শিব থেকে শক্তি প্রকটিত ও লীন হন (শৈবাগম ও আচার্য বচনানুসারে)
🕉️ শিব থেকে শক্তি প্রকটিত ও লীন হন
______________________________________________
🔰 ভূমিকা — শৈবদর্শন পরম্পরায় শিবশক্তিকে অভিন্ন বলে মান্য করেন শৈবগণ। কিন্তু বর্তমান সমাজে দেখা যাচ্ছে শক্তি আরাধনাকারী কিছু শাক্ত ব্যক্তির দ্বারা সর্বদাই শিবের চেয়েও শ্রেষ্ঠ শক্তি — এই ধারণা ও প্রচার করে সনাতন ধর্মের প্রাচীন সিদ্ধান্ত কে নস্যাৎ করবার চেষ্টা করছে। কখনো কখনো আবেগের আশ্রয় নিয়েও পরমেশ্বর শিবের পরমত্বের উপরে শক্তিপারম্যবাদ স্থাপন করবার মতো ধৃষ্টতা করতে দেখা যায়।
এই প্রবন্ধে আমি প্রাচীন আগমশাস্ত্র ও প্রাচীন আচার্যগণের বচনের উদ্ধৃতি উপস্থাপন করে শক্তিপারম্যবাদ যে একটি কল্পনাপ্রসূত আবেগের উচ্ছাস মাত্র তা সিদ্ধ করেছি।
______________________________________________
🕉️ শিব থেকে শক্তি প্রকটিত ও লীন হন 🕉️
মহাশ্রুতি নামে পরিচিত শৈব আগমশাস্ত্রের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত শৈবাগম হল — বাতুল শুদ্ধাখ্য শৈবাগম ।
এই শিবাগমের ১ম পটলে তত্ত্ব বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন প্রভু শিব। এই ১ম পটলের মধ্যে স্পষ্ট ভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, একমাত্র সর্বোচ্চ পরমেশ্বর “শিব” নিজেকে তিন ভাবে প্রকাশ করেছেন।
যথা — শিবতত্ত্ব, সদাশিব তত্ত্ব ও মহেশ তত্ত্ব।
এই “শিব তত্ত্ব” থেকে প্রকটিত হয়েছে শাক্তদের উপাস্য “শক্তি”।
♦️ মহাশ্রুতির শাস্ত্রবচন প্রমাণ :
🔸 প্রমাণ —
ইত্যেতৈর্লক্ষণৈর্যুক্তং শিবরূপমিহোচ্যতে ।
সৃষ্ট্যর্থং সর্বতত্ত্বানাং লোকস্যোৎপত্তিকারণম্ ॥ ২৩ ॥
যোগিনামুপকারায় স্বেচ্ছ্যা চিন্তিতঃ শিবঃ ।
[ শক্তিপঞ্চকম্ ]
তচ্ছিবে তু পরা শক্তিঃ সহস্রাংশেন জায়তে ॥ ২৪ ॥
তচ্ছক্তেস্তু সহস্রাংশাদাদিশক্তিসমুদ্ভবঃ ।
আদিশক্তিসহস্রাংশাদিচ্ছাশক্তিসমুদ্ভবঃ ॥ ২৫ ॥
[মহাশ্রুতি বাতুলশুদ্ধাখ্য শৈব আগম/১ম পটল/২৩-২৫ নং মহামন্ত্র]
✅ অর্থ :
শিবের স্বরূপ এই সকল লক্ষণ দ্বারা সম্পন্ন। শিবতত্ত্ব থেকেই অন্যান্য সমস্ত তত্ত্বের উৎপত্তি হয়। তিনিই সমস্ত লোকসমূহের সৃষ্টির মূল কারণ ॥ ২৩ ॥
যোগীদের উপকার করবার জন্য পরমেশ্বর ভগবান শিব নিজের ইচ্ছায় এই স্বরূপ ধারণ করেন। [উপমার মাধ্যমে স্বয়ং পরিপূর্ণ শিবকে ব্যাখ্যা করবার জন্য বলা হচ্ছে] তাঁর (শিবের) হাজার ভাগের এক ভাগ থেকে পরাশক্তির প্রাদুর্ভাব ঘটে। পরাশক্তির হাজার ভাগের এক ভাগ থেকে আদিশক্তির, আদিশক্তির হাজার ভাগের এক ভাগ থেকে ইচ্ছাশক্তির, ইচ্ছাশক্তির হাজার ভাগের এক ভাগ থেকে জ্ঞানশক্তির এবং জ্ঞানশক্তির হাজার ভাগের এক ভাগ থেকে ক্রিয়াশক্তির অভিব্যক্তি ঘটে ॥ ২৪-২৫ ॥
অর্থাৎ, বাতুল শুদ্ধাখ্য শৈবাগমের সর্বোচ্চ সিদ্ধান্তসার শিববানী দ্বারা প্রমাণিত যে শক্তির অস্তিত্ব শিব থেকেই। শক্তি থেকে সর্বোচ্চ পরমসত্তা শিব কখনোই প্রকট হন না, তাই শক্তিপারম্যবাদ এখানে খণ্ডিত। শিবপারম্যবাদ অখণ্ডিত ও চিরসত্য।
♦️ আচার্যের আপ্তবচন প্রমাণ :
এবার প্রাচীন শৈবাচার্য শ্রীসোমানন্দপাদের শাক্তবিজ্ঞান গ্রন্থ থেকে দেখুন —
বিষয় : শক্তি সর্বদা পরমশিবেই (ব্রহ্ম) লীন হন, শিব কদাপি শক্তিতে লীন হননা ।
🔷 কাশ্মীর ত্রিক ভৈরবাগম সম্প্রদায়ের বংশানুক্রমিক প্রত্যক্ষ শৈবাচার্য, মহামাহেশ্বরাচার্য অভিনবগুপ্তপাদের পরমেষ্ঠি গুরু বিদগ্ধ পণ্ডিত তথা সাধক ভগবান শ্রীসোমানন্দপাদ তাঁর ‘শাক্তবিজ্ঞান’ শাস্ত্রে স্পষ্টভাবেই বলছেন —
"অন্তাবস্থা সমাখ্যাতা বিশ্রামস্ত্বধুনোচ্যতে ॥ ১৫ ॥
যদা সা পরমা শক্তিঃ সুলীনা পরমে পদে ॥ ১৬ ॥
তদা ন বিন্দতে কিঞ্চিদ্বিষযী বিষযান্তরম্ ।
শিবে বিশ্রাম্যতে শক্তিস্তদা বিশ্রাম উচ্যতে ॥ ১৭ ॥
যত্র বিশ্রমণং শক্তের্মনস্তত্র লযং ব্রজেৎ ।
তদাত্মা পরমাত্মত্বে জ্ঞাতব্যো নিশ্চিতাত্মভিঃ ॥ ১৮ ॥
শিবীভূতো ভবত্যাত্মা পরিণামঃ স এবহি । ১৯ ।"
[তথ্যসূত্র- 'শাক্তবিজ্ঞান'/শ্রীসোমানন্দপাদ বিরচিত]
✅ ভাবার্থ : স্থান, প্রবেশ, রূপ, লক্ষ্য, লক্ষ্যণ, উত্থাপন, বোধন, চক্রবিশ্রাম, ভূমিকাগমন, অন্তাবস্থা, বিশ্রাম, পরিণাম এবং আগমন - শাক্তবিজ্ঞানের এই ১৩ টি স্বরূপ সাক্ষাৎ শিব কর্তৃক শাস্ত্রে কথিত হয়েছে। শিবযোগীর নাভিকন্দ-চক্রস্থিত গ্রন্থি বিদীর্ণ হলে তৎ বিন্দু হতে পরাশক্তির যে স্ফূরণ ঘটে তাহাই 'অন্তাবস্থা' । সেই পরাশক্তি পরমপদ শিব পদে যখন অন্তর্লীন হন, সেই সময় বিষয়-বিষয়ী মূলক কোনো ভেদ থাকে না। শিবে এভাবেই শক্তি বিশ্রান্তি লাভ করেন, ইহাই 'বিশ্রাম'। শিবেই শক্তির বিশ্রাম তথা শিবেই মন (সূক্ষ্ম মন) তত্ত্বের লয় ঘটে। এইভাবেই সেই শক্তিও পরমাত্মক-ই বটে, এটা নিশ্চিত কেননা শিবীভূত হওয়া অর্থাৎ সাক্ষাৎ শিব হয়ে
যাওয়া - এটাই শক্তির পরিণাম।
🔷 এই প্রসঙ্গে দূর্বাসা-আমর্দক ক্রমের শৈবাচার্য শ্রীজ্ঞানশম্ভু শিবাচার্য-ও তাঁর 'জ্ঞানরত্নাবলী'-তে বলছেন —
" যদুক্তং মহাকৌলজ্ঞাননির্ণযে মৎস্যনাথাবতারিতে চন্দ্রী দীপ বিনির্গতে ।
জ্ঞানমধ্যে ক্রিয়ালীনা জ্ঞানীচ্ছা চ লয়ং গতঃ ।
ইচ্ছাশক্তি লয়োধাত্র স দেবঃ পরমঃ শিবঃ । তস্মান্নিরঞ্জনঃ শান্তঃ শিবঃ শক্তেশ্চ কারণম্ । সর্বসামেব শক্তীনাং হেতুঃ সর্বগতঃ শিবঃ ।
ন শক্তেঃ পরতন্ত্রত্বাৎ বিশ্বোপাদানমাস্থিতে ॥
ইত্যাদি বাক্যানি শক্তানি শিবত্ব প্রতিপাদকানি বহূনিসন্তি ।"
✅ অর্থ : চন্দ্রদ্বীপে অবতার নেওয়া শিবাচার্য মৎস্যেন্দ্রনাথ কর্তৃক মহাকৌলজ্ঞাননির্ণয়ে ইহা উক্ত হয়েছে যে — ক্রিয়াশক্তি জ্ঞানে, জ্ঞান শক্তি ইচ্ছা শক্তিতে লয় পায় এবং এই অন্তিম ইচ্ছাশক্তিও সাক্ষাৎ পরমশিবে অন্তর্লীন হয়ে থাকে। সেই নিরঞ্জন শান্ত, সর্বগত শিব-ই শক্তির কারণ, হেতু। শক্তি পরতন্ত্র নয় , শক্তি বিশ্বের উপাদান কারণ - ইত্যাদি আগম বাক্যের দ্বারা প্রকৃতপক্ষে শক্তির শিবত্ব-ই প্রতিপাদিত হয়ে থাকে অর্থাৎ 'শক্তি' শব্দের দ্বারা সেক্ষেত্রে শিব-ই বাচিত হন।
👁️🗨️ 🔸 লক্ষ্য করুন, তন্ত্রের জগতে সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাচীন দার্শনিক মহামহেশ্বরাচার্য শ্রী অভিনবগুপ্ত শৈবাচার্যের পরমেষ্ঠী গুরুদেব শ্রীসোমানন্দ শৈবাচার্যপাদ জী শাক্ত বিজ্ঞান গ্রন্থে বলেছেন যে, অন্তিমপর্যায়ে শক্তিও শিবে লীন হয়ে এক শিবেই পরিনত হন। শক্তিতে গিয়ে পরমসত্তা শিব লীন হন না। কারণ, পরমসত্তা কখনোই অন্য কোনো প্রকাশিত সত্তায় লীন হওয়া যুক্তি সম্মত নয়। আর এই ‘শক্তি শিবে লীন হয়ে যান’ বিষয়টিকেই প্রমাণ করবার জন্য ‘নাথ শৈবপরম্পরা’-র প্রথম আচার্য শ্রীমৎসেন্দ্রনাথ শৈবাচার্য তাঁর রচিত “কৌলজ্ঞান নির্ণয়” গ্রন্থে শক্তিও শিবে লীন হয়ে শিব হয়ে যান — এই বচনকে প্রমাণ হিসেবে উদ্ধৃতি দিয়ে ‘শ্রীজ্ঞানশম্ভু শিবাচার্যও তাঁর 'জ্ঞানরত্নাবলী'-তে লিখেছেন।
_____________________________________________
📍 সিদ্ধান্ত : শিবের শিবতত্ত্ব থেকে শক্তি প্রকট হয়ে পরাশক্তি নামে পরিচিত হন, এই শক্তিই ক্রমশ বিভিন্ন শক্তির রূপ নিয়ে বিভিন্ন কার্য করেন। সব শেষে ঐ শক্তি যেমনভাবে শিবতত্ত্ব থেকে প্রকট হয়েছিলেন ঠিক তেমনভাবেই শিবেই লীন হয়ে যান, তখন অদ্বিতীয় শিব থাকেন, তাই শিবকে ব্রহ্ম শব্দে চিহ্নিত করা হয়। ব্রহ্ম কখনোই অন্য সত্তায় লীন হতে পারেনা, কারণ তিনিই সর্বোপরি সত্তা। এই কারণে “শক্তিতে শিব লীন হয়ে শক্তিই অবশিষ্ট থাকেন” — এমন ধারণা করাটা শাস্ত্রসম্মত নয় এটি অযৌক্তিক ও কাল্পনিক ধারণা বা আবেগের বশবর্তী হওয়া সিদ্ধান্ত মাত্র। শক্তিপারম্যবাদেরও ঊর্ধ্বে অখণ্ডিত শিবপারম্যবাদ সর্বোপরি এবং চিরাচরিত সত্য হিসেবে প্রমাণিত।
✍️ লেখনীতে : শিবালয় প্রতিষ্ঠাতা শিবদ্বারাধীশাধ্যক্ষ দেশিক আচার্যপরমাধিকারী শ্রীগুরু নন্দীনাথ শৈব আচার্যদেব 🕉️
©️ কপিরাইট ও প্রচারে : Shivalaya 🔥
শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্ 🚩
ॐ নমঃ পার্বতীপতয়ে হর হর মহাদেব 🚩
#শক্তিপারম্যবাদখণ্ডন #শিবপারম্যবাদ #শৈবধর্ম #বাতুলশুদ্ধাখ্যশৈবাগম #নন্দীনাথশৈব


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন