"হরিং হরন্তম্‌" বাক্যের সঠিক তাৎপর্য নির্ণয়—

 

"হরিং হরন্তম্‌" বাক্যের সঠিক তাৎপর্য নির্ণয় —



🚩 সংস্কৃত শাস্ত্রের গভীরতা ও সূক্ষ্মতা নির্ভর করে তার ব্যাকরণিক বুৎপত্তির ওপর। বৈদিক মন্ত্র বা শাস্ত্রীয় বাক্যের অর্থ নির্ণয়ে পাণিনীয় সূত্র এবং ভাষ্যকারদের ব্যাখ্যাই পরম প্রামাণ্য হিসেবে গণ্য হয়। তৈত্তিরীয় আরণ্যকের একটি সুপ্রসিদ্ধ পদ “হরিং হরন্তম্” যা বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা ও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষত, এই শব্দবন্ধের দ্বারা কাকে 'কর্তা' এবং কাকে 'কর্ম' হিসেবে চিহ্নিত করা হবে, তা নিয়ে নানাবিধ মতভেদ পরিলক্ষিত হয়।

​প্রচলিত কিছু ভ্রান্ত ধারণা বা সংকীর্ণ ব্যাখ্যার ঊর্ধ্বে উঠে, পাণিনীয় ব্যাকরণের বিধি এবং প্রাচীন কাশিকা বৃত্তির আলোকে এই পদের প্রকৃত অর্থ উন্মোচন করাই বর্তমান আলোচনার মুখ্য উদ্দেশ্য। মহর্ষি জৈমিনীর মীমাংসা দর্শন এবং শ্রুতি-স্মৃতির সাক্ষ্য গ্রহণ করে আমরা দেখাব যে- শব্দার্থের সঠিক বিন্যাস কীভাবে একটি মন্ত্রের আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক গুরুত্বকে প্রতিষ্ঠিত করে। নিম্নে পাণিনীয় ব্যাকরণের সূত্রাবলি, ধাতু বিচার এবং শাস্ত্রীয় উপবৃংহণের মাধ্যমে 'হরিং হরন্তম্' পদের সার্থক অর্থ ও সিদ্ধি বিশ্লেষণ করা হলো।

উক্ত মন্ত্রটি হলো —

“হরিং হরন্তমনুয়ন্তি দেবা বিশ্বস্যেশানং বৃষভং মন্ত্রীনাম্।
 ব্রহ্ম সরূপমনু মেদমাগমা দয়নং মা বিভন্ধীর্বিক্রমস্ব”॥

[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/তৈত্তিরীয় আরণ্যক/১০/৪৯/১]

অন্বয় - “বিশ্বস্য ঈশানং” - (নিখিল ব্রহ্মাণ্ডের অধিপতি বা শাসক)। ​"মতীনাম্ বৃষভম্” - (সকল বুদ্ধি বা স্তুতির বর্ষণকারী) (শ্রেষ্ঠ)। “​হরিং হরন্তম্” - {(যিনি) হরিকে হরণ/লয় করছেন, তাঁকে)} “​দেবাঃ” - (দেবতাগণ)। “অনুযন্তি” - (অনুগমন করেন)। “ব্রহ্ম” - (সেই পরম ব্রহ্ম)। “সরূপম্” - (স্বীয় স্বরূপ বা সত্য রূপকে)। “অনু মে ইদম্ আগমাঃ” - (আমার এই অভিমুখে বা হৃদয়ে প্রকাশিত হোন)। “অয়নম্ মা বিবন্ধীঃ” - {(আমার মুক্তির) পথকে রুদ্ধ করবেন না)}। “বিক্রমস্ব” - (আপনার মহিমা বা শক্তি দিয়ে আমার অজ্ঞানতাকে) অতিক্রম করুন।।

অর্থ — যিনি হরিকে (বিষ্ণুকে) হরণ বা লয় করেন, সেই পরমেশ্বর শিবকে সকল দেবতা অনুসরণ করেন। তিনি বিশ্বজগতের অধিপতি (ঈশান) এবং সকল বুদ্ধি বা মন্ত্রের শ্রেষ্ঠ বর্ষণকারী (বৃষভ)। তিনি স্বয়ং ব্রহ্মস্বরূপ, হে মহাদেব! আপনি আমার এই হৃদয়ে প্রকাশিত হোন। আমার পরম গতির পথকে রুদ্ধ করবেন না, বরং আপনার দিব্য বিক্রম ও শক্তির দ্বারা (আমার মোহবন্ধন) ছিন্ন করুন।"

এবার “হরি হরন্তম্‌” বাক্যের সঠিক অর্থ নির্ণয় করা যাক —

পাণিনীয় সূত্র - “কর্মণি দ্বিতীয়া” (২/৩/২)।।

কাশিকা ভাষ্য— "কর্মণি কারকে যা সংখ্যা তত্র দ্বিতীয়া বিভক্তির্ভবতি"।। এই অনুযায়ী- ​এখানে 'হরি' শব্দের উত্তর দ্বিতীয়া বিভক্তি যুক্ত হয়ে 'হরিং' পদটি সিদ্ধ হয়েছে। ব্যাকরণ মতে, যার উত্তর দ্বিতীয়া বিভক্তি থাকে, সে হয় 'কর্ম'। সুতরাং, এখানে হরি স্বয়ং হরণ করছেন না, বরং হরিকেই হরণ করা হচ্ছে।

পাণিনী ​সূত্র -  “লটঃ শতৃশানচাবপ্রথমানসমানাধিকরণে” (৩/২/১২৪)।।

​বর্তমান কালে নিরন্তর কোনো কাজ চলা বোঝাতে 'শতৃ' প্রত্যয় হয়। √হৃ (হরণ করা) + শতৃ = হরৎ। এর দ্বিতীয়ার একবচনের রূপ হলো 'হরন্তম্'।

কাশিকা বৃত্তির উদাহরণ-  "পচন্তং দেবদত্তং পশ্য" (পাকরত দেবদত্তকে দেখো) এর অনুকরণে 'হরিং হরন্তম্' মানে হলো- "হরিকে হরণ করছেন এমন একজনকে (দেখো বা জানো)।"

পাণিনী সূত্র -অনেকমন্যপদার্থে” (২/২/২৪)।।

কাশিকা ভাষ্য— "অনেকং সুবন্তমন্যপদার্থে বর্তমানং সহ সমস্যতে"। এই অনুযায়ী- ​যখন পদের দ্বারা অন্য কোনো ব্যক্তি বা পদার্থকে বোঝানো হয়, তখন তা বহুব্রীহি। ​এখানে 'হর' (শিব) হলেন লয় বা হরণের কর্তা। তাই বাক্যটি দাঁড়ায়- "হরিং হরতি যঃ সঃ হরঃ" (যিনি হরিকে হরণ করেন তিনি হর)। ​সুতরাং- 'হরিং হরন্তম্' পদটি সেই 'হর' বা শিবের একটি বিশেষণ হিসেবে কাজ করছে, যিনি হরণক্রিয়ার কর্তা।

উল্লিখিত √হৃ ধাতুর অর্থ "অপসারণ বা ধ্বংস করা"।
​এই অর্থ প্রয়োগ করলে দেখা যায়- হরি (যিনি স্থিতির প্রতীক) তাঁকে মহাপ্রলয় কালে হর (যিনি লয়ের প্রতীক) অপসারণ বা নিজের মধ্যে লীন করছেন। ​এখানে দ্বিতীয়া বিভক্তির কারণে 'হরি' কর্ম এবং শতৃ প্রত্যয়ান্ত 'হরন্তম্' পদটি সেই ধ্বংসাত্মক ক্রিয়াকে প্রকাশ করছে।

সুতরাং- বিগ্রহ বাক্য হলো- “হরিং হরতি ইতি” অর্থাৎ- যিনি হরিকে হরণ করেন।

বিভক্তি (২/৩/২) হরি + অম্ = হরিং হরিকে (কর্ম)।

কৃৎ প্রত্যয় (৩/২/১২৪) √হৃ + শতৃ = হরন্তম্ হরণ করছেন এমন (বিশেষণ)।

সিদ্ধ অর্থ হলো- “হরিং হরন্তম্” হর (শিব) হরিকে হরণ করছেন।

পূর্বমীমাংসায় জৈমিনী বলেন—

“শাস্ত্রাস্থা বা তন্নিমিত্তত্বাত্” ।।
[পূর্বমীমাংসা ১/৩/৯]

অর্থাৎ- শাস্ত্রসমর্থিত ব্যাখ্যাই অধিক প্রামাণ্য। যখন কোনো শব্দের একাধিক অর্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তখন শাস্ত্রীয় প্রয়োগ এবং বৈদিক পরম্পরা সমর্থিত অর্থটিই গ্রাহ্য করতে হবে।

এবার অন্য শাস্ত্রের বচন দেখে নেওয়া যাক। প্রথমে শ্রুতি কি বলে দেখে নেবো —

“হরিং হরন্তং পাদাভ্যামনুযান্তি সুরেশ্বরাঃ”।। 
[শরভ উপনিষদ/৫]

এখানে শ্রুতি নিজেই ‘হরি’কে কর্ম এবং শিবকে ‘হরণকারী’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

এবার এর উপবৃংহন দেখে দেবো। বেদের অর্থ যেখানে অস্পষ্ট, পুরাণ সেখানে সেই অর্থকে বিস্তারিত করে (যাকে বলা হয় ‘উপবৃংহণ’)। —

হরি হরন্তং বৃষভং বিশ্বেশানং তমীশ্বরম্ ॥ ৭৪
[লিঙ্গ মহাপুরাণ/পূর্বভাগ/অধ্যায় ৯৬/৭৪ নং শ্লোক]

“হরি হরস্তং বৃষভং বিবেশানন্ত ঈশ্বরঃ” ॥ ১৬
[শিবমহাপুরাণ/শতরুদ্র সংহিতা/১২ অধ্যায়/১৬ নং শ্লোক]

অর্থ — ​"যিনি হরিকে (বিষ্ণুকে) হরণ বা লয় করেন, যিনি নিখিল বিশ্বের অধিপতি এবং শ্রেষ্ঠ শক্তিধর, সেই পরমেশ্বর শিবকে (আমি স্তুতি করি)।"

পরিশেষে বলা যায়- ‘হরিং হরন্তম্’ শব্দবন্ধটি কেবল একটি সাধারণ বিশেষণ নয়, বরং এটি বৈদিক ঐতিহ্যে শিব ও বিষ্ণুর পারমার্থিক সম্পর্কের গভীর ব্যাখ্যা। পাণিনীয় ব্যাকরণের ‘কর্মণি দ্বিতীয়া’ এবং ‘লটঃ শতৃশানচাবপ্রথমানসমানাধিকরণে’ এই সূত্রগুলোর ভিত্তিতে এটি সুপ্রমাণিত যে- এখানে ‘হরি’ কোনোভাবেই কর্তা নন, বরং তিনি হরণক্রিয়ার ‘কর্ম’ বা আধার।

​মহর্ষি জৈমিনীর নির্দেশিত “শাস্ত্রাস্থা বা তন্নিমিত্তত্বাত্” ন্যায়ানুসারে, যখন আমরা শ্রুতি (তৈত্তিরীয় আরণ্যক, শরভ উপনিষদ) এবং উপবৃংহণকারী স্মৃতি (লিঙ্গ ও শিবমহাপুরাণ)-র সাহায্য গ্রহণ করি, তখন সংশয়ের কোনো অবকাশ থাকে না। এই শাস্ত্রীয় সাক্ষ্যসমূহ অনুযায়ী- পরমেশ্বর শিবই হলেন সেই ‘হর’, যিনি মহাপ্রলয়কালে স্থিতিকারক হরিকেও নিজের মধ্যে লীন বা হরণ করেন।

​সুতরাং- ব্যুৎপত্তিগত লব্ধ অর্থ এবং শাস্ত্রীয় প্রামাণ্য উভয় দিক থেকেই ‘হরিং হরন্তম্’ এর একমাত্র ব্যাকরণসিদ্ধ ও প্রামাণিক অর্থ হলো-

“যিনি হরিকে (বিষ্ণুকে) হরণ বা লয় করেন, সেই সর্বেশ্বর শিবকে দেবতাগণ অনুগমন করেন।”

​এই বিশ্লেষণটি যেমন ভাষাতাত্ত্বিক দিক থেকে ত্রুটিমুক্ত, তেমনই সনাতন শাস্ত্রের গূঢ় লয়তত্ত্বের সাথে সম্পূর্ণ সংগতিপূর্ণ।


🙏সর্বে হ্যেষ রুদ্রস্তস্মৈ রুদ্রায় নমো অস্তু🙏

নমঃ শিবায়ৈ 🙏
নমঃ শিবায় 🙏
শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্‌ ✊🚩

✍️ লেখনীতে— অন্তিক ভট্টাচার্য্য (শম্বরনাথ শৈব)।

🌻 বিশেষ কৃতজ্ঞতা— আমার গুরু শ্রী নন্দীনাথ শৈবাচার্য জী ও আমার আদর্শ শ্রী রোহিত কুমার চৌধুরী শৈবজী।

📣 কপিরাইট ও প্রচারে— Shivalaya

বি: দ্র:— লেখাটি কপি করলে সম্পূর্ণভাবে করবেন, কোনো রকম কাটছাট করা যাবে না।


মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ