সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ’ শ্লোকের প্রকৃত লক্ষ্য একমাত্র - পরমেশ্বর শিব



🕉️ সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ’ শ্লোকের প্রকৃত লক্ষ্য একমাত্র — পরমেশ্বর শিব

__________________________________________________

🔰 ভূমিকা — 

বর্তমান সময়ে সনাতন সমাজের একটি বড় সংকট হল — যোগ, আত্মতত্ত্ব ও বেদান্তের প্রকৃত অর্থ সম্পর্কে অজ্ঞতা। অধিকাংশ মানুষ ভগবদ্গীতাকে কেবল সম্প্রদায়গত দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করেন ; অথচ ভগবৎ গীতা নিজেই সমগ্র বৈদিক তত্ত্বের সারসংগ্রহ। এই অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে বহু সম্প্রদায়ভিত্তিক ভাষ্যকার গীতার উপর নিজস্ব মতবাদ আরোপ করেছেন। ফলে শাস্ত্রের প্রকৃত উদ্দেশ্য আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে এবং সাধারণ মানুষের কাছে বহু মতামতই শাস্ত্রসিদ্ধ সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সমগ্র সনাতন ধর্মের মৌলিক তত্ত্ব।

শাস্ত্রমীমাংসার একটি মৌলিক নীতি হল — কোনো একটি শাস্ত্রকে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, বরং বেদ, উপনিষদ, স্মৃতি, পুরাণ, ইতিহাস, আগম এবং অন্যান্য প্রামাণিক গ্রন্থের সঙ্গে সমন্বয় করে বিচার করতে হয়। একাধিক শাস্ত্রে একই তত্ত্ব পুনঃপুনঃ প্রতিপাদিত হলে তবেই সেই সিদ্ধান্তকে সনাতন ধর্মের অন্তিম সিদ্ধান্ত (সিদ্ধান্ততত্ত্ব) বলা যায়। ব্যক্তিগত বিশ্বাস, সম্প্রদায়গত আবেগ বা একক ভাষ্য কখনোই শাস্ত্রসিদ্ধ সিদ্ধান্তের বিকল্প হতে পারে না।

এই প্রবন্ধে আলোচিত হবে ভগবদ্গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের বিখ্যাত শ্লোক— “সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ”। প্রচলিত ধারণায় এই শ্লোককে কেবল শ্রীকৃষ্ণের ব্যক্তিগত পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়। বিশেষ করে বৈষ্ণবগণ সর্বদা দাবী করেন যে, ভগবদগীতায় শ্রীকৃষ্ণ নিজেকে একমাত্র পরমেশ্বর দাব করেছেন, শ্রীকৃষ্ণ সবকিছু ছেড়ে একমাত্র শ্রীকৃষ্ণের শরণ নিতে বলেছেন। কিন্তু যোগশাস্ত্র, উপনিষদ, বেদ, পুরাণ এবং শৈব-আগমসমূহ একত্রে বিচার করলে একটি ভিন্ন ও গভীর তত্ত্ব উদ্ভাসিত হয়। যোগাবস্থায় ‘আমি’ (অহং) শব্দটি কেবল দেহধারী ব্যক্তিকে নির্দেশ করে না ; বরং দেহে অবস্থানকারী পরমাত্মা, আত্মস্বরূপ পরমচৈতন্যকেই নির্দেশ করে। সেই আত্মাই সর্বভূতে বিরাজমান এক ও অদ্বিতীয় পরমসত্তা।

এই কারণেই ভগবদ্গীতার বহু শ্লোকের সঙ্গে অথর্ববেদের উপনিষদসমূহ, শিবগীতা, ঈশ্বরগীতা, শিবপুরাণ এবং অন্যান্য শাস্ত্রে পরমেশ্বর শিবের শ্রীমুখে উচ্চারিত বাণীর বিস্ময়কর মিল দেখা যায়। এই মিল কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং এক অভিন্ন বৈদিক তত্ত্বেরই পুনরুচ্চারণ। অতএব, এই সাদৃশ্যকে অস্বীকার করে গ্রন্থগুলিকে অপ্রামাণিক বলে দাবি করা শাস্ত্রসম্মত পদ্ধতি নয়। বরং শাস্ত্রসমূহের আন্তঃসম্পর্ক, উদ্ধৃতি, প্রাচীন আচার্যদের সাক্ষ্য এবং মীমাংসার নীতির আলোকেই তাদের প্রামাণিকতা নির্ণয় করা উচিত।

এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য কোনো সম্প্রদায়বিশেষের প্রতি বিদ্বেষ প্রদর্শন করা নয়; বরং বেদ, উপনিষদ, পুরাণ ও ইতিহাসে বিদ্যমান প্রামাণিক উদ্ধৃতির ভিত্তিতে দেখানো যে, “সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ”— এই শ্লোকে উল্লিখিত ‘মাম্’‘অহং’ শব্দের প্রকৃত লক্ষ্য কে, এবং কেন বহু বৈদিক ও পৌরাণিক গ্রন্থ এই তত্ত্বকে একবাক্যে পরমেশ্বর শিবের সঙ্গে অভিন্ন বলে প্রতিষ্ঠা করেছে।

পাঠকের প্রতি অনুরোধ, এই আলোচনাকে কোনো সম্প্রদায়গত বিতর্ক হিসেবে নয়, বরং শাস্ত্রসম্মত অনুসন্ধান হিসেবে বিবেচনা করুন। কারণ সনাতন ধর্মে সত্যের মানদণ্ড ব্যক্তি, সম্প্রদায় বা প্রথা নয় —  শ্রুতি, যুক্তি, মীমাংসা এবং সমগ্র শাস্ত্রসমূহের সমন্বিত সিদ্ধান্তই প্রকৃত প্রমাণ।

__________________________________________________

♦️ বিতর্কিত শ্লোক : 


ভগবদগীতায় বলা হয়েছে —

সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ ।

অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ ॥ ৬৬ 

[ভগবদগীতা/১৮ অধ্যায়/৬৬ নং শ্লোক]

✅ অর্থ : [অর্জুনকে শ্রীকৃষ্ণ বললেন] সকল ধর্ম পরিত্যাগ করে তুমি একমাত্র আমার শরণ গ্রহণ করো। আমি তোমাকে সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত করে মোক্ষ প্রদান করব, তাই শোক কোরো না। 

__________________________________________________

♦️ শ্লোকের অর্থ ও লক্ষ্য বিচার — উক্ত শ্লোকে সমস্ত প্রকার ধর্ম পরিত্যাগ করে আমার শরণ নিতে বলা হয়েছে, আমি অর্জুনকে সর্বপাপ থেকে মুক্ত করে মোক্ষ প্রদান করবো বলা হয়েছে। 

এখন প্রথম প্রশ্ন হল — সর্বধর্ম অর্থা‌ৎ সমস্ত ধর্ম বলতে কি বোঝানো হয়েছে ?

✳️ উত্তর : এই বিষয়ে বেদে বলা হয়েছে, চলুন দেখে নেওয়া যাক।

অথর্ববেদের অন্নপূর্ণা উপনিষদের ১ম অধ্যায় -এ সর্বধর্ম ও তার পরিভাষা স্পষ্ট করে বলা হয়েছে —

যাবদ্যাবন্মুনিশ্রেষ্ঠ স্বয়ং সন্ত্যজ্যতেঽখিলম্ ।
তাবত্তাবৎ পরালোকঃ পরমাত্মৈব শিষ্যতে ॥ ৪৪ 
॥ 

✅ অর্থ : হে মুনিশ্রেষ্ঠ ! যতক্ষণ পর্যন্ত সমস্ত কিছুর পরিত্যাগ সম্পূর্ণরূপে না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত পরমাত্মার উপলব্ধি হয় না। যখন সবকিছুর পরিত্যাগ সম্পন্ন হয়, তখন একমাত্র পরমাত্মাই অবশিষ্ট থাকেন।

যাবৎসর্বং ন সন্ত্যক্তং তাবদাত্মা ন লভ্যতে ।
সর্ববস্তুপরিত্যাগে শেষ আত্মেতি কথ্যতে ॥ ৪৫ 
॥ 

✅ অর্থ : যতক্ষণ পর্যন্ত সমস্ত বিষয়-বস্তুর প্রতি আসক্তি ত্যাগ করা না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত আত্মার উপলব্ধি হয় না। সকল বিষয়-বস্তুর [আসক্তি ভাব] পরিত্যাগের পর যে একমাত্র আত্মাই অবশিষ্ট থাকে, তাকেই প্রকৃত আত্মা বলা হয়।

আত্মাবলোকনার্থং তু তস্মাৎসর্বং পরিত্যজেৎ ।
সর্বং সন্ত্যজ্য দূরেণ যচ্ছিষ্টং তন্ময়ো ভব ॥ ৪৬ 
॥ 

✅ অর্থ : অতএব আত্মার সাক্ষাৎকার লাভের জন্য সবকিছুর প্রতি আসক্তি পরিত্যাগ করা উচিত। সমস্ত কিছু সম্পূর্ণভাবে ত্যাগ করলে যা অবশিষ্ট থাকে, তার সঙ্গেই একাত্ম হও।

সর্বং কিঞ্চিদিদং দৃশ্যং দৃশ্যতে যজ্জগদ্গতম্ ।
চিন্নিষ্পন্দাংশমাত্রং তন্নান্যৎ কিঞ্চন শাশ্বতম্ ॥ ৪৭ 
॥ 

✅ অর্থ : এই জগতে যা কিছু দৃশ্যমান, সবই চৈতন্যের (চিৎ-এর) স্থির (নিষ্পন্দ) স্বরূপেরই প্রকাশমাত্র। সেই পরমচৈতন্য (পরম চেতনা সত্ত্বা) ব্যতীত অন্য কোনো শাশ্বত সত্তা নেই।

সমাহিতা নিত্যতৃপ্তা যথাভূতার্থদর্শিনী ।
ব্রহ্মন্ সমাধিশব্দেন পরা প্রজ্ঞোচ্যতে বুধৈঃ ॥ ৪৮ 
 

✅ অর্থ : হে ব্রহ্মন্ ! যে চিত্ত সর্বদা একাগ্র, নিত্য তৃপ্ত এবং বস্তুর যথার্থ স্বরূপ উপলব্ধি করে, জ্ঞানীগণ সেই পরম প্রজ্ঞাকেই ‘সমাধি’ নামে অভিহিত করেন।


পরিজ্ঞায় পরিত্যাগো বাসানানং য উত্তমঃ । 
সত্তাসামান্যরূপত্বাত্তৎকৈবল্যপদং বিদুঃ ॥ ১৫॥

[অথর্ববেদ/অন্নপূর্ণা উপনিষদ/৫ম অধ্যায়/১৫ নং মন্ত্র]

✅ অর্থ : বাসনাসমূহকে যথার্থরূপে জেনে তাদের যে পরিত্যাগ করা হয়, তাকেই সর্বোত্তম ত্যাগ বলা হয়। কারণ সেই অবস্থা সত্তার সামান্য (বিশুদ্ধ অস্তিত্ব) স্বরূপ হওয়ায় জ্ঞানীগণ তাকে কৈবল্যপদ (মোক্ষ) বলে জানেন। ॥ ১৫ ॥

🟥 বিশ্লেষণ —

অথর্ববেদের অন্নপূর্ণা উপনিষদের এই মন্ত্রগুলি স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, "সর্বধর্ম পরিত্যাগ" বলতে নিজের কর্তব্য, নৈতিকতা বা ধর্মাচরণ ত্যাগ করাকে বোঝানো হয়নি। এখানে 'সর্ব' বলতে সকল বিষয়-বাসনা, দেহাভিমান, জড় উপাধি এবং বিষয়ের প্রতি আসক্তিকে বোঝানো হয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত এই আসক্তিগুলি সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত আত্মসাক্ষাৎকার বা পরমাত্মার উপলব্ধি সম্ভব নয়।

অতএব, ভগবদ্গীতার "সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য" বাক্যটির প্রকৃত তাৎপর্য হল — সকল উপাধি, আসক্তি ও জড় পরিচয় অতিক্রম করে নিজের দেহের অভ্যন্তরে থাকা আত্মস্বরূপ পরমাত্মার শরণ গ্রহণ করা। অন্নপূর্ণা উপনিষদ এই তত্ত্বকেই আরও স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছে এবং দেখিয়েছে যে, প্রকৃত ত্যাগ হল বাহ্যিক কর্ম পরিত্যাগ নয়, বরং অন্তরের বাসনা ও আসক্তির পরিত্যাগ, পাপ থেকে বিরত ও পুণ্যের ফল ভোগ করবার আশা ত্যাগ করে নিষ্কাম হওয়া ; আর এই অবস্থাই জীবকে কৈবল্য বা মোক্ষের পথে প্রতিষ্ঠিত করে। 

এককথায় — দেহবোধের সকল বাহ্যিক ক্রিয়াকলাপের ধর্মকে স্বয়ং আমি না ভেবে, নিজেকে আত্মা বলে জেনে আত্মাতে মন স্থির করতে বলা হয়েছে।

__________________________________________________

এবার যোগের বিষয়টি আগে স্পষ্ট করে নেয়া যাক।


পরমশৈব ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নিজের শ্রীমুখে স্বীকার করেছিলেন যে, ভগবদ্‌গীতার জ্ঞান অর্জুনকে শ্রবণ করানোর মুহূর্তে তিনি যোগযুক্ত হয়ে সেই সময়ে তিনি পরমব্রহ্মের বিষয়ে বলেছিলেন, এর প্রমাণ রয়েছে মহাভারতের আশ্বমেধিকপর্বের ১৭ অধ্যায়ের ৯-১৩ নং শ্লোকে।  

তাছাড়াও পদ্মপুরাণের উত্তর খণ্ডের ১৭৫ নং অধ্যায়ের ১৬-৩০ নং শ্লোকে - শ্রীবিষ্ণু নিজেই বলেছেন যে, গীতা সাক্ষাৎ মহাদেবকেই বোধিত করে, আর গীতার স্বরূপটি শিবেরই স্বরূপ। তাই এক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, শ্রীকৃষ্ণ, অর্জুনকে যে জ্ঞানটা প্রদান করেছিলেন, তা শিবজ্ঞানই ছিল এবং পরমেশ্বর শিবের সাথেই একাগ্রভাবে সংযুক্ত থেকেই সেই জ্ঞান অর্জুনকে দিয়েছিলেন।


দেখুন, যোগ অবলম্বন করে যোগী ব্যক্তি ‘অহং’ - আমি - শব্দে শিবকেই বুঝিয়ে থাকেন, তা বেদেই বলা হয়েছে —

সর্বত্রপূর্ণরূপোহস্মি সচ্চিদানন্দলক্ষণঃ ।

সর্বতীর্থস্বরূপোহস্মি পরমাত্মাস্ম্যহং শিবং ॥ ১২ ॥

[সামবেদ/মৈত্রেয়ী উপনিষদ/অধ্যায়/৩]

অর্থ : আমি সর্বত্র পূর্ণরূপে বিরাজিত সচ্চিদানন্দ লক্ষণযুক্ত। তীর্থের স্বরূপও আমি এবং আমি পরমাত্মা স্বরূপ কল্যাণকারী শিব ॥ ১২ ॥


♦️ যোগী ব্যক্তি যখন ধ্যানের মাধ্যমে পরমেশ্বর শিবের তত্ত্বকে জানতে পারেন, তখন সে যোগী মুক্ত হয়ে শিবত্ব লাভ করেন। শ্রুতি শাস্ত্রের মধ্যেই বলা হয়েছে শিবতত্ত্বকে জানার পরেই জীবের মুক্তি হয় —

বিরক্তস্য তু সংসারাজ্ঞানং কৈবল্যসাধনম্ ।

তেন পাশাপহানিঃ স্যাজ্ঞাত্বা দেবং সদাশিবম্‌ ॥ ৪৭ ॥

[সামবেদ/দর্শন উপনিষদ/৬ষ্ঠ খণ্ড/৪৭]

অর্থ : এই প্রকারে যেসব মানুষের সংসার-সাগরের মায়া থেকে পৃথক হয়ে যায়, তাদের কৈবল্যমুক্তির সাধনভূত জ্ঞানের প্রাপ্তি হয়। সেই জ্ঞানের দ্বারা নিত্য পরমাত্মা সদাশিবের তত্ত্বজ্ঞান প্রাপ্ত হওয়ার পরে, সমস্ত প্রকার বন্ধন থেকেই জীব মুক্ত হয়ে যায় ॥ ৪৭ ॥


একই বাক্যের সমর্থনে ভগবান শ্রীবিষ্ণু জী বলেছেন —

যস্মিন্ কালে স্বমাত্মানং যোগী জানাতি কেবলম্ ।

তস্মাৎ কালাৎ সমারভ্য জীবন্মুক্তো ভবেদসৌ ॥ ৪২ ॥

[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/বরাহ উপনিষদ/২ অধ্যায়]

অর্থ : যোগী যে সময়ে কেবল আত্মস্বরূপ অবগত হন, সেই সময় থেকে তিনি জীবন্মুক্ত বলে কথিত হন ॥ ৪২ ॥


অর্থাৎ, অহং শব্দে সর্বদা পরমেশ্বর শিবকেই বোঝানো হয়ে থাকে। 

♦️ এবার সরাসরি ‘অহং’ শব্দের অর্থ একমাত্র শিবকেই বোঝানো হয়ে থাকে, অন্য আর কাউকে বোঝানো হয় না — এই বিষয়ে আলোচনা করি।

শ্রীকৃষ্ণ ‘অহং’ শব্দে আমি বলতে শিবকেই বুঝিয়েছেন। শাস্ত্রেও বলা হয়েছে যোগস্থ আত্মজ্ঞানময় অবস্থায় অহং শব্দে মহিমা ঘোষণা কারী ব্যক্তির অহং শব্দ শিবকেই নির্দেশ করে। যারা অহং শব্দে শিবকেই বোঝানো হচ্ছে বলে মনে করেন তারাই মায়ামুক্ত ব্যক্তি, বাকিরা মায়ার অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে অহং শব্দের বাচক দেহধারী শ্রীকৃষ্ণ-কে মনে করে চলেছে, এটি বলছে শাস্ত্র। 

দেখুন প্রমাণ — 

শিবরূপতয়া ভাতেঽহংশব্দার্থে মুনীশ্বরাঃ ।

অবিদ্যা বিলয়ং যাতি বিদ্যয়া পরয়ৈব তু ॥ ৮ ॥

[স্কন্দমহাপুরাণ/সূতসংহিতা/যজ্ঞবৈভবখণ্ড/উপরিভাগ/ব্রহ্মগীতা/অধ্যায় ১২/৮ শ্লোক]

অর্থ : অহং — শব্দের অর্থ ‘আমি’ বলতে যিনি ‘শিব’ বলে ভাবেন, বাস্তবে একমাত্র তার‌ই সকল অবিদ্যা (মায়া) লুপ্ত (দূর) হয়েছে বলে জানা উচিত ॥ ৮ ॥ 

অর্থাৎ, পরমেশ্বর শিবের সহিত যোগের দ্বারা একাত্মভাবে স্থিত হয়ে পরমশৈব ভগবান শ্রী কৃষ্ণ সেই ভাব অনুসারে আমি শব্দে শিব মাহাত্ম্য প্রকাশ করেছেন অর্জুনের সম্মুখে। তাই আমি শব্দে পরমেশ্বর শিবের সর্বোচ্চ পরমত্বের খণ্ডন হয়নি। বরং ভগবদগীতার এই শ্লোক মূলত পরমেশ্বর শিব কেই ইঙ্গিত করছে। 

পরমেশ্বর শিব যে সকল জীবের মধ্যে জীবাত্মা হয়ে অবস্থান করেন তা শ্রীকৃষ্ণ নিজেই বলেছেন, প্রমাণ দেখুন —

আত্মা চ সর্বভূতানাং সাংখ্যে পুরুষ উচ্যসে।

ঋষভস্ত্বং পবিত্রাণাং যোগিনাং নিষ্কলঃ শিবঃ ॥ ৩১৬

[মহাভারত/অনুশাসন পর্ব/১৩ অধ্যায়/৩১৬ নং শ্লোক]

✅ অর্থ — হে মহাদেব ! আপনি সমস্ত প্রাণীর জীবাত্মা, সাংখ্যে পুরুষ বলে উক্ত হয়েছেন ; পবিত্রগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ এবং যোগিদের অন্তরের মধ্যে নিষ্কল পরমশিব ॥৩১৬

__________________________________________________

এবার ভগবদ্গীতার উক্ত শ্লোকের মতো একই বচন যে, প্রভু শিবের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন শাস্ত্রে বলা হয়েছে, তা দেখে নিন।  

🕉️ শিবগীতা থেকে প্রমাণ উপস্থাপন করা হল,

শিবগীতা থেকে প্রমাণ — 

নানাযোনিষু জাতস্য দেহিনো যস্য কস্যচিৎ । 

কোটিজন্মার্জিতেঃ পুণ্যৈৰ্ম্ময়ি ভক্তিঃ প্রজায়তে ৪১

স এব লভতে জ্ঞানং মদ্ভক্তঃ শ্রদ্ধয়ান্বিতঃ । 

নান্যকৰ্ম্মাণি কুর্ব্বাণো জন্মকোটিশতৈরপি ৪২

ততঃ সর্বং পরিত্যজ্য মদ্ভক্তিং সমুদাহর ।

সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ ৪৩

অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ । 

যৎ করোষি যদশ্লাসি যজুহোষি দদাসি যৎ ৪৪

[পদ্মপুরাণ/পাতালখণ্ড/শিবগীতা/১৪ অধ্যায়/৪১-৪৪ নং শ্লোক]

অর্থ : পরমেশ্বর শিব বললেন, নানা যোনিতে জন্ম নিয়ে দেহ গ্রহণ করে অবশেষে কোটি জন্ম ধরে অর্জিত পণ্যের ফলে জীবের হৃদয়ে শিব ভক্তি উদয় হয় ॥ ৪১ ॥

আমার প্রতি একনিষ্ঠ ভক্তি শ্রদ্ধা আছে, একমাত্র এমন ভক্তের‌ই শিবজ্ঞান (আত্মজ্ঞান) লাভ হয়ে থাকে। অন্য কোনো কর্ম দ্বারা বা অন্য কোনো উপায় দ্বারা শতকোটি জন্মেও আত্মজ্ঞান লাভ করতে জীব সক্ষম হয় না ॥ ৪২ ॥

সকল কিছু পরিত্যাগ করে তুমি কেমন আমার প্রতি ভক্তি পরায়ণ হও। তুমি সকল ধর্ম (জড় দৈহিক ও কর্মকাণ্ডমূলক ধর্মকে) পরিত্যাগ করে আত্মরূপ আমার (পরমাত্মা শিবের) শরণ নাও। আমি (আত্মস্বরূপ শিব) তোমাকে সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত করে মোক্ষ প্রদান করব। তুমি যে আহার, যজ্ঞ, দান ইত্যাদি করো তা সব‌ই আমাকে (দেহের মধ্যে স্থিত শিবরূপ আত্মাকে) অর্পন করো ॥ ৪৩-৪৪ ॥


🟥 বিশ্লেষণ — ভগবদ্গীতার ১৮ অধ্যায়ের ৬৬ নং শ্লোকের সঙ্গে শিবগীতা-র এই ১৪ অধ্যায়ের ৪৩-৪৪ নং শ্লোকগুলির তুলনা করলে দেখা যায় যে, "সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ" এবং "অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ"— এই উভয় বচনই এখানে অবিকলভাবে পরমেশ্বর শিবের শ্রীমুখে উচ্চারিত হয়েছে। 

আরও লক্ষণীয় বিষয় হল, শিবগীতার আখ্যান অনুযায়ী এই উপদেশ পরমেশ্বর শিব শ্রীরামচন্দ্রকে প্রদান করেন। অর্থাৎ আখ্যানের ক্রমানুসারে এই বচনটি শ্রীকৃষ্ণের অবতারেরও পূর্বে, ত্রেতাযুগে উচ্চারিত হয়েছে। পরে দ্বাপরযুগে ভগবান শ্রীকৃষ্ণও ভগবদ্গীতায় একই বচন উচ্চারণ করেন। এই ধারাবাহিকতা দেখায় যে, এটি শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে সীমাবদ্ধ উক্তি নয় ; বরং পরমেশ্বর শিবের উক্তিকে যোগযুক্ত হয়ে পুনঃপুনঃ প্রতিপাদিত করেছেন শ্রীকৃষ্ণ।

এটি শুধু শব্দগত মিলই নয়, এর পূর্ববর্তী শ্লোকগুলিতেও পরমাত্মা শিব স্পষ্টভাবে আত্মজ্ঞান, ভক্তি, সকল ধর্ম (দৈহিক ও কর্মকাণ্ডমূলক আসক্তি) পরিত্যাগ এবং আত্মারূপ শিবের শরণ গ্রহণের উপদেশ দিচ্ছেন। অর্থাৎ এখানে "মাম্""অহং" শব্দদ্বয় পরমাত্মা শিবকেই নির্দেশ করছে।


🕉️ শিবপুরাণ থেকে প্রমাণ  — 

সর্বমন্যৎ পরিত্যজ্য শিব এব শিবঙ্করঃ ॥ ৫৩ ॥
পরো ধ্যেয়োঽধিদেবেশঃ সমাপ্তা অথর্বণী শ্রুতিঃ 
।..॥ ৫৪ ॥

[শিবমহাপুরাণ/বায়বীয় সংহিতা/উত্তরখণ্ড/৩৭ অধ্যায়/৫৩-৫৪ নং শ্লোক]

অর্থ : অন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে একমাত্র কল্যাণময় শিবকেই ধ্যান করা উচিত। তিনিই দেবগণের পরম ঈশ্বর ও সর্বোচ্চ ধ্যানযোগ্য। এটিই অথর্ববেদের শ্রুতির অন্তিম সিদ্ধান্ত।

☀️ উপরোক্ত শিব পুরাণের শ্লোকে বলা হয়েছে অথর্ববেদের শ্রুতি মন্ত্রে শিবকেই একমাত্র ধ্যান করা উচিত। এই পুরাণ বচন সত্য, কারণ - অথর্ববেদের অন্তর্গত অথর্বশিখা উপনিষদের ৩য় খণ্ডের ৪ নং মন্ত্রে এমনটিই বলা হয়েছে। দেখুন 👇 

🕉️ অথর্বশিখা থেকে প্রমাণ  — 

সর্বকরণানি মনসি সম্প্রতিষ্ঠাপ্য ধ্যানং বিষ্ণুঃ প্রাণং মনসি

সহ করণৈঃ মনসি সম্প্রতিষ্ঠাপ্য ধ্যাতা রুদ্রঃ প্রাণং মনসি সহকরণৈর্নাদান্তে

পরমাত্মনি সম্প্রতিষ্ঠাপ্য ধ্যায়ীতেশানং প্রধ্যায়িতব্যম্‌ ॥ ৩ 

সর্বমিদং ব্রহ্মবিষ্ণুরুদ্রেন্দ্রাস্তে সম্প্রসূয়ন্তে সর্বাণি চেন্দ্রিয়াণি সহ ভূতৈর্ন
কারণং কারণানাং ধ্যাতা কারণং তু ধ্যেয়ঃ সর্বৈশ্বর্যসম্পন্নঃ সর্বেশ্বরঃ
শম্ভুরাকাশমধ্যে ধ্রুবং স্তব্ধ্বাঽধিকং ক্ষণমেকং ক্রতুশতস্যাপি
চতুঃসপ্তত্যা যৎ ফলং তদবাপ্নোতি কৃৎস্নমোঙ্কারগতিশ্চ
সর্বধ্যানযোগজ্ঞানানাং যৎ ফলমোঙ্কারো বেদ পর ঈশো বা শিব একো
ধ্যেয়ঃ শিবঙ্করঃ সর্বমন্যৎ পরিত্যজ্য
॥ ৪ 

[অথর্ববেদ/অথর্বশিখা/৩য় খণ্ড/৩-৪ নং মন্ত্র]

অর্থ : সমস্ত ইন্দ্রিয়কে মনে প্রতিষ্ঠিত করে যে ধ্যান করা হয়, তা বিষ্ণুরূপ ; প্রাণকে মনসহ ইন্দ্রিয়গুলির সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত করে যে ধ্যানকারী, সে রুদ্ররূপ ; এবং প্রাণ ও ইন্দ্রিয়সমূহকে মনসহ নাদান্তে পরমাত্মায় প্রতিষ্ঠিত করে যে ধ্যান করা হয়, তা ঈশান (সদাশিব)-এর ধ্যান — এইভাবেই ধ্যান করা উচিত।

এই সমগ্র জগৎ, ব্রহ্মা, বিষ্ণু, রুদ্র, ইন্দ্র, সমস্ত ইন্দ্রিয় ও পঞ্চভূত — সবই তাঁর (ত্রিদেব জনক সদাশিব) থেকে উৎপন্ন। তিনি সকল কারণের কারণ, ধ্যানকারীরও কারণ এবং ধ্যানের বিষয়। তিনি সর্বঐশ্বর্যসম্পন্ন শম্ভু।

আকাশমধ্যস্থিত সেই অচল, স্থির শম্ভুকে যদি এক মুহূর্তের জন্যও ধ্যান করা যায়, তবে একশত যজ্ঞের চেয়েও চুয়াত্তর গুণ অধিক যে ফল, সেই ফল লাভ হয়। এছাড়া ওঁকারের পরম গতি (ওঁকারোপাসনার চূড়ান্ত ফল)ও লাভ হয়।

সমস্ত প্রকারের ধ্যান, যোগ ও জ্ঞানের যে ফল, ওঁকারোপাসনার যে ফল, বেদের যে পরম প্রতিপাদ্য — তা একমাত্র পরম ঈশ্বর অর্থাৎ শিব। অতএব, অন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে একমাত্র মঙ্গলদাতা শিবকেই ধ্যান করা উচিত [শিবই একমাত্র ধ্যেয়, অর্থাৎ ধ্যানের জন্য শিবই একমাত্র লক্ষ্যবস্তু] ॥ ৩॥   


🕉️ আরও দেখুন অথর্ববেদের অন্তর্গত শরভ উপনিষদের ৩০ নং মন্ত্রে এমনটিই বলা হয়েছে। দেখুন 👇 

এক এব শিবো নিত্যস্ততোঽন্যৎসকলং মৃষা ।

তস্মাৎসর্বান্পরিত্যজ্য ধ্যেয়ান্বিষ্ণবাদিকান্সুরান্ ॥ ৩০ ॥

[তথ্যসূত্র - অথর্ববেদ/শরভ উপনিষদ/৩০ নং মন্ত্র]

অর্থ : শিব‌ই একমাত্র নিত্য, অন্য সকল কিছুই মিথ্যা । এই কারণে বিষ্ণু আদি সকল দেবতাকে পরিত্যাগ করে শিবকেই ধ্যেয় বলে জানা উচিত ॥ ৩০ ॥

✳️ ব্যাখ্যা — যেহেতু বিষ্ণু সহ সমস্ত অনিত্য দেবতার স্বরূপ পরমেশ্বর শিব নিজেই ধারণ করেন তাই একমাত্র শিবকেই ধ্যেয় এবং সত্য বলা হয়েছে , বাকি সবকিছুকেই মিথ্যা বলেছেন স্বয়ং বেদ শাস্ত্র। এর থেকেও প্রমাণিত হয় যে, যেখানে শ্রীকৃষ্ণের মূল স্বরূপ বিষ্ণুই অনিত্য অর্থাৎ যিনি ক্ষয়যুক্ত, সেখানে ভগবদ্গীতার "সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ । অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ ॥" - উক্ত শ্লোক কখনোই শ্রীকৃষ্ণকে বোঝায় না। কারণ, ব্রহ্ম কখনোই অনিত্য হতে পারে না, তাঁর ক্ষয় থাকতে পারে না, যা মায়া তা প্রকট হয় আবার নিবৃত্ত হয়ে যায়। পররমেশ্বর শিব মায়া দ্বারা বিভিন্ন রূপ ধারণ করেন, সেখানে বিষ্ণুরূপও মায়াময় মাত্র, পদ্মপুরাণের উত্তরখণ্ডের ১৭৫ অধ্যায়ের ১৬ নং শ্লোকে লক্ষ্মী দেবীর কাছে গীতার উক্ত ঈশ্বর শিব তা বলার প্রসঙ্গে ভগবান বিষ্ণু নিজেই নিজের দেহকে মায়াময় বলেছেন, তাঁর দেহরূপী বিষ্ণুরূপ প্রকৃত আত্মতত্ত্ব নয় - মায়াময় দেবি বপুর্মে‌ ন তু তাত্ত্বিকম্‌ । তাই বেদ সরাসরি একমাত্র শিবকেই ধ্যেয় বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছে, বিষ্ণুর ধ্যানকে ত্যাগ করতে বলেছে। বেদকে অনুসরণকারী ভগবদ্গীতাও এইকারণে একমাত্র শিবকেই ইঙ্গিত করছে।


🕉️ এবার ইতিহাস শাস্ত্র থেকে স্বয়ং পরমেশ্বর দক্ষিনামূর্তি‌ শিবের জ্ঞান উপদেশ শুনুন  —  

ঈশ্বর উবাচ । 

এতদেব পরং জ্ঞানং নানাশ্রুতিশিরোগতম্ ।

অহং ব্রহ্মেতি বিজ্ঞানান্মুচ্যতে নান্যথা দ্বিজাঃ ॥ ৯৪॥

জ্ঞানে চাস্তমিতে বিপ্রাঃ বেদনাদিবিবর্জিতঃ ।

অহমেবাস্মি তদ্ব্রহ্ম বাচারম্ভণমিত্যপি ॥ ৯৫॥

নৈব বাচা ন মনমা শক্যোঽহং জ্ঞাতুমেব হি ।

তমেকং জানথাত্মানং নান্যঃ পন্থাঽয়নায় হি ॥ ৯৬॥

জ্ঞানেনৈব পরা মুক্তির্ভবত্যেব ন চান্যথা ।

অহং ব্রহ্মেতি বিজ্ঞানং তদ্দ্বিজাঃ পরমার্থতঃ ॥ ৯৭ ॥

শব্দজ্ঞানমহো বিপ্রাঃ ন মুক্ত্যৈ ভবতি ধ্রুবম্ ।

শ্রবণায়াপি নো বিপ্রা ন লভ্যঃ (?) পরমেশ্বরঃ ॥ ৯৮ ॥

শৃণ্বন্তোঽপি মহাদেবং ন বিদ্যুর্যং পিনাকিনম্ ।

ভক্ত্যা হ্যনন্যযা লভ্যো দুর্লভোঽয়ং মুনীশ্বরঃ ॥ ৯৯ ॥

ভাবগ্রাহ্যমনীশারূপমিত্যাহ শ্রুতিরাদরাৎ ।

সর্বমন্যৎপরিত্যজ্য ধ্যেয়োঽহং পরমেশ্বরঃ ॥ ১০০ ॥

চতুর্থোঽহং সদা বিপ্রাঃ তুরীয়ঃ শিব এব হি ।

অহমাত্মা মুনিভেষ্ঠাঃ সত্যং সত্যং ন সংশয়ঃ ॥ ১০১ ॥

ব্রহ্মণশ্চাপি বিষ্ণোশ্চ তথান্যেষাং দিবৌকমাম্ ।

জনিতাহং মহাদেবঃ পরমাত্মা শ্রুতিশ্রুতঃ ॥ ১০২ ॥

ন কর্মণা ন প্রজয়া ন ধনেনেজ্যযা দ্বিজাঃ ।

নান্যঃ পন্থা দ্বিজশ্রেষ্ঠাঃ মজ্জ্ঞানং পরমার্থতঃ ॥ ১০৩॥

যস্যৈব বৃণুতে স্বাত্মা তেন লম্যমিদং দ্বিজাঃ ।

যদাকাশং চর্মবেষ্টং বেষ্টয়েয়ুর্জনা দ্বিজাঃ ॥ ১০৪॥

তদা শিবমবিজ্ঞায় দুঃখভ্যান্তো ভবিষ্যতি ।

ইন্দ্রাগ্নিমিত্রং বরুণং বিষ্ণুং ব্রহ্মাণমেব চ ॥ ১০৫॥

একমেব মহাদেব বহুধা কল্পয়ন্তি হি ।

মামবিজ্ঞায় বিপ্রেন্দ্রাঃ কিমৃচা স করিষ্যতি ॥ ১০৬॥

যো মাং বেদ স বৈ মুক্তিমমী লোকাঃ সমাসতে ।

কি বোঽদ্য বহুনোক্তেন শ্রদ্দধ্বং মুনিসত্তমাঃ ॥ ১০৭॥

[শিবরহস্য মহাইতিহাস/ভর্গাখ্য পঞ্চমাংশ/২৫ অধ্যায়/৯৪-১০৭ নং শ্লোক]

অর্থ : হে দ্বিজগণ ! এইটিই পরম জ্ঞান, যা বিভিন্ন শ্রুতির মর্মস্থলে প্রতিষ্ঠিত। ‘আমিই ব্রহ্ম’ — এই প্রত্যক্ষ জ্ঞান লাভের দ্বারাই মুক্তি লাভ হয় ; অন্য কোনো উপায়ে নয় ॥ ৯৪ ॥

হে বিপ্রগণ ! যখন সেই পরম জ্ঞান উদিত হয়, তখন বেদাদি (বাহ্য শাস্ত্রনির্ভরতা) অতিক্রান্ত হয়। তখন উপলব্ধি হয় — ‘আমিই সেই ব্রহ্ম’ ; আর নাম-রূপাদি কেবল বাক্যনির্ভর (বাচারম্ভণমাত্র) বলে প্রতীয়মান হয় ॥ ৯৫ ॥

আমাকে বাক্যের দ্বারা কিংবা মনের দ্বারা জানা সম্ভব নয়। সেই একমাত্র আত্মতত্ত্বকেই জানো ; কারণ এই গন্তব্যে উপনীত হওয়ার অন্য কোনো পথ নেই ॥ ৯৬ ॥

হে দ্বিজগণ ! একমাত্র জ্ঞানের দ্বারাই পরম মুক্তি লাভ হয়, অন্য কোনো উপায়ে নয়। ‘আমিই ব্রহ্ম’— এই প্রত্যক্ষ উপলব্ধিই পরমার্থতত্ত্ব ॥ ৯৭ ॥

হে বিপ্রগণ ! কেবল শব্দগত বা শাস্ত্রগত জ্ঞান কখনও মুক্তির কারণ হয় না। কেবল শ্রবণমাত্র দ্বারাও পরমেশ্বরকে লাভ করা যায় না ॥ ৯৮ ॥

হে মুনীশ্বর ! অনেকেই অতিশয় দুর্লভ মহাদেবের কথা শুনেও সেই পিনাকধারী শিবকে যথার্থভাবে জানতে পারে না। তিনি একনিষ্ঠ ভক্তির দ্বারাই লাভযোগ্য ॥ ৯৯ ॥

শ্রুতি শ্রদ্ধার সঙ্গে ঘোষণা করে যে, আমি (শিব) ভাবগ্রাহ্য (ভাবের দ্বারা প্রাপ্ত হই), ইন্দ্রিয় ও সাধারণ বুদ্ধির অতীতস্বরূপ (ঊর্ধ্বে) । অতএব, ঐ সকল অন্যান্য বাহ্যিক ভাব পরিত্যাগ করে আমাকেই (আত্মরূপকে) পরমেশ্বররূপে (শিবকে) ধ্যান করা উচিত ॥ ১০০ ॥

হে বিপ্রগণ ! আমিই সর্বদা চতুর্থ বা তুরীয় অবস্থা ; আমিই শিব। হে মুনিশ্রেষ্ঠগণ ! আমিই সকলের আত্মা — এ সত্য, সত্যই; এতে কোনো সন্দেহ নেই ॥ ১০১ ॥

আমিই মহাদেব, পরমাত্মা। আমিই ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং অন্যান্য সকল দেবতার উৎপত্তির কারণ — শ্রুতি এই কথাই ঘোষণা করেছে ॥ ১০২ ॥

হে দ্বিজগণ ! কর্ম, সন্তান, ধন কিংবা যজ্ঞের দ্বারা নয়; হে শ্রেষ্ঠ দ্বিজগণ! আমার যথার্থ জ্ঞানই পরমার্থে একমাত্র পথ, অন্য কোনো পথ নেই ॥ ১০৩ ॥

হে দ্বিজগণ! যাঁকে আত্মা (পরমাত্মা) নিজে অনুগ্রহ করেন, তিনিই তাঁকে লাভ করেন। যেমন মানুষ যদি আকাশকে চামড়া দিয়ে আবৃত করতে পারে ॥ ১০৪ ॥

তেমনি, শিবকে যথার্থভাবে না জেনে দুঃখের অন্ত কখনও হবে না। ইন্দ্র, অগ্নি, মিত্র, বরুণ, বিষ্ণু, ব্রহ্মা প্রভৃতি সকল দেবতা - এক মহাদেবকেই নানারূপে কল্পনা করা হয়েছে। হে শ্রেষ্ঠ বিপ্রগণ! আমাকে যথার্থভাবে না জেনে ঋক্‌-মন্ত্রাদি পাঠ করে কী-ই বা লাভ হবে? ॥ ১০৫-১০৬ ॥

যে আমাকে যথার্থভাবে জানে, সেই প্রকৃতপক্ষে মুক্তিলাভ করে এবং পরম পদ লাভ করে। আর অধিক বলার কী আছে? হে মুনিশ্রেষ্ঠগণ! তোমরা এই তত্ত্বে দৃঢ় শ্রদ্ধা স্থাপন কর ॥ ১০৭ ॥

🟥 বিশ্লেষণ — এইখানে পরমেশ্বর শিব নিজের প্রদান করা বেদের শ্রুতি মন্ত্রে শিব সম্পর্কে কোন কোন মন্ত্র উল্লেখ হয়েছে তা বর্ণনা করেছেন, আমাদের আলোচ্য বিষয়টির অনুরূপ শ্লোক ১০০  নং শ্লোকে উপলব্ধ, এর মাধ্যমে পুনরায় শিবই একমাত্র শরণদাতা বলে প্রমাণিত।

__________________________________________________

🟥 সিদ্ধান্ত —

উপর্যুক্ত বেদ, উপনিষদ, ইতিহাস, পুরাণ, আগম এবং ভগবদ্গীতার সমন্বিত বিচার থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, "সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ"— এই মহাবাক্যের প্রকৃত লক্ষ্য একমাত্র পরমেশ্বর শিব। কারণ, যোগাবস্থায় উচ্চারিত "অহং""মাম্" শব্দ কখনোই ক্ষণস্থায়ী দেহধারী ব্যক্তিকে নির্দেশ করে না; বরং সর্বভূত-অন্তর্যামী, তুরীয়, পরমাত্মা, পরব্রহ্মকেই নির্দেশ করে। আর সেই পরমাত্মা যে স্বয়ং শিব— এই সিদ্ধান্ত বেদ নিজেই পুনঃপুনঃ ঘোষণা করেছে।

অন্নপূর্ণা উপনিষদ "সর্বধর্ম পরিত্যাগ"-এর প্রকৃত অর্থকে সমস্ত উপাধি, বাসনা ও জড়-আসক্তির পরিত্যাগ বলে ব্যাখ্যা করেছে। বরাহ উপনিষদ ও দর্শন উপনিষদ ঘোষণা করেছে যে, আত্মজ্ঞান ও সদাশিবতত্ত্বের উপলব্ধিই জীবন্মুক্তির কারণ। অথর্বশিখা উপনিষদ সরাসরি আদেশ দিয়েছে— "সর্বমন্যৎ পরিত্যজ্য, শিব একো ধ্যেয়ঃ", অর্থাৎ অন্য সবকিছু পরিত্যাগ করে একমাত্র শিবকেই ধ্যান করতে হবে। শরভ উপনিষদও একই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। শিবপুরাণ এই মন্ত্রগুলিকেই অথর্ববেদের অন্তিম সিদ্ধান্ত বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। শিবগীতায় ভগবদ্গীতার ১৮ অধ্যায়ের ৬৬তম শ্লোক অবিকলভাবে পরমেশ্বর শিবের শ্রীমুখে পুনরুক্ত হয়েছে শ্রীকৃষ্ণের জন্মের এক যুগ পূর্বেই। আবার শিবরহস্যে স্বয়ং মহাদেব ঘোষণা করেছেন— "অহং ব্রহ্ম" এই প্রত্যক্ষ উপলব্ধিই মুক্তির একমাত্র পথ ; তিনিই তুরীয়, তিনিই সকলের আত্মা, তিনিই ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও সমগ্র দেবসমষ্টির উৎপত্তিকারণ।

অতএব, যখন বেদ, উপনিষদ, পুরাণ, ইতিহাস এবং আগম — সকল প্রামাণিক শাস্ত্র একই তত্ত্বকে একবাক্যে প্রতিষ্ঠিত করছে, তখন ভগবদ্গীতার "মামেকং শরণং ব্রজ"-এর "মাম্" শব্দকে কেবল শ্রীকৃষ্ণের মানবরূপে সীমাবদ্ধ করা শাস্ত্রমীমাংসার নীতির পরিপন্থী। বরং যোগযুক্ত অবস্থায় শ্রীকৃষ্ণ পরমাত্মা-স্বরূপ শিবতত্ত্বের বাণীকেই প্রকাশ করেছেন। সেই কারণেই গীতার "অহং", "মাম্", "পরমাত্মা", "ব্রহ্ম", "ঈশ্বর"— এই সমস্ত শব্দের চূড়ান্ত বাচ্য একমাত্র পরমেশ্বর শিব

সুতরাং, "সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ" — এই শ্লোকের প্রকৃত, পরম এবং একমাত্র লক্ষ্য পরমেশ্বর শিব। সকল উপাধি, সম্প্রদায়গত সংকীর্ণতা, দেহাভিমান ও জড়-আসক্তি ও কর্মফলের আশা পরিত্যাগ করে আত্মস্বরূপ, সর্বব্যাপী, তুরীয়, পরব্রহ্ম শিবেরই শরণ গ্রহণ করাই এই শ্লোকের অন্তর্নিহিত সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্ত কোনো একক গ্রন্থের বক্তব্য নয়, কোনো সম্প্রদায়গত বিশ্বাসের সিদ্ধান্ত নয় ; বরং সমগ্র বৈদিক শাস্ত্রপরম্পরায় পুনঃপুনঃ প্রতিপাদিত ও মীমাংসিত এক অভিন্ন তত্ত্বেরই ঘোষণা।

__________________________________________________

🚩 তথ্য সংগ্রহ, ব্যাখ্যা প্রদান তথা সত্য উন্মোচনে : শিবালয় প্রতিষ্ঠাতা শিবদ্বারাধীশাধ্যক্ষ দেশিক আচার্যপরমাধিকারী শ্রীশ্রীগুরু নন্দীনাথ শৈব আচার্যদেব জী 🚩

©️ কপিরাইট ও প্রচারে : Shivalaya 🔥

শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্ 🚩
ॐ নমঃ পার্বতীপতয়ে হর হর মহাদেব 🚩


#হিন্দুধর্ম #সনাতনধর্ম #শিবালয় #Shivalaya #sanatandharma #যোগ  #শৈবধর্ম #শিবগীতা  #শিবমহাপুরাণ #গীতা #শ্রীকৃষ্ণ # #স্কন্দমহাপুরাণ #পরমেশ্বরশিব #শিবরহস্য #কৃষ্ণযজুর্বেদ #অথর্ববেদ #অথর্বশিখাউপনিষদ #উপনিষদ #ভগবদ্গীতা


মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ