শতরুদ্রিয় সূক্ত রাজধর্মের বিষয়ে নাকি পরমেশ্বর শিবের বিষয়ে বর্ণিত হয়েছে ? সত্যিটা জানুন
🔥 শতরুদ্রিয় সূক্ত রাজধর্মের বিষয়ে নাকি পরমেশ্বর শিবের বিষয়ে বর্ণিত হয়েছে ? — সত্যিটা জানুন ।
__________________________________________________
🔰 ভূমিকা —
🔘 দয়ানন্দ সরস্বতী তাঁর নিরাকারবাদী তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা এবং পরমেশ্বরের সাকার কল্যাণময় স্বরূপকে আড়াল করার উদ্দেশ্যে শুক্ল-যজুর্বেদের ১৬ অধ্যায় বৈদিক সূক্ত সুপ্রসিদ্ধ ‘শতরুদ্রীয়’ প্রকরণকে লৌকিক সেনাধ্যক্ষ বা মানুষের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে ভাষ্য করেছেন। তাঁর দাবি - শতরুদ্রীয় প্রকরণটি মূলত একটি লৌকিক 'রাজধর্ম প্রকরণ', যেখানে সাধারণ রাজা ও সেনাপতির কর্তব্য বর্ণিত হয়েছে। এই উদ্দেশ্যে তিনি এই প্রকরণের প্রতিটি হোম-মন্ত্রের অত্যন্ত অদ্ভুত ও কপোলকল্পিত ব্যাখ্যা করেছেন, যার কোনো শাস্ত্রীয় বা ব্যাকরণগত ভিত্তি নেই।
যেকোনো বৈদিক মন্ত্রের প্রকৃত অর্থ অনুধাবনের জন্য উক্ত প্রকরণের প্রসঙ্গ, বিনিয়োগ এবং উদ্দেশ্য বিচার করা আবশ্যিক। শতরুদ্রীয় প্রকরণের মূল বিধি ও মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে শুক্ল-যজুর্বেদের নিজস্ব ব্রাহ্মণ গ্রন্থ ‘শতপথ ব্রাহ্মণে’। এছাড়াও কাত্যায়ন ও আপস্তম্ব শ্রৌতসূত্রের মতো কল্পবেদাঙ্গে এর সুনির্দিষ্ট যজ্ঞীয় পদ্ধতি দেওয়া হয়েছে। এই সমস্ত প্রামাণ্য গ্রন্থ একই সমর্থনে বলছে যে- শতরুদ্রীয় অধ্যায়টি একটি উচ্চাঙ্গের 'হোম প্রকরণ'। কিন্তু, দয়ানন্দ সরস্বতী এই সমস্ত শাস্ত্রীয় অনুশাসনকে সম্পূর্ণ তোয়াক্কা না করে নিজের মনগড়া মতবাদ প্রচার করেছেন।
__________________________________________________
🔺শতরুদ্রীয়’ শব্দের পাণিনীয় ব্যুৎপত্তি ও বৈদিক তাৎপর্য, রুদ্রোপাসনার ব্যাকরণীয় বিশ্লেষণ, পরমেশ্বর রুদ্রই (শিব-ই) একমাত্র দেবতা নির্ণয় এবং দয়ানন্দ সরস্বতীর কপোলকল্পিত দাবির খণ্ডন —
🛑 এখন বিষয় হলো — শতরুদ্রীয় প্রকরণ কি আসলেই রাজধর্ম প্রকরণ ?
উত্তর হল - না৷ কেননা, শতরুদ্রীয় প্রকরণ যে হোম প্রকরণ তা শুক্ল-যজুর্বেদ এর ব্রাহ্মণ শতপথ ব্রাহ্মণে বিস্তারিত বর্ণনা আছে এবং কল্পসূত্রাদিতে এর পদ্ধতি বলা হয়েছে৷ চলুন তবে বিষয় গুলো দেখে নেওয়া যাক —
♦️ শতপথ ব্রাহ্মণের ৯ম কাণ্ডের ১ম অধ্যায় স্পষ্ট বলছে- “অথাতঃ শতরুদ্রীয়ং জুহোতি" অতএব এখন শতরুদ্রীয় হোম করা হচ্ছে এবং "স এষোঽত্র রুদ্রো দেবতা" এখানে রুদ্রই দেবতা। শতপথ ব্রাহ্মণ (৯/১/১/১৪) স্পষ্টাক্ষরে বলছে - "নমস্তে রুদ্র মন্যব ইতি… অর্থাৎ- শতরুদ্রীয় প্রকরণ শুরু হয় এভাবে- “নমস্তে রুদ্র মন্যব উততে ইষবে নমঃ” [শুক্ল-যজুর্বেদ/ অধ্যায় ১৬/১] অর্থাৎ - হে রুদ্র! আপনার ক্রোধকে নমস্কার।
♦️ কাত্যায়ন শ্রৌতসূত্র (১৮/১) একে অগ্নিচয়ন যজ্ঞের উত্তরপক্ষের হোম হিসেবে নির্দেশ করেছে —
“শতরুদ্রিয়হোম উত্তরপক্ষস্যাঽপরস্যাং স্রক্ত্যাং পরিশ্রিৎস্বর্কপর্ণেনাঽর্ককাষ্ঠেন শাতয়ন্ত্সন্ততং জর্তিলমিশ্রান্গবেধুকাশক্তূনজাক্ষীরমেকে তিষ্ঠন্নুদঙ্ নমস্ত ইত্যধ্যায়েন”।।
♦️ একই নির্দেশনা আপস্তম্ব শ্রৌতসূত্র ১৭/১১-তে দেওয়া হয়েছে —
“সহস্রস্য প্রমা অসীতি সহস্রেণ হিরণ্যশল্কৈর্ ঊর্ধ্বস্তিষ্ঠন্ প্রতিদিশমগ্নিং প্রোক্ষতি দ্বাভ্যাং দ্বাভ্যাং শতাভ্যাম্ । মধ্য উত্তমাভ্যাং প্রাঙ্মুখঃ” ॥১।।
✅ অনুবাদ- (অধ্বর্য়ু) "সহস্রস্য প্রমা অসি..." ইত্যাদি মন্ত্রে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায়, প্রতি দিকে দুইশত করে মোট এক হাজার সোনার টুকরো (হিরণ্যশল্ক) দিয়ে চিতি-অগ্নিকে প্রোক্ষণ (পবিত্র জল বা ঘি ছেটানো) করবেন। মধ্যভাগে অবশিষ্ট অংশ দিয়ে পূর্বমুখী হয়ে প্রোক্ষণ করবেন।
”ইমা মে অগ্ন ইষ্টকা ধেনবঃ সন্ত্বিতীষ্টকা ধেনূর্যজমানঃ কুরুতে” ॥ ২ ॥
✅ অনুবাদ- (হে অগ্নি, এই ইষ্টকাসমূহ আমার জন্য কামধেনু স্বরূপ হোক) এই মন্ত্র পাঠ করে যজ্ঞের ইষ্টকাসমূহকে নিজের জন্য গাভী বা পুষ্টিদাত্রী রূপে কল্পনা করবেন।
“ঐডিক্যা চিত্যাধ্বর্যুরগ্নিমভিমৃশ্য শতরুদ্রীয়ং জুহোতি জর্তিলযবাগ্বা গবীধুকযবাগ্বা বা জর্তিলৈর্গবীধুকসক্তুভিঃ কুসয়সর্পিষাজাক্ষীরেণ মৃগীক্ষীরেণ বার্কপর্ণেনোদঙ্ তিষ্ঠন্ । উত্তরস্য পক্ষস্যোত্তরাপরায়াং স্রক্ত্যাং বিকর্ণ্যাং স্বয়মাতৃণায়ামনুপরিচারং বা” ॥ ৩ ॥
✅ অনুবাদ- অতঃপর অধ্বর্য়ু উত্তরবেদিরূপ চিতি-অগ্নি স্পর্শ করে শতরুদ্রীয় হোম সম্পন্ন করবেন। এই হোম জর্তিল (বুনো তিল) ও যবের যবাগূ (মণ্ড), অথবা গবীধুক (বুনো শস্যের) যবাগূ, অথবা জর্তিল ও গবীধুকের ছাতু, অথবা বিশেষ ঘৃত (কুসয়সর্পি), কিংবা ছাগলের দুগ্ধ অথবা হরিণীর দুগ্ধ দ্বারা করতে হবে। অধ্বর্য়ু উত্তর দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে একটি আকন্দ পাতা (অর্কপর্ণ)-র সাহায্যে এই আহুতি প্রদান করবেন। এই হোম যজ্ঞবেদির উত্তর দিকের উত্তর-পশ্চিম কোণে (উত্তরাপরা স্রক্তি) অবস্থিত 'বিকর্ণী' এবং 'স্বয়মাতৃণা' নামক ইষ্টকার ওপর অথবা তার চারপাশে পরিভ্রমণ করে করতে হয়।
“নমস্তে রুদ্র মন্যব ইত্যেতাননুবাকাকান্ত্রৈধং বিভজ্যাপী বা প্রথমাদুপক্রম্য নমস্তক্ষভ্য ইতি জানুদঘ্নে ধারয়মাণো রথকারেভ্যশ্চ ব ইত্যুপক্রম্য নমঃ স্বায়ুধায়েতি নাভিদঘ্নে শেষেণ প্রাগবতানেভ্য আস্যদঘ্নে হুত্বা সহস্রাণি সহস্রশ ইতি দশাবতানান্ হুত্বান্বারোহাঞ্জুহোতি” ॥ ৪ ॥
✅ অনুবাদ- "নমস্তে রুদ্র মন্যব..." ইত্যাদি অনুবাকের মন্ত্রসমূহকে তিনটি ভাগে বিভক্ত করে আহুতি দিতে হবে। প্রথম অনুবাক থেকে শুরু করে "নমস্তক্ষভ্যঃ..." মন্ত্র পর্যন্ত অংশটির হোম করার সময় পাত্রটি নিজের হাঁটু সমান উচ্চতায় (জানুদঘ্নে) ধারণ করতে হবে। অতঃপর "রথকারেভ্যশ্চ বঃ..." থেকে শুরু করে "নমঃ স্বায়ুধায়..." মন্ত্র পর্যন্ত অংশটির আহুতি দেওয়ার সময় পাত্রটি নাভি সমান উচ্চতায় (নাভিদঘ্নে) ধারণ করতে হবে। অবশিষ্ট মন্ত্রগুলি থেকে শুরু করে 'অবতান' মন্ত্রের পূর্ব পর্যন্ত অংশটি মুখ বা ওষ্ঠের সমান উচ্চতায় (আস্যদঘ্নে) পাত্র ধারণ করে হোম করতে হবে। এরপর "সহস্রাণি সহস্রশঃ..." ইত্যাদি দশটি অবতান মন্ত্রের দ্বারা আহুতি দিয়ে, পরিশেষে অন্বারোহ (অনুবর্তী) হোমসমূহ সম্পন্ন করবেন।
“নমো রুদ্রেভ্যো যে পৃথিব্যামিতি জানুদঘ্নে ধারয়মাণো নমো রুদ্রেভ্যো যেঽন্তরিক্ষে ইতি নাভিদঘ্নে নমো রুদ্রেভ্যো যে দিবীত্যাস্যদঘ্নে হুত্বৈতানেব যজমানং বাচয়িত্বৈতানেব বিপরীতান্ প্রত্যবরোহান্ হুত্বা সংচরে পশূনামর্কপর্ণমুদস্যতি” ॥ ৫ ॥
✅ অনুবাদ- "নমো রুদ্রেভ্যো যে পৃথিব্যাম্..." মন্ত্রে হাঁটু সমান উচ্চতায়, "নমো রুদ্রেভ্যো যেঽন্তরিক্ষে..." মন্ত্রে নাভি সমান উচ্চতায় এবং "নমো রুদ্রেভ্যো যে দিবি..." মন্ত্রে মুখ সমান উচ্চতায় পাত্র ধারণ করে হোম করবেন। এই মন্ত্রগুলি যজমানকে দিয়েও পাঠ করাবেন (বাচন করাবেন)। অতঃপর এই উচ্চতার ক্রমটিকে বিপরীত করে (অর্থাৎ প্রথমে মুখ, তারপর নাভি, এবং শেষে হাঁটু সমান উচ্চতায়) 'প্রত্যবরোহ' নামক আহুতিসমূহ প্রদান করবেন। হোম শেষে পশুপাল চলাচলের রাস্তায় (সংচরে) সেই আহুতির আকন্দ পাতাটি নিক্ষেপ করবেন।
“যং দ্বিষ্যাত্তস্য সংচরে যস্য রুদ্রঃ প্রজাং পশূন্বাভিমন্যেতোদঙ্ পরেত্য রুদ্রাঞ্জপংশ্চরেদিত্যযজ্ঞসংযুক্তঃ কল্পঃ” ॥ ৬ ॥
✅ অনুবাদ : যদি যজমানের কোনো শত্রু থাকে, তবে সেই শত্রুর যাতায়াতের পথে এই পাতাটি নিক্ষেপ করবে। অথবা রুদ্রদেব যদি যজমানের প্রজা বা পশুর প্রতি রুষ্ট হন, তবে উত্তর দিকে গিয়ে রুদ্রমন্ত্র জপ করতে করতে শান্তিক্রিয়া করবে, এটি যজ্ঞের বহির্ভূত একটি লৌকিক বা বিশেষ প্রতিকারমূলক বিধি (অযজ্ঞসংযুক্ত কল্প)।
✳️ তাহলে, ব্রাহ্মণ ও কল্পসূত্র অনুযায়ী- শতরুদ্রীয় প্রকরণ সাধারণ রাজধর্ম প্রকরণ নয় এটি বৃহৎ হোম প্রকরণ। এখানে প্রত্যেকটা মন্ত্র কীভাবে প্রয়োগ হবে তার পদ্ধতি বলে দিয়েছে কল্পসূত্র। কিন্তু, আর্যসমাজের প্রতিষ্ঠাতা দয়ানন্দ সরস্বতী নিজের নিরাকারবাদী সিদ্ধান্তকে জোরপূর্বক স্থাপিত করার জন্য, সমগ্র শাস্ত্রের বিচার না করেই কপোলকল্পিত মনগড়া ভাষ্য করে শতরুদ্রীয় হোম প্রকরণকে নিছক রাজধর্ম প্রকরণ বলে প্রচার করে দিয়েছেন৷ কিন্তু, দয়ানন্দ সরস্বতী তো আর সত্যকে লুকিয়ে রাখতে পারেনি, শাস্ত্রই দয়ানন্দ সরস্বতীর এসব জালিয়াতি উন্মোচন করে দিয়েছে।
এই প্রকার সুনির্দিষ্ট যজ্ঞীয় ক্রিয়া, উচ্চতার পরিমাপ এবং আকন্দ পাতার আহুতি কখনো কোনো লৌকিক রাজা বা সেনাধ্যক্ষের সামনে করা সম্ভব নয়। অতএব, শ্রুতি ও কল্পসূত্রের বিচারে এটি সম্পূর্ণরূপে একটি বৃহৎ হোম প্রকরণ, তাই স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর দাবি সম্পূর্ণ মনগড়া মাত্র।
দয়ানন্দ সরস্বতী শতরুদ্রীয়কে সাধারণ মানুষের স্তরে নামিয়ে আনলেও, পাণিনীয় ব্যাকরণের শব্দ-নিষ্পত্তির নিয়মেই প্রমাণিত হয় যে এর একমাত্র উপাস্য হলেন স্বয়ং পরমেশ্বর রুদ্রই। পাণিনীয় অষ্টাধ্যায়ীর তদ্ধিত প্রকরণে স্পষ্ট সূত্র রয়েছে —
“শতরুদ্রাচ্ছশ্চ ঘশ্চ”॥ (অষ্টাধ্যায়ী ৪/২/২৮)
এই সূত্রটি পাণিনির “সা অস্য দেবতা” (৪/২/২৪) এই প্রধান অধিকার সূত্রের অধীনে বিহিত হয়েছে। অর্থাৎ, “যার উপাস্য দেবতা শতরুদ্র” কেবল এই অর্থেই ‘শতরুদ্র’ শব্দের উত্তর ‘ছ’ এবং ‘ঘ’ প্রত্যয় প্রযুক্ত হবে।
“শতরুদ্রঃ অস্য দেবতা সঃ” — শতরুদ্র + ছ = শতরুদ্রীয়ম্।
“শতরুদ্রঃ অস্য দেবতা সঃ” — শতরুদ্র + ঘ = শতরুদ্রিয়ম্।
ব্যাকরণ শাস্ত্রের সর্বোচ্চ প্রামাণ্য ভাষ্যকারগণ এই তদ্ধিতার্থকে একবাক্যে সমর্থন করেছেন —
◾কাশিকা বৃত্তি (বামন ও জয়াদিত্য) —
“শতরুদ্রাচ্ছশ্চ ঘশ্চ। শতরুদ্রীয়ম্, শতরুদ্রিয়ম্”॥ তাঁরা স্পষ্ট দেখিয়েছেন যে, শব্দটির মূল ব্যুৎপত্তিগত অর্থই হলো — যার দেবতা নিঃসন্দেহে রুদ্র।
◾পদমঞ্জরী ভাষ্য (হরদত্ত মিশ্র) —
“শতরুদ্রীয়মিতি। শতশব্দোঽনন্তবচনঃ, শতং রুদ্রা দেবতাস্যেতি ঘচ্ছৌ, তয়োভিধানসামর্থ্যাদ্ ‘দ্বিগোর্লুগনপত্যে’ লুগ্ ন ভবতি”॥
পদমঞ্জরীকার এখানে এক পরম রহস্যোদ্ঘাটন করেছেন। তিনি বলছেন- এখানে ‘শত’ শব্দটির অর্থ কেবল গাণিতিক সংখ্যা ১০০ নয়, বরং ‘শতশব্দোঽনন্তবচনঃ’ অর্থাৎ এটি অনন্ত বা অসংখ্য বাচক। সুতরাং, অনন্ত রূপে প্রকাশিত রুদ্রই যার দেবতা, সেই অর্থেই এই প্রত্যয় সাধিত হয়। দ্বিগুণ সমাসের লোপের সাধারণ নিয়মও (দ্বিগোর্লুগনপত্যে) এই প্রত্যয়-সামর্থ্যের কারণে বাধা পায়, যা শব্দটির নিত্যত্ব প্রমাণ করে।
◾সিদ্ধান্তকৌমুদী (ভট্টোজী দীক্ষিত) —
“শতং রুদ্রা দেবতা অস্য শতরুদ্রিয়ম্, শতরুদ্রীয়ম্। ঘচ্ছয়োর্বিধানসামর্থ্যাৎ দ্বিগোর্লুগনপত্যে ইতি ন লুক্॥” অর্থাৎ, অনন্ত রুদ্র যার পরম দেবতা, তাহাই শতরুদ্রীয়।
◾মহাভাষ্য (মহর্ষি পতঞ্জলি) —
“শতরুদ্রাদ্ ঘ চ - শতরুদ্রাদ্ ঘপ্রত্যয়ো বক্তব্যঃ, ছশ্চ বক্তব্যঃ। শতরুদ্রিয়ম্, শতরুদ্রিয়ম্”॥ মহাভাষ্যের প্রসঙ্গ অনুসারেও “সা অস্য দেবতা” অর্থেই এই রূপসমূহ সিদ্ধ হয়েছে।
🔘 পাণিনীয় ব্যাকরণ এখানে প্রমাণ করেছে যে- ‘শতরুদ্রীয়’ শব্দটির অস্তিত্বই টিকে আছে "সা অস্য দেবতা" সূত্রের জোরে। যজ্ঞীয় পরিভাষায় কোনো লৌকিক সেনাধ্যক্ষ, দেশের কোনো সাকার-নিরাকার মানুষ বা সামাজিক নেতা কখনো "দেবতা" (যজ্ঞভুক্) হতে পারেন না। অতএব, ব্যাকরণগত মূল শব্দ-নিষ্পত্তির নিয়ম অনুসারেই দয়ানন্দ সরস্বতীর লৌকিক ব্যাখ্যা সম্পূর্ণরূপে পাণিনি-বিরোধী ও অশাস্ত্রীয়।
“শতশব্দোঽনন্তবচনঃ” এই নিয়ম অনুসারে শুক্ল-যজুর্বেদের ১৬শ অধ্যায় এবং কৃষ্ণ-যজুর্বেদের তৈত্তিরীয় সংহিতার ৪/৫ অধ্যায় (যা 'নমকম্-চমকম্' বা 'শ্রীরুদ্রম্' নামে খ্যাত), সর্বত্রই পরমেশ্বর রুদ্রের এই বিশ্বরূপ বা অনন্ত রূপের বন্দনা করা হয়েছে। তাই পাণিনির এই “শতরুদ্রীয়” সূত্রটি আসলে বৈদিক রুদ্রোপাসনার প্রধান ব্যাকরণগত ভিত্তি।
🔶 শুক্ল-যজুর্বেদের ১৬শ অধ্যায়ের ভাষ্যকারদ্বয় উব্বট এবং আচার্য মহীধর তাঁদের ভাষ্যের শুরুতেই স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে- এই অধ্যায়ের সমস্ত মন্ত্র কেবল পরমেশ্বর রুদ্রেরই বাচক এবং এটি একটি পরম হোমাত্মক প্রকরণ —
◾উব্বট ভাষ্য— “শতরুদ্রীয়হোমঃ। অথাতো যঃ শতরুদ্রীয়ং জুহোতি ইত্যুপক্রম্য স এষোঽন্নাগ্নিশ্চিতো বুভুক্ষমাণো রুদ্ররূপেণাবতিষ্ঠতে”॥ অর্থাৎ, এটি শতরুদ্রীয় হোম। অগ্নিচয়ন শেষে অগ্নিদেব স্বয়ং ক্ষুধার্ত হয়ে রুদ্ররূপে এখানে অবস্থান করেন। অধ্যায়ের দেবতা নির্ণয় করতে গিয়ে তিনি স্পষ্ট বলেন- “তত্র একো রুদ্রো দেবতা” (এখানে এক পরমেশ্বর রুদ্রই একমাত্র দেবতা)।
◾মহীধর ভাষ্য— “পঞ্চদশে অধ্যায়ে চয়নমন্ত্রান্ সমাপ্য ষোড়শে শতরুদ্রীয়াখ্যহোমমন্ত্রা উচ্যন্তে”॥ অর্থাৎ, পঞ্চদশ অধ্যায়ে চয়ন সমাপ্ত করে এই ষোড়শ অধ্যায়ে শতরুদ্রীয় নামক হোমের মন্ত্রসমূহ বলা হচ্ছে। দেবতার বিষয়ে তিনিও পুনরুল্লেখ করেন - “ষোড়শর্চোঽনুবাকঃ একরুদ্রদৈবত্যঃ” এই অনুবাকের দেবতা একমাত্র রুদ্র।
__________________________________________________
🔥 সিদ্ধান্ত —
সমগ্র প্রবন্ধ শাস্ত্র মীমাংসায় শৈবপক্ষের ব্যাখ্যা নিরপেক্ষ ও বেদসম্মত হিসেবে প্রমাণিত। সুতরাং - ব্রাহ্মণ, কল্পবেদাঙ্গ এবং সমস্ত প্রামাণ্য শাস্ত্রের শব্দপ্রমাণ এবং পাণিনীয় তদ্ধিতার্থের অনুশাসনে এটি সূর্যালোকের ন্যায় স্পষ্ট যে- “শতরুদ্রীয়ম্” পদের একমাত্র অর্থ হলো পরমেশ্বর রুদ্রের উদ্দেশ্যে নিবেদিত স্তোত্র বা যজ্ঞীয় প্রকরণ।
যেখানে পাণিনি, পতঞ্জলি, কাশিকা, পদমঞ্জরী, ভট্টোজী দীক্ষিত, শতপথ ব্রাহ্মণ এবং উব্বট-মহীধর একই সমর্থন করছেন যে- এই প্রকরণের আধার স্বয়ং ঈশ্বর রুদ্র, সেখানে দয়ানন্দের একে "লৌকিক সেনাধ্যক্ষ ও রাজধর্ম" বলা বৈদিক বিনিয়োগের ঘোরতর অবমাননা এবং শাস্ত্রীয় জালিয়াতি মাত্র। অতএব, আর্য সমাজের এই আধুনিক ও মনগড়া ব্যাখ্যা শাস্ত্রীয় ও ব্যাকরণগত বিচারে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য ও খণ্ডিত।
🙏“সর্বে হ্যেষ রুদ্রস্তস্মৈ রুদ্রায় নমো অস্তু”🙏
শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্ ✊🚩
ॐ নমঃ পার্বতীপতয়ে হর হর মহাদেব 🚩
✍️লেখনীতে— অন্তিক ভট্টাচার্য্য (শম্বরনাথ শৈব)।
🌻বিশেষ কৃতজ্ঞতা— আমার গুরু শ্রী নন্দীনাথ শৈবাচার্য ও আমার আদর্শ শ্রী রোহিত কুমার চৌধুরী শৈবজী।
© কপিরাইট ও প্রচারে— Shivalaya 🔥
#সনাতনধর্ম #শৈবধর্ম #পরমেশ্বরশিব #দয়ানন্দসরস্বতীরবেদভাষ্যখণ্ডন #বেদ #আর্যসমাজেরখণ্ডন #দয়ানন্দসরস্বতীরমতবাদখণ্ডন #আর্যসমাজেরপর্দাফাঁস #শিবালয় #শৈব



মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন