শাস্ত্রের আলোকে — শিবভক্তির লক্ষণ বিচার

 


🕉️ শাস্ত্রের আলোকে — শিবভক্তির লক্ষণ বিচার

__________________________________________________

🔰 ভূমিকা :

অনেকেই শাস্ত্রের বচনকে অস্বীকার করে বলেন—“শাস্ত্র মেনে কী হবে, ভক্তিই সব।” কিন্তু এই বক্তব্য শাস্ত্রসম্মত নয়। কারণ শাস্ত্রই ঘোষণা করছে যে, ভক্তিই শিবলাভের প্রাথমিক ও অপরিহার্য উপায়। ভক্তি থেকেই শিবতত্ত্বের প্রতি শ্রদ্ধা জন্মায়, শ্রদ্ধা থেকে শাস্ত্রশ্রবণ, শাস্ত্রশ্রবণ থেকে মনন, মনন থেকে জ্ঞান এবং জ্ঞান থেকেই পরমেশ্বর শিবের প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি সম্ভব হয়। অতএব, শাস্ত্রকে অস্বীকার করে ভক্তির কথা বলা প্রকৃতপক্ষে স্ববিরোধী অবস্থান। কারণ ভক্তির প্রকৃত স্বরূপ, তার লক্ষণ, তার সাধনপদ্ধতি এবং তার পরম ফল—সবই শাস্ত্রের মাধ্যমেই জানা যায়।

শ্রীস্কন্দমহাপুরাণের সূতসংহিতার যজ্ঞবৈভবখণ্ডের পূর্বভাগে ‘শিবভক্তিবিচার’ নামক ২৬ নং অধ্যায়ে শিবভক্তির এক অত্যন্ত বিস্তৃত ও গভীর আলোচনা পাওয়া যায়। এখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, শিবভক্তি কেবল পূজা, জপ বা ধ্যানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। শিবলিঙ্গের অর্চনা, রুদ্রাক্ষ ধারণ, ত্রিপুণ্ড্র ও ভস্ম ধারণ, ‘ওঁ নমঃ শিবায়’ ষড়ক্ষর মন্ত্রের জপ, শিবকথা শ্রবণ, শিবোৎসবে অংশগ্রহণ, শিবমন্দির নির্মাণ, শিবশাস্ত্র অধ্যয়ন ও প্রচার, শিবজ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত সাধুদের সেবা, শিবযাত্রা, গুরুসেবা, বেদ ও বেদান্তের প্রতি বিশ্বাস, সকল জীবের প্রতি দয়া, মধুর ভাষণ, সর্বভূতের কল্যাণচিন্তা, সকলের গুণদর্শন এবং সর্বজনের প্রতি মৈত্রীভাব — এসবকেই শাস্ত্র শিবভক্তির অঙ্গ হিসেবে ঘোষণা করেছে।

এই অধ্যায়ে আরও ঘোষণা করা হয়েছে যে, ভক্তিই পরম পুরুষার্থ প্রদান করে, ভক্তিই সংসাররূপ মহারোগের নাশ করে, ভক্তিই পরমতত্ত্বের জ্ঞান দান করে এবং ভক্তিই পরম মুক্তির কারণ। ভক্তিযুক্ত সাধকের হৃদয়েই শক্তিসহিত পরমেশ্বর শিব প্রকাশিত হন এবং তাঁকেই নিজের অনন্ত, সত্য, চৈতন্যময় ও আনন্দময় স্বরূপ দান করেন।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। অনেকেই ভুলভাবে মনে করেন যে, শিবভক্তরা অন্য দেবতার বিরোধী। কিন্তু এই অধ্যায় তার সম্পূর্ণ বিপরীত শিক্ষা দেয়। এখানে বলা হয়েছে যে, বিষ্ণু প্রভৃতি দেবতার নিন্দাকারীদের প্রতিহত করা এবং তাঁদের ভক্তদের রক্ষা করাও শিবভক্তির অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ প্রকৃত শিবভক্ত কোনো দেবতার ভক্তের প্রতি হিংসা বা বিদ্বেষ পোষণ করেন না; বরং তাঁদের রক্ষা করেন। কারণ তিনি সকল দেবতার মধ্যেই পরমেশ্বর শিবের ঐশ্বরিক প্রকাশ উপলব্ধি করেন।

অতএব, এই অধ্যায় সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, শাস্ত্রবিরোধী ভক্তি বলে কিছু নেই। বরং শাস্ত্রই প্রকৃত ভক্তির ভিত্তি, শাস্ত্রই ভক্তির পরিচয়, শাস্ত্রই ভক্তির সাধনপথ এবং শাস্ত্রই ভক্তির পরম ফল নির্ধারণ করে। তাই যে ব্যক্তি শাস্ত্রকে অস্বীকার করে ভক্তির দাবি করেন, তিনি অনিচ্ছাকৃতভাবেই শাস্ত্রপ্রদত্ত ভক্তির মহিমাকেও অস্বীকার করেন। পক্ষান্তরে, শাস্ত্রসম্মত ভক্তিই মানুষকে ধীরে ধীরে শিবতত্ত্বের জ্ঞান, শিবসাক্ষাৎকার এবং পরম মোক্ষের পথে পরিচালিত করে।

__________________________________________________

🕉️ শাস্ত্রের আলোকে — শিবভক্তির লক্ষণ বিচার 🕉️

সূত উবাচ ।

অথাতঃ সম্প্রবক্ষ্যামি শিবভক্তিং সমাসতঃ ।
যয়া ভুক্তির্বিমুক্তিশ্চ মুনীন্দ্রাঃ সর্বদেহিনাম্ ॥ ১ ॥

ভক্তির্বহুবিধা জ্ঞেয়া ভবানীসহিতস্য তু ।
একা শঙ্করসায়ুজ্যশ্রদ্ধা সারতরা পরা ॥ ২ ॥

অন্যা শঙ্করসারূপ্যশ্রদ্ধাঽতীব শিবপ্রিয়া ।
অপরা শিবসামীপ্যশ্রদ্ধা বেদবিদাং বরা ।
ইতরা শিবসালোক্যশ্রদ্ধাঽভীষ্টফলপ্রদা ॥ ৩ ॥

অপরা চ শিবজ্ঞানশ্রদ্ধা পাশনিকৃন্তনী ॥ ৪ ॥

অন্যা বেদশিরঃশ্রদ্ধা সাক্ষাদ্বিজ্ঞানদায়িনী ।
অপরা শ্রবণশ্রদ্ধা প্রোক্তা বেদান্তবেদিভিঃ ॥ ৫ ॥

ইতরা মননশ্রদ্ধা নৃণাং সম্ভাবনাপ্রদা ।
অন্যা দেবেশ্বরধ্যানশ্রদ্ধারূপা মহত্তরা ॥ ৬ ॥

অপরোদ্ধূলনশ্রদ্ধা ভস্মনা পাপনাশিনী ।
ত্রিপুণ্ড্রধারণশ্রদ্ধা তদন্যা তত্ত্বদায়িনী ॥ ৭ ॥

রুদ্রাক্ষধারণশ্রদ্ধা চাপি ভক্তিরুদীরিতা ।
ষড়ক্ষরজপশ্রদ্ধা চাপি ভক্তির্মহত্তরা ॥ ৮ ॥

শিবলিঙ্গার্চনশ্রদ্ধা চাপি ভক্তিরনুত্তমা ।
লিঙ্গার্চনদিদৃক্ষা চ মহাভক্তিঃ প্রকীর্তিতা ॥ ৯ ॥

অনুমোদনমীশস্য পূজায়াং ভক্তিরুচ্যতে ।
পূজোপকরণশ্রদ্ধা চাপি ভক্তিরুদীর্যতে ॥ ১০ ॥

শিবোৎসবদিদৃক্ষা চ শিবভক্তির্মহত্তরা ।
তথৈবোৎসবসেবা চ ভক্তিরুক্তাঽতিশোভনা ॥ ১১ ॥

তথৈবোৎসবসেবার্থমাগতানাং মহাত্মনাম্ ।
অন্নপানপ্রদানং চ শিবভক্তিরুদীরিতা ॥ ১২ ॥

মহাদেবকথাদীনাং শ্রবণেচ্ছা মহর্ষয়ঃ ।
মহাভক্তিরিতি প্রোক্তা মহামাহেশ্বরৈর্জনৈঃ ॥ ১৩ ॥

কথাশ্রবণকালে তু শিবস্য পরমাত্মনঃ ।
বিকারঃ স্বরনেত্রাদের্ভক্তিরুক্তা মহাত্মভিঃ ॥ ১৪ ॥

উদ্যানকরণং শম্ভোঃ শিবভক্তিরুদাহৃতা ।
বাপীকূপতডাগাদিকরণং চ মনীষিভিঃ ॥ ১৫ ॥

প্রাকারগোপুরাদীনাং শিবস্যামিততেজসঃ ।
ইষ্টকাদ্যৈশ্চ নির্মাণং শিবভক্তিরুদীরিতা ॥ ১৬ ॥

শিবশাসনযুক্তস্য পূজা শ্রদ্ধাপুরঃসরম্ ।
শিবভক্তিরিতি প্রোক্তা শিবভক্তিপরায়ণৈঃ ॥ ১৭ ॥

শিবারাধনবুদ্ধ্যৈব নিত্যানামপি কর্মণাম্ ।
নৈমিত্তিকানাং করণমপি ভক্তিঃ শিবস্য তু ॥ ১৮ ॥

অভ্যাসঃ শিববিদ্যায়াস্তস্যা অধ্যাপনং তথা ।
শিবভক্তিরিতি প্রোক্তা শিবদৃষ্টিপরায়ণৈঃ ॥ ১৯ ॥

লেখনং শিববিদ্যায়াঃ প্রদানং পুস্তকস্য তু ।
শিবভক্তিরিতি প্রোক্তা শিবশাস্ত্রবিশারদৈঃ ॥ ২০ ॥

শিবপুস্তকনিক্ষেপস্থাননির্মাণমাস্তিকাঃ ।
শিবভক্তিরিতি প্রোক্তা শিবদৃষ্টিপরায়ণৈঃ ॥ ২১ ॥

শিবজ্ঞানৈকনিষ্ঠস্য মঠিকাদানমেব চ ।
অন্নপানাদিদানং চ শিবভক্তিরুদীরিতা ॥ ২২ ॥

শিবজ্ঞানৈকনিষ্ঠস্য শুশ্রূষা শ্রদ্ধয়া সহ ।
শিবভক্তিরিতি প্রোক্তা শিবভক্তিপরায়ণৈঃ ॥ ২৩ ॥

জাপিনাং শিবমন্ত্রস্য শুশ্রূষা চ মহাত্মনাম্ ।
শিবভক্তিরিতি প্রোক্তা শিবতত্ত্ববিচিন্তকৈঃ ॥ ২৪ ॥

শিবযাত্রাপরাণাং তু শুশ্রূষা চ তথৈব চ ।
শিবযাত্রা চ বিদ্বদ্ভিঃ শিবভক্তিঃ প্রকীর্তিতা ॥ ২৫ ॥

শিবযাত্রাপরাণাং তু বাধকানাং তু বাধনম্ ।
শিবভক্তিরিতি প্রোক্তা শিবযাত্রাপরায়ণৈঃ ॥ ২৬ ॥

শিবাপরাধনিষ্ঠানাং ছেদনং পরয়া মুদা ।
শিবভক্তিরিতি প্রোক্তা শিবারাধনতৎপরৈঃ ॥ ২৭ ॥

শিবজ্ঞানৈকনিষ্ঠানাং শিবজ্ঞানস্য সুব্রতাঃ ।
দূষকস্য শিরশ্ছেদঃ শিবভক্তিঃ প্রকীর্তিতা ॥ ২৮ ॥

ভস্মসাধননিষ্ঠানাং দূষকস্য মুনীশ্বরাঃ ।
ছেদনং শিরসঃ সাক্ষাচ্ছিবভক্তিরুদীরিতা ॥ ২৯ ॥

বিষ্ণ্বাদীনাং তু দেবানাং দূষকস্য দুরাত্মনঃ ।
বাধনং শিবভক্তিস্তু প্রোক্তা বেদান্তবেদিভিঃ ॥ ৩০ ॥

বিষ্ণ্বাদিদেবতাভক্তস্যৈব দূষণকারিণঃ ।
বাধনং চ মহাপ্রাজ্ঞৈঃ শিবভক্তিঃ প্রকীর্তিতা ॥ ৩১ ॥

দেবদ্রব্যস্য ভোক্তুশ্চ ব্রাহ্মণদ্রব্যহারিণঃ ।
বাধনং চ মহাপ্রাজ্ঞৈঃ শিবভক্তিঃ প্রকীর্তিতা ॥ ৩২ ॥

আতুরাণাং নৃণাং রক্ষা রক্ষকাণাং চ রক্ষণম্ ।
ভীতস্যাভয়দানং চ শিবভক্তিঃ প্রকীর্তিতা ॥ ৩৩ ॥

সর্বভূতেষু কারুণ্যং প্রিয়ভাষণমেব চ ।
সর্বভূতহিতে শ্রদ্ধা সাক্ষাদ্ভক্তিঃ শিবস্য তু ॥ ৩৪ ॥

সর্বভূতেষু দোষস্যাদর্শনং গুণদর্শনম্ ।
সর্বভূতেষু মৈত্রী চ শিবভক্তিরুদীরিতা ॥ ৩৫ ॥

মহাদেবেঽতিবিশ্বাসো বিশ্বাসঃ শিববেদনে ।
বেদান্তেষু চ বিশ্বাসঃ শিবভক্তিরুদীরিতা ॥ ৩৬ ॥

গুরুক্তার্থেষু বিশ্বাসো গুরুশুশ্রূণং তথা ।
সাঽপি ভক্তিরিতি প্রোক্তা বেদবেদান্তবেদিভিঃ ॥ ৩৭ ॥

ভক্তিরেব পরমার্থদায়িনী ভক্তিরেব ভবরোগনাশিনী ।
ভক্তিরেব পরবেদনপ্রদা ভক্তিরেব পরমুক্তিকারিণী ॥ ৩৮ ॥

ভক্তিযুক্তজনচিত্তপঙ্কজে ভুক্তিমুক্তিফলদঃ পুরাতনঃ ।
শক্তিযুক্তপরবিগ্রহঃ শিবঃ সত্যমেব সততং প্রকাশতে ॥ ৩৯ ॥

ভক্তিযুক্তজনপরিতুষ্টঃ পরমেশঃ সত্যসুখবোধপরমং বপুরনন্তম্ ।
স্বস্য মুনয়ঃ পরমকারুণিক ঈশঃ শক্তিসহিতস্ত্রিনয়নঃ খলু দদাতি ॥ ৪০ ॥

ইতি শ্রীস্কন্দমহাপুরাণে সূতসংহিতায়াং চতুর্থে যজ্ঞবৈভবখণ্ডে শিবভক্তিবিচারো নাম ষড়বিংশোঽধ্যায়ঃ ॥ ২৬ ॥

[স্কন্দ মহাপুরাণ/সূতসংহিতা/যজ্ঞবৈভবখণ্ড/পূর্বভাগ/২৬ অধ্যায়]

অর্থ — সূতদেব বললেন, এখন আমি সংক্ষেপে শিবভক্তির বর্ণনা করছি। যে শিবভক্তির দ্বারা সকল জীব ভোগ (ইহলোকের কল্যাণ) এবং মোক্ষ (মুক্তি) — উভয়ই লাভ করে ॥ ১ ॥

ভবানীসহিত পরমেশ্বর শিবের প্রতি ভক্তি বহুপ্রকার বলে জানা উচিত। এর মধ্যে সর্বোত্তম ও শ্রেষ্ঠ ভক্তি হল — শঙ্করের সঙ্গে সায়ুজ্য (শিবের সঙ্গে একাত্মতা) লাভের উদ্দেশ্যে অটল শ্রদ্ধা ॥ ২ ॥

আর এক প্রকার ভক্তি হল — শঙ্করের সারূপ্য (শিবসদৃশ রূপ) লাভের উদ্দেশ্যে গভীর শ্রদ্ধা, যা শিবের অত্যন্ত প্রিয়। অন্যটি হল — শিবের সামীপ্য (শিবের সান্নিধ্য) লাভের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা, যা বেদজ্ঞদের মতে শ্রেষ্ঠ। আর একটি হল — শিবের সালোক্য (শিবলোকে অবস্থান) লাভের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা, যা অভীষ্ট ফল প্রদান করে ॥ ৩ ॥

আর এক প্রকার ভক্তি হল — শিবতত্ত্বের জ্ঞান লাভের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা, যা সকল পাশ (বন্ধন) ছিন্ন করে ॥ ৪ ॥

আর এক প্রকার ভক্তি হল — বেদের শিরোভাগ (উপনিষদ)-এর প্রতি শ্রদ্ধা, যা প্রত্যক্ষ ব্রহ্মজ্ঞান প্রদান করে। আরেকটি হল — শাস্ত্রশ্রবণের প্রতি শ্রদ্ধা, যা বেদান্তজ্ঞ মহাপুরুষগণ ভক্তি বলে অভিহিত করেছেন ॥ ৫ ॥

আর একটি হল — শোনা তত্ত্বের মনন (গভীর চিন্তন)-এর প্রতি শ্রদ্ধা, যা মানুষের দৃঢ় উপলব্ধি জন্মায়। আর এক প্রকার হল — দেবেশ্বর শিবের ধ্যানের প্রতি শ্রদ্ধা, যা অত্যন্ত মহান ভক্তি ॥ ৬ ॥

আর এক প্রকার ভক্তি হল — পবিত্র ভস্ম ধারণের প্রতি শ্রদ্ধা, যা পাপ বিনাশ করে। আর একটি হল — ত্রিপুণ্ড্র ধারণের প্রতি শ্রদ্ধা, যা পরম তত্ত্বের জ্ঞান প্রদান করে ॥ ৭ ॥

রুদ্রাক্ষ ধারণের প্রতি শ্রদ্ধাকেও ভক্তি বলা হয়েছে। তদ্রূপ ষড়ক্ষর (ওঁ নমঃ শিবায়) মন্ত্রের জপের প্রতি শ্রদ্ধাও এক মহান ভক্তি ॥ ৮ ॥

শিবলিঙ্গের পূজা বা অর্চনার প্রতি শ্রদ্ধাও অনুত্তম (অতুলনীয়) ভক্তি। আর শিবলিঙ্গের পূজা দর্শনের আন্তরিক আকাঙ্ক্ষাকেও মহাভক্তি বলা হয়েছে ॥ ৯ ॥

পরমেশ্বর শিবের পূজার অনুমোদন (সমর্থন ও প্রশংসা) করাও ভক্তি বলে পরিচিত। এছাড়া শিবপূজার উপকরণ সংগ্রহ ও নিবেদনের প্রতি শ্রদ্ধাকেও ভক্তি বলা হয়েছে ॥ ১০ ॥

শিবের উৎসব দর্শনের আন্তরিক ইচ্ছাও এক মহান শিবভক্তি। তদ্রূপ শিবের উৎসবের সেবায় অংশগ্রহণ করাও অতি শোভন (অত্যন্ত উৎকৃষ্ট) ভক্তি বলে বর্ণিত হয়েছে ॥ ১১ ॥

তদ্রূপ শিবোৎসবের সেবার উদ্দেশ্যে আগত মহাত্মাগণকে অন্ন ও পানীয় প্রদান করাও শিবভক্তি বলে অভিহিত হয়েছে ॥ ১২ ॥

হে মহর্ষিগণ! পরমেশ্বর শিবের লীলাকথা ও মাহাত্ম্য শ্রবণের আন্তরিক ইচ্ছাকেও মহান মাহেশ্বরগণ মহাভক্তি বলে অভিহিত করেছেন ॥ ১৩ ॥

পরমাত্মা শিবের কথামৃত শ্রবণের সময় কণ্ঠস্বর, চোখ ইত্যাদির ভক্তিভাবজনিত পরিবর্তন (যেমন—কণ্ঠরোধ, অশ্রু, পুলক ইত্যাদি) মহাত্মাগণ শিবভক্তি বলে বর্ণনা করেছেন ॥ ১৪ ॥

শম্ভুর উদ্দেশ্যে উদ্যান (পুষ্পবাগান) নির্মাণ করাও শিবভক্তি বলে বর্ণিত হয়েছে। তদ্রূপ কূপ, পুকুর, জলাশয় প্রভৃতি নির্মাণ করাকেও মনীষীগণ শিবভক্তি বলেছেন ॥ ১৫ ॥

অসীম তেজস্বী পরমেশ্বর শিবের জন্য প্রাকার (মন্দির প্রাচীর), গোপুর (প্রবেশদ্বার) প্রভৃতি ইষ্টকাদি দ্বারা নির্মাণ করাও শিবভক্তি বলে অভিহিত হয়েছে ॥ ১৬ ॥

শিবশাস্ত্রের বিধান অনুসারে শ্রদ্ধাপূর্বক শিবপূজা করাকে শিবভক্তিতে পরায়ণ মহাপুরুষগণ শিবভক্তি বলে বর্ণনা করেছেন ॥ ১৭ ॥

শিবারাধনার বুদ্ধিতে (শিবকে উদ্দেশ্য করে) নিত্যকর্ম এবং নৈমিত্তিক কর্ম সম্পাদন করাও পরমেশ্বর শিবের ভক্তি বলে গণ্য হয় ॥ ১৮ ॥

শিববিদ্যার নিয়মিত অধ্যয়ন এবং সেই বিদ্যার অধ্যাপনা (অন্যকে শিক্ষা প্রদান) করাকেও শিবদর্শনে পরায়ণ মহাপুরুষগণ শিবভক্তি বলে অভিহিত করেছেন ॥ ১৯ ॥

শিববিদ্যা লিপিবদ্ধ (লেখন) করা এবং সেই বিষয়ক গ্রন্থ দান করাকেও শিবশাস্ত্রে পারদর্শী আচার্যগণ শিবভক্তি বলে বর্ণনা করেছেন ॥ ২০ ॥

শিবশাস্ত্র বা শিববিষয়ক পুস্তক সংরক্ষণের জন্য স্থান নির্মাণ করাকেও শিবদর্শনে পরায়ণ আস্তিকগণ শিবভক্তি বলে বর্ণনা করেছেন ॥ ২১ ॥

শিবজ্ঞানে একনিষ্ঠ ব্যক্তিকে মঠ (আশ্রম) দান করা এবং তাঁকে অন্ন, পানীয় প্রভৃতি দান করাও শিবভক্তি বলে অভিহিত হয়েছে ॥ ২২ ॥

শিবজ্ঞানে একনিষ্ঠ ব্যক্তির প্রতি শ্রদ্ধাসহকারে সেবা-শুশ্রূষা করাকেও শিবভক্তিতে পরায়ণ মহাপুরুষগণ শিবভক্তি বলে বর্ণনা করেছেন ॥ ২৩ ॥

শিবমন্ত্র জপরত মহাত্মাগণের সেবা-শুশ্রূষা করাকেও শিবতত্ত্বের চিন্তকগণ শিবভক্তি বলে অভিহিত করেছেন ॥ ২৪ ॥

শিবযাত্রায় (তীর্থযাত্রা বা ধর্মীয় যাত্রায়) নিয়োজিত ব্যক্তিদের সেবা-শুশ্রূষা করা এবং নিজে শিবযাত্রা সম্পাদন করাও বিদ্বানগণ শিবভক্তি বলে বর্ণনা করেছেন ॥ ২৫ ॥

শিবযাত্রায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের পথে যারা বাধা সৃষ্টি করে, তাদের সেই বাধা প্রতিহত করাকেও শিবযাত্রায় পরায়ণ ব্যক্তিগণ শিবভক্তি বলে অভিহিত করেছেন ॥ ২৬ ॥

যারা শিবের প্রতি অপরাধে লিপ্ত, তাদের সেই অপরাধ প্রবণতা দৃঢ়ভাবে দূর করাকেও শিবারাধনায় তৎপর মহাপুরুষগণ শিবভক্তি বলে বর্ণনা করেছেন ॥ ২৭ ॥

শিবের প্রতি অনুচিত বাক্য প্রভৃতির মাধ্যমে যারা অপরাধ করে, তাদের সম্পূর্ণ উৎসাহসহ দণ্ডিত করাই শিবভক্তি ॥ ২৭ ॥

হে সুব্রতগণ ! যিনি একমাত্র শিবজ্ঞানে নিষ্ঠাবান, তাঁর প্রতি বা শিবজ্ঞানের উপর যদি কোনো দুষ্ট ব্যক্তি বিদ্বেষবশত নিন্দা বা অপমান করে দোষারোপ করে ( সেই অকল্যাণকারী অপরাধী দুষ্ট ব্যক্তির) শিরচ্ছেদ (মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত) করা [শিবভক্ত শাসকের কর্তব্য] — এমন বিধান প্রচলনকারীর ব্যবহারকেই শিবভক্তি বলা হয়েছে ॥ ২৮ ॥

হে মুনিশ্রেষ্ঠগণ ! যারা ভস্মধারণে একনিষ্ঠ, তাদের নিন্দাকারীর শিরশ্ছেদ (আক্ষরিক অর্থে 'মস্তকচ্ছেদন') করাকেও শাস্ত্রে শিবভক্তি বলে বর্ণনা করা হয়েছে ॥ ২৯ ॥

যে দুষ্ট হৃদয়যুক্ত ব্যক্তি বিষ্ণু তথা অনান্য দেবদেবীর উপর দোষ আরোপ করেন, বেদান্তজ্ঞ মহাপুরুষগণ তাকে আটকানোই শিবভক্তি বলে বর্ণনা করেছেন ॥ ৩০

বিষ্ণু তথা অনান্য দেবদেবীর ভক্তদের কষ্টপ্রদানকারী ব্যক্তিকে দণ্ড ইত্যাদি (শাস্তি) দ্বারা আটকে দেওয়াই হল শিবভক্তি - এমনটা মহাপ্রাজ্ঞগণ বর্ণনা করেছেন ॥ ৩১

দেবতার উদ্দেশ্যে নিবেদিত সম্পদ ভোগকারী এবং ব্রাহ্মণের সম্পদ হরণকারীর প্রতিবন্ধকতা দূর করাকেও মহাপ্রাজ্ঞগণ শিবভক্তি বলে বর্ণনা করেছেন ॥ ৩২ ॥

অসুস্থ মানুষের রক্ষা করা, রক্ষাকারীদের রক্ষা করা এবং ভীত ব্যক্তিকে অভয়দান করাকেও শিবভক্তি বলে বর্ণনা করা হয়েছে ॥ ৩৩ ॥

সকল জীবের প্রতি দয়া, সকলের সঙ্গে প্রিয় ও মধুর ভাষায় কথা বলা এবং সকল প্রাণীর কল্যাণে আন্তরিক শ্রদ্ধা রাখা — এসবই সাক্ষাৎ পরমেশ্বর শিবের ভক্তি ॥ ৩৪ ॥

সকল জীবের দোষ না দেখে গুণের প্রতি দৃষ্টি রাখা এবং সকলের প্রতি মৈত্রীভাব পোষণ করাকেও শিবভক্তি বলা হয়েছে ॥ ৩৫ ॥

মহাদেবের প্রতি অটল বিশ্বাস, শিববিষয়ক শাস্ত্রবাণীর প্রতি বিশ্বাস এবং বেদান্তের প্রতি বিশ্বাস রাখাকেও শিবভক্তি বলে বর্ণনা করা হয়েছে ॥ ৩৬ ॥

গুরুর উপদেশ ও বাণীর প্রতি বিশ্বাস রাখা এবং শ্রদ্ধার সঙ্গে গুরুর সেবা-শুশ্রূষা করাকেও বেদ ও বেদান্তজ্ঞ মহাপুরুষগণ শিবভক্তি বলে অভিহিত করেছেন ॥ ৩৭ ॥

একমাত্র ভক্তিই পরম পুরুষার্থ প্রদান করে। একমাত্র ভক্তিই সংসাররূপ মহারোগের বিনাশিনী। একমাত্র ভক্তিই পরমতত্ত্বের জ্ঞান দান করে। একমাত্র ভক্তিই পরম মুক্তি প্রদান করে ॥ ৩৮ ॥

ভক্তিযুক্ত ব্যক্তির হৃদয়রূপ পদ্মে ভোগ ও মোক্ষের ফলদাতা, শক্তিসহিত, সনাতন পরমেশ্বর শিব সর্বদাই সত্যরূপে প্রকাশিত হন ॥ ৩৯ ॥

ভক্তিযুক্ত ব্যক্তির প্রতি পরমেশ্বর শিব অত্যন্ত সন্তুষ্ট হন এবং পরমকারুণিক, ত্রিনয়ন, শক্তিসহিত সেই ঈশ্বর মুনিগণকে নিজের অনন্ত, পরম, সত্য, সুখময় ও চৈতন্যময় স্বরূপ প্রদান করেন ॥ ৪০ ॥


এইভাবে শ্রীস্কন্দমহাপুরাণের সূতসংহিতার চতুর্থ যজ্ঞবৈভবখণ্ডে ‘শিবভক্তিবিচার’ নামক ছাব্বিশতম অধ্যায় সমাপ্ত হলো ॥ ২৬ ॥

_________________________________________________________________________________________________

🚩 তথ্য সংগ্রহকারী ও অনুবাদক : শিবালয় প্রতিষ্ঠাতা শিবদ্বারাধীশাধ্যক্ষ দেশিক আচার্যপরমাধিকারী শ্রীশ্রীগুরু নন্দীনাথ শৈব আচার্যদেব 🚩 

©️ কপিরাইট ও প্রচারে : Shivalaya🔥 

শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্ 🚩 

ॐ নমঃ পার্বতীপতয়ে হর হর মহাদেব 🚩 


পরমেশ্বর শিবের ও সনাতন শৈবধর্মের বিষয়ে এমন গুহ্য সত্য রহস্য ও সত্য উন্মোচনমূলক লেখা আরো পেতে অবশ্য‌ই আমাদের Shivalaya ফেসবুক পেজ Follow করে Favourite করে রাখুন। এই তথ্য দ্বারা যদি আপনার জ্ঞান বৃদ্ধি হয়ে থাকে তবে অবশ্য‌ই এই লেখাটি শেয়ার করুন, যাতে সত্য প্রকাশ্যে আসে।

 #সনাতনধর্ম #শিবালয় #শিব #পরমেশ্বরশিব  #Shivalaya #শৈবধর্ম #শিবশাসন #বেদ #স্কন্দমহাপুরাণ #শাস্ত্র #শিবভক্তিরলক্ষণ #শিবভক্তি #শিবভক্ত

[এই পোস্টটি শুধুমাত্র শিক্ষামূলক ও জনসচেতনতার উদ্দেশ্যে প্রকাশিত।এখানে ব্যবহৃত চিত্রটি কেবল বিষয়টি সহজে উপস্থাপনের জন্য Ai-সহায়তায় নির্মিত একটি প্রতীকী চিত্র, এই ছবিটির মধ্যে কিছু লেখা আলাদা ভাবে লেখা হয়েছে। সকল শাস্ত্রীয় উদ্ধৃতি ও তথ্য যথাসম্ভব মূল গ্রন্থ অনুসারে ছবি উপস্থাপিত হয়েছে।]

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ