পরমেশ্বর শিব — সকল দেবোপাসনার পরম গন্তব্য এবং মোক্ষের একমাত্র দাতা

 



🕉️ পরমেশ্বর শিব — সকল দেবোপাসনার পরম গন্তব্য এবং মোক্ষের একমাত্র দাতা

__________________________________________________

🔰 ভূমিকা :

আজকের দিনে অনেকেই দাবি করেন যে সনাতন ধর্ম কোনোভাবেই শুধুই শিবকেন্দ্রিক নয় ; বরং শিবকে পরম লক্ষ্য বলা কেবলমাত্র শৈব সম্প্রদায়ের একটি সাম্প্রদায়িক মত মাত্র, এটি সমগ্র সনাতন ধর্মের সিদ্ধান্ত নয়। কিন্তু এই ধারণা তখনই সঠিক বলে ভাবতে পারবেন, যখন সনাতন ধর্মের মূল শাস্ত্রগুলির সাক্ষ্য উপেক্ষা করা হয়।

স্কন্দ মহাপুরাণের সূতসংহিতার যজ্ঞবৈভবখণ্ডের পূর্বভাগের ২৩ নং অধ্যায়ে - স্বয়ং পরমেশ্বর শিবের প্রসাদক্রম (কৃপাপ্রাপ্তির ক্রম) ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এখানে দেখানো হয়েছে যে, জীব নিজের কর্মের দ্বারা পাপ করলে দুঃখ ও অধোগতি ভোগ করে, আবার শাস্ত্রবিধি অনুসারে সৎকর্ম করলে চিত্তশুদ্ধি লাভ করে। চিত্তশুদ্ধির মাধ্যমে ধীরে ধীরে বৈরাগ্য, গুরুপ্রাপ্তি, ধ্যান, জ্ঞান এবং দেবতাদের কৃপা লাভ হয়। কিন্তু এই সমস্তই শেষ লক্ষ্য নয় ; এগুলি কেবলমাত্র পরমেশ্বর শিবের প্রসাদলাভের পূর্ববর্তী সোপানমাত্র।

এই অধ্যায়ে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, গণেশ, কার্তিকেয়, দেবী শক্তি এবং অন্যান্য দেবতাগণ জীবকে নিজ নিজ ক্ষেত্রে কল্যাণ প্রদান করলেও, তাঁদের কৃপা শেষ পর্যন্ত জীবকে একমাত্র শিবপ্রসাদের দিকেই অগ্রসর করে। কামনাযুক্ত ব্যক্তিকে তাঁরা ভোগ প্রদান করেন, আর নিষ্কাম সাধককে ক্রমে শিবজ্ঞান লাবের দ্বারা মোক্ষের উপযুক্ত করে তোলেন। মোক্ষদানকারী একমাত্র শিব ; অন্য সকল দেবতা তাঁর কৃপালাভের পথে হেতু বা সহায়ক মাত্র।

অতএব, শাস্ত্রনির্দেশিত ধর্মাচরণ, দেবতাদের উপাসনা, গুরুসেবা, জ্ঞানসাধনা — এসব পরস্পরবিরোধী নয় ; বরং একটিই ধারাবাহিক আধ্যাত্মিক যাত্রা। জীব তার যোগ্যতা ও সংস্কার অনুসারে বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে ক্রমশ পরমেশ্বর শিবের কৃপা লাভ করে এবং অবশেষে জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে মোক্ষ লাভ করে। শিবপ্রাপ্তির পর আর কোনো প্রাপ্য অবশিষ্ট থাকে না।

এই সিদ্ধান্ত কোনো ব্যক্তিগত মত, সম্প্রদায়গত আবেগ বা পরবর্তী কালের ব্যাখ্যা নয় ; বরং স্কন্দ মহাপুরাণের সূতসংহিতায় বর্ণিত শাস্ত্রীয় প্রসাদক্রমেরই সারসংক্ষেপ। এই অধ্যায়ের উদ্দেশ্য অন্যান্য দেবতার মাহাত্ম্য অস্বীকার করা নয় ; বরং তাঁদের প্রত্যেকের স্থান ও ভূমিকা নির্ধারণ করে দেখানো যে সমস্ত শাস্ত্রবিধি, সমস্ত দেবোপাসনা এবং সমস্ত সাধনপথের চূড়ান্ত পরিণতি পরমেশ্বর শিবের প্রসাদ ও মোক্ষলাভ।

__________________________________________________

🔶 সমগ্র সনাতন ধর্মের সমস্ত দেবোপাসনা ও সাধনমার্গের চূড়ান্ত লক্ষ্য কে — এবং এই বিষয়ে শাস্ত্রের সিদ্ধান্ত কী ? 

বেদ, পুরাণ ও আগমে বর্ণিত বিভিন্ন দেবতার উপাসনা কি স্বতন্ত্র চূড়ান্ত পথ, নাকি সবই এক পরম লক্ষ্যের দিকে নিয়ে যায় ? 

শাস্ত্রবিধি অনুসারে কর্ম, দেবোপাসনা ও জ্ঞানসাধনার শেষ পরিণতি কী ?

🔥চলুন উপরোক্ত সকল প্রশ্নের উত্তরটি জেনে নিই, স্কন্দমহাপুরাণের আলোকে —

[তথ্যসূত্র : স্কন্দমহাপুরাণ/সূতসংহিতা/যজ্ঞবৈভবখণ্ড/পূর্বভাগ/২৩ অধ্যায়]


♦️ (শিব কৃপা লাভের পথে দেবদেবীর ভক্তি হ‌ওয়া ক্রম — নামক ২৩ নং অধ্যায়) ♦️


সূত উবাচ।

অথাতঃ সংপ্রবক্ষ্যামি প্রসাদক্রমমাদরাৎ ।

যস্য বিজ্ঞানমাত্রেণ প্রসাদঃ শাঙ্করো ভবেৎ ॥ ১ ॥

পুরা সনৎকুমারাখ্যো মুনিঃ সত্যপরায়ণঃ ।

ব্রহ্মাণং ব্রহ্মসম্পন্নমপৃচ্ছদিদমাদরাৎ ॥ ২ ॥

সোঽপি সর্বজগদ্ধাতা সহ তেন মুনীশ্বরাঃ ।

নারায়ণমনাদ্যন্তমপৃচ্ছদিদমুত্তমম্ ॥ ৩ ॥

সোঽপি নারায়ণঃ শ্রীমান্ সহ তাভ্যামুমাপতিম্ ।

কৈলাসশিখরে রম্যে সমাসীনমতিপ্রভুম্ ॥ ৪ ॥

প্রণম্য দণ্ডবদ্ভক্ত্যা স্তুত্বা রুদ্রেণ সুব্রতাঃ ।

অপৃচ্ছদ্দেবদেবেশমিদং পরমকারণম্ ॥ ৫ ॥

দেবদেবোঽপি সর্বজ্ঞঃ সাম্বঃ সর্বফলপ্রদঃ ।

প্রাহ গম্ভীরয়া বাচা বিষ্ণবে মুনিপুঙ্গবাঃ ॥ ৬ ॥

তচ্ছুত্বা ভগবান্ ব্যাসঃ সাক্ষাৎপ্রত্যক্ষশঙ্করাৎ ।

সনৎকুমারাৎ সর্বজ্ঞাদুক্তবান্ মম সাদরম্ ॥ ৭ ॥

অহং ভাগ্যবতামদ্য যুষ্মাকং মুনিপুঙ্গবাঃ ।

কেবলং কৃপয়া বক্ষ্যে তদেব পরয়া মুদা ॥ ৮ ॥

নিত্যকর্মাদ্যনুষ্ঠানাৎ পাপনাশো ভবত্যতঃ ।

চিত্তশুদ্ধির্ভবেজ্জন্তো রুদ্রস্যৈব প্রসাদতঃ ॥ ৯ ॥

তয়া সংসারদোষস্য দর্শনং ভবতি স্বতঃ ।

ততো বিরক্তিঃ সংসারাৎ পুনস্ত্যাগশ্চ কর্মণাম্ ॥ ১০ ॥

বিরিঞ্চস্য প্রসাদেন ততঃ শান্ত্যাদিসাধনম্ ।

প্রসাদাদ্বৈষ্ণবাৎ সাক্ষান্মুমুক্ষুত্বং পুনঃ স্বতঃ ॥ ১১ ॥

বিঘ্নরাজপ্রসাদেন গুরুপাদপরিগ্রহঃ ।

তেন যোগাভিধং ধ্যানমৈশ্বরং জ্ঞানসাধনম্ ॥ ১২ ॥

পুনঃ সাংখ্যাভিধং জ্ঞানং পার্বত্যাস্তু প্রসাদতঃ ।

সাংখ্যস্যোৎপত্তিবেলায়াং মোচকস্য শিবস্য তু ॥ ১৩ ॥

প্রসাদো জায়তে তেন সংসারস্য বিমর্দনম্ ।

সংসারমোচকঃ সাক্ষাৎ শিব এব ন চাপরঃ ॥ ১৪ ॥

অন্যাশ্চ দেবতাঃ সর্বাঃ প্রণাড্যৈবহি মোচ(চি)কাঃ ।

অনেকজন্মসংসিদ্ধঃ শ্রৌতস্মার্তপরায়ণঃ ॥ ১৫ ॥

ক্রমেণৈব মহাদেবং মোচকং পরমেশ্বরম্ ।

প্রাপ্নুয়াদপ্রমাদেন মুমুক্ষুরিতি হি শ্রুতিঃ ॥ ১৬ ॥

প্রসাদহেতুভূতেষু প্রণবাখ্যো মহামনুঃ ।

বরিষ্ঠঃ কথিতঃ প্রাজ্ঞৈর্দেবতাসু বিশেষতঃ ॥ ১৭ ॥

বিষ্ণুর্মুখ্য ইতি প্রোক্তস্তথা সকলধর্মতঃ ।

রুদ্রারাধনমেবোক্তং বরিষ্ঠমিতি বৈদিকৈঃ ॥ ১৮ ॥

ওঙ্কারস্য প্রসাদেন বিষ্ণোশ্চৈব প্রসাদতঃ ।

রুদ্রারাধনবাঞ্ছা স্যাত্তদারাধনতঃ পুনঃ ॥ ১৯ ॥

জ্ঞানমানন্দমদ্বৈতং পরং ব্রহ্মাধিগচ্ছতি ।

প্রসাদাদেব রুদ্রস্য জ্ঞানং মোক্ষৈকসাধনম্ ॥ ২০ ॥

দেবযানাভিধা বিষ্ণোর্গতিঃ স্রষ্টুঃ প্রসাদতঃ ।

ব্রাহ্মণ্যং কীর্তিরিন্দোশ্চ রবেরারোগ্যমেব তু ॥ ২১ ॥

অগ্নেরৈশ্বর্যমতুলং পিতৃযাণো যমস্য তু ।

পুরন্দরস্য সৌভাগ্যং বলং বায়োঃ প্রসাদতঃ ॥ ২২ ॥

বিঘ্নরাজস্য দেবস্য কার্যসিদ্ধিরবিঘ্নতঃ ।

ষণ্মুখস্য প্রসাদেন সর্বসিদ্ধিরযত্নতঃ ॥ ২৩ ॥

ভারত্যাশ্চ প্রসাদেন বাগ্বিভূতিরযত্নতঃ ।

শ্রীদেব্যাস্তু প্রসাদেন সর্বৈশ্বর্যমযত্নতঃ ॥ ২৪ ॥

দুর্গাদেব্যাঃ প্রসাদেন সর্বত্র বিজয়ো ভবেৎ ।

কামিনাং দেবতাঃ সর্বাঃ সাংসারিকফলপ্রদাঃ ॥ ২৫ ॥

কামনারহিতানাং তু শুদ্ধিদ্বারেণ দেবতাঃ ।

মহাদেবপ্রসাদস্য হেতুভূতা ভবন্তি হি ॥ ২৬ ॥

মহাদেবপ্রসাদস্তু ন হেতুঃ কস্যচিদ্ দ্বিজাঃ ।

স্বয়ং ভুক্তিকরঃ পুংসাং কামিনামচিরেণ তু ॥ ২৭ ॥

স্বয়ং মুক্তিকরঃ সাক্ষাৎ কামনারহিতস্য তু ।
চিরেণৈব তু কালেন শিবস্যৈব প্রসাদতঃ ॥ ২৮ ॥

দেবতা ভুক্তিদা এব মুক্তিদা ন স্বতন্ত্রতঃ ।
মহাদেবপ্রসাদেন সমঃ কশ্চিন্ন বিদ্যতে ॥ ২৯ ॥

মহাদেবপ্রসাদেন খলু বিষ্ণুপদং দ্বিজাঃ ।
ব্রহ্মেন্দ্রাদিপদং চাপি ন স্বতঃ সর্বদেহিনাম্ ॥ ৩০ ॥

প্রসাদে সতি দেবস্য শিবস্য পরমাত্মনঃ ।
বৈদিকানাং তথাঽন্যেষামপি মুক্তির্হি সিদ্ধ্যতি ॥ ৩১ ॥

ব্রাহ্মণাশ্চ বিমুচ্যন্তে প্রসাদেন শিবস্য তু ।
ক্ষত্রিয়াশ্চ তথা বৈশ্যাঃ শূদ্রা অপি চ সংকরাঃ ॥ ৩২ ॥

পাষণ্ডিনো বিমুচ্যন্তে প্রসাদেন শিবস্য তু ।
কিং পুনর্বৈদিকা বিপ্রাঃ স্ত্রিয়ঃ সর্বা মুনীশ্বরাঃ ॥ ৩৩ ॥

খরোষ্ট্রতরবোঽপীশপ্রসাদেনৈব কেবলম্ ।
অযত্নেন বিমুচ্যন্তে নাত্র সদেহকারণম্ ॥ ৩৪ ॥

গর্ভস্থো মুচ্যতে কশ্চিজ্জাতমাত্রেণ কশ্চন ।
বাল্যযৌবনবার্ধক্যাদ্যবস্থাসু চ কশ্চন ॥ ৩৫ ॥

পাষণ্ডাশ্চ বিমুচ্যন্তে প্রসাদেন মহেশিতুঃ ।
বৈদিকাশ্চ খরোষ্ট্রাদিজাতয়শ্চ তথৈব চ ॥ ৩৬ ॥

পাংসবঃ পর্বতায়ন্তে পাংসূয়ন্তে চ পর্বতাঃ ।
শিবপ্রসাদযুক্তানামাজ্ঞয়ৈব তু কেবলম্ ॥ ৩৭ ॥

ব্রহ্মনারায়ণাদ্যাস্তু দেবতা অখিলা অপি ।
বিজায়ন্তে চ নশ্যন্তি হ্যাজ্ঞয়ৈব প্রসাদিনঃ ॥ ৩৮ ॥

প্রসাদস্য চ মাহাত্ম্যং শিবস্য পরমাত্মনঃ ।
অপি দেবা ন জানন্তি শ্রুতয়শ্চ ন সংশয়ঃ ॥ ৩৯ ॥

ব্রহ্মনারায়ণায়াস্তু দেবতা অখিলা অপি ।
বিজায়ন্তে চ নশ্যন্তি হ্যাজ্ঞয়ৈব প্রসাদিনঃ ॥ ৩৮ ॥

প্রসাদস্য চ মাহাত্ম্যং শিবস্য পরমাত্মনঃ ।
অপি দেবা ন জানন্তি শ্রুতয়শ্চ ন সংশয়ঃ ॥ ৩৯ ॥

শঙ্করোঽপি মহাতেজাঃ শাঙ্করী বা মুনীশ্বরাঃ ।
শিবপ্রসাদমাহাত্ম্যং কিন্তু জানাতি বা ন বা ॥ ৪০ ॥

ভবন্তোঽ

পি মহাদেবপ্রসাদায় মুনীশ্বরাঃ ।
গুরুপাদাম্বুজং নিত্যং পূজয়ধ্বং যথাবলম্ ॥ ৪১ ॥

শ্রীমদ্ব্যাঘ্রপুরে পুণ্যে সর্বদেবসমাবৃতে ।
স্বস্বরূপানুসন্ধানপ্রমোদেনৈব কেবলম্ ॥ ৪২ ॥

সাক্ষাদ্দভ্রসভামধ্যে নৃত্যন্তং দেবনায়কম্ ।
অম্বিকাসহিতং নিত্যং ভজধ্বং পরয়া মুদা ॥ ৪৩ ॥

শ্রীকালহস্তিনাথস্য প্রণামালোকনাদয়ঃ ।
অপি শম্ভোঃ প্রসাদায় ভবন্তি দ্বিজপুঙ্গবাঃ ॥ ৪৪ ॥

বারাণস্যাং মহাদেবপ্রণামালোকনাদয়ঃ ।
অপি শম্ভোঃ প্রসাদায় ভবন্তি দ্বিজপুঙ্গবাঃ ॥ ৪৫ ॥

প্রসাদলাভায় হি ধর্মসঞ্চয়ঃ, প্রসাদলাভায় হি দেবতার্চনম্ ।
প্রসাদলাভায় হি দেবতাস্মৃতিঃ, প্রসাদলাভায় হি সর্বভীরিতম্ ॥ ৪৬ ॥

শিবপ্রসাদেন বিনা ন ভুক্তয়ঃ, শিবপ্রসাদেন বিনা ন মুক্তয়ঃ ।
শিবপ্রসাদেন বিনা ন দেবতাঃ, শিবপ্রসাদেন হি সর্বমাস্তিকাঃ ॥ ৪৭ ॥

শিবপ্রসাদেন সমো ন বিদ্যতে, শিবপ্রসাদাদধিকো ন বিদ্যতে ।
শিবপ্রসাদেন শিবস্য সন্নিধিঃ, শিবপ্রসাদেন বিশুদ্ধতাঽঽত্মনঃ ॥ ৪৮ ॥

শিবপ্রসাদেন যুতস্য বৈদিকং ন বিদ্যতে কর্ম জনস্য সুব্রতাঃ ।
শিবপ্রসাদেন যুতস্য তান্ত্রিকং ন বিদ্যতে কর্ম তথৈব কিঞ্চন ॥ ৪৯ ॥

শিবপ্রসাদেন যুতস্য সুব্রতা ন জন্মনাশৌ ভবতঃ সদৈব তু ।
শিবপ্রসাদেন যুতঃ স্বয়ং শিবঃ, শিবপ্রসাদস্তু শিবপ্রসাদতঃ ॥ ৫০ ॥

ইতি শ্রীস্কন্দমহাপুরাণে সূতসংহিতায়াং চতুর্থে যজ্ঞবৈভবখণ্ডে শঙ্করপ্রসাদক্রমবর্ণনং নাম ত্রয়োবিংশোঽধ্যায়ঃ ॥ ২৩ ॥

[স্কন্দ পুরাণ/সূতসংহিতা/যজ্ঞবৈভবখণ্ড/পূর্বভাগ/২৩ অধ্যায়]

____________________________________________________________________________________________

✅ অর্থ — সূত মুনি বললেন, এখন আমি শ্রদ্ধার সঙ্গে প্রসাদের (কৃপার) ক্রম বর্ণনা করছি। একে মাত্র জেনে নিলেই শিবকৃপা লাভ হয় ॥ ১ ॥

প্রাচীনকালে সনৎকুমার এই বিষয়ে ব্রহ্মার কাছে জিজ্ঞাসা করেছিলেন ॥ ২ ॥

ব্রহ্মা নিজে এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে উপনীত হতে না পারায় সনৎকুমারকে সঙ্গে নিয়ে ভগবান বিষ্ণুর কাছে গেলেন। তিনিও এ বিষয়ে সম্পূর্ণরূপে আলোকপাত করা নিজের সামর্থ্যের বাইরে মনে করলেন। তখন তাঁরা তিনজনই কৈলাস পর্বতে অধিষ্ঠিত উমাপতি মহাদেবের নিকট গমন করলেন ॥ ৩–৪ ॥

সেখানে উপস্থিত হয়ে তাঁরা শম্ভুর নিকট প্রসাদক্রম (কৃপার ক্রম) সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলেন ॥ ৫ ॥

মহাদেব করুণা করে গম্ভীর কণ্ঠে বিষ্ণু প্রমুখের উদ্দেশ্যে এই গূঢ় তত্ত্ব প্রকাশ করলেন ॥ ৬ ॥

প্রত্যক্ষ শঙ্করের রূপের মতো সনৎকুমারের নিকট থেকে ব্যাসদেব সেই তত্ত্বের জ্ঞান লাভ করেন এবং স্নেহবশত আমাকে (সূতকে) তার উপদেশ দেন ॥ ৭ ॥

আমিও আজ কেবল কৃপাবশত আপনাদের সেই বিষয়ই বলছি ॥ ৮ ॥

নিত্য ও নৈমিত্তিক কর্মের অনুষ্ঠান করলে পাপ বিনষ্ট হয়। পাপ দূর হলে জীবের চিত্ত শুদ্ধ হয়। কিন্তু পাপনাশ ও চিত্তশুদ্ধি তখনই ঘটে, যখন সমস্ত কর্ম শিবার্পণবুদ্ধিতে সম্পাদিত হয়। অপবিত্র কর্মের ফলে নয়, বরং শিবার্পণবুদ্ধিতে সম্পাদিত কর্মে সন্তুষ্ট শিবের কৃপায়ই তত্ত্বজ্ঞানকে আচ্ছন্ন করে রাখা পাপসমূহ ক্ষীণ হয়। অন্যথায় নিত্যাদি কর্ম কেবল কর্মে অধিকার প্রদান করে এবং ভবিষ্যতের অধঃপতন রোধ করে মাত্র। শিবার্পণভাব না থাকলে নিত্যাদি কর্মও মোক্ষের উপায় হতে পারে না। অতএব পাপক্ষয়ের প্রকৃত কারণ শিবপ্রসাদ ; নিত্যাদি কর্ম কেবল তার নিমিত্তমাত্র ॥ ৯ ॥

চিত্তশুদ্ধি লাভ হলে শিবের কৃপায় সংসারের (বিষয়ী মায়ার কারণে) দোষ উপলব্ধি হয়। সেই দোষদর্শন থেকে বৈরাগ্যের উদয় হয় এবং সমস্ত কর্মের প্রতি ত্যাগবোধ জন্মায়। সর্বত্রই পরমেশ্বরের কৃপাই মূল কারণ। অন্যথায় মানুষ সংসারের দোষ উপলব্ধি করেও সেগুলি সংশোধনের প্রচেষ্টাতেই প্রবৃত্ত হয়ে পড়ে ॥ ১০ ॥

ব্রহ্মার কৃপায় শম প্রভৃতি সাধনের প্রাপ্তি হয়। বিষ্ণুর প্রসাদে মুক্তিলাভের আকাঙ্ক্ষা (মুমুক্ষুতা) জাগ্রত হয় ॥ ১১ ॥

গণেশের কৃপায় গুরু-চরণ লাভ হয়। তার ফলে জ্ঞানসাধনের উপায়রূপ যোগনামক ঈশ্বরবিষয়ক ধ্যান সম্ভব হয় ॥ ১২ ॥

ভগবতী পার্বতীর কৃপায় শুদ্ধত্বরূপ তত্ত্বের জ্ঞান লাভ হয়। যখন এই জ্ঞান উদিত হয়, তখন শিবের সেই কৃপা লাভ হয়, যা সংসারবন্ধন ধ্বংস করে মুক্তিদায়ক অখণ্ডাকার জ্ঞানের উদয় ঘটায়। সংসার থেকে মুক্তিদাতা একমাত্র শিব, অন্য কেউ নন ॥ ১৩–১৪ ॥

অন্যান্য দেবতারা এই ক্রমানুসারেই মোক্ষলাভ করিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে সহায়ক মাত্র হন, প্রত্যক্ষভাবে নন। বহু জন্ম ধরে শ্রৌত ও স্মার্ত মার্গ অনুসরণকারী, অপ্রমাদী সাধকই মোক্ষদাতা পরমশিবের কৃপা লাভ করতে পারেন — এটাই বৈদিক সিদ্ধান্ত ॥ ১৫–১৬ ॥

কৃপালাভের উপায়গুলির মধ্যে ‘প্রণব’ নামক মহামন্ত্র সর্বশ্রেষ্ঠ। দেবতাদের মধ্যে বিষ্ণুই প্রধান; তিনিই কৃপালাভের কারণরূপে সহায়ক হন। সমস্ত ধর্মাচরণের মধ্যে রুদ্রের আরাধনাকেই কৃপালাভের প্রধান উপায় বলা হয়েছে ॥ ১৭–১৮ ॥

ওঙ্কার এবং বিষ্ণুর প্রসন্নতায় রুদ্রের আরাধনা করার ইচ্ছা জাগে। সেই আরাধনার ফলে রুদ্রের কৃপায় এমন জ্ঞান লাভ হয়, যা আনন্দরূপ অদ্বৈত পরব্রহ্মকে বিষয় করে। এই জ্ঞানই মোক্ষের প্রত্যক্ষ সাধন ॥ ১৯–২০ ॥

বিষ্ণুর প্রসন্নতায় দেবযান মার্গে গতি লাভ হয়। ব্রহ্মার কৃপায় ব্রাহ্মণযোনি প্রাপ্ত হয়। চন্দ্রের কৃপায় কীর্তি এবং সূর্যের কৃপায় আরোগ্য লাভ হয় ॥ ২১ ॥

অগ্নির প্রসন্নতায় অতুল ঐশ্বর্য লাভ হয় এবং যমরাজের কৃপায় পিতৃযান মার্গ প্রাপ্ত হয়। ইন্দ্রের প্রসাদ সৌভাগ্যের কারণ এবং বায়ুর কৃপা বলপ্রদানের কারণ ॥ ২২ ॥

বিঘ্নরাজ বিনায়কের প্রসন্নতায় সমস্ত কার্য নির্বিঘ্নে সিদ্ধ হয়। কার্তিকেয়ের কৃপায় বিশেষ চেষ্টা ছাড়াই সমস্ত সিদ্ধি লাভ হয় ॥ ২৩ ॥

সরস্বতীর প্রসাদে অনায়াসে বাগ্বৈভব লাভ হয়। লক্ষ্মীর কৃপায় বিশেষ পরিশ্রম ছাড়াই সর্বপ্রকার ঐশ্বর্য লাভ হয় ॥ ২৪ ॥

দুর্গার কৃপায় সর্বত্র বিজয় লাভ হয়। যাঁদের কামনা রয়েছে, সকল দেবতা সেই সকাম ব্যক্তিদের সাংসারিক ফল প্রদান করেন। আর যাঁরা নিষ্কাম সাধক, তাঁদের সকল দেবতা চিত্তশুদ্ধি দান করে মহাদেবের কৃপালাভে সহায়ক হয়ে ওঠেন ॥ ২৫–২৬ ॥

মহাদেবের কৃপা স্বয়ং অমোঘ ; তাকে অন্য কারও সাহায্যের অপেক্ষা করতে হয় না। সকাম ব্যক্তিদের শিবকৃপা অচিরেই ভোগ প্রদান করে। আর নিষ্কাম সাধকদের এই কৃপাই স্বয়ং মোক্ষ দান করে ॥ ২৭ ॥

অন্যান্য দেবতারা ভোগ ও মোক্ষ — উভয়ই শিবকৃপার মাধ্যমেই প্রদান করতে সক্ষম হন ; তাই তাঁদের ক্ষেত্রে ফললাভে বিলম্ব ঘটে। কিন্তু শিবকৃপা কারও উপর নির্ভরশীল নয় ; তাই এর ফল তৎক্ষণাৎ লাভ হয়। অতএব, মহাদেবের কৃপার সমতুল্য আর কিছুই নেই ॥ ২৮–২৯ ॥

বিষ্ণু, ব্রহ্মা, ইন্দ্র প্রভৃতি পদও একমাত্র শিবকৃপার দ্বারাই লাভ করা যায়; অন্য কোনো উপায়ে নয় ॥ ৩০ ॥

বৈদিক এবং অবৈদিক — উভয় প্রকার মানুষেরই মোক্ষ কেবল শিবকৃপা লাভের পরই সম্ভব হয় ॥ ৩১ ॥

ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র, সংকরজাতি এবং পাষণ্ডী — সকলেই শিবকৃপার দ্বারা মোক্ষ লাভ করে। তাহলে বৈদিক ব্রাহ্মণ এবং সমস্ত নারী মহাদেবের প্রসাদে মুক্তিলাভের যোগ্য — এ কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না ॥ ৩২–৩৩ ॥

গাধা, উট এবং বৃক্ষও ঈশ্বরের কৃপায় অনায়াসে মোক্ষ লাভ করে। ॥ ৩৪ ॥

কেউ মাতৃগর্ভেই মুক্তি লাভ করে, কেউ জন্মমাত্রই মোক্ষপ্রাপ্ত হয় ; আবার কেউ বাল্য, যৌবন অথবা বার্ধক্যকালে মুক্তিলাভ করে ॥ ৩৫ ॥

পাষণ্ডী, বৈদিক এবং গাধা, উট প্রভৃতি জাতিও মহাদেবের প্রসাদে (কৃপায়) মোক্ষলাভ করে ॥ ৩৬ ॥

যাঁদের উপর শিবের কৃপা থাকে, তাঁদের (শিবভক্তদের) আজ্ঞায় পর্বত ধূলিকণার ন্যায় এবং ধূলিকণা পর্বতের ন্যায় হয়ে যেতে পারে ॥ ৩৭ ॥

ব্রহ্মা, নারায়ণ প্রভৃতি সকল দেবতাই মহেশ্বরের আজ্ঞাতেই উৎপন্ন হন এবং তাঁরই আজ্ঞাতেই লয়প্রাপ্ত হন ॥ ৩৮ ॥

দেবতাগণ এবং বেদও নিঃসন্দেহে শিবের কৃপার প্রকৃত মাহাত্ম্য সম্পূর্ণরূপে জানেন না ॥ ৩৯ ॥

মহাতেজস্বী শঙ্কর (সংহারকর্তা রুদ্রদেব) এবং শাঙ্করী (রুদ্রের পত্নী পার্বতী) স্বয়ং শিবপ্রসাদের (ত্রিদেবজনক সদাশিব তথা সর্বোচ্চ পরমতত্ত্ব পরমশিবের কৃপার) সম্পূর্ণ মাহাত্ম্য জানেন কি না, তাও নিশ্চিতভাবে বলা যায় না ॥ ৪০ ॥

হে মুনিশ্রেষ্ঠগণ ! আপনারাও মহাদেবের কৃপা লাভের জন্য যথাশক্তি প্রতিদিন গুরুদেবের (শৈব আচার্যের) চরণকমলের পূজা করুন ॥ ৪১ ॥

সকল দেবতায় পরিবেষ্টিত পবিত্র শ্রীমদ্‌ব্যাঘ্রপুরে, কেবল নিজের স্বরূপের অনুসন্ধানজনিত পরম আনন্দে, পরমেশ্বর বিরাজমান আছেন ॥ ৪২ ॥

সেই সভামণ্ডপের মধ্যে অম্বিকাসহ নৃত্যরত দেবনায়ক মহাদেবকে আপনারা সর্বদা পরম আনন্দের সঙ্গে ভজন করুন। ॥ ৪৩ ॥

শ্রীকালহস্তিনাথের দর্শন, প্রণাম প্রভৃতিও শম্ভুর কৃপালাভের উপায়স্বরূপ ॥ ৪৪ ॥

বারাণসীতে মহাদেবের দর্শন, প্রণাম প্রভৃতিও শিবপ্রসাদ লাভের উপায় ॥ ৪৫ ॥

মহাদেবের প্রসাদ (কৃপা) লাভের উদ্দেশ্যেই ধর্মসঞ্চয় করা হয়। দেবতার আরাধনা, দেবস্মরণ প্রভৃতি সমস্ত সাধনার লক্ষ্যই হল - শিবকৃপা লাভ করা ॥ ৪৬ ॥

শিবপ্রসাদ ব্যতীত ভোগ লাভ হয় না, মোক্ষও লাভ হয় না। দেবতাগণও শিবপ্রসাদের দ্বারাই অনুকূল (কৃপালু) হন। সমস্ত কিছুই শিবকৃপার দ্বারাই লাভ হয় ॥ ৪৭ ॥

শিবপ্রসাদের সমতুল্য কিছু নেই এবং তার চেয়ে শ্রেষ্ঠও কিছু নেই। শিবপ্রসাদ লাভ হলে শিবের সান্নিধ্য লাভ হয় এবং আত্মা সম্পূর্ণরূপে বিশুদ্ধ হয়ে যায় ॥ ৪৮ ॥

যিনি শিবপ্রসাদে ভূষিত [শিবকৃপা দ্বারা আত্মজ্ঞান/শিবজ্ঞান/ব্রহ্মজ্ঞান], তাঁর আর বৈদিক বা তান্ত্রিক কোনো কর্ম সম্পাদনের প্রয়োজন থাকে না ॥ ৪৯ ॥

যিনি শিবকৃপার পাত্র, তাঁর আর পুনর্জন্ম বা মৃত্যুর আবর্তন ঘটে না [জীব জন্ম মৃত্যুর চক্র থেকে চিরকালের জন্য মুক্ত হয়ে শিবে লীন হয়ে ব্যবহারিক অস্তিত্বের উর্দ্ধে‌ উঠে গিয়ে], তিনি স্বয়ং শিব হয়ে যান। শিবপ্রসাদের অনন্য বৈশিষ্ট্য এই যে, তা একমাত্র শিবপ্রসাদ দ্বারাই লাভ করা যায় ॥ ৫০ ॥

____________________________________________________________________________________________

🚩 তথ্য সংগ্রহকারী ও অনুবাদক : শিবালয় প্রতিষ্ঠাতা শিবদ্বারাধীশাধ্যক্ষ দেশিক আচার্যপরমাধিকারী শ্রীশ্রীগুরু নন্দীনাথ শৈব আচার্যদেব 🚩 

©️ কপিরাইট ও প্রচারে : Shivalaya  🔥 

শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্ 🚩 

ॐ নমঃ পার্বতীপতয়ে হর হর মহাদেব 🚩 


পরমেশ্বর শিবের ও সনাতন শৈবধর্মের বিষয়ে এমন গুহ্য সত্য রহস্য ও সত্য উন্মোচনমূলক লেখা আরো পেতে অবশ্য‌ই আমাদের Shivalaya ফেসবুক পেজ Follow করে Favourite করে রাখুন। এই তথ্য দ্বারা যদি আপনার জ্ঞান বৃদ্ধি হয়ে থাকে তবে অবশ্য‌ই এই লেখাটি শেয়ার করুন, যাতে সত্য প্রকাশ্যে আসে।

 #সনাতনধর্ম #শিবালয় #শিব #পরমেশ্বরশিব  #Shivalaya #শৈবধর্ম #শিবশাসন #বেদ #স্কন্দমহাপুরাণ #শাস্ত্র #মোক্ষ #শিবপ্রাপ্তি


মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ