পরমেশ্বর সদাশিব — ত্রিদেবের সৃষ্টিকর্তা
পদ্মপুরাণ থেকে ত্রিদেবের পিতা সদাশিবের বৈশিষ্ট্য, লক্ষণ ও পরিচয় 👇
'যএকঃ শাশ্বতোদেবোব্রহ্মবন্দ্যঃ সদাশিবঃ ।
ত্রিলোচনোগুণাধারো গুণাতীতোহক্ষরোব্যয়ঃ ॥৩
পৃথকৃত্বাত্মনস্তাততত্র স্থানং বিভজ্য চ ।
দক্ষিণাঙ্গে সৃজাৎপুত্রং ব্রহ্মাণাং বামতো হরিম্ ॥৫
পৃষ্ঠদেশে মহেশানংত্রীপুত্রান্ সৃজিদ্বিভুঃ ।
জাতমাত্রাস্ত্রয়োদেবা ব্রহ্মাবিষ্ণুমহেশ্বরাঃ ॥৬”
(তথ্যসূত্র - চৌখাম্বা প্রকাশিত "পদ্মপুরাণ/ পাতালখণ্ড/১০৮ নং অধ্যায়")
অর্থ - সেই এক সদাশিবই শাশ্বত, ব্রহ্মা দ্বারা অৰ্চিত, ত্রিলোচন, ত্রিগুণধারী, ত্রিগুণাতীত, অক্ষর (অক্ষর ব্রহ্মস্বরূপ) এবং অব্যয়(নিরাকার পরমশিব)। তিনি নিজ ইচ্ছায় নিজেকে তিনভাগে বিভক্ত করেন। তিনি তাঁর দক্ষিণ(ডান)ভাগ থেকে পুত্রস্বরূপ ব্রহ্মাকে, বামভাগ থেকে শ্রীহরিকে এবং পৃষ্ঠদেশ থেকে মহেশ্বরকে (অর্থাৎ রুদ্র) সৃষ্টি করেন। এই ভাবে সদাশিবের তিনপুত্র ব্রহ্মা বিষ্ণু ও মহেশ্বর ত্রিদেব হিসেবে পরিচিতি পায়। [ তাই সদাশিবকে ত্রিদেবজনক বলা হয়]
ভালো করে লক্ষ্য করে দেখুন, এখানে পরমেশ্বর সদাশিবকে এক ও অদ্বিতীয় পরমেশ্বর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সেই প্রভু সদাশিব ই ত্রিদেবকে প্রকট করেন, সেই ত্রিদেবের অন্তর্গত বিষ্ণু অর্থাৎ হরি এবং ত্রিদেবের মধ্যে থাকা হর বা রুদ্র/মহেশ , উভয়েই গুণযুক্ত সত্ত্বা।
যোহসৃজদ্দক্ষিণাদঙ্গাদ ব্রাহ্মণং লোকসম্ভবম্।
বামপার্শ্বাত্তথা বিষ্ণুং লোকরক্ষার্থমীশ্বরঃ ॥৩৪৫৷৷
[মহাভারত- অনুশাসনপর্ব/অধ্যায় ১৩/৩৪৫ নং শ্লোক]
✅ অর্থ — যে ঈশ্বর (মহাদেব) দক্ষিণপার্শ্ব হতে জগতের সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মাকে সৃষ্টি করেছেন এবং লোকরক্ষার জন্য বামপার্শ্ব হতে বিষ্ণুকে উৎপাদন করেছেন ॥৩৪৫৷৷
🔵 আরও বলা আছে যে, ত্রিদেবরূপ সাক্ষাৎ পরমেশ্বর শিব ধারণ করেন—
ব্রহ্মশিরোপহর্তাষ মহিষঘ্নায় বৈ নমঃ।
নমস্ত্রিরূপধরায় সর্ব্বরূপধরায় চ ॥৩১১।।
[মহাভারত/অনুশাসনপর্ব/অধ্যায় ১৩/৩১১ নং শ্লোক]
✅ অর্থ — আপনি ব্রহ্মার শিরশ্ছেদ ও দুর্গার রূপ ধারণ করে মহিষাসুরকে বধ করেছিলেন, আপনি ত্রিদেব - ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও রুদ্রের রূপ ধারণ করেন এবং সকলের রূপই ধারণ করিয়া থাকেন আপনাকে নমস্কার ॥৩১১৷।
---------------------------------------------------------------------------------------------------
বেদের ভস্মজাবাল উপনিষদে পরমেশ্বর শিবকে ত্রিদেবের জন্মদাতা এবং ত্রিদেবের চেয়েও শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে, অদ্বৈত বলা হয়েছে। শিব থেকে স্বতন্ত্র অন্য কোনো ব্রহ্ম নেই, নিরাকার ব্রহ্মের একটি অনিত্যরূপ নন শিব। শিব স্বয়ং পরমব্রহ্ম, ব্রহ্ম শব্দে শিবকেই ইঙ্গিত করা হয়ে থাকে, একথার প্রমাণ স্বয়ং বেদই দিয়েছে, দেখুন 👇
বৃষভারূঢ়ং হিরণ্যবাহুং হিরণ্যবর্ণং হিরণ্যরূপং পশুপাশবিমোচকং পুরুষং কৃষ্ণপিঙ্গলং ঊর্ধ্বরেতং বিরূপাক্ষং বিশ্বরূপং সহস্রাক্ষং সহস্রশীর্ষং সহস্রচরণং বিশ্বতোবাহুং বিশ্বাত্মানং একং অদ্বৈতং নিষ্কলং নিষ্ক্রিয়ং শান্তং শিবং অক্ষরং অব্যয়ং হরি-হর-হিরণ্যগর্ভ-স্রষ্টারং অপ্রমেয়ং অনাদ্যন্তং রুদ্রসূক্তৈরভিষিচ্য সিতেন ভস্মনা শ্রীফল দলৈশ্চ ত্রিশাখৈরার্দ্রৈর-নার্দ্রৈর্বা ॥
[তথ্যসূত্র : অথর্ববেদ/ভস্মজাবাল উপনিষদ/২/৭]
অর্থ — যিনি বৃষভ নন্দীকে বাহন বানিয়ে তার উপর আরূঢ় হন, যার বাহু হিরণ্য অর্থাৎ স্বর্ণালী বর্ণের ন্যায় উজ্জ্বল, দিব্যদেহ স্বর্ণালী বর্ণের ন্যায় উজ্জ্বল, যার রূপ মাধুর্য স্বর্ণালী বর্ণের ন্যায়, যিনি জীবরূপী সকল পশুর পাশরূপী বন্ধন কে মোচন করেন, যিনি স্বয়ং ব্রহ্মপুরুষ, কৃষ্ণপিঙ্গলরূপী অর্ধনারীশ্বর হিসেবে একই দেহে শক্তিদেবী উমা কে ধারণ করেন, যিনি ঊর্ধ্বরেতরূপে দেহের অভ্যন্তরের ঊর্ধ্বে সহস্রারচক্রে সকল শক্তির উৎস স্থিত, যার অসাধারণ বিরূপ ত্রিনেত্র রয়েছে, বিশ্বের সকল রূপ যার, চারিদিকে যার হাজার হাজার নেত্র রয়েছে, হাজার হাজার মস্তক রয়েছে, হাজার হাজার চরণ রয়েছে, যার বিশ্বের সকল দিকে হস্ত রয়েছে, যিনি বিশ্বের সকলের আত্মা, যিনি এক ও অদ্বিতীয় সত্ত্বা, যিনি সমস্ত কলার অতীত হিসেবে নিরাকার সত্ত্বা, যিনি সকল কিছুর স্রষ্টা ও পরিচালনাকারী হয়েও হয়েও নিজে নিষ্ক্রিয়ভাবে স্থিত তথা শান্ত রূপে সমস্তদিকে সমানভাবে শান্ত তথা স্থির, সেই প্রভু হলেন স্বয়ং শিব, এই প্রভুই অক্ষরব্রহ্ম ॐ-কার, এই প্রভুই অব্যয় অর্থাৎ বিনাশহীন, এই প্রভু শিব(সদাশিব)ই ত্রিদেবরূপী হরি(বিষ্ণু), হর(কৈলাসপতি রুদ্র) ও হিরণ্যগর্ভ(ব্রহ্মা)-র সৃজন কর্তা, তিনি অপ্রমেয়রূপে অসীম, তিনি অনাদি, তার অন্ত নেই, রুদ্রসূক্ত (শতরুদ্রিয়) পাঠপূর্বক তার (দুধ তথা জল দ্বারা) স্নান-অভিষেক করা হয়, ভস্ম প্রদান করা হয়, শ্রীফল রূপী বেলগাছের বেলফল ও ত্রিশাখাযুক্ত ভেজা বা শুকনো বেলপাতা প্রভৃতি সহ (ধুতরা প্রভৃতি বন্য)ফুল তাকে অর্পন করা হয় (আমি সেই প্রভু শিবের ধ্যানে মগ্ন) ।
• ত্রিদেব নাশ হয়ে গেলেও একজনই তখনও বর্তমান থাকেন, ভস্মজাবাল উপনিষদের বেদমন্ত্রে সেই ত্রিদেব (ব্রহ্মা-বিষ্ণু-কালরুদ্র) -এর চেয়েও ঊর্ধ্বে থাকা অদ্বিতীয় পরমব্রহ্ম শিবের কথা স্পষ্ট ভাবে ঘোষণা করা আছে। প্রমাণ দেখুন 👇
কৈলাসশিখরাবাসমোঙ্কারস্বরূপিণং মহাদেবং উমার্ধকৃতশেখরং সোমসূর্যাগ্নিনয়ন মনন্তেন্দুরবিপ্রভং ব্যাঘ্রচর্মাম্বরং মৃগহস্তং ভস্মোদ্ধূলিতবিগ্রহং তির্যক্ ত্রিপুণ্ড্ররেখা বিরাজমানভালপ্রদেশং স্মিতসম্পূর্ণ পঞ্চবিধ পঞ্চাননং বীরাসনারূঢ়মপ্রমেয়মনাদ্যনন্তং নিষ্কলং নির্গুণং শান্তং নিরঞ্জনমনাময়ং হুং ফট্ কুর্বাণং শিব নাম অন্যনিশমুচ্চরন্তং হিরণ্যবাহুং হিরণ্যরূপং হিরণ্যবর্ণং হিরণ্য নিধিং অদ্বৈতং চতুর্থং ব্রহ্মবিষ্ণুরুদ্রাতীতমেকমাশাস্যং ভগবন্তং শিবং প্রণম্য মুহুর্মুহুরভ্যর্চ্য শ্রীফলদলৈস্তেন ভস্মনা চ নতোত্তমাঙ্গঃ কৃতাঞ্জলিপুটঃ
[অথর্ববেদ/ভস্ম জাবাল উপনিষদ /১/১]
অর্থ — যিনি ব্যাঘ্রচর্ম পরিধান করেন, মৃগমুদ্রা হস্তে ধারণ করেন, সমগ্র দেহে ভস্ম মেখে থাকেন, যিনি কপালে ত্রিপুণ্ড্র তিলন ধারণ করেন, স্মিতহাস্যে পাঁচটিমুখ সম্পন্ন তিনি বীরাসনে বসেন, তিনিই নিষ্কল(নিরাকার পরমশিব) নির্গুণ(সকল মায়ার অতীত), শান্ত, তিনিই নিরঞ্জন। হুং ফট্ ইত্যাদি বলে শিব নাম অহর্নিশি উচ্চারণ করে সেই হিরণ্যবর্ণরূপী, হিরণ্যবাহু, হিরণ্যরূপ যার সেই প্রভুই অদ্বিতীয়, তিনিই জাগ্রত-স্বপ্ন-সুষুপ্তির ঊর্ধ্বে থাকা চতুর্থপদ সমাধীতে প্রাপ্ত হন যে প্রভু, যিনি নারায়ণ, ব্রহ্মা ও কালরুদ্র — এই ত্রিদেবেরও অতীত হলেন ভগবান শিব, সেই প্রভুকে প্রণাম করে বারংবার অর্চনাপূর্বক বেলফল ও বেলপত্র তথা ভস্ম দিয়ে তার কাছে বারবার নত মস্তকে কৃতাঞ্জলিপুটে নিজেকে সমর্পণ করছি।
দেখুন — ত্রিদেবের স্রষ্ঠা ও তাদের ঊর্ধ্বে থাকা প্রভু শিবই অদ্বিতীয় পরমব্রহ্ম বলেই বেদ দ্বারাই প্রমাণিত হল। শিবই একমাত্র অদ্বৈত ব্রহ্ম, অন্য কোনো দেবতা ব্রহ্ম নন। বেদের মধ্যে থাকা অদ্বৈত দর্শনকেই একমাত্র শৈব পরমাদ্বৈত অদ্বৈতবাদ বলে, যা শৈবাগম শাস্ত্রে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। পরম অদ্বৈতবাদ দ্বারা একমাত্র শিবই পরমেশ্বর, বিষ্ণু বা অন্য কেউ নয়।
বেদ বলছে - ব্রহ্মা বিষ্ণুর মৃত্যু হয় ।
প্রমাণ দেখুন —
পরমেষ্ঠ্যপি নিষ্ঠাবান্ হীয়তে হরিরপ্যজঃ ।
ভাবোঽপ্যভাবমায়াতি জীর্যন্তে বৈ দিগীশ্বরাঃ ॥ ৫১
ব্রহ্মা বিষ্ণুশ্চ রুদ্রশ্চ সর্বা বা ভূতজাতয়ঃ ।
নাশমেবানুধাবন্তি সলিলানীব বার্ডবম্ ॥ ৫২
[তথ্যসূত্র : মহ উপনিষদ/৩য় অধ্যায়/৫১-৫২ নং মন্ত্র]
অর্থ — ব্রহ্মাও বিনাশপ্রাপ্ত হন আর অজ বিষ্ণুও মৃত্যুপ্রাপ্ত হন। সমস্ত ভাব অভাবে পরিনত হয়ে যায়, এই ভাবে জাগতিক সকল কিছুই নশ্বর, দিকপালেরাও মৃত্যু প্রাপ্ত হন ॥ ৫১
ব্রহ্মা-বিষ্ণু রুদ্র তথা সকল দেবতা সহ যতরকম জীব আছে সবাই নাশ হবার জন্য ধাবিত হয় সেই প্রকারে যেভাবে জল বাড়বানলের দিকে ধাবিত হয় ॥ ৫২
— দেখুন বৈষ্ণব গণ ! আপনারা যে মহ উপনিষদের উপর নির্ভর করে নারায়ণকে অজন্মা একমাত্র পরমব্রহ্ম দাবী করেছিলেন, সেই মহ উপনিষদ স্বয়ং নিজেই নারায়ণের মৃত্যু হয় বলে দাবী করেছে।
তাহলে বলুন যার মৃত্যু হয় সেই জীব তত্ত্ব কি করে পরমব্রহ্ম হবেন ?
এরই সাথে দেখুন ত্রিদেবেরও নাশ হয়ে যায় বলে দাবী করেছে মহ উপনিষদ।
এখন নিশ্চয়ই ভাবছেন বিষ্ণুকে অজ বলবার পরেও আপনাদের বৈষ্ণবদেরই মহ উপনিষদ কেন তার মৃত্যু হয় বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছে।
প্রকৃত পক্ষে, যেমন ভাবে ব্রহ্মাকে স্বয়ম্ভু বা অজ বলা হয়, বিষ্ণুর ক্ষেত্রেও তেমনভাবেই অজ শব্দটি প্রয়োগ হয়েছে মাত্র, কিন্তু এর অর্থ এমন নয় যে, ব্রহ্মা বিষ্ণু সত্যিই অজন্মা, প্রকৃত পক্ষে অজন্মা শিবই এই ব্রহ্মা বিষ্ণু রূপে ব্যবহারিক জগতে প্রকট হন, তাই শিবদৃষ্টিতে ব্রহ্মা বিষ্ণু কে অজ মাত্র বলা হয়। আর বেদেই ব্রহ্মা বিষ্ণুর জন্ম পরমেশ্বর শিবের থেকে হয় তা বহু মন্ত্রে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত। এই কারণে অজ বলা হলেও নারায়ণ মৃত্যুপ্রাপ্ত হয়ে যান অর্থাৎ নারায়ণ প্রকৃতি তত্ত্ব মাত্র, যার কারণে প্রকৃতিকে অনিত্য বলা হয়। প্রকৃতিরূপী নারায়ণ জগৎ সৃষ্টি করে সেখানে ব্রহ্মা কালরুদ্র উৎপন্ন করেন কল্পভেদে, কিন্তু সাধরণ প্রলয়ে অন্তিমে ব্রহ্মা কালরুদ্র তথা সব কিছু নাশ হলেও পরবর্তী কল্পতে নূতন সৃষ্টি ঘটাবার জন্য প্রকৃতিরূপী নারায়ণ ই অবশিষ্ট থাকেন । তাই মহোপনিষদে বলা হয়েছে সৃষ্টি হবার পূর্বে এক নারায়ণ ছিলেন, তখন ব্রহ্মা, কালরুদ্র ঈশান, চন্দ্র সূর্য কেউ ছিলনা। এখানে কেউ ছিলনা বলতে প্রকৃতির কোনো বিচিত্র বিভিন্ন সত্ত্বার অনুপস্থিতিকে বোঝানো হয়েছে। নারায়ণ সেই যোনীরূপী প্রকৃতি, যেখানে পরশিব কারণরূপী বীজ প্রদান করেন, তারপরেই সেখান থেকে সৃজন হয়।
দেখুন —
রুদ্রাৎপ্রবর্ততে বীজং বীজযোনির্জনার্দনঃ।
যো রুদ্রঃ সস্বয়ং ব্রহ্মা যো ব্রহ্মা স হুতাশনঃ ॥৭॥
(কৃষ্ণ যজুর্বেদ/রুদ্রহৃদয় উপনিষদ/৭নং মন্ত্র)
অর্থ : পরমেশ্বর পরারুদ্র শিব'ই সকল কিছুর উৎপত্তির কারণরূপী বীজ, আর সেই কারণরূপী বীজ বপন করবার জন্য যোনীস্বরূপ হলেন জনার্দন নারায়ণ। আবার যিনি 'মহারুদ্র সদাশিব' তিনি স্বয়ং (সদ্যোজাত রূপে সৃজনকর্তা) ব্রহ্মা, আর যিনি ব্রহ্মা তিনিই হলেন মূলত হুতাশন অগ্নিদেব ॥৭॥
— উপরোক্ত শ্রুতি প্রমাণ দ্বারা নারায়ণের ঐ একা অবস্থানের অবস্থা প্রকৃতিসত্ত্বা মাত্র হিসেবে পরিচিত হচ্ছে।
প্রকৃতিরূপী নারায়ণের কার্য যখন সম্পন্ন হবে অর্থাৎ মহাপ্রলয় যখন আসবে তখন শুধু ব্রহ্মা ও কালরুদ্র নয় বরং ঐ প্রকৃতিরূপ নারায়ণেরও নাশ হয়ে যাবে , যা মহ উপনিষদের ৩/৫১-৫২ তে বলা হয়েছে ।
এই ত্রিদেব নাশ হয়ে গেলেও একজনই তখনও বর্তমান থাকেন, ভস্মজাবাল উপনিষদের বেদমন্ত্রে সেই ত্রিদেব (ব্রহ্মা-বিষ্ণু-কালরুদ্র) -এর চেয়েও ঊর্ধ্বে থাকা অদ্বিতীয় পরমব্রহ্ম শিবের কথা স্পষ্ট ভাবে ঘোষণা করা আছে। প্রমাণ দেখুন 👇
কৈলাসশিখরাবাসমোঙ্কারস্বরূপিণং মহাদেবং উমার্ধকৃতশেখরং সোমসূর্যাগ্নিনয়ন মনন্তেন্দুরবিপ্রভং ব্যাঘ্রচর্মাম্বরং মৃগহস্তং ভস্মোদ্ধূলিতবিগ্রহং তির্যক্ ত্রিপুণ্ড্ররেখা বিরাজমানভালপ্রদেশং স্মিতসম্পূর্ণ পঞ্চবিধ পঞ্চাননং বীরাসনারূঢ়মপ্রমেয়মনাদ্যনন্তং নিষ্কলং নির্গুণং শান্তং নিরঞ্জনমনাময়ং হুং ফট্ কুর্বাণং শিব নাম অন্যনিশমুচ্চরন্তং হিরণ্যবাহুং হিরণ্যরূপং হিরণ্যবর্ণং হিরণ্য নিধিং অদ্বৈতং চতুর্থং ব্রহ্মবিষ্ণুরুদ্রাতীতমেকমাশাস্যং ভগবন্তং শিবং প্রণম্য মুহুর্মুহুরভ্যর্চ্য শ্রীফলদলৈস্তেন ভস্মনা চ নতোত্তমাঙ্গঃ কৃতাঞ্জলিপুটঃ
[অথর্ববেদ/ভস্ম জাবাল উপনিষদ /অধ্যায় ১/১ নং মন্ত্র]
অর্থ — যিনি ব্যাঘ্রচর্ম পরিধান করেন, মৃগমুদ্রা হস্তে ধারণ করেন, সমগ্র দেহে ভস্ম মেখে থাকেন, যিনি কপালে ত্রিপুণ্ড্র তিলন ধারণ করেন, স্মিতহাস্যে পাঁচটিমুখ সম্পন্ন তিনি বীরাসনে বসেন, তিনিই নিষ্কল(নিরাকার পরমশিব) নির্গুণ(সকল মায়ার অতীত), শান্ত, তিনিই নিরঞ্জন। হুং ফট্ ইত্যাদি বলে শিব নাম অহর্নিশি উচ্চারণ করে সেই হিরণ্যবর্ণরূপী, হিরণ্যবাহু, হিরণ্যরূপ যার সেই প্রভুই অদ্বিতীয়, তিনিই জাগ্রত-স্বপ্ন-সুষুপ্তির ঊর্ধ্বে থাকা চতুর্থপদ সমাধীতে প্রাপ্ত হন যে প্রভু, যিনি নারায়ণ, ব্রহ্মা ও কালরুদ্র — এই ত্রিদেবেরও অতীত হলেন ভগবান শিব, সেই প্রভুকে প্রণাম করে বারংবার অর্চনাপূর্বক বেলফল ও বেলপত্র তথা ভস্ম দিয়ে তার কাছে বারবার নত মস্তকে কৃতাঞ্জলিপুটে নিজেকে সমর্পণ করছি।
সুতরাং — ত্রিদেবের স্রষ্ঠা ও তাদের ঊর্ধ্বে থাকা প্রভু শিবই অদ্বিতীয় পরমব্রহ্ম বলেই বেদ দ্বারাই প্রমাণিত হল।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন