মধ্বাচার্যের ব্রহ্ম বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের গুরুপরম্পরাহীনতার প্রমাণ (শৈবপক্ষ দ্বারা)

🚫 মধ্বাচার্যের ব্রহ্ম বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের গুরুপরম্পরাহীনতার প্রমাণ (শৈবপক্ষ দ্বারা)
______________________________________________
॥ ॐ নমঃ শিবায় ॥
🔰 ভূমিকা —
বর্তমান সময়ে শাস্ত্রজ্ঞানহীন মানুষেরা শৈব গুরুপরম্পরাকে সনাতন ধর্মের একমাত্র প্রাচীন ও প্রধান পরম্পরা বলে স্বীকার করতে চায় না। কারণ, তাদের বক্তব্য হল - সনাতন ধর্মের বৈষ্ণব, শৈব, শাক্ত, গাণপত্য ব্রাহ্ম(নিরপেক্ষ ব্রহ্মবাদী) ইত্যাদি পরম্পরার সকলেই সনাতন ধর্মের এক একটি সিদ্ধান্ত, সবাই নাকি সনাতন ধর্মের মান্য পরম্পরা । শৈবদের গুরুপরম্পরার যেমন নিজস্ব মান্যতা রয়েছে তেমনই নাকি অনান্য পরম্পরার নিজস্ব মান্যতা রয়েছে।
কিন্তু এখন সমস্যা হল সবার যদি নিজের নিজের পরম্পরার ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে, তবে কোনটি প্রকৃত ধর্মের সত্য সিদ্ধান্ত ?
সনাতন ধর্ম একটিই, সত্যও একটিই, পরমেশ্বর একজনই - তাহলে ভিন্ন গুরুপরম্পরার ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত কেন রয়েছে ?
একটি সিদ্ধান্তের জায়গায় একাধিক সিদ্ধান্ত কেন রয়েছে আমাদের সনাতনী সমাজে ?
এই জিজ্ঞাসা আজ পর্যন্ত সনাতন ধর্মের মানুষদের মনে উদয় হয়নি, যার কারণে সঠিক সিদ্ধান্ত কোনটি তা সনাতনীরা জানতেই পারেনি। প্রকৃত গুরু পরম্পরা কোনটি, যখন জীবের জন্য ঈশ্বরের দ্বারা সনাতন ধর্মের মার্গ প্রশস্ত করা হয়েছিল, সেই সূচনাকালে কোন গুরু পরম্পরার হাত ধরে এই সনাতন ধর্মের সিদ্ধান্ত সমগ্র জীবের কাছে ধরা দিয়েছিল ?
— এ বিষয়ে কারোরই জানবার আগ্রহ প্রকাশ হতে দেখা যায়নি, তাই এই প্রবন্ধে আমি সেই সঠিক গুরুপরম্পরার নির্ণয় করবো।
এই প্রসঙ্গে বৈষ্ণবদের মান্য যে সকল গুরুপরম্পরা এই পৃথিবীতে বর্তমান রয়েছে, সেই গুরুপরম্পরা গুলির উৎপত্তি কবে হয়েছিল ?
তাদের পরম্পরাগত মান্যতা কি ?
তাদের এই মান্যতার সাথে শাস্ত্রের বচনের মিল আছে কি না ?
নাকি তাদের নিজস্ব মস্তিষ্কপ্রসূত কাল্পনিক কাহিনীর মান্যতার উপর নির্ভর করে বৈষ্ণব গুরুপরম্পরা গড়ে উঠেছে ?
শৈব গুরুপরম্পরা আর বৈষ্ণবদের গুরুপরম্পরার মধ্যে কোন পরম্পরা তথা সিদ্ধান্ত শাস্ত্রসম্মত, অধিক গ্রহণযোগ্য আর কি কি পার্থক্য রয়েছে — এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
[এখানে শুধুমাত্র বিশ্লেষণ করে পরম্পরার প্রামাণিকতার বিষয়ে দৃষ্টিপাত করা হয়েছে, কোনো সম্প্রদায়কে অপমানিত বা কটুক্তি করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়।]
______________________________________________
______________________________________________
🟫☘️ আলোচ্য বিষয় ☘️🟫
🔆 প্রথমে ব্রহ্মসম্প্রদায়ী বৈষ্ণবদের দাবী সম্পর্কে জানা যাক :
বৈষ্ণবীয় দাবী —
“ব্রহ্ম সম্প্রদায় (মাধব সম্প্রদায়) - এর প্রতিষ্ঠাতা আচার্য হলেন শ্রী মধ্বাচার্য, তিনি দ্বৈতবাদ কে একমাত্র সত্য বলে প্রচার করেছিলেন এবং শ্রীবিষ্ণুই সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বোচ্চ বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। আদিশঙ্করাচার্যের পন্থার অনুসারী কেবলাদ্বৈত দর্শনের অনুসারী অচ্যুতপ্রেক্ষাচার্য ছিলেন শ্রীমধ্বাচার্যের গুরু। কিন্তু আদি শঙ্করাচার্যের প্রবর্তিত মায়াবাদী অদ্বৈত দর্শন মতবাদকে মধ্বাচার্য মেনে নিতে পারেননি। তিনি দ্বৈতবাদ প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেটির প্রচারের জন্য তিনি শিষ্য বানিয়ে তাদের মাধ্যমে প্রচার করে নিজের একটি বৈষ্ণব সম্প্রদায় গড়ে তোলেন। তিনি ভগবান বায়ুর তৃতীয় অবতার ছিলেন। এই বায়ুদেবের সমকক্ষ হতে পারেননি স্বয়ং শিব। বায়ুদেবের কাছে শিবও পরাজিত হয়েছেন। সেই মহাশক্তিশালী বায়ুদেবের অবতার আনন্দতীর্থ মধ্বাচার্য ব্রহ্মসূত্রের উপর নিজের মতবাদ প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে দ্বৈতমতবাদের নিরিখে ভাষ্য রচনা করে ব্যাসদেবের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং ব্যাসদেব সেই ব্রহ্মসূত্রের ভাষ্যকেই সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ও সত্য বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তাই বায়ুদেবের অবতার হওয়ায় সরাসরি মধ্বাচার্য-ই গুরুপরম্পরার প্রধান। পদ্মনাভতীর্থ, নরহরিতীর্থ, মাধবতীর্থ এবং অক্ষোব্যতীর্থ ছিলেন তাঁর শিষ্য। ”
______________________________________________
______________________________________________
🔆 এবার ‘ব্রহ্ম বৈষ্ণব’ সম্প্রদায়ের পক্ষ দাবী করা মান্যতার বিষয়ে মহাপাশুপত শৈব পরম্পরার পক্ষ থেকে সমীক্ষা করা যাক :
🔥 শৈব পক্ষ দ্বারা ‘মধ্বাচার্যের ব্রহ্ম বৈষ্ণব সম্প্রদায়’ -এর মান্যতাকে শাস্ত্রের নিরিখে প্রাচীনত্ব ও গ্রহণযোগ্যতার বিচার —
🔷 (১) মধ্বাচার্য নিজের রচিত নব্য মতবাদ নিজেই নিজেকে বায়ুর অবতার বলে দাবী করেছেন, যা অত্যন্ত হাস্যকর বিষয়। কোনো শাস্ত্রে ‘মধ্বাচার্য’ কে বায়ুদেবের অবতার বলে ঘোষণা করা হয়নি। এখন কিছু মধ্বাচার্যের অনুসারীরা হয়তো বলবেন যে, ‘অমুক তমুক পুরাণে মধ্বাচার্যকে বায়ুর অবতার স্বীকার করা হয়েছে কিন্তু তা বর্তমানে, ঐ পুরাণগুলিতে সেই অধ্যায় ও শ্লোক গুলি পাওয়া যায়না’ — এই ধরণের কপোলকল্পিত গল্প রচনা করে ধূর্ত যুক্তি দিয়ে মধ্বাচার্যবাদী বৈষ্ণবেরা আনন্দে আত্মহারা হলেন, যুক্তি প্রমাণের ভিত্তিতে সত্য বিচারের ক্ষেত্রে বিদ্বান ব্যক্তি কখনোই এমন ধূর্ততাপূর্ণ কাল্পনিক বিষয়কে প্রামাণিক হিসেবে বিবেচনা করেন না।
এখন যদি আমরাও বলি যে, “মায়া ছড়িয়ে শিব নিন্দুকের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে মধ্বাচার্য নামক এক দ্বৈতবাদী বৈষ্ণব অসুর জন্মানোর ভবিষ্যত বানী অমুক তমুক পুরাণে ছিল, কিন্তু এখন সেসব অধ্যায় শ্লোক পাওয়া যায় না- এমনটা যদি বলে দাবী করি তবে মধ্বাচার্যের অনুসারীরা মান্য করবেন ?
নিশ্চয়ই মান্য করবেন না আপনারা, তার কারণ জেনে নিন 👇
“কোনো শাস্ত্রে ছিল কিন্তু এখন নেই” — এই ধরনের যুক্তিকে সাধারণভাবে কয়েকভাবে চিহ্নিত করা যায়:
অপ্রমাণযোগ্য দাবি : এমন দাবি যেটা যাচাই বা খণ্ডন করার উপায়ই নেই।
প্রমাণের দায় এড়ানো : যে দাবি করছে, সে প্রমাণ না দিয়ে বলছে “ছিল, কিন্তু হারিয়ে গেছে।”
কপোলকল্পিত বা মনগড়া যুক্তি : নিজের মতবাদ টিকিয়ে রাখতে নতুন গল্প বানানো।
অর্থাৎ, এসব অপ্রমাণযোগ্য, দায় এড়ানো কপোলকল্পিত গল্পের যুক্তি এখানে খণ্ডিত।
সনাতন ধর্মের শাস্ত্রের ভিত্তিতে বিচার করে ফলাফল হিসেবে বলা যায় — মধ্বাচার্য কে কোনো শাস্ত্রে বায়ু অবতার বলা হয়নি, এটি মধ্বাচার্যের অনুসারীদের নিজস্ব সাম্প্রদায়িক বিশ্বাস মাত্র, যা সর্বসাধারণের জন্য অশাস্ত্রীয় হবার দরুন, কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
🔷 (২) মধ্বাচার্যের প্রতিষ্ঠিত ব্রহ্ম সম্প্রদায়ের নিজস্ব মান্যতা অনুসারে, মধ্বাচার্যের মধ্যে প্রকৃত জ্ঞান নাকি তার মধ্যে প্রথম থেকেই বিদ্যমান ছিল, কারণ তিনি বায়ুর অবতার ছিলেন। এই দাবী শুধু মাত্র তাদের অনুসারীদের সম্প্রদায়গত বিশ্বাস, সনাতন ধর্মের শাস্ত্রে এমন কোনো প্রমাণ উপলব্ধ নয়।
শব্দপ্রমাণ না থাকলে শুধু অনুমান করে নিয়ে তার ভিত্তিতে একটি মান্যতা তৈরী করে নেওয়ার মতো দুঃষ্কর্ম হল চরম অশাস্ত্রীয় এবং প্রচণ্ড পরিমাণে অধর্মের বিষয়।
এই ধারাটি ঐতিহাসিকভাবে যাচাইযোগ্য নয়।
🔷 (৩) মধ্বাচার্যের ব্রহ্ম-বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের বিশ্বাস অনুযায়ী,
ব্রহ্মসম্প্রদায়ী বৈষ্ণবদের গুরু পরম্পরা শুরু হয়েছে এই ক্রমে :
নারায়ণ → ব্রহ্মা → বায়ু → হনুমান → ভীম → মধ্ব
অর্থাৎ স্বয়ং শ্রীহরি নারায়ণ দ্বৈতবাদের বৈষ্ণবীয় জ্ঞান দিয়েছিলেন ব্রহ্মাকে, ব্রহ্মা থেকে এই পরম্পরা শুরু হয়েছে বলে ‘ব্রহ্ম-সম্প্রদায়’ নামে পরিচিত হয়েছে। ব্রহ্মা বায়ুকে এই জ্ঞান দেন, বায়ু থেকে সরাসরি হনুমান জ্ঞান পেয়েছেন, আর হনুমান থেকে ভীম পেয়েছেন। আর ভীম থেকে মধ্বাচার্য এই জ্ঞান পেয়েছেন। — এমনটাই হল মধ্বাচার্যের অনুসারীদের দাবী।
প্রথমত, নারায়ণ দ্বৈতবাদের জ্ঞান ব্রহ্মাকে কখন কোথায় কিভাবে দিলেন তার প্রমাণ কোথাও কোনো শ্রুতি-স্মৃতি-পুরাণ-ইতিহাস শাস্ত্রে পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে ব্রহ্মা কবে বায়ুকে দ্বৈতবাদের জ্ঞান দিলেন সেটিও অপ্রমাণিত, বায়ু কখন দ্বৈতবাদের জ্ঞান হনুমানকে দিলেন এবং হনুমান কবে ভীমকে সেই বৈষ্ণবীয় দ্বৈতবাদী জ্ঞান দিলেন তার স্পষ্টতঃ কোনো শব্দপ্রমাণ উক্ত শাস্ত্রের কোথাও নেই। কিন্তু মধ্বাচার্যের অনুসারীরা নিজেদের পরম্পরাকে প্রামাণিক প্রমাণ করতে গিয়ে প্রমাণবিহীন দাবী করে তা বিশ্বাস করছেন মনেপ্রাণে। শাস্ত্রে যে জ্ঞানের অস্তিত্ব নেই সেটিকে প্রচার করা কখনোই ধর্মসম্মত হতে পারেনা, ইহা সত্য প্রাপ্তির মার্গও নয়।
স্বয়ং বৈষ্ণবদেরই পুরাণের দ্বৈতবাদকে নিকৃষ্ট মার্গ বলে নিন্দা করা হয়েছে, অদ্বৈতবাদকে মুক্তির সর্বশ্রেষ্ঠ মার্গ বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছে, দেখুন —
🔸অদ্বৈত দর্শন সম্বন্ধে গরুড়পুরাণের সিদ্ধান্ত —
অদ্বৈতযোগসম্পন্নাস্তে মুচ্যন্তেতি বন্ধনাৎ ॥ ৩
[তথ্যসূত্র — গরুড়পুরাণ/অষ্টাবিংশাধিকারদ্বিশততমোহধ্যায়(আত্মজ্ঞানকথনম)/ ৩নং শ্লোক]
✅ অর্থ — যাহারা অদ্বৈত জ্ঞান সম্পন্ন তাহারা ভববন্ধন থেকে মুক্ত হইতে পারে ॥ ৩
🔸 অদ্বৈত বিরোধী অনান্য দ্বৈত দর্শন সম্পর্কে গরুড়পুরাণের সিদ্ধান্ত —
একেন জন্মনা জ্ঞানাৎ মুক্তিম দ্বৈততাবিনাং ।
যোগভ্রষ্টা কুযোগাশ্চ বিপ্ৰা যোগীকুলোদ্ভবা ॥ ১১
[তথ্যসূত্র — গরুড়পুরাণ/অষ্টাবিংশাধিকারদ্বিশততমোহধ্যায়(আত্মজ্ঞানকথনম)/ ১১নং শ্লোক]
✅ অর্থ — দ্বৈতজ্ঞানীদের এক জন্মে মুক্তি হতে পারে না। তাহারা যোগভ্রষ্টা হয়ে যোগীরূপে ব্রাহ্মণকুলে জন্মগ্রহণ করে। তথাপি অদ্বৈত অবলম্বনে মুক্ত হতে সক্ষম হয়।
বৈষ্ণবদের প্রাণপ্রিয় গরুড় পুরাণ বলছে যে, দ্বৈতবাদীরা মুক্তি পায় না। তাহলে ভাবুন, যদি নারায়ণ দ্বৈত জ্ঞান বৈষ্ণবদের দের দিয়েছেন, তাহলে বৈষ্ণবেরা তো মুক্তি পাবে না বলে গরুড় পুরাণ মান্যতা দিয়েছে।
অর্থাৎ দ্বৈতবাদ মোহনাত্মক বলে বৈষ্ণবীয় পুরাণ শাস্ত্রেই প্রমাণিত। মধ্বাচার্যের ব্রহ্ম-বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের দর্শন যে মুক্তি প্রদান করবে না তা বৈষ্ণবদের পুরাণ থেকেই প্রমাণিত।
এবার ভীম কখন মধ্বাচার্যকে ঐ দ্বৈতবাদী জ্ঞান দিতে এলেন, তার বিচার করা যাক।
মহাভারতের স্বর্গারোহণ পর্বের ৪র্থ অধ্যায়ের ৭-৮ নং শ্লোকে স্পষ্ট ভাবে বলা হয়েছে যে, ভীম বায়ুর দেহে লীন হয়ে সিদ্ধ প্রাপ্ত হন।
তাহলে সেই দ্বাপর যুগের ভীম কিভাবে এলেন মধ্বাচার্যের কাছে জ্ঞান দিতে ? শাস্ত্রে কোথাও এমন ভবিষ্যতবানী বা অন্য পূর্ববর্তী কল্পে ঘটে যাওয়া কাহিনী হিসেবেও উল্লেখ নেই। অথচ শাস্ত্র প্রমাণ ছাড়াই শুধুমাত্র নিজেদের বিশ্বাসের উপর নির্ভর করে একটি কপোলকল্পিত গুরুপরম্পরা রচনা করেছেন মধ্বাচার্য ও তার অনুসারী ব্রহ্মসম্প্রদায়ী বৈষ্ণবগণ। ভীমের লীলা সমাপন হবার দ্বাপরযুগীয় সময় কাল আর কলিযুগে প্রায় খ্রিষ্টীয় ১৩শ শতকে জন্ম নেওয়া মধ্বাচার্যের জন্মকালীন সময়ের মধ্যে বৃহৎ থেকেও বৃহত্তর তফাৎ রয়েছে। প্রমাণ ছাড়া অবান্তর দাবীর মূল নেই।
এবার যদি এটাও অনুমান করা হয় যে, বায়ুর অবতার স্বয়ং মধ্বাচার্য, তাই তার কাছে সকল জ্ঞান ছিল। তবুও এই দাবীটি বৈষ্ণবদের ব্রহ্মসম্প্রদায়ী গুরুপরম্পরার প্রামাণিকতা প্রমাণ করতে সক্ষম নয়। কারণ, এমন কপোলকল্পিত কাহিনী যে কেউ রচনা করে নিজের গুরু বা নিজেকে অমুক তমুক দেবদেবীর অবতার বলে নিজেকে ঘোষণা করতে পারেন, তাহলে তাদের বক্তব্যকে মধ্বাচার্যের অনুসারীগণ মানতে পারবে না ?
মধ্বাচার্যবাদের যুক্তি তাদেরই উপর সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, অর্থাৎ মধ্বাচার্যের ব্রহ্ম-বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের এই মান্যতা কখনোই যুক্তিযুক্ত নয়।
এখন কথা হল মধ্বাচার্যের মতবাদ যদি সত্য হয় তাহলে মধ্বাচার্যের পূর্বে অনান্য যুগে কখনো এই মতবাদ প্রচারিত হয়নি কেন ? বৈষ্ণবদের শাস্ত্রে দ্বৈতবাদী পরম্পরার উল্লেখ নেই কেন ? বরং দ্বৈতবাদ কে নিন্দা করেছেন বৈষ্ণবশাস্ত্র। এমনটা কেন ? বৈষ্ণবীয় ব্রহ্মসম্প্রদায়ের দ্বৈতবাদের আচার্য কোন কোন ঋষি মুনি ছিলেন ? তাদের বিষয়ে শাস্ত্রে কোথায় উল্লেখ আছে ?
উত্তর হল : কোথাও নেই।
তাহলে এই ব্রহ্মসম্প্রদায়ী গুরুপরম্পরার মান্যতা গুলি এল কোথা থেকে ?
উত্তর : মধ্বাচার্যের লিখিত গ্রন্থ ও তার পরবর্তী যত শিষ্য-প্রশিষ্যগণ আছেন - তাদের লিখিত গ্রন্থে নিজস্ব বিশ্বাসকে একমাত্র সত্য বলে মনে করানোর ভ্রম ছড়ানো হয়েছে। এই মতবাদের সাথে স্বয়ং বৈষ্ণব শাস্ত্রেরই মিল নেই, বরং ঘোরতর বিরোধ রয়েছে।
তিনযুগে বৈষ্ণবদের এই ব্রহ্মসম্প্রদায়ী বৈষ্ণবগুরুপরম্পরার অস্তিত্ব কোথায় ছিল ?
🔷 (৪) মধ্বাচার্যের মতবাদ অনুযায়ী বায়ুদেব নাকি পরমেশ্বর শিবের থেকেও অধিক শক্তিশালী। বায়ুদেব নাকি স্বয়ং শিবকে পরাজিত করেছিলেন। এবার আপনারা দেখুন শিবের সামনে বায়ুদেবের কত ক্ষমতা —
🗣️💨 বৈষ্ণবদের প্রাণপ্রিয় পদ্মপুরাণ থেকে দেখুন 👇
বায়ুর্বলবতাং শ্রেষ্ঠো জগ্রাহাজগবমথ স্বেনৈব করেনোৎকর্ষয়ন্নধঃ পপাত ধনুশ্চ বায়োরুপরি পপাত অহসংস্তদা সর্বে ॥
[তথ্যসূত্র : নবভারত প্রকাশিত ‘পদ্মপুরাণ/পাতালখণ্ড/৭১ অধ্যায়/১১৮ নং শ্লোক, চৌখাম্বা প্রকাশিত ‘পদ্মপুরাণ/পাতালখণ্ড/১১৬ অধ্যায়/১২২ নং শ্লোক]
✅ অর্থ : তারপর বলবানদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বায়ু দেবতা অজগব ধনুকটি ধারণ করলেন। তিনি নিজের হাতে সেটিকে বাঁকাতে (ঝুঁকাতে) চেষ্টা করছিলেন, তখন তিনি নিচে পড়ে গেলেন এবং ধনুকটিও তাঁর উপরেই পড়ে গেল। এটি দেখে সকলেই হাসতে লাগল ॥
👁️ লক্ষ্য করুন — পরমেশ্বর শিবের একটি অজগব নামক ধনুক সর্বশক্তি দিয়ে তুলতে গিয়ে অপারগ হয়ে ধনুকের তলায় চাপা পড়ে হাসিরপাত্র হওয়া বায়ুদেব নাকি পরমেশ্বর শিবের থেকেও অধিক শক্তিশালী, আর এই বায়ুদেব নাকি পরমেশ্বর শিবকে পরাজিতও করেছেন।
♦️ চলুন তাহলে বায়ুদেবতার কত ক্ষমতা সেটা এবার বেদ থেকেই দেখা যাক —
[কেন উপনিষদে বর্ণিত হয়েছে, একবার দেবতারা অসুরদের সাথে যুদ্ধ করতে গিয়ে জয়ী হন। এতে দেবতারা নিজেদের শক্তির অহংকার করতে থাকেন। তখন সাক্ষাৎ পরমেশ্বর শিব যক্ষ অবতার রূপ ধারণ তাদের অহংকার বিনাশ করবার জন্য আবির্ভূত হন। এবার দেখুন মন্ত্র ও অর্থ সহ]
তদ্ধৈষাং বিজজ্ঞৌ তেভ্যো হ প্রাদুর্বভূব
তন্ন ব্যজানত কিমিদং যক্ষমিতি ॥ ২
[কেন উপনিষদ/৩ খণ্ড/২ নং মন্ত্র]
✅ অর্থ : পরমব্রহ্ম শিব অবশ্যই দেবতাদের মিথ্যা অভিমানের কথা জেনে তাঁদেরই কল্যাণার্থে তাঁদের সামনে আবির্ভূত হয়েছিলেন। কিন্তু সেই যক্ষকে দেবতারা চিনতে পারলেন না।
অথ বায়ুমবুবম্বায়বেতন্বিজানীহি কিমেতদ্ যক্ষমিতি তথেতি ॥ ৭
[কেন উপনিষদ/৩ খণ্ড/৭ নং মন্ত্র]
✅ অর্থ : তখন দেবতারা বায়ুকে বললেন, 'হে বায়ু, এই যক্ষের পরিচয় ভালভাবে জেনে আসুন।' (বায়ু বললেন:) 'তাই হবে।'
তদভ্যদ্রবৎ তমভ্যবদৎকোহসীতি বায়ুবা
অহমস্মীত্যব্রবীম্মাতরিশ্বা বা অহমস্মীতি ॥ ৮
তস্মিংস্তুয়ি কিং বীর্যমিতি অপীদং
সর্বমাদদীয় যদিদং পৃথিব্যামিতি ॥ ৯
তস্মৈ তৃণং নিদধাবেতদাদৎস্বেতি;
তদুপপ্রেয়ায় সর্বজবেন, তন্ন শশাকাদাতুম্
স তত এব নিববৃতে নৈতদশকং
বিজ্ঞাতং যদেতদ্ যক্ষমিতি ॥ ১০
[কেন উপনিষদ/৩ খণ্ড/৮-১০ নং মন্ত্র]
✅ অর্থ : বায়ু সেই যক্ষরূপী শিবের কাছে গেলে যক্ষ প্রশ্ন করলেন, 'আপনি কে?' বায়ু বললেন, ‘আমি বায়ু, আমি সামান্য নই ; আমি মাতরিশ্বা (যিনি শূণ্যে বিচরণ করেন)।’ ॥ ৮
(যক্ষরূপী শিব প্রশ্ন করলেন:) ' যেহেতু আপনি এতই অসামান্য। কিন্তু আপনি কোন্ শক্তির অধিকারী ?' বায়ু বললেন, এই বিশ্বে যা কিছু আছে, সব আমি উড়িয়ে দিতে পারি ॥ ৯
[যক্ষরূপী শিব] একটি তৃণখণ্ড বায়ুদেবতার সামনে রেখে বললেন, 'এটিকে উড়িয়ে নিয়ে যান তো।' (বায়ু) সবেগে ধেয়ে গেলেন এবং তাঁর সর্বশক্তি প্রয়োগ করলেন, কিন্তু তবুও তৃণটিকে নড়াতে পারলেন না। তাই ফিরে এসে তিনি (দেবতাদের বললেন:) ‘এই দিব্যমূর্তি যে কে তা আমি বুঝতে পারলাম না।’ ॥ ১০
দেখুন পাঠবৃন্দ ! প্রভু শিবের যক্ষ অবতারের কাছে বায়ুদেবের শক্তি তুচ্ছ প্রমাণিত হল।
🗣️💨 বায়ুদেবের আরো অক্ষমতা দেখুন —
অথর্ববেদ থেকেই দেখে নিন, পরমেশ্বর শিব বলছেন —
মামেব বিদিত্বামৃতত্বমেতি । তরতি শোকম্ । মামেব বিদিত্বা সাংসৃতিকীং রুজং দ্রাবয়তি । তস্মাদহং রুদ্রো যঃ সর্বেষাং পরমা গতিঃ । সোঽহং সর্বাকারঃ ॥ ৮
যতো বা ইমানি ভূতানি জায়ন্তে ।
যেন জাতানি জীবন্তি । যৎ প্রয়ন্ত্যভিসংবিশন্তি । তং মামেব বিদিত্বোপাসীত । ভূতেভির্দেবেভিরভিষ্টুতোঽহমেব ॥ ৯
ভীষাস্মাদ্বাতঃ পবতে । ভীষোদেতি সূর্যঃ । ভীষাস্মাদগ্নিশ্চেন্দ্রশ্চ ॥ ১০
(ভস্ম জাবাল উপনিষদ/২য় অধ্যায়/৮-১০ নং মন্ত্র)
অর্থ — পরমেশ্বর শিব বললেন, আমাকেই (শিবকে) যথাযথভাবে জেনে (জীবের) অমৃতত্ব (মোক্ষ) লাভ হয়। একমাত্র আমাকে (শিবকে) জেনেই শোকের উত্তরণ ঘটে। যে জীব একমাত্র আমাকে (জীবের অন্তরে থাকা আত্মাস্বরূপ শিবকে) জানতে পারে সেই জীবের সংসারের দুঃখরূপী রোগ বিনষ্ট হয়ে যায়। এই (সংসারের বন্ধন থেকে উৎপন্ন হওয়া দুঃখ থেকে মুক্ত করবার) কারণেই আমিই হলাম রুদ্র — যে রুদ্র সকলের পরম গন্তব্য। সেই আমিই সকল রূপের আকারের ধারক ॥ ৮ ॥
যেখান থেকে সমস্ত প্রাণী ও সৃষ্ট জগৎ উৎপন্ন হয়, যার দ্বারা এরা জীবিত থাকে, যার মধ্যেই সমস্ত কিছু অবশেষে বিলীন হয়, তাকে (শিবকে) জেনে এবং উপলব্ধি করেই উপাসনা করা উচিত। আমি (শিব) সেই তত্ত্ব(পরমশিব তত্ত্ব), আমাকেই দেবতারা সহ সমগ্র বিশ্ব স্তুতি ও উপাসনা করে ॥ ৯ ॥
আমার (শিবের) ভয়ে বায়ু প্রবাহিত হয়, আমার ভয়ে সূর্য উদয় হয়, আমার ভয়ে অগ্নি ও চন্দ্র নিজেদের কর্তব্য পালন করে ॥ ১০ ॥
♦️ পুরাণে দেখুন —
এই একই কথা সরাসরি মহাদেবেরই উদ্দেশ্যে স্কন্দমহাপুরাণের ব্রহ্মগীতাতে বলা হয়েছে —
ভীষাঽস্মাৎপবতে বায়ুর্ভীষোদেতি দিবাকরঃ ।
ভীষাঽস্মাদগ্নিরিন্দ্রশ্চ মৃত্যুর্ধাবতি পঞ্চমঃ ॥ ৫৬
[স্কন্দমহাপুরাণ/সূতসংহিতা/যজ্ঞবৈভব খণ্ড/উপরিভাগ/ব্রহ্মগীতা/৬ অধ্যায়/৫৬ নং শ্লোক]
অর্থ : এই পরব্রহ্ম মহাদেবের শাসনের ভয়ে বায়ু বয়ে চলে, সূর্য উদয় হন, অগ্নি ইন্দ্র, মৃত্যু ইত্যাদি সবাই নিজের নিজের কার্য নিয়মানুসারে এই কারণে করেন ।
অর্থাৎ যেখানে বায়ুদেবেরই অস্তিত্ব সংকটে, যেখানে বায়ুদেবই ভয়ে ভীত, যেখানে বায়ুদেব নিজেই পরমেশ্বর শিবের অজগব ধনুকের ভার সহ্য করতে পারেন না, সেই বায়ুদেবের তুচ্ছ শক্তির কাছে নাকি পরমব্রহ্ম শিব পরাজিত হন ?
একথা একজন বাচ্চা শুনলেও হেঁসে গড়াগড়ি খাবে।
আর এই বায়ুদেবের নামে, ভীমের নামে নকল বীরত্বের কাহিনী আমদানি করে বিভিন্ন পুস্তক রচনা করে মধ্বাচার্য নিজের বড়াই করেছেন, এমন ভিত্তিহীন সাম্প্রদায়িক কার্যকলাপের কোনো মূল্যই নেই সনাতন সমাজে নেই।
🔷 (৫) কলিযুগে ‘শিবনিন্দুক বৈষ্ণবাচার্য’ হিসেবে মধ্বাচার্য সবচেয়ে জনপ্রিয়। কারণ তিনি সবচেয়ে বড় বড় মিথ্যা কাহিনী রচনা করে বলেছেন, ঐ কাহিনী গুলি মহাভারতে বর্ণিত আছে। অথচ উত্তর ভারত বা দক্ষিণ ভারতে উপলব্ধ মহাভারতের পাণ্ডুলিপিতে এসব কাহিনী পাওয়া যায়নি আজ পর্যন্ত। আর এসব আজগুবি কাহিনী রচনা করে ‘মহাভারত তাৎপর্য নির্ণয়’ নামক গ্রন্থের আমদানি করেছেন মধ্বাচার্য।
তারই সাথে ব্যাসদেবের নামেও অসত্য কথা প্রচার করেছেন। ব্যাসদেব নিজেই বিষ্ণুকে ত্যাগ করে শৈব হয়েছিলেন, স্কন্দ মহাপুরাণের কাশীখণ্ডের ব্যাসাষ্টকমে তা প্রমাণিত। সেই ব্যাসদেব নাকি মধ্বাচার্যের মতো অসত্য প্রচারিত ব্যক্তির লিখিত সাম্প্রদায়িক শিবনিন্দুকের রচিত দ্বৈতবাদের দ্বারা ব্যাখ্যা করা ব্রহ্মসূত্রের দ্বৈতভাষ্যকে মান্যতা দিয়েছেন। যেখানে স্বয়ং বৈষ্ণবীয় পুরাণে ব্যাস দ্বৈতবাদের নিন্দা করেছেন, সেখানে সেই ব্যাসদেবই নাকি দ্বৈতভাষ্যকে সর্বশ্রেষ্ঠ বলে মান্যতা দিয়েছেন। প্রকৃত শাস্ত্র দ্বারা বিচর করলেই বৈষ্ণবদের এই সকল স্ববিরোধী শাস্ত্রবিরুদ্ধ কাণ্ডকারখানা ধরা পড়ে।
দেখুন, পরমেশ্বর শিবের নির্দেশেই ব্যাসদেব ব্রহ্মসূত্রের রচনা করেছিলেন —
ব্যাস উবাচ ।
আজ্ঞয়া কেবলং শম্ভোরহং বেদার্থবেদনে ॥ ৭২
সম্পূর্ণঃ সর্বেবেদান্তবাক্যানামর্থং নিশ্চয়ে ।
সমর্থশ্চ নিযুক্তশ্চ সূত্রারম্ভকৃতেঽপি চ ॥ ৭৩
আজ্ঞয়া দেবদেবস্য ভবতামাপি যোগিনাম্ ।
জ্ঞানে গুরুগুরুশ্চাহমভবং মুনিপুঙ্গবাঃ ॥ ৭৪
ভবন্তোঽপি শিবজ্ঞানে বেদসিদ্ধে বিশেষতঃ ।
ভক্ত্যা পরময়া যুক্তা নিষ্ঠা ভবত সর্বদা ॥ ৭৫
(স্কন্দপুরাণ/সূতসংহিতা/যজ্ঞবৈভব খণ্ড/উপরিভাগ/সূতগীতা/৮ অধ্যায়/৭২-৭৩ নং শ্লোক)
অর্থ : ব্যাসদেব বললেন কেবল পরমেশ্বর শিবের আজ্ঞাতেই আমি বেদার্থ বুঝতে সক্ষম হয়েছি, উপনিষদ- বাক্যের নিশ্চয় করতে সক্ষম হয়েছি এবং ব্রহ্মসূত্র রচনায় নিযুক্ত হয়েছি ॥ ৭২-৭৩ ॥
মহাদেবের আদঘাতেই জ্ঞানের বিষয়ে আমি আপনাদের অর্থাৎ সকল মুনিগণের পরম গুরু হতে পেরেছি। আপনারাও বেদ সিদ্ধ শিবজ্ঞানের প্রতি পরম ভক্তি সহিত নিষ্ঠাবান হয়ে উঠুন ॥ ৭৪-৭৫ ॥
🔸 ফলে, মধ্বাচার্যের এমন অসত্য বচন ও সবক্ষেত্রে গোঁজামিল দিয়ে নিজস্ব মান্যতা ও পরম্পরা তৈরী করবার প্রবণতা থেকে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে ‘মধ্বাচার্যের প্রতিষ্ঠিত দ্বৈতবাদী ব্রহ্ম-বৈষ্ণব সম্প্রদায়’ সম্পূর্ণভাবে গুরুপরম্পরাহীন সাম্প্রদায়িক অশাস্ত্রীয় অসম্প্রদায়।
আর এই অসম্প্রদায়ের পরবর্তীকালের শিষ্য বিজয়েন্দ্র তীর্থও যেন একদম মধ্বাচার্যের অবতার, কেননা - বিজয়েন্দ্র তীর্থ ‘শৈব-সর্বস্ব-খণ্ডনম্’ নামক পুস্তকে বহু আজগুবি কাহিনীর অবতারনা করেছেন যা পূর্বে কোনো বৈষ্ণব আচার্যগণও করেননি, অথচ সব যেন বিজয়েন্দ্র তীর্থের হাতেই গিয়ে ধরা দিল, আবার হাতে ধরা দিলেও সেই সকল কাহিনীর তথ্যসূত্র নেই।
উপমা হিসেবে বলি, ‘মধ্বাচার্য অসুর ছিলেন’ এটি কূর্মপুরাণে আছে।
এমন টা বললাম, কিন্তু কূর্মপুরাণের কোথায় কোন ভাগে, কোন অধ্যায়ে, কত নং শ্লোকে এটি উল্লেখ আছে তা উল্লেখ করলাম । তাছাড়া বর্তমানের কূর্মপুরাণে সেসব কাহিনী উপস্থিতও নেই। তাহলে সেই কূর্মপুরাণের নামে বলা কাহিনী কি মান্য করা যাবে ? মধ্বাচার্যের অনুসারীগণ মানবে ?
অর্থাৎ বিজয়েন্দ্র তীর্থও এই একই কাজ করে, বলে বেড়িয়েছে যে শৈবদের মত তিনি খণ্ডন করেছেন।
বিষয়টা ঠিক এমন : রাতে নিদ্রায় স্বপ্নে নিজেকে রাজা হতে দেখে, নিদ্রা ভঙ্গ হলে উঠে নিজেকে রাজা দাবী করবার মতো এই বিষয়টিও ঠিক তেমন।
যুক্তি ছাড়া প্রমাণ ছাড়া যা ইচ্ছে তাই লিখে সেটিকেই অজ্ঞদের মাঝে প্রচার করে সংখ্যা বৃদ্ধি করে গুরুপরম্পরা খুলে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নিজেদের কুমতবাদ প্রচার করাই মধ্বাচার্যের ব্রহ্ম-বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের বৈশিষ্ট্য। সব থেকেবিষ্ণুকে সর্বোচ্চ ও শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করতে গিয়ে অবৈষ্ণবদের বিরুদ্ধে অধিক অপশব্দ ব্যবহারকারী, কাল্পনিক গল্প রচনাকারী যদি কোনো ব্যক্তি তথা সম্প্রদায় থাকে তাহলে সেটি হল এই মধ্বাচার্য ও তার এই ব্রহ্ম-মধ্ব-বৈষ্ণব সম্প্রদায়।
______________________________________________
______________________________________________
♦️ শৈবপরম্পরা এবং মধ্বাচার্যের ব্রহ্ম-বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের মধ্যে - সনাতন ধর্মের একমাত্র শাস্ত্রীয় ও প্রামাণিক পরম্পরা কোন পরম্পরা ?
✅ উত্তর - সনাতন ধর্মের শাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে এমন পরম্পরা হল - একমাত্র শৈবপরম্পরা। কারণ, প্রামাণিক শাস্ত্র শিবমহাপুরাণে শৈব গুরুপরম্পরাগুলির উল্লেখ রয়েছে।
[উপমন্যু শৈবাচার্য জী শ্রীকৃষ্ণকে শিবপূজার পর শিবস্তোত্র পাঠ করবার বিধি বলতে গিয়ে স্তোত্রে যেভাবে বর্ণনা করেছেন শৈব আচার্য ও শৈবপরম্পরার নাম, সেই শ্লোক সহ এখানে নিচে উপস্থাপন করা হল]
▪️ প্রমাণ দেখুন —
শ্বেতাদ্যা নকুলীশান্তাঃ সশিষ্যাশ্চাপি দেশিকাঃ।
তৎ সন্ততীয়া গুরবো বিশেষাদ্ গুরবো মম ॥ ১৬৮
শৈবা মাহেশ্বরাশ্চৈব জ্ঞানকর্মপরায়ণাঃ।
কর্মেদমনুমন্যন্তাং সফলং সাধ্বনুষ্ঠিতম্ ॥ ১৬৯
শৈবাঃ সিদ্ধান্তমার্গস্তাঃ শৈবাঃ পাশুপতাস্তথা।
শৈবা মহাব্রতধরাঃ শৈবাঃ কাপালিকাঃ পরে ॥ ১৭৩
শিবাজ্ঞাপালকাঃ পূজ্যা মমাপি শিবশাসনাৎ।
সর্বে মামনুগৃহন্তু শংসন্তু সফলক্রিয়াম্ ॥ ১৭৪
[শিবমহাপুরাণ/বায়বীয় সংহিতা/উত্তরখণ্ড/৩১ অধ্যায়]
✅ অর্থ : উপমন্যু জী বললেন, শ্বেতাশ্বতর আচার্য থেকে নকুলীশ পর্যন্ত, শিষ্য-সহ আচার্যগণ, তাঁদের সন্তান পরম্পরায় উৎপন্ন গুরুজন, বিশেষতঃ আমার গুরু, শৈব, মাহেশ্বর, যাঁরা জ্ঞান ও কর্মে তৎপর থাকেন, তাঁরা যেন আমার এই কর্মকে সফল ও সুসম্পন্ন বলে মানেন ॥ ১৬৮-১৬৯ ॥
সিদ্ধান্তমার্গী শৈব, পাশুপত শৈব, মহাব্রতধারী শৈব ও অন্য কাপালিক শৈব পরম্পরায় দীক্ষিত ব্যক্তি - এঁনারা সকলেই শিবের আদেশ পালনকারী এবং আমারও পূজনীয়। অতএব শিবের আদেশে এঁদের সকলের আমার ওপর অনুগ্রহ হোক এবং তাঁরা এই কার্যকে সফল ঘোষণা করুন ॥ ১৭৩-১৭৪ ॥
দেখুন ! আমাদের শৈব পরম্পরা তথা সমগ্র সনাতন ধর্মের প্রথম আচার্য গুরুদেব হিসেবে শ্বেতাশ্বতর মহর্ষিকে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর মাধ্যমে পরবর্তীতে আরো আচার্য হয়েছেন, এভাবেই চলতে চলতে কলিযুগ এলে নকুলীশ (লকুলীশ) নামক অবতার নিয়ে পরমেশ্বর শিবই শৈবপরম্পরার আচার্য হয়ে প্রচার করেন।
এনার মধ্যবর্তী সকল প্রাচীন ঋষি মুনিই ছিলেন আমাদের শৈব আচার্য, যাদের উপর ভিত্তি করে বর্তমানের সনাতনীরা সনাতন ধর্ম নিয়ে গর্ব করে।
আমাদের মহাপাশুপত শৈব পরম্পরার সেই সকল আচার্যদের নাম বলা হয়েছে শিবমহাপুরাণের বায়বীয় সংহিতার উত্তরখণ্ডের ৯ম অধ্যায়ে।
এই অধ্যায়ের শ্লোকের অনুবাদ দিলাম —
🔜 ➡️ “শ্রীকৃষ্ণ বললেন — ভগবন্ ! সমস্ত যুগাবর্তে যোগাচার্যের রূপে ভগবান শংকরের যাঁরা অবতার হন এবং সেই অবতারদের শিষ্যদের সকলের বর্ণনা করুন।
উপমন্যু বললেন — শ্বেত, সুতার, মদন, সুহোত্র, কঙ্কলৌগাক্ষি, মহামায়াবী জৈগীষব্য, দধিবাহ, ঋষভ মুনি, উগ্র, অত্রি, সুপালক, গৌতম, বেদশিরা মুনি, গোকর্ণ, গুহাবাসী, শিখণ্ডী, জটামালী, অট্টহাস, দারুক, লাঙ্গুলী, মহাকাল, শূলী, দণ্ডী, মুণ্ডীশ, সহিষ্ণু, সোমশর্মা ও নকুলীশ্বর এই বারো কল্পের সপ্তম মন্বন্তরে যুগক্রমে আঠাশজন যোগাচার্য প্রকটিত হন। এঁনাদের প্রত্যেকের শান্তচিত্তযুক্ত চারজন করে শিষ্য ছিলেন, যা শ্বেত থেকে রুষ্য পর্যন্ত বলা হয়েছে। আমি তাঁদের ক্রমশঃ বর্ণনা করছি, শোনো।
শ্বেত, শ্বেতশিখ, শ্বেতাশ্ব, শ্বেতলোহিত, দুন্দুভি, শতরূপ, ঋচীক, কেতুমান, বিকোশ, বিকেশ, বিপাশ, পাশনাশন, সুমুখ, দুর্মুখ, দুর্গম, দুরতিক্রম, সনৎকুমার, সনক, সনন্দন, সনাতন, সুধামা, বিরজা, শঙ্খ, অণ্ডজ, সারস্বত, মেঘ, মেঘবাহ, সুবাহক, কপিল, আসুরী, পঞ্চশিখ, বাস্কল, পরাশর, গর্গ, ভার্গব, অঙ্গিরা, বলবন্ধু, নিরামিত্র, কেতুশৃঙ্গ, তপোধন, লম্বোদর, লম্ব, লম্বাত্মা, লম্বকেশক, সর্বজ্ঞ, সমবুদ্ধি, সাধ্য, সিদ্ধি, সুধামা, কশ্যপ, বশিষ্ঠ, বিরজা, অত্রি, উগ্র, গুরুশ্রেষ্ঠ, শ্রবণ, শ্রবিষ্ঠক, কুণি, কুণবাহু, কুশরীর, কুনেত্রক, কাশ্যপ, উশনা, চ্যবন, বৃহস্পতি, উতথ্য, বামদেব, মহাকাল, মহানিল, বাচঃশ্রবা, সুবীর, শ্যারক, যতীশ্বর, হিরণ্যনাভ, কৌশল্য, লোকাক্ষি, কুথুমি, সুমন্ত, জৈমিনী, কুবন্ধ, কুশকন্ধর প্লক্ষ, দার্ভায়ণি, কেতুমান, গৌতম, ভল্লবী, মধুপিঙ্গ, শ্বেতকেতু, উশিজ, বৃহদশ্ব, দেবল, কবি, শালিহোত্র, সুবেষ, যুবনাশ্ব, শরদ্বসু, ছগল, কুম্ভকর্ণ, কুম্ভ, প্রবাহুক, উল্ক, বিদ্যুৎ, শম্বুক, আশ্বলায়ন, অক্ষপাদ, কণাদ, উলুক, বৎস, কুশিক, গর্গ, মিত্রক এবং রুষ্য- এঁরা যোগাচার্যরূপী মহেশ্বরের শিষ্য। এঁদের সংখ্যা একশো বারো। এঁরা সকলেই সিদ্ধ পাশুপত। এঁদের শরীর ভস্মে বিভূষিত থাকে। এঁরা সম্পূর্ণ শাস্ত্রে তত্ত্বজ্ঞ, বেদ ও বেদাঙ্গের পারঙ্গম বিদ্বান। শিবাশ্রমে অনুরক্ত, শিবজ্ঞান-পরায়ণ, সর্বপ্রকার আসক্তিমুক্ত, একমাত্র ভগবান শিবেই মন ন্যস্ত রাখেন, সমস্ত দ্বন্দ্ব সহ্যকারী, ধীর, সর্বভূত-হিতকারী, সরল, কোমল, স্বস্থ, ক্রোধশূন্য ও জিতেন্দ্রিয়। তাঁদের অলংকার হল রুদ্রাক্ষের মালা। তাঁদের মস্তক ত্রিপুঞ্জে অঙ্কিত। তাঁদের মধ্যে কেউ শিখারূপে জটাধারণ করেন, কারো সব কেশই জটারূপ। কেউ কেউ জটা রাখেন না, অনেকে সর্বদা মাথা ন্যাড়া করেন। তাঁরা প্রায়শঃ ফল-মূল খান, প্রাণায়াম সাধনে তৎপর হন। 'আমি শিবের' এই অভিমানযুক্ত হন। সর্বদা শিবের চিন্তায় ব্যাপৃত থাকেন। তাঁরা সংসাররূপ বিষ-বৃক্ষের অঙ্কুরকে মন্থন করেছেন এবং সর্বদা পরমধামে যাবার জন্য উৎসুক থাকেন। যাঁরা যোগাচার্যগণের সঙ্গে এই শিষ্যদের জেনেও মান্য করে সর্বদা শিবের আরাধনা করেন, তাঁরা শিবের সাযুজ্য প্রাপ্ত হন, এর অন্যথা ভাবা উচিত নয়।” ⬅️🔚
🔶 আরো দেখুন — প্রাচীনকালে সকলেই শৈব ছিলেন,
🔆 প্রমাণ দেখুন —
হিতায় সর্বমর্ত্যানাং শিবধর্মং সনাতনম্।
যেন সিদ্ধাঃসুরা দৈত্যা গন্ধর্বোরগরাক্ষসাঃ ॥৮
ঋষয়ঃ কিন্নরা যক্ষস্তথা কিংপুরুষাদয়ঃ।
তথা তথা বিবিধাশ্চান্যে শিবধর্ম পরায়ণাঃ ॥৯
সম্পূজ্যাঃ সসুরাঃ সর্বে তদ্ভক্তাঃ শিবধার্মিকাঃ ।..॥১০
[তথ্যসূত্র : শিবধর্মপুরাণ/১ম অধ্যায়/৮-১০ নং শ্লোক]
✅ অর্থ : মৃত্যুলোকবাসী সকল জীবের জন্য সনাতন শিবধর্ম পরমহিতকারক। এই কারণে, সমস্ত সিদ্ধগণ, দেবতাগণ, দৈত্যগণ, গন্ধর্বগণ, নাগগণ, রাক্ষসগণ, ঋষিগণ, কিন্নরগণ, যক্ষগণ তথা কিংপুরুষাদি ও অনান্য বিবিধ সকলেই শিবধর্ম পরায়ণ হয়েছেন এবং দেবতাদের সাথে শিবের পূজা করে তারা ভক্তিপূর্বক শিবধার্মিক অর্থাৎ শৈব হয়েছেন ॥৮-১০
[এখান থেকে প্রমাণিত হয়ে গেল যে, শৈবধর্ম ই সনাতনধর্ম, প্রাচীন কালে কেউ অশৈব ছিলেন না]
______________________________________________
অপর দিকে, মধ্বাচার্যের ব্রহ্ম-বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের কোনো অস্তিত্ব নেই শাস্ত্রে, পরম্পরার নাম উল্লেখ করা নেই, আচার্য পরম্পরার ক্রম উল্লেখ নেই। প্রাচীনকালে বৈষ্ণবদের পরম্পরার অস্তিত্বহীনতা প্রমাণিত হল।
কিন্তু শৈবপরম্পরার ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে আচার্যদের নাম সহ ক্রম উল্লেখ করা আছে শাস্ত্রে, এমনকি পরম্পরার নাম পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়েছে শিবমহাপুরাণে।
তাই যা শাস্ত্রবিহিত, যা শাস্ত্র সম্মত, যা শাস্ত্রের বচন সিদ্ধ — সেই পরমসত্য ই গ্রহণ যোগ্য, এই কারণে সনাতন ধর্মের শাস্ত্রের আলোকে শৈবপরম্পরা ই একমাত্র সর্বাপেক্ষা প্রাচীন ঐ অদ্বিতীয় সনাতন গুরু পরম্পরা।
মধ্বাচার্যের ব্রহ্ম-বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের প্রাচীনত্ব নেই, সত্যযুগে এই সম্প্রদায়ের কোনো অস্তিত্ব ছিলনা, দ্বাপর যুগ ও ত্রেতাযুগেও এর কোনো অস্তিত্ব ছিল না, কিন্তু কলিযুগ উপস্থিত হতেই রামানুজের শ্রীবৈষ্ণব সম্প্রদায়ের মতোই মধ্বাচার্যের ইচ্ছায় একটি গুরুশিষ্য পরম্পরা রাতারাতি জেগে উঠেছে, যার কোনো শাস্ত্রীয় ভিত্তি নেই। এটিই কলির লীলা, যেখানে সত্যকে চাপা দেবার জন্য অসত্য, অবার্চিন মতবাদগুলি মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে আজ।
শাস্ত্রের নামে নতুন নতুন শ্লোক রচনা করে তা শুনিয়ে অল্পবুদ্ধিযুক্ত ব্যক্তিগণের কাছে অপপ্রচার করবার ক্ষমতার বলে নিজের নব্য ব্রহ্ম-বৈষ্ণব সম্প্রদায় কে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন মধ্বাচার্য। নচেৎ তার পক্ষে কখনোই শৈবদের মধ্যে বিন্দুমাত্র এই অশাস্ত্রীয় তথাকথিত দ্বৈতবাদী বৈষ্ণবীয় সংস্কৃতি প্রবেশ করানো সম্ভব হতো না, সুযোগের ব্যবহার করে মধ্বাচার্য নিজের গুরুপরম্পরা রাতারাতি প্রকট করেছিলেন, তারপর তিনি বিভিন্ন ভাষ্য পুস্তক রচনা করে শাস্ত্রের সর্বত্র বিষ্ণুকেই সর্বোচ্চ ব্রহ্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবার চেষ্টা করেন। এমনকি শৈব আচার্য মহর্ষি শ্বেতাচার্যের শ্বেতাশ্বতর উপনিষদকেও ব্যবহার করে পরমেশ্বর শিবের জন্য বলা শ্রুতিমন্ত্রগুলিকে বিষ্ণুর উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে বলে দাবী করেছেন নিজের রচিত ভাষ্য ইত্যাদি পুস্তকে।
এই কারণে মধ্বাচার্য তথা তার উক্ত নব্য দ্বৈতবাদী ব্রহ্ম সম্প্রদায় নামক বৈষ্ণবপরম্পরার পক্ষ থেকে লিখিত কোনো ভাষ্যই আমাদের শৈবদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। বিকৃত মতবাদের বচন সর্বদা পরিত্যাজ্য, তাই ইচ্ছাকৃতভাবে পরমেশ্বর শিবের উদ্দেশ্যে বাচিত হওয়া বেদমন্ত্রের অর্থের বিকৃতকারী মধ্বাচার্য ইত্যাদি নব্য ব্রহ্ম-বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের কোনো কিছুই আমাদের শৈবদের তথা সমগ্র সনাতন ধর্মে গ্রহণযোগ্যও নয়, মান্যও নয়।
______________________________________________
♦️ তাহলে কি আপনারা বিষ্ণুর পূজা করা, বিষ্ণুর ভক্তি করা কে নিষিদ্ধ বলতে চাইছেন ? আর বিষ্ণুভক্ত দের আপনারা অবৈধ বলে দাবী করছেন ?
✅ উত্তর - দেখুন ! এখানে আলোচ্য বিষয় হল মধ্বাচার্যের ‘ব্রহ্ম-বৈষ্ণব’ সম্প্রদায়ের গ্রহণযোগ্যতার বিষয়ে। শাস্ত্রে কোথাও বিষ্ণুপূজা করাতে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই, বিষ্ণুভক্তিতেও কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। তাই আমরা শৈবরা কখনোই বিষ্ণুপূজা বা বিষ্ণুভক্তিকে অশ্রদ্ধা করি না, নিষিদ্ধ বলেও প্রচার করিনা।
পরমেশ্বর শিবের পূজা করবার মুহূর্তে সকল দেবদেবীর পূজা করতে হয়, তাই স্বাভাবিক ভাবেই ভগবান বিষ্ণুর পূজাও করা হয়ে থাকে। আমাদের মহাপাশুপত শৈব পরম্পরা তথা শাস্ত্রের বচন অনুসারে সকল দেবদেবীর মধ্যে শিবতত্ত্বই মূল কারণ হিসেবে অবস্থিত, এই দৃষ্টিভঙ্গিতে দেবদেবীর পূজা করি। সেক্ষেত্রে ভগবান বিষ্ণুর পূজার সময়েও তার অন্তরে শিব স্থিত অর্থাৎ শিবই বিষ্ণুরূপ ধারণ করে আমার পূজা গ্রহণ করছেন - এমন ভাব হৃদয়ে ধারণ করে আমরা পূজা করে থাকি। তাই ভগবান বিষ্ণুর পূজা বা ভক্তিতে কোন বাধা নেই, বাধা দেওয়ার কথা যারা ভাবনা করে তারা অধর্মী।
🕉️ দেখুন
শিবভক্তির লক্ষণে স্পষ্ট করেই বলা হয়েছে —
শিবজ্ঞানৈকনিষ্ঠানাং শিবজ্ঞানস্য সুব্রতাঃ ।
দূষকস্য শিরশ্ছেদঃ শিবভক্তিঃ প্রকীর্তিতা ॥ ২৮ ॥
ভস্মসাধননিষ্ঠানাং দূষকস্য মুনীশ্বরাঃ ।
ছেদনং শিরসঃ সাক্ষাচ্ছিবভক্তিরুদীরিতা ॥ ২৯ ॥
বিষ্ণবাদীনাং তু দেবানাং দূষকস্য দুরাত্মনঃ ।
বাধনং শিবভক্তিস্তু প্রোক্তা বেদান্তবেদিভিঃ ॥ ৩০ ॥
বিষ্ণবাদিদেবতাভক্তস্যৈব দূষণকারিণঃ ।
বাধনং চ মহাপ্রাজ্ঞৈঃ শিবভক্তিঃ প্রকীর্তিতা ॥ ৩১ ॥
[স্কন্দমহাপুরাণ/সূত সংহিতা/ যজ্ঞবৈভব খণ্ড/পূর্বভাগ/২৬ অধ্যায়/৩০-৩১ নং শ্লোক]
✅ অর্থ : শিবের প্রতি অনুচিত বাক্য প্রভৃতির মাধ্যমে যারা অপরাধ করে, তাদের সম্পূর্ণ উৎসাহসহ দণ্ডিত করাই শিবভক্তি ॥ ২৭ ॥
যিনি একমাত্র শিবজ্ঞানে নিষ্ঠাবান, তাঁর প্রতি বা শিবজ্ঞানের উপর যে কেউ দোষারোপ করে, তার শিরচ্ছেদ করা (শিবভক্ত শাসক কর্তব্য) — এটিকেই শিবভক্তি বলা হয়েছে ॥ ২৮ ॥
যে দুষ্ট হৃদয়যুক্ত ব্যক্তি বিষ্ণু তথা অনান্য দেবদেবীর উপর দোষ আরোপ করেন, তাকে আটকানোই শিবভক্তি ॥ ৩০
বিষ্ণু তথা অনান্য দেবদেবীর ভক্তদের কষ্টপ্রদানকারী ব্যক্তিকে দণ্ড ইত্যাদি (শাস্তি) দ্বারা আটকে দেওয়াই হল শিবভক্তি ॥ ৩১
[খেয়াল করুন আমাদের শাস্ত্রে বলা হয়েছে, শিবনিন্দা করলে তাকে সঠিক উত্তর দেওয়া বা শাস্তি দেওয়াকেই শিবভক্তি বলা হয়েছে, তাই যারা বিষ্ণুভক্ত হয়ে শিবনিন্দা করবার কৌশল অবলম্বন করতে থাকে তাদের শাস্ত্রীয় জবাব দেওয়াটাই ধর্ম, শাস্ত্র তো মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত দিতে বলেছে, কিন্তু আমরা শুধু শিবের পরমত্বের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছি মাত্র, এটি নিন্দা নয়, উত্তর শৈবপক্ষ থেকে। যদি এটি নিন্দা করাই হতো, তবে আমাদের সনাতন শৈবধর্ম এত উদারতা দেখিয়ে বলতো না যে বিষ্ণু ও অনান্য দেবদেবীদের ভক্তকে রক্ষা করাই শিব ভক্তি। এর থেকে প্রমাণিত হয় যে, শৈবরা কতটা উদার। আমরা শৈবরা ধর্মের সঠিক পরিভাষাকে সঠিক রাখবার জন্যই বিচার বিশ্লেষণ করি, এটি নিন্দা নয়। কিন্তু মধ্বাচার্যের তার রচিত মহাভারত তাৎপর্য নির্ণয় গ্রন্থে শ্রীকৃষ্ণের নামে অসত্য বচন লিখে দাবী করেছেন যে, শৈবদের হত্যা করলেই নাকি শ্রেষ্ঠ বৈষ্ণব হওয়া যাবে। কতটা স ন্ত্রাসী মানসিকতা হলে শিবভক্ত শৈবদের এতটা হিংসা করা সম্ভব এটা পাঠকবৃন্দ বিচার করবেন। এখানেই শৈব ও বৈষ্ণবদের মানসিকতার মধ্যে সবচেয়ে বড় তফাৎ।]
আমরা পরমেশ্বর শিবের গুরুপরম্পরার অনুশাসন অনুসারে শৈব, আমাদের অদ্বৈত শৈবপরম্পরার নীতিতে কোথাও কাউকে হিংসা করবার মতো শিক্ষা দেওয়া নেই। তাই ভগবান বিষ্ণুর পূজা বিষয়ে আমাদের শৈবদের কোনো বিদ্বেষ নেই।
সত্য যুগেও শ্রীবিষ্ণুর পূজা ও পরমেশ্বর শিবের পূজা হতো, চিরকাল হয়ে এসেছে, আজও হচ্ছে। এটি চিরাচরিত সত্য, এতে কোনো অসঙ্গতি নেই। কিন্তু আমরা আলোচনা করছি শৈবপরম্পরা ও বৈষ্ণব পরম্পরা মধ্যে কোন পরম্পরা টি সবথেকে প্রাচীন ও শাস্ত্রের দৃষ্টিতে প্রামানিক পরম্পরা ।
পূজা করা ভক্তি করা এটি অন্য একটি প্রসঙ্গের বিষয়, আর পরম্পরার পর্যবেক্ষণ বিশ্লেষণ অন্য একটি প্রসঙ্গের বিষয়। দুটি আলাদা প্রসঙ্গকে এক ভাবা উচিত নয়। গুরুপরম্পরা না থাকা সত্ত্বেও মনসা দেবীর পূজা হয়, শীতলা দেবীর পূজা হয়। তাই দেবদেবীর পূজা করা আর সেই দেবদেবীর গুরু পরম্পরার প্রামাণিকতার আলোচনা করবার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
বৈষ্ণব পরম্পরা না থাকলেও আমরা শৈবরা পরমেশ্বর শিবের পূজা করবার সময়ে শ্রীবিষ্ণুকে পূজা করতাম, নন্দী মহারাজকে পূজা করতাম, কীর্তিমুখকে পূজা করতাম, নবগ্রহ দেবতাকে পূজা করতাম, যেমনটা সত্যযুগেও হতো আজও তেমনই ভাবে পূজা করছি।
কোনো দেবদেবীর গুরুপরম্পরা থাকে এই কারণেই যে, ঐ নির্দিষ্ট দেবী বা দেবতার পরমত্ব যে সর্বোপরি তা সমাজে প্রচার প্রসার করে প্রতিষ্ঠিত করবার জন্য, তাদের দৃষ্টিকোণে সৃষ্টিরহস্য একমাত্র সত্য লাভের পথ, সেটি সমাজে প্রচলিত করবার জন্য, সেই দেবী বা দেবতার পূজার্চনা, সাধনা ইত্যাদি করবার সঠিক পদ্ধতি প্রচার করবার জন্য।
কিন্তু এই কারণে বহু এমন সম্প্রদায়ের জন্ম হয়েছ, যা প্রকৃত সনাতন জ্ঞানের বিপরীত ও অসঙ্গতিপূর্ণ সিদ্ধান্ত দিয়ে মানুষকে ধর্মের সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করে ভুল পথে পরিচালিত করে, ফলে মানুষ সনাতন ধর্মের সঠিক আচার নিয়ম বিধি-বিধান থেকে বঞ্চিত হয়ে যায়। এর ফলে ধীরে ধীরে অজ্ঞানতা গ্রাস করে সমাজকে, আর এরই সুযোগ নিয়ে ধর্মবিদ্বেষী অপপ্রচারকারীরা সনাতন ধর্মকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে শুরু করে।
এই কারণে প্রত্যেক মতবাদ ও সম্প্রদায়ের সিদ্ধান্তকে বিচার বিশ্লেষণ করে সত্যকে উপস্থাপন করবার বিধান স্বয়ং সনাতন ধর্ম আমাদের সকলকে অধিকার হিসেবে দিয়েছেন। কিন্তু তা অবশ্যই সঠিক শাস্ত্রীয় গুরুপরম্পরাগত ক্রমে দীক্ষিত ও শিক্ষাপ্রাপ্ত আচার্য গুরুদেবের সিদ্ধান্ত হতে হবে। যারা হঠাৎ ই একটা নব্য মতবাদ সিদ্ধান্তের উদয় ঘটিয়ে নিজেদের সম্প্রদায় বানিয়ে গুরু শিষ্য পরম্পরা আরম্ভ করে প্রাচীন শাস্ত্র সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিপরীত সিদ্ধান্ত দেন তাদের সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য কি না তা নিয়ে বিচার বিশ্লেষন করা অবশ্যই ন্যায় ও ধর্মসম্মত কার্য।
আর এই কারণেই বৈষ্ণবদের সবচেয়ে পুরাতনের মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে থাকা পরম্পরা ‘মধ্বাচার্যের ব্রহ্ম-বৈষ্ণব সম্প্রদায়’ -এর গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু তা নিয়ে আলোচনা করা হল।
যাতে সমাজের মানুষ এদের নব্য সিদ্ধান্তকে সনাতন ধর্মের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ও একমাত্র সিদ্ধান্ত বলে ভেবে নিয়ে অন্ধকার মার্গে না চলে যায়।
বিষ্ণু পূজা ও বিষ্ণুভক্তি করা শাস্ত্রসম্মত, কিন্তু ভগবান বিষ্ণুর নামে নব্য গুরুপরম্পরা তৈরী করে অসঙ্গতিপূর্ণ সিদ্ধান্ত প্রচার করা কখনোই শাস্ত্রসম্মত নয়, গ্রহণযোগ্যও নয়।
______________________________________________
🔶 অন্তিম সিদ্ধান্ত 🔶
শৈবপরম্পরা সম্পূর্ণভাবে শাস্ত্রসম্মত এবং শৈবপরম্পরাগুলির উল্লেখ শাস্ত্রে রয়েছে এমনকি আচার্য ক্রমও উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু মধ্বাচার্যের ব্রহ্ম-বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের পক্ষে এমন কোনো প্রামাণিকতা নেই। শাস্ত্রপ্রমাণহীন, শাস্ত্রে উল্লেখহীন গুরুপরম্পরাহীন মধ্বাচার্যের ব্রহ্ম-বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের যে কোনো নব্য সিদ্ধান্ত, নব্য ভাষ্য অগ্রহণযোগ্য তথা সর্বদা পরিত্যাজ্য। কারণ, যেখানে গুরুপরম্পরারই অস্তিত্ব নেই সেখানে পরবর্তীকালের ভাষ্যের কোনো গ্রহণযোগ্যতাই থাকে না।
শৈবপরম্পরাই সনাতন ধর্মের সবচেয়ে প্রাচীনতম এক ও অদ্বিতীয় গুরুপরম্পরা। এক্ষেত্রে মধ্বাচার্যের ব্রহ্ম-বৈষ্ণব সম্প্রদায় অবার্চীন, নবীন ও গৌণ অপসম্প্রদায় মাত্র।
______________________________________________
✍️ সত্য উন্মোচনে — শিবালয় প্রতিষ্ঠাতা শিবদ্বারাধীশাধ্যক্ষ আচার্যপরমাধিকারী শ্রীগুরু নন্দীনাথ শৈব আচার্যদেব জী
©️ কপিরাইট ও প্রচারে : Shivalaya 🔥
শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্ 🚩
ॐ নমঃ পার্বতীপতয়ে হর হর মহাদেব 🚩
#বৈষ্ণবমতখণ্ডন #ভণ্ডবৈষ্ণবদমন #বৈষ্ণবমতবাদখণ্ডন #বৈষ্ণবদেরভণ্ডামীফাঁস #দ্বৈতবাদেরখণ্ডন #শিবালয় #শিবধর্ম #সনাতনধর্ম #Shivalaya #মধ্বচার্যেরখণ্ডন #ব্রহ্মবৈষ্ণবপরম্পরাখণ্ডন #মধ্বমতখণ্ডন #ব্রহ্মসম্প্রদায়খণ্ডন
[This Post is Only for Public Awareness.]

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন