শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে 'মহেশ্বর' পদের রূঢ়ার্থ নির্ণয়, ব্যাকরণ ও মীমাংসাভিত্তিক বিচার"





 🚩 "শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে 'মহেশ্বর' পদের রূঢ়ার্থ নির্ণয়, ব্যাকরণ ও মীমাংসাভিত্তিক বিচার" —



❌ আপত্তি — বৈষ্ণবরা শিবকে তামসিক দেবতা মাত্র বলে। কিন্তু, শাস্ত্রে শিব হলো গুণাতীত। যদিও  এই অর্থ প্রতিপাদন করতে বহু শ্রুতি বাক্য রয়েছে তারপরেও আমরা শৈবপক্ষ থেকে উক্ত প্রমাণ দিয়ে থাকি - "মায়ান্তু প্রকৃতিং বিদ্যান্মায়িনন্তু মহেশ্বরম্‌" (শ্বেতা ৪/১০)। উক্ত শ্রুতি থেকে এটা প্রমাণিত হয়, মায়া যেহেতু ত্রিগুণাত্মিকা তাই সেই ত্রিগুণাত্মিকা মায়ারও যিনি অধিশ্বর তিনিই মহেশ্বর (শিব)। তাই শিব কদাপি তামসিক নয়। বরং প্রভু শিব গুণাতীত ব্রহ্ম। 

কিন্তু, এখানে হলো মূল বিষয়। বৈষ্ণবরা বলেন- এখানে মহেশ্বর পদ "মহাশ্চাসৌ ঈশ্বরস্যঃ" এই কর্মধারয় সমাস অনুযায়ী সর্বব্যাপী সত্ত্বা বা মহান ঈশ্বরকে বোঝায়। এই অনুযায়ী- মহেশ্বর পদে বিষ্ণু, ইন্দ্রাদি অর্থও গ্রহণ করা যায় কেবল ত্রিনেত্রধারী, কৈলাসনিবাসী শিবকে নয়। তাই, এখানে মহেশ্বর পদ শিবেই কদাপি রূঢ় নয়। 


✅ সমাধান — ব্যুৎপত্তিগত ভাবে এই ব্যাখ্যা সঠিক মনে হলেও ইহাই একমাত্র অর্থ নয়। কেননা, ব্যাকরণের “রূঢ়ির্যোগম্‌পহরি” এই নিয়ম অনুযায়ী- রূঢ়ার্থ দ্বারা যোগার্থ দূর্বল হওয়ার কারণে “মহেশ্বর” পদ দ্বারা কেবল প্রভু শিবকেই প্রতিপাদিত করে, অন্য কোনো দেবতাকে নয়৷ তাই, উক্ত প্রকরণে “মহেশ্বর” পদ দ্বারা একমাত্র প্রভু শিবকেই বোঝায়৷ 

সাধারণত পূর্বমীমাংসার নিয়ম হলো- যদি শ্রুতির কোনো শব্দ বা বাক্য যদি স্পষ্ট অর্থের বোধক না হয় তবে তা নির্ণয় করতে হয়- প্রসঙ্গ, প্রাসঙ্গিক লক্ষণ, অন্যান্য শাস্ত্র প্রকরণ দ্বারা। যদিও- “মহেশ্বর” পদ শিবেই রূঢ় তারপরেও আমরা বিভিন্ন প্রকরণ দ্বারা উক্ত পদের শিববাচ্যতা সিদ্ধ করবো।

প্রথমত- “সিংহাবলোকন ন্যায়” অনুযায়ী- পূর্বের প্রকরণ বিচার করে “মহেশ্বর” পদের অর্থ নির্ধারণ করা ন্যায় সঙ্গত। উক্ত শ্বেতাশ্বতর উপনিষদের ৩য় অধ্যায়ের প্রারম্ভেই বলা হয়েছে- “এক হি রুদ্র ন দ্বিতীয়ায় তস্থুর্য” (শ্বেতা ৩/২) অর্থাৎ- রুদ্রই একমাত্র পরমেশ্বর দ্বিতীয় কোনো সত্ত্বা নেই। সেই এক ও অদ্বিতীয় পরমেশ্বর রুদ্রকে পরবর্তী মন্ত্রে এভাবে উল্লেখ করেছে- 

“যা তে রুদ্র শিবা তনূরঘোরাঽপাপকাশিনী।
তয়া নস্তনুবা শন্তময়া গিরিশন্তাভিচাকশীহি ॥ ৫ ॥
যামিষুং গিরিশন্ত হস্তে বিভর্ষ্যস্তবে।
শিবাং গিরিত্র তাং কুরু মা হিংসীঃ পুরুষং জগৎ” ॥ ৬ ॥

উক্ত মন্ত্রগুলোর অর্থ হলো- ​"হে গিরিনিবাসী প্রভু রুদ্র, আপনার যে রূপ পরম শান্ত ও মঙ্গলময়, সেই রূপের দ্বারা আমাদের ধন্য করুন। আপনার হাতের অস্ত্রকে আমাদের জন্য কল্যাণময় করে তুলুন এবং আমাদের ও এই জগতের কোনো ক্ষতি না করে আমাদের রক্ষা করুন।" 

এবার এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো- এখানে রুদ্রকে একমাত্র অদ্বিতীয় ব্রহ্ম বলা হয়েছে। এবং সেই রুদ্রকেই উক্ত মন্ত্রে বলা হয়েছে- গিরিত্র, গিরিশন্ত যা অন্যান্য শ্রুতিতে উল্লেখিত কৈলাসনিবাসী শিবের সাথেই অভিন্ন৷ যা- “কৈলাসশিখরাভাসা হিমবদ্‌গিরি সংস্থিতা। নীলকন্ঠং ত্রিনেত্রং চ তন্মে মনঃ শিবসঙ্কল্প মস্তু” (ঋগবেদ/আশ্বলায়ণ শাখা ১০/১৭১) এই মন্ত্র দ্বারা প্রতিপাদিত হয়। অর্থাৎ - নিরাকার, নির্বিকার, নির্গুণ ব্রহ্ম পরশিবই যে সাকার, সগুণে কৈলাসনিবাসী, ত্রিনেত্রধারী তা শ্রুতি দ্বারাই সিদ্ধ হয়ে যায়।

[ এবং একই মন্ত্র শুক্ল-যজুর্বেদের ১৬ নং অধ্যায় শতরুদ্রীয় হোম প্ররকণেও বিদ্যমান। যেখানে ভাষ্যকার - উব্বট, মহীধর, সায়ণ আদি - গিরি, গিরিত্র, গিরিশন্ত পদ দ্বারা কৈলাসনিবাসী শিব অর্থই প্রতিপাদন করেছেন। ]

এবার- উক্ত ধারাবাহিক বর্ণনার পর ৪র্থ অধ্যায়ে সেই এক ও অদ্বিতীয় পরমেশ্বর রুদ্রকেই বলা হয়েছে - “মায়িনন্তু মহেশ্বরম্‌”। সুতরাং- এখানে “মহেশ্বর” পদের সাথে পূর্বে উল্লেখিত “গিরিত্র”, “গিরিশন্ত” আদির সম্বন্ধে সম্বন্ধ স্থাপন করা হয়েছে। তাই, দিনের আলোর ন্যায় পরিস্কার যে- এখানে “মহেশ্বর” পদ দ্বারা একমাত্র শিবকেই বুঝিয়েছে যিনি সাকারে কৈলাসনিবাসী, ত্রিনেত্রধারী।

উক্ত বিষয়টি “দণ্ডাপুপিকান্যায়” দ্বারাও সিদ্ধ হয়। যেমন- একটি হাতি যদি পিঠে সংযুক্ত দণ্ডটি খেয়ে নেয়, তাহলে- সেই দণ্ডের সাথে পিঠেগুলোও খেয়ে নিয়েছে তা আলাদা ভাবে বলতে হয় না। একই ভাবে- রুদ্রুই যখন অদ্বিতীয় পরমেশ্বর তার অতিরিক্ত আর কিছুই কেই, তবে- মহেশ্বর নামটিও যে সেই এক অদ্বিতীয় পরমেশ্বর রুদ্রেরই এমন অর্থ আপনা আপনিই সিদ্ধ হয়ে যায়। তাই, “দণ্ডাপুপিকান্যায়” অনুযায়ী- “মহেশ্বর” পদ শিববাচ্য তা স্বতসিদ্ধ।

আরও বিস্তারিত ভাবে যদি বলতে হয় তাহলে এখানে পূর্বমীমাংসার “ছাগপশুন্যায়” উদ্ধৃত দেওয়া হচ্ছে— “অগ্নিষোমীয়ং পশুমালভেত” [তৈত্তিরীয় সংহিতা/৬/১/১/৬]  “পশুচোদনায়াম্‌ অনিয়মঃ অবিশেষাৎ” [মীমাংসা ৬/৮/৩০]— অগ্নিষোমীয় যজ্ঞে পশুবলি দেওয়া উচিত, এই নির্দেশক (বিধি) বাক্যে ‘'পশু’ এমন একটি সাধারণ পদ হওয়ায়, তা চার পায়ে চলা কোনো পশু বলি দেওয়ার কথা বলে, কোনো নির্দিষ্ট পশুর কথা বলে না।  এই কারণে, সেই অগ্নিষোমীয় যজ্ঞে বলি দেওয়ার জন্য ঠিক কি পশু, সে বিষয়ে সন্দেহ হয়। কিন্তু, “ছাগস্য হবিশো বপায়া মেদসঃ” [তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ৩/৬/৮/১]— অর্থাৎ ছাগলের চর্বি দিয়ে হোম করতে হবে, এই অর্থবোধক বিনিয়োগ মন্ত্র থেকে এবং এই মন্ত্রে ‘ছাগ’ নামক বিশেষ পদ থাকার কারণে, সাধারণ ‘পশু’ শব্দের অর্থ ‘ছাগ’ নির্ধারিত হয়। এইভাবে, সাধারণ 'পশু’ শব্দের ‘ছাগ’ অর্থ না করলে, ‘'অগ্নিষোমীয়’’ এই বিধিবাক্য ও ‘ছাগস্য হবিশঃ’ এই বিনিয়োগ বাক্যের মধ্যে একতা থাকবে না। তাই সাধারণ ‘পশু’ শব্দের ‘ছাগ’ এই বিশেষ অর্থ গ্রহণ করা উচিত। এই উদ্দেশ্য সিদ্ধ করার জন্য পূর্বমীমাংসার “ছাগো বা মন্ত্র বর্ণাত্‌” [মীমাংসা ৬/৮/৩১]— এই সূত্র প্রবৃত্ত হয়। একেই ছাগপশুন্যায় বলা হয়। তাই এই ন্যায় দ্বারা সিদ্ধ হয়, ভিন্ন ভিন্ন মন্ত্রে যেসব বিশেষ পদ এসেছে, সেগুলির উপর ভাবনা করে, সাধারণ পদগুলোর অর্থ নির্ধারণ করা উচিত। তাই শ্বেতাশ্বতর শ্রুতিতে— “মহেশ্বর” পদ দ্বারা যদি শিবকে মানা না হয় তবে, কৈবল্য, অথর্বশির, কঠবল্লী ইত্যাদি অনেক উপনিষদে যেসব বিশেষ শব্দ এসেছে যেমন— শিব, অমৃত, উমাসহায়, উমার্দ্ধদেহং’ পরমেশ্বর, নীলকণ্ঠ, ত্রিলোচন, জাতবেদ, ঈশান ইত্যাদি, সেগুলো শিবেই প্রতিষ্ঠিত বিশেষ শব্দ, তারাও বৃথা হয়ে যাবে। অর্থাৎ- শ্বেতাশ্বতর শ্রুতিতে উল্লেখিত “মহেশ্বর” পদের বিশেষ অর্থ অন্যান্য শ্রুতি বর্ণিত- “ত্রিলোচন, উমাসহায়, উমার্দ্ধদেহং” বিশেষ অর্থের একাত্মতা থাকবে না। তাই ন্যায় অনুযায়ী “মহেশ্বর” পদের বিশেষ অর্থ অন্যান্য শ্রুতিতে যে ত্রিলোচন, উমাসহায়ং আদি যে বিশেষ অর্থ আছে, তাতে শিবই সিদ্ধ হয় অন্য কোনো দেবতা নয়। এটাই মেনে নেওয়া ন্যায় সঙ্গত।

[ একই ভাবে ঈশান আদি নামও সেই অদ্বিতীয় শিবেরই বোধক ]

​শ্রুতিতে রুদ্রকে কেবল নিরাকার ব্রহ্ম বলা হয়নি, বরং 'গিরিত্র', 'গিরিশন্ত', প্রভৃতি সুনির্দিষ্ট লক্ষণে লক্ষিত করা হয়েছে। ছাগপশু ন্যায় এবং দণ্ডাপূপিকা ন্যায় অনুসারে, যেখানে সাধারণ 'ঈশ্বর' বা 'ব্রহ্ম' পদের সাথে সুনির্দিষ্ট লাক্ষণিক বিশেষণ (যেমন- ত্রিলোচন, নীলকন্ঠং, উমাসহায় আদি) যুক্ত থাকে, সেখানে সাধারণ পদটি সেই বিশেষ চিহ্ণধারী সত্তাতেই (শিবে) পর্যবসিত হয়। সুতরাং, মহেশ্বর পদটি এখানে কৈলাসনিবাসী শিবের বিশ্বময় অবস্থারই বাচক।

এছাড়াও, আশ্বলায়ণ গৃহ্যসূত্র অনুযায়ী— "সর্বাণি হ বা অস্য নামধেয়ানি" (৪/৭/২৯) যেহেতু রুদ্র সর্বব্যাপী, তাই জগতের সকল কল্যাণকর নামই রুদ্রের। এই কল্প-প্রমাণ দ্বারা এটি স্বতঃসিদ্ধ যে, 'মহেশ্বর' নামটির প্রকৃত ধারক ও বাচ্যার্থ স্বয়ং শিব। এমনকি মহাভারতেও উল্লেখ করেছে শিবের নাম কেন মহেশ্বর। উক্ত বিষয়ে মহাভারতে বলা হয়েছে-

“মহেশ্বরশ্চ লোকানাং মহতামীশ্বরশ্চ সঃ”।।
[মহাভারত/অনুশাসনপর্ব/অধ্যায় ১৩৯/২৮]

পরমেশ্বর শিব প্রধান লোকদিগের ঈশ্বর বলেই শিব মহেশ্বর।।২৮।।

তাহলে- বৈষ্ণবরা মহেশ্বর পদের- “মহাশ্চাসৌ ঈশ্বরস্যঃ” এই যে অবয়বার্থ গ্রহণ করেন তা মহাভারতের উক্ত বচন অনুযায়ী শিবেই পর্যবসিত হয়। সুতরাং- অবয়বার্থ হোক বা রূঢ়ার্থ “ঘটকুট্টীপ্রভাত ন্যায়” অনুযায়ী- “মহেশ্বর” পদ দ্বারা কেবল শিবই সংজ্ঞায়িত হয়।

এবার পাণিনীয় ব্যাকরণ ও কাশিকা ভাষ্যের আলোকে 'মহেশ্বর' পদের রূঢ়তা বিচার করা যাক —

পাণিনীয় সূত্র —

"স্বং রূপং শব্দস্যাশব্দসংজ্ঞা" (১/১/৬৮)

অর্থাৎ- শাস্ত্রীয় প্রকরণে কোনো শব্দ যখন উচ্চারিত হয়, তখন সেই শব্দটি তার নিজস্ব স্বরূপকে নির্দেশ করে, তার বাইরের কোনো অর্থ বা পর্যায়বাচক শব্দকে নয়।

​কাশিকা ভাষ্যকার এখানে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে 'অগ্নের্ঢক্' (৪/২/৩৩) সূত্রের উদাহরণ দিয়েছেন। সেখানে বলা হয়েছে—

"অগ্নিশব্দোঽগ্নিশব্দস্যৈব গ্রাহকো ভবতি, ন জ্বলনঃ পাবকো ধূমকেতুরিতি"।

যখন 'অগ্নি' শব্দ থেকে প্রত্যয় বিধান করা হয়, তখন তা কেবল 'অগ্নি' শব্দ থেকেই হবে। অগ্নির পর্যায়বাচক শব্দ যেমন- জ্বলন, পাবক বা ধূমকেতু থেকে ওই কার্য হবে না।

​বৈষ্ণবরা দাবি করেন যে- শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে 'মহেশ্বর' পদটি কেবল একটি যৌগিক বিশেষণ, যা 'বিষ্ণু' বা 'নারায়ণ'কেও বোঝাতে পারে। কিন্তু, উক্ত পাণিনীয় সূত্র ও ভাষ্য অনুযায়ী এই যুক্তি টেকে না। সূত্রানুসারে, শ্রুতি যখন 'মহেশ্বর' বা 'রুদ্র' শব্দ ব্যবহার করেছেন, তখন সেই শব্দগুলো তাদের নিজস্ব স্বরূপেই গ্রাহ্য। পাণিনীয় প্রথা অনুযায়ী- শ্রুতি যদি বিষ্ণু বা নারায়ণকে বোঝাতে চাইতেন, তবে তিনি সেই শব্দগুলোই ব্যবহার করতেন। যেহেতু তা করা হয়নি, তাই 'মহেশ্বর' শব্দটি তার নিজস্ব 'রূঢ়ি' বা সংজ্ঞার্থেই সীমাবদ্ধ।

কাশিকা ভাষ্যে যেমন বলা হয়েছে অগ্নির বদলে 'পাবক' গ্রাহ্য নয়, ঠিক তেমনি মহেশ্বরের বদলে 'বিষ্ণু' বা 'নারায়ণ' পদকে সেখানে টেনে আনা ব্যাকরণগতভাবে অশুদ্ধ। কারণ 'মহেশ্বর' পদটি সেখানে “স্বং রূপং” অর্থাৎ শিবতত্ত্বের নিজস্ব বাচক হিসেবেই স্বয়ংসম্পূর্ণ।

​সূত্রে 'অশব্দসংজ্ঞা' কথাটি দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে- যদি শব্দটি কোনো বিশেষ পারিভাষিক সংজ্ঞা হয়, তবে তার স্বরূপ নয় বরং সংজ্ঞীকেই (যাকে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে) গ্রহণ করতে হবে। শৈব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী- 'মহেশ্বর' বা 'রুদ্র' কেবল শব্দ নয়, এগুলো একেকটি 'সংজ্ঞা'। যেমন— "তরপ্তমপৌ ঘঃ" (১/১/২২) সূত্রে 'ঘ' বললে তার সংজ্ঞী (তরপ্ ও তমপ্) গ্রাহ্য হয়, তেমনি উপনিষদিক প্রকরণে 'মহেশ্বর' শব্দটি একটি সংজ্ঞা হিসেবেই প্রযুক্ত হয়েছে যা কেবল ত্রিনেত্রধারী শিবকেই নির্দেশ করে।

​উপযুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এটি নিঃসংশয়ে প্রমাণিত হয় যে, শ্বেতাশ্বতর উপনিষদে প্রযুক্ত 'মহেশ্বর' পদটি কোনো সাধারণ বিশেষণ বা অন্য কোনো দেবতার পর্যায়বাচক শব্দ নয়। শ্বেতাশ্বতরের সামগ্রিক গঠনতন্ত্র বিচার করলে দেখা যায়, শ্রুতি যেখানে রুদ্রকে "অদ্বিতীয়" এবং "গিরিশন্ত" বা "কপর্দী"র মতো বিশেষ চিহ্নে চিহ্নিত করেছেন, সেখানে 'ছাগপশু ন্যায়' ও 'সিংহাবলোকন ন্যায়' অনুযায়ী পরবর্তী 'মহেশ্বর' পদটি কেবল সেই নির্দিষ্ট শিব-সত্তাতেই পর্যবসিত হতে বাধ্য।

​পাণিনীয় ব্যাকরণের "স্বং রূপং শব্দস্যাশব্দসংজ্ঞা" সূত্রের নিয়ম অনুযায়ী- শ্রুতিতে যে শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, তার নিজস্ব স্বরূপই গ্রাহ্য। সুতরাং- 'মহেশ্বর' শব্দের স্থানে 'বিষ্ণু' বা অন্য কোনো অর্থের অনুপ্রবেশ ব্যাকরণগতভাবে অশুদ্ধ এবং শাস্ত্রীয় অপলাপ মাত্র। এমনকি ব্যুৎপত্তিগত অবয়বার্থ গ্রহণ করলেও, মহাভারতের অনুশাসন পর্বের বচন অনুযায়ী তা শিবের ওপরই সংজ্ঞায়িত।
অতএব, "রূঢ়ির্যোগম্‌পহরতি" এই ন্যায় অনুসারে ব্যুৎপত্তিগত অর্থের চেয়ে রূঢ়ার্থ অধিক বলবান হওয়ায়, এবং শ্রুতির নিজস্ব প্রকরণ ও পাণিনীয় ব্যাকরণের বিধিবদ্ধ নিয়মে 'মহেশ্বর' পদটি পরমেশ্বর শিবে 'রূঢ়'। সুতরাং- মায়াধীশ মহেশ্বর হলেন গুণাতীত পরমশিব, যিনি ত্রিগুণাত্মিকা মায়ার অধীশ্বর হয়েও স্বয়ং নির্গুণ ও পরম ব্রহ্ম। বৈষ্ণবীয় 'তামসিক'ত্বের আরোপ এখানে কেবল অপ্রাসঙ্গিকই নয়, বরং শাস্ত্র ও ব্যাকরণের বিচারে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।


🙏সর্বে হ্যেষ রুদ্রস্তস্মৈ রুদ্রায় নমো অস্তু🙏


নমঃ শিবায়ৈ 🙏
নমঃ শিবায় 🙏
শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্‌ ✊🚩

✍️ অপপ্রচার দমনে— অন্তিক ভট্টাচার্য্য (শম্বরনাথ শৈব)।

🌻 বিশেষ কৃতজ্ঞতা— আমার গুরু শ্রী নন্দীনাথ শৈবাচার্য জী ও আমার আদর্শ শ্রী রোহিত কুমার চৌধুরী শৈবজী।

📣 কপিরাইট ও প্রচারে— Shivalaya।

বি: দ্র:— লেখাটি কপি করলে সম্পূর্ণভাবে করবেন, কোনো রকম কাটছাট করা যাবে না।





শিবঃ ওঁ…….🙏


মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ