ঋগ্বেদের প্রকৃত মন্ত্রার্থ, ঔষধি উদ্ভিদ বনস্পতি' শব্দের বৈদিক বিচার এবং কট্টর নিরামিষবাদী পূর্বপক্ষের দাবির শাস্ত্রসম্মত খণ্ডন
ঋগ্বেদের প্রকৃত মন্ত্রার্থ, ঔষধি উদ্ভিদ বনস্পতি' শব্দের বৈদিক বিচার এবং কট্টর নিরামিষবাদী পূর্বপক্ষের দাবির শাস্ত্রসম্মত খণ্ডন
_________________________________________________
ভূমিকা
পূর্ববর্তী আলোচনায় আমরা শুক্ল-যজুর্বেদের শতপথ ব্রাহ্মণের প্রমাণ দ্বারা দেখিয়েছি যে, দেবযজ্ঞে নিবেদিত পশুর মেদ থেকে তৃণ, লতা, বৃক্ষ ও বনস্পতির উৎপত্তির কথা বৈদিক শাস্ত্রে বর্ণিত হয়েছে। এই প্রমাণের জবাবে কট্টর নিরামিষবাদী পূর্বপক্ষ দাবি করেছেন যে, উক্ত বচনে কেবল বনস্পতি বা বৃক্ষের কথা বলা হয়েছে; তৃণ-লতা বা উদ্ভিদকে বোঝানো হয়নি। তাঁদের মতে, ঋগ্বেদে উদ্ভিদ (ঔষধি)-এর উৎপত্তি পৃথকভাবে বর্ণিত হয়েছে, ফলে নিরামিষভোজীরা পশুর মেদজাত কোনো খাদ্য গ্রহণ করেন না।
এই দাবি প্রথম দর্শনে গ্রহণযোগ্য মনে হলেও, ঋগ্বেদের মূল মন্ত্র, বৈদিক শব্দার্থ এবং প্রামাণিক ভাষ্য বিচার করলে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র প্রকাশিত হয়। পূর্বপক্ষ এখানে ‘ঔষধি’, ‘উদ্ভিদ’ ও ‘বনস্পতি’ শব্দের অর্থে ইচ্ছামতো পরিবর্তন এনে এমন একটি সিদ্ধান্ত প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন, যা মূল বৈদিক পাঠের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এমনকি তাঁদের উদ্ধৃত ঋগ্বেদের মন্ত্রগুলিই তাঁদের দাবিকে সমর্থন না করে বরং স্ববিরোধিতার দিকে নিয়ে যায়।
এই প্রবন্ধে আমরা ঋগ্বেদের মূল সংস্কৃত মন্ত্র, প্রামাণিক অনুবাদ এবং বৈদিক শব্দার্থ বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখাব যে, পূর্বপক্ষের উত্থাপিত আপত্তি কতখানি শাস্ত্রসম্মত এবং তাদের যুক্তির কোথায় স্ববিরোধিতা বিদ্যমান। বিচার হবে ব্যক্তিগত মত, আবেগ বা আধুনিক কল্পনার ভিত্তিতে নয়; বরং বেদবচন, বৈদিক ভাষ্য এবং যুক্তির আলোকে।
_________________________________________________
🚫 কট্টর নিরামিষাশী পূর্বপক্ষের দাবী — (১)
মহাবিশ্বের সর্বপ্রথম বেদ—ঋগ্বেদে উদ্ভিদ ও বনস্পতির উৎপত্তির উল্লেখ।📜 ঋগ্বেদ—মহাবিশ্বের সর্বপ্রথম বেদ
✅ অদ্বৈত শৈব পক্ষ থেকে উক্ত দাবীর খণ্ডন — (১)
"তস্মাদ্যজ্ঞাৎসর্বহুত ঋচঃ সামানি জজ্ঞিরে। ছন্দাংসি জজ্ঞিরে তস্মাদ্যজুস্তস্মাদজায়ত॥" (ঋগ্বেদ/শাকল শাখা/১০/৯০/৯)অর্থ : সেই সর্বহুত যজ্ঞ (পরম পুরুষ) থেকে ঋক (ঋগ্বেদ) এবং সাম (সামবেদ) উৎপন্ন হয়েছে। তা থেকে ছন্দ (অথর্ববেদ) এবং যজুঃ (যজুর্বেদ) উৎপন্ন হয়েছে।
_________________________________________________
এবার আসি পরবর্তী দাবী ও তার খণ্ডনে।
🚫 কট্টর নিরামিষাশী পূর্বপক্ষের দাবী — (২)
উদ্ভিদ (ওষধি) ও বনস্পতির উৎপত্তি সম্পর্কে সুস্পষ্ট বর্ণনা প্রদান করেছে। আসুন, ঋগ্বেদের সেই প্রমাণটি দেখি। 👇
याः फलिनीर्या अफला अपुष्पा याश्च पुष्पिणीः । बृहस्पतिप्रसूतास्ता नो मुञ्चन्त्वंहसः ॥ (ঋগ্বেদ ১০.৯৭.১৫)
অর্থঃ— ফলযুক্ত ও ফলহীন, পুষ্পযুক্ত ও পুষ্পহীন—সমস্ত উদ্ভিদ, যা বৃহস্পতি (মহাজাগতিক শক্তি বা পরম জ্ঞান) দ্বারা উৎপন্ন বা প্রেরিত হয়েছে, তারা আমাদের সমস্ত কলুষতা ও রোগ থেকে মুক্ত করুক।
✅ অদ্বৈত শৈব পক্ষ থেকে উক্ত দাবীর খণ্ডন — (২)
এইখানে অনুবাদে চালাকি করা হয়েছে। প্রকৃত অনুবাদ দেখুন :
যাঃ ফালিনীর্যা অফলা অপুষ্পা যাশ্চ পুষ্পিণীঃ ।
বৃহস্পতিপ্রসূতাস্তা নো মুণঞ্চন্ত্বংহসঃ ॥ ১৫ ॥
[ঋগ্বেদ/শাকলশাখা/১০ম মণ্ডল/৯৭ সূক্ত/১৫ নং মন্ত্র]
অর্থ — যাহারা ফলবতী আথবা যাহারা ফলবতী নয়, যাহারা পুষ্পবতী, অথবা যাহারা তাদৃশ নয়, বৃহস্পতিকর্তৃক উৎপাদিত সেই সমস্ত ওষধি আমাদিগকে পাপ (রোগ) হইতে রক্ষা করুক।
— বেদদূষক পূর্বপক্ষ নিরামিষবাদী ব্যক্তি এখানে ‘ঔষধি’ শব্দকে পরিবর্তন করে ‘উদ্ভিদ’ বলে বেদের অনর্থ করেছে।
পূর্বপক্ষের সমগ্র লেখার সারসংক্ষেপ দাবী হল — যা ফল দেয় না তা উদ্ভিদ, আর যা ফল দেয় তা বৃক্ষ, বনস্পতি হল সেই বৃক্ষ শব্দের সমার্থক।
পূর্বপক্ষ ব্যক্তি প্রথমেই ‘উদ্ভিদ’ বলতে ‘ঔষধি’ বুঝিয়েছেন, আর বনস্পতি উক্ত উদ্ভিদ থেকে ভিন্ন বলে তিনি দাবী করেছেন। অথচ তাহলে এক্ষেত্রে তিনি যে মন্ত্র ব্যবহার করেছেন, সেখানে বলা হয়েছে — যে উদ্ভিদ ফল দেয় আর যে উদ্ভিদ ফল দেয় না - সবই বৃহস্পতি দ্বারা প্রদান করা। অর্থাৎ পূর্বপক্ষ প্রথমে উদ্ভিদের যে সংজ্ঞা দিয়েছিলেন তার সাথে এখানে পরবর্তীতে তিনি নিজে যে মন্ত্রার্থ লিখেছেন সেই অর্থের সাথে স্ববিরোধ হয়ে গিয়েছে।
এখানে ‘ফল হয় না’ এমন উদ্ভিদ স্বীকার করে তিনি বনস্পতির সংজ্ঞা অনুযায়ী বৃক্ষকেও উদ্ভিদ মেনে নিয়ে নিজেই উদ্ভিদকে বনস্পতি বলে মেনে নিয়েছেন, যা আমাদেরই পক্ষের বক্তব্য। প্রতিপক্ষের দাবীকেই সত্য মেনে বসে আছেন বেচারা নিরামিষ বাদী।
আমরা অদ্বৈত শৈব পক্ষ থেকে — শুক্ল-যজুর্বেদের শতপথ ব্রাহ্মণ থেকে প্রমাণ দেখিয়ে বলেছিলাম যে, “দেবতাদের যজ্ঞ থেকে বলি হওয়া পশুর মেদ পৃথিবীতে পতিত হয়ে তৃণ-লতা আদি বনস্পতি উৎপন্ন হয়েছে” ।
কিন্তু কট্টর নিরামিষাশী ব্যক্তি সেটির বিপক্ষে উত্তর দিয়ে খণ্ডন করতে গিয়ে লিখে বোঝাতে চেয়েছেন যে, “পশুর মেদ দিয়ে তৈরী বনস্পতি বলতে বৃক্ষকে বুঝিয়েছে, তৃণ-লতাকে বোঝায়নি, তৃণলতা হল উদ্ভিদ আর এই উদ্ভিদ হল ঔষধি, আর এই ঔষধি উদ্ভিদ কখনোই পশুর মেদ থেকে জন্মায়নি। তাই নিরামিষাশীরা পশুর মেদের তৈরী বনস্পতি আহার করে না, নিরামিষাশীরা একদম শুদ্ধ।”
অথচ নিজের এই ভাবের ঘরে নিজেরাই আগুন দিয়ে বসে আছেন পূর্বপক্ষ। এরকম কাঁচা পণ্ডিতেরা নিজের অজ্ঞতা নিয়ে এসেছে বেদার্থ বিচার করতে।
এবার মূল প্রসঙ্গ স্পষ্ট করা যাক —
এখানে এই মন্ত্রে ঔষধিগুণ সম্পন্ন সকল উদ্ভিদকেই বোঝানো হয়েছে, সেই উদ্ভিদ হোক তৃণ-লতা বা বৃক্ষ, সেই তৃণলতা বা বৃক্ষে ফল হোক বা না হোক। সেগুলি সবই বৃহস্পতি দ্বারা প্রকটিত বা প্রেরিত হয়েছে।
এবার দেখুন এই ঔষধি কখনোই বৃক্ষ থেকে ভিন্ন নয়, এটি প্রমাণ হচ্ছে ঐ ঔষধি সূক্ত থেকেই।
অশ্বত্থে বো নিষদনং পর্ণে বো বসতিষ্কৃতা।
গোভাজ ইৎকিলাসথ যৎসনবথ পুরুষম্ ॥ ৫ ॥
[ঋগ্বেদ/শাকলশাখা/১০ম মণ্ডল/৯৭ সূক্ত/৫ নং মন্ত্র]
অর্থ — হে ওষধিগণ! অশ্বথ বৃক্ষে তোমরা উপবেশন কর। পলাশ বৃক্ষে তোমরা বাস কর। যখন রোগীর প্রতি অনুগ্রহ কর, তখন তোমাদিগকে গাভী দান করা উচিৎ হয়, অর্থাৎ বিশিষ্ঠ কৃতজ্ঞতার ভাজন হও।
অশ্বত্থ গাছের যে কত ঔষধি গুণ আছে তা আর এখানে উল্লেখ করলাম না। কারণ, অশ্বত্থ গাছের উপকরিতা সম্পর্কে বিশ্ব সংসার পরিচিত, আয়ুর্বেদেও তা উল্লেখ আছে। যারা ঔষধী বলতে উদ্ভিদ আর উদ্ভিদ বলতে শুধু তৃণলতা বলে দাবী করছে, তারা বলুন তাহলে অশ্বত্থ গাছের এত ঔষধি গুণ কেন রয়েছে ? যেহেতু অশ্বত্থ বৃক্ষের এত ঔষধি গুণ রয়েছে তাই ঔষধি যদি উদ্ভিদ শব্দের সমার্থক হয়, তবে অশ্বত্থ বৃক্ষও উদ্ভিদ। আর অশ্বত্থ বৃক্ষ যেহেতু বনস্পতি তাই বনস্পতি যে পশুর মাংসের মেদ থেকে উৎপন্ন তা প্রমাণিত। পূর্বপক্ষ নিজেই নিজের পেতে রাখা ফাঁদে জড়িয়ে পড়েছেন।
আরো প্রমাণ দেখুন, পশুর মেদ পৃথিবীতে পতিত হয়ে বনস্পতি হয়েছে বলেছিলাম। সেই একই বচন উক্ত ঔষধি সূক্তে রয়েছে, দেখুন —
অবপতন্তীরবদন্দিব ওষধয়স্পরি ।
যং জীবমশ্নবামহৈ ন স রিষ্যাতি পুরুষঃ ॥ ১৭ ॥
যা ওষধীঃ সোমরাজ্ঞীর্বহ্বীঃ শতবিচক্ষণাঃ ।
তাসাং ত্বমস্যুত্তমারং কামায় শং হৃদে ॥ ১৮ ॥
যা ওষধীঃ সোমরাজ্ঞীর্বিষ্ঠিতাঃ পৃথিবীমনু ।
বৃহস্পতিপ্রসূতা অস্যৈ সং দত্ত বীর্যম্ ॥ ১৯ ॥
[ঋগ্বেদ/শাকলশাখা/১০ম মণ্ডল/৯৭ সূক্ত/১৭-১৯ নং মন্ত্র]
অর্থ — ওষধিগণ স্বর্গ হইতে নিয়ে পতিত হইবার সময় বলিয়াছিল, আমরা যে প্রাণীকে অনুগ্ৰহ করি, তাহার কোন অনিষ্ট উপস্থিত হয় না ॥ ১৭ ॥
সোম যে সকল ওষধির রাজা, যাহারা অসংখ্য এবং নানা উপকার করিয়া থাকে, হে ওষধি! তুমি তাহাদিগের শ্রেষ্ঠ, তুমি বাসনা পূর্ণ করিতে এবং হৃদয়কে সুখী করিতে সমর্থ ॥ ১৮ ॥
সোম যে সকল ওষধির রাজা (সৃষ্টিকর্তা), যাহারা পৃথিবীর নানা স্থানে বিস্তৃত আছে, বৃহস্পতি কর্তৃক উৎপাদিত (প্রেরিত অর্থে), সেই সকল ওষধি এই রোগী ব্যক্তির বলাধান করুক, অথবা এই উপস্থিত ওষধিকে বীৰ্যবতী করুক। (এ স্থলে ভিষক যে ওষধিটী উপস্থিত রোগে ব্যবহার করিবেন, তাহার বিষয়ে কহিতেছেন) ॥ ১৯ ॥
অর্থাৎ — এক্ষেত্রে দেবতাদের কাছ থেকে পতিত হওয়া পশুর মেদ মর্ত্যে বনস্পতি হবার বিষয়টির সাথে স্বর্গ থেকে ঔষধীগুণ মর্ত্যে পতিত হবার বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। দেবতারা স্বর্গেই থাকেন তাই এক্ষেত্রে মীমাংসা হল দেবতাদের যজ্ঞ থেকে প্রকট হওয়া ঔষধি গুণ পশুর মেদকে মাধ্যম বানিয়ে মর্ত্যে বনস্পতি অর্থাৎ তৃণ-লতাপাতা ও বৃক্ষাদি প্রায় সকল উদ্ভিদের মধ্যেই স্থিত হয়েছে।
অথচ, এই সরল বিষয়টিকে মন্ত্রের ত্রুটিপূর্ণ অনুবাদের মাধ্যমে অনর্থ করে কট্টর নিরামিষাশী পূর্বপক্ষ ব্যক্তি বেদকে দূষিত করবার ধৃষ্টতা করেছেন। যার ফলে অশ্বত্থ বৃক্ষের ঔষধী গুণের উপর প্রশ্ন উঠে যায়, যা বেদমন্ত্রের বচনকে অস্বীকার করবার মতো চরম ধৃষ্টতার লক্ষণ। স্ববিরোধী বক্তব্য দিয়ে পূর্বপক্ষ নিজেই নিজেকে খণ্ডিত করেছেন।
🚫 কট্টর নিরামিষাশী পূর্বপক্ষের দাবী — (৩)
या ओषधीः पूर्वा जाता देवेभ्यस्त्रियुगं पुरा । मनै नु बभ्रूणामहं शतं धामानि सप्त च ॥ (ঋগ্বেদ ১০.৯৭.১)
অর্থঃ— হে ঔষধিসমূহ! তোমরা দেবতাদেরও পূর্বে, সুদূর অতীতে, তিন যুগ আগে উৎপন্ন হয়েছিলে। আমি এই বাদামি-বর্ণ (অথবা নানা বর্ণের) ঔষধিগুলির শত এবং আরও সাতটি (মোট ১০৭টি) আবাসস্থান বা প্রকারের কথা ঘোষণা করছি।
✅ অদ্বৈত শৈব পক্ষ থেকে উক্ত দাবীর খণ্ডন — (৩)
এইখানেও অনুবাদে চালাকি করা হয়েছে, প্রকৃত অনুবাদ দেখুন -
যা ওষধীঃ পূর্বা জাতা দেবেভ্যন্ত্রিযুগং পুরা।
মনৈ নূ বভ্রূণামহং শতং ধামানি সপ্ত চ ॥ ১ ॥
[ঋগ্বেদ/শাকলশাখা/১০ম মণ্ডল/৯৭ সূক্ত/১ নং মন্ত্র]
অর্থ : পূর্বকালে তিন যুগ ধরিয়া দেবতারা যে সমস্ত প্রাচীন ওষধি সৃষ্টি করিয়াছেন, সেই সকল পিঙ্গলবর্ণ ওষধির একশত সপ্ত স্থান বিদ্যমান আছে, আমি এইরূপ জ্ঞান করি।
- এইখানে বেদমন্ত্রে বলা হয়েছে যে, পূর্বকালে অর্থাৎ সৃষ্টির আগে থেকে দেবতাদের দ্বারা তিনযুগ ধরে ঔষধি উৎপন্ন হয়েছে। কিন্তু পুনরায় বেদমন্ত্রের অর্থ বদলে দিয়ে বেদদূষক ধূর্ত নিরামিষবাদী ব্যক্তি - নিজের ভ্রান্ত নিরামিষবাদ কে টিকিয়ে রাখার অপচেষ্টা করেছে, যা তার জেদের দ্বারা বেদের অর্থ বদলে দিয়ে পরমেশ্বর শিবের বচন কে অপমানিত করা তথা তার দ্বারা বিশ্বের সকলকে অধর্মের পথে নেওয়ার মতো বিনাশকারী ফাঁদ। এমন মানসিকতা কে ধিক্কার, তার মস্তিষ্ক কে ধিক্কার, তার পূর্বপুরুষেরাও নিশ্চিতভাবে ধিক্কার ও শোক করছেন এমন বেদদূষক বংশধরকে নিজেদের কুলে উৎপন্ন হতে দেখে।
ঔষধীগুণ উৎপন্নকারী ঔষধির রাজা হলেন দেবতা সোম, তা প্রেরণকর্তা হলেন বৃহস্পতি - এটি বলাই হয়েছে। সুতরাং দেবতাদের উৎপত্তির তিন যুগ পূর্বে ঔষধির জন্ম হয়েছে বলে দাবী করা কখনোই সঙ্গত নয়, যুক্তিযুক্ত নয়।
_________________________________________________
🚫 কট্টর নিরামিষাশী পূর্বপক্ষের দাবী — (৪)
त्वमु॑त्त॒मास्यो᳚षधे॒ तव॑ वृ॒क्षा उप॑स्तयः ।
उप॑स्तिरस्तु सो॒३॒ऽस्माकं॒ यो अ॒स्माँ अ॑भि॒दास॑ति ॥
(ঋগ্বেদ ১০।৯৭।২৩)
অর্থঃ— হে ওষধি! তুমি সমস্ত উদ্ভিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ এবং বনের বৃক্ষরাজি তোমার অনুচর। যে ব্যক্তি আমাদের ক্ষতি করতে চায় বা আমাদের হিংসা করে, সে যেন আমাদের বশীভূত (পদদলিত) হয়।
✅ অদ্বৈত শৈব পক্ষ দ্বারা খণ্ডন — (৪)
এইখানেও অনুবাদে চালাকি করা হয়েছে, প্রকৃত অনুবাদ দেখুন -
ত্বমুত্তমাস্যোষধে তব বৃক্ষা উপস্তয়ঃ ।
উপস্তিরস্তু সোস্মাকং যো অস্মাঁ অভিদাসতি ॥ ২৩ ॥
[ঋগ্বেদ/শাকলশাখা/১০ম মণ্ডল/৯৭ সূক্ত/২৩ নং মন্ত্র]
অর্থ — হে ওষধি! তুমি শ্রেষ্ঠ ; যেখানে যত বৃক্ষ আছে, সকলেই তোমার নিকট হীন। যে আমাদিগের অনিষ্ট চিন্তা করে, সে যেন আমাদিগের নিকট হীন হয়।
এবার প্রশ্ন হল - উক্ত ২৩ নং মন্ত্রে কি বৃক্ষের থেকে ঔষধীকে আলাদা ভাবে শ্রেষ্ঠ দেখানো হয়েছে, তবে কি বৃক্ষ আর ঔষধী আলাদা ? বৃক্ষ কি ঔষধীর চেয়ে হীন ?
উত্তর হল - না । এখানে বৃক্ষের মধ্যে থাকা ‘উপকারী ঔষধি গুণ’ -এর প্রশংসা করা হয়েছে। বলশক্তি না থাকলে জীবের শরীর যেমন সামর্থ্যহীন, এখানেও তেমনই ইঙ্গিত করা হয়েছে।
ঔষধী শব্দকে বারংবার উদ্ভিদ বলে বৃক্ষ থেকে ভিন্ন দেখাবর চেষ্টা করেছেন - বেদদূষক পূর্বপক্ষ নিরামিষবাদী ব্যক্তি।
যাস্ক নিরুক্ত, ৯ম অধ্যায়, ১ম খণ্ড অনুযায়ী,
ঔষধি -এর অর্থ —
ওষৎ + ধয়ন্তি : ‘ওষৎ’ মানে রোগ, জ্বালা বা উত্তাপ। ‘ধয়ন্তি’ মানে শোষণ করা বা পান করা। অর্থাৎ, যা মানুষের শরীরের ভেতরের রোগ বা কষ্টকে শুষে নিয়ে আরোগ্য দান করে, তা-ই হলো ওষধি।
দোষং + ধয়ন্তি : শরীরে যখন বাত, পিত্ত বা কফের ভারসাম্য নষ্ট হয়, তখন তাকে ‘দোষ’ বলা হয়। যা শরীরের এই ক্ষতিকারক দোষগুলোকে চুষে নিয়ে শরীরকে সাম্যাবস্থায় ফেরায়, তা-ই ওষধি।
এবার, উদ্ভিদ —এর অর্থ কি ? তা দেখা যাক।
উদ্’ মানে ওপরে বা ঊর্ধ্বে এবং ‘ভিদ্’ মানে ভেদ করা বা ফুঁড়ে বের হওয়া। অর্থাৎ, যা মাটির বুক ভেদ করে বা ভূতলের ওপর মাথা চাড়া দিয়ে জন্মায়, তাকেই ‘উদ্ভিদ’ বলা হয়।
🔸 মহর্ষি পাণিনির সঅষ্টাধ্যায়ী/৩/১/১৩৫ — এখানে ‘ভিদ্’ (বিদারনে) ধাতুর সাথে ‘উদ্’ উপসর্গের মিলনকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
🔸 মনুস্মৃতি/১/৪৬ : মহর্ষি মনু উদ্ভিদের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে লিখেছেন —
উদ্ভিজ্জা স্থাবরাঃ সর্বে বীজকাণ্ডরোহিণঃ।
অর্থ — বীজ অথবা কাণ্ড থেকে যা মাটি ভেদ করে জন্মায় এবং এক জায়গায় স্থির থাকে, তারা সবাই ‘উদ্ভিজ্জ’ বা উদ্ভিদ।
উদ্ভিদ হলো একটি সাধারণ গুণবাচক শব্দ — যা মাটি ফুঁড়ে বের হওয়া ছোট-বড় সমস্ত সবুজ প্রাণকে (ঘাস থেকে শুরু করে বটগাছ) একসাথে বোঝায়।
ওষধি হলো একটি বিশেষণ ও শ্রেণীবাচক শব্দ — যা মূলত রোগ নিরাময়কারী গুণ, যে গুণসমূহ লতাপাতা সহ বৃক্ষতেও স্থিত।
উপরেই বেদমন্ত্রে আমরা দেখেছি অশ্বত্থ ও পলাশ বৃক্ষের মধ্যে ঔষধী গুণাবলী রয়েছে। অর্থাৎ ঔষধি বলতে গুণকে বোঝায়, এই ঔষধিগুণাবলী তৃণলতা সহ বড় বড় বৃক্ষতেও থাকে।
তাছাড়া, বনস্পতিকে শুধু বৃক্ষ হিসেবে মান্য করলেও, সেক্ষেত্রেও ঐ বৃক্ষের ফল দিয়েই দেবদেবীর পূজা করা হয়, তার ছালবাকল ঔষধি তৈরীর কাজে লাগে অর্থাৎ শুক্ল-যজুর্বেদ/শতপথ ব্রাহ্মণ/৩/৮/৩/১২ -অনুযায়ী পশুর মাংসের মেদ দিয়ে উৎপন্ন হওয়া বৃক্ষের ফল খেয়েই নিরামিষাশীরা বেঁচে আছে।
কিন্তু অতিজ্ঞানীরা অধিকজ্ঞানের চাপে প্রাথমিক জ্ঞান টুকু ধরে রাখতে পারে না। বেদের মন্ত্রের অর্থ জ্ঞান করা তো দূরের কথা, বেদদূষক পূর্বপক্ষ নিরামিষবাদী ব্যক্তি সাধারণ বিচার বুদ্ধি দিয়ে ভাবতে পারেনি বরং নিজেদের সবচেয়ে বড় শুদ্ধ প্রমাণ করতে গিয়ে বেদের মন্ত্রতে অশুদ্ধি প্রবেশ করিয়ে বসে আছেন। তিনি নাকি আবার শুদ্ধ শৈব পরম্পরার বিশুদ্ধতা বজায় রাখতে এসেছেন। যার নিজের সামান্যতম প্রাথমিক জ্ঞান, বিচার বুদ্ধি নেই তারা কি না এসেছে বেদের অর্থ নির্ণয় করতে, আর সে নাকি করবে শুদ্ধতার কর্ম ।
পরিশেষে প্রমাণিত হল — শুক্ল যজুর্বেদের শতপথ ব্রাহ্মণ বচন চিরাচরিত সত্য। বেদদূষক পূর্বপক্ষ নিরামিষবাদী ব্যক্তির দাবী খণ্ডিত ও তার অজ্ঞতা প্রমাণিত।
অখণ্ডিত রইল বেদ বচন, দেবতাদের দ্বারা পশুর মেদ মর্ত্যে পতিত হয়ে তার সমগ্র উদ্ভিদ প্রজাতি বনস্পতি উৎপন্ন হয়েছে। আর সেই উদ্ভিদ তথা বনস্পতির উপরেই নির্ভর করে তথাকথিত ধার্মিক প্রাণীপ্রেমী কট্টর নিরামিষাশী রা নিজেদের পেট পরিপালন করছে। যদি বেদবিধান গ্রহণযোগ্য না হয় তাদের কাছে আর প্রাণীপ্রেম যদি এতই বেশি হয় তাহলে উদ্ভিজ্জ আহার করাও ছেড়ে দেওয়া তাদের সবচেয়ে উচিত কর্ম।
বেদমন্ত্র সদাসত্য —
তস্যাবাঙ্ মেধঃ পপাত।
স ঽএষ বনস্পতিরজায়ত ॥ ১২ ॥
[শুক্ল-যজুর্বেদ/শতপথ ব্রাহ্মণ/৩/৮/৩/১২]
✅ অর্থ : ঐ দেবতাদের দ্বারা আলভ্যমান পশুর সকাশে মেধ নীচের মর্ত্যলোকে পতিত হয় এবং তা থেকে স্থাবর জাতীয় তৃণ-লতাদি বনস্পতি উৎপন্ন হয়েছিল।
_________________________________________________
__________________________________________________
🚩 তথ্য সংগ্রহ ও সত্য উন্মোচন তথা খণ্ডনে : শিবালয় প্রতিষ্ঠাতা শিবদ্বারাধীশাধ্যক্ষ দেশিক আচার্যপরমাধিকারী শ্রীশ্রীগুরু নন্দীনাথ শৈব আচার্যদেব জী 🚩
©️ কপিরাইট ও প্রচারে : Shivalaya 🔥
শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্ 🚩
ॐ নমঃ পার্বতীপতয়ে হর হর মহাদেব 🚩
পরমেশ্বর শিবের ও সনাতন শৈবধর্মের বিষয়ে এমন গুহ্য সত্য রহস্য ও সত্য উন্মোচনমূলক লেখা আরো পেতে অবশ্যই আমাদের Shivalaya ফেসবুক পেজ Follow করে Favourite করে রাখুন। এই তথ্য দ্বারা যদি আপনার জ্ঞান বৃদ্ধি হয়ে থাকে তবে অবশ্যই এই লেখাটি শেয়ার করুন, যাতে সত্য প্রকাশ্যে আসে।
#হিন্দুধর্ম #সনাতনধর্ম #শিবালয় #Shivalaya #sanatandharma #খাদ্যাভ্যাস #শৈবধর্ম #আমিষ #নিরামিষ #মাংসাহার #মহাভারত #ঋগ্বেদ #নিরুক্ত #অপপ্রচারেরখণ্ডন #শতপথব্রাহ্মণ #শুক্ল-যজুর্বেদ #উদ্ভিদ
[এই পোস্টটি শুধুমাত্র শিক্ষামূলক ও জনসচেতনতার উদ্দেশ্যে প্রকাশিত।এখানে ব্যবহৃত চিত্রটি কেবল বিষয়টি সহজে উপস্থাপনের জন্য Ai-সহায়তায় নির্মিত একটি প্রতীকী চিত্র, এই ছবিটির মধ্যে কিছু লেখা আলাদা ভাবে লেখা হয়েছে। সকল শাস্ত্রীয় উদ্ধৃতি ও তথ্য যথাসম্ভব মূল গ্রন্থ অনুসারে ছবি উপস্থাপিত হয়েছে।]


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন