“বেদে মূর্তিপূজা নেই” — বলে অপপ্রচারকারী দয়ানন্দ সরস্বতী ও তার আর্যসমাজের দাবী খণ্ডন




 💠 "বেদে কি সত্যিই মূর্তিপূজা নেই? আর্য সমাজের ভ্রান্ত ধারণা খণ্ডন এবং শাস্ত্রীয় প্রমাণের পুনর্মূল্যায়ন" —


--- 🚩 আর্য সমাজের অনুসারীদের বিশ্বাস এবং দাবি হলো যে বেদে মূর্তিপূজার কোনো প্রতিপাদন (বিধান) নেই। বেদের কর্মখণ্ডে মূর্তিপূজা থাকবেও না, কারণ বেদের পদ্ধতি হলো যজ্ঞের। আমি সেই বেদের কথা বলছি যা বর্তমানে সংহিতা রূপে আমাদের কাছে আছে। বেদ অনন্ত- “অনন্তা বৈ বেদাঃ” [তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ৩/১০/১১]। সূর্যের যতগুলো কিরণ আছে, বেদের মন্ত্রও ঠিক ততগুলোই। মহর্ষি বেদব্যাস সেই অনন্ত ভাণ্ডার থেকে যজ্ঞের জন্য উপযোগী কিছু হাজার মন্ত্র নির্বাচন করে সংহিতা রূপে আমাদের দিয়েছেন। এই কয়েক হাজার মন্ত্রই যে সম্পূর্ণ বেদ, এমনটাও বলা যায় না। এটি তো বেদের অংশ মাত্র। একে চাইলে 'যজ্ঞ-বেদ'ও বলা যেতে পারে। এখন এর মধ্যে মূর্তিপূজার প্রতিপাদন কীভাবে সম্ভব? কেউ ফুটবলের ওপর বই লিখল আর তাতে তবলার কথা বলা হয়নি, এটি অনেকটা তেমনই কথা হলো।

👉 উদাহরণস্বরূপ বলা যায় —

- ডাক্তারি বই আপনাকে শেখায় অ্যানাটমি, প্যাথলজি বা রোগের লক্ষণ। কিন্তু সেই বইতে স্টেথোস্কোপ বা এক্স-রে মেশিন কীভাবে তৈরি করতে হয় বা তার মেকানিজম কী, তা লেখা থাকে না। কারণ সেটি 'ইঞ্জিনিয়ারিং'-এর বিষয়। কিন্ত, তাই বলে কি ডাক্তার স্টেথোস্কোপ ব্যবহার করবেন না? অবশ্যই করবেন, কারণ রোগ নির্ণয়ের জন্য সেটি তার 'করণ' বা শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। ঠিক তেমনই- সংহিতা হলো বেদের সেই 'টেক্সটবুক' যা মূলত যজ্ঞতত্ত্ব ও দেবতাদের স্তুতি শেখায়। আর বিগ্রহ (মূর্তি) হলো সেই উপাসনার 'স্টেথোস্কোপ' বা যন্ত্র, যা দিয়ে অদৃশ্য পরমাত্মার স্পন্দন অনুভব করা যায়। বিগ্রহ তৈরির বিধি বা প্রাণপ্রতিষ্ঠার পদ্ধতি কল্পসূত্র বা শৈবআগম শাস্ত্রে (যা শ্রুতির অংশ) বিস্তারিত আছে। সংহিতায় নেই বলে বিগ্রহ অবৈধ এ দাবি করা মানে টেক্সটবুকে নেই বলে স্টেথোস্কোপকে অস্বীকার করা।

সনাতন ধর্মে যত প্রামাণিক প্রথা ও গ্রন্থ আছে, তার সবকিছুর আধার বা ভিত্তি হলো বেদ। বেদের মাধ্যমেই এই সবকিছুর বিকাশ ঘটেছে, তাই এই যজ্ঞ-বেদেও মূর্তিপূজার ব্যাপারে কিছুটা হলেও সংকেত বা ইঙ্গিত অবশ্যই থাকবে, যদিও তার বিস্তারিত বর্ণনা সেখানে না থাকে। মূর্তিপূজা বিধির বিস্তারিত বর্ণনা পাবেন শৈবাগম/পুরাণ/ইতিহাস শাস্ত্রে, যা সংখ্যায় হাজার হাজার এবং যার মধ্যে লক্ষ লক্ষ শ্লোক রয়েছে। ​ঠিক এই কারণেই — আর্যসমাজের প্রতিষ্ঠাতা দয়ানন্দ সরস্বতী ‘পুরাণ/আগম আদি’ শাস্ত্রকে প্রক্ষিপ্ত বলে ঘোষণা করে এগুলিকে অমান্য বলে এড়িয়ে গিয়েছেন। এবার চলুন, বেদের মধ্যেই দেবপ্রতিমা বিগ্রহ/মূর্তি পূজার উল্লেখ খুঁজে বের করা যাক।

👉 ঋগ্বেদ মণ্ডল ১০, সূক্ত সংখ্যা ১৩০ ঋচা নং ৩-এ বলা হয়েছে—

“কাসীৎপ্রমা প্রতিমা কিং নিদানমাজ্যং কিমাসীৎপরিধিঃ ক আসীৎ। ছন্দঃ কিমাসীৎ প্রউগং কিমুক্থং যদ্দেবা দেবমযজন্ত বিশ্বে” ॥ ৩ ॥

--- 'প্রতিমা' শব্দটির দিকে লক্ষ্য করুন। এই মন্ত্রের প্রসঙ্গ হলো- প্রজাপতি যজ্ঞের দ্বারা বিশ্ব সৃষ্টি করছেন। এই যজ্ঞে 'প্রমা' অর্থাৎ পরিমাণ (মাপ) কী ছিল? দ্রব্য, সময় সবকিছুরই একটি পরিমাপ থাকে। এই যজ্ঞে 'প্রতিমা' কী ছিল? এই শব্দের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সায়নাচার্য বলেছেন — 

“হবিষ্প্রতিযোগীত্বেন মীয়তে নির্মীযত ইতি প্রতিমা দেবতা। সা চ তস্য যজ্ঞস্য কাসীৎ” ॥

অর্থ — ​"যজ্ঞে উৎসর্গকৃত হবির প্রতিযোগী (অর্থাৎ হবির অংশ গ্রহণকারী) হিসেবে যাঁকে পরিমাপ করা হয় বা নিরূপণ করা হয়, তিনিই হলেন প্রতিমা বা দেবতা” ।

আমরা হবিরূপে বা নৈবেদ্য রূপে যা কিছু প্রস্তুত করি এবং যার আহুতি যজ্ঞে দেওয়া হয়, সেটি কে গ্রহণ করবে? নৈবেদ্য যেহেতু 'সগুণ' (বস্তুগত), তাই তা গ্রহণকারীকেও 'সগুণ' হতে হবে। নির্গুণের সাথে আমরা দ্রব্যের মাধ্যমে কোনো ব্যবহারই করতে পারব না। নির্গুণের সাথে দ্রব্য তো দূরের কথা, বাণী বা মনের মাধ্যমেও ব্যবহার সম্ভব নয়। নির্গুণ তো এই সবকিছুর ঊর্ধ্বে। ​কিন্তু, প্রজাপতি ব্রহ্মদেবকে এই জগত রচনা করতে হবে যা দেখা যায়, যার মধ্যে শোনার জন্য শব্দ আছে, ঘ্রাণ নেওয়ার জন্য ফুল আছে, স্পর্শ করার জন্য বস্তু আছে এবং স্বাদ নেওয়ার জন্য মধুর আদি রস আছে। এগুলো সবই 'সগুণ'। এই সবকিছুরই অস্তিত্ব বা সত্ত্বা আছে যা আমরা ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে অনুভব করি। এই প্রকারে যজ্ঞে আহুতি দেওয়া দ্রব্যেরও সত্ত্বা আছে এবং তা সগুণ। তাকে গ্রহণ করার জন্য অবশ্যই সাকার (রূপধারী) কোনো দেবতা প্রয়োজন। আপনি ভোজন তৈরি করলেন, কিন্তু তা খাওয়ার জন্য তো কাউকে দরকার। বাতাসে খাবার ছুড়ে দিয়ে তো আর বলা যায় না যে আমি খাইয়েছি। তাই এখানে সগুণ দ্রব্য স্বীকার বা গ্রহণ করার জন্য সাকার দেবতাও প্রয়োজন। 

--- 'প্রতিমা' শব্দের এখানে এটাই তাৎপর্য। ​সাকার রূপ কীভাবে হয়? যেমন- মাটির স্তূপ পড়ে আছে, সেখান থেকে কিছুটা অংশ নিয়ে আমরা একটি ঘট (কলস) বানালাম। সেই সম্পূর্ণ স্তূপ থেকে কিন্তু ঘট হবে না, সম্পূর্ণটা নিলে তা স্তূপই থেকে যাবে। সম্পূর্ণ থেকে কিছুটা অংশ নিলেই আকার তৈরি হয়। যজ্ঞেও বনের আগুনের মতো যত্রতত্র আহুতি দেওয়া হয় না, একটি কুণ্ডের ভেতর অগ্নিকে পরিমিত (সীমাবদ্ধ) করেই আহুতি দেওয়া হয়। এই প্রকারে অনন্ত, অসীম, নির্গুণ পরব্রহ্মকে আমাদের ব্যবহার করার যোগ্য করার জন্য সীমিত করে নিতে হয়। যতক্ষণ প্রতিমা বা মূর্তি নেই, ততক্ষণ আমরা মন বা দ্রব্যের দ্বারা ব্যবহার করতে পারব না। তবে কীভাবে বলা যায় যে বেদে প্রতিমা বা মূর্তির উল্লেখ নেই?

​হ্যাঁ, নির্গুণের প্রতিমা হবে না। যজুর্বেদে বর্ণিত “ন তস্য প্রতিমা অস্তি” [যজুর্বেদ ৩২/৩] যা আর্যসমাজীরা উদ্ধৃত করে, সেটি তো নির্গুণের ব্যাপারে বলা হয়েছে। নির্গুণের প্রতিমা কীভাবে হবে? কিন্তু সগুণের প্রতিমা অবশ্যই থাকবে। ভগবানের দুটি স্বরূপই আছে নির্গুণ এবং সগুণ।  "অপি বোভয়বিধাঃ স্যুঃ" [যাস্ক নিরুক্ত/৭/৬] দেবতারা মনুষ্যকার এবং মনুষ্যাকার নয় দুই হতে পারে। অর্থাৎ ব্রহ্ম সাকার নিরাকার দু ভাবেই আছেন। এটি হলো তত্ত্বকথা। মহর্ষি যাঙ্ক তাঁর 'নিরুক্ত' (৭/৬-৭) গ্রন্থে দেবতার আকার নিয়ে তিনটি মত দিয়েছেন— 

– “অথাকারচিন্তনং দেবতানাম্। পুরুষবিধাঃ স্যুরিত্যেকম্।....অপুরুষবিধাঃ স্যুরিত্যেপরম্।...অপি উভয়বিধাঃ  স্যুঃ, অপি বা অপুরুষবিধানামেব সতামেতে কর্মাত্মানঃ স্যুঃ।”

--- দেবতারা পুরুষাকৃতি (মানুষের মতো), অপুরুষাকৃতি (নিরাকার বা প্রাকৃতিক) এবং উভয়বিধ হতে পারেন। অর্থাৎ ব্রহ্ম যেমন নিরাকার, তেমনই উপাসনার প্রয়োজনে তিনি সাকার। আর্য সমাজীরা যজুর্বেদের “ন তস্য প্রতিমা অস্তি” (৩২/৩) মন্ত্রটিকে মূর্তিপূজা খণ্ডনে ব্যবহার করলেও, সেটি কেবল ব্রহ্মের নিরাকার তত্ত্বের কথা বলে। কিন্তু সগুণ উপাসনায় 'প্রতিমা' বা রূপ অপরিহার্য।

যেমন সাধারণ লোকের দৃষ্টিতে পাথরের মূর্তি জড় বলে গণ্য হয়, তেমনই অগ্নিও জড়। কিন্তু শাস্ত্র অনুযায়ী- “অভিমানিব্যপদেশঃ” [বেদান্তদর্শন ২/১/৫ ও মহাভাষ্য-বর্তিক ৩/১/৭] অনুসারে এই উভয় মূর্তিই চৈতন্য ধারণ করে। অগ্নি আহুতির স্থূল অংশকে দগ্ধ করে তার সূক্ষ্ম অংশ দেবতাদের নিকট পৌঁছে দেয় আর মূর্তি, মৌমাছির দ্বারা পান করা ফুলের রসের ন্যায়, নিবেদিত দ্রব্যের সূক্ষ্ম অংশ সংশ্লিষ্ট দেবতার নিকট অর্পণ করে।

​এছাড়াও- ঋগবেদের অনেক স্থানে ইন্দ্রকে 'হরিবা' অর্থাৎ হরি নামক অশ্ব (ঘোড়া) বিশিষ্ট বলা হয়েছে। যাঁর কাছে ঘোড়া আছে এবং যিনি ঘোড়ায় সওয়ার হন, তাঁর কি মূর্তি হতে পারে না? ঘোড়ায় চড়ার জন্য তাঁরও তো একটি আকার থাকতে হবে। যাঁর আকার আছে এবং যা বেদেও বলা হয়েছে, তাঁর মূর্তি কেন তৈরি হতে পারবে না?

​👉 এবার ঋগ্বেদ প্রথম মণ্ডল, ২১তম সূক্ত, ২নং ঋচা দেখুন—

“তা যজ্ঞেষু প্র শংসতেন্দ্রাগ্নী শুম্ভনা নরঃ। তা গায়ত্রেষু গায়ত” ।।

উক্ত মন্ত্রের সায়ণ ভাষ্যও দেখে নেবো—

- ​হে "নরঃ" মনুষ্যাঃ ঋত্বিজঃ "তা" পূর্বোক্তৌ তৌ "ইন্দ্রাগ্নী" যজ্ঞেষু অনুষ্ঠীয়মানকর্মসু "প্র শংসত" শস্ত্রৈঃ। তথা "শুম্ভত" নানাবিধৈরলঙ্কারৈঃ শোভিতৌ কুরুত। তথা "তা" পূর্বোক্তৌ তাবিন্দ্রাগ্নী "গায়ত্রেষু" গায়ত্ৰীচ্ছন্দস্কেষু মন্ত্রেষু সামরূপেণ "গায়ত"॥ তা। ‘সুপাং সুলুক্°’ ইতি আকারঃ। শুম্ভত। অস্য সংহিতায়াম্ 'অন্যেষামপি দৃশ্যতে' (পা. সূ. ৬/৩/১৩৭) ইতি দীর্ঘঃ॥

অর্থ— ​"হে ঋত্বিকগণ! আপনারা যজ্ঞের অনুষ্ঠান চলাকালীন শস্ত্রের (স্তুতিমন্ত্র) মাধ্যমে সেই পূর্বে উল্লিখিত ইন্দ্র ও অগ্নির প্রকৃষ্ট প্রশংসা করুন। তাঁদের নানাবিধ অলঙ্কারের দ্বারা সুশোভিত করুন (অর্থাৎ মহিমান্বিত করুন)। একইভাবে, গায়ত্রী ছন্দে রচিত মন্ত্রসমূহের মাধ্যমে সেই ইন্দ্র ও অগ্নিকে সামগানের ন্যায় গান করুন।"

--- এখানে দুটি শব্দ আছে— 'শংসত' এবং 'শুম্ভতা'। 'শংসত' মানে হলো স্তুতি করা আর 'শুম্ভতা' মানে হলো অলঙ্কার দিয়ে সাজানো। এখানে ইন্দ্র এবং অগ্নিকে সাজানোর কথা বলা হচ্ছে। বাতাসে তো আর সাজানো যায় না, সাজানোর জন্য মূর্তি প্রয়োজন।

👉 একই প্রসঙ্গে সমর্থণ পাওয়া যায় তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণে। উক্ত ব্রাহ্মণে বলা হয়েছে— 

“হোতা যক্ষৎপেশস্বতীঃ। তিস্রো দেবীর্হিরণ্যয়ীঃ। ভারতীবৃহতীর্মহীঃ।”

[কৃষ্ণযজুর্বেদ/ তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ২/৬/১৭]

--- ‘হোতা (যাজক) সেই তিন দেবীর পূজা করবেন যাঁরা সুবর্ণময়ী (সোনার তৈরি), সুন্দরী এবং মহীয়সী।’

উক্ত মন্ত্রে ভট্ট ভাষ্কর মিশ্রের ভাষ্যও দেখে নেওয়া যাক— 

“তিস্রো দেব্যোঽষ্টমপ্রয়াজদেবতাঃ তাশ্চ পেশস্বতীঃ রূপবত্যঃ। হিরণ্যয়ীঃ সুবর্ণাভরণোপেতাঃ। ভারতীরিতি বহুবচনেনেডাসরস্বত্যাবপি গৃহ্যেতে। বৃহতীঃ প্রৌঢ়াঃ। মহীঃ পূজ্যাঃ” ।।

অর্থ— ইড়া, সরস্বতী ও ভারতী এই তিন দেবী হলেন অষ্টম প্রয়াজ দেবতাস্বরূপ। তাঁরা অত্যন্ত রূপবতী এবং সুবর্ণ অলঙ্কারে বিভূষিত। এখানে 'ভারতী' শব্দের বহুবচন ব্যবহারের মাধ্যমে ইড়া ও সরস্বতী দেবীদ্বয়কেও এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই দেবীরা অত্যন্ত মহিমময়ী ও পরম পূজনীয়া।

‘অর্থাৎ ভারতী, ইড়া ও সরস্বতী দেবীগণ সুবর্ণময়ী (সোনার তৈরি মূর্তিরূপে পূজিতা) এবং তাঁরা উজ্জ্বল অলঙ্কার পরিধান করে আছেন। এই বর্ণনা থেকে স্পষ্ট জানা যায় যে, বৈদিক যুগে দেবীদের ধাতুনির্মিত মূর্তির পূজা প্রচলিত ছিল’।

👉 কৃষ্ণযজুর্বেদ মৈত্রায়ণী শাখার মানবগৃহ্যসূত্রে কর্মকাণ্ডে মূর্তির ভাঙ্গণ ও প্রায়শ্চিত্ত বিধি দেখলে বোঝা যায় মূর্তিপূজা কেবল কল্পনা ছিলোনা। উক্ত গৃহ্যসূত্রে বলা হয়েছে—

“যদ্যর্চা দহ্যেদ্বা নশ্যেদ্বা প্রপতেদ্বা প্রভজেদ্বা প্রচলেদ্বা ...এতাভির্জুহুয়াৎ ...ইতি দশাহুতয়:।”

[মানবগৃহ্যসূত্রে ২/১৫/৬]

--- যদি (কাঠ, পাথর বা ধাতুর তৈরি) মূর্তি পুড়ে যায়, তার অঙ্গ ভঙ্গ হয়ে যায়, বা পড়ে যায় এবং তার কয়েক টুকরো হয়ে যায়, সে হাসে বা স্থানান্তরিত হয়ে যায়, তবে মূর্তিবান গৃহস্থকে বৈদিক মন্ত্রের সাথে অগ্নিতে দশটি আহুতি দেওয়া উচিত।

সকলেরই জানা আছে যে- কল্পবেদাঙ্গ বেদের কর্মকাণ্ডের ব্যাখ্যা করে। কীভাবে কি করতে হবে, কোথায় মন্ত্রের বিনিয়োগ করতে হবে আদি আদি৷ এবার যদি মূর্তির অস্তিত্বই না থাকত, তবে ভাঙা বা পুড়ে যাওয়ার এই বিধিবদ্ধ বিধানের কোনো প্রয়োজন হতো না।

👉 আবার বেদে কুশনির্মিত বিগ্রহ ও আহুতির পূর্বে ধ্যানের কথাও বলা হয়েছে—

​“যস্যৈ দেবতায়ৈ হবির্গৃহীতং স্যাত্তাং ধ্যায়েদ্বষট্করিষ্যন্।”

[ঐতরেয় ব্রাহ্মণ ২/৮]

​--- বষট্কার বা আহুতি দেওয়ার আগে দেবতার 'স্বরূপ' ধ্যান করতে হয়।

এই সমর্থনে বেদ বলছে— 

“বেদোহসি যেন ত্বং দেব বেদ দেবেভ্যো ..” 
[বাজসনেয়ী সংহিতা ২/২১]। “পত্নী বেদং প্রমুঞ্চতী বেদোহসি” [কাত্যায়ন শ্রৌতসূত্র ৩/৮/১] হে কুশমুষ্টি নির্মিত পদার্থ, তুমি বেদ (বিগ্রহ) হও)।

​“ইষং পৃঞ্চন্তা সুকৃতে সুদানব আ বর্হিঃ সীদতং নরা।” [ঋগ্বেদ ১/৪৭/৮] ‘যজমানের নিমিত্ত পরমাত্মা কুশাসনে প্রতিষ্ঠিত হও।’ (পরমাত্মার কুশ নির্মিত বিগ্রহকে কুশাসনে বিরাজমান করেন)

​কুশাসনে সকল দেবতাদের বিরাজমান করে হবি প্রদান—

“হোতা যক্ষদ্বর্হিষীন্দ্রং নিষদ্ব রং বৃষভং নর্যপসম্। বসুভি রুদ্রৈরাদিত্যৈ: সযুগ্ভির্বর্হিরা সদদ্বেত্বাজ্যস্য হোতর্যজ।”

[বাজসনেয়ী সংহিতা ২৮/৪]

-‘বেদি বা আসনে বসার মধ্যে শ্রেষ্ঠ, অভীষ্টবর্ষক এবং যজমানের হিতকর কার্যকারী ইন্দ্র পরমাত্মাকে হোতা দর্ভাসনে যজন করেন (পরমাত্মার মূর্তিকে হোতা দর্ভাসনে রাখেন)। সেই ইন্দ্র, বসু, রুদ্র এবং আদিত্যগণের সঙ্গে যুক্ত হয়ে দর্ভাসনে বসুন। তিনি ঘৃত পান করুন। হে হোতা! যজন করো।’

অর্থাৎ- এখানে কুশ দিয়ে দেবতাদের বিগ্রহ তৈরি করে আসনে বসানোর (বর্হি) কথা স্পষ্ট বলা হয়েছে। তাই, এখান থেকে স্পষ্ট হয় যে বেদে মূর্তি পূজো স্পষ্ট ইঙ্গিত দেওয়া আছে।

👉 কৃষ্ণযজুর্বেদের আপস্তম্বগৃহ্যসূত্রে যজ্ঞের ঈশান কোণে ঈশান দেবতার পত্নী-পুত্র সহ মূর্তি পূজার কথা বলা হয়েছে –

“উত্তরয়া দক্ষিণস্যামীশানমাবাহয়তি।” (২০/১) “লৌকিক্যা বাচোত্তরস্যাং মীঢুষীম্।” (২০/২) “মধ্যে জয়ন্তম্।” (২০/৩)

 - ‘অথোত্তরয়া ‘আ ত্বা বহন্তু’ এই মন্ত্র দ্বারা দক্ষিণ কুটিরে ঈশানকে আবাহন করবেন। মূর্তিমান এখানে আসুন, এইরূপ ধ্যান করবেন।’

সায়ণাচার্যের ঋগবেদ ভাষ্যে একই সমর্থন পাওয়া যায়— 

“​তং বঃ শর্ধং রথেশুভং ত্বেষং পনস্যুমা হুবে ।
যস্মিন্সুজাতা সুভগা মহীয়তে সচা মরুত্‌সু মীল্হুষী” ॥৯॥

[ঋগবেদ ৫/৫৬/৯]

ভাষ্য— ​হে মরুতঃ "বঃ "শর্ধং যুষ্মদীযং বলং গণং "রথেশুভং রথে শোভনং "ত্বেষং দীপ্তং "পনস্যুং স্তুত্যম্ "আ "হুবে আহ্বযে। "যস্মিন্ শর্ধে "সুজাতা সুষ্ঠু প্রবৃদ্ধা "সুভগা শোভনভাগ্যাতিমহতী "মীল্হুষী। ‘ মীল্হুষ্টম শিবতম' ইত্যাদৌ দর্শনাৎ মীঢ্বান্ রুদ্রঃ। তৎপত্নী মীল্হুষী। "মরুৎসু "সচা সহ "মহীযতে পূজ্যতে "তং শর্ধমা হুবে। আপস্তম্বোঽপি রুদ্রপত্নীং মীল্হুষীসংজ্ঞযা ব্যবজহার - উত্তরযা দক্ষিণস্যামীশানমাবাহযতি লৌকিক্যা বাচোত্তরস্যাং মীল্হুষীং মধ্যে জযন্তম্ ' ( আপ. গৃ. ২০. ১-৩ ) ইতি ॥ ॥ ২০ ॥ ॥ ৪ ॥

অর্থ— ​“হে মরুৎগণ! আমি তোমাদের সেই ‘শর্ধং’ অর্থাৎ তোমাদের বলশালী গণকে (বাহিনীকে) ‘আ হুবে’ বা আহ্বান করছি। যারা ‘রথেশুভং’ অর্থাৎ রথে আরোহণ করে অত্যন্ত শোভন বা সুন্দর দেখায়, যারা ‘ত্বেষং’ অর্থাৎ দীপ্তিময় এবং যারা ‘পনস্যুং’ অর্থাৎ স্তুতিযোগ্য। ​যে শর্ধে বা মরুৎ-গণে ‘সুজাতা’ (যিনি উত্তমরূপে প্রবৃদ্ধ বা প্রকটিত), ‘সুভগা’ (যিনি শোভন ভাগ্যের অধিকারিণী এবং অতি মহতী) সেই ‘মীল্হুষী’ দেবী ‘সচা’ (একত্রে) ‘মরুৎসু মহীয়তে’ অর্থাৎ মরুৎগণের সাথে একত্রে পূজিত হন, আমি সেই গণকে আহ্বান করি। ​‘মীল্হুষ্টম শিবতম’ (হে অতিশয় ফলদাতা, অত্যন্ত কল্যাণময়) ইত্যাদি প্রয়োগের মাধ্যমে দেখা যায় যে, ‘মীঢ্বান’ বলতে রুদ্রকে বোঝায়, আর তাঁর পত্নীই হলেন ‘মীল্হুষী’। আচার্য আপস্তম্বও রুদ্রপত্নীকে ‘মীল্হুষী’ সংজ্ঞায় অভিহিত করেছেন ‘দক্ষিণ দিকে (লৌকিকী বাচ যোগে) ঈশানকে (রুদ্রকে) আবাহন করবে এবং উত্তর দিকে মীল্হুষীকে ও মধ্যস্থানে জয়ন্তকে আবাহন করবে’ (আপস্তম্ব গৃহ্যসূত্র ২০.১-৩)।”

আবার একই ভাবে প্রদোষকালে বিরুপাক্ষ শিবের সপরিবার সহ ধূপ-দ্বীপ আদি দ্বারা পূজো করার বিধান বর্ণনা করা হয়েছে— 

অথ প্রদোষে “রুদ্রং বিরূপাক্ষং সপত্নীকং মমুক্তং সগণং সপাৰ্ষদ্কম্ আবাহয়ামি” ইত্যাবাদ্য গন্ধ-পুষ্প-ধূপ-দীপৈরভ্যর্চ্য প্রতিপুরুষং পৈষ্টিকান্ দীপান্ একাধিকাংশ্ চতস্রো অষ্টৌ বা দেবস্য আয়তনে প্রতিদিশং প্রদ্যোতয়তি। ‘উদ্দীপ্যস্ব জাতবেদঃ, মা নো হিংসীঃ’ ইতি দ্বাভ্যাম্। ‘হব্যবাহমভিমাতিষাহি, স্বিষ্টমগ্নে অভি’ ইতি দ্বাভ্যাং চ।।

[বৌধায়ন গৃহ্যসূত্র/৩য় প্রশ্ন/৮ম অধ্যায়/২]

অর্থ— প্রদোষকালে প্রথমে বলা হয় “হে বিরূপাক্ষ রুদ্র! পত্নীসহ, গণ-পরিবৃত, পার্ষদসমেত আপনি আমার নিকটে আগমন করুন।” এভাবে আহ্বান করার পরে গন্ধ, ফুল, ধূপ ও প্রদীপ দিয়ে রুদ্রকে পূজা করা হয়। এরপর মন্দিরে বা পূজাস্থানে প্রতিটি দিকের জন্য একেকটি করে প্রদীপ জ্বালানো হয়, কখনও চারটি, কখনও আটটি এগুলোকে পৈষ্টিক প্রদীপ বলা হয়েছে। এই প্রদীপ জ্বালানোর সময় নিম্নের মন্ত্রগুলো পাঠ করা হয় (১)“উদ্দীপ্যস্ব জাতবেদঃ, মা নো হিংসীঃ”[তৈত্তিরীয় আরণ্যক ১০/১] এই দুটি মন্ত্র, এবং- হে অগ্নি, হব্যবাহ! দুষ্কৃতিদের পরাস্ত করুন, (২)হে স্বিষ্টকৃত অগ্নি, [তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ২/৪/১/৪] আমাদের দিকে অনুকূল হন”, এই দুটি মন্ত্রও পাঠ করা হয়।

এখানে স্পষ্ট ভাবে রুদ্রকে পত্নীসহ, রুদ্রগণ সহ, পার্ষদ সমেত আহ্বান করা হয়েছে। এবং সেই রুদ্রকেই গন্ধ, পুষ্প, ধূপ ও দ্বীপ দ্বারা পূজো করার কথাও বলা হয়েছে। সাধারণত নির্গুণ সত্ত্বাকে কখনো পরিবার সহ সপার্ষদে আহ্বান করক যায় না, এবং গন্ধ, পুষ্প, ধূপ, দ্বীপ আদি সগুন উপাচার দ্বারাও পূজা করা সম্ভব নয়। যেহেতু, নির্গুণ সবকিছুর ঊর্ধ্বে। আর উপাচার আদি দ্বারা কেবল সগুনেরই উপাসনা সম্ভব। সুতরাং- এখান থেকেও জানা যায় যে- বৈদিক সময়েও মূর্তি পূজার প্রচলন ছিলো। 

👉 এছাড়াও বিষ্ণুধর্মসূত্রে বিষ্ণু-শিবের ষোড়শোপচার পূজা বিধি বিস্তারিতভাবে লেখা আছে। এছাড়াও আরও বেশ কিছু কল্পবেদাঙ্গে মূর্তি পূজো বিষয়ক প্রমাণ উপলব্ধ—

👉 বোধায়নগৃহ্যসূত্র (২/২/১৩) —


--- এখানে 'চিত্রিয়াণি' বলতে সাধারণত গৃহের বাইরের দিকে অবস্থিত মঙ্গল চিহ্নযুক্ত স্থান, বা দেবতাত্মীয় বৃক্ষ (যেমন অশ্বত্থ) অথবা যজ্ঞীয় চিত্রিত বেদীকে বোঝায়। সেগুলোর পূজা বা বন্দনা করার বিধান দেওয়া হয়েছে।

👉 লৌগাক্ষিগৃহ্যসূত্র (১৮/৩) — 


--- এখানে সরাসরি 'দেবতায়তন' এবং 'দেবগৃহ' শব্দ দুটি ব্যবহৃত হয়েছে। এর অর্থ হলো, বৈদিক যুগের এই পর্যায়ে এসে দেবতাদের জন্য নির্দিষ্ট বাসস্থান বা মন্দির নির্মিত হয়েছিল। ভাষ্যে বলা হয়েছে দেবগৃহ 'মদ্য' বা 'শোণিত' (রক্ত) দ্বারা অপবিত্র হতে পারে। এর থেকে বোঝা যায়, সেই সময় এমন কিছু দেবালয় বা উপাসনা পদ্ধতি ছিল যেখানে বলিপ্রথা প্রচলিত ছিল। যেখানে 'গৃহ' বা 'আয়তন' (বাসস্থান) আছে, সেখানে সেই গৃহের অধিপতি হিসেবে দেবতার কোনো একটি রূপ বা প্রতীকের (বিগ্রহ) অবস্থান অত্যন্ত স্বাভাবিক।

👉 গৌতমধর্মসূত্র (৯/১/১৩-১৪ এবং ৯/১/৬৬) —



--- এখানে ১৩/১৪ নং সূত্রে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে- দেবতার দিকে পা প্রসারিত করা যাবেনা। ভাষ্য অনুযায়ী এখানে দেবতা অর্থ প্রতিমা/বিগ্রহকে বোঝায়। এবং এই দেবতা শব্দে যে প্রতিমা/বিগ্রহ প্রতিপাদিত হয়েছে তা স্পষ্ট বোঝা যায় ৬৬ নং সূত্রে৷ উক্ত সূত্রে বলা হয়েছে যে- দেবমন্দিরের প্রদক্ষিণ করতে। সুতরাং- মন্দিরে যে দেবতার প্রতিমা/বিগ্রহ থাকবে এটাই স্বাভাবিক।

👉 শাঙ্খায়নগৃহ্যসূত্র (৪/১২/১৫) —

--- ‘দেবায়তন' বলতে দেবপ্রতিমার স্থান (যেখানে মূর্তিস্থাপন করা হয়েছে) এবং যজ্ঞস্থানকে বোঝানো হয়েছে। সেই স্থানসমূহকে 'প্রদক্ষিণ' অর্থাৎ ডান দিক দিয়ে ঘুরে সম্মান প্রদর্শন করার কথায় বলা হয়েছে৷ 

ঋগ্বেদীয় আশ্বলায়নগৃহ্যপরিশিষ্টে নবগ্রহের পীঠ-মূর্তি পূজার বিস্তারপূর্বক উল্লেখ আছে। পঞ্চদেব (গণপতি, বিষ্ণু, শিব, দুর্গা, সূর্য) মূর্তি পূজারও বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়—

“গণপতিমাদিত্যং শক্তিমচ্যুত্যং শিবং পঞ্চকমেব বাহরহরযজন্তে তানপ্সু বাগ্নৌ বা সূর্যে বা স্বহৃদয়ে বা স্থণ্ডিলে বা প্রতিমাসু বা যজেত” [আশ্বলায়নগৃহ্যপরিশিষ্ট ২/১০]

যজুর্বেদীয় কাত্যায়ন পরিশিষ্টে সকল দেবতাদের আলাদা আলাদা প্রতিমা পূজার উল্লেখ করা হয়েছে - “ব্রাহ্মবৈষ্ণবরৌদ্রসাবিত্রমৈত্রাবরুণৈস্তল্লিঙ্গৈর্মন্ত্রৈরর্চয়েত”

👉 কল্পবেদাঙ্গেও পরমেশ্বর শিবকে পিনাকী ও কৃত্তিবাসা স্বরূপে আহুতি দেওয়ার উল্লেখ করা হয়েছে—

“যো ব্রহ্মা ব্রহ্মণ উজ্জহার প্রাণেশ্বরঃ কৃত্তিবাসাঃ পিনাকী। ঈশানো দেবঃ স ন আয়ুর্দধাতু তস্মৈ জুহোমি হবিষা ঘৃতেন স্বাহা” ।।

[অগ্নিবেশ্য গৃহ্যসূত্র/ ২য়/ অধ্যায় ৫/৩]

👉 একই সমর্থন রয়েছে বৌধায়ণ গৃহ্যসূত্রেও—

“যো ব্রহ্মা ব্রহ্মণ উজ্জহার প্রাণেশ্বরঃ কৃত্তিবাসাঃ পিনাকী। ঈশানো দেবঃ স ন আয়ুর্দধাতু তস্মৈ জুহোমি হবিষা ঘৃতেন স্বাহা” ।।

[বৌধায়ণ গৃহ্যসূত্র/ ৩য় প্রশ্ন/ অধ্যায় ৭/১৪]

অর্থদ্বয়— যিনি প্রাণেশ্বর (প্রাণের অধিপতি), কৃত্তিবাস (চর্ম পরিধানকারী), পিনাকী (পিনাকধারী), সেই ঈশান দেব (পরমেশ্বর শিব), যিনি ব্রহ্মাকে ব্রহ্মবিদ্যা বা বেদ জ্ঞানের মাধ্যমে উদ্ঘাটন করেছিলেন, তিনি আমাদের আয়ু বৃদ্ধি করুন। তাঁকেই আমি ঘৃতসহিত হব্য দ্বারা আহুতি দিচ্ছি।

--- বেদ কোনো উপন্যাস নয় যে শুধু পড়লেই হবে, বেদ হলো 'ক্রিয়ার্থ' (কর্মপ্রধান)। মহর্ষি জৈমিনি বলেছেন— "আম্নায়স্য ক্রিয়ার্থত্বাদ আনর্থক্যম অতদর্থানাম" [পূর্বমীমাংসা ১/২/১]। অর্থাৎ বেদের সার্থকতা তার যজ্ঞানুষ্ঠানে। যজ্ঞ কীভাবে হবে, কোথায় কোন মন্ত্র পড়তে হবে (বিনিয়োগ), তা বেদে বিস্তারিত নেই। সেই 'বিনিয়োগ' বা প্রয়োগ বিধি বর্ণিত হয়েছে কল্পসূত্রে। কল্প ছাড়া বেদের মন্ত্রগুলো কেবল শব্দমাত্র থেকে যায়, কর্মে পরিণত হয় না। যদি কল্পসূত্র অপ্রামাণিক হয়, তবে আর্য সমাজের 'অগ্নিহোত্র' আদি পদ্ধতিও প্রশ্নবিদ্ধ হবে, কারণ সেগুলোও তো কল্প বা পরবর্তী বিধি অনুযায়ী করা হয়।  সুতরাং- উপরিউক্ত সকল কল্পবেদাঙ্গ প্রমাণ থেকে বিষয়টি দিনের আলোর ন্যায় পরিষ্কার যে- বেদে মূর্তি পূজার উল্লেখ হয়েছে।

👉 আবার একই সমর্থন আমরা বেদেও দেখতে পাই। অগ্নিচয়ণ প্রক্রিয়াতে যখন শতরুদ্রীয় হোম করা হয় তখন রুদ্রকে একটি নির্দিষ্ট আকারযুক্ত স্বরূপে আহুতি প্রদান ও আহ্বান করা হয়— 

"মীডুষ্টম শিবতম শিববা নঃ সুমনা ভব। পরমে বৃক্ষ আয়ুধং নিধায় কৃত্তিং বসান আ চর পিনাকং বিভ্ৰদা গহি"।।

[যজুর্বেদ/অধ্যায়/১৬/৫১]

উব্বট ভাষ্য — কৃত্তিং চর্ম বসানঃ। পিনাকং বিভ্রৎ পিনাকং কোদণ্ডঃ তং ধারয়ন্।।

মহীধর ভাষ্য — কৃত্তি চর্ম বসানঃ পরিদধানঃ সন্‌ আচর আগচ্ছ তপশ্চরেতি বা। আগচ্ছন্নপি পিনাকং ধনুর্বিভ্রত্‌ ধারয়ন্সন্‌ আগহি আগচ্ছ।।

ভাষ্যার্থ —  “কৃত্তি” অর্থাৎ চর্ম (ব্যাঘ্রচর্ম) সেটি যিনি পরিধান করেছেন, তিনিই কৃত্তিবাস।
“পিনাক” অর্থাৎ ধনু বা কোদণ্ড সেটি ধারণকারী তিনি পিনাকধারী।

--- এই কৃত্তিবাস পিনাকধারী প্রভু শিব যেন সেই চর্ম পরিধান করে আচার বা যজ্ঞস্থলে আগমন করেন, অথবা তপস্যা সম্পাদন করেন। এমনকি আগমনের সময়ও তিনি যেন হাতে পিনাকধনু ধারণ করে থাকেন এবং সেই অবস্থাতেই “আগহি আগচ্ছ” (হে প্রভু শিব, এসো!) বলা হয়েছে।

অর্থাৎ- ব্যাঘ্রচর্মপরিহিত, পিনাকধারী পরমেশ্বর শিবকে উদ্দেশ্য করে বলা হচ্ছে— “হে প্রভু, তুমি ব্যাঘ্রচর্ম পরিধান করে, হাতে পিনাকধনু ধারণ করে আমাদের যজ্ঞস্থানে আগমন করো বা তপস্যার স্থানে উপস্থিত হও।”

এই দুটি ভাষ্যেই বলা হয়েছে- “কৃত্তি” অর্থ চর্ম। “পিনাক” অর্থ ধনু। এবং উভয়ই রুদ্র/শিবের মূর্তমান লক্ষণ।

👉 একই মন্ত্রের ভাষ্যে তৈত্তিরীয় সংহিতার ৪/৫/১০-শে সায়ণাচার্য বলেছেন —

“কৃত্তি বসানো ব্যাঘ্রচর্মমাত্রং পরিদধান আচরাস্পদাভিমুখ্যেনাঽঽগচ্ছ। আগচ্ছন্নপি পিনাকং বিশ্বদ্ভূষণার্থং ধনুমাত্রং হস্তে ধারয়ন্বাণাদিক পরিত্যজ্যাঽঽগহ্যগচ্ছ” ।।

অর্থ— “ব্যাঘ্রচর্ম পরিধানকারী হে প্রভু ! তুমি তোমার পিনাকধনু হাতে নিয়ে, কিন্তু বাণাদি অস্ত্র ত্যাগ করে, আমাদের যজ্ঞস্থানে আগমন করো।”

--- এখানে দেবতাকে আহ্বান করা হয়েছে- “হে রুদ্র ! তুমি ব্যাঘ্রচর্ম পরিধান করে, হাতে পিনাকধনু ধারণ করে আমাদের যজ্ঞে আগমন করো।”

যদিও এখানে আর্যসমাজীরা আপত্তি তুলতে পারে এখানে পিনাকী ও কৃত্তিবাসা অর্থে- বজ্রপাত ও প্রকৃতিকে বুঝিয়েছে। কিন্তু, আর্যসজামের এই দাবীও যৌক্তিক নয় কেননা- মহর্ষি যাস্ক স্পষ্ট করেই গেছেন পিনাক ও কৃত্তিবাস শিবেরই লক্ষণ— 

“এতত্তে রুদ্রাবসং তেন পরো মুজবতোৎ তীহি। 
অবতত ধন্বা পিনাকাবসঃ কৃত্তিবাসা অহিসত্র শিবো তীহি”।।

[শুক্ল-যজুর্বেদ ৩/৬১]

উক্ত মন্ত্রের পিনাক ও কৃত্তিবাসা শব্দের অর্থে মহর্ষি যাস্ক বলেছে — 

“রস্তঃ পিনাকমিতি দণ্ডস্য” [নিরুক্ত/৩/২০/২২]
রস্ত ও পিনাক শব্দদয় দণ্ডার্থক।

যাস্কাচার্য এখানে স্পষ্টভাবে বলেন যে “পিনাক” কোনো “পেষণযন্ত্র” নয়, বরং দণ্ডার্থক অর্থাৎ অস্ত্র, ধনু বা আঘাতকর উপকরণ।

[নিরুক্ত/৩/২০/২৬] “পিনাকং প্রতিপিনষ্ট্যেনেন"
পিনাক শব্দের ব্যুৎপত্তি এই যে এর দ্বারা সংহার বা হনন করা হয়।

ব্যাখ্যাঃ — পিনাক শব্দের ব্যুৎপত্তি প্রদর্শন হচ্ছে। হিংসার্থক 'পিষ' ধাতুর উত্তর 'আর্ক' প্রত্যয় করে পিনাক শব্দের নিষ্পত্তি। পিষাক, পিনাক ইহার দ্বারা শত্রু সংহার করা হয়।

এই উদ্ধৃতিতে যাস্কাচার্য ব্যাখ্যা করছেন যে ‘পিনাক’ শব্দটি দণ্ড বা ধনুর্থাতক আয়ুধ। 'পিনাকং প্রতিপিনষ্টি'  যার দ্বারা ভয়ংকরভাবে পিষে ফেলা হয়। ব্যুৎপত্তি অনুযায়ী ‘পিষ’ ধাতুতে (সংহারার্থে) ‘আর্ক’ প্রত্যয়যোগে ‘পিনাক’ শব্দটি নিষ্পন্ন হয়েছে।

অর্থাৎ, এই ব্যুৎপত্তিতে ‘পিষ’ (সংহার) ধাতুর উপস্থিতি ও 'আর্ক' প্রত্যয়ের সাহায্যে যে পিনাক উৎপন্ন হচ্ছে, তা নিশ্চিতভাবে বিধ্বংসী কোনও অস্ত্র বোঝাচ্ছে, যা একমাত্র শিবের ধনুক। এই ধ্বংসকারিতা ঈশ্বরের তামস গুণের অভিব্যক্তি যা রুদ্ররূপে প্রকাশ পায়। অতএব, ব্যুৎপত্তি ও ব্যবহার উভয় দিক থেকেই পিনাক একমাত্র শিবের অস্ত্র।

এই বাক্যে যাস্ক “পিষ্ ধাতু”-র ব্যুৎপত্তি দিলেও সেটির ধ্বংস বা হনন অর্থ নিয়েছেন, “খাদ্যপেষণ” নয়। কারণ পূর্বেই তিনি “দণ্ডার্থক” বলেছেন। সুতরাং প্রসঙ্গ অনুযায়ী ‘পেষণ’ মানে ‘সংহার’, ‘বিনাশ’।

এবং এভাবে ব্যুৎপত্তি দাঁড়ায়—

পিষ্‌ (সংহার) + আর্ক প্রত্যয় = পিনাক = সংহারক অস্ত্র (ধনু)।

অতএব, ‘পিনাক’ মানে ‘সংহারার্থক ধনু’, যা একমাত্র রুদ্র বা শিবের আয়ুধ। এটি কোনো “প্রাকৃতিক শক্তি” বা “বজ্রপাত” নয়, বরং শিবের নির্দিষ্ট অস্ত্রের নাম, যেটি পরবর্তীতে সকল বেদান্ত, স্মৃতি, ও পুরাণে অপরিবর্তিতভাবে শিবের ধনু হিসেবেই গৃহীত।

“অবততধন্বা পিনাকহস্তঃ কৃত্তিবাসাঃ"
[নিরুক্ত/৩/২০/২৭]

(অবততধন্বা) অবরোপিত ধনুর্ধারী বা জ্যামুক্ত ধনুর্ধারী। (পিনাহস্ত) হাতে ধনুক ধারণ করেন যিনি। (কৃত্তিবাসা) যিনি চর্মাম্বরপরিহিত।

সুতরাং- উক্ত শাস্ত্র প্রমাণ থেকে স্পষ্ট হওয়া যায় যে- যজ্ঞে পরমেশ্বর শিবকে পিনাকধারী ও কৃত্তিবায়ায়া স্বরূপে আহুতি প্রদান করা হয়, যা মূর্তি পূজারই প্রতিপাদন করে।

“ত্রিনেত্র, নীলকণ্ঠ, কৈলাসনিবাসী, পিণাকী, কৃত্তিবাসা, কপর্দ্দী” (শুক্ল-যজুর্বেদ/১৬) রূপে হোম/পূজা, এগুলো সাকার ঈশ্বরের পূজার স্পষ্ট নির্দেশ।

বেদে যেমন “হবিষ্মন্তঃ সদ্‌মিৎ ত্বা হবামহে” (শুক্ল-যজুর্বেদ/১৬/১৬), (ঋগ্বেদ ১/১১৪/৮) ধরনের মন্ত্র রয়েছে, যা সাকার ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, যজমান নিজের সকল বাঁধা বিপত্তির দূরীকরণ ও সুখ প্রাপ্তির জন্য সেই রুদ্রকে আহুতি দিচ্ছে যিনি- নীলকন্ঠ, ত্রিনেত্রধারী, কৈলাসনিবাসী, উমাপতি পরমেশ্বর শিব। পূর্বমীমাংসা ১/২/৩৮ নং সূত্রে মহর্ষি জৈমিনি বলেছেন- “অভিজ্ঞেয়াৎ” অর্থাৎ, অর্থ নির্ধারণ করতে হয়, প্রসঙ্গ দ্বারা। আর সম্পূর্ণ শতরুদ্রীয় প্রসঙ্গে স্পষ্ট ভাবেই উল্লেখ আছে পরমেশ্বর শিবের সাকার স্বরূপের। যে স্বরূপকে উদ্দেশ্য করে আহুতি দেওয়া হচ্ছে, বন্দনা করা হচ্ছে, নমস্কার জানানো হচ্ছে। সাকার মানে কোনো নির্দিষ্ট রূপ বা মূর্তি ধারণ, তাই এই মন্ত্র দ্বারা মূর্তির উদ্দেশ্যে হোম বা অর্চনা করা শাস্ত্রসম্মত। তাই, বেদে মূর্তি পূজার বিধি নেই বলাটা অযৌক্তিক, কারণ বেদ নিজেই সাকার ঈশ্বরের পূজা ও সমর্পণের প্রমাণ দেয়। মূর্তির মাধ্যমে ভক্তি প্রকাশ করা বেদের সঙ্গে বিরোধী নয়, বরং বেদের ভক্তিমূলক দিকের প্রকাশ।

সুতরাং, বেদে সঠিকভাবে ঈশ্বরের রূপে পূজা করার অনুমতি আছে, যা দয়ানন্দের দাবিকে মিথ্যা প্রমাণ করে।

👉 এছাড়াও বেদে বলা হচ্ছে—

“ত্র‍্যম্বকং যজামহে সুগন্ধিং পুষ্টিবর্ধনম্।
উর্বারুকমিব বন্ধনান্ মৃত্যোর্মুক্ষীয় মামৃতাৎ” ।।

[ঋগবেদ ৭/৫৯/১২]

উক্ত মন্ত্রের অর্থ নিরূপণ ও ব্যাখ্যা করতে মহর্ষি যাস্ক বলেছেন—

“ত্র্যম্বকো রুদ্রস্তং ত্র্যম্বকং যজামহে সুগন্ধিম্ । সুগন্ধি সুষ্ঠুগন্ধিম্ । পুষ্টিবর্ধনং পুষ্টিকারকমিব । উর্বারুকমিব ফলং বন্ধনাদারোধনা-ন্মৃত্যোঃ সকাশান্মুঞ্চস্ব মাম্ । কস্মাদিতি । এষামিতরেষাপরা ভবতি” ।।

[যাস্ক নিরুক্ত/পরিশিষ্ট/১৩/৩৫]

এই মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র দ্বারা স্পষ্ট জানান দেয় আমরা ত্র‍্যাম্বকং অর্থাৎ তিনচোখ সম্পন্ন শিবের যজনা করি। আবার ত্র‍্যাম্বক অর্থ ত্রিভুবনের পিতাও মানা যায় যেমন বেদে বলেছে- 

“ভুবনস্য পিতরং গীর্ভিরাভী রুদ্রং দিবা বর্ধয়া রুদ্রমক্তৌ। বৃহন্তমৃষ্বমজরং সুষুম্নমৃধগ্ধুবেম কবিনেষিতাসঃ” ॥

[ঋগ্বেদ সংহিতা ৬/৪৯/১০]

উক্ত মন্ত্রের সায়ণভাষ্য দেখে নেবো—

​“ভুবনস্য ভূতজাতস্য “পিতরং পালয়িতারং “রুদ্রম্ । রুত্ দুঃখম্ । তদ্ দ্রাবয়িতারমীশ্বরম্ “আভিঃ “গীর্ভিঃ স্তুতিভিঃ "দিবা অহনি হে স্তোতঃ “বর্ধয় । “অক্তৌ রাত্র্যাং চ তমেব “রুদ্রং স্তুতিভিবর্ধয় । বয়ং চ “কবিনা প্রাজ্ঞেন রুদ্রেণ “ইষিতাসঃ প্রেরিতাঃ সন্ত: “বৃহন্তং মহান্তম্ “ঋষ্বং দর্শনীয়ম্ “অজরং জরারহিতং "সুষুম্নং শোভনসুখমেবংগুণবিশিষ্টং রুদ্রম্ “ঋধক্ ঋদ্ধং সমৃদ্ধং যথা ভবতি তথা “হুবেম স্তবাম ॥ ॥ ৬ ॥

অর্থ— এই ভুবনের সকল প্রাণীকুলের পিতা এবং পালনকর্তা হলেন রুদ্র। রুৎ শব্দের অর্থ হলো- দুঃখ, সেই দুঃখকে যিনি দ্রবীভূত বা দূর করেন, তিনিই ঈশ্বর রুদ্র। হে স্তোতা! এই সকল 'গী' অর্থাৎ স্তুতিবাক্য দ্বারা দিনের বেলা (দিবা) সেই রুদ্রের মহিমা বর্ধন (গান) করো। এবং 'অক্তু' অর্থাৎ রাত্রিতেও সেই রুদ্রেরই স্তুতিগানের মাধ্যমে মহিমা কীর্তন করো। এবং আমরাও সেই 'কবি' অর্থাৎ প্রাজ্ঞ (সর্বজ্ঞ) রুদ্র কর্তৃক প্রেরিত বা উৎসাহিত হয়ে, সেই মহান, দর্শনীয় (মনোরম), জরাহীন এবং পরম সুখদায়ক এই সকল গুণবিশিষ্ট রুদ্রকে অত্যন্ত ঋদ্ধ বা সমৃদ্ধভাবে (যথোচিত শ্রদ্ধার সাথে) আহ্বান বা স্তুতি করি।

তাই, এখানে ত্র‍্যম্বক অর্থে ত্রিভুবনের পিতা অর্থ নেওয়া হয়, তাহলেও দণ্ডাপুপিকান্যায় দ্বারা সেই রুদ্রই যে নীলকন্ঠ, ত্রিনেত্রধারী, কৈলাসনিবাসী, কৃত্তিবাসা, পিণাকী চিহ্নযুক্ত এমন সিদ্ধ হয়ে যায়। 

আবার - অমরকোষ, স্বর্গবর্গ ২১ শে অমরসিংহ “ত্র‍্যাম্বক” শব্দের অর্থে - ‘তিন চোখ সম্পন্ন’, ‘তিন লোকের পিতা’ অর্থকে গ্রহণ করেছেন। আচার্য সায়ণও একই অর্থকে গ্রহণ করেছেন। 

এছাড়াও- ব্যাকরণে একটি নীতি আছে- "রূঢ়িযোগম্‌পহরতি" (রূঢ়ি বা প্রচলিত অর্থ আভিধানিক অর্থকে ছাপিয়ে যায়)। পাণিনী অষ্টাধ্যায়ীর ভাষ্যকার কাশিকা ভাষ্যের উদাহরণ (১/২/৫২) থেকে বোঝা যায় যে, বিশেষণের রূপ প্রকৃতি অনুযায়ী হয়।
​'ত্র্যম্বক' শব্দটি বৈদিক কাল থেকেই রুদ্রের জন্য 'রূঢ়' বা নির্দিষ্ট হয়ে গেছে। যাস্ক যখন বলেন 'ত্র্যম্বকো রুদ্রস্তং', তখন তিনি কার্যত স্বীকার করে নিচ্ছেন যে 'ত্র্যম্বক' মানেই 'রুদ্র'। আর রুদ্রের বৈদিক ও পৌরাণিক পরিচয়ই হলো তিনি ত্রিনয়ন বিশিষ্ট।

পাণিনি ধাতুপাঠ (১/১১৫৭) “যজ্ দেবপূজা-সঙ্গতি-করন-দানেষু।” অর্থাৎ- √যজ্ ধাতুর অর্থ কেবল যজ্ঞ নয় পূজা, সঙ্গতি ও দান অর্থেও ব্যবহৃত হয়। সুতরাং- এর থেকেও প্রমাণিত হয় বেদে ঈশ্বরের সাকার স্বরূপের পূজোর উল্লেখ আছে। আর সেই সাকার স্বরূপকে আমরা মূর্তিতে কল্পনা করি।

👉 এবার- জৈমিনি পূর্বমীমাংসা ৩য় অধ্যায়ের ৩য় পাদ ১৪ নং সূত্র অনুযায়ী- শ্রুতি-লিঙ্গ-বাক্য-প্রকরণ-স্থান-সমাখ্যা এইগুলিই অর্থনির্ণয়ের প্রধান উপায়। এবার এখানে বিষয় হলো বেদে মূর্তি পূজোর নিয়ম। তবে, দেখে নেওয়া যাক পূর্বমীমাংসা অনুযায়ী বেদে মূর্তি পূজোর উল্লেখ আছে কি নেই —

◾শ্রুতি — মীমাংসা শাস্ত্রের নিয়ম হলো— "বিধিনা ত্বেকবাক্যত্বাৎ স্তুত্যর্থেন বিধীয়মানানাং স্যুঃ" (পূর্বমীমাংসা ১/২/৭)। অর্থাৎ, বিধি (যেমন- শতরুদ্রীয় হোম করো) এবং সেই হোমে ব্যবহৃত মন্ত্র (যেমন- পিনাকধারী রুদ্রের মন্ত্র) মিলে একটি 'একবাক্যতা' বা অখণ্ড অর্থ তৈরি করে।

অগ্নিচয়ন প্রক্রিয়াতে "অথাতঃ শতরুদ্রীয়ং জুহোতি" [শতপথ ব্রাহ্মণ ৯/১/১/১] এই বিধিবাক্যটি যজ্ঞের নির্দেশ দিচ্ছে। আর সেই হোমের সময়- “হবিষ্মন্তঃ সদ্‌মিৎ ত্বা হবামহে” [শুক্ল-যজুর্বেদ/শতরুদ্রীয়/১৬/১৬] {“হব্য (ঘৃত ও সমিধ) হস্তে নিয়ে আমরা সর্বদাই তোমাকে আহ্বান করি}। "পিনাকং বিভ্ৰদা গহি" [শুক্ল-যজুর্বেদ/শতরুদ্রীয়/১৬/৫১] (পিনাক হাতে নিয়ে এসো) মন্ত্রটি পাঠ করা হচ্ছে। ​যজ্ঞে যার উদ্দেশ্যে আহুতি দেওয়া হয়, তাকে 'দেবতা' বলে। এখন মন্ত্র যদি দেবতার রূপ বর্ণনা করে (যেমন- পিনাকধারী, কৃত্তিবাসা), তবে বিধি অনুযায়ী সেই সাকার দেবতাই যজ্ঞের আরাধ্যা। কারণ, যা মন্ত্রে নেই, তা বিধিতে ফলপ্রসূ হয় না।

“অগ্নিচয়ন প্রক্রিয়ায়- যজ্ঞের বিধিবাক্য যখন শতরুদ্রীয় হোমের নির্দেশ দেয় এবং সেই হোমের মন্ত্র যখন রুদ্রকে 'পিনাকধারী' ও 'কৃত্তিবাসা' বলে আহ্বান করে, তখন সেই 'বিধি' ও 'মন্ত্র'-এর একবাক্যতায় সাকারতত্ত্ব শ্রুতিসিদ্ধ হয়ে যায়। কারণ, যা মন্ত্রের দ্বারা প্রকাশিত নয়, তা যজ্ঞে আরাধ্যা হতে পারে না। অতএব, বেদে সাকার পূজা কেবল কল্পনা নয়, বরং যজ্ঞীয় অনুষ্ঠানের মূল ভিত্তি।"

◾লিঙ্গ — বেদে রুদ্রের জন্য 'পিনাকহস্ত' (হাতে ধনু), 'কৃত্তিবাসা' (চর্ম পরিহিত), 'নীলগ্রীব' (নীলকণ্ঠ) ইত্যাদি শব্দের ব্যবহার। ​যুক্তি অনুযায়ী- 'নীলকণ্ঠ' বা 'জটাধারী' এই বিশেষণগুলো একটি সুনির্দিষ্ট আকার বা 'লিঙ্গ' (চিহ্ন) বহন করে। নিরাকার বা বায়ু-বিদ্যুতের কোনো নীলকণ্ঠ বা জটা থাকতে পারে না। সুতরাং, শব্দের এই সামর্থ্যই প্রমাণ করে যে এখানে সাকার দেবতার কথা বলা হচ্ছে।

◾বাক্য — ঋগ্বেদ ১/৪৭/৮-এর বাক্য- "আ বর্হিঃ সীদতং নরা" (হে বীরগণ/দেবতাগণ, আপনারা এই কুশাসনে বসুন)। ​যুক্তি অনুযায়ী- এখানে 'আসন' এবং 'বসা' এই দুটি পদের বাক্যগত সম্বন্ধ প্রমাণ করে যে, যাঁকে আহ্বান করা হচ্ছে তাঁর একটি আকার আছে। কারণ নিরাকার সত্তার পক্ষে কোনো সীমিত আসনে (বর্হি) বসা যুক্তিযুক্ত নয়।

◾প্রকরণ — যজুর্বেদের 'শতরুদ্রীয়' প্রকরণ। এখানে রুদ্রের শত শত রূপের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে- কখনও তিনি সেনাপতি, কখনও স্থপতি, কখনও বা ব্যাধ।
​যুক্তি অনুযায়ী- এই পুরো প্রকরণটি হলো উপাসনা এবং শান্তিকরণের। উপাসনার প্রকরণে উপাস্যকে সবসময় সাকার রূপেই কল্পনা করা হয় (উপাসক-উপাস্য ভাব)। প্রকরণগতভাবে এখানে 'রুদ্র' মানে কোনো প্রাকৃতিকশক্তি বা সাধারণ রাজা/সেনাপতি নয়, বরং একজন সাকার ঈশ্বর।

◾স্থান — যজ্ঞের কর্মকাণ্ডে যেখানে মূর্তির ভাঙন বা স্থানচ্যুতির (মানগৃহ্যসূত্র ২/১৫/৬) প্রায়শ্চিত্ত বিধি দেওয়া হয়েছে, তার ঠিক পরেই দেবতার আবাহন মন্ত্রের স্থান। ​যুক্তি অনুযায়ী- কর্মকাণ্ডের এই বিশেষ স্থানে মূর্তির কথা আসার অর্থ হলো- বৈদিক যজ্ঞে মূর্তির উপস্থিতি একটি অনিবার্য বাস্তবতা ছিল। স্থানের এই পারম্পর্য প্রমাণ করে যে বিগ্রহ ছাড়া এই অনুষ্ঠান অসম্পূর্ণ।

◾সমাখ্যা — 'ত্র্যম্বক' মানে যাঁর তিনটি চোখ। 'পিনাকী' মানে যিনি পিনাক নামক ধনু ধারণ করেন। এই শব্দগুলোর ব্যুৎপত্তিগত অর্থই দেবতার সাকার রূপকে চিহ্নিত করে দেয়। আর্য সমাজীরা একে 'প্রকৃতি' বললেও 'সমাখ্যা' প্রমাণ অনুযায়ী এই নামগুলো কেবল নির্দিষ্ট আকারযুক্ত রুদ্রের জন্যই রূঢ় বা প্রসিদ্ধ।

--- তাহলে, উক্ত ষড়প্রমাণ দ্বারাও এটা জানা যায় বেদে মূর্তি পূজোর নির্দেশ দেওয়া আছে। এবার একই প্রসঙ্গে ব্যাকরণের দ্বারা দেখে নেওয়া যাক যে- বেদে মূর্তি পূজোর নির্দেশ আছে—

--- বেদে রুদ্রকে যখন 'নীলগ্রীব', 'পিনাকী' বা 'কৃত্তিবাসা' বলা হয়, তখন পাণিনীয় সূত্র অনুযায়ী তাঁর সাকার বিগ্রহ স্বতঃসিদ্ধ হয়ে যায়।

“​ইত্থম্ভূতলক্ষণে” (পাণিনী ২/৩/২১) এই সূত্র অনুযায়ী, যে চিহ্নের মাধ্যমে কাউকে চেনা যায়, সেই চিহ্নে তৃতীয়া বিভক্তি হয়। যেমন সিদ্ধান্তকৌমুদী ভাষ্য অনুযায়ী- 'জটাভিস্তাপসঃ' (জটার দ্বারা তাপস চেনা যায়)।
যখন বেদে 'নীলগ্রীবেণ' (নীলকণ্ঠের দ্বারা) বা 'পিনাকেন' (হাতে পিনাক ধারণের দ্বারা), “কৃত্তিবসনেন” (চর্ম আবৃত দ্বারা) রুদ্রকে চেনার কথা বলা হয়, তখন ব্যাকরণগতভাবে রুদ্রের একটি অবিচ্ছেদ্য সাকার চিহ্ন স্বীকার করা হয়। নিরাকার সত্তার কোনো 'গ্রীবা' (কণ্ঠ) বা হাত থাকা অসম্ভব। সুতরাং, ব্যাকরণ অনুযায়ী এই বিশেষণগুলো কেবল বিগ্রহেরই হতে পারে।

এখন এখানে আর্যসমাজ আপত্তি তুলতে পারে যে- 
“নীলগ্রীব মানে হলো নীল আকাশ বা প্রকৃতি"।

কিন্তু, ইত্থম্ভূতলক্ষণে' স্পষ্ট বলে যে কোনো বিশেষ 'লক্ষণ' বা 'চিহ্নের' মাধ্যমেই কাউকে চেনা যায়। ব্যাকরণ অনুযায়ী 'নীলগ্রীবেণ' বা 'পিনাকেণ' তখনই সিদ্ধ হয়, যখন সেই চিহ্নটি ব্যক্তির সাথে অবিচ্ছেদ্য থাকে। প্রকৃতি যদি নীল হয়, তবে তাকে 'নীলগ্রীব' বলা ব্যাকরণগতভাবে 'গৌণ' প্রয়োগ। কিন্তু রুদ্রের ক্ষেত্রে এটি 'মুখ্য' প্রয়োগ। ব্যাকরণে- 'গৌণমুখ্যয়োর্মুখ্যে কার্যসংপ্রত্যয়ঃ' পরিভাষা/১৫ অনুযায়ী মুখ্য অর্থই গ্রহণীয়। সুতরাং নীলকণ্ঠধারী ব্যক্তি সত্ত্বা এখানে রুদ্র।

👉 এছাড়াও- পাণিনীয় ব্যাকরণের এই দুটি সূত্র— 'সাধকতমং করণম্' (১/৪/৪২) ও 'কর্তৃকরণয়োস্তৃতীয়া' (২/৩/১৮) বেদে সাকার উপাসনা বা মূর্তিপূজার যৌক্তিকতাকে একটি বৈজ্ঞানিক ও ভাষাতাত্ত্বিক ভিত্তি প্রদান করে। নিচে এর সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা দেওয়া হলো—

​--- ক্রিয়াসিদ্ধিতে মূর্তির 'করণ' সংজ্ঞা (পাণিনী ১/৪/৪২) ​সূত্রটিতে কাশিকা ভাষ্য বলছে— "ক্রিয়াসিদ্ধৌ যৎ প্রকৃষ্টোপকারকং... তৎ করণসংজ্ঞং ভবতি"। অর্থাৎ, কোনো কাজ সম্পন্ন করার জন্য যা সবচেয়ে বেশি সাহায্য করে, তা-ই হলো 'করণ'।

​'উপাসনা' বা 'যজ্ঞ' হলো একটি বৈদিক ক্রিয়া। নিরাকার ও সর্বব্যাপী পরমাত্মার সাথে আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতের (যেমন- ফুল, ঘৃত, নৈবেদ্য) কোনো সরাসরি সংযোগ সম্ভব নয়। কেননা- নিরাকার, নির্গুণ ব্রহ্ম এসব কিছুর ঊর্ধ্বে।

এই ক্রিয়াটি সম্পন্ন করার জন্য আমাদের একটি 'প্রকৃষ্ট উপকারক' বা মাধ্যমের প্রয়োজন হয়। মূর্তি বা বিগ্রহ হলো সেই 'করণ', যা আমাদের মন ও নিবেদিত দ্রব্যকে দেবতার সাথে সংযুক্ত করে। কাশিকা ভাষ্যে যেমন ধান কাটার জন্য 'দাত্র' (কাস্তে) করণ, তেমনই ঈশ্বরীয় চেতনার সাথে সংযোগের জন্য 'বিগ্রহ' হলো অপরিহার্য করণ।

​দেবতার সাকার পরিচয়ে তৃতীয়া বিভক্তি (পাণিনী ২/৩/১৮) ​এই সূত্র অনুযায়ী অনুক্ত কর্তা এবং 'করণ'-এ তৃতীয়া বিভক্তি হয়। কাশিকা ভাষ্যে- 'প্রকৃত্যাদিভ্য উপসংখ্যানম্' বার্তিকটির মাধ্যমে কোনো বস্তুর স্বভাব বা বৈশিষ্ট্য বোঝাতেও এই বিভক্তির প্রয়োগ দেখানো হয়েছে।

​বেদে যখন রুদ্রকে 'নীলগ্রীবেণ' (নীলকণ্ঠ দ্বারা) বা 'পিনাকেন' (পিনাক ধনু দ্বারা) চিহ্নিত করা হয়, তখন ব্যাকরণ অনুযায়ী এই বিশেষণগুলো দেবতার স্বরূপ বা 'লিঙ্গ' হিসেবে কাজ করে।

​কাশিকা ভাষ্যের "প্রকৃত্যা অভিরূপঃ" (আকৃতি দ্বারা সুন্দর) উদাহরণের মতো, বৈদিক মন্ত্রে যখন দেবতার নির্দিষ্ট আকার ও অস্ত্রের বর্ণনা দিয়ে তৃতীয়া বিভক্তি যুক্ত হয়, তখন তার দ্বারা প্রমাণিত হয় যে- পরমেশ্বরের সেই সাকার রূপটিই উপাসনার ক্ষেত্রে তাঁর প্রধান পরিচয়। যা নিরাকার ও গুণহীন, ব্যাকরণগতভাবে তার কোনো 'অভিরূপ' বা 'দর্শনীয়' অবস্থা থাকা সম্ভব নয়।

​শাস্ত্রীয় নীতি অনুযায়ী, যজ্ঞীয় মন্ত্রে দেবতার যে স্বরূপ (সাকার) বর্ণিত হয়, যজ্ঞীয় ক্রিয়ায় সেই স্বরূপই 'সাধ্য'। 

পাণিনীয় সূত্র অনুযায়ী —

১. বিগ্রহ হলো উপাসনা ক্রিয়ার 'সাধকতম করণ'।
২. সাকার বিশেষণ হলো দেবতার 'প্রকৃতি' বা পরিচয় জ্ঞাপক চিহ্ন।

​অতএব, বেদে বর্ণিত পিনাকধারী বা কৃত্তিবাসা রুদ্রের যে বর্ণনা আমরা পাই, তাকে মূর্তিতে রূপদান করা ব্যাকরণ ও মীমাংসা উভয় শাস্ত্রের নিয়মেই বৈধ এবং প্রয়োজনীয়। কারণ, করণ (মাধ্যম) ছাড়া ক্রিয়া (পূজা) অসম্ভব।

👉 এবার দেখে নেবো মহর্ষি পাণিনী স্বয়ং মূর্তি পূজো নিয়ে কি বলছেন এবং মহর্ষি পতঞ্জলি, ভট্টজীদিক্ষীত, কাশিকা আদি ভাষ্যকারও মূর্তি পূজো নিয়ে কি বলছে সেটাও দেখে নেবো —

--- ​মহর্ষি পাণিনির 'অষ্টাধ্যায়ী' সূত্রে মূর্তিপূজার অস্তিত্ব ও সামাজিক স্বীকৃতির স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। উক্ত পাণিনীয় সূত্রটি হলো —

​"জীবিকার্থে চাপণ্যে" (৫/৩/৯৯)

​ব্যাখ্যা — এই সূত্রে পাণিনি বলছেন, যখন কোনো দেব-প্রতিকৃতি (মূর্তি) কেনা-বেচার (পণ্যে) জন্য নয়, বরং উপাসনা ও দর্শনের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহের জন্য রাখা হয়, তখন সেখানে 'কন্' প্রত্যয় বিলুপ্ত হয়।

​উদাহরণস্বরূপ — 'শিবঃ', 'স্কন্দঃ', 'বিষ্ণুঃ'।
​যদি এগুলো সাধারণ মাটির পুতুল হতো যা মেলায় বিক্রি হয়, তবে ব্যাকরণ অনুযায়ী নাম হতো 'শিবকঃ' বা 'বিষ্ণুকঃ'। কিন্তু যেহেতু এগুলো 'পূজার্থ' (উপাসনার জন্য), তাই এদের নাম সাক্ষাৎ দেবতার নামে হয়।

- ​কাশিকা ও সিদ্ধান্তকৌমুদী ভাষ্যে বলা হয়েছে— "দেবলকাদীনাং জীবিকার্থা দেবপ্রতিকৃতয় উচ্যস্তে"। 
'দেবলক' মানে সেই সব পুরোহিত বা সেবায়েত, যারা মন্দিরে বিগ্রহের সেবা করেন। কাশিকা এখানে বাসুদেব, শিব, স্কন্দ, বিষ্ণু ও আদিত্য এই পঞ্চদেবতার নাম উল্লেখ করে প্রমাণ করেছেন যে প্রাচীন কাল থেকেই এই বিগ্রহগুলোর অস্তিত্ব ও উপাসনা ছিল।

- ‘অর্চা' বা পূজনীয় বিগ্রহ ​মহর্ষি পতঞ্জলি তাঁর মহাভাষ্যে এই সূত্রের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেছেন—
​"যাস্ত্বেতাঃ সম্প্রতিপূজার্থাস্তাসু ভবিষ্যতি"। ​পতঞ্জলি মৌর্য সম্রাটদের তৈরি মূর্তির কথা উল্লেখ করলেও স্পষ্ট করেছেন যে- যে মূর্তিগুলো 'পূজার্থ' (পূজার জন্য) ব্যবহৃত হচ্ছে, সেগুলোর ক্ষেত্রেই পাণিনির এই সূত্র প্রযোজ্য। অর্থাৎ, পতঞ্জলির সময়েই মন্দিরে পূজনীয় 'অর্চা' বা বিগ্রহের ধারণা সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল।

​পাণিনি, পতঞ্জলি এবং বেদাঙ্গের ঋষিদের সাক্ষ্যই প্রমাণ করে যে মূর্তিপূজা কোনো আধুনিক প্রথা নয়। এটি বৈদিক ব্যাকরণ ও দর্শন দ্বারা সমর্থিত একটি উচ্চতর আধ্যাত্মিক বিজ্ঞান। যারা কেবল আক্ষরিক অর্থে বেদ বুঝতে চান, তারা বেদের এই 'অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ' (ব্যাকরণ ও কল্পসূত্র) বুঝতে ব্যর্থ হন। তাই- যারা বলছেন মূর্তিপূজোর কোনো অস্তিত্ব নেই তাদের দাবী এখানে খণ্ডিত হয়ে যায়৷

👉 ​বেদে সাকার উপাসনা নিয়ে ব্রহ্মসূত্রের সিদ্ধান্ত দেখে নেওয়া যাক —

​ভারতীয় দর্শনের শিরোমণি 'ব্রহ্মসূত্র' মূলত উপনিষদের জটিল ও আপাতবিরোধী বাক্যগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করে। বেদে একদিকে ব্রহ্মকে- 'অশব্দমস্পর্শমরূপমব্যয়ম্' (শব্দ, স্পর্শ ও রূপহীন) বলা হয়েছে, আবার অন্যদিকে তাঁকে 'হিরণ্যশ্মশ্রুঃ হিরণ্যকেশঃ' (স্বর্ণাভ দাড়ি ও কেশবিশিষ্ট) বা 'সহস্রশীর্ষা পুরুষঃ' (সহস্র মস্তকবিশিষ্ট) রূপে বর্ণনা করা হয়েছে। মহর্ষি বাদরায়ণ তাঁর সূত্রে এই সাকার বর্ণনার পরমার্থিক ও ব্যবহারিক সার্থকতা বিচার করেছেন।

--- ​ব্রহ্মসূত্রের প্রথম অধ্যায়ের অন্যতম প্রধান সূত্র হলো: "অন্তস্তদ্ধর্মোপদেশাৎ" (১/১/২০)। ছান্দোগ্য উপনিষদে সূর্যমণ্ডলের অভ্যন্তরে এক হিরণ্ময় পুরুষের বর্ণনা আছে। প্রশ্ন ওঠে, এই রূপটি কি কোনো সীমাবদ্ধ দেবতার? সূত্রকার বলছেন না, এটি স্বয়ং পরমাত্মার। কারণ সেখানে এমন সব ধর্মের (গুণাবলীর) কথা বলা হয়েছে যা কেবল পরমাত্মারই সম্ভব (যেমন- সর্বপাপবিমুক্ত হওয়া)। সুতরাং, উপাসনার প্রয়োজনে ব্রহ্ম সাকার রূপ পরিগ্রহ করেন বা সেই রূপে নিজেকে প্রকাশিত করেন। এটি ব্রহ্মের মায়িক রূপ নয়, বরং উপাসকের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ।

- বেদে ব্রহ্মকে 'বৈশ্বানর' রূপে বর্ণনা করা হয়েছে, যেখানে তাঁর মস্তক আকাশ এবং চরণ পৃথিবী। ব্রহ্মসূত্রের ১/২/২৪-৩০ সূত্রগুলোতে এই বিশ্বরূপ বা সাকার অবয়বের আলোচনা করা হয়েছে। ঋষি আশ্মরথ্যের মতে- "অভিব্যক্তেরিত্যাশ্মরথ্যঃ" (১/২/২৯)। অর্থাৎ, বিভু বা সর্বব্যাপী পরমাত্মা উপাসকের হৃদয়ে বা ধ্যানের সুবিধার্থে 'প্রদেশমাত্র' (একটি নির্দিষ্ট সীমিত আকার) হিসেবে অভিব্যক্ত হন। ঋষি বাদরিও তাঁর "অনুস্মৃতেরিতি বাদরিঃ" (১/২/৩০) সূত্রে সমর্থন করেছেন যে, মনের একাগ্রতার জন্য ব্রহ্মকে সাকার রূপে স্মরণ করা শাস্ত্রসম্মত।

​- সাকার ও নিরাকার বর্ণনার মধ্যে কোনো বিরোধ নেই, একথা ব্রহ্মসূত্র স্পষ্টভাবে বলেছে- "প্রকাশবচ্চাবৈয়র্থ্যাৎ" (৩/২/১৫)। যেমন- সূর্যের আলো সর্বত্র ব্যাপ্ত হলেও কোনো স্বচ্ছ আধারের মাধ্যমে তা বিশেষ আকার ধারণ করে, তেমনি পরমাত্মা নিরাকার হওয়া সত্ত্বেও উপাসনার 'উপাধি' বা মাধ্যমের কারণে সাকার রূপে প্রতীয়মান হন। বেদে নিরাকার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে ব্রহ্মের স্বরূপ জ্ঞানের জন্য, আর সাকার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে উপাসনার মাধ্যমে চিত্ত শুদ্ধির জন্য। উভয় বর্ণনাই বেদে সমানভাবে সার্থক ও সত্য।
- ​ব্রহ্মসূত্রকার চতুর্থ অধ্যায়ে- "ন প্রতীকে ন হি সঃ" (৪/১/৪) সূত্রে সতর্ক করেছেন যে, প্রতীক (যেমন- মন বা আদিত্য) নিজে ব্রহ্ম নয়, কিন্তু প্রতীকের মাধ্যমে ব্রহ্মেরই উপাসনা করা হয়। অর্থাৎ, সাকার রূপটি একটি আলম্বন বা মাধ্যম, যার লক্ষ্য হলো সেই পরম তত্ত্বের উপলব্ধি। যারা এভাবে সগুণ বা সাকার ব্রহ্মের উপাসনা করেন, তাঁরা 'অর্চিরাদি মার্গে' উচ্চতর লোক প্রাপ্ত হন, যা অন্তিমে মোক্ষের সোপান হিসেবে কাজ করে।

- ব্রহ্মসূত্রের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী- ব্রহ্ম মূলত "অরূপবদেব হি তৎপ্রধানত্বাৎ" (৩/২/১৪) অর্থাৎ- রূপহীন বা নিরাকার। কিন্তু ব্রহ্মের এই নিরাকারত্ব সাকার উপাসনাকে অস্বীকার করে না। বরং সাধকের রুচি, মেধা এবং ভক্তির টানে সেই নির্বিশেষ পরমাত্মাই সগুণ ও সাকার রূপে নিজেকে প্রকট করেন। বেদে বর্ণিত সাকার উপাসনা কেবল রূপক নয়, বরং ব্রহ্মের অপরিমেয় শক্তির এক চিন্ময় প্রকাশ।

👉 পঞ্চাবয়বী ন্যায় অনুযায়ী— 

◾​১. প্রতিজ্ঞা — ​বেদে সাকার উপাসনা ও প্রতিমা-তত্ত্ব শাস্ত্রসিদ্ধ এবং এটি বেদের কর্মকাণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
(ব্যাখ্যা- এখানে আমরা কেবল 'মূর্তিপূজা' শব্দে সীমাবদ্ধ না থেকে একে 'সাকার উপাসনা' হিসেবে ধরছি, কারণ পূজা হলো সেই সাকার তত্ত্বের প্রয়োগ।)

◾​২. হেতু — ​যেহেতু বেদের সংহিতাসমূহে দেবতাদের 'সবিশেষ' বর্ণনা, আয়ুধ-পরিচ্ছদের উল্লেখ এবং তাঁদের 'আবাহন-স্থাপন-ধ্যান' বর্ণিত হয়েছে। ​লিঙ্গ (চিহ্ন)- 'শুম্ভতা' (অলঙ্করণ), 'পেশস্বতীঃ' (রূপবতী), 'পিনাকহস্তঃ' (হাতে ধনু) এই বিশেষণগুলো নিরাকার সত্তায় অসম্ভব। পাণিনীয় সূত্রানুযায়ী দেবতাকে চেনার জন্য 'ইত্থম্ভূতলক্ষণে' (২/৩/২১) তৃতীয়া বিভক্তির প্রয়োগ (যেমন- পিনাকেণ, নীলগ্রীবেণ) তাঁদের সাকার চিহ্নকেই সিদ্ধ করে।

​◾৩. উদাহরণ —  ​যেখানে যেখানে 'ক্রিয়ার্থক আবাহন' থাকে, সেখানে সেখানেই 'আধার' বা 'বিগ্রহ' থাকতে বাধ্য।

​দৃষ্টান্ত- যেমন, কাউকে যদি বলা হয় "ভোজন করো", তবে সেখানে যেমন একজন 'ভোক্তা' এবং 'ভোজ্য বস্তু' থাকতে হয়, তেমনই যজ্ঞে যখন বলা হয় "দেবতাকে অলঙ্কৃত করো" (শুম্ভতা) বা "দেবতা আসনে বসুন" (আ বর্হিঃ সীদতং), তখন সেই আদিষ্ট কর্ম সম্পাদনের জন্য দেবতার একটি দেশ-কাল-পরিচ্ছিন্ন আকার থাকা অপরিহার্য। লৌকিক জগতে কোনো নিরাকার সত্তাকে 'সাজানো' বা 'আসনে বসানো' যুক্তিবিদ্যার বিরুদ্ধ।

এছাড়াও- যেমন লৌকিক জগতে একজন যোদ্ধাকে যখন 'ধনুর্ধারী' বা 'বর্মধারী' বলা হয়, তখন সেই বিশেষণগুলো (তৃতীয়া বিভক্তি যুক্ত) তাঁর সাকার অবয়বকেই প্রমাণ করে। একইভাবে, যজ্ঞক্রিয়া (সাধ্য) সম্পন্ন করার জন্য যেমন কাস্তে (দা) একটি করণ, তেমনই দেবতার সাথে সংযোগ স্থাপনের জন্য 'বিগ্রহ' হলো শ্রেষ্ঠ 'সাধকতম করণ' (পাণিনী ১/৪/৪২)। নিরাকার বা অলক্ষণ সত্তার ক্ষেত্রে এই ব্যাকরণিক ও তাত্ত্বিক সম্বন্ধ অসম্ভব।

​◾৪. উপনয় — ঋগ্বেদ ১০/১৩০/৩-এ উল্লিখিত 'প্রতিমা' শব্দটি কেবল মাপকাঠি নয়, বরং যজ্ঞের হবির 'প্রতিযোগী' বা 'সদৃশ গ্রহণকারী' বিগ্রহ। আবার, মানবগৃহ্যসূত্রে বর্ণিত মূর্তির 'ভঞ্জন-প্রায়শ্চিত্ত' (মূর্তি ভেঙে গেলে আহুতি দেওয়া) প্রমাণ করে যে, সেই আকার কেবল মানসিক কল্পনা বলা যায় না, বরং তা কাঠ, পাথর বা ধাতুর তৈরি বাস্তব বিগ্রহ ছিল। তাই, যুক্তি অনুযায়ী- যদি বেদে মূর্তির অস্তিত্বই না থাকত, তবে বেদের কর্মকাণ্ডের শাখা (কল্পসূত্র) কখনোই তার বিনাশের প্রায়শ্চিত্ত বিধান করত না। কারণ, যা অবাস্তব, তার সংস্কার হয় না। এবং অন্যান্য কল্পসূতত্রে দেবমন্দিরের প্রদক্ষিণ করা এবং বেদ মন্ত্র উচ্চারণ পূর্বক রুদ্রের সপরিবার, সপার্ষদ সহ গন্ধ, পুষ্প, ধূপ, দ্বীপ আদি দ্বারা পূজো করা, রুদ্রকে কৃত্তিবাসা ও পিনাকধারী স্বরূপে আহুতি দেওয়া দ্বারা প্রমাণ হয় যে- বেদে অবশ্যই মূর্তি পূজোর নিয়ম আছে৷

এবং যদি বেদে রুদ্রকে 'তিন লোকের পিতা' (ত্র্যম্বক) বলা হয়, তবে দণ্ডাপুপিকা ন্যায় অনুযায়ী তাঁর সেই পিতৃত্বের সাকার পরিচয় (যিনি নীলকণ্ঠ, পিনাকপাণি) স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সিদ্ধ হয়ে যায়। কারণ যাঁর মহিমা বা গুণ বর্ণিত হয়েছে (দণ্ড), তাঁর অস্তিত্ব বা স্বরূপ (অপূূপ/পিঠা) অস্বীকার করার কোনো অবকাশ নেই।

◾​৫. নিগমন — অতএব, এটি প্রমাণিত যে- আর্য সমাজীদের দাবি (বেদে মূর্তিপূজা নেই) শাস্ত্রীয় ও ব্যাকরণগতভাবে ভিত্তিহীন, বরং বেদের কর্মকাণ্ড, ব্যাকরণের কারক-তত্ত্ব এবং মীমাংসার প্রয়োগবিধি এই ত্রয়ীর বিচারে মূর্তিপূজা বা সাকার উপাসনা বৈদিক ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

👉 উপরিউক্ত শাস্ত্রীয় আলোচনা, ব্যাকরণিক সূত্র এবং মীমাংসা-দর্শনের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের মাধ্যমে এটি দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট যে- বেদে মূর্তিপূজা বা সাকার উপাসনার অস্তিত্ব নেই এই দাবি কেবল ভিত্তিহীন নয়, বরং তা বেদের 'ক্রিয়ার্থক' স্বরূপের পরিপন্থী। পরিশেষে বলা যায় —

​১. ​বেদের যে অংশ (সংহিতা) আমাদের কাছে বর্তমানে আছে, তা মূলত 'যজ্ঞ-বেদ'। একটি বিশেষ বিষয়ের গ্রন্থে যেমন অন্য বিষয়ের বিস্তারিত বর্ণনা থাকে না, তেমনি যজ্ঞ-সংহিতায় মূর্তিপূজার 'ম্যানুয়াল' বা বিস্তারিত পদ্ধতি না থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ঋগ্বেদের 'প্রতিমা' (১০/১৩০/৩), 'শুম্ভতা' (১/২১/২) (সাজানো) 'আয়ুধ ও অলঙ্কার'-এর বর্ণনা দ্বারা প্রমাণ হয় যে- বৈদিক ঋষিদের দৃষ্টিতে ঈশ্বর কেবল নিরাকার তত্ত্ব নন, তিনি উপাসনার প্রয়োজনে সাকার ও সবিশেষ।

​২. ​পাণিনীয় ব্যাকরণের- 'ইত্থম্ভূতলক্ষণে' (২/৩/২১) সূত্র অনুযায়ী যখন রুদ্রকে 'নীলগ্রীবেণ' বা 'পিনাকেন' বলা হয়, তখন তাঁর একটি নির্দিষ্ট সাকার 'লক্ষণ' বা 'চিহ্ন' ব্যাকরণগতভাবেই স্বীকৃত হয়। নিরাকার বায়ু বা বিদ্যুতের জটা, নীলকণ্ঠ বা হাতে ধনু থাকা অসম্ভব। কাশিকা ভাষ্যের- 'প্রকৃত্যা অভিরূপঃ' সূত্রের ন্যায় দেবতার এই সাকার বিশেষণগুলোই দ্বারা প্রমাণ হয় যে- উপাসনার ক্ষেত্রে তাঁর সাকার বিগ্রহই মুখ্য পরিচয়।

​৩. ​মহর্ষি জৈমিনির মতে, বেদের সার্থকতা তার যজ্ঞানুষ্ঠানে। যজ্ঞ একটি স্থূল ক্রিয়া, যেখানে সগুণ দ্রব্য (ঘৃত, ফল) নিবেদন করা হয়। নিরাকার ও অতীন্দ্রিয় সত্তার সাথে স্থূল দ্রব্যের সংযোগ স্থাপনের জন্য 'বিগ্রহ' হলো শ্রেষ্ঠ 'সাধকতম করণ' (১/৪/৪২)। মাধ্যম (মূর্তি) ছাড়া যেমন উপাসনা-ক্রিয়া সম্পন্ন হয় না, তেমনি কল্পবেদাঙ্গ বা গৃহ্যসূত্রে বর্ণিত মূর্তির ভাঙন বা সংস্কারের প্রায়শ্চিত্ত বিধি দ্বারা প্রমাণ হয় যে- বৈদিক যুগে বিগ্রহ কেবল কল্পনা ছিল না, বরং তা বাস্তবতাও বটে।

​৪. ​ব্রহ্মসূত্রের- 'অন্তস্তদ্ধর্মোপদেশাৎ' (১/১/২০) এবং 'অভিব্যক্তেরিত্যাশ্মরথ্যঃ' (১/২/২৯) সূত্রানুযায়ী, সর্বব্যাপী পরমাত্মা উপাসকের হৃদয়ে বা ধ্যানের সুবিধার্থে একটি নির্দিষ্ট আকারে নিজেকে প্রকাশ করেন। যজুর্বেদের "ন তস্য প্রতিমা অস্তি" মন্ত্রটি ঈশ্বরের অনন্ত স্বরূপের কথা বলে (যাঁর সমান কেউ নেই), কিন্তু তা তাঁর সাকার উপাসনাকে খণ্ডন করে না। বরং নির্গুণ ব্রহ্মই ভক্তের ভক্তির টানে সগুণ বিগ্রহে প্রকাশিত হন, ঠিক যেমন সর্বত্র ব্যাপ্ত বিদ্যুৎ একটি বাল্বের মাধ্যমে আলো হয়ে ধরা দেয়।

​৫. ​শতরুদ্রীয় হোমে পিনাকধারী ও কৃত্তিবাসা রুদ্রকে আবাহন, কিংবা গৃহ্যসূত্রে বর্ণিত সপরিবার দেব-উপাসনা দ্বারা প্রমাণ হয় যে- সনাতন ধর্মের মূর্তিপূজা কোনো অর্বাচীন প্রথা নয়। এটি বেদের সেই মূল বৃক্ষের শাখা যা পুরাণ এবং ইতিহাসে পল্লবিত হয়েছে। যাস্কের নিরুক্ত থেকে সায়ণাচার্যের ভাষ্য সর্বত্রই দেবতার আকার ও বিগ্রহ-তত্ত্ব স্বীকৃত।

 — আর্য সমাজীদের মূর্তিপূজা-বিরোধী অবস্থান মূলত বেদের একটি খণ্ডিত ও কেবল রূপক-ভিত্তিক ব্যাখ্যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু ব্যাকরণ, মীমাংসা এবং বেদাঙ্গের সামগ্রিক বিচারে দেখা যায়, সাকার উপাসনা ছাড়া বেদের কর্মখণ্ড ও উপাসনাখণ্ড অসম্পূর্ণ। অতএব, বেদে মূর্তিপূজার নির্দেশ বা ইঙ্গিত নেই, এই দাবি মিথ্যা। বরং মূর্তিপূজা হলো বেদেরই সেই চিন্ময় প্রকাশ, যা নিরাকার পরমেশ্বরকে সাধারণ মানুষের ভক্তি ও সেবার নাগালে নিয়ে আসে। 

👉 মীমাংসাকার কুমারিলভট্ট বিরচিত “মীমাংসাশ্লোকবার্তিক” এর একটি শ্লোক উদ্ধৃত করে আমার এই প্রবন্ধটি সম্পূর্ণ করছি —

“বিশুদ্ধজ্ঞানদেহায় ত্রিবেদীদিব্যচক্ষুষে ।
শ্রেয়ঃ প্রাপ্তিনিমিত্তায় নমঃ সোমার্ধধারিণে” ।। ১ ।।
[মীমাংসাশ্লোকবার্তিক/প্রতিজ্ঞাসূত্র/১ নং শ্লোক]

অর্থ— যিনি বিশুদ্ধ জ্ঞানময় শরীরের অধিকারী, ঋক্-যজু-সাম এই তিন বেদই যাঁর দিব্য চক্ষু (অর্থাৎ যিনি ত্রিনয়ন), এবং যিনি পরম কল্যাণ স্বর্গ ও মোক্ষ প্রাপ্তির একমাত্র কারণ, সেই অর্ধচন্দ্রধারী ভগবান শিবকে প্রণাম জানাই।।

— সর্বে হ্যেষ রুদ্রস্তস্মৈ রুদ্রায় নমো অস্তু —

নমঃ শিবায় 🙏
নমঃ শিবায়ৈ 🙏
শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্ ✊🚩
ॐ নমঃ পার্বতীপতয়ে হর হর মহাদেব 🚩

✍️ লেখানীতে — অন্তিক ভট্টাচার্য্য (শম্বরনাথ শৈব)।

🌻 বিশেষ কৃতজ্ঞতা — আমার গুরু শ্রীনন্দীনাথ শৈবাচার্য ও আমার আদর্শ শ্রীরোহিত কুমার চৌধুরী শৈবজী। 

©️📣 কপিরাইট ও প্রচারে — SHIVALAYA

বি: দ্র: লেখাটি কপি করলে সম্পূর্ণ করবেন, কোনো রকন কাটছাট গ্রহণযোগ্য নয়। 






শিবঃ ওঁ……..🙏

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ