ভৈরব রূপে পরমেশ্বর শিব করলেন — বিষ্ণুর বামন অবতার নিগ্রহ (সংহার)



॥ ॐ নমঃ শিবায় ॥

ভূমিকা ঃ

পরমেশ্বর শিব এই জগত কে রক্ষা করবার জন্য বহু লীলা করেছেন, তার মধ্যে বিষ্ণু অবতার গুলির সংহার করবার লীলা অন্যতম । এই প্রবন্ধে শ্রীবিষ্ণুর বামন অবতারকে সংহার করবার বিষয়ে স্কন্দমহাপুরাণের শঙ্করসংহিতার শিবরহস্যখণ্ডের উপদেশখণ্ডের ৬৪ অধ্যায়ের মধ্যে ৮১-৮৯ নং শ্লোকে যে কাহিনি উল্লেখিত হয়েছে, আমি তা শ্লোক সহ অনুবাদ উপস্থাপন করলাম। ধৈর্য সহকারে সম্পূর্ণ প্রবন্ধ টি পড়ুন ।

________________________________________________


ভৈরব রূপে পরমেশ্বর শিব করলেন — বিষ্ণুর বামন অবতার নিগ্রহ (সংহার)

[তথ্যসূত্র : স্কন্দমহাপুরাণ/শঙ্করসংহিতা/শিবরহস্যখণ্ড/উপদেশকাণ্ড/৬৪ অধ্যায়/৮১-৮৯ নং শ্লোক]


বামনাবতারনিগ্রহঃ


একদা পুনরেবৈষ বলিনিগ্রহমাচরন্‌ ।

বভূব কাশ্যপসুতো বামনো মধ্যুসূধনঃ ॥ ৮১ ॥

ঈশ্বরাপ্তবরোঽভ্যেত্য যাগশালাময়াচত ।

পদত্রয়মিতাং ভূমিমাত্মনঃ স্থিতয়ে পুনঃ ॥ ৮২ ॥

প্রতিগৃহ্য ততো ভূমিমেকেনৈব পদা দিবম্।

বিক্রম্যান্যপদালাভাদ্ধলিং কারাগৃহান্তরে ॥ ৮৩ ॥

নিবেশ্য রাজ্যং ভূয়োঽপি দেবেন্দ্রায় ত্রিবিক্রমঃ ।

দত্বাণ্ডমেতদ্ভগ্নং স্যাদ্যথা সংবর্ধযত্পুনঃ ॥ ৮৪ ॥

অর্থ — একসময় ভগবান মহাবিষ্ণু, মহাতেজস্বী বামনরূপে (এক ক্ষুদ্র বামন বালক হিসেবে), মহর্ষি কশ্যপের পুত্র হয়ে আবির্ভূত হলেন, পরাক্রান্ত রাজা বলিকে দমন করার উদ্দেশ্যে। তিনি পূর্বে শ্রী ঈশ্বর (শিব) থেকে বরলাভ করেছিলেন এবং সেই শক্তি নিয়ে বলির যজ্ঞশালায় উপস্থিত হলেন। সেখানে তিনি বিনয় সহকারে নিজের বসবাসের জন্য মাত্র তিন পা জমি প্রার্থনা করলেন ॥ ৮১–৮২

বলির কাছ থেকে সেই দান পাবার পর, বামন ত্রিবিক্রম রূপ ধারণ করলেন। এক পা দিয়ে তিনি সমগ্র পৃথিবী আচ্ছাদিত করলেন, দ্বিতীয় পা দিয়ে আকাশ পরিমাপ করলেন। তৃতীয় পা রাখার আর কোনো স্থান না পেয়ে, তিনি রাজা বলিকে অধীন করে পাতালে প্রেরণ করে বন্দী করে কারাগারে নিক্ষেপ করলেন এবং ইন্দ্রকে স্বর্গরাজ্য পুনরায় ফিরিয়ে দিলেন। এরপর তাঁর রূপ অসীমভাবে সম্প্রসারিত (বৃদ্ধি)  হলো, যার ফলে সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ড কেঁপে উঠল ॥ ৮৩–৮৪


ততো দেবৈর্মহাদেবো জ্ঞাত্বা বৃত্তান্তমস্য তু ।

ভৈরবং সন্দিদেশাস্য নিগ্রহে ভৈরবাকৃতিম্ ॥ ৮৫ ॥

অর্থ — এরপর, দেবতাদের কাছ থেকে সমগ্র ঘটনা জেনে মহাদেব তার শ্রীভৈরবকে আদেশ দিলেন, যাতে তিনি (বামন রূপী বিষ্ণুকে) দমন করার জন্য ভয়ঙ্কর ভৈরবরূপে আবির্ভূত হন। [৮৫]


সোঽপি তং ত্বরয়াভ্যেত্য বৃদ্ধমণ্ডান্তমচ্যুতম্ ।

প্রহৃত্যোরসি হস্তেন নিপাত্যোত্কৃত্য চ ত্বচম্ ॥ ৮৬ ॥

আত্মনঃ কঞ্চুকত্বেন দধাবানীলকোমলম্ ।

তস্যাস্থ্যপি মহদ্দীর্ঘ কঙ্কালারূয়ং দধৌ করে ॥ ৮৭ ॥

অর্থ — এরপর, ভগবান ভৈরব দ্রুত ছুটে গেলেন অচ্যুত (বিষ্ণু) -র দিকে, যিনি বামনরূপে সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ড জুড়ে বিস্তৃত হয়েছিলেন। প্রবল শক্তি দিয়ে তিনি বিষ্ণুকে (বামনরূপে) বক্ষদেশে আঘাত করলেন, ফলে তিনি (আকারে ক্রমশ স্বাভাবিক আকারে ফিরে এসে) ভূমিতে পতিত হলেন। তারপর ভৈরব বামনের অন্ধকারবর্ণ কোমল চামড়া ছাড়িয়ে সেটিকে নিজের বর্মরূপে ধারণ করলেন। এছাড়াও তিনি বামনের দীর্ঘ অস্থিপুঞ্জ, যা “কঙ্কাল” নামে পরিচিত, সেটিকে হাতে তুলে অস্ত্ররূপে ধারণ করলেন ॥ ৮৬-৮৭


ততো জগ্মুর্নিরাতঙ্কাস্তদা সর্বে সুরা দিবম্ ।

উপেন্দ্রোপি মহাদেবং সমারাধ্য যথাপুরম্ ॥ ৮৮ ॥

শান্তাপরাধঃ সমভূজ্জগাম চ যথাগতম্

এবং পঞ্চাবতারেষু নিগৃহীতঃ পিনাকিনা ।

পঞ্চস্বনুগৃহীতশ্চ বক্ষ্যে শ্রুণ্বন্তু তৎকথাম্ ॥ ৮৯ ॥

অর্থ — এরপর দেবতারা সমস্ত ভয় থেকে মুক্ত হয়ে স্বর্গলোকে ফিরে গেলেন। উপেন্দ্র (বামন), নিজের অপরাধ উপলব্ধি করে, পূর্বের ন্যায় ভগবান মহাদেবের পূজা করলেন এবং পাপমুক্ত হয়ে নিজের বিষ্ণু স্বরূপে প্রত্যাবর্তন করলেন।

হে মহৎ ব্রাহ্মণগণ! এভাবে শ্রী নারায়ণের দশ অবতারের মধ্যে পাঁচটিতে পরমেশ্বর শিব তাঁকে সংযত করেছিলেন। এখন শুনুন, বাকি পাঁচ অবতারে কিভাবে মহাদেব বিষ্ণুর প্রতি কৃপা বর্ষণ করেছিলেন তার কাহিনি ॥ ৮৮–৮৯


-------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------- 


[লক্ষণীয় বিষয় :  বামন অবতার কে সংহার করবার জন্য স্বয়ং পরমেশ্বর শিব নিজে যাননি, বরং তার স্বরূপভূত গণ  ‘ভৈরব’ জী কে আদেশ দিয়েছিলেন।  ভৈরব জী বামনরূপী বিষ্ণুর চর্ম ধরে তুলে দিয়ে বামনের মেরুদণ্ড ধরে টেনে বের করে নিয়ে সেটিকে কঙ্কাল অস্ত্র হিসেবে ধারণ করেন, ঐ অবস্থায় বামন পরমেশ্বর শিবের কাছে ক্ষমা চান। এই দৃষ্টান্তমূলক কাহিনীর দ্বারা সমাজ এই শিক্ষা পাবে যে, যত‌ই শক্তিশালী হও, অহংকার কোরো না, অহংকার করলেই পরমেশ্বর সেই অহংকার বিনাশ করবেন। তাই সদা সর্বদা অহংকার থেকে দূরে থাকো। বামনের এই চর্ম আর অস্থি টি হল সেই অহংকার বিনাশের প্রতীক হিসেবে সমগ্র সমাজের কাছে আদর্শ উদাহরণ।]

________________________________________________


অনান্য শাস্ত্রে, পরমেশ্বর শিবের দ্বারা বামন অবতার সংহারের প্রমাণ — 

 
পুরাণ প্রমাণ 

স্কন্দ উপপুরাণের ৯নং অধ্যায়ের ৯১ নং শ্লোক বলা হয়েছে যে, পরমেশ্বর শিবের পরমভক্ত শ্রীসুন্দর বামন অবতারের দ্বারা পূজিত বামনেশ্বর শিবের অর্চনা করেছিলেন নিজের বচন দ্বারা —
বামনেশ্বরমভ্যর্চ্য বাক্ পুষ্পৈর্বামনার্চিতম্ ।..॥ ৯১
[স্কন্দ উপপুরাণ/৯নং অধ্যায়/৯১ নং শ্লোক]
অর্থ — বামন অবতারের দ্বারা পূজিত বামনেশ্বর শিবের অর্চনা করলেন সুন্দরেশ্বর নিজের বচনপুষ্পের দ্বারা ।

অর্থাৎ, ভৈরব দ্বারা বামন সংহার করবার পর ঐ বিষ্ণু‌অবতার বামন পরমেশ্বর শিবের পূজা করেছিলেন, এমনটাই ইঙ্গিত এখানে স্পষ্ট। 

বেদ প্রমাণ 

বেদোক্ত মুক্তিকা উপনিষদের বচন অনুসারে বেদের মূল ১০৮ উপনিষদের মধ্যে অন্যতম হল শরভ উপনিষদ। অর্থাৎ (বেদ) শ্রুতিশাস্ত্র শরভ উপনিষদের ১৩ নং মন্ত্রেও এই কাহিনীর সমর্থন করেই বেদবাক্য উপস্থিত রয়েছে, দেখুন —

যো মত্স্যকূর্মাদিবরাহসিংহান্বিষ্ণুং ক্রমন্তং বামনমাদিবিষ্ণুম্ ।

বিবিক্লবং পীড্যমানং সুরেশং ভস্মীচকার মন্মথং যমং চ ।

তস্মৈ রুদ্রায নমো অস্তু ॥ ১৩ 

(অথর্ববেদ/শরভ উপনিষদ/১৩নং মন্ত্র)

অর্থ — যিনি শ্রীবিষ্ণুর মৎস, কূর্মবরাহ, নৃসিংহ এমনকি বামন অবতারকেও পীড়া দান পূর্বক পরাজিত করেছিলেন সেই মন্মথ(কামদেবের)কে ভস্মকারী সকলের যমরূপী সুরেশ্বর ভগবান রুদ্র(শিব)কে প্রণাম করি ॥১৩


মহাশ্রুতি শৈবাগম থেকে প্রমাণ 

মৎস্যকূর্মবরাহাদিনারসিংহাদিকান* পুরা ।

অবতারাত্ মহাবিষ্ণোঃ সংহৃত্য পরমেশ্বরঃ ॥ ৩৬ ॥

তত্তত্কল্পেষু ভুষাং চ তত্তদঙ্গান্যকল্পয়ত্ ।

হরিধ্বংসীতি লোকেষু ততঃ খ্যাতিং গতঃ শিবঃ ॥ ৩৯ ॥ 

[মহাশ্রুতি সূক্ষ্মাগম/ক্রিয়াপাদ/২য় পটল]

অর্থ – অতীতে মহাবিষ্ণুর মৎস, কূর্মবরাহ এবং নরসিংহ (বামন) আদি* অবতারকেও পরমেশ্বর শিব সংহার করেছিলেন ॥৩৬

বিভিন্ন কল্পে পরমেশ্বর শিব শ্রীবিষ্ণুর এসব অবতারদের হত্যার পরে তাদের বিভিন্ন অঙ্গ নিজের আভূষণ ও অলঙ্কার হিসেবে ধারন করতেন। এরপর থেকেই মহেশ্বর শিব সমগ্র লোকে ‘হরিধ্বংসী’ রূপে আখ্যায়িত হন ॥৩৯

('*'এইখানে বিষ্ণুর "মৎস, কূর্ম, বরাহ, নৃসিংহ আদি অবতার" বাক্যে 'আদি' শব্দ দ্বারা বামন কেও ঐ অবতারের মধ্যে পরোক্ষভাবে ধরে নেওয়া হয়েছে) 

🔻বাতুলশুদ্ধাখ্য আগম মতেও মহেশ্বরের ২৫ টি লীলাবিগ্রহের মধ্যে ১৩ নং বিগ্রহটিই হল – হরিধ্বংসী। প্রমাণ দেখুন -

ত্রয়োদশং হরিধ্বংসী ত্বর্ধনারী চতুর্দশম্ ।[মহাশ্রুতি বাতুলশুদ্ধাখ্য আগম – প্রথমঃ পটলঃ – ১২৯ নং মহামন্ত্র]


🔘 তামিল শৈবশাস্ত্র ‘Sivaparakramam’(শিবপরাক্রমম্‌) অনুযায়ী মহেশ্বরের ৬৪ টি লীলা বিগ্রহের মধ্যে একটি বিগ্রহ হল -  বামন সংহার মূর্তি 

🔖নীলকন্ঠ শিবাচার্য জী তার রচিত ক্রিয়াসার গ্রন্থে এই  বামন অবতার নিগ্রহ প্রসঙ্গ  উল্লেখ করেছেন ।


________________________________________________

সিদ্ধান্ত

 শৈব আগম ও বেদ যখন নিজেই বিষ্ণুর বিভিন্ন অবতার কে শিবের দ্বারা সংহার হয়েছে বলে স্বীকার করেছে, তখন প্রত্যেক সনাতনী কে এই বিষ্ণুঅবতারগুলিকে সংহার করবার কাহিনীকে সত্য বলে গ্রহণ ও মান্য করতেই হবে। কারণ বেদ সম্মত যে কোন কাহিনী সর্বদাই সর্বপ্রথম এবং সর্বোচ্চ হিসেবে গ্রহণযোগ্য। বেদ বিরুদ্ধ কোন কাহিনী বা মত গ্রহণযোগ্য নয়।

আর বেদানুসারে শৈবাগম সর্বোচ্চ তথা অন্তিমসার সিদ্ধান্তদায়ী, অর্থাৎ যখন শৈবাগম কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিয়েছে তখন তা আর কোনোভাবেই খণ্ডন বা অগ্রহণযোগ্য হবে না ।

________________________________________________

________________________________________________


শ্রী বামনেশ্বর শিব মন্দিরের বর্তমান ঠিকানা 

Current location of Vamaneswarar Mandir


  বামন অবতাররূপী বিষ্ণু যে স্থানে পরমেশ্বর শিবের আরাধনা করেছিলেন, সেই  শিবমন্দিরটি আজ‌ও বিদ্যমান রয়েছে । বর্তমানে তার নাম ‘ শ্রী বামনেশ্বর ধাম’ , যা বর্তমান ভারতের বিহার রাজ্যের বক্সারে অবস্থিত।


ঠিকানা :

Vamaneswar Temple

वामनेस्वर मंदिर

HX53+WM9, Central Jail Rd, 

Bibiganj, Buxar, Bihar 802101 


 Location দেখুন, 

এখানে ক্লিক করে👇 

Vamaneswar Temple 


________________________________________________

শ্রী বামনেশ্বর শিব মন্দিরের চিত্র


________________________________________________

এখানেই এই প্রবন্ধ টি সমাপ্ত হল ।


বরাহ অবতার রূপে শ্রীনারায়ণের জয়

বরাহসংহারি পরমেশ্বর শিবের জয়

শিবপুত্র শ্রীকার্তিকেয় ভগবানের জয়

শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্ 🚩 

ॐ নমঃ পার্বতীপতয়ে হর হর মহাদেব 🚩 


লেখনীতে — ©শ্রী নন্দীনাথ শৈব আচার্য জী 

কপিরাইট ও প্রচারে — SHIVALAYA 


মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ