অনাদি নিরাকার নির্গুণ অংশহীন পরমশিব-ই পরমব্রহ্ম শব্দে চিহ্নিত - বলছে বেদ
🕉️ অনাদি নিরাকার নির্গুণ অংশহীন ‘পরমশিব’-ই পরমব্রহ্ম শব্দে চিহ্নিত — বলছে বেদ
__________________________________________________
🔰 ভূমিকা — অদ্বৈত শৈবদর্শন ই সনাতন ধর্মের এক ও অদ্বিতীয় প্রাচীনতম চিরনিত্য সিদ্ধান্ত। এক পরমসত্তা শিবই তিনভাবে লীলা করছেন।
যেমন — (১) মায়ায় তৈরী গুণ দ্বারা যুক্ত গুণাত্মক হয়ে ত্রিদেবের মধ্যে অন্যতম সংহারকর্তা ‘রুদ্র’রূপে।
(২) গুণের প্রভাব থেকে মুক্ত স্বরূপে গুণাতীত ত্রিদেবজনক সাকার ‘সদাশিব’ হয়ে।
(৩) সকল রূপ গুণ দৃষ্টান্ত তথা সকল কিছুর অতীত নিরাকার নির্গুণ হিসেবে ‘পরমশিব’ হয়ে সর্বোচ্চ পরমসত্তা হিসেবে স্থিত।
মায়ার প্রভাবে কলিকালের মানুষেরা বিভিন্ন মতপথে বিভক্ত হয়ে গিয়ে সনাতন ধর্মের সেই পরম অদ্বৈত শৈবদর্শন থেকে বিমুখ হয়ে পড়েছে। ফলে, সর্বোচ্চ পরমসত্তা পরমশিবই যে একমাত্র পরমব্রহ্ম শব্দে অভিহিত হন, তা ভ্রমিত মানুষের বোধগম্য হয় না।
যখন শৈবপক্ষ থেকে বলা হয় যে, পরমশিবই নির্গুণ নিরাকার সর্বোচ্চ পরমসত্তা পরমব্রহ্ম, যখন কিছু শাস্ত্রজ্ঞানহীন ব্যক্তি বা স্মার্ত ব্যক্তি দাবী করেন যে, “এই সিদ্ধান্ত শুধুমাত্র শৈবদের সম্প্রদায়গত সীমাবদ্ধ সিদ্ধান্ত। পরমশিবকে নিরাকার নির্গুণ ব্রহ্ম বলছ চিহ্নিত করার বিষয়টি শুধুমাত্র শৈবদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ও সম্প্রদায়েই মান্য। বৈষ্ণব, শাক্ত, গাণপত্য, সৌর বা অন্য কোনো সম্প্রদায়ের কাছে পরমশিব নির্গুণ নিরাকার ও সর্বোচ্চ ব্রহ্ম বলে স্বীকৃতি পাবে না, কারণ পরমশিব শব্দকে নিরাকার নির্গুণ হিসেবে নিরপেক্ষ বেদের কোথাও শব্দপ্রমাণ সহ দাবী করা হয়নি। নির্গুণ নিরাকার পরমতত্ত্বের নাম ‘ব্রহ্ম’, শিব হল ব্রহ্মের মায়ায় প্রকটিত একটি সাকার রূপমাত্র। বৈষ্ণবদের কাছে ঐ নিরাকার নির্গুণ পরমতত্ত্ব পরমবিষ্ণু, শাক্তদের কাছে পরমাশক্তি, গাণপত্যদের কাছে পরমগণপতি, সৌরদের কাছে পরমসূর্য - বলে গণ্য। শুধুমাত্র পরমশিব নির্গুণ নিরাকার ব্রহ্ম নয়, এটি শৈবদের সম্প্রদায়গত মান্যতা মাত্র, সার্বজনীন সিদ্ধান্ত নয়” — এই দাবী যে ভিত্তিহীন, তা বেদ থেকেই পরমশিবকেই সর্বোচ্চ নির্গুণ নিরাকার ব্রহ্ম হিসেবে শব্দ প্রমাণ দেখিয়ে শৈবদের দর্শনই সনাতন ধর্মের একমাত্র নিরপেক্ষ অদ্বৈত দর্শন - তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়েছে এই প্রবন্ধে।
__________________________________________________
♦️ বেদ বলছে —
তদেব নিষ্কলং ব্রহ্ম নির্বিকল্পং নিরঞ্জনম্ ।
তদ্ব্রহ্মাহমিতি জ্ঞাত্বা ব্রহ্ম সম্পদ্যতে ধ্রুবম্ ॥ ৮ ॥
নির্বিকল্পমনন্তং চ হেতুদৃষ্টান্তবর্জিতম্ ।
অপ্রমেয়মনাদিং চ জ্ঞাত্বা চ পরমং শিবম্ ॥ ৯ ॥
[কৃষ্ণ-যজুর্বেদ/ব্রহ্মবিন্দু উপনিষদ/৮-৯ ক্রমাঙ্ক মন্ত্র]
✅ অর্থ : সেই ব্রহ্মই নিষ্কল (অংশহীন), নির্বিকল্প এবং নিরঞ্জন (কলুষতাশূন্য)। ‘সেই ব্রহ্মই আমি’ — এইভাবে জেনে জ্ঞানী ব্যক্তি নিশ্চিতভাবেই ব্রহ্মে (উপনীত হয়ে) লীন হয়ে [অদ্বৈত] ব্রহ্ম হয়ে যান ॥ ৮ ॥
সেই পরমশিবকেই নির্বিকল্প, অনন্ত, হেতু ও দৃষ্টান্ত-বর্জিত, অপ্রমেয় এবং অনাদি - ব্রহ্ম বলে জানলে — সেই আত্মজ্ঞানী ব্যক্তি মুক্ত হন ॥ ৯ ॥🔹 ব্যাখ্যা :
উপরোক্ত দুটি মন্ত্রকে পাশাপাশি বিচার করলে একটি গভীর অদ্বৈত তত্ত্ব প্রকাশিত হয়। ৮ ক্রমাঙ্ক মন্ত্রে প্রথমে সেই পরমতত্ত্বকে “নিষ্কল ব্রহ্ম”, “নির্বিকল্প” এবং “নিরঞ্জন” বলা হয়েছে। অর্থাৎ পরম ব্রহ্ম কোনো অংশ, বিভাগ, দ্বৈততা, বিকল্প বা কলুষতার দ্বারা সীমাবদ্ধ নন। তিনি সমস্ত প্রকার ভেদ ও উপাধির অতীত এক অখণ্ড পরমসত্তা। তাই তাঁকে উপলব্ধির ক্ষেত্রে বলা হয়েছে—“তদ্ব্রহ্মাহমিতি”, অর্থাৎ “সেই ব্রহ্মই আমি”। এই ব্রহ্মাত্মৈক্য-জ্ঞান লাভের ফলেই জ্ঞানী ব্যক্তি ব্রহ্মস্বরূপে উপনীত হন।
এরপর ৯ ক্রমাঙ্ক মন্ত্রে একই পরমতত্ত্বের আরও স্বরূপলক্ষণ প্রদান করে বলা হয়েছে—তিনি নির্বিকল্প, অনন্ত, হেতু ও দৃষ্টান্ত-বর্জিত, অপ্রমেয় এবং অনাদি। অর্থাৎ তাঁর কোনো দ্বিতীয় নেই, তাঁর কোনো সীমা নেই, তাঁকে কোনো কারণ দ্বারা উৎপন্ন বলা যায় না, কোনো দৃষ্টান্তের মাধ্যমে তাঁর পূর্ণস্বরূপ বোঝানো যায় না, কোনো সাধারণ প্রমাণ বা পরিমাপের দ্বারা তাঁকে সীমাবদ্ধ করা যায় না এবং তাঁর কোনো আদিও নেই।
কিন্তু এই সমস্ত নির্গুণ ও নিরাকার স্বরূপলক্ষণ বর্ণনা করার পর মন্ত্রটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে সেই তত্ত্বকেই “পরমং শিবম্” — “পরম শিব” বলে নির্দেশ করেছে। অর্থাৎ এখানে “ব্রহ্ম” এবং “পরম শিব” — দুটি পৃথক সর্বোচ্চ তত্ত্ব হিসেবে উপস্থাপিত হয়নি; বরং ৮ ক্রমাঙ্ক মন্ত্রে যে নিষ্কল, নির্বিকল্প, নিরঞ্জন ব্রহ্মের কথা বলা হয়েছে, ৯ ক্রমাঙ্ক শ্রুতিতে সেই একই পরমতত্ত্বকে “পরম শিব” নামে অভিহিত করা হয়েছে।
সুতরাং শৈব অদ্বৈত ব্যাখ্যা ও বেদের দৃষ্টিতে মন্ত্রদ্বয়ের ধারাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ —
নিষ্কল ব্রহ্ম → নির্বিকল্প → নিরঞ্জন → অনন্ত → অপ্রমেয় → অনাদি → পরম শিব।
অর্থাৎ পরমশিব শুধু শৈব পরম্পরার সম্প্রদায়গত সীমাবদ্ধ সিদ্ধান্তের মধ্যে থাকা একটি নাম মাত্র হিসেবে এখানে সীমাবদ্ধ নন ; এই মন্ত্রের আলোচ্য পরমশিব হলেন সমস্ত ভেদ, বিকল্প, সীমা, কারণ ও দৃষ্টান্তের অতীত পরমতত্ত্ব। এটি বেদের নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ৮ ক্রমাঙ্ক মন্ত্রে “তদ্ব্রহ্মাহম্” এবং ৯ ক্রমাঙ্ক মন্ত্রে “পরমং শিবম্”—এই দুই বক্তব্য পাশাপাশি রয়েছে। ফলে শ্লোকদ্বয়ের অন্তর্নিহিত তত্ত্বকে এইভাবে বোঝা যায় —
যে নিষ্কল, নির্বিকল্প ও নিরঞ্জন ব্রহ্মকে “আমি সেই ব্রহ্ম” — এই জ্ঞান দ্বারা উপলব্ধি করা হয়, ৯ ক্রমাঙ্ক মন্ত্রে সেই একই পরমতত্ত্বকে “পরম শিব” নামে নির্দেশ করা হয়েছে।
এই কারণেই “পরমশিব” শব্দটিকে কেবল কোনো সাকার দেবতার একটি বিশেষ নাম বা সম্প্রদায়গত আমদানি করা নাম হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে, নির্গুণ-নিরাকার পরমব্রহ্মতত্ত্বের নাম হিসেবে বোঝার শাস্ত্রীয় ভিত্তি এখানে পাওয়া যায়।
অতএব, বেদের এই মন্ত্রদ্বয়ের আলোচনায় শিব ও ব্রহ্মকে দুটি স্বতন্ত্র পরমসত্তা হিসেবে গ্রহণ করার পরিবর্তে একই অদ্বিতীয় পরমতত্ত্ব পরমশিবের একটি নাম ব্রহ্ম, এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা অদ্বৈত শৈব ব্যাখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সেই পরমতত্ত্ব শিবের জ্ঞানই আত্মজ্ঞান এবং সেই জ্ঞানই মোক্ষের পথ — এ কথাও মন্ত্রের শেষাংশে “জ্ঞাত্বা চ পরমং শিবম্” দ্বারা বিশেষভাবে প্রতিপাদিত হয়েছে।
শ্রুতিতে পরমশিবকে নিরাকার নির্গুণ ব্রহ্ম হিসেবে শব্দপ্রমাণ সহ উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু পরমবিষ্ণু/পরমাশক্তি/পরমগণপতি/পরমসূর্য শব্দ উল্লেখ করে তাদের নিরাকার নির্গুণ পরমসত্তা বলা হয়নি। তাই শৈবপক্ষের সিদ্ধান্ত যে নিরপেক্ষ বেদ দ্বারা প্রমাণিত ও গ্রহণযোগ্য, এই বিষয়ে আর কোনো সংশয় নেই। বরং পরমবিষ্ণু/পরমাশক্তি/পরমগণপতি/পরমসূর্য ইত্যাদি নামগুলির কোনো অস্তিত্ব ই নেই, নিজেদের সম্প্রদায়কে শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করবার জন্য এই নামগুলিকে রচনা করে জোরপূর্বক পরমশিবের সাথে প্রতিযোগিতায় নামানো হয়েছে সমাজে, যার উল্লেখ শাস্ত্রে নেই। প্রমাণহীন অযৌক্তিক দাবীর গ্রহণযোগ্যতা নেই।
এই বিষয়ে বেদ বলছে —
তর্কতশ্চ প্রমাণাচ্চ চিদেকত্বব্যবস্থিতেঃ ।
চিদেকত্বপরিজ্ঞানে ন শোচতি ন মুহ্যতি ॥ ৩৪ ॥
[অথর্ববেদ/অন্নপূর্ণা উপনিষদ/৪র্থ অধ্যায়/৩৪ ক্রমাঙ্ক শ্রুতি]
✅ অর্থ : যুক্তি ও প্রমাণের দ্বারা যখন চৈতন্যের একত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত হয়, তখন সেই এক চৈতন্যকে যথার্থভাবে উপলব্ধি করলে মানুষ না শোক করে, না মোহগ্রস্ত হয়। ॥ ৩৪ ॥
🔥 সিদ্ধান্ত : বেদের নিরপেক্ষ সনাতন সিদ্ধান্ত হল - নিরাকার নির্গুণ পরমেশ্বরই একমাত্র পরমশিব, তাঁকেই ব্রহ্ম শব্দে ইঙ্গিত করা হয়। এই বিষয়টি যিনি জানেন সেই শিবজ্ঞানী ব্যক্তিই মোক্ষলাভ করেন। এটি কোনো সম্প্রদায়ের নিজস্ব মতবাদ নয়, এই সিদ্ধান্ত সকল সনাতনীর জন্য মান্য করা বাধ্যতামূলক, কারণ - বেদ এটিকে নিরপেক্ষ বৈদিক সিদ্ধান্ত বলে স্বীকৃতি দিয়েছে।
__________________________________________________
🚩 তথ্য সংগ্রহ, ব্যাখ্যা প্রদান তথা সত্য উন্মোচনে : শিবালয় প্রতিষ্ঠাতা শিবদ্বারাধীশাধ্যক্ষ দেশিক আচার্যপরমাধিকারী শ্রীপাদযুক্ত শ্রীগুরু নন্দীনাথ শৈব আচার্যদেব জী 🚩
©️ কপিরাইট ও প্রচারে : Shivalaya 🔥
শৈব সনাতন ধর্ম সদা বিজয়তেতরাম্ 🚩
ॐ নমঃ পার্বতীপতয়ে হর হর মহাদেব 🚩
পরমেশ্বর শিবের ও সনাতন শৈবধর্মের বিষয়ে এমন গুহ্য সত্য রহস্য ও সত্য উন্মোচনমূলক লেখা আরো পেতে অবশ্যই আমাদের Shivalaya ফেসবুক পেজ Follow করে Favourite করে রাখুন। এই তথ্য দ্বারা যদি আপনার জ্ঞান বৃদ্ধি হয়ে থাকে তবে অবশ্যই এই লেখাটি শেয়ার করুন, যাতে সত্য প্রকাশ্যে আসে।
#হিন্দুধর্ম #সনাতনধর্ম #শিবালয় #Shivalaya #sanatandharma #আত্মজ্ঞানী #শৈবধর্ম #পরমশিব #পরমব্রহ্ম #ব্রহ্ম #পরমেশ্বরশিব #ব্রহ্মবিন্দুউপনিষদ #কৃষ্ণযজুর্বেদ #উপনিষদ #সদাশিব #আত্মজ্ঞান #বেদ #বেদজ্ঞান
[এই পোস্টটি শুধুমাত্র শিক্ষামূলক ও জনসচেতনতার উদ্দেশ্যে প্রকাশিত।এখানে ব্যবহৃত চিত্রটি কেবল বিষয়টি সহজে উপস্থাপনের জন্য Ai-সহায়তায় নির্মিত একটি প্রতীকী চিত্র, এই ছবিটির মধ্যে কিছু লেখা আলাদা ভাবে লেখা হয়েছে। সকল শাস্ত্রীয় উদ্ধৃতি ও তথ্য যথাসম্ভব মূল গ্রন্থ অনুসারে ছবি উপস্থাপিত হয়েছে।]


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন