সকল উদ্ভিদের সুখ ও ব্যথা অনুভবের চেতনাশক্তি আছে — বলছে সনাতন ধর্মের শাস্ত্র
🌱 সকল উদ্ভিদের সুখ ও ব্যথা অনুভবের চেতনাশক্তি আছে — বলছে সনাতন ধর্মের শাস্ত্র
__________________________________________________
🔰 ভূমিকা —
বর্তমানে নিরামিষ ও আমিষ আহারকে কেন্দ্র করে সনাতন সমাজে ব্যাপক বিতর্ক দেখা যায়। বিশেষত অনেক নিরামিষাশী ব্যক্তি দাবি করেন যে, পশু বধ করে মাংস আহার করলে পশুর ভীষণ কষ্ট ও যন্ত্রণা হয় ; তারা চিৎকার করে, তাই যারা নিজেদের রসনা তৃপ্তির জন্য পশুকে নির্দয়ভাবে বধ করে মাংস আহার করেন তারা পশুহিংসক, পাপী, অধার্মিক, এমনকি সেই আমিষভোজী রাক্ষুসে ব্যক্তি দেবতার পূজা করারও যোগ্য নন।
কিন্তু যখন সেই নিরামিষাশীদের জিজ্ঞাসা করা হয় — আপনারা যে শাক, তৃণ, লতা, বৃক্ষ ও অন্যান্য উদ্ভিদ ছেদন করে আহার করেন, সেগুলিও যদি প্রাণসম্পন্ন ও অনুভূতিশীল হয়, তবে সেই জীবহত্যা কীভাবে পাপমুক্ত হয় ? তখন নিরামিষাশীদের পক্ষ থেকে সাধারণত উত্তর দেওয়া হয় যে, উদ্ভিদের কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র (Central Nervous System) নেই, তারা পশুর মতো চিৎকার করতে পারে না, তাই তারা ব্যথা, সুখ বা দুঃখ অনুভব করে না,তাই তাদের সম্পূর্ণভাবে না বধ করে খানিকটা ছেদন করে খাওয়া যায় এতে তাদের কষ্ট হয় না, তারা কোনো প্রতিক্রিয়াও দেখায় না, অথবা তাদের সম্পূর্ণভাবে উপড়ে নিয়ে বা বধ করে খেলেও তারা অন্তত ব্যথা পায় না, তাই উদ্ভিদকে আহার করা যেতেই পারে। এই যুক্তির ভিত্তিতেই অনেকেই মনে করেন যে উদ্ভিদ ভক্ষণে কোনো পাপ নেই, অথচ নিরামিষবাদিরা দাবি করেন, পশু বধ করে মাংস ভক্ষণ সর্বতোভাবে অধর্ম।
কিন্তু প্রশ্ন হল — ধর্ম-অধর্ম নির্ণয়ের ক্ষেত্রে সনাতন ধর্মে চূড়ান্ত প্রমাণ কী ? আধুনিক বিজ্ঞানের পরিবর্তনশীল মতামত, নাকি বেদ, স্মৃতি, মহাকাব্য ও পুরাণাদি শাস্ত্র ? সনাতন ধর্মে - ধর্মের একমাত্র প্রামাণ্য ভিত্তি — শাস্ত্র। আধুনিক বিজ্ঞান জড়জগতের কার্যপ্রণালী নিয়ে অনুসন্ধান করে ; কিন্তু ধর্ম, অধর্ম, পুণ্য, পাপ, জীবের আধ্যাত্মিক স্বরূপ কিংবা নৈতিক বিধান নির্ধারণ করা তার বিষয় নয়। তাই ধর্মীয় বিষয়ে শাস্ত্রবচনই সর্বাগ্রে গ্রহণীয়।
এই প্রবন্ধে সেই শাস্ত্রসম্মত বিচারই উপস্থাপিত হবে। ব্রহ্মমহাপুরাণের পিপ্পলাদোপাখ্যান, মহাভারতের শান্তিপর্বে ভৃগু-ভরদ্বাজ সংলাপ এবং মনুস্মৃতির স্থাবরজীব (উদ্ভিজ্জ) বিষয়ক উক্তির আলোকে প্রতিপন্ন করা হবে যে, সনাতন শাস্ত্র উদ্ভিদকে নিছক জড় পদার্থ বলে মনে করে না ; বরং তাদের চৈতন্যসম্পন্ন জীবরূপে স্বীকার করে। শাস্ত্রে উদ্ভিদের শ্রবণ, দর্শন, গন্ধগ্রহণ, রসগ্রহণ, স্পর্শবোধ, রোগ, আরোগ্য, বৃদ্ধি, সুখ-দুঃখ অনুভব, এমনকি স্নেহ, রক্ষণাবেক্ষণ ও পারস্পরিক সহমর্মিতারও স্পষ্ট বর্ণনা বিদ্যমান। ব্রহ্মমহাপুরাণে দেখা যায়, বনস্পতি, ঔষধি, বৃক্ষ, পশু ও পক্ষীগণ দধীচি ঋষির পত্নীর শোকে রোদন করছেন, মাতাপিতৃহীন পিপ্পলাদকে নিজেদের সন্তানরূপে গ্রহণ করছেন, তার জন্য সোমদেবের নিকট অমৃত প্রার্থনা করছেন এবং তাকে লালন-পালন করছেন। আবার মহাভারতে ভৃগু ঋষি যুক্তিসহকারে প্রতিষ্ঠা করেছেন যে উদ্ভিদেরও পঞ্চভূত, ইন্দ্রিয়, জীবন ও সুখ-দুঃখ অনুভবের ক্ষমতা রয়েছে। মনুস্মৃতিও স্থাবর জীবের অন্তর্নিহিত চেতনা ও সুখ-দুঃখ অনুভবের কথা স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে।
এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তি, সম্প্রদায় বা খাদ্যাভ্যাসকে আক্রমণ করা নয় ; বরং শাস্ত্রের প্রকৃত বক্তব্যকে তুলে ধরা। যদি শাস্ত্রমতে উদ্ভিদও চৈতন্যসম্পন্ন জীব হয় এবং সুখ-দুঃখ অনুভব করে, তবে কেবল “উদ্ভিদের অনুভূতি নেই”—এই যুক্তির উপর ভিত্তি করে নিরামিষভোজনকে সম্পূর্ণ অহিংস এবং মাংসভোজনকে একমাত্র হিংসা বলে প্রচার করা কতখানি শাস্ত্রসম্মত, তা পাঠক নিজেই বিচার করবেন। নিম্নে প্রামাণ্য শাস্ত্রবচনের আলোকে উদ্ভিদের চেতনা, অনুভূতি ও সুখ-দুঃখ গ্রহণক্ষমতার বিষয়টি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হল।
__________________________________________________
♦️ ব্রহ্মমহাপুরাণে উদ্ভিদের চেতনার প্রমাণ —
উদ্ভিদদের চেতনা শক্তি আছে এমন একটি বর্ণনা রয়েছে চৌখাম্বা প্রকাশিত ‘ব্রহ্মমহাপুরাণের ১১০ তম অধ্যায়ে পিপ্পলেশ্বর তীর্থ’ কাহিনীর প্রসঙ্গে। সেই কাহিনীর মধ্যে ঔষধীগুণসম্পন্ন বা ঔষধীগুণহীন সকল প্রকার তৃণলতা-বৃক্ষাদির পীড়া লাভের বর্ণনা রয়েছে।
✳️ প্রসঙ্গ টি হল — বৃত্রাসুর ইন্দ্রসহ দেবতাদের উপর অত্যাচার করতে শুরু করলে দেবতারা পরমশৈবাচার্য মহর্ষি দধীচির শরণাপন্ন হন। দেবতারা পূর্বকালে দধীচির কাছে সংরক্ষিত হিসেবে রেখে যাওয়া ভয়ংকর শক্তিশালী অস্ত্রগুলি ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসেছিলেন। কিন্তু দধীচি বলেন দেবতারা দীর্ঘ সময় ধরে অস্ত্র নিতে আসেননি, দেবতদের অস্ত্রগুলি সংরক্ষণের কারণে অসুর-দৈত্যরা দধীচিকে শত্রু ভাবতে শুরু করেন, তাই দধীচি অস্ত্রগুলি ক্ষয় বা হরণ হবার আশঙ্কা থেকে মুক্ত হতে অস্ত্রগুলি ধুয়ে মন্ত্রপুত জলে সে অস্ত্রের শক্তিগুলো নিবিষ্ট করেন এবং তা নিজে খেয়ে নিয়েছেন। এর কিছুদিন কালবাদেই দেবতারা এসে অস্ত্র চাইছেন, তখন দেবতারা সব শুনে বললেন ঐ অস্ত্র ছাড়া কোনোভাবে দেবতাদের রক্ষা সম্ভব নয়। তখন দধীচি বললেন, তার নিজের শরীরের অস্থি নিয়ে তা দিয়ে অস্ত্র বানাতে, কারণ সেই অস্ত্র গুলির শক্তি তার হাড়ের মধ্যে জমা হয়েছে। দেবতারা রাজি হন, পরমশৈবাচার্য মহর্ষি দধীচি তখন যোগবলে পরমেশ্বর শিবকে স্মরণ করে দেহত্যাগ করেন। দেবতারা গোমাতাদের দিয়ে চাটিয়ে দধীচির দেহের মাংস অস্থি থেকে আলাদা করে নিয়ে চলে যান, পরবর্তীতে বিশ্বকর্মা তা দিয়ে বজ্রাস্ত্র তৈরী করে ইন্দ্রকে দেন, তা দিয়ে বৃত্রাসুর নিহত হন। এদিকে দধীচির স্ত্রী সুবর্চা (গভস্তিনী/প্রাতিথেয়ী) দেবী মা পার্বতীর পূজা করে আশ্রমে ফিরে এসে তার স্বামীকে কোথাও দেখতে না পেয়ে গৃহে প্রজ্জ্বলিত অগ্নির কাছ থেকে সকল ঘটনা জানতে পেরে মহাশোকে পড়ে যান, তিনি তখন দেহত্যাগের সংকল্প নিয়ে অগ্নিতে প্রবেশ করতে যান, কিন্তু তিনি তখন গর্ভবতী ছিলেন তথা প্রসবকালের অতিনিকটেই ছিলেন, তাই তিনি অগ্নিতে প্রবেশ করবার পূর্বে পাথর দিয়ে নিজের গর্ভ ফাটিয়ে দধীচিপুত্র পিপ্পলাদ কে একটি পিপ্পল (অশ্বত্থ) গাছের নিচে রেখে উদ্ভিদ সহ সকল প্রাণী ও দেবতাদের সাক্ষী করে তাদের কাছে ঐ শিশুর সংরক্ষণের ভার সপে দিয়ে অগ্নিতে প্রবেশ করেন। তখন সকল উদ্ভিদ সহ প্রাণী অতিকাতর স্বরে শোকে আচ্ছন্ন হয়ে রোদন করেন ও দধীচির পত্নীকে বারণ করতে থাকেন। এরপর পিপ্পলাদ কে তারা সকলে মিলে পরিপোষণ করতে শুরু করেন। বনস্পতি তাদের রাজা সোমের কাছে ঐ শিশুর জন্য অমৃত চেয়ে বসেন, চন্দ্র দিয়েও দেন। ঐ শিশু পিপুল গাছের তলায় জন্মেছিল তাই তার নাম পিপ্পলাদ হয়েছিল। তারপর শিশু বড় হলে বৃক্ষদের কাছ থেকে সব জানতে পারেন ও দেবতাদের উপর প্রতিশোধ নিতে বৃক্ষের মাধ্যমে চন্দ্রের গিয়ে পরামর্শ অনুযায়ী পরমেশ্বর শিবের উপাসনা করেন ও মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করেন।
এখানে সেই প্রসঙ্গের থেকে উদ্ভিদের চেতনার প্রমাণ দেওয়ার জন্য কিছু প্রমাণ উল্লেখ করছি।
🔸 ব্রহ্মমহাপুরাণ থেকে প্রমাণ —
নত্বা চ গঙ্গাং ভুবমাশ্রমং চ, বনস্পতীনোষধীরাশ্রমস্থান্ ॥ ৬৮ ॥
প্রাতিথেয়্যুবাচ।
পিত্রা হীনো বন্ধুভির্গোত্রজৈশ্চ, মাত্রা হীনো বালকঃ সর্ব এব।
রক্ষন্তু সর্বেঽপি চ ভূতসংঘাস্তথৌষধ্যো বালকং লোকপালাঃ ॥ ৬৯ ॥
যে বালকং মাতৃপিতৃপ্রহীণং, সনির্বিশেষং স্বতনুপ্ররূকৈঃ।
পশ্যন্তি রক্ষন্তি ত এব নূনং, ব্রহ্মাদিকানামপি বন্দনীয়াঃ ॥ ৭০ ॥
[চৌখাম্বা প্রকাশিত ‘ব্রহ্মমহাপুরাণ/১১০ তম অধ্যায় (পিপ্পলেশ্বর তীর্থ)]
✅ অর্থ : গঙ্গা, পৃথিবী, আশ্রম, আশ্রমে অবস্থিত বনস্পতি ও ঔষধিসমূহকে প্রণাম করে — ॥ ৬৮ ॥
প্রাতিথেয়ী বললেন, এই বালক পিতৃহীন, মাতৃহীন, আত্মীয়স্বজন ও গোত্রজদের থেকেও বঞ্চিত। সমস্ত ভূতগণ, ঔষধিসমূহ এবং লোকপালগণ যেন এই শিশুকে রক্ষা করেন ॥ ৬৯ ॥
যে সকল সত্তা এই মাতাপিতৃহীন, অসহায় শিশুটিকে নিজেদের সন্তানসম মনে করে দেখাশোনা ও রক্ষা করবে, তারা নিশ্চয়ই ব্রহ্মা প্রভৃতি দেবতাদের কাছেও বন্দনীয় হবে ॥ ৭০ ॥
ব্রহ্মোবাচঃ
ইত্যুক্ত্বা চাত্যজদ্ বালং ভর্তৃচিত্তপরায়ণা।
পিপ্পলানাং সমীপে তু ন্যস্য বালং নমস্য চ ॥ ৭১ ॥
অগ্নিং প্রদক্ষিণীকৃত্য যজ্ঞপাত্রসমন্বিতা।
বিবেশাগ্নিং প্রাতিথেয়ী ভর্ত্রা সহ দিবং যযৌ ॥ ৭২ ॥
রুরুবুশ্চাঽঽশ্রমস্থা যে বৃক্ষাশ্চ বনবাসিনঃ।
পুত্রবৎ পোষিতা যেন ঋষিণা চ দধীচিনা ॥ ৭৩ ॥
বিনা তেন ন জীবামস্তয়া মাত্রা বিনা তথা।
মৃগাশ্চ পক্ষিণঃ সর্বে বৃক্ষাঃ প্রোচুঃ পরস্পরম্ ॥ ৭৪ ॥
[চৌখাম্বা প্রকাশিত ‘ব্রহ্মমহাপুরাণ/১১০ তম অধ্যায় (পিপ্পলেশ্বর তীর্থ)]
✅ অর্থ : ব্রহ্মা বললেন — এভাবে বলে পতির প্রতি সম্পূর্ণ অনুরক্তা প্রাতিথেয়ী শিশুটিকে পিপ্পল (অশ্বত্থ) বৃক্ষসমূহের নিকটে রেখে তাদের প্রণাম করলেন ॥ ৭১ ॥
অগ্নিকে প্রদক্ষিণ করে এবং যজ্ঞপাত্রসহ তিনি অগ্নিতে প্রবেশ করলেন; এরপর স্বামীর সঙ্গে স্বর্গলোকে গমন করলেন ॥ ৭২ ॥
ঋষি দধীচি যেসব আশ্রমবাসী পশু এবং অরণ্যে বসবাসকারী বৃক্ষকে নিজের পুত্রের ন্যায় লালন-পালন করেছিলেন — ॥ ৭৩ ॥
তাঁকে এবং সেই মাতৃসম প্রাতিথেয়ীকে ছাড়া আমরা বাঁচতে পারব না — এভাবে সমস্ত পশু, পক্ষী ও বৃক্ষ পরস্পরের মধ্যে বলতে লাগল ॥ ৭৪ ॥
বৃক্ষা ঊচুঃ
স্বর্গমাসেদুষোঃ পিত্রোস্তদপত্যেষ্বকৃত্রিমম্।
যে কুর্বন্ত্যনিশং স্নেহং ত এব কৃতিনো নরাঃ ॥ ৭৫ ॥
দধীচিঃ প্রাতিথেয়ী বা বীক্ষতেঽস্মান্ যথা পুরা।
তথা পিতা ন মাতা বা ধিগস্মান্ যাপিনো বয়ম্ ॥ ৭৬ ॥
অস্মাকমপি সর্বেষামতঃ প্রভৃতি নিশ্চিতম্।
বালো দধীচিঃ প্রাতিথেয়ী বালো ধর্মঃ সনাতনঃ ॥ ৭৭ ॥
[চৌখাম্বা প্রকাশিত ‘ব্রহ্মমহাপুরাণ/১১০ তম অধ্যায় (পিপ্পলেশ্বর তীর্থ)]
✅ অর্থ : বৃক্ষগণ বললেন — যেসব ব্যক্তি স্বর্গে গমনকারী পিতামাতার সন্তানদের প্রতি অকৃত্রিম স্নেহ প্রদর্শন করেন, প্রকৃতপক্ষে তারাই সত্যিকার মহৎ ব্যক্তি ॥ ৭৫ ॥
দধীচি ঋষি ও প্রাতিথেয়ী যেমন পূর্বে আমাদের স্নেহভরে দেখতেন, তেমনভাবে আমরা যদি তাদের সন্তানকে রক্ষা করতে না পারি, তবে আমাদের পিতা-মাতা হওয়ার বা বেঁচে থাকার কোনো সার্থকতা নেই ; ধিক্ আমাদের ॥ ৭৬ ॥
অতএব আজ থেকে আমরা সবাই দৃঢ়ভাবে স্থির করলাম — দধীচি ও প্রাতিথেয়ীর এই সন্তানই আমাদের সন্তান; তাকে লালন-পালন করাই আমাদের সনাতন ধর্ম ॥ ৭৭ ॥
[লক্ষ্য করুন — শাস্ত্রমতে, বৃক্ষ অর্থাৎ স্থাবর জাতি কথা বলছে, মানুষের মতো কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রহীন ও মুখহীন অবস্থাতেও]
ব্রহ্মোবাচ ।
এবমুক্ত্বা তদৌষধ্যো বনস্পতিসমন্বিতাঃ ।
সোমং রাজানমভ্যেত্য যাচিরেঽমৃতমুত্তমম্ ॥ ৭৮ ॥
স চাপি দত্তবান্ তেভ্যঃ সোমোঽমৃতমনুত্তমম্ ।
দদুর্বালায় তে চাপি অমৃতং সুরবল্লভম্ ॥ ৭৯ ॥
স তেন তৃপ্তো ববৃধে শুক্লপক্ষে যথা শশী ।
পিপ্পলৈঃ পালিতো যস্মাৎ পিপ্পলাদঃ স বালকঃ ।
প্রবৃদ্ধঃ পিপ্পলানেবমুবাচাতিবিস্মিতঃ ॥ ৮০ ॥
[চৌখাম্বা প্রকাশিত ‘ব্রহ্মমহাপুরাণ/১১০ তম অধ্যায় (পিপ্পলেশ্বর তীর্থ)]
✅ অর্থ : ব্রহ্মা বললেন — এভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ঔষধিসম্পন্ন বনস্পতিসমূহ রাজা সোমের কাছে গিয়ে উৎকৃষ্ট অমৃত প্রার্থনা করল ॥ ৭৮ ॥
রাজা সোমও তাদের সেই উৎকৃষ্ট অমৃত প্রদান করলেন; আর তারা দেবগণের প্রিয় সেই অমৃত শিশুটিকে পান করাল ॥ ৭৯ ॥
সেই অমৃত পান করে শিশুটি যেমন শুক্লপক্ষে চন্দ্র বৃদ্ধি পায়, তেমনি দ্রুত বেড়ে উঠতে লাগল। পিপ্পল (অশ্বত্থ) বৃক্ষগণ তাকে লালন-পালন করেছিলেন বলে তার নাম হলো পিপ্পলাদ। বড় হয়ে সে বিস্মিত হয়ে পিপ্পল বৃক্ষদের উদ্দেশে এইরূপ বলল ॥ ৮০ ॥
পিপ্পলাদ উবাচ।
মানুষেভ্যো মানুষাস্তু জায়ন্তে পক্ষিভিঃ খগাঃ ।
বীজেভ্যো বীরুধো লোকে বৈষম্যং নৈব দৃশ্যতে ।
বার্ক্ষস্ত্বহং কথং জাতো হস্তপাদাদিজীববান্ ॥ ৮১ ॥
[চৌখাম্বা প্রকাশিত ‘ব্রহ্মমহাপুরাণ/১১০ তম অধ্যায় (পিপ্পলেশ্বর তীর্থ)]
✅ অর্থ : পিপ্পলাদ বললেন — মানুষ থেকে মানুষেরই জন্ম হয়, পক্ষী থেকে পক্ষীর জন্ম হয় এবং বীজ থেকে উদ্ভিদের (বীরুধ) উৎপত্তি হয়। জগতে এর অন্যথা কখনও দেখা যায় না। তাহলে আমি কীভাবে বৃক্ষজাত হয়েও হাত-পা-যুক্ত জীবন্ত মানুষরূপে জন্মগ্রহণ করলাম ? ॥ ৮১ ॥
ব্রহ্মোবাচ ।
বৃক্ষাস্তদ্বচনং শ্রুত্বা সর্বমূচুর্যথাক্রমম্।
দধীচের্মরণং সাধ্ব্যাস্তথা চাগ্নিপ্রবেশনম্ ॥ ৮২ ॥
অস্থ্নাং সংহরণং দেবৈরেতৎসর্বং সবিস্তরম্।
শ্রুত্বা দুঃখসমাবিষ্টো নিপপাত তদা ভূবি ॥ ৮৩ ॥
আশ্বাসিতঃ পুনর্বৃক্ষৈর্বাক্যৈর্ধর্মার্থসংহিতৈঃ।
আশ্বস্তঃ স পুনঃ প্রাহ তদৌষধিবনস্পতীন্ ॥ ৮৪ ॥
[চৌখাম্বা প্রকাশিত ‘ব্রহ্মমহাপুরাণ/১১০ তম অধ্যায় (পিপ্পলেশ্বর তীর্থ)]
✅ অর্থ : ব্রহ্মা বললেন — পিপ্পলাদের এই কথা শুনে বৃক্ষগণ ক্রমানুসারে সমস্ত ঘটনা তাকে বলল — ঋষি দধীচির মৃত্যু, সাধ্বী প্রাতিথেয়ীর অগ্নিতে প্রবেশ (সহমরণ), দেবতাদের দ্বারা দধীচির অস্থিসমূহ গ্রহণ করা — এই সমস্ত ঘটনাই তারা বিস্তারে বর্ণনা করল। সব কথা শুনে পিপ্পলাদ গভীর শোকে অভিভূত হয়ে ভূমিতে লুটিয়ে পড়ল ॥ ৮২-৮৩ ॥
পরে বৃক্ষগণ ধর্ম ও কল্যাণময় উপদেশপূর্ণ বাক্যের মাধ্যমে তাকে সান্ত্বনা দিল। সান্ত্বনা লাভ করে পিপ্পলাদ পুনরায় সেই ঔষধি ও বনস্পতিগণকে উদ্দেশ করে বলতে লাগলেন ॥ ৮৪ ॥
⏺️ বিশ্লেষণ — এই সমগ্র ঘটনাপ্রবাহ শাস্ত্রের দৃষ্টিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এখানে ঔষধি সম্পন্ন তৃণগুল্মলতা সহ বৃক্ষাদি স্থাবরজাতির মধ্যে মধ্যে স্মৃতিশক্তি, বিচারবুদ্ধি, শোক, করুণা, স্নেহ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ, কথোপকথন, কর্তব্যবোধ এবং পরোপকারের মানসিকতা — এই সকল চৈতন্যের লক্ষণ স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে। সেই শাস্ত্রবচনগুলি মূল সংস্কৃত পাঠ ও বাংলা অর্থসহ উপস্থাপিত হয়েছে। এখানে পরমশৈবাচার্য মহর্ষি দধীচির মহান দিব্যপুত্র রুদ্রাবতার পরমশৈবাচার্য পিপ্পলাদ মহর্ষির জন্মকাহিনীর বিবরণ উপস্থাপন করা হয়েছে। কোনো নিরামিষাশী ব্যক্তি যদি নিজেকে ধার্মিক বলে ভাবছেন অথচ এই কাহিনীকে সত্য বলে মানতে অস্বীকার করার দুঃসাহস করেন, তাহলে সেই ব্যক্তি কোনভাবেই ধার্মিক নয়, তিনি শাস্ত্রের বচনে সংশয় প্রকাশকারী নাস্তিক তথা অধার্মিক বলে গণ্য। এমন ধরনের জেদসম্পন্ন শাস্ত্র বিরোধী ব্যক্তিদের মুখে কখনোই পাপ-পুণ্য বা উচিত অনুচিত বা দয়াধর্মের প্রবচন মানায় না।
__________________________________________________
♦️ মহাভারতে উদ্ভিদের চেতনার শাস্ত্রীয় বিচার —
উদ্ভিদের মধ্যে চেতনা, ইন্দ্রিয়শক্তি ও সুখ-দুঃখ অনুভবের ক্ষমতা আছে কি না—এই প্রশ্নটি কেবল আধুনিক যুগের নয়; প্রাচীন ভারতীয় ঋষিরাও এই বিষয় নিয়ে গভীর দার্শনিক আলোচনা করেছেন। মহাভারতের শান্তিপর্বের ৭৮ অধ্যায়ে মহর্ষি ভৃগু ও মহর্ষি ভরদ্বাজের মধ্যকার সংলাপে এই বিষয়টি অত্যন্ত যুক্তিপূর্ণভাবে উপস্থাপিত হয়েছে।
এই সংলাপে ভরদ্বাজ প্রথমে আপত্তি উত্থাপন করেন যে, উদ্ভিদে মানুষের মতো চোখ, কান, নাক, জিহ্বা বা ত্বক দৃশ্যমান নয় ; তাদের চলাফেরা নেই, তাই তাদের পঞ্চভূত, ইন্দ্রিয় কিংবা চেতনা আছে বলে মনে হয় না, যেমনটা আজকালকার কট্টর নিরামিবাদী ব্যক্তিগণ দাবী করেন । ভরদ্বাজের এর এই আপত্তির উত্তরে মহর্ষি ভৃগু একে একে যুক্তি ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রতিপন্ন করেন যে, উদ্ভিদও পঞ্চভূতসমন্বিত জীব ; তাদের নিজস্ব উপায়ে ইন্দ্রিয়ক্রিয়া, আহার, বৃদ্ধি, রোগ, আরোগ্য এবং সুখ-দুঃখ অনুভবের ক্ষমতা বিদ্যমান। নিম্নে সেই গুরুত্বপূর্ণ শাস্ত্রবচন মূল সংস্কৃত পাঠ ও বাংলা অর্থসহ উপস্থাপিত হল —
🔸 মহাভারত থেকে প্রমাণ —
চেষ্টা বায়ুঃ খমাকাশমুষ্মাগ্নিঃ সলিলং দ্রবঃ ।
পৃথিবী চাত্র সংঘাতঃ শরীরং পাঞ্চভৌতিকম্ ॥ ৪ ॥
ইত্যেতৈঃ পঞ্চভির্ভূ তৈর্যুক্তং স্থাবরজঙ্গমম্ ।
শ্রোত্রং ঘ্রাণং রসঃ স্পর্শো দৃষ্টিশ্চেন্দ্রিয়সংজ্ঞিকাঃ ॥ ৫ ॥
ভরদ্বাজ উবাচ ।
পঞ্চভির্যদি ভূতৈস্তু যুক্তাঃ স্থাবরজঙ্গমাঃ ।
স্থাবরাণাং ন দৃশ্যন্তে শরীরে পঞ্চ ধাতবঃ ॥ ৬ ॥
অনুষ্মাণামচেষ্টানাং ঘনানাঞ্চৈব তত্ত্বতঃ ।
বৃক্ষাণাং নোপলভ্যন্তে শরীরে পঞ্চ ধাতবঃ ॥ ৭ ॥
ন শৃণ্বন্তি ন পশ্যন্তিন গন্ধরসবেদিনঃ ।
ন চ স্পর্শং বিজানন্তি তে কথং পাঞ্চভৌতিকাঃ ॥ ৮ ॥
অদ্রবত্বাদনগ্নিত্বাদভূমিত্বাদবাযুতঃ ।
আকাশস্যাপ্রমেয়ত্বাদ্ বৃক্ষাণাং নাস্তি ভৌতিকম্ ॥ ৯ ॥
ভৃগুরুবাচ।
ঘনানামপি বৃক্ষাণামাকাশোঽস্তি ন সংশয়ঃ ।
তেষাং পুষ্পফলব্যক্তির্নিত্যং সমুপপদ্যতে ॥ ১০ ॥
উষ্মতো ম্লায়তে পর্ণং ত্বক্ ফলং পুষ্পমেব ।
গ্লায়তে শীর্য্যতে চাপি স্পর্শস্তেনাত্র বিদ্যতে ॥ ১১ ॥
বায্বগ্ন্যশনিনির্ঘোষৈঃ ফলং পুষ্পং বিশীর্য্যতে ।
শ্রোত্রেণ গৃহ্যতে শব্দস্তস্মাচ্ছ্ ণ্বন্তি পাদপাঃ ॥ ১২ ॥
বল্লী বেষ্টয়তে বৃক্ষং সৰ্বতশ্চৈব গচ্ছতি ।
নহ্যদৃষ্টেশ্চ মার্গোঽস্তি তস্মাৎ পশ্যন্তি পাদপাঃ ॥ ১৩ ॥
পুণ্যাপুণ্যৈস্তথাগন্ধৈর্ধূপৈশ্চ বিবিধৈরপি ।
অরোগাঃ পুষ্পিতাঃ সন্তি তস্মাজ্জিঘ্রন্তি পাদপাঃ ॥ ১৪ ॥
পাদৈঃ সলিলপানাচ্চ ব্যাধীনাঞ্চাপি দর্শনাৎ ।
ব্যাধিপ্রতিক্রিয়াত্বাচ্চ বিদ্যতে রসনং দ্রুমে ॥ ১৫ ॥
বক্রেণোৎপলনালেন যথোর্দ্ধং জলমাদদেৎ ।
তথা পবনসংযুক্তঃ পাদৈঃ পিবতি পাদপঃ ॥ ১৬ ॥
সুখদুঃখয়োশ্চ গ্রহণাচ্ছিন্নস্য চ বিরোহণাৎ ।
জীবং পশ্যামি বৃক্ষাণামচৈতন্যং ন বিদ্যতে ॥ ১৭ ॥
তেন তজ্জলমাদত্তং জরয়ত্যগ্নিমারুতৌ ।
আহারপরিণামাচ্চ স্নেহো বৃদ্ধিশ্চ জায়তে ॥ ১৮ ॥
[হরিদাস সিদ্ধান্ত বাগীশ ভট্টাচার্যের অনুবাদিত বিশ্ববাণী প্রকাশনীর প্রকাশিত মহাভারত/শান্তিপর্ব/১৭৮ অধ্যায়/৪-১৮ নং শ্লোক]
✅ অর্থ : বায়ু গতিক্রিয়াশালী, আকাশ শূন্যময়, অগ্নি উত্তাপযুক্ত, জল তরল এবং পৃথিবী সংহত অর্থাৎ কঠিনরূপ; এই পঞ্চভূতময় প্রাণিগণের শরীর ॥ ৪ ॥
জগতেব সমস্ত স্থাবর (উদ্ভিজ্জ) ও জঙ্গম (প্রানীজ) পদার্থই এই পঞ্চভূতসংযুক্ত এবং পঞ্চ জ্ঞানেন্দ্রিযও এই পাঞ্চভৌতিক। যথা - কর্ণ আকাশময়, নাসিকা পৃথিবীময়ী, জিহ্বা জলময়ী, ত্বক্ বায়ুময়ী ও চক্ষু অগ্নিময় ॥ ৫ ॥
ভরদ্বাজ বললেন, ‘সমস্ত স্থাবর ও জঙ্গম পদার্থই যদি পঞ্চভূতযুক্ত হতো, তবে স্থাবর (উদ্ভিজ্জ) পদার্থের শরীরে সেই পঞ্চভূত দেখা যায় না কেন ?॥ ৬ ॥
উদ্ভিদদের শরীরে উত্তাপ নেই, তাদের গমনাদি ক্রিয়া (চলন-গমন) নেই এবং তাদের শরীরের ভিতরে পরমাণুগুলির নিবিড় সংযোগ রয়েছে, এ সমস্ত কথাই সত্য। সুতরাং বৃক্ষগুলির শরীরে পঞ্চভূত আছে বলে জানা যায় না ॥ ৭ ॥
তারপর, উদ্ভিদদের কান নেই বলে শুনতে পায়না, চোখ নেই বলে দেখতে পায় না, নাক ও জিহ্বা নেই বলে গন্ধ ও রস গ্রহণ করতে পারে না এবং ত্বক্ না থাকায় তাদের স্পর্শজ্ঞানও নাই। অতএব সেই বৃক্ষসকল পাঞ্চভৌতিক হইবে কি প্রকারে ? ॥ ৮ ॥
উদ্ভিদসমূহে জল নেই, অগ্নি নেই, ভূমি (পৃথিবীতত্ত্ব/মৃত্তিকা/মাটি) নেই, বায়ু নেই এবং আকাশও আছে বলে মনে হয় না। অতএব উদ্ভিদদের শরীরে একেবারেই ভৌতিকত্ব (ভৌতিক পদার্থ) নেই ’ ॥ ৯ ॥
ভৃগু বললেন, ‘বৃক্ষসমূহের ভিতরে পরমাণুর নিবিড় সংযোগ থাকলেও তাতে আকাশ আছে, এবিষযে কোনো সন্দেহ নেই। এই জন্যই প্রত্যহ তাদের পুষ্প ও ফলের আবির্ভাব সম্ভবপর হয় ॥ ১০ ॥
উদ্ভিদের মধ্যে শরীরে অগ্নি আছে বলেই, তার তাপে অপতিত পত্র, চৰ্ম, ফল ও পুষ্প ম্লান (শুটা) হয় এবং সেগুলি বিশীর্ণ হয়ে যায় ; অতএব বৃক্ষসমূহের স্পর্শবোধ আছে ॥ ১১ ॥
বাইরের বায়ু, অগ্নি ও বজ্রের নির্ঘোষে বৃক্ষের ফল ও পুষ্প বিশীর্ণ হয় ; সুতরাং উদ্ভিদেরা কানের দ্বারা শব্দ গ্রহণ করে। অতএব অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, স্থাবরেরা (উদ্ভিদেরা) সকলে শ্রবণ করে ॥ ১২ ॥
লতা বৃক্ষকে বেষ্টন করে এবং সকল দিকে গমন করে। অতএব লতাগুলির চক্ষু আছে, চক্ষু না থাকলে তাদের গমন পথের সম্ভব হতো না। অতএব, বৃক্ষ ও লতাপ্রভৃতি পাদপগণ দেখতে পায় ॥ ১৩ ॥
পাদপগণ (উদ্ভিদেরা) উৎকৃষ্ট ও নিকৃষ্ট নানাবিধ গন্ধ ও ধূপদ্বারা নীরোগ থেকে তদনুরূপ পুষ্প ও ফল প্রসব করে ; অতএব পাদপগণ আঘ্রাণ করে থাকে ॥ ১৪ ॥
বৃক্ষসকল পাদদ্বারা জলপান করে এবং তাদের ব্যাধি (রোগ ও তার বেদনা অনুভব) ও ব্যাধিপ্রতিক্রিয়া (বেদনা অনুভব করার বিষয়) দেখা যায় ; সুতরাং বৃক্ষ সকলের রস গ্রহণ করবার শক্তি আছে ॥ ১৫ ॥
মানুষ যেমন বক্র উৎপলনাল দ্বারা উপরের জল আকর্ষণ করে পান করে, বায়ুযুক্ত বৃক্ষও তেমন পাদদ্বারা আকর্ষণ কবিয়া জল পান করে ॥ ১৬ ॥
উদ্ভিদের প্রফুল্লতা দেখে তাদের সুখ আছে তা জানা যায় এবং ম্লানতা দর্শন করে দুঃখ আছে তা জানা যায় এবং ছিন্ন অঙ্গের পুনরায় উৎপত্তি হয়, দেখা যায় ; অতএব বৃক্ষসমূহের জীবন আছে বলে মনে করা উচিত ; সুতরাং তাদের অচৈতন্য নাই (তাদের মধ্যে চৈতন্য/চেতনা আছে) ॥ ১৭ ॥
বৃক্ষ পাদ (চরণরূপী মূল/শিকড়) দ্বারা আকর্ষণ করে জল পান করে, তাহাব শবীরেব অভ্যন্তরস্থ অগ্নি ও বায়ু সেই জলকে জীর্ণ করে দেয় এবং ভুক্তবস্তু পরিপাক করে থাকে, তাতেই বৃক্ষের রসও বৃদ্ধি হয় ॥ ১৮ ॥
⏺️ বিশ্লেষণ — উপরোক্ত সংলাপের মূল বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মহর্ষি ভৃগু উদ্ভিদের চেতনা প্রতিষ্ঠার জন্য কেবল বিশ্বাসের উপর নির্ভর করেননি; বরং পর্যবেক্ষণ, যুক্তি এবং প্রকৃতির কার্যকারণ বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাঁর সিদ্ধান্ত উপস্থাপন করেছেন।
প্রথমে তিনি প্রতিপন্ন করেন যে, উদ্ভিদও অন্যান্য জীবের ন্যায় পঞ্চভূতসমন্বিত। এরপর তিনি একে একে উদ্ভিদের বিভিন্ন ইন্দ্রিয়শক্তির উপস্থিতি ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, উদ্ভিদ উত্তাপে ম্লান হয়, ফলে স্পর্শবোধের পরিচয় পাওয়া যায় ; বায়ু, অগ্নি ও বজ্রধ্বনির প্রভাবে ফল ও পুষ্প ঝরে পড়ে, অতএব তারা শব্দ গ্রহণ করে; লতা আশ্রয়বৃক্ষকে বেষ্টন করে সঠিক পথে অগ্রসর হয়, অতএব তাদের দর্শনশক্তি আছে ; বিভিন্ন গন্ধ ও ধূপের প্রভাবে তাদের স্বাস্থ্য ও পুষ্পধারণে পরিবর্তন ঘটে, অতএব তারা গন্ধ গ্রহণ করে ; মূলের মাধ্যমে জল গ্রহণ এবং রোগাক্রান্ত হওয়া ও রোগমুক্ত হওয়ার বর্ণনা দ্বারা তাদের রসগ্রহণ ও জীবনক্রিয়ার প্রমাণও উপস্থাপন করা হয়েছে।
এই আলোচনার পরিণতিতে মহর্ষি ভৃগু একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন — “সুখদুঃখয়োশ্চ গ্রহণাচ্ছিন্নস্য চ বিরোহণাৎ। জীবং পশ্যামি বৃক্ষাণামচৈতন্যং ন বিদ্যতে॥” অর্থাৎ, উদ্ভিদের সুখ-দুঃখ অনুভব, ছিন্ন অঙ্গের পুনরায় উৎপত্তি এবং জীবনলক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে তিনি সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, বৃক্ষ অচেতন নয় ; তাদের মধ্যে চৈতন্য বিদ্যমান।
অতএব, মহাভারতের এই সংলাপ থেকে স্পষ্ট হয় যে, সনাতন ধর্মের শাস্ত্র উদ্ভিদকে নিছক জড় পদার্থ বলে মনে করে না। বরং তাদের জীব, পঞ্চভূতসমন্বিত, ইন্দ্রিয়সম্পন্ন এবং সুখ-দুঃখ অনুভবে সক্ষম চৈতন্যবিশিষ্ট সত্তা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এই শিক্ষা ব্রহ্মমহাপুরাণে বর্ণিত পিপ্পলাদোপাখ্যান এবং মনুস্মৃতির স্থাবরজীব বিষয়ক বক্তব্যের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে বিভিন্ন শাস্ত্রের সমন্বিত সাক্ষ্য থেকে প্রতীয়মান হয় যে, সনাতন ধর্মে উদ্ভিদও চৈতন্যসম্পন্ন জীবরূপেই বিবেচিত।
__________________________________________________
♦️ মনুস্মৃতিতে উদ্ভিদের চেতনা ও সুখ-দুঃখ অনুভবের প্রমাণ —
ব্রহ্মমহাপুরাণে উদ্ভিদের স্নেহ, করুণা ও চৈতন্যের বর্ণনা এবং মহাভারতে তাদের ইন্দ্রিয়, জীবন ও অনুভূতির শাস্ত্রীয় বিশ্লেষণের পর মনুস্মৃতিও একই সিদ্ধান্তকে সংক্ষিপ্ত অথচ সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছে। মনুস্মৃতির প্রথম অধ্যায়ে স্থাবর জীবের স্বরূপ বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে যে, উদ্ভিদ বাহ্যিকভাবে নিস্পন্দ বা জড়প্রায় মনে হলেও তাদের অন্তরে চৈতন্য বিদ্যমান এবং তারা সুখ-দুঃখ অনুভব করতে সক্ষম। নিম্নে সেই গুরুত্বপূর্ণ শাস্ত্রবচনটি মূল সংস্কৃত পাঠ ও বাংলা অর্থসহ উপস্থাপিত হল।
🔸 মনুসংহিতা থেকে প্রমাণ —
তমসা বহুরূপেণ বেষ্টিতাঃ কর্মহেতুনা ।
অন্তস্সংজ্ঞা ভবন্ত্যেতে সুখদুঃখসমন্বিতাঃ ॥ ৪৯ ॥
[মনুস্মৃতি/১ম অধ্যায়/৪৯ নং শ্লোক]
অর্থ : ইহারা (স্থাবর = উদ্ভিদ) বহুবিধ কর্মফলে তমোগুণে আক্রান্ত হয়ে অবস্থান করে, বহির্ব্যাপার থাকে না, কেবলমাত্র অন্তরে চৈতন্যবিশিষ্ট থাকে। কোনো কোনো সময়ে এদের সুখদুঃখের বিলক্ষণ অনুভব হয় ॥ ৪৯ ॥
⏺️ বিশ্লেষণ — মনুস্মৃতির এই শ্লোকটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে স্থাবর জীবের (উদ্ভিদের) বাহ্যিক নিস্পন্দতা ও অন্তর্নিহিত চৈতন্যের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট পার্থক্য নির্দেশ করা হয়েছে। শাস্ত্র বলছে, বহুবিধ কর্মফলের কারণে উদ্ভিদ তমোগুণে আবৃত থাকায় তাদের বাহ্যিক ক্রিয়াকলাপ প্রকাশ পায় না; কিন্তু তাই বলে তারা অচেতন নয়। বরং তাদের অন্তরে চেতনা বিদ্যমান এবং সেই চেতনার কারণেই তারা সুখ ও দুঃখ অনুভব করে।
এই শ্লোকের বিশেষ তাৎপর্য হল — এখানে উদ্ভিদের চেতনা প্রতিষ্ঠার জন্য কোনো রূপক, উপমা বা কাহিনীর আশ্রয় নেওয়া হয়নি ; বরং সরাসরি সিদ্ধান্তরূপে ঘোষণা করা হয়েছে যে, স্থাবর জীব “অন্তঃসংজ্ঞা” অর্থাৎ অন্তর্নিহিত চৈতন্যসম্পন্ন এবং “সুখদুঃখসমন্বিত”, অর্থাৎ সুখ-দুঃখ অনুভবকারী।
অতএব, ব্রহ্মমহাপুরাণে উদ্ভিদের আচরণগত চেতনার বর্ণনা, মহাভারতে তাদের ইন্দ্রিয়, জীবন ও অনুভূতির যুক্তিপূর্ণ বিশ্লেষণ এবং মনুস্মৃতিতে তাদের অন্তর্নিহিত চৈতন্য ও সুখ-দুঃখ অনুভবের প্রত্যক্ষ ঘোষণা—এই তিনটি শাস্ত্রের সম্মিলিত সাক্ষ্য একই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, সনাতন ধর্মের দৃষ্টিতে উদ্ভিদ চৈতন্যসম্পন্ন জীব; তারা কেবল জীবিতই নয়, বরং সুখ-দুঃখ অনুভব করতেও সক্ষম।
__________________________________________________
🔥 সিদ্ধান্ত —
উপর্যুক্ত ব্রহ্মমহাপুরাণ, মহাভারত এবং মনুস্মৃতির প্রামাণ্য শাস্ত্রবচনসমূহ একত্রে বিচার করলে একটি বিষয় নিঃসন্দেহে প্রতীয়মান হয় — সনাতন ধর্মের শাস্ত্র উদ্ভিদকে জড় পদার্থ বলে স্বীকার করে না; বরং তাদের চৈতন্যসম্পন্ন জীব, ইন্দ্রিয়বিশিষ্ট এবং সুখ-দুঃখ অনুভবে সক্ষম স্থাবর সত্তা হিসেবে গ্রহণ করে। মানুষের মতো মস্তিষ্ক না থাকলে যে উদ্ভিদের অনুভবের চেতনা শক্তি থাকবে না তা নির্ধারণ করা যুক্তিযুক্ত নয়। উদ্ভিদের মানুষের মতো যৌনাঙ্গ নেই, কিন্তু তবুও উদ্ভিদের প্রজনন ক্ষমতা আছে। এতেও প্রমাণিত হয় যে, উদ্ভিদের ক্ষেত্রে মনুষ্যের মতোই অঙ্গ থাকাটা বাধ্যতামূলক নয়। মানুষের মতো অঙ্গ ইত্যাদি না থাকলেও উদ্ভিদ সকল কিছুই অনুভব করতে সক্ষম।
অতএব, “উদ্ভিদের কোনো অনুভূতি নেই, তাই উদ্ভিদ ভক্ষণ সম্পূর্ণ অহিংস ; কিন্তু পশুভক্ষণই একমাত্র হিংসা” — এই দাবি সনাতন ধর্মের প্রামাণ্য শাস্ত্র দ্বারা সমর্থিত নয়। বরং শাস্ত্রের সাক্ষ্য অনুসারে এই ধারণা অসঙ্গত ও শাস্ত্রবিরোধী বলে প্রতীয়মান হয়। যদি কেবল অন্য জীবের অনুভূতির ভিত্তিতেই খাদ্যের ধর্ম-অধর্ম নির্ধারণ করা হয়, তবে সেই একই যুক্তি উদ্ভিদের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য হবে। ফলে এই যুক্তির উপর ভিত্তি করে কেবল আমিষভোজীদের অধার্মিক বা পাপী বলা নিজেই একটি স্ববিরোধী অবস্থান।
সনাতন ধর্মে ধর্ম-অধর্মের বিচার ব্যক্তিগত আবেগ, আধুনিক মতবাদ বা একপাক্ষিক যুক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত নয়; বরং বেদ, স্মৃতি, ইতিহাস, পুরাণ এবং শাস্ত্রবিধির উপর প্রতিষ্ঠিত। তাই কোনো খাদ্যাচার সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে শাস্ত্রের পূর্ণাঙ্গ নির্দেশ বিবেচনা করা উচিত, আংশিক ধারণা বা নির্বাচিত যুক্তির উপর নয়।
অতএব, শাস্ত্রের এই সুস্পষ্ট প্রমাণসমূহের আলোকে বলা যায় যে, উদ্ভিদের চেতনা ও সুখ-দুঃখ অনুভব অস্বীকার করে নিরামিষভোজনকে একমাত্র অহিংস ও সর্বোচ্চ ধর্ম বলে প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টা শাস্ত্রসম্মত ভিত্তি লাভ করে না। সনাতন ধর্মের প্রামাণ্য শাস্ত্রই এই ধারণার সীমাবদ্ধতা ও স্ববিরোধিতা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে। যদি পশুবধে তার মাংস আহার করা মাংসাশী আমিষভোজীদের রসনা তৃপ্তির বিষয় হয়, পাপ হয়, হিংসা হয়, অধর্ম হয়। তবে উদ্ভিদভোজনকারী নিরামিষাশী ব্যক্তিগণও ‘প্রাণ ও চেতনা যুক্ত উদ্ভিদজাতি’কে ছেদন বা প্রাণ ছিনিয়ে বধ করে নিজেদের আহার্য বস্তু হিসেবে প্রস্তুত করবার ফলে - একইভাবে রসনাতৃপ্তির পৃষ্টপোষক, পাপী, হিংসকারী ও অধর্মী, দোষী বলে সাব্যস্ত হন — শাস্ত্রের ভিত্তিতে।
__________________________________________________
🚩 তথ্য সংগ্রহ ও সত্য উন্মোচনে : শিবালয় প্রতিষ্ঠাতা শিবদ্বারাধীশাধ্যক্ষ দেশিক আচার্যপরমাধিকারী শ্রীশ্রীগুরু নন্দীনাথ শৈব আচার্যদেব জী 🚩
©️ কপিরাইট ও প্রচারে : Shivalaya 🔥
শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্ 🚩
ॐ নমঃ পার্বতীপতয়ে হর হর মহাদেব 🚩
পরমেশ্বর শিবের ও সনাতন শৈবধর্মের বিষয়ে এমন গুহ্য সত্য রহস্য ও সত্য উন্মোচনমূলক লেখা আরো পেতে অবশ্যই আমাদের Shivalaya ফেসবুক পেজ Follow করে Favourite করে রাখুন। এই তথ্য দ্বারা যদি আপনার জ্ঞান বৃদ্ধি হয়ে থাকে তবে অবশ্যই এই লেখাটি শেয়ার করুন, যাতে সত্য প্রকাশ্যে আসে।
#হিন্দুধর্ম #সনাতনধর্ম #শিবালয় #Shivalaya #sanatandharma #খাদ্যাভ্যাস #শৈবধর্ম #আমিষ #নিরামিষ #মাংসাহার #মহাভারত #মনুস্মৃতি #ব্যাসস্মৃতি #শতপথব্রাহ্মণ #শুক্ল-যজুর্বেদ #উদ্ভিদ
[এই পোস্টটি শুধুমাত্র শিক্ষামূলক ও জনসচেতনতার উদ্দেশ্যে প্রকাশিত।এখানে ব্যবহৃত চিত্রটি কেবল বিষয়টি সহজে উপস্থাপনের জন্য Ai-সহায়তায় নির্মিত একটি প্রতীকী চিত্র, এই ছবিটির মধ্যে কিছু লেখা আলাদা ভাবে লেখা হয়েছে। সকল শাস্ত্রীয় উদ্ধৃতি ও তথ্য যথাসম্ভব মূল গ্রন্থ অনুসারে ছবি উপস্থাপিত হয়েছে।]


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন