পরমেশ্বর সদাশিব — ত্রিদেবের সৃষ্টিকর্তা

 



আমরা দেখে নেবো.... ত্রিদেবের উৎপত্তির বিষয়ে শিবমহাপুরাণের বচন ।

♦️ প্রমাণ — ১ ( শিমহাপুরাণ থেকে)♦️

॥ শিবউবাচ ॥

যুবাং প্রসূতৌ প্রকৃতের্মদীয়ায়া মহাবলৌ
সব্যাপসব্যগাত্রাভ্যাং মম সর্বৈশ্বরস্য হি॥১৬
অয়ং মে দক্ষিণাৎপার্শ্বাদ্ ব্রহ্মা লোকপিতামহঃ।
বামপার্শ্বাদ্ বিষ্ণুস্ত্বং সমুৎপন্নঃ পরমাত্মনঃ॥১৭

 (শিবমহাপুরাণ/রুদ্রসংহিতা/সৃষ্টিখণ্ড/৯ অধ্যায়)

অর্থ : পরমেশ্বর শিব বললেন - আমি সকলের ঈশ্বর, তোমরা দুজন(ব্রহ্মা ও বিষ্ণু) জন্ম হয়েছ আমার স্বরূপভূত (শক্তি দেবীর) প্রকৃতির অংশ থেকে। ব্রহ্মা ও বিষ্ণু উভয়েই আমি পরমপুরুষ সদাশিবের ডান-বাম অঙ্গ হতে উদ্ভব হয়েছে।

শিবপুরাণ অনুসারে, ব্রহ্মা বিষ্ণুর উৎপত্তি পরমেশ্বর সদাশিবের থেকে হয়েছে।
আদ্যাশক্তি হলেন পরমেশ্বর সদাশিবের পরমাপ্রকৃতি স্বরূপ বামভাগ। পরমেশ্বরের এই বামভাগের প্রকৃতি থেকেই বিষ্ণুর আগমন, তিনিই নারায়ণ নামে অভিহিত হন।

এবার দেখুন ভগবান রুদ্রের বিষয়ে প্রভু পরমেশ্বর সদাশিব ব্রহ্মাকে বলছেন -

মদ্রুপং পরমং ব্রহ্মন্নীদৃশং ভবদঙ্গতঃ।
প্রকটীভবিতা লোকে নাম্না রুদ্রঃ প্রকীর্তিতঃ ॥৩০

[তথ্যসূত্র : শিবমহাপুরাণ/রুদ্রসংহিতা/সৃষ্টিখণ্ড/অধ্যায়৯]

সরলার্থ : হে ব্ৰহ্মা! আমার এমন পরম অংশস্বরূপ তোমার শরীর থেকে ইহলোকে প্রদর্শিত হবে, যাকে 'রুদ্র' বলা হবে।

সুতরাং এখানে প্রমাণিত হচ্ছে যে পরমেশ্বর শিব ব্রহ্মা কে বলছেন তাঁর একটি অংশস্বরূপ পিতামহ ব্রহ্মার শরীর থেকে সম্ভূত হবে, যার নাম 'রুদ্র' হবে । 

আরো একটি প্রমাণ দেখুন শিবমহাপুরাণ থেকে👇

বামাঙ্গজো মম হরির্দক্ষিণাঙ্গোদ্ভবো বিধিঃ ॥৫৬
মহাপ্রলয়কৃদ্ রুদ্রো বিশ্বাত্মা হৃদয়োদ্ভবঃ ।
ত্রিধা ভিন্নো হ্যহং বিষ্ণো ব্রহ্মবিষ্ণুভবাখ্যয়া ॥৫৭
সর্গরক্ষালয়করস্ত্রিগুণৈ রজ আদিভিঃ ।
গুণভিন্নঃ শিবঃ সাক্ষাৎ প্রকৃতে পুরুষাৎপরঃ ॥৫৮
পরং ব্রহ্মাদ্বয়ো নিত্যোঽনন্তঃ পূর্ণো নিরঞ্জনঃ ।
অন্তস্তমো বহিঃসত্ত্বস্ত্রিজগৎপালকো হরিঃ ॥৫৯
অন্তঃ সত্ত্বস্তমোবাহ্যস্ত্রিজগল্লয়কৃদ্ধরঃ ॥৬০
অন্তর্বহীরজশ্চৈব স্ত্রী জগৎ সৃষ্টিকৃদ্বিধিঃ ।
এবং  গুণাস্ত্রিদেবেষু গুণভিন্নঃ শিবঃ স্মৃতঃ ॥৬১
[তথ্যসূত্র : শিবমহাপুরাণ/রুদ্রসংহিতা/সৃষ্টিখণ্ড/অধ্যায় ৯]

অর্থ — পরমেশ্বর সদাশিব বললেন, শ্রী হরি আমার বাম অঙ্গ থেকে প্রকট হয়েছেন, ব্রহ্মা আমার ডান অঙ্গ থেকে উৎপন্ন হয়েছেন, আর মহাপ্রলয়কারী বিশ্বাত্মা রুদ্র আমার হৃদয় থেকে প্রাদুর্ভূত হয়েছেন. হে বিষ্ণু ! আমি ব্রহ্মা-বিষ্ণু এবং ভব(রুদ্র) নাম দ্বারা তিন রূপে বিভক্ত হয়েছি। আমি রজ আদি তিন গুণের দ্বারা সৃষ্টি, পালন তথা সংহার করি ।
 আমি শিব এই জাগতিক মায়ার গুণ(-এর প্রভাব) থেকে ভিন্ন (তথা মুক্ত) , আর আমি প্রকৃতি তথা পুরুষের‌ও ঊর্ধ্বে। আমি অদ্বিতীয়(অর্থাৎ একমাত্র),নিত্য, অনন্ত, পূর্ণ এবং নিরঞ্জন পরব্রহ্ম।
ত্রিলোকের পালনকারী শ্রীহরি - ভেতরে তমোগুণ আর বাইরে সত্ত্বগুণ ধারণ করে থাকেন।
ত্রিলোকের সংহারকারী  রুদ্রদেব ভেতরে সত্ত্বগুণ আর বাইরে তমোগুণ ধারণ করে থাকেন । 
ত্রিজগত কে সৃষ্টিকারী ব্রহ্মাজী বাইরে এবং ভেতরে উভয় দিকেই রজোগুণী সম্পন্ন। 
এইভাবে ব্রহ্মা-বিষ্ণু তথা রুদ্র এই তিন দেবতায় গুণ রয়েছে ।
কিন্তু সাক্ষাৎ পরমেশ্বর শিব কে গুণের ঊর্ধ্বে গুণাতীত বলে জানা উচিত ॥ ৫৬-৬১


♦️ প্রমাণ — ২ (স্কন্দপুরাণ থেকে)♦️

স্কন্দপুরাণের সূতসংহিতার যজ্ঞবৈভবখণ্ডের উপরিভাগের অন্তর্গত সূতগীতার ২য় অধ্যায়ের ১৫নং শ্লোক থেকে ৫০নং শ্লোকে বলা হয়েছে 👇

অর্থ — ত্রিমূর্তি অর্থাৎ ত্রিদেব(ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও রুদ্রদেব)-এর মধ্যে রুদ্রদেব হলেন তিনি, যার উপাধিগত বিশেষত্ব মূলত সত্ত্বগুণ , অর্থাৎ রুদ্রদেবের দিব্যদেহ সাত্ত্বিক, কিন্তু সংহারের কারণে তিনি তমোগুণকে ধারণ করেন মাত্র ॥১৫
কিন্তু যার নিজের শরীর স্বয়ং তমোগুণসম্পন্ন কিন্তু পালন করবার প্রয়োজনের কারণে সত্ত্বগুণ গ্রহণ করেন , ত্রিমূর্তির মধ্যে তিনি হলেন শ্রীবিষ্ণু ॥১৬
রজোগুণ যার শরীর তো বটেই বরং উৎপত্ত্যর্থ (সৃষ্টি করবার জন্য) -এর কারণেও রজোগুণ ধারণ করেন, তিনি হলেন ব্রহ্মা ॥১৭
ভোগ তথা মোক্ষ প্রদান করবার কারণে রুদ্রদেবের শরীর শুক্ল অর্থাৎ শ্বেত বর্ণ, বিষ্ণু হল কৃষ্ণবর্ণ আর ব্রহ্মা লাল বর্ণের — এভাবেই তাদেরকে স্মরণ করে ধ্যান করা উচিত ॥১৮ 
সত্ত্বগুণ থেকে শুক্ল অর্থাৎ শ্বেত বর্ণ উৎপন্ন হয়, রজোগুণ থেকে লালবর্ণ উৎপন্ন হয় আর তমোগুণ থেকে কৃষ্ণ/কালো বর্ণ হয় ॥১৯
বেদ শাস্ত্রে কোথাও কোথাও ব্রহ্মা বা বিষ্ণুকে পরমেশ্বর বলা হয়েছে কিন্তু সেটি তাদের ঔপাধিক রূপের দৃষ্টি তে নয় বরং তাদের অন্তরস্থ পরতত্ত্বকে বস্তুতঃ পরমেশ্বর বলা হয়েছে এই দৃষ্টিতে ॥২০-২১
কেবলমাত্র ব্রহ্মা-বিষ্ণু আদি উপাধি প্রধান রূপে তো মূলত ব্রহ্মা আদি দেবতা ই , পরমেশ্বর নয় ॥২২
কিন্তু উপাধিপ্রাধান্য দৃষ্টিতেও রুদ্রদেব সব থেকে উৎকৃষ্ট, কারণ উত্তম সত্ত্বগুণ কে একমাত্র তিনিই শরীররূপে গ্রহণ করেছেন ॥২৩
রজ এবং তম গুণের থেকে সত্ত্বগুণ শ্রেষ্ঠ, পর তথা অপর, সুখ তথা জ্ঞান সত্ত্বগুণ থেকেই প্রাপ্ত হয়ে থাকে ॥২৪
পরত্বের প্রকাশ রুদ্রদেবের মধ্যেই সর্বাধিক , ব্রহ্মা বা বিষ্ণু আদি দেবতার মধ্যে সেই সত্ত্বগুণের প্রকাশ তেমনটা নেই ॥২৫
রুদ্রদেব সর্বদাই নিজের পরতত্ত্বতা ই মানেন, এই বিষয়টি কখনোই ভুলে যান না। কিন্তু অন্য দেবতারা প্রায়শই নিজের ঔপাধিকরূপ কেই নিজে স্বয়ং বলে মানতে থাকেন। সেই হরি বা ব্রহ্মা‌ উভয়েই স্বয়ং কেই মানতে থাকেন, বাস্তবিক অর্থেও নিজের পরতত্ত্বতার প্রতি সজাগ থাকেন না, কিন্তু তারাও রুদ্রদেব কে পরতত্ত্ব রূপ‌ই মানেন, নিজেদের মতো ভাবেন না ॥২৬-২৭
কখনো কখনো সংহার আদি কার্যের জন্য রুদ্রদেব নিজেকে স্বয়ং ঔপাধিক রুদ্ররূপে ভেবে নেন, কিন্তু মুখ্যতঃ তিনি নিজেকে পরতত্ত্ব হিসেবে অবশ্যই অবগত থাকেন ॥২৮
ব্রহ্মা আদি দেবতারাও বিচার বিবেচনার দশাতে নিজের পরতত্ত্বতার নিশ্চয়কারী হয়ে যান, কিন্তু মুখ্যতঃ তাদের ঔপাধিক অভিমান এর সাথে বজায় থাকে। রুদ্রদেবের স্থিতি এনাদের চেয়ে বিপরীত — মুখ্যতঃ রুদ্রদেবের নিরূপাধিক প্রকাশ ই থাকে। প্রয়োজনে কখনো কখনো ঔপাধিক অভিমানী হন মাত্র । রুদ্রদেবের  তত্ত্বনিষ্ঠা স্বাভাবিক ই, হরি-ব্রহ্মার ঔপাধিক স্থিতি স্বাভাবিক ॥২৯-৩১
যে সমস্ত ব্যক্তিরা যথাশক্তি হরি ব্রহ্মা আদি দেবতাদের পূজা করে থাকে সে সমস্ত ব্যক্তিদের শীঘ্রই মোক্ষ লাভ হয় না , ধীরগতিতে ক্রমে ক্রমে শিবকৃপাপ্রাপ্তি হবার পর‌ই মোক্ষ লাভ হয় ॥৩২
যে ব্যক্তি যথাশক্তি রুদ্রদেবের পূজার্চনা করেন সেই ব্যক্তির অতি শীঘ্রই মোক্ষ লাভ হয়ে যায়, কারণ সেক্ষেত্রে কোনো ক্রমের আবশ্যকতা থাকে না ॥৩৩
রুদ্ররূপ এর দ্বারা রুদ্রদেব অন্য দেবতাদের চেয়ে বরিষ্ঠ — বড় — এইরকম ভাবনা নিশ্চিত ভাবেই মোক্ষদায়ক ॥৩৪
গুণ‌উপাধির মধ্যে অভিমানসম্পন্ন শ্রীবিষ্ণু আদি দেবতা রুদ্রদেবের থেকে বরিষ্ঠ(শ্রেষ্ঠ) — এমন ভাবনা করাটাই সংসারচক্রে আবদ্ধ হয়ে মোক্ষলাভ করতে অক্ষম হবার মূল কারণ হয় ॥৩৫
রুদ্রদেব, বিষ্ণু, পিতামহ ব্রহ্মার মধ্যে কাউকেই সাক্ষাৎ পরতত্ত্বের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ভেবে নেওয়াটাই সংসারে আবদ্ধ হবার কারণ , রুদ্রদেব, বিষ্ণু, ব্রহ্মা, স্বরাট্, সম্রাট, ইন্দ্র আদি সবাই আভ্যন্তরীণভাবে শিবরূপের দৃষ্টিকোণে সকলে এক ও অদ্বিতীয় পরতত্ত্ব , এরকম ভাবনা করলে অবশ্যই মোক্ষ প্রাপ্তি হয় ॥৩৬-৩৭
মন্ত্রীর মধ্যে রাজদৃষ্টি করলে দোষ নয় বরং মন্ত্রী প্রসন্নতা দ্বারা ফল প্রাপ্তির হেতু হয় । অতঃ সর্বত্র ব্রহ্ম(শিব)দৃষ্টি করা মুখ্য ভাবনা হওয়া উচিত, ইহা নিঃসন্দিগ্ধ ॥৩৮
তথাপি রুদ্রদেবের মধ্যে পরতত্ত্বদৃষ্টি সরলভাবে ই হয়ে যায় , কারণ - সত্ত্বময় হবার কারণে তার মধ্যে পরতত্ত্বের স্ফুর্তি প্রবাহমান থাকে । অন্যত্র সেই রকম দৃষ্টি হতে পারে না কারণ অসাত্ত্বিক হবার কারণে পরতত্ত্বের সেইরকম স্ফুর্তি তাদের মধ্যে হয় না ॥৩৯
রুদ্রদেবের “আন্তরিকতা-উপাধিশরীর” সত্ত্বগুণ যুক্ত আর তমগুণ এনার স্বরূপশরীর থেকে বহির্ভূত তথা পৃথকভাবে স্থিত । বিষ্ণু দেবের আন্তরিকতা তমগুণযুক্ত, সত্ত্বগুণ তার শরীর থেকে পৃথক হয়ে বহির্ভূত ভাবে স্থিত।
ব্রহ্মার আন্তরিকতা রজঃ আর সেই রজগুণ তার স্বরূপ থেকে বহির্ভূত হয়েও স্থিত । সত্ত্বগুণের সাথে ব্রহ্মার কোন সম্বন্ধ নেই । রুদ্রদেব ও শ্রীবিষ্ণুর মধ্যে সত্ত্বগুণের সহিত সম্বন্ধ হল — একজনের আন্তরিক আর আরেকজনের বহির্ভূত । অতঃ সত্ত্বগুণের দৃষ্টি কে নিয়ে  সাধারণ জীবেরা বিবাদ করে বলতে থাকে যে হরি শ্রেষ্ঠ নাকি হর ? ।
অহো ! মোহশক্তির  উপর ! আশ্চর্য হচ্ছি ! কতটা ক্ষমতা মোহশক্তির... !
আন্তরিক সত্ত্বগুণযুক্ত রুদ্রদেবের শ্রেষ্ঠতা নির্বিবাদ হবার পরেও, বাহ্যিক সত্ত্বগুণ যুক্ত বিষ্ণুকে দেখে জীবেরা ভ্রমে পড়ে যায় । সত্ত্ব-অসংবদ্ধ হবার কারণে ব্রহ্মা কে তো বরিষ্ঠ মানা যায় না ॥৪০-৪২
অনেক বার জন্ম গ্রহণ করে শ্রৌত-স্মার্ত ধর্ম অনুষ্ঠান
করে বুদ্ধি শুদ্ধ হয়ে যায় যে সমস্ত ব্যক্তিদের, একমাত্র তাদের‌ই মনে এই নিশ্চয় হতে পারে যে হরির থেকে হর শ্রেষ্ঠ ॥৪৩
মহাপাপ যুক্ত লোকেদের হরের থেকে হরিকে শ্রেষ্ঠ মনে হয়ে থাকে ॥৪৪
নির্বিকল্প পরমতত্ত্বতে যার শ্রদ্ধা হয়, তিনি বিনা প্রয়াস করেই মোক্ষ পেয়ে যান ॥৪৫
নির্বিকল্প পরম তত্ত্ব হলেন স্বয়ং প্রভু শিব , তিনি নিজের লীলাবিগ্রহ তে সাম্ব(অম্বা সহিত), ত্রিলোচন, চন্দ্রমৌলি রূপধারী ॥৪৬
নিজ আত্মরূপ, সুখাভিন্ন, স্ফুর্তিলক্ষণ প্রমোদ দ্বারা তিনিই তাণ্ডব প্রিয়, রুদ্রাদি গুণোপাধি মূর্তির‌ও তিনি(শিব‌ই) উপাস্য ॥৪৭
এরকম পরমমূর্তি যার তিনিই সাক্ষাৎ পরমতত্ত্ব, অন্য কেউ নয় ॥৪৮
ব্রহ্মাদি কে পরতত্ত্ব ভাবা মূলত অজ্ঞান, তাই এমন অজ্ঞানতার বিষয় ভাবতে থাকা ব্যক্তি কখনোই মুক্তি লাভ করতে পারে না ॥৪৯
অতঃ শিব , যার সাম্ব আদি মূর্তি (অম্বিকা সহিত সদাশিব) বিশেষ রয়েছে তিনিই সচ্চিদানন্দরূপ সাক্ষাৎ পরমতত্ত্ব, অন্য কেউ নয় ॥৫০

সুতরাং, ভগবান বিষ্ণুই যে মূলত তমোগুণসম্পন্ন তা প্রমাণিত হল।
ত্রিদেবের মধ্যে থাকা রুদ্র/মহেশ হল প্রকৃতপক্ষে সত্ত্বগুণসম্পন্ন।

এবার বৈষ্ণবদের প্রাণপ্রিয় সাত্ত্বিক পদ্মপুরাণ থেকেই দেখাবো - পরমেশ্বর সদাশিব কে ? ভগবান রুদ্র(ত্রিদেবের অন্তর্গত মহেশ) ? বিষ্ণু কে ? আর ব্রহ্মা কে ?

♦️ প্রমাণ — ৩ ( পদ্মপুরাণ থেকে)♦️

পদ্মপুরাণ থেকে ত্রিদেবের পিতা সদাশিবের বৈশিষ্ট্য, লক্ষণ ও পরিচয় 👇 

'যএকঃ শাশ্বতোদেবোব্রহ্মবন্দ্যঃ সদাশিবঃ ।

ত্রিলোচনোগুণাধারো গুণাতীতোহক্ষরোব্যয়ঃ ॥৩ 

পৃথকৃত্বাত্মনস্তাততত্র স্থানং বিভজ্য চ । 

দক্ষিণাঙ্গে সৃজাৎপুত্রং ব্রহ্মাণাং বামতো হরিম্ ॥৫ 

 পৃষ্ঠদেশে মহেশানংত্রীপুত্রান্ সৃজিদ্বিভুঃ ।

জাতমাত্রাস্ত্রয়োদেবা ব্রহ্মাবিষ্ণুমহেশ্বরাঃ ॥৬

(তথ্যসূত্র -  চৌখাম্বা প্রকাশিত "পদ্মপুরাণ/ পাতালখণ্ড/১০৮ নং অধ্যায়")

অর্থ - সেই এক সদাশিবই শাশ্বত, ব্রহ্মা দ্বারা অৰ্চিত, ত্রিলোচন, ত্রিগুণধারী, ত্রিগুণাতীত, অক্ষর (অক্ষর ব্রহ্মস্বরূপ) এবং অব্যয়(নিরাকার পরমশিব)। তিনি নিজ ইচ্ছায় নিজেকে তিনভাগে বিভক্ত করেন। তিনি তাঁর দক্ষিণ(ডান)ভাগ থেকে পুত্রস্বরূপ ব্রহ্মাকে, বামভাগ থেকে শ্রীহরিকে এবং পৃষ্ঠদেশ থেকে মহেশ্বরকে (অর্থাৎ রুদ্র) সৃষ্টি করেন। এই ভাবে সদাশিবের তিনপুত্র ব্রহ্মা বিষ্ণু ও মহেশ্বর ত্রিদেব হিসেবে পরিচিতি পায়। [ তাই সদাশিবকে ত্রিদেবজনক বলা হয়]


 ভালো করে লক্ষ্য করে দেখুন, এখানে পরমেশ্বর সদাশিবকে এক ও অদ্বিতীয় পরমেশ্বর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই প্রভু সদাশিব ই ত্রিদেবকে প্রকট করেন, সেই ত্রিদেবের অন্তর্গত বিষ্ণু অর্থাৎ হরি এবং ত্রিদেবের মধ্যে থাকা হর বা রুদ্র/মহেশ , উভয়েই গুণযুক্ত সত্ত্বা। 



যোহসৃজদ্দক্ষিণাদঙ্গাদ ব্রাহ্মণং লোকসম্ভবম্।

বামপার্শ্বাত্তথা বিষ্ণুং লোকরক্ষার্থমীশ্বরঃ ॥৩৪৫৷৷

[মহাভারত- অনুশাসনপর্ব/অধ্যায় ১৩/৩৪৫ নং শ্লোক]

✅ অর্থ — যে ঈশ্বর (মহাদেব) দক্ষিণপার্শ্ব হতে জগতের সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মাকে সৃষ্টি করেছেন এবং লোকরক্ষার জন্য বামপার্শ্ব হতে বিষ্ণুকে উৎপাদন করেছেন ॥৩৪৫৷৷


🔵 আরও বলা আছে যে, ত্রিদেবরূপ সাক্ষাৎ পরমেশ্বর শিব ধারণ করেন—


ব্রহ্মশিরোপহর্তাষ মহিষঘ্নায় বৈ নমঃ।

নমস্ত্রিরূপধরায় সর্ব্বরূপধরায় চ ॥৩১১।।

[মহাভারত/অনুশাসনপর্ব/অধ্যায় ১৩/৩১১ নং শ্লোক]

✅ অর্থ — আপনি ব্রহ্মার শিরশ্ছেদ ও দুর্গার রূপ ধারণ করে মহিষাসুরকে বধ করেছিলেন, আপনি ত্রিদেব - ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও রুদ্রের রূপ ধারণ করেন এবং সকলের রূপই ধারণ করিয়া থাকেন আপনাকে নমস্কার ॥৩১১৷।

---------------------------------------------------------------------------------------------------


বেদের ভস্মজাবাল উপনিষদে পরমেশ্বর শিবকে ত্রিদেবের জন্মদাতা এবং ত্রিদেবের চেয়েও শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে, অদ্বৈত বলা হয়েছে। শিব থেকে স্বতন্ত্র অন্য কোনো ব্রহ্ম নেই, নিরাকার ব্রহ্মের একটি অনিত্যরূপ নন শিব। শিব স্বয়ং পরমব্রহ্ম, ব্রহ্ম শব্দে শিবকেই ইঙ্গিত করা হয়ে থাকে, একথার প্রমাণ স্বয়ং বেদ‌ই দিয়েছে, দেখুন 👇 

বৃষভারূঢ়ং হিরণ্যবাহুং হিরণ্যবর্ণং হিরণ্যরূপং পশুপাশবিমোচকং পুরুষং কৃষ্ণপিঙ্গলং ঊর্ধ্বরেতং বিরূপাক্ষং বিশ্বরূপং সহস্রাক্ষং সহস্রশীর্ষং সহস্রচরণং বিশ্বতোবাহুং বিশ্বাত্মানং একং অদ্বৈতং নিষ্কলং নিষ্ক্রিয়ং শান্তং শিবং অক্ষরং অব্যয়ং হরি-হর-হিরণ্যগর্ভ-স্রষ্টারং অপ্রমেয়ং অনাদ্যন্তং রুদ্রসূক্তৈরভিষিচ্য সিতেন ভস্মনা শ্রীফল দলৈশ্চ ত্রিশাখৈরার্দ্রৈর-নার্দ্রৈর্বা ॥  

[তথ্যসূত্র : অথর্ববেদ/ভস্মজাবাল উপনিষদ/২/৭]

অর্থ — যিনি বৃষভ নন্দীকে বাহন বানিয়ে তার উপর আরূঢ় হন, যার বাহু হিরণ্য অর্থাৎ স্বর্ণালী বর্ণের ন্যায় উজ্জ্বল, দিব্যদেহ স্বর্ণালী বর্ণের ন্যায় উজ্জ্বল, যার রূপ মাধুর্য স্বর্ণালী বর্ণের ন্যায়, যিনি জীবরূপী সকল পশুর পাশরূপী বন্ধন কে মোচন করেন, যিনি স্বয়ং ব্রহ্মপুরুষ, কৃষ্ণপিঙ্গলরূপী অর্ধনারীশ্বর হিসেবে এক‌ই দেহে শক্তিদেবী উমা কে ধারণ করেন, যিনি ঊর্ধ্বরেতরূপে দেহের অভ্যন্তরের ঊর্ধ্বে সহস্রারচক্রে সকল শক্তির উৎস স্থিত, যার অসাধারণ বিরূপ ত্রিনেত্র রয়েছে, বিশ্বের সকল রূপ যার, চারিদিকে যার হাজার হাজার নেত্র রয়েছে, হাজার হাজার মস্তক রয়েছে, হাজার হাজার চরণ রয়েছে, যার বিশ্বের সকল দিকে হস্ত রয়েছে, যিনি বিশ্বের সকলের আত্মা, যিনি এক ও অদ্বিতীয় সত্ত্বা, যিনি সমস্ত কলার অতীত হিসেবে নিরাকার সত্ত্বা, যিনি সকল কিছুর স্রষ্টা ও পরিচালনাকারী হয়েও হয়েও নিজে নিষ্ক্রিয়ভাবে স্থিত তথা শান্ত রূপে সমস্তদিকে সমানভাবে শান্ত তথা স্থির, সেই প্রভু হলেন স্বয়ং শিব, এই প্রভুই অক্ষরব্রহ্ম ॐ-কার, এই প্রভুই অব্যয় অর্থাৎ বিনাশহীন, এই প্রভু শিব(সদাশিব)ই ত্রিদেবরূপী হরি(বিষ্ণু), হর(কৈলাসপতি রুদ্র) ও হিরণ্যগর্ভ(ব্রহ্মা)-র সৃজন কর্তা, তিনি অপ্রমেয়রূপে অসীম, তিনি অনাদি, তার অন্ত নেই, রুদ্রসূক্ত (শতরুদ্রিয়) পাঠপূর্বক তার (দুধ তথা জল দ্বারা) স্নান-অভিষেক করা হয়, ভস্ম প্রদান করা হয়, শ্রীফল রূপী বেলগাছের বেলফল ও ত্রিশাখাযুক্ত ভেজা বা শুকনো বেলপাতা প্রভৃতি সহ (ধুতরা প্রভৃতি বন্য)ফুল তাকে অর্পন করা হয়  (আমি সেই প্রভু শিবের ধ্যানে মগ্ন) ।


 ত্রিদেব নাশ হয়ে গেলেও একজন‌ই তখন‌ও বর্তমান থাকেন, ভস্মজাবাল উপনিষদের বেদমন্ত্রে সেই ত্রিদেব (ব্রহ্মা-বিষ্ণু-কালরুদ্র) -এর চেয়েও ঊর্ধ্বে থাকা অদ্বিতীয় পরমব্রহ্ম শিবের কথা স্পষ্ট ভাবে ঘোষণা করা আছে। প্রমাণ দেখুন 👇 

কৈলাসশিখরাবাসমোঙ্কারস্বরূপিণং মহাদেবং উমার্ধকৃতশেখরং সোমসূর্যাগ্নিনয়ন মনন্তেন্দুরবিপ্রভং ব্যাঘ্রচর্মাম্বরং মৃগহস্তং ভস্মোদ্ধূলিতবিগ্রহং তির্যক্ ত্রিপুণ্ড্ররেখা বিরাজমানভালপ্রদেশং স্মিতসম্পূর্ণ পঞ্চবিধ পঞ্চাননং বীরাসনারূঢ়মপ্রমেয়মনাদ্যনন্তং নিষ্কলং নির্গুণং শান্তং নিরঞ্জনমনাময়ং হুং ফট্ কুর্বাণং শিব নাম অন্যনিশমুচ্চরন্তং হিরণ্যবাহুং হিরণ্যরূপং হিরণ্যবর্ণং হিরণ্য নিধিং অদ্বৈতং চতুর্থং ব্রহ্মবিষ্ণুরুদ্রাতীতমেকমাশাস্যং ভগবন্তং শিবং প্রণম্য মুহুর্মুহুরভ্যর্চ্য শ্রীফলদলৈস্তেন ভস্মনা চ নতোত্তমাঙ্গঃ কৃতাঞ্জলিপুটঃ

[অথর্ববেদ/ভস্ম জাবাল উপনিষদ /১/১]

অর্থ —  যিনি ব্যাঘ্রচর্ম পরিধান করেন, মৃগমুদ্রা হস্তে ধারণ করেন, সমগ্র দেহে ভস্ম মেখে থাকেন, যিনি কপালে ত্রিপুণ্ড্র তিলন ধারণ করেন, স্মিতহাস্যে পাঁচটিমুখ সম্পন্ন তিনি বীরাসনে বসেন, তিনিই নিষ্কল(নিরাকার পরমশিব) নির্গুণ(সকল মায়ার অতীত), শান্ত, তিনিই নিরঞ্জন। হুং ফট্ ইত্যাদি বলে শিব নাম অহর্নিশি উচ্চারণ করে সেই হিরণ্যবর্ণরূপী, হিরণ্যবাহু, হিরণ্যরূপ যার সেই প্রভুই অদ্বিতীয়, তিনিই জাগ্রত-স্বপ্ন-সুষুপ্তির ঊর্ধ্বে থাকা চতুর্থপদ সমাধীতে প্রাপ্ত হন যে প্রভু, যিনি নারায়ণ, ব্রহ্মা ও কালরুদ্র — এই ত্রিদেবের‌ও অতীত হলেন ভগবান শিব, সেই প্রভুকে প্রণাম করে বারংবার অর্চনাপূর্বক বেলফল ও বেলপত্র তথা ভস্ম দিয়ে তার কাছে বারবার নত মস্তকে কৃতাঞ্জলিপুটে নিজেকে সমর্পণ করছি।


দেখুন — ত্রিদেবের স্রষ্ঠা ও তাদের ঊর্ধ্বে থাকা প্রভু শিব‌ই  অদ্বিতীয় পরমব্রহ্ম বলেই বেদ দ্বারাই প্রমাণিত হল। শিব‌‌ই একমাত্র অদ্বৈত ব্রহ্ম, অন্য কোনো দেবতা ব্রহ্ম নন। বেদের মধ্যে থাকা অদ্বৈত দর্শনকেই একমাত্র শৈব পরমাদ্বৈত অদ্বৈতবাদ বলে, যা শৈবাগম শাস্ত্রে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। পরম অদ্বৈতবাদ দ্বারা একমাত্র শিব‌ই পরমেশ্বর, বিষ্ণু বা অন্য কেউ নয়।



বেদ বলছে - ব্রহ্মা বিষ্ণুর মৃত্যু হয় । 

প্রমাণ দেখুন 

পরমেষ্ঠ্যপি নিষ্ঠাবান্‌ হীয়তে হরিরপ্যজঃ ।

ভাবোঽপ্যভাবমায়াতি জীর্য‌ন্তে বৈ দিগীশ্বরাঃ ॥ ৫১

ব্রহ্মা বিষ্ণুশ্চ রুদ্রশ্চ সর্বা বা ভূতজাতয়ঃ ।

নাশমেবানুধাবন্তি সলিলানীব বার্ডবম্ ॥ ৫২

[তথ্যসূত্র : মহ উপনিষদ/৩য় অধ্যায়/৫১-৫২ নং মন্ত্র]

অর্থ — ব্রহ্মাও বিনাশপ্রাপ্ত হন আর অজ বিষ্ণু‌ও মৃত্যুপ্রাপ্ত হন। সমস্ত ভাব অভাবে পরিনত হয়ে যায়, এই ভাবে জাগতিক সকল কিছুই নশ্বর, দিকপালেরাও মৃত্যু প্রাপ্ত হন ॥ ৫১

ব্রহ্মা-বিষ্ণু রুদ্র তথা সকল দেবতা সহ যতরকম জীব আছে সবাই নাশ হবার জন্য ধাবিত হয় সেই প্রকারে যেভাবে জল বাড়বানলের দিকে ধাবিত হয় ॥ ৫২

      — দেখুন বৈষ্ণব গণ ! আপনারা যে মহ উপনিষদের উপর নির্ভর করে নারায়ণকে অজন্মা একমাত্র পরমব্রহ্ম দাবী করেছিলেন, সেই মহ উপনিষদ স্বয়ং নিজেই নারায়ণের মৃত্যু হয় বলে দাবী করেছে। 

তাহলে বলুন যার মৃত্যু হয় সেই জীব তত্ত্ব কি করে পরমব্রহ্ম হবেন ?

এর‌ই সাথে দেখুন ত্রিদেবের‌ও নাশ হয়ে যায় বলে দাবী করেছে মহ উপনিষদ

এখন নিশ্চয়ই ভাবছেন বিষ্ণুকে অজ বলবার পরেও আপনাদের বৈষ্ণবদের‌ই মহ উপনিষদ কেন তার মৃত্যু হয় বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছে। 

প্রকৃত পক্ষে, যেমন ভাবে ব্রহ্মাকে স্বয়ম্ভু বা অজ বলা হয়, বিষ্ণুর ক্ষেত্রেও তেমনভাবেই অজ শব্দটি প্রয়োগ হয়েছে মাত্র, কিন্তু এর অর্থ এমন নয় যে, ব্রহ্মা বিষ্ণু সত্যিই অজন্মা, প্রকৃত পক্ষে অজন্মা শিব‌ই এই ব্রহ্মা বিষ্ণু রূপে ব্যবহারিক জগতে প্রকট হন, তাই শিবদৃষ্টিতে ব্রহ্মা বিষ্ণু কে অজ মাত্র বলা হয়। আর বেদেই ব্রহ্মা বিষ্ণুর জন্ম পরমেশ্বর শিবের থেকে হয় তা বহু মন্ত্রে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত। এই কারণে অজ বলা হলেও নারায়ণ মৃত্যুপ্রাপ্ত হয়ে যান অর্থাৎ নারায়ণ প্রকৃতি তত্ত্ব মাত্র, যার কারণে প্রকৃতিকে অনিত্য বলা হয়। প্রকৃতিরূপী নারায়ণ জগৎ সৃষ্টি করে সেখানে ব্রহ্মা কালরুদ্র উৎপন্ন করেন কল্পভেদে, কিন্তু সাধরণ প্রলয়ে অন্তিমে ব্রহ্মা কালরুদ্র তথা সব কিছু নাশ হলেও পরবর্তী কল্পতে নূতন সৃষ্টি ঘটাবার জন্য প্রকৃতিরূপী নারায়ণ ই অবশিষ্ট থাকেন । তাই মহোপনিষদে বলা হয়েছে সৃষ্টি হবার পূর্বে এক নারায়ণ ছিলেন, তখন ব্রহ্মা, কালরুদ্র ঈশান, চন্দ্র সূর্য কেউ ছিলনা। এখানে কেউ ছিলনা বলতে প্রকৃতির কোনো বিচিত্র বিভিন্ন সত্ত্বার অনুপস্থিতিকে বোঝানো হয়েছে। নারায়ণ সেই যোনীরূপী প্রকৃতি, যেখানে পরশিব কারণরূপী বীজ প্রদান করেন, তারপরেই সেখান থেকে সৃজন হয়।

দেখুন —

রুদ্রাৎপ্রবর্ততে বীজং বীজযোনির্জনার্দনঃ।

যো রুদ্রঃ সস্বয়ং ব্রহ্মা যো ব্রহ্মা স হুতাশনঃ ॥৭॥

(কৃষ্ণ যজুর্বেদ/রুদ্রহৃদয় উপনিষদ/৭নং মন্ত্র)

অর্থ : পরমেশ্বর পরারুদ্র শিব'ই সকল কিছুর উৎপত্তির কারণরূপী বীজ, আর সেই কারণরূপী বীজ বপন করবার জন্য যোনীস্বরূপ হলেন জনার্দন নারায়ণ। আবার যিনি 'মহারুদ্র সদাশিব' তিনি স্বয়ং (সদ্যোজাত রূপে সৃজনকর্তা) ব্রহ্মা, আর যিনি ব্রহ্মা তিনিই হলেন মূলত হুতাশন অগ্নিদেব ॥৭॥

        — উপরোক্ত শ্রুতি প্রমাণ দ্বারা নারায়ণের ঐ একা অবস্থানের অবস্থা প্রকৃতিসত্ত্বা মাত্র হিসেবে পরিচিত হচ্ছে।

 প্রকৃতিরূপী নারায়ণের কার্য যখন সম্পন্ন হবে অর্থাৎ মহাপ্রলয় যখন আসবে তখন শুধু ব্রহ্মা ও কালরুদ্র নয় বরং ঐ প্রকৃতিরূপ নারায়ণের‌ও নাশ হয়ে যাবে , যা মহ উপনিষদের ৩/৫১-৫২ তে বলা হয়েছে ।


এই ত্রিদেব নাশ হয়ে গেলেও একজন‌ই তখন‌ও বর্তমান থাকেন, ভস্মজাবাল উপনিষদের বেদমন্ত্রে সেই ত্রিদেব (ব্রহ্মা-বিষ্ণু-কালরুদ্র) -এর চেয়েও ঊর্ধ্বে থাকা অদ্বিতীয় পরমব্রহ্ম শিবের কথা স্পষ্ট ভাবে ঘোষণা করা আছে। প্রমাণ দেখুন 👇 

কৈলাসশিখরাবাসমোঙ্কারস্বরূপিণং মহাদেবং উমার্ধকৃতশেখরং সোমসূর্যাগ্নিনয়ন মনন্তেন্দুরবিপ্রভং ব্যাঘ্রচর্মাম্বরং মৃগহস্তং ভস্মোদ্ধূলিতবিগ্রহং তির্যক্ ত্রিপুণ্ড্ররেখা বিরাজমানভালপ্রদেশং স্মিতসম্পূর্ণ পঞ্চবিধ পঞ্চাননং বীরাসনারূঢ়মপ্রমেয়মনাদ্যনন্তং নিষ্কলং নির্গুণং শান্তং নিরঞ্জনমনাময়ং হুং ফট্ কুর্বাণং শিব নাম অন্যনিশমুচ্চরন্তং হিরণ্যবাহুং হিরণ্যরূপং হিরণ্যবর্ণং হিরণ্য নিধিং অদ্বৈতং চতুর্থং ব্রহ্মবিষ্ণুরুদ্রাতীতমেকমাশাস্যং ভগবন্তং শিবং প্রণম্য মুহুর্মুহুরভ্যর্চ্য শ্রীফলদলৈস্তেন ভস্মনা চ নতোত্তমাঙ্গঃ কৃতাঞ্জলিপুটঃ

[অথর্ববেদ/ভস্ম জাবাল উপনিষদ /অধ্যায় ১/১ নং মন্ত্র]


অর্থ —  যিনি ব্যাঘ্রচর্ম পরিধান করেন, মৃগমুদ্রা হস্তে ধারণ করেন, সমগ্র দেহে ভস্ম মেখে থাকেন, যিনি কপালে ত্রিপুণ্ড্র তিলন ধারণ করেন, স্মিতহাস্যে পাঁচটিমুখ সম্পন্ন তিনি বীরাসনে বসেন, তিনিই নিষ্কল(নিরাকার পরমশিব) নির্গুণ(সকল মায়ার অতীত), শান্ত, তিনিই নিরঞ্জন। হুং ফট্ ইত্যাদি বলে শিব নাম অহর্নিশি উচ্চারণ করে সেই হিরণ্যবর্ণরূপী, হিরণ্যবাহু, হিরণ্যরূপ যার সেই প্রভুই অদ্বিতীয়, তিনিই জাগ্রত-স্বপ্ন-সুষুপ্তির ঊর্ধ্বে থাকা চতুর্থপদ সমাধীতে প্রাপ্ত হন যে প্রভু, যিনি নারায়ণ, ব্রহ্মা ও কালরুদ্র — এই ত্রিদেবের‌ও অতীত হলেন ভগবান শিব, সেই প্রভুকে প্রণাম করে বারংবার অর্চনাপূর্বক বেলফল ও বেলপত্র তথা ভস্ম দিয়ে তার কাছে বারবার নত মস্তকে কৃতাঞ্জলিপুটে নিজেকে সমর্পণ করছি।


সুতরাং — ত্রিদেবের স্রষ্ঠা ও তাদের ঊর্ধ্বে থাকা প্রভু শিব‌ই  অদ্বিতীয় পরমব্রহ্ম বলেই বেদ দ্বারাই প্রমাণিত হল।


























































মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ