পরমেশ্বর শিব সমস্ত শাস্ত্রের প্রকটকর্তা ও সনাতন ধর্মের সমস্ত মার্গের অন্তিম উদ্দেশ্য একমাত্র শিবকে লাভ করা
(শিবকৃপা লাভের মার্গক্রম প্রামাণিকতা — নামক অধ্যায়)
অথাতঃ সংপ্রবক্ষ্যামী মার্গপ্রামাণ্যনির্ণয়ম্ ।
শ্রদ্ধয়া সহিতা যূয়ং শৃণুধ্বং মুনিপুঙ্গবাঃ ॥ ১ ॥
বেদাংশ্চ ধর্মশাস্ত্রাণি পুরাণং ভারতং তথা ।
বেদাঙ্গান্যুপবেদাংশ্চ কামিকাদ্যাগমানপি ॥ ২ ॥
কাপালং লাকুলং চৈব তয়োর্ভেদান্ দ্বিজর্ষভাঃ ।
তথা পাশুপতং সৌমং ভৈরবপ্রমুখাগমান্ ॥ ৩ ॥
তেষামেবোপভেদাংশ্চ শতশোঽথ সহস্রশঃ ।
বিষ্ণ্যাগমাংস্তথা ব্রাহ্মান্ বুদ্ধার্হায়াগমানপি ॥ ৪ ॥
লোকায়তং তর্কশাস্ত্রং বহুবিস্তরসংযুতম্ ।
মীমাংসামতিগম্ভীরাং সাংখ্যযোগৌ তথৈব চ ॥ ৫ ॥
অনেকভেদভিন্নানি তথা শাস্ত্রান্তরাণি চ ।
নির্মমে শঙ্করঃ সাক্ষাৎ সর্বজ্ঞঃ সংগ্রহেণ তু ॥ ৬ ॥
প্রসাদাদেব রুদ্রস্য ব্রহ্মবিষ্ণ্বাদয়ঃ সুরাঃ ।
সিদ্ধবিদ্যাধরা যক্ষা রাক্ষসায়াস্তথৈব চ ॥ ৭ ॥
মুনয়শ্চ মনুষ্যাশ্চ যথাভাগ্যং দ্বিজোত্তমাঃ ।
তান্যেব বিস্তরেণৈব সংগ্রহেণৈব বা পুনঃ ॥ ৮ ॥
কুর্বন্তি তানি নামানি কথিতানি মনীষিভিঃ ।
অধিকারিবিভেদেন নৈকস্যৈব সদা দ্বিজাঃ ।
তর্কৈরেতে হি মার্গাস্তু ন হন্তব্যা মনীষিভিঃ ॥ ৯ ॥
যথা তোয়প্রবাহাণাং সমুদ্রঃ পরমাবধিঃ ।
তথৈব সর্বমার্গাণাং সাক্ষান্নিষ্ঠা মহেশ্বরঃ ॥ ১০ ॥
যেন যেন প্রকারেণ জনৈরেবিরুপাসিতঃ ॥ ১১ ॥
তত্তন্মার্গানুগুণ্যেন সাধকত্বং হ্যুপৈতি সঃ ।
তৎপ্রসাদাৎ ক্রমান্মার্গান্ বিশিষ্টানেতি মানবঃ ॥ ১২ ॥
তত্র তত্র স্থিতো দেবঃ প্রসাদং কুরুতেঽস্য তু ।
সোপানক্রমতো দেবা বেদমার্গস্য হেতবঃ ।
বেদমার্গস্থিতো দেবঃ সাক্ষান্মুক্তেস্তু কারণম্ ॥ ১৩ ॥
তত্রাপি কর্মভাগস্থো জ্ঞানশ্রদ্ধাপ্রদো হরঃ ।
জ্ঞানভাগস্থিতঃ শম্ভুর্জ্ঞানদ্বারেণ মোক্ষদঃ ॥ ১৪ ॥
একরূপা পরা মুক্তিস্ততস্তদ্বিষয়া মতিঃ ॥ ১৫ ॥
ভবেত্রৈব নানারূপা ভবিষ্যতি ।
বেদান্তঃ শঙ্করং সাক্ষাৎ নির্বিশেষাদ্বয়াত্মনা ॥ ১৬ ॥
ভক্তি মার্গান্তরান্ত্রৈবং ততো বিদ্যা তু বেদজা ।
অতো মার্গান্তরাজ্জাতা ন তয়ো মুনিসত্তমাঃ ।
অবিদ্যা নৈব বিদ্যাঃ স্যুরিতি সম্যন্নিরূপণম্ ॥ ১৭ ॥
তস্মান্মার্গান্তরাণাং তু প্রামাণ্যং বেদবিত্তমাঃ ॥ ১৮ ॥
মুক্তেরন্যত্র নাত্রৈব ক্রমেণৈবাত্র মানতা ।
অতো বেদান্তভাগস্থো মহাদেবোঽচিরেণ তু ॥ ১৯ ॥
মুক্তিং দদাতি নান্যত্র স্থিতঃ সোঽপি ক্রমেণ তু ।
দদাতি পরমাং মুক্তিমিত্যেষা শাশ্বতী শ্রুতিঃ ॥ ২০ ॥
অতো বেদস্থিতো মর্ত্যো নান্যমার্গ সমাশ্রয়েত্ ।
বেদমার্গৈকনিষ্ঠানাং ন কিঞ্চিদপি দুর্লভম্ ॥ ২১ ॥
অত্রৈব পরমা মুক্তির্ভুক্তয়শ্চাত্র পুষ্কলাঃ ।
অতোঽধিকারিভেদেন মার্গা মানং ন সংশয়ঃ ॥ ২২ ॥
ঈশ্বরস্য স্বরূপং চ বন্ধহেতৌ তথৈব চ ।
জগতঃ কারণে মুক্তৌ জ্ঞানাদৌ চ তথৈব চ ॥ ২৩ ॥
মার্গাণাং যে বিরুদ্ধাংশা বেদান্তেন বিচক্ষণাঃ ।
তেঽপি মন্দমতীনাং চ মহামোহাবৃতাত্মনাম্ ।
বাঞ্ছামাত্রানুগুণ্যেন প্রবৃত্তা ন যথার্থতঃ ॥ ২৪ ॥
দর্শয়িত্বা তৃণং মর্ত্যো ধাবন্তীং গাং যথাঽগ্রহীত্ ॥ ২৫ ॥
দর্শয়িত্বা তথা ক্ষুদ্রমিষ্টং পূর্বং মহেশ্বরঃ ।
পশ্চাৎ পাকানুগুণ্যেন দদাতি জ্ঞানমুত্তমম্ ॥ ২৬ ॥
তস্মাদুক্তেন মার্গেণ শিবেন কথিতা অমী ।
মার্গা মানং ন চামানং মৃষাবাদী কথং শিবঃ ॥ ২৭ ॥
মহাকারুণিকো দেবঃ সর্বজ্ঞো নির্মলঃ খলু ।
তথাঽপি বেদো মার্গাণামুত্তমঃ সর্বসাধকঃ ॥ ২৮ ॥
সর্বমুক্তং সমাসেন মার্গপ্রামাণ্যনির্ণয়ম্ ।
এবং বুদ্ধ্বা শ্রুতৌ শ্রদ্ধাং কুরুধ্বং যত্নতো দ্বিজাঃ ॥ ২৯ ॥
ইতি শ্রীস্কন্দপুরাণে সূতসংহিতায়াং চতুর্থে যজ্ঞবৈভবখণ্ডে মার্গপ্রামাণ্যবর্ণনং নাম দ্বাবিংশোঽধ্যায়ঃ ॥ ২২ ॥
[স্কন্দ পুরাণ/সূতসংহিতা/পূর্বভাগ/যজ্ঞবৈভবখণ্ড/অধ্যায় ২২]
____________________________________________________________________________________________
✅ অর্থ —
বেদ, (মনু প্রভৃতি) ধর্মশাস্ত্র, পুরাণ, মহাভারত, (জ্যোতিষাদি) বেদাঙ্গ, (আয়ুর্বেদাদি) উপবেদ, কামিক প্রভৃতি আগম, কাপাল ও লাকুল প্রভৃতি আগম এবং তাদের বিভিন্ন শাখা, পাশুপত, সোম, ভৈরব প্রভৃতি আগম ও তাদের শত শত ভেদ-উপভেদ, বৈষ্ণব আগম, ব্রাহ্ম আগম, বৌদ্ধ আগম, জৈন আগম, লোকায়ত শাস্ত্র, অত্যন্ত বিস্তৃত তর্কশাস্ত্র, অতি গভীর মীমাংসা, সাংখ্য ও যোগশাস্ত্র এবং নানাবিধ ভেদের আরও বহু শাস্ত্র— এই সমস্তই স্বয়ং মহাদেব নির্মাণ করেছেন ॥ ২–৬ ॥
শ্রী রুদ্রের কৃপায়ই ব্রহ্মা, বিষ্ণু প্রভৃতি দেবতা, সিদ্ধ, বিদ্যাধর (গন্ধর্ব), যক্ষ, রাক্ষস প্রভৃতি (অমানবীয় সত্তা), মুনি এবং অন্যান্য মানুষ— শিবনির্মিত ঐ শাস্ত্রগুলিরই সংক্ষিপ্ত বা বিস্তৃত রূপ প্রচার ও বিন্যাস করে থাকেন। এই কারণেই মনীষীদের দ্বারা প্রবর্তিত যে যে নামে যে যে শাস্ত্র পরিচিত হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রসিদ্ধ হয়েছে।
(অর্থাৎ, জৈমিনি মীমাংসার প্রকৃত রচয়িতা নন ; রচয়িতা মহেশ্বর। জৈমিনি কেবল এক বিশেষ পদ্ধতিতে তাকে সংকলিত বা বিন্যস্ত করেছেন। সেই কারণেই তাঁকে তার প্রণেতা বলে ধরা হয়েছে। এটিও শিবকৃপাজনিত।) ॥ ৭–৮ ॥
অধিকারীভেদে (অর্থাৎ যোগ্যতা ও মানসিক স্তর অনুযায়ী) এই শাস্ত্রগুলির ব্যবহার। এক ব্যক্তির জন্য সব শাস্ত্র সমানভাবে প্রযোজ্য নয়। অতএব জ্ঞানীদের উচিত নয় কেবল তর্কের আশ্রয়ে এগুলির খণ্ডন করা। প্রত্যেকটিই নিজ নিজ ক্ষেত্রে প্রমাণস্বরূপ। সবগুলিরই প্রামাণ্য আছে; তবে সাধনরূপে তাদের মধ্যে তারতম্য আছে — এই সিদ্ধান্তই ধারণ করা উচিত ॥ ৯ ॥
যেমন সব জলধারা— নালী, নালা, ছোট নদী, বড় নদী, পবিত্র নদী ইত্যাদির চূড়ান্ত গন্তব্য সমুদ্র; তেমনি সব পথের পরম পরিণতি শিবেতে ॥ ১০ ॥
মানুষ এই বিভিন্ন পথের মাধ্যমে যে যে রূপে পরমেশ্বরের উপাসনা করে, পরমেশ্বর সেই সেই পথ অনুযায়ী তাদের ইষ্টসিদ্ধি দান করেন; এবং তাঁর কৃপায় ক্রমে ব্যক্তি আরও উৎকৃষ্ট পথের দিকে অগ্রসর হতে থাকে ॥ ১১–১২ ॥
সমস্ত পথের অধিষ্ঠাতা রূপে অবস্থিত পরমশিবই সাধকের প্রতি কৃপা করে তাকে ফল দান করেন। অন্যান্য দেবতারা সিঁড়ির ধাপের মতো — প্রতিটি ধাপ পরবর্তী ধাপে পৌঁছে দিয়ে নিজের কাজ সম্পন্ন করে; চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া তার কাজ নয়। তেমনই দেবতাগণ ক্রমান্বয়ে সাধককে বেদমার্গ পর্যন্ত পৌঁছে দেন। শেষ ধাপ একমাত্র সেটিই। আবার ফলদানের ক্ষেত্রেও ঐ দেবতারা মাধ্যমমাত্র ; ফল দেন মহাদেব, তবে তাঁদের মাধ্যমে। যেমন রাষ্ট্রপতি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সরকারি কর্মচারীদের বেতন প্রদান করেন, তেমনি দেবতাদের মাধ্যমে শিব ফল প্রদান করেন। কিন্তু বেদমার্গে চলমান ব্যক্তির মোক্ষলাভে কেবল মহেশ্বরই কারণ হন ; সেখানে অন্য কোনো দেবতার মধ্যস্থতার প্রয়োজন হয় না ॥ ১৩ ॥
বেদমার্গের মধ্যেও কর্মখণ্ডের অধিষ্ঠাতা শিব জ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধা জাগিয়ে মানুষকে মোক্ষের নিকট পৌঁছে দেন এবং জ্ঞানখণ্ডের অধিষ্ঠাতা তিনিই জ্ঞানের মাধ্যমে প্রত্যক্ষভাবে মোক্ষ প্রদান করেন ॥ ১৪ ॥
কারণ মোক্ষ একরূপ, তাই তাকে বিষয় করে যে প্রমাণজ্ঞান, সেটিও একরূপ হওয়া উচিত। (যেমন ঘট বা পাত্রকে জানার জ্ঞানও ঘটরূপই হয়।) এই একরূপ জ্ঞান কেবল বেদান্তই উৎপন্ন করে। অন্য পথগুলি বিভিন্ন প্রকার জ্ঞানের উৎপাদক। অতএব অন্যান্য মত থেকে উৎপন্ন জ্ঞান প্রকৃতপক্ষে অবিদ্যা, বিদ্যা নয় — এটিই সঠিক সিদ্ধান্ত ॥ ১৫–১৭ ॥
এই কারণে মোক্ষ ব্যতীত অন্যান্য বিষয়ে অন্যান্য পথের সফলতা ও প্রামাণ্য স্বীকৃত। কিন্তু মোক্ষের ক্ষেত্রে তাদের প্রামাণ্য কেবল ক্রমান্বয়িক বা পরোক্ষ ॥ ১৮ ॥
অতএব উপনিষদে প্রতিপাদিত মহাদেবই দ্রুত মোক্ষদাতা। তিনি অন্যান্য পথের মাধ্যমে সরাসরি মোক্ষ দেন না ; ক্রমে দেন। এটাই শ্রুতি-সমর্থিত সিদ্ধান্ত ॥ ১৯–২০ ॥
সুতরাং যে ব্যক্তি বেদমার্গে প্রতিষ্ঠিত, তার কখনো অন্য পথ অবলম্বন করা উচিত নয়। যারা কেবল বেদমার্গে অবিচল থাকে, তাদের জন্য কিছুই দুর্লভ নয় ॥ ২১ ॥
এই পথেই পরম মোক্ষ লাভ হয় এবং এই পথ অনুসরণ করেই প্রচুর ভোগও লাভ করা যায়। অন্য পথগুলি অন্য যোগ্যতার অধিকারীদের জন্য অবশ্যই প্রামাণিক ; কিন্তু উৎকৃষ্ট পথ ত্যাগ করে অধম পথে চলা মূর্খতা ॥ ২২ ॥
একইভাবে ঈশ্বরস্বরূপ, বন্ধনের কারণ, জগতের কারণ, মোক্ষ ও তার সাধন, জ্ঞান এবং অন্যান্য বিষয়ে যে সব অন্য পথ উপনিষদবিরোধী মত প্রকাশ করে — সেগুলিও মহামোহে আচ্ছন্ন অল্পবুদ্ধি লোকদের বোঝানোর উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে। প্রকৃত অর্থে সেই সমস্ত মতই পরম সত্য — এমন অভিপ্রায় ঐ শাস্ত্রগুলিরও নয় ॥ ২৩–২৪ ॥
যেমন দৌড়ে চলা একটি গরুকে ধরার জন্য তাকে ঘাস দেখাতে হয়, তেমনই জীবরূপ পশুদেরও প্রথমে তুচ্ছ ইষ্টবস্তু (কাম্য বস্তু) দেখিয়ে মহাদেব তাদের নিজের নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং পরে ধীরে ধীরে তাদের পরম সত্যের উপলব্ধি করিয়ে দেন ॥ ২৫–২৬ ॥
অতএব, উল্লিখিত প্রকারে শিবপ্রদত্ত এই সমস্ত পথই প্রমাণস্বরূপ ; অপ্রমাণ নয়। শিব কীভাবে মিথ্যাবাদী হতে পারেন ? ॥ ২৭ ॥
তিনি তো মহাকারুণিক, সর্বজ্ঞ এবং নির্দোষ দেব ; তাঁর দ্বারা ভুল হওয়া সম্ভব নয়। তবে সব পথ প্রমাণ হলেও ভোগ ও মোক্ষ — উভয়েরই সিদ্ধি সাধনকারী উৎকৃষ্ট পথ হলো বেদ ; তার তুলনায় অন্যান্য পথ অপেক্ষাকৃত নিকৃষ্ট ॥ ২৮ ॥
এইভাবে আমি পথগুলির প্রামাণিকতার বিষয়ে সিদ্ধান্ত স্পষ্ট করে বললাম। এটি বুঝে তোমরা যত্নসহকারে শ্রুতির (বেদের) প্রতি শ্রদ্ধাশীল হও ॥ ২৯ ॥
____________________________________________________________________________________________
🚩 তথ্য সংগ্রহকারী ও অনুবাদক : শিবালয় প্রতিষ্ঠাতা শিবদ্বারাধীশাধ্যক্ষ দেশিক আচার্যপরমাধিকারী শ্রীশ্রীগুরু নন্দীনাথ শৈব আচার্যদেব 🚩
©️ কপিরাইট ও প্রচারে : Shivalaya 🔥
শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্ 🚩
ॐ নমঃ পার্বতীপতয়ে হর হর মহাদেব 🚩
#সনাতনধর্ম #শিবালয় #shiva #শিব #পরমেশ্বরশিব #Shivalaya #শৈবধর্ম #শিবশাসন #বেদমন্ত্র #বিশ্বরূপ #বিরূপাক্ষ #তৈত্তিরীয়আরণ্যক

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন