মাতা সীতা কে রাবণ স্পর্শ করতে সক্ষম হয়েছিলেন ?
🔥 মাতা সীতা কে রাবণ স্পর্শ করতে সক্ষম হয়েছিলেন ?
__________________________________________
🔰 ভূমিকা —
বর্তমানে এই কলিযুগে ম্লেচ্ছ খ্রিষ্টান মুসলিম নাস্তিকবাদী প্রভৃতি অসনাতনীদের উদ্দেশ্য হল সনাতন ধর্মকে নিকৃষ্ট প্রমাণ করে সনাতনীদের মনের আস্থা ও বিশ্বাসকে নাশ করে, তাদের দুর্বল করে নিজেদের সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত করে সংখ্যা বৃদ্ধি করে সনাতন ধর্মকে লুপ্ত করা।
এই উদ্দেশ্য সফল করতেই তারা চিরকাল আমাদের সনাতন ধর্মের বিভিন্ন মহান ব্যক্তিত্বকে কলঙ্কিত করবার চেষ্টা করে এসেছে। তার মধ্যে একটি হল “মাতা সীতা কে অসতী” প্রমাণ করা।
কিন্তু আমরা শিবভক্ত শৈব রা থাকতে কখনো কোনো কালেই অসনাতনীদের এই অপপ্রচারকে সফল হতে দেবো না। বরং শাস্ত্রের বচন দ্বারা সত্য তুলে ধরে মীমাংসা করে অসনাতনীদের চরম খণ্ডন করতে সর্বদা প্রস্তুত।
রাক্ষসরাজ রাবণ দ্বারা মাতা সীতাকে অপহরণ করবার প্রসঙ্গে ঘটে যাওয়া একটি অতি গুহ্য সত্য ঘটনা বিষয়ে কূর্মপুরাণে উল্লেখ রয়েছে। এর মাধ্যমেই মাতা সীতার পবিত্রতার বিষয়ে স্পষ্ট হয়ে যাবে।
__________________________________________
🕉️ কূর্মপুরাণ/উপরিভাগ/৩৩ অধ্যায়/১১২-১৪৪ নং শ্লোকে ব্যাসদেব বর্ণনা করে বললেন —
স্বামীসেবায় নিবেদিত পতিব্রতা স্ত্রীকে ইহলোক ও পরলোকে পাপ স্পর্শ করতে পারে না ॥ ১১২
পতিব্রতা ও ধর্মাচরণে রত নারী সব মঙ্গল লাভ করে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এমন স্ত্রীকে ইহলোকে কোনো সময়েই কেউ পরাজিত করতে পারে না ॥ ১১৩
দেখো, ত্রিলোকে বিখ্যাতা সৌভাগ্যবতী রামপত্নী সীতা কেবল সতীত্বের ধর্ম বলেই (শক্তিতেই) রাক্ষসরাজ রাবণকে জয় করেছিলেন ॥ ১১৪
একদিন রাক্ষসরাজ রাবণ, কালের প্রেরণায়, বিশালনয়না রামপত্নী সীতাকে কামনা করেছিল ॥ ১১৫
রাক্ষসরাজ রাবণ মায়াবী তপস্বীর বেশ ধরে নির্জন বনে ঘুরে বেড়ানো ভাবিনী সীতাকে হরণ করতে চেয়েছিল ॥ ১১৬
সেই পবিত্রহাস্যময়ী সীতা রাবণের মনের ভাব বুঝে নিজের স্বামী দাশরথি রামকে স্মরণ করে হাসিমুখে আবাসস্থ (নিজের কুটিরে রাখা) অগ্নির শরণ নিয়েছিলেন ॥ ১১৭
রামপত্নী সীতা কৃতাঞ্জলি হয়ে নিজের স্বামীকে সাক্ষাৎ বিষ্ণুর স্বরূপ জেনে মহাযোগস্বরূপ ও সর্বলোকদাহক অগ্নিকে এইভাবে আরাধনা করতে লাগলেন— ॥ ১১৮
যিনি মহাযোগস্বরূপ, যিনি গহ্বর অর্থাৎ অনির্বচনীয় তত্ত্ব এবং যিনি সকল প্রাণীর দাহক, সকল ভূতের ঈশ্বর ও সংহারক, সেই পরম অগ্নিকে নমস্কার করি ॥ ১১৯
যিনি সাক্ষী, সর্বমুখী, প্রদীপ্তদেহ এবং যিনি সকল জীবের হৃদয়ে আত্মারূপে অবস্থান করেন, সেই পাবকদেবকে নমস্কার করি ॥ ১২০
যিনি ব্রাহ্মণদের হিতকারী, সাক্ষাৎ ব্রহ্মস্বরূপ, যোগী, কৃত্তিবাস, সকল জীবের ঈশ্বর এবং পরমপদস্বরূপ, সেই অগ্নিরূপ রুদ্রের শরণ নিই ॥ ১২১
জগতের মূর্তি, সকল তেজের উৎপত্তিস্থান, মহাযোগেশ্বর, আদিত্য, সকল তেজের উৎস ও প্রজাপতিরূপ সেই অগ্নিরূপ রুদ্রের শরণ নিই ॥ ১২২
যিনি মহাগ্রাস অর্থাৎ সর্বসংহারক, ত্রিশূলধারী, সকল যোগীদের ঈশ্বর (শিব) এবং ভোগ ও মুক্তিদাতা, সেই কালাগ্নিরুদ্রস্বরূপ ঈশের (শিবের) শরণ নিই ॥ ১২৩
তুমি বিরূপাক্ষ, মহাব্যাহৃতির স্বরূপ, সোনার গৃহে অব্যক্তরূপে অবস্থানকারী, মহান ও অসীম তেজস্বী— আমি তোমার শরণ নিই ॥ ১২৪
যিনি সকল প্রাণীর মধ্যে অবস্থান করেন, সেই বৈশ্বানরের শরণ নিই এবং যিনি হব্য-কব্য বহনকারী ও ঈশ্বর, আমি সেই বহ্নিরূপদেবতার শরণ নিই ॥ ১২৫
যিনি জগতের স্রষ্টা সবিতার আকাশমণ্ডলে অবস্থিত পরম জ্যোতিরূপ, বরেণ্য ও মঙ্গলময় পরমতত্ত্ব, সেই অগ্নির শরণ নিই। হে হব্যবাহন! তুমি আমাকে রক্ষা করো ॥ ১২৬
এইভাবে বহ্ন্যষ্টক মন্ত্র জপ করে রামপত্নী যশস্বিনী সীতা উন্মীলিত নয়নে মনে মনে রামকে ধ্যান করতে লাগলেন ॥ ১২৭
এরপর ভগবান মহেশ্বর হব্যবাহন অগ্নির রূপে যেন তেজ দিয়ে দহন করার জন্যই প্রজ্বলিত আত্মারূপে আবাসস্থ অগ্নি থেকে আবির্ভূত হলেন ॥ ১২৮
সেই ভগবান মহেশ্বর অগ্নিদেবের দ্বারা রাবণবধের ইচ্ছায় [সেখানে রাবণের অজান্তে] মায়াময়ী সীতাকে সৃষ্টি করে রামপত্নী প্রকৃত সীতাকে নিয়ে সেখান থেকে অন্তর্ধান করালেন ॥ ১২৯
রাক্ষসরাজ রাবণ সেই মায়াময়ী সীতাকে দেখে [প্রকৃত সীতা মনে করে] গ্রহণ করে সাগরবেষ্টিত লঙ্কায় চলে গেলেন ॥ ১৩০
তারপর লক্ষ্মণের সঙ্গে রাম রাবণকে বধ করে সীতাকে গ্রহণ করতে গিয়ে শঙ্কিত হয়েছিলেন ॥ ১৩১
তখন সেই মায়াময়ী সীতা সকলের বিশ্বাসের জন্য আবার অগ্নিতে প্রবেশ করেছিলেন এবং অগ্নিও সেই সীতাকে দগ্ধ করেছিলেন ॥ ১৩২ ॥
উগ্রতেজস্বী ভগবান অগ্নি মায়াময়ী সীতাকে দগ্ধ করে রামকে প্রকৃত সীতাকে দেখিয়েছিলেন। এই কারণে অগ্নিদেব দেবতাদের অত্যন্ত প্রিয় হয়েছিলেন ॥ ১৩৩ ॥
তখন ক্ষীণকটিদেশযুক্ত জনককন্যা সীতা দুই হাতে স্বামীর চরণ ধরে রামের উদ্দেশে ভূমিতে প্রণাম করলেন ॥ ১৩৪ ॥
এই আশ্চর্য দৃশ্য দেখে বিস্ময়ে চোখ বিস্ফারিত রাম আনন্দভরে মস্তক নত করে অগ্নিদেবকে সন্তুষ্ট করলেন ॥ ১৩৫ ॥
এরপর তিনি অগ্নিকে বললেন — “হে ভগবান! আপনি তো এখনই তাঁকে দগ্ধ করলেন, তবে আবার কীভাবে সৃষ্টি হয়ে তিনি আমার কাছে এলেন ?” ॥ ১৩৬ ॥
সর্বলোকদাহক হব্যবাহন অগ্নিদেব সকলের সামনেই দাশরথি রামকে আগের সমস্ত ঘটনা বলতে লাগলেন — ॥ ১৩৭ ॥
মিথিলার রাজা জনক, রুদ্রবল্লভা পার্বতীকে তপস্যার মাধ্যমে আরাধনা করে দেবীর প্রিয়া এই সীতাকে লাভ করেছিলেন ॥ ১৩৮ ॥
স্বামীসেবায় নিবেদিত, পতিব্রতা ও সুশীলা এই সীতাকে রাবণের কামনাবস্তু হতে দেখে আমি তাঁকে ভবানীর কাছে রেখেছিলাম ॥ ১৩৯ ॥
রাবণ যে সীতাকে হরণ করেছিল, সেই সীতা ভস্মীভূত হয়েছে। রাবণবধের জন্যই আমি সেই মায়াসীতার সৃষ্টি করেছিলাম ॥ ১৪০ ॥
যার জন্য আপনি রাক্ষসরাজ রাবণকে দর্শন করেছিলেন, সেই মায়াময়ী সীতাকে আমি ফিরিয়ে নিয়েছি। এখন লোকবিনাশকারী রাবণও নিহত হয়েছে ॥ ১৪১ ॥
অতএব আমি বলছি, এই নির্মল ও পাপহীন জানকীকে গ্রহণ করুন এবং আপনি যে প্রকৃত পক্ষে অব্যয় দেব নারায়ণ বলে ভাবুন ॥ ১৪২ ॥”
বিশ্বজ্যোতির্ময় ও সর্বমুখী ভগবান অগ্নি এই কথা বলে, রামচন্দ্র ও সকল প্রাণীর দ্বারা সম্মানিত হয়ে অন্তর্ধান করলেন ॥ ১৪৩ ॥
পতিব্রতা স্ত্রীদের এই মাহাত্ম্যই আমি বর্ণনা করলাম।..॥ ১৪৪ ॥
__________________________________________
🔶 বিশ্লেষণ : ব্যাসদেব স্পষ্টভাবে বললেন, রাবণ যখন মাতা সীতাকে স্পর্শ করতে উদ্যত হয়েছিলেন তখন মাতা সীতা গৃহে প্রজ্জ্বলিত অগ্নিরূপী রুদ্র অর্থাৎ পরমেশ্বর শিবকে স্মরণ করেছিলেন, তৎক্ষণাৎ মহাদেবের নির্দেশে অগ্নি রাবণের সামনে মায়ার দ্বারা এক নকল সীতাকে প্রকৃত সীতার স্থানে রূপান্তরিত করে প্রকৃত সীতাদেবী নিয়ে জগন্মাতা পার্বতীদেবীর কাছে রেখে আসেন, এদিকে রাবণ মায়ার বিষয়ে কিছুই অবগত না হয়ে নকল সীতাকে হরণ করেন। অর্থাৎ প্রকৃত মাতা সীতাকে স্পর্শ করতেই সক্ষম হননি রাবণ। তাই মাতা সীতা সর্বদাই পরমপবিত্রা পতিব্রতা সতী নারী, তাকে যারা কলঙ্কিত করবার অপপ্রয়াস করেন তাদের জন্মদাত্রী যে পরদারগ্রস্তা এতে কোনো সন্দেহ থাকে না। কারণ, অধার্মিক বুদ্ধিতে পুষ্ট ব্যক্তি সর্বদা পাপীদের গর্ভ থেকেই উৎপন্ন নয়, ধর্মাত্মা সাধু ব্যক্তি সর্বদা পুণ্যবতীর গর্ভে জন্ম গ্রহণ করেন।
__________________________________________
🔥 সিদ্ধান্ত : মায়াময় সীতাকে হরণ পূর্বক রাবণ যে ব্যবহার করেছেন তাতে প্রকৃত মাতা সীতার সতীত্বে কোনোভাবে কলঙ্ক লাগে নি।
[বিঃদ্রঃ — পুরাণ শাস্ত্রে বাল্মীকি রামায়ণের সেই সকল অংশ বর্ণিত হয়েছে, যা বাল্মিকী দ্বারা বাল্মিকী রামায়ণে বলা সম্ভব হয়নি। এর একটি উদাহরণ হিসেবে বলি - ভগবান শ্রীরামচন্দ্র রাবণ বধ করে সীতাদেবী বিমানে করে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন , তখন তিনি দেবী সীতাকে বলেছিলেন “এই স্থানে আমি মহাদেবের কৃপা পেয়েছিলাম, যার ফলে আমি এই যুদ্ধ জয় করতে পেরেছি”। কিন্তু বাল্মিকী রামায়ণে রাবণকে বধ করবার উদ্দেশ্যে পরমেশ্বর শিবের উপাসনা করবার বিস্তারিত বর্ণনা নেই। রামচন্দ্র দ্বারা শিবের উপাসনা বিষয়ে শিবমহাপুরাণে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে রামেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ হিসেবে। এটিই সংক্ষিপ্ত আকারে স্কন্দমহাপুরাণের ব্রহ্মখণ্ডের সেতুবন্ধ মাহাত্ম্যে বর্ণিত হয়েছে। এছাড়া পদ্মপুরাণের পাতালখণ্ডে শিব-রাঘব সংবাদ হিসেবে শিবগীতায় শ্রীরামচন্দ্র দ্বারা শিব উপাসনার বিস্তারিত বর্ণনা ও পরমেশ্বর শিবের দ্বারা রামচন্দ্রের বিজয় নিশ্চিত হবার প্রসঙ্গ উল্লেখ আছে। তাই সনাতনীদের বিভিন্ন শাস্ত্রে একটি ঘটনার বিস্তারিত উল্লেখ একস্থানের সম্পূর্ণভাবে থাকবে এমন ভাবনা করা উচিত নয়।]
__________________________________________
🚩 তথ্য সংগ্রহ ও লেখনীতে : শিবালয় প্রতিষ্ঠাতা শিবদ্বারাধীশাধ্যক্ষ আচার্যপরমাধিকারী শ্রীগুরু নন্দীনাথ শৈব আচার্যদেব 🚩
©️ কপিরাইট ও প্রচারে : Shivalaya 🔥
শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্ 🚩
ॐ নমঃ পার্বতীপতয়ে হর হর মহাদেব 🚩
#হিন্দুধর্ম #সনাতনধর্ম #শিবালয় #রামায়ণ #সীতা #বাল্মিকীরামায়ণ #Shivalaya #sanatandharma #শৈবধর্ম #শিবশাসন

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন