শৈবদের ভক্ষ্যাভক্ষ্য বিচার নিয়ে দ্বৈতবাদী নিরামিষাশী তথাকথিত ছদ্মশৈবের অপব্যাখ্যার খণ্ডন —
🚩 শৈবদের ভক্ষ্যাভক্ষ্য বিচার নিয়ে দ্বৈতবাদী নিরামিষাশী তথাকথিত ছদ্মশৈবের অপব্যাখ্যার খণ্ডন —
🔘 নিজেকে শৈব দাবী করা এক নিরামিষাশী পূর্বপক্ষ দাবি করেছেন যে- শিবজ্ঞানীর জন্য আমিষ-নিরামিষের ভেদাভেদহীনতার যে পরমার্থিক বর্ণনা শাস্ত্রে রয়েছে, তা কেবলই এক ‘মানসিক আস্বাদনের রূপক’ এবং সাধারণ মানুষের জন্য নিরামিষ আহারই একমাত্র নিরাপদ আধ্যাত্মিক পথ।
আপাতদৃষ্টিতে এই মতটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও নীতিবাদী মনে হলেও, তত্ত্ব ও শাস্ত্রের গভীর সিদ্ধান্ত বিচার করলে দেখা যায়- এটি অদ্বৈতবাদী শাস্ত্রের ওপর দ্বৈতবাদী সংস্কারের জোরপূর্বক আরোপ মাত্র।
প্রথমে সূতসংহিতা উক্ত শ্লোক ও অর্থ দেখে নেওয়া যাক —
অভক্ষ্যং ব্রহ্মবিজ্ঞানবিহীনস্যেইব দেহিনঃ।
ন সম্যজ্ঞানিনস্তস্য স্বরূপং সকলং খলু ॥৭
পদার্থ- অভক্ষ্যম্ = যা খাওয়া উচিত নয় বা অখাদ্য (ভক্ষ্য ও অভক্ষ্যের বিচার)। ব্রহ্মবিজ্ঞান-বিহীনস্য = ব্রহ্মের বিশেষ জ্ঞান বা অনুভব থেকে যিনি বঞ্চিত, তাঁর। এব = কেবল বা মাত্র। দেহিনঃ = দেহধারী জীবের (যিনি নিজেকে দেহ মনে করেন)। ন = না (প্রযোজ্য নয়)। সম্যক্-জ্ঞানিনঃ = সম্যক বা পূর্ণ তত্ত্বজ্ঞানী পুরুষের জন্য। তস্য = তাঁর (সেই জ্ঞানীর দৃষ্টিতে)। স্বরূপম্ = নিজেরই আত্মা বা স্বরূপ। সকলম্ = সমস্ত জগৎ বা সবকিছু। খলু = নিশ্চয়ই বা প্রকৃতপক্ষে।
অনুবাদ- ভক্ষ্য ও অভক্ষ্যের (খাদ্য ও অখাদ্যের) নিয়ম বা বাছবিচার কেবল ব্রহ্মজ্ঞানহীন দেহাত্মবোধসম্পন্ন (যিনি নিজেকে শুধু শরীর ভাবেন) ব্যক্তির জন্যই প্রযোজ্য। যিনি সম্যক বা পূর্ণ তত্ত্বজ্ঞানী, তাঁর জন্য এই বিভাজন নেই, কারণ তাঁর কাছে এই সমগ্র জগৎ নিশ্চয়ই তাঁর নিজেরই আত্মস্বরূপ।
অহমন্নং তথাহন্নাদ ইতি হি ব্রহ্মবেদনম্।
ব্রহ্মবিদগ্রসতি জ্ঞানাৎসর্বং ব্রহ্মাত্মনৈব তু ॥৮
পদার্থ- অহম্ = আমিই। অন্নম্ = ভোগ্য বস্তু বা খাদ্য। তথা = এবং/অনুরূপভাবে। অন্নাদঃ = অন্নের ভোক্তা বা আহারকারী (অন্ন + অদ্ + ক্বিপ্)। ইতি = এই প্রকার। হি = নিশ্চয়ই। ব্রহ্মবেদনম্ = ব্রহ্মের জ্ঞান বা অনুভবের অবস্থা (তৈত্তিরীয় শ্রুতির উপলব্ধি)। ব্রহ্মবিৎ = ব্রহ্মজ্ঞানী পুরুষ। গ্রসতি = গ্রাস বা ভক্ষণ করেন। জ্ঞানাৎ = পরম জ্ঞানের প্রভাবে বা জ্ঞানাগ্নির দ্বারা। সর্বম্ = সমস্ত কিছুকে। ব্রহ্মাত্মনা = ব্রহ্মরূপে বা আত্মরূপে। এব তু = অবশ্যই।
অনুবাদ- "আমিই অন্ন (ভোগ্য বস্তু) এবং আমিই অন্নাদ (ভোক্তা)" এটিই হলো প্রকৃত ব্রহ্মানুভব। ব্রহ্মজ্ঞানী পুরুষ তাঁর পরম জ্ঞানের দ্বারা এই সমস্ত কিছুকে নিজের ব্রহ্মস্বরূপেই গ্রাস বা ভক্ষণ করেন (অর্থাৎ তাঁর কাছে খাদ্য ও খাদক একাকার হয়ে যায়)।
ব্রহ্মক্ষত্রাদিকং সর্বং যস্য স্যাদোদনং সদা।
যস্যোপসেচনং মৃত্যুস্তজ্ঞানী তাদৃশঃ খলু ॥৯
পদার্থ- ব্রহ্ম-ক্ষত্র-আদিকম্ = ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ইত্যাদি চেতন জগত এবং সমগ্র সৃষ্টি। সর্বম্ = সমস্ত কিছু। যস্য = যাঁর কাছে (সেই জ্ঞানীর কাছে)। স্যাৎ = হয়। ওদনম্ = অন্ন বা ভাত (মূল আহার)। সদা = সর্বদা। যস্য = যাঁর। উপসেচনম্ = তরকারি, চাটনি বা ব্যঞ্জন (যা ভাতের সাথে মেখে খাওয়া হয়)। মৃত্যুঃ = স্বয়ং কাল বা মৃত্যু। তৎ-জ্ঞানী = সেই তত্ত্বজ্ঞানী পুরুষ। তাদৃশঃ = সেই প্রকার (মহাকালের মতো সর্বভুক)। খলু = নিশ্চয়ই।
অনুবাদ- (কঠোপনিষদের সূত্র ধরে) যাঁর কাছে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় আদি সমগ্র জগৎ সর্বদা প্রধান অন্ন বা ভাতের মতো, আর স্বয়ং মৃত্যু যাঁর কাছে তরকারি বা চাটনির মতো (যা দিয়ে তিনি জগৎকে গ্রাস করেন), সেই পরম শিবকে অনুভবকারী তত্ত্বজ্ঞানী পুরুষও নিশ্চয়ই সেই মহাকালের মতোই সর্বগ্রাসী বা সর্বভুক হন।
ব্রহ্মাস্বরূপং বিজ্ঞাতুজ্ঞানাত্তত্তস্য ভাসতে।
তথা সতি জগম্ভোজ্যং ভবেৎ বিজ্ঞানিনঃ খলু ॥১০
পদার্থ- ব্রহ্মস্বরূপম্ = ব্রহ্মের প্রকৃত স্বরূপ। বিজ্ঞাতুঃ = জ্ঞাতা বা অনুভবকারীর (যিনি জানছেন)। জ্ঞানাৎ = আত্মজ্ঞানের দ্বারা (অজ্ঞান দূর হলে)। তৎ = সেই সত্য। তস্য = তাঁর কাছে। ভাসতে = প্রকাশিত হয় বা প্রতিভাত হয়। তথা সতি = তা হলে পর বা সেই অবস্থা লাভ হলে। জগৎ = এই দৃশ্যমান বিশ্বব্রহ্মাণ্ড। ভোজ্যম্ = ভক্ষণের যোগ্য বা ভোগ্য বস্তু। ভবেৎ = হয়ে যায়। বিজ্ঞানিনঃ = সেই পরম বিজ্ঞানময় বা তত্ত্বজ্ঞানী পুরুষের। খলু = নিশ্চয়ই।
অনুবাদ- প্রকৃত জ্ঞাতার নিজের স্বরূপ যে আসলে ব্রহ্ম, তা আত্মজ্ঞানের দ্বারা অজ্ঞান দূর হলেই তাঁর নিকট প্রকাশিত হয়। আর সেই অবস্থা প্রাপ্ত হলে, সেই পরম বিজ্ঞানীর কাছে এই সমগ্র জগৎই নিশ্চয়ই ভোজ্য বা ভোগ্য বস্তু রূপে প্রতিভাত হয় (কারণ তাঁর অতিরিক্ত দ্বিতীয় কোনো বস্তুর অস্তিত্ব থাকে না)।
[স্কন্দমহাপুরাণ / সূতসংহিতা / যজ্ঞবৈভবখণ্ড / পূর্বভাগ / ৪৫ অধ্যায়]
দেখুন পাঠকবৃন্দগণ- সনাতন দর্শনে কোনো তত্ত্বকে বুঝতে গেলে কেবল ভাবাবেগ নয়, বরং শ্রুতি (বেদ-উপনিষদ), স্মৃতি (ধর্মসূত্র ও সংহিতা আদি) এবং ন্যায় শাস্ত্রের যুক্তি বা নিয়মের আশ্রয় নিতে হয়।
পূর্বপক্ষ যেখানে শাস্ত্রের মুখ্যার্থকে খর্ব করে একদেশী ভাবনার প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন, সেখানে শাস্ত্রীয় ও যৌক্তিক খণ্ডন অপরিহার্য। তাই- নিচে ন্যায় শাস্ত্রের নিয়ম, উপনিষদ এবং প্রাচীন ধর্মসূত্রের প্রমাণের আলোকে পূর্বপক্ষের সেই দাবিগুলোর ক্রমানুযায়ী যৌক্তিক পুনঃখণ্ডন উপস্থাপন করা হলো।
———————————————————————————————————————————————————
❌ নিরামিষাশীর দাবী —
শ্লোকগুলো আক্ষরিক নয়, রূপক (শ্লোক ৭, ৮, ১০)। শাস্ত্রে ব্যবহৃত ‘ভোজন’, ‘অন্ন’ বা ‘গ্রাস’ শব্দগুলো পেটের ক্ষুধা মেটানো বা মুখে খাওয়ার কথা বলছে না, বরং মন বা আত্মা দিয়ে পরমেশ্বরের আনন্দ আস্বাদন করার কথা বলছে (যেমন কবিরা প্রকৃতিকে উপভোগ করেন)।
✅ শৈবপক্ষ দ্বারা খণ্ডন —
তৈত্তিরীয় উপনিষদের ভৃগুবল্লীতে অন্নকে ব্রহ্ম বলা হয়েছে -
“অন্নং ন নিন্দ্যাৎ। তদ্ব্রতম্। প্রাণো বা অন্নম্। শরীরমন্নাদম্” ।।
অর্থাৎ- অন্নের নিন্দা করবে না, শরীরই অন্নের ভোক্তা। শ্রুতি এখানে আধ্যাত্মিক ও স্থূল শরীর উভয় স্তরেই অন্নের বাস্তব অস্তিত্ব স্বীকার করেছে।
আর শব্দ প্রমাণ দুই প্রকার। যথা- অভিধাবৃত্তি এবং লক্ষণাবৃত্তি। যদি অভিধাবৃত্তি গ্রহণ করলে শাস্ত্রের সাথে বিরোধ হয়, সেখানে লক্ষণাবৃত্তি গ্রহণের কথা ন্যায়দর্শনে বলা হয়েছে। আবার, একই ভাবে যদি লক্ষণাবৃত্তি গ্রহণ করলে যদি শাস্ত্রের বিরোধ হয়ে তবে- সেখানে অভিধাবৃত্তিই গ্রহণীয়৷ যেমন, কেউ বললো- “অগ্নি উষ্ণ” এখানে উষ্ণতা অগ্নির ধর্ম তাই ইহা অভিধাবৃত্তি। এখন ছলপূর্বক কেউ যদি বলে- “রাগও উষ্ণ” তবে- অগ্নির যে ধর্ম উষ্ণতা তা মিথ্যা হয়ে যাবে। তাই এখানে লক্ষণাবৃত্তি খাটবে না।
আবার- “গঙ্গায়াং ঘোষঃ” এরূপ বাক্যের যদি অভিধাবৃত্তি গ্রহণ করা হয় তবে- গঙ্গা নদীর মধ্যে গ্রাম এরূপ অর্থ গ্রহণ সরাসরি যুক্তির বিরোধ করছে। সুতরাং- এখানে লক্ষণাবৃত্তিতে অর্থ নিতে হবে- গঙ্গা নদীর তীরে গ্রাম।
মীমাংসা ও ন্যায় শাস্ত্রের নিয়ম হলো- যতক্ষণ আক্ষরিক বা মুখ্য অর্থ যৌক্তিকভাবে খাটে, ততক্ষণ রূপক বা লক্ষণার্থ গ্রহণ করা শাস্ত্রবিচারের গুরুতর অপরাধ (অপসিদ্ধান্ত)। সূতসংহিতায় স্পষ্ট বলা হয়েছে- “দেহিনঃ” অর্থাৎ- দেহধারীদের জন্য। যতক্ষণ দেহ আছে, ততক্ষণ স্থূল ভোজন আক্ষরিকভাবেই সত্য, তা রূপক নয়।
আপস্তম্ব ধর্মসূত্র (১/১৭/১৪-১৫) স্পষ্ট বলছে -
“নাপণীয়মন্নমশ্নীয়াৎ” ও “তথা রসানামমাংসমাধুলবণানীতি পরিহাপ্য”।।
অর্থাৎ- বাজারের কেনা খাদ্য খাবে না, তবে মাংস, মধু ও লবণ বাদ দিয়ে। এখানে যদি ভোজন কেবলই ‘মানসিক রূপক’ হতো, তবে বাজারে কেনা খাদ্য বা লবণের মতো স্থূল বস্তুর তালিকা ধর্মসূত্রে আসত না।
মীমাংসা দর্শনের নীতি হলো -
“অবিরুদ্ধম্ পরম্” (পূর্বমীমাংসা ১/২/৪৪)
অর্থাৎ- যে ব্যাখ্যা বা অনুমান (পরম্) গ্রহণ করা হচ্ছে, তা যদি বেদের বিধান বা যুক্তির সঙ্গে বিরোধ না করে, তবে সেই ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য।।
যেমন- বৈদিক অগ্নিষোমীয় যাগে পশু দ্বারা আহুতি দেওয়া হয়, যার বিস্তারিত বিনিয়োগ বিধি বিভিন্ন শ্রৌতসূত্র, গৃহ্যসূত্র ও ধর্মসূত্রে বর্ণিত রয়েছে এবং এরূপ শ্রুতিবচনও উপলব্ধ যেখানে যজ্ঞের ক্ষেত্রে পশুর বলি ও আহুতি দেওয়ার স্পষ্ট বর্ণনা আছে। যেমন- “অগ্নিষোমীয়ং পশুমালভেত্” [তৈত্তিরীয় সংহিতা/৬/১/১/৬] এবং “ছাগস্য হবিষো বপায়া মেদসঃ” [তৈত্তিরীয় ব্রাহ্মণ ৩/৬/৮/১]।। এখানে প্রথমটি হলো বিধিবাক্য এবং দ্বিতীয়টি হলো বিনিয়োগ বাক্য। প্রথমে বলা হয়েছে- যজ্ঞে একটি পশু উৎসর্গ করতে হবে, দ্বিতীয় বাক্যে বলা হয়েছে- সেই ছাগপশুর বপা বা চর্বি দ্বারা হোম করতে হবে। মীমাংসার নিয়মানুযায়ী বিধি ও বিনিয়োগ বাক্যের একবাক্যতা অনুযায়ী এটিই প্রমাণিত হয় যে বেদে এই আক্ষরিক পশুর আহুতির বিধান রয়েছে।
এছাড়াও, যজ্ঞের নিয়ম হলো- যজ্ঞের অবশিষ্টাংশ বা ইড়া প্রসাদ যজমান, হোতা সকলেই গ্রহণ করবেন এবং ভক্ষণ করবেন। এমনকি আপস্তম্ব ধর্মসূত্রেও যজমানের জন্য এরূপ স্পষ্ট বিধান রয়েছে-
“অগ্নীষোমীয়সংস্থায়ামেব” ॥ ২৪ ॥
অগ্নীষোমীয় পশুর যজ্ঞ সমাপ্ত হলে তাঁর অন্ন ভোজন করা উচিত।। (১/১৮/২৪)
“হুতায়াং বপায়াং দীক্ষিতস্য ভোক্তব্যম্” ॥ ২৫ ॥
অথবা- পশুর 'বপা' (চর্বি বা মেদ) অগ্নিতে আহুতি দেওয়া হয়ে গেলে দীক্ষিতের অন্ন ভোজন করা যেতে পারে।।(১/১৮/২৫)
শ্রুতি ও ধর্মসূত্রের বচন অনুযায়ী - যজ্ঞের বপা (চর্বি) বা হব্য অগ্নিতে আহুতি হওয়ার পর দীক্ষিত যজমান বা সাধক সেই যজ্ঞীয় অন্ন বা মাংস আক্ষরিক অর্থেই ভক্ষণ করতে পারেন। একই সমর্থন মনুও করেছেন। তিনি বলেছেন- “প্রোক্ষিতং ভক্ষয়েন্মাংসং” [মনুসংহিতা ৫/২৭] অর্থাৎ যজ্ঞের হুতাবশিষ্ট প্রোক্ষিত মাংস ভক্ষণ করবে। সুতরাং, এখানে ভোজন কেবলই ‘মানসিক রূপক’ বা ‘কবির কল্পনা’ নয়, তা আক্ষরিক ও বৈদিক ক্রিয়া।
অতএব, পূর্বপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী - এখানে ‘ভোজন’, ‘অন্ন’ বা ‘গ্রাস’ শব্দের অর্থ কেবলই "মন বা আত্মা দিয়ে পরমাত্মার আনন্দ আস্বাদন করা" রূপক হিসেবে এমনটা গ্রহণ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়, কারণ তা সরাসরি মীমাংসা দর্শনের নিয়মের বিরোধিতা করে।
মীমাংসা শাস্ত্রের প্রধান সিদ্ধান্ত হল - যেকোনো বাক্য বা শব্দের প্রকৃত অর্থ নির্ধারণ করতে হয় তার নির্দিষ্ট প্রসঙ্গ ও প্রকরণ বিচার করে। সূতসংহিতার এই বিশেষ প্রকরণের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়ই হলো স্থূল জগতের ‘ভক্ষ্যাভক্ষ্য বিচার’ (কোনটি আহারযোগ্য আর কোনটি আহারযোগ্য নয়)। সুতরাং, যেখানে আলোচনার মূল বিষয়বস্তুই হলো স্থূল আহার, সেখানে জোরপূর্বক ‘মানসিক আস্বাদন’ বা ‘কবির কল্পনা’র মতো লক্ষণার্থ টেনে আনা বাক্যার্থ বিচারের নিয়ম-বহির্ভূত।
তদুপরি, মীমাংসার অন্য একটি মূল নীতি অনুযায়ী, সেই অর্থই সর্বদা গ্রহণীয় যা অন্যান্য প্রামাণিক শাস্ত্রের সিদ্ধান্তের সাথে সম্পূর্ণ অবিরুদ্ধ ও সঙ্গতিপূর্ণ। আমরা পূর্বেই দেখেছি যে শ্রুতি, স্মৃতি ও ধর্মসূত্র আদিতে বাজার থেকে ক্রয় করে, যজ্ঞীয় ও আপৎকালীন মাংস ভক্ষণের সপক্ষে স্পষ্ট ও আক্ষরিক শব্দপ্রমাণ বিদ্যমান। এমতাবস্থায় পূর্বপক্ষের কাল্পনিক লক্ষণার্থ গ্রহণ করলে তা বহু প্রামাণিক শাস্ত্রের বিধিবাক্যের সাথে সরাসরি ‘বিরোধ দোষ’ উৎপন্ন করে। পক্ষান্তরে, এই শ্লোকগুলোর আক্ষরিক বা মুখ্যার্থ গ্রহণ করলে সমস্ত শাস্ত্রের মধ্যে একটি সুন্দর একবাক্যতা ও সামঞ্জস্য বজায় থাকে।
সুতরাং, সামগ্রিক শাস্ত্রীয় প্রকরণ ও ন্যায়সঙ্গত বিচার দ্বারা এটি নিশ্চিতভাবেই প্রমাণিত হয় যে- স্কন্দমহাপুরাণের সূতসংহিতার উক্ত অধ্যায়ে মাংস ভক্ষণ বা আহারের প্রসঙ্গটি কোনোভাবেই নিছক “মানসিক রূপক” হতে পারে না।
অতএব, অন্য শাস্ত্রের প্রসঙ্গের অপলাপ করে পূর্বপক্ষের দেওয়া এই মনগড়া লক্ষণার্থের দাবিটি সম্পূর্ণরূপে খণ্ডিত ও নিরস্ত হলো।
———————————————————————————————————————————————————
❌ নিরামিষাশীর দাবী —
শ্লোক নং ৭ অনুযায়ী- শিবজ্ঞানীর মাংসের স্থূল বাসনা থাকে না। যিনি সত্যি সত্যি শিবজ্ঞান লাভ করেছেন, তিনি জিভ বা পেটের লোভের অনেক ঊর্ধ্বে। কোনো প্রাণীকে কষ্ট দিয়ে মাংস খাওয়ার মতো স্থূল বা নিচু বাসনা তাঁর মনে আসতেই পারে না।
✅ শৈবপক্ষ দ্বারা খণ্ডন —
তৈত্তিরীয় উপনিষদ এর ভৃগুবল্লীতে বলা হয়েছে -
“অহম্ অন্নম্ অন্নম্ অদন্তম্ অদ্মি” ।। (ভৃগুবল্লী/১০/৬)
অর্থাৎ, ব্রহ্ম বলছেন- "আমিই অন্ন, আর যে অন্নকে ভক্ষণ করছে (অদন্তম্) তাকেও আমিই ভক্ষণ করি (অদ্মি)।"
অর্থাৎ- অন্ন স্বরূপে যিনি আছে তিনি ব্রহ্ম, অন্নকে যিনি ভক্ষণ করছেন তিনিও ব্রহ্ম এবং অন্ন ও অন্নের ভোক্তাকে যিনি ভক্ষণ করছেন তিনিও ব্রহ্ম। এর সরলার্থ হল - অদ্বৈত ভাবনাতে কেউই কাউকে কষ্ট দিয়ে ভক্ষণ করছে না। এখানে অন্ন, ভোক্তা এবং এই দুইকে যিনি ভক্ষণ করেন তিনিই ব্রহ্ম। সব রূপে এক ব্রহ্ম বিদ্যমান। যখন ব্রহ্মই অন্ন, ব্রহ্মই ভোক্তা এবং ব্রহ্মই সেই ভক্ষণক্রিয়া, তখন সেখানে দ্বিতীয় কোনো সত্ত্বাই নেই যাকে কষ্ট দেওয়া সম্ভব ! শিবজ্ঞানী এই পরম অদ্বৈত ভাবনায় স্থিত থাকেন।
আসলে ওনার এই যুক্তিটি 'দ্বৈতবাদী সংস্কার' দ্বারা দুষ্ট। ন্যায় দর্শনে এটাকে “ব্যাঘাত দোষ” বলা হয়। অর্থাৎ নিজের যুক্তি ঘুরে এসে নিজেরই বিরোধ করছে।
শিবজ্ঞানীর কাছে মাংস ‘নিচু’ আর শাকসবজি ‘উঁচু’ এমন কোনো ভেদবুদ্ধি থাকে না। যিনি মাংসের প্রতি আসক্তি থেকে মুক্ত, তিনি মাংসের প্রতি ঘৃণা থেকেও মুক্ত। মাংসকে "নিচু বাসনা" মনে করাটাই প্রমাণ করে যে ওই ব্যক্তি এখনো ভেদজ্ঞানের স্তরে আছেন, শিবজ্ঞানে পৌঁছাননি।
প্রকৃত শিবজ্ঞানী মাংসের প্রতি আসক্তি (অনুরাগ) এবং মাংসের প্রতি ঘৃণা বা নিচু ভাব (দ্বেষ) এই দুটি দ্বৈত মানসিকতা থেকেই মুক্ত। তাঁর কাছে ছাগল, মুরগি, গম বা ধান সবই একই ব্রহ্মচেতনার বহিঃপ্রকাশ। তিনি কোনো 'স্থূল বা নিচু বাসনা' থেকে খাচ্ছেন না, বরং ব্রহ্মরূপে ব্রহ্মকেই আস্বাদন করছেন। যেমন- ভগবদ্গীতার ৪/২৪ শে বলা হয়েছে-
“ব্রহ্মার্পণং ব্রহ্ম হবি ব্রহ্মাগ্নৌ ব্রহ্মণা হুতম্”।।
অর্থাৎ- অর্পণও ব্রহ্ম, ঘৃতও ব্রহ্ম, অগ্নিও ব্রহ্ম এবং হোতাও ব্রহ্ম।।"
আপস্তম্ব ধর্মসূত্র বলছে -
“অগ্নীষোমীয়সংস্থায়ামেব” ॥ ২৪ ॥
অগ্নীষোমীয় পশুর যজ্ঞ সমাপ্ত হলে কেবল তাঁর অন্ন ভোজন করা উচিত।। (১/১৮/২৪)
“হুতায়াং বপায়াং দীক্ষিতস্য ভোক্তব্যম্” ॥ ২৫ ॥
অথবা- পশুর 'বপা' (চর্বি বা মেদ) অগ্নিতে আহুতি দেওয়া হয়ে গেলে দীক্ষিতের অন্ন ভোজন করা যায়।। (১/১৮/২৫)
উক্ত বিধান দেওয়া হয়েছে - সমাজের প্রতিটা স্তরের জন্য যারা যজ্ঞ ক্রিয়া করেন ৷ এর অন্তর্গত ব্রহ্মজ্ঞ ব্রাহ্মণও যিনি যজ্ঞের হোতা স্বরূপে যজ্ঞ সম্পাদন করেন।
যজ্ঞে বা শাস্ত্রে যা পবিত্র বলে অনুমোদিত, তা গ্রহণ করা কোনো 'স্থূল বা নিচু বাসনা' নয়, বরং তা শাস্ত্রীয় বিধানের অংশ। শিবজ্ঞানী অদ্বৈত শৈবব্যক্তি বাসনার বশবর্তী হয়ে খান না, বরং তাঁর সামনে যা আহার হিসেবে থাকে, তিনি তা-ই ব্রহ্মরূপে গ্রহণ করেন, সেখানে শাক আর মাংসের কোনো আধ্যাত্মিক তফাৎ তাঁর কাছে থাকে না।
এই প্রসঙ্গে একটি শাস্ত্রীয় উপাখ্যান দেখে নেবো -
ভরত নিজের সৈন্যদের নিয়ে মহর্ষি ভরদ্বাজের আশ্রমে পৌঁছালেন। এবং সেই আশ্রমে পৌঁছে ভরত সহ সকল সৈন্যরা দেখলেন যে —
আজৈশ্চাপি চ বারাহৈর্নিষ্ঠানবরসঞ্চয়ৈঃ।
ফলনির্মূহসংসিন্ধৈঃ সূপৈর্গন্ধরসান্বিতৈঃ।। ৬৭
পুষ্পঙ্কজবতীঃ পূর্ণাঃ শুক্লস্যান্নস্য চাভিতঃ।
দদৃশুবিস্মিতান্তত্র নরা লৌহীঃ সহস্রশঃ।। ৬৮
বভূবুর্বনপার্শ্বেযু কৃপাঃ পায়সকর্দমাঃ।
তাশ্চ কামদুঘা গাবো ক্রমাশ্চাসন্ মধুচ্যুতঃ।। ৬৯
বাপ্যো মৈরেয়পূর্ণাশ্চ মৃষ্টমাংসচয়ৈবৃর্তাঃ।
প্রতপ্তপিঠরৈশ্চাপি মার্গমায়ূরকৌক্কুটৈঃ।। ৭০
[বাল্মিকী রামায়ণ/অযোধ্যাকাণ্ড/৯১ সর্গঃ/৬৭-৭০ নং শ্লোক]
অর্থ — ভরতের সাথে আগত সকল সৈন্য দেখলেন যে, চারদিকে শুক্লান্নপূর্ণ স্বর্ণ ও রজতপূর্ণ বহু সংখ্যক পাত্র রয়েছে। ঐ সকল পাত্রে ফলের রসসিদ্ধ সুগন্ধি সূপ (ঝোল বিশেষ), উৎকৃষ্ট ব্যঞ্জন, ছাগ ও বরাহ মাংস রয়েছে। বনবিভাগস্থ কূপ সমূহে পায়েসের কর্দ্দম দৃষ্ট হলো তাদের। ধেনুগণ অভীষ্ট প্রদান এবং বৃক্ষ সকল মধু ক্ষরণ করতে লাগলো। পরিতপ্ত পিঠরপক্ক মৃগ, ময়ুর ও কুক্কুটের মাংসে এবং মদ্যে দিঘীসকল পরিপূর্ণ হয়েছে।।
পূর্বপক্ষের মূল যুক্তি হলো- কোনো মুক্ত পুরুষ বা তত্ত্বজ্ঞানী ব্যক্তি জিহ্বা বা পেটের লালসার বশবর্তী হয়ে মাংস ভক্ষণ করেন না, কারণ তাঁরা এই সমস্ত স্থূল কামনার অনেক ঊর্ধ্বে।
বাল্মীকি রামায়ণের অযোধ্যাকাণ্ডে (৯১ সর্গ) বর্ণিত হয়েছে, অযোধ্যার রাজকুমার ভরত যখন তাঁর বিশাল সেনাবাহিনীসহ মহর্ষি ভরদ্বাজের আশ্রমে উপস্থিত হন, সেখানে ভরত এবং তাঁর সৈন্যরা বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করেন যে, চারদিকে সুবর্ণ ও রৌপ্যপাত্রে ফলের রসে সুসিদ্ধ সুগন্ধি ব্যঞ্জনের সাথে বিপুল পরিমাণে ছাগল, বরাহ (বন্য শূকর), হরিণ, ময়ূর ও কুক্কুটের (মুরগি) মাংস এবং বিভিন্ন প্রকারের পুষ্পরসে সমৃদ্ধ মদ্য প্রস্তুত রয়েছে।
এখানে ন্যায় শাস্ত্রের বিখ্যাত "দণ্ডাপূপিকা ন্যায়" অনুযায়ী- লাঠির (দণ্ড) সাথে বেঁধে রাখা পিঠা (অপূপ) যদি ইঁদুরে খেয়ে ফেলে, তবে লাঠিটি যে ইঁদুর সরিয়ে নিয়েছে তা আলাদা করে প্রমাণ করতে হয় না তা স্বতঃসিদ্ধ। ঠিক তেমনি, মহর্ষি ভরদ্বাজ তাঁর আশ্রমে সমাগত অতিথিদের তৃপ্তির জন্য যেখানে বিভিন্ন পশুর মাংসের এক বিশাল আয়োজন রেখেছেন, সেখানে ঋষি স্বয়ং এবং তাঁর ব্রহ্মচারী শিষ্যেরা সেই মাংস আহার বা রন্ধনের প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত ছিলেন, তা এই ন্যায়ের আলোকেই স্বতঃসিদ্ধ।
এখন পূর্বপক্ষের নিকট প্রশ্ন- মহর্ষি ভরদ্বাজের মতো পরম মুক্ত পুরুষ ও ব্রহ্মজ্ঞ ঋষির আশ্রমে যদি বিভিন্ন প্রকার মাংসের এই আক্ষরিক উপস্থিতি ও উপযোগিতা সত্য হয়, তবে কি মহর্ষি ভরদ্বাজ এবং তাঁর তপস্বী শিষ্যেরাও জিভের লোভে বা কোনো "নিচু মানসিকতা" দ্বারা চালিত হয়েছিলেন ? তদুপরি, সেই পশুপাখিগুলোকে বধ করা ব্যতিরেকে কি সেই মাংসের আধিক্য সম্ভব ছিল ? নিশ্চিতভাবেই নয়। ঋষিশ্রেষ্ঠ ভরদ্বাজ কাম বা লোভের বশবর্তী হয়ে এই আয়োজন করেননি, বরং সৃষ্টির সমস্ত অন্নকে ব্রহ্মের লীলা রূপেই তিনি দর্শন ও আপ্যায়ন করেছিলেন।
অতএব, মহর্ষি ভরদ্বাজের মতো পরম ব্রহ্মজ্ঞানী ঋষি এবং তাঁর ব্রহ্মচারী শিষ্যেরা যদি মাংসের এই বাস্তব উপযোগিতাকে মর্যদা দিয়ে থাকেন, তবে সাধারণ মানুষের মাংস গ্রহণে "পাপ" বা "স্থূল বাসনা" খোঁজা কেবলই শাস্ত্রীয় অধিকারভেদের অজ্ঞানতা।
অতএব - শিবজ্ঞানী বা ব্রহ্মজ্ঞানী পুরুষেরা কোনো ভেদবুদ্ধি বা জিভের লালসায় মাংস খান না, বরং তাঁদের দৃষ্টিতে সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডই ব্রহ্মের প্রকাশ এবং পরিস্থিতি ও শাস্ত্রীয় বিধি অনুযায়ী যা তাঁদের সম্মুখে আহাররূপে উপস্থিত হয়, তা-ই তাঁরা সমভাবে গ্রহণ করেন।
———————————————————————————————————————————————————
❌ নিরামিষাশীর দাবী —
নিরামিষ মনকে শান্ত রাখে। আমরা যতক্ষণ সাধারণ মানুষ, ততক্ষণ মনকে পবিত্র ও শান্ত রাখতে এবং রাগ-ক্রোধ (তামসিকতা) নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিরামিষ ও সাত্ত্বিক আহার অত্যন্ত জরুরি।
✅ শৈবপক্ষ দ্বারা খণ্ডন —
পূর্বপক্ষের এই দাবিটি ন্যায় শাস্ত্রের “ব্যভিচার দোষ” এবং “অনৈকান্তিকতা” দ্বারা দুষ্ট। পূর্বপক্ষ দাবি করেছেন যে নিরামিষ আহারই মনকে শান্ত ও পবিত্র রাখার একমাত্র কারণ। কিন্তু এই যুক্তি বাস্তবে ও শাস্ত্রে খণ্ডিত হয়ে যায়।
কেননা- কেবল নিরামিষ আহার গ্রহণ করলেই মন শান্ত থাকে, ক্রোধ তামসিকতা আদিও নিয়ন্ত্রিত থাকে তবে- ইস্কনের প্রতিষ্ঠাতা প্রভুপাদ যিনি তুখোড় নিরামিষভোজী, সেই ব্যক্তি শিবকে রাস্কেল বলে কীভাবে কটুক্তি করতে পারে ? এছাড়াও- শিবকে “ডেমি গড”, তামসিক দেবতা, কৃষ্ণের দাস বলে পরমেশ্বর শিবকে কীভাবে অপমান করতে পারে ? তিনি তো কেবল নিরামিষ আহার গ্রহণ করেছেন। তবে ওনার সাত্ত্বিকতা কোথায় গেলো ? কেবল প্রভুপাদই নই, ইস্কনের প্রতিটা সদস্যই যারা কেবল আর কেবল নিরামিষ গ্রহণ করেন তারা কেন শিবকে তামসিক দেবতা বলে নিচু করেন ? এক্ষেত্রে কি নিরামিষের প্রভাবে শিবকে ব্রহ্ম বলা যায় না ? এক্ষেত্রে এর উত্তর কি হবে ? আমাদের চারপাশে এমন হাজারো দৃষ্টান্ত রয়েছে যারা নিরামিষ গ্রহণ করলেও তারা হিংস্র স্বভাব পরায়ণ।
এছাড়াও- দ্বৈতবাদী মধ্বাচার্য তিনিও নিরামিষ গ্রহণকারী হলেও চরম শিব বিদ্বেষী ছিলেন। জ্ঞানী হয়ে শিব বিদ্বেষ করা কোথাকার সাত্ত্বিকতা ? কেবল নিরামিষ ও সাত্ত্বিক আহার করলেই যদি রাগ, বিদ্বেষ ও তামসিকতা দূর হতো, তবে নিরামিষাশী বৈষ্ণব গোষ্ঠী বা ইস্কনের অনুসারীরা পরমেশ্বর শিবের প্রতি তীব্র বিদ্বেষ, কটূক্তি এবং তাঁকে "তামসিক দেবতা" বলে নিচু দেখানোর মতো অহংকার প্রকাশ করতে পারতেন না।
তাঁদের এই সাম্প্রদায়িক অহংকার ও বিদ্বেষমূলক মনোভাবই প্রমাণ করে যে- মুখে নিরামিষ খেলেও মনের ভেতরের তামসিকতা, ক্রোধ এবং অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি ঘৃণা দূর নাও হতে পারে। অতএব, নিরামিষ আহারের সাথে মন পবিত্র হওয়ার কোনো 'অব্যভিচারী' বা ধ্রুব সম্পর্ক নেই।
যদি নিরামিষ একমাত্র শ্রেষ্ঠ পথ হতো তবে- শাস্ত্রে পেঁয়াজ ও রসুন যা নিরামিষ হওয়ার পরেও তামসিকবৃত্তির জন্য অভক্ষ্য বলে সিদ্ধান্ত দিতো না। সুতরাং- নিরামিষ গ্রহণ করলেই যে তামসিকতা থাকবেনা এটা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।
———————————————————————————————————————————————————
❌ নিরামিষাশীর দাবী —
শ্লোক নং ৯ হলো- সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়ের রূপক। জ্ঞানী ব্যক্তি সমাজকে ভাত আর মৃত্যুকে শাক হিসেবে খান এর অর্থ হলো, শিবজ্ঞানী মহাকালের মতো। তিনি পুরো সৃষ্টির জন্ম-মৃত্যুর স্বাভাবিক নিয়মকে কোনো কিছু না খেয়েই পরমাত্মায় অনুভব করেন।
✅ শৈবপক্ষ দ্বারা খণ্ডন —
পূর্বপক্ষের এই দাবিটি “মুখ্যার্থ অপলাপ” বা জোরপূর্বক শাস্ত্রের আক্ষরিক সত্যকে অস্বীকার করার চেষ্টা মাত্র। কঠোপনিষদ ও সূতসংহিতার এই পরম তত্ত্বটিকে কেবল "কোনো কিছু না খেয়ে অনুভব করা" বা কবি-কল্পনার রূপক বলা শাস্ত্রসম্মত নয়।
স্কন্দমহাপুরাণের সূতসংহিতার এই শ্লোকটির মূল উৎস হলো (কঠোপনিষদ ১/২/২৫) -
"যস্য ব্রহ্ম চ ক্ষত্রং চ উভে ভবত ওদনঃ।
মৃত্যু র্যস্যোপসেচনং ক ইত্থা বেদ যত্র সঃ॥"
উপনিষদ এখানে পরমাত্মা শিবের 'সর্বভক্ষত্ব' বা 'সংহর্তৃত্ব' রূপের বর্ণনা করছে। প্রলয়কালে পরমেশ্বর শিব কোনো কাল্পনিক বা মানসিক অনুভব করেন না, বরং তিনি স্থূল ও সূক্ষ্ম সমগ্র সৃষ্টিকে বাস্তবিকভাবেই নিজের মধ্যে বিলীন বা গ্রাস করেন।
ব্রহ্মের এই প্রলয় রূপ পরম সত্য। যিনি শিবজ্ঞানী অদ্বৈত শৈবব্যক্তি, তিনি নিজেকে সেই মহাকালের সাথে একাত্ম অনুভব করেন। অতএব, মহাকাল যেমন সৃষ্টির সমস্ত জীবকে (তা সে ব্রাহ্মণ হোক, ক্ষত্রিয় হোক বা পশু হোক) নিজের 'অন্ন' বা গ্রাস মনে করেন, শিবজ্ঞানীর দৃষ্টিতেও এই জগতের সমস্ত স্থূল বস্তুই তাঁর নিজের পরমাত্মারূপী অগ্নির 'আহুতি' বা আহার মাত্র।
পূর্বে বলেছিলাম - আক্ষরিক অর্থ যদি কোনোভাবেই অসম্ভব বা যৌক্তিকতার মাপদণ্ডে অবাস্তব হয়, কেবল তখনই রূপক বা লক্ষণার্থ নেওয়া যায় (যেমন- গঙ্গায় গোয়ালাদের বাস, জলের ওপর ঘর অসম্ভব, তাই গঙ্গার তীর অর্থ নেওয়া হয়)।
পূর্বপক্ষ ভাবছেন সমাজকে ভাত বা মৃত্যুকে শাক হিসেবে খাওয়া অসম্ভব, তাই এটি রূপক। কিন্তু পরমাত্মা শিবের পক্ষে সমগ্র সৃষ্টিকে গ্রাস করা (সংহার করা) কোনো অসম্ভব বিষয় নয়, এটি তাঁর স্বাভাবিক ধর্ম। শ্রুতিও পরমেশ্বর শিবের উদ্দেশ্যে বলেন- “নমো হন্ত্রে চ হনীয়সে চ” (শুক্ল-যজুর্বেদ ১৬/৩৯)। এর অর্থ হলো- হত্যাকারী ও মহাহত্যাকারী রুদ্রকে নমস্কার। এখানে মহাহত্যাকারী বলার উদ্দেশ্যে হলো- পরমেশ্বর শিব সমগ্র জগতকে মহাপ্রলয়ে সংহার করেন।
একই প্রসঙ্গে ন্যায়প্রস্থান জ্ঞানমীমাংসাতে বলা হয়েছে-
"অত্তা চরাচরগ্রহণাৎ" ।। (ব্রহ্মসূত্র ১/২/৯)
সূত্রার্থ - (কঠোপনিষদের উক্ত মন্ত্রে বর্ণিত) 'অত্তা' বা ভক্ষণকারী হলেন স্বয়ং পরমাত্মা/পরমেশ্বর, কারণ এখানে চরাচর অর্থাৎ সমগ্র স্থূল ও সূক্ষ্ম জগৎকে গ্রাস করার কথা বলা হয়েছে।
মহর্ষি বেদব্যাস এই সূত্রে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে - পরমেশ্বর কেবল মনে মনে অনুভব করেন না, প্রলয়কালে তিনি 'অত্তা' অর্থাৎ আক্ষরিক অর্থেই সমগ্র বিশ্বকে নিজের মধ্যে ভক্ষণ বা বিলীন করেন। অতএব, পরমেশ্বরের এই সর্বভক্ষত্ব রূপ পরম বাস্তব। যিনি শিবজ্ঞানী অদ্বৈত শৈবব্যক্তি, তিনি এই সর্বভক্ষত্ব ভাবের সাথে একাত্ম হন। সুতরাং, একে নিছক "মানসিক রূপক" বলা ব্যাসসূত্রের সরাসরি বিরোধিতা করা।
তদুপরি, শিবজ্ঞানী অদ্বৈত শৈবব্যক্তি যখন স্থূল শরীরে থেকে খাদ্য গ্রহণ করেন, তখন তাঁর এই 'সর্বভক্ষত্ব' বোধ জাগ্রত থাকে। তাঁর কাছে ছাগল-মুরগি বা শাক-সবজি সবই এক মহাকালের পেটে যাওয়া অন্ন। তাই এটিকে "কোনো কিছু না খেয়ে কেবল মনে মনে ভাবা" বলে লঘু করা ন্যায় শাস্ত্রের পরিপন্থী।
পূর্বপক্ষ বলতে চেয়েছেন, শিবজ্ঞানী কোনো কিছু না খেয়েই পরমাত্মায় তৃপ্ত থাকেন।
কিন্তু, শিবজ্ঞানী স্থূল শরীর ধারণ করে থাকাকালীন অবশ্যই আহার করেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের মতো তিনি স্বাদের লোভে বা "জীব হত্যা করছি" এই পাপ-পুণ্যের দ্বৈতবোধে আটকা পড়ে খান না। তিনি যখন মাংস বা অন্ন মুখে দেন, তখন তৈত্তিরীয় উপনিষদ অনুযায়ী- “অহমন্নমন্নমদন্তমদ্মি” অর্থাৎ- আমিই অন্ন, আর যে অন্নকে খাচ্ছে তাকেও আমিই খাচ্ছি। এই ভাবনা শিবজ্ঞানী অদ্বৈত শৈবব্যক্তি মধ্যে জাগ্রত থাকে। আর এটা তখনই বলা সম্ভব হচ্ছে যখন এটি অদ্বৈত শৈবব্যক্তির অনুভব হয়েছে।
———————————————————————————————————————————————————
❌ নিরামিষাশীর দাবী —
সাধারণের জন্য নিরামিষই শ্রেষ্ঠ পথ। ভক্ষ্য-অভক্ষ্যের নিয়ম কেবল মুক্ত পুরুষের জন্য খাটতে পারে, কিন্তু সাধারণ সাধক বা মানুষের জন্য নিরামিষ আহারই একমাত্র নিরাপদ ও আধ্যাত্মিক পথ।
✅ শৈবপক্ষ দ্বারা খণ্ডন —
না, এমনটি সত্য নয়। কেবল নিরামিষই শ্রেষ্ঠ পথ নয়। যদি কেবল নিরামিষই শ্রেষ্ঠপথ হতো তবে শাস্ত্রে ভক্ষ্যাভক্ষ্য বিচার করে সিদ্ধান্ত দিতো না। ধর্মসূত্র আদিতে সমাজের জন্যই সকল বিধান দেওয়া হয়েছে, সেখানে আলাদা ভাবে বলা নেই যে - এই বিধি কেবল মুক্ত পুরুষের জন্য। যদি এরূপই বিধান হতো তবে- শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীরাম মুক্ত পুরুষ হয়েও ‘মৃগয়া’ করতো না।
এখন মানুষ কি খাবে, কি খাবে না সেটা নির্ভর করবে তাদের মনের উপর। কেমন খাদ্য গ্রহণে তারা অধিক সন্তুষ্ট। শাস্ত্রে অনেক নিয়মই বলেছে আবার শাস্ত্র এটাও বলে যে, যেভাবে আত্মসন্তুষ্ট হয় সেভাবে ধর্ম পালন করতে।
মনু বলেছেন—
“আচারশ্চৈব সাধূনামাত্মনস্তুষ্টিরেব চ” ।।
(মনু সংহিতা/২/৬)
উক্ত শ্লোকের ভাষ্যে মেধাতিথির ভাষ্য — “আত্মতুষ্টিশ্চ বৈকল্লিকপদার্থবিষয়ধর্ম্মে প্রমাণম্। তদাহ গর্গব্যাসঃ— বৈকল্লি আত্মতুষ্টিঃ প্রমাণম্” ।।
“আত্মসন্তুষ্টিও ধর্মের প্রমাণমূলক বিষয়। গর্গব্যাসও বলেছেন ‘আত্মসন্তুষ্টিই বৈধ (প্রমাণ)।”
অর্থাৎ ধর্মের প্রতিষ্ঠা ও প্রমাণের জন্য শুধু বেদ বা আচারের নির্দেশই নয়, নিজের অন্তর্গত তৃপ্তি বা আত্মসন্তুষ্টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শাস্ত্রে যেহেতু স্পষ্টভাবেই আমিষ এবং নিরামিষ উভয় প্রকার আহারেরই বিধান বা বিকল্প দেওয়া আছে (যেমন আমরা আপস্তম্ব ধর্মসূত্রে দেখেছি), তাই এখানে মেধাতিথির ভাষ্য অনুযায়ী আমিষ বা নিরামিষ বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে মানুষের 'আত্মতুষ্টি' বা ব্যক্তিগত পছন্দ সম্পূর্ণ বৈধ এবং শাস্ত্রসম্মত।
[এখানে পূর্বপক্ষ একটি সম্ভাব্য আপত্তি করতে পারেন যে- তবে এই অনুযায়ী নিজের মনের সন্তুষ্টির জন্য চুরি, ডাকাতিও করা যেতে পারে৷ এতেও ধর্মের নিয়ম লঙ্ঘন হয় না, তবে এর মীমাংসা কি হবে ? প্রকৃতপক্ষে এমন নয়। খাদ্যগ্রহণের ক্ষেত্রে শাস্ত্রই দুটি পথের বিধান দিয়েছেন৷ তাই নিরামিষ না আমিষ আহার গ্রহণে ধর্মের নিয়মের লঙ্ঘন হয় না। কিন্তু, পক্ষান্তরে- চুরি, ডাকাতি আদি অধর্ম কার্য এবং এসবের জন্য শাস্ত্রে শাস্তির বিধান দিয়েছেন, তাই এক্ষেত্রে সেই যুক্তি গ্রহণযোগ্য হবে না। ]
যেহেতু সনাতন শাস্ত্রে আমিষ ও নিরামিষ উভয় আহারেরই বৈধ বিকল্প রয়েছে, তাই কোনো ব্যক্তি যদি নিরামিষ খেয়ে তৃপ্ত থাকেন তবে তিনি তা-ই গ্রহণ করুন, আর যিনি ন্যায়সঙ্গতভাব্ আমিষ খেয়ে সন্তুষ্ট তিনি তা-ই গ্রহণ করুন। নিজের প্রকৃতি ও তৃপ্তি অনুযায়ী এই শাস্ত্রসম্মত বিকল্প বেছে নেওয়ায় ধর্মের কোনো লঙ্ঘন হয় না।
এই প্রসঙ্গে স্বয়ং মহর্ষি বেদব্যাস ব্রহ্মসূত্রে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে —
"সর্বান্নানুমনতিশ্চ প্রাণাত্যয়ে তদ্দর্শনাৎ" ।। (ব্রহ্মসূত্র ৩/৪/২৮)
সূত্রার্থ - প্রাণসঙ্কট বা বিশেষ পরিস্থিতিতে (যেমন ধর্মরক্ষা বা শরীর রক্ষা) সমস্ত প্রকার অন্ন ভক্ষণের অনুমতি শাস্ত্র দেয়, কারণ শ্রুতিতেও (ছান্দোগ্য উপনিষদে ঋষি চাক্ষায়নের হস্তী-উচ্ছিষ্ট মাষকলাই ভক্ষণের মাধ্যমে) তেমনটাই দেখা গেছে।
স্বয়ং ব্রহ্মসূত্রকার বেদব্যাসজী এখানে স্পষ্ট করছেন যে, আহারের নিয়মগুলো পরিস্থিতি ও অধিকারভেদে নমনীয়। শাস্ত্র কোথাও বলেনি যে নিরামিষই "একমাত্র" আধ্যাত্মিক পথ। যদি তা-ই হতো, তবে আপৎকালে বা বিশেষ যজ্ঞীয় পরিস্থিতিতে সমস্ত অন্ন (আমিষসহ) গ্রহণের এই বৈদান্তিক অনুজ্ঞা থাকত না।
———————————————————————————————————————————————————
✅ প্রকৃত শিবজ্ঞান কোনো খাদ্যের মোড়কে বা বাহ্যিক নিরামিষাশী অহংকারের খাঁচায় বন্দী থাকে না। যিনি সত্যি সত্যি শিবজ্ঞানী বা ব্রহ্মজ্ঞানী, তিনি রাগ (অনুরাগ/আসক্তি) এবং দ্বেষ (ঘৃণা) এই দুই মানসিক দ্বৈততা থেকেই মুক্ত। তাঁর কাছে ছাগল, মুরগি, ধান বা গম সবই এক অভিন্ন পরমাত্মার স্পন্দন। তিনি জিহ্বার লালসায় কিংবা জীব-হত্যার ভেদবুদ্ধি নিয়ে আহার করেন না, বরং ব্রহ্মরূপে ব্রহ্মাগ্নিতেই সমস্ত অন্নকে আহুতি দেন।
অতএব, শাস্ত্রের দোহাই দিয়ে আমিষ আহারকে ‘নিচু বাসনা’ বলা এবং নিরামিষকে একমাত্র আধ্যাত্মিক পথ দাবি করাটি প্রকৃতপক্ষে ব্যক্তির নিজস্ব ধারনাকে একমাত্র সত্য ভেবে যেনতেন প্রকারে অন্যের উপর চাপিয়ে দেওয়ার আধ্যাত্মিক অহংকার ও ভেদজ্ঞানেরই বহিঃপ্রকাশ। পরমেশ্বর শিবের সেই পরম অদ্বৈত স্থিতিতে ভক্ষ্য, ভোজ্য এবং ভোক্তা সবই একাকার হয়ে একমেবাদ্বিতীয়ম্ ব্রহ্মরূপে বিরাজ করে।
🙏সর্বে হ্যেষ রুদ্রস্তস্মৈ রুদ্রায় নমো অস্তু🙏
নমঃ শিবায়ৈ 🙏
নমঃ শিবায় 🙏
শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্ ✊🚩
✍️ অপপ্রচার দমনে— অন্তিক ভট্টাচার্য্য (শম্বরনাথ শৈব)।
🌻 বিশেষ কৃতজ্ঞতা— আমার গুরু শ্রী নন্দীনাথ শৈবাচার্য জী ও আমার আদর্শ শ্রী রোহিত কুমার চৌধুরী শৈবজী।
📣 কপিরাইট ও প্রচারে— Shivalaya।


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন