হংস - সোঽহং — মন্ত্র একমাত্র পরমেশ্বর শিবেরই, অন্য আর কারোর নয়
🦢 হংস - সোঽহং — মন্ত্র একমাত্র পরমেশ্বর শিবেরই, অন্য আর কারোর নয় 🕉️
__________________________________________________
🔰 ভূমিকা —
সনাতন ধর্মে হংসবিদ্যা এক অত্যন্ত প্রাচীন, গূঢ় এবং পরমোপাসনামূলক বিদ্যা। যুগে যুগে বহু ঋষি, যোগী ও সাধক এই বিদ্যার মাধ্যমে আত্মতত্ত্ব ও পরমতত্ত্বের উপলব্ধির সাধনা করেছেন। মানুষের নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের মাধ্যমে নিরন্তর স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই হংস মন্ত্র জপ হয়ে থাকে। যেহেতু মানুষের নিজের চেষ্টা থেকে জপ হয় না বরং বিনা প্রয়াসেই জপ হয় তাই এই মন্ত্রকে অজপা গায়ত্রী বলা হয়। কারণ, মানুষ যদি এই অজপা বিদ্যা সম্পর্কে অবগত হয়ে এই মন্ত্রে নিজের মনকে প্রবিষ্ট করায় তবে মানুষ এর অভ্যন্তরীণ শ্বাসের ডায়নের মাধ্যমে ত্রাণ লাভ করেন অর্থাৎ মোক্ষ লাভ করেন, এই কারণে এটি অজপা গায়ত্রী শব্দে বিভুষিত হয়।
কিন্তু বর্তমানে এই হংসবিদ্যার প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে নানা ধরনের ব্যাখ্যা প্রচলিত হয়েছে। বিশেষত, অনেকেই হংসবিদ্যাকে কেবল একটি নিরপেক্ষ ব্রহ্মবিদ্যা হিসেবে উপস্থাপন করে থাকেন এবং এর সঙ্গে পরমেশ্বর শিবের প্রত্যক্ষ সম্পর্ককে অস্বীকার বা উপেক্ষা করার চেষ্টা করেন। অথচ, কোনো তত্ত্ব, মন্ত্র বা বিদ্যার প্রকৃত অর্থ ব্যক্তিগত মত, সম্প্রদায়গত বিশ্বাস কিংবা কল্পনানির্ভর ব্যাখ্যার দ্বারা নয়; বরং শাস্ত্রপ্রমাণের দ্বারাই নির্ধারিত হয়।
সনাতন ধর্মের চিরন্তন নীতি হলো — শ্রুতি, স্মৃতি, পুরাণ, আগম এবং শাস্ত্রসমূহই ধর্ম ও তত্ত্ব নির্ণয়ের প্রধান প্রমাণ। অতএব, হংসবিদ্যার প্রকৃত পরিচয় জানার জন্যও আমাদের একমাত্র আশ্রয় হতে হবে শাস্ত্রের প্রত্যক্ষ বচন। শাস্ত্র যদি কোনো মন্ত্রের দেবতা, বীজ, শক্তি, উপাস্য ও ফল সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দেয়, তবে সেই সিদ্ধান্ত পরিত্যাগ করে অন্য কোনো ব্যাখ্যা প্রতিষ্ঠা করা শাস্ত্রসম্মত হতে পারে না।
এই আলোচনায় আমরা স্কন্দমহাপুরাণের সূতসংহিতার ‘হংসবিদ্যাবিবরণ’ অধ্যায়কে অবলম্বন করে হংসবিদ্যার প্রকৃত স্বরূপ বিশ্লেষণ করব। এই অধ্যায়ে হংসমন্ত্রের ঋষি, ছন্দ, দেবতা, বীজ, শক্তি, ধ্যান, জপপদ্ধতি, অজপা-তত্ত্ব, জীব ও পরমাত্মার সম্পর্ক, গুরুমাহাত্ম্য এবং সর্বোপরি হংসবিদ্যার পরম লক্ষ্য অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় যে, শাস্ত্র নিজেই ঘোষণা করেছে — “বিদ্যা শক্তির্ভবেদ্ বীজং শিব এব ন চান্যথা” — এই বিদ্যার বীজ স্বয়ং শিব, অন্য কেউ নন; আবার “হংস হংসেতি যো ব্রূয়াৎ সর্বদা শিব এব সঃ” — যিনি হংসমন্ত্র জপ করেন, পরমার্থে তিনি শিবস্বরূপ হন। এই ঘোষণাগুলি হংসবিদ্যার শিবতাত্ত্বিক ভিত্তিকে সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। এরই সাথে শিব মহাপুরাণের বচন ও বেদের একাধিক মন্ত্র উপস্থাপন করে সেই পুরাণ বচনের প্রামাণিকতা স্পষ্ট করা হয়েছে।
অতএব, এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য কোনো সম্প্রদায়, মতবাদ বা ব্যক্তিবিশেষের সমালোচনা নয় ; বরং সনাতন শাস্ত্রকে সর্বোচ্চ প্রমাণরূপে গ্রহণ করে হংসবিদ্যার প্রকৃত স্বরূপ পাঠকের সম্মুখে উপস্থাপন করা। আশা করা যায়, নিম্নে উদ্ধৃত শাস্ত্রবচন ও তার বিশ্লেষণ মনোযোগ সহকারে বিচার করলে হংসবিদ্যার প্রকৃত তাত্ত্বিক অবস্থান সম্পর্কে সকল সংশয় দূর হবে এবং পাঠক নিজেই শাস্ত্রের আলোকে যথার্থ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে সক্ষম হবেন।
__________________________________________________
মূল প্রসঙ্গ —
♦️ স্কন্দমহাপুরাণে হংস নামক শৈববিদ্যা মন্ত্রের রহস্য বিবরণ —
সূত উবাচ।
আত্মমন্ত্রং প্রবক্ষ্যামি সমাসেন ন বিস্তরাৎ ।
ঋষির্ব্রহ্মাঽস্য গায়ত্রং ছন্দ আত্মৈব দেবতা ।
শান্তান্তং শক্তিরস্যোক্তা তদন্তং বীজমুচ্যতে ॥ ১ ॥
বিদ্যা শক্তির্ভবেদ্ বীজং শিব এব ন চান্যথা ।
তেনায়ং পরমো মন্ত্রঃ শিবশক্ত্যাত্মকঃ স্মৃতঃ ॥ ২ ॥
এতদ্ বুদ্ধ্বা জপেন্মন্ত্রং বীজশক্ত্যাত্মনা বুধঃ ।
ধ্যায়েৎ সাম্বং মহাদেবং সংসারাময়ভেষজম্ ॥ ৩ ॥
যস্তু দ্বাদশসাহস্রমিমং জপতি নিত্যশঃ ।
তস্য সর্বাণি পাপানি বিনশ্যন্তি ন সংশয়ঃ ॥ ৪ ॥
অথবা প্রাণসঞ্চারঃ সকারঃ পরিকীর্তিতঃ ।
হকারোঽপানসঞ্চারো দেহে দেহভৃতাং সদা ॥ ৫ ॥
এবং যস্তু বিজানাতি মন্ত্রমাচার্যপূর্বকম্ ।
সোঽজপন্নপি হংসাখ্যং জপত্যেব ন সংশয়ঃ ॥ ৬ ॥
ঈদৃশীমজপাং বিদ্যামাস্তিক্যাদ্ গুরুভক্তিতঃ ॥ ৭ ॥
যো বিজানাতি পাপানি বুদ্ধিপূর্বকৃতানি চ ।
তস্য নশ্যন্তি সর্বাণি নাত্র কার্যা বিচারণা ॥ ৮॥
অথবা জীবমন্ত্রোঽয়ং জীবাত্মপ্রতিপাদকঃ ।
অহংশব্দস্য রূঢ়ত্বাল্লোকে জীবাত্মবস্তুনি ।
শক্তিমন্ত্রঃ সকারাখ্যঃ পরমেশ্বরবাচকঃ ॥ ৯ ॥
প্রকৃতার্থে প্রসিদ্ধত্বাৎপ্রসিদ্ধঃ পরমেশ্বরঃ॥ ১০॥
মহদাদ্যণুপর্যন্তং জগৎসর্বং চরাচরম্ ।
জায়তে বর্ততে চৈব লীয়তে পরমেশ্বরে ॥ ১১ ॥
সংসারিত্বেন ভাতোঽহং স এব পরমেশ্বরঃ ।
সোঽহমেব ন সন্দেহঃ স্বানুভূতিপ্রমাণতঃ ॥ ১২ ॥
হংসয়োঃ শবলং হিত্বা পদয়োঃ সদ্বিতীয়য়োঃ ।
পূর্ণোঽহমেবং জানীয়াদ্ বোধমাত্রস্বভাবতঃ ॥ ১৩ ॥
শ্রুতিরপ্যেবমেবাঽঽহ পরমার্থপ্রকাশিনী ।
সত্যসম্পূর্ণবিজ্ঞানসুখরূপো মহেশ্বরঃ ॥ ১৪ ॥
অহং চাব্যভিচারিত্বাৎ সৎস্বভাবো ন সংশয়ঃ ।
অহমব্যভিচার্যেব সাক্ষিত্বাদ্ ব্যভিচারিণাম্ ॥ ১৫ ॥
জ্ঞাতমজ্ঞাতমপ্যর্থং সদাঽহং বেদ কেবলঃ ।
সোঽর্থো মাং ন বিজানাতি ততোঽবিচ্ছিন্নচেতনঃ ॥ ১৬ ॥
চিতোঽন্যশেষতাভাবাচ্চিতোঽচিচ্ছেষতা ন হি ।
শরাবাদিপদার্থানাং চেতনত্বপ্রসক্তিতঃ ॥ ১৭ ॥
চিচ্ছেষত্বং চ নাস্ত্যেব চিতশ্চিন্ন হি ভিদ্যতে ।
ভিদ্যতে চেদচিচ্চিৎ স্যাচ্চিতোঽচিত্ত্বং বিরুধ্যতে॥ ১৮॥
তথা চিচ্চেতনস্যাপি ন শেষত্বমবাপ্নুয়াৎ ।
শেষত্বে সতি তৎসিদ্ধিস্তৎসিদ্ধৌ শেষতা চিতঃ ॥ ১৯ ॥
অতোঽন্যশেষতা লোকে চিতো ভ্রান্তা প্রতীয়তে ।
সুখস্বভাব এবাহং সদা প্রেমাস্পদত্বতঃ ॥ ২০ ॥
অসুখস্য ন হি প্রেমাস্পদত্বং পরিদৃশ্যতে ।
নাহমন্যস্য শেষো হি শেষী সর্বস্য সর্বদা ॥ ২১ ॥
পূর্ণোঽহং সর্বসাক্ষিত্বাৎ সর্বদা পরমার্থতঃ ।
অপূর্ণো যুগপৎ সর্বং ন বিজানাতি কশ্চন ॥ ২২ ॥
সংসারবর্জিতঃ সাক্ষাৎ সর্বদা পরমেশ্বরঃ ।
অহং সংসারসাক্ষিত্বাত্তথা সংসারবর্জিতঃ ॥ ২৩ ॥
এবং বাক্যানুসারিণ্যা যুক্ত্যাঽঽচার্যপুরঃসরম্ ।
অহং সঃ সোঽহমেবেতি বিজানীয়াদ্বিচক্ষণঃ ॥ ২৪ ॥
য এবমাত্মমন্ত্রেণ জীবাত্মপরমাত্মনোঃ ।
পারমার্থিকমেকত্বং সুদৃঢ়ং পরিপশ্যতি ।
স এব ব্রহ্মবিন্মুখ্যো নেতরোঽজ্ঞানমোহিতঃ ॥ ২৫ ॥
এবম্ভূতং পরিজ্ঞানং যস্য জাতং যদা ভুবি ।
তদৈব তস্য সংসারবিনাশো নাস্তি সংশয়ঃ ॥ ২৬ ॥
হংসবিদ্যামবিজ্ঞায় মুক্তৌ যত্নং করোতি যঃ ।
স নভোভক্ষণেনৈব ক্ষুন্নিবৃত্তিং করিষ্যতি ॥ ২৭ ॥
হংসবিদ্যা পরা চৈষা পরমন্ত্রপ্রভেদিনী ।
সর্বৈশ্বর্যপ্রদা সর্বদেবতাতৃপ্তিকারিণী ॥ ২৮ ॥
অস্যাশ্চ জপমাত্রেণ দীর্ঘায়ুষ্যমবাপ্নুয়াৎ ।
আরোগ্যং বিজয়ং বিদ্যামবাপ্নোতি ন সংশয়ঃ ॥ ২৯ ॥
বহুনোক্তেন কিং বিদ্যা হংসাখ্যা সর্বকামদা ।
হংস হংসেতি যো ব্রূয়াৎ সর্বদা শিব এব সঃ ॥ ৩০ ॥
শিবেন বিষ্ণুনা চৈব ব্রহ্মণা সর্বদৈবতৈঃ ।
আদৃতা হংসবিদ্যেয়ং চিরাদেবং সিদ্ধিদা ॥ ৩১ ॥
রেচকং পূরকং মুক্ত্বা কুম্ভকে সুস্থিতঃ সুধীঃ।
নাভিকন্দে সমৌ কৃত্বা প্রাণাপানৌ সমাহিতঃ ॥ ৩২ ॥
মস্তকস্থামৃতস্বাদং পীত্বা ধ্যানেন সাদরম্।
দীপাকারং মহাদেবং জ্বলন্তং নাভিমধ্যমে॥ ৩৩ ॥
অভিষিচ্যামৃতেনৈব হংস হংসেতি যো জপেৎ ।
জরামরণরোগাদি ন তস্য ভুবি বিদ্যতে ॥ ৩৪ ॥
এবং দিনে দিনে কুর্যাদণিমাদিবিভূতয়ে ।
ঈশ্বরত্বমবাপ্নোতি সদাঽভ্যাসপরঃ পুমান্ ॥ ৩৫ ॥
বহবোঽনেন মার্গেণ প্রাপ্তা নিত্যত্বমাস্তিকাঃ ।
হংসবিদ্যামৃতে লোকে নাস্তি নিত্যত্বসাধনম্ ॥ ৩৬ ॥
যো দদাতি মহাবিদ্যাং হংসাখ্যাং পারমেশ্বরীম্ ।
তস্য দাস্যং সদা কুর্যাচ্ছ্রদ্ধয়া পরয়া সহ ॥ ৩৭ ॥
শুভং বাঽশুভমন্যদ্বা যদুক্তং গুরুণা ভুবি ।
তৎ কুর্যাদবিচারেণ শিষ্যঃ সন্তোষসংযুতঃ ॥ ৩৮ ॥
হংসবিদ্যামিমাং লব্ধ্যা গুরোঃ শুশ্রূষয়া নরঃ ।
আত্মানমাত্মনা সাক্ষাদ্ ব্রহ্ম বুদ্ধ্যা সুনিশ্চলঃ ॥ ৩৯ ॥
দেহজাত্যাদিসম্বন্ধান্ বর্ণাশ্রমসমন্বিতান্ ॥ ৪০ ॥
বেদশাস্ত্রাণি চান্যানি পাদপাংশুমিব ত্যজেৎ ।
ন গুরুং সন্ত্যজেন্নিত্যং জানন্নস্য কৃতং নরঃ ॥ ৪১ ॥
গুরুভক্তিং সদা কুর্যাচ্ছ্রেয়সে ভূয়সে নরঃ ।
গুরুরেব শিবস্তস্য নান্য ইত্যব্রবীচ্ছ্রুতিঃ ॥ ৪২ ॥
শ্রুত্যা যদুক্তং পরমার্থমেতন্নসংশয়োঽন্যচ্চ ততঃ সমস্তম্ ।
শ্রুত্যাঽবিরোধে চ ভবেৎ প্রমাণং নো চেদনর্থায় ন চ প্রমাণম্ ॥ ৪৩ ॥
ইতি শ্রীস্কন্দমহাপুরাণে সূতসংহিতায়াং চতুর্থে যজ্ঞবৈভবখণ্ডে হংসবিদ্যাবিবরণং নাম সপ্তমোঽধ্যায়ঃ ॥ ৭ ॥
[স্কন্দমহাপুরাণ/সূতসংহিতা/যজ্ঞবৈভবখণ্ড/পূর্বভাগ/৭ম অধ্যায়]
✅ অর্থ — সূত বললেন, এখন আমি সংক্ষেপে আত্মমন্ত্রের বর্ণনা করছি, বিস্তৃতভাবে নয়। এই মন্ত্রের ঋষি ব্রহ্মা, এর ছন্দ গায়ত্রী এবং এর দেবতা স্বয়ং আত্মা (পরমাত্মা শিব)। মন্ত্রের শেষে যে "শান্ত" পদ রয়েছে, সেটিই এর শক্তি বলে কথিত ; আর তার পরবর্তী অংশই এর বীজরূপে পরিচিত ॥ ১ ॥
এই মন্ত্রে বিদ্যাই শক্তিরূপ এবং শিবই বীজরূপ — অন্য কিছু নয়। এই কারণেই এই মন্ত্রকে শিব ও শক্তির অবিচ্ছেদ্য স্বরূপযুক্ত পরম মন্ত্র বলা হয়েছে ॥ ২ ॥
জ্ঞানী সাধক এই তত্ত্ব যথাযথভাবে উপলব্ধি করে বীজ ও শক্তির ঐক্যভাব নিয়ে এই মন্ত্র জপ করবেন এবং সংসাররূপ মহারোগের মহৌষধ স্বরূপ সাম্ব-মহাদেবের ধ্যান করবেন ॥ ৩ ॥
যে ব্যক্তি প্রতিদিন এই মন্ত্র বারো হাজার বার জপ করে, তার সমস্ত পাপ বিনষ্ট হয়ে যায় — এতে কোনো সন্দেহ নেই ॥ ৪ ॥
অথবা বলা হয়েছে, ‘স’ অক্ষর প্রাণবায়ুর গতি নির্দেশ করে এবং ‘হ’ অক্ষর অপানবায়ুর গতি নির্দেশ করে। এই দুই প্রবাহ সকল জীবের দেহে সর্বদাই চলমান থাকে ॥ ৫ ॥
যে ব্যক্তি আচার্যের নিকট থেকে এই মন্ত্রের প্রকৃত তত্ত্ব জেনে নেয়, সে বাহ্যভাবে জপ না করলেও স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ‘হংস’ নামক অজপা-মন্ত্র সর্বদাই জপ করে — এতে কোনো সন্দেহ নেই ॥ ৬ ॥
এইরূপ অজপা-বিদ্যা দৃঢ় আস্থার সঙ্গে এবং গুরুর প্রতি ভক্তির মাধ্যমে লাভ করা যায় ॥ ৭ ॥
যে ব্যক্তি এই বিদ্যার প্রকৃত জ্ঞান লাভ করে, তার জেনে-শুনে করা সমস্ত পাপও বিনষ্ট হয়ে যায় — এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ বা বিচারের অবকাশ নেই ॥ ৮ ॥
অন্য অর্থে, এই মন্ত্র জীবমন্ত্রও বটে, কারণ এটি জীবাত্মার স্বরূপ প্রকাশ করে। জগতে ‘অহং’ শব্দটি সাধারণভাবে জীবাত্মাকেই নির্দেশ করে। আর ‘স’-কারযুক্ত শক্তিমন্ত্র পরমেশ্বরের বাচক বলে পরিচিত ॥ ৯ ॥
কারণ প্রকৃত বা মুখ্য অর্থে ‘স’-কার পরমেশ্বরকেই নির্দেশ করে এবং সেই অর্থেই তিনি সুপ্রসিদ্ধ ॥ ১০ ॥
মহৎ তত্ত্ব থেকে ক্ষুদ্রতম অণু পর্যন্ত এই সমগ্র চরাচর জগৎ পরমেশ্বর থেকেই উৎপন্ন হয়, তাঁর দ্বারাই স্থিত থাকে এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর মধ্যেই লয়প্রাপ্ত হয় ॥ ১১ ॥
সংসারবদ্ধ জীবরূপে যে ‘আমি’ প্রতীয়মান, সেই আমিই প্রকৃতপক্ষে পরমেশ্বর। ‘সোঽহম্’— অর্থাৎ ‘তিনিই আমি’; এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই, কারণ এটি স্বানুভূতি দ্বারা প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধ হয় ॥ ১২ ॥
‘হং’ ও ‘সঃ’— এই দুই পদের উপর আরোপিত উপাধিজনিত ভেদ পরিত্যাগ করে, তাদের অভেদস্বরূপ উপলব্ধি করলে ‘আমিই পূর্ণ ব্রহ্ম’ — এই জ্ঞান লাভ হয় ; কারণ আত্মার স্বভাবই বিশুদ্ধ চৈতন্যমাত্র ॥ ১৩ ॥
পরমার্থ প্রকাশকারী শ্রুতিও এই কথাই ঘোষণা করে — মহেশ্বর সত্য, পূর্ণ, সর্বজ্ঞ এবং পরম আনন্দরূপ ॥ ১৪ ॥
আমিও অব্যভিচারী (অপরিবর্তনীয়) হওয়ায় আমার প্রকৃত স্বভাব সৎ (চিরন্তন সত্তা) — এতে কোনো সন্দেহ নেই। আমি সকল পরিবর্তনশীল বিষয়ের সাক্ষী বলেই নিজে কখনও পরিবর্তিত হই না ॥ ১৫ ॥
আমি সর্বদা সকল জ্ঞাত ও অজ্ঞাত বিষয়কে জানি ; কিন্তু সেই বিষয়সমূহ আমাকে জানতে পারে না। অতএব আমি অবিচ্ছিন্ন, স্বপ্রকাশ চৈতন্যস্বরূপ ॥ ১৬ ॥
চৈতন্যের অন্য কিছুর অধীন বা অবশিষ্ট হওয়া সম্ভব নয়; আবার জড়ের অবশিষ্টও চৈতন্য হতে পারে না। যদি তা স্বীকার করা হয়, তবে ঘট, শরাব (পাত্র) প্রভৃতি জড় পদার্থকেও চেতন বলে মানতে হয় ॥ ১৭ ॥
[মানসিক পর্যায়ের অভ্যন্তরীণ] চৈতন্যের (চেতনার) কোনো অবশিষ্টত্ব নেই, কারণ চৈতন্য (চেতনা) কখনও বিভক্ত হয় না। যদি বিভক্ত হয় বলে ধরা হয়, তবে চৈতন্যই জড়ে পরিণত হবে — যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ॥ ১৮ ॥
অতএব চৈতন্যের ক্ষেত্রেও অন্য কিছুর অবশিষ্ট বা অধীন হওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। কারণ, যদি চৈতন্যকে কারও অধীন বলা হয়, তবে সেই অধীনতার প্রতিষ্ঠার জন্যও আবার চৈতন্যেরই আশ্রয় নিতে হবে ॥ ১৯ ॥
এই কারণে চৈতন্য অন্য কিছুর অধীন — এই ধারণা জগতে কেবল ভ্রান্তিবশতই প্রতীয়মান হয়। প্রকৃতপক্ষে আমিই স্বভাবত পরম সুখস্বরূপ ; আর সেই কারণেই সকলের নিকট আমি চিরকাল প্রেমের আশ্রয় ও সর্বাধিক প্রিয় ॥ ২০ ॥
যে ব্যক্তি এই হংসবিদ্যার প্রকৃত জ্ঞান লাভ করেছেন, তিনি বেদ, শাস্ত্র এবং অন্যান্য গ্রন্থকে পথের ধূলির ন্যায় পরিত্যাগ করতে পারেন; কিন্তু কখনও গুরুকে পরিত্যাগ করবেন না, কারণ তিনিই এই জ্ঞান দান করেছেন ॥ ৪১ ॥
🔖দ্রষ্টব্য: এখানে "বেদশাস্ত্র পরিত্যাগ" বলতে শাস্ত্রের অবমাননা বোঝানো হয়নি। এর অর্থ — আত্মসাক্ষাৎকার লাভের পর সাধকের আর বাহ্য শাস্ত্রনির্ভর অনুসন্ধানের প্রয়োজন থাকে না; কিন্তু গুরুর প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ভক্তি কখনও ত্যাগ করা উচিত নয়। এই কথা বেদেও বলা হয়েছে, কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/ব্রহ্মবিদ্যা/২৯-৩০ নং শ্লোক, শুক্ল-যজুর্বেদ/পৈঙ্গল উপনিষদ/৪র্থ অধ্যায়/১৪ নং মন্ত্র। অন্য যারা আত্মসাক্ষাৎকার লাভ করতে পারেনি তাদের জন্য প্রাথমিক ভাবে শাস্ত্রসম্মত বাহ্য পাঠ ও তার অনুসরণ প্রয়োজন ও আবশ্যক।
মানুষের উচিত সর্বদা অধিকতর কল্যাণ লাভের জন্য গুরুর প্রতি গভীর ভক্তি রাখা। কারণ, শ্রুতি ঘোষণা করেছে — ‘গুরুরূপেই শিব বিরাজমান ; তিনি ব্যতীত অন্য কেউ নন’ ॥ ৪২ ॥
শ্রুতিতে যা পরমার্থতত্ত্বরূপে ঘোষিত হয়েছে, তাই নিঃসন্দেহে সত্য ; তার বিপরীত যা কিছু, তা সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাজ্য। যে মত বা বক্তব্য শ্রুতির বিরোধী নয়, কেবল তাই প্রমাণরূপে গ্রহণযোগ্য; আর যা শ্রুতিবিরোধী, তা অনর্থের কারণ এবং কখনও প্রমাণ বলে গণ্য হতে পারে না ॥ ৪৩ ॥
এইভাবে শ্রীস্কন্দমহাপুরাণের সূতসংহিতার চতুর্থ যজ্ঞবৈভবখণ্ডে ‘হংসবিদ্যাবিবরণ’ নামক সপ্তম অধ্যায় সমাপ্ত ॥ ৭ ॥
__________________________________________________
🔶 শিবমহাপুরানেও বলা পরমেশ্বর শিবই হংস, আবার এর বিপরীত সোঽহম্ -শিবই। প্রমাণ —
বৃংহণত্বং বৃহত্বং চ সদা শম্ভ্বাখ্যবিগ্রহে ।
পঞ্চব্রহ্মময়ে বিশ্বপ্রতীতির্ ব্রহ্মশব্দিতা ॥ ৩৬ ॥
প্রতিলোমাত্মকং হংসে বক্ষ্যামি প্রণবোদ্ভবম্ ।
তব স্নেহাদ্ বামদেব সাবধানতয়া শৃণু ॥ ৩৭ ॥
ব্যঞ্জনস্য সকারস্য হকারস্য চ বর্জনাৎ ।
ওমিত্যেব ভবেৎ স্থূলো বাচকঃ পরমাত্মনঃ ॥ ৩৮ ॥
মহামন্ত্রঃ স বিজ্ঞেয়ো মুনিভিস্তত্ত্বদর্শিভিঃ ।
তত্র সূক্ষ্মো মহামন্ত্রস্তদুদ্ধারং বদামি তে ॥ ৩৯ ॥
আদ্যে ত্রিপঞ্চরূপে চ স্বরে ষোড়শকে ত্রিষু ।
মহামন্ত্রো ভবেদাদৌ সসকারো ভবেদ্যদা ॥ ৪০ ॥
হংসস্য প্রতিলোমঃ স্যাৎ সকারার্থঃ শিবঃ স্মৃতঃ ।
শক্ত্যাত্মকো মহামন্ত্রবাচ্যঃ স্যাদিতি নির্ণয়ঃ ॥ ৪১ ॥
গুরূপদেশকালে তু সোঽহং শক্ত্যাত্মকঃ শিবঃ ।
ইতি জীবপরো ভূয়ান্ মহামন্ত্রস্তদা পশুঃ ॥ ৪২ ॥
শক্ত্যাত্মকঃ শিবাংশশ্চ শিবৈক্যাচ্ছিবসাম্যভাক্ ॥ ৪৩ ॥
[শিবমহাপুরাণ/কৈলাস সংহিতা/১৬ নং অধ্যায়/৩৬-৪৩ নং শ্লোক]
✅ অর্থ — [ভগবান স্কন্দ বললেন] শম্ভু-নামধারী পরমেশ্বরের স্বরূপেই সর্বদা ‘বৃহত্ত্ব’ (অসীম মহত্ত্ব) এবং ‘বৃংহণত্ব’ (সকলকে পোষণ ও বর্ধিত করার ক্ষমতা) বিদ্যমান। পঞ্চব্রহ্মময় এই বিশ্বে তাঁর সর্বব্যাপী প্রকাশের কারণেই তাঁকে ‘ব্রহ্ম’ নামে অভিহিত করা হয় ॥ ৩৬ ॥
হে বামদেব! তোমার প্রতি স্নেহবশত আমি এখন প্রণব (ওঁকার) থেকে উদ্ভূত হংসমন্ত্রের প্রতিলোমতত্ত্ব বর্ণনা করছি। তুমি একাগ্রচিত্তে ও মনোযোগ সহকারে তা শ্রবণ করো ॥ ৩৭ ॥
‘স’ এবং ‘হ’— এই দুই ব্যঞ্জনবর্ণ বর্জন করলে অবশিষ্ট থাকে ‘ওঁ’ (প্রণব)। এই ওঁকারই পরমাত্মার স্থূল (প্রকাশ্য) বাচক বলে পরিচিত ॥ ৩৮ ॥
এই মন্ত্রকেই তত্ত্বদর্শী মুনিগণ ‘মহামন্ত্র’ বলে জানেন। এখন আমি তোমাকে সেই মহামন্ত্রের সূক্ষ্ম তত্ত্ব ব্যাখ্যা করছি ॥ ৩৯ ॥
ত্রিপঞ্চরূপ এবং ষোড়শ স্বরসমষ্টির আদিতে যখন ‘স’-কার সংযুক্ত হয়, তখন সেই আদ্যরূপই মহামন্ত্ররূপে প্রতিষ্ঠিত হয় ॥ ৪০ ॥
হংসমন্ত্রের প্রতিলোমরূপ হলো ‘সোঽহং’। সেখানে ‘স’-কারের অর্থ শিব বলে স্মরণ করা হয়েছে। অতএব, এই মহামন্ত্রের বাচ্য শক্তিসহিত পরমেশ্বর শিব — এটাই শাস্ত্রের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ॥ ৪১ ॥
গুরু যখন শিষ্যকে উপদেশ দেন, তখন তিনি শিক্ষা দেন— ‘সোঽহং’, অর্থাৎ ‘আমি সেই শক্তিসহিত শিব’। এই উপদেশের মাধ্যমে জীব পরমতত্ত্বের দিকে অভিমুখী হয় এবং পশুভাব (অজ্ঞতা ও বন্ধন) অতিক্রম করে ॥ ৪২ ॥
জীব শক্তিস্বরূপ, শিবেরই অংশরূপ ; এবং শিবের সঙ্গে ঐক্যলাভের ফলে সে শিবসাম্য (শিবতুল্য অবস্থা) লাভ করে ॥ ৪৩ ॥
__________________________________________________
🔷বেদ বলছে —
🔶 হংস মন্ত্র হলেন মহেশ্বর, সেই মন্ত্রের মাধ্যমে স্ফটিকের মতো দিব্য দেহধারী দক্ষিণামূর্তি শিবের শরণ নেওয়া উচিত । প্রমাণ —
হংস এব পরং বাক্যং হংস এব তু বৈদিকম্ ।
হংস এব পরো রুদ্রো হংস এব পরাৎপরম্ ॥ ৬১
সর্বদেবস্য মধ্যস্থো হংস এব মহেশ্বরঃ ।
পৃথিব্যাদিশিবান্তং তু অকারাদ্যাশ্চ বর্ণকাঃ ॥ ৬২ ॥
কূটান্তা হংস এব স্যান্ মাতৃকেতি ব্যবস্থিতাঃ ॥ ৬৩
হংসজ্যোতিরনূপম্যং দেবমধ্যে ব্যবস্থিতম্।
দক্ষিণামুখমাশ্রিত্য জ্ঞানমুদ্রাং প্রকল্পয়েৎ ॥ ৬৪ ॥
সদা সমাধিং কুর্বীত হংসমন্ত্রমনুস্মরন্ ।
নির্মলস্ফটিকাকারং দিব্যরূপমনুত্তমম্ ॥ ৬৫ ॥
[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/ব্রহ্মবিদ্যা উপনিষদ/৬১-৬৫ নং মন্ত্র]
✅ অর্থ — হংসই পরম বাক্য (মহাবাক্য); হংসই বৈদিক (বেদপ্রতিপাদ্য তত্ত্ব)। হংসই পরম রুদ্র (পরম শিব) এবং হংসই পরাৎপর (সকলের ঊর্ধ্বে অবস্থিত পরম সত্তা) ॥ ৬১
সকল দেবতার অন্তঃস্থিত (মধ্যস্থ) মহেশ্বরও হংসই। পৃথিবী থেকে শিব পর্যন্ত এবং 'অ'কার থেকে শুরু করে সকল বর্ণই (মাতৃকারূপে) হংসস্বরূপ ॥ ৬২ ॥
সমস্ত কূট (বর্ণবিভাগ)-এর অন্তিম তত্ত্বও হংসই ; এই কারণেই সমগ্র মাতৃকাকে (বর্ণমালা বা অক্ষরসমষ্টিকে) হংসরূপ বলে নির্ধারণ করা হয়েছে ॥ ৬৩ ॥
হংসের অনুপম জ্যোতি দেবগণের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত। দক্ষিণামুখ (পরমেশ্বর দক্ষিণামূর্তি শিব)-এর আশ্রয় গ্রহণ করে জ্ঞানমুদ্রা ধারণ করবে ॥ ৬৪ ॥
সর্বদা সমাধিস্থ অবস্থায় হংসমন্ত্র স্মরণ করবে এবং নির্মল স্ফটিকের ন্যায় বিশুদ্ধ, অনুত্তম দিব্যস্বরূপের (পরমেশ্বর শিবের) ধ্যান করবে ॥ ৬৫ ॥
🔶 হংস মন্ত্রের মুখ হল - রুদ্র। প্রমাণ —
অগ্নীষোমৌ পক্ষাব্ ওঙ্কারঃ শিরঃ উকারো
বিন্দুঃ ত্রিনেত্রং মুখং রুদ্রো রুদ্রাণী চরণৌ ।
[শুক্ল-যজুর্বেদ/হংস উপনিষদ/১৪ নং মন্ত্র]
✅ অর্থ - অগ্নি ও সোম সেই (হংস) -এর দুই পক্ষ (ডানা)। ওঙ্কার তার মস্তক। বিন্দুসহিত উকার তার তৃতীয় নেত্র। রুদ্র তার মুখ এবং রুদ্রাণী তার দুই চরণ।
🔶হংস মন্ত্রে মন লীন হলে সাম্ব-সদাশিবের দর্শন লাভ হয়, এই কথা বেদের বচন। প্রমাণ —
তস্মিন্ মনো বিলীয়তে মনসি সংকল্পবিকল্পে দগ্ধং পুণ্যপাপে
সদাশিবঃ শক্ত্যাত্মা সর্বত্রাবস্থিতঃ স্বয়ংজ্যোতিঃ শুদ্ধো বুদ্ধো
নিত্যো নিরঞ্জনঃ শান্তঃ প্রকাশত ইতি বেদানুবচনং ভবতীত্যুপনিষৎ ॥ ২১ ॥
[শুক্ল-যজুর্বেদ/হংস উপনিষদ/২১ নং মন্ত্র]
✅ অর্থ — যখন মন সেই হংস নামক পরম তত্ত্বে লয়প্রাপ্ত হয় এবং মনের সকল সংকল্প–বিকল্প, পুণ্য ও পাপ দগ্ধ (বিনষ্ট) হয়ে যায়, তখন শক্তিসহিত স্বরূপধারী সদাশিব, যিনি সর্বব্যাপী, স্বয়ংপ্রকাশ, শুদ্ধ, চৈতন্যময় (বুদ্ধ), নিত্য, নিরঞ্জন (মায়া ও সকল কলুষ থেকে মুক্ত) এবং পরম শান্ত — তিনি স্বয়ং প্রকাশিত হন। এই বিষয়েই বেদের ঘোষণা (বেদবচন) রয়েছে। — এই হলো উপনিষদের উপদেশ ॥ ২১ ॥
🔶 হংস মন্ত্র বা তার প্রতিলোম (উল্টোরূপ) সোঽহং (সোঽহম্) হলেন দিব্য জ্যোতিরূপ শিব। প্রমাণ —
সোঽহমের্কঃ পরং জ্যোতিরর্কজ্যোতিরহং শিবঃ ।
আত্মজ্যোতিরহং শুক্রঃ সর্বজ্যোতিরসাবদোম্ ॥ ১১ ॥
(অথর্ব-বেদ/মহাবাক্য উপনিষদ/১১ নং মন্ত্র)
✅ অর্থ — আমি সেই [সোঽহম্/ হংস প্রতিলোম] চিদ্ আদিত্য, আমি আদিত্য রূপ সেই পরম জ্যোতি, আমি সেই জ্যোতিস্বরূপ শিব (শিবলিঙ্গ/পরমাত্মা শিব)। আমি সেই শ্রেষ্ঠ আত্মজ্যোতি, সকলকে প্রকাশ প্রদানকারী বীজরূপ ব্রহ্ম আমিই তথা সেই প্রকাশিত জ্যোতি থেকে আমি কখনোই পৃথক হই না ।
__________________________________________________
🔥 সিদ্ধান্ত —
উপর্যুক্ত স্কন্দমহাপুরাণের সূতসংহিতার ‘হংসবিদ্যাবিবরণ’ অধ্যায়ের প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, হংসবিদ্যা কোনো অনির্দিষ্ট বা দেবতানিরপেক্ষ উপাসনা নয়। শাস্ত্র নিজেই এই বিদ্যার মন্ত্র, বীজ, শক্তি, দেবতা, ধ্যান, সাধনপদ্ধতি এবং পরম লক্ষ্য নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। দ্বিতীয় শ্লোকে স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করা হয়েছে — “বিদ্যা শক্তির্ভবেদ্ বীজং শিব এব ন চান্যথা”, অর্থাৎ এই মন্ত্রের বীজ স্বয়ং শিব, অন্য কেউ নন। আবার সাধককে সাম্ব-মহাদেবের ধ্যান করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং পরিশেষে বলা হয়েছে — “হংস হংসেতি যো ব্রূয়াৎ সর্বদা শিব এব সঃ” ; অর্থাৎ যে সর্বদা ‘হংস, হংস’ জপ করে, সে শিবস্বরূপ হয়। আরও বলা হয়েছে, “গুরুরেব শিবস্তস্য” — গুরুরূপেই শিব বিরাজমান। সমস্ত শাস্ত্রপ্রমাণের সমন্বিত বিচার থেকে একটি বিষয় সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় — হংসবিদ্যা কোনো অনির্দিষ্ট, নিরপেক্ষ বা দেবতাশূন্য তত্ত্ব নয়।
শিবমহাপুরাণে 'স'-কারের অর্থ শিব বলে নির্ণয় করে 'সোঽহং' মহামন্ত্রের বাচ্যকে শক্তিসহিত পরমেশ্বর শিব বলা হয়েছে; বেদের ব্রহ্মবিদ্যা উপনিষদের শ্রুতিমন্ত্রে "হংস এব পরো রুদ্রো", "হংস এব মহেশ্বরঃ" বলে হংসকেই পরম রুদ্র মহেশ্বররূপে অভিহিত করা হয়েছে ; বেদের স্বয়ং হংস উপনিষদে হংসমন্ত্রের মুখকে রুদ্র বলা হয়েছে, হংস উপনিষদ আরো বলছে — হংস বিদ্যা জপ করে দক্ষিণামূর্তি শিবের স্ফটিকের ন্যায় দিব্য রূপের ধ্যান করতে হবে। আবার বেদের মহাবাক্য উপনিষদে জীবরূপ মনুষ্য যখন আত্মজ্ঞানে নিজের প্রকৃত স্বরূপ কে জানতে পারে তখন তার সেই স্থিতিতে সেই আত্মজ্ঞানী ব্যক্তি "সোঽহম্... অহং শিবঃ" বলে সেই উপলব্ধিকে প্রত্যক্ষভাবে শিবতত্ত্বের সঙ্গে নিজেকে অভিন্ন বলে মনে করে - এমটি উল্লেখ করা হয়েছে।
অতএব, হংসবিদ্যাকে শিবতত্ত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে কেবল একটি নিরপেক্ষ ব্রহ্মবিদ্যা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি। বরং সমগ্র আলোচনায় হংসবিদ্যার ভিত্তি, উপাস্য, ধ্যান, সাধনা ও সিদ্ধি — সবই শিবতত্ত্বকে কেন্দ্র করেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জীবাত্মা ও পরমাত্মার অভেদ উপলব্ধির যে শিক্ষা এখানে দেওয়া হয়েছে, সেটিও শিবতত্ত্বের মধ্য দিয়েই ব্যাখ্যাত হয়েছে ; শিবকে উপেক্ষা করে নয়।
অর্থাৎ হংস যে শিবেরই বিদ্যা, তা বেদের শ্রুতিমন্ত্র দ্বারা প্রমাণিত। তাই শ্রুতিবিরোধী কোনো মত কখনও প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়।
সুতরাং, শাস্ত্রের এই সুস্পষ্ট ঘোষণার পরেও যদি কেউ হংসবিদ্যাকে শিবসংক্রান্ত বিদ্যা বলতে অস্বীকার করেন, অথবা শিবের প্রত্যক্ষ পরিচয়কে উপেক্ষা করে একে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ব্রহ্মবিদ্যা বলে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন, তবে সেই মত শাস্ত্রসমর্থিত নয়। সনাতন ধর্মে ব্যক্তিগত মত, কল্পনা বা সম্প্রদায়গত ব্যাখ্যার চেয়ে শাস্ত্রই সর্বোচ্চ প্রমাণ ও গ্রহনযোগ্য বলে বিবেচিত। তাই হংসবিদ্যার প্রকৃত স্বরূপ নির্ধারণেও শাস্ত্রবচনই চূড়ান্ত মানদণ্ড, এবং সেই শাস্ত্রবচন স্পষ্টভাবেই ঘোষণা করছে — হংসবিদ্যা পরমেশ্বর শিবেরই বিদ্যা।
__________________________________________________
🚩 তথ্য সংগ্রহ, ব্যাখ্যা প্রদান তথা সত্য উন্মোচনে : শিবালয় প্রতিষ্ঠাতা শিবদ্বারাধীশাধ্যক্ষ দেশিক আচার্যপরমাধিকারী শ্রীশ্রীগুরু নন্দীনাথ শৈব আচার্যদেব জী 🚩
©️ কপিরাইট ও প্রচারে : Shivalaya 🔥
শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্ 🚩
ॐ নমঃ পার্বতীপতয়ে হর হর মহাদেব 🚩
#হিন্দুধর্ম #সনাতনধর্ম #শিবালয় #Shivalaya #sanatandharma #হংস #শৈবধর্ম #সোঽহম্ #সোঽহং #হংসমন্ত্র #অজপাগায়ত্রী # #স্কন্দমহাপুরাণ #পরমেশ্বরশিব #শুক্লযজুর্বেদ #কৃষ্ণযজুর্বেদ #অথর্ববেদ #ব্রহ্মবিদ্যাউপনিষদ #মহাবাক্যউপনিষদ #হংসউপনিষদ


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন