গোমাতাকে বন্দনা করবার বেদমন্ত্র
ঋষিগণ গাভীকে কেবল প্রাণী হিসেবে দেখেননি; তাঁরা গোমাতাকে যজ্ঞ, পবিত্রতা, সমৃদ্ধি ও কল্যাণের আধাররূপে বন্দনা করেছেন। সেই কারণেই দুধ বা গোময় গ্রহণের পূর্বে এই মঙ্গলময় বৈদিক মন্ত্র পাঠ করা হয় —
🐄 🌿🌼 মন্ত্র 🌼🌿🐄
“আ গাবো অগ্মন্নুত ভ
দ্রমক্রন্ত্ সীদন্তু গোষ্ঠে রণয়ন্ত্বস্মে ।
প্রজাবতীঃ পুরুরূপা ইহ
স্যুরিন্দ্রায় পূর্বীরুষসো দুহানা ॥ ”
[📖 তথ্যসূত্র : ঋগ্বেদ সংহিতা/শাকলশাখা/৬মণ্ডল/২৮ সূক্ত/১নং মন্ত্র]
__________________________________________
🌿 অন্বয় (শব্দ ভেঙে অর্থ) 🌿
আ গাবঃ অগ্মন্ → গাভীগণ (গোমাতাগণ) এখানে আগমন করুক
উত ভদ্রম্ অক্রন্ → এবং কল্যাণ সাধন করুক
সীদন্তু গোষ্ঠে → গোশালায় অবস্থান করুক
রণয়ন্তু অস্মে → আমাদের আনন্দ ও সমৃদ্ধি দান করুক
প্রজাবতীঃ → বৎসযুক্ত / সন্তানসমৃদ্ধ
পুরুরূপাঃ → নানাবর্ণবিশিষ্ট
ইহ স্যুঃ → এখানে অবস্থান করুক
ইন্দ্রায় → যজ্ঞীয় দেবকার্যের (ইন্দ্ররূপধারী পরমেশ্বর শিবের) উদ্দেশ্যে
পূর্বীঃ উষসঃ দুহানাঃ → বহু প্রভাতে দুধ দানকারী
__________________________________________
✅ মন্ত্রের অর্থ ✅
“গাভীগণ আমাদের নিকট আগমন করে অবস্থান করুন এবং আমাদের মঙ্গল সাধন করুন। তাঁরা গোশালায় অবস্থান করুন ও আমাদের আনন্দ ও সমৃদ্ধি বৃদ্ধি করুন। বহু বৎসযুক্ত (বাছুর সহ), নানাবর্ণবিশিষ্ট সেই গাভীগণ এখানে অবস্থান করুন এবং যজ্ঞীয় দেবকার্যের (পরমেশ্বর শিব তথা অনান্য দেবতাদের অর্চনার কার্য সম্পাদন করার) জন্য অনন্ত প্রভাতকালে দুগ্ধ দান করুন।”
__________________________________________
🕉️ টীকা 🕉️
এখানে “ইন্দ্রায়” শব্দটি “ইন্দ্রের উদ্দেশ্যে” অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। বৈদিক কাল থেকেই গাভীর দুধ যজ্ঞে দেবতাদের উদ্দেশ্যে নিবেদন করা হয়ে এসেছে। তাই গাভীকে যজ্ঞধর্মের ধারক ও পবিত্রতার উৎসরূপে রূপক হিসেবে ইন্দ্র শব্দ ব্যবহার করে বন্দনা করা হয়েছে। কিন্তু এতে শুধু মাত্র ইন্দ্রকে বোঝায় না বরং সকল দেবতার কার্যের জন্য এবং ইন্দ্ররূপধারী স্বয়ং পরমেশ্বর শিবের কার্য সম্পাদনের উদ্দেশ্যেও গোমাতার কাছে প্রার্থনা হিসেবে এই মন্ত্রটিতে ইন্দ্র শব্দটি প্রয়োগ হয়েছে।
⚡পরমেশ্বর শিবই ইন্দ্ররূপধারী, তা অথর্ববেদে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে —
যো বৈ রুদ্রঃ স ভগবান্যশ্চেন্দ্রস্তস্মৈ বৈ নমো নমঃ ॥ ৪
[অথর্ববেদ/শির উপনিষদ/২ কণ্ডিকা/৪ নং মন্ত্র]
✅ অর্থ : যে ভগবান রুদ্র(শিব), ইন্দ্রস্বরূপ ধারণ করে ব্রহ্মাণ্ডে বারিবর্ষণ করছেন, সেই পরমেশ্বর রুদ্রকে পুনঃ পুনঃ প্রণাম করি ॥ ৪
__________________________________________
🔶 পুরাণ শাস্ত্রে এই বেদমন্ত্রের প্রয়োগ :
🔥 গোমাতার গোময় নিয়ে তা দহন করে ভস্ম তৈরী করবার পদ্ধতি বলতে গিয়ে পরমেশ্বর সদাশিব তার তিনপুত্র ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ কে প্রথমে গোমাতাকে এই ঋগ্বেদোক্ত বেদমন্ত্রে অভিমন্ত্রিত করতে বলেছেন পদ্মপুরাণের পাতালখণ্ডে।
দেখুন —
“আ গাব ইতি মন্ত্রেণ ধেনুং তত্রাভিমন্ত্রয়েৎ।..॥”
[নবভারত প্রকাশিত ‘পদ্মপুরাণ/পাতালখণ্ড/৬৬ অধ্যায়/৩০ নং শ্লোক]
✅ অর্থ : ‘আ গাব’ এই মন্ত্রদ্বারা ধেনুকে (গাভীকে) অভিমন্ত্রিত করবে ।
♦️ সনাতনী শৈবদের কাছে ভস্ম কেবল মাত্র ছাই নয় — এটি বৈরাগ্য, পবিত্রতা ও মহাদেবের প্রিয় বস্তু তথা শিবপ্রতীক। তাই পদ্মপুরাণ-এ ভস্ম তৈরির জন্য গোময় গ্রহণের পূর্বে গোমাতাকে বৈদিক মন্ত্রে অভিমন্ত্রিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
🕉️ পরমেশ্বর সদাশিবের দ্বারা কথিত নির্দেশের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য —
পরমেশ্বর শিব ভস্ম প্রস্তুতির জন্য গোময় গ্রহণের পূর্বে এই বৈদিক মন্ত্র পাঠ করে গোমাতা কে অভিমন্ত্রিত করতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং এর মাধ্যমে পরমেশ্বর বোঝাচ্ছেন —
▪️ গোমাতা কেবল গৃহপালিত পশু নন ; তিনি সনাতন ধর্মের ধার্মিক জীবনের পবিত্র আশ্রয়।
▪️ গোময় (গোবর) শুধুমাত্র জৈব পদার্থ নয় ; এটি যজ্ঞীয় ও শোধনকারী সংস্কারক দ্রব্য।
▪️ গোমাতার অনুমতি, আশীর্বাদ ও মঙ্গলকামনা নিয়েই ধর্মকার্যে গোময় গ্রহণ করা উচিত।
▪️গোময়কে পরমেশ্বর শিবের প্রিয় বস্তু ভস্ম রূপে পবিত্রভাবে প্রস্তুত করাই এই আচারের মূল উদ্দেশ্য।
__________________________________________
🚩 তথ্য সংগ্রহ ও লেখনীতে : শিবালয় প্রতিষ্ঠাতা শিবদ্বারাধীশাধ্যক্ষ আচার্যপরমাধিকারী শ্রীগুরু নন্দীনাথ শৈব আচার্যদেব 🚩
©️ কপিরাইট ও প্রচারে : Shivalaya 🔥
শিবপ্রিয় গোমাতার জয় 🙏
শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্ 🚩
ॐ নমঃ পার্বতীপতয়ে হর হর মহাদেব 🚩
#হিন্দুধর্ম #সনাতনধর্ম #শিবালয় #shiva #শিব #পরমেশ্বরশিব #ভগবান #পরমেশ্বরভগবানশিব #Shivalaya #sanatandharma #mahadev #shankar #শৈবধর্ম #শিবশাসন


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন