শরভ মন্ত্রের কাছে নৃসিংহমন্ত্র পরাজিত
🔥 শরভ মন্ত্রের কাছে নৃসিংহমন্ত্র পরাজিত — শৈবদের সিদ্ধান্তকে সত্য প্রমাণ করলেন বৈষ্ণবদের প্রিয় নারদ পুরাণ 🔥
🟪 নারদ পুরাণ বলছে —
“নৃসিংহের তন্ত্র-মন্ত্রের প্রভাব থেকে নিজেকে
রক্ষার জন্যে সর্বদা শরভ মন্ত্রের পাঠ করা উচিত।”
[নারদীয় পুরান / পূর্বভাগ / চতুর্থপাদ / অধ্যায় ৭১ / ১১২-১১৩ শ্লোক ]
🔥 ব্যাখ্যা : কোনো ব্যক্তি যদি নৃসিংহের মন্ত্র দ্বারা কারোর উপর অভিচারাদি (ক্ষতি করবার উদ্দেশ্যে) ক্রিয়া করে (মারণ, উচ্চাটন, বশীকরণ ইত্যাদি) প্রয়োগ করে অন্য কোনো ব্যক্তির ক্ষতি করতে চেষ্টা করে তবে সেই নৃসিংহের মন্ত্র দ্বারা প্রয়োগকে বিফল করবার জন্য শরভেশ্বর মন্ত্রের আশ্রয় নিতে বলেছে স্বয়ং বৈষ্ণবদের প্রিয় সাত্ত্বিক নারদপুরাণ, এখানেও শরভ মন্ত্রের কাছে নৃসিংহ পরাজিত, এতেই প্রমাণিত হয় যে, নৃসিংহ বধ হয়েছিল শরভের হাতেই, যা বৈষ্ণবদের শাস্ত্রসম্মত।
🤔 বিচার করুন :
শরভেশ্বরের কাছে নৃসিংহ পরাজিত তথা বধ হয়েছিলেন - এই শাস্ত্র সম্মত কাহিনী বেশিরভাগ বৈষ্ণবগণ কখনোই মানতেই চান না। তাদের ভক্তি এতটাই অন্ধ যে, শাস্ত্রে উল্লেখিত কাহিনীকেও অস্বীকার করবার মতো ধৃষ্টতা তারা দেখাতে থাকেন। কোনো কোনো বৈষ্ণব ব্যক্তি তো নিজেদের আরাধ্যের এমন অহংকার চূর্ণবিচূর্ণ হবার এই পরাজয়কে নিজেদের বৈষ্ণবসম্প্রদায়ের পরাজয়ের গ্লানি ভেবে নিয়ে এই গ্লানি থেকে মুক্ত হবার জন্য “গাণ্ডাভেরুণ্ড” নামক এক কাল্পনিক চরিত্রকে আমদানি করেন এবং দাবী করেন যে ঐ নৃসিংহ আরো ক্রুদ্ধ হয়ে গাণ্ডাভেরুণ্ড রূপ ধারণ করে শরভকে বধ করে। হ্যা ! এমনই কাল্পনিক কাহিনী রচনা করে, ছবি তৈরী করে প্রচার করেন বৈষ্ণব গণ। এমনকি এই কাহিনীকে বৈধতা দিতে নব্য নৃসিংহ তন্ত্রও রচনা করে তার ভিত্তিতে এসব অবাস্তব বেদ বিরুদ্ধ কাহিনী প্রচার করতে থাকেন।
♦️ অথর্ববেদের অন্তর্গত ১০৮ উপনিষদের মধ্যে উপলব্ধ শরভ উপনিষদও তো শ্রুতিবচন।
শরভ উপনিষদে বলা হয়েছে 👇
যো ঘোরং বেষমাস্থায শরভাখ্যং মহেশ্বরঃ ।
নৃসিংহং লোকহন্তারং সংজঘান মহাবলঃ ॥ ৪
[অথর্ববেদ/শরভ উপনিষদ/৪নং শ্লোক]
✅ অর্থ – সেই মহাবলবান মহেশ্বর শরভের রূপ ধারণ করে নৃসিংহের প্রাণ হনন করেন ॥ ৪
[লক্ষ্য করুন : শরভ অবতার নৃসিংহকে বধ করেছেন তা ‘হন্তা’ শব্দে স্পষ্টভাবে উল্লেখ হয়েছে বেদে]
➡️ পরবর্তী মন্ত্রে দেখুন —
হরিং হরন্তং পাদাভ্যামনুযান্তি সুরেশ্বরাঃ ।
মাবধীঃ পুরুষং বিষ্ণুং বিক্রমস্ব মহানসি ॥ ৫ ॥
[অথর্ববেদ/শরভ উপনিষদ/৫নং শ্লোক]
✅ অর্থ – সর্বেশ্বর ভগবান রুদ্র যখন শ্রী বিষ্ণুর পা এর অংশ ধরে হরণ করলেন, সেই সময় সমস্ত দেবতাগণ পরমেশ্বর শিবের কাছে প্রার্থনা করে বললেন, হে পুরুষোত্তম প্রভু! আপনি বিষ্ণুর উপর দয়া করুন, ওনাকে বধ করবেন না, আপনার জয় হোক।
[লক্ষ্য করুন : বিষ্ণুর নৃসিংহ অবতারের পায়ের অংশ ধরে হরণ করে উল্টো করে শরভেশ্বর ঝুলিয়ে রেখেছিলেন, তা ‘হরি হরন্তং পাদাভ্যাম্’ শব্দে তা প্রমাণিত]
➡️ এবার পরবর্তী মন্ত্রে দেখুন —
কৃপমা ভগবান্বিষ্ণুং বিদদার নখৈঃ খরৈঃ ।
চর্মান্বরো মহাবীরো বীরভদ্রো বভূব হ ॥ ৬ ॥
[অথর্ববেদ/শরভ উপনিষদ/৬নং শ্লোক]
✅ অর্থ - তখন নিজের তেজোময় নখের দ্বারা নৃসিংহরূপী বিষ্ণুদেবকে ভগবান রুদ্র বিদীর্ণ করে দিলেন, তখন সেই নৃসিংহের চর্ম ধারণকারী সেই মহাবীর রুদ্র বীরভদ্র নামে বিখ্যাত হলেন।
[লক্ষ্য করুন : এখানে বলা হয়েছে - শরভেশ্বর নিজের নখের দ্বারা নৃসিংহরূপে থাকা বিষ্ণুকে চিরে দিলেন, ‘বিদদার নখৈঃ’ শব্দে প্রমাণিত। আর সেই চিরে দেওয়া চামড়া মহাবীর বীরভদ্র বস্ত্র হিসেবে ধারণ করেন, তা ‘চর্মান্বরো মহাবীরো বীরভদ্রো’ শব্দে প্রমাণিত।]
সুতরাং বেদের বচন অনুসারে শরভের হাতে নৃসিংহ বধ হয়ে এখানেই কাহিনী সমাপ্ত হয়েছে। এর পরবর্তীতে রচিত কোনো কাহিনীর উল্লেখ বেদে নেই, তাই শরভ দ্বারা নৃসিংহের বধ হওয়া কাহিনীটিই বেদসম্মত, এর বাইরে যে সব বেদবিরুদ্ধ গাণ্ডাভেরুণ্ড-র কাহিনী বা সিদ্ধান্ত রয়েছে তা সব অগ্রহণযোগ্য, এসব মান্য নয়।
কারণ বেদের শ্রুতি বচন সকল পুরাণ ও স্মৃতির ঊর্ধ্বে, যেখানে বেদ নিজে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে শরভের হাতেই নৃসিংহ বধ হয়েছেন, সেখানে অবার্চিন কাহিনী রচনা করা অধর্মের লক্ষণ মাত্র।
🔸 স্মৃতিশাস্ত্র ব্যাস সংহিতায় স্বয়ং বেদব্যাস বলছেন —
শ্রুতি স্মৃতি পুরাণানাং বিরোধো যত্র দৃশ্যতে ।
তত্র শ্রৌতং প্রমাণস্তু তয়োর্দ্বৈধে স্মৃতিব্বরা ॥
[ব্যাস সংহিতা/১ম অধ্যায়/৪নং শ্লোক]
✅ অর্থ : যেখানে শ্রুতি, স্মৃতি ও পুরাণের বিরোধ দেখা যায়, সেখানে শ্রুতির কথনই বলবান এবং যেস্থলে স্মৃতি ও পুরাণের বিরোধ দেখা যায়, সেখানে স্মৃতির কথনই বলবান।
অর্থাৎ যা বেদে উল্লেখিত হয়েছে, সেই প্রসঙ্গের সহিত পৌরাণিক বা তান্ত্রিক প্রসঙ্গের মিল থাকবে, সেইটুকু অংশই মান্য, বাকি অন্য প্রসঙ্গগুলি নয়। শ্রুতিবচনই সবচেয়ে বলবান অর্থাৎ গ্রহণযোগ্য প্রমাণ।
আর সেখানে স্বয়ং বৈষ্ণবদেরই প্রান প্রিয় নারদ পুরাণ বলছে যে, শরভ মন্ত্র দ্বারা নৃসিংহ মন্ত্রের কু-প্রভাব থেকে মুক্তি দেয়।
______________________________________________
নৃসিংহের নামে ইসকনীদের প্রচারিত চলচ্চিত্র দেখে আবেগী হয়ে পড়া ব্যক্তিদের হয়তো শাস্ত্রের মধ্যে থাকা প্রকৃত সিদ্ধান্ত হজম হবে না। তাদের জন্য সমবেদনা রইল। কিন্তু যা সত্য তাই শাস্ত্রে বলা থাকবে এটিই ধর্ম। যারা টিভি সিরিয়াল রিলস শর্টস চলচ্চিত্র তৈরী করেন তারা নিজেদের ভাবনা অনুযায়ী সেইসব তৈরি করেন, তা দেখা মাত্রই সত্য ভেবে আবেগে ভেপে যাওয়াটা বুদ্ধিমত্তার পরিচয় নয়। বরং তাদের দেখানো কাহিনী বা তথ্যগুলি শাস্ত্রসম্মত কি না সেটিও পর্যালোচনা করে তারপর যা সত্য তা গ্রহণ করা উচিত।
আর সেই সত্যই হল - বৈষ্ণবদের পুরাণেই নৃসিংহ মন্ত্রের পরাজয় ঘটে শরভেশ্বরের মন্ত্রের কাছে। কারণ শরভের কাছে নৃসিংহ নিজেই পরাজিত। আর যেখানে মন্ত্রের কর্তা নৃসিংহ নিজেই দূর্বল , সেখানে শরভেশ্বরের মন্ত্রের সমক্ষে দূর্বল নৃসিংহের মন্ত্র কিভাবে শক্তিশালী হতে পারে ?
আমরা যা বলছি তা শাস্ত্র থেকে বলছি। আর এর মাধ্যমে এটাই বলতে চাইছি তে, একমাত্র পরমেশ্বর শিব অদ্বিতীয়, তার সমকক্ষ অন্য কেউ নয়, সকলেই তার রূপ, শিব অন্য কারোর রূপ নন। তাই সাক্ষাৎ শিবের কল্যাণময় শক্তির কাছে তারই অন্যরূপ বিষ্ণুর গৌণশক্তি কখনোই সামর্থ্যবান নন - একথা বৈষ্ণব পুরাণেরই।
তত্ত্ব ব্যাখ্যা করাকে ভেদাভেদ বা নিন্দা বলে চিহ্নিত করা যায় না।
ভেদাভেদ বা নিন্দা তাকে বলে যখন কেউ বিষ্ণুর পূজাকে নিষিদ্ধ বলে, বিষ্ণুকে বিদ্বেষ করে।
ন্যায়ের জন্য যেমন আদালতে বিচার হয়, তেমনই পরমতত্ত্ব কে তা নির্ণয়ের জন্য বিচার করতে হয়। জন্মদাত্রী মাতা কে ছেড়ে অন্য কোনো নারীকে জন্মদাত্রী মাতা বলা যেমন অজ্ঞতা তেমনই পরমতত্ত্বকে বিচার করবার জন্য বিষ্ণু ও শিবের লক্ষণ ও বৈশিষ্ট বিচার করাকে নিন্দা/ভেদাভেদ তকমা দেওয়াও অজ্ঞতাই বটে।
যাদের এবিষয়ে অভিযোগ থাকবে তারা কমেন্টে পাণ্ডিত্যের প্রকাশ না করে, সভ্যতা ভদ্রতা বজায় রেখে এই Shivalaya পেজে সরাসরি লাইভ আলোচনায় আসবেন, সরাসরি আপনার কথার মাধ্যমে প্রশ্ন করবেন, আমাদের শৈবপরম্পরার শিবালয় প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে শাস্ত্র ও যুক্তিসম্মত উত্তর শুনবেন।
তারপর নিজে বিচার করবেন, যা সত্য বলে প্রমাণ হবে তা গ্রহণ করবেন।
__________________________________________
যাদের মস্তিকে বুদ্ধির অস্তিত্ব রয়েছে, তারা বিচার বিবেচনা করে সত্যকে সত্য বলেই গ্রহণ করবেন। আরা যারা সত্য থেকে পালিয়ে গিয়ে নিজের দাম্ভিকতাতেই সত্য ভাবেন তারা এই দাম্ভিকতা নিজের ঘরে বসে দেখাতে পারবেন, জনসমক্ষে যুক্তি উপস্থাপন হলে সেখানে তার বিরুদ্ধে বলবার ক্ষমতা দেখাতে তারা চিরকাল অক্ষম। কারণ তারা ভালো করেই জানেন যে, প্রমাণ ও যুক্তি সর্বোপরি। অজ্ঞানতা আর অযৌক্তিকতা বেশি দিন স্থায়ী হয় না।
🔥 অন্তিমে বলছি, পরমেশ্বর শিবের শক্তির চেয়ে শক্তিশালী আর কেউই নেই, একথাও বেদেরই, প্রমাণ —
অর্হন্ বিভৰ্ষি সায়কানি ধন্বার্হন্ নিষ্কং যজতং বিশ্বরূপম্ ।
অর্হন্নিদং দয়সে বিশ্বমভ্বং ন বা ওজীয়ো রুদ্র ত্বদস্তি ॥ ১০ ॥
[ঋগ্বেদ/শাকল শাখা/২য় মণ্ডল/৩৩ নং সূক্ত/১০নং মন্ত্র]
✅ অর্থ – হে রুদ্রদেব (শিব) ! আপনি বাণ ও ধনুক ধারণ করে থাকেন, হে পূজনীয় প্রভু ! আপনিই বহুরূপে একমাত্র বিশ্বরূপধারী। আপনিই সমস্ত বিশ্বভুবনের রক্ষাকর্তা, আপনার চেয়ে অধিক বলবান কেহই নেই ॥ ১০
__________________________________________
🚩 তথ্য সংগ্রহ ও লেখনীতে : শিবালয় প্রতিষ্ঠাতা শিবদ্বারাধীশাধ্যক্ষ আচার্যপরমাধিকারী শ্রীগুরু নন্দীনাথ শৈব আচার্যদেব 🚩
©️ কপিরাইট ও প্রচারে : Shivalaya 🔥
জয় বাবা শরভেশ্বরের জয় 🔥
শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্ 🚩
ॐ নমঃ পার্বতীপতয়ে হর হর মহাদেব 🚩
#হিন্দুধর্ম #সনাতনধর্ম #শিবালয় #shiva #শিব #পরমেশ্বরশিব #ভগবান #পরমেশ্বরভগবানশিব #Shivalaya #sanatandharma #mahadev #shankar #শৈবধর্ম #শরভ #শরভেশ্বর #শরভঅবতার #Barasat


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন