দ্বৈতবাদী কট্টর নিরামিষাশী ব্যক্তির দ্বারা শৈবাগম শাস্ত্র জালিয়াতি ও অপব্যাখ্যার চরম খণ্ডন
🚩 দ্বৈতবাদী শৈবের শাস্ত্র জালিয়াতি ও অপব্যাখ্যার অবসান, মীমাংসা, পাণিনীয় ব্যাকরণ ও ন্যায়ের দ্বারা অদ্বৈত শৈব [সিদ্ধান্ত]পক্ষ কর্তৃক খণ্ডন —
———————————————————————————————————————————————————
❌ দ্বৈতবাদী পূর্বপক্ষের দাবি — অংশুমান আগমের ২০ নম্বর শ্লোকটি উল্লেখ করে পূর্বপক্ষ দাবি করেছেন যে, সেখানে সরাসরি কেবল পশুবলি দেওয়ার কথাই বলা হয়নি। শ্লোকে 'অথবা' (বিকল্প) হিসেবে চাল-কুমড়ো (কূষ্মাণ্ড) বলির বিধানও দেওয়া আছে। পূর্বপক্ষের উদ্দেশ্যে এটা দেখিয়ে উনি প্রমাণ করতে চান যে, আগমশাস্ত্রে পশুবলি বাধ্যতামূলক নয়, বরং তার বিকল্প হিসেবে উদ্ভিজ্জ বা প্রতীকী বলির পথই বেশি সমর্থিত।
✅ অদ্বৈতবাদী সিদ্ধান্তপক্ষের খণ্ডন — প্রথমত- পূর্বপক্ষ আমাদের বক্তব্যই বুঝতে পারেনি ঠিক কি তর্ক ছিলো আমাদের। আমরা বলেছিলাম- শাস্ত্রে বলির বিধিও আছে আবার নিষেধও আছে। তার সমর্থনেই আমরা ‘অংশুমান' আগমের বচনটির উদ্ধার করেছিলাম এবং বলেছিলাম উক্ত প্রকরণে বলির বিধি দেওয়া রয়েছে। আমরা- পশুবলির বিধি নিয়ে কথা বলছিলাম, বিকল্প নিয়ে নয়৷ আর মীমাংসা ক্ষেত্রে বিকল্পের কথা বলেছিলাম কারণ- শাস্ত্রে পশুবলির বিধি ও নিষেধ দুই আছে। সেক্ষেত্রে বিরোধাভাস না হওয়ার জন্যই বিকল্পের মীমাংসা দিয়েছিলাম৷ কিন্তু, পূর্বপক্ষ যুক্তি, তর্ক না বুঝেই কেবল পশুবলির বিকল্প দেখিয়ে সম্পূর্ণ বিষয়টিকে এড়িয়ে গেলো।
পূর্বপক্ষ শ্লোকটি পড়ার সময় নিজেদের সুবিধামতো 'অথবা' (বিকল্প) শব্দটিকে ব্যবহার করছেন, কিন্তু এর অন্তর্নিহিত যুক্তিটি বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। মহর্ষি পাণিনির অষ্টাধ্যায়ী ব্যাকরণ এবং ন্যায়শাস্ত্রের নিয়ম অনুযায়ী- 'বিকল্প' বা 'অথবা' শব্দটির প্রয়োগ তখনই সিদ্ধ হয়, যখন উভয় পক্ষই সমানভাবে সত্য, বৈধ এবং অস্তিত্বশীল হয়।
শাস্ত্রে যদি 'ক' এর বিকল্প 'খ' বলা থাকে, তবে তার অর্থ হলো- 'ক'-ও সম্পূর্ণ সত্য এবং 'খ'-ও সম্পূর্ণ সত্য।
পূর্বপক্ষ এর আগে দাবি করেছিলেন যে আগমশাস্ত্রে বাস্তব পশুবলির কোনো অনুমোদনই নেই, সব নাকি প্রতীকী! এখন আমার প্রশ্ন- যদি মূল পশুবলির কোনো বৈধতা বা অস্তিত্বই না থাকবে, তবে ঋষি সেখানে 'অথবা' বা বিকল্প শব্দ ব্যবহার করবেন কার বিরুদ্ধে ? শূন্য বা মিথ্যার সাথে কি কখনো কোনো সত্যের বিকল্প হতে পারে? অংশুমান আগমের এই শ্লোকে 'অথবা' শব্দটির উপস্থিতিই প্রমাণ করে দেয় যে- বাস্তব পশুবলি আগমশাস্ত্রে শতভাগ অনুমোদিত এবং সত্য। পূর্বপক্ষ বিকল্পের দোহাই দিতে গিয়ে প্রকারান্তরে বাস্তব বলির সত্যতাকেই স্বীকার করে নিজেদের আগের দাবি খণ্ডন করে ফেলেছেন ! আর এখানেই পূর্বপক্ষ ব্যক্তি নিজেকে স্বয়ং-ই খণ্ডন করে বসে আছেন।
পূর্বপক্ষ দাবি করছেন, প্রতীকী বলির পথই 'বেশি সমর্থিত'। মীমাংসা দর্শনের পরিভাষায় একে 'মুখ্য বিধি' এবং 'অনুকল্প বিধি'-র বিপর্যয় বলা হয়। মীমাংসা অনুযায়ী, শাস্ত্রে প্রথমাংশে যা বিধিত হয় তা হলো 'মুখ্য কল্প'। আর আপৎকালে বা অসমর্থতার কারণে যা বিকল্প দেওয়া হয়, তা হলো 'অনুকল্প'।
অংশুমান আগমের শ্লোকে প্রথমাংশে বলা হয়েছে —
“কুক্কুটাজবরাহাশ্চ তত্তৎস্থানে বলিং দদেৎ”।।
অর্থাৎ- বন্যমোরগ, ছাগল ও শূকরের বলি নির্দিষ্ট স্থানে প্রদান করবে। এটি হলো মূল বা মুখ্য বিধি।
এরপর বলা হয়েছে—
“অথবান্যপ্রকারেণ কূষ্মাণ্ডবলিমাচরেৎ”।।
অথবা অন্য প্রকারে চাল-কুমড়ো বলি দেবে। এটি হলো অনুকল্প বা গৌণ বিধি।
মীমাংসার নিয়ম হল — কোনো সাধক যদি অসমর্থ হন, কিংবা দেশের পরিস্থিতি বা দ্রব্যের অভাব থাকে, তবেই তিনি মুখ্য বিধির বদলে অনুকল্প বা প্রতীকী বিধি (চাল-কুমড়ো) গ্রহণ করতে পারেন। কিন্তু অনুকল্পের উপস্থিতি কখনোই মুখ্য বিধির গুরুত্বকে লঘু বা খণ্ডিত করতে পারে না। মুখ্য বিধি সর্বদা প্রাবল্য বজায় রাখে।
পূর্বপক্ষ কেন এই ভুলটি করছেন ? কারণ, তাঁরা ভাবছেন নিবৃত্তি মার্গ আর প্রবৃত্তি মার্গের নিয়ম এক। অংশুমান আগমের এই বিকল্পটি আসলে 'অধিকার ভেদ'-এর চূড়ান্ত নিদর্শন। যিনি প্রবৃত্তি মার্গী গৃহস্থ বা তান্ত্রিক সাধক, তাঁর জন্য পশু বলির মুখ্য বিধান। আর যিনি পরম সাত্ত্বিক বা নিবৃত্তি মার্গী সাধক, যাঁর হৃদয়ে পশুবধের তীব্র অনিচ্ছা রয়েছে, তাঁর অধিকারকে সম্মান জানিয়ে পরমেশ্বর শিব চাল-কুমড়োর বিকল্প দিয়েছেন। শাস্ত্রে যখন দুই পক্ষকেই স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে, তখন পূর্বপক্ষ কেবল নিজেদের নিবৃত্তি মার্গীয় ‘অনুকল্প’ পক্ষটিকে পরম সত্য বলে প্রচার করছেন, আর অন্য পক্ষের ‘মুখ্য বিধি’কে মহাপাপ বলছেন। ন্যায়শাস্ত্রের ভাষায় একেই বলে 'অর্ধজড়তীয়তা দোষ' বা সুবিধাবাদী বিচার দোষ।
অতএব, অংশুমান আগমের এই শ্লোকটি পূর্বপক্ষের দাবিকে সমর্থন করে না, বরং তাদের দাবিকে সম্পূর্ণ চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়। শ্লোকের 'অথবা' শব্দটুকুই প্রমাণ করে যে বাস্তব পশুবলিবিধান এবং উদ্ভিজ্জ বলি- উভয় পথই পরমেশ্বর শিবের দ্বারা সমানভাবে সিদ্ধ। কারণ, স্থাবর জঙ্গম উভয়ই জীব, উভয়েরই উদ্ধারের জন্য অধিকারী। শুধুমাত্র উদ্ভিদ উদ্ধার হবেন বা পশু উদ্ধার হবেন বলে পক্ষপাতিত্ব নেই পরমেশ্বর শিবের কাছে, তাই উভয় প্রকার বলি মানুষের হৃদয়ের ভিন্ন ভিন্ন ভাব জন্য ভিন্ন ভিন্ন বলি বিধান করা হয়েছে।
আপনাদের নিবৃত্তি মার্গীয় অধিকার অনুযায়ী আপনারা চাল-কুমড়ো বলি দিন, তাতে আমাদের বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই। কিন্তু শিবের দেওয়া 'বিকল্পের স্বাধীনতা'কে অস্বীকার করে, নিজের অনুকল্পকে পরম সিদ্ধান্ত বানিয়ে, শাস্ত্রের মুখ্য বিধিসম্মত বাস্তব আহার বা বলীদানকে 'পাপ বা অধর্ম' বলার ধৃষ্টতা অন্তত করবেন না।"
———————————————————————————————————————————————————
❌ দ্বৈতবাদী পূর্বপক্ষের দাবি — কামিক আগমের (পূর্বভাগ, অধ্যায়-১৯) 'বাস্তুদেবাবলীবিধি পটল' থেকে একটি দীর্ঘ অনুবাদ উপস্থাপন করে উনি দাবি করেছেন যে, সেখানে মৎস্য, বরাহ, মেষ প্রভৃতি শব্দ থাকলেও তার অর্থ প্রকৃত মাছ বা পশুমাংস নয়। আচার্য আটা বা ময়দার প্রতীকী দ্রব্য (পিষ্টক) তৈরি করে ভাবনাপূর্বক নিবেদন করবেন। পূর্বপক্ষের মূল দাবি হলো, আগমশাস্ত্রের কোথাও প্রকৃত পশুহত্যা বা মাছ-মাংস নিবেদনের অনুমোদন নেই, যেখানেই এগুলো বলা আছে, তা আসলে প্রতীকী বা ভাবনার স্তরে নিবেদন করার কথা বলা হয়েছে।
✅অদ্বৈতবাদী সিদ্ধান্তপক্ষের খণ্ডন — পূর্বপক্ষ কামিকাগমের যে অনুবাদটি আমাদের দেখিয়েছিল, তা মূল গ্রন্থের সংস্কৃত শ্লোকের সাথে বিন্দুমাত্র মেলে না। তাঁরা নিজেদের নিরামিষ এজেন্ডা চরিতার্থ করতে মূল আগমের শ্লোকগুলোর অনুবাদ সম্পূর্ণ বিকৃত করেছেন (পূর্বপক্ষ ব্যক্তি বেদের মন্ত্রের অনুবাদ কেও বিকৃত করেছিল শুধুমাত্র নিজেদের নিরামিষা আহারকে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করবার জন্য)। নিচে মূল শ্লোক ধরে ধরে তার জালিয়াতি ও অসঙ্গতি উন্মোচিত করা হলো —
পূর্বপক্ষ দাবি করেছিল যে 'মৎস্য' বা 'মাংস' শব্দ দ্বারা প্রকৃত মাংস বোঝায় না। কিন্তু মূল কামিকাগমের পাঠ দেখুন —
“সামুদ্রং ভৃঙ্গরাজায় মৎস্যং মৎস্যোদনং মৃগে ।।”
(শ্লোক/১৫)
অর্থ- ভৃঙ্গরাজ নামক বাস্তুদেবতাকে 'সামুদ্রং' (সামুদ্রিক মৎস্য বা লোনা মাছ) এবং মৃগ নামক দেবতাকে 'মৎস্যোদনং' (মাছ-ভাত বা মৎস্যযুক্ত অন্ন) বলি দেবে।
“বারাহং তু বলৌ মাংসং অসুরায় প্রদাপয়েৎ।।”
(শ্লোক/২৩)
অর্থ- অসুর নামক দেবতাকে বলিরূপে 'বারাহং মাংসং' (বরাহ বা বুনো শূকরের মাংস) প্রদান করতে হবে।
“রোগায় শুষ্ক মৎস্যান বৈ...”
(শ্লোক/২৫)
অর্থ- রোগ নামক দেবতাকে বলিরূপে 'শুষ্ক মৎস্যান' (শুটকি মাছ) প্রদান করবে।
“রুদ্রায় মাংসান্নং স্যাৎ...”
(শ্লোক/৩২)
অর্থ- রুদ্র নামক দেবতাকে বলিরূপে 'মাংসান্নং' (মাংসযুক্ত অন্ন বা মাংস-ভাত) দিতে হবে।
পূর্বপক্ষের কাছে আমাদের সোজা প্রশ্ন- 'বারাহং মাংসং' (শূকরের মাংস) এবং 'শুষ্ক মৎস্য' (শুটকি মাছ) বলতে আটা-ময়দার কোন প্রতীকী রূপ বোঝায়? ময়দা দিয়ে কি শুটকি মাছ তৈরি করা হয়? 'বারাহং মাংসং' পদের ব্যাকরণগত অর্থ "বরাহ বা শূকরের মাংস" ছাড়া অন্য কিছু করা কি স্বয়ং শিবের শব্দার্থকে বিকৃত করা নয়?
কামিকাগমে পরমেশ্বর শিব স্পষ্ট করে বলে দিচ্ছেন যে- কোন স্থানে বা কার গৃহে কেমন বলি দিতে হবে। কিন্তু, পূর্বপক্ষ এই শ্লোকটি সম্পূর্ণ চেপে গেছেন।
“হবিষ্যং দেবভবনে মাংসান্নং রাজমন্দিরে ।।
মদ্যং শূদ্রগৃহে প্রোক্তং অন্যত্র মধুকল্পয়েৎ ।।”
(শ্লোক/৪৫-৪৬)
অর্থ- দেবভবনে বা মন্দিরে বলির দ্রব্য হবে 'হবিষ্য' (ঘৃতান্ন)। কিন্তু রাজমন্দিরে (ক্ষত্রিয়দের রাজপ্রাসাদে বা দুর্গে) বলির দ্রব্য হবে 'মাংসান্নং' (মাংসযুক্ত অন্ন)। এবং শূদ্রের গৃহে বাস্তুযাগের বলি হবে 'মদ্যং' (মদ্য বা মদ), এই দুটি স্থান ছাড়া অন্য সাধারণ গৃহস্থের ক্ষেত্রে মধুর (প্রতীকী মধু) কল্পনা করবে।
এই শ্লোকটি পূর্বপক্ষের দাবিকে মিথ্যা প্রমাণিত করে। পরমেশ্বর শিব স্বয়ং বলছেন - রাজপ্রাসাদে মাংস এবং শূদ্রের ঘরে মদ্য দিয়ে বলি দিতে হবে। যদি মদ্য বা মাংসের বাস্তব অস্তিত্বই না থাকবে, তবে শিব এখানে বর্ণ বা স্থানভেদে হবিষ্য, মাংস ও মদ্যের আলাদা আলাদা বিধান কেন দিলেন ? শিবের এই স্পষ্ট সামাজিক ও তান্ত্রিক শ্রেণীবিন্যাসকে অস্বীকার করা কি চরম ধৃষ্টতা নয় ? — পূর্বপক্ষ কি আগমদূষক নন ?
পূর্বপক্ষ দেখিয়েছিলেন যে, মৎস্য বা মাংসের পরিবর্তে সর্বত্রই ময়দার পিষ্টক ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু মূল সংস্কৃত শ্লোকটি দেখুন —
“মৎস্যার্থং চৈব মাংসার্থং পিষ্টং বাপি কল্পয়েৎ” ।।
(শ্লোক/৪৭)
এখানে 'বাপি' (বা + অপি) পদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 'বাপি' শব্দের অর্থ হলো "অথবা" বা "পছন্দানুযায়ী"।
শ্লোকের ব্যাকরণগত অর্থ হলো- "মৎস্য এবং মাংসের পরিবর্তে (যদি তা না পাওয়া যায় বা দিতে অনিচ্ছা থাকে), তবে পিষ্টকও (ময়দার প্রতীক) কল্পনা বা তৈরি করা যাইতে পারে।"
এখানে 'বাপি' বা 'অথবা' শব্দটিই প্রমাণ করে দেয় যে- মূল বিধানটি বাস্তব মৎস্য ও মাংসেরই ছিল! যদি মূল মৎস্য-মাংস নিষিদ্ধই হতো, তবে ঋষি "এর পরিবর্তে আটার পিষ্টক করা যেতে পারে (বাপি)" এই বিকল্পের কথা বলতেনই না। পূর্বপক্ষ এই 'বাপি' (বিকল্প) শব্দের আসল অর্থ লুকিয়ে রেখে সাধারণ মানুষকে বোকা বানাতে চেয়েছিল যে- আগম নাকি মাংস নিষিদ্ধ করে কেবল পিষ্টকের কথাই বলেছে!
আপনারা যে অনুবাদ দেখিয়ে অদ্বৈতবাদী শৈবদের অপমান করতে চেয়েছিলেন, সেই কামিকাগমের মূল শ্লোকই তো আপনাদের মুখোশ টেনে খুলে দিল! কামিকাগমের ১৫, ২৩ ও ২৫ নম্বর শ্লোকে যে 'শুষ্ক মৎস্য' (শুটকি মাছ), 'বারাহং মাংসং' (শূকরের মাংস) এবং ৪৫-৪৬ নম্বর শ্লোকে যে রাজপ্রাসাদে 'মাংসান্ন' ও শূদ্রগৃহে সরাসরি 'মদ্য' নিবেদনের স্পষ্ট বিধিবাক্য রয়েছে, তাকে আপনারা আটা-ময়দা বলে কোন বুদ্ধিতে অনুবাদ করলেন ?
আপনারা নিজেদের নিরামিষ সংকীর্ণতাকে ঢাকতে স্বয়ং শিবের আগমশাস্ত্রের বিকৃত ও জাল অনুবাদ তৈরি করে প্রচার করছেন ! ছিঃ ছিঃ ছিঃ! শৈব আগমকেও দূষিত করলেন !
শাস্ত্রে মৎস্য-মাংস না পাওয়া গেলে বা দিতে অনিচ্ছা থাকলে 'বাপি' (অথবা) হিসেবে পিষ্টকের বিকল্প দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মূল বিধি যে বাস্তব মাংস ও মৎস্যেরই ছিল, তা এই কামিকাগমই প্রমাণ করে দিল। পরমেশ্বর শিবের শাস্ত্র কে নিয়ে জালিয়াতি করে নিজেদের শুদ্ধ দাবী করা বন্ধ করুন, আর সত্যকে স্বীকার করতে শিখুন !
"পূর্বপক্ষ দাবি করেছেন যে — কামিক আগমে উল্লিখিত 'মৎস্যোদনম্' (মৎস্য + ওদন) বা 'মাংসান্নম্' (মাংস + অন্ন) শব্দগুলোর অর্থ প্রকৃত মাছ বা মাংস নয়, এগুলি নাকি কেবল ময়দার তৈরি কাল্পনিক বা প্রতীকী দ্রব্য।
পূর্বপক্ষের এই দাবিটি কেবল অসত্যই নয়, বরং স্বয়ং মহর্ষি পাণিনির অষ্টাধ্যায়ী ব্যাকরণ এবং কাশিকা বৃত্তির নিয়ম অনুযায়ী সম্পূর্ণ অসম্ভব ও ব্যাকরণবিরুদ্ধ।
মহর্ষি পাণিনির অষ্টাধ্যায়ী সূত্রের নিয়ম অনুসারে- কামিক আগমের ১৫ নম্বর শ্লোকে ব্যবহৃত ‘মৎস্যোদনম্’ এবং ৩২ নম্বর শ্লোকে ব্যবহৃত ‘মাংসান্নম্’ পদগুলি অত্যন্ত স্পষ্ট তৎপুরুষ সমাস। এই সমাসটি নিষ্পন্ন হয় পাণিনির “অন্নেন ব্যঞ্জনম্” (২/১/৩৪) সূত্র দ্বারা।
এই সূত্রের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কাশিকা বৃত্তি-তে স্পষ্ট বলা হয়েছে —
“সংস্কার্যমন্নম্, সংস্কারকং ব্যঞ্জনম্। বৃত্তাবুক্রিয়ায়া অন্তর্ভাবাদন্নব্যঞ্জনয়োঃ সামর্থ্যম্”।।
কাশিকা অনুযায়ী — অন্ন (ভাত বা মূল খাদ্য) হলো যাকে সংস্কৃত বা প্রস্তুত করা হবে (সংস্কার্য), আর ব্যঞ্জন (উপকরণ বা স্বাদবর্ধক উপাদান) হলো যা দিয়ে অন্নটিকে সুস্বাদু বা মিশ্রিত করা হবে (সংস্কারক)। যেমন- 'দধ্যোদনঃ' (দই-ভাত)। এখানে দই একটি বাস্তব সংস্কারক দ্রব্য, যা ভাতের সাথে মিশ্রিত হয়ে তার স্বাদ বাড়ায়।
কাশিকা স্পষ্ট করছে যে, সমাসবদ্ধ পদে ক্রিয়ার (মাখানো বা মিশ্রিত করার ক্রিয়া) অন্তর্ভাব থাকায় অন্ন ও ব্যঞ্জনের মধ্যে বাস্তব 'সামর্থ্য' বা সম্বন্ধ তৈরি হয়।
পাণিনির এই সূত্র এবং কাশিকার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী — কোনো কাল্পনিক বা কৃত্রিম প্রতীকী বস্তু কখনো বাস্তব অন্নের 'সংস্কারক' বা ব্যঞ্জন হতে পারে না। কামিক আগমের শ্লোকে যখন 'মৎস্যোদনম্' (মৎস্য + ওদন) বা 'মাংসান্নম্' (মাংস + অন্ন) বলা হচ্ছে, তখন পাণিনির সূত্রানুসারে 'মৎস্য' এবং 'মাংস' হলো সংস্কারক ব্যঞ্জন এবং 'ওদন/অন্ন' হলো সংস্কার্য।
বাস্তব দই ছাড়া যেমন 'দধ্যোদন' (দই-ভাত) তৈরি হওয়া অসম্ভব, বাস্তব ঘি ছাড়া যেমন 'ঘৃতোদন' (ঘি-ভাত) কল্পনা করা যায় না, তেমনই বাস্তব মৎস্য বা মাংসের সংযোগ ছাড়া 'মৎস্যোদন' বা 'মাংসান্ন' পদের উৎপত্তিই ব্যাকরণগতভাবে সিদ্ধ হয় না।
ময়দার তৈরি বা কাল্পনিক কোনো মাছ-মাংস দিয়ে বাস্তব চালের তৈরি ভাতের 'সংস্কার' বা মিশ্রণ করা ব্যাকরণগত সামর্থ্যের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। সুতরাং, এই পদগুলির দ্বারা বাস্তব মাছ বা মাংসের উপস্থিতি ব্যাকরণগতভাবেই পূর্বনির্ধারিত।
———————————————————————————————————————————————————
❌ দ্বৈতবাদী পূর্বপক্ষের দাবি — পূর্বপক্ষের এই প্রতীকী বলির তত্ত্বটিকে বৈদিক প্রমাণের সাথে যুক্ত করতে উনি মনুস্মৃতির পঞ্চম অধ্যায়ের ৩৭ নম্বর শ্লোকটি উদ্ধৃত করেছেন। যেখানে বলা হয়েছে, মাংস খাওয়ার তীব্র ইচ্ছা থাকলে ঘৃতপশু (ঘি দিয়ে তৈরি) বা পিষ্টপশু (চালের গুঁড়ো দিয়ে তৈরি) বানিয়ে খাওয়া উচিত, কিন্তু রসনাতৃপ্তির জন্য প্রকৃত পশুবধ করা উচিত নয়। পূর্বপক্ষ দেখাতে চান যে কেবল আগম নয়, স্বয়ং বেদ-স্মৃতি শাস্ত্রের মধ্যেও পশুবলি বা পশুহত্যার চরম বিরোধ রয়েছে এবং সেখানেও প্রতীকী পশুর কথাই বলা হয়েছে।
✅ অদ্বৈতবাদী শৈব পক্ষের (সিদ্ধান্ত) দ্বারা খণ্ডন — পূর্বপক্ষ মনুস্মৃতির ৫/৩৭ শ্লোক উদ্ধৃত করে দাবি করেছেন যে, বেদ ও স্মৃতিশাস্ত্রে পশুবলির চরম বিরোধ রয়েছে এবং সেখানে কেবলই প্রতীকী (ঘৃতপশু বা পিষ্টপশু) বলির কথাই বলা হয়েছে।
পূর্বপক্ষ যে শ্লোকটি (৫/৩৭) দেখিয়েছেন, সেটি মূলত "বৃথা পশুহত্যা" (যজ্ঞ বা দেবপূজার উদ্দেশ্যে পশু বধ না করে, কেবলমাত্র নিজের রসনাতৃপ্তির জন্য করা হত্যাকে এখানে) নিষেধ করার জন্য প্রযুক্ত হয়েছে। শ্লোকটির শেষাংশেই বলা আছে- “ন ত্বেব তু বৃথা হন্তুং পশুমিচ্ছেৎকদাচন” - বৃথা পশুবধ কখনো করবে না।
কিন্তু যেখানে যজ্ঞ বা শাস্ত্রীয় বিধির প্রসঙ্গ রয়েছে, সেখানে মনু স্বয়ং বাস্তব পশুবলির নির্দেশ দিয়েছেন। এর ঠিক পরের শ্লোকগুলোতেই মনু স্পষ্ট বলছেন-
“যজ্ঞার্থং পশবঃ সৃষ্টাঃ স্বয়মেব স্বয়ম্ভুবা। যজ্ঞোঽস্য ভূত্যৈ সর্বস্য তস্মাদ্ যজ্ঞে বধোঽবধঃ ॥” (মনুস্মৃতি, ৫/৩৯)
অর্থাৎ, স্বয়ম্ভূ ব্রহ্মা যজ্ঞের উদ্দেশ্যেই পশু সৃষ্টি করেছেন। যজ্ঞের কল্যাণের জন্য যে পশুবধ, তা আসলে বধ বা হিংসা নয়।
অর্থাৎ সেই বিধিবৎ পশুবধ করে তার মাংস আহার করাকে — ‘অহিংসা’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এমনকি একই অধ্যায়ের ৪১ নম্বর শ্লোকে মনু অত্যন্ত স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বাস্তব পশুবধের বিধান দিয়েছেন-
“মধুপর্কে চ যজ্ঞে চ পিতৃদ্বৈবতকর্মণি। অত্রৈব পশবঃ হিংস্যাঃ নানহোত্যব্রবীন্মনুঃ ॥” (মনুস্মৃতি, ৫/৪১)
অর্থাৎ, মধুপর্ক আচারে, যজ্ঞে এবং পিতৃপুরুষ বা দেবতাদের উদ্দেশ্যে শ্রাদ্ধাদিকর্মে পশুবধ কর্তব্য। অন্যথা করা উচিত নয়, ইহা স্বয়ং মনুর ঘোষণা।
মীমাংসা ও ন্যায়শাস্ত্রের নিয়ম হলো- "উৎস্বর্গ" (সাধারণ নিষেধ) এবং "অপবাদ" (বিশেষ বিধি)। উৎস্বর্গ (সাধারণ নিয়ম) হলো- "মা হিংস্যাৎ সর্বা ভূতানি" কোনো জীবকে হিংসা করবে না। এটি সাধারণ মানুষের সাধারণ জীবনের জন্য নিয়ম। অপবাদ (বিশেষ নিয়ম) হল — "অগ্নিষোমীয়ং পশুমালভেত" যজ্ঞে অগ্নি ও সোমের উদ্দেশ্যে পশুবলি দেবে। এটি যজ্ঞ ও শাস্ত্রীয় বিধানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বিশেষ নিয়ম।
শাস্ত্রে নিয়ম হল — বিশেষ বিধি (অপবাদ) সর্বদা সাধারণ নিষেধকে (উৎস্বর্গ) খণ্ডিত করে। অতএব, সাধারণ ক্ষেত্রে পশুবধ হিংসা ও পাপ হলেও, যজ্ঞের বা দেবপূজার বেদ-বিহিত পশুবলি হিংসা বা পাপ নয়। পূর্বপক্ষ সাধারণ নিষেধের নিয়মটিকে জোরপূর্বক বিশেষ বৈদিক বিধির ওপর চাপিয়ে দিয়ে শাস্ত্রীয় নিয়মের মারাত্মক অবমাননা করছেন।
স্বয়ং মহর্ষি ব্যাসদেব উত্তর মীমাংসা শাস্ত্র অর্থাৎ বেদান্ত সূত্রের (ব্রহ্ম সূত্রে) ৩.১.২৫ নং সূত্রে বলছেন -
" অশুদ্ধমিতি চেন্ন শব্দাৎ " ॥ ২৫ ॥
[তথ্যসূত্র : মহর্ষি ব্যাসদেব রচিত ব্রহ্মসূত্র (উত্তর মীমাংসা)/ ৩/ ১/ ২৫]
পদ বিশ্লেষণ - অশুদ্ধং (পাপ, দোষ) ইতি (ইহা) চেৎ (যদি) ন (না) শব্দাৎ (শ্রুতি হতে শব্দ- প্রমাণ)
সূত্রার্থ - যজ্ঞের (উপাসনা বিশেষ) নিমিত্ত পশুহিংসা (হত্যা) দোষযুক্ত/ অশুদ্ধ - ইহা অমান্য, কারণ শ্রুতিতেই (বেদ শাস্ত্রে) যজ্ঞে পশু আহুতির শব্দ-প্রমাণ পাওয়া যায়।
আলোচ্য সূত্রের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে মহামান্য শৈব আচার্য্য শ্রীপতি পণ্ডিতারাধ্য তাঁর ব্রহ্মসূত্র শ্রীকর ভাষ্যে বলছেন —
" ন হিংসা সর্বভূতানি " - ইহা কখনোই হিংসা নয় কেননা, " অগ্নিষোমীযং পশুমালভেত ", " ভাগস্য বপাযমেব সোনুব্রুহী " - ইত্যাদি শ্রুতি বাক্য মতে অগ্নিষ্টোম (যজ্ঞ) কার্যে পশু হত্যা বৈধ। " বাযব্যংশ্বেতমালভেতে " (বায়ুদেবের উদ্যেশ্যে শ্বেত অশ্বের আহুতি প্রদান) ইত্যাদি শ্রুতি দ্বারা উপাসনার্থে (যজ্ঞে) পশুহত্যা এর পাপজনকত্ব খণ্ডিত/ নিরসিত হয়। " হিরণ্যশরীর ঊর্ধ্বঃ স্বর্গং লোকমেতী (স্বর্ণ শরীর প্রাপ্ত করে স্বর্গে গমন) ", " ন বা উ এতন্ম্রিযসে নরিষ্যসি দেবান্ ইদেপি পথিভিস্সুগেভিঃ " - ইত্যাদি শ্রুতি বাক্য দ্বারা আহুতিকৃত পশুর স্বর্ণদেহ প্রাপ্তি, স্বর্গলোক প্রাপ্তি, দেবতালোক প্রাপ্তি ইত্যাদি সিদ্ধ হয়।
যেখানে- শৈব আচার্য ব্যাসদেব স্বয়ং পশুবলিকে হিংসা মনে করেন না, সেখানে শাস্ত্র ও আচার্য বচনের দোহাই অহিংসার মালা জপ করা কতটা শাস্ত্রীয় ও যৌক্তিক তার উপর প্রশ্ন থেকেই যায়। এবার কি তবে পূর্বপক্ষ ব্যক্তিবর্গ আচার্যের বিরোধ করবেন ? কারণ পূর্বপক্ষেরই দাবি ছিলো ধর্ম পালনে আচার্যের বচনও মান্য। এখন কি তবে পূর্বপক্ষ আচার্য বাক্যকে অমান্য করবেন ?
পূর্বপক্ষকে আমাদের প্রশ্ন — আপনারা মনুস্মৃতির ৫/৩৭ নম্বর শ্লোকটি দেখালেন, কিন্তু তাঁর ঠিক পরের ৫/৩৯ এবং ৫/৪১ নম্বর শ্লোকগুলো কেন নিঃশব্দে চেপে গেলেন ? যেখানে স্বয়ং মনু বলছেন ‘যজ্ঞে বধোঽবধঃ’ (যজ্ঞের পশুবধ হিংসা নয়) এবং যজ্ঞে ও শ্রাদ্ধে ‘পশুন্ হন্যান্মধু’ (পশুবধ কর্তব্য)? একটি খণ্ডিত শ্লোক দেখিয়ে সমগ্র মনুস্মৃতি ও বেদের বিধিবাক্যকে উড়িয়ে দেওয়ার এই অসৎ প্রচেষ্টা বন্ধ করুন !
———————————————————————————————————————————————————
❌ দ্বৈতবাদী পূর্বপক্ষের দাবি — পূর্বপক্ষ দাবি করেছেন যে, শৈবদীক্ষাপ্রাপ্ত শিবাচার্য বা সিদ্ধান্ত মার্গী আচার অনুযায়ী এই প্রতীকী বা সাত্ত্বিক বলির নিয়মটিই একমাত্র প্রামাণ্য পথ। পূর্বপক্ষ বলতে চেয়েছেন যে যারা বাস্তব বলীবিধানকে শাস্ত্রসম্মত বলে প্রচার করছে, তারা আসলে সিদ্ধান্ত মার্গের শাস্ত্রীয় বিধানের 'অর্থের অনর্থ' ঘটিয়ে তাকে জোরপূর্বক অদ্বৈত মার্গীয় বা অন্য কোনো তামসিক আচার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে।
✅ অদ্বৈতবাদী সিদ্ধান্তপক্ষের খণ্ডন — শৈবাগম কোনো একক বা সংকীর্ণ গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। স্বয়ং পরমেশ্বর শিব সমস্ত মানবের আধ্যাত্মিক অধিকার অনুসারে ত্রিবিধ আগম শাস্ত্রের প্রকাশ ঘটিয়েছেন- দ্বৈত (সিদ্ধান্ত), দ্বৈতাদ্বৈত এবং অদ্বৈত।
যাঁরা গৃহত্যাগী নিবৃত্তি মার্গী বা সম্পূর্ণ বৈরাগ্যবান (দ্বৈত বা অদ্বৈত) সাধক, তাঁদের জন্য আর্থিক সামর্থ্যের অভাবে বা বাহ্যিক বস্তুর উপর নির্ভরশীলতার ভাব ত্যাগের কারণে নিজের অন্তরের অভ্যন্তরীণ মানসিক প্রতিকী বলি প্রযোজ্য। যারা পশু বলি দিতে মানসিক ভাবে বা আর্থিকভাবে অসমর্থ্য তাদের জন্য সিদ্ধান্ত মার্গের উক্ত বিকল্প বলিপূজা প্রশস্ত। কিন্তু যাঁরা প্রবৃত্তি মার্গী, বীরাচারী বা অদ্বৈত ভাবধারার অনুসারী তথা তাতে মানসিক, শারিরীক ও আর্থিকভাবেও সাবলীল, তাঁদের জন্য বীর কৌল- শৈব বা শাক্ত আগমের তান্ত্রিক বাস্তব বলী ও পঞ্চতত্ত্বের বিধান সমানভাবে সত্য ও পরমেশ্বর শিবের দ্বারা সমর্থিত।
একটি বিশেষ মার্গের নিয়মকে (দ্বৈত সিদ্ধান্ত শৈব) সমস্ত মার্গের ওপর একচেটিয়া পরম সিদ্ধান্ত হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া এবং অদ্বৈত মার্গের বিধিবিহিত বাস্তব আচারকে 'তামসিক' বা 'অপপ্রচার' বলা আদতে স্বয়ং শিবের মুখনিঃসৃত অন্যান্য শিবোক্ত আগমসমূহকেই প্রকারান্তরে 'তামসিক' বা 'অশাস্ত্রীয়' বলে অপমান করার নামান্তর মাত্র।
পূর্বপক্ষ কামিকাগমের যে অনুবাদটি তুলে ধরেছেন, সেখানে স্পষ্ট বলা আছে — শৈবদীক্ষাপ্রাপ্ত শিবাচার্যরাই বাস্তুযাগের প্রধান অধিকারী। কিন্তু সেই একই কামিকাগমের মূল পাঠেই যখন রাজপ্রাসাদের জন্য বাস্তব 'মাংসান্ন' এবং শূদ্রের গৃহের জন্য বাস্তব 'মদ্য' বলির স্পষ্ট অনুশাসন দেওয়া হয়েছে, তখন সেই শিবাচার্যরাই তো সেই বিধান সম্পন্ন করবেন!
অর্থাৎ, শৈবদীক্ষাপ্রাপ্ত আচার্য বলতেই যে, তিনি কেবল নিরামিষ বা প্রতীকী বলি দেবেন, এমন কোনো একপাক্ষিক নিয়ম শাস্ত্রে নেই। বরং দীক্ষিত শিবাচার্য বা দেশিক শাস্ত্রের বিধি অনুযায়ী স্থান, কাল এবং অধিকার বিচার করে বাস্তব বা প্রতীকী উভয় প্রকার বলিকর্মই সম্পন্ন করার সার্বভৌম অধিকারী।
প্রথমত - লক্ষণের (সিদ্ধান্তের) ব্যাপ্তি যদি লক্ষ্যের (সমগ্র শৈব শাস্ত্রের) কেবল একভাগে থাকে এবং অন্য ভাগে না থাকে, তবে তাকে অব্যাপ্তি দোষ বলে। পূর্বপক্ষ কেবল সিদ্ধান্ত শৈব বা দ্বৈতবাদের একটি নির্দিষ্ট আচারকে সমগ্র শিব-পরম্পরা বা শৈবধর্মের একমাত্র লক্ষণ বা পরিভাষা হিসেবে সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন। শিবের সুবিশাল অদ্বৈত শৈব তথা বীরাচারী শৈব ধারাকে এই সংজ্ঞার বাইরে রেখে দেওয়ার কারণে উনাদের দাবিটি ন্যায়শাস্ত্র অনুযায়ী মারাত্মক “অব্যাপ্তিদোষে” দুষ্ট।
দ্বিতীয়ত — পূর্বপক্ষ শিবের মুখনিঃসৃত কামিকাগম থেকে নিজেদের পছন্দের 'প্রতীকী বলি'র অংশটুকুকে পরম সত্য বলে মাথায় তুলে নিচ্ছেন, কিন্তু একই কামিকাগমের যেখানে রাজভবনে বাস্তব 'মাংসান্ন' বা শূদ্রগৃহে 'মদ্য' বলির সরাসরি শিববচন রয়েছে, সেটিকে 'তামসিক' বলে বর্জন বা অস্বীকার করছেন। শিবের এক বচন মানা এবং অন্য বচনকে অস্বীকার করার এই দ্বিচারিতা ন্যায়শাস্ত্রে “অর্ধজড়তীয়তাদোষে” দুষ্ট।
তৃতীয়ত — যেখানে যুক্তি বা হেতুটি সাধ্যকে প্রমাণ করতে অসমর্থ বা ভ্রান্ত হয়, তাকে হেত্বাভাস বলে। পূর্বপক্ষ ব্যক্তি প্রমাণ করতে চাইছেন যে আগমে বাস্তব বলির বৈধতা নেই (সাধ্য)। আর এর সপক্ষে তিনি হেতু বা যুক্তি দিচ্ছেন যে "বাস্তুযাগে প্রতীকী বলির বিধান আছে"। কিন্তু বাস্তুযাগের একটি বিশেষ বিধান দিয়ে সমগ্র শিবপূজার বাস্তব বলিদানকে অবৈধ প্রমাণ করা যায় না। এটি যুক্তির ক্ষেত্রে 'বাধিত হেত্বাভাস' বা ভুল দৃষ্টান্ত প্রয়োগের দোষ।
চতুর্থত — যখন সিদ্ধান্তকে প্রমাণ করার জন্য প্রমাণের আশ্রয় নিতে হয়, আবার সেই প্রমাণকে সত্য করতে সিদ্ধান্তেরই আশ্রয় নিতে হয় তাকে 'অন্যোন্যাশ্রয় দোষ' বলে । পূর্বপক্ষ দাবি করছেন যে তাঁদের নিরামিষ বা প্রতীকী আচারই পরম শাস্ত্রসম্মত, কারণ তাঁরা সিদ্ধান্ত মার্গী। আবার বলছেন তাঁরা সিদ্ধান্ত মার্গী বলেই তাঁদের এই প্রতীকী আচারটিই একমাত্র পরম সত্য। এটি সম্পূর্ণ গোলাকার যুক্তি বা অন্যোন্যাশ্রয় দোষ।
পূর্বপক্ষকে আমাদের বিনীত জিজ্ঞাসা- আপনারা শৈবদীক্ষাপ্রাপ্ত শিবাচার্যের দোহাই দিয়ে শিবেরই অদ্বৈত শৈব পরম্পরাকে 'তামসিক' বা 'অপপ্রচার' বলছেন কোন সাহসে ? শিবের শাস্ত্রে যে 'অধিকার ভেদ' রয়েছে, তা স্বীকার না করা কি আপনাদের শাস্ত্রীয় গোঁড়ামি নয় ?
ন্যায়শাস্ত্রের নিয়মানুযায়ী — আপনাদের এই একপাক্ষিক দাবিটি অব্যাপ্তি দোষ এবং অর্ধজরতী দোষে জর্জরিত। শিবের কামিকাগম থেকে আপনাদের পছন্দের প্রতীকী অংশটুকু নেবেন, আর রাজমন্দিরে 'মাংসান্ন' বা শূদ্রগৃহে 'মদ্য' বলির স্পষ্ট শিববচনকে এড়িয়ে যাবেন, এই সুবিধাবাদী বিচার আর যা-ই হোক, শাস্ত্রীয় নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত হতে পারে না। নিজের অধিকার অনুযায়ী শান্ত হয়ে নিজের পূজা করুন, কিন্তু পরমেশ্বর শিবের সমগ্র শাস্ত্রীয় বৈচিত্র্য ও অধিকার ভেদকে 'তামসিক' বলে শিবনিন্দা করার ধৃষ্টতা অন্তত দেখাবেন না !
———————————————————————————————————————————————————
🔵 ন্যায়সূত্রের পরিপ্রেক্ষিত—
“প্রতিজ্ঞা-হেতু-দাহরণ-উপনয়ন-নিগমনানি অবয়বাঃ।”
[ন্যায়/১/১/৩২]
“প্রতিজ্ঞা (দাবি), হেতু (কারণ), উদাহরণ, উপনয় (প্রয়োগ), নিগমন (উপসংহার) এই পাঁচটি যুক্তির অঙ্গ।”
এই পাঁচটি অঙ্গ উপস্থিত না থাকলে সেই যুক্তি ত্রুটিযুক্ত বলে বিবেচিত হয়। যেখানে প্রতিজ্ঞা (দাবি) থাকলেও হেতু বা উদাহরণ না থাকে, সেখানে সেই যুক্তিকে বলা হয় “অননুগ্রাহ্য প্রতিজ্ঞা”।
পূর্বপক্ষ যে প্রতিজ্ঞাটি করেছেন — "আগমশাস্ত্রে বাস্তব বলিদান বা মৎস্য-মাংস নিবেদনের বিধান নেই, তা কেবলই আটা-ময়দার প্রতীকী ক্রিয়া" তা পঞ্চাবয়ব ন্যায়ের দ্বারা বিচার করলে খণ্ডিত ও অননুগ্রাহ্য প্রমাণিত হয় —
◾প্রতিজ্ঞা — “পূর্বপক্ষের উপস্থাপিত সিদ্ধান্তটি অননুগ্রাহ্য (অগ্রহণযোগ্য ও অপ্রমাণিত)।”
এটি আমাদের প্রতিজ্ঞা, যা আমরা প্রমাণ করতে চলেছি যে- পূর্বপক্ষের দাবিটি শাস্ত্রীয় ও যৌক্তিক বিচারে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য।
◾হেতু — “যেহেতু এই সিদ্ধান্তটি শিবোক্ত শাস্ত্রের আক্ষরিক বিধি (অভিধাবৃত্তি), ব্যাকরণগত সামর্থ্য এবং অধিকারভেদের সামগ্রিক ব্যবস্থার বিরোধী।”
কেন অগ্রাহ্য ? কারণ পূর্বপক্ষের দাবিটি শাস্ত্রের মূল বিধিবাক্য, পাণিনীয়সূত্র এবং শিবের সর্বজ্ঞতার সাথে সাংঘর্ষিক।
◾দৃষ্টান্ত — “যাহা যাহা শাস্ত্রীয় আক্ষরিক বিধি, ব্যাকরণগত সামর্থ্য এবং অধিকারভেদের সামগ্রিক ব্যবস্থার বিরোধী হয়, তাহা তাহাই অননুগ্রাহ্য বা অপ্রমাণিত হয়, যেমন- বৌদ্ধ বা চার্বাকদের বেদ-বিরোধী সিদ্ধান্ত।”
কামিকাগমের মূল পাঠের ১৫, ২৩, ২৫ ও ৩২ নম্বর শ্লোকে সরাসরি বাস্তব ‘বারাহং মাংসং’ (শূকরের মাংস), ‘শুষ্ক মৎস্য’ (শুটকি মাছ) ও ‘মাংসান্নম্’-এর স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে। এবং পাণিনির “অন্নেন ব্যঞ্জনম্” (২/১/৩৪) সূত্রানুসারে বাস্তব মাছ-মাংস ছাড়া ‘মৎস্যোদন’ বা ‘মাংসান্ন’ পদের উৎপত্তিই ব্যাকরণবিরুদ্ধ। যা এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে, তা চার্বাকদের প্রত্যক্ষবাদী গোঁড়ামির মতোই প্রমাণহীন ও অননুগ্রাহ্য।
◾উপনয় — “পূর্বপক্ষের এই দাবিটিও- যেখানে কামিকাগমের স্পষ্ট মাংস ও মদ্যের আক্ষরিক বিধিবাক্য এবং পাণিনীয় সমাস-সামর্থ্যকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে কেবল ‘কাল্পনিক প্রতীকী’ বলে প্রচার করা হচ্ছে, ঠিক তেমনই শাস্ত্রীয় বিধি ও ব্যাকরণ-বিরোধী একটি সিদ্ধান্ত।”
উদাহরণটির সাথে পূর্বপক্ষের দাবিকে যুক্ত করা হলো। পূর্বপক্ষ যেহেতু কামিকাগমের ৪৫-৪৬ নম্বর শ্লোকের রাজমন্দিরে বাস্তব ‘মাংসান্ন’ ও শূদ্রগৃহে ‘মদ্য’ বলির সামাজিক বিন্যাসকে অস্বীকার করছেন, তাই তাঁদের দাবিটি সরাসরি ‘উপনয়’ দোষে দুষ্ট।
◾নিগমন — “তস্মাৎ (অতএব), পূর্বপক্ষের সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণরূপে অননুগ্রাহ্য ও শাস্ত্রীয় বিচারে অগ্রাহ্য, ইহা সিদ্ধ হইল।”
পাঁচটি যৌক্তিক ধাপ পার করে আমরা আমাদের মূল প্রতিজ্ঞায় ফিরে এলাম এবং প্রমাণ করলাম যে পূর্বপক্ষের তত্ত্বটি খণ্ডিত।
প্রথমত — পূর্বপক্ষ প্রথমে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে আগমে বাস্তব বলির কোনো অস্তিত্বই নেই। কিন্তু যখনই তাঁরা অংশুমান আগমের “অথবা” (বিকল্প) শব্দটিকে নিজেদের সমর্থনে ব্যবহার করলেন, তখনই তাঁরা পরোক্ষভাবে বাস্তব বলির অস্তিত্ব স্বীকার করে নিলেন (কারণ সত্যের বিকল্পই সত্য হয়)। এর ফলে তাঁদের মূল প্রতিজ্ঞাটি নিজেরাই ধ্বংস করে ফেলেছেন, যা ন্যায়শাস্ত্রে 'প্রতিজ্ঞাহানি' নামক নিগ্রহস্থান।
দ্বিতীয়ত — শৈব সিদ্ধান্ত ও তন্ত্রের মূল সিদ্ধান্ত হলো শিবের অধিকারভেদ ও শিবোক্ত বাক্যের অভ্রান্ততা। পূর্বপক্ষ শিবেরই এক শাস্ত্রের (বাস্তুযাগের প্রতীকী বলি) অজুহাত দিয়ে শিবেরই অন্য শাস্ত্রের বাস্তব বলিদানকে 'তামসিক' বা 'অপপ্রচার' বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন। স্বীয় শাস্ত্রের সিদ্ধান্তকে খণ্ডন করার এই প্রবণতাকে ন্যায়শাস্ত্রে 'অপসিদ্ধান্ত' নামক নিগ্রহস্থান বলা হয়।
✅ সিদ্ধান্ত— মহর্ষি গৌতমের ন্যায়শাস্ত্রের নিয়ম পঞ্চাবয়বী ন্যায় অনুসারে আপনাদের প্রতিজ্ঞাটি ‘অননুগ্রাহ্য’ ও খণ্ডিত। আপনারা যে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে আগমে বাস্তব বলি নেই, তা অংশুমান আগমের ‘অথবা’ (বিকল্প) শব্দ মেনে নেওয়ার সাথে সাথেই ‘প্রতিজ্ঞাহানি’ নিগ্রহস্থানে পরিণত হয়েছে। আর পরমেশ্বর শিবের অর্ধেক কথা মেনে বাকি অর্ধেককে তামসিক বলে উড়িয়ে দেওয়া আপনাদের ‘অপসিদ্ধান্ত’ দোষকে প্রমাণ করে।
[ বি: দ্র: এই সিদ্ধান্ত নিয়ে অহেতুক কুতর্ক ও বিতণ্ডা না করে, পূর্বপক্ষকে আগামী রবিবারের সন্ধ্যা ৭টার লাইভে উক্ত বিষয়ের উপর আলোচনাতে আসার আমন্ত্রণ দেওয়া হলো, কারা অতি চালাকি করছে তখন না হয় প্রমাণ হয়ে যাবে ]
🔸 বিশেষ ঘোষণা — পূর্বপক্ষের সমর্থন কারী ব্যক্তিবর্গের নিজস্ব বিচার বিবেচনা করবার ক্ষমতা নেই, তাই একটি অযৌক্তিক লিখিত দাবীকে দেখা মাত্র তারা শুধু মাত্র নিরামিষাশী এজেন্ডা হবার কারণে ‘খুব সুন্দর/একদম/দারুণ’ বলে বাহবা দেওয়া মতো হাস্যকর কার্য তারা করে থাকেন। তাদের প্রতি বড় করুণা হয়। তারা বেদদূষক আগমদূষক কে তার পাপকার্যের জন্য প্রশংসা বাহবা দিয়ে অন্যদিকে নিরামিষ খেয়ে পশু মেদ হতে উৎপন্ন উদ্ভিদকে কষ্ট দিয়ে বধ করে তা আহার করে পাপ করেও ভাবছে যে, তারা বড় শিবোপাসক হয়ে উঠেছে। পরমেশ্বর শিবের বামা/নিগ্রহ শক্তির কারণে বেচারাদের এমন একটা বেহাল অবস্থা। পরমেশ্বর শিবের কৃপায় এদের মধ্যে নিরামিষাশী হবার অহংকার দূর হয়ে সর্বত্র শিবময় চেতনা বোধ হোক। শ্রীগুরু দক্ষিণামূর্তয়ে নমঃ ॥
🙏সর্বে হ্যেষ রুদ্রস্তস্মৈ রুদ্রায় নমো অস্তু🙏
নমঃ শিবায়ৈ 🙏
নমঃ শিবায় 🙏
শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্ ✊🚩
✍️ অপপ্রচার দমনে— অন্তিক ভট্টাচার্য্য (শম্বরনাথ শৈব)।
🌻 বিশেষ কৃতজ্ঞতা— আমার গুরু শ্রী নন্দীনাথ শৈবাচার্য জী ও আমার আদর্শ শ্রী রোহিত কুমার চৌধুরী শৈবজী।
📣 কপিরাইট ও প্রচারে— Shivalaya 🔥


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন