সত্যার্থপ্রকাশে দয়ানন্দ কর্তৃক “তীর্থ” শব্দের অপব্যাখ্যা খণ্ডন ও আপত্তি নিরসন—
🔻সত্যার্থপ্রকাশে দয়ানন্দ কর্তৃক “তীর্থ” শব্দের অপব্যাখ্যা খণ্ডন ও আপত্তি নিরসন —
❌ সত্যার্থপ্রকাশে তীর্থ শব্দ নিয়ে দয়ানন্দের বালখিল্য ব্যাখ্যা —
প্রশ্ন- আচ্ছা, কোন তীর্থ, নাম-স্মরণ-সত্য কিনা?
উত্তর- হাঁ। বেদাদি সত্য-শাস্ত্রের অধ্যয়ন-অধ্যাপন, ধার্মিক বিদ্বান্ ব্যক্তিদের সঙ্গ, পরোপকার, যোগাভ্যাস, নির্বৈরতা, নিষ্কপটতা, সত্যভাষণ, সত্যগমন, সত্যানুষ্ঠান, ব্রহ্মচর্য্য আচার্য্য-অতিথি-মাতা-পিতার সেবা, পরমেশ্বরের স্তুতি-প্রার্থনা-উপাসনা, শান্তি, জিতেন্দ্রিয়তা, সুশীলতা, ধর্মসঙ্গতপুরুষকার এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান আদি শুভগুণ-কর্ম দুঃখ হইতে উদ্ধার করে বলিয়া এসকলের নাম 'তীর্থ'।
জল-স্থলময় স্থান আদি কখনও তীর্থ হইতে পারে না। কারণ "জনা য়ৈস্তরন্তি তানি তীর্থাণি" মনুষ্য যে কর্ম করিয়া দুঃখ হইতে পার হয় তাহার নাম 'তীর্থ'। জল, স্থল পার করে না কিন্তু ডুবাইয়া মারে। তবে নৌকা প্রভৃতির নাম 'তীর্থ' হইতে পারে। কারণ তদ্বারা সমুদ্রাদি পার হওয়া যায়।
সমানতীর্থে বাসী ॥১ ৷ (অষ্টা০ ৪।৪।১০৭)
নমস্তীর্থ্যায় চ ॥২॥ (যজু০ অ০১৬)
যে-সকল ব্রহ্মচারী একসঙ্গে একই আচার্য্যের নিকট একই শাস্ত্র অধ্যয়ন করে, তাহারা সকলেই 'সতীর্থ' এবং সমান-তীর্থসেবী ॥১॥
যিনি বেদাদি শাস্ত্র এবং সত্যভাষণাদি ধর্মলক্ষণযুক্ত বলিয়া সাধু, তাঁহাকে অন্নাদি প্রদান পূর্বক তাঁহার নিকট হইতে বিদ্যাগ্রহণ করা ইত্যাদিকে 'তীর্থ' বলে।।
[সত্যার্থপ্রকাশ/একাদশ সমুল্লাস/২৫৬ নং পৃষ্ঠা]
✅শৈবপক্ষ দ্বারা খণ্ডন—
“কাক যেমন ময়ূরের পেখম লাগালে ময়ূর হয় না”। তেমনি নামের পরে “সরস্বতী” পদ লাগিয়ে দিলেই বিদ্যার সাগর হয় না।
তথাকথিত মহর্ষি দয়ানন্দ তার সত্যার্থপ্রকাশের একাদশ সমুল্লাসে “তীর্থপ্রকরণ”এ বলেছেন- তীর্থ অর্থ হলো-
“তীর্থ = এমন ব্যক্তি যার দান, শিক্ষা, সত্যভাষণ ও ধর্মসংগত আচরণ দ্বারা লোক বা সমাজ দুঃখ থেকে মুক্তি পায়, স্থান বা নদী-ঘাট নয়।”
অর্থাৎ, দয়ানন্দ এখানে ‘তীর্থ’ কে মূলত শুভগুণ/ব্যক্তি-বিশেষের নাম হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। যার জন্য পাণিনী অষ্টাধ্যায়ী এর ৪/৪/১০৭ নং সূত্র প্রমাণ হিসেবে উদ্ধৃত করেছেন। চলুন প্রথমে “তীর্থ” শব্দের ব্যুৎপত্তি ও অর্থ সম্পর্কে জেনে নিই—
👉 উণাদিসূত্র ২/৭ ব্যাখ্যায় তীর্থ শব্দের অর্থ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে এইভাবে বলা হয়েছে—
“তরন্তি যেন যত্র বা তৎ তীর্থম্”
অর্থ— “যার দ্বারা (লোক) পার হয়, অথবা যেখানে (পারাপার) করা হয় সেটাই তীর্থ।”
এখানে ‘তরন্তি’ ধাতু (তৃ = তরণ/অতিক্রম/পার হওয়া) দিয়ে স্পষ্ট করেছে– তীর্থ হলো অতিক্রমস্থান। নদীর যেখানে পারাপার করা হয়। নদীর ঘাট। যেখান দিয়ে যাওয়া/অতিক্রম সম্ভব। সাধুসন্তরা যেটাকে ‘পবিত্র অতিক্রমস্থল’ হিসেবে ব্যবহার করেন।
👉তীর্থ শব্দের ব্যুৎপত্তি—
উণাদি ২/৭ তৃ (ধাতু- প্লবন/সন্তরণ) + থক্ (প্রত্যয়) = ত্র্থ / তির্থ। এর পরে- ঋ-ধাতুর ই-আদেশ (পাণিনী ৭/১/১০০) = তির্থ। হলি চ (পাণিনী ৮/২/৭৭) মতে রেফ-দীর্ঘ = তীর্থ। শেষে সু-প্রত্যয় যোগে- তরীর্থ + সু = তীর্থঃ। অর্থাৎ- পুরো ব্যুৎপত্তি বলছে- তীর্থ = “যেখানে পার হওয়া যায়”। (অর্থাৎ- নদীঘাট, স্নানস্থান, অতিক্রমস্থান)
উপরোক্ত ব্যাখ্যা থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে- তীর্থ শব্দ তৃ (প্লবন, সন্তরণ) ধাতু থেকে। অর্থ অত্যন্ত সুস্পষ্ট- “অতিক্রম করার স্থান”, “ঘাট”, “পারাপারের জায়গা”। এটি পুরোপুরি নিরুক্তের ব্যাখ্যার সঙ্গে মিলে যায়।
👉যাস্ক নিরুক্ত বলছে—
“সুবাস্তুনদী, তুগ্ব তীর্থং ভবতি, তূর্ণমেতদায়ন্তি” ॥৮॥
[যাস্ক নিরুক্ত/৪/১৫/৮]
সুবাস্তুঃ নদী (সুবাস্তু-একটি নদীর নাম), তুগ্ব তীর্থং ভবতি ('তুগ্বন' শব্দের অর্থ তীর্থ); এতৎ (তীর্থে) ভূর্ণং (ক্ষিপ্রতার সহিত) আয়স্তি (আগমন করে)।
এখানে দানের সহিত সম্বদ্ধ আছে বলিয়া 'সুবাস্তু' শব্দে নদী বুঝাইতেছে-নদীতীরে গিয়া দান করা সর্ব্বজনপ্রসিদ্ধ; 'সুবাস্তাঃ অধি তুগ্বনি'-এই স্থলে আবার সুবাস্তু নদীর সহিত 'তুগ্ব' শব্দের সম্বন্ধ নিবন্ধন 'তুগ্ব' শব্দেও তীর্থ বুঝাইতেছে। 'তুগ্ব' শব্দ 'তূর্ণ' শব্দপূর্ব্বক 'গম্' ধাতুর উত্তর 'বনিপ্' প্রত্যয়ে নিষ্পন্ন; লোক জলপানার্থ অথবা অবগাহনের নিমিত্ত তূর্ণং অর্থাৎ ক্ষিপ্রতার সহিত নদীর তীর্থে (ঘাটে) গমন করে।
অর্থাৎ— যেখানে দ্রুত গমন করে (পার হয়), সেই নদীর ঘাটই তীর্থ।”
নিরুক্ত আরও বলে- তীর্থে স্নান, অবগাহন হয়, তীর্থে দান হয়, তীর্থ গমনস্থল। তীর্থ উচ্চারণ-সম্বন্ধযুক্ত শব্দ যেমন “তুগ্ব” যার অর্থও ঘাট/তীর্থ।
নিরুক্ত তীর্থকে নদীর পারাপারের স্থান ও ধর্মীয় ঘাট হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তাহলে উপরোক্ত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ থেকে প্রমাণিত হলো দয়ানন্দের ব্যাখ্যা একপাক্ষিক মাত্র। যেখানে তীর্থ শব্দ দ্বারা অনেক কিছুও বোঝায়। যেমন—
কর্ম তীর্থ, জ্ঞান তীর্থ, ধর্ম তীর্থ, সাধন তীর্থ আদি আদি। কিন্তু, দয়ানন্দ যা ব্যাখ্যা করেছে তা শাস্ত্রের বিপরীত একপাক্ষিক ব্যাখ্যা মাত্র।
যেমন- সায়ণাচার্য পরমেশ্বর শিবের স্তুতি করতে গিয়ে বলেছেন— "যস্য নিঃশ্বসিতং বেদা যো বেদেভ্যোহখিলং জগৎ। নির্মমে তমহং বন্দে বিদ্যাতীর্থ মহেশ্বরম্"॥ [তৈত্তিরীয় সংহিতা]
অর্থাৎ- যার নিশ্বাস থেকে বেদের প্রাকট্য সেই বিদ্যার তীর্থ মহেশ্বরকে বন্দনা করি।
এখানে তীর্থ শব্দের প্রয়োগ হয়েছে বিদ্যার অধিশ্বর হিসেবে। সেই বিদ্যার অধীশ্বর যার থেকে সমস্ত জ্ঞান প্রবাহিত হয়, তাই শ্রুতি শিবকে “ ঈশান সর্ববিদ্যানাং” বলে স্তুতি করে। অর্থাৎ- শিব আধ্যাত্মিক জ্ঞানমাধ্যম হিসেবে তীর্থ শব্দের প্রয়োগ সায়ণচার্য করেছেন।
—————————————————————————————————————————————
👉 চলুন এবার দয়ানন্দের দাবীর অসঙ্গতি গুলো দেখে নেওয়া যাক—
◾১️. ব্যুৎপত্তিগত অসঙ্গতি—
❌অসঙ্গতি — দয়ানন্দ বলেন তীর্থ = শুধুমাত্র পুণ্যবান ব্যক্তি বা গুণকর্ম।
✅মীমাংসা— উণাদি ২/৭ তৃ + থক্ = তীর্থ “যেখানে পার হওয়া যায়, অতিক্রমযোগ্য স্থান”। উণাদি সূত্রে স্পষ্টভাবে স্থানভিত্তিক অর্থ বলা হয়েছে, ব্যক্তির নাম বা গুণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা শাস্ত্রসম্মত নয়।
—————————————————————————————————————————————
◾২️. নিরুক্তের সাথে বিরোধ —
❌অসঙ্গতি — দয়ানন্দ বলেন- জল বা স্থলময় স্থান তীর্থ হতে পারে না, কেবল ব্যক্তি বা গুণই তীর্থ।
✅মীমাংসা — নিরুক্ত ৪/১৫/৮ সুবাস্তুনদী, তুগ্ব তীর্থং = নদীর ঘাট, যেখানে দান, স্নান এবং অতিক্রম ঘটে।
নদী-ঘাট এবং তীর্থের পারাপারের স্থান স্পষ্টভাবে শাস্ত্র ও নিরুক্তে চিহ্নিত, দয়ানন্দের ব্যাখ্যা এটি উপেক্ষা করে।
রামায়ণে বলা হয়েছে —
যানি ত্বত্তীরবাসীনি দৈবতানি চ সন্তি হি।
তানি সর্বাণি যক্ষ্যামি তীর্থান্যায়তনানি চ ।। ৯০।।
[বাল্মিকী রামায়ণ/অযোধ্যা কাণ্ড/৫৩ সর্গ/৯০ নং শ্লোক]
অর্থ— ' হে দেবি ! তোমার তীরে যে সকল দেবতা বাস করেন এবং যে সকল তীর্থক্ষেত্র ও মন্দির আছে, তাদের সকলকেই আমি পূজা করব।।
গঙ্গার যদি কোনো মাহাত্ম্যই না থাকতো তবে দেবী সীতা কেন এভাবে প্রার্থনা জানাচ্ছেন ? তীর্থ ক্ষেত্রে স্নান, পূজন আদির বিশেষ ফল লাভ হয় তা উক্ত শ্লোক দ্বারাই প্রমাণিত।
এখানে স্পষ্ট ভাবে তীর্থ অর্থ ধর্মতীর্থ বোঝানো হয়েছে। এবং নদী, মন্দির আদিও যে তীর্থ তাও প্রমাণিত হয়।
এখানে দয়ানন্দের আরও একটি দাবীর খণ্ডন হয় যেখানে দয়ানন্দ বলেছেন - তীর্থ সকল ৫০০ থেকে ১০০০ বছর আগে জৈন আদিদের দেখে নির্মিত হয়েছে। এসব তীর্থ আধুনিক, প্রাচীন নয়।
তাহলে দয়ানন্দকে বলতে চাই - যদি ৫০০ ও ১০০০ বছর আগে তীর্থক্ষেত্র নির্মিত হয়েছে তবে - রামায়ণে তীর্থক্ষেত্রে উল্লেখ কীভাবে আসলো ? রামায়ণ তো মহাভারতের চেয়েও প্রাচীন। তবে তীর্থস্থান আধুনিক হয় কীভাবে ? মহাভারতে তীর্থের অসীম মাহাত্ম্য বলা আছে অর্থাৎ, সাধারণ ভাবে ৫০০০ বছর আগে তীর্থের যাত্রা, স্নান, জপ, তপ, হোম, দান, দেবতা অর্চন আদির প্রচলন ছিলো। তবে এখন তা কীভাবে আধুনিক হয়ে গেলো তা তো দয়ানন্দ হয়তো নিজেও জানে না। এবার হয়তো নিজেদের পীঠ বাঁচাতে বলেই দেবে যে - রামায়ণ মহাভারতও প্রক্ষিপ্ত 🤭।।
দয়ানন্দের সবচেয়ে বড় দ্বিচারিতা হল - তিনি ৫০০ বছর আগের পাণ্ডাদের নথিকে প্রমাণ হিসেবে মানছেন কিন্তু, রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণকে প্রমাণ হিসেবে মানছেন না।
—————————————————————————————————————————————
◾৩️. পাণিনী ও সতীর্থ সূত্রের বিরোধ—
❌ অসঙ্গতি— দয়ানন্দ বলেন- তীর্থ অর্থ শুধু ব্যক্তি/শুভগুণ।
✅মীমাংসা — অষ্টাধ্যায়ী ৪/৪/১০৭- সতীর্থ = সমান-তীর্থে একত্রে অধ্যয়নকারী।
সতীর্থ ব্যাখ্যা দেখায় তীর্থের মূল অর্থ স্থলভিত্তিক, সম্পর্কসূচক, শুধু গুণকে তীর্থ বলা ভুল। তীর্থ' শব্দটির মূল ধাতু হলো 'তৃ' (তরণ করা)। যা দিয়ে তরণ করা হয় বা যেখানে তরণ করা হয়, সেটিই তীর্থ। এটি যেমন জ্ঞান হতে পারে, তেমনি একটি নির্দিষ্ট পবিত্র ঘাট বা স্থানও হতে পারে।
তীর্থ- এটি একটি বিশেষ্য পদ, যা পবিত্র স্থান, জলাশয় বা ঋষিদের আবাসস্থলকে বোঝায়।
সতীর্থ- এটি একটি সম্বন্ধবাচক শব্দ। সতীর্থ হতে গেলে একটি 'তীর্থ' বা স্থানের প্রয়োজন (যেমন গুরুকুল বা পাঠশালা)। সুতরাং স্থান বা আধারকে অস্বীকার করলে 'সতীর্থ' শব্দটির অস্তিত্বই সংকটে পড়ে।
দয়ানন্দ 'তীর্থ' শব্দটিকে কেবল আধ্যাত্মিক বা গুণবাচক অর্থে সীমাবদ্ধ করতে চেয়েছেন (যেমন- সুশীলতা, সত্যভাষণ)। কিন্তু, বৈদিক সাহিত্যে এবং নিরুক্তে (যাস্ক মুনি) স্পষ্টভাবে নদী ও ঘাটের উল্লেখ পাওয়া যায়। দয়ানন্দের বক্তব্য অনুযায়ী- গুণ বা ব্যক্তি তীর্থ হতে পারে (জঙ্গম তীর্থ), কিন্তু তার মানে এই নয় যে ভৌগোলিক বা স্থাবর তীর্থগুলো (স্থাবর তীর্থ) অস্তিত্বহীন।
তীর্থ ও সতীর্থ শব্দ দুটিকে এক করে দেখা ভুল। তীর্থ হলো একটি পবিত্র স্থান (যেমন গঙ্গা বা বারাণসী), যেখানে মানুষ স্নান, দান ও ঈশ্বর আরাধনা করে। আর সতীর্থ হলো সেই স্থানে একত্রে অবস্থানকারী সহপাঠী। 'নিমন্ত্রণ' ও 'আমন্ত্রণ' যেমন আলাদা, তেমনি তীর্থ (স্থান) ও সতীর্থ (সম্পর্ক) ভিন্ন অর্থ বহন করে। প্রসঙ্গভেদে 'তীর্থ' শব্দের অর্থ বুঝতে হবে, কেবল গুণকে তীর্থ বলে স্থাবর তীর্থকে অস্বীকার করা শাস্ত্রসম্মত নয়।
—————————————————————————————————————————————
◾৪️. বেদ-ইতিহাস ব্যবহারের বিরোধ—
❌ অসঙ্গতি — দয়ানন্দ সরস্বতী বলেন - শুধু গুণকর্মই তীর্থ।
✅ মীমাংসা — বেদ, ইতিহাসে তীর্থ হলো- নদী, হ্রদ, পবিত্র স্থান যেখানে দান, স্নান, যজ্ঞ হয়। শাস্ত্রপ্রচলিত স্থানবোধকে উপেক্ষা করে ব্যক্তিগত গুণের উপর দৃষ্টি দিচ্ছে, বেদ ইতিহাসে নদী বা পবিত্র স্থানকেই প্রধান ধ্যান।
👉 রামায়ণের বালকাণ্ডের ৩৫ নং স্বর্গে বলা হয়েছে—
তে শৈলরাজস্য সুতে লোকনমষ্কৃতে।
গঙ্গাং চ সরিতাং শ্রেষ্ঠা উমাদেবী চ রাঘব ।। ২২।।
"হে রঘুনন্দন রাম! গিরিরাজ হিমালয়ের এই দুই লোকপূজ্যা কন্যা নদীশ্রেষ্ঠা গঙ্গাদেবী এবং উমাদেবী।
এতৎ তে সর্বমাখ্যাতং যথা ত্রিপথগামিনী ।
খং গতা প্রথমং তাত গতিং গতিমতাং বর ।। ২৩ ।।
সৈষা সুরনদী রম্যা শৈলেন্দ্রতনয়া তদা।
সুরলোকং সমারূঢ়া বিপাশা জলবাহিনী।। ২৪।।
"জ্ঞানিশ্রেষ্ঠ বৎস রাম! যেরূপে সেই ত্রিপথগা (স্বর্গ-মর্ত্য-পাতাল-প্রবাহিণী) গঙ্গা প্রথমে আকাশে (আকাশগঙ্গারূপে) প্রবাহিতা হয়েছেন, তৎপরে সেই রমণীয়া শৈলসুতা সুরনদী পাপনাশিনী জলরূপে সুরলোকে (দেবলোকে) আরোহণ করেছেন- তা সকলই তোমাকে বললাম।"
শুরুতেই রামায়ণে অযোধ্যা কাণ্ডের উদ্ধৃত দিয়ে দেখিয়েছি গঙ্গা হলো তীর্থস্থান। তার স্পষ্টিকরণ হয় এই শ্লোক গুলোতেও যেখানে গঙ্গাকে পাপবিনাশিনী পবিত্র নদী হিসেবেই বর্ণনা করা হয়েছে।
সুতরাং, গঙ্গা স্নানও তীর্থের অংশ তা এখানেই প্রমাণিত হয়ে যায়। এবং দয়ানন্দের দাবীরও খণ্ডন হয় যে- তীর্থ স্নানের কোনো ফল হয় না এমন দাবী এখানে খণ্ডিত হয়। কেননা- বলাই আছে গঙ্গা পাপবিনাশিনী।
এবং এই পাপবিনাশিনী তীর্থ গঙ্গার উল্লেখ বেদেও রয়েছে—
যত্র গঙ্গা চ যমুনা যত্র প্রাচী সরস্বতী।
যত্র সোমেশ্বরো দেবস্তত্র মামমৃতং কৃধীন্দ্রায়েন্দ্রো পরি স্রব।।
[ঋগবেদ/আশ্বলায়ণ শাখা/৯/১৫৫/৫]
অর্থ— “যেখানে গঙ্গা ও যমুনা, এবং যেখানে প্রাচীন সরস্বতী নদী প্রবাহিত হচ্ছে, এবং সেইস্থান যেখানে সোমেশ্বর দেব বিরাজমান, সেখানে হে সোম! আমার জন্য অমৃতত্ত্ব প্রদান করো তথা ইন্দ্রের জন্য চারপাশ থেকে প্রবাহিত হও।”
ইমং মে গঙ্গে যমুনে সরস্বতি শুতুদ্রি স্তোমং সচতা পরুষ্ণ্যা।
অসিক্ত্যা মরুদবৃধে বিতস্তয়াার্জীকীয়ে শৃণুহ্যা সুষোময়া ॥ ৫ ॥
[ঋগবেদ/১০/৭৫/৫]
সায়ণ ভাষ্য— অত্র প্রধানভূতাঃ সপ্ত নদ্যস্তদবয়বভূতা নদ্যস্তিস্রঃ স্তূয়ন্তে। হে "গঙ্গে হে "যমুনে হে "সরস্বতি হে "শুতুদ্রি হে "পরুষ্ণি। হে "অসিক্ত্যা অবয়বভূতয়া সহিতে "মরুদবৃধে হে "বিতস্তয়া "সুষোময়া চ সহিতে "আর্জীকীয়ে ত্বং চ এবং সপ্ত নদ্যো যূয়ং "মে "স্তোমং স্তোত্রমস্মদীয়ম্ "আ "সচত আসেবধ্বম্। "শৃণুহি শৃণুত চ। আর্জীকীয়ায়া বিতস্তয়া সুষোময়া চ সাহিত্যং নিরুক্ত উক্তং -- ‘ বিতস্তয়া চার্জীকীয়া আ শৃণুহি সুষোময়া চ ' ইতি। অত্র 'গঙ্গা গমনাৎ' (নিরু. ৯.২৬) ইত্যাদি নিরুক্তং দ্রষ্টব্যম্ ॥
অনুবাদ— হে গঙ্গা, যমুনা, সরস্বতী, শতদ্রু (সুতলেজ) এবং পরুষ্ণী (রাভি)! তোমরা আমার এই স্তুতি গ্রহণ করো। হে অসিক্নী (চেনাব) যুক্ত মরুদবৃধা এবং বিতস্তা (ঝিলাম) ও সুষোমা (সোহান) যুক্ত আর্জীকীয়া! তোমরা সকলে সম্মিলিতভাবে আমার এই স্তোত্র শ্রবণ করো এবং এই যজ্ঞে সেবা প্রদান করো।
এখানে বিচার্য এই যে, যদি গঙ্গাদি নদীর অধিষ্ঠাত্রী দেবতা না থাকত, তবে তাদের আবাহন কীভাবে সম্ভব? আর স্তুতি শোনার প্রার্থনাই বা কীভাবে হতো? এই কারণে গঙ্গাদি তীর্থকে 'অতীর্থ' বলা অজ্ঞানতা।
সরস্বতী সরয়ুঃ সিন্ধুরূর্মিভির্মহো মহীরবসা যন্তু বক্ষণীঃ।
দেবীরাপো মাতরঃ সূদয়িত্বো ঘৃতবৎ পয়ো মধুমন্নো অর্চত ॥ ৯ ॥
[ঋগবেদ/শাকল শাখা/১০/৬৪/৯]
সায়ণ ভাষ্য— মহঃ মহতোঽপি মহীঃ মহত্যোঽত্যন্তং মহত্যঃ ঊর্মিভিঃ সহিতাঃ সরস্বতী সরয়ুঃ সিন্ধুঃ এতদাদ্যা একবিংশতিসংখ্যাকাঃ বক্ষণীঃ ইমা নদ্যঃ অবসা রক্ষনেন হেতুনা আ যন্তু অস্মদীয়ং যজ্ঞং প্রত্যাগচ্ছন্তু। ততঃ দেবীবঃ দেবনশীলাঃ মাতরঃ মাতৃভূতাঃ সূদয়িত্বঃ প্রেরয়িত্র্যঃ তাসাাম্ আপঃ ঘৃতবৎ ঘৃতযুক্তং মধুমৎ মধুসহিতমাত্মীয়ং পয়ঃ নঃ অস্মভ্যম্ অর্চত প্রয়চ্ছন্তু ।।
অনুবাদ— তরঙ্গময়ী মহান নদী সরস্বতী, সরযূ এবং সিন্ধু, তাদের রক্ষাকারী শক্তি নিয়ে আমাদের যজ্ঞে আগমন করুক। সেই দিব্য নদীগণ আমাদের জননীর ন্যায়, তাঁরা যেন আমাদের ঘৃত ও মধুর ন্যায় পুষ্টিকর ও প্রীতিদায়ক জল (বা দুগ্ধ) দান করেন।
আপো ভূয়িষ্ঠা ইত্যেকো অব্রবীদগ্নির্ভূয়িষ্ঠ ইত্যন্যো অব্রবীৎ।
বধর্যন্তীং বহুভ্যঃ প্রৈকো অব্রবীদৃতা বদন্তশ্চমসাঁ অপিংশত ॥ ৯ ॥
[ঋগবেদ/শাকল শাখা/১/১৬১/৯]
সায়ণ ভাষ্য— চমসচতুরধাকরণকালে কিমিতি সত্যং বদন্তো ব্যভজন্নিতি তদাহ। “একঃ ত্রয়াণামন্যতমঃ “আপো “ভূয়িষ্ঠাঃ “ইতি “অব্রবীত নহি উদকাৎ প্রশস্তং লোকোপকারকং তত্ত্বান্তরমস্তি। আপো ভূয়িষ্ঠাঃ ইতি ঋতম্ অবাদীৎ। অপামেব শ্রেষ্ঠত্বম্ 'অপ এব সসর্জাদৌ' (মনু. ১.৮) ইত্যাদিশাস্ত্রাৎ। তথা “অন্যঃ “অগ্নির্ভূয়িষ্ঠ “ইতি “অব্রবীত।...এবম্ “ঋতা ঋতানি উক্তরূপানি যথার্থানি বাক্যানি “বদন্তঃ পরস্পরং ব্রুবন্তঃ “চমসান্ “অপিংশত …. (সংক্ষেপিত)।।
অনুবাদ— (ঋভুগণের মধ্যে) একজন বললেন, "জলই সর্বশ্রেষ্ঠ" (কারণ জলই সৃষ্টির আদি ও পরম উপকারক)। অন্যজন বললেন, "অগ্নিই সর্বশ্রেষ্ঠ" (কারণ পাক ও দহনাদি কার্যে অগ্নিই জগতের ধারক)। আবার অন্যজন বহু প্রাণীর হিতকারী মেঘ বা ভূমিকে শ্রেষ্ঠ বললেন। এইভাবে তাঁরা সত্য কথা বলতে বলতে সোমরস পানের পাত্রগুলো (চমস) বিভাজন করলেন।
তীর্থৈস্তরন্তি প্রবতো মহীরিতি যজ্ঞকৃতঃ সুকৃতো যেন যন্তি।
অত্রাদধুর্যজমানায় লোকং দিশো ভূতানি যদকল্পয়ন্ত ॥
[অথর্ববেদ/২৮/৪/৭]
পদার্থঃ — (তীর্থৈঃ) তীর্থসমূহের দ্বারা (প্রবতঃ) প্রকৃষ্ট বা অত্যন্ত (মহী) বড় বিপত্তিকে (ইতি) এইভাবে (তরন্তি) তরে যান অর্থাৎ তীর্থের মাধ্যমে বড় বড় পাপ নষ্ট হয়ে যায়; (যজ্ঞকৃতঃ) যজ্ঞ সম্পাদনকারীরা ও (সুকৃতঃ) পুণ্য কর্মকারীরা (যেন) যে মার্গের দ্বারা (যন্তি) গমন করেন, তাঁরা (অত্র) এই পুণ্যলোক প্রাপ্তির সাধনার মার্গে উপনীত হন; (যজমানায়) যজমানের নিমিত্ত (লোকম্) পুণ্যলব্ধ লোক বা স্থানের (অদধুঃ) বিধান করুন; (যৎ) যা (দিশঃ) দিকসমূহ ও (ভূতানি) সর্ব প্রাণীবর্গ অর্থাৎ দিকসমূহে স্থিত প্রাণীরা যজমানের নিমিত্ত (অকল্পয়ন্ত) কল্পনা করেন।এতে তীর্থের মাধ্যমে (পাপ বা সংসার) তরণ করার বিষয়টি স্পষ্ট।
🔘 বিচার -
দয়ানন্দ তাঁর 'সত্যাথ প্রকাশ' গ্রন্থে দাবি করেছেন যে, বর্তমান তীর্থগুলো আধুনিক (৫০০-১০০০ বছরের পুরনো) এবং বেদে তীর্থ বলতে কেবল 'বিদ্যা' বা 'সত্যভাষণ' বোঝানো হয়েছে। কিন্তু উপরের মন্ত্র ও ভাষ্যগুলো তাঁর এই দাবিকে নিম্নলিখিতভাবে খণ্ডন করে-
ঋগ্বেদের শাকল শাখায় (১০/৭৫/৫ এবং ১০/৬৪/৯) গঙ্গা, যমুনা, সরস্বতী, সিন্ধু ও সরয়ুর মতো নির্দিষ্ট নদীর নাম উল্লেখ করে স্তুতি করা হয়েছে। দয়ানন্দ সরস্বতীজী এগুলোকে কেবল রূপক বলতে চাইলেও বেদের শব্দাবলী ('উর্মিভিঃ' বা তরঙ্গযুক্ত, 'প্রতরণায়' বা পার হওয়ার ঘাট) স্পষ্টতই ভৌগোলিক জলাধার বা তীর্থের অস্তিত্ব প্রমাণ করে।
যজুর্বেদ ও অথর্ববেদে 'তীর্থ' শব্দটি 'পার হওয়ার স্থান' বা 'ঘাট' অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অথর্ববেদের 'তীর্থৈস্তরন্তি' (তীর্থের দ্বারা তরণ করে) বাক্যটি দয়ানন্দজীর 'জলাদি তীর্থ হতে পারে না' এই মতের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। সায়ণ ভাষ্য অনুযায়ী, এই তরণ কেবল শারীরিক নয়, বরং পাপমোচন ও পুণ্যলোক প্রাপ্তির মাধ্যমও বটে।
দয়ানন্দজী দাবি করেন তীর্থগুলো জৈনদের দেখাদেখি ১০০০ বছরের মধ্যে তৈরি। কিন্তু ঋগ্বেদ ও অথর্ববেদের এই মন্ত্রগুলোর প্রাচীনত্ব অনন্ত। মহাভারতেও (যা দয়ানন্দ সরস্বতীজীর মতে ৫০০০ বছর আগের) তীর্থযাত্রার বিস্তৃত বিবরণ আছে। সুতরাং, তীর্থকে আধুনিক বলা ঐতিহাসিক ও শাস্ত্রীয়ভাবে অসঙ্গত।
দয়ানন্দ নদীকে কেবল জল মনে করতেন। কিন্তু ঋগ্বেদ (১০/৬৪/৯) স্পষ্ট ভাষায় নদীকে 'দেবী' এবং 'মাতরঃ' (মা) বলে সম্বোধন করেছে। যদি নদী কেবল জড় পদার্থ হতো, তবে বেদে তাদের কাছে 'রক্ষার' (অবসা) বা 'স্তুতি শোনার' (শৃণুহি) প্রার্থনা করা হতো না।
সুতরাং- শাস্ত্রীয় বিচারে এটি স্পষ্ট যে, বৈদিক ঋষিগণ গঙ্গা-যমুনাদি নদী ও নির্দিষ্ট জলাধারকে পবিত্র তীর্থ হিসেবে মানতেন। দয়ানন্দ সরস্বতী তীর্থের যে আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন তা প্রশংসনীয় হলেও, ভৌগোলিক তীর্থের অস্তিত্ব ও মাহাত্ম্যকে অস্বীকার করা বেদের মূল সংহিতা ও সায়ণ ভাষ্যের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
—————————————————————————————————————————————
◾৫️. কার্যগত অর্থের অসঙ্গতি—
❌ অসঙ্গতি— দয়ানন্দ বলেন- তীর্থ ক্ষেত্র আদি স্থান মূল তীর্থ নয়, কেবল ধ্যান/গুণের উপর মনোযোগ হলো তীর্থ।
✅মীমাংসা— শাস্ত্র উদ্ধৃতি ও ব্যাকরণ অনুযায়ী- তীর্থ হলো অতিক্রমযোগ্য স্থান (জল বা স্থল), পারাপার, পুণ্যকর্মের স্থান। বাস্তব কার্যপদ্ধতির সঙ্গে মিল নেই, মানুষ যে স্থানে পারাপার, দান, স্নান করে সেটিই তীর্থ।
—————————————————————————————————————————————
◾৬. বেদ মন্ত্রের ভুল প্রয়োগ—
❌অসঙ্গতি— দয়ানন্দ তীর্থের অর্থ যে গুণ কর্ম তার উদাহরণ দিতে গিয়ে বলেন— “নমস্তীর্থায় চ” (যজুর্বেদ ১৬/৪২)।
✅মীমাংসা— দয়ানন্দ যে বেদ প্রমাণের উদ্ধৃত করেছে তা তীর্থের ব্যাখ্যায় সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। কেননা- বেদের উক্ত স্থানে পরমেশ্বর শিবকে উদ্দেশ্য করে বলা হচ্ছে- “নমস্তীর্থায় চ কূল্যায় চ” (শুক্ল-যজুর্বেদ/শতরুদ্রীয় হোম প্রকরণ/ ১৬ অধ্যায়/৪২ নং মন্ত্র) - অর্থাৎ তীর্থ স্বরূপ রুদ্রকে নমস্কার। উক্ত মন্ত্রে তীর্থ শব্দের ভাষ্যে উব্বট-মহীধর বলছেন—
উব্বট— “তীর্থ ভবস্তীর্থ্যঃ”।।
অর্থ— বিশ্বের সমস্ত তীর্থে প্রকাশিত রদ্রই ‘তীর্থ্য’।
মহীধর— “তীর্থে প্রযাগাদৌ ভবঃ তীর্থ্যঃ তস্মৈ”।।
অর্থ— প্রয়াগ ইত্যাদি যেসব তীর্থে তিনি প্রকাশমান, সেই তীর্থ যিনি ‘তীর্থ্য’ নামে খ্যাত সেই রুদ্রকে নমস্কার।।
সায়ণাচার্যও উক্ত মন্ত্রের ভাষ্যে বলেছেন-
“তীর্থ প্রয়াগাদৌ সন্নিহিতস্তীর্থ্যঃ”।।
[তৈত্তিরীয় সংহিতা/৪/৫/৯]
অর্থ— “প্রয়াগ প্রভৃতি তীর্থস্থানে যে অবস্থান করে, তাকে তীর্থ্য বলা হয়।”
সুতরাং, দয়ানন্দ সরস্বতী বেদ মন্ত্রেরও ভুল প্রয়োগ করেছেন।
—————————————————————————————————————————————
দয়ানন্দের ব্যাখ্যা “তীর্থ = কেবল শুভগুণ বা ব্যক্তি” অর্ধসত্য, শাস্ত্রবিরোধী এবং ব্যাকরণ-নিরুক্ত-উণাদি সূত্রের বিপরীত।
সঠিক শাস্ত্রসমর্থ ব্যাখ্যা- “তীর্থ = অতিক্রমযোগ্য স্থান বা ঘাট, যেখানে মানুষ দান, স্নান, যজ্ঞ, পুণ্যকর্ম করে। আর সতীর্থ = সেই স্থানের সাথে সম্পর্কযুক্ত অন্যরা।”
পরিশেষে বলা যায় যে, দয়ানন্দ 'তীর্থ' শব্দটিকে কেবল আধ্যাত্মিক গুণাবলি বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক যোগ্যতার গণ্ডিতে আবদ্ধ করে যে ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন, তা শাস্ত্রীয় ও যৌক্তিক উভয় দিক থেকেই অসম্পূর্ণ এবং একপাক্ষিক। সনাতন বৈদিক ঐতিহ্যে তীর্থের ধারণা অত্যন্ত ব্যাপক, এখানে 'স্থাবর তীর্থ' (নদী, পর্বত, পবিত্র ভূমি) এবং 'জঙ্গম তীর্থ' (বিদ্বান ও সাধু পুরুষ) উভয়কেই সমান মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।
দয়ানন্দের দাবী— তীর্থ কেবল ৫০০ বা ১০০০ বছরের আধুনিক উদ্ভাবন, কিন্তু তা ঋগ্বেদীয় নদীস্তুতি, অথর্ববেদের তরণ-মন্ত্র এবং রামায়ণ-মহাভারতের প্রাচীন বর্ণনার মাধ্যমে সরাসরি খণ্ডিত হয়। ব্যাকরণগতভাবে 'তীর্থ' শব্দের মূল অর্থই হলো 'ঘাট' বা 'পার হওয়ার স্থান'। পাণিনীয় ব্যাকরণ ও যাস্কের নিরুক্ত যে স্থানভিত্তিক অর্থের প্রতিপাদন করে, তাকে অস্বীকার করা মানে বেদের মৌলিক শব্দার্থতত্ত্বকেই অগ্রাহ্য করা।
গঙ্গাদি নদীকে কেবল 'জলরাশি' বলা বৈদিক ঋষিদের অনুভূতির পরিপন্থী, কারণ বেদে এই নদীগুলো কেবল জড় উপাদান নয়, বরং 'মাতরঃ' (জননী) এবং 'দেবী' হিসেবে স্বীকৃত। আধ্যাত্মিক উন্নতিতে গুণের প্রয়োজন অবশ্যই আছে, কিন্তু নির্দিষ্ট পবিত্র স্থানের পরিবেশ ও শক্তি যে সেই উন্নতিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে, তা শাস্ত্র ও ইতিহাস উভয় দ্বারা স্বীকৃত। সুতরাং, দয়ানন্দ সরস্বতীর 'তীর্থপ্রকরণ' সংক্রান্ত ব্যাখ্যাটি বৈদিক সংহিতা ও ভাষ্যকারদের ঐতিহ্যের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ এক কৃত্রিম আধুনিক মতবাদ মাত্র। প্রকৃত সত্য এই যে- যেখানে আধ্যাত্মিক জ্ঞান এবং ভৌগোলিক পবিত্রতা মিলিত হয়, সেখানেই পূর্ণাঙ্গ তীর্থের প্রকাশ ঘটে।
🙏সর্বে হ্যেষ রুদ্রস্তস্মৈ রুদ্রায় নমো অস্তু 🙏
ওঁ নমঃ শিবায় 🙏
ওঁ নমঃ শিবায়ৈ 🙏
✍️ অপপ্রচার দমনে- অন্তিক ভট্টাচার্য্য (শম্বরনাথ শৈব)।
🌻 বিশেষ কৃতজ্ঞতা - আমার গুরু শ্রী নন্দীনাথ শৈবাচার্যজী ও আমার আদর্শ শ্রী রোহিত কুমার চৌধুরী শৈবজী।
📢 কপিরাইট ও প্রচারে - Shivalaya
বি: দ্র: লেখাটি কপি করলে সম্পূর্ণভাবে করবেন, কোনো রকম কাটছাট গ্রহণযোগ্য নয়।


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন