূর্তি থাকবে না তখনই তার বৃত্তি সমূহ আত্মার অভিমুখে অগ্রসর হতে থাকবে।


✅ শৈবপক্ষ দ্বারা খণ্ডন —  

​আর্যসমাজ বলছে মূর্তি 'ভৌতিক' (পঞ্চভূত নির্মিত), তাই তা দিয়ে 'আধ্যাত্মিক' লাভ হয় না। যদি পঞ্চভূত নির্মিত মূর্তি ত্যাজ্য হয়, তবে পঞ্চভূত নির্মিত 'শরীর' দিয়ে ও পঞ্চভূত থেকে উৎপন্ন 'অন্ন' খেয়ে আধ্যাত্মিক সাধনা করা হয় কীভাবে ? শরীরও তো ভৌতিক। আর্যসমাজের যুক্তি অনুযায়ী, শরীর দিয়ে মন্ত্র জপ করাও তবে 'ভৌতিক' কাজ, আধ্যাত্মিক নয়! সনাতন ধর্ম বলে - ঈশ্বর সর্বব্যাপী। যদি তিনি সর্বব্যাপী হন, তবে তিনি এই পঞ্চভূতের মূর্তির মধ্যেও আছেন। মূর্তিকে 'জড়' ভাবাটাই অজ্ঞানতা, তাকে চিদানন্দময় সত্তার প্রকাশ হিসেবে দেখাই হলো প্রকৃত আধ্যাত্মিকতা।

​তারা সার্কাস বা কলসী কাঁধে মেয়েদের 'অভ্যাসের' উদাহরণ দিয়েছে। কিন্তু তারা একটি মূল বিষয় এড়িয়ে গেছে - সার্কাসের মেয়েটি প্রথম দিনেই দড়ির ওপর সাইকেল চালায়নি। প্রথমে সে মাটিতে ব্যালেন্স শিখেছে, তারপর ছোট উচ্চতায়, শেষে উঁচুতে। সাধারণ মানুষের মন হলো সেই শিক্ষানবিশ মেয়ের মতো। সরাসরি নিরাকার ব্রহ্মে (যা চরম লক্ষ্য) মন বসানো অসম্ভব। মূর্তিপূজা হলো সেই 'প্রশিক্ষণ সোপান'। মূর্তিতে মন স্থির করার অভ্যাস করলেই তবে ভবিষ্যতে নিরাকার ধ্যানের যোগ্যতা আসে। সিঁড়ি ছাড়া সরাসরি ছাদে ওঠার দাবি করা যেমন হাস্যকর, মূর্তি ছাড়া সরাসরি নিরাকার ধ্যানের দাবিও সাধারণের জন্য তেমন অবাস্তব।

​তারা বলছে মূর্তির হাত-পায়ে মন ঘুরে বেড়ায়, তাই একাগ্রতা হয় না। যোগসূত্রে বলা হয়েছে— "দেশবন্ধশ্চিত্তস্য ধারণা" (যোগদর্শন/বিভূতিপাদ/১) -একটি নির্দিষ্ট দেশে বা আধারে মনকে নিবদ্ধ করাই হলো ধারণা। মন যদি নিরাকার শূন্যে থাকে, তবে সে আরও বেশি দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু মূর্তিরূপী একটি সুনির্দিষ্ট 'আলম্বনে' থাকলে মনের বিক্ষিপ্ততা কমে আসে। মূর্তির চরণে বা মুখে মন নিবদ্ধ করা আসলে মনের 'বৃত্তিনিরোধ' করার একটি বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি।

​আর্যসমাজ বলছে - "মূর্তি ত্যাগ করে আত্মাতেই পরমাত্মাকে অনুভব করো।"

​প্রশ্ন হলো - এই 'অনুভব' করতে গেলে কি মনের মধ্যে পরমাত্মার কোনো 'ভাব' বা 'গুণ' (যেমন- আলোকস্বরূপ, দয়াময়) আনতে হয় না ?

এখন যখনই তারা 'আলোকস্বরূপ' বা 'সর্বব্যাপী' বলে ধ্যান করছে, তখনই তারা মনের ভেতরে একটি 'মানস-মূর্তি' তৈরি করে ফেলছে। অর্থাৎ, বাইরের পাথরের মূর্তিকে অস্বীকার করে তারা মনের ভেতরের কাল্পনিক মূর্তির আরাধনা করছে। তাহলে- বাইরের মূর্তিকে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে তারা মনের ভেতরের সূক্ষ্ম মূর্তির সেই 'ঘট্টকুটি' বা শুল্কশালাতেই এসে ধরা পড়ছে। সাকার ছাড়া নিরাকার চিন্তন অসম্ভব এটাই চরম সত্য।

তাহলে আর্যসমাজীদের কাছে একটি প্রশ্ন- ​"আপনারা যে 'যম-নিয়ম' পালন করে ধ্যানে বসেন, সেই ধ্যানের সময় মনকে কোন 'আলম্বনে' রাখেন? যদি বলেন 'নিরাকার', তবে সেই নিরাকারের ধারণাটিও তো একটি মানসিক 'আকার' মাত্র। সুতরাং মূর্তিকে অস্বীকার করা আসলে নিজের ছায়াকে অস্বীকার করার মতোই বৃথা চেষ্টা। আপনারা চক্রাশ্রয় দোষে দুষ্ট হয়ে সাকার মাধ্যমেই নিরাকারকে ধরতে চাইছেন, অথচ মাধ্যমটিকে ঘৃণা করছেন।"

——————————————————————————————————————————————————————

প্রশ্ন— ময়রার দোকান হতে চার আনার সন্দেশ কিনে আনলাম। সন্দেশ খেয়ে সত্যি খুবই আস্বাদ পেলাম । সন্দেশ সাকার, আর আস্বাদ নিরাকার। যদি ময়রাকে বলা যায় — আমার চার আনার নিরাকার আস্বাদ দাও তো । সে কেমন করে দেবে এ থেকে বুঝলাম যে, সাকার মূর্তি হতেই নিরাকার পরমাত্মার আস্বাদ বা আনন্দ পাওয়া সম্ভব ।

আর্যসমাজের উত্তর—  ভাইটি শোনো । যার যা গুণ, খেলে পরে তা জানা যাবেই । সন্দেশ খেলে সন্দেশের আস্বাদ পাওয়া যাবে, জিলিপী খেলে জিলিপীর আস্বাদ পাওয়া যাবে । সন্দেশ এবং আস্বাদে গুণ ও গুণীর সম্বন্ধ আছে, ব্যাপ্য ব্যাপকের নেই । সন্দেশ দ্রব্য, আস্বাদে গুণ ও গুণীর সম্বন্ধ আছে, ব্যাপ্য ব্যাপকের নেই। সন্দেশ দ্রব্য, আস্বাদ তার গুণ। কিন্তু মূর্তি এবং পরমাত্মা দু'জনেই যে দ্রব্য। সন্দেশ খেলে গুণ আস্বাদ, অনুভব করবে । কিন্তু মূর্তি দ্বারা পরমাত্মার আনন্দ কেমন করে অনুভব করলে বলো? কেননা, পরমাত্মা তো মূর্তির গুণ নয় । আর এক কথা, সন্দেশ খেলে সন্দেশের আস্বাদ পাওয়া যায়, কিন্তু যদি কেউ মাটির নকল সন্দেশ তৈরী করে খাওয়া আরম্ভ করে, তা হলে কি সন্দেশের আস্বাদ পাবে? কোনো মতেই নয় । ঠিক্ তেমনি, পরমাত্মার অনুভূতি হলেই পরমাত্মার আনন্দ লাভ করে, পরমাত্মার পরিবর্তে যদি কেউ মাটি বা পাথরের নকল পরমাত্মার মূর্তি তৈরী করে, তাহলে সে তাতে পরমাত্মার আনন্দ কেমন করে অনুভব করবে?


✅ শৈবপক্ষের খণ্ডন— 

​আর্যসমাজ বলছে ঈশ্বর মূর্তির 'গুণ' নন। কিন্তু সনাতন দর্শনে মূর্তিকে ঈশ্বরের গুণ হিসেবে দেখা হয় না, দেখা হয় 'আধার' বা 'অধিষ্ঠান' হিসেবে। বিদ্যুৎ (Electricity) নিরাকার এবং সাকার তার (Wire) বা বাল্ব (Bulb) একটি দ্রব্য। বাল্ব কি বিদ্যুতের গুণ ? না। কিন্তু বাল্ব বা তার ছাড়া কি বিদ্যুৎ নিজেকে প্রকাশ করতে পারে? পারে না। একইভাবে, পরমাত্মা মূর্তির গুণ নন, কিন্তু মূর্তি হলো সেই 'মাধ্যম' যার মাধ্যমে পরমাত্মার অনন্ত আনন্দ বা 'আস্বাদ' ভক্তের হৃদয়ে সঞ্চারিত হয়। মাধ্যমকে অস্বীকার করা মানে শক্তির প্রকাশকেই অস্বীকার করা।

​আর্যসমাজের সবচেয়ে দুর্বল যুক্তি হলো মূর্তিকে 'মাটির নকল সন্দেশ'-এর সাথে তুলনা করা। মাটির সন্দেশ কেউ আসল সন্দেশ ভেবে খায় না। কিন্তু ভক্ত যখন মূর্তিপূজা করেন, তিনি পাথরকে পাথর ভেবে পূজা করেন না। শাস্ত্রীয় 'প্রাণপ্রতিষ্ঠা' এবং ভক্তের 'ভাব'-এর মাধ্যমে সেই জড় বস্তুটি ঈশ্বরের জীবন্ত প্রতীকে রূপান্তরিত হয়। যেমন একটি কাগজের টুকরোতে রাষ্ট্রীয় সিল থাকলে তা মহামূল্যবান নোটে পরিণত হয়, অথচ সিল ছাড়া তা কেবল কাগজ, তেমনি শাস্ত্রীয় বিধি ও ভক্তির 'সিল' যখন মূর্তিতে পড়ে, তখন তা আর 'নকল' থাকে না, তা পরমাত্মার অনুভূতির কেন্দ্র হয়ে ওঠে। আর্যসমাজ এখানে 'ভাব'-এর শক্তিকে উপেক্ষা করে কেবল 'বস্তু'-র বিচার করছে।

​আর্যসমাজ বলছে এখানে ব্যাপ্য-ব্যাপক সম্বন্ধ নেই। কিন্তু ঈশ্বর যদি 'সর্বব্যাপী' হন (যা আর্যসমাজ মানে), তবে তিনি মূর্তির মধ্যেও ব্যাপ্ত আছেন। যদি ঈশ্বর মূর্তির মধ্যে না থাকেন, তবে তিনি 'সর্বব্যাপী' হতে পারেন না। আর যদি তিনি মূর্তির মধ্যে থাকেন, তবে সেই মূর্তিকে অবলম্বন করে তাকে অনুভব করা কেন ভুল হবে? অগ্নিকাষ্ঠের মধ্যে অগ্নি ব্যাপ্ত থাকে, কিন্তু কাঠ ঘর্ষণ করলেই তবে সেই অগ্নি প্রকাশিত হয়। মূর্তি হলো সেই 'ঘর্ষণ' বা মাধ্যম যা নিরাকার ঈশ্বরের আনন্দকে সাকার অনুভবে নিয়ে আসে।

​আর্যসমাজ আস্বাদকে কেবল দ্রব্যের গুণ বলছে। কিন্তু আস্বাদ বা আনন্দ আসলে 'ভোক্তার' চিত্তের বৃত্তি। একই সন্দেশ একজন শোকাতুর মানুষের কাছে বিস্বাদ লাগতে পারে। অর্থাৎ, আস্বাদ কেবল দ্রব্যে নেই, তা মনের অবস্থার ওপর নির্ভর করে। ঠিক তেমনি, যার মনে ভক্তি নেই তার কাছে মূর্তি কেবল পাথর (নকল সন্দেশ)। কিন্তু যার মনে সংস্কার ও প্রেম আছে, তার কাছে সেই মূর্তির মাধ্যমেই পরমাত্মার আনন্দ আস্বাদিত হয়।

​এখানে আর্যসমাজ পুনরায় চক্রাশ্রয় দোষে পতিত হচ্ছে- ​তারা বলছে 'পরমাত্মার অনুভূতি হলেই আনন্দ হয়'। প্রশ্ন হলো- সেই অনুভূতি হবে কিসের মাধ্যমে? তারা বলবে 'নাম জপ' বা 'ধ্যান' (যা শব্দ বা মানসিক আকার)। এখন শব্দ বা মানসিক আকারও তো এক প্রকার 'সাকার' মাধ্যম। তাহলে মূর্তিকে 'নকল সন্দেশ' বলে ব্যঙ্গ করে তারা কেন শব্দ বা নামকে 'আসল সন্দেশ' বলছে ?

আর্যসমাজের যুক্তিটি এমন যে — "জল খেলে তৃষ্ণা মেটে, কিন্তু গ্লাস দিয়ে জল খেলে তৃষ্ণা মেটে না কারণ গ্লাস জলের গুণ নয়।" এটি হাস্যকর। গ্লাস যেমন জল পান করার মাধ্যম, মূর্তিও তেমনি পরমাত্মার আনন্দ আস্বাদনের একটি দিব্য মাধ্যম। মাটির সন্দেশ আর পবিত্র বিগ্রহকে এক করে দেখা তাদের দার্শনিক স্থূলতার পরিচয় দেয়।

——————————————————————————————————————————

প্রশ্ন — মূর্তি থাকায়, যেমন — নোটের এবং টাকা পয়সার ব্যবহার সুখদায়ক তেমনি মূর্তির পূজাও সুখদায়ক ।

আর্যসমাজের উত্তর —  ◼️প্রথমতঃ — রাজা শরীরধারী, তাই তার মূর্তি ছাপ নোট এবং টাকা পয়সা তৈরী হতে পারে, কিন্তু পরমাত্মা যিনি নিরাকার তাঁর মূর্তি তৈরী হবে কেমন করে ?


✅ শৈবপক্ষের খণ্ডন — 

​আর্যসমাজ বলছে রাজার শরীর আছে বলে নোটে তার ছবি থাকে। কিন্তু বিচার করুন - আমরা যখন একটি ১০ টাকার নোট ব্যবহার করি, তখন কি আমরা রাজার 'শরীরকে' ব্যবহার করি? না। আমরা ব্যবহার করি রাজার 'শাসন ক্ষমতা' বা 'প্রতিশ্রুতি'। রাজার শাসন ক্ষমতা বা সার্বভৌমত্ব কি চোখে দেখা যায়? না, তা নিরাকার। কিন্তু সেই নিরাকার ক্ষমতাকে সাকার নোটে একটি প্রতীকের মাধ্যমে আবদ্ধ করা হয়েছে যাতে লেনদেন সহজ হয়। একইভাবে, পরমাত্মার নিরাকার শক্তিকে একটি সাকার মূর্তিতে স্থাপন করা হয় যাতে ভক্তের আধ্যাত্মিক লেনদেন বা উপাসনা সহজ হয়। প্রতীক সাকার হলেও তা যাঁর প্রতীক, তিনি নিরাকার হতেই পারেন।

​একটি নোট ছিঁড়ে ফেললে যেমন কেবল কাগজ নষ্ট হয় না, বরং রাষ্ট্রীয় অবমাননা হয়, তেমনি একটি মূর্তিকে আঘাত করা মানে কেবল পাথর ভাঙা নয়, বরং ভক্তের অন্তরের পরমাত্মাকে আঘাত করা। আর্যসমাজ যদি বলে রাজা সাকার তাই নোট চলে, তবে তাদের প্রতিজিজ্ঞাসা হলো- রাজা মারা যাওয়ার পরও (শরীর না থাকলেও) তার প্রচলিত মুদ্রা বা নোট কেন চলে? কারণ সেখানে শরীর মুখ্য নয়, 'স্বীকৃতি' মুখ্য। পরমাত্মা সর্বকাল বিদ্যমান, তাই তাঁর প্রতীক বা মূর্তি সর্বদাই কার্যকরী।

​আর্যসমাজ 'ওঁ' শব্দটিকে পরমাত্মার প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করে। 'ওঁ' কি পরমাত্মার শরীর? না। 'ওঁ' কি পরমাত্মার মতো নিরাকার? না, এটি একটি সাকার শব্দ বা ধ্বনি। যদি নিরাকার পরমাত্মাকে বোঝাতে সাকার 'ওঁ' শব্দ বা লিখিত চিহ্নের (Symbol) ব্যবহার সুখদায়ক ও গ্রহণযোগ্য হয়, তবে সাকার 'মূর্তি' কেন হবে না? তারা সাকার শব্দ মানছে কিন্তু সাকার রূপ মানছে না এটিই তাদের চক্রাশ্রয় দোষ।

​নোট নিজে সম্পদ নয়, তা সম্পদ পাওয়ার মাধ্যম। মূর্তিও নিজে ঈশ্বর নয়, তা ঈশ্বর অনুভবের মাধ্যম।
​ আর্যসমাজ মাধ্যমকে (নোট/মূর্তি) লক্ষ্য (ধন/ঈশ্বর) ভেবে ভুল করছে। তারা বলছে নিরাকারের মূর্তি হয় না। আর্যসমাজ দাবি করে ঈশ্বর নিরাকার, রূপহীন এবং গুণাতীত। কিন্তু তাদের যজ্ঞের দিকে তাকালে দেখা যায়- ​ঘৃত (ঘি), সমিধ (কাঠ), সামগ্ৰী: এগুলো সাকার, সগুণ (গন্ধ, রূপ, রস যুক্ত) এবং সম্পূর্ণ 'জড়' দ্রব্য। ​অগ্নি- অগ্নি একটি সাকার রূপ, যা চোখ দিয়ে দেখা যায় এবং হাত দিয়ে তাপ অনুভব করা যায়। ​যজ্ঞকুণ্ড- এটি একটি জ্যামিতিক সীমানায় আবদ্ধ সাকার আধার। যদি নিরাকারকে বুঝতে সাকার মূর্তির প্রয়োজন না থাকে, তবে যজ্ঞে সাকার আগুনের সামনে ঘৃতাহুতি দেওয়ার প্রয়োজন কী? যদি পরমাত্মা সর্বব্যাপী হন, তবে তিনি কি আগুনের বাইরে নেই? আগুন জ্বালিয়ে তাকে একটি নির্দিষ্ট স্থানে আহ্বান করার অর্থই হলো উপাসনার সুবিধার্থে তাকে একটি 'সাকার আধারে' কল্পনা করা। এটি মূর্তিপূজারই যাজ্ঞিক সংস্করণ।

আর্যসমাজ মূর্তিকে 'জড় পাথর' বলে প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু যজ্ঞের ঘি বা কাঠ কি জড় নয়? ঘি পুড়ে ছাই হয়ে যায়, কিন্তু সেই বাহ্যিক ক্রিয়ার মাধ্যমে তারা মনে করে পরমাত্মার প্রীতি হচ্ছে। একইভাবে, মূর্তিতে পুষ্প বা ধূপ অর্পণ করাও একটি ভক্তিপূর্ণ ক্রিয়া যার লক্ষ্য সেই এক পরমাত্মা। ​যদি ঘি (জড় দ্রব্য) দিয়ে নিরাকার ব্রহ্মের উপাসনা সম্ভব হয়, তবে প্রতিমা (জড় দ্রব্য) দিয়ে কেন সম্ভব হবে না? এখানে আর্যসমাজের ওপর 'অর্ধজরতী ন্যায়' বর্তায় তারা যজ্ঞের সাকারত্ব মেনে নিচ্ছে, কিন্তু মূর্তির সাকারত্বকে দোষ দিচ্ছে।

​আর্যসমাজ মূর্তিকে অস্বীকার করে পরমাত্মার নিরাকারত্বের শুল্ক ফাঁকি দিতে চায়। কিন্তু তারা যখনই 'ওঁ' বলছে, যখনই কোনো শাস্ত্রীয় মন্ত্র পড়ছে, তখনই তারা সেই সাকার শব্দ-প্রতীকের 'ঘট্টকুটি' বা শুল্কশালায় এসে ধরা পড়ছে। রাজার ছবি দেওয়া নোট ব্যবহার করে যেমন রাজাকে সম্মান জানানো হয়, তেমনি পরমাত্মার গুণবাচক মূর্তি পূজা করে পরমাত্মাকেই আরাধনা করা হয়।
​"রাজার শরীর থাক বা না থাক, নোটের মূল্য তার সিল বা প্রতীকের ওপর নির্ভর করে। ঠিক তেমনি, পরমাত্মা সাকার হোন বা নিরাকার, ভক্তের হৃদয়ে তাঁর উপস্থিতির জন্য মূর্তিরূপী 'সিল' বা 'প্রতীক' অত্যন্ত সুখদায়ক ও প্রয়োজনীয়। আপনারা রাজার ছবি দেওয়া নোট পকেটে রাখেন, কিন্তু ভগবানের ছবি বা মূর্তি দেখলে তাকে 'জড়' বলেন এটি আপনাদের চিন্তার দ্বিচারিতা।"

——————————————————————————————————————————————————————

◼️ দ্বিতীয়তঃ — নোট এবং টাকা পয়সা রাজার আদেশ, রাজকীয় ট্যাকশালে তৈরী বলে সুখদায়ক । কিন্তু যদি কোনো মানুষ রাজকীয় বিধি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নিজের ঘরে জাল মুদ্রা তৈরী করা আরম্ভ করে, তাহলে রাজা তাকে জেলখানা দর্শন করিয়ে ছাড়বে । সেইরূপ পারমাত্মাকে তৈরী করা এবং তার মূর্তি পূজা করা অনেক যোনিরূপ জেলখানা দর্শনের প্রয়াস ছাড়া কিছুই নয় জানবে ।


✅ শৈবপক্ষের খণ্ডন— 

​আর্যসমাজ বলছে জাল নোট বানালে জেল হয় কারণ তা রাজার আদেশ নয়। মূর্তিপূজা কি কোনো ভক্তের 'নিজের ঘরে বানানো' খেয়ালি নিয়ম? একদমই নয়। মূর্তিপূজা বা সাকার উপাসনা বেদ, আগম, পুরাণ এবং তন্ত্র শাস্ত্রের সুনির্দিষ্ট বিধানে প্রতিষ্ঠিত। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় ভগবান স্বয়ং বলেছেন— "যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাংস্তথৈব ভজাম্যহম্" - যে আমাকে যেভাবে ভজনা করে, আমি তাকে সেভাবেই কৃপা করি। যদি শাস্ত্র (ঈশ্বরের সংবিধান) মূর্তিপূজার অনুমতি দেয়, তবে তাকে 'জাল মুদ্রা' বলা শাস্ত্রেরই অবমাননা। আর্যসমাজ এখানে নিজের সংকীর্ণ ব্যাখ্যাকে 'রাজার আদেশ' বলে চালাচ্ছে, যা আসলে প্রকৃত শাস্ত্রীয় আদেশের পরিপন্থী।

​আর্যসমাজ যজ্ঞে যে সাকার অগ্নি, ঘি এবং কাঠ ব্যবহার করে, তা কি ঈশ্বর স্বয়ং আকাশ থেকে পাঠিয়েছেন? না, তা মানুষই সংগ্রহ করেছে এবং মানুষের হাতে গড়া কুণ্ডেই আহুতি দিচ্ছে। যদি মানুষের তৈরি মূর্তিতে পূজা করা 'জেলখানার পথ' হয়, তবে মানুষের তৈরি যজ্ঞকুণ্ডে ঘি ঢালাও তো একই যুক্তিতে অপরাধ হওয়া উচিত! যজ্ঞের উপাচারগুলোও তো সাকার এবং জড়। আর্যসমাজ যদি যজ্ঞকে 'বৈধ মুদ্রা' বলে, তবে একই শাস্ত্রীয় বিধিতে প্রতিষ্ঠিত মূর্তিপূজাকে 'জাল মুদ্রা' বলার কোনো নৈতিক বা যৌক্তিক অধিকার তাদের নেই। এটি তাদের 'অর্ধজরতী ন্যায়' এবং 'চক্রাশ্রয় দোষ'।

​জাল নোট বানানো হয় রাজাকে ঠকানোর জন্য বা ব্যক্তিগত লাভের জন্য। কিন্তু মূর্তিপূজা করা হয় ঈশ্বরকে পাওয়ার জন্য, সমর্পণের জন্য। ভক্তি কোনো জালিয়াতি নয়। যদি কোনো শিশু তার পিতাকে ভালোবেসে একটি মাটির পুতুল বানিয়ে বলে "এটি আমার বাবা", তবে বাবা কি তাকে জেলখানায় পাঠাবেন? নাকি তার সরল ভালোবাসা দেখে আনন্দিত হবেন? ঈশ্বর যদি দয়াময় ও সর্বজ্ঞ হন, তবে তিনি ভক্তের হৃদয়ের 'ভাব' দেখেন, বাহ্যিক মাধ্যমের 'জড়ত্ব' নয়। আর্যসমাজ এখানে ঈশ্বরকে একজন নিষ্ঠুর ও প্রতিহিংসাপরায়ণ বিচারক হিসেবে উপস্থাপন করছে, যা ঈশ্বরের স্বরূপের বিরোধী।

​আর্যসমাজ 'মূর্তি' নামক জেলখানা এড়াতে গিয়ে যজ্ঞের পথে হাঁটা দিল। কিন্তু যজ্ঞে গিয়েও তারা দেখছে- ​তাদের একটি নির্দিষ্ট সাকার মূর্তিতে (অগ্নি) আহুতি দিতে হচ্ছে। ​তাদের নির্দিষ্ট সাকার মন্ত্রের (শব্দ) ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ​অর্থাৎ, সাকার প্রতীককে 'জাল' বলে ত্যাগ করতে গিয়ে তারা আবারও সাকার প্রতীকের 'ঘট্টকুটি' বা শুল্কশালাতেই ধরা পড়ল। সাকার মাধ্যম ছাড়া উপাসনার কোনো 'বৈধ মুদ্রা' আর্যসমাজের কাছেও নেই।

​আর্যসমাজ বলছে মূর্তিপূজা পুনর্জন্ম বা জেলখানার কারণ। প্রহ্লাদ পাথরের স্তম্ভে ভগবানকে দেখেছিলেন এবং মুক্তি পেয়েছিলেন। ধ্রুব, বিদুর, শবরী সবাই সাকার রূপের আরাধনা করেই সিদ্ধি লাভ করেছেন। যদি মূর্তিপূজা জেলখানার কারণ হতো, তবে ভারতের হাজার হাজার ঋষি-মুনি-সন্ত যারা মূর্তিপূজা করেছেন, তারা কেউ মুক্ত হতেন না। আর্যসমাজের এই দাবি আসলে ভারতের সমগ্র আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যকেই অস্বীকার করার নামান্তর।

​"আপনারা মূর্তিকে জাল মুদ্রা বলছেন, কিন্তু আপনাদের যজ্ঞের ঘি আর কাঠ কি স্বর্গ থেকে ছাপানো হয়ে আসে? সেগুলোও তো মানুষের তৈরি সাকার উপাচার। যদি সাকার যজ্ঞের মাধ্যমে নিরাকারের উপাসনা বৈধ হয়, তবে সাকার মূর্তির মাধ্যমে নিরাকারের আরাধনা কেন অবৈধ হবে? আপনারা নিজেদের সুবিধামতো শাস্ত্রের অর্ধেক গ্রহণ করছেন আর অর্ধেক বর্জন করছেন এই 'অর্ধজড়তীয়তা দোষ'-ই আপনাদের যুক্তির প্রধান দুর্বলতা।"

——————————————————————————————————————————————————————

প্রশ্ন— মহাভারতে পড়েছি—একলব্য দ্রোণাচার্যের মূর্তি গড়ে শস্ত্র বিদ্যা শিক্ষা করেছিল ।

আর্যসমাজের উত্তর—  দ্রোণাচার্য সশরীর, মূর্তিমান ছিলেন, তাই একলব্য তাঁর মূর্তি নির্মাণ করেছিল । সে তো ঈশ্বরের স্থানে তাঁর পূজা করেনি । তাছাড়া—সেই মূর্তিটি একলব্যকে শাস্ত্র-বিদ্যা শিক্ষা দিয়েছিল একথা যদি সত্য হয়, তাহলে একলব্যের শস্ত্র সঞ্চলন অভ্যাস করার প্রয়োজন কী ছিল? মনে রেখো একলব্য সমস্ত শাস্ত্রবিদ্যা অভ্যাস দ্বারাই শিক্ষা করেছিল । শিক্ষার কথা দ্রোণাচার্য জানতেনই না। যখন তিনি জানতে পারলেন তখান তার পরিণাম একলব্যকে ভোগ করতে হয়েছিল তার বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ কেটে দিয়ে । কোনো কর্ম বা শিক্ষাদানের যোগ্যতা মূর্তিতে আসবে কোথা হতে? যদি মূর্তিতে শিক্ষাদানের যোগ্যতা থাকে তাহলে সকলের উচিত, ব্যাসের মূর্তি গড়ে তার কাছে বেদ পড়া।

একজন বেয়ারা কোনো ইংরাজের কাছে চাকরী করতে করতে ইংরেজী বলতে শিখে ফেলে । ময়রার কাছে চাকরী করতে করতে মানুষ মিষ্টি করতে শিখে ফেলে । আগুনের কাছে বসলে উষ্ণতা বোধ হবে । যার সঙ্গতি করা যাবে তার গুণ সঙ্গতিকারীর উপর প্রভাব বিস্তার করবে জড় মূর্তির সঙ্গতিতে জড়তা এলো, পিটনী খেলো, মন্দির ভাঙলো, দেশে ভয়াবহ পরাধীনতা ও দারিদ্র্য দেখা দিলো । জড়ের সঙ্গতিতে আত্মবিশ্বাস এবং কর্মশক্তিও হয়ে গেল ।

বাংলাদেশ অগ্নিবীর
সত্য প্রকাশে নির্ভীক সৈনিক


✅ শৈবপক্ষের খণ্ডন— 

​আর্যসমাজ বলছে একলব্য অভ্যাসের দ্বারা শিখেছে, মূর্তি তাকে শেখায়নি। একলব্য যখন দ্রোণাচার্যের কাছে প্রত্যাখ্যাত হলেন, তখন তাঁর সামনে দুটি পথ ছিল, হতাশা অথবা বিকল্প মাধ্যম। তিনি মূর্তিকে বেছে নিয়েছিলেন 'আলম্বন' হিসেবে। একলব্য কি কেবল মাটির ঢেলার সামনে ধনুর্বিদ্যা অভ্যাস করেছিলেন? না। তিনি সেই মূর্তিতে তাঁর গুরুর 'সাক্ষাৎ উপস্থিতি' অনুভব করেছিলেন। এই 'শ্রদ্ধা' এবং 'একাগ্রতা' ছাড়া কেবল যান্ত্রিক অভ্যাস কাউকে শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর করতে পারে না। মূর্তি এখানে একটি 'মনস্তাত্ত্বিক পাওয়ার হাউস' হিসেবে কাজ করেছে, যা একলব্যের আত্মবিশ্বাসকে পর্বতপ্রমাণ করেছিল। আর্যসমাজ এখানে 'অভ্যাস' এবং 'অনুপ্রেরণা'-এর সূক্ষ্ম পার্থক্য বুঝতে ভুল করেছে।

​তারা উপহাস করে বলেছে- ব্যাসের মূর্তি গড়ে বেদ পড়া উচিত। এটি একটি অত্যন্ত স্থূল যুক্তি। মূর্তিপূজক কখনও বলে না যে মূর্তির মুখ দিয়ে শব্দ বের হবে। মূর্তিপূজার মূল কথা হলো 'ভাব'। ব্যাসের মূর্তির সামনে বসলে একজন শিক্ষার্থীর মনে ব্যাসদেবের জ্ঞান ও তপস্যার প্রতি যে গভীর শ্রদ্ধা জাগবে, তা তাকে নিরাকার শূন্যে বসে পড়ার চেয়ে অনেক বেশি একাগ্রতা দান করবে। আর্যসমাজ কি যজ্ঞের আগুনের কাছে বসে সরাসরি বেদ শেখে? না। কিন্তু তারা আগুনের পবিত্রতাকে সামনে রেখে বেদ পাঠ করে। যদি আগুনের (সাকার) সান্নিধ্য বেদ পাঠে সহায়ক হয়, তবে ব্যাসদেবের মূর্তির (সাকার) সান্নিধ্য কেন হবে না? এটি তাদের সেই চক্রাশ্রয় দোষ।

​আর্যসমাজ দাবি করেছে মূর্তিপূজার কারণে দেশে দারিদ্র্য ও পরাধীনতা এসেছে। এটি একটি তাত্ত্বিক জালিয়াতি। ভারতবর্ষ যখন জ্ঞান-বিজ্ঞানে, গণিতে, স্থাপত্যে এবং ধন-সম্পদে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ছিল (স্বর্ণযুগ), তখনও এ দেশে মূর্তিপূজা ও মন্দির ছিল। আর্যভট্ট, বরাহমিহির, কালিদাস, তাঁরা কি কেউ মূর্তিপূজাবিরোধী ছিলেন? না। পরাধীনতা এসেছে রাজনৈতিক অনৈক্য ও সামরিক কৌশলের অভাবে, মূর্তিপূজার জন্য নয়। আক্রমণকারীরা যখন ভারতে এসেছিল, তাদের দেশগুলোতেও কি দারিদ্র্য বা সমস্যা ছিল না? আধুনিক যুগে অনেক নিরাকারবাদী দেশও দারিদ্র্যের শিকার। সুতরাং মূর্তিপূজাকে দারিদ্র্যের কারণ বলা আর 'বৃষ্টি হওয়ার জন্য ছাতা দায়ী' বলা সমান মূর্খতা।

​তারা বলছে জড় মূর্তির সঙ্গতিতে জড়তা আসে। মূর্তিপূজক জড় পাথরের সঙ্গতি করে না, সে পাথরের আড়ালে থাকা 'চৈতন্য পরমাত্মার' সঙ্গতি করে। একলব্য জড় মাটির সঙ্গতি করেননি, তিনি তাঁর বীর গুরুর তেজ ও বীরত্বের মানসিক সঙ্গতি করেছিলেন। আর্যসমাজ যজ্ঞে কাঠের (জড়) সঙ্গতি করে। তবে কি তাদের মধ্যে কাঠের মতো কাঠিন্য বা জড়তা আসা উচিত? আগুনে ঘি ঢাললে কি তারা আগুনের মতো দাহ্য হয়ে যান? নিশ্চয়ই নয়। উপাচার জড় হলেও লক্ষ্য তো সেই পরম চৈতন্য।

​আর্যসমাজ মূর্তিকে এড়িয়ে যেতে চায়, কিন্তু তারা নিজেরাও মহাপুরুষদের ছবি বা স্মৃতি রক্ষার কথা বলে। যদি মূর্তিতে জড়তা আসে, তবে মহাপুরুষদের ছবিতে কেন জড়তা আসবে না? আর্যসমাজ যদি বলে ছবি কেবল স্মৃতির জন্য, তবে মূর্তিপূজকের কাছেও মূর্তি হলো পরমেশ্বরের অনন্ত করুণার 'স্মৃতি ও প্রতীতি'-র আধার। তারা সাকার মাধ্যমকে 'স্মৃতি' বলে গ্রহণ করছে কিন্তু 'উপাসনা' বলে বর্জন করছে এটিই তাদের যুক্তির চক্রাশ্রয় এবং অর্ধজড়তীয়তা দোষ।

​"একলব্যের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দান তাঁর গুরুর প্রতি অটল ভক্তির প্রমাণ, যা মূর্তির মাধ্যমেই জাগ্রত হয়েছিল। আপনারা মূর্তিকে 'জড়' বলে গালি দিচ্ছেন, কিন্তু নিজেরা যজ্ঞের জড় অগ্নি ও কাষ্ঠে মগ্ন থাকেন। আপনারা পরাধীনতার দায় মূর্তির ওপর চাপাচ্ছেন, অথচ ভুলে যাচ্ছেন এই মূর্তিপূজক দেশই একসময় বিশ্বগুরু ছিল। আপনাদের যুক্তি আসলে 'কাকতালীয় ন্যায়'-এর মতো অর্থাৎ কাক বসলো আর তাল পড়লো, তাই আপনারা ভাবছেন কাকের জন্যই তাল পড়েছে। মূর্তিপূজা আত্মশক্তি হরণ করে না, বরং একলব্যের মতো আত্মশক্তিকে চরম শিখরে নিয়ে যায়।"

​”ঘৃতকাঠিন্য ন্যায়” অনুযায়ী- সাধারণ অবস্থায় ঘি (ঘৃত) তরল থাকে। কিন্তু শীতকালে বা ঠান্ডার সংস্পর্শে সেই একই তরল ঘি কঠিন আকার ধারণ করে। ঘি কঠিন হয়ে গেলেও তা কিন্তু অন্য কোনো বস্তু হয়ে যায় না, তার গুণ বা ধর্ম (শক্তি) একই থাকে। কেবল অবস্থার পরিবর্তনের কারণে তা 'সাকার' বা দৃষ্টিগোচর হয়।

​আর্যসমাজ বলছে ঈশ্বর নিরাকার, তাই তাঁর সাকার মূর্তি হওয়া অসম্ভব বা দোষের। ঘৃতকাঠিন্য ন্যায় অনুযায়ী- ঈশ্বর মূলত নিরাকার ও সর্বব্যাপী (যেমন তরল ঘি)। কিন্তু ভক্তের হৃদয়ের ভক্তি ও প্রেমের 'শীতলতায়' (গাঢ়তায়) সেই নিরাকার পরমাত্মাই সাকার বিগ্রহ বা মূর্তিতে ঘনীভূত হন। কঠিন ঘি যেমন ঘি-ই থাকে, তেমনি সাকার মূর্তিও আসলে সেই নিরাকার ব্রহ্মেরই একটি রূপ। মূর্তি পাথর নয়, বরং 'ঘনীভূত ঈশ্বর'।

​আর্যসমাজ দাবি করেছিল মূর্তির সঙ্গতিতে 'জড়তা' আসে। এখন কঠিন ঘি দেখে কি কেউ বলে যে এটি জড় পাথর? না। সবাই জানে আগুনের তাপে এটি আবার তরল হবে। ঠিক তেমনি, মূর্তিরূপী কঠিন আধারে যে পরমাত্মা আছেন, সাধকের জ্ঞানের তাপে তিনি আবার নিরাকার অনুভবে লীন হন। সুতরাং মূর্তিপূজা জড়তা নয়, বরং নিরাকারকে হৃদয়ে ধরার একটি 'ঘন মাধ্যম'।

আর্যসমাজের প্রতি জিজ্ঞাসা- ​"আপনারা যজ্ঞে যে ঘি ব্যবহার করেন, তা যদি শীতকালে জমে কঠিন হয়ে যায়, তবে কি তার ঘি-ত্ব নষ্ট হয়ে যায়? নিশ্চয়ই না। তাহলে সর্বব্যাপী ঈশ্বর যদি ভক্তের প্রয়োজনে মূর্তিতে সাকার রূপ ধারণ করেন, তবে তাঁর ঈশ্বরত্ব নষ্ট হবে কেন? আপনারা কঠিন ঘি দিয়ে যজ্ঞ করতে পারলে আমরা কঠিন (সাকার) মূর্তিতে ভগবানের পূজা করতে পারব না কেন?"

​আর্যসমাজ নিরাকারবাদের পথ ধরে হাঁটলেও শেষ পর্যন্ত তাদের সেই 'ঘৃতকাঠিন্য'-এর কাছেই হার মানতে হয়। কারণ- ​তারা 'ওঁ' শব্দ বা যজ্ঞের আগুনের আশ্রয় নেয়, এগুলোও তো ব্রহ্মের এক প্রকার 'ঘনীভূত' বা সাকার প্রকাশ। ​নিরাকারকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তারা যখনই কোনো গুণের (যেমন- ন্যায়কারী, দয়ালু) আশ্রয় নেয়, তখনই তারা ব্রহ্মকে একটি মানসিক ছাঁচে বা 'আকারে' বন্দী করে ফেলে। এটিই তাদের চক্রাশ্রয় দোষ।

​"আর্যসমাজের যুক্তি হলো- ঘি কেবল তরল অবস্থাতেই ঘি, কঠিন হলে তা জড় পাথর। কিন্তু ঘৃতকাঠিন্য ন্যায় অনুযায়ী- রূপভেদ হলেও তত্ত্বভেদ হয় না। ঈশ্বর নিরাকার হয়েও ভক্তের প্রেমে সাকার মূর্তিতে ধরা দেন। আর্যসমাজের কেবল নিরাকারবাদ আসলে ভক্তির সেই শীতলতা বা গভীরতাকে অস্বীকার করার একটি ব্যর্থ চেষ্টা মাত্র।"

— সুতরাং আর্যসমাজের আরও একটি হাস্যকর দাবী খণ্ডিত হলো।

——————————————————————————————————————————————————————

🔴 উক্ত আর্যসমাজের এরূপ হাস্যকর দাবীর উপর কয়েকটি প্রশ্ন উঠে আসে —

​প্রশ্ন: — যজ্ঞের অগ্নি (সাকার রূপ), ঘৃত (রস), সমিধ বা কাঠ (স্পর্শ/জড় দ্রব্য) এবং মন্ত্র (শব্দ) এই প্রতিটিই কি পঞ্চভূতের অন্তর্গত জড় বস্তু নয়? যদি জড় অগ্নিতে ঘি ঢেলে নিরাকার ব্রহ্মের তৃপ্তি বা প্রসন্নতা সম্ভব হয়, তবে জড় মূর্তিতে পুষ্প বা নৈবেদ্য অর্পণ করলে তা পরমাত্মায় পৌঁছাবে না কেন?

​আপনারা বলছেন মূর্তিতে 'রূপ-রস-গন্ধ' আছে বলে মন চঞ্চল হয়। তবে যজ্ঞের আগুনের রূপ, ঘিয়ের গন্ধ এবং মন্ত্রের শব্দ কি মনকে চঞ্চল করে না? যদি যজ্ঞের সাকারত্ব আধ্যাত্মিক হয়, তবে মূর্তির সাকারত্ব কেন 'জড় পূজা' হবে?

​প্রশ্ন: — পাণিনি বা কাশিকা কোথাও বলেননি যে 'পূজা' মানে কেবল জড় বস্তুর রক্ষণাবেক্ষণ। কাশিকা বৃত্তিতে 'চিতি স্মৃত্যাম্' (চিন্তা) এবং 'পূজ পূজায়াম্'-কে একই সারিতে রাখা হয়েছে। যদি 'চিন্তা' একটি চেতন মানসিক ক্রিয়া হয়, তবে ব্যাকরণ অনুযায়ী 'পূজা' কেন কেবল 'জড় পরিষ্কার করা' হবে? আপনারা কি পাণিনীয় ব্যাকরণের এই আধ্যাত্মিক অর্থকে অস্বীকার করে 'পেট পূজা'র মতো লৌকিক উপহাস দিয়ে শাস্ত্রকে খাটো করছেন না?

​প্রশ্ন: — 'ওঁ' শব্দটিও তো একটি 'ধ্বনি' বা খাতায় লিখলে একটি 'চিহ্ন'। শব্দ কি নিরাকার? না, শব্দ আকাশের গুণ এবং তা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য। যদি একটি 'শব্দ-প্রতীক' নিরাকার ব্রহ্মকে হৃদয়ে আনতে সাহায্য করতে পারে, তবে একটি 'রূপ-প্রতীক' (বিগ্রহ) কেন পারবে না? কান দিয়ে যা গ্রহণ করা যায় তা যদি পবিত্র হয়, তবে চোখ দিয়ে যা গ্রহণ করা যায় (মূর্তি) তা কেন 'মেকি' বা 'জড়' হবে?

​প্রশ্ন: — মন কি কোনো গুণ বা আলম্বন ছাড়া এক মুহূর্ত স্থির থাকতে পারে? আপনারা যখন বলেন ঈশ্বর 'দয়ালু', 'ন্যায়কারী' বা 'সর্বব্যাপী', তখন কি মনের মধ্যে দয়া বা ব্যাপকতার একটি 'মানসিক চিত্র' তৈরি হয় না? যদি মানসিক চিত্র দোষের না হয়, তবে সেই চিত্রটিকেই পাথরে খোদাই করলে তা কেন 'জেলখানার পথ' হবে? আপনারা বাইরের মূর্তিকে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে মনের ভেতরের 'কাল্পনিক মূর্তির' সেই ঘট্টকুটি (শুল্কশালা)-তেই কি বারবার ফিরে আসছেন না?

​প্রশ্ন: — ঈশ্বর যদি মূর্তির ভেতরেও থাকেন, তবে মূর্তিকে কেন্দ্র করে তাঁকে ডাকলে তিনি শুনবেন না কেন? আপনারা বলছেন মূর্তিতে 'জীবাত্মা' নেই বলে মিলন হয় না। জীবাত্মা কি কেবল শরীরের ছাঁচে বন্দী? উপাসনার সময় সাধকের চেতনা যখন মূর্তিতে নিবদ্ধ হয়, তখন সেই সংযোগ কি ঈশ্বরীয় ব্যাপ্তির বাইরে? যদি ঈশ্বর বিষে বা সাপে থেকেও ত্যাজ্য হন, তবে তিনি কি মূর্তিতে থেকে 'পূজ্য' হতে পারেন না? সাপের কামড়ানোর স্বভাব আছে, কিন্তু মূর্তির স্বভাব তো কেবল শান্তি ও ভক্তি জাগানো। ক্ষতিকর জড় আর পবিত্র জড়কে এক করা কি 'কাকতালীয় ন্যায়' নয়?

​প্রশ্ন: — যদি মূর্তিতে কোনো শক্তি বা গুণ না-ই থাকে, তবে একলব্য কি কেবল 'মাটির ঢেলার' সামনে অভ্যাস করে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ধনুর্ধর হয়েছিলেন? মাটির ঢেলার প্রতি তাঁর যে 'নিশ্চল শ্রদ্ধা', সেই শ্রদ্ধাই কি তাঁর ভেতরের সুপ্ত ব্রহ্মশক্তিকে জাগ্রত করেনি? যদি মূর্তি একটি 'পাওয়ার হাউস' বা 'অনুঘটক' হিসেবে কাজ করতে পারে, তবে তাকে 'ফলহীন' বলা কি সত্যের অপলাপ নয়?
​"আপনারা মূর্তিকে 'জাল নোট' বলেন। কিন্তু আপনাদের যজ্ঞের ঘি, কাঠ আর তিল কি স্বয়ং ঈশ্বর ট্যাকশালে ছাপিয়ে পাঠিয়েছেন? সেগুলোও তো মানুষের সংগ্রহ করা জড় বস্তু। যদি সাকার যজ্ঞের মাধ্যমে নিরাকারকে পাওয়া 'বৈধ মুদ্রা' হয়, তবে সাকার মূর্তির মাধ্যমে নিরাকারকে পাওয়া কেন 'জালিয়াতি' হবে? আসলে আপনারা 'অর্ধজড়তীয়তা দোষ' দিয়ে নিজের সুবিধামতো শাস্ত্র ব্যাখ্যা করছেন, যেখানে ভক্তির কোনো স্থান নেই।"


🙏 সর্বে হ্যেষ রুদ্রস্তস্মৈ রুদ্রায় নমো অস্তু 🙏

নমঃ শিবায় 🙏
নমঃ শিবায়ৈ 🙏
শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তে ✊🚩

✍️ অপপ্রচার দমনে — অন্তিক ভট্টাচার্য্য (শম্বরনাথ শৈব)।

🌻 বিশেষ কৃতজ্ঞতা — আমার গুরু শ্রীনন্দীনাথ শৈবাচার্য ও আমার আদর্শ শ্রীমান রোহিত কুমার চৌধুরী শৈবজী। 

📢 কপিরাইট ও প্রচারে — Shivalaya…

বি: দ্র: লেখাটি কপি করলে সম্পূর্ণ করবেন, কোনো রকম কাটছাট গ্রহণযোগ্য নয়। 







শিবঃ ওঁ……….🙏

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ