সোমনাথ জ্যোতির্লিঙ্গের উৎপত্তি ও মাহাত্ম্য

 

 

সোমনাথ জ্যোতির্লিঙ্গের উৎপত্তি ও মাহাত্ম্য 

_______________________________________________

ঋষয় উচুঃ

জ্যোতিষাঞ্চৈব লিঙ্গানাং মাহাত্ম্যং কথয়াধুনা ।
উৎপত্তিং চ তথা তেষাং ব্রূহি সর্বং যথাশ্রুতম্ ॥ ১ ॥

সূত উবাচ

শৃণ্বন্তু বিপ্রা বক্ষ্যামি তন্মাহাত্ম্যং জনিং তথা ।
সংক্ষেপতো যথাবুদ্ধি সদ্গুরোশ্চ ময়া শ্রুতম্ ॥ ২ ॥

এতেষাঞ্চৈব মাহাত্ম্যং বক্তুং বর্ষশতৈরপি ।
শক্যতে ন মুনিশ্রেষ্ঠাস্তথাপি কথয়ামি বঃ ॥ ৩ ॥

সোমনাথশ্চ তেষাং বৈ প্রথমঃ পরিকীর্তিতঃ ।
তন্মাহাত্ম্যং শৃণু মুনে প্রথমং সাবধানতঃ ॥ ৪ ॥

সপ্তবিংশন্মিতাঃ কন্যা দক্ষেণ চ মহাত্মনা ।
তেন চন্দ্রমসে দত্তা অশ্বিন্যাদ্যা মুনীশ্বরাঃ ॥ ৫ ॥

চন্দ্রং চ স্বামিনং প্রাপ্য শোভমানা বিশেষতঃ ।
চন্দ্রোऽপি চৈব তাঃ প্রাপ্য শোভতে স্ম নিরন্তরম্ ॥ ৬ ॥

হেম্না চৈব মণির্ভাতি মণিনা হেম চৈব হি ।
এवं চ সময়ে তস্য যজ্জাতং শ্রূয়তামিতি ॥ ৭ ॥

সর্বাস্বপি চ পত্নীষু রোহিণী নাম যা স্মৃতা ।
যথৈকা সা প্রিয়া চাসীত্তথান্যা ন কদাচন ॥ ৮ ॥

অন্যাশ্চ দুঃখমাপন্নাঃ পিতরং শরণং যযুঃ ।
গত্বা তস্মৈ চ যদ্দুঃখং তথা তাভির্নিবেদিতম্ ॥ ৯ ॥

দক্ষঃ স চ তথা শ্রুত্বা দুঃখং চ প্রাপ্তবান্ তদা ।
সমাগত্য দ্বিজাশ্চন্দ্রং শান্ত্যাবোচদ্ বচস্তদা ॥ ১০ ॥

দক্ষ উবাচ

বিমলে চ কুলে ত্বং হি সমুৎপন্নঃ কলানিধে ।
আশ্রিতেষু চ সর্বেষু ন্যূনাধিক্যং কথং তব ॥ ১১ ॥

কৃতং চেত্তৎ কৃতং তচ্চ ন কর্তব্যং ত্বয়া পুনঃ ।
বর্তনং বিষমত্বেন নরকপ্রদমীরিতম্ ॥ ১২ ॥

সূত উবাচ

দক্ষশ্চৈবং চ সম্প্রার্থ্য চন্দ্রং জামাতরং স্বয়ম্ ।
জগাম মন্দিরং স্বং বৈ নিশ্চয়ং পরমং গতঃ ॥ ১৩ ॥

চন্দ্রোঽপি বচনং তস্য ন চকার বিমোহিতঃ ।
শিবমায়াপ্রভাবেণ যয়া সম্মোহিতং জগত্ ॥ ১৪ ॥

শুভং ভাবি যদা যস্য শুভং ভবতি তস্য বৈ ।
অশুভং চ যদা ভাবি কথং তস্য শুভং ভবেত্ ॥ ১৫ ॥

চন্দ্রোঽপি বলবদ্ভাবিবশান্মেনে ন তদ্বচঃ ।
রোহিণ্যাং চ সমাসক্তো নান্যাং মেনে কদাচন ॥ ১৬ ॥

তচ্ছ্রুত্বা পুনরাগত্য স্বয়ং দুঃখসমন্বিতঃ ।
প্রার্থয়ামাস চন্দ্রং স দক্ষো দক্ষঃ সুনীতিতঃ ॥ ১৭ ॥

দক্ষ উবাচ

শ্রূয়তাং চন্দ্র যৎ পূর্বং প্রার্থিতো বহুধা ময়া ।
ন মানিতং ত্বয়া যস্মাত্ তস্মাত্ ত্বং চ ক্ষয়ী ভব ॥ ১৮ ॥

সূত উবাচ

ইত্যুক্তে তেন চন্দ্রো বৈ ক্ষয়ী জাতঃ ক্ষণাদিহ ।
হাহাকারো মহানাসীৎ তদেন্দৌ ক্ষীণতাং গতে ॥ ১৯ ॥

দেবর্ষয়স্তদা সর্বে কিং কার্যং হা কথং ভবেৎ ।
ইতি দুঃখং সমাপন্না বিহ্বলাঃ হ্যভবন্মুনে ॥ ২০ ॥

বিজ্ঞাপিতাশ্চ চন্দ্রেণ সর্বে শক্রাদয়ঃ সুরাঃ ।
ঋষয়শ্চ বশিষ্ঠাদ্যা ব্রহ্মাণং শরণং যযুঃ ॥ ২১ ॥

গত্বাপি তু তদা প্রোচুস্তদ্ বৃত্তং নিখিলং মুনে ।
ব্রহ্মণে ঋষয়ো দেবা নত্বা নুত্বাতিবিহ্বলাঃ ॥ ২২ ॥

ব্রহ্মাপি তদ্বচঃ শ্রুত্বা বিস্ময়ং পরমং যযৌ ।
শিবমায়াং সুপ্রশস্য শ্রাবয়ংস্তানুবাচ হ ॥ ২৩ ॥

ব্রহ্মোবাচ

অহো কষ্টং মহজ্জাতং সর্বলোকস্য দুঃখদম্ ।
চন্দ্রস্তু সর্বদা দুষ্টো দক্ষশ্চ শপ্তবান্ অমুম্ ॥ ২৪ ॥

সর্বং দুষ্টেন চন্দ্রেণ কৃতং কর্মাপ্যনেকশঃ ।
শ্রূয়তামৃষয়ো দেবাশ্চন্দ্রকৃত্যং পুরাতনম্ ॥ ২৫ ॥

বৃহস্পতের্গৃহং গত্বা তারা দুষ্টেন বৈ হৃতা ।
তস্য ভার্যা পুনশ্চৈব স দৈত্যান্ সমুপস্থিতঃ ॥ ২৬ ॥

সমাশ্রিতস্তদা দৈত্যান্ যুদ্ধং দেবৈশ্চকার হ ।
ময়াত্রিণা নিষিদ্ধশ্চ তস্মৈ তারাং দদৌ শশী ॥ ২৭ ॥

তাং চ গর্ভবতীং দৃষ্ট্বা ন গৃহ্ণামীতি সোঽব্রবীত্ ।
অস্মাভির্বারিতো জীবঃ কৃচ্ছ্রাজ্জগ্রাহ তাং তদা ॥ ২৮ ॥

যদি গর্ভ জহাতীহ গৃহ্ণামীত্যব্রবীত্ পুনঃ ।
গর্ভে ময়া পুনস্তত্র ত্যাজিতে মুনিসত্তমাঃ ॥ ২৯ ॥

কস্যায়ং চ পুনর্গর্ভঃ সোমস্যেতি চ সাব্রবীৎ ।
পশ্চাত্তেন গৃহীতা সা ময়া চ বারিতেন বৈ ॥ ৩০ ॥

এবংবিধানি চন্দ্রস্য দুশ্চরিত্রাণ্যনেকশঃ ।
বর্ণ্যন্তে কিং পুনস্তানি সোऽদ্যাপি কুরুতে কথম্ ॥ ৩১ ॥

যজ্জাতং তৎ সুসঞ্জাতং নান্যথা ভবতি ধ্রুবম্ ।
অতঃ পরমুপায়ং বো বক্ষ্যামি শৃণুতাদরাৎ ॥ ৩২ ॥

প্রভাসকে শুভে ক্ষেত্রে ব্রজেচ্চন্দ্রঃ সদৈবতৈঃ ।
শিবমারাধয়েত্তত্র মৃত্যুঞ্জয়বিধানতঃ ॥ ৩৩ ॥

নিধায়েশং পুরস্তত্র চন্দ্রস্তপতু নিত্যশঃ ।
প্রসন্নশ্চ শিবঃ পশ্চাদক্ষয়ং তং করিষ্যতি ॥ ৩৪ ॥

সূত উবাচ

ইতি শ্রুত্বা বচস্তস্য ব্রহ্মণস্তে সুরর্ষয়ঃ ।
সন্নিবৃত্যায়যুঃ সর্বে যত্র দক্ষবিধূ ততঃ ॥ ৩৫ ॥

গৃহীত্বা তে ততশ্চন্দ্রং দক্ষং চাশ্বাস্য নির্জরাঃ ।
প্রভাসে ঋষয়শ্চক্রুস্তত্র গত্বাখিলাশ্চ বৈ ॥ ৩৬ ॥

আবাহ্য তীর্থবর্যাণি সরস্বত্যাদিকানি চ ।
পার্থিবেন তদা পূজাং মৃত্যুঞ্জয়বিধানতঃ ॥ ৩৭ ॥

তে দেবাশ্চ তদা সর্বে ঋষয়ো নির্মলাশয়াঃ ।
স্থাপ্য চন্দ্রং প্রভাসে চ স্বং স্বং ধাম যযুর্মুদা ॥ ৩৮ ॥

চন্দ্রেণ চ তপস্তপ্তং ষণ্মাসং চ নিরন্তরম্ ।
মৃত্যুঞ্জয়েন মন্ত্রেণ পূজিতো বৃষভধ্বজঃ ॥ ৩৯ ॥

দশকোটিমিতং মন্ত্রং সমাবৃত্য শশী চ তম্ ।
ধ্যাত্বা মৃত্যুঞ্জয়ং মন্ত্রং তস্থৌ নিশ্চলমানসঃ ॥ ৪০ ॥

তং দৃষ্ট্বা শঙ্করো দেবঃ প্রসন্নোऽভূত্ততঃ প্রভুঃ ।
আবির্ভূয় বিধুং প্রাহ স্বভক্তং ভক্তবৎসলঃ ॥ ৪১ ॥

শঙ্কর উবাচ

বরং বৃণীষ্ব ভদ্রং তে মনসা যৎসমীপ্সিতম্ ।
প্রসন্নোঽহং শশিন্ সর্বং দাস্যে বরমনুত্তমম্ ॥ ৪২ ॥

চন্দ্র উবাচ

যদি প্রসন্নো দেবেশ কিমসাধ্যং ভবেন্মম ।
তথাপি মে শরীরস্য ক্ষয়ং বারয় শঙ্কর ॥ ৪৩ ॥

ক্ষম্তব্যো মেऽপরাধশ্চ কল্যাণং কুরু সর্বদা ।
ইত্যুক্তে চ তদা তেন শিবো বচনমব্রবীত্ ॥ ৪৪ ॥

শিব উবাচ

পক্ষে চ ক্ষীয়তাং চন্দ্র কলা তে চ দিনে দিনে ।
পুনশ্চ বর্ধতাং পক্ষে সা কলা চ নিরন্তরম্ ॥ ৪৫ ॥

সূত উবাচ

এবং সতি তদা দেবা হর্ষনির্ভরমনসাঃ ।
ঋষয়শ্চ তথা সর্বে সমাজগ্মুর্দ্রুতং দ্বিজাঃ ॥ ৪৬ ॥

আগত্য চ তদা সর্বে চন্দ্রায়াশিষমব্রুবন্ ।
শিবং নত্বা করৌ বদ্ধ্বা প্রার্থয়ামাসুরাদরাত্ ॥ ৪৭ ॥

দেবা উচুঃ

দেবদেব মহাদেব পরমেশ নমোঽস্তু তে ।
উময়া সহিতঃ শম্ভো স্বামিন্নত্র স্থিরো ভব ॥ ৪৮ ॥

সূত উবাচ

ততশ্চন্দ্রেণ সদ্ভক্ত্যা সংস্তুতঃ শঙ্করঃ পুরা ।
নিরাকারশ্চ সাকারঃ পুনশ্চৈবাভবৎ প্রভুঃ ॥ ৪৯ ॥

প্রসন্নশ্চ স দেবানাং ক্ষেত্রমাহাত্ম্যহেতবে ।
চন্দ্রস্য যশসে তত্র নাম্না চন্দ্রস্য শঙ্করঃ ॥ ৫০ ॥

সোমেশ্বরশ্চ নাম্নাসীদ্বিখ্যাতো ভুবনত্রয়ে ।
ক্ষয়কুষ্ঠাদিরোগাণাং নাশকঃ পূজনাদ্ দ্বিজাঃ ॥ ৫১ ॥

ধন্যোऽয়ং কৃতকৃত্যোঽয়ং যন্নাম্না শঙ্করঃ স্বয়ম্ ।
স্থিতশ্চ জগতাং নাথঃ পাবয়ঞ্জগতীতলম্ ॥ ৫২ ॥

তৎকুণ্ডং তৈশ্চ তত্রৈব সর্বৈর্দেবৈঃ প্রতিষ্ঠিতম্ ।
শিবেন ব্রহ্মণা তত্র হ্যবিভক্তং তু তৎ পুনঃ ॥ ৫৩ ॥

চন্দ্রকুণ্ডং প্রসিদ্ধং চ পৃথিব্যাং পাপনাশনম্ ।
তত্র স্নাতি নরো যঃ স সর্বৈঃ পাপৈঃ প্রমুচ্যতে ॥ ৫৪ ॥

রোগাঃ সর্বে ক্ষয়াদ্যাশ্চ হ্যসাধ্যা যে ভবন্তি বৈ ।
তে সর্বে চ ক্ষয়ং যান্তি ষণ্মাসং স্নানমাত্রতঃ ॥ ৫৫ ॥

প্রভাসং চ পরিক্রম্য পৃথিবীক্রমসম্ভবম্ ।
ফলং প্রাপ্নোতি শুদ্ধাত্মা মৃতঃ স্বর্গে মহীয়তে ॥ ৫৬ ॥

সোমলিঙ্গং নরো দৃষ্ট্বা সর্বপাপাৎ প্রমুচ্যতে ।
লব্ধ্বা ফলং মনোঽভীষ্টং মৃতঃ স্বর্গ সমীহতে ॥ ৫৭ ॥

যদ্যৎফলং সমুদ্দিশ্য কুরুতে তীর্থমুত্তমম্ ।
তত্তৎফলমবাপ্নোতি সর্বথা নাত্র সংশয়ঃ ॥ ৫৮ ॥

ইতি তে ঋষয়ো দেবাঃ ফলং দৃষ্ট্বা তথাবিধম্ ।
মুদা শিবং নমস্কৃত্য গৃহীত্বা চন্দ্রমক্ষয়ম্ ॥ ৫৯ ॥

পরিক্রম্য চ তত্তীর্থং প্রশংসন্তশ্চ তে যযুঃ ।
চন্দ্রশ্চাপি স্বকীয়ং চ কার্যং চক্রে পুরাতনম্ ॥ ৬০ ॥

ইতি সর্বঃ সমাখ্যাতঃ সোমেশস্য সমুদ্ভবঃ ।
এवं সোমেশ্বরং লিঙ্গং সমুৎপন্নং মুনীশ্বরাঃ ॥ ৬১ ॥

যঃ শৃণোতি তদুৎপত্তিং শ্রাবয়েদ্ বা পরান্নরঃ ।
সর্বান্ কামানবাপ্নোতি সর্বপাপৈঃ প্রমুচ্যতে ॥ ৬২ ॥

ইতি শ্রীশিবমহাপুরাণে চতুর্থ্যাং কোটিরুদ্রসংহিতায়াং সোমনাথ জ্যোতির্লিঙ্গমাহাত্ম্যে প্রথমোঽধ্যায়ঃ। ॥ ১ ॥

__________________________________________________

অনুবাদ : 

ঋষিগণ বললেন —
[হে সূতদেব!] এখন আপনি জ্যোতির্লিঙ্গসমূহের মাহাত্ম্য এবং তাদের উৎপত্তির বর্ণনা করুন ; আপনি [আপনার গুরু ব্যাসদেবের কাছে] যেমন  শুনেছেন, সেই সব বৃত্তান্ত‌ই আমাদের বলুন ॥ ১ ॥

সূতদেব বললেন —
হে ব্রাহ্মণগণ ! আমি তাদের মাহাত্ম্য ও উৎপত্তি সম্পর্কে আমার সদ্‌গুরুর কাছ থেকে যেমন শুনেছি, সংক্ষেপে আমার বুদ্ধি অনুযায়ী বলছি ; আপনারা তা শ্রবণ করুন ॥ ২ ॥

হে মুনিশ্রেষ্ঠগণ ! শত শত বছরেও এদের (দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের) মাহাত্ম্য বর্ণনা করে সমাপ্ত করা যায় না ; তবুও আমি [যথাসাধ্য বর্ণনা করে] আপনাদের বলছি ॥ ৩ ॥

তাদের (দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের) মধ্যে [ক্রম অনুযায়ী] সোমনাথকে প্রথম বলা হয়েছে। হে মুনি ! সর্বপ্রথম তাঁর মাহাত্ম্য মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করুন ॥ ৪ ॥

হে মুনীশ্বরগণ ! মহাত্মা দক্ষ তাঁর অশ্বিনী প্রভৃতি সাতাশটি কন্যার বিবাহ চন্দ্রের সঙ্গে দিয়েছিলেন ॥ ৫ ॥

তাঁরা চন্দ্রকে (স্বামী হিসেবে) লাভ করে অত্যন্ত শোভিত হয়েছিলেন এবং চন্দ্রও তাঁদের পেয়ে সর্বদা শোভিত হতেন — যেমন সোনার দ্বারা মণি শোভা পায় এবং মণির দ্বারা সোনা শোভা পায় ॥ ৬ ॥

এরপর কালের ক্রমে তাঁদের সঙ্গে যা ঘটেছিল, তা শুনুন। সকল পত্নীর মধ্যে যিনি রোহিণী নামে পরিচিতা, তিনি চন্দ্রের কাছে যতটা বেশি প্রিয় ছিলেন, অন্য কেউ ততটা প্রিয় ছিলেন না। ॥৭–৮॥

তখন অন্য কন্যাগণ দুঃখিত হয়ে তাঁদের পিতার (দক্ষের) শরণ নিলেন। সেখানে গিয়ে তারা নিজেদের সমস্ত দুঃখ জানালেন। হে ব্রাহ্মণগণ ! এ কথা শুনে দক্ষ খুব দুঃখ পেলেন। তারপর তিনি চন্দ্রের কাছে এসে শান্তভাবে এই কথা বললেন — ॥ ৯–১০ ॥

দক্ষ বললেন —
হে চন্দ্র ! আপনি উত্তম কুলে জন্মগ্রহণ করেছেন। সকল আশ্রিতের প্রতি সমান আচরণ করাই উচিত ; তবে আপনার এই পক্ষপাত কেন ? এতদিন যা হয়েছে, তা অতীত হয়ে গিয়েছে — এখন থেকে আর এমন করবেন না। পক্ষপাতদুষ্ট আচরণকে নরকদায়ক বলা হয়ে থাকে ॥১১–১২॥

সূতদেব বললেন —
দক্ষ এভাবে নিজের জামাতা চন্দ্রের কাছে প্রার্থনা করে নিশ্চিন্ত হয়ে নিজ গৃহে ফিরে গেলেন। কিন্তু চন্দ্র দক্ষের কথা মানলেন না, কারণ তিনি শিবমায়ার প্রভাবে মোহিত ছিলেন — যে মায়ায় এই জগৎ মোহিত হচ্ছে। ॥১৩–১৪॥

যার যখন শুভ হওয়ার, তখন তার শুভ অবশ্যই হয় ; আর যার যখন অশুভ হওয়ার, তখন তার শুভ কীভাবে হতে পারে ? ॥ ১৫ ॥

চন্দ্রও প্রবল বিধিলিপির (বিধির লিখনের) কারণে তাঁর কথা মানলেন না। তিনি রোহিণীর প্রতি আসক্ত হয়ে থাকতেন এবং অন্য কোনো পত্নীর সম্মান করতেন না। এতে দক্ষ অত্যন্ত দুঃখিত হলেন। নীতিশাস্ত্রে পারদর্শী তিনি আবার নিজে এসে চন্দ্রকে নীতিসঙ্গতভাবে বলতে লাগলেন — ॥ ১৬–১৭ ॥

দক্ষ বললেন —
হে চন্দ্র ! শুনুন, আমি আপনাকে নানা ভাবে অনুরোধ করেছি, কিন্তু আপনি মানেননি ; অতএব আপনি ক্ষয়রোগে আক্রান্ত হোন। ॥ ১৮ ॥

সূতদেব বললেন —
এইরূপ বলামাত্র।ই চন্দ্র সঙ্গে সঙ্গে ক্ষয়রোগে আক্রান্ত হলেন। তাঁর ক্ষীণ হয়ে পড়তেই মহা হাহাকার পড়ে গেল। হে মুনি ! তখন সমস্ত দেবতা ও ঋষিগণ ‘হায় ! এখন কী করা উচিত ? কীভাবে চন্দ্রের মঙ্গল হবে ?’ — এই বলে দুঃখিত ও ব্যাকুল হয়ে পড়লেন ॥ ১৯–২০ ॥


চন্দ্র ইন্দ্র প্রভৃতি সকল দেবতা এবং বশিষ্ঠাদি ঋষিদের কাছে এই সমস্ত কথা জানালেন। তখন সবাই ব্রহ্মার শরণে গেলেন। ॥২১॥

হে মুনে! সেখানে গিয়ে অত্যন্ত ব্যাকুল দেবগণ ও ঋষিরা ব্রহ্মাকে প্রণাম করে স্তব করতে করতে সমস্ত সংবাদ নিবেদন করলেন। তাঁদের কথা শুনে ব্রহ্মা অত্যন্ত আশ্চর্য হয়ে শিবমায়ার প্রশংসা করে বলতে লাগলেন — ॥ ২২–২৩ ॥

ব্রহ্মা বললেন —
আহা ! সমগ্র জগতকে দুঃখদানকারী এই মহা বিপদ উপস্থিত হয়েছে। চন্দ্র তো চিরকালই দুষ্ট, আর দক্ষও তাকে শাপ দিয়েছে। ॥২৪॥

এই দুষ্ট চন্দ্র আরও বহু পাপকর্ম করেছে। হে দেবগণ ও ঋষিগণ ! তোমরা তার পূর্বের কৃতকর্ম শুনো। ॥২৫॥

এই দুষ্ট চন্দ্র বৃহস্পতির গৃহে গিয়ে তাঁর পত্নী তারা-কে অপহরণ করেছিল। তারপর সে দানবদের সঙ্গে মিলিত হয়ে তাদের পক্ষ নিয়ে দেবতাদের সঙ্গে যুদ্ধও করেছিল। আমি ও অত্রি যখন তাকে নিষেধ করলাম, তারপর সে তারাকে ফিরিয়ে দিল। ॥২৬–২৭॥

তাকে গর্ভবতী দেখে বৃহস্পতি বললেন — ‘আমি একে গ্রহণ করবো না।’ তখন আমরা তাঁকে তা করতে নিষেধ করলাম ; পরে অনেক কষ্টে তিনি তারাকে গ্রহণ করলেন। ॥২৮॥

বৃহস্পতি আবার বললেন — ‘সে গর্ভ ত্যাগ করলে তবেই আমি তাকে গ্রহণ করব।’ হে মহর্ষিগণ ! তখন আমি তারার গর্ভ পরিত্যাগ [করিয়ে বুধ উৎপন্ন] হলে, তাকে (তারাকে) জিজ্ঞাসা করলাম— ‘এ কার গর্ভ?’ তিনি (তারা) বললেন — ‘এই গর্ভ হল চন্দ্রের।’ এরপর আমার কথায় বৃহস্পতি তাকে (তারাকে) গ্রহণ করলেন। ॥ ২৯–৩০ ॥

এইরূপ আরও বহু দুষ্টকর্ম চন্দ্র করেছে —আমি আবার কত বলব? সে আজও কেন তেমনই করছে ? যা হওয়ার ছিল, তা হয়ে গেছে ; তা আর অন্যরকম হওয়ার নয়। এখন তোমাদের উত্তম উপায় বলছি, মনোযোগ দিয়ে শোনো ॥ ৩১–৩২ ॥

চন্দ্র যেন শুভ প্রভাসক্ষেত্রে দেবতাদের সঙ্গে যায় এবং সেখানে মৃত্যুঞ্জয় পূজার বিধি-বিধান অনুসারে মৃত্যুঞ্জয় (ত্র্যম্বক) শিবের আরাধনা করে। শিবলিঙ্গ স্থাপন করে, তার সামনে প্রতিদিন তপস্যা করুক ; এতে প্রসন্ন হয়ে পরমেশ্বর শিব তাকে ক্ষয়রোগ থেকে মুক্ত করবেন ॥৩৩–৩৪॥

সূতদেব বললেন —
হে মহর্ষিগণ ! ব্রহ্মার এই কথা শুনে দেবতা ও ঋষিরা ফিরে এলেন, যেখানে দক্ষ ও চন্দ্র ছিলেন ॥ ৩৫ ॥

তারপর সকল দেবতা ও ঋষি প্রজাপতি দক্ষকে সান্ত্বনা দিয়ে এবং চন্দ্রকে সঙ্গে নিয়ে প্রভাসতীর্থে গিয়ে সরস্বতী প্রভৃতি শ্রেষ্ঠ তীর্থগুলির আবাহন করে মৃত্যুঞ্জয় পূজার বিধি-বিধান অনুসারে মৃত্যুঞ্জয় মন্ত্রে পার্থিব-অর্চনাবিধি অনুসারে শিবের পূজা করলেন ॥ ৩৬–৩৭ ॥

এরপর বিশুদ্ধ অন্তঃকরণে সেই দেবতা ও ঋষিগণ চন্দ্রকে প্রভাসক্ষেত্রে রেখে আনন্দের সঙ্গে নিজ নিজ ধামে ফিরে গেলেন ॥ ৩৮ ॥

চন্দ্র নিরন্তর ছয় মাস তপস্যা করলেন এবং মৃত্যুঞ্জয় মন্ত্রে বৃষভধ্বজ শিবের পূজা করলেন। ॥ ৩৯ ॥

স্থিতচিত্ত হয়ে তিনি দশ কোটি সংখ্যক বার মৃত্যুঞ্জয়-মন্ত্র জপ করলেন এবং মন্ত্রময় ভগবান মৃত্যুঞ্জয়ের ধ্যান করতে করতে সেখানেই অবস্থান করলেন ॥ ৪০ ॥

তখন তাঁকে দেখে ভক্তবৎসল ভগবান শিব প্রসন্ন হলেন এবং প্রকাশিত হয়ে তাঁর ভক্ত চন্দ্রকে বলতে লাগলেন — ॥ ৪১ ॥

শঙ্কর বললেন —
হে চন্দ্র ! তোমার মঙ্গল হোক। তোমার মনে যা অভিলাষ আছে, সেই বর প্রার্থনা করো ; আমি তোমার প্রতি প্রসন্ন, তোমাকে সকল উৎকৃষ্ট বর দান করবো ॥ ৪২ ॥

চন্দ্র বললেন —
হে দেবেশ ! আপনি যদি আমার প্রতি প্রসন্ন হন, তবে আমার কোন কার্য‌ই বা অসম্ভব থাকতে পারে ? তথাপি হে প্রভু শঙ্কর ! আমার শরীরের ক্ষয়রোগ দূর করে দিন। আমার অপরাধ ক্ষমা করুন এবং নিরন্তর কল্যাণ করুন। চন্দ্র এইভাবে বললে, প্রভু শিব এই কথা বললেন — ॥ ৪৩–৪৪ ॥

পরমেশ্বর শিব বললেন —
হে চন্দ্র ! এক পক্ষকালে তোমার এক-একটি কলা প্রতিদিন ক্ষীণ হবে এবং অপর পক্ষকালে সেই কলাগুলি ক্রমে ক্রমে বৃদ্ধি পাবে ॥ ৪৫ ॥

সূতদেব বললেন —
হে দ্বিজগণ ! চন্দ্র এই বর লাভ করতেই আনন্দভরে সকল দেবতা ও ঋষি দ্রুত সেখানে এসে উপস্থিত হলেন। ॥ ৪৬ ॥

সেখানে এসে তাঁরা চন্দ্রকে আশীর্বাদ করলেন এবং পরমেশ্বর শিবকে প্রণাম করে হাত জোড় করে ভক্তিভরে প্রার্থনা করলেন — ॥ ৪৭ ॥

দেবতারা বললেন — হে দেবদেব ! হে মহাদেব ! হে পরমেশ্বর ! আপনাকে প্রণাম করি। হে শম্ভু ! হে স্বামী ! উমা সহ আপনি এখানে স্থির হোন (অবস্থান করুন) ॥ ৪৮ ॥

সূতদেব বললেন —
পূর্বকালে সেই নিরাকার পরমেশ্বর শিব, চন্দ্রের উৎকৃষ্ট ভক্তিভরে স্তবপ্রাপ্ত হয়ে সেই প্রভু পুনরায় সাকার রূপ ধারণ করলেন ॥ ৪৯ ॥

দেবতাদের প্রতি প্রসন্ন হয়ে পরমদেব শঙ্কর সেই ক্ষেত্রের মাহাত্ম্য বৃদ্ধি এবং চন্দ্রের যশ বিস্তারের জন্য সেখানে তাঁরই নামে তিন লোকব্যাপী সোমেশ্বর (সোমের ঈশ্বর) নামে প্রসিদ্ধ হলেন । হে দ্বিজগণ ! তাঁর পূজার দ্বারা পরমেশ্বর শিব প্রসন্ন হলে ক্ষয়, কুষ্ঠ প্রভৃতি রোগ নাশ হয় ॥ ৫০–৫১ ॥

ধন্য এই চন্দ্র, কৃতার্থ এই চন্দ্র — যাঁর নামানুসারে স্বয়ং পরমেশ্বর শঙ্কর এই ভূমিকে পবিত্র করবার জন্য এখানে অবস্থান করেছেন। সেখানেই দেবতারা চন্দ্রের নামে চন্দ্রকুণ্ড প্রতিষ্ঠা করলেন, যেখানে শিব ও ব্রহ্মার সম্মিলিত অবস্থান মনে করা হয় ॥ ৫২–৫৩ ॥

পৃথিবীতে প্রসিদ্ধ সেই চন্দ্রকুণ্ড সমস্ত পাপ নাশকারী। যে মানুষ সেখানে স্নান করে, সে সকল পাপ থেকে মুক্ত হয়। সেই কুণ্ডে ছয় মাস নিরন্তর স্নান করলে ক্ষয় প্রভৃতি অসাধ্য রোগও নষ্ট হয়ে যায় ॥ ৫৪–৫৫ ॥

প্রভাসতীর্থের পরিক্রমা করলে শুদ্ধাত্মা মানুষ সমগ্র পৃথিবী পরিক্রমার ফল লাভ করে এবং মৃত্যুর পর স্বর্গে প্রতিষ্ঠা পায় ॥ ৫৬ ॥

সোমেশ্বর লিঙ্গের দর্শন করলে মানুষ সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হয় এবং এই লোকেই মনোবাসনা পূর্ণ করে মৃত্যুর পরে স্বর্গে যায় ॥ ৫৭ ॥

মানুষেরা যে যে ফল লাভের উদ্দেশ্যে এই উৎকৃষ্ট তীর্থের সেবা করেন, সেই সেই ফল অবশ্যই তিনি লাভ করেন — এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই ॥ ৫৮ ॥

সোমেশ্বরের এমন মাহাত্ম্য দেখে দেবতা ও ঋষিগণ আনন্দভরে শিবকে প্রণাম করে ক্ষয়রোগমুক্ত চন্দ্রকে সঙ্গে নিয়ে সেই তীর্থের পরিক্রমা করে তার প্রশংসা করতে করতে [নিজের নিজের স্থানে] ফিরে গেলেন এবং চন্দ্রও তাঁর পূর্বের মতো নিজের কর্তব্য-কার্য আরম্ভ করলেন ॥ ৫৯ – ৬০ ॥

হে মুনিশ্রেষ্ঠা ! এইভাবে আমি সোমেশ্বরের উৎপত্তির বর্ণনা করলাম। সোমেশ্বর লিঙ্গ এইরূপেই প্রকাশিত হয়েছিল ॥ ৬১ ॥

যে ব্যক্তি সোমেশ্বর লিঙ্গের উৎপত্তি শ্রবণ করে বা অন্যকে শ্রবণ করায়, তার সমস্ত কামনা পূর্ণ হয় এবং সে সকল প্রকার পাপ থেকে মুক্ত হয় ॥ ৬২ ॥













মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ