আর্যসমাজের “রূপং রূপং প্রতিরূপো বভূব” ঋগবেদীয় মন্ত্রের অপব্যাখ্যার খণ্ডন —

 🚩 “রূপং রূপং প্রতিরূপো বভূব তদস্য রূপং প্রতিচক্ষণায়” উক্ত ঋগবেদীয় মন্ত্রের উপর আর্যসমাজের অপব্যাখ্যার খণ্ডন —



👉 প্রথমে মন্ত্রটি দেখে নেওয়া যাক —

“রূপং রূপং প্রতিরূপো বভূব তদস্য রূপং প্রতিচক্ষণায়
ইন্দ্রো মায়াভিঃ পুরুরূপ ঈয়তে যুক্তা হ্যস্য হরয়াঃ শতা দশ” ।। [ঋগ্বেদ/ শাকলশাখা ৬/৪৭/১৮]

🔘 দয়ানন্দ সরস্বতী প্রতিষ্ঠিত আর্যসমাজের মূল আধ্যাত্মিক ভিত্তি হলো ঈশ্বরের নিরতিশয় নিরাকারত্ব এবং একদেশীত্ব-বর্জন। আর্যসমাজের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পরমেশ্বর সর্বদা সর্বব্যাপী, সর্বজ্ঞ এবং জড় বা প্রাকৃত আকার-বর্জিত, কারণ ঈশ্বরের কোনো রূপ বা অবয়ব স্বীকার করলে তাঁর সর্বব্যাপকত্ব ও নিত্যত্ব ক্ষুণ্ণ হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, ঋগ্বেদের ৬/৪৭/১৮ মন্ত্রে প্রযুক্ত “রূপং রূপং প্রতিরূপো বভূব” অথবা “ইন্দ্রো মায়াভিঃ পুরুরূপ ঈয়তে” এই বাক্যগুলোকে কোনো পৌরাণিক বা সাকার পরমেশ্বরের বহু রূপ ধারণের প্রমাণ হিসেবে স্বীকার করা হয় না। আর্যসমাজী চিন্তাধারা অনুযায়ী- এই মন্ত্রের ‘ইন্দ্র’ শব্দটির দ্বারা প্রকরণভেদে হয় সর্বব্যাপী পরমাত্মার সৃষ্টি-সামর্থ্যকে বোঝানো হয়েছে, অথবা “সৈন্ধব ন্যায়” ও পাণিনীয় ব্যাকরণের (৫/২/৯৩) সূত্রানুসারে এর দ্বারা “জীবাত্মা” এবং তার দশ ইন্দ্রিয় ও প্রাণ-বৃত্তির নানাবিধ শরীর ধারণের প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করা হয়েছে। অতএব, ঈশ্বরের সাকারত্ব খণ্ডন এবং কঠোপনিষদের 'অরূপম্' বাক্যের সত্যতা রক্ষার্থে আর্যসমাজ এই মন্ত্রটিকে জীবাত্মার রূপান্তর অথবা ঈশ্বরের সর্বব্যাপক সৃষ্টির রূপক অলঙ্কার হিসেবেই দর্শন করে।

কিন্তু, এই আর্যসমাজের এই অর্থ কি আসলেই সঠিক? চলুন দেখে নেওয়া যাক —
——————————————————————————————————————————

❌ আর্যসমাজের দাবী ১ — যারা সাকারবাদ দাবি করে, তারা রমেশচন্দ্র দত্তের ভুল অনুবাদ ব্যবহার করে।


✅ শৈবপক্ষ কর্তৃক খণ্ডন ১ — এটি একটি অত্যন্ত দুর্বল যুক্তি। আমরা এই মন্ত্রের প্রমাণের জন্য রমেশচন্দ্র দত্ত বা হরফ প্রকাশনীর মুখাপেক্ষী নই। এই মন্ত্রের সাকার ও দিব্য রূপের পরমার্থিক ব্যাখ্যা স্বয়ং ‘বৃহদারণ্যক উপনিষদ’ (২/৫/১৯)-এ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখিত আছে -

“রূপং রূপং প্রতিরূপো বভূব, তদস্য রূপং প্রতিচক্ষণায়। ইন্দ্রো মায়াভিঃ পুরুরূপ ঈয়তে, যুক্তা হ্যস্য হরয়ঃ শতা দশ। অয়ং বৈ হরয়োহয়ং বৈ দশ চ সহস্রাণি বহূনি চানন্তানি চ, তদেতদ্‌ ব্রহ্মাপূর্বমনপরমনন্তরমবাহ্যম্, অয়মাত্মা ব্রহ্ম সর্বানুভূঃ, ইত্যনুশাসনম্” ।।

​অনুবাদ - ​(সেই পরমেশ্বর সৃষ্টিজগতে প্রকট হওয়ার জন্য) প্রতিটি রূপেরই প্রতিরূপ (অনুরূপ বা সদৃশ আকার) ধারণ করেছেন। তাঁর এই রূপ ধারণ মূলত তাঁর নিজের ঐশ্বর্যকে প্রকাশ করার জন্য (যাতে সাধক বা জীব তাঁকে উপলব্ধি/দর্শন করতে পারে)। ​সেই ‘ইন্দ্র’ (পরমেশ্বর) নিজের মায়াশক্তির (অনন্ত ঐশ্বর্য ও সংকল্পের) দ্বারা বহু রূপ (পুরুরূপ) ধারণ করে বিচরণ বা প্রকাশ লাভ করেন। কারণ, তাঁর রথে যুক্ত রয়েছে শত শত ও সহস্র সহস্র ‘হরি’ অর্থাৎ অশ্ব (এখানে 'অশ্ব' বলতে পরমেশ্বরের অনন্ত শক্তি ও ইন্দ্রিয়-বৃত্তিকে বোঝানো হয়েছে)। ​(পরমার্থ বিচারে) এই যে শত-সহস্র, বহু ও অনন্ত শক্তির কথা বলা হলো- তা মূলত তিনিই (সেই এক পরমেশ্বর)। সেই পরম ব্রহ্মের কোনো কারণ নেই (অপূর্বম্ - যার পূর্বে কিছু নেই), তাঁর কোনো কার্য বা বিনাশ নেই (অনপরম্), তাঁর কোনো ভেতর নেই (অনন্তরম্) এবং কোনো বাহির নেই (অবাহ্যম্)। এই যে সর্বানুভূ (সর্বজ্ঞ বা সবকিছুকে অনুভবকারী) আত্মা তিনিই হলেন ব্রহ্ম। এটাই হলো বেদের চরম শিক্ষা বা শাসন (অনুশাসন)।

সুতরাং, উপনিষদের এই মন্ত্রটিই স্বয়ং প্রমাণ করছে যে- পরমেশ্বর যুগপৎ সর্বব্যাপী নিরাকার আবার নিজের দিব্য শক্তিতে সাকার রূপে রূপায়িত এতে কোনো বিরোধ বা দোষ নেই। এবং- কঠ উপনিষদ ২/২/৯-১০-১১ দ্রষ্টব্য।

তাই কেউই রমেশচন্দ্র দত্তের দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন না। সুতরাং অনুবাদকের ভুল দেখিয়ে মূল বৈদিক সত্যকে আড়াল করা যাবে না।

যদি এই মন্ত্রটি কেবলই কোনো আধুনিক অনুবাদকের ভুল বা রূপক অলঙ্কার হয়ে থাকে, তবে আজ থেকে হাজার বছর আগের বৃহদারণ্যক উপনিষদে (২/৫/১৯) মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য এই মন্ত্রের শেষে কেন বললেন- "তদেতদ্ব্রহ্ম... অয়মাত্মা ব্রহ্ম সর্বানুভূঃ"?

উপনিষদ স্বয়ং যেখানে এই মন্ত্রের ‘ইন্দ্র’ ও ‘পুরুরূপ’কে পরম ব্রহ্মের প্রত্যক্ষ প্রকাশ বলেছেন, সেখানে উপনিষদকে অগ্রাহ্য করে আর্যসমাজ কার সিদ্ধান্তে একে সাধারণ রূপক বলে উড়িয়ে দিচ্ছে?
——————————————————————————————————————————

❌ আর্যসমাজের দাবী ২ — মন্ত্রে 'মূর্তি' বা 'প্রতিমা' শব্দ নেই, তাহলে সাকারবাদ আসে কী করে?


✅ শৈবপক্ষ কর্তৃক খণ্ডন ২ — মন্ত্রে 'মূর্তি' শব্দ না থাকলেও 'রূপং রূপং' (রূপে রূপে) এবং 'পুরুরূপঃ' (বহু রূপ ধারণকারী) শব্দ দুটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বিদ্যমান। 'রূপ' শব্দের অর্থই হলো আকার (ধাতুপাঠ ১০.০৪৭৯)। এবং “দণ্ডাপুপিকান্যায়” অনুযায়ী- দণ্ডের সাথে যেমন পিঠাও গ্রহণ হয় তেমনই- রুপের সাথে সাকার মূর্তিও প্রতিপাদিত হয়ে যায়।

​যজুর্বেদের (৩২/৩) "ন তস্য প্রতিমা অস্তি" মন্ত্রের আর্যসমাজী যে ব্যাখ্যা দেন, তা ভুল কেননা- সেখানে নির্গুণের ব্যাপারে বলা হয়েছে। সেখানে 'প্রতিমা' শব্দের অর্থ 'উপমা', কোনো প্রতিমূর্তি বা আকার নয়। অর্থাৎ- সেই নির্গুণ ঈশ্বরের সমকক্ষ কেউ নেই। সুতরাং, ঋগ্বেদের এই মন্ত্রে 'রূপ' শব্দ থাকাটাই ঈশ্বরের বিবিধ রূপ বা প্রকাশ ধারণের ক্ষমতার জন্য যথেষ্ট।

বেদের মন্ত্রে যেখানে ‘রূপং রূপং’ (রূপে রূপে) এবং ‘পুরুরূপঃ’ (বহু রূপ) শব্দগুলো স্বয়ং বিদ্যমান, সেখানে কেবল ‘মূর্তি’ বা ‘প্রতিমা’ শব্দ নেই বলে সাকার রূপকে অস্বীকার করা কি শব্দের অপব্যাখ্যা নয়? 

‘দণ্ডাপূপিকা ন্যায়’ অনুসারে রূপের অস্তিত্ব স্বীকার করলে রূপবান সাকার সত্তা কি স্বতঃসিদ্ধভাবে প্রমাণিত হয় না? আর যদি ‘রূপ’ মানে আকার না-ই হয়, তবে আর্যসমাজ কোন ধাতু বা ব্যাকরণের নিয়মে বেদের ‘রূপ’ শব্দের অর্থ ‘নিরাকার’ প্রমাণ করবে?
——————————————————————————————————————————

❌ আর্যসমাজের দাবী ৩ — পাণিনির সূত্র ৫/২/৯৩ অনুসারে এখানে 'ইন্দ্র' অর্থ ঈশ্বর নয়, বরং 'জীবাত্মা' ধরতে হবে।


✅ শৈবপক্ষ কর্তৃক খণ্ডন ৩ — আর্যসমাজী এখানে নিজের সুবিধেমতো 'সৈন্ধব' ন্যায়ের অপপ্রয়োগ করেছেন। এই প্রকরণে 'ইন্দ্র' শব্দের অর্থ কোনোভাবেই 'জীবাত্মা' হতে পারে না। যদি প্রশ্ন আসে কেন? তবে- এই ঋগ্বেদ মন্ত্রটি হুবহু বৃহদারণ্যক উপনিষদের ২/৫/১৯ মন্ত্রে উদ্ধৃত হয়েছে। সেখানে মহর্ষি যাজ্ঞবল্ক্য স্পষ্ট বলেছেন— "অয়ং বৈ হরয়োঽয়ং বৈ দশ চ সহস্রাণি বহূনি চানন্তানি চ, তদেতদ্ব্রহ্ম..." অর্থাৎ- এই ইন্দ্রই হলেন ব্রহ্ম।

​আর্যসমাজী দাবি করেছেন যে এই সূত্রে ‘ইন্দ্র’ শব্দের অর্থ কেবলই জীবাত্মা, পরমাত্মা নয়। কিন্তু কাশিকা ও সিদ্ধান্তকৌমুদীর মূল পাঠটি ভালো করে লক্ষ্য করলেই তাঁদের এই ভুল উঠে আসে-

​কাশিকা ভাষ্য বলছে- “​“রূঢিরেষা চক্ষুরাদীনাং করণানাম্। তথা চ ব্যুৎপত্তেরনিয়মং দর্শয়তি।”
​“ইতিকরণঃ প্রকারার্থঃ। সতি সম্ভবে ব্যুৎপত্তিরন্যথাপি কর্তব্যা, রূঢেরনিয়মাদিতি।”

​সিদ্ধান্তকৌমুদী বলছে- “ইতিশব্দঃ প্রকারার্থঃ”।
​কাশিকাকার জয়াদিত্য এবং দীক্ষিতজী দুজনেই স্পষ্ট বলছেন- এখানে ‘ইন্দ্রিয়’ শব্দটি মূলত একটি ‘রূঢ়ি’ শব্দ, যা চোখ, কান আদি করণ বা ইন্দ্রিয়কে বোঝায়। এই শব্দটির বুৎপত্তি বা সাধন প্রক্রিয়াটি ‘অনিয়মিত’। সূত্রে যে ‘ইতি’ শব্দ রয়েছে, তা ‘প্রকারার্থ’। অর্থাৎ, এখানে ইন্দ্রিয় শব্দের ব্যুৎপত্তি কেবল জীবাত্মার সাথেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সম্ভব হলে এর ব্যুৎপত্তি অন্যভাবেও করা আবশ্যক।

​সুতরাং- আর্যসমাজী যেভাবে এই সূত্রটিকে ‘ইন্দ্র অর্থ- কেবল জীবাত্মা’ নিয়মের একটি কঠোর সিদ্ধান্ত বানাতে চেয়েছিলেন, কাশিকা স্বয়ং “ব্যুৎপত্তেরনিয়মং” এবং “অন্যথাপি কর্তব্যা” বলে সেই সিদ্ধান্তটির খণ্ডন দিয়েছে।

​কাশিকা ভাষ্যে লেখা আছে- ​“ইন্দ্র আত্মা, স চক্ষুরাদিনা করণেনানুমীযতে। নাকর্তৃকং করণমস্তি।”

সিদ্ধান্তকৌমুদীতে- “করণেন কর্তুরনুমানাৎ”।

অর্থাৎ- ইন্দ্রিয় বা করণের দ্বারা কর্তার অনুমিতি হয়, কারণ কর্তা ছাড়া করণ কাজ করতে পারে না।

​আর্যসমাজী এখানে ‘কর্তা’ বা ‘আত্মা’ বলতে কেবল জীবাত্মাকে ধরে নিয়েছেন। কিন্তু আমাদের শরীর ও ইন্দ্রিয়গুলোর পরম চালক কে?

(​কেনোপনিষদ ১/১) স্পষ্ট প্রশ্ন করে-

“কেনেষিতং পততি প্রেষিতং মনঃ। কেন প্রাণঃ প্রথমঃ প্রৈতি যুক্তঃ। কেনেষিতাং বাচমিমাং বদন্তি চক্ষুঃ শ্রোত্রং ক উ দেবো যুনক্তি ॥” অর্থাৎ- কার ইচ্ছায় মন চলে? কার দ্বারা যুক্ত হয়ে চোখ-কান কাজ করে?

​উত্তর (কেনোপনিষদ ১/২)-

“শ্রোত্রস্য শ্রোত্রং মনসো মনো যদ্ বাচো হ বাচং স উ প্রাণস্য প্রাণঃ চক্ষুষশ্চক্ষুঃ...” অর্থাৎ, যিনি শ্রোত্রের শ্রোত্র, চোখের চোখ, তিনিই পরম তত্ত্ব।।

​জীবাত্মা নিজে জড় ইন্দ্রিয়কে সচল করতে পারে না, যদি না তার পেছনে পরমেশ্বর শিবের ‘চিচ্ছক্তি’ বা অন্তর্যামী পরমাত্মার সত্তা কাজ করে। অতএব, ইন্দ্রিয় যার লিঙ্গ বা চিহ্ন, তিনি মূলত সেই পরমেশ্বরই, যিনি এই দেহের অন্তর্যামী। সায়ণাচার্য নিজেই শব্দের ধাতুগত অর্থ বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন- “ইদি পরমৈশ্বর্যে”। পরম ঐশ্বর্য কেবল পরমাত্মারই থাকে, মায়াবদ্ধ জীবের নয়।

​আর্যসমাজী অত্যন্ত সুন্দর ‘সৈন্ধব ন্যায়’ (লবণ ও ঘোড়ার উদাহরণ) ব্যবহার করে বলেছেন যে, প্রকরণ বা প্রসঙ্গ অনুযায়ী অর্থ গ্রহণ করতে হয়! তবে- ​আসুন দেখা যাক যজুর্বেদের ১৬ অধ্যায়ের (শতরুদ্রীয়) বা ঋগ্বেদের ৬/৪৭/১৮ মন্ত্রের প্রকরণটি কী?

​ঋগ্বেদের ৬/৪৭/১৮ মন্ত্রের ঠিক পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী মন্ত্রগুলো (যেমন ৬/৪৭/১৫-১৭) পরমেশ্বরের মহিমা, যজ্ঞ এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের রক্ষাকর্তার স্তুতিতে পূর্ণ।
​যজুর্বেদের শতরুদ্রীয় অধ্যায়টি সমগ্র ব্রহ্মাণ্ডের অধিপতি, স্থাবর-জঙ্গমের স্বামী, অন্তর্যামী রুদ্রের উদ্দেশ্যে নিবেদিত।

​এখন- ‘সৈন্ধব ন্যায়’ অনুযায়ী- যেখানে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি, স্থিতি, লয় এবং সর্বব্যাপকত্বের কথা হচ্ছে (প্রকরণ), সেখানে ‘ইন্দ্র’ শব্দের অর্থ ‘ক্ষুদ্র জীবাত্মা’ করাটা কেমন যুক্তি? খেতে বসে কেউ যেমন ঘোড়া চায় না, লবণ চায়, তেমনই ঈশ্বরের স্তুতির প্রকরণে ‘ইন্দ্র’ শব্দের অর্থ পরমেশ্বর শিব বা পরমাত্মাই হবে, কোনো মায়াবদ্ধ জীবাত্মা নয়। আর্যসমাজী নিজেই নিজের দেওয়া সৈন্ধব ন্যায়ের নিয়ম লঙ্ঘন করেছেন।

​যদি আর্যসমাজীর কথামতো ঋগ্বেদ ৬/৪৭/১৮ মন্ত্রে ‘ইন্দ্র’ অর্থ জীবাত্মা ধরা হয়, তবে মন্ত্রের দ্বিতীয়ার্ধের অর্থ দাঁড়াবে-

​“জীবাত্মা নিজের মায়াশক্তির দ্বারা বহু রূপ ধারণ করে এবং তার রথে সহস্র অশ্ব (ইন্দ্রিয়) যুক্ত আছে।”

যা ​আর্যসমাজের নিজস্ব মতবাদের সাথে সংঘাত (স্ববিরোধিতা)।

​১. আর্যসমাজের প্রতিষ্ঠাতা দয়ানন্দ সরস্বতীর মতে- জীবাত্মা হলো ক্ষুদ্র, একদেশী এবং সীমিত শক্তির অধিকারী (অল্পজ্ঞ)। জীবাত্মার কোনো ‘মায়াশক্তি’ বা নিজের ইচ্ছায় ব্রহ্মাণ্ডে বহু রূপ ধারণ করার ক্ষমতা নেই। যদি জীবাত্মা নিজের মায়াশক্তিতে বহু রূপ ধারণ করতে পারে, তবে তো জীবাত্মাই ‘সর্বশক্তিমান ঈশ্বর’ হয়ে গেল!

২. কাশিকা ও সিদ্ধান্তকৌমুদী অনুযায়ী ইন্দ্রিয় হলো ১০টি (বা ১১টি)। কিন্তু মন্ত্রে বলা হয়েছে- “হরয়ঃ শতা দশ” (সহস্র অশ্ব বা ইন্দ্রিয়)। একটি জীবাত্মার কি একসাথে হাজারটি ইন্দ্রিয় বা শরীর থাকে? কখনই নয়। কিন্তু পরমাত্মার ক্ষেত্রে এটি খাটে, কারণ শ্বেতাশ্বতর ও পুরুষসূক্ত অনুযায়ী তাঁর সহস্র চোখ, সহস্র হাত ও সহস্র পা রয়েছে।

​পাণিনির ৫/২/৯৩ সূত্রটি কেবল ‘ইন্দ্রিয়’ শব্দের ব্যাকরণগত বুৎপত্তি দেখানোর জন্য একটি রূঢ়ি নির্দেশ মাত্র, এটি বৈদিক মন্ত্রের অর্থ সংকুচিত করার কোনো দার্শনিক ফতোয়া নয়। কাশিকা ও সিদ্ধান্তকৌমুদীর “ব্যুৎপত্তেরনিয়মং” এবং উপনিষদের অন্তর্যামী তত্ত্ব প্রমাণ করে যে- যেখানেই পরম ঐশ্বর্যের প্রসঙ্গ আসবে, সেখানেই ‘ইন্দ্র’ পদের মুখ্য অর্থ স্বয়ং পরমেশ্বর। 

সুতরাং, আর্যসমাজীর এই ব্যাকরণগত চাতুর্য সায়ণাচার্যের ভাষ্য, উপনিষদের প্রকরণ এবং তাঁদের নিজস্ব উদ্ধৃত কাশিকার সূত্রের আলোকেই সম্পূর্ণ খণ্ডিত হয়।

আপনাদেরই পরম পূজনীয় কাশিকা বৃত্তি যেখানে স্পষ্ট বলছে- “ব্যুৎপত্তেরনিয়মং” এবং “অন্যথাপি কর্তব্যা” অর্থাৎ- ইন্দ্রিয় শব্দের বুৎপত্তি কেবল জীবাত্মায় সীমাবদ্ধ নয়, অন্যভাবেও করা আবশ্যক, সেখানে কাশিকার দোহাই দিয়ে ‘ইন্দ্র’ শব্দের অর্থকে কেবল জীবাত্মা স্বীকার করা কি স্বয়ং কাশিকাকারের সাথে প্রতারণা নয়?

পরম ঐশ্বর্য অর্থ প্রকাশকারী ‘ইদি পরমৈশ্বর্যে’ ধাতুর মুখ্য বাচ্যার্থ পরমাত্মা শিবকে ছেড়ে, জড় ইন্দ্রিয়কে সচল করতে অক্ষম একদেশী জীবাত্মাকে যজ্ঞের প্রকরণে টেনে আনা কোন ধরনের বৈদিক সিদ্ধান্ত?
——————————————————————————————————————————

❌ আর্যসমাজের দাবী ৪ — ঈশ্বর সাকার হলে বা কোথাও উপস্থিত হলে তাঁর সর্বব্যাপকত্ব নষ্ট হয় এবং কঠোপনিষদের 'অরূপম্' বাক্য মিথ্যা হয়।


✅ শৈবপক্ষ কর্তৃক খণ্ডন ৪ — ঈশ্বর যখন সাকার রূপে কোথাও উপস্থিত হন বা প্রকট হন, তখন তিনি আকাশ থেকে ‘নেমে’ আসেন না বা অন্য জায়গা খালি করে আসেন না। তিনি সর্বত্র ব্যাপ্ত থকেই নিজের দিব্য শক্তিকে সেই নির্দিষ্ট স্থানে প্রকট করেন।

​বাতাস বা বায়ু পুরো ঘরেই সর্বত্র সমানভাবে ছড়িয়ে আছে (সর্বব্যাপী)। কিন্তু আমরা যখন হাতপাখা বা বৈদ্যুতিক পাখা চালাই, তখন একটি নির্দিষ্ট জায়গায় বাতাস বিশেষভাবে অনুভূত ও তীব্র হয়। পাখা চালানোর কারণে কি ঘরের বাকি অংশের বাতাস হাওয়া হয়ে যায়? অবশ্যই না। একইভাবে, পরমেশ্বর সর্বত্র থাকা সত্ত্বেও ভক্তের অনুগ্রহার্থে বা নিজের লীলার জন্য কোনো বিশেষ স্থানে সাকার রূপে নিজেকে প্রকট করলে তাঁর সর্বব্যাপকত্বের একবিন্দুও হানি হয় না।

আর কঠ উপনিষদের ব্যাখ্যা একপাক্ষিক। কেননা- উক্ত স্থানেও কেবল ব্রহ্মের নির্গুণ স্বরূপ নিয়েই বলা হয়েছে সগুণ স্বরূপ নিয়ে নয়। যেমন শ্বেতাশ্বতরে বলা হয়েছে- “এক হি রুদ্র ন দ্বিতীয়ায় তস্থুর্য” (৩/২) অর্থাৎ- রুদ্রই অদ্বিতীয় পরমেশ্বর। আবার একই প্রকরণে বলা হয়েছে- 

“যা তে রুদ্র শিবা তনূরঘোরাঽপাপকাশিনী।
তয়া নস্তনুবা শন্তময়া গিরিশন্তাভিচাকশীহি॥৫
যামিষুং গিরিশন্ত হস্তে বিভর্ষ্যস্তবে।
শিবাং গিরিত্র তাং কুরু মা হিংসীঃ পুরুষং জগৎ”॥৬

অনুবাদ - হে রুদ্র! তোমার যে ‘শিব’ (কল্যাণময়) তনু বা শান্ত স্বরূপ আছে যা ঘোর (ভয়ঙ্কর) নয়, যা সকল পাপ ও অশুভতাকে দূর করে, সেই শান্তময় দেহ বা স্বরূপ দ্বারা, হে গিরিশ (কৈলাসে অবস্থানকারী), তুমি আমাদের প্রতি প্রকাশিত হও ।।৫।।

হে গিরিশন্ত (কৈলাসনিবাসী রুদ্র)! তোমার হাতে যে ভয়ংকর অস্ত্র (ধনু-বাণ) ধারণ করেছ, সেটিকে কল্যাণকর করো। হে গিরিত্র (পর্বতের অধিপতি), তুমি যেন মানুষ বা জগতের কোনো প্রাণীকে আঘাত না করো ।।৬।।

একই মন্ত্র শতরুদ্রীয় হোম প্রকরণেও বিদ্যমান। যেখানে- উব্বট-মহীধর ও সায়ণাচার্য একই অর্থ গ্রহণ করেছেন। উপরোক্ত মন্ত্রের প্রসঙ্গ অনুযায়ী- “তনূ” শব্দের অর্থ- শরীর যা নিরুক্ত, উণাদিসূত্র আদি দ্বারাও সমর্থিত। যেমন- ‘তন্’ ধাতুর উত্তর উণাদি ২/১১৭ সূত্র (সংস্করণ ভেদে ২/১১৮)- “অর্ত্তিপূবপিয়জিতনিধনিতপিভ্যো নিত্” অনুযায়ী ‘উসি’ প্রত্যয় হয়েছে এবং তা ‘নিৎ’ (অর্থাৎ ‘ন্’ ইৎ বা লোপ) হয়েছে। এর অর্থ হলো দেহ বা শরীর। অর্থাৎ- পরমেশ্বরের শরীর কোনো প্রাকৃত বা জড় উপাদান নয়, তা তাঁরই চিচ্ছক্তির প্রকাশ বা বিস্তার।

আবার- “শকন্ধ্বাদিত্বাৎপররূপম্‌” (পাণিনি ৬/১/৯৪) সূত্রানুসারে- ‘গিরিশন্ত’ শব্দটি একটি সম্বোধনবাচক বহুব্রীহি সমাস যা বিশেষ কোনো ঈশ্বরতুল্য রূপেই বোঝানো হয়। সুতরাং, গিরিশন্ত অর্থ- “ঈশ্বর শিব” ছাড়া অন্য কিছু গ্রহণ করা ভাষ্য ও ব্যাকরণ উভয়ের বিরোধিতা।

এবং- “গিরৌ শেতে ইতি গিরিশঃ” এই ব্যুৎপত্তি অনুযায়ী- যিনি গিরি বা পর্বতে শয়ন করেন (অবস্থান করেন) তিনিই গিরিশ।

গিরি (উপপদ) + শী (ধাতু) + ড (প্রত্যয়) [‘অধিকরণে শেতেঃ’ (৩/২/১৫) সূত্রের বৈদিক বার্ত্তিক- “গিরৌ ডশ্ছন্দসি”]। এখানে ‘ড’ প্রত্যয়ের ‘ড্’ লোপ পেয়ে ‘অ’ থাকে। ‘ড’ প্রত্যয়টি ‘টি-সংজ্ঞক’ লোপকারী হওয়ায় ‘শী’ ধাতুর ‘ঈ’ কার লোপ পায়। ফলে গিরি + শ্ + অ = গিরিশ। অর্থাৎ- কৈলাস পর্বতে অবস্থানকারী রুদ্র। যা ভাষ্যকারদের ভাষ্য দ্বারা প্রমাণিত।

সুতরাং- ব্যাকরণ, বৈদিক ভাষ্য এবং উপনিষদের সমন্বিত বিচারে এটি প্রমাণিত যে, পরমেশ্বর শিব স্বরূপে প্রাকৃত আকারহীন (নিরাকার) হলেও, তাঁর নিজের দিব্য মায়াশক্তিতে ভক্তের জন্য অপ্রাকৃত মঙ্গলময় শরীর (সাকার রূপ) ধারণ করতে সম্পূর্ণ সমর্থ।

অতএব, কঠোপনিষদের 'অরূপম্' বাক্য ঈশ্বরের জড় বা ভৌতিক রূপকে অস্বীকার করে, কিন্তু তাঁর দিব্য, অপ্রাকৃত এবং ভক্তানুগ্রহকারী সাকার সত্তাকে কোনোভাবেই খণ্ডিত করে না।

শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ এবং যজুর্বেদের শতরুদ্রীয় সূক্তে যখন স্পষ্টাক্ষরে রুদ্রের ‘শিবা তনূ’ মঙ্গলময় শরীর এবং ‘গিরিশন্ত’ কৈলাসনিবাসী রূপের স্তুতি করা হচ্ছে, তখন পাণিনির বিশেষ বৈদিক বার্ত্তিক “গিরৌ ডশ্ছন্দসি” এবং উণাদির “তন্” (শরীর) ধাতুর সূত্রকে আর্যসমাজ কীভাবে খণ্ডন করবে?

পরমেশ্বরের শরীর যদি নাই থাকে, তবে বেদের ‘গিরিশ’ (পর্বতে শয়নকারী) পদের বৈয়াকরণিক বুৎপত্তি কি আর্যসমাজের মতে মিথ্যা ও অর্থহীন?
——————————————————————————————————————————

❌ আর্যসমাজের দাবী ৫ — নিঘন্টু অনুসারে মায়া মানে অলৌকিক শক্তি নয়, প্রজ্ঞা বা বুদ্ধি।


✅ শৈবপক্ষ কর্তৃক খণ্ডন ৫ —​ আচার্য সায়ণও প্রথম পক্ষে ‘মায়া’র অর্থ করেছেন —

“আত্মীয়ৈঃ সংকল্পৈঃ” - ঈশ্বরের নিজের দিব্য সংকল্প বা ইচ্ছা। আর দ্বিতীয় পক্ষে পরমাত্মার ক্ষেত্রে করেছেন — 

"অনাদিমায়াশক্তিভিঃ” অনন্ত অনাদি মায়াশক্তি।

​শাস্ত্রে পরমেশ্বরের সংকল্পই তাঁর শক্তি। পরমেশ্বর যখন সংকল্প করেন “আমি বহু হবো” - “তদৈক্ষত বহু স্যাং প্রজায়েয়েতি” - (ছান্দোগ্য উপনিষদ), তখন তাঁর সেই সংকল্পই আকারে রূপায়িত হয়।

আর্য সমাজ আরও বলছে- একাধিক যজমানের সামনে ঈশ্বর রূপ ধারণ করলে ঈশ্বর অনেকগুলো হয়ে যাবেন, যা বেদের একমেবাদ্বিতীযম্ তত্ত্বের বিরোধী।

আসলে এটি পরমেশ্বরের 'ঐশ্বর্য' সম্পর্কে অজ্ঞতার লক্ষণ। ঈশ্বর কোনো জড় বস্তু নন যে এক টুকরো এখানে থাকলে অন্য টুকরো ওখানে থাকবে।

​যেমন সূর্য আকাশে একটিই, কিন্তু হাজারটা জলের পাত্র রাখলে প্রতিটা পাত্রেই সূর্যের প্রতিবিম্ব পূর্ণরূপে দেখা যায়। সূর্য কি তাতে একাধিক হয়ে যায়? অবশ্যই না। একইভাবে এক পরমেশ্বর তাঁর দিব্য যোগমায়ার দ্বারা একই সাথে অনন্ত কোটি ভক্তের সামনে ভিন্ন ভিন্ন রূপে প্রকাশিত হতে পারেন, অথচ তিনি এক ও অদ্বিতীয়ই থাকেন।

আচার্য সায়ণও বলেছেন -

​“...তস্মাদ্বহুশরীরাণি স্বীকৃত্য যুগপৎ হবিষ্মতো যজমানান্ গচ্ছতীত্যর্থঃ।”

যেহেতু পরমেশ্বরের সহস্র সহস্র অশ্ব বা শক্তি রয়েছে, তাই তিনি একই সাথে বহু শরীর বা রূপ ধারণ করে ভিন্ন ভিন্ন যজমানের যজ্ঞে গমন করেন।

বেদান্ত সূত্র ২/১/৩৭ "সর্বধর্মোপপত্তেশ্চ" অনুযায়ী- ব্রহ্ম বা পরমেশ্বরের ক্ষেত্রে সমস্ত আপাত-বিরোধী ধর্ম (একই সাথে এক হওয়া ও বহু রূপে প্রকাশ পাওয়া) সিদ্ধ হয়।

এক সূর্য যেমন হাজারটি জলপাত্রে নিজেকে পূর্ণরূপে প্রতিবিম্বিত করেও এক ও অদ্বিতীয় থাকে, পরমেশ্বরও যদি তাঁর দিব্যমায়ার দ্বারা একই সাথে বহু যজমানের সামনে প্রকট হন, তবে তাঁর ‘একমেবাদ্বিতীযম্’ তত্ত্ব ক্ষুণ্ণ হয় কীভাবে?

আর্যসমাজ কি পরমেশ্বরকে কোনো জড় বস্তুর মতো মনে করে যে, তিনি এক জায়গায় থাকলে অন্য জায়গায় থাকতে পারবেন না? ব্রহ্মের ক্ষেত্রে সমস্ত আপাত-বিরোধী ধর্ম সিদ্ধকারী ব্যাসদেবের বেদান্তসূত্র “সর্বধর্মোপপত্তেশ্চ” (২/১/৩৭)-কে কি আর্যসমাজ স্বীকার করে না?
——————————————————————————————————————————

❌ আর্যসমাজের দাবী ৬ — দয়ানন্দ সরস্বতী এই মন্ত্রের অর্থ করেছেন জীবাত্মার দশ ইন্দ্রিয় ও শরীর ধারণ।


✅ শৈবপক্ষ কর্তৃক খণ্ডন ৬ — ​মন্ত্রের মূল পাঠ হলো- 

“যুক্তা হ্যস্য হরয়াঃ শতা দশ”।

এখানে দুটি সংখ্যাবাচক শব্দ রয়েছে- ‘শতা’ (শত) এবং ‘দশ’। ব্যাকরণ ও বৈদিক প্রয়োগানুযায়ী এর অর্থ ১০ × ১০০ = ১০০০ (সহস্র)।

​সায়ণাচার্য তাঁর ভাষ্যে স্পষ্ট লিখেছেন-

"শতা দশ সহস্রসংখ্যাকা অপরিমিতাঃ সন্তি”।।

অর্থাৎ- দশ শত অর্থাৎ সহস্র সংখ্যক, যা পরমেশ্বরের অপরিমিত শক্তির প্রতীক।

দয়ানন্দ নিজের মতবাদ মেলাতে গিয়ে এই ‘দশ’ শব্দটিকে আলাদা করে ‘দশ ইন্দ্রিয়’ অর্থ করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো- যদি ‘দশ’ মানে কেবল ১০টি ইন্দ্রিয়ই হয়, তবে পাশে থাকা ‘শতা’ (শত শত) শব্দটির কী গতি হবে? একজন সাধারণ জীবাত্মার কি ‘শত শত’ ইন্দ্রিয় বা শরীর থাকে? আর্যসমাজের নিজস্ব তত্ত্ব অনুযায়ীও জীব একদেশী এবং তার ইন্দ্রিয় সংখ্যা সীমিত (১০ বা ১১টি)। সুতরাং, ‘শতা দশ’ পদটিকে টেনেটুনে কেবল ‘দশ ইন্দ্রিয়’ বানানো ঘোরতর ব্যাকরণগত বিভ্রান্তি।

​মন্ত্রে বলা হয়েছে- “ইন্দ্রো মায়াভিঃ পুরুরূপ ঈয়তে” - ইন্দ্র নিজের শক্তির দ্বারা বহু রূপ ধারণ করে বা বহু রূপে প্রতীয়মান হন।

​আর্যসমাজের সিদ্ধান্ত (ত্রৈতবাদ) অনুযায়ী- জীবাত্মা হলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র (অণু) এবং অল্পজ্ঞ। জীবাত্মার নিজের কোনো স্বাধীন ক্ষমতা নেই যে সে নিজের সংকল্প বা মায়াশক্তির দ্বারা ‘পুরুরূপ’ (একসাথে বহু প্রকার রূপ) ধারণ করতে পারে।

​যদি দয়ানন্দের মত অনুযায়ী জীবাত্মা নিজেই নিজের প্রজ্ঞা বা মায়ায় বহু রূপ ধারণ করতে সমর্থ হয়, তবে ঈশ্বরের ‘সর্বশক্তিমানত্ব’ গুণের আর কোনো উপযোগিতা থাকে না, জীব নিজেই ঈশ্বর হয়ে পড়ে। সুতরাং, ‘পুরুরূপ’ ধারণের এই ক্ষমতা কেবল পরমেশ্বরেরই ঐশ্বর্য বা স্বাতন্ত্র্য শক্তির দ্বারা সম্ভব,জীবের দ্বারা নয়।

​ঋগ্বেদের এই একই ‘হরয়ঃ’ (অশ্ব বা শক্তি) এবং ‘ইন্দ্র’ শব্দের প্রয়োগ অন্য সূক্তে পরমাত্মার অর্থেই সিদ্ধ হয়েছে। যেমন, ​ঋগ্বেদ ২/১৮/৪-৫ মন্ত্রসমূহ- সেখানে ইন্দ্রের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করা হচ্ছে—

"আ দ্বাভ্যাং হরিভ্যাং ইন্দ্র... আ বিংশত্যা ত্রিংশতা যা হ্যর্বাঙ্ আ চত্বারিংশতা হরির্যুজানঃ..." 

অর্থাৎ, হে ইন্দ্র! আপনি দুটি, বিশটি, ত্রিশটি, চল্লিশটি বা শত-সহস্র অশ্বে যুক্ত হয়ে আমাদের যজ্ঞে আসুন।

​এখন দয়ানন্দের যুক্তি অনুযায়ী যদি এখানেও অশ্ব মানে ইন্দ্রিয় বা প্রাণ ধরা হয়, তবে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করা হচ্ছে যে- "হে ঈশ্বর, আপনি ২০টি বা ৪০টি ইন্দ্রিয় নিয়ে আসুন!" যা সম্পূর্ণ হাস্যকর ও অর্থহীন।

​মহর্ষি দয়ানন্দের এই ব্যাখ্যাটি মূলত বেদের সাকার-নিরাকার সমন্বিত পরমাত্মতত্ত্বকে আড়াল করার একটি জোরপূর্বক চেষ্টা মাত্র। ‘শতা দশ’ (সহস্র) শক্তি ও ‘পুরুরূপ’ (অনন্ত রূপ) ধারণের মহিমা কেবল সর্বব্যাপী, সর্বশক্তিমান পরমেশ্বর শিব বা পরমাত্মার ক্ষেত্রেই সর্বাংশে সত্য হতে পারে, কোনো সীমাবদ্ধ জীবাত্মার ক্ষেত্রে নয়।

মন্ত্রের “হরয়ঃ শতা দশ” পদের গাণিতিক অর্থ যেখানে ‘সহস্র’ (১০ × ১০০), সেখানে মহর্ষি দয়ানন্দ কোন বৈদিক ব্যাকরণের জোরে ‘শতা’ (শত শত) শব্দটিকে অপব্যাখ্যা করে কেবল ‘দশ ইন্দ্রিয়’ অর্থ করলেন? 

আর্যসমাজের নিজস্ব মতবাদ অনুযায়ী জীবাত্মা যেখানে ‘অণু’ ও অল্পজ্ঞ, সেখানে জীবাত্মা নিজের মায়ায় ‘পুরুরূপ’ (অনন্ত রূপ) ধারণ করে এই ব্যাখ্যা দিয়ে আপনারা কি জীবাত্মাকেই ‘সর্বশক্তিমান ঈশ্বর’ বানিয়ে দিচ্ছেন না? ঋগ্বেদের ২/১৮/৪ মন্ত্রে ইন্দ্রের ২০ বা ৪০টি অশ্বের কথা বলা হয়েছে, আর্যসমাজের লজিক অনুযায়ী তবে কি ঈশ্বরের ২০ বা ৪০টি ইন্দ্রিয় স্বীকার করতে হবে?
——————————————————————————————————————————

👉 তাহলে উক্ত মন্ত্রের সঠিক অর্থ দেখে নেওয়া যাক —

“রূপং রূপং প্রতিরূপো বভূব তদস্য রূপং প্রতিচক্ষণায়
ইন্দ্রো মায়াভিঃ পুরুরূপ ঈয়তে যুক্তা হ্যস্য হরয়াঃ শতা দশ” ।।

[ঋগ্বেদ/ শাকলশাখা ৬/৪৭/১৮]

পদার্থ- (​রূপে রূপে) = জগতে দৃশ্যমান প্রতিটি রূপ বা আকারের মধ্যে। (​প্রতিরূপঃ) = অনুরূপ আকারধারী বা প্রতিবিম্ব রূপ হয়ে। (​বভূব) = তিনি প্রকট হয়েছেন বা অবস্থান করছেন। (​তৎ) = তাঁর সেই প্রকাশিত রূপটি। (​অস্য) = এই পরমেশ্বরের। (​রূপং) = স্বরূপ বা মহিমা। (​প্রতিচক্ষণায়) = জীবের স্পষ্ট উপলব্ধি বা প্রত্যক্ষ দর্শনের জন্য (হয়ে থাকে)। (​ইন্দ্রঃ) = পরম ঐশ্বর্যময় পরমেশ্বর শিব। (​মায়াভিঃ) = তাঁর নিজের অনাদি মায়াশক্তি এবং দিব্য সংকল্পসমূহের দ্বারা। (​পুরুরূপঃ) = বহু প্রকার রূপ বা অনন্ত আকারবিশিষ্ট হয়ে। (​ঈয়তে) = প্রকাশিত হন বা লীলা করেন। (​যুক্তাঃ) = যুক্ত বা নিয়োজিত রয়েছে। (​হি) = নিশ্চিতভাবেই। (​অস্য) = এই পরমেশ্বরের। (​হরয়ঃ) = অশ্বের ন্যায় অপ্রতিহত গতিশীল অনন্ত শক্তিসমূহ। (​শতা দশ) = দশ শত, অর্থাৎ সহস্র সহস্র (অগণিত)।।

অনুবাদ- সেই পরমেশ্বর জগতের প্রতিটি রূপের মধ্যে অনুরূপ আকার ধারণ করে প্রকট হয়েছেন। পরমেশ্বরের এই রূপ ধারণ মূলত জীবের প্রত্যক্ষ উপলব্ধি বা দর্শনের জন্যই হয়ে থাকে। সেই পরম ঐশ্বর্যময় প্রভু তাঁর নিজের অনাদি মায়াশক্তি ও দিব্য সংকল্পের দ্বারা বহু প্রকার রূপ ধারণ করে প্রকাশিত হন, কারণ নিশ্চিতভাবেই তাঁর রথে বা আশ্রয়ে সহস্র সহস্র অশ্বের ন্যায় অপ্রতিহত গতিশীল অনন্ত শক্তিসমূহ যুক্ত রয়েছে।

যা- সায়ণাচার্যের ব্যাখ্যার সাথে সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ। পক্ষান্তরে দয়ানন্দের ভাষ্য অসঙ্গতিতে পরিপূর্ণ।
——————————————————————————————————————————

✅ উপরোক্ত বৈদিক, বৈয়াকরণিক এবং ভাষ্যগত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এটি প্রমাণিত হয় যে- আর্যসমাজের "ঈশ্বর সাকার হলে তাঁর সর্বব্যাপকত্ব নষ্ট হয়" এই দাবিটি ঈশ্বরের 'ঐশ্বর্য' এবং 'সর্বশক্তিমানত্ব' গুণের পরিপন্থী। পাণিনির সূত্র, মহাভাষ্য এবং সিদ্ধান্তকৌমুদীর নিয়মানুসারে বেদের ‘গিরিশ’ বা ‘গিরিশন্ত’ শব্দের বাচ্যার্থ যেমন সুনির্দিষ্টভাবে পরমেশ্বর শিব, ঠিক তেমনই ঋগ্বেদের ৬/৪৭/১৮ মন্ত্রে সায়ণাচার্যের পরমাত্মা-পরক ভাষ্যও প্রমাণ করে যে, ঈশ্বর নিজের ‘অনাদি মায়াশক্তি’ ও ‘দিব্য সংকল্পের’ দ্বারা ‘পুরুরূপ’ বা সাকার রূপ ধারণ করেন। 

উপনিষদের 'অরূপম্' বাক্য কেবল ঈশ্বরের জড় বা পঞ্চভৌতিক দেহকে অস্বীকার করে, কিন্তু তাঁর দিব্য চিন্ময় তনুকে নয়। অতএব, পরমেশ্বর শিব স্বরূপে সর্বব্যাপী ও নিরাকার হয়েও ভক্তের ‘প্রতিচক্ষণায়’ অর্থাৎ প্রত্যক্ষ উপলব্ধির জন্য সাকার রূপে প্রকট হতে সম্পূর্ণ সমর্থ, আর্যসমাজের রূপক বা গুণবাচক অপব্যাখ্যা বেদের এই ব্যাখ্যার সামনে খড়কুটোর মতো উড়ে যায়।


🙏সর্বে হ্যেষ রুদ্রস্তস্মৈ রুদ্রায় নমো অস্তু🙏

নমঃ শিবায়ৈ 🙏
নমঃ শিবায় 🙏
শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তে ✊🚩

✍️অপপ্রচার দমনে— অন্তিক ভট্টাচার্য্য (শম্বরনাথ শৈব)।

🌻বিশেষ কৃতজ্ঞতা— আমার গুরু শ্রী নন্দীনাথ শৈবাচার্য জী ও আমার আদর্শ শ্রী রোহিত কুমার চৌধুরী শৈবজী।

কপিরাইট ও প্রচারে— Shivalaya…

বি: দ্র:— লেখাটি কপি করলে সম্পূর্ণভাবে করবেন, কোনো রকম কাটছাট করা যাবে না।





শিবঃ ওঁ…….🙏

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ