দেবীসূক্ত বা দেব্যথর্বশীর্ষ উপনিষদে ‘অহং রুদ্রেভির্বসুভিশ্চরামি’ মন্ত্রে অহং শব্দটি পরমেশ্বর শিবকেই ইঙ্গিত করে



🕉️ দেবীসূক্ত বা দেব্যথর্বশীর্ষ উপনিষদে ‘অহং রুদ্রেভির্বসুভিশ্চরামি’ মন্ত্রে অহং শব্দটি ‘পরমেশ্বর শিব’ কেই ইঙ্গিত করে 🔥

______________________________________________

দেবীসূক্ত বা দেব্যথর্বশীর্ষ উপনিষদে ‘অহং রুদ্রেভির্বসুভিশ্চরামি’ - বচন দ্বারা দেবীকে শিববিহীন এক ও অদ্বিতীয় পরমসত্তা হিসেবে দাবী করা শক্তিপারম্যবাদের খণ্ডন

______________________________________________

🔰 ভূমিকা — প্রত্যেকটি দেবদেবীর ভক্তগণ নিজের নিজের পছন্দ মতো দেবদেবী কে সর্বোচ্চ প্রমাণ করবার জন্য নির্দিষ্ট দেবদেবীর “আমি সবকিছু” এমন ধরণের আমি সংজ্ঞায়িত শব্দের উপর নির্ভর করে দাবী করেন যে সেই নির্দিষ্ট দেবতা বা দেবীই একমাত্র সর্বোচ্চ পরমসত্তা।


এভাবেই বর্তমানের তথাকথিক শাক্তগণের দাবী হল দেবীসূক্ত বা দেব্যথর্বশীর্ষ উপনিষদে ‘অহং রুদ্রেভির্বসুভিশ্চরামি’ - বচন দ্বারা শিবহীন দেবীকে এক ও অদ্বিতীয় পরমসত্তা বলা হয়েছে। এই প্রবন্ধে সেই দাবীর সত্যতা যাচাই করে প্রকৃত তাৎপর্য উল্লেখ করা হয়েছে। 

______________________________________________

🚫 নবীন-শাক্তপক্ষের দাবী :

অহং রুদ্রেভির্বসুভিশ্চরামি। অহমাদিত্যৈরুত বিশ্বদেবৈঃ। অহং মিত্রাবরুণাবুভৌ বিভর্মি। অহমিন্দ্রাগ্নী অহমশ্বিনাবুভৌ ॥ ৫ ॥

[দেব্যথর্বশীর্ষ উপনিষদ/৫ নং মন্ত্র]

এবং 

ঋগ্বেদ/দেবী সূক্ত/১০ম মণ্ডল/সূক্ত ১২৫ -এর ১ম মন্ত্রে বাক্ আম্ভৃণী ঋষি দেবীর সঙ্গে একাত্ম হয়ে ঘোষণা করছেন :


“অহং রুদ্রেভির্বসুভিশ্চরাম্যহমাদিত্যৈরুত বিশ্বদেবৈঃ। 

অহং মিত্রাবরুণোভা বিভ্যহমিন্দ্রাগ্নী অহমশ্বিনোভা॥”

অর্থ : আমিই রুদ্র, বসু, আদিত্য ও বিশ্বদেবগণের রূপে বিচরণ করি। আমিই বিষ্ণু, মিত্র, বরুণ, ইন্দ্র ও অগ্নিকে ধারণ করে আছি। 

দেখুন শৈবগণ আপনাদের রুদ্র (শিব)-র রূপ দেবী ধারণ করেছেন। 

______________________________________________

🕉️ শৈবপক্ষ দ্বারা দাবীর খণ্ডন : 


বেদের মন্ত্র যা বলা হয়েছে তার স্থান কালপাত্র বিচার করা জরুরী, তবেই সত্য জানা সম্ভবপর হবে। 

প্রথমে দেবীসূক্তের বিষয়ে আলোকপাত করা যাক।


দেবীসূক্ত নামে সংজ্ঞায়িত করা যে সূক্ত ঋগ্বেদ সংহিতাতে রয়েছে তা মূলত বাক্ আম্ভৃণী ঋষি পরমাত্মার সঙ্গে যোগযুক্ত অবস্থায় নিজেকে একাত্ম করে অহং অর্থাৎ আমি শব্দে ‘পরমাত্মাই সকল কিছু’ তা ঘোষণা করছেন। 


🔷 আত্মজ্ঞান উপলব্ধি করে ব্রহ্ম সত্ত্বা তে নিজের আমিত্বকে উন্নীত করে ত্রিশঙ্কু ঋষিও এক‌ই কথা বলেছিলেন, দেখুন  প্রমাণ 👇


✳️ ত্রিশঙ্ক মুনি ব্রহ্ম লাভের পর বললেন —


অহং বৃক্ষস্য রেরিবা। কীর্তিঃ পৃষ্ঠং গিরেরিব। 

ঊর্ধ্বপবিত্রো বাজিনীব স্বমৃতমস্মি। 

দ্রবিণং সবর্চসম্। সুমেধা অমৃতোক্ষিতঃ। 

ইতি ত্রিশঙ্কোর্বেদানুবচনম্ ॥ ১

(কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/তৈত্তিরীয় উপনিষদ/শিক্ষা বল্লী-১০ অধ্যায়/অনুবাক-১)


✅ অর্থ — ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করার পর ত্রিশঙ্ক মুনি বলেছেন — আমি সংসাররূপী বৃক্ষের প্রেরয়িতা। ব্রহ্মে পরিনত হয়ে আমি সমস্ত বিশ্বের সাথে একাত্ম হতে পেরেছি। গিরিপৃষ্ঠের ন্যায় আমার(ব্রহ্মের) কীর্তি উচ্চ। ব্রহ্মভাব প্রাপ্ত হবার দরুন আমার কীর্তি ব্রহ্মের মতো মহান ও অনন্ত। (আমি ব্রহ্মের সাথে একাত্ম হতে পেরেছি তাই) আমি (অর্থাৎ আত্মারূপী আমি) পবিত্র। সূর্যে যেমন উত্তম অমৃত আছে আমিও সেরূপ উত্তম অমৃত। আমিই সেই ধনরূপ আত্মতত্ব শ্রেষ্ট মেধাযুক্ত। আমি অমৃত ও অক্ষয়।


 — এখানে অহং শব্দ দ্বারা আমিই সব বলতে যদি দেবীকেই কেই বোঝানো হতো, আর এর জন্য‌ই যদি একমাত্র দেবীই ঈশ্বর হয়ে থাকেন। তাহলে ভেবে দেখুন ত্রিশঙ্কু ঋষিও এক‌ই কথা বলেছেন যে, আমিই সব । তাহলে নব্যশাক্তদের যুক্তি অনুযায়ী সনাতন ধর্মে দুইটি ভিন্ন ভিন্ন ঈশ্বর স্বীকার করতে হতো। কিন্তু সনাতন ধর্মে ঈশ্বর একজন‌ই। তবে এই ‘আমি’ ই ব্রহ্ম বলবার মীমাংসা কি ? 

এর মীমাংসা হল - আত্মজ্ঞান।


যে কোনো ব্যক্তি অহং অর্থাৎ আমি শব্দ দ্বারা নিজের দেহ থেকে স্বতন্ত্র ‘আত্মা’-কেই ইঙ্গিত করেন, ঐ আত্মাই মূল পরমাত্মা। সুতরাং সকল জীবের মধ্যে স্থিত অহংরূপে আত্মরূপী এক পরমাত্মাই স্থিত। এই জ্ঞানকেই আত্মজ্ঞান বলে। এইভাবে যিনি নিজের আত্মার জ্ঞানলাভ করেন, তিনিই আত্মজ্ঞান সম্পন্ন আত্মজ্ঞানী ব্যক্তি।


বাক্ আম্ভৃণী ঋষিও নিজের দেহের মধ্যে স্থিত আত্মাকে পরমাত্মার সঙ্গে একাত্ম করে যোগযুক্ত অবস্থায় অহং অর্থাৎ আমি শব্দে ‘পরমাত্মাই সকল কিছু’ তা ঘোষণা করছেন। যেহেতু তিনি একজন নারী ঋষি হিসেবে আত্মজ্ঞানে পরমাত্মার বিষয়ে বলেছেন, তাই পরমাত্মার বিষয়টিকে ‘স্ত্রীলিঙ্গ’ বাচক হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে দেবীসূক্ত হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। কিন্তু তা শিবপারম্যবাদের ঊর্ধ্বে শক্তিপারম্যবাদের অস্তিত্বকে কোনোভাবেই প্রমাণ করছে না।


⏺️ এবার আসি দেবী-অথর্বশীর্ষের বিষয়ে —

দেবী-অথর্বশীর্ষে প্রথমে বলা হয়েছে - দেবগণ যখন দেবীর কাছে গিয়ে পরিচয় জানতে চাইলেন, তখন দেবী তাদের আমি শব্দে ইঙ্গিত করেছেন তার অন্তরে স্থিত অস্তিত্বরূপ পরমসত্তাকে। যে পরমসত্তা থেকে দেবী স্বয়ং প্রকটিত হয়ে জগৎ সৃষ্টি স্থিতি লয় ইত্যাদি করছেন। ঐ পরমসত্তা হলেন ব্রহ্ম এবং দেবী হলেন সেই ব্রহ্মের শক্তি।


এখন প্রশ্ন হল — ব্রহ্ম কে ?

তমীশ্বরাণাং পরমং মহেশ্বরং

তং দেবতানাং পরমং চ দৈবতম্ ।

পতিং পতীনাং পরমং পরস্তাদ্

বিদাম দেবং ভুবনেশমীড্যম্ ॥ ৭ ॥

ন তস্য কার্যং করণং চ বিদ্যতে

ন তৎসমশ্চাভ্যধিকশ্চ দৃশ্যতে ।

পরাস্য শক্তির্বিবিধৈব শ্রয়তে

স্বাভাবিকী জ্ঞানবলক্রিয়া চ ॥ ৮ ॥

[তথ্যসূত্র : কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ/অধ্যায় ৬/৭-৮ নং মন্ত্র]

✅ অর্থ — সমস্ত ঈশ্বরপদ প্রাপ্তকারী দেবতাদের‌ থেকে পরম হলেন মহেশ্বর । সমস্ত দেবতাদের চেয়েও তিনি হলেন পরমদেবতা, তিনি সংসারের সমস্ত পতিদের‌ও পতি, তিনি সকল কিছুর মধ্যে পরমতম স্তর, সেই ভুবনের একমাত্র ঈশ্বর ভুবনেশ পরমেশ্বর শিব‌‌ই আরাধ্য, তাকেই নিজের অন্তরের আত্মাস্বরূপ বলে জানা উচিত ॥ ৭ ॥

[পরমার্থিক দৃষ্টির বিচারে] না তার কোনো কার্যগত শরীর আছে, আর না তার কোনো করণ আছে, না তার সমতুল্য অন্য কেউ আছে, সেই পরমেশ্বর শিবের চেয়ে উৎকৃষ্ট আর অন্য কাউকে দেখা যায় না । সেই অদ্বিতীয় শিবের মধ্যে থেকেই  স্বাভাবিকভাবে প্রকাশিত তার অভিন্ন পরাশক্তি, শিবের এই স্বাভাবিক অদ্বিতীয় পরাশক্তিই নানারকম ভাবে অর্থাৎ জ্ঞানশক্তি ক্রিয়াশক্তি ও বলশক্তি রূপে বিদ্যমান‌। ইহাই বেদশাস্ত্রের বচন ॥ ৮ ॥


🔷 লক্ষ্য করুন : কৃষ্ণ-যজুর্বেদের শ্বেতাশ্বতর উপনিষদের শ্রুতি তে বলা হয়েছে ‘পরাস্য শক্তির্বিবিধৈব’ অর্থাৎ — শিব থেকে পরাশক্তি প্রকট হন - এটি সর্বজনমান্য বেদের বচন, কোনো সম্প্রদায়গত সিদ্ধান্ত নয়। অর্থাৎ বেদ অনুসারে, দেবী অর্থাৎ পরাশক্তি প্রকট হন পরমব্রহ্ম শিবের থেকে। 


অর্থাৎ দেবী (পরাশক্তি) ‘অহং’ - (আমি) বলতে পরমব্রহ্ম শিব-কেই বুঝিয়েছেন। 


দেখুন, যোগ অবলম্বন করে যোগী ব্যক্তি ‘অহং’ শব্দে শিবকেই বুঝিয়ে থাকেন তা বেদেই বলা হয়েছে —

সর্বত্রপূর্ণরূপোহস্মি সচ্চিদানন্দলক্ষণঃ ।

সর্বতীর্থস্বরূপোহস্মি পরমাত্মাস্ম্যহং শিবং ॥ ১২ ॥

[সামবেদ/মৈত্রেয়ী উপনিষদ/অধ্যায়/৩]

✅ অর্থ — আমি সর্বত্র পূর্ণরূপে বিরাজিত সচ্চিদানন্দ লক্ষণযুক্ত। তীর্থের স্বরূপও আমি এবং আমি পরমাত্মা স্বরূপ কল্যাণকারী শিব ॥ ১২ ॥


♦️ সেই যোগীর ধ্যানের মাধ্যমে পরমেশ্বর শিবের তত্ত্বকে জানতে পারেন, তখন সে যোগী মুক্ত হয়ে শিবত্ব লাভ করেন। শ্রুতি শাস্ত্রের মধ্যেই বলা হয়েছে শিবতত্ত্বকে জানার পরেই জীবের মুক্তি হয় —

বিরক্তস্য তু সংসারাজ্ঞানং কৈবল্যসাধনম্ ।

তেন পাশাপহানিঃ স্যাজ্ঞাত্বা দেবং সদাশিবম্‌ ॥ ৪৭ ॥

[সামবেদ/দর্শন উপনিষদ/৬ষ্ঠ খণ্ড/৪৭]


✅ অর্থ — এই প্রকারে যেসব মানুষের সংসার-সাগরের মায়া থেকে পৃথক হয়ে যায়, তাদের কৈবল্যমুক্তির সাধনভূত জ্ঞানের প্রাপ্তি হয়। সেই জ্ঞানের দ্বারা নিত্য পরমাত্মা সদাশিবের তত্ত্বজ্ঞান প্রাপ্ত হওয়ার পরে, সমস্ত প্রকার বন্ধন থেকেই জীব মুক্ত হয়ে যায় ॥ ৪৭ ॥


একই বাক্যের সমর্থনে ভগবান শ্রীবিষ্ণু জী বলেছেন —

যস্মিন্ কালে স্বমাত্মানং যোগী জানাতি কেবলম্ ।

তস্মাৎ কালাৎ সমারভ্য জীবন্মুক্তো ভবেদসৌ ॥ ৪২ ॥

[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/বরাহ উপনিষদ/২ অধ্যায়]


✅ অর্থ — যোগী যে সময়ে কেবল আত্মস্বরূপ অবগত হন, সেই সময় থেকে তিনি জীবন্মুক্ত বলে কথিত হন ॥ ৪২ ॥


অর্থাৎ, অহং শব্দে সর্বদা পরমেশ্বর শিবকেই বোঝানো হয়ে থাকে। 


এবার দেব্যথর্বশীর্ষ উপনিষদ থেকেই দেখা যাক, 

বেদ দেবী কে কোন সত্ত্বা হিসেবে চিহ্নিত করছেন ? 

দেবী একমাত্র ব্রহ্ম নাকি ব্রহ্মের শক্তি ?


✅ উত্তর : দেবীঅথর্বশীর্ষ উপনিষদের ১৫ নং মন্ত্রে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে —

 এষাঽঽত্মশক্তি । এষাবিশ্বমোহিনী । 

পাশাঙ্কুশধনুর্বাণধরা । এষামহাবিদ্যা । 

য এবং বেদং স শোকং তরতি ॥১৫

[দেব্যথর্বশীর্ষ উপনিষদ/১৫ নং মন্ত্র]

✅ অর্থ – ইনি পরমাত্মার শক্তি, ইনি বিশ্ব মোহিনী, পাশ অঙ্কুশ ধনু ও বানধারিণী ।ইনি শ্রীমহাবিদ্যা। যে তাকে এই ভাবে জানে শোকের দুস্তর সাগর পার হয়ে যায় ॥১৫


লক্ষ্য করুন – উপরোক্ত শ্লোকে দেবীকে পরমাত্মার শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছেন অর্থাৎ এখান থেকে প্রমাণিত হয় যে দেবী প্রথমে পরমার্থিক পর্যায়ের বিচারে ব্রহ্মের(শিবের) সাথে অভিন্ন থাকাকালীন অবস্থাকে নির্দেশ করে নিজেকে ব্রহ্ম বলেছেন এবং পরবর্তীতে ব্যবহারিক পর্যায়ের বিচারে সেই দেবীকেই উক্ত উপনিষদ পরমাত্মার(শিবের) শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অর্থাৎ দেবী শিবের অভিন্না ইচ্ছাশক্তি। তাই ঐ দেবী-অথর্বশীর্ষ উপনিষদেই দেবীকে দেবাত্মশক্তি বলা হয়েছে।


ইতিহাস শাস্ত্র মহাভারত থেকে এই যুক্তির সমর্থনকারী  প্রমাণ দেখুন — 

রূপং বিদ্ধি মহাভাগে ! প্রকৃতিস্ত্বং পরাে হ্যহম্ ॥ ৩৮ ॥

অহম বিষ্ণুরং ব্রহ্মা হ্যহম্ যজ্ঞস্তথৈব ।

আবয়োর্ন চ ভেদোঽস্তি পরমার্থস্ততোঽবলে ।

তথাপি বিদ্মস্তে ভেদং কিং মাং ত্বং পরিপৃচ্ছসি ॥ ৩৯ ॥

[মহাভারত/শান্তিপর্ব/২২৭ অধ্যায়/৩৮-৩৯ শ্লোক]

✅ অর্থ – মহাদেব দেবী পার্বতীকে বললেন- আমিই ব্রহ্ম(শিব), তুমিই ব্রহ্মশক্তি (পার্বতী) , আমিই ভােক্তা , তুমি ভােগ্যা । তুমি প্রকৃতি , আমিই পুরুষ ॥৩৮

আমিই বিষ্ণু, আমিই ব্রহ্মা এবং আমিই যজ্ঞ , ইহাই পরমার্থ যে তোমাতে(পার্বতী) আমাতে(শিব) কোনো ভেদ নেই। তথাপি আমরা জানি যে তোমাতে আমাতে পরস্পরের ভেদ আছে(ব্যবহারিক পর্যায়ে) ॥ ৩৯


অর্থাৎ, পরমার্থিক অবস্থায় শক্তি পরমশিবেই লীন হয়ে থাকে, তাই শক্তি অভিন্নভাবে শিবে থাকেন -এই পরমার্থিক দৃষ্টিতে শিবশক্তিতে ভেদ নেই, শিবের সহিত শক্তি অভিন্ন বা শক্তিকে ব্রহ্ম - এমনটা বলা হয়ে থাকে। কিন্তু শিব সর্বদাই ব্রহ্ম, শক্তি তার প্রকাশ - সাক্ষাৎ ব্রহ্ম নন, এই কারণে মহাদেব বলছেন, শিব ও শক্তি ব্যবহারিক পর্যায়ের বিচারে ভিন্ন। শক্তি সাক্ষাৎ ব্রহ্ম নন, শক্তি শিবের সহিত অভিন্ন হবার দৃষ্টিকোনের কারণে শাস্ত্রে কখনো কখনো ব্রহ্মে বলে কথিত হন মাত্র, মূলত দেবী হলেন ব্রহ্মের শক্তি। 


♦️ এবার সরাসরি ‘অহং’ শব্দের অর্থ শিবকেই বোঝানো হয়ে থাকে, তা নিয়ে আলোচনা করি।


দেবী ‘অহং’ শব্দে আমি বলতে শিবকেই বুঝিয়েছেন। শাস্ত্রেও বলা হয়েছে যোগস্থ আত্মজ্ঞানময় অবস্থায় অহং শব্দে মহিমা ঘোষণা কারী ব্যক্তির অহং শব্দ শিবকেই নির্দেশ করে। যারা অহং শব্দে শিবকেই বোঝানো হচ্ছে বলে মনে করেন তারাই মায়ামুক্ত ব্যক্তি, বাকিরা মায়ার অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে অহং শব্দের বাচক দেবীকে মনে করে চলেছে । 

প্রমাণ — 

শিবরূপতয়া ভাতেঽহংশব্দার্থে মুনীশ্বরাঃ ।

অবিদ্যা বিলয়ং যাতি বিদ্যয়া পরয়ৈব তু ॥ ৮ ॥

[স্কন্দমহাপুরাণ/সূতসংহিতা/যজ্ঞবৈভবখণ্ড/উপরিভাগ/ব্রহ্মগীতা/অধ্যায় ১২/৮ শ্লোক]

✅ অর্থ : অহং — শব্দের অর্থ ‘আমি’ বলতে যিনি ‘শিব’ বলে ভাবেন, বাস্তবে একমাত্র তার‌ই সকল অবিদ্যা (মায়া) লুপ্ত (দূর) হয়েছে বলে জানা উচিত ॥ ৮ ॥ 

অর্থাৎ, পরমেশ্বর শিবের সহিত একাত্মভাবে স্থিত হয়ে দেবী সেই ভাব অনুসারে বাহ্যিক শক্তিরূপের মাহাত্ম্য প্রকাশ করেছেন দেবগণের সম্মুখে। এতে পরমেশ্বর শিবের সর্বোচ্চ পরমত্বের খণ্ডন হচ্ছে না। 


✳️ অভিন্ন অবস্থায় থেকে শৈবমহাযোগী ব্যক্তিও যোগাবস্থায় সৃষ্টি স্থিতি প্রলয় করতে সক্ষম, প্রমাণ দেখুন — 


♦️ যোগী যোগের একটা পর্যায়ে পৌঁছালে সে সৃষ্টি-স্থিতি-লয় ইত্যাদি করতে পারে —

যত্র বায়ুঃ স্থিরঃ খে স্যাৎ সেয়ং প্রথমভূমিকা ।

যত্রাত্মনা সৃষ্টিলয়ৌ জীবন্মুক্তিদশাগতঃ ।

সহজঃ কুরুতে যোগং সেয়ং নিষ্পত্তিভূমিকা ॥

[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/বরাহ উপনিষদ/অধ্যায় ৫/৭৫]

✅ অর্থ — যোগী জীবন্মুক্তিদশা স্বভাবতঃ স্বয়ং যোগ অবলম্বন করে সৃষ্টি, স্থিতি ও লয় করতে পারেন, তখন তার নাম নিষ্পত্তি ভূমিকা।


অর্থাৎ যোগী চাইলেই সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয় করতেই পারে।


♦️ পরম পবিত্র শিবমহাপুরাণেও একি কথায় পরমেশ্বর শিব, ব্রহ্মা এবং বিষ্ণুকে বলেছেন —


এতৎকালে তু যঃ কুর্যাৎ পূজাং মল্লিঙ্গবেরয়োঃ ।

কুর্যাৎ স জগতঃ কৃত্যং স্থিতিসর্গাদিকং পুমান্ ॥ ১১ ॥

[শিবমহাপুরাণ/বিদ্যেশ্বর সংহিতা/অধ্যায় ৯/১১]


✅ অর্থ — এই সময় (শিবমহারাত্রিতে) যে পরমেশ্বর শিবের লিঙ্গস্বরূপ (নিষ্কল-অঙ্গ- আকৃতিরহিত নিরাকার ব্রহ্মের প্রতীক) এবং প্রতিকৃতি (সকল- সাকার স্বরূপের প্রতীক বিগ্রহ) এর পূজা করবে, সেই ব্যক্তি জগতের সৃষ্টি-স্থিতি-লয় ইত্যাদি কৃত্য করতে সক্ষম হবে ॥ ১১ ॥


তাহলে প্রমাণিত হচ্ছে যে, — যোগী ব্যক্তি যোগাবস্থার দ্বারা সবই করতে পারেন। যোগীর জন্য সৃষ্টি থেকে লয় পর্যন্ত কার্য করা কোনো বিশেষ অসমর্থের বিষয় না। 


তাই শিবের‌ই ইচ্ছাশক্তি যে জগৎ সৃষ্টি স্থিতি প্রলয় করতে সক্ষম হবেন এতে কোনো সংশয়ের অবকাশ নেই। এতে পরমব্রহ্ম শিবের স্থান যে দেবীর চেয়ে নিকৃষ্ট হয়ে গেল - এমনটা ঘটা সম্ভব নয়। কারণ শিব হলেন সেই অহং অবস্থা, যার উপর নির্ভর করেই দেবী সকল কিছুর উৎপত্তি-পালন-লয় ইত্যাদি করছেন।

______________________________________________

এবার আসি দেবীসূক্ত তথা দেবী-অথর্বশীর্ষের মন্ত্রটির অর্থ নির্ণয়ের বিষয়ে।


‘অহং রুদ্রেভির্বসুভিশ্চরামি’ - বচন দ্বারা দেবী কখনোই ‘আমিই শিবের জন্ম দিই, শিব আমার‌ই রূপ’ — এমনটা বলেননি। 

সম্পূর্ণ মন্ত্র পড়ে দেখুন —


‘ অহং রুদ্রেভির্সবসুভিশ্চরাম্যহমাদিত্যৈরুদ্দেত বিশ্বদেবৈঃ। অহং মিত্রাবরুণোভা বিভর্ম্যহমিন্দ্রাগ্নী অহমশ্বিনোভা॥ ’

✅ প্রকৃত অর্থ : রুদ্রগণ ও বসুগণ রূপে আমি সঞ্চার করি। আমি আদিত্যগণ ও বিশ্বদেবের রূপে বিচরণ করি। মিত্র ও বরুণ এবং ইন্দ্র ও অগ্নি তথা অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের আমি ভরণ পোষণ করি ॥ ৫ ॥ 

                       — এখানে ১১জন রুদ্রগণ, ৮জন বসু, ১২টি আদিত্য ইত্যাদিদের কথা বলা হয়েছে। সরাসরি পরমেশ্বর শিবের কথা বলা হয়নি। বরং দেবী শিবভাবে ভাবিত হয়ে অহং শব্দে সকল দেবদেবী তথা জগত কে নিজের স্বরূপ বলে পরিচয় দিয়েছেন। 

তখন দেবগণ শিবজ্ঞানসম্পন্না ব্রহ্মবিদ্যারূপী দেবীর সাকার রূপগুলির প্রতি সম্মান প্রদর্শনপূর্বক দেবীর বিভিন্ন নাম উল্লেখপূর্বক দেবীর স্তুতি করেছেন। 

কারণ, বেদের মুণ্ডক উপনিষদের ৩/২/৯ মন্ত্রে বলা হয়েছে স্পষ্ট ভাবে বলা হয়েছে —  “ব্রহ্মবেদ ব্রহ্মৈব ভবতি” 

অর্থাৎ — যিনি ব্রহ্মকে [দর্শন করে] জেনে(উপলব্ধি করে) ফেলেন তিনি‌ও [এক পরমাত্মা শিবের সাথে একীভূত হবার কারণে] ব্রহ্ম বলে অভিহিত হন ।

এই কারণেই দেবগণ দেবীকেও ব্রহ্মস্বরূপিনী বলে জেনে দেবীকে স্তুতি করেছেন। এতে নূতন করে আশ্চর্য হবার বিষয় আমরা শৈবরা দেখতে পাইনা। কারণ, আমাদের মহাপাশুপত শৈবপরম্পরার শৈব আচার্য-গুরুগণ এই সকল বিষয়ে স্পষ্টভাবে মীমাংসা করে রেখেছেন। কিন্তু বর্তমানে শক্তিপারম্যবাদী নব্যশাক্তদের উদয় হয়েছে, যারা বেদ-পুরাণ-ইতিহাস-আগমতন্ত্রের বচনের বিরুদ্ধে গিয়ে নবাগত মতবাদের আমদানি করতে আরম্ভ করেছেন। তাদের ধারণা যে সম্পূর্ণভাবে ভিত্তিহীন তা এই প্রবন্ধে প্রমাণিত হল।


🔥 সিদ্ধান্ত — দেবীসূক্ত বা দেব্যুথর্বশীর্ষ উপনিষদে ‘অহং রুদ্রেভির্বসু।ভিশ্চরামি’ - বচন দ্বারা পরমাত্মা শিবকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। 

______________________________________________

🚩 তথ্য সংগ্রহ ও লেখনীতে : শিবালয় প্রতিষ্ঠাতা শিবদ্বারাধীশাধ্যক্ষ দেশিক আচার্যপরমাধিকারী শ্রীগুরু নন্দীনাথ শৈব আচার্যদেব 🚩 

©️ কপিরাইট ও প্রচারে : Shivalaya 🔥 


শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্ 🚩 

ॐ নমঃ পার্বতীপতয়ে হর হর মহাদেব 🚩 


পরমেশ্বর শিবের ও সনাতন শৈবধর্মের বিষয়ে এমন গুহ্য সত্য রহস্য ও সত্য উন্মোচনমূলক লেখা আরো পেতে অবশ্য‌ই আমাদের Shivalaya ফেসবুক পেজ Follow করে Favourite করে রাখুন। 

এই তথ্য দ্বারা যদি আপনার জ্ঞান বৃদ্ধি হয়ে থাকে তবে অবশ্য‌ই এই লেখাটি শেয়ার করুন, যাতে সত্য প্রকাশ্যে আসে।


 #সনাতনধর্ম #শিবালয় #shiva #শিব #পরমেশ্বরশিব #শক্তিপারম্যবাদখণ্ডন #শক্তি #দেবীসূক্ত #Shivalaya #sanatandharma #শৈবধর্ম

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ