আমিষ-নিরামিষ খাদ্য আহার বিষয়ে ভগবদগীতা
আমিষ-নিরামিষ খাদ্য আহার বিষয়ে ভগবদগীতা
__________________________________________
🔰 ভূমিকা — নিরামিষ ও আমিষ আহারের বিষয়ে ধর্মের সিদ্ধান্ত কোন পক্ষে রয়েছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত হবার জন্য ভগবদগীতা-র ১৭ তম অধ্যায়ের ৭-১০ নং শ্লোকের উদ্ধৃতি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। মহাভারতের মোট ১৮টি পর্বের মধ্যে ষষ্ঠ পর্ব হলো ভীষ্মপর্ব। এই পর্বের ২৫ নম্বর অধ্যায় থেকে ৪২ নম্বর অধ্যায় পর্যন্ত মোট ১৮টি অধ্যায় নিয়ে শ্রীমৎ ভগবৎ গীতা (শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা) গঠিত।
এই প্রবন্ধে সেই শ্লোকের প্রকৃত অর্থ ও ভাবার্থ তুলে ধরে নিরামিষ ও আমিষ আহারের বিষয়ে ধর্মের সিদ্ধান্ত হিসেবে ভগবদগীতার কি নির্দেশনা রয়েছে তা তুলে ধরা হয়েছে। সমগ্র প্রবন্ধ টি ধৈর্য্য সহকারে পড়ে নিরপেক্ষ বিচার করে সত্য গ্রহণ করুন।
__________________________________________
🥗 আলোচ্য বিষয় : আমিষ-নিরামিষ খাদ্য আহার বিষয়ে ভগবদগীতা
♻️ মানুষের প্রিয় খাদ্যের তিন প্রকারভেদ —
আহারস্ত্বপি সর্বস্য ত্রিবিধো ভবতি প্রিয়ঃ ।
যজ্ঞস্তপস্তথা দানং তেষাং ভেদমিমং শৃণু ॥ ৭ ॥
[ভগবদগীতা/১৭ অধ্যায়/৭ নং শ্লোক]
[অন্বয় — আহারঃ = আহার, খাদ্য। তু = কিন্তু / আবার। অপি = এছাড়াও। সর্বস্য = সকলের। ত্রিবিধঃ = তিন প্রকার। ভবতি = হয়। প্রিয়ঃ = প্রিয়। যজ্ঞঃ = যজ্ঞ। তপঃ = তপস্যা। তথা = এবং। দানং = দান। তেষাং = তাদের। ভেদম্ = ভেদ, পার্থক্য। ইমং = এই। শৃণু = শোনো]
✅ অর্থ : সকল মানুষের প্রিয় আহারও তিন প্রকারের হয় ; তেমনভাবেই যজ্ঞ, তপস্যা ও দানও তিন প্রকার। এখন তাদের এই ভেদ সম্পর্কে শোনো ॥ ৭ ॥
🍱 সাত্ত্বিক আহার প্রিয় ব্যক্তিদের আহারের বৈশিষ্ট্য —
আয়ুঃসত্ত্ববলারোগ্যসুখপ্রীতিবিবর্দ্ধনাঃ ।
রস্যাঃ স্নিগ্ধাঃ স্থিরা হৃদ্যা আহারাঃ সাত্ত্বিকপ্রিয়াঃ ॥ ৮ ॥
[ভগবদগীতা/১৭ অধ্যায়/৮ নং শ্লোক]
[অন্বয় : আয়ুঃ = আয়ু। সত্ত্ব = মানসিক নির্মলতা। বল = শক্তি। আরোগ্য = স্বাস্থ্য। সুখ = সুখ। প্রীতি = সন্তোষ / আনন্দ। বিবর্দ্ধনাঃ = বৃদ্ধি করে এমন। রস্যাঃ = রসযুক্ত। স্নিগ্ধাঃ = স্নিগ্ধ, পুষ্টিকর। স্থিরাঃ = স্থায়ী পুষ্টিদায়ক। হৃদ্যাঃ = হৃদয়গ্রাহী, মনোরম। আহারাঃ = খাদ্যসমূহ। সাত্ত্বিকপ্রিয়াঃ = সাত্ত্বিক ব্যক্তিদের প্রিয়]
✅ অর্থ : যে খাদ্য আয়ু, মানসিক পবিত্রতা, শক্তি, স্বাস্থ্য, সুখ ও আনন্দ বৃদ্ধি করে, এবং যা রসযুক্ত, পুষ্টিকর, স্থায়ী উপকারদায়ক ও হৃদয়গ্রাহী — সেই খাদ্য সাত্ত্বিকদের প্রিয় ॥ ৮ ॥
♨️ রাজসিক আহার প্রিয় ব্যক্তিদের আহারের বৈশিষ্ট্য —
কট্বম্নলবণাত্যুষ্ণতীক্ষ্ণরুক্ষবিদাহিনঃ ।
আহারা রাজসস্যেষ্টা দুঃখশোকাময়প্রদাঃ ॥ ৯ ॥
[ভগবদগীতা/১৭ অধ্যায়/৯ নং শ্লোক]
[অন্বয় — কটু = তিক্ত / ঝাল, অম্ল = টক। লবণ = নোনতা। অত্যুষ্ণ = অতিরিক্ত গরম। তীক্ষ্ণ = তীব্র / ঝাঁঝালো। রুক্ষ = শুষ্ক। বিদাহিনঃ = জ্বালাকারী। আহারাঃ = খাদ্য। রাজসস্য = রাজসিক ব্যক্তির। ইষ্টাঃ = প্রিয়। দুঃখ = কষ্ট। শোক = দুঃখবোধ। আময় = রোগ। প্রদাঃ = প্রদানকারী।]
✅ অর্থ : অতিরিক্ত ঝাল, টক, নোনতা, গরম, ঝাঁঝালো, শুষ্ক ও দাহকারী খাদ্য রাজসিক মানুষের প্রিয়; এগুলো কষ্ট, শোক ও রোগের কারণ হয় ॥ ৯ ॥
🤢 তামসিক আহার প্রিয় ব্যক্তিদের আহারের বৈশিষ্ট্য —
যাতযামং গতরসং পূতি পর্যুষিতঞ্চ যৎ ।
উচ্ছিষ্টমপি চামেধ্যং ভোজনং তামসপ্রিয়ম্ ॥ ১০ ॥
[ভগবদগীতা/১৭ অধ্যায়/১০ নং শ্লোক]
[অন্বয় — যাতযামম্ = বহুক্ষণ আগে প্রস্তুত / বাসি। গতরসম্ = যার রস বা স্বাদ নষ্ট হয়েছে। পূতি = দুর্গন্ধযুক্ত / পচা। পর্যুষিতম্ = দীর্ঘক্ষণ রাখা। চ = এবং। যৎ = যা। উচ্ছিষ্টম্ = অন্যের ভোজনাবশেষ। অপি = এছাড়াও। চ = এবং। অমেধ্যম্ = অপবিত্র। ভোজনম্ = খাদ্য। তামসপ্রিয়ম্ = তামসিকদের প্রিয়]
✅ অর্থ : যে খাদ্য বাসি, স্বাদহীন, পচা, দীর্ঘক্ষণ রাখা, অন্যের উচ্ছিষ্ট এবং অপবিত্র — সেই খাদ্য তামসিক প্রকৃতির মানুষের প্রিয় ॥ ১০ ॥
________________________________________________
🔥 শ্রীনন্দীনাথ শৈব আচার্যকৃত নিরপেক্ষ ব্যাখ্যা :
মহাভারতের ভগবদ্গীতা ১৭.৭–১০ শ্লোকগুলির অনুবাদ দেখলে দেখা যায়, এখানে সরাসরি “নিরামিষ” (শাকাহার) বা “আমিষ” (মাংসাহার) — এই শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়নি। শ্লোকগুলিতে মূল আলোচনা হচ্ছে আহারের গুণগত প্রকৃতি (গুণভেদ) নিয়ে— অর্থাৎ খাদ্যের প্রভাব, বৈশিষ্ট্য ও মানসিক প্রবণতার সঙ্গে সম্পর্ক, খাদ্যের উৎসভেদ নয়।
শ্লোক অনুযায়ী —
সাত্ত্বিক আহার → যা আয়ু, সত্ত্ব, বল, আরোগ্য, সুখ, প্রীতি বৃদ্ধি করে, এবং রসযুক্ত, স্নিগ্ধ, স্থির, হৃদ্য।
রাজসিক আহার → যা অতি ঝাল, টক, নোনতা, অতিরিক্ত গরম, তীক্ষ্ণ, রুক্ষ, দাহকারী।
তামসিক আহার → যা বাসি, রসহীন, পচা, দীর্ঘক্ষণ রাখা, উচ্ছিষ্ট, অপবিত্র।
এই বর্ণনায় লক্ষ্য করলে দেখা যায়— শ্রেণিবিভাগের মানদণ্ড হল :
১. খাদ্যের গুণ,
২. শরীর-মনের উপর প্রভাব,
৩. খাদ্যের অবস্থা ও প্রকৃতি।
৭-১০ নং শ্লোকে
“যা মাছ/মাংস/ডিম তাই হল রাজসিক/তামসিক” বা “যা উদ্ভিজ্জ তাই হল সাত্ত্বিক” — এমনটা কোথাও বলা হয়নি।
তবে পরবর্তী কালের বিভিন্ন নির্দিষ্ট ভাবধারার ভাষ্যকার, পরম্পরা নির্মাণ করে নিজেদের উক্ত নবাগত আচার অনুযায়ী কিছু খাদ্যের উৎসকে সাত্ত্বিক-রাজসিক-তামসিক হিসেবে আলাদা করে ব্যাখ্যা করেছেন। যেমন - কিছু বৈষ্ণবমতবাদী নবগত পরম্পরাতে উক্ত শ্লোকের সাত্ত্বিক আহার বলতে নিরামিষ উদ্ভিজ্জ বস্তুকে এবং তামসিক আহার বলতে আমিষ প্রানীজ (মাছ/মাংস/ডিম) কে বুঝিয়েছেন — কিন্তু সেটি ভাষ্যগত বা আচরণগত ব্যাখ্যা ; কিন্তু এই চারটি শ্লোকে সরাসরি শব্দার্থে নিরামিষ-আমিষ বিভাজন নেই।
তাই শুধুমাত্র ভগবদ্গীতা ১৭ অধ্যায়ের.৭–১০ নং শ্লোক-এর পদার্থ ও অনুবাদ ধরে বলা যায়, এখানে মূল শিক্ষা হল —
“খাদ্যকে তার প্রভাব ও গুণ অনুসারে বিচার করা হয়েছে, উৎস (উদ্ভিজ্জ/প্রাণিজ) অনুসারে নয়।”
__________________________________________
🚩 তথ্য সংগ্রহ ও লেখনীতে : শিবালয় প্রতিষ্ঠাতা শিবদ্বারাধীশাধ্যক্ষ দেশিক আচার্যপরমাধিকারী শ্রীশ্রীগুরু নন্দীনাথ শৈব আচার্যদেব 🚩
©️ কপিরাইট ও প্রচারে : Shivalaya 🔥
শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্ 🚩
ॐ নমঃ পার্বতীপতয়ে হর হর মহাদেব 🚩
#হিন্দুধর্ম #সনাতনধর্ম #শিবালয় #shiva #শিব #পরমেশ্বরশিব #ভগবান #পরমেশ্বরভগবানশিব #Shivalaya #sanatandharma #খাদ্যাভ্যাস #শৈবধর্ম #ভগবদ্গীতা


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন